প্রথম পাঠ: সুধীর গুপ্ত

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

মাকড়সা আমার সবচেয়ে প্রিয় জীব। ছোটবেলা থেকেই ওদের ওপরে একটা আলাদা টান আছে আমার। জুতোর বাক্সে করে একসময় তাদের পুষেছিও অনেক। আমাদের অনাথ-আশ্রমের সুপার কৃষ্ণবাবুর মাকড়সায় ফোবিয়া ছিল। অতএব সেগুলো কাছে রাখা যেত না বেশিদিন। খুঁজে পেতে বের করে ফেলে দিয়ে আসতেন। মারও খেয়েছি ও নিয়ে অনেকবার।

তবু মাকড়সাপ্রীতি আমার যায়নি। দেওয়ালের গায়ে তাদের স্বচ্ছন্দ চলাফেরা, শিল্পীর দক্ষতায় জালের মরণফাঁদ বুনে তোলা, বিদ্যুতগতিতে শিকারের ঘাড়ে লাফ দেওয়া, এই সবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। মনে হতো চেষ্টা করলে আমিও হয়তো পারব। একেবারে ছোটবেলায় সেই করতে গিয়ে আছাড়ও খেয়েছি অনেকবার।

বড় হয়ে আদকবাবুর কাছে ম্যাজিকের খেলা শিখে সেই প্রফেশনে কেমন করে এলাম সে অনেক গল্প। কিন্তু মাকড়সার ভূত আমার মাথা থেকে কোনদিন নামল না। তিনকুলে কেউ নেই। একা থাকি। ম্যাজিক শো করে হাতে কিছু পয়সা আসা শুরু করতে মাকড়সা পোষার শখটা চাগিয়ে উঠল। খুদে হান্টিং স্পাইডার থেকে শুরু করে উলফ স্পাইডার বা বড়সড় ট্যারান্টুলা সবই আছে। ওদের আমি আটকে রাখি না। বাড়ির চারপাশের ঝোপজঙ্গলে ঘুরেফিরে বেড়ায়, পোকামাকড় ধরে খায়। কিন্তু আমায় ছেড়ে যায় না। রাত্রে বিছানায় শুলে সব ভিড় করে আসবে চারদিকে। হাতে গায়ে বাইবে। ওরা বোধহয় ভালোবাসা বোঝে। নইলে এমনটা করবে কেন?

কখনো কখনো মুখোমুখি বসে তাদের খুদে খুদে ঝিলমিলে চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি একা একাই। তখন উলফ স্পাইডারগুলো ক্র-র-র করে মৃদু অথচ তীক্ষ্ন শব্দ করে, ট্যারান্টুলারা তাদের হিসহিসে ভাষায় কিছু বলতে বলতে দেয়াল থেকে লাফিয়ে আসে সামনে, আবার কেউ কেউ চুপচাপ বসে সামনের দাঁড়াদুটো এমনভাবে নাড়ায়, যেন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলতে চাইছে আমার সঙ্গে।

ওদের দেখে দেখেই আমার মাকড়সাবিদ্যের খেলার জন্ম। শক্ত স্টিলের তার, হাতেপায়ে সাকার আর কিছু মেক-আপ, এই সম্বল করে মাকড়সা সেজে স্টেজে শো করি। খেলাটা বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছে আজকাল। কাগজ-টাগজে রিভিউ বেরোয় মাঝেমাঝে।

মধ্যে এক নাছোড় জার্নালিস্টের পাল্লায় পড়েছিলাম। ইন্টারভিউ করতে সে বাড়িতে আসবেই। বারণ করলে শোনে না। শেষে একদিন বিনা নিমন্ত্রণেই সন্ধেবেলা এসে হাজির। তবে দু'মিনিটের বেশি থাকতে পারেনি। ঘরের দরজা খুলতেই আমার ঘাড়ে, মাথায় গুটিদশেক ছোটবড় পুষ্যিকে হেঁটেচলে বেড়াতে দেখে সটান বিদেয় হয়েছিল।

মালবাজারে আমার ম্যাজিক শো চলছিল। এখানে মাকড়সাবিদ্যের খেলাটা অকল্পনীয় সাড়া ফেলেছে। বুকিং কাউন্টার উপচে পড়বার দশা। জনতার দাবিতে তাই সাতদিনের প্রোগ্রাম গিয়ে দাঁড়িয়েছে পনেরোদিনে।

সেই নিয়ে একদিন, শোয়ের পরে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় বিনয় বলল, 'অনেকেই দু'-তিনবার করে দেখছে বটে, কিন্তু একটা লোক আছে স্যার, তার মতো ফ্যান আমি দেখিনি। সেকেন্ড দিনের ফার্স্ট শো থেকে শুরু করে রোজই আসছে। সবচেয়ে দামি টিকিট নিয়ে ফ্রন্ট রোয়ে বসে, আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেলাটা দেখে। একেকদিন তো দুটো শোয়েরও টিকিট নেয়। রোজ প্রোগ্রামের শেষে আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্য ঘ্যানঘ্যান করে এসে। আমি ঢুকতে দিই না।'

বললাম, 'তা ভালোই তো। পয়সা দিয়ে টিকিট যখন কাটছে—'

'তা কাটছে, কিন্তু আরেকটা ব্যাপারও আছে যে! সেইজন্যই কথাটা তুললাম। লোকটা আপনার খেলাটার ভিডিও করে। একেকদিন স্টেজের একেক দিক থেকে।'

'ধুস,' আমি হেসে ফেললাম, 'একটা লোক রোজ ক্যামেরা নিয়ে আমার খেলার ভিডিও করবে আর আমি দেখতে পাব না?'

'না স্যার। বড় ক্যামেরা-ট্যামেরা না, একটা মোবাইল হাতে থাকে। তাইতে তুলে নেয়।'

এইবার একটু কৌতূহল হল। বললাম, 'কাল শোয়ের পরে লোকটাকে একবার ডাকিস তো!'

পরদিন শো শেষ হলে গ্রিনরুমে বসে আছি তখন লোকটাকে নিয়ে বিনয় এল। বিরাট চেহারা। ঝিলমিলে চোখ। এসে নিঃশব্দে আমার সাথে হাত মিলিয়ে একটা চেয়ার টেনে সামনে বসে কোনো ভনিতা না করে বললেন, 'একটা কথা বলবার ছিল। তবে প্রাইভেট।'

বিনয় ইশারাটা বুঝে নিল। বললেন, 'আমি বরং গাড়িটা নিয়ে গ্যারেজে ঘুরে আসি। পেছনের টায়ারটা ঝামেলা করছে। আধঘণ্টার মধ্যে ফিরব।'

বললাম, 'দেরি করিস না। হোটেলে ফিরতে হবে।'

বাইরে গোটা হল শুনশান হয়ে গেছে ততক্ষণে। শো শেষ হতে দলের লোকজন যে যার মতো বেরিয়ে গেছে। বিনয় আমার স্টেজ অ্যাসিস্ট্যান্ট, আবার আমার গাড়িটাও চালায়। ফিরে এলে যাওয়া যাবে।

তাকে বিদায় করে লোকটার দিকে ঘুরে বসে একটু অবাক হতে হল। হাতের আঙুলগুলো মুখের সামনে ধরে মাকড়সার দাঁড়ার মতন করে নাড়িয়ে যাচ্ছে লোকটা। পুঁতির মতো ঝিলমিলে চোখদুটো আমার দিকে ঠায় তাকিয়ে।

একটা আশ্চর্য ঠান্ডা হিংস্রতা ছিল তাতে। দৃষ্টি টেনে রাখে। চোখ ফেরাতে পারছিলাম না আমি। সেইভাবে থাকতে থাকতেই হঠাৎ কেমন মনে হল আঙুলের নড়াচড়াগুলোর মানে বুঝতে পারছি একটু একটু। কতগুলো এলোমেলো শব্দ যেন, জটপাকানো, মাথার মধ্যে এসে ধাক্কা দিচ্ছিল জুড়ে-মিশে কিছু একটা অর্থ তৈরি করবার চেষ্টা করছিল— কিছু প্রশ্ন, কিছু কৌতূহল, পরিচিত মানুষের প্রিয় সম্ভাষণ!

নিজের অজ্ঞাতেই আমার হাতের আঙুলগুলোও কখন যেন উঠে এসেছিল আমার মুখের সামনে। দুর্বোধ্য ভঙ্গিতে এমনভাবে নড়াচড়া করে চলেছিল, যেন মানুষটার আঙুলের ভাষার জবাবেই ওদের সঞ্চালন।

হঠাৎ চটকাটা ভেঙে গেল আমার। মুখের সামনে থেকে হাতদুটো সরিয়ে নিয়েছে লোকটা। চোখদুটোও একেবারে স্বাভাবিক। ভালো করে চেয়ে দেখলাম তার মুখের দিকে। ভবঘুরের জীবনে কম মানুষ দেখিনি আমি। লোকটার বোধ হয় কোনো মানসিক অসুস্থতা আছে। চেহারায় ওর পাশে আমি পিগমি। একটু ভয়ে ভয়েই বললাম, 'আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন?'

'হ্যাঁ। কিছু কৌতূহল ছিল। আপনার হাতটা একবার দেখাবেন?'

বলেই সে আমার একটা হাত তুলে নিয়ে তেলোটার ওপর আঙুল বোলাতে শুরু করে দিয়েছে। এটা অবশ্য আমার কাছে নতুন নয়। অভ্যেস আছে। মেদিনীপুরে শো করতে গিয়ে মাকড়সার খেলা দেখাবার পর এক সরকারি অফিসার ভদ্রলোক এই কম্ম করেছিলেন এসে। বলেন, 'আপনার হাতটা নর্মাল মানুষের মতো কিনা তাই দেখছি।'

এ লোকটার আঙুলের ছোঁয়া একটু কর্কশ। ঠিক কর্কশও নয়। কেমন একটা হালকা রোমশ ছোঁয়া। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, 'যা ভাবছেন তা নয়। আমার হাতের তেলো আর পাঁচটা মানুষের মতোই। স্টেজে যা দেখেছেন সে-সব হাতপায়ের তেলোয় লাগানো সাকারের কাজ।'

'আমার কিন্তু তা মনে হয় না। সেইজন্যেই ক'দিন ধরে খেলাটার সময় আপনার মুভমেন্টগুলোর ছবি তুলছি। সেগুলো বাড়ি গিয়ে দেখছি আর অবাক হচ্ছি। সম্ভবত নিজের বিষয়ে আপনি সব কথা জানেন না। আপনার জন্ম কোথায়?'

এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, এটা আমার একটা দুর্বল জায়গাও বটে। অনাথ আশ্রমের দরজায় কে যে আমাকে এনে রেখে গিয়েছিল তার খবর ওঁদের রেকর্ডে ছিল না। কে আমার বাবা-মা, কোথা থেকে এলাম, তার কিছুই আমি জানি না।

আমার মুখ দেখে বিরক্তিটা আন্দাজ করতে পারল বোধ হয় লোকটা। চোখদুটো কোমল হয়ে এল তার। হাতটা ছেড়ে দিয়ে পুঁতির মতন ঝিলমিলে চোখদুটো দিয়ে আমাকে দেখতে দেখতেই বললেন, 'আমার অনুমান ঠিক হলে প্রশ্নটার উত্তর আপনার জানবার কথা নয়।'

একটু চমকে উঠলাম আমি। এ লোকটা আমার বিষয়ে কিছু একটা জানে! কী সেটা?'

উত্তেজনাটা বোধ হয় আমার মুখচোখে ফুটে উঠেছিল। মানুষটার নজর এড়াল না সেটা। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, 'কাল শোয়ের পরে আমার বাড়িতে আসুন। আপনার খেলাটার ভিডিওগুলো দেখাব। একা আসবেন। ড্রাইভার আনবেন না। আপনার নিজের বিষয়েও কিছু প্রশ্নের জবাব পাবেন হয়তো।'

ঠিকানাটা মালবাজার শহরের নয়। তিনিঝোরা নামে একটা গ্রামের। কার্ডটা লোকাল ম্যানেজারকে পরদিন দেখাতে তিনি বললেন, 'জায়গাটা লাটাগুরি রোড ধরে কয়েক কিলোমিটার দূরে। যাবেন নাকি?'

'অটো বা টোটো পাওয়া যাবে?'

'কেন যাবে না? কখন লাগবে বলুন, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'

'আজ শোয়ের পর।'

'রাতে? না মশাই। ও কর্মটি করবেন না। জায়গাটা ভালো নয়। চোর-ডাকাতের উপদ্রব আছে। রাতের দিকে খুনজখম লেগেই থাকে হামেশা। তাছাড়া—'

'তাছাড়া কী?'

'না মানে, লোকে নানা কথা বলে।'

'ভূত-পেত্নী?' আমি হেসে ফেললাম।

ভদ্রলোক দেখি ভুরুটা কুঁচকেই আছেন। খানিক বাদে বললেন, 'না সে-সব কিছু নয়। জঙ্গলের একেবারে ধারেই তো! লোকজন নানা বাজে কথা বলে। জায়গাটায় নাকি মাকড়সার উপদ্রব আছে।'

এমনিতেই সে-রাতটা আমার ভদ্রলোকের ওখানে না গিয়ে উপায় ছিল না। অদ্ভুত একটা ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন উনি। আমার ব্যাপারে কিছু একটা খবর আছে ওঁর কাছে। মুখে কখনো বলি না, কিন্তু নিজের বিষয়ে যে-কোনো খবর পাবার জন্য আমি প্রাণ বাজি রাখতেও রাজি। এবারে তার সঙ্গে আবার এই মাকড়সা-রহস্যের কথা জুড়ে যেতে যাবার ইচ্ছেটা আরো বেড়ে উঠল। বললাম, 'কী জাতের মাকড়সা? বিষাক্ত কিছু?'

'জানি না মশাই। গেঁয়ো লোকের কথাবার্তা। সে নাকি রাক্ষুসে চেহারা। কোত্থেকে আসে, কোথায় যায় সে-সব কেউ দেখেনি। মাঝেমধ্যে ছাগলমুরগি টেনে নিয়ে চলে যায়। অমূল্যবাবু, মানে এটা যাঁর কার্ড, উনি অবশ্য বলেন ওসব বাজে কথা। নিজে পোকামাকড় নিয়ে গবেষেণা করেন। বলেন অমন জীব প্রকৃতিতে হতে পারে না। লোকে ভুল দেখেছে। তবে পাবলিকের মন তো! ওইজন্যেই তো মশাই আপনার মাকড়সার খেল এখানে এত পপুলার হয়েছে।'

'ইনটারেস্টিং রহস্য মশাই,' আমি মুচকি হাসলাম, 'আমার নিজের মাকড়সা পোষার বহুদিনের নেশা। যেতেই হচ্ছে দেখছি তাহলে একবার।'

শো সেদিন একটু তাড়াতাড়িই শেষ করে দিয়েছিলাম। সাড়ে আটটা নাগাদ বেরিয়ে হনুমান মন্দির অটোস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি ম্যানেজার ভদ্রলোকের কথাটা মিথ্যে নয়। রাত্রিবেলা ও-গ্রামের দিকে যেতে কেউই রাজি নয়। বহু কষ্টে একজনকে দুনো ভাড়ায় রাজি করিয়ে শেষমেষ গাড়িতে চেপে বসলাম যখন, তখন ঘড়িতে ন'টা বাজছে। অটোওয়ালা কড়ার করিয়ে নিয়েছিল, আমাকে নামিয়ে দিয়েই সে ফিরে আসবে। দাঁড়াবে না। আমি তখন তাতেই রাজি। দরকার হলে ভদ্রলোকের বাড়িতে থেকে যাব একটা রাত। কথাবার্তায় যা বুঝেছি, জায়গাটা বাসরাস্তা থেকে কিলোমিটার দুয়েক ভেতরে। তেমন হলে ওই পথটুকু হেঁটে বড়রাস্তায় উঠে এলে কিছু না কিছু বন্দোবস্ত হয়ে যাবে একটা।

তিনিঝোরায় নেমে ঠিকানা খুঁজতে অসুবিধে হল না। কার্ডে লেখা ছিল 'রাজবাড়ি।' জায়গাটা গরুমারার জঙ্গলের একেবারে বাফার জোনের পাশে। এলোমেলো গাছপালা, ঝোপজঙ্গল দক্ষিণদিকে ক্রমশ ঘন হয়ে মূল জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে। ওরই ভেতর এদিক-ওদিক কুঁড়েঘরগুলোর মাঝখানে বিরাট একতাল অন্ধকারের মতো পুরনো আমলের বাড়িটা সহজেই নজর কাড়ে। গ্রামযোজনার ইটবাঁধানো সরু রাস্তা থেকে বেরিয়ে একটা ঝোপঝাড় ঢাকা পায়ে-চলা পথ এগিয়ে গেছে তার দিকে।

বাড়িটা বিরাট। চারপাশে দেওয়ালঘেরা কম্পাউন্ড। ঢোকার জায়গাটায় দেওয়াল বেশ খানিক ভাঙা। কোনোকালে সেখানে দরজা ছিল হয়তো। এখন আর নেই। রাস্তাটা সেখান দিয়ে ঢুকে এঁকেবেঁকে গিয়ে শেষ হয়েছে মূল বাড়ির সামনে। দু'পাশে ঝোপঝাড়ে ঢাকা অযত্নের বাগান।

দরজায় পৌঁছে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বইকি। বাড়িটা একেবারে নিঃঝুম। এদিক ওদিক খানিক দেখে ফিরে যাব কিনা ভাবছি তখন হঠাৎ খেয়াল হল দোতলার একটা ঘরের জানালা দিয়ে আলোর আবছা আভাস আসছে। যাক। অন্তত কেউ থাকে এখানে। গলা চড়িয়ে ডাকলাম, 'অমূল্যবাবু? আমি সুধীর। আপনি আছেন কি?'

কোনো জবাব এল না। ফের একবার ডাক দিতে যাব এমন সময় একটা খড়মড় শব্দ উঠল বাড়িটার ভেতর থেকে। দোতলার আলোজ্বলা এলাকাটা থেকে এদিকে দ্রুত এগিয়ে আসছিল তা। কয়েক সেকেন্ড বাদে থুপ করে একটা শব্দ হল অন্ধকার দরজাটার ভেতরদিকে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা টর্চ জ্বলে উঠল। আলোটার পেছনে অমূল্যবাবুর বিশাল শরীরের সিল্যুয়েট দেখা যাচ্ছিল।

'আসুন আসুন, সুস্বাগতম।'

গলার শব্দটা পেয়ে বুকের থেকে একটা পাষাণভার নেমে গেল। তার পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বললাম, 'একলাই থাকেন নাকি?'

বলতে বলতেই অন্ধকারে আঠালো কিছু একটার ছোঁয়া লাগল আমার হাতেমুখে। গলা থেকে একটা বিরক্তির আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল। শুনতে পেয়ে লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফেলল আমার দিকে। জোরালো আলোর রশ্মি লেগে আমার চারপাশে চিকচিক করে উঠল জ্যামিতিক নকশায় ছড়িয়ে থাকা জালের মোটা সুতোগুলো। কাছে এসে সেগুলো আমার হাতমুখ থেকে সাবধানে সরিয়ে দিতে দিতে তিনি একটু বিরক্ত গলায় বললেন, 'সাবধানে আসবেন। জালগুলোর কোনো ক্ষতি না হলেই ভালো।'

দোতলায় একটা ঘরেই আলো জ্বলছে। একপাশে একটা পড়ার টেবিলে স্তূপাকৃতি দেশি-বিদেশি বই, লেখার সরঞ্জাম, একটা ল্যাপটপ। অন্যপাশে একটা চৌকি পাতা। ছোট একটা টেবিলে ক'টা রুটি আর একটা সবজি ঢাকা দেয়া ছিল। সেদিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, 'খিদে পেয়েছে নিশ্চয়। আগে খেয়ে নিন একটু।'

জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি?'

মৃদু হাসল লোকটা, 'আমি ওসব খাই না। তাছাড়া আমার খাওয়া হয়ে গেছে আগেই। আপনি তাড়াতাড়ি করুন, তারপর যে জন্য ডেকে এনেছি সেটা দেখাই।

'ভালো করে নজর করুন! যখন খেলাটা দেখান তখন যেটা একেবারে রিফ্লেক্স অ্যাকশানে করে ফেলেন তার দিকে খেয়াল না থাকবারই কথা। কিন্তু ক্যামেরার চোখ ভুল করে না।'

কমপিউটারের পর্দার ভূতুড়ে নীলচে আলো এসে পড়ছে মানুষটার মুখে। পুঁতির মতো চোখদুটো জ্বলছে যেন সে আলোয়। আমার সামনে পর্দায় তখন আমারই মাকড়সার খেলার একটা মন্তাজ স্লো মোশানে হয়ে চলেছে।

'ডানদিকের দেওয়াল থেকে এপাশের জালে লাফাবার মুহূর্তে দেওয়ালের গায়ে হাত আর পায়ের চাপ দিয়ে লাফের শক্তি নিচ্ছিলেন আপনি। কোমরে আটকানো দড়িটার দিকে খেয়াল করুন। ঢিলে হয়ে ঝুলছে! সেকেন্ড দুয়েকের ব্যাপার। তবু সেই সময়টা মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম না মেনে দেওয়ালের গায়েই আটকে থেকেছেন আপনি। শুধু হাতের চেটো দিয়ে গোটা শরীরটাকে দেওয়ালে ধরে রাখবার মতো শক্তি আপনার সাকার-এর নেই সুধীরবাবু।'

বলতে বলতেই দেওয়ালের গায়ে ঠেকে যাওয়া আমার দুটো বাহুর ছবি বড় হয়ে উঠে গোটা পর্দা ছেয়ে ফেলেছে।

'সাকার নয়। এক সেকেন্ডের জন্য আপনার অজান্তেই আপনার রিফ্লেক্স অ্যাকশান অন্য ব্যবস্থা নিয়েছিল। যে ব্যবস্থা নেওয়া কোনো সাধারণ মানবশরীরের পক্ষে সম্ভব নয়—দেখুন।'

আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। পর্দা জুড়ে বড় হয়ে ওঠা আমার হাত আর পা দুটোর গা থেকে অজস্র সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম লোমের মতো কিছু বের হয়ে এসে আঁকড়ে ধরেছে দেওয়ালটাকে! পরক্ষণেই ছবি স্লো মোশান ছেড়ে স্বাভাবিক গতিতে ফিরে এল। প্রচণ্ড শক্তির একটা লাফে দেওয়াল ছেড়ে ছিটকে যাচ্ছি আমি দূরে ঝুলতে থাকা রেশমের অর্ধস্বচ্ছ জালটার দিকে। চারটে আসল আর চারটে নকল পা লাগানো মাকড়সা-জাদুকর তার জালে ফিরে চলেছে দেওয়ালের গা ছেড়ে।

হঠাৎ কমপিউটারের পর্দা ছেড়ে মানুষটার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। 'কী বলতে চাইছেন আপনি অমূল্যবাবু? এ ভিডিওটায় কিছু কারিকুরি আছে। এ দিয়ে কী প্রমাণ করতে চাইছেন? কী চান আপনি আমার কাছে?'

জবাবে চোখের পলকে অমূল্যবাবুর একটা হাত আমার হাতে এসে পেঁচিয়ে বসল। অজস্র সূক্ষ্ম কাঁটাওয়ালা একটা শিরীষ কাগজ যেন চেপে বসেছে আমার বাহুতে। অসম্ভব জোরালো সে হাতের বাঁধন আমাকে অকেজো করে দিয়েছিল সেই মুহূর্তে। হাতটা ধরে রেখেই আমার মুখের একেবারে কাছে জ্বলজ্বলে চোখদুটো ধরে রেখে তিনি বললেন, 'এখনো বুঝতে পারছ না? তোমার বাবা মায়ের খোঁজ কেন কখনো পাওনি তুমি? আরো একটা কথা। তোমার সঙ্গে তো একদিন মাত্র দেখা হয়েছে আমার। নামটা ছাড়া কিছুই জানি না। তাহলেও নির্দ্ধিধায় বলে দিতে পারি তুমি ছোটবেলা থেকে মাকড়সা ভালোবাস। তারাও তোমাকে পছন্দ করে। তাই না? নিজেকে জাগাও সুধীর। তোমার আসল পরিচয়কে মনে করবার চেষ্টা করো।'

একটা আশ্চর্য শীতল উত্তাপে লোকটার চোখদুটো জ্বলছিল। যেন কোনো উন্মাদের দৃষ্টি। কী ইঙ্গিত দিতে চাইছে ও? কোন অবিশ্বাস্য পথে বইয়ে দিতে চাইছে আমার ভাবনাকে? মনের ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছিল আমার সেই মুহূর্তে। আমার অনুভূতি কোনো একটা অজানা সত্যিকে নির্দ্ধিধায় মেনে নিতে চাইছে, আর আমার সমস্ত শিক্ষা, দীক্ষা, বিশ্বাস তার বিরোধিতা করছে একসঙ্গে। এ হয় না। হতে পারে না। বুকের মধ্যে কেউ বসে যেন বারবার চিৎকার করে উঠছিল, 'পালাও। এই মুহুর্তে বেরিয়ে যাও এ বাড়ির চৌহদ্দি থেকে। নইলে দেরি হয়ে যাবে।'

শেষপর্যন্ত সেই গলাটারই জয় হল। একটা প্রচণ্ড ইচ্ছের জোরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বিরাট শরীরটাকে তুলে ধরে ছুঁড়ে ফেললাম আমি ঘরের একটা কোণায়।

কিন্তু লাভ হল না। অমানুষিক ক্ষিপ্রতায় নিজেকে সামলে নিয়ে একটা ছিলেছোঁড়া তিরের মতোই আমার দিকে ছিটকে এল সে। তাকে এড়িয়ে খোলা দরজার দিকে ঝাঁপ দিলাম আমি।

বড় বড় লাফে দোতলার করিডোর বেয়ে যখন নীচের দিকে ছুটছি তখন পেছনে হঠাৎ একটা খড়মড় শব্দ উঠল। এক মুহূর্তের ব্যাপার। তারপরেই রেলিং বেয়ে নীচের ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা ভারী, নরম শরীর থুপ করে লাফিয়ে পড়ে ঝোপঝাড় বেয়ে ছুটে গেল বাড়ির সীমানার দিকে।

আমি তখন সেদিকে ঘুরে দেখবার অবস্থায় নেই। বাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ইটবাঁধানো শুঁড়িপথটাতে পৌঁছে ছুটে চলেছি দু'কিলোমিটার দূরের বড়রাস্তার দিকে। আধুনিক মানুষের তৈরি সভ্যতার প্রতীক ওই রাস্তা। সেখানে বিদ্যুতের আলো আছে। যুক্তি আছে। বিজ্ঞান আছে।

কিলোমিটারখানেক পথ পেরিয়ে অপ্রত্যাশিত বাধা এল একটা। হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে একটা লোক বেরিয়ে এল আমার সামনে। মাথার ওপর হাত তুলে চোখের পলকে কিছু একটা ছুঁড়ে মারল সে আমার পা লক্ষ্য করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডান হাঁটুতে একটা শক্তিশালী ধাক্কা আমাকে মুখ থুবড়ে ফেলল রাস্তার ওপর।

তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিল হাঁটুটায় আমার। অসহায়ভাবে মাটিতে পড়ে দেখছিলাম, কালো কালো ছায়ার মতো কতগুলো মানুষ এসে ঘিরে দাঁড়িয়েছে আমাকে। অন্ধকারের মধ্যে থেকে চাপা গলায় কেউ বলে উঠল, 'পকেটগুলো ভালো করে দেখিস। ঘড়ি, ফোন—'

আমার সারা শরীরজুড়ে কতগুলো হাত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমার গায়েপিঠে ঝরে পড়ছিল অজস্র আঘাত। আমার ঠোঁটে নিজের রক্তের নোনতা স্বাদ।

লোকগুলো আমাকে ছেড়ে এইবারে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারের ভেতর তাদের মৃদু গলায় কথাবার্তা, হাসিঠাট্টার শব্দ আসছিল।

তীব্র ভয়ের পাশাপাশি একটা গভীর রাগ তখন ফনা তুলছিল আমার চেতনায়। কতকাল ঘুমিয়ে ছিলাম আমি? দুর্বল প্রাণীগুলো, চিরকাল মাথা নীচু করে যারা আমাদের পুজো দিয়ে গেছে, সেই তারা আজকে...

মৃত্যুর ভয়, আর গভীর রাগের অনুভূতি মিলে আমার মস্তিষ্কে একটা অচেনা আলোড়ন জাগিয়ে তুলছিল। আমার প্রতিটি কোষে তার প্রতিধ্বনি জাগছে! ঝড়ের বেগে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল আমার চেতনায়, আমার সমস্ত শরীরে...

হঠাৎ একটা মৃদু অথচ তীক্ষ্ন ক্র-র-র-র শব্দ বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে। ঘন অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিল না কিছু, কিন্তু শব্দটা শুনেই মানুষগুলো লাফ দিয়ে দূরে সরে গেল হঠাৎ। তাদের হাতের শক্তিশালী টর্চের আলো এসে আমার আটটা চোখকে ঝলসে দিচ্ছিল। কিন্তু, চোখের দৃষ্টির কোন প্রয়োজন ছিল না আমার। মাটির ওপর ওই ছায়ামূতি গুলোর মৃদু কাঁপন দেখে আমি পরিষ্কার পড়ে নিতে পাচ্ছিলাম তাদের প্রতিটি নড়াচড়াকে। শক্তিশালী পা গুলোকে গুটিয়ে নিয়ে আমি লাফ দেবার জন্য তৈরি হলাম...

আলোগুলো সরে গেছে আমার ওপর থেকে। দুলতে দুলতে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছিল তারা। পালাচ্ছে! ভিতু, দুর্বল জীবের দল! এর শাস্তি ওরা পাবে। এই গ্রহের প্রভু-জীবের ওপর আক্রমণ চালাবার জন্য চরমতম শাস্তি! আমি...

'কী ভাবছ?'

পেছন থেকে হিসহিস করে ভেসে আসা শব্দগুলোর অর্থ বুঝে নিতে কোনো অসুবিধে হল না আমার। মাথা না ঘুরিয়েই বললাম, 'এদের শাস্তি পেতে হবে। পালিয়ে কতদূর যাবে এরা?' শক্তপোক্ত পেছনের চারটে পায়ে ভর দিয়ে দৌড়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছি তখন আমি। পেটের পেছনে শক্তিশালী হুলের মাথায় ঝিকিয়ে উঠেছে সুতীব্র মারণ বিষ।

'ভুল করছ সুধীর। এরা পালাবে না।'

অতিকায় রোমশ জীবটা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আটপায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে ছুটন্ত আলোগুলোর দিকে দেখতে দেখতেই সে বলে যাচ্ছিল, 'আমাদেরই সৃষ্টি ওরা। বহুকাল আগে, যখন আরাকিয়েন সভ্যতা এই গ্রহে উন্নতির শীর্ষে, সেইসময় নিজেদের বৈশিষ্ট্য দিয়ে আমরাই গড়েছিলাম এদের। কাজেই আরাকিয়েনের সাহস আর হিংস্রতা ওদের মধ্যেও আছে। ওরা ফিরে আসবে এখানে। অনেক বেশি সংখ্যায়। আমরা মাত্র দুজন সুধীর—'

বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল আমার। বললাম, 'বাড়িতে ফিরে গিয়ে...'

'লাভ হবে না। এখানে আমাদের না পেলে ওরা গোটা এলাকাটা তন্ন- তন্ন করে খুঁজবে। সেক্ষেত্রে আমার বাড়িটাও বাদ যাবে না। অনেক ঝোপঝাড় সেখানে। তাতে আমার ছড়ানো জালগুলো দেখলে...না সুধীর। আমাদের ওপরে ওদের কোনো সন্দেহ হতে দেওয়া চলবে না। অন্য পথ ভাবতে হবে। এসো!'

দ্রুতপায়ে জাল বুনে চলেছিলাম আমরা। আঠালো, শক্তিশালী সুতোগুলো আমাদের শরীর থেকে বের হয়ে ছিটকে যাচ্ছিল রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশের ঘন ঝোপজঙ্গলের মাথায়। আস্তে আস্তে গোটা রাস্তাটা ভরে উঠছিল স্টিলের চেয়েও শক্ত সুতোর জালের ঠাসবুনুনিতে।

'কেন এদের সৃষ্টি করেছিলাম আমরা?' আমার গলায় তিক্ততা গোপন থাকছিল না।

তিনি প্রথমে উত্তর দিলেন না কোনো। তারপর জাল ছুঁড়তে ছুঁড়তেই মৃদুগলায় বললেন, 'প্রকৃতির মার সুধীর। নিজেদের জেনেটিক বদল ঘটিয়ে পূর্বসূরিরা উন্নততর প্রজাতির আরাকিয়েন গড়তে চেয়েছিলেন। ব্যর্থ সে চেষ্টার ফল হয়েছিল বন্ধ্যাত্বের এক গ্রহব্যাপী মহামারী।'

'তার সমাধান করা যায়নি?'

'সমাধান খোঁজা হয়েছিল আরাকিয়েনের ক্লোন সৃষ্টি করে। লক্ষ লক্ষ বাঁদরের ভ্রূণকোষে আমাদের জিন প্রতিস্থাপন করা হল। তাতে গড়ে উঠল বন্ধ্যাত্বমুক্ত অর্ধ-আরাকিয়েন এই নতুন প্রজাতি। বুদ্ধি আর হিংস্রতায় আমাদেরই মতো। কিন্তু আমাদের দুটো রূপের মধ্যে একটাই এরা ধরতে জানে কেবল।

শুরুতে ওরা আমাদের দেবতাজ্ঞানে পুজো করত। নাভাজোর হোপিরা সত্যিটাকে এখনো ধরে রেখেছে তাদের গল্পে। তারা বিশ্বাস করে এক অতিকায় মাকড়সাজননীর স্বপ্ন থেকে মানুষের সৃষ্টি। মিশরের নেইথ, ব্যাবিলনের ইসথার, জাপানের জোরোগুমো নামের দুইরূপিনী মাকড়সা মানবীদের কাহিনিতে এখনি ছড়িয়ে আছে দূর অতীতের আরাকিয়েন উপাসনার স্মৃতি। কিন্তু, তখন দ্রুত কমে আসছিল আমাদের সংখ্যা। ওদের সৃষ্টির মাত্র কয়েক সহস্রাব্দির মধ্যে...'

হঠাৎ কথা থামিয়ে নিজের শরীরটা মাটিতে ঠেকিয়ে কিছু একটা অনুভব করলেন তিনি। তারপর মাটি থেকে ছিটকে উঠে জালের গভীরে ঢুকে যেতে যেতে ডাক দিল, 'উঠে এসো। ওরা আসছে—'

'মনঃসংযোগ করো সুধীর। নিজের অন্য রূপের ছবিটা ফুটিয়ে তোলো মাথার মধ্যে-' মৃদু গলায় কথাগুলো বলতে বলতেই ঝড়ের মতো একটা বদল আসছিল তার ঝুলন্ত শরীরে—

অজ্ঞান মানুষ দু'জনের জ্ঞান ফিরে এসেছে। তাদের মধ্যে একজন এখানকার লোকজনের পরিচিত। ঘন, শক্ত জাল ছিঁড়ে তাদের উদ্ধার করে জ্ঞান ফেরাতে বেশ খানিক সময় লেগেছে মানুষজনের।

বনদফতরের বিট অফিসার কমলবাবুর চোখে তখনো ঘুম জড়ানো। খবর পেয়ে মাঝঘুম ছেড়ে উঠে এসেছেন। জালগুলো পরীক্ষা করতে করতেই বললেন, 'আশ্চর্য! এত মোটা জাল তৈরি করতে পারে যে মাকড়সা তার আকৃতি তো—'

'বিরাট বড়,' অমূল্যবাবু দুর্বল গলায় বলে উঠলেন একবার, 'এই ভদ্রলোককে সি অফ করে ফিরছি, তখন হঠাৎ পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে...ওফ! দুঃস্বপ্নের জীব একটা। আর তেমনি চালাক। আপনাদের শব্দ পেয়েই জাল ছেড়ে জঙ্গলের দিকে পালিয়ে গেল। বিদ্যুতের মতো গতি। আজ ঠিক সময়ে আপনারা এসে না পড়লে...'

অমূল্যবাবু এলাকার পরিচিত মানুষ। এ গ্রামের জমিদারবাড়িটা কিনে নিয়ে বিশ বছর হল এখানে আছেন। পোকামাকড় নিয়ে গবেষণা করেন। একটু অমিশুক, কিন্তু লোকজন তাঁকে খানিক শ্রদ্ধাই করে। এতকাল এখানকার অতিকায় মাকড়সার রহস্যকে হেসেই উড়িয়ে দিয়ে এসেছেন তিনি। কিন্তু আজ, নিজে তার শিকার হয়ে মত বদলেছে তাঁর। তাঁর কথায় অবিশ্বাস করবার মতো কিছু ছিল না।

ভীত চোখে দক্ষিণদিকে ছড়িয়ে থাকা গরুমারার জঙ্গলের দিকে একনজর ফিরে দেখলেন কমলবাবু। হেডকোয়ার্টারে একটা খবর দিতে হবে কাল। এই জঙ্গলে তিনি নিজেও তো রাতবিরেতে—

'প্রথমদিন তোমার শো দেখেই লক্ষণগুলো টের পেয়েছিলাম,' বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে তিনি মৃদু গলায় বলছিলেন, 'তারপর ভিডিওগুলো খুঁটিয়ে দেখে যে কী আনন্দ হয়েছিল আমার তুমি ভাবতে পারবে না সুধীর। এতকাল জানতাম আরাকিয়েন সভ্যতার শেষ সদস্য এই আমিই টিকে আছি শুধু পৃথিবীর এই অঞ্চলে। একেকবার ভাবতাম, নিজেকে শেষ করে দিই। এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ! তারপর তোমাকে দেখলাম। বুঝতে পারলাম, আমাদের আরো কেউ কেউ এখনো জন্ম নিচ্ছে এখানে। হয়তো প্রকৃতির বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ কেটে গিয়ে গোপনে ফের বেড়ে চলেছে আমাদের সংখ্যা। তুমি তার প্রমাণ সুধীর।'

অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে একটু দ্বিধাভরে বললাম, 'কিন্তু তাদের খুঁজে পাবার কোনো—'

'আমরা দীর্ঘায়ু জীব সুধীর। এখনো বহুকাল বেঁচে থাকব আমরা। সময় আমাদের পক্ষে।'

কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর স্বপ্নমাখা চোখদুটো আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিজের মনে নিজেকেই যেন বলে চলেছিল, 'খুঁজে তাদের আমরা বের করবই। তারপর একদিন, সবাই মিলে সুদূর উত্তরের কুইনলিন পর্বতমালার গভীরে ফিরে যাব। সেখানে আরাকিয়েনের গুহানগরীতে এখনো অটুট আছে হয়তো আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার। তারপর...'

তার কথার কোনো উত্তর দিলাম না আমি। ভোর হয়ে আসছিল। পুব আকাশে সূর্যের আলোর প্রথম ছোঁয়া লেগেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%