দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

‘পরের জানালায় দেখবার আগে আরাকিয়েনের একটা বিশেষ ক্ষমতার পরিচয় আমি তোমাকে দেব জিমূতবাহন,' বলতে বলতেই হঠাৎ এগিয়ে এসে তার শরীরটা ছুঁয়ে ধ্যানস্থ হলেন সুদ্ধিরদেব। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যেন একটা বৈদ্যুতিক শক খেলে গেল জিমূতবাহনের শরীরে। সুদ্ধিরদেবের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তার নিজেরই অবিকল একটা প্রতিরূপ।
'আশ্চর্য, নয়? আমরা এখন চেতনাকক্ষে রয়েছি। যা দেখছ তা নিছকই কিছু চিন্তাতরঙ্গের খেলা। কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় যখন এই রূপবদল ঘটত, তখন একবার সেই বদল ঘটলে রূপান্তরিত অবস্থায় আমি কিন্তু নিজেকে সত্যিই জিমূতবাহন ভাবতাম। তার সমস্ত স্মৃতিকে নিজের স্মৃতি বলেই মনে হতো আমার। একবার এই রূপান্তর ঘটালে একমাত্র পূর্ণিমার চাঁদের প্রথম আলো আরাকিয়েনকে তার নিজের রূপ ফিরিয়ে দিতে পারে।'
'কিন্তু...এ অন্যায়! এভাবে অন্যের জীবনে হস্তক্ষেপ করা...'
'জানি। মিলিত সভ্যতার সূচনা হবার পর থেকে এই শক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সে ছিল যুদ্ধের সময়। যুদ্ধে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু হয় না জিমূতবাহন। এর সাহায্যেই আমি ঔধীশের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে জয় পেয়েছিলাম। এসো... দেখো...
'আমরা ব্যর্থ হয়েছি ঔধীশদেব,' সামনে দাঁড়ানো ছ'জন সন্ন্যাসীর মুখপাত্র তাঁর বিবরণ শেষ করেছেন। গোটা সভা নিস্তব্ধ হয়ে আছে এখন।
স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে দেখছিলেন প্রধান সাঙ্ঘিক। ছেলেটি অল্পবয়সী। সঙ্ঘে যোগ দেবার কঠোর পরীক্ষা পার করেছিল মাত্র ষোলো বছর বয়সে। সম্ভাবনাময় তরুণ। হয়তো একদিন দ্বিতীয় সাঙ্ঘিক পদের দাবিদার হবার সম্ভাবনা ছিল তার।
একটু হতাশভাবেই মাথা নাড়লেন পুর্বপ্রদেশের ঔধীশ, মহাসাঙ্ঘিক শারণিক। সেই আদি উধীশদেবের কাল থেকেই সংঘের নিয়ম বড় কঠোর।
'এমনকী তোমাদের যুদ্ধে হারাবার পর ওরা কোনদিকে গিয়েছে তারও কোনো সন্ধান তোমরা করতে পারনি?'
'গত চার মাস ধরে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি আমরা। কিন্তু যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে সেই চার আরাকিয়েন। দেনচেং গ্রামের ওই বাড়ির প্রতিটি কোণা খুঁজেছি, কিন্তু সামান্য দু'একটা সাংসারিক কাগজপত্র ছাড়া, তাদের আস্তানার হদিশ দিতে পারে এমন কোনোকিছুই মেলেনি।'
'যা পেয়েছ তা...'
'সঙ্গে করে এনেছি প্রভু,' বলতে বলতেই তরুণ সন্ন্যাসী তার কালো পোশাকের ভেতর থেকে একটা ছোট খাম বের করে মহাসাঙ্ঘিকের হাতে তুলে দিলেন, 'সাংসারিক হিসেবপত্র, কলকাতা থেকে ডিসপেনসারির জন্য ডাক্তার বিজয় গুপ্তের আনানো ওষুধপত্রের বিল, সেমন্তী গুপ্তের কয়েকটা চিঠি আর ওঁদের ব্যাঙ্কের পাশবইটা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি।'
খামটা পাশে বসা দ্বিতীয় সাঙ্ঘিকের হাতে তুলে দিতে দিতে মুখটা কঠোর হয়ে উঠছিল শারণিকের, 'তোমাদের অক্ষমতায় বিজয় গুপ্ত সহ চারজন আরাকিয়েন ঔধীশ সঙ্ঘের হাত থেকে পালাতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার প্রায়শ্চিত্ত তোমরা জানো?'
'জানি দেব। শপথবাক্যের একটা কথাও আমরা ভুলিনি। আমরা প্রস্তুত।' মন্ত্রোচ্চারণের মতোই একসঙ্গে ছ'টি গলা কথা বলে উঠল। সঙ্ঘের চিহ্ন খোদাই করা ধাতব চাকতিগুলো তারা তখন একে একে কবজি থেকে খুলে নামিয়ে রাখছে শারণিকের পায়ের কাছে।
সমতল জমির টুকরোটার ঠিক মাঝখানে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়েছে প্রাচীন মঠের অন্ধকার শরীর। তাকে ঘিরে থাকা সবুজ মাঠ কিছুদূর এগিয়েই খাড়া নেমে গেছে নীচের ঘন মেঘের স্তর পেরিয়ে। ভুটান সীমান্তের কাছে ডুয়ার্সের গহনে ছড়িয়ে থাকা বহু নামহীন শৃঙ্গের মতো এই পাহাড়চূড়াতেও সভ্যজগতের মানুষের পা পড়েনি কখনো। সঙ্ঘের দীক্ষিত সদস্যরাই কেবল এখানে পৌঁছোবার পথের সন্ধান জানে।
সূর্য পশ্চিমে ঢলেছে। সোনারঙের আলো এসে ধুইয়ে দিচ্ছিল সে উঠোনের সবুজ ঘাসের আস্তরকে। মেঘের গায়ে অস্তগামী সূর্যের রামধনুর আলপনা।
মাঠের উত্তরপাশে একেবারে খাদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন সঙ্ঘের সমস্ত সন্ন্যাসী। প্রাচীন ভাষায় কোনো প্রার্থনামন্ত্র ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন তাঁরা বাতাসে। সে মন্ত্রের গম্ভীর সুর বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরায়।
মঠের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন ঔধীশ শারণিক। গম্ভীর বাজনার তালে তালে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে জেগে উঠছে একেকটা গলা,
'ইয়া মেহআইইলা উধীশায়া আরাকিপিয়েহিন স্মুঃ...'
সঙ্গেসঙ্গেই কালো বিদ্যুতঝলকের মতো একেকটা শরীর লাফিয়ে উঠছে বাতাসে। তারপর গভীর খাদের নীচে মিলিয়ে যাচ্ছে অপরাধী গলার শেষ রেশটুকু।
হঠাৎ তাল কেটে গেল সেই অনুষ্ঠানের। তীক্ষ্ন গলায় আর্তনাদের শব্দ উঠেছে একটা। অতল খাদে লাফিয়ে পড়বার মুখে ভয় পেয়েছে বোধ হয় শাস্তি পাওয়া ছ'জনের কোনো একজন। ঘিরে থাকা সন্ন্যাসীদলের কয়েকজন মিলে উঁচু করে ধরেছে প্রাণপণে লড়তে থাকা শরীরটাকে...
তারপর গভীর খাদের মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকা তার শেষ চিৎকারকে ঢেকে দিল সমবেত কন্ঠে উচ্চারিত মন্ত্রটা, 'ইয়া মেহআইইলা উধীশায়া আরাকিপিয়েহিন স্মুঃ'—'আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হোক হে আরাকিয়েননাশক আদি উধীশ'
'একটা সামান্য সূত্র পাওয়া গিয়েছে শারণিক,' পাশে এসে দাঁড়ানো দ্বিতীয় সাঙ্ঘিক শৌভশামের গলার আওয়াজে চমক ভাঙল তাঁর। হাতে করে একটা পুরনো ব্যাঙ্কের পাশবই নিয়ে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন শৌভশাম, 'অ্যাকাউন্টটা বিজয় গুপ্তের। দশবছর আগে অবধি নাগরাকাটা এলাকার একটা অনাথ আশ্রমের অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা হয়েছে এখান থেকে। সুধীর নামে যে দ্বিরূপধারী আরাকিয়েন বিজয় ও সেমন্তী গুপ্তকে আমাদের হানা থেকে রক্ষা করেছিল, সে ওদেরই সন্তান। আমি নিশ্চিত, তাকেই ওই অনাথ আশ্রমে গোপনে বড় করা হয়েছিল।'
মাঠের একধারে তখন শেষবারের মতো ওঠা আর্তনাদটা মিলিয়ে যাচ্ছে বহু নীচের অদেখা অরণ্যে। সূর্য অস্ত গিয়েছে। কালো ডানা মেলে অন্ধকার নেমে আসছিল মঠকে ঘিরে। কালি ঢালা অন্ধকারের মধ্যে মহাসাঙ্ঘিকের জ্বলে ওঠা চোখদুটো দেখা যাচ্ছিল শুধু।
'পূর্বাঞ্চলে আরাকিয়েনের অস্তিত্ব মুছে দেবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আপনার ওপরেই দেয়া হয়ছে শৌভশাম। অথচ মঠ থেকে মাত্র কয়েকদিনের দূরত্বে দ্বিরূপধারী সেই প্রাচীন রাক্ষসীর বংশধর বড় হয়ে উঠেছে তা আপনি টেরও পাননি। কেন?'
বলতে বলতেই শৌভশামের কাঁধদুটো চেপে ধরে নিজের মুখটাকে তাঁর মুখের কাছে নামিয়ে এনেছেন শারণিক। মস্তিষ্কের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক একটা ধাক্কায় ছটফট করছিলেন শৌভশাম। জ্বলন্ত চোখদুটো যেন চিরে চিরে দেখছে তাঁর প্রতিটি স্মৃতিকোষকে।
কিছুক্ষণ পরে তাঁকে ছেড়ে সরে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসলেন শারণিক, 'বিশ্বাসঘাতকতা নয়। নিছকই বুদ্ধির অক্ষমতা। ফলে, প্রায়শ্চিত্তের ঝাঁপ দেবার আগে আরেকবার তোমায় সুযোগ দিতে চাই আমি।'
থরথর করে কাঁপছিলেন শৌভশাম। তিনি শুনেছেন, কেন্দ্রীয় ঔধীশ মঠের মৃত্যুহীন পুরোহিতদের একজন করে প্রতিভু প্রতিটি আঞ্চলিক মঠের প্রধান হন। এ মঠের বাকি সন্ন্যাসীরা নিতান্তই স্থানীয় সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রাণের কোনো মূল্য নেই প্রাচীন যুগ থেকে উঠে আসা এই পুরোহিতদের কাছে। আভূমি নত হয়ে তিনি শারণিকের পা দুটো জড়িয়ে ধরলেন, 'আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব। এবার আমার সৈন্যরা ওই অনাথ আশ্রম থেকে বিফল হয়ে ফিরবে না।'
'মূর্খ,' বলতে বলতে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন শারণিক, 'আরাকিয়েনের ধী শক্তিকে ছোট করে দেখো না। ওই অনাথ আশ্রম ওদের কাছে পৌঁছোবার একমাত্র সূত্র হতে পারে তা কি ওরা অনুমান করতে পারবে না ভেবেছ? ওরা ওখানে নজর রাখবে। সৈন্যদল নিয়ে গেলে বাধা ওরা দেবেই। আর, নিজেদের এলাকার বাইরে একসঙ্গে চারজন আরাকিয়েনের সামনা করা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তার ধারণা তোমার আছে।'
'কিন্তু ওখানে না হানা দিলে কেমন করে...'
একটা হাসির আভাস দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল শারণিকের ঠোঁটের কোণে, 'হানা দেওয়া হবে। তবে ঔধীশ সেনাদল নয়। যাবে তুমি একা। শক্তি নয়, কৌশলে, গোপনে এ কাজ করতে হবে শৌভশাম। সফল হলে তোমার প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ হবে। আর ব্যর্থ হলে...'
কথাটা সম্পূর্ণ না করেই মঠের ভেতরে এগিয়ে গেলেন শারণিক। তাঁর চলে যাওয়া পথটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছিলেন শৌভশাম। ব্যর্থ হলে তার শাস্তি পেতে হয়তো এই মঠে ফিরে আসবারও প্রয়োজন হবে না তাঁর। চারজন আরাকিয়েনের সঙ্গে একা মোকাবিলা করবার ফল কী হতে পারে তা তাঁর অজানা নেই। কতবারই তো ঔধীশ সেনাদল একক আরাকিয়েন শিকারে গিয়েছে। মানুষের রূপ ছেড়ে অতিকায় মাকড়সার রূপে ফিরে যাওয়া সে দৈত্যের দিকে ছোঁড়া পারদের বুলেট একবারও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে দ্বিতীয়বার গোটা দলটাকেই বাঁচবার সুযোগ দেয় না সে।
'এই দাঁড়া তোরা। একজনও নড়বি না। সৌমেন তুমি ছোটদের ওই গাছের গুঁড়িটার পাশে দাঁড় করিয়ে একবার কাউন্ট করে নাও।' ভেজা পাতায় ঢাকা একটা ঢালু গলি বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসতে আসতে কৃষ্ণবাবু হাঁক দিলেন। খাড়াই পাহাড়ের গা জুড়ে জঙ্গলটা এখানে বেশ ঘন।
হালকা শব্দ তুলে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নেমে আসছিল। খানিক নীচে একটা ভেঙে পড়া বড় গাছের গুঁড়ি গলিটার এপাড় ওপাড় করে নদীখাতের ওপরে ঝুঁকে রয়েছে। ওর পাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে ছেলেদের দলটা। লতাপাতার আড়াল থেকে তাদের খুলে ধরা ছাতাগুলো চোখে পড়ছিল শুধু।
'ও স্যার, চলুন না! কিচ্ছু হবে না,' ছাতার আড়াল থেকে একগাদা কচিকাঁচা গলা ভেসে এল এবার। অধৈর্য হয়ে পড়েছে ছেলেগুলো। সেটা স্বাভবিক। দুপুর প্রায় একটা বাজে। ভুটান থেকে বের হয়ে আসা জলঢাকার এই উপনদীটার খাদের মাথায় মাথায় ছেলেদের নিয়ে আজ দিনতিনেক হল হাঁটা চলেছে। ট্রেকের স্পনসর হিলা টি এস্টেটে আজ ওদের লাঞ্চের নিমন্ত্রণ। ওখান থেকেই নাগরাকাটায় ফেরা। তিনদিন ধরে র্যাশনের খাবার খেয়ে আজ তারা সেই ভোজ খাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে।
আকাশ থেকে নেমে আসা অসময়ের ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির দিকে একবার চোখ তুলে দেখলেন কৃষ্ণবাবু। পাথরগুলো পিছল হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় বৃষ্টিটা না থামলে...
'এদিকে একবার দেখুন তো স্যার!'
ক্লাশ টেনের সৌমেন কখন যেন উঠে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। তার আঙুল খানিক দূরে মাটির ওপর পড়ে থাকা একটা নরম স্তূপের দিকে দেখাচ্ছিল।
'এলিফ্যান্ট ড্রপিং!' বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে কৃষ্ণবাবু নীচু হয়ে জিনিসটাকে ভালো করে দেখে নিলেন একবার। একেবারে তাজা।
'কী করবেন স্যার?'
এদিক-ওদিক একবার তাকিয়ে দেখে নিলেন কৃষ্ণবাবু। পায়ের নীচে খাদ থেকে বয়ে যাওয়া নদীর ঝরঝর শব্দের সঙ্গে গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দ মিশে একটা ঝিমধরা আবহ গড়ে তুলছে।
'তুমি বাচ্চাদের সঙ্গে থাকো সৌমেন। একটু শান্ত করে রাখো। আমি একবার নেমে গিয়ে সামনের রাস্তাটার অবস্থা দেখে আসি। সিগন্যাল দিলে আস্তে আস্তে ওদের নামিয়ে আনবে। পলাশ আর হিমুকে লাইনের শুরু আর শেষে রেখে তুমি মাঝখানে থাকবে।' কথাগুলো বলতে বলতেই পিছল পাথরে সাবধানে পা রেখে ছেলেদের দলটাকে ছাড়িয়ে নীচের দিকে নেমে গেলেন কৃষ্ণবাবু।
ঢালু রাস্তাটা এখানে প্রায় ষাট ডিগ্রি কোণ করে নেমে গেছে খাদের মাথা বেয়ে। ওটা পেরোতে পারলে বাকি রাস্তাটার দু'পাশেই ঘন জঙ্গল। সমস্যা হবে না আর। পাহাড়ের দেয়ালে হাত রেখে সাবধানে মাটিতে পায়ের ধাক্কা দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন কৃষ্ণবাবু। বাচ্চাগুলোকে এখান দিয়ে পার করে নিয়ে যাবার আগে, কোথাও মাটি ধ্বসে যাবার সম্ভাবনা আছে কি না সেটা যাচাই করে নেওয়া দরকার।
পথটার মাঝামাঝি আড়াআড়ি গাছ পড়ে আছে একটা। সেই অবধি এগিয়েই থেমে যেতে হল কৃষ্ণবাবুকে। হঠাৎ তেজ বেড়ে উঠেছে বৃষ্টির। চড়বড় করে নেমে আসা জলের ফোঁটার ঘা খেয়ে পথটার ওপরে কাদামাটির স্রোত নেমে আসছে পাহাড় থেকে। গাছটা ধরে থেমে দাঁড়ালেন তিনি। এ অবস্থায় বাচ্চাদের এখান দিয়ে নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। ফিরে গিয়ে বৃষ্টি থামবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
গাছটায় ভর দিয়ে আস্তে আস্তে পেছনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন কৃষ্ণবাবু। আর তারপর চমকে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। তিমির নামে ক্লাস ফোরের ছেলেটাকে মাথার ওপর তুলে ধরে তখন পিছল পথটা দিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছিল কালো পোশাকে ঢাকা একজন সন্ন্যাসী। তিনি মুখ খুলতে যেতেই তিমিরকে একহাতে খাদের দিকে ঝুলিয়ে ধরে সে অন্যহাতের তর্জনি ঠোঁটের ওপর রাখল। তারপর এগিয়ে এসে একেবারে তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াল সে।
তিমির হঠাৎ প্রাণপণে চিৎকার করে উঠতে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তার মুখের ওপর শক্ত হয়ে এঁটে বসেছে সন্ন্যাসীর অন্য হাতটা। প্রায় দমবন্ধ হয়ে চোখদুটো বড় বড় হয়ে উঠছিল ছেলেটার।
সেদিকে চোখ রেখে শান্ত গলায় কৃষ্ণবাবু বললেন, 'আপনি কে আমি জানি না। কিন্তু এই অনাথ বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন। আমার আশ্রমে পরের দয়ায় মানুষ। ওকে এভাবে...'
'দেব। তবে আগে কয়েকটা খবর আমার প্রয়োজন। কয়েকটা নাম বলছি। ডঃ বিজয় গুপ্ত, সেমন্তী গুপ্ত, অমূল্য সেন, সুধীর গুপ্ত এই চারজনের বিষয়ে আপনি যা জানেন তা...'
একটা তীক্ষ্ন ক্র-র-র-র শব্দ উঠে হঠাৎ সন্ন্যাসীর কথায় বাধা দিল। কৃষ্ণবাবুর বিস্মিত চোখের সামনে একটা অতিকায় উল্ফ স্পাইডার কখন যেন মাথার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছগুলো থেকে ছিটকে এসে সন্ন্যাসীর সামনের রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ থমকে গিয়ে তিমিরকে খাদের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন সন্ন্যাসী। তার হাতে তখন উঠে আসছিল একটা অটোমেটিক পিস্তল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাকড়সাটার শরীর থেকে মোটা একটা রসের ধারা গিয়ে আঁকড়ে ধরেছে খাদের মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকা তিমিরের শরীরটাকে। সেই অবসরে পিস্তলটা জন্তুটার দিকে তাক করে সন্ন্যাসী হিসহিস করে বলে উঠলেন, 'এতে ছ'টা পারদভরা বুলেট আছে। তার একটাই তোমার জন্য—'
ঠিক তখনই দ্বিতীয় একটা ক্র-র-র-র শব্দ তাঁর পেছনদিকের বনে জেগে উঠল। তারপর সেখান থেকে ছুটে আসা মাকড়সার রসের একটা আঠালো ধারা পিস্তলটাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল সন্ন্যাসীর হাত থেকে। তার সামনে দাঁড়ানো মাকড়সাটা তখন দ্রুত বদলে যাচ্ছিল একটা পরিচিত মানুষের চেহারায়।
'সুধীর তুমি? কিন্তু...'
পেছনদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মাকড়সাটা তখন লাফিয়ে এসে সন্ন্যাসীর শরীরে তার দাঁড়াদুটো বিঁধিয়ে দিয়েছে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে মানুষটা।
সেদিকে দেখতে দেখতেই একহাতে তিমিরের অচেতন শরীরটা ধরে রেখে সুধীর বলল, 'নিতান্ত নিরুপায় হয়েই আপনার সামনে নিজের দুটো রূপকে প্রকাশ করতে হল স্যার। গত তিনমাস ধরে আমি আর অমূল্যবাবু মিলে আপনাদের পাহারা দিয়ে চলেছি। কিন্তু এ যে এভাবে এমন জায়গায় আপনার ওপরে হানা দেবে তা আমরা আন্দাজ করতে পারিনি।'
'কিন্তু তোমরা কারা? কী করে সম্ভব?'
'বাস্তব অনেক সময়েই কল্পনার থেকে রোমাঞ্চকর হয় কৃষ্ণবাবু,' সন্ন্যাসীর পেছনে দুপায়ে দাঁড়িয়ে ওঠা অমূল্যবাবুর বিরাট চেহারাটা কাছে এগিয়ে আসছিল এবার, 'খুব সংক্ষেপে বলছি। পৃথিবীর প্রথম সভ্য জীব ছিল আমাদের এই দ্বিরূপধারী আরাকিয়েন সমাজ। এ গ্রহের বাঁদরজাতীয় জীবদের শরীরে আমাদের কিছু জিন প্রতিস্থাপিত করে কৃত্রিম আরাকিয়েন সৃষ্টির চেষ্টা থেকে মানুষের উদ্ভব। অথচ অকৃতজ্ঞ এই প্রাণীদের গড়া ঔধীশ সংঘ বহু সহস্রাব্দ ধরে আমাদের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিয়ে চলেছে পৃথিবী থেকে।
'একসময় আমি নিজেকে এই অঞ্চলের শেষ আরাকিয়েন বলে বিশ্বাস করতাম। তারপর সুধীরের সন্ধান পেলাম। মনে আছে, আমি ডাক্তার সেজে একবার আপনার কাছ থেকে সুধীরের বাবা-মায়ের ঠিকানা নিয়েছিলাম? সেই দিয়ে ওর বাবা-মাকে খুঁজে বের করে এঁদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়েছি আমরা।
'তাঁদের কাছেই জেনেছি, একমাত্র সন্তানকে ঔধীশদের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য তাকে আপনার অনাথ আশ্রমে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। সারাজীবন ধরে গোপনে তার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে বেড়িয়েছেন। খুঁজে বের করেছেন পূর্বাঞ্চলে মানুষের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা বহু আরাকিয়েনের ঠিকানা। তারপর...'
সুধীর নীচু হয়ে সন্ন্যাসীর শরীরটা পরীক্ষা করছিল। হঠাৎ মুখ তুলে সে বলল, 'বিষ এর মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ছে। আর বেশিক্ষণ আয়ু নেই এর। দেরি হয়ে যাচ্ছে অমূল্যবাবু। জিপিএস চিপটা দিন।'
পকেট থেকে সন্ন্যাসীর হাতে আটকানো সঙ্ঘের চিহ্নওয়ালা চাকতিটার মতো হুবহু দেখতে অন্য একটা চাকতি বের করে আনলেন অমূল্যবাবু। তারপর সুধীরের হাতে সেটা বেঁধে দিতে দিতেই কৃষ্ণবাবুর দিকে ঘুরে বললেন, 'এরপর যা ঘটবে তাতে কোনো ভয় পাবেন না আপনি। গত তিনমাস ধরে সুধীরকে এর জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছি আমরা। এরপর সন্ন্যাসী আপনাকে যা প্রশ্ন করবে তার সঠিক জবাব দেবেন। আমি আড়াল থেকে নজর রাখব'
'সন্ন্যাসী? কিন্তু সে তো...'
কথাটা সম্পূর্ণ হল না কৃষ্ণবাবুর। তাঁর চোখের সামনে তখন সন্ন্যাসীর শরীরটাকে ছুঁয়ে ধ্যানস্থ সুধীরের চেহারা ঝড়ের বেগে বদলে যাচ্ছিল অবিকল সেই কালো পোশাকধারী সন্ন্যাসীর চেহারায়। বদলের একেবারে শেষমুহূর্তে তার হাতের তলা থেকে অচেতন সন্ন্যাসীর শরীরটাকে ছিনিয়ে নিয়ে অমূল্যবাবু ততক্ষণে উধাও হয়ে গেছেন পাশের জঙ্গলে।
মাথার ওপর তিমিরের শরীরটা উঁচিয়ে ধরে রেখে স্থির চোখে সন্ন্যাসী ফের বললেন, 'যে প্রশ্ন করেছি তার জবাব দিন কৃষ্ণবাবু। আপনার সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই।'
অবাক বিস্ময়ে তার দিকে চেয়ে দেখছিলেন কৃষ্ণবাবু। খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনো স্মৃতি নেই এর মনে। বোধবুদ্ধির অতীত ঘটনাগুলোর কোনো ব্যাখ্যা পাবার চেষ্টাও আর করছিল না তাঁর মন। কেবল অমূল্যবাবুর শেষ কথাটুকুতে ভরসা রেখে যন্ত্রচালিতের মতো তিনি বলে চলেছিলেন সুধীরের গল্প, তার বাপ-মায়ের কাহিনি, মাঝেমাঝে সুধীরের খবর দেবার জন্য যে-সব বিভিন্ন ঠিকানা জানিয়ে তাঁর কাছে বিজয়বাবুর চিঠি আসত সেইসব ঠিকানার সন্ধান। বলতে বলতে তাঁর চোখে জল আসছিল। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, আত্মগোপন করে থাকা অন্য দুর্ভাগা আরাকিয়েনদের ঠিকানা সেগুলো।
'ঔধীশ সঙ্ঘের দ্বিতীয় সাঙ্ঘিক শৌভশামের আন্তরিক ধন্যবাদ নিন বন্ধু' সামনে দাঁড়ানো কালো পোশাক পরা সন্ন্যাসী তিমিরকে কৃষ্ণবাবুর কোলে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, 'আজ আপনার দেওয়া খবর থেকে এই অঞ্চলের বহু আরাকিয়েনের আস্তানার খবর পাওয়া গেছে বলে আমার বিশ্বাস। এই ভয়াল রাক্ষসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আপনার অবদান সঙ্ঘ মনে রাখবে। কিন্তু আর দেরি নয়। পাহাড়ে সন্ধ্যা নামছে। আপনি শিশুদের নিয়ে নিশ্চিন্তে ফিরে যান।'
'ইনি কে স্যার?' কাঁধের কাছ থেকে তিমিরের কচি গলাটা বলে উঠল একবার। বড় আদরে তাকে জড়িয়ে ধরে তার দিকে মুখ ঘোরালেন কৃষ্ণবাবু। 'ও কেউ নয় বাবা। একজন...' বলতে বলতেই সামনের দিকে ফিরে তিনি দেখলেন, সন্ন্যাসী উধাও হয়েছেন সেখান থেকে।
উল্টোদিকের পাহাড় বেয়ে তিরবেগে উঠে যাচ্ছিলেন কালো পোশাকধারী সন্ন্যাসী। নষ্ট করবার মতো সময় নেই তাঁর হাতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মঠে ফেরা দরকার এখন। চলতে চলতেই মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠছিল তাঁর। ছাব্বিশটা ঠিকানা। নিশ্চিন্ত শিকার।
তাঁর অনেক পেছনে, জঙ্গলের পাশে টিটাগুরি গ্রামের একটা চায়ের দোকানের আলো আঁধারিতে বসে মোবাইলে দ্রুত কথা বলে চলেছিলেন অমূল্যবাবু। হাতে ধরা ছোট জিপিএস ট্র্যাকারটার গায়ে দ্রুত সরে যেতে থাকা ফুটকিটার দিকে তখন নজর নেই তাঁর, 'শিকারী নিজেই শিকার হয়েছে বিজয়বাবু। সন্ন্যাসীর চেহারা ও স্মৃতি নিয়ে সুধীর মঠের পথে রওনা হয়ে গেছে। আমাসাদোমের পুঁথির তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে পূর্ণিমার চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্মৃতি আর শক্তি ফিরে আসবে তার। তখন মঠের ভেতর থেকে তার সাহায্য পাব আমরা। আজ শুক্লা একাদশী। হাতে চারদিন সময় আছে আর। আপনি সমস্ত আস্তানায় খবর পাঠান। প্রতিটি আরাকিয়েনের সাহায্য দরকার হবে আমাদের ঔধীশদের মঠের বিরুদ্ধে এই অভিযানে।'
এখানে গভীর বনে মানুষের যাতায়াতের কোনো চিহ্ন নেই। সামনে মেঘ ফুঁড়ে খাড়া উঠে যাওয়া পাহাড়টার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন ঔধীশ সন্ন্যাসী। ওর গা বেয়ে একটা টিকটিকিরও ওঠবার সাধ্য হবে না। সে চেষ্টা না করে আস্তে আস্তে পাহাড়টাকে বেড় দিয়ে চলতে শুরু করলেন তিনি। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বনতুলসি আর ঘেঁটুর একটা গভীর ঝোপের মধ্যে ঢুকে পাহাড়ের গায়ের কাছে পৌঁছে একটা বড় পাথরকে সরাতে একটা নীচু গর্ত দেখা গেল। উপুড় হয়ে শুয়ে বুকে হেঁটে গর্তটার মধ্যে ঢুকে এলেন তিনি। সামনে পাহাড়ের বুকের ভেতর দিয়ে পাথর কেটে তৈরি অসমান সিঁড়ির ধাপ খাড়া ওপরদিকে উঠে গেছে। চার হাত-পায়ে ধাপ আঁকড়ে ধরে দ্রুত ওপরদিকে উঠে যাচ্ছিলেন তিনি। পায়ের নীচে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল বাইরের দুনিয়ার চোখে অদৃশ্য গর্তটার মুখ।
পরদিন গভীর রাত্রে সেই সিঁড়ি দিয়ে মঠ খালি করে একে একে নেমে এল কালো পোশাক পরা সন্ন্যাসীবাহিনী। তাদের দৃষ্টি সহস্রাব্দ-প্রাচীন এক প্রতিজ্ঞায় স্থির। তাদের কাঁধের ঝোলায় উন্মুখ হয়ে থাকে পারদভরা বুলেটে সেজে ওঠা অটোমেটিক পিস্তল। শৌভশামের তদারকিতে নিঃশব্দে নিজেদের ছোট ছোট দলে সাজিয়ে নিচ্ছিল তারা।
'আমার সৈনিকরা তৈরি ঔধীশ শারণিক। আপনি আদেশ দিলে...' অস্তগামী চাঁদের ম্লান আলোয় শারণিকের সামনে এসে মাথা নীচু করে দাঁড়ালেন দ্বিতীয় সাঙ্ঘিক শৌভশাম।
সামনে দাঁড়ানো দলগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন শারণিক। কিছু একটা ভাবছিলেন তিনি। খানিক বাদে নীচু গলায় প্রশ্ন করলেন, 'আরাকিয়েনের সবচেয়ে দূরের আস্তানায় পৌঁছোবার জন্য কত সময় লাগবে?'
জবাবে একটা দলের দিকে ইশারা করে শৌভশাম ডাকলেন, 'লামা হেরসিং?'
দল ছেড়ে একজন পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের তরুণ এগিয়ে এসে দুই সাঙ্ঘিককে অভিবাদন করে একটুকরো কাগজ মেলে ধরলেন সামনে। সেখানে আঁকা ম্যাপের গায়ে একটা লাল বিন্দুতে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, 'দূরতম আস্তানার সন্ধান মিলেছে সুন্দরবন অঞ্চলের মহেশতলা গ্রামে। কাল দুপুরের উড়ানে কলকাতায় গিয়ে ওর কাছের শহর নামখানা অবধি রাতের মধ্যে পৌঁছে যাব আমরা। সেক্ষেত্রে নদীপথে বাকি দূরত্বটা পেরিয়ে গ্রাম খুঁজে নিতে পরশু বিকেল হয়ে যাবে।'
কাগজটা একনজর দেখে হেরসিং-এর হাতে তা ফিরিয়ে দিয়ে শৌভশামের দিকে ঘুরে তাকালেন শারণিক, 'বেশ। প্রতিটি দল তার নিশানার কাছাকাছি পৌঁছে নিজেদের গোপন রেখে অপেক্ষা করবে। শেষ দলটি গন্তব্যে না পৌঁছানো অবধি নিশানার কাছাকাছি কেউ এগোবে না।'
'কিন্তু শারণিক, সবচেয়ে কাছের আস্তানা রেকচিং গ্রাম এখান থেকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার পথ। আট থেকে দশ ঘণ্টার দূরত্বে আরো দশটা আস্তানা রয়েছে। এত দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা না করে...'
'ভুল করছ শৌভশাম। এদের নিজেদের মধ্যে একটা যোগসূত্র রয়েছে। ওই বিজয় গুপ্ত। তুমি নিজেই সে খবর এনেছ। কোথাও আগে আক্রমণ হলে অন্য আস্তানাগুলোয় তার সাবধানবাণী পৌঁছে যাবার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছি না আমি।
আক্রমণ একসঙ্গে হবে। আগামী পরশু শুক্লাচতুর্দশী। আকাশে চাঁদ থাকবে। রাত ঠিক তিনটের সময় একসঙ্গে আঘাত হানবে প্রত্যেকটা দল। তার আগে কোনোভাবেই যেন কেউ আত্মপ্রকাশ না করে। কাজ শেষ হবার পর প্রত্যেক দল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মঠে ফিরে আসবে।'
বলতে বলতে শৌভশামের কাঁধে হাত রাখলেন তিনি, 'তৈরি হও। পূর্ণিমার দিন সকালে রেকচিং গ্রামের দল ফিরে এসে প্রথম সাফল্যের সংবাদ দেবার পর হাইনলিম-এর কেন্দ্রীয় মঠে সে খবর বয়ে নিয়ে যাবে তুমি। এই দুর্লভ সম্মান তোমারই প্রাপ্য।'
নীচু হয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে উঠে দাঁড়ালেন শৌভশাম। পূর্ণিমার দিনটির কথা কানে আসতে হঠাৎ করেই মনের ভেতর একটা হালকা অস্বস্তির ছোঁয়া ছড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর। ঘুমন্ত কোনো স্মৃতি যেন জেগে উঠতে চাইছে বারবার। তাঁদের অভিবাদন করে একে একে রওনা হয়ে যাচ্ছে দলগুলো। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্যমনস্কভাবে অস্তগামী ভাঙা চাঁদটার দিকে তাকিয়েছিলেন তিনি। অস্বস্তিটা বেড়ে উঠছে ক্রমশ।
'শৌভশাম।' শারণিকের হাত কখন এসে তাঁর কাঁধ ছুঁয়েছে, 'তোমায় অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে কেন? কী ভাবছ?' তীক্ষ্ন, শীতল চোখদুটো তাঁর চোখের ওপরে এসে স্থির হয়েছে। হঠাৎ একটু কেঁপে উঠলেন শৌভশাম। শারণিক কাউকে বিশ্বাস করেন না।
কিছুক্ষণ সেইভাবে তাকিয়ে থাকবার পর চোখ সরিয়ে নিয়ে মৃদু হাসলেন শারণিক। এর মনের ভেতর গভীর একটা ভয়ের স্পর্শ পাচ্ছেন তিনি। অস্বাভাবিক তীব্র একটা উত্তেজনাও জেগে উঠেছে সেখানে। অনুভূতিগুলো শৌভশামের চরিত্রবিরোধী। কিন্তু এ অবস্থায় অস্বাভাবিক নয়। উত্তেজিত তিনি নিজেও।
'ফিরে চলো শৌভশাম। এখন অপেক্ষার পালা আমাদের।' বলতে বলতে নীচু হয়ে গুহার ভেতরে এগিয়ে গেলেন শারণিক। নিঃশব্দে তাঁকে অনুসরণ করলেন দ্বিতীয় সাঙ্ঘিক শৌভশাম।
সে রাতে আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল। কোন এক অদৃশ্য ইশারা পেয়ে সুন্দরবন থেকে চুম্বি উপত্যকা, ডিংলার রুদ্রাক্ষবন থেকে কোকরাঝার অরণ্যের আদিবাসী গ্রাম ছেড়ে হঠাৎ উধাও হয়েছিল কিছু মানুষ। বিমানে, ট্রেনে, ভাড়া করা গাড়িতে আর দশজন যাত্রীর সঙ্গে মিশে তারা একে একে এসে পৌঁছে যাচ্ছিল ডুয়ার্সের নিবিড় বনাঞ্চলে।
তারপর অরণ্যের আড়ালে নিজেদের আসল রূপে ফিরে গিয়ে অতিকায় আটপেয়ে জীবগুলো গাছে গাছে আঠালো সুতো ছুঁড়ে অকল্পনীয় গতিতে ছুটে যাচ্ছিল ক্রমশ উঁচু হয়ে ওঠা পাহাড়শ্রেণী পেরিয়ে। তাদের লক্ষ্য ঔধীশদের মঠের উত্তরে ভুটান সীমান্তের রেনচিং গ্রাম। সেখানে বিজয় গুপ্ত তাদের অপেক্ষায় আছেন। বহুকালের বহু অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে আরাকিয়েনরা যুদ্ধে চলেছে আজ।
'মঠের অবস্থান পাওয়া গেছে।' অমূল্যবাবুর হাতে ধরা জিপিএস ট্র্যাকারের পর্দায় ফুটে ওঠা মানচিত্রটার গায়ে একটা বিন্দু স্থির হয়ে জ্বলছিল।
'আপনি নিশ্চিত?' তাঁকে ঘিরে বসে থাকা মানুষের দলটার মধ্যে থেকে বাসুই রিগজিং-এর গলাটা ভেসে উঠল। রেনচিং গ্রামের একটেরেতে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িটা স্থানীয় স্কুলের এই হেডমাস্টারমশাই-এর। শান্ত চেহারার নির্বিরোধী মানুষটা অতিথিদের একত্র হবার পর থেকে নীরবে তাদের দেখভাল করে চলেছেন।
'হ্যাঁ। সেইজন্যই অবস্থানের সবচেয়ে কাছের আস্তানায় ডেকে আনা হয়েছে আপনাদের। জায়গাটা এখান থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় ওখান থেকে সুধীর নড়েনি।'
নীরবে উঠে গিয়ে নিজের বুকশেলফ থেকে একটা হাতে আঁকা ম্যাপ নিয়ে এসে বিজয় গুপ্তের সামনে খুলে রাখলেন রিগজিং। তাঁর শিরা ওঠা আঙুলগুলো ম্যাপটার গায়ে ঘুরছিল, 'এ-অঞ্চলটা আমার হাতের তেলোর মতো চেনা ডঃ গুপ্ত। এখানে ত্রিশ চল্লিশ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো পরিচিত মঠ বা লোকালয় নেই।'
'তাহলে সুধীর ওখানে এতটা সময় ধরে... ওর কিছু হয়নি তো?' ভিড়ের পেছন থেকে সেমন্তীর আতঙ্কিত গলাটা জেগে উঠল একবার।
রিগজিং তাঁর দিকে ফিরে কিছু বলতে গিয়েছিলেন, কিন্তু কথাটা আর বলা হল না তাঁর। বাইরে থেকে জেগে ওঠা একটা পিস্তলের আওয়াজ আর সেইসঙ্গে তীক্ষ্ন একটা ক্র-র-র-র শব্দ রাতের অন্ধকারকে ফালাফালা করে দিচ্ছিল তখন।
ঘরে হাজির প্রতিটি লোকের মতোই নিজেও তাঁর দ্বিতীয় রূপে বদলে যেতে যেতেই রিগজিং ততক্ষণে ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিয়েছেন। নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে ঘরের চারপাশের খোলা জানালাগুলো দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছিল সেই অতিকায় জীবের দল। নিঃশব্দে, অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মিশে যাচ্ছিল তারা চারপাশের গভীর জঙ্গলে।
'এখানকার কাজ শেষ। একটা বুলেটই যথেষ্ট ছিল,' অস্ত্রটা আলখাল্লার আড়ালে গুঁজতে গুঁজতেই মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা অতিকায় মাকড়সাটার গায়ে একটা লাথি ছুঁড়লেন ঔধীশ দলপতি, 'এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মঠে ফিরে গিয়ে...'
হঠাৎ কিছু একটা শুনে কথা থামিয়ে কান খাড়া করলেন সন্ন্যাসী। তাঁদের ঘিরে থাকা জঙ্গল থেকে মৃদু ক্র-র-র শব্দটা ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছিল। বিস্মিত চোখে একে অন্যের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়েই নিঃশব্দে চারদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গেল চারজনের দলটা। তাদের প্রত্যেকের হাতে তখন উঠে এসেছে পারদের গুলিভরা মারণাস্ত্রগুলো।
কিন্তু কোনো কাজে এল না তাদের অস্ত্র। চারপাশের জঙ্গলের অন্ধকার থেকে একসঙ্গে ছুটে আসা আঠালো মাকড়সার রসের স্রোত তখন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে চার সন্ন্যাসীকে। তাদের ঘিরে অন্ধকার জঙ্গল থেকে বের হয়ে আসছিল অতিকায় রোমশ আরাকিয়েনের গোটা দলটা।
দুপুরের রোদ ভেজা উত্তাপ ছড়াচ্ছিল অরণ্য জুড়ে। নির্জন বাড়িটার উঠোনে, তীব্র বিষের আঘাতে অচেতন ঘাতক সন্ন্যাসীদের শরীরগুলো পাশাপাশি শুয়ে ছিল। তাদের মাথায় হাত ছুঁইয়ে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়ানো জীব চারজন তখন অবিকল তাদের রূপ নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। অচেতন দেহগুলোকে বয়ে নিয়ে বনের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল অপেক্ষায় থাকা অন্য আরাকিয়েনের দল।
কয়েকমুহূর্ত বাদে উঠে দাঁড়িয়ে পায়ের কাছে পড়ে থাকা মৃত আরাকিয়েনের দেহটাকে একবার দেখলেন ঔধীশ দলপতি। সামনে নির্জন ঘরটাকে বিকেলের মায়াবি আলোয় ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। একমুহূর্তের জন্য সেদিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলেন তিনি। কিছুক্ষণ আগে, শেষরাত্রের অন্ধকারে ওই রাক্ষসকে শেষ করেছেন তাঁরা। তারপর এতখানি সময় কেটে গেল কীভাবে?
তবে সে নিয়ে মাথা ঘামানোর অবসর তখন তাঁর ছিল না। শারণিক অপেক্ষায় আছেন। যেতে হবে তাঁদের।
পড়ন্ত সূর্যের আলোয় জঙ্গল পেরিয়ে মঠের দিকে দ্রুত ছুটছিলেন সন্ন্যাসীরা। তাঁদের নাগালের বাইরে থেকে অরণ্যের আড়ালে তখন তাঁদের অনুসরণ করে ছুটে চলেছে অতিকায় মাকড়সাদের দলটা।
'ওরা ফিরে আসছে। শৌভশাম তৈরি হও। তোমাকে রওনা হতে হবে!'
যেন বহুদূর থেকে শারণিকের গলাটা ভেসে আসছিল শৌভশামের কানে। সারাটা দিন রেকচিং-এর দলটার অপেক্ষায় কেটেছে তাঁদের দুজনের। সেই নিয়েই গভীর দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি এতক্ষণ। কিন্তু, সে-দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে কখন যে একটা অচেনা ছটফটানি পেয়ে বসছিল শৌভশামকে তা তিনি নিজেও টের পাননি। কিছু একটা ঘটবে যেন! পুব আকাশে পাহাড়ের আড়াল থেকে উঠে আসতে থাকা অদৃশ্য পূর্ণিমার চাঁদটা যেন সেই ইঙ্গিতকেই বয়ে আনছিল তাঁর কাছে।
মাঠের মাঝখানে সুড়ঙ্গের সিঁড়িতে আওয়াজ উঠছিল। কয়েক জোড়া পা দ্রুত উঠে আসছে সেখান দিয়ে। অদ্ভুত একটা আলস্য জড়িয়ে ধরছিল শৌভশামকে। চাঁদের আলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। মাথার মধ্যে অদ্ভুত একটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল তাঁর। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে...
সেই ঝাপসা দৃষ্টিতে ধরা পড়ছিল, মাঠের মাঝখানে সুড়ঙ্গের মুখ বেয়ে একে একে উঠে আসছে রেকচিঙের দলটা। শারণিকের পায়ের কাছে বসে প্রণাম করছে তারা...
আর ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের মাথায় মুখ বাড়াল পূর্ণিমার চাঁদ। তার লালচে আলো এসে ধুইয়ে দিয়ে গেল তাদের শরীরকে।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল শৌভশামের দ্রুত বদলে যেতে থাকা শরীরটা। এইবার সব মনে পড়ে গেছে তার। এইবার...
তার সামনে তখন সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ছেড়ে নিজেদের স্বরূপে ফিরে গিয়েছে অন্য চার আরাকিয়েন। দুহাতে ধরে থাকা দুটো বন্দুকের নল তাদের দিকে নিশানা করে পিছিয়ে আসতে আসতেই চাপা গলায় শারণিক বলে উঠলেন, 'অস্ত্র নাও শৌভশাম। মায়াবি আরাকিয়েনের দল...'
কথাটা শেষ হল না তাঁর। চারটে অতিকায় রোমশ বাহু তখন পেছন থেকে তাঁকে বজ্র আলিঙ্গনে ধরে তুলে নিয়েছে মাথার ওপর। তীব্র চাপে জ্ঞান হারিয়ে যেতে যেতেই শারণিকের চোখে পড়ছিল, সুড়ঙ্গের মুখ বেয়ে উঠে আসছে একের পর এক অতিকায় আরাকিয়েনের দল।
একটা তীক্ষ্ন আর্তনাদের শব্দ উঠেছিল সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে চিরে। তারপর শব্দটা মিলিয়ে গেল পাহাড়চূড়াকে ঘিরে রাখা মেঘের স্তর ছাড়িয়ে বহু নীচে ছড়িয়ে থাকা পাথুরে জমির দিকে।
আকাশের পূর্ণ চাঁদের আলোয় তখন গোটা মঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল অতিকায় আরাকিয়েনের দলটা। খানিক বাদে তাদের মধ্যে থেকে দুজন এসে সুধীরের পাশে দাঁড়ালেন।
'মানুষের চেহারায় ফিরে আয় সুধীর। আমার সঙ্গে চল। সামনে অনেক কাজ। ঔধীশদের কেন্দ্রীয় শক্তির ঠিকানা এখনো আমাদের জানা নেই। এদের পুঁথিঘরে সে খবর মিলতে পারে।'
সুধীর মাথা নাড়ল, 'হ্যাঁ। এখনো অনেক পথ পেরোতে হবে আমাদের।'
তার পাশে দাঁড়ানো বিজয়বাবু ও সেমন্তী হাসছিলেন, 'তুই ঠিক পারবি, দেখে নিস! আমরা সবাই রইলাম তো তোর সঙ্গে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন