হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ঐশিকা গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিল৷ যদিও ডাক্তার তাকে এ অবস্থায় বেশি হাঁটতে বারণ করেছে কিন্তু এছাড়া কোনও উপায় নেই৷ কারণ, কবুতর মহল নামে সেই প্রাচীন হাবেলি-প্রাসাদে গাড়ি পৌঁছোয় না৷ চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন হর্ম্য প্রাসাদ, দেউলগুলোর ফাঁক গলে, সংকীর্ণ পথের নানা গোলকধাঁধা অতিক্রম করে তবে পৌঁছোতে হবে কবুতর মহলে৷ তবে সেখানে যাবার রাস্তা চেনে ঐশিকা৷ মাত্র মাস চারেক আগেই সে এসেছিল এখানে, মন্দির প্রাচীন হর্ম্য প্রাসাদশোভিত মধ্যভারতের এই মাণ্ডুতে৷ পরিচিত ট্যুরিস্ট স্পট এই মাণ্ডু৷ সারাদেশের লোকেরা আসে এই প্রাচীন প্রাসাদ-নগরী দেখতে, শুনতে আসে মাণ্ডুর রূপমতীর বিখ্যাত প্রেমকাহিনি৷ তবে এখন ট্যুরিস্ট সিজন নয়, এপ্রিল মাস, গরম পড়তে শুরু করেছে৷ ট্যাক্সি স্ট্যান্ড প্রায় ফাঁকাই বলা যায়৷ দু-একটা গাড়ি শুধু এদিক-ওদিক গাছের নীচে ঝিমোচ্ছে৷ স্ট্যান্ডের লাগোয়া যেসব ছোট ছোট দোকানঘরগুলো টুরিস্টদের জন্য পাথরের মূর্তি, ধাতুর গহনা, পিকচার পোস্টকার্ড ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে বসে থাকে সেগুলোও এখন বন্ধ৷ শুধু দূর থেকে দুজন শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষকে প্রাচীন প্রাসাদ-নগরীর গোলকধাঁধায় অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল ঐশিকা৷
তাকেও ওদিকে যেতে হবে, কাজেই সঙ্গের ছোট্ট লাগেজটা কাঁধে নিয়ে ঐশিকা হাঁটতে শুরু করল৷ কয়েক পা এগোবার পর একটা বন্ধ দোকানের ঝাঁপের গায়ে বেশ কয়েকটা পোস্টার চোখে পড়ল তার৷ বেশ কয়েকটা দু-তিন বছর বয়সি বাচ্চার ছবি সাঁটানো সেখানে৷ স্থানীয় বাচ্চা সব৷ নিখোঁজের বিজ্ঞাপন৷ ঐশিকার মনে পড়ল রেল স্টেশন থেকে গাড়িতে আসার পথে কী একটা কথা প্রসঙ্গে ড্রাইভার বলছিল বটে, আজকাল দিনকাল বদলে গেছে ম্যাডাম৷ খবরের কাগজ আর টিভি খুললেই খালি খুন-জখম মারদাঙ্গার খবর৷ আমাদের মাণ্ডুতেও তো কয়েকমাস ধরে বেশ কয়েকটা বাচ্চাকে পাওয়া যাচ্ছে না৷ কেউ বলছে বাচ্চাগুলোকে চুরি করে নাকি আরবদেশে পাঠানো হচ্ছে উটের দৌড়ে উটের গলায় ঝোলাবার জন্য, আবার কেউ বলছে তাদের নাকি মুম্বাইয়ের কোঠিবাড়ি বা সার্কাসের দলে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে৷
ঐশিকার পোস্টারগুলো দেখে ড্রাইভারটার কথা মনে পড়ে গেল৷ তবে তার ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ তার সঙ্গে একটা বাচ্চা আছে ঠিকই, কিন্তু তাকে কেউ চুরি করতে পারবে না৷ সে আছে ঐশিকার দেহের ভিতর৷ মাত্র তিনমাস বয়স তার৷ ক’দিন আগে সোনোগ্রাফি টেস্টে ধরা পড়েছে তার উপস্থিতি৷
কিছুটা এগিয়েই প্রাসাদ নগরীর গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ল ঐশিকা৷ সর্পিল পথের দু’পাশে নির্বাকভাবে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট প্রাসাদের মতো পাথর অথবা প্রাচীন ইটের তৈরি বাড়িগুলো৷ তাদের মাথাগুলো গম্বুজাকৃতির, পাথরের নক্সা-কাটা তোরণ, জাফরিলা ঝুলবারান্দা, খাঁজ-কাটা গোলাকৃতি স্তম্ভ৷ দেওয়ালের গায়ে এখনও কোথাও কোথাও জেগে আছে কাজ, ছবি বা মূর্তির আবছা উপস্থিতি৷
মাস তিনেক আগে মাণ্ডুর এই প্রাসাদ-নগরীরই ছবি তুলতে এখানে প্রথমবার এসেছিল পেশায় ফোটোগ্রাফার ঐশিকা৷ তখন তার জানা ছিল না এই আসা তার জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেবে৷ তাকে আবার ছুটে আসতে হবে এখানে, হয়তো বা বার বার আসতে হবে, এমনকী হয়তো বা কলকাতার নগরজীবন ছেড়ে ঐশিকাকে জীবন কাটাতে হবে মধ্য ভারতের এই খণ্ডহর প্রাসাদ-নগরীতে৷ কারণ, সে যাকে পেটে ধারণ করেছে সে ছোটরাজা চান্দেল সিং-এর সন্তান৷
তিনমাস পর আবার প্রিয়তমর সঙ্গে মিলিত হতে চলেছে ঐশিকা৷ এই তিনমাসের বিচ্ছেদকালে অবশ্য চোখবন্ধ করলেই তারে চোখে ভেসে উঠেছে টিকালো নাক, রক্তিম ওষ্ঠ, কটা চোখের সুঠামদেহের এক যুবাপুরুষের মুখ, ছোটরাজার মুখ৷ আবার আজ তার সঙ্গে মিলন হবে ঐশিকার৷
কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে একটা উৎকণ্ঠাও কাজ করছে তার মনে৷ কবুতর হাবেলির রানিমা, ঐশিকার হবু শাশুড়ি এবার তাকে মেনে নেবেন তো? ছোটরাজা যখন গতবার ঐশিকাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেছিল তখন তো তিনি হাবেলির ভিতরে প্রবেশও করতে দেননি ঐশিকাকে৷ সদর দরজা আটকে দাঁড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বলেছিলেন, তোমাকে আমি প্রবেশ করতে দেব না হাবেলিতে৷ তুমি যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফিরে যাও৷ আর কোনও দিন এখানে আসবে না৷ আমি তোমাকে পুত্রবধূ হিসাবে মানব না৷
কিন্তু ছোটরাজা তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, ‘আমাদের ভালোবাসার মিলন ব্যর্থ হবে না৷ দেখবে সস্তান আসবে তোমার গর্ভে৷ তখন আর তিনি তোমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না৷ আর যদি তিনি তা-ও না করেন, তবে তোমাকে নিয়ে ‘‘বিল্লি মহল’’-এ চলে যাব৷ ও বাড়িটা আমাকেই দিয়ে গেছেন পিতৃদেব৷’
হাঁটতে লাগল ঐশিকা৷ কিছুটা এগোবার পর রাস্তার পাশে একটা নির্জন বারান্দা থেকে মৃদু শব্দ শুনে সেদিকে তাকিয়ে একটা থামের আড়াল থেকে কিছুটা বেরিয়ে থাকা আলিঙ্গনরত বিদেশী নারী-পুরুষকে দেখতে পেল ঐশিকা৷ চারপাশে কোনও লোকজন না-থাকায় এই নির্জন প্রাসাদে মিলিত হচ্ছে ওই নারী-পুরুষ৷ তাদের দেহের সঞ্চালন দেখে বোঝা যাচ্ছে পরস্পরকে ভালোবাসা উজাড় করে দিচ্ছে৷
তাদের দেখে মনে মনে হাসল ঐশিকা৷ ঠিক এইভাবেই এই নির্জন হাবেলির কত কোণে, কত অলিন্দে, থামের আড়ালে সে-ক’টা দিন ছোটরাজার সঙ্গে মিলিত হয়েছে ঐশিকা৷ যার ফলশ্রুতি তার গর্ভের সন্তান৷ বিশেষত ওই, বিল্লি মহলের প্রতিটা ক-ক্ষ অলিন্দেই তো জেগে আছে তাদের দুজনের ভালোবাসার মিলনের ছবি৷
বিল্লি মহল৷ কথাটা ভাবতে ভাবতে এগোতে এগোতে একসময় বিল্লি মহলের কাছে পৌঁছে গেল ঐশিকা৷ রাস্তার গায়েই দাঁড়িয়ে আছে থাম আর মাথায় গম্বুজলা ওপর-নীচে অলিন্দ-ঘেরা বাড়িটা৷
ঐশিকা থমকে দাঁড়াল বাড়িটার সামনে৷ কেউ থাকে না বাড়িটাতে৷ থাকে শুধু অগুনতি বিড়াল৷ কালো-সাদা-লাল-ডোরাকাটা নানারকম বিড়াল৷ এ জন্য স্থানীয় লোকেরা এই ছোট্ট হাবেলি বা বাড়িটাকে বলে ‘বিল্লি মহল’৷ ঠিক যেমন প্রচুর পায়রা থাকায় ছোট রাজার হাবেলিকে ডাকা হয় ‘কবুতর মহল’ নামে৷ বিল্লি মহলের বারান্দায়, কার্নিসে সেদিনের মতো আজও অনেক ক’টা বিড়াল শুয়ে বসে আছে৷ এই বিল্লি মহলেই তো ছোট রাজার সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে ঐশিকার প্রথম দেখা হয়েছিল৷
সেই প্রথম সাক্ষাতের ব্যাপারটা ঐশিকার যতবারই মনে পড়ে ততবারই যেন রোমাঞ্চিত হয় ঐশিকার শরীর৷ আসলে মাণ্ডুর হাবেলিগুলোয় ছবি তুলতে তুলতে ঘুরতে ঘুরতে সেদিন হঠাৎ ওখানে এসে উপস্থিত হয়েছিল ঐশিকা৷ সে-দিনও এমনই আলোছায়া খেলা করছিল এখানে৷ সাধারণ ট্যুরিস্টারা সাধারণত এখানে আসে না৷ তারা মাণ্ডুর রাজপ্রাসাদ, রূপমতীর প্রাসাদ এসব প্রাসাদগুলো দেখেই ফিরে যায়৷ কাজেই আজকের মতো সে-দিনও এ-জায়গা নির্জন-ই ছিল৷ বিড়ালগুলো যেন এ-স্থাপত্যের অঙ্গ৷ তাদের ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারেনি ঐশিকা৷
ছবি তুলতে তুলতে সে পৌঁছে গেছিল দোতলার বারান্দায়৷ কার্নিসে বসা একটা বিড়াল শীতের নরম রোদ পোহাচ্ছিল৷ তার ছবি তুলতে গিয়ে একটু বেশিই ঝুঁকে পড়েছিল সে৷ আর তারপরই ঘটল সেই ঘটনা বা দুর্ঘটনাটা৷ প্রাচীন হাবেলির অলিন্দে যে জায়গায় ঐশিকা দাঁড়িয়েছিল সেখানে হঠাৎ-ই তার পায়ের নীচের পাথরটা খসে পড়েছিল৷ হয়তো নীচেই পড়ে যেত সে৷ মুহূর্তের জন্য যেন মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছিল সে৷
তবে তেমন কিছু ঘটেনি৷ পরমুহূর্তেই একটা শক্তসবল হাত পিছন থেকে ধরে ফেলেছিল ঐশিকার জ্যাকেটের কলার৷ শূন্য থেকে তুলে তাকে আবার দাঁড় করিয়েছিল অলিন্দর নিরাপদ জায়গাতে৷ ঐশিকা পিছন ফিরে দেখতে পেয়েছিল ক’টা চোখের এক সুন্দর যুবককে, ছোট-রাজাকে৷ ঐশিকার উদ্দেশ্যে সে বলেছিল, ‘ম্যাডাম, একটু সাবধানে ছবি তুলবেন তো!’
সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে-আসা ঐশিকা তখন মৃদু মৃদু কাঁপছে৷ তার মুখ দেখে তাকে আশ্বস্ত করার জন্য এরপর মুক্তোর মতো দাঁতে হেসে ছোটরাজা চান্দেল বলেছিল, ‘আর এমন কিছু ঘটবে না৷ ভয় পাবেন না৷ এটা আমার হাবেলি৷ চলুন আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাই বাড়িটা৷’ আর তারপর...
বাড়িটার দিকে তাকিয়ে সে-দিনের সেই স্মৃতি মনে পড়ে গেল ঐশিকার৷ বিড়ালগুলোকে দেখে হঠাৎ আরও একটা কথা মনে পড়ল তার৷ ইদানীং তার অ্যাপার্টমেন্টের যত বিড়াল এসে দাঁড়িয়ে থাকে তার চারতলার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে৷ ঐশিকা দরজা খুললেই তারা তার পায়ে পায়ে ঘোরে৷
আগে ঐশিকা বিড়াল একদম পছন্দ করত না৷ দেখলেই তাড়াত৷ কিন্তু এই বিল্লি মহল থেকে ফেরার পর থেকেই ফ্ল্যাটের দরজায় বিড়াল দেখলেই এখানকার স্মৃতি জেগে উঠতে তার মনে৷ ইদানীং সে ফ্ল্যাটের বিড়ালগুলোকে খাবার দেওয়াও শুরু করেছে৷ বিল্লি মহলের সামনে কয়েকমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকাল ঐশিকা৷ তারপর হাঁটতে শুরু করল৷ বাড়ি-মহলগুলোর গলিঘুঁজি অতিক্রম করতে করতে একসময় সে পৌঁছে গেল ‘কবতুর মহল-এর’ সামনে৷
কবুতর মহল৷ মাঝারি আকারের সাদা রঙের এক হাবেলি৷ বাইরের দিকে পাথরের জাফরির ঝুলবারান্দা৷ কারুকাজ করা কার্নিস৷ দেওয়ালের গায়ে খোদিত দেব-দেবী৷ তলোয়ার হাতে ঘোড়সওয়ার রাজার ফ্রেস্কো৷ তবে বয়সের ভারে সবই কেমন বিবর্ণ বিষণ্ণ্৷ তবে বাড়িটার বিশেষত্ব হচ্ছে অগুনতি-অজস্র পায়রা বসে আছে বাড়িটার বারান্দা আর ছাদের কার্নিসে৷ কিছু পায়রা আবার ওড়াউড়িও করছে বাড়িটার মাথায়৷ বকম বকম শব্দ ভেসে আসছে চারপাশ থেকে৷
ছোটরাজারা মাণ্ডুরাজার বংশধর৷ পাঁচশো বছর আগে নাকি ও-বাড়ি বানিয়েছিলেন চান্দেল সিং-এর কোনও এক পূর্ব-পুরুষ৷ ঐশিকা জানে, এ-বাড়িতে মাত্র তিনজন লোক থাকে৷ ছোটরাজা, রানিমা আর ছোটরাজার বাবার আমলের বুড়ো চাকর যোধরাও৷ তাদের তিনজনকেই আগে দেখেছে ঐশিকা৷
আর্চের মতো পাথরের তৈরি প্রবেশতোরণ৷ তার মাথায় পঙ্খের কাজ করা শুঁড় ভাঙা গণেশমূর্তি৷ থামের দু-পাশেও খোদিত আছে তলোয়ার হাতে প্রহরীমূর্তি৷ তবে সময়ের থাবায় তাদের কারো তলোয়ার ভেঙে গেছে, মাথার পাগড়ি খসে গেছে৷ তবুও অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা৷
তোরণের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল ঐশিকা৷ মনে মনে সে প্রথমে ভাবল, ছোটরাজা হাবেলিতে আছে তো? নইলে হয়তো হাবেলিতে তাকে ঢুকতেই দেবেন না রানিমা৷
কিন্তু তারপর সে ভেবে নিল, আজ সে এ-বাড়িতে ঢুকবেই৷ কারণ এ-বাড়িতে প্রবেশ করার সামাজিক অধিকার আজ তার আছে৷ বাড়ির ভাবী উত্তরাধিকারীকে ঐশিকা আজ তার গর্ভে-ধারণ করছে৷ তার এ-বাড়িতে প্রবেশাধিকার আটকাতে পারেন না রানিমা৷ যে-কোনও পরিস্থিতির জন্য মনটাকে শক্ত করে নিল ঐশিকা৷ প্রবেশ-তোরণ অতিক্রম করে সে উঠে এল বারান্দায়৷ মাথার ওপর পায়রার ডাক, তাদের বিষ্ঠা আর পালক ছড়িয়ে আছে চারপাশে৷ অলিন্দ সোজা গিয়ে থেমেছে কারুকাজ-করা একটা ভারী কাঠের দরজার সামনে৷ যদিও যে দরজার রং এখন বিবর্ণ, গায়ের কাঠের প্যানেলও খসে পড়েছে কয়েক জায়গাতে৷ দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷ ভারী লোহার কড়া ঝুলছে দরজার গায়ে৷ অলিন্দ পেরিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ঐশিকা৷
গতবার তাকে ঠিক এ-জায়গা থেকেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রানিমা৷ কলিং বেলের কোনও ব্যবস্থা নেই৷ দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল ঐশিকা৷ তারপর কড়া নাড়তে শুরু করল৷
কয়েক মুহূর্ত পর দরজার ওপাশ থেকে একটা অস্পষ্ট পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল৷ উত্তেজনায় এবার মৃদু মৃদু কাঁপতে শুরু করল ঐশিকা৷ কে খুলতে আসছে দরজা? ছোটরাজা? তাকে দেখতে পেয়ে সে কী করবে? তাকে দেখতে পেয়েই জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখবে? তার সেই লাল টুকটুকে ঠোঁট৷ যে-ঠোঁটের স্পর্শ পেলেই মুহূর্তর মধ্যে জেগে ওঠে ঐশিকার সারা শরীর৷ কে খুলবে কবুতর মহলের দরজা?
দরজা খুলল ঠিকই, তবে ছোটরাজা নয়, দরজা খুললেন রানিমা৷ রানিমার ষাটোর্ধ বয়স৷ পরনে ঘাগড়া, চোলি, হাতে-পায়ে ভারী রুপোর গহনা, গলায় কানে স্বর্ণালঙ্কার৷ চেহারাতে এমন একটা অভিজাত গাম্ভীর্য আছে যে দেখলেই বোঝা যায় তিনি সাধারণ পরিবারের নারী নন৷ ঐশিকা ছোটরাজার কাছে শুনেছে তার মাকেও নাকি রাজস্থানের কোনও এক রাজবংশ থেকে বিয়ে করে এনেছিলেন তার বাবা৷ রাজরক্তের আভিজাত্য বইছে এ-নারীর রক্তেও৷
প্রথম দর্শনে তাকে চিনতে পারলেন না রানিমা৷ গম্ভীরভাবে প্রশ্ণ করলেন, ‘কে তুমি? কী চাই?’
ঐশিকা জবাব দিল, ‘আমি ঐশিকা৷ কলকাতা থেকে আসছি৷’
‘ঐশিকা!’ নামটা শুনে এবার তাকে মুহূর্তের মধ্যে চিনে ফেললেন রানিমা৷ প্রথমে তাঁর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল, তারপর তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল৷ কঠিন স্বরে রানিমা বলে উঠলেন, ‘তুমি আবার ফিরে এসেছ?’ বলেছিলাম না এ-বাড়িতে তোমাকে কোনোদিন ঢুকতে দেব না৷ আজও এক-ই কথা বলছি৷ এখনই চলে যাও তুমি৷ চান্দেরের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ হতে দেব না আমি৷’
ঐশিকা একটু চুপ করে থেকে শান্তভাবেই বলল, ‘না, আমি যাব না৷ ভিতরে ঢুকব৷’
কথাটা শুনেই রানিমা বললেন, ‘ভিতরে ঢুকবে মানে? জোর করে ঢুকবে নাকি? এখনও বলছি, তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও৷’ ঐশিকা আবারও শান্তভাবেই বলল, ‘না, আমি যাব না৷ আমি ছোটরাজার কাছে এসেছি৷’
রানিমা বলে উঠলেন, ‘আমার কাছে কিন্তু লাইসেন্সড বন্দুক আছে৷ তুমি চলে না গেলে আমি বন্দুক বার করব৷ যাও বলছি...’
মাথা গরম করলে চলবে না৷ ঐশিকা তাই এ-কথা শুনে নিজেকে সংযত রেখে মৃদু হেসে বলল, ‘আমাকে মারবেন আপনি? তবে শুধু আমাকে নয়, আমার সঙ্গে সঙ্গে আরও একজনকে মেরে ফেলবেন আপনি৷’
ভুরু কুঁচকে রানিমা বললেন, ‘তার মানে? কী আবোলতাবোল বোকছ তুমি?’
মুহূর্তখানেক চুপ করে থাকল ঐশিকা৷ তারপর সে তার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করল৷ সে বলল, ‘আমার পেটে আপনাদের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী আছে৷ ছোটরাজার সন্তান৷ তার অধিকার নিয়েই এ-বাড়িতে প্রবেশ করতে এসেছি আমি৷’
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তি বনে গেলেন রানিমা৷ বিড়বিড় করে শুধু একবার বললেন, ‘সত্যি বলছ? তুমি নিশ্চিত?’
ঐশিকা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত৷ ডাক্তারও দেখিয়েছি৷ মিথ্যা বলছি না আমি৷’
ঐশিকা খেয়াল করল দরজা ধরে দাঁড়িয়ে মৃদু কাঁপছেন মহিলা৷ ঐশিকা তাকিয়ে রইল তাঁর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার জন্য৷ কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্ভবত এ ঘটনার ধাক্কা সামলে উঠলেন রানিমা৷ ঐশিকার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ভিতরে এসো৷’
সন্তানের অধিকার নিয়ে কবুতর হাবেলির ভিতর পা রাখল ঐশিকা৷
বাইরের অলিন্দটা যতটা অপরিষ্কার বাড়িটার ভিতরটা ততটাই পরিচ্ছন্ন৷ চোখধাঁধানো শ্বেতপাথরের মেঝে, চুনকাম করা মসৃণ দেওয়ালের গা থেকে ঝুলছে সোনালি ফ্রেমে আঁটা নানা তৈলচিত্র, হরিণের শিং, প্রাচীন তলোয়ার৷ কোথাও রাখা আছে পাথর অথবা ধাতুর মূর্তি৷
তবে অদ্ভুত একটা গন্ধও মিশে আছে বাড়ির ভিতর৷ প্রাচীন আভিজাত্যের গন্ধ৷
রানিমার পিছন পিছন ঐশিকা একটা অলিন্দ পেরিয়ে উপস্থিত হল একটা ঘরের মধ্যে৷ চামড়ার কৌচ রাখা আছে একটা নীচু বাঘ-থাবা পা-ওলা টেবিলের সামনে৷ মেঝেতে গালিচা পাতা, মাথাসহ একটা বাঘছাল সেখানে শুয়ে আছে৷ দেওয়ালের গায়ে ঝুলছে একটা বন্দুক, তার সঙ্গে টোটার বেল্ট৷ একপাশের দেওয়ালে শিং-সহ স্টাফ করা একটা হরিণের মাথাও টাঙানো আছে৷
তবে ঘরে ঢোকার পর যে-জিনিসটা ঐশিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করল তা, হল একটা দেওয়ালে ঝোলানো তৈলচিত্র৷ ছোটরাজার? সেই ক’টা চোখ, টিকালো নাক, গোলাপের পাপড়ির পাতলা রক্তিম ঠোঁট৷ ঠিক ছোটরাজার মতো দেখতে! ছবিটা ঐশিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পেরে মৃদু কৌতুকের হাসি যেন ফুটে উঠল রানিমার মুখে৷ তিনি প্রথমে বললেন, ‘না ওটা ছোটরাজার ছবি নয়৷ বড়রাজার ছবি৷ এ-বাড়ির বংশধররা সব একই রকম দেখতে হয়৷ বিশেষত ওই ক’টা চোখ, রক্তিম ঠোঁট৷ আর এ বাড়ির পুরুষদের স্বভাবও বংশানুক্রমে একইরকম হয়...৷’
এ-কথা বলার পর তিনি ইশারায় ঐশিকাকে কৌচটা দেখিয়ে দিলেন তার বসার জন্য৷ ঐশিকা বসল সেখানে৷ বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর রানিমা বললেন, ‘আবারও শেষ একবার জিগ্যেস করছি, সত্যি বলছ তো তুমি? এই বংশের উত্তরাধিকারী তোমার পেটে?’
ঐশিকা জবাব দিল, ‘সত্যি বলছি৷ আপনার বিশ্বাস না হলে কোনও ডাক্তারকে দিয়ে ব্যাপারটা পরীক্ষা করাতে পারেন৷ ছোটরাজার রক্ত বইছে তার দেহে৷’
রানিমা আর কিছু বললেন না৷ যে দরজা দিয়ে ঐশিকা ঘরে ঢুকেছে ঠিক তার উল্টো দিকেই একটা দরজা আছে সম্ভবত অন্দরমহলে যাবার জন্য৷ ভারী পর্দা টাঙানো আছে সে দরজাতে৷ ঐশিকার সঙ্গে আর কোনও কথাও না-বলে সে-দরজা দিয়ে অন্তর্হিত হলেন রানিমা৷ একলা ঘরে বসে রইল ঐশিকা৷ সে ভাবতে লাগল ছোটরাজা কোথায়? এ-বাড়িতেই, নাকি অন্য কোথাও? রানিমা কি তাকেই ঐশিকার আসার খবর দিতে গেলেন?
ঘরের এক কোণায় একটা গ্রান্ডফাদার ক্লকও আছে৷ তার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই ঘরে৷ ঐশিকা ভাবতে লাগল এবার তার কি করা উচিত?
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অবশ্য ঘরে ফিরলেন রানিমা৷ পোশাকটা কিছুটা পরিবর্তন করেছেন তিনি৷ শীত চলে গেলেও গায়ে একটা মহার্ঘ শাল চড়িয়েছেন৷ হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগও আছে৷ রানিমা ঘরে ঢুকতেই এবার উঠে দাঁড়াল ঐশিকা৷ হাজার হোক এখন তাকে শাশুড়িমাতাই বলা যায়৷ তিনি ঐশিকার উদ্দেশ্যে বললেন, আমি দশ মিনিটের মধ্যেই আসছি৷ কাছেই একটা দোকান আছে সেখান থেকে মিঠাই নিয়ে৷
বরফ কি তবে গলছে? ঐশিকা প্রথমে বলল, ‘না, না, ও-সবের কোনও দরকার নেই৷’
রানিমা জবাব দিলেন, ‘তা কি হয়? এমন সুসংবাদ দিলে তুমি৷’
ঐশিকা একটু লজ্জিতভাবে বলল, ‘বলছি তো ও সবের দরকার নেই৷ ছোটরাজা কোথায়?’
রানিমা জবাব দিলেন, ‘দোতলায় আছে৷ সন্ধ্যা হলে নীচে নামবে৷ তবে তাকে এখন ডাকা যাবে না৷ হয়তো সে ঘুমোচ্ছে৷ এ বংশের কতগুলো নিয়ম আছে৷ পুরুষরা যখন বিশ্রাম নেন তখন তাকে ডাকা যায় না৷ তা তিনি সন্তানই হন, স্ত্রী-ই হন, পিতা-ই হন না কেন৷ এটাকে তুমি সামাজিক অনুশাসনও বলতে পারো এ বংশের৷ তুমি এখানেই থাকো, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে থেকে আসছি৷’
চলে গেলেন রানিমা৷ একলা ঘরে চুপচাপ বসে রইল ঐশিকা৷ ঘরের বাইরে থেকে মাঝে মাঝে পায়রার ডাক স্পষ্টভাবে ভেসে আসছে৷ এছাড়া কোনও শব্দ নেই৷ ঐশিকার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল, এখনই সে ছুটে যায় ছোটরাজার কাছে৷ কিন্তু রানিমা বলে গেলেন যে, এ-বাড়িতে পুরুষদের বিশ্রামের সময় তাদের ডাকা যায় না৷ ঐশিকা এ-বাড়ির বধূ হতে চলেছে৷ পারিবারিক অনুসাশন তারও মেনে চলা উচিত৷ কাজেই সে-ঘরেই বসে রইল ঐশিকা৷
রানিমা সত্যিই ফিরতে বেশি দেরি করলেন না৷ বাড়িতে ঢুকে তিনি সোজা চলে গেলেন অন্দরে৷ তারপর তিনি ঘরে ঢুকলেন হাতে একটা রুপোর রেকাবি আর বেশ বড় একটা শ্বেতপাথরের গ্লাস নিয়ে৷ রেকাবিতে রাখা বেশ কয়েকটা সন্দেশ আর গ্লাসে রয়েছে লালচে রঙের শরবত৷ পেস্তা, জাফরান ভাসছে তার ওপর৷ ঐশিকার সামনের টেবিলের ওপর সেগুলো নামিয়ে রেখে রানিমা বললেন, ‘এগুলো খেয়ে নাও৷ আমি এখন বিশ্রাম নিতে যাব৷ সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আবার দেখা হবে৷ ছোটরাজা তার আগেই নিশ্চয়ই নীচে নামবে৷ ইচ্ছা করলে বাড়িটা তুমি ঘুরে দেখতে পারো৷ এখন এটা তোমারও তো বাড়ি৷ এ-বাড়ির উত্তরাধিকারীকে পেটে ধারণ করেছ তুমি...৷’
শেষ কথাগুলো বলার সময় যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল রানিমার ঠোঁটের কোণে৷ সম্পর্কের বরফ সত্যিই গলছে, নাকি তা শ্লেষের হাসি, ঠিক বুঝতে পারল না ঐশিকা৷ ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন রানিমা৷
মিষ্টি বা এই ঘোল জাতীয় শরবত কোনওটাই তেমন পছন্দ করে না ঐশিকা৷ তাছাড়া ইদানীং খেতে ভালো লাগে না তার৷ খিদেও নেই৷ তবে রানিমা যখন তাকে যত্ন করে দিয়েছেন তখন ঐশিকা না খেলে তিনি অসম্মানিত হতে পারেন তাই খাবারটা খেতে হবে তাকে৷ ঐশিকা ভাবল, সে পরে খেয়ে নেবে সন্দেশ আর শরবত, রানিমা তো আর সন্ধ্যার আগে আসবেন না৷ তার আগে হাবেলিটা একবার ঘুরে দেখা যাক৷
কৌচ থেকে ঐশিকা উঠে পড়ল৷ রানিমা যেখান দিয়ে অন্তর্হিত হলেন সেই দরজার ভারী পর্দা সরিয়ে ঘরের বাইরে পা রাখতেই এ-বাড়ির অন্দরমহলটা দেখতে পেল ঐশিকা৷ শ্বেতপাথরের একটা বাঁধানো উঠোন মতো জায়গা৷ আর তাকে বেষ্টন করে মন্দির সংলগ্ণ সার সার ঘর৷ দোতলাতেও অমনই ঘর আছে অলিন্দ সংলগ্ণ৷ পাথরের নকশা-কাটা জাফরি দিয়ে দোতলার বারান্দাটা৷ শ্বেতপাথরের উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা পেখম তোলা পায়রা৷
অলিন্দ ধরে হাঁটতে শুরু করল ঐশিকা৷ নিস্তব্ধ অলিন্দ৷ এক পাশে দরজা বন্ধ সার সার ঘরগুলো ধীর পায়ে অতিক্রম করছিল ঐশিকা৷ সামনে অলিন্দর শেষ প্রান্তে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি৷ তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রমাণ আকারের ব্রোঞ্জের মূর্তি৷ মূর্তিটা দেখার জন্যই সেদিকে ঐশিকা এগোছিল৷
কিন্তু হঠাৎ এক ঝটাপট শব্দ শুনে ঐশিকা তাকিয়ে দেখল ভিতরের উঠোন থেকে অলিন্দে লাফিয়ে উঠেছে বেশ বড় একটা সাদা রঙের বিড়াল৷ তার মুখে ধরা একটি ময়ূরপঙ্খি পায়রা৷ সে ডানা ঝাপটিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বিড়ালটার মুখ থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য৷ বিড়ালটা অলিন্দে উঠে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল ঐশিকার দিকে, তারপর অনেকটা ভ্রূক্ষেপহীন ভাবেই ঐশিকার কিছুটা তফাত দিয়ে সে এগোল সিঁড়ির দিকে৷ বিড়ালটা যখন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছে ঠিক তখনই পায়রাটা একবার প্রচণ্ড জোরে ডানা ঝাপটিয়ে উঠল বাঁচার জন্য৷ আর তাতেই হুঁশ ফিরল ঐশিকার৷ ছোট রাজার শখের অত সুন্দর পেখম তোলা পায়রাটাকে মেরে ফেলতে চলেছে বিড়ালটা৷ ওর মুখ থেকে ছাড়িয়ে নিলে তখনও হয়তো বেঁচে যাবে পায়রাটা৷
ঐশিকা তাই এগোল বিড়ালটার পিছনে৷ সিঁড়ি বেয়ে বিড়ালটার পিছন পিছন দোতলাতে উঠে গেল সে৷ বিড়ালটা এবার মনে হয় বুঝতে পারল, ঐশিকা তার মুখ থেকে খাবারটা কেড়ে নিতে এসেছে৷ সে লাফিয়ে দ্রুত ছুটতে শুরু করল সামনের দিকে৷ ঐশিকাও এগোল অলিন্দ বেয়ে৷ জাফরি ঢাকা অলিন্দে আঁধো আলো-ছায়া খেলা করছে৷ সামনে একটা ঘর৷ লাল রঙের মখমলের পর্দা ঝুলছে দরজায়৷ ঐশিকা পৌঁছে গেল সেই দরজার সামনে৷ অন্য ঘরগুলোর দরজা বন্ধ৷ এই একটি মাত্র ঘরেরই দরজা খোলা৷ বিড়ালটাকে আর দেখা যাচ্ছে না৷ তবে কি এ ঘরেই ঢুকল?
কিন্তু এ কার ঘর? কে আছেন ঘরের ভিতর জানা নেই ঐশিকার৷ ঘরের ভিতর ঢোকা সমিচিন বোধ করল না ঐশিকা৷ সে এবার ফিরতে যাচ্ছিল৷ ঠিক সেই সময় পর্দা ঠেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল একজন-ড্রেসিং গাউন পরা ছোটরাজা চান্দেল সিং!
মুহূর্তের দৃষ্টি বিনিময়৷ তার পরই ছোটরাজা বলে উঠল, ‘তুমি এসেছ! আমি জানতাম তুমি আসবে৷’
তাকে দেখে ঐশিকা বিহ্বলভাবে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, এসেছি৷ তোমার কথাই সত্যি হল৷ তোমার সন্তানের মাতৃত্বের অধিকার নিয়েই আজ কবুতর মহলের অন্দরে প্রবেশ করলাম৷’
ঐশিকা হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু তার আগেই ছোটরাজা জড়িয়ে ধরল ঐশিকাকে৷ তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকে ছুড়ে দিল পালকের গদি-আটা নরম পালঙ্কের ওপর৷ ঐশিকার শরীরটা ডুবে গেল পালঙ্কের ভিতর৷ তারপর ঐশিকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কপালে, গালে প্রচণ্ড আবেগে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল ছোটরাজা৷
এক সময় ছোটরাজার ঠোঁট এসে থামল ঐশিকার ঠোঁটের ওপর৷ মৃদু একটা আঁশটে গন্ধযুক্ত নোনতা স্বাদ আছে ছোটরাজার জিভে, ঠোঁটে৷ যে স্বাদ পাগল করে দেয় ঐশিকাকে৷ ছোটরাজা তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতেই মুহূর্তের মধ্যে জেগে উঠতে শুরু করল ঐশিকার দেহ৷ জেগে উঠতে শুরু করল উপবাসী চান্দেলের দেহও৷ এক ঝটকায় নিজের ড্রেসিং-গাউনটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল ছোটরাজা৷ সম্পূর্ণ নিরাবরণ শরীর তার৷ ছোটরাজা এরপর খুলে ফেলতে লাগল ঐশিকার পোশাকও৷ বাঁধা দিল না ঐশিকা৷ একবার শুধু সে অস্পষ্টভাবে বলল ‘দরজা খোলা, যদি কেউ চলে আসে?’
ছোটরাজা জবাব দিল, ‘কেউ আসবে না, কেউ আসবে না....’ সে ডুবে গেল ঐশিকার শরীরের ভিতর৷ ছোটরাজার ঠোঁট নেমে এল ঐশিকার ঠোঁটে৷ তারপর তা ধীরে ধীরে নামতে শুরু করল ঐশিকার গলা ছুঁয়ে দুই স্তনবৃন্তে, সেখান থেকে নাভিতে, অবশেষে আরও নীচে তার দু পায়ের ফাঁকে৷ অস্ফুট চিৎকার করে ঐশিকা খামচে ধরল ছোটরাজার মাথার চুল৷ এরপর চূড়ান্ত সম্ভোগের জন্য প্রস্তুত হল ছোটরাজা৷ ঐশিকার পা দুটোকে দু-পাশে ফাঁক করে নিজের দেহকে ঐশিকার দেহের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে যাচ্ছিল সে৷ কিন্তু চূড়ান্ত ভালোবাসার কাজটা করতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করে নিল ছোটরাজা৷ ঐশিকার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘না, এ কাজ করা ঠিক হবে না এখন৷ যদি আমাদের সন্তানের কোনও ক্ষতি হয়ে যায়!’
ছোটরাজার কথায় যেন পরম মমত্ব ঝরে পড়ল ঐশিকার গর্ভে সদ্য বিকশিত সন্তানের ওপর৷ এরপর সে ঐশিকার পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘দেখবে ছেলে হবে তোমার৷ আমার মতো ফর্সা গায়ের রং, কটা চোখ, টিকালো নাক, পাতলা রক্তিম ঠোঁট৷ আমাদের বংশে শুধু ছেলেই জন্মায়৷ সকলেই তারা প্রায় একইরকম দেখতে আর একই স্বভাবের হয়৷ আমার বাবা-ঠাকুর্দা সবাই প্রায় একই চেহারার৷ স্বভাব চরিত্র আমার মতোই ছিল৷ যে আসছে সে-ও ঠিক আমারই মতো হবে...৷’
এরপর ছোটরাজা ঐশিকাকে বলল, ‘তোমাকে একটা মজার কথা বলি৷ যদি তোমাকে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করে এনে তারপর শারীরিকভাবে প্রথম মিলিত হতাম তবে কিন্তু প্রথম মিলিত হতাম ওই বিল্লি মহলেই৷ ওখানে প্রথম মিলনেই নাকি গর্ভ সঞ্চার হয়েছিল আমার মা-ঠাকুমাদের, আর প্রত্যেকেরই পুত্রসন্তান৷ বংশানুক্রমে এ-পরিবারের নারী-পুরুষরা মিলতি হয় ওখানে৷ এটাই প্রথা৷ সেজন্য আমি নিশ্চিত ছিলাম তোমার গর্ভে সন্তান আসবেই৷
এ কথা বলে ঐশিকাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল ছোটরাজা চান্দেল৷ ঐশিকার নগ্ণ শরীর স্পর্শ করতে লাগল সে৷ না, যৌনতার স্পর্শ নয় পরম মমতা, ভালোবাসা, নির্ভরতার স্পর্শ৷ ঐশিকাও তার বুকে মুখ গুজে শুয়ে পড়ল৷ দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল, তারপর সন্ধ্যাও নামতে শুরু করল৷
এক সময় হুঁশ ফিরল ঐশিকার৷ সে উঠে বসে বলল, ‘এবার নীচে নামতে হবে৷ রানিমা আসতে বারণ করেছিলেন, ঘটনাচক্রে চলে এসেছি৷ উনি জানতে পারলে ভুল বুঝবেন৷’
ছোটরাজা উঠে বসে জানতে চাইলেন, ‘তার সঙ্গে কী কথা হল তোমার?’
ঐশিকা তার জবাবে এই হাবেলিতে আসার পর রানিমার সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে তা বিস্তারিতভাবেই বলল৷
ছোটরাজা শুনে বলল, ‘মেঘ কেটে যাচ্ছে বলে মনে হয়৷ হাজার হোক তোমার পেটে যে আসছে সে এ-বাড়িরই সন্তান৷ তাকে তো আর ফেলে দিতে পারবেন না তিনি৷ এর আগে বহুবার আমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু তা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করেছিলেন রানিমা৷’
ঐশিকা প্রশ্ণ করল, ‘বাতিল করেছিলেন কেন? আমার ব্যাপারেই বা তার আপত্তির কী ছিল? বংশগরিমা? নাকি বাঙালি, অন্য ভাষার মেয়ে বলে?’
প্রশ্ণটা শুনে একটু চুপ করে থেকে ছোটরাজা জবাব দিল ‘না, ঠিক তেমন ব্যাপার নয়৷ আসলে আমি তাঁর একমাত্র সন্তান৷ সম্ভবত তিনি এই ভেবে ভয় পান যে হাবেলিতে বউ এলে সে হয়তো আমাকে তাঁর থেকে দূরে ঠেলে দেবে৷’
ঐশিকা শুনে বলল, ‘বুঝলাম’৷
ছোটরাজা এরপর বলল, ‘কিন্তু এখন তাঁকে খুশি রাখা, তাঁর আশঙ্কা দূর করা প্রয়োজন তোমার৷ আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করার জন্যও তাঁকে আমাদের দরকার৷ আচ্ছা, তুমি কফি বানাতে পারো?’
ঐশিকা বলল, ‘হ্যাঁ, পারি৷ কেন পারব না?’
ঘরের কোণে একটা গ্র্যান্ডফাদার ক্লক রাখা আছে৷ সেদিকে তাকিয়ে ছোটরাজা বলল, ‘এখন ছ’টা বাজে৷ ঠিক সাড়ে ছ’টায় ঘর থেকে বেরোন তিনি৷ তারপর রসুইঘরে ঢুকে কফি বানান নিজের জন্য৷ চিনি কম৷ ঘড়ি ধরে বাঁধাধরা নিয়ম৷ সিঁড়ি দিয়ে নেমেই তিন নম্বর ঘরটাই হল রসুইঘর৷ সব মজুত আছে সেখানে৷ শিকল খুলে ঢুকলেই বুঝতে পারবে৷ আর তার দুটো ঘর পর-ই রানিমার ঘর৷ তুমি কফি বানিয়ে রানিমার ঘরে নক করবে৷ হাতে থাকবে কফির পেয়ালা৷ রানিমা দেখে খুশি হবেন৷ তিনি বুঝতে পারবেন যে আমাকে তাঁর থেকে কেড়ে নিতে আসোনি তুমি৷’
ঐশিকা বলল, ‘ঠিক বলছো৷ আমি তাঁকে খুশি রাখার চেষ্টা করব৷ আমি তবে কফি বানাতে নীচে যাই৷’
পালঙ্ক থেকে উঠে পোশাক পরে নিল ঐশিকা৷ ছোটরাজাও ড্রেসিং গাউনটা আবার গায়ে চাপিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজকের দিনটা তোমার শোয়ার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করবেন রানিমা৷ তিনি ঠিক রাত ন’টায় খাওয়া সেরে নিজের ঘরে দরজা দেন৷ ওঠেন বেলা আটটায়৷ তিনি রাতে দরজা দিলেই তুমি আমার আছে চলে আসবে৷ আর তিনি জেগে ওঠার আগে নীচে নেমে যাবে৷৷ সারা দিনে তো দেখাসাক্ষাৎ হবেই৷’
ঘর থেকে বেরোল ঐশিকা৷ তার পিছন পিছন দরজার বাইরে বেরোল ছোটরাজা৷ অন্ধকার বারান্দা৷ কিন্তু খুট্ করে একটা শব্দ হল৷ আলো জ্বলে উঠল৷ বাতিটা জ্বালাল ছোটরাজার সেই বুড়ো চাকর যোধ রাও৷ তাকে গতবার দেখেছে ঐশিকা৷ এ লোকটারও ওই বিল্লি মহলে যাওয়া-আসা আছে৷ কাছে এসে দাঁড়াল বুড়োটা৷ সে কিন্তু বিস্মিত হল না ঐশিকাকে দেখে৷ ঐশিকাকে সরাসরি ‘ছোটরানিমা’ সম্ভাষণ করে বলল, ‘আপনি এসেছেন জানি৷ ছোটরানিমা, আপনি যখন বিল্লি মহলের পাশ দিয়ে আসছিলেন তখন আমি ওই মহলের ভিতরেই ছিলাম৷’
যোধ রাওয়ের কথাটা শুনে ছোটরাজা বলে উঠল, ‘তুমি বিল্লি মহলে গেছিলে!’
যোধ রাও বলল, ‘হ্যাঁ, গেছিলাম৷ কারণ জিনিসটা পাওয়া গেছে৷’
কথাটা শুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ছোটরাজার চোখ৷ তারপর সে ঐশিকার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আজ রাতে আমি বাইরে থাকব৷ কাজ আছে৷ একটু পরেই বেরিয়ে যাব আমি৷’ তারপর যোধ রাওকে বলল, ‘তুমি ছোটরানিমার খেয়াল রাখবে৷ যেন কোনও অসুবিধা না হয়৷’
যোধ রাও জবাব দিল, ‘যো হুকুম ছোটরাজা৷’
ঐশিকা এবার পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে৷
নীচে নেমে এল ঐশিকা৷ অলিন্দে বেশ কয়েকটা আলো জ্বলছে৷ যোধ রাও-ই সম্ভবত বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে ওপরে উঠেছে৷ তবে এখানে ভোল্টেজ মনে হয় কম থাকে৷ আলোগুলো কেমন যেন ম্যাটম্যাটে বিবর্ণ৷ ছোটরাজার কথামতো রসুইঘরটার শিকল খুলে ভিতরে ঢুকল ঐশিকা৷ দেওয়ালে দরজার পাশেই সুইচ বোর্ড৷ ঐশিকা বাতি জ্বালিয়ে ফেলল৷ আগাগোড়া শ্বেতপাথর মোড়া একটা ঘর৷ ঐশিকার ফ্ল্যাটের বেডরুমও এত সুন্দর মহার্ঘ্য নয়৷ দেওয়ালের গায়ে অনেক তাক৷ তাতে থরে থরে সাজানো আছে রুপোর বাসন, পের্সিছের ডিনার সেট, কাট গ্লাসের পানপাত্র এসব৷ আর আছে পিতলের তৈরি বিরাট বিরাট কলস, গামলা, বারকোষ-থালা ইত্যাদি প্রাচীন বাসনপত্র৷
ঘরের একপাশে বিরাট একটা শ্বেতপাথরের স্ল্যাব বসানো৷ রান্নার ব্যবস্থা সেখানেই৷ গ্যাস ওভেন বসানো আছে৷ আর জায়গাটার গায়ের দেওয়ালে তাকের মধ্যে ছোট-বড় বিভিন্ন মুখবন্ধ কাচের পাত্রে রাখা আছে রান্নার নানান উপকরণ৷ ঐশিকা গিয়ে দাঁড়াল সেখানে৷ ওভেনের কাছেই বেশ বড় একটা রুপোর বাটি রাখা৷ তার ভিতর লেগে থাকা অবশিষ্ট কিছু তরল৷ তার রং দেখে ঐশিকা বুঝতে পারল যে-তাকে দেবার জন্য এ পাত্রটাতেই শরবত বানিয়েছিলেন রানিমা৷ এবার তার খেয়াল হল, সেই শরবত বা সন্দেশ কোনওটাই খাওয়া হয়নি৷ রানিমা ব্যাপারটা দেখলে দুঃখ পাবেন৷ হয়তো বা অসম্মানিতবোধও করতে পারেন৷ কথাটা মনে হতেই ঐশিকা ভাবল, ‘তাড়াতাড়ি বাইরের ঘরে গিয়ে সে জিনিসগুলো কিছুটা অন্তত খেয়ে তারপর এসে রানিমার জন্য কফি বানানো যাক৷’
ঐশিকা জায়গাটা থেকে সরতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা ছোট জিনিস চোখে পড়ল৷ একটা ওষুধের ফয়েল পড়ে আছে রুপোর বাটিটার ঠিক পাশে কীসের ওষুধ?
ফয়েলটা হাতে নিল ঐশিকা৷ তার ভিতরের ওষুধগুলো সব বার করে নেওয়া হয়েছে৷ সে সেটা আবার রেখে দিতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু হঠাৎ-ই যেন অন্য একটা সত্ত্বা কাজ করে উঠল তার ভিতর৷ অন্য ফয়েলটা হাতে নিয়ে তার গায়ের খুদে খুদে হরফগুলো পড়তে লাগল সে৷ ওষুধটা কীসের তা না বুঝতে পারলেও ফয়েলের গায়ে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দেখে চমকে উঠল সে৷ ইংরাজী কথাটার তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার নিষিদ্ধ৷ গর্ভপাত ঘটতে পারে৷’
লেখাটা পরে কেঁপে উঠল ঐশিকা৷ রানিমা কি তবে ওই শরবতে এই ওষুধ মিশিয়েছেন তার গর্ভস্থ ভ্রূণটাকে নষ্ট করে দেবার জন্য! নইলে এই শরবত গোলার পাত্রের পাশে এই ওষুধের শূন্য ফয়েল কেন?
কিন্তু এ-ও কি সম্ভব? হতে পারে রানিমা তাঁর ছেলের বিয়ে দিতে চান না বা ঐশিকাকে পছন্দ করছেন না৷ তা বলে তার জন্য এত বড় কাণ্ড ঘটাতে চলেছিলেন তিনি?
ঐশিকার মাথার ভিতরটা যেন কেমন করে উঠল৷ ফয়েলটাকে হাতের মুঠোতে নিয়ে টলতে টলতে রসুইঘর থেকে বেরিয়ে অলিন্দ অতিক্রম করে সে ফিরে এল সেই ঘরে৷ সেখানে টেবিলের ওপর তখনও রাখা আছে সেই সন্দেশের প্লেট আর শরবতের গ্লাসটা৷ কৌচটার ওপর ধপ্ করে বসে পড়ে দুহাতে মাথা চেপে ধরে সামনের টেবিলের খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সে৷
তার কী করা উচিত কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না ঐশিকা৷ একবার সে ভাবতে লাগল যে ওপরে উঠে গিয়ে ব্যাপারটা জানিয়ে আসে ছোটরাজাকে৷ আবার পরক্ষণেই তার মনে হতে লাগল, ‘হয়তো এটা রানিমায়ের-ই কোনও ওষুধ হতে পারে৷ শরবতের পাত্রের পাশে ফয়েলটা পড়ে থাকাটা নেহাতই কাকতালীয় ঘটনা৷’ আবার কখনও তার মনে হতে লাগল, ‘না, না, এটা কখনওই কাকতালীয় নয়৷ এমন সমাপতন কি সম্ভব? খবরের কাগজে তো নানা ঘটনা শোনা যায়, মা ছেলেকে খুন করছে, ছেলে বাবাকে খুন করছে৷ আর আমি তো রানিমার কাছে নেহাতই বাইরের লোক৷’ নানা পরস্পর বিরোধী ভাবনা ভাবতে লাগল সে৷ সময় এগিয়ে চলল৷
রানিমা ঘরে ঢুকলেন অনেক পরে৷ তখন প্রায় রাত সাড়ে আটটা বাজে৷ তাঁর হাতে একটা রুপোর থালায় পুরি, সব্জি এবং আরও বেশ কিছু খাবার৷ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে তিনি বললেন, ‘তোমার জন্য একটা ঘর সাজিয়ে এলাম, আর রাতের খাবারও বানিয়ে আনলাম৷’ কিন্তু থালা নিয়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে এসেই সন্দেশের প্লেট আর শরবতের গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, ‘এগুলো তুমি খাওনি কেন?’
ঐশিকা ঠিক কী বলবে তা বুঝে উঠতে না পেরে চুপ করে রইল৷
খাবারের থালাটা টেবিলের একপাশে নামিয়ে রেখে রানিমা আবারও প্রশ্ণ করলেন, ‘খাওনি কেন? শরীর খারাপ?’
কোনও জবাব দিল না ঐশিকা৷
আঁতে ঘা লাগল রানিমার৷ বেশ একটু গলা চড়িয়ে তিনি বললেন, ‘এত কষ্ট করে দুপুর রোদে বেরিয়ে তোমার জন্য মিঠাই আনলাম, শরবত বানালাম তুমি খেলে না?’
ঐশিকা এবার মুখ খুলল৷ সে বলল ‘না খেলাম না৷ ইচ্ছা করেই খাইনি৷’
রানিমা আরও গলা চড়িয়ে বললেন, ‘একে তো আমাকে বোকা বানিয়ে তোমরা চোরের মতো সম্পর্ক তৈরি করেছ৷ তার ওপর বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই এত অপমান?’
ঐশিকা ‘চোরের মতো’ শব্দটা শুনে উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘খাইনি বেশ করেছি৷ যে খাবার আনলেন তা-ও নিয়ে যান৷ আপনার দেওয়া কোনও খাবারই আমি খাব না৷’
রানিমা আর ঐশিকার চিৎকার চেচামেচি শুনে পর্দা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল যোধ রাও৷ ঘরের ভিতর ঢুকে একটু জড়সড় হয়ে তাদের দুজনের দিকে তাকাল সে৷ রানিমা তাকে দেখলেও তেমন ভ্রুক্ষেপ করলেন না৷ তিনি ঐশিকার উদ্দেশে বললেন, ‘খাবে না মানে? কেন তুমি খাবে না সে কথা বলতে হবে৷’
ঐশিকা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না৷ হাতের মুঠো খুলে ফয়েলটা রানিমাকে দেখিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এটা কী? রসুইখানায় শরবতের পাত্রের পাশে এটা ছিল কেন? আপনি আমার সন্তানকে খুন করার চেষ্টা করেছিলেন৷ এই শরবত আর সন্দেশ আমি নিয়ে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাব৷’
ঐশিকার হাতের ফয়েলটা দেখে, তার কথা শুনে ফ্যাকাশে হয়ে গেল রানিমার মুখ৷ রানিমা সম্ভবত বুঝতে পারলেন যে, তিনি ধরা পড়ে গেছেন৷ কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি নিজেকে সামলে নিলেন৷ শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, ওই সন্দেশে আর শরবতে ওষুধ মিশিয়েছি আমি৷ তোমার পেটে যে আছে সে পৃথিবীর আলো দেখুক তা আমি চাই না৷ তোমাকে পুত্রবধূ হিসাবে মেনে নিতে আমার কোনও আপত্তি নেই৷ কিন্তু আমি চাই না তোমাদের সন্তান জন্মাক৷’
ঐশিকা একথা শুনে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর আরও জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘কেন? কেন? কেন? আমার পেটের সন্তান আপনার কী ক্ষতি করেছে? কী ক্ষতি করবে?’
ঐশিকার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রানিমা৷ তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমাকে আমি সবকথা ছোটরাজার সামনেই বলব৷ যোধ রাও, ছোটরাজাকে ডাকো৷’
যোধ রাও একটু আমতা আমতা করে জবাব দিল, ‘তিনি নেই, বাইরে গেছেন৷’
‘বাইরে গেছেন? কোথায় গেছেন? তাকে তো রাতে বাইরে যেতে বারণ করেছিলাম আমি৷’ এই বলে রানিমা এবার ঘুরে দাঁড়ালেন৷
তিনি এরপর মাধো রাওকে প্রশ্ণ করলেন, ‘ছোটরাজা কোথায় গেছে বল?’
যোধ রাও বলল, ‘আমি জানি না৷’
ছোটরাজার সামনে ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া প্রয়োজন৷ তাই
ঐশিকা বলে উঠল, ‘আমি ওপরে গেছিলাম দুপুরে৷ ছোটরাজার সঙ্গে যোধ রাওয়ের কথা হচ্ছিল৷ যোধ রাও তাকে বলল সে কী একটা জিনিস রেখে এসেছে বিল্লি মহলে৷ তারপর ছোটরাজা বলল যে, সে আজ রাতে এই হাবেলিতে থাকবে না৷’
কথাটা শোনামাত্র ঘরের দেওয়ালের দিকে এগিয়ে এলেন রানিমা৷ দেওয়াল থেকে দোনলা বন্দুক আর কার্তুজের বেল্টটা নামিয়ে দুটো টোটা ভরে ফেললেন বন্দুকে৷ তারপর বন্দুকের নলটা যোধ রাওয়ের গলায় ঠেকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘বল সে কোথায় গেছে?’
যোধ রাও আবারও জবাব দিল, ‘জানি না রানিমা৷’
রানিমা তাঁর বন্দুকের নলটা আরও জোরে তার গলায় চেপে ধরে বললেন, ‘আমার শরীরেও রাজপুতের রক্ত আছে৷ দরকারে আমিও মানুষ মারতে পারি৷ আমি ঠিক তিন গুনব৷’
রানিমা গুনতে শুরু করলেন, ‘এক...দুই...৷’
এবার ভয় পেয়ে গেল যোধ রাও৷ সে বলে উঠল, ‘ছোটরাজা বিল্লি মহলে গেছেন৷’
পরমুহূর্তেই রানিমা বন্দুকটা ঘুরিয়ে তার বাঁট দিয়ে আঘাত করলেন যোধ রাওয়ের মাথায়৷ ছিটকে পড়ল যোধ রাও৷ রানিমা এরপর যেন অনেকটা আর্তনাদের স্বরেই বলে উঠলেন, ‘দুপুরে মিঠাইওয়ালার দোকানে খবরটা যখন শুনলাম তখন ঠিক এই আশঙ্কাই করছিলাম৷ আজ এর নিষ্পত্তি করতে হবে৷’
এ-কথা বলে তিনি ঐশিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি এসো আমার সঙ্গে, চান্দেলের কাছে যাব আমি৷ সেখানে গেলে তুমি জানতে পারবে কেন তোমার পেটের বাচ্চাকে মারতে চেয়েছি আমি৷’
ঐশিকা পুরো ব্যাপারটাতে হতভম্ব৷ সে দাঁড়িয়ে রইল৷
তা দেখে রানিমা ধমকের স্বরে বলে উঠলেন, ‘এসো বলছি৷ ব্যাপারটা তোমার জানা দরকার৷’
কিছুটা রানিমার হাতের উদ্যত বন্দুকের ভয়ে, আর কিছুটা ছোটরাজাকে সামনে রেখে রানিমার ওষুধ মেশানোর ব্যাপারটা ফয়সালা করার জন্য ঐশিকা বলল, ‘ঠিক আছে চলুন৷’
রানিমার সঙ্গে কবুতর মহল ত্যাগ করল ঐশিকা৷
আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে৷ সেই আলোতে দাঁড়িয়ে আছে নির্জন পরিত্যক্ত প্রাচীন হাবেলিগুলো৷ কেমন যেন ভৌতিক অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা! কোথাও কোনও শব্দ নেই৷ হাবেলিগুলোর সর্পিল গলি বেয়ে বন্দুক হাতে রানিমা এগোতে থাকলেন৷ তাঁকে অনুসরণ করল ঐশিকা৷ অবশেষে রানিমা পৌঁছে গেলেন সেই বিল্লি মহলের সামনে৷
বাড়িটার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন রানিমা৷ মনে হয় তিনি শোনার চেষ্টা করলেন, হাবেলির ভিতর থেকে কোনও শব্দ ভেসে আসছে কিনা?
না, কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না বাড়ির ভিতরে৷ অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আছে বিল্লি মহলে৷ শুধু বিন্দু বিন্দু আলো যেন নড়ে বেড়াচ্ছে কার্নিসের মাথায়, দোতলার অলিন্দে, অথবা নীচের বারান্দায়৷ বিড়ালের চোখ৷
রানিমা ইশারায় কোনও শব্দ না-করতে বললেন ঐশিকাকে৷ তারপর বন্দুকটা উঁচিয়ে ধরে ঐশিকাকে নিয়ে উঠে পড়লেন বিল্লি মহলের অন্ধকার অলিন্দে৷ একের পর এক ঘর, অলিন্দে ছোটরাজাকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তিনি৷ এ-জায়গার প্রতিটা ঘর-অলিন্দ কত চেনা ঐশিকার৷ এ-জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছোটরাজার সঙ্গে ঐশিকার মিলনের কত স্মৃতি৷ জায়গাটাই এখন কত যেন অচেনা লাগছে তার কাছে৷ কেমন এক অপার্থিব পরিবেশ বিরাজ করছে চারপাশে! শুধু মাঝে মাঝে সেই বিন্দু বিন্দু আলো নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে৷ অন্ধকারের সঙ্গে নিঃশব্দে পদচারণা করছে এ-হাবেলির বাসিন্দারা, মার্জারের দল৷
যার খোঁজে রানিমা এসেছেন অবশেষে একসময় তার সন্ধান মিলল৷ নানা ঘর ঘুরে বাড়ির পিছনের অংশের অলিন্দে এসে একটা থামের কাছে গিয়েই থমকে দাঁড়ালেন রানিমা৷ থামের আড়ালে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তিনি আঙুল দিয়ে থামের ও-পাশটা দেখালেন৷
ঐশিকাও থামের আড়াল থেকে তাকাল সেদিকে৷ থামের ওপাশেই চারপাশ ঘেরা বাঁধানো একটা উন্মুক্ত জায়গা৷ মাথার ওপর থেকে চাঁদের আলো সরাসরি এসে পড়েছে সেখানে৷ একটা পাথরের বেদিতে বসে আছে ছোটরাজা চান্দেল সিং৷ বসার ভঙ্গিমাটা একটু অদ্ভুত৷ মাথাটা একদম কোলের ওপর ঝোঁকানো৷
রানিমা যেন অনেকটা স্বগক্তির স্বরে বললেন, ‘শেষপর্যন্ত বাপ-ঠাকুর্দার পথ-ই ধরল ও৷ শুধু পায়রাতে ওর সাধ মিটল না৷ ওর জন্যই তো এত পায়রা পোষা বাড়িতে৷’
এরপর তিনি ঐশিকাকে বললেন, ‘ভালো করে খেয়াল করো তোমার প্রেমিকের দিকে’ ছোটরাজার দিকে৷
ছোটরাজার কোলে যেন একটা কী আছে! ছোট পুতুলের মতো একটা পা ঝুলছে না ছোটরাজার কোল থেকে? শিশু, নাকি পুতুল, ছোটরাজা চান্দেলের কোলে? একটা ছোট্ট বাচ্চাই তো মনে হচ্ছে!
চান্দেল কি তবে বিবাহিত? সন্তান আছে তার? চান্দেল চুমু খাচ্ছে তাকে? এ জন্যই কি রানিমা ঐশিকার সঙ্গে ছোটরাজার বিয়েতে বা তার সন্তান ধারণে সম্মত নন? মুহূর্তের মধ্যে এ-প্রশ্ণগুলো ঘুরপাক খেয়ে গেল ঐশিকার মনে৷ সে আর উত্তেজনার চাপ সহ্য করতে পারল না৷ থামের আড়াল থেকে লাফিয়ে নেমে এগোল ছোটরাজার দিকে...
ঐশিকার পায়ের শব্দে হুঁস ফিরল ছোটরাজার৷ কোলের থেকে মুখ উঠিয়ে ছোটরাজা চান্দেল তাকাল ঐশিকার দিকে৷ ছোটরাজার কটা চোখ এখন ঠিক বিড়ালের মতোই জ্বলছে৷ তার কোলে যে আছে সে একটা নগ্ণ শিশু৷ হয়তো বা এক বছর বা তার কাছাকাছি বয়স হবে তার৷ ঐশিকাকে দেখামাত্রই ছোটরাজা শিশুটার নিস্পন্দ ছোট্ট শরীরটাকে বেদির ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল৷ চাঁদের আলো এসে পড়েছে ছোটরাজা চান্দেলের মুখে৷ সেই আলোতে ঐশিকা স্পষ্ট দেখতে পেল ছোটরাজার ঠোঁটের কষের একপাশ বেয়ে একটা রক্তধারা চিবুক ছুঁয়ে নামছে গলার দিকে!
নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ঐশিকা৷ ব্যাপারটা সে এবার ধরে ফেলেছে৷ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সে ছোটরাজাকে বলল, ‘তুমি বাচ্চাটার রক্ত খাচ্ছ?’
মুহূর্ত খানেক চুপ করে থাকল ছোটরাজা৷ তারপর যেন একটু কাতর কণ্ঠে বলল, ‘তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না৷ আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি৷ এ ভালোবাসায় কোনও মিথ্যা নেই৷ আমি কোনও প্রেতাত্মা নই৷ আমিও মানুষ৷ এ আমাদের বংশের নেশা...৷’
ঐশিকা তার কথা শুনে আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘না! তুমি মানুষ নও৷ মানুষ হলে কেউ মানুষের রক্ত খেতে পারে?’
ছোটরাজা এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু পর মুহূর্তে বন্দুকের শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ৷ গুলি চালিয়ে দিয়েছেন রানিমা৷ আর তার আঘাতে ছোটরাজার দেহটা ছিটকে পড়ল কিছুটা তফাতে৷
ঘটনাগুলোর অভিঘাতে যেন পাথরের মূর্তি বনে গেল ঐশিকা৷ রানিমাও এবার অলিন্দ ছেড়ে নীচে নেমে এলেন৷ জলের ধারা গড়াচ্ছে তাঁর চোখের কোণ বেয়ে৷ ঐশিকার কাঁধে হাত রেখে তিনি ছোটরাজার দেহটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাজ শেষ৷ শেষ পর্যন্ত আমাকে করতে হল৷ বাচ্চা নিখোঁজের ব্যাপারটা আমি দুপুরে বাইরে বেরিয়েই শুনেছিলাম...৷’
আতঙ্কিত স্বরে ঐশিকা বলে উঠল, ‘ছোটরাজা কি মানুষ? নাকি কোনও প্রেতাত্মা?’
রানিমা বললেন, ‘না, মানুষ-ই৷ আমি ওকে গর্ভে ধারণ করেছিলাম৷ তবে বংশ পরম্পরায় ওরা বিশেষ ধরনের মানুষ৷ অনেকটা বিড়ালের স্বভাবজাত৷ কটা চোখ, রোমশ দেহ, ছোট ছোট তীক্ষ্ন দাঁত, পায়রা ধরে খায়৷ আর এই পায়রার রক্তের স্বাদ পেতে পেতেই এক সময় মানুষের রক্তেও আকৃষ্ট হয় ওরা৷ শুনেছি ওর কোনও এক পূর্বপুরুষ নাকি একটা গর্ভবতী বিড়ালকে গুলি করে মেরেছিলেন এই বিল্লি মহলে৷ তারপর থেকেই এমন সন্তান জন্ম নেয় এ-বংশে৷ তোমার গর্ভেও যে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, সে-ও...৷’
রানিমা কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ ছোটরাজার দেহটা নড়ে উঠল৷ উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে ছোটরাজা বলে উঠলেন, ‘আমাকে তুমি বাঁচাও ঐশিকা৷ আমাদের ভালোবাসাকে গর্ভে ধারণ করেছ তুমি৷ আমি যা-ই হই না কেন, আমাদের ভালোবাসা মিথ্যা নয়, মিথ্যা নয়...৷’
ছোট রাজাকে আবার উঠে বসার চেষ্টা করতে দেখে, তার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে যেন কঠিন হয়ে উঠল রানিমার মুখ৷ ঐশিকা হয়তো বা নিজের অজান্তেই এগোতে যাচ্ছিল তার সন্তানের পিতার দিকে৷ কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে আবার গর্জে উঠল রানিমার হাতের বন্দুক৷ ছোটরাজার দেহটা মাটিতে পড়ে-থাকা অবস্থাতেই পাক খেল কয়েকবার৷ এক অদ্ভুত আর্তনাদ বেরিয়ে এল ছোটরাজা চান্দেলের গলা থেকে৷ যেন কোনও বিড়ালের-ই আর্তনাদ! স্থির হয়ে গেল ছোটরাজার দেহ৷
কিন্তু ছোটরাজার সেই মৃত্যু-আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গেই একটা অদ্ভুত ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটল৷ হঠাৎ-ই যেন জেগে উঠল বিল্লি মহল৷ যেখানে যত বিড়াল ছিল তারা ছোটরাজার সেই কণ্ঠস্বর শুনে একসঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল৷ তারপর তারা ছুটে আসতে লাগল অন্ধকার হাবেলির ভিতর থেকে, অথবা দোতলার কার্নিস-অলিন্দ থেকে লাফিয়ে পড়ল ঐশিকারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে৷ অনেক অনেক বিড়াল! বিল্লি মহলের সব বিড়াল এসে সমবেত হল সেখানে৷ একবার তারা তাকাল মাটিতে পড়ে থাকা নিস্পন্দ ছোটরাজার শরীরের দিকে৷ তারপর একসঙ্গে বিড়ালগুলো চিৎকার করে উঠল৷
না, করুণ স্বর নয়, ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ন এক রক্ত জল-করা ডাক৷ আর তার পরই তারা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানিমার ওপর, তাঁকে আঁচড়ে কামড়ে শেষ করার জন্য৷ গুলিহীন বন্দুক খসে পড়ল রানিমার হাত থেকে৷ তাঁকে ফালা ফালা করতে শুরু করছে বিড়ালগুলো৷ এ-অবস্থার মধ্যেই রানিমা বলে উঠলেন, ‘ওরা আমাকে বাঁচতে দেবে না, ওদের রাজাকে মেরে ফেলেছি আমি৷ কিন্তু ওরা তোমাকে এখন মারবে না৷ রাজার সন্তানকে যে গর্ভে ধারণ করে আছ তুমি৷ তুমি পালাও এখান থেকে৷ কিন্তু তোমার গর্ভের সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখো না৷ সে-ও তার বাপের মতোই হবে৷ মেরে ফেলো, মেরে ফেলো তাকে৷’
কথাগুলো বলে মাটিতে পড়ে গেলেন রানিমা৷ বিড়ালগুলো জান্তব আক্রোশে ছিঁড়তে লাগল তাঁর দেহ৷
ঐশিকা এবার সম্বিত ফিরে পেয়ে ছুটতে শুরু করল বিল্লি মহলের বাইরে যাবার জন্য৷ বিড়ালগুলো কিন্তু তাকে বাঁধা দিল না...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন