দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
'পূজা স্বীকার করুন জননী আরাকিয়েন।'
মৃদু খসখস শব্দ উঠল গুহার ভেতর থেকে। প্রথমে দুটি রোমশ পা, তারপর হঠাৎ একটি ছোট্ট লাফ দিয়ে অতিকায় আট-পা'ওয়ালা জীবটা বের হয়ে এল গুহার মুখে। রোমশ কপাল থেকে জ্বলজ্বলে চারজোড়া চোখ নতজানু আদিম মানুষগুলোকে দেখছিল। সাধ্যমতো নৈবেদ্য সঙ্গে এনেছে তারা। কয়েকটি দুর্গন্ধ যুক্ত কাঁচা চামড়া। কিছু ফলমূল।
আস্তে আস্তে পাথরের মেঝের ওপর দেহের ভার নামিয়ে নীচু হয়ে বসল সে। তারপর হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল তার শরীরটা। একটা আশ্চর্য বদল ঘটে চলেছিল তাতে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেবী আরাকিয়েন উঠে দাঁড়ালেন জীবটার জায়গায়। তাঁর ঢেউখেলানো কালো চুলে, রাত্রির মতো অন্ধকার। চোখের মণিতে আর ধবধবে পোশাকে রৌদ্রের আলো ঝলক দিচ্ছিল।
'আমি তৃপ্ত হয়েছি। কী চাও?'
'বৃষ্টির অভাবে আমাদের অরণ্য শুকিয়ে উঠেছে। আমাদের বৃষ্টি দিন জননী।'
'তাই হোক।'
হাতের দণ্ডটি আকাশের দিকে তুলে ধরলেন দেবী আরাকিয়েন। কয়েকটি মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপরেই পশ্চিম দিগন্ত থেকে গুরুগুরু গর্জন ভেসে এল। সূর্যের উত্তপ্ত মুখ ঢেকে গেছে মেঘের আড়ালে। প্রার্থনার বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল খরায় পুড়তে থাকা গ্রাম আর তাকে ঘিরে থাকা অরণ্যকে। বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে উঠছিল আদিম গ্রামবাসীদের জয়ধ্বনি। মানুষের রূপ ছেড়ে অতিকায় জীবটি তখন তার আট পায়ে ভর করে ফিরে গেছে গুহার ভেতরে। সেখান থেকে বাইরের উল্লাসরত মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে তার আটটি চোখে বিষণ্ণতা ছেয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ের গভীর অবধি ছড়ানো এই গুহানগরী একদিন মুখরিত থাকত অগণিত আরাকিয়েনের কন্ঠস্বরে। আজ তাঁকে নিয়ে মাত্র কয়েকজনই অবশিষ্ট আছে আর। প্রকৃতির মার। পৃথিবীর সর্বত্রই সেই একই ছবি। শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই গ্রহের ওপরে তার সমস্ত অধিকারকে ওই বন্য, অর্ধ-আরাকিয়েনদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে একটা গোটা সভ্যতা...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন