হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

নৃসিংহ চৌধুরীর দিনলিপি :
১লা আগস্ট, পশ্চিম গারো পাহাড়, মেঘালয় :
শিলং থেকে আজ বেলা দশটা নাগাদ পশ্চিম গারো পাহাড়ের এই ছোট্ট গ্রামটায় এসে পৌঁছেছি৷ যদিও এই টিম্বাটু গ্রামটা ‘ইন্দো-মায়ানমার বায়ো ডাইভার্সিটি হটস্পটের’ অন্তর্গত, অফুরান জীববৈচিত্রসমৃদ্ধ এ অঞ্চলে শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমার মতো ‘বাটার ফ্লাই ক্যাচার’ বা প্রজাপতি শিকারিরা এখানে এসে উপস্থিত হন, তবুও এখানে থাকার জন্য তেমন কোনও হোটেল গড়ে ওঠেনি৷
এখানে থাকতে হলে পাহাড়ের ঢালে গ্রামের কোনও কুঁড়েতেই মাথা গুঁজতে হয়৷ কাঠের অথবা পাথরের তৈরি কয়েকটা বাড়ি অবশ্য এখানে আছে, কিন্তু সেগুলো হয় সরকারি সম্পত্তি অথবা একান্ত ব্যক্তিগত আবাসস্থল৷ তা ভাড়া দেবার জন্য নয়৷ আমার কপাল অবশ্য এবার ভালো৷ আমি এবার আশ্রয় পেয়েছি ডক্টর শেফিল্ডের ছবির মতো সুন্দর কাঠের বাড়িটাতে৷
গত বছর এখানে এসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল৷ ডক্টর শেফিল্ডকে ‘ইংরেজ’ বলা যেতেই পারে৷ খাঁটি ইংরেজ রক্ত প্রবাহিত তার দেহে৷ যদিও তিনি নিজেকে ‘গারো’ হিসাবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন৷ শেফিল্ডের ঠাকুরদা একশো বছর আগে এখানে মিশনারি হিসাবে এসেছিলেন, তারপর এ-পাহাড়কে, এখানকার মানুষজনকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেছিলেন৷ শেফিল্ডের বাবাও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন৷ শেফিল্ড অবশ্য প্রথম জীবনে এখানে সুকলের পাঠ চুকিয়ে লন্ডনে চলে যান৷ সেখানে ডাক্তারি পাশ করে রয়্যাল সোসাইটির সভ্যও হন৷ ওখানকার কোনও এক নামকরা হাসপাতালে কাজ করার পর, বছর দশেক আগে জন্মভূমির টানে আবার গারো পাহাড়ে ফিরে এসেছেন অকৃতদার মানুষটি৷
সদা হাস্যময় এই মানুষটি আমাকে তাঁর বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন সম্ভবত আমি বাঙালি বলে৷ বাঙালিদের তিনি শ্রদ্ধা করেন রবীন্দ্রনাথের জন্য৷ রবীন্দ্রনাথ যখন শিলং পাহাড়ে ছিলেন তখন শেফিল্ডের ঠাকুরদা নাকি একবার তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন৷ শেফিল্ডের একটা কুকুর আছে৷ তাকে নিয়ে এ-বাড়িতে দিন কাটান তিনি৷ জাতিতে সেটা গ্রেট ডেন৷
ডক্টর শেফিল্ডের বাড়ি মালপত্র রেখে, স্নান-খাওয়া সেরে, ঘন্টাখানেক বিশ্রাম করে আমার প্রজাপতি সংগ্রহের সাজসরঞ্জাম কাচের জার, পাউচ, প্রজাপতি ধরার হ্যান্ডনেট ইত্যাদি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম৷ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগোলাম ওপরের দিকে৷ বর্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে৷ গাছপালা সব প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে৷ দুপুরের আলোতে ঝলমল করছে ঘন নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা পান্না-সবুজ পাহাড়ের ঢালগুলো৷ এত প্রান্তবন্ত সবুজ রং শুধু হয়তো এই গারো পাহাড়েই দেখা যায়৷ তারই মাঝে দূর থেকে চোখে পড়ছে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা রুপালি ফিতার মতো কয়েকটা ঝোরা বা ঝরণা৷ তেমনই একটা ঝোরাকে লক্ষ্য করে এগোলাম আমি৷ এক সময় পৌঁছে গেলাম সে-জায়গাতে৷
পাহাড়ের ঢালে কিছুটা সমতল মতো জায়গা৷ ফুট তিরিশেক ওপরের একটা পাথরের ফাটল থেকে জলধারা ঝর ঝর শব্দে নীচে নেমে সমতল জায়গাটিতে ছোট একটা ডোবা মতো সৃষ্টি করে আবার নীচের দিকে হারিয়ে গেছে৷ ডোবাটার চারপাশে ছড়িয়ে আছে জলধারায় মসৃণ হয়ে যাওয়া নানা আকৃতির নুড়িপাথর আর ছোট ছোট ঝোপঝাড়৷
ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই৷ জলধারা যেখানে এসে পড়ছে তার কিছুটা তফাতেই একটা ডিম্বাকৃতি পাথরের ওপর বসে আছে একঝাঁক ছোট্ট ছোট্ট প্রজাপতি৷ মোনার্ক বাটারফ্লাই৷ পাথরের ওপর সার বেঁধে বসে এক অদ্ভুত সম্মিলিত ছন্দে তারা পাখা নেড়ে চলেছে৷
তাদের দেখেই আমার মনটা খুশিতে নেচে উঠল৷ এ তল্লাটে মোনার্ক বাটারফ্লাই এমন কিছু দুর্লভ নয়, তবে এরা পরিযায়ী প্রজাপতি বা মাইগ্রেটরি বাটারফ্লাই৷ সুদূর উত্তর আমেরিকা থেকে পাহাড় সমুদ্র পেরিয়ে, হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এরা এখানে আসে৷ ব্যাপারটা ভাবলেই কেমন আশ্চর্য লাগে৷ এখানকার কিছু মানুষ বিশ্বাস করে যে এই প্রজাপতির পাখার রেণু নির্দিষ্ট অঙ্গে মাখলে নাকি মিলন সুখের হয়৷ আর আমার ওদের দেখে ভালো লাগার কারণ হল, আমি যে-যেবার প্রথম মোনার্ক বাটারফ্লাই ধরেছি সে-সেবার-ই পরবর্তীকালে দুষ্প্রাপ্য প্রজাপতির সন্ধান পেয়েছি৷ এটা আমার একটা সংস্কারও বলা যেতে পারে৷
ছোট হলেও মোনার্ক খুব সাবধানী৷ কাছে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যায়৷ ওদের দেখামাত্রই হ্যান্ড নেটটা বাড়িয়ে ভেজা পাথরের ওপর সাবধানে পা রেখে আমি সন্তর্পণে এগোলাম সেই নির্দিষ্ট পাথরটার দিকে৷ কিন্তু কাছে যেতেই আমার আশঙ্কা সত্যি হল৷ বিপদের গন্ধ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁকটা উড়তে শুরু করল৷ আমি বাতাসে নেট চালালাম৷ কিন্তু একটাও আটকাল না তাতে৷ ঝাঁকটা উড়ে গেল ডোবার দিকে৷
সেখানে নামা যাবে না৷ মুহূর্তখানেক সেখানে দাঁড়িয়ে একটু হতাশ হয়ে আবার পিছনে ফিরতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই দেখতে পেলাম তাকে৷ একটা প্রজাপতি তখনও সেই পাথরটার ওপর বসে আছে৷ যেন তার ওড়ার কোন তাড়া নেই৷ আর তাকে দেখামাত্রই যা আছে কপালে ভেবে নেটটা চালিয়ে দিলাম তাকে লক্ষ্য করে৷ আর আমার হাতলওলা জালের বৃত্তর মধ্যে আটকে গেল প্রজাপতিটা৷
গারো পাহাড়ে এ-মরশুমে আমার প্রথম শিকার এই মোনার্কটা৷ প্রজাপতিটাকে ধরার পর আমার সংস্কারের জন্য মনে মনে বেশ খুশি হলাম৷ কিছুক্ষণের মধ্যে সাবধানে তাকে জাল থেকে খুলে পুরে ফেললাম কাচের জারে৷ আপাতত সেটাই ওর আস্তানা৷ এরপর আমি এগোলাম পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্যালিপটাস জঙ্গলের দিকে৷
সময় এগিয়ে চলল, আমিও ঘুরে বেড়াতে লাগলাম প্রজাপতির খোঁজে৷ একবার আমার দেখা হল সাদা রঙের একঝাঁক ‘কমন ম্যাপ বাটারফ্লাইয়ের’ সঙ্গে৷ আর একবার হলুদের ওপর কালো ডোরাওলা ‘টাইগার বাটারফ্লাইয়ে’র সঙ্গে৷ কিন্তু এ দু-ধরনের প্রজাপতি আমার সংগ্রহে আছে৷ তাই আমি শুধু তাদের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম, ধরার চেষ্টা করলাম না৷ ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর তখন বিকাল হয়ে এসেছে৷ হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল মাটিতে শুয়ে থাকা একটা গাছের গুড়ির ওপর৷ বেশ বড় একটা প্রজাপতি বসে আছে সেখানে৷ ‘ব্রহ্মপুত্র প্যামফ্লাই’৷ দুষ্প্রাপ্য প্রজাপতি৷ আমি থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে৷
কিন্তু তাকে ধরার উপায় আমার নেই৷ এই গারো পাহাড়ে যে তিনশো ধরনের প্রজাপতি পাওয়া যায় তার মধ্যে বেশ কিছু প্রজাপতি সংরক্ষণ আইনের শীর্ষ তালিকাভুক্ত৷ ব্যাপারটা শুনলে অনেকেই আশ্চর্য হবেন যে, কেউ বাঘ, গণ্ডার বা হাতি শিকার করলে যে শাস্তি হবে, ওইসব প্রজাপতি ধরলেও একই শাস্তি৷ ব্রহ্মপুত্র প্যামফ্লাই-ও একই তালিকাভুক্ত৷ ওকে ধরলেই, ধরা পড়লে নির্ঘাত সাত-আট বছরের হাজতবাস৷ তবে ক্যামেরাবন্দি অবশ্যই করা যায়৷ তাই সে উড়ে যাওয়ার আগে চটপট ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করলাম৷
লেন্সটা ঠিক করছি৷ হঠাৎ-ই একটা মৃদু বিপ্ বিপ্ শব্দ কানে এল৷ আর এরপরই প্রজাপতিটা যেখানে বসে ছিল, সেদিকে একটা গাছের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এল একজন লোক৷ তাঁর পায়ে ঝোপঝাড় আন্দোলিত হতেই শোয়ানো-গাছের গুড়ি থেকে প্রজাপতিটা উড়ে গেল অন্যদিকে৷ মুহূর্তের মধ্যেই সে হারিয়ে গেল চোখের আড়ালে৷
তাকালাম লোকটার দিকে৷ পরনে নীল রঙের ট্যুইট সুট, মাথায় হ্যাট, হাতে দস্তানা, মাঝবয়সি দীর্ঘকায় একজন লোক৷ তাঁর হাতে ধরা মোবাইল ফোনের মতো একটা যন্ত্র৷ লোকটাকে দেখে আমার ঠিক ভারতীয় বলে মনে হল না৷ প্রজাপতিটা উড়ে যাওয়াতে সেই মুহূর্তে লোকটার উপস্থিতিতে ঈষৎ ক্ষুণ্ণ্ হলাম আমি৷ লোকটা সম্ভবত শেষমুহূর্তে প্রজাপতিটাকে উড়ে যেতে দেখেছিল৷ তাই সে আমার উদ্দেশ্যে একটু লজ্জিতভাবে বলল, ‘মাফ করবেন৷ আমার জন্যই প্রজাপতিটা পালাল৷ তবে ওই যে ওখানে পাহাড়ের ঢালে ছোট ঝরণা দেখছেন ওখানে বেশ কয়েকটা ব্রহ্মপুত্র প্যামফ্লাই আছে৷ আমি কিছুক্ষণ আগেই দেখে এলাম৷’
স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণে কথাগুলো বলে লোকটা অঙ্গুলি নির্দেশ করল উল্টোদিকের পাহাড়ের ঢালের গায়ে একটা ঝরণার দিকে৷ আমি তাঁর কথা শুনে সৌজন্যতার খাতিরে তাঁর উদ্দেশে বললাম, ‘না, না, ঠিক আছে৷ প্রজাপতিটা এমনিও উড়ে যেতে পারত৷ আবার হয়তো ব্রহ্মপুত্র প্যামফ্লাই দেখতে পেয়ে যাব৷’
জবাব শুনে মৃদু হাসলেন ভদ্রলোক৷ তারপর আমার পরিচয় জানতে চাইলেন৷
আমি সংক্ষেপে আমার পরিচয় ব্যক্ত করলাম৷ আমি ডাক্তার শেফিল্ডের বাড়ি উঠেছি শুনে ভদ্রলোক প্রথমে বললেন, ‘ডাক্তার শেফিল্ডকে আমি চিনি৷ খুব সজ্জন মানুষ৷’ তারপর লোকটা নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আমি, ক্যালিপ্ঢা অক্স৷ মেক্সিকান৷ ভারতের আকাশ নিয়ে গবেষণা করতে বছর পাঁচেক ধরে এদেশে আছি৷ এখানে আমার একটা বাড়ি আছে৷ যদিও সারাবছর আমি এখানে থাকি না৷ বাড়িটা ভাড়া দেওয়া আছে৷ মাঝে মাঝে এখানে আসা-যাওয়া করি৷’
কথাগুলো বলার পর চারপাশে কী যেন খুঁজতে খুঁজতে তিনি প্রশ্ণ করলেন, ‘তা কী প্রজাপতি ধরলেন? কোনও রেয়ার স্পিসিস...’
তাঁর কথা শুনে আমি কিট ব্যাগ থেকে কাচের জারটা বার করে তুলে ধরে বললাম, এই যে একটা মোনার্ক বাটারফ্লাই৷
‘মোনার্ক বাটার ফ্লাই!’ ভদ্রলোক কাছে এগিয়ে এসে জারটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিতরের প্রজাপতিটাকে দেখতে লাগলেন৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর মুখটা৷ তিনি কাছে চলে আসায় তাঁর অন্য হাতে ধরা ছোট যন্ত্রটার বিপ্ বিপ্ শব্দটা কানে বড় লাগছে৷ আমি তাঁকে জিগ্যেস করলাম, ‘আপনার হাতে এটা কী জিনিস?’
ক্যালিপ্ঢা মৃদু চমকে উঠে সুইচ টিপে যন্ত্রটা বন্ধ করে দিয়ে হেসে বললেন, ‘আমার বাড়িতে একটা অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ বসানো আছে৷ যা দিয়ে আমি আকাশ দেখি৷ আপনি গেলে আপনাকেও দেখাব৷ এটা টেলিস্কোপেরই যন্ত্রাংশ৷ রিমোটও বলতে পারেন৷ খুব শক্তিশালী৷ ভুলে হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছি৷’
একথা বলার পরই প্রজাপতিটা দেখতে দেখতে আমাকে বেশ একটু অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘বেশ সুন্দর প্রজাপতি৷ একটা অনুরোধ করছি, এটা আমাকে দেবেন? যা দাম চান আমি দেব৷ আমি প্রজাপতি ধরি না ঠিকই, কিন্তু যাঁরা ধরেন, তাঁদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে প্রজাপতি কিনি৷ মেক্সিকোতে আমার একটা ছোট সংগ্রহশালা আছে৷ এই মোনার্কটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে, এটা আকারে বেশ বড়৷’
আমি একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিলাম, ‘মাফ করবেন৷ এটা আমার ধরা প্রথম প্রজাপতি৷ আমার কিছু সংস্কার আছে৷ এটা আমি দিতে পারব না৷’
জবাব শুনে মিস্টার ক্যালিপ্ঢা আমার মুখের দিকে মুহূর্তখানেক তাকিয়ে থেকে জারটা আবার আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে হেসে বললেন, ‘আমি হয়তো আপনাকে এমন একটা প্রজাপতি দিতে পারি যার বিনিময়ে এটা আপনি আমাকে দিয়ে দেবেন৷’
আমি হেসে বললাম, ‘তাই নাকি? আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল৷ এখানে বহু দেশের মানুষ আসেন৷ কিন্তু ইতিপূর্বে কোনও মেক্সিকানের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ হয়নি৷ আমি এখানে ক’দিন থাকব৷ তেমন সুযোগ হলে আপনার দেশের গল্প শুনব৷’
ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘অবশ্যই৷ আবার আমাদের দেখা হবে৷ আমি এবার যাই৷ বেলা পড়ে আসছে৷ আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল৷ ধন্যবাদ৷’
আমিও তাঁকে ধন্যবাদ জানাবার পর তিনি এগোলেন অন্যদিকে৷ আর আমিও এদিনের মতো প্রজাপতি অভিযান সাঙ্গ করে নীচে নামতে শুরু করলাম ডাক্তার শেফিল্ডের বাড়িতে ফেরার জন্য৷ দিনের শেষ আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে গারো পাহাড়ের মাথায়৷
আমি যে টেবিলে বসে এই দিনলিপি লিখছি, সেই টেবিলেই কাচের জারের মধ্যে এখন শোভা পাচ্ছে মোনার্কটা৷ আমি একটা ছোট্ট গাছের ডাল ঢুকিয়ে দিয়েছি জারের মধ্যে৷ তার-ই একটা পাতায় ডানা মুড়ে চুপ করে বসে আছে সে৷
ডক্টর শেফিল্ডের ডায়েরি :
১ লা আগস্ট, টিম্বাটু ভিলেজ, ওয়েস্ট গারো হিল্স, মেঘালয়৷
আজ সকালে সেই বাঙালি প্রজাপতি-শিকারি ভদ্রলোক মিস্টার চৌধুরি আমার বাড়িতে এসে উঠলেন৷ এই প্রজাপতি-শিকারি ভদ্রলোকের সঙ্গে গত বছর আমার পরিচয় হয়েছিল৷ আমি তাঁকে এ-বছর আমার বাড়িতে থাকতে দেব বলেছিলাম৷ আমি আমার কথা রাখলাম৷ ভদ্রলোককে ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিয়ে ডিস্পেনসারির দিকে রওনা হয়েছি, ক্যাথলিক চার্চের সামনে উপস্থিত হতেই দেখি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে রাজ সইকিয়া প্রায় ছুটতে ছুটতে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়াল৷ তাঁর মুখ কেমন ফ্যাকাসে! উত্তেজনায় সে কাঁপছে৷
আমি প্রশ্ণ করলাম, ‘কী হয়েছে আপনার?’
সে জবাব দিল, ‘ডক্টর শেফিল্ড, আপনি দয়া করে এখনই একবার আমার বাড়ি চলুন, মীনাক্ষীর আবার ব্লিডিং শুরু হয়েছে৷ এবারও হয়তো ...৷’ কথা শেষ না-করে আমার হাত দুটো চেপে ধরল সে৷
আমি মনে মনে বলে উঠলাম, ‘আবার মিসক্যারেজ! গতকাল বিকেলেই তাঁকে একদম সুস্থ স্বাভাবিক দেখে এসেছি!’ মুখে কিছু না বলে আমি তৎক্ষণাৎ সইকিয়ার সঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তাঁর বাড়ির উদ্দেশে ছুটতে শুরু করলাম৷ যখন ওপরে উঠে এলাম তখন আমরা দুজনেই হাঁফাচ্ছি৷
ইউক্যালিপ্ঢাসের বনের মধ্যে পাথরের দেওয়াল আর কাঠের ঢালু ছাদওলা বিরাট দোতলা বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে৷ ব্রিটিশ আমলে জরিপের কাজ করতে আসা এক ভদ্রলোক বহু বছর আগে এ-বাড়িটা বানিয়েছিলেন৷ বহু হাত ঘুরে এ-বাড়িটা এখন ক্যালিপ্ঢা নামক মেক্সিকান ভদ্রলোকের সম্পত্তি৷ তাঁর সঙ্গেও আমার পরিচয় আছে৷ ভদ্রলোক মহাকাশ পর্যবেক্ষক৷ এই গারো পাহাড়ের ধুলো ধোঁয়াহীন নির্মল আকাশ পর্যবেক্ষণের পক্ষে সুবিধাজনক বলে তিনি এই সম্পত্তিটা এখানে কিনেছেন৷
বাড়িটার এক-তলায় ভাড়া থাকে স্থানীয় সরকারি সুকলের টিচার রাজা সইকিয়া ও তার স্ত্রী মীনাক্ষী৷ দুজনেরই বয়স তিরিশের নীচে৷ সুখী দম্পতি৷ যদিও এখন আর তাদের ঠিক সুখী বলা যাচ্ছে না৷
সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতর ঢোকার আগে আমার চোখ গেল ছাদের দিকে৷ সেই বিরাট টেলিস্কোপটা দোতলার ছাদ ফুঁড়ে কামানের মতো তাক করা আছে মহাকাশের দিকে৷ ওটা দিয়েই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করেন ল্যান্ড লর্ড৷ ওই টেলিস্কোপটা দিয়ে তিনি আমাকেও একবার আকাশের আশ্চর্যরূপ দেখিয়েছিলেন৷
রাজা সইকিয়া আমাকে নিয়ে সোজা হাজির হল তাঁর বেডরুমে৷ খাটে চাদর ঢাকা অবস্থায় শুয়েছিল মীনাক্ষী৷ মাঝে মাঝে সে অস্ফুটভাবে কোকাচ্ছে৷ বিবর্ণ মুখ৷ চোখের কোল বেয়ে জল চুইয়ে পড়ছে৷ একজন ঘরের কাজ করা গারো মহিলা তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে৷
আমি একটা টুল টেনে নিয়ে মীনাক্ষীর পায়ের কাছে বসে চাদরটা একটু ওঠালাম৷ হ্যাঁ, মিসক্যারেজ৷ চার মাসের ভ্রূণ, তাকে সন্তান বলাই ভালো, প্রায় বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ রক্তে ভিজে গেছে বিছানাটা৷ এই নিয়ে তিনবার মিসক্যারেজ হল মীনাক্ষীর৷ প্রথমে তিন মাসে, দ্বিতীয়বার দু’মাসে, আর এবার চারমাসে৷ আমি খাটে বসা মহিলাকে তাড়াতাড়ি গরম জল আনতে বলে আমার ব্যাগ থেকে গ্লাভস, ব্যান্ডেজ, সিজার ইত্যাদি সাজসরঞ্জাম বের করলাম৷
গরম জল এসে গেল কিছু সময়ের মধ্যেই৷ সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তারপর আমি কাজ শুরু করলাম৷ অভ্যস্ত হাতে মিনিট খানেকের মধ্যেই আমি সেই মাংসল পিণ্ডটাকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম মীনাক্ষীর দেহ থেকে৷ মনে মনে ভাবতে লাগলাম কেন এমন হচ্ছে? সবকিছুর পিছনেই তো একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকা উচিত৷ ভ্রূণটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতেই হঠাৎ তার গায়ে কয়েকটা ছিট্ছিট্ দাগ দেখতে পেলাম৷ আর সেটা দেখেই আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহু বছর আগে ছাত্রাবস্থায় ইংল্যান্ডের মেডিক্যাল কলেজে কাচের জারে রাখা ফর্মালিনে চোবানো একটা ভ্রূণের কথা৷
এক জাপানি নারীর ভ্রূণ৷ বিশেষ কারণবশত আমাদের প্রফেসর সেই ভ্রূণটা আমাদের দেখিয়েছিলেন৷ সে-ভ্রূণটা এমন-ই দেখতে ছিল৷ আমার মনে হল, এ ভ্রূণটাও মেডিক্যাল অ্যানালিসিসের জন্য পাঠালে কেমন হয়? পরপর তিনবার এমন অস্বাভাবিক অপারেশনের কারণ আমি ধরতে পারছি না৷ হয়তো ভ্রূণটার মেডিক্যাল অ্যানালিসিস করলে কোনও সমাধান সূত্র মিলতে পারে৷
মীনাক্ষী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ আমি তাড়াতাড়ি বাকি কাজ শেষ করে তাকে একটা ঘুমের ইঞ্জেকশন দিলাম৷ মানসিক স্ট্রেস কাটিয়ে ওঠার জন্য তাঁর পক্ষে ঘুমটা জরুরি৷ কাজ মিটে যাবার পর রাজা সইকিয়াকে ডেকে প্রথমে জিগ্যেস করলাম, ‘মীনাক্ষী কোনও চোট-টোট পেয়েছিল কি?’
সে বলল, ‘না, গতকাল বিকেলে আপনি ওকে দেখে যাওয়ার পর সন্ধ্যাবেলা আমরা গল্প করলাম, রেডিওতে গান শুনলাম৷ তারপর খাওয়া সারলাম৷ মীনাক্ষীর রোজনামচা লেখার অভ্যাস আছে৷ টেবিলে বসে আধঘণ্টা সে সেটা লিখল, তারপর আমরা শুতে গেলাম রোজকার মতো...৷’
ডাক্তার হিসাবে আমি তাঁকে প্রশ্ণ করলাম, ‘গত রাতে কোনও দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে কি? সে সময় যদি কোনও আঘাত...৷’
রাজা সইকিয়া বলল, ‘না, কাল কেন, যে তিনবার এই ঘটনা ঘটল তার কয়েক দিনের মধ্যে এ সম্পর্ক ঘটেনি৷’ এরপর সে বলল, ‘আজ সকালেও স্বাভাবিক ছিল৷ সাতটায় উঠে আমাকে বেড-টি দিল, ঘরের কাজের মহিলা আসার পরও হাতে হাতে তার সঙ্গে টুকটাক কাজ করল৷ আপনার নিষেধের কারণে ও কোনও ভারী কাজ করে না৷ গুয়াহাটি থেকে আমার কিছু বই পার্সেল এসেছিল, সেগুলো ক্যুরিয়ার কোম্পানির লোকের কাছ থেকে রিসিভ করল৷ মিস্টার ক্যালিপ্ঢা একবার নীচে নেমেছিলেন, আজ মাসপয়লা বলে তাঁকে ভাড়ার টাকাটাও ডেকে দিল৷ রান্নার কাজ শেষ হওয়ার পর দশটা নাগাদ আমি স্নান করতে ঢুকেছি সুকলে বেরোব বলে, তখনও ভাত বাড়ছিল৷ তারপরই ওর চিৎকার শুনলাম৷ বাইরে বেরিয়ে দেখি ডায়েনিং টেবিলের সামনে মীনাক্ষী দাঁড়িয়ে আছে৷ তার পায়ের সামনে কাঠের মেঝেতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত৷’
মীনাক্ষী ডায়েরি বা রোজনামচা লেখে তা আমার জানা ছিল না৷ জানার কথাও নয়৷ আমার মাথায় হঠাৎ একটা ভাবনা এল৷ মিসক্যারেজের আগের দিনটাতে পেশেন্টের কার্যকলাপ অনেক সময় খুব ইমপর্ট্যান্ট হয়৷ হয়তো এমন কিছু ঘটে যাতে চবিবশ ঘণ্টার মধ্যে মিসক্যারেজ হয়৷ ব্যাপারটা ভেবে নিয়ে আমি একটু ইতস্তত করে রাজা সইকিয়াকে বললাম, ‘মীনাক্ষীর রোজনামচার খাতাটা একবার পাওয়া যেতে পারে? যদিও রোজনামচা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ কারও দেখা ঠিক নয়৷ তবে আমি ডাক্তার হিসাবেই সেটা দেখতে চাই৷ নানা কারণে তো মিসক্যারেজ হয়, আমি জানতে চাই গত দু’বার মিসক্যারেজের ঠিক আগে তাঁর মানসিক পরিস্থিতি ঠিক কেমন ছিল, বা সে এমন কোনও কাজ করেছে কি না যাতে মিসক্যারেজ হতে পারে৷ মীনাক্ষীর অনুমতি সাপেক্ষে, একান্ত কোনও ব্যক্তিগত ব্যাপার, যার গোপনীয়তা আপনারা আমার কাছে রক্ষা করতে চান, তেমনি কিছু সেখানে না থাকলে আমাকে যদি সে লেখাগুলো দেন...’
এত দুঃখের মধ্যেও রাজা সইকিয়া মৃদু হেসে বলল, ‘না, সে খাতায় আমাদের দাম্পত্য জীবনের কোনও ব্যাপার লেখা নেই৷ ওই লেখা নিয়ে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গোপনীয়তাও কিছু নেই৷ মীনাক্ষী খুব সংক্ষিপ্তসারে তার কাজের বিবরণ লিখে রাখে ওই রোজনামচায়৷ আমি স্বচ্ছন্দে তাঁর ডায়েরি আপনাকে দিতে পারি৷’ এই বলে সে পাশের ঘরে গিয়ে দুটো ডায়েরি নিয়ে ফিরে এসে আমার হাতে তুলে দিল৷ আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, আগের দুটো মিসক্যারেজের তারিখ আপনার মনে আছে?
সে জবাব দিল, হ্যাঁ আছে৷ ২২শে ফেব্রুয়ারি, আর গত বছরের ১৯শে সেপ্ঢেম্বর৷
আমি বললাম, ‘আচ্ছা’৷
এরপর আমি তাঁকে বললাম, ‘আর একটা ব্যাপারে আপনার অনুমতি প্রয়োজন৷ এই ভ্রূণটাকে আমি পরীক্ষার জন্য দিল্লি এইমস-এ পাঠাতে চাই৷ যদি ওরা ওটা দেখে এ ব্যাপারে কোনও আলোকপাত করতে পারে৷ আমার জানা দরকার একজন সুস্থ সবল তরুণীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা বারবার কেন ঘটছে!’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে একটু ইতস্তত করে রাজা সইকিয়া বলল, ‘ঠিক আছে, আপনি যা ভালো বুঝবেন তাই করুন৷’
আমি বললাম, ‘তাহলে আমাকে একটা মুখ ঢাকা পাত্র আর কিছুটা বরফ দিন৷’
সে জিনিসগুলো হাজির হওয়ার পর ভ্রূণটাকে বরফপূর্ণ সেই পাত্রে ভরে রাজা সইকিয়ার বাড়ি ছাড়লাম আমি৷ বাইরে বেরিয়েই দিল্লি এইমস-এর রেডিওলজি বিভাগের প্রধান বন্ধুবর ডক্টর নাইয়ারকে মোবাইলে ফোন করলাম৷ সব শোনার পর তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তুমি আমাকে ওটা আজকের ফ্লাইটেই পাঠিয়ে দাও৷ আমি পরীক্ষার ব্যবস্থা করছি৷’ সৌভাগ্যক্রমে ঢাল থেকে নীচে নেমে শিলং যাওয়ার ডাকগাড়িটি পেয়ে গেলাম৷ পোস্টমাস্টার, চালক, সবাই আমার পূর্বপরিচিত৷ অসুবিধার ব্যাপার নেই৷ আমি চড়ে বসলাম ডাক বিভাগের জিপে৷
বেলা দুটো নাগাদ শিলং পৌঁছোলাম৷ শিলং-এর পুলিশ বাজার এলাকায় আমার পরিচিত একটা প্যাথলজি সেন্টার আছে৷ তাঁর মালিক মিস্টার বর্মনের মাধ্যমে ভ্রূণটাকে গুয়াহাটি থেকে দিল্লি পাঠাবার ব্যবস্থা করলাম সন্ধ্যার ফ্লাইটে৷ আমার সামনেই সেটা নিয়ে একজন রওনা হল গুয়াহাটি যাওয়ার জন্য৷ শিলং-এর কাজ সেরে সেই ডাকগাড়িতেই আমি আবার সূর্য ডোবার কিছু আগে ফিরলাম এখানে৷ গাড়ি থেকে নেমে আমার ডিসপেনসারির দিকে এগোচ্ছি, হঠাৎ আমার দেখা হয়ে গেল রাজা সইকিয়ার ল্যান্ডলর্ড মিস্টার ক্যালিপ্ঢার সঙ্গে৷ কুশল বিনিময়ের পর তিনি আমাকে বললেন, ‘আজ দেখলাম আপনি আমার বাড়ি গিয়েছিলেন?’
আমি তাঁকে ব্যাপারটা মোটামুটি বলার পর তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমার ভাড়াটিয়া বলে বলছি না, সত্যিই এত নির্বিবাদ ভালো ফ্যামিলি দেখা যায় না৷ আমার বাড়িটা তো কার্যত ওরাই দেখাশোনা করে৷ ব্যাপারটা খুব দুর্ভাগ্যজনক৷ তা আপনি এখন কোথা থেকে ফিরছেন?’
আমি কোথায় কী কারণে গিয়েছিলাম তা জানবার পর মিস্টার ক্যালিপ্ঢা আমাকে বললেন, ‘আপনার বাড়িতে তো একজন বাঙালি প্রজাপতি শিকারি ভদ্রলোক অতিথি হয়েছেন৷ আজ তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল আমার৷’
আমি জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, এসেছেন৷ ভদ্রলোক বেশ ভালো৷ কয়েক বছর ধরে প্রজাপতি শিকার করতে আসছেন এখানে৷’
মিস্টার ক্যালিপ্ঢা এরপর বিদায় নিয়ে এগোলেন নিজের বাড়ির উদ্দেশে, আর আমি রওনা হলাম আমার ডিসপেন্সারির দিকে৷ সকালবেলা আজ বসতে পারিনি বলে রোগীদের বেশ ভিড় হয়েছিল৷ তাদের দেখতে দেখতে রাত আটটা বেজে গেল৷
এখানে রাত আটটা মানে বেশ রাত৷ কর্মব্যস্ত দিনের শেষে রাত ন’টা নাগাদ বাড়ি ফিরে খাওয়া সেরে এই ডায়েরি লিখতে বসেছিলাম৷ এখন রাত প্রায় দশটা৷ প্রজাপতি-শিকারি বাঙালি ভদ্রলোকের কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছি না৷ হয়তো তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন৷ মাঝে মাঝেই আমার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে সেই ভ্রূণটা৷ দিল্লি থেকে ওভার ফোনে পরীক্ষার রিপোর্টটা সম্ভবত আগামিকাল রাত বা পরশুর মধ্যেই এসে যাবে৷ ডক্টর নাইয়ার সে আশ্বাসই আমাকে দিয়েছন৷ ভ্রূণটা দেখার পর থেকেই একটা উদ্ভট চিন্তা উঁকি দিচ্ছে আমার মনে৷ দেখা যাক রিপোর্টটা কী আসে!
এই দিনলিপি লেখা শেষ হলে রাজা সইকিয়ার দেওয়া মীনাক্ষীর ডায়েরিটা নিয়ে বসব৷ সম্ভব হলে যেদিন যেদিন তার মিসক্যারেজ হয়েছে তার আগের দিনের বা মিসক্যারেজের দিনের ঘটনা, যদি পরবর্তীকালে লেখা হয়ে থাকে তা আমার খাতায় নোট করে নেব৷ হয়তো তা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে কিছু পাওয়া যেতে পারে৷
মিসেস মীনাক্ষী সইকিয়ার রোজনামচা
(তার ডায়েরি থেকে ডক্টর শেফিল্ডের খাতায় তোলা)
১৮ই সেপ্ঢেম্বর
আজ ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভেঙেছে আমার৷ চোখ মেলতেই খোলা জানালা দিয়ে ওপাশের পাহাড়টা চোখে পড়ল৷ নতুন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের ঢালে৷ অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য! রাজার ঘুম তখনও ভাঙেনি৷ আমি ধাক্কা দিয়ে তাঁর ঘুম ভাঙাবার পর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল৷ গুয়াহাটি শহর ছেড়ে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গাতে আসার পর একটা চাপা অবসাদ কাজ করছিল তাঁর মনে৷ ক’দিন আগে পর্যন্ত সে বলছিল যে চাকরি ছেড়ে আবার গুয়াহাটি ফিরে যাবে৷ কিন্তু ক’দিন আগে যখন ডক্টর শেফিল্ড আমি ‘মা’ হতে চলেছি, সে-খবর দিলেন, তারপর থেকে রাজার অবসাদ ভাবটা কেটে গিয়েছে৷ ও এখন খুশিতে চনমনে৷
ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণ পর রাজা আমাকে মনে করাল যে আমাদের ল্যান্ডলর্ড মিস্টার ক্যালিপ্ঢা মেক্সিকো থেকে গতকাল সন্ধ্যায় ফিরে এসেছেন৷ আমার সঙ্গে তাঁর দেখা না হলেও, তিনি রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন৷ সন্ধ্যায় তিনি আমাদের দুজনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আকাশ দেখার জন্য৷ মিস্টার ক্যালিপ্ঢা খুব নম্র, ভদ্র, বিনয়ী মানুষ৷ মহিলাদের দেখলে অনেক পুরুষের চোখে যে কামনার ভাব খেলা করে সেটা তাঁর মধ্যে একদমই নেই৷ বরং চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি খেলা করে৷ যেন মনে হয় তিনি অনেক দূরের দিকে তাকিয়ে সব সময় কিছু খুঁজছেন৷ হয়তো টেলিস্কোপে চোখ রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার কারণে তাঁর চোখের দৃষ্টি এমন হয়েছে৷ ভদ্রলোক যখন এখানে এসে থাকেন তখনও তাঁর উপস্থিতি প্রায় বোঝাই যায় না৷ আকাশের দিকে তাকিয়ে রাত কাটান৷ দিনের বেলা ঘুমান৷ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নীচে নামেন না৷ নীচে নামলেও যাতে আমাদের কোনও অসুবিধা না হয়, সেজন্য বাড়িতে ঢোকা-বেরোবার সময় বাড়ির পেছনের দরজাটা ব্যবহার করেন৷ তিনি আমাকে সিস্টার বলে সম্বোধন করেন৷
আটটা নাগাদ আমার ঘরের কাজের সহকারী স্থানীয় মহিলা টুসিং এল৷ তার সঙ্গে ঘরের কাজ, রান্না-বান্না এসব করতেই বেলা দশটা বেজে গেল৷ এগারোটার সময় রাজা খাওয়া সেরে সুকলে চলে গেল৷ বারোটা নাগাদ ক্যুরিয়ার কোম্পানির লোক এল পার্সেল নিয়ে৷ এখানে বইপত্র পাওয়া যায় না বলে রাজা গুয়াহাটি থেকে প্রায়ই বই আনায়৷ পার্সেলটা রিসিভ করলাম৷ একটা নাগাদ খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম৷ সাড়ে চারটেতে ঘুম থেকে ওঠার কিছু সময় পরই রাজা এল৷ বিকাল আর সন্ধ্যাটা গল্প করেই কাটালাম দুজন৷ তারপর টুসিংকে ছুটি দিয়ে আমরা ওপরে উঠলাম আকাশ দেখার জন্য৷
মিস্টার ক্যাপিল্টা আমাদের প্রতীক্ষাতেই ছিলেন৷ আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর আকাশ দেখার ঘরে৷ কতরকম যন্ত্র সে-ঘরে ঠিক যেন এরোপ্লেনের কক্পিট৷ বাড়ির বাইরে থেকে এ-ঘরটার আকার ঠিক বোঝা যায় না৷ ঘরের ছাঁদটা ইগলু আকৃতির৷ আর সে-ছাদ ফুঁড়ে ইলেকট্রনিক্স টেলিস্কোপটা বাইরে বেরিয়ে আছে৷
টেলিস্কোপে চোখ রাখতেই আকাশটা যেন পৃথিবীতে নেমে এল৷ কত উজ্জ্বল নক্ষত্র, গ্রহ! টেলিস্কোপে যে ছবি দেখা যাচ্ছে তা আবার ধরা পড়ছে ঘরের মধ্যে রাখা একটা কম্পিউটার স্ক্রিনে৷ সেটা দেখে ক্যালিপ্ঢা বিবরণ দিয়ে যেতে লাগলেন প্রতিটা ব্যাপারের৷ কোনটি আসলে নক্ষত্র, কোনটা নক্ষত্র নয়, গ্রহ সূর্যের আলো পড়ে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, কোনটি আসলে মৃত নক্ষত্র এসব৷ পর্যায়ক্রমে আমি আর রাজা দেখলাম সেগুলো৷ ঘণ্টাখানেক পর ওই ছাদের ঘর ছেড়ে আমরা যখন নীচে নেমে এলাম তখন আমরা সত্যিই অভিভূত! আজকের দিনটা খুব সুন্দর কাটল৷
২১শে ফেব্রুয়ারি
আজ ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি৷ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস৷ গুয়াহাটিতে একটা অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য সকালবেলাই রাজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল৷ গতকাল আমাকে রাজা ডক্টর শেফিল্ডের চেম্বার দেখাতে নিয়ে গেছিল৷ তিনি বললেন, আমার সব কিছু স্বাভাবিক-ই আছে৷ গত সেপ্ঢেম্বর আমার মিসক্যারেজ হবার পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম৷ শেফিল্ড অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, যে-ভেঙে পড়ার কিছু নেই৷ প্রথমবার এমন ঘটনা নাকি অনেকের ক্ষেত্রেই হয়৷ এখন আমার মাত্র দু মাস চলছে৷ আশাকরি এবার আমার তেমন কিছু ঘটবে না৷
রাজা চলে যাবার পর দুপুর পর্যন্ত ঘরের কাজ করলাম৷ তারপর বই নিয়ে পড়তে বসলাম৷ রাজাই বইগুলো আনিয়েছে৷ ফেয়ারি টেল্স৷ ও কোথায় শুনেছে যে এ ধরনের বই গর্ভাবস্থায় পড়লে মা-র মন ভালো থাকে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে নাকি গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশও ভালো হয়৷ সত্যি মিথ্যে যাই হোক বইগুলো পড়তে আমার বেশ ভালো লাগল৷ দুপুরও কেটে গেল৷
বিকালবেলা বাগানে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ ‘হাই সিস্টার’ সম্বোধন শুনে দেখি মিস্টার ক্যালিপ্ঢা৷ তাঁর হাতে একটা যন্ত্র৷ বিপ্ বিপ্ শব্দ হচ্ছে তাতে৷ ক্যালিপ্ঢা ক’দিন হল আবার ফিরে এসেছেন৷ কিন্তু সামনা সামনি তার সঙ্গে আমার এই প্রথম সাক্ষাৎ৷ বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা হল আমাদের দুজনের মধ্যে৷ অক্টোবরে চলে গেছিলেন তিনি৷ ক্যালিপ্ঢা জানতে চাইলেন নতুন কোনও মোনার্ক প্রজাপতির দল এসেছে কিনা৷ আমি জবাব দিলাম যে ব্যাপারটা আমি খেয়াল করিনি৷ ক্যালিপ্ঢা এরপর বাগান ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা ফিরে এল৷ তাঁর মুখে শুনলাম তাদের অনুষ্ঠান খুব ভালো হয়েছে৷ প্রতিদিনের মতোই এদিন সন্ধ্যা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আমরা দুজন গল্প করে আর রেডিওতে গান শুনে কাটিয়েছিলাম৷ এখন রাত সাড়ে ন’টা বাজে৷ সারাদিনের জার্নির ধকল কাটাতে রাজা খাওয়া সেরেই শুয়ে পড়েছে৷ আর আমি আমার ডায়েরি নিয়ে বসেছি৷ একটা দিন নিস্তরঙ্গ অথচ বেশ শান্তিপূর্ণভাবে কেটে গেল৷
৩১ জুলাই
সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই আজকাল আমার বড় ভয় করে৷ গত দুবার আমার মিসক্যারেজ হয়েছিল রাতের ঘুমের মধ্যে৷ ঘুম ভাঙতেই দেখেছি রক্তে ভিজে গেছে সব কিছু৷ আজ সুকল ছুটি ছিল রাজার৷ বিকেলবেলা ডাক্তার শেফিল্ডকে সে বাড়ি এনেছিল৷ তিনি আমাকে পরীক্ষা করে বললেন, সব স্বাভাবিক আছে৷ তিনি তা বললেও আমার ভয় কাটছে না৷
দু-দুবারের অভিজ্ঞতা আমাকে আতঙ্কিত করে রেখেছে৷ আমাকে মুখে কিছু না বললেও রাজার মুখ দেখে বুঝতে পারি সে-ও খুব টেনশনে আছে৷ এখন আমার গর্ভস্থ সন্তানের বয়স চার মাস৷ শেফিল্ড আজ এ-ও বলে গেলেন, এবার আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে না বলেই মনে হয়৷ তবুও রাত নামতেই আমার ভয় করতে শুরু করেছে৷ শেফিল্ডের কথাই যেন সত্যি হয়৷ আমি যেন সত্যিই সুন্দর একটা সকাল দেখতে পারি কাল৷
ডাক্তার চলে যাবার পর আমি আর রাজা বাইরের বারান্দায় বসে রইলাম৷ সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণ পর ল্যান্ডলর্ড ক্যালিপ্ঢাকে বাড়ি ফিরতে দেখলাম৷ গতকালই তিন মাস পর তিনি ফিরেছেন৷ তিন মাসের ভাড়া তাঁকে দেওয়া হয়নি৷ কাল সকালে সবকিছু ঠিক থাকলে ভাড়াটা তাঁকে দিয়ে দেব৷ আজকাল ডাক্তার শেফিল্ডের পরামর্শমতো আমরা খাওয়া সেরে রাত ন’টার মধ্যে শুয়ে পড়ছি৷ যথাসম্ভব বিশ্রাম নিচ্ছি আমি৷ জল তোলা বা সিঁড়ি ভাঙার মতো কোনও কাজ করছি না তাঁর পরামর্শে৷ যেভাবেই হোক আমার গর্ভস্থ সন্তানকে এবার বাঁচাতেই হবে৷ রাত আটটাতে খাওয়া সাড়া হয়ে গেছে আমাদের৷ অভ্যাসবশত কয়েক লাইন ডায়েরি লিখলাম৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সুন্দর সকালের প্রতীক্ষায় ঘুমাতে যাব৷ মঙ্গলময় ঈশ্বর আমাদের সহায় হন৷
নৃসিংহ চৌধুরীর দিনলিপি
২রা আগস্ট, পশ্চিম গারো পাহাড়,
মেঘালয়,
আজ ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে ডাক্তার শেফিল্ডের বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছিলাম৷ ঢাল বেয়ে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গলে যখন উঠে এলাম তখন ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ছে আনাচে কানাচে৷ প্রথমেই আমার দেখা হল এক ঝাঁক ‘খাসি কমন র্যাঙনের’ সঙ্গে৷ কালো রঙের এ প্রজাপতির দুপাশের ডানার নীচের অংশে সাদা ছিটছিট দাগ আছে৷ দেখতে ভারী সুন্দর৷ আমার জালে আটকে গেল একটা৷ আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ধরে ফেললাম ডানায় নীল রংলা বেশ বড়সড় একটা ‘চাইনিজ পিকক’ প্রজাপতি৷
ভাগ্য আজ বেশ সুপ্রসন্ন বুঝতে পারলাম৷ আমি ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম আমার জাল নিয়ে৷ কখনও পাহাড়ের ঢালে, কখনও আবার তার মাথার ঝোপঝাড়ে৷ বেশ কয়েক জায়গাতে সাদা রঙের ‘অ্যালব্যাট্রম’ প্রজাপতি দেখলাম৷ কিন্তু তাদের ছাড় দিলাম৷ কারণ গতবার ও-প্রজাপতি আমি বেশ ক’টা সংগ্রহ করেছি৷ ঘুরতে ঘুরতে আমার চোখে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গেল ‘পেন্টেড লেডি’৷ গতবার এ-প্রজাপতি একবার দেখতে পেলেও ধরতে পারিনি৷ সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে গেছিল সেটা৷
এ পাহাড়ে যেসব প্রজাপতি মেলে তাদের মধ্যে ‘পেন্টেড লেডি’কে সবথেকে সুন্দর বললেও অত্যুক্তি হয় না৷ হলুদ, আর নীল-সাদা মেশানো আশ্চর্য সুন্দর তার রং৷ আমি সন্তর্পণে এগোলাম তার দিকে৷ জাল চালালাম ঠিকই কিন্তু প্রথমবার ব্যর্থ হলাম৷ সে উড়ে গিয়ে কিছুটা তফাতে বসল৷ আবার আমি সেখানে গিয়ে জাল ছুড়লাম৷ কিন্তু সেবারও ব্যর্থ হলাম৷
প্রজাপতিটা বেশ কিছুক্ষণ খেলাল আমাকে৷ তার পিছু পিছু বেশ কিছুক্ষণ ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াল৷ কিন্তু এক-একটা দিন বিধাতা এক-একজনের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখেন৷ শেষ পর্যন্ত আমার জালে ধরা পড়ে গেল ‘পেন্টেড লেডি’৷ আমার সেই মোনার্ক প্রজাপতি সংক্রান্ত সংস্কারের কথা আবার মাথায় এল৷ ভাগ্যিস মোনার্কটা মিস্টার ক্যালিপ্ঢাকে দিইনি৷ ওই তো আমার জন্য এই ‘পেন্টেড লেডি’ ধরার সৌভাগ্য বয়ে আনল৷
ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেছে৷ তাছাড়া প্রজাপতির পিছনে ছোটাছুটি করতে গিয়ে বেশ হাঁফ ধরে গেছিল আমার৷ কাজেই এরপর ‘পেন্টেড লেডি’কে একটা জারে পুরে ফেরার পথ ধরলাম৷
সোজা ঘরে ফিরে এসেছিলাম৷ বেলা এগারোটা নাগাদ দরজা ধাক্কাবার শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি সেই মিস্টার ক্যালিপ্ঢা এসে হাজির হয়েছেন৷ একটু বিস্মিত হলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে তাঁকে ভিতরে আমন্ত্রণ জানালাম৷ ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘গতকাল পরিচিত হলাম, তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করি৷ তা কী কী প্রজাপতি ধরলেন?’
আমি তার প্রশ্ণ শুনে হেসে টেবিলের ওপর রাখা সার সার কাচের জারগুলো দেখিয়ে দিলাম৷ সেদিকে তাকিয়ে ক্যালিপ্ঢা বললেন, ‘বাহ্! পেন্টেড লেডি দেখছি!’ কথাটা তিনি বললেও তাঁর চোখ আটকে গেল সেই মোনার্কটার দিকে৷ তিনি চুপ করে চেয়ে রইলেন সেদিকে৷
আমি আলোচনায় ফিরে আসার জন্য বললাম, ‘আমি মেক্সিকো কোনওদিন না-গেলেও আপনার সে-দেশের কথা অনেক পড়েছি৷ অ্যাজটেক সভ্যতা তো সেখানেই গড়ে উঠেছিল৷ অত হাজার বছর আগে অ্যাজটেকরা কীভাবে পিরামিডগুলো তৈরি করেছিলেন, স্থাপত্যবিদ্যায় এত পারদর্শী হয়েছিলেন তা ভাবতেই আশ্চর্য লাগে!’
আমার কথা শুনে ক্যালিপ্ঢা যেন সম্বিত ফিরে পেলেন৷ মৃদু চমকে উঠে তিনি এরপর বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক-ই বলেছেন৷ সভ্যতার সেই উষা লগ্ণে আমাদের দেশের মানুষেরা অদ্ভুত সব স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন৷ গঠনশৈলীর দিক থেকে অনেক বেশি আধুনিক ছিল অ্যাজটেক পিরামিড মন্দিরগুলো৷ তা বানাবার জন্য নিখুঁত জ্যামিতিক জ্ঞানের প্রয়োজন হত৷ শুধু তাই নয়, নির্ভুল জ্যোর্তিবিজ্ঞানও তাদের জানা ছিল৷ আপনি নিশ্চয়ই পাথরের তৈরি অ্যাজটেক ক্যালেন্ডারের বিখ্যাত ছবিটা দেখেছেন৷ কীভাবে পাঁচ হাজার বছরের দিনপঞ্জীর হিসাব, গ্রহ নক্ষত্রের পূর্ণাঙ্গ অবস্থান সে ক্যালেন্ডারে দেখিয়েছিলেন তাঁরা! বেশ কিছু এমন মন্দির সেখানে আছে যার গ্রানাইট পাথরের জোড়গুলো তাঁরা আটকেছিলেন পাথর গলিয়ে৷ এ-কাজে যে উত্তাপের প্রয়োজন হয় তা এখনও আধুনিক ল্যাবরেটরি ছাড়া কোথাও করা সম্ভব নয়৷’
আমি আমার পাণ্ডিত্য ফলাবার জন্য এবার বললাম, ‘অনেকে তো বলেন এসব নাকি গ্রহান্তরের মানুষদের কাজ৷ পৃথিবীর মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য একদিন তারা পৃথিবীতে নেমে এসেছিল৷ এসব তাদেরই কাজের সাক্ষ্য৷ দানিকেন নামে এক ভদ্রলোক এর স্বপক্ষে যুক্তিও খাড়া করেছেন তাঁর বইয়ে৷ প্রাচীন অ্যাজটেক পুরোহিতরা পিরামিড শীর্ষে যে নরবলি দিত, তা নাকি আসলে উৎসর্গ করা হত এলিয়ানদেরকেই৷
আমার কথা শুনে ক্যালিপ্ঢা বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা মানমন্দিরের চিত্রলিপিতে এর উল্লেখ আছে৷ যেহেতু মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আমি কিছুটা চর্চা করি তাই এ ব্যাপারে আমারও আগ্রহ আছে৷’
বেশ কিছুটা সময় এসব বিষয় নিয়ে আমরা দুজন আলোচনা করলাম৷ তারপর মিস্টার ক্যালিপ্ঢা একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘কাল আমি যে অনুরোধটা করেছিলাম, সেটা আজও একবার করছি৷ মোনার্কটা আমাকে দিন৷ তার বিনিময়ে আমি এটা আপনাকে দেব৷’
এই বলে তিনি তার পকেট থেকে একটা সেলোফেন পেপারের পাউচ বার করে টেবিলের ওপর রাখলেন৷ পাউচের মধ্যে রাখা আছে একটা প্রজাপতি৷ সেটা দেখে চিনতে পেরে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম৷ দুষ্প্রাপ্য একটা ‘রিগাল ব্লু বেগম’ প্রজাপতি! সেলোফেন পেপারের মধ্যে থেকেও যেন মৃত প্রজাপতির ডানার নীচের অংশ থেকে উজ্জ্বল নীলাভ দ্যুতি ছড়াচ্ছে! এটাও সংরক্ষণ তালিকার প্রথম সারির অন্তর্গত৷ এখন এ-প্রজাপতি ধরা ও মারা নিষেধ৷
আমি বিস্মিত ভাবে চেয়ে রইলাম ক্যালিপ্ঢার মুখের দিকে৷ তিনি আমাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, ‘ভয় নেই৷ এটা আমি এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে কিনেছি৷ সে এই মৃত প্রজাপতিটা বহু বছর আগে কিনেছিল বনদপ্তর থেকে৷ সে সব কাগজপত্রও আমি আপনাকে দেব৷ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন৷’
আমি তাঁকে কী জবাব দেব, তা বুঝতে পারলাম না৷ আমি একবার তাকালাম আমার মোনার্কের দিকে, আর একবার ব্লু বেগমের দিকে৷ মোনার্কটাকে নিয়ে আমার সংস্কার থাকতে পারে৷ কিন্তু সামান্য কেটা মোনার্কের বদলে ‘ব্লু বেগম?’ আমি প্রশ্ণটা করেই ফেললাম তাঁকে৷
তিনি হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, মোনার্কের দাম সামান্য আর ব্লু বেগমের দাম কয়েক লক্ষ টাকা৷ কিন্তু আমার এক অভ্যাস বা বদভ্যাস আছে৷ যে জিনিস একবার আমার পছন্দ হয় তার জন্য আমি যে-কোনও দাম দিতে রাজি থাকি!’
তাঁর কথা শুনে কী করব ভাবতে লাগলাম৷ ক্যালিপ্ঢা স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন বোতল-বন্দি মোনার্কটার দিকে৷ হঠাৎ আমার মাথায় এল, কিছু সিদ্ধান্ত নেবার আগে একবার ডাক্তার শেফিল্ডের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো৷ আমি তো তাঁর বাড়িতেই উঠেছি৷ মিস্টার ক্যালিপ্ঢা এক অর্থে আমার কাছে অজ্ঞাতকুলশীল৷ ব্লু বেগমটা নিয়ে পরে যদি কোনও বিপদ হয়! ব্যাপারটা মাথায় আসতেই আমি ক্যালিপ্ঢাকে বললাম, ‘ঠিক আছে, ব্যাপারটা নিয়ে অন্তত একটা দিন ভাবার সময় দিন৷’
ক্যালিপ্ঢা হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে আমি আবার নয় কাল আসব৷ তবে ‘ব্লু বেকম’ কোনও সংগ্রাহকের কাছে থাকলে সে একটা আলাদা মর্যাদা পায় তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন?’ এই বলে তিনি ব্লু বেগমটাকে পকেটে পুরে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন৷
আমি আর সারাদিন বাড়ি থেকে বেরোলাম না৷ ক্যালিপ্ঢার ব্যাপারটাই সারাদিন মনের মধ্যে খেলা করে চলল৷ দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল, তারপর এক সময় গারো পাহাড়ের মাথায় সূর্য ডুবে গেল৷
সন্ধ্যার বেশ কিছু পরে ডক্টর শেফিল্ড আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন৷ আমি তাঁকে মিস্টার ক্যালিপ্ঢার ব্যাপারটা বললাম৷ শুনে হয়তো তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু বাড়ির অন্যদিক থেকে কুকুরের ডাক ভেসে এল৷ তা শুনে তিনি বললেন, ‘আমি এখন যাই৷ আমি বাড়ি ফিরেছি তা আমার গ্রেট ডেন কুকুরটা বুঝতে পেরেছে৷ ওর খিদে পেয়েছে৷ আমাকে ডাকছে৷ একটু ভেবে মিস্টার ক্যালিপ্ঢার প্রস্তাবটা নিয়ে মতামত জানাব৷’ এই বলে তিনি ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন৷ আমিও খাওয়া সেরে দিনলিপি লিখতে বসেছি৷ আবার দরজায় টোকা দেবার শব্দ! মনে হয় কেউ ডাকছে...
ডক্টর শেফিল্ডের ডায়েরি :
২রা আগস্ট, টিম্বাটু ভিলেজ,
ওয়েস্ট গারো হিলস্, মেঘালয়৷
আজ বেশ সকাল-সকালই বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলাম আমার চেম্বারে যাবার জন্য৷ আমার অতিথি বাঙালি ভদ্রলোককে আমারও অনেক আগে সূর্যোদয়ের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রজাপতি ধরার জাল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে দেখেছি৷ তাঁর সঙ্গে ভালো করে কথা বলার সময় সুযোগ পাচ্ছি না৷ জানি না তিনি কী ভাবছেন এ কারণে৷
ডিসপেন্সারিতে আজ বেশ ভিড় ছিল৷ তাদের দেখা শেষ করার পর এক পেশেন্টের বাড়ি থেকে কল আসায় যেতে হল সেখানে৷ কাজেই আজ দুপুরে বাড়ি ফেরা হল না৷ ভাবলাম একেবারে বিকেলের চেম্বার সেরে বাড়ি ফিরব৷ সেইমতো আবার চেম্বারেই গেলাম৷ তবে বিকেলের দু-তিনজন ছাড়া রোগী ছিল না৷
সন্ধ্যাবেলা চেম্বার বন্ধ করে বাড়ি ফিরে দেখা করতে গেলাম বাঙালি প্রজাপতি-শিকারির ঘরে৷ কুশল বিনিময়ের পর শুনলাম আমার পেশেন্ট মীনাক্ষী সইকিয়ার ল্যান্ডলর্ড নাকি এ-বাড়িতে এসেছিলেন৷ প্রজাপতি শিকারির মোনার্কটার বিনিময়ে তিনি নাকি কয়েক লক্ষ টাকা মূল্যের দুষ্প্রাপ্য একটা ‘ব্লু বেগম’ দিতে চেয়েছেন তাঁকে৷
ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত! ঘরে ফিরে এলাম এরপর আমার কুকুরটার ডাকে৷ দুপুরে তাঁকে খেতে দিতে পারিনি৷ তার খাবারের বন্দোবস্ত করে নিজেও খাওয়া সেরে বাইরের ব্যালকনিতে একটু বসেছি৷ ঠিক সেইসময় দিল্লি থেকে ডক্টর নাইয়ারের ফোনটা এল মোবাইলে৷ ভ্রূণটার অ্যানালিসিস করা হয়েছে৷ দু-তিনদিনের মধ্যেই রিপোর্ট এসে যাবে৷
তবে তিনি মৌখিকভাবে সে-রিপোর্ট সম্বন্ধে যা জানালেন তাতে আমি চমকে উঠলাম৷ কেন এই ভ্রূণটা দেখে সেই জাপানি ভ্রূণটার কথা মনে পড়ে গেছিল সেটা এবার স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে৷ আমি এরপর আমার ডায়েরিটা এনে এতে মীনাক্ষীর রোজনামচা থেকে টোকা অংশগুলো দেখতে লাগলাম৷
তেমন কোনও অদ্ভুত ব্যাপার নেই তাতে৷ পাতা তিনটে বার বার পড়তে পড়তে নানা দিক থেকে তা বিশ্লেষণ করতে করতে শুধু দুটো ঘটনার মিল পেলাম৷ মীনাক্ষীর যে-দুবার মিসক্যারেজ হল তার কাছাকাছি সময় সে দুদিন দুটো পার্সেল রিসিভ করেছিল, আর ওই তৃতীয়বার মিসক্যারেজ হওয়ার আগে ঘটনাচক্রে মিস্টার ক্যালিপ্ঢা বাড়িতে ফিরে এসেছেন৷
ক্যালিপ্ঢার কথা ভাবতেই হঠাৎ আমার মাথায় এল, আচ্ছা, তিনি হঠাৎ ওই মোনার্কটা অত একটা দামি প্রজাপতির বিনিময়ে কিনতে চাচ্ছেন কেন? মোনর্ক তো এখানে প্রচুর পাওয়া যায়! তবে কি ওই প্রজাপতির মধ্যে অন্য কোনও বিশেষত্ব আছে?
ও প্রশ্ণটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে হল, প্রজাপতিটা আর একবার গিয়ে দেখে আসি৷ গেলাম আবার ভদ্রলোকের ঘরে৷ আমার যাওয়াতে ভদ্রলোক একটু অবাকই হলেন৷ আমার ইচ্ছার কথা শুনে তিনি মোনার্কের জারটা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন৷ আমি তাকে জিগ্যেস করলাম, ‘এই প্রজাপতি আর কোথায় কোথায় পাওয়া যায় বলুন তো?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘এদের আদি বাসস্থান উত্তর আমেরিকায়৷ মূলত মেক্সিকো থেকে তারা যাত্রা শুরু করে, তারপর কোস্টারিকা পানামা যোজক ছুঁয়ে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর গা বেয়ে এদিকে লম্বা পাড়ি দেয় তারা৷ আমেরিকা থেকে এশিয়া এসে মোনার্ক ছড়িয়ে পড়ে সিংহলসহ সুমাত্রা, জাভা ইত্যাদি দেশে আর আমাদের, এদিকে ভারত, বাংলাদেশ, এমনকী নেপালেরও কয়েক জায়গাতে৷’
আমি শুনে বললাম, ‘এর মানে তো মিস্টার ক্যালিপ্ঢার নিজের দেশেও মোনার্ক পাওয়া যায়৷’
কাচের জারের মধ্যে চুপচাপ বসে আছে প্রজাপতিটা৷ জারটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেও কিছুই বুঝতে পারলাম না৷ জারটা যখন আবার ফেরত দিতে যাচ্ছি ঠিক তখনই কাকতালীয়ভাবে একটা ঘটনা ঘটল৷ দরজা খোলা পেয়ে আমার কুকুরটা কখন আমার পিছন পিছন এঘরে ঢুকেছে তা আমরা দুজন খেয়াল করিনি৷ হঠাৎ পায়ে একটা মৃদু ধাক্কা অনুভব করলাম, পরে বুঝেছিলাম ব্যাপারটা, আসলে তখন কুকুরটা আমার পায়ে মাথা ঘসতে গেছিল৷ কিন্তু সেই ধাক্কায় আমার হাতে আলগোছে ধরা জারটা পড়ে মাটিতে সঙ্গে সঙ্গে চুরমার হয়ে গেল৷ আর তার থেকে বেরিয়ে মোনার্কটা গিয়ে উড়ে বসল ঘরের কোণে৷
প্রজাপতি-শিকারি তাঁর জালটা হাতে উঠিয়ে নিলেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে আমার কুকুরটা পৌঁছে গেছে ঘরের সেই কোণে৷ প্রজাপতিটার দিকে তাকিয়ে গর গর করছে কুকুরটা৷ তাই দেখে থমকে গেলেন ভদ্রলোক৷ কুকুরটা প্রজাপতিটার ওপর থাবা মারার আগেই আমি তাড়াতাড়ি সেখানে ছুটে গিয়ে একধাক্কায় কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে খপ করে ধরে ফেললাম প্রজাপতিটাকে৷
তারপরই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল আমার৷ যেন হাতে ছেঁকা লাগছে, এমন গরম মোনোর্কের দেহ৷ তাছাড়া অদ্ভুত এক ধাতব কাঠিন্য প্রজাপতির পাখায়৷ কোনও কোমলতা নেই তার স্পর্শে৷
এ কীভাবে সম্ভব! মুঠো থেকে খুব সাবধানে প্রজাপতিটার ডানা ধরে বের করলাম৷ আলোর নীচে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিস্ময়ে চমকে উঠলাম৷ এটা একটা যান্ত্রিক প্রজাপতি! কিন্তু এত নিখুঁতভাবে তাকে বানানো হয়েছে যে, হাতে না নিলে বোঝাই যাবে না সেটা আসল না নকল৷ পাখনা দুটো অজানা কোনও ধাতু দিয়ে বানানো৷ পাখাদুটোর নীচে যেগুলোকে প্রকৃতির কারুকাজ বলে মনে হচ্ছিল তা আসলে সূক্ষ্ম ডায়াগ্রাম৷ তার মূল দেহের কোথাও হয়তো ব্যাটারি ধরনের কিছু লুকানো আছে৷ আর শুঁড় দুটো সম্ভবত অ্যান্টেনা৷ ধাতব তার দিয়ে সে-দুটো তৈরি৷
দেখা শেষ হলে সেটা তুলে দিলাম সেই বাঙালি ভদ্রলোকের হাতে৷ তিনি ততক্ষণে হয়তো কিছু অনুমান করে নিয়েছিলেন৷ প্রজাপতিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বিস্মিতভাবে তিনি বললেন, ‘সম্ভবত এটার মধ্যে ব্যাটারি আছে৷ সেটার আয়ু কমে এসেছে বলে এর ধাতব দেহ গরম হয়ে গেছে৷ টর্চের ক্ষেত্রে যেমন হয়৷ আর সেজন্যই আমি যখন প্রজাপতিটাকে ধরে ছিলাম তখন অন্য প্রজাপতিগুলো উড়ে গেলেও এটা ওড়েনি৷ ব্যাটারির চার্জ কমে যাওয়াতে এর গতি শ্লথ হয়ে এসেছে৷’
এরপর তিনি বললেন, ‘ক্যালিপ্ঢার আগ্রহের কারণ এবার বুঝতে পারলাম৷ নিশ্চয়ই তিনি এ-প্রজাপতির ব্যাপারে বিশেষভাবে অবগত৷ আমার সঙ্গে তাঁর সঙ্গে যখন প্রথম দেখা হয় তখন তাঁর হাতে একটা ছোট যন্ত্র ছিল৷ বিপ্ বিপ্ শব্দ হচ্ছিল তা থেকে৷ আমি তাকে যন্ত্রটা সম্বন্ধে প্রশ্ণ করলে তিনি সেটাকে তাঁর টেলিস্কোপের যন্ত্রাংশ বলেছিলেন৷ সম্ভবত সেটা কোনও ট্যাক্সমিটার রিসিভার বা ডিটেক্টর ছিল, তার মাধ্যমেই হয়তো তিনি প্রজাপতির অবস্থান বুঝতে পেরে আমার কাছে পৌঁছে গেছিলেন৷’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, এমনটা হতে পারে৷’ কারণ, আমার মনে পড়ে গেল মীনাক্ষী তাঁর ডায়েরির এক জায়গাতে লিখেছে বাগানে তার সঙ্গে ক্যালিপ্ঢার সাক্ষাতের সময় ক্যালিপ্ঢার হাতে এমন একটা যন্ত্র দেখেছিল৷ আর ক্যালিপ্ঢা মীনাক্ষীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে মোনার্ক প্রজাপতির কোনও ঝাঁক সেখানে এসেছে কিনা৷
কিছুক্ষণ আমরা দুজন চুপচাপ ভাবতে লাগলাম পুরো ব্যাপারটা নিয়ে৷ আমার সবকিছু দেখে শুনে কেন জানি ধারণা হতে লাগল, যে মীনাক্ষীর মিসক্যারেজের সঙ্গে এসব ঘটনার কোনও সম্পর্ক আছে৷ যা লুকিয়ে আছে মিস্টার ক্যালিপ্ঢার কাছে৷ বাঙালি ভদ্রলোক এরপর জানতে চাইলেন, প্রজাপতিটা কীভাবে মিস্টার ক্যালিপ্ঢাকে ফিরিয়ে দেবে?
আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম, ‘ওঁকে বলবেন যে, আপনি ব্যাপারটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না৷ আর দুটো দিন সময় লাগবে সিদ্ধান্ত নিতে৷ প্রজাপতিটা আমাকে দিন৷ আমি ওটাকেও আরও খুঁটিয়ে দেখব৷’
ভদ্রলোক প্রজাপতি আমার হাতে তুলে দিলেন৷ সেটা নিয়ে কুকুরটাকে সঙ্গে করে আমি সেঘর থেকে বেরিয়ে এলাম৷
নৃসিংহ চৌধুরীর দিনলিপি (খণ্ডিতাংশ)৷
৪ আগস্ট, পশ্চিম গারো পাহাড়,
মেঘালয়৷
২ তারিখে ওই যান্ত্রিক প্রজাপতির ঘটনা দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলাম৷ কিন্তু তখনও আমার জানা ছিল না, যে-বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে তার তুলনায় এটা কণা মাত্রও নয়৷ সে-প্রসঙ্গে পরে আসছি৷ যাই হোক, সেদিন রাতে ডক্টর শেফিল্ড যন্ত্র-প্রজাপতিটা নিয়ে চলে যাওয়ার পর সারারাত আর ঘুম এল না আমার৷ এই প্রথম মাঝরাতে কুকুরটাকে বেশ কয়েকবার ডাকতে শুনলাম৷ ঘুম এল শেষ রাতে৷
প্রজাপতির খোঁজে আর কাকভোরে বেরোনো হল না৷ ঘুম ভাঙল বেলা আটটা নাগাদ৷ কিছুক্ষণ পরই শেফিল্ড এলেন৷ তিনি বললেন, কিছু দূরে একটা গ্রামে তিনি পেশেন্ট দেখতে যাবেন৷ পেশেন্ট পার্টি গাড়ি নিয়ে এসেছে৷ মূমুর্ষ রোগী, যেতেই হবে৷ ফিরতে একটু বেলা হবে৷ তারপর তিনি মিস্টার ক্যালিপ্ঢা এলে কী বলতে হবে সে-কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷
তিনি চলে যাবার পর আমি তখন স্নান খাওয়া সেরে বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছি৷ ঠিক সেই সময়েই কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি মিস্টার ক্যালিপ্ঢা এসে উপস্থিত হয়েছেন৷ স্মিত হেসে তিনি বললেন, ‘সুপ্রভাত৷ আজ ভোরে প্রজাপতি ধরতে বেরোননি?’
একটু বিস্মিত হলাম তাঁর কথা শুনে৷ তবে কি তিনি খেয়াল করেছিলেন যে আগের দিন, ভোরে আমি প্রজাপতি ধরতে বেড়িয়েছিলাম? আমি জবাব দিলাম, ‘এখন বেরোব৷ তা আপনি এখন?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘আসলে মোনার্কটার ব্যাপারে আপনি কী সিদ্ধান্ত নিলেন জানতে এলাম৷’
আমি জবাব দিলাম, ‘আরও কয়েকটা দিন ভেবে নিয়ে তারপর আপনাকে জানিয়ে দেব৷’
তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘ঠিক আছে তাই ভাবুন৷ আমি অপেক্ষা করছি৷’ তারপর হেসে বললেন, ‘আপনার জন্য আমার কাছে একটা ভালো খবর আছে৷ পাহাড়ের পশ্চিমের ঢালে যে ছোট্ট ঝরণা আছে, ওই যে যেটার সামনে একটা ছোট্ট ডোবা মতন আছে সেখানে আজ ভোরে এক ঝাঁক ‘গসমার উইন্ড বাটারফ্লাই’ দেখলাম! তাদের সাদা পাখনায় কালো ছোঁপ৷ জায়গাটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন মোজাইক পাথরের টুকরো ছড়িয়ে রেখেছে সে-জায়গাতে৷’
আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ৷ খবরটা আমার কাজে লাগবে৷ মোনার্কটা আমি ওখান থেকেই ধরে ছিলাম৷’
‘আবার দেখা হবে৷’—বলে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন মিস্টার ক্যালিপ্ঢা৷
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি অন্যদিনের মতো প্রজাপতি ধরার সাজসরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম৷
পাহাড়ের ঢালে আমি উঠে এলাম এক সময়৷ চারপাশের ঝোপঝাড়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগোতে লাগলাম প্রজাপতির খোঁজে৷ কিন্তু কী আশ্চর্য, কোনও অজানা কারণে আজ কোথাও একটাও প্রজাপতি! চোখে পড়ছে না৷ এমনকী সাদা রঙের ইন্ডিয়ান কমন অ্যালবাট্রমগুলো, যারা সবসময় এখানে উড়ে বেড়ায়, তারাও নেই! ধীরে ধীরে এরপর আমি এগোলাম সেই ঝরণাটার দিকে৷ মোনার্কটা যেখান থেকে আমি সংগ্রহ করেছিলাম৷ আরও কিছুক্ষণ পর আমি পৌঁছোলাম সে-জায়গাতে৷ সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে পাহাড়ের খাঁজ থেকে নেমে আসা জলধারা৷ ডোবার ধারে পাথরগুলো সাদা ধবধব করছে৷ এমনকী জলতলের নীচের নুড়ি পাথর, শ্যাওলাগুলোও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷
ঝরণার ঝর ঝর শব্দ ছাড়া চারপাশে কোনও শব্দ নেই৷ ক্যালিপ্ঢা চারপাশের ঝোপঝাড়ে মোজাইকের টুকরোর মতো প্রজাপতির ঝাঁকের কথা বলেছিল৷ তা দেখতে না পেলেও কাছাকাছি একটা পাথরের ওপর একটা বেশ বড় গসমার উইন্ড কিন্তু দেখতে পেলাম৷ হয়তো ঝাঁকটা তাকে ফেলে রেখে অন্য কোথায় উড়ে গেছে! উজ্জ্বল সূর্যকিরণে একলা বসে সে পাখা নাড়ছে৷
আমি এগোলাম তার দিকে৷ কাছাকাছি পৌঁছে ক্ষিপ্র গতিতে জাল চালালাম৷ সে আটকে গেল জালে৷ ব্যাগ থেকে কাচের জার বার করলাম৷ প্রজাপতিটা খুব বিশ্রীভাবে জালে আটকে গেছে৷ জাল থেকে সেটাকে হাত দিয়ে খুলে জারে ঢোকানোর সময়-ই ঘটল ব্যাপারটা৷ প্রজাপতিটাকে স্পর্শ করতেই মুহূর্তের মধ্যে আমার দেহে তীব্র বৈদ্যুতিন প্রবাহ অনুভূত হল৷ যেন কোনও হাইভোল্টেজ ইলেকট্রিক তার ছুঁয়ে ফেলেছি৷ আর সেই মারাত্মক শক্ খেয়ে আমি ছিটকে পড়লাম জলে৷ এবং সঙ্গে সঙ্গে চেতনা হারালাম৷
যখন জ্ঞান ফিরল তখন প্রথমে বুঝতে পারলাম না আমি কোথায়৷ কয়েক মিনিট একটা আচ্ছন্ন ভাব কাজ করছিল, তারপর ধীরে ধীরে সব কিছু স্পষ্ট হল৷ একটা অদ্ভুত আকৃতির ঘরের মেঝেতে পড়ে আছি৷ মাথার ওপরের স্বচ্ছ ছাদ দিয়ে নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ একটা নীলাভ আলো জ্বলছে ঘরটাতে৷ তার দেওয়ালে অসংখ্য ইলেকট্রনিক্স প্যানেল৷ সেখানে বিন্দু বিন্দু নানা রঙের আলো জ্বলছে নিভছে৷
যে মেঝেতে আমি শুয়ে আছি সেটা সম্ভবত বুটিদার রুপালি অ্যালুমিনিয়াম বা ওই ধরনের কোনও ধাতুর তৈরি৷ ঘরের দরজাটা অবশ্য খোলা৷ দরজার বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার৷ সেখান থেকে ঝিঁঝি পোকার ঐকতান ভেসে আসছে৷ আর এরপরই আমি সেই ঘরটার মধ্যে দেখতে পেলাম আমার পরিচিত একজনকে, মিস্টার ক্যালিপ্ঢা! কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন আমার দিকে৷ আমি শোয়া-অবস্থা থেকে মাটিতে উঠে বসে তাঁকে জিগ্যেস করলাম, ‘আমি কোথায়? আমি কীভাবে এখানে এলাম?’
ক্যালিপ্ঢা বললেন, ‘ওই যে আপনি প্রজাপতি ধরতে গিয়ে তড়িতাহত হলেন, তারপর আমিই আপনাকে এখানে এনেছি৷ এটা কোথায়, তা না জানলেও আপনার চলবে৷ সেই প্রজাপতিটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? আমাকে ওটা দিন৷’ শেষ কথাগুলো বেশ কর্কশ ভাবে বললেন মিস্টার ক্যালিপ্ঢা৷
আমি তাঁর প্রশ্ণের জবাব দেওয়ার আগে উঠে দাঁড়াতে গেলাম৷ আর তখনই আমি বুঝতে পারলাম আমার হাতদুটো পিছমোরা করে বাঁধা৷ ক্যালিপ্ঢা কি তাঁর মানে আমাকে অপহরণ করে এনেছেন? যে যান্ত্রিক প্রজাপতি থেকে আমি তড়িতাহত হলাম নিশ্চয়ই তার পেছনে মিস্টার ক্যালিপ্ঢারও কোনও হাত আছে! মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপারটা ভেবে নিয়ে হাত-বাঁধা অবস্থায় কোনওক্রমে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আমার হাত বাঁধা কেন? আপনি কি আমাকে ধরে এনেছেন? শিগগির হাত খুলুন৷’
ক্যালিপ্ঢা মৃদু হেসে বললেন ‘ঠিক খুলে দেব৷ তার আগে বলুন প্রজাপতিটা কোথায়?’
আমি এবার একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘ওটা আমার সঙ্গে নেই৷ বাড়িতে আছে৷’
ক্যালিপ্ঢা বললেন, ‘আপনার সঙ্গে ওটা নেই তা আমিও জানি৷ তবে ওটা আপনার ঘরে নেই৷ আমি খুঁজে দেখেছি৷’
‘আপনি আমার ঘরে ঢুকেছিলেন আমার অবর্তমানে? আমার বাঁধন খুলে দিন৷’ চিৎকার করে বলে উঠলাম আমি৷
তিনি বললেন, ‘প্রজাপতিটা কোথায় আপনি বলুন৷ ওটা এক্ষুনি আমার দরকার৷’
আমি আবার চিৎকার করে উঠলাম, ‘আমি যদি বাড়ি পৌঁছোতে না পারি তবে কিছুতেই বলব না ওটা কোথায় আছে৷ ওটা তো একটা যান্ত্রিক প্রজাপতি৷ আপনার কী দরকার ওটা দিয়ে?’
‘যান্ত্রিক’ শব্দটা শুনেই মুহূর্তের জন্য কেমন যেন থমকে গেলেন ক্যালিপ্ঢা৷ তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, ওটা যান্ত্রিক৷ আমার সঙ্গীরা ওটা মোনার্কের ঝাঁকের সঙ্গে মেক্সিকো থেকে এখানে পাঠিয়েছিল৷ ওটা আসলে একটা সার্কিট, যা এই ঘরটাকে মহাশূন্যের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে৷’
তাঁর কথা শুনে বিস্মিতভাবে আমি প্রশ্ণ করলাম, ‘আপনি কে? কোনও বিজ্ঞানী?’
ক্যালিপ্ঢা বললেন, ‘হ্যাঁ, বিজ্ঞানী তো বটেই৷ তবে...’
কী যেন একটা বলতে গিয়ে তিনি থেমে গেলেন৷ তারপর একটু চুপ করে থেকে কর্কশভাবে বললেন, ‘সময় নষ্ট করবেন না৷ সার্কিটটা কোথায়? ওটার জন্য আপনাকে খুন করতেও দ্বিধা করব না আমি৷’
এবার আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম৷ তাঁকে কী জবাব দেব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না৷ ঠিক সেইসময় আর একটা কণ্ঠস্বর কানে এল—‘ওটা আমার কাছে, এই যে৷’
তাকিয়ে দেখি ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছেন ডক্টর শেফিল্ড...৷
ডক্টর শেফিল্ডের ডায়েরি ঃ
৪ আগস্ট, ওয়েস্ট গারো হিলস,
মেঘালয়৷
পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনার কথা শোনা যায় যা অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়৷ গতকাল রাতে আমার জীবনে যা ঘটল তা আমি এখনও মাঝে মাঝে বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না৷ এ ঘটনার সাক্ষী প্রজাপতি-শিকারি নৃসিংহ চৌধুরী যদি না থাকতেন তাহলে আমি ওই ঘটনা সম্বন্ধে নিশ্চিত এ-সিদ্ধান্তে উপনীত হতাম যে কিছু সময়ের জন্য আমার ইন্দ্রিয়গুলো আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে৷
পরশু রাতে বাঙালি ভদ্রলোকের ঘর থেকে প্রজাপতিটা নিয়ে এসেছিলাম৷ ঘরে ফিরে বেশ কিছুক্ষণ ধরে পরীক্ষা করে সেটাকে আমার কোটের পকেটে রেখে দিয়েছিলাম৷ পরদিন ভোরে পরিচিত একজন রোগীকে দেখতে যাবার জন্য ডাক এল৷ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে আমি পেশেন্ট পার্টির সঙ্গে তাদের গ্রামে গেলাম৷ ফিরলাম বেলা বারোটা নাগাদ৷ বাইরে থেকেই আমার গ্রেট ডেনটার পরিত্রাহি চিৎকার কানে এল৷
বাড়িতে ঢুকে দেখি দুটো ঘর-ই লণ্ডভণ্ড৷ কোনও কিছু খোয়া না গেলেও কেউ বা কারা যেন লন্ডভন্ড করে খুঁজেছে কিছু৷ গ্রেট ডেনটা চেন ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করছে৷ হঠাৎ আমি চৌধুরীর ঘরের মেঝেতে কুড়িয়ে পেলাম একটা জিনিস৷ স্বচ্ছ কাগজের মধ্যে রাখা একটা দুর্মূল্য ‘রিগাল ব্লু বেগম’!
মুহূর্তের মধ্যে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল সবকিছু, কে কী কারণে বাড়িতে ঢুকেছিল! তবে যান্ত্রিক মোনার্কটা সে নিয়ে যেতে পারেনি৷ সেটা এখন আমার কোটের পকেটে৷
কিন্তু চৌধুরী কোথায় গেলেন? তিনি কি প্রজাপতি ধরতে গেছেন? নাকি তাকে অপহরণ করা হল?
সঙ্গে-সঙ্গে আবার বেড়িয়ে ছুটলাম পাহাড়ের দিকে৷ ঘণ্টা তিনেক ধরে পাহাড়ের প্রত্যেকটা ঢালে, তার মাথার জঙ্গলে তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান চালালাম৷ বিকেল হয়ে এল, কিন্তু তাঁর দেখা মিলল না৷ আমি তখন ঠিক করলাম যে সরাসরি গিয়ে ক্যালিপ্ঢাকে ধরব৷ তিনি যে আমার বাড়ি গেছিলেন তার প্রমাণ তো ওই ব্লু বেগমটা৷ সম্ভবত সেটা তাঁর পকেট থেকে পড়ে গেছিল৷
দ্রুত নীচে নেমে এলাম৷ হাজির হলাম গিয়ে ক্যালিপ্ঢার বাড়ি৷ দোতলায় তাঁর অংশ তালা দেওয়া৷ মীনাক্ষীর পরিচারিকা আমাকে জানাল যে, বাড়িওলা সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন আর ফেরেননি৷ আমি এরপর দুশ্চিন্তাগ্রস্তভাবে নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম৷
না, চৌধুরী ফিরে আসনেনি৷ দুশ্চিন্তা ক্রমশ বাড়তে লাগল৷ কিভাবে তাঁর খোঁজ করা যায় ভাবতে লাগলাম৷ হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল৷ আমার গ্রেট ডেনটা প্রশিক্ষিত কুকুর৷ তার সাহায্যে যদি একটা শেষ চেষ্টা করা যায় চৌধুরীকে খোঁজার ব্যাপারে৷ কুকুরটা সমানে ডেকে চলেছে৷ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চেন ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করছে৷ আমি তাড়াতাড়ি চৌধুরীর ঘরে গিয়ে তাঁর ব্যবহৃত একটা জামা নিয়ে এলাম৷ কুকুরটাকে বাইরে এনে, বাড়িতে তালা দিয়ে চৌধুরীর জামাটা শোঁকালাম তাকে৷ বুদ্ধিমান কুকুর আমাকে টানতে টানতে তারপর বাড়ির বাইরে নিয়ে এল৷ আমাকে নিয়ে এগোল পাহাড়ের একটা ঢালের দিকে৷ পাহাড়ের মাথায় তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে৷ তার রাঙা আলো ছড়িয়ে পড়েছে সারা উপত্যকায়৷
কুকুরটার সঙ্গে যখন ওপরে উঠে এলাম ঠিক তখনই অন্ধকার নামল৷ তার পিছু পিছু কোথায় যাচ্ছি তা ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না৷ তারপর এক সময় চাঁদ উঠল৷ একটা ঝরণা দেখতে পেলাম৷ তার পাশ দিয়ে কিছুটা এগিয়ে কুকুরটা ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা একটা ঢিবির সামনে আমাকে দাঁড় করাল৷ এটা পাহাড়ের শেষ প্রান্ত৷ ঢিবিটার কিছুটা তফাতেই অতল খাদ৷ দীর্ঘ বিস্তৃত খাদ৷ ওপারে অন্য দেশের সীমানা৷ ঢিবির সামনে বড় বড় ঝোপঝাড়৷ কুকুরটা তাকিয়ে আছে সেদিকেই৷
আমি এখানে কোনওদিন আসিনি৷ কুকুরটার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলাম ঝোপের আড়াল থেকে একটা গুহামুখ যেন উঁকি দিচ্ছে৷ ঝোপঝাড় একটু সরাতেই সেটা স্পষ্ট হল৷ কুকুরটাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে সন্তর্পণে ভিতরে প্রবেশ করলাম৷
কুড়ি-পঁচিশ ফুট লম্বা একটা টানেল৷ তার শেষপ্রান্ত থেকে আবছা আলো ভেসে আসছে৷ আমি এগোলাম সেদিকে৷ একটা দরজা৷ তার ওপাশে একটা অদ্ভুত ঘর৷ নীল আলো জ্বলছে সেখানে৷ অসংখ্য বৈদ্যুতিক প্যানেল সারা ঘরে৷ মাথাটা কাচ জাতীয় কিছু দিয়ে তৈরি৷ আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ আমি বুঝতে পারলাম বাইরে থেকে যাকে ঢিবি বলে মনে হচ্ছিল সেটা আসলে ক্যামোফ্লেজ৷ আসলে ঢিবির আড়ালে লুকিয়ে আছে ঘরটা৷
দরজার বাইরে টানেলের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই ঘরের ভেতরে দেখতে পেলাম মিস্টার ক্যালিপ্ঢা আর চৌধুরীকে৷ দুজনেই দাঁড়িয়ে আছেন৷ ক্যালিপ্ঢা ওই যান্ত্রিক প্রজাপতিটার খোঁজ করছেন চৌধুরীর কাছে৷ আর চৌধুরী তার খোঁজ দিতে রাজি হচ্ছেন না৷ তাঁর হাত বাঁধা৷ শেষ পর্যন্ত চৌধুরীকে যখন ক্যালিপ্ঢা খুনের হুমকি দিলেন তখন আমি আর থাকতে না পেরে পকেট থেকে যান্ত্রিক মোনার্কটা বার করে সেঘরে প্রবেশ করে বললাম, ‘ওটা আমার কাছে, এই যে৷ ’
তারা দুজইে এবার ফিরে তাকালেন আমার দিকে৷ ক্যালিপ্ঢা দেওয়ালের গায়ে একটা প্যানেলের গায়ে হাত রেখে তাঁর দস্তানা পড়া ডান হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘ওটা আমার জিনিস৷ আমাকে দিয়ে আপনারা চলে যান৷’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ দেব৷ কিন্তু তার আগে আপনি বলুন, আপনি কে? এই ভদ্রলোককে আপনি বেঁধে রেখেছেন কেন?’
ক্যালিপ্ঢা প্রশ্ণের উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘প্রজাপতিটা আমাকে দিন৷ ওটা দিলে আমি ওকে মুক্তি দেব৷’
আমি চৌধুরীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘বলেছি তো দেব৷ আগে বলুন আপনি কে?’
একটা অস্ফুট হাসি ফুটে উঠল ক্যালিপ্ঢার ঠোঁটের কোণে৷ তিনি জবাব দিলেন, ‘ধরুন আমি তেমন কেউ, যারা সভ্যতার উষালগ্ণে মানুষকে জ্ঞানের আলো দেখিয়েছিল৷ যেমন মিশরের মানুষকে শিখিয়েছিল কীভাবে নিখুঁত জ্যামিতিক নক্সায় গড়ে তুলতে হয় পিরামিড৷ প্রাচীন অ্যাজটেকদের শিখিয়েছিল কীভাবে বানাতে হয় ভবিষ্যতের নিখুঁত ক্যালেন্ডার৷ ইঙ্কাদের জানিয়েছিল ভূমিকম্পরোধী স্থাপত্যের কৌশল৷ যারা এ-গ্রহের মানুষকে সর্বপ্রথম মহাবিশ্বের সন্ধান দেবার চেষ্টা করেছিল৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রথম পাঠ যারা শিখিয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে...৷’
ক্যালিপ্ঢার কথা শুনে মৃদু চমকে উঠলাম৷ কিন্তু এ যে বিশ্বাস করা কঠিন আমি তাঁকে বললাম, ‘হেঁয়ালি নয়৷ যা বলবার তা স্পষ্ট করে বলুন৷ এভাবে সময় নষ্ট করাটা কারোর পক্ষেই আকাঙ্ক্ষিত নয়৷’
তিনি কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে৷ তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি এবার যেন আরও স্পষ্ট হল৷ তারপর তিনি বললেন, সেটা কিন্তু আপনাদের পক্ষে মঙ্গলজনক হবে না৷
আমি বললাম, ‘তা না হোক, বলুন আপনি কে?’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘তবে দেখুন আমি কে—’
ধীর পায়ে তিনি এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ঘরের ঠিক মাঝখানে ধাতব পাতে মোড়া একটা নীচু বেদির মতো জায়গায়৷ শেষবারের মতো তিনি একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে৷ তারপর পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেলেন৷ আর এর পরেই হঠাৎ তাঁর পোশাকগুলো যেন অগ্ণিভ হয়ে উঠল কয়েক মুহূর্তের জন্য৷ পরমুহূর্তে সেগুলো ছাই হয়ে পড়ল তাঁর পায়ের কাছে৷ অথচ পোশাকের আগুন গ্রাস করেনি তাঁর দেহকে! আমাদের সামনে সম্পূর্ণ নিরাবরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ক্যালিপ্ঢা৷
কিন্তু ক্যালপ্ঢার সেই দেহ দেখে আমার কেন জানি মনে হল এটা একটা খোলস৷ রোমহীন, ভাঁজহীন, মৃদুকঠিন ত্বকসম্পন্ন মসৃণ এক দেহ৷ অনেকটা পোশাকের দোকানে পূর্ণবয়স্ক মানুষের আকৃতির যে পুতুলগুলির উপর পোশাক চাপানো হয় অনেকটা সেইরকম দেখতে৷
আর এরপরই আমার অনুমান সত্যি হল৷ ঈষৎ শব্দ করে অনেকটা ডিমের খোলার মতো আঁকাবাঁকা ফাটল ধরতে শুরু করল সেই দেহে৷ একটা একটা করে ডিমের খোলার মতোই খসে পড়তে লাগল বহিরাবরণ আর তাঁর ভেতর থেকে উঁকি দিতে লাগল থকথকে সবুজ জেলির পিণ্ড৷ ঠিক যেন অনেকটা কোনও দানবীয় প্রজাতির পিউপার মতো!
—শেষ টুকরোটাও একসময় খসে গেল সেই সবুজাভ গুটির গা থেকে৷ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সবুজাভ জেলির আবরণে মোড়া অদ্ভুত এক অবয়ব৷ আকারে সেটা পাঁচ ফুটের একটু বেশি হবে৷
আর এরপরেই সেই জেলির ভেতর থেকে উঁকি মারল এক কুৎসিত মাথা৷ মাথার ওপর থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াল এন্টেনার মতো দুটো শুঁড়৷ উন্মোচিত হল দুটো গোলাকার হলুদাভ চোখ৷ অনেকটা গলদা চিংড়ির চোখের মতো৷ কোটর চিরে চোখ দুটো বাইরে বেরিয়ে এল৷ লম্বাটে কুৎসিত মুখমণ্ডলের নীচের অংশে উন্মোচিত হল সার সার তীক্ষ্ন দাঁতের পাটি৷ সবশেষে থকথকে জেলির আবরণ ভেদ করে কাঁধের কাছ থেকে বেরিয়ে এল দুটো পাখা৷ এত কুৎসিত পাখা আমি জীবনে দেখিনি৷ সবুজাভ আঁঠালো তরল মাখা পাখাদুটোর শেষ প্রান্তে হাতের পাতার মতো অংশ আছে৷ তাতে তিনটে করে আঙুল, আঙুলের প্রান্তে তীক্ষ্ন নখর!
আমার পা দুটো যেন কেউ মাটির সঙ্গে আটকে দিয়েছে৷ আমি দেখে যাচ্ছি সেই ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস্য দৃশ্য৷ একসময় জেলির আবরণ ভেদ করে পুরো দেহটাই উন্মোচিত হল৷ সবুজাভ প্রাণীটার দেহের সঙ্গে প্রজাপতির দেহেরও অনেকটা মিল আছে৷ শুঁড়, লম্বাটে মাথা, ডানা, বুকের চেয়ে নিম্নাংশের দৈর্ঘ্য বেশি এবং তার প্রান্তদেশ ছুঁচালো৷ এক অতি কুৎসিৎ প্রজাপতি যেন তার নিজের উপর ভর করে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ সারা দেহ তার চটচটে জেলিতে মাখামাখি৷ আমি একবার তাকালাম চৌধুরীর দিকে৷ তাঁর চোখও আমার মতোই বিস্মিত, বিস্ফারিত৷
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এরপর ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে উঠল প্রাণীটা৷ তারপর একটা ধাতব কিচ্ কিচ্ শব্দ করে হেলতে দুলতে সে এগোতে লাগল আমাদের দিকে৷ উত্তেজনায় আমি মুহূর্তের মধ্যে সজোরে চেপে ধরেছিলাম আমার হাতের সেই ধাতব প্রজাপতিটাকে৷ হঠাৎই মচ্ করে একটা শব্দ হল৷ নিজের অজান্তেই হাতের চাপে প্রজাপতির কোন অংশ সম্ভবত ভেঙে গেছিল কিন্তু সেই অল্প শব্দেই আমার হুশ ফিরল৷ অদ্ভুত প্রাণীটা তখন তার তীক্ষ্ন নখরযুক্ত পাখাদুটো দিয়ে আমাকে আলিঙ্গন করার জন্য বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছে৷
নিশ্চয়ই তার উদ্দেশ্য, প্রজাপতিটাকে হস্তগত করা৷ আর দেরি না করে আমি তাকে দূরে সরাবার জন্য মুঠোয় ভরা কৃত্রিম প্রজাপতিটাকে ছুড়ে ফেললাম ঘরের অন্য প্রান্তে৷ প্রাণীটা একবার শুধু তার কুৎসিত মাথাটা ফিরিয়ে দেখে নিল সে জিনিসটা ঘরের কোথায় গিয়ে পড়ল৷ আমি ভেবেছিলাম এবার সে সেটার দিকে এগিয়ে যাবে৷ কিন্তু তা না করে সে তীব্র কিচ্ কিচ্ শব্দ করে মনে হয় হাসল৷ তারপর আবার এগোল আমাদের দিকে৷ তার ডানার শেষ প্রান্তের নখগুলি প্রসারিত হচ্ছে৷ আমি দরজার দিকে ছুটলে আমাকে হয়তো সে ধরতে পারবে না কিন্তু চৌধুরীকে নির্ঘাত ধরে ফেলবে৷
ঠিক এই মুহূর্তে একটা কাণ্ড ঘটল৷ শুনতে পেলাম আমার গ্রেট ডেনের কানফাটানো গর্জন৷ আমাকে অনুসরণ করে কখন যেন সে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে৷ আর তারপরই সে তার বাঘের মতো শরীরটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অদ্ভুত প্রাণীটার ওপর৷ পরমুহূর্তেই দুজনে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল৷ কুকুরের গর্জন আর প্রাণীটার হিংস্র কিচ্ কিচ্ শব্দে ভরে উঠল ঘর৷ দাঁত আর নখ দিয়ে দুজনেই ঘায়েল করার চেষ্টা করতে লাগল পরস্পরকে৷
প্রমাদ গুনলাম আমি৷ সময় নষ্ট করা যাবে না৷ চৌধুরীকে টানতে টানতে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে ঢুকলাম টানেলে, টানেল ধরে ছুটতে শুরু করলাম৷ আমাদের পেছনে ভেসে আসতে লাগল মরণাপণ লড়াইয়ের শব্দ৷ কোনওরকমে টানেলের বাইরে বেড়িয়ে এলাম৷ হঠাৎ গ্রেট ডেনটার তীব্র আর্ত চিৎকার কানে এল৷ তারপরই যেন সব শব্দ থেমে গেল৷ আর টানেলের ভেতর থেকে কামানের গোলার মতো বাইরে বেরিয়ে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে আমাদের কিছুটা তফাতে ছিটকে পড়ল আমার কুকুরটার প্রাণহীন নিস্পন্দ দেহ৷
প্রাণীটা কি এবার বেরিয়ে আসবে? আর কালবিলম্ব না করে আমরা ছুটতে শুরু করলাম৷ কিছুটা এগোবার পরেই মনে হল আমাদের পা যেন কাঁপছে৷ পা নয়, মাটি৷ আর এরপরেই প্রচণ্ড শব্দ করে আমাদের পেছনের সেই পাথরের ঢিবির মাথাটা চৌচির হয়ে গেল৷ আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ৷ ঢিবির ভেতর থেকে উজ্জ্বল একটা বিরাট বাক্স যেন চাকতির মতো পাক খেতে খেতে শোঁ শোঁ শব্দ করে তিরবেগে আকাশের দিকে উঠতে শুরু করল৷
মহাকাশযান! আমরা যে-ঘরের মধ্যে এতক্ষণ ছিলাম সেটাই সম্ভবত উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে৷ আমরা তাকিয়ে রইলাম সেদিকে৷ অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য! কিন্তু বেশ অনেকটা ওপরে উঠে গিয়ে পরেই সেটা আবার তিরবেগে নামতে শুরু করল নীচের দিকে৷ চারপাশ আলোকিত করে সেটা পৃথিবীর কাছাকাছি নেমে এসে অদৃশ্য হল খাদের মধ্যে৷ কয়েক মুহূর্ত পরেই সেই খাদের নীচ থেকে ভেসে এল প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ৷ সম্ভবত ধবংস হল মহাকাশযানটা৷
তবু আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন মনে করলাম না৷ কিছু করার থাকলে তা দিনের আলোতেই করতে হবে৷ এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে প্রায় বাক্রুদ্ধ অবস্থায় আমরা ফেরার পথ ধরলাম৷ ঠিক করলাম সকালে ফিরে কুকুরের মৃতদেহটা নিয়ে যাব৷ বিস্মিত, বিধবস্ত অবস্থায় মাঝরাতে ঘরে ফিরলাম আমরা৷ সারাটা রাত যেন ঘোরের মধ্যে কাটল৷
আজ দিনের আলো ফুটলে আমরা স্থানীয় দুজন লোককে সঙ্গে নিয়ে পাহাড় ভেঙে হাজির হলাম সেই জায়গাতে৷ সেই ঢিবির মতো উঁচু জায়গাটা আর নেই৷ সেখানে একটা গহ্বর সৃষ্টি হয়েছে৷ চারপাশে ঝোপঝাড়গুলো আগুনে ঝলসে গেছে৷ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে নীচে উঁকি মারলাম৷ অতল খাদ নীচে, কিছুই চোখে পড়ল না৷ কিছুটা দূরে পড়েছিল আমার কুকুরটার মৃতদেহ৷ তার চামড়া ঝলসে গেছে৷ লোক দুজনের সাহায্যে সেই মৃতদেহটাকে বহন করে নীচে ফেরার পথ ধরলাম৷
বাড়ি ফিরে প্রথমে কুকুরের মরদেহটাকে বাগানে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম৷ আমাদের জন্য সে প্রাণ দিল৷ বার বার মনে পড়ছে তার কথা৷ তেজষ্ক্রিয়তার স্পষ্ট চিহ্ণ ধরা পড়েছে তার দেহে৷ ওই মহাজাগতিক প্রাণীটা তেজষ্ক্রিয় বিকিরণে সক্ষম ছিল৷ আমরা দুজন খুব জোর বেঁচে গেছি! সে আমাকে আলিঙ্গন করলে আমি নির্ঘাত মারা পড়তাম৷
মহাকাশযানটা ধবংস হবার পিছনে আমি একটা কারণ পেয়েছি৷ প্রজাপতিটা ছুড়ে ফেলার আগে যখন আমি সেটাকে সজোরে চেপে ধরেছিলাম তখনই ওটার কোনও একটা অংশ যে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছি তা বুঝতে পেরেছিলাম৷ ক্ষতিগ্রস্ত সার্কিটের কারণেই সম্ভবত মহাকাশযানটা মুখ থুবড়ে পড়ে৷ তবে একটা প্রশ্ণ থেকেই যাচ্ছে৷ আমার কুকুরটা নয় তাকে আক্রমণ করেছিল বলে মরল৷ কিন্তু মীনাক্ষীর গর্ভস্থ সন্তানরা কী দোষ করেছিল, তাদের সে মারল কেন?
কাল ভোরে চৌধুরী চলে যাচ্ছেন৷ আমাকে এবার উঠতে হবে তাঁর ঘরে যাবার জন্য৷ তিনি যাবার আগে তাঁকে একটা জিনিস উপহার দেব৷ সেটা ছদ্মবেশী ক্যালিপ্ঢার ফেলে যাওয়া ‘রিগাল ব্লু বেগম’ বাটারফ্লাই৷ আমি পরীক্ষা করে দেখেছি, ওটা যান্ত্রিক নয়, আসল প্রজাপতি৷ যার কাছ থেকে ক্যালিপ্ঢা জিনিসটা পেয়েছিলেন সে-লোকের সন্ধানও পেয়েছি৷ কাগজপত্র নিয়ে কোনও অসুবিধা হবে না৷
ঠিক দু-বছর পর নৃসিংহ চৌধুরীর দিনলিপি
৫ আগস্ট, পশ্চিম গারো পাহাড়,
মেঘালয়৷
ডাক্তার শেফিল্ডের আমন্ত্রণে আবার ঠিক দু-বছর পর তাঁর বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছি৷ না, প্রজাপতি ধরতে নয়, প্রজাপতি ধরা আমি দু-বছর আগে সেই রাতে, সেই ঘটনার পর ছেড়ে দিয়েছি৷ শেফিল্ড এখানে আমাকে একটা অনুষ্ঠানে যোগদানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন৷ যদিও কী অনুষ্ঠান আমাকে জানাননি৷
বাগানে দাঁড়িয়ে আমাদের দুজনের কথা হচ্ছিল৷ কিছুটা তফাতে শেফিল্ডের সেই কুকুরটার শ্বেতপাথরের সমাধি৷ গারো পাহাড়ের ফাঁক গলে শেষ বিকেলের মায়াবী আলো এসে পড়েছে সেখানে৷ একঝাঁক মোনার্ক প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে সেই সমাধির ওপর৷ একটু ইতস্তত করে আমি ডাক্তার শেফিল্ডকে জিগ্যেস করলাম, ‘আপনার সেই পেশেন্ট মীনাক্ষীদেবীর গর্ভস্থ সন্তানকে ক্যালিপ্ঢা বার বার করে কেন নষ্ট করছিল, তার কোনও সমাধানসূত্র পেয়েছেন?’
ডাক্তার শেফিল্ড বললেন, ‘সম্ভবত পেয়েছি৷ ঘরে চলুন, কিছু জিনিস আপনাকে দেখাব৷’
তাঁর পিছন পিছন ঘরে ঢুকলাম৷ তিনি আলমারি থেকে একটা ফাইল বের করে এগিয়ে দিলেন আমার দিকে৷ চেয়ারে বসে ফাইলটা খুলতেই তার মধ্যে থেকে বেরোল কয়েকটা পুরোনো পেপার কাটিং৷ ডাক্তার শেফিল্ড বললেন, তথাকথিত সেই ক্যালিপ্ঢার বাড়ির টেলিস্কোপ রুমের একটি সিন্দুক থেকে এগুলো উদ্ধার করেছি৷ এ কাগজগুলো সবই মেক্সিকো থেকে, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে ইউকাতান প্রদেশের রাজধানী সেরিদা থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত৷
আমি একটা পেপার কাটিং পড়লাম৷ তাতে ইউকাতানএর বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সন্তানসম্ভবা মহিলাদের অকস্মাৎ গর্ভপাত বা মৃত সন্তান প্রসবের খবর ছাপা হয়েছে৷ সেখানে ঘটনাটা এত বেশি ঘটছিল যে তা সংবাদপত্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল৷
দ্বিতীয় যে পেপারকাটিংটা হাতে নিলাম তাতে একটা প্রত্ন আবিষ্কারের খবর ছাপা আছে৷ ইউকাতানের কেতমল্ মন্দিরের কাছে খনন কার্য চালাবার সময় অক্টোভিও নামে এক প্রত্নবিদ ভূগর্ভস্থ এক কক্ষে পাথরের তৈরি এক অদ্ভুত কফিন আবিষ্কার করেন বল উল্লেখ আছে যে সে-রিপোর্টে৷ ডাক্তার শেফিল্ড সেই পেপার কাটিংগুলোর মধ্যে থেকে একটা কাটিং বেছে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা পড়ুন, তাহলে হয়তো ব্যাপারটা কিছুটা স্পষ্ট হবে আপনার কাছে৷’
তাতে লেখা—
‘‘নিজস্ব সংবাদদাতা, সেরিদা ঃ গতকাল সকালে কেতমল্ অঞ্চলের এক প্রাচীন স্থাপত্যর ধবংসাবশেষ থেকে বিখ্যাত প্রত্নবিদ অক্টোভিও কোলাসের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে৷ কিছুদিন আগে অক্টোভিওর বক্তব্য নিয়ে পণ্ডিত মহলে শোরগোল পড়ে গেছিল৷ অনেকে তাঁকে পাগল বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন সে জন্য৷ বেশ কিছুকাল আগে নেটিভ আমেরিকানদের জ্ঞান ও উর্বরতার দেবতা কেত্মল কোয়াতল্ মন্দিরের কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চলার সময় পাথরের নল সমন্বিত এক শূন্য কফিন তিনি আবিষ্কার করেন৷ এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল৷ কিন্তু কেতমল্ সংলগ্ণ অঞ্চলে অকস্মাৎ ব্যাপক হারে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা শুরু হলে সে সম্বন্ধে তিনি অদ্ভূত এক ব্যাখ্যা দেন৷ যা তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রগুলিতে পৌঁছে দেয়৷ এসব অঞ্চলের প্রাচীন মন্দিরগুলোতে এক সময় দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার প্রথা ছিল৷ প্রাচীন লোককথা অনুযায়ী দেবতারা নাকি ছিলেন ‘আত্মভুক’৷ অর্থাৎ যে অজ্ঞাত শক্তি আমাদের দেহকে চালিত করে সেই শক্তি ভক্ষণ করেই নাকি বেঁচে থাকতেন দেবতারা৷ গর্ভস্থ সন্তানদের মৃত্যুর ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে, ভূগর্ভস্থ কক্ষে যে আধার তিনি খুঁজে পেয়েছেন, তার মধ্যে হিমায়িত অবস্থায় তথাকথিত কোনও দেবতা ঘুমিয়ে ছিলেন৷ কয়েক হাজার বছর পর তিনি ঘুম ভেঙে বাইরে বেড়িয়ে পড়েছেন৷ গর্ভস্থ শিশুদের প্রাণ ভক্ষণ করে তিনি নিজের শক্তি সঞ্চয় করছেন৷ গর্ভস্থ শিশু তার লক্ষ্য কেন, সে বিষয়েও অক্টোভিও একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন৷ পূর্ণাঙ্গ মানুষকে হত্যা করার চেয়ে গর্ভস্থ সন্তানকে হত্যা করলে তা লোকচক্ষুতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে৷ স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর এ বক্তব্যের পর অনেকেই তাঁকে পাগল আখ্যা দিতে কুণ্ঠা বোধ করেননি৷ অক্টোভিওর সব প্রত্নবিদ সঙ্গীরাই তাঁর সঙ্গ পরিত্যাগ করলেন৷ ইদানীং অক্টোভিও একাকি পাগলের মতোই ঘুরে বেড়াতেন ওই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার প্রাচীন মন্দির ও ধবংসস্তূপগুলোতে৷ তিনি নাকি ওসব জায়গাতে খুঁজে বেড়াতেন সেই আত্মভূক দেবতাকে৷ সম্ভবত তিনি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছিলেন৷ প্রত্নবিদ অক্টোভিওর মৃতদেহ পরীক্ষা করে ডাক্তাররা জানিয়েছেন কোন তেজষ্ক্রিয় রশ্মির প্রভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে৷ তাঁর মৃতদেহ যেখানে পাওয়া গেছে সেখানে কোনও তেজষ্ক্রিয় পদার্থ আছে কিনা তার সন্ধানে সরকারের তরফ থেকে এক অনুসন্ধানকারী দল পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷’’
রিপোর্টটা পড়ার পর আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডাক্তার শেফিল্ডকে প্রশ্ণ করলাম, ‘ওই মহাজাগতিক প্রাণী আত্মভূক এটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে কী সম্ভব?’
শেফিল্ড বললেন, ‘আত্মা’ শব্দটা বলতে আপনি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় না গিয়ে যদি এটাকে একটা শক্তি হিসাবে দেখেন তবে শক্তির স্থানান্তকরণ তো সম্ভব৷ প্রাণ তো আসলে একটা শক্তি৷’
আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম, ‘আমাদের ধর্মশাস্ত্র ভাগবত গীতায় বলা আছে, আত্মা অবিনশ্বর৷ অস্ত্র দিয়ে তাকে ছেদ করা যায় না, আগুনে তাকে পোড়ানো যায় না৷ সে শুধু দেহ পরিবর্তন করে৷ হয়তো আমাদের প্রাচীন পণ্ডিতরা আত্মা বলতে শক্তিকে বুঝিয়েছিলেন৷ শক্তির ব্যাপারটা তো একই৷ ব্যাপারটা এর আগে আমি এভাবে ভেবে দেখিনি৷’
ডাক্তার শেফিল্ড বললেন, ‘বিজ্ঞান তো চলমান৷ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার হয়ে চলেছে৷ আমাদের বিজ্ঞান এই ‘আত্মা’ নামক ‘শক্তি’র স্থানান্তরের ব্যাপারটাও হয়তো কোনদিন আবিষ্কার করবে৷’
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম দুজনে৷ শেফিল্ড তারপর বললেন, ‘এবার চলুন, সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে৷’ আমি বললাম, ‘কোথায়? কী অনুষ্ঠান?’
ডাক্তার শেফিল্ড হেসে জবাব দিলেন, ‘সেই মিস্টার ক্যালিপ্ঢার বাড়ি৷ সেই মীনাক্ষীর এক ফুটফুটে সন্তান জন্মেছে৷ তার আজ এক বছর পূর্ণ হচ্ছে৷ সেই উপলক্ষ্যে আমার উদ্যোগেই একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে৷ আপনাকে ক্যালিপ্ঢার টেলিস্কোপ-ঘরটাও দেখাব৷ ওই টেলিস্কোপে চোখ রেখে হয়তো অজানা কোনও গ্রহর দিকে তাকিয়ে থাকত সে৷ সম্ভবত মেক্সিকোতে আর থাকা সম্ভব হচ্ছিল না বলে এখানে এসেছিল, আর এখান থেকেই মহাকাশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিল সে৷ কিন্তু প্রাচীন মেক্সিকান দেবতার সে-গ্রহে আর ফেরা হল না৷’
ডাক্তার শেফিল্ডের সঙ্গে সেই বাড়ির দিকে এগোতে এগোতে হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ল৷ ক্যালিপ্ঢা বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গীরা ওটা মোনার্কের ঝাঁকের সঙ্গে মেক্সিকো থেকে এখানে পাঠিয়েছিল৷’ তাহলে কি আজও তাঁর সঙ্গীরা রয়ে গেছে সেখানে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন