দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

স্ফটিকের জানালাগুলো স্বচ্ছ হয়ে উঠছিল। লম্বা পথ শেষ হয়েছে অবশেষে। আকাশগঙ্গার একেবারে একটেরেতে নির্জন এই হলদে তারার দেশ। তার জন্মগ্রহ কালনিলাস-এর থেকে অনেকগুলো ঝাঁপের দরকার হয় এখানে পৌঁছোতে। অতিমহাকাশযাত্রা খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। স্কলারশিপটা না পেলে জিমূতবাহনের মতো সাধারণ হাইড্রোপনিক চাষীর ছেলের পক্ষে সে-খরচের জোগান দেওয়া কল্পনারও বাইরে ছিল।
'জানালায় দেখুন,' মিষ্টি যান্ত্রিক শব্দটা তার মাথার মধ্যে গুণগুণ করে উঠতে চোখ মেলে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল সে। ছবিতে অজস্রবার দেখেছে। মিল্কি ওয়ে জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুবিশাল মানব-আরাকিয়েন সাম্রাজ্যের সব শিশুই এই ছবি দেখে তাদের প্রথম পাঠ্যবইয়ের পর্দায়। কিন্তু সামনাসামনি সেই রত্নের মতো উজ্জ্বল ঝিলিক দেওয়া আদি মাতৃভূমিকে দেখতে পাওয়া এক সম্পূর্ণ অন্য অভিজ্ঞতা।
সারা শরীরে একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছিল জিমূতবাহনের। সভ্যতার জন্মভূমি। জীবন্ত দেবতা-দম্পতির মন্দির! গ্যালাক্সির সবচেয়ে সুরক্ষিত এই দেবভূমিতে সাধারণ মানুষ বা আরাকিয়েনের পা দেবার অধিকার নেই। কাঁপা কাঁপা হাতদুটো তার নিজের অজান্তেই কপালে এসে ঠেকল একবার।
ফেরি যানের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে পা দিতেই একঝলক বরফঠান্ডা হাওয়া তাকে স্বাগত জানাল। কুইনলিন পর্বতমালায় হেমন্ত এসেছে। হলুদ হয়ে ওঠা মহারণ্যের ঢাকনা সরিয়ে সামনে উঠে গেছে কালো পাথরের একটা টিলা। টিলার পেছন থেকে আকাশের দিকে সটান মাথা তুলেছে মেঘ পেরোনো বরফের চূড়া। জিমূতবাহন জানে, সে-শৃঙ্গের নাম ইরিস।
পেছনে, ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ ছড়িয়ে বাতাসে ভেসে উঠছিল স্বচ্ছ ফেরি যান। তারপর, হঠাৎ একটা ঝলক দিয়ে তা তিরবেগে ধেয়ে গেল আকাশের নীল চাঁদোয়া ফুঁড়ে। এইবার এই গ্রহে সে একেবারে একা।
এদিক-ওদিক একবার ঘুরে তাকাল সে। এখানে, পাতাঝরা হেমন্তের বনে কোনো সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ করে এক আশ্চর্য গোলকের আকাশ চিরে নেমে আসা সম্ভবত এর বাসিন্দাদের ভয় পাইয়েছে। অঞ্চলটা ছেড়ে তারা সরে গেছে পাহাড় আর অরণ্যের গভীরে।
মৃদু ক্র-র-র-র একটা শব্দে তার সম্বিত ফিরল। মাঝারি আকারের রোমশ মাকড়সাটা কখন যেন সুতোয় ভর করে গাছের ফাঁক থেকে নেমে এসেছে সামনে। মুখের দুপাশের দাঁড়াদুটো দ্রুত নড়াচড়া করছে তার। এই শব্দহীন ভাষা জীমূতবাহন বোঝে। মৃদু হেসে ডানহাতটা বাড়িয়ে ধরল সে। জীবটা সেখানে নেমে একমুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তারপর ছোট্ট একটা লাফে মাটিতে নেমে এসে এগিয়ে গেল সামনের চড়াই ধরে।
পথপ্রদর্শক! একটু আশ্চর্য হচ্ছিল জীমূতবাহন। আরাকিয়েনরা সাধারণত এত ছোট আকারের হয় না। তাদের শিশুরাও এর চাইতে অনেক বড় চেহারা নিয়ে জন্মায়। অথচ জীবটা বুদ্ধিমান। কীভাবে...
তবে সে নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় তখন তার ছিল না। চড়াই বেয়ে খানিক উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে জীবটা। তার দাঁড়ার দ্রুত নড়াচড়ায় অধৈর্য হবার ইঙ্গিত। জড়তা ঝেড়ে ফেলে তার পেছন পেছন পা চালাল সে।
'এসো জিমূতবাহন। পৃথিবীগ্রহে স্বাগত।'
গলার শব্দটায় বয়সের সুস্পষ্ট ছাপ। তবে এখনও তা মধুর ঠেকে। খানিক আগে টিলা পেরিয়ে ইরিসের একেবারে পাদদেশের এই গুহামুখটার সামনে এসে থেমেছিল তার আটপেয়ে সঙ্গী। তাকে সেখানেই অপেক্ষা করবার ইঙ্গিত করে নিজে জাল ছুঁড়ে উধাও হয়েছিল গুহার অন্ধকার পেটের ভেতর। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। সামান্য তন্দ্রা আসছিল জিমূতবাহনের চোখে। সেটা অস্বাভাবিক নয়। শেষ ঝাঁপটা প্রায় একশো আলোবছর দীর্ঘ ছিল। এমন উড়ানে যাত্রীর শরীরে ক্লান্তি আসে।
তাড়াতাড়ি চোখ খুলে তাকাল সে। দুজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছেন তার সামনে। প্রৌঢ়ত্বের সীমা অনেক কাল পার করেছেন তাঁরা।
জিমূতবাহন জানে তাঁরা কে। জানে তাঁদেরই কাছে শিক্ষা নেবার জন্য প্রতি দশকে একবার মেধা অলিম্পিয়াডের আয়োজন করেন 'সভ্যতার প্রহরী' সঙ্ঘের গুরুকূল। তেরোশো গ্রহের মানব ও আরাকিয়েন সমাজ থেকে বেছে নেওয়া হয় মাত্র একজন শ্রেষ্ঠ মেধাবীকে। সে-ই যে সেরা মেধাবীর শিরোপা নিয়ে এঁদের কাছে কখনো এসে পৌঁছোবে, সে-কথা তার স্বপ্নেরও অতীত ছিল।
তবু, মানব-আরাকিয়েন যৌথ সভ্যতার এই ঈশ্বর দম্পতিকে দেখে তার মনে ভয় বা সম্ভ্রমের বদলে একটা আশ্চর্য ভালোলাগার অনুভূতি উঠে আসছিল। বড় সুন্দর দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। টলটলে চোখগুলোতে স্নেহ ঝরে পড়ছে যেন।
'ক্লান্ত হয়েছ, তাই না?' বৃদ্ধ এইবার এগিয়ে এসেছেন সামনে। নীচু হয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন তিনি একবার। তারপর পোশাকের ভাঁজ থেকে ছোট একটা শিশি বের করে তার নাকের সামনে ধরলেন।
তীব্র গন্ধটাকে ঠিক পরিচিত ভালো মন্দের আওতায় ফেলা যায় না। শুধু জিমূতবাহন টের পাচ্ছিল, সে-গন্ধের ছোঁয়ায় শরীর থেকে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে তার এক নিমেষে। শান্ত হয়ে আসছে তার তীব্র খিদে। মিটে যাচ্ছে গলা শুকিয়ে ওঠা তৃষ্ণা।
'আরাকিয়েন সুরাসার। এ-গ্রহে এ-ই আমাদের একমাত্র জীবনীশক্তির উৎস। শিক্ষার এই ক'দিন তোমাকেও পুষ্টি জোগাবে এই সুরাসার,' মৃদু হাসলেন বৃদ্ধ, 'এবারে আমার পরিচয় দিই। আমি...'
'আমি জানি,' হঠাৎ নীচু হয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিল জিমূতবাহন। তারপর এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার পায়েও হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতেই সে বলল, 'আপনাদের দেখা পেয়েছি এ আমার সৌভাগ্য দেবী আনিপ্পা ও ঈশ্বর সুদ্ধির।'
'জ্ঞানী হও। আরাকিয়েনের জ্ঞানভাণ্ডারের অধীশ্বর হয়ে সভ্যতার রক্ষা ও প্রসারের গুরুদায়িত্ব নেবার যোগ্য হও। এখন চলো আমাদের সঙ্গে।'
প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে অন্ধকার গুহাপথের অলিগলি বেয়ে, অবশেষে চওড়া একটা পাথুরে চত্বরে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন তাঁরা। জিমূতবাহন অবাক হয়ে চারদিকে দেখছিল। একেবারেই নিরাভরণ এই পাথরের চাতাল কারো বাসস্থান হতে পারে না।
তার মনের কথাটা বুঝি টের পেয়েছিলেন সুদ্ধির। একটু হেসে, চত্বরের ঠিক মাঝখান দিয়ে অতলের দিকে নেমে যাওয়া একটা কুয়োর দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বললেন, 'আমরা দশম তলের জ্ঞানকক্ষে যাব। সে-পথে তুমি নিজের শক্তিতে যেতে পারবে না জিমূতবাহন। এসো...'
বলতে বলতেই দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার দেহ হঠাৎ করেই বদলে যাচ্ছিল অতিকায় রোমশ দুটো আটপেয়ে শরীরে। কয়েকমুহূর্ত লাগল বদলটা শেষ হতে। তারপর তার মাথার মধ্যে গুনগুন করে উঠল সুদ্ধিরের গলার আওয়াজ, 'ভয় পেয়ো না...'
তাঁর শরীর থেকে বের হয়ে আসা ইস্পাতের চেয়েও দৃঢ় অথচ রেশমের চেয়েও নরম মাকড়সাতন্তুর একটা স্রোত এসে তখন জিমূতবাহনকে ঘিরে আরামপ্রদ ঢাকনা বুনে দিচ্ছিল। কয়েকমুহূর্ত বাদে একটা মৃদু ঝাঁকুনি, আর তারপর দ্রুত নেমে চলবার অনুভূতি তার ঘুম জড়িয়ে আসা চেতনাকে জানিয়ে দিল—কুয়োর পথে তিরবেগে নেমে চলেছে তারা পাতালের দিকে।
'এইখানে তোমার শিক্ষা শুরু হবে জীমূতবাহন।'
নিরাভরণ হলঘরটার একপাশে একটা বিছানা পাতা। কিছু সাধারণ আসবাব। সেখানে কোথাও কোনো আধুনিক যন্ত্রের দেখা মেলে না। প্রথাগত শিক্ষাদানের জন্য জ্ঞানসঞ্চার গণক, কিংবা হাতেকলমে জ্ঞানের প্রয়োগ শেখাবার জন্য নানাজাতের অজস্র সিমুলেটরের সঙ্গে আজন্ম পরিচিত জীমূতবাহন। অথচ এই ঘরে সে-সব উপকরণের কোনো চিহ্নই নেই। একটু অবাক হয়েই সে তাকিয়ে দেখছিল ঘরটার চারদিকে।
তার অবাক হওয়া দেখে মৃদু হাসলেন দেবী আনিপ্পা। তাঁর চারজোড়া উজ্জ্বল চোখ সামনে বসা জিমূতবাহনের দিকে ধরা, 'কী ভাবছ? শিক্ষাদানের কোনো যন্ত্রপাতিই এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার কাছে মজুত নেই, তাই তো? না জিমূতবাহন। প্রথাগত শিক্ষার পালা তোমার শেষ হয়েছে। তোমাকে নতুন করে দেবার কিছুই আর নেই আমাদের কাছে।'
'কিন্তু আরাকিয়েনের জ্ঞানভাণ্ডার...'
'আছে বইকি! তবে সে জ্ঞানভাণ্ডারে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন বা যুদ্ধবিদ্যার মতো কোনো মণিরত্ন আর অবশিষ্ট নেই। তার সবই আমি তোমাদের দিয়েছি। শুধু একটাই জিনিস এখনও তার সঞ্চয়ে আছে। একমাত্র 'সভ্যতার প্রহরী' সঙ্ঘে নির্বাচিত সৌভাগ্যবানরাই তার অধিকারী হন। তা হল আমাদের ইতিহাস।
'এই গ্রহে দ্বিরূপধারী আরাকিয়েনরাই সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিল। অর্ধ-আরাকিয়েন মানুষরা আমাদেরই সৃষ্টি। গ্যালাক্সি জোড়া তেরোশো গ্রহের সুবিশাল মানব-আরাকিয়েন সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল এই গ্রহে। তাই এই গ্রহ সভ্যতার পবিত্রতম তীর্থস্থান। এই গ্রহের ইতিহাসকে জানবার জন্যই তোমার এখানে আসা।'
'কিন্তু কীভাবে? জ্ঞানসঞ্চার গণক ছাড়া...'
'এইভাবে জিমূতবাহন...' বলতে বলতেই দেয়ালের গায়ের কুলুঙ্গির ভেতর থেকে বাক্সের মতো চেহারার একটা প্রাচীন জিনিসকে মেঝের ওপর নামিয়ে এনেছেন সুদ্ধির। তারপর তাকে খুলে ধরেছেন তার সামনে।
অবাক হয়ে জিনিসটার দিকে দেখছিল জিমূতবাহন। দূর অতীতের এই জ্ঞানযন্ত্রের কথা তারা ইতিহাসের পাতায় পড়েছে। এদের পুঁথি বলা হত। এর পাতায় পাতায় সাঙ্কেতিক ছবির মালা গেঁথে তার মধ্যে জ্ঞানসঞ্চয়ের কৌশল তৈরি হয়েছিল প্রাক-ইতিহাসের কোনো অজ্ঞাত, অন্ধকার যুগে।
'এর নাম আমাসাদোমের পুঁথি। দেবী আরাকিয়েনের মানসপুত্র জিরিয়েনের রচিত এই পুঁথিতেই ধরা আছে সভ্যতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। এ-পুঁথির সম্পূর্ণ পাঠ তোমাকে নিতে হবে আমাদের কাছে।'
একটু হতাশ হয়েই মাথা নাড়ল জিমূতবাহন, 'কিন্তু আমি তো এই সঙ্কেত...'
'পড়তে জানো না। স্বাভাবিক। সেই অপ্রয়োজনীয় কৌশল বহুকাল হল হারিয়ে গেছে তোমাদের দুনিয়া থেকে। এর পাঠ আমরা তোমায় অন্য পথে দেব জিমূতবাহন,' বলতে বলতে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন দেবী আনিপ্পা। তাঁর চারজোড়া তীব্র চোখের দৃষ্টি সংহত হয়েছে তার চোখের দিকে, 'চোখ বন্ধ করো। মনের চোখকে খোলো। আমাদের দুজনের স্মৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দাও তোমার চেতনাকে। সেখানে জমা করে রাখা এই পুঁথির পাঠ জীবন্ত হয়ে উঠুক তোমার চোখের সামনে। দেখো জিমূতবাহন...'
...আস্তে আস্তে অন্ধকার কেটে যাচ্ছিল। একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে যেন দাঁড়িয়ে আছে সে। তার অজস্র খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দুনিয়াটা আবছা আবছা চোখে পড়ে। আর কোনো ছাত্র নেই সেখানে। খানিক দূরে দাঁড়ানো বৃদ্ধ মানুষদুজনের চোখ তার দিকে তুলে ধরা।
জিমূতবাহনকে সচেতন হতে দেখে মিষ্টি হাসলেন সুদ্ধিরদেব, 'স্বাগত জিমূতবাহন। আমাদের এই চেতনাকক্ষের প্রত্যেকটি জানালা ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়কে দেখায়। সেই পথে, আমাসাদোমের পুঁথি থেকে নির্বাচিত ইতিহাসের কিছু বিচ্ছিন্ন অধ্যায় তুমি তোমার সামনে ঘটতে দেখবে এবার।
'তার সূচনা হবে আমার আসল পরিচয় জানাবার কাহিনি দিয়ে। সুধীর গুপ্ত নাম নিয়ে যখন মানুষের দুনিয়ায় জন্মেছিলাম, পৃথিবীতে আরাকিয়েনের তখন চরম দুর্দিন। সেই সময়...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন