হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

স্টেটবাসের পিছনের সিটে বসে জানলার বাইরে তাকিয়েছিল নবারুণ৷ ইচ্ছা করেই পিছনের আসনটা বেছে নিয়েছে নবারুণ৷ যাতে সহযাত্রীদের দৃষ্টি কম পড়ে তার ওপর৷
এ-দুটো বছর ধরে বহুবার টেলিভিশন চ্যানেলে, সংবাদপত্রের পাতায় ছবি ছাপা হয়েছে তার৷ আজকাল কেউ তার দিকে তাকালেই নবারুণের মনে হয় লোকটা তাকে চিনে ফেলল না তো? তার দিকে তাকিয়ে লোকটা মনে মনে ভাবছে না তো যে—আরে, এই তো সেই অর্থলোভী নরপিশাচ ডাক্তার নবারুণ গুপ্ত! যার জন্য সরকারি হাসপাতালে একটা ফুটফুটে বাচ্চা ছেলের প্রাণ গেল!
হ্যাঁ, এই অর্থলোভী, অবিবেচক, দায়িত্বজ্ঞানহীন, নরপিশাচ—এধরনের বিশেষণগুলোই তার সম্পর্কে ব্যবহৃত হত সংবাদমাধ্যমের আলোচনায়৷ সংবাদমাধ্যমে কলঙ্কের খবর যত ফলাও করে ছাপা হয় কলঙ্ক মোচনের খবর তেমনভাবে ছাপা হয় না৷ মেডিকেল কাউন্সিল, আইন, আদালত তাকে নির্দোষ বললেও মানুষের কাছে সে খবর তেমনভাবে পৌঁছোয়নি৷ সমাজের চোখে হয়তো সে ঘৃণ্য মানুষ হিসেবেই সারাজীবন রয়ে যাবে৷
তবে এর চেয়েও বড় ধাক্কা মালবিকার মৃত্যুটা৷ ঘটনার চাপ নিতে পারেনি সে৷ প্রথমে সে নিজেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে নিল৷ সন্তানসম্ভবা ছিল সে৷ হয়তো সামাজিক লজ্জার ভয়ে এরপর সে চলে গেল পৃথিবী থেকেই৷ গত দু’বছরে হাসপাতালে সেই শিশুমৃত্যুর ঘটনাটা একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেল নবারুণের জীবনটাকে৷
মসৃণ পিচগলা রাস্তা দিয়ে উল্কার গতিতে ছুটে চলেছে বাস৷ হু হু করে বাতাস ঢুকছে জানলা দিয়ে৷ রাস্তার দু’পাশে ফাঁকা ফাঁকা জমি, কোথাও কাশফুলের বন৷ তারই মাঝে কোথাও কোথাও চোখে পড়ছে পানশালা৷ ঝাঁ-চকচকে রিসর্ট, একলা দাঁড়িয়ে থাকা নির্মীয়মাণ বহুতল, বহুজাতিক সংস্থার হোর্ডিং—মোবাইল, বাইকের বিজ্ঞাপন৷ শহর এখন হাত বাড়িয়েছে গ্রামের দিকে৷
যদিও নবারুণের মাঝে মাঝেই মনে পড়ছে গত দু-বছর ধরে চলা বিভিন্ন ঘটনা বা দুর্ঘটনার নানা অনুষঙ্গ, বিশেষত মালবিকার সেই মৃত্যু-শীতল মুখটার কথা৷ তবুও বহুদিন পর সেসব থেকে কিছুটা মুক্তির আনন্দ যেন অনুভব করছে নবারুণ৷ প্রফেসর ঘটকও বলেছেন যে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে৷ এখানে তার কোনও অসুবিধা হবে না৷ নার্সিংহোমেই তার থাকার ব্যবস্থা হবে৷ ইচ্ছে না হলে নার্সিংহোম ছেড়ে বাইরে যাওয়ার দরকার নেই৷
বাইরের দিকেই তাকিয়ে বসেছিল নবারুণ৷ কলকাতা থেকে সারারাত একইভাবে বসে এসেছে সে৷ মাঝরাতে একবার একটা ধাবায় বাস থেমেছিল৷ তখন শুধু একবার চা খেতে নেমেছিল সে৷ বেলা প্রায় দশটা বাজে, এমন সময় হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বাসের গতি কমে এল৷ কনডাকটর ঘাড় ফিরিয়ে নবারুণকে বলল, ‘দাদা, এগিয়ে আসুন৷ আপনার নার্সিংহোম এসে গেছে৷’
সিট ছেড়ে ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে উঠে দাঁড়াল নবারুণ৷ এক মিনিটের মধ্যেই বাসটা তাকে রাস্তার পাশে নামিয়ে দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ তুলে চলে গেল৷
কিছুটা তফাতেই দেখা যাচ্ছে তিনতলা নার্সিংহোমটা৷ মাথার ওপর সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে লেখা ‘ঘটক নার্সিংহোম’৷ দূর থেকেই বাড়িটার পিছন দিকে প্রাচীরঘেরা বিঘে চারেক লম্বা একটা বিশাল জমি চোখে পড়ছে৷ সম্ভবত সেটা নার্সিংহোমের জমির-ই অংশ৷ কালো রঙের একটা এসইউভি দাঁড়িয়ে আছে নার্সিংহোমের সামনে, তবে লোকজন তেমন চোখে পড়ছে না৷
তিনতলা সাদা রঙের বাড়িটাকে কেমন যেন বিবর্ণ-বিষণ্ণ্ লাগছে৷ তার ঝাঁ-চকচকে ভাবটা নেই৷ হয়তো বা একদম রাস্তার গা ঘেঁষেই বিল্ডিংটা দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে ধুলো ধোঁয়ায় অমন বিবর্ণ দেখাচ্ছে তাকে৷ নবারুণ কিছুটা হেঁটে নার্সিংহোমের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল৷ ভিতর থেকে কোনও শব্দ আসছে না৷ মাথার ওপর একবার তাকাল নবারুণ৷ দোতলা-তিনতলার ঘরগুলোর সার সার কাচের জানলাগুলো ভিতর থেকে সব বন্ধ৷
নবারুণকে দেখতে পেয়ে গেটের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সবুজ পোশাক পরা একজন সিকিউরিটির লোক৷ দরজা আগলে দাঁড়িয়ে সে নবারুণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ণ করল, ‘পেশেন্ট পার্টি? নাকি ওষুধ কোম্পানির লোক?’
নবারুণ জবাব দিল, ‘আমি ডাক্তার অম্বরীশ ঘটকের কাছে এসেছি৷’
‘কী কাজ?’ সন্দিগ্দ চোখে আবার প্রশ্ণ করল লোকটা৷
নবারুণ জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগে নার্সিংহোমের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার ঘটক৷ নবারুণ তাঁকে প্রায় সাত-আট বছর পর দেখল৷ তাঁকে সে শেষ চাক্ষুষ করেছিল যখন সে মেডিকেল কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র ছিল৷ তাদের প্রফেসর ছিলেন ডাক্তার ঘটক৷ এই সাত-আট বছরে বয়স তাঁর কিছুটা বেড়েছে, মাথার টাকটাও যেন কিছুটা বেড়েছে, জুলপিতে পাক ধরেছে৷ কিন্তু তাঁর চেহারা-পোশাকেও যেন আভিজাত্য বেড়েছে অনেকটা৷ পরনে সাদা রঙের দামি স্যুট৷ সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে হাতের রোলেক্স, চোখের সোনার ফ্রেমের বাইফোকালটা৷ নবারুণকে দেখতে পেয়েই তিনি সেই গেটম্যানকে বললেন, ‘ওঁনাকে ভিতরে ঢুকতে দাও৷ উনি আমাদের নতুন ডাক্তারবাবু৷’
লোকটা কথাটা শুনে একটু লজ্জা পেয়ে, ‘আসুন আসুন স্যার’ বলে দরজা খুলে দিল৷ হাতের ব্যাগটাও নিতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু নবারুণ ইশারায় থামাল তাকে৷ নবারুণ প্রবেশ করল নার্সিংহোমে৷ ডাক্তার ঘটক কয়েক-পা এগিয়ে এলেন তার সামনে৷ তীক্ষ্ন, অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে একবার তিনি নবারুণকে দেখে নিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ওয়েলকাম মাই বয়৷ এসো, ভিতরে এসো৷
নবারুণের কাঁধে ভরসার হাত, বিশ্বাসের হাত৷ অনেকদিন পর কেউ এভাবে হাত রাখল তার কাঁধে৷ নবারুণের বন্ধু-বান্ধব, ছেড়ে-আসা হাসপাতালের কলিগরা তো কবেই তার সঙ্গ ত্যাগ করেছে, বদনামের অংশীদার হওয়ার ভয়ে বা ঘৃণাতে৷ নবারুণ ঝুঁকে পড়ে তার স্যারকে প্রণাম করতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু তাকে তুলে ধরে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘এসবের কোনও দরকার নেই৷ মেডিকেল কলেজে তুমি আমার প্রিয় ছাত্র ছিলে, এখনও তাই আছ৷ চলো, আগে ভিতরে চলো৷’
ডাক্তার ঘটকের সঙ্গে বাড়িটার ভিতর পা রাখল নবারুণ৷ দরজার পাশেই রিসেপশন, ক্যাশ কাউন্টার, কিন্তু কেউ কোথাও নেই৷ কয়েক পা এগিয়ে একপাশে একটা লিফট৷ তার ঠিক বিপরীতে ওপরে ওঠার সিঁড়ি৷ সামনে একটা লম্বা প্যাসেজ চলে গিয়েছে নার্সিংহোমের ভিতরে৷ আর তার দু’পাশে সার সার ঘর৷ তার কোনওটা এক্স-রে রুম, কোনওটা প্যাথলজি রুম, দরজার গায়ে লেখা আছে৷ সেখানেই একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন ডাক্তার ঘটক৷
ঘরটা তার অফিসরুম৷ নবারুণকে নিয়ে তিনি প্রবেশ করলেন সেই ঘরে৷ কাচের টেবিল-ঘিরে সার সার চেয়ার৷ নবারুণকে তার একটাতে বসতে বলে তিনি গিয়ে বসলেন তাঁর নিজের গদি আঁটা রিভলভিং চেয়ারে, নবারুণের মুখোমখি৷ ডাক্তার ঘটক যেখানে বসলেন ঠিক তাঁর মাথার পিছনে এক সন্ন্যাসীর ছবি৷ তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন ফোটো ফ্রেমের ভিতর থেকে৷ যেন তিনি তাকিয়ে আছেন নবারুণের দিকেই৷
ডাক্তার ঘটকের ঘরে টাঙানো এই ছবিটা দেখে বেশ অবাক-ই হল নবারুণ৷ মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ে গেল একটা পুরোনো ঘটনা৷ মেডিকেল কলেজে তার এক সহপাঠী ছিল সুপ্রিয় বলে৷ কোনও এক গুরুদেবের শিষ্য ছিল সে৷ অপারেশন টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করার আগে অবশ্যই একবার সে তার গুরুদেবের ছবি পকেট থেকে বার করে প্রণাম করত৷ ব্যাপারটা একবার ধরা পড়ে গিয়েছিল প্রফেসর ঘটকের চোখে৷ সঙ্গে সঙ্গে তিনি সবার সামনেই সুপ্রিয়কে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘এই পেশেন্টকে যদি কেউ বাঁচাতে পারে তা হল মেডিকেল সায়েন্স৷ এই পেশেন্টের জীবন-মৃত্যু-আরোগ্য সবই নির্ভর করছে বিজ্ঞানের ওপর৷ আমাদের হাতের ওপর৷ তোমার ওই ছবির ওপর নয়৷ ছিঃ ছিঃ, তুমি না বিজ্ঞানের ছাত্র! সামনের দিনে এ-ঘটনা দেখলে তোমাকে ওটি থেকে বার করে দেব৷ ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে তুমি বরং তোমার গুরুদেবের আশ্রমে চলে যেও৷ অলৌকিকভাবে রোগীদের চিকিৎসা কোরো৷’
এহেন ডাক্তার ঘটকের মাথার পিছনে এজন্য সাধুসন্ন্যাসীর ছবি দেখে বেশ অবাক-ই হল নবারুণ৷ সে নিজে অবশ্য গুরুবাদ বা দৈববাদে বিশ্বাস না করলেও এসবকে অশ্রদ্ধাও করে না৷ কারণ, এক-এক মানুষের এক-এক বিশ্বাস৷ সে-বিশ্বাসকে ব্যক্তিগতভাবে অবিশ্বাস করলেও অশ্রদ্ধা করাও উচিত নয়৷
বেশ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলেন ডাক্তার ঘটক৷ তারপর একটা পেপার ওয়েট তুলে নিয়ে সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘অনেক বছর পর দেখা হল তোমার সঙ্গে৷ তুমি যখন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র তখনই তো চাকরি থেকে আমি রেজিগনেশন দিই৷ তারপর কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতা থেকে অনেক দূরে এখানে চলে আসি৷ প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল মেডিকেল কলেজের সবার সঙ্গে৷ তারপর যখন তোমার ঘটনাটা ঘটল তখন খবরের কাগজে, টেলিভিশনের পরদায় তোমার ছবি দেখে তোমাকে চিনলাম৷ খুব খারাপ লাগছিল তোমার ব্যাপারটা দেখে৷ আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না ঘটনাটা৷ সেসময় বেশ কয়েকবার তোমার টেলিফোন নম্বর জোগাড় করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি৷ কিন্তু দিনকয়েক আগে ঘটনাচক্রে তোমার নম্বরটা এক মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাছে পেয়ে যোগাযোগ করলাম তোমার সঙ্গে৷ তোমাকে আসতে বললাম আমার এখানে৷
তোমার ঘটনাটা সম্বন্ধে নানা খবর বেরিয়েছিল সংবাদমাধ্যমে৷ আমি জানি সবসময় সংবাদমাধ্যমের সব সংবাদ সঠিক হয় না৷ আসল ঘটনাটা কী ঘটেছিল তা আর একবার সংক্ষেপে জানতে চাই৷ নির্দ্বিধায় বলো৷ তোমার আশঙ্কার কোনও কারণ নেই৷ মেডিকেল কাউন্সিল, আদালত তো তোমাকে ক্লিনচিট দিয়েছে৷ তুমি আমার এখানে কাজ করবে অতীতে যাই ঘটুক না কেন৷’—একটানা কথাগুলো বলে নবারুণের উত্তরের প্রত্যাশায় চশমার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ডাক্তার ঘটক৷
নবারুণ একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করল৷—আপনাকে টেলিফোনে যা বলেছি সেটাই সত্যি স্যার৷ আমাদের সেই সরকারি হাসপাতালে ‘ওটি’-তে নাইট ডিউটি ছিল আমার৷ ঠিক দু’বছর আগে কালীপুজোর রাত৷ একজন এসে খবর দিল একজন পেশেন্ট এসেছে৷ বছর আটেক বয়সের একটা বাচ্চা ছেলে৷ হেড ইনজুরি৷ বাজি পোড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে গেছে৷ আমি অ্যাটেন্ড করলাম ছেলেটাকে৷ দেখলাম ওর মাথায় গভীর ক্ষত৷ স্টিচ করতে হবে৷ তাকে ওটিতে নিয়ে যেতে বলে আমি যখন তৈরি হয়ে ‘ওটি’-তে ঢুকতে যাচ্ছি, ঠিক তখন-ই মোবাইলে হাসপাতাল সুপারের মেজেস এল, ‘কাম শার্প, আর্জেন্ট ম্যাটার৷’
আমি সঙ্গে সঙ্গে সুপার সাহেবকে ফোন করতেই তিনি জানালেন, ‘এখনি আমার অফিসে আসতে হবে৷ বাইরে বেরোতে হবে৷’
আমি তাঁকে বললাম, ‘কিন্তু আমি তো এখন ‘ওটি’-তে ঢুকছি৷ হেড ইনজুরি নিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে এসেছে৷ স্টিচ করতে হবে৷’
তিনি বললেন, ‘আমি এখনই অন্য একজনকে সেখানে পাঠাচ্ছি৷’ কিন্তু তুমি চলে এসো এখনই৷’
সুপারের নির্দেশ৷ কাজেই একটু ইতস্তত করে আমি ছুটলাম পাশের বিল্ডিং-এ তাঁর অফিসে৷ আমি তাঁর চেম্বারে ঢুকলাম৷ আমাদের সরকারি হাসপাতালের গায়েই একটা নতুন নার্সিংহোম রয়েছে৷ সুপার সাহেব বললেন, আমাকে সেখানে এখনই একবার যেতে হবে৷ এক বিখ্যাত শিল্পপতির মেয়ে কার অ্যাক্সিডেন্টে পায়ে ইনজুরি নিয়ে সেখানে গেছে৷ ঢাকঢোল পিটিয়ে বিজ্ঞাপন করলেও তেমন পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি সেই নার্সিংহোমের৷ যে-সার্জেনরা নিয়োজিত হয়েছেন তাঁরা কালীপুজোর রাতে ডিউটিতে আসেননি৷ তাঁদের খবর পাঠানো হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাঁদের আসতে অন্তত একঘণ্টা সময় লাগবে৷ অন্য কেউ হলে সে নার্সিংহোম হয়তো পেশেন্টকে অন্য কোথাও যেতে বলত৷ কিন্তু ক্ষমতাবান বিশিষ্ট শিল্পপতির কন্যা বলে তাকে ফেরাতে পারেনি৷
সেই শিল্পপতির পলিটিক্যাল কানেকশন আছে শাসকদলের সর্বোচ্চ মহলে৷ আর সেই সূত্র ধরে ওই শিল্পপতি স্বাস্থ্যভবনের এক পদস্থ কর্তাকে ফোন করে সাহায্য চেয়ে৷ সেই অফিসার আবার সুপার সাহেবকে ফোন করেছেন একজন সার্জেনকে সেখানে পাঠাবার জন্য৷ কারণ আমাদের সরকারি হাসপাতালটা সেই নার্সিংহোমের কাছেই৷ সুপার সাহেবের কথা শুনে আমি তাকে বললাম, ‘কিন্তু স্যার, ডিউটি আওয়ার্সে এভাবে বাইরে যাওয়া কি ঠিক হবে? তাছাড়া আমি ওটিতে ছেলেটাকে ঢুকিয়ে এসেছি৷’
সুপার সাহেব বললেন, না-গেলে তাঁর আর আমার পরিণাম ভালো হবে না৷ সেই শিল্পপতি রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি৷ সেখানে গেলে আমার চিন্তার কিছু নেই৷ আর ওটি-তে এখনই অন্য একজন সার্জেনকে পাঠাচ্ছেন তিনি৷ তার কথার ওপর ভরসা করে কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসপাতালের সরকারি গাড়িতেই হাসপাতাল ছেড়ে সেই নার্সিংহোমে পৌঁছোলাম আমি৷
গিয়ে দেখি ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়৷ ধনীর দুলালি মদ্যপ অবস্থায় ধর্মতলার একটা পানশালা থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে ধাক্কা মেরেছিল রাস্তার ডিভাইডারে৷ গাড়িতে-বসা অবস্থায় তার বাঁ-পায়ের পাতা জখম হয়েছে৷ দুটো স্টিচ-ই যথেষ্ট৷ কিন্তু ওই সামান্য কাজ করতেই ঘণ্টা দুই সময় লেগে গেল৷ একে সে মদ্যপ অবস্থায় ছিল, তার ওপর বাপের আদরের মেয়ে৷ কিছুতেই সে পা ছুঁতে দিতে রাজি হচ্ছিল না৷ চিৎকার করছিল, অশ্রাব্য গালিগালাজ করছিল৷
কাজ মিটিয়ে আমি যখন হাসপাতালে ফিরলাম তখন প্রায় ঘণ্টা তিনেক সময় কেটে গেছে৷ সেখানে ঢুকেই শুনলাম ব্যাপারটা৷ আমার ওটি-তে রেখে আসা সেই বাচ্চা ছেলেটা নাকি মারা গেছে! আসলে সুপার সাহেব ওটি-তে কাউকে পাঠাতে ভুলে গিয়েছিলেন৷ রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে তার৷
পরদিন কীভাবে যেন খবরটা চাউর হয়ে গেল মিডিয়াতে৷ সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার পেশেন্ট ফেলে টাকার লোভে নার্সিংহোমে শিল্পপতির মেয়ের চিকিৎসা করতে গিয়েছিল৷ আমার লোভ আর কর্তব্যে অবহেলার জন্যই মৃত্যু হয়েছে বাচ্চাটার৷ অথচ আমি সেই নার্সিংহোমে থেকে একটা পয়সাও নিইনি৷ আমার কোনও যোগাযোগ-ই ছিল না ওই নার্সিংহোমের সঙ্গে৷ খবর মিডিয়াতে প্রচার হওয়ামাত্রই বিরোধী রাজনৈতিক দল, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবীরা হইহই করে মাঠে নেমে পড়লেন৷ অবস্থা বেগতিক দেখে সুপার সাহেবও ঘটনাটার দায় ঝেড়ে ফেলে বললেন, তিনি নাকি জানতেন-ই না ব্যাপারটা! আর তারপর...
দীর্ঘক্ষণ কথাগুলো বলে একটু চুপ করে রইল নবারুণ৷ তার চোখে ভেসে উঠল সে-সময়ের ঘটনাগুলো৷ তার সাসপেনশন, মামলা-মোকদ্দমা, মিডিয়ার আক্রমণ, অবসাদে মালবিকার আত্মহত্যা...৷ শেষের দিকে একদিন সে বলেছিল, ‘কী হবে আমার? কী হবে পেটের বাচ্চাটার?’
আমার এক পেশেন্ট ছিলেন নামকরা অ্যাডভোকেট৷ সেদিন হাসপাতালে ডিউটিতে গেলেও অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টারে সই করিনি৷ সেই সূত্র ধরেই তিনি শেষপর্যন্ত আমায় বাঁচিয়ে দিলেন৷ আমি চাকরি ফিরে পেলেও বুঝতে পারলাম ওই হাসপাতালে চাকরি করা আর আমার সম্ভব নয়৷ রেজিগনেশন দিয়ে দিলাম৷
কথাগুলো বলে চুপ করে গেল নবারুণ৷ বেশ খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতা৷ মাথা নীচু করে বসেছিল নবারুণ৷ ডাক্তার ঘটক তার উদ্দেশে বললেন, ‘চিয়ার আপ৷ অনেকের জীবনেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে৷ তারপর ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে৷ তাছাড়া আমি তোমার সঙ্গে আছি৷’
নবারুণ বলল, ‘আপনার ভরসাতেই তো এখানে এলাম৷ কিন্তু এখানে কেউ আমাকে চিনে ফেলবে না তো? আপনাকে কোনও বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না তো?’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘ওসব নিয়ে চিন্তা কোরো না৷ পাবলিক মেমরি খুব শর্ট৷ হয়তো তারা ইতিমধ্যেই ঘটনাটা ভুলতে শুরু করেছে বা ভুলেই গেছে৷ তোমার ডাক্তার মাইতির সেই ঘটনার কথা খেয়াল আছে? যে রোগীর পেটের মধ্যে নিড্ল রেখে স্টিচ করে দিয়েছিল৷ তাই নিয়ে মিডিয়াতে কত হইচই হয়েছিল! কিন্তু সে এখন চুটিয়ে প্র্যাকটিস করছে৷ তিনটে নার্সিংহোমে বানিয়েছে৷ তাছাড়া এটা কলকাতা শহর নয়৷ এখানে মিডিয়ার দাপাদাপি নেই, কোনও সমস্যা হবে না তোমার৷’
এ কথা বলার পর ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘এবার এখানকার কথা বলি তোমাকে৷ এখানেই ক’টা দিন থাকতে হবে তোমাকে৷ খাবারের ব্যবস্থা কেয়ারটেকার মানে ওই গেটম্যান করে দেবে৷ আমার নতুন নার্সিংহোমটা শহরের ভিতর৷ সেটা ওপেন হলেই সেখানে শিফট্ করবে তুমি৷ এই নার্সিংহোমে তোমার তেমন কাজ নেই৷ এটা বন্ধ করে দিচ্ছি৷ এখানে ঠান্ডা পানীয়র একটা বটলিং প্ল্যান্ট করব৷ যন্ত্রপাতি সব শিফট হচ্ছে এখান থেকে নতুন নার্সিংহোমে৷ এখানে নতুন কোনও রোগীকে অ্যাডমিট করা হচ্ছে না৷ দুজন মাত্র রোগী আছে এখানে৷ তাদের একজন বৃদ্ধ, বয়সজনিত অসুবিধার কারণে ভরতি আছে৷ অন্য একজন একটা মাঝবয়সি লোক৷ পা ভেঙেছে, ট্রাকশন দেওয়া আছে৷ হাউস ফিজিশিয়ান ডাক্তার দাস এসে দু’বেলা তাদের দেখে যান৷ ক’দিনের মধ্যে তাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে৷ আর আছে দুজন আয়া৷ নার্সিং-এর কাজটা তারাই করে৷ নতুন নার্সিং হোমটা চালু হলে তোমার কাজ শুরু হবে৷’
নবারুণ জানতে চাইল, ‘কত কাজ বাকি আছে তার?’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘খুব দ্রুত সেখানে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি৷ দেখা যাক! তার আগে একটা কাজ বাকি আছে৷’
এরপর ডাক্তার ঘটক হঠাৎ তার রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলো, এবার তোমাকে তোমার ঘরে নিয়ে যাই৷ সারারাত জার্নি করে এসেছ৷ বিশ্রাম নাও৷ আমাকে আবার স্টেশনে যেতে হবে একজনকে আনতে৷ বিকালে আমি আবার আসব৷’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার ঘটক৷ উঠে দাঁড়াল নবারুণও৷ সে-ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে ডাক্তার ঘটকের পিছনে হাঁটতে হাঁটতে নবারুণ বলল, ‘তাহলে আমার এখানে কোনও কাজ নেই বলছেন?’
ডাক্তার ঘটক হেসে বললেন, ‘না, নেই৷ তবে ইচ্ছা হলে পেশেন্ট দুজনের কেবিনে ভিজিট করতে পারো৷ একটু পালস প্রেশারগুলো দেখেটেখে দিও৷ পেশেন্টরা স্যাটিসফায়েড হবে দুজন ডাক্তারবাবু তাদের দেখতে আসছেন বলে৷’
ঘরটা নার্সিংহোমের ঠিক পিছন দিকে৷ অ্যাটাচড্ বাথ, বেশ ছিমছাম ঘর৷ ডাক্তার ঘটক তাকে এঘরে পৌঁছে দেওয়ার পর সে দুজন আয়া এসে দেখা করে গিয়েছিল নবারুণের সঙ্গে৷ মাঝবয়সি দুজন মহিলা৷ গেটের সেই ছেলেটাও এসেছিল খাবার দিতে৷ ননীগোপাল নাম তার৷ স্নান-খাওয়া সেরে, নবারুণ ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ তার যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকেল হয়ে গেছে৷
নবারুণ স্বপ্ণের মধ্যে মালবিকাকে দেখছিল৷ কোর্ট রুমে উইটনেস বক্সে দাঁড়িয়ে আছেন নবারুণ৷ অ্যাডভোকেটদের তীক্ষ্ন সওয়াল জবাব চলছে৷ চোখা-চোখা সব প্রশ্ণবাণ নিক্ষিপ্ত হচ্ছে নবারুণের উদ্দেশ্যে৷ আর কিছুটা তফাতে একটা কেঠো বেঞ্চে অন্যদের সঙ্গে আশঙ্কিত, বিধবস্ত মুখ নিয়ে বসে আছে মালবিকা৷ সেদিনই তাকে শেষবারের জন্য দেখেছিল নবারুণ এজলাসের ঘেরাটোপের মধ্যে৷
নবারুণের স্বপ্ণে আবার ফিরে এসেছিল দৃশ্যটা৷ মাঝে মাঝেই এ-স্বপ্ণটা দেখে নবারুণ৷ আজও দেখল৷ ঘুমটা ভাঙার পর৷ ঘুমটা ভেঙে যাওয়ার পর ধাতস্থ হতে বেশ কিছু সময় লাগল নবারুণের৷ আসলে মালবিকা নবারুণের জীবনকে এতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে তাকে এখনও মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না নবারুণ৷ এক-এক সময় তার মনে হয়—সব মিথ্যা, সব মিথ্যা, মালবিকা চলে যায়নি সে আছে, সে আছে...
জানলার বাইরে তাকাল নবারুণ৷ পড়ন্ত বেলায় একলা দাঁড়িয়ে আছে উঁচু প্রাচীর ঘেরা বিরাট জমিটা৷ স্বপ্ণটা দেখার পর আবার একটা বিষণ্ণ্তা ঘিরে ধরেছ নবারুণকে৷ তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল নবারুণ৷ তার ঘরের ঠিক পিছনেই একটা ছোট প্যাসেজ৷ তারপরই একটা ছোট গেট আছে৷ সেটা দিয়ে মাঠটাতে নেমে পড়ল সে৷ ভালো করে চারদিকে তাকাল নবারুণ৷ কেউ কোথাও নেই৷ তবে জমিটার একদম শেষ মাথায় বেশ কয়েকটা গাছ জটলা বেঁধে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে৷ গাছগুলো খুব বিশাল নয়, আবার ছোটও নয়৷ আর তার কিছুটা তফাতে প্রাচীরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ছোট আউট হাউস৷ নবারুণ হাঁটতে শুরু করল সেদিকে৷
ফাঁকা মাঠে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় সেদিকে পৌঁছে গেল সে৷ হ্যাঁ, আউট হাউসের মতোই একটা ঘর৷ সেটা বাইরে থেকে তালাবন্ধ৷ সে এরপর এগোল গাছের দঙ্গলগুলোর দিকে৷ পাঁচটা গাছ সেখানে যেন বৃত্তরচনা করে দাঁড়িয়ে আছে৷ তার মধ্যে দুটো গাছকে সে চিনতে পারল, বট আর অশ্বত্থ৷ বাকিগুলো অচেনা৷ গাছগুলোর ডাল-পাতা মিলেমিশে তাদের ভিতরের ফাঁকা জমিটার মাথায় একটা চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে৷ তবুও তারই ফাঁক গলে শেষ বিকেলের সূর্যকিরণ কীভাবে যেন এসে পড়েছে গাছে ঘেরা ভিতরের ছোট্ট জমিটাতে৷ সেখানে রয়েছে লাল রঙের একটা অনুচ্চ বেদি৷ ঠিক যেমন বেদির ওপর মূর্তি বসিয়ে পুজো-অর্চনা করা হয়, তেমন বেদি৷
জিনিসটা দেখে বেশ একটু অবাক হয়ে গেল নবারুণ৷ ডাক্তার ঘটক এখানে কোনও পুজোর ব্যবস্থা করেন নাকি! আবার হয়তো তিনি নন, হাসপাতালের কর্মীরাই হয়তো কোনও পুজোটুজো করেন—মনে মনে ভাবল নবারুণ৷
ডাক্তার ঘটকের কথা মনে পড়তেই হঠাৎ তার খেয়াল হল যে, তিনি বিকেলবেলা আসবেন বলেছেন৷ কথাটা মনে আসতেই নবারুণ সে-জায়গা ছেড়ে পা বাড়াল ঘরে ফেরার জন্য৷ জমিটা পেরিয়ে এসে নবারুণ আবার বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় মাথার ওপরে একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে ওপরদিকে তাকাল সে৷ নার্সিংহোমের তিনতলার একটা জানলা খোলা ছিল৷ সেটা হাত দিয়ে টেনে বন্ধ করল কেউ৷ তার চুড়ি-পরা হাতটাই শুধু এক ঝলক দেখতে পেল নবারুণ৷ হয়তো সে সেই আয়া দুজনের মধ্যেই কেউ হবে৷
নিজের ঘরের এসে ঢুকল নবারুণ৷ বাইরে বেলা দ্রুত পড়ে আসছে৷ শরতের বেলা৷ দুর্গাপুজো শেষ হয়ে গেছে দিন দশেক আগে৷ সামনে কালীপুজো আসছে৷ মানে সেই ঘটনার দু’বছর পূর্ণ হবে আর ক’দিন পর৷ জানলার বাইরে তাকিয়ে বাইরের সন্ধ্যা-নামা দেখতে লাগল নবারুণ৷ ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে মাঠের বুকে৷ সেদিকেই তাকিয়ে ছিল নবারুণ৷ হঠাৎ একটা গাড়ির শব্দ শুনতে পেল৷ একটা এসইউভি গাড়ি ঢুকল মাঠে৷ গাড়িটা সম্ভবত ডাক্তার ঘটকের৷
নার্সিংহোমের কম্পাউন্ডে ঢোকার পর একটা চওড়া প্যাসেজ আছে বিল্ডিং-এর পিছন দিকে যাওয়ার জন্য৷ সেখান দিয়েই গাড়িটা ঢুকে পিছনের জমিটা দিয়ে গোটা এগোচ্ছে জমিটার শেষ প্রান্তের দিকে৷ গাড়িটা গিয়ে থামল জমিটার শেষ প্রান্তের সেই আউট হাউসের মতো ঘরটার সামনে৷ গাড়ি থেকে নামল দুজন৷ আলো মরে এসেছে৷ সেই আবছা আলোতে দূর থেকে একজনকে আন্দাজে চিনতে পারল নবারুণ৷ তিনি ডাক্তার ঘটক৷
গাড়ি থেকে নেমে লোক দুজন সেই ঘরটাতে ঢুকল৷ নবারুণ সেদিকে তাকিয়ে রইল৷ বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল৷ অন্ধকার নেমে আসছে৷ একসময় একজন বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠল৷ তারপর গাড়ি আবার ফিরে আসতে লাগল৷ নবারুণের ঘরের পাশ কাটিয়ে আবার নার্সিংহোমের সামনের দিকে চলে গেল গাড়িটা৷ এর পাঁচ মিনিটের মধ্যে নবারুণের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল৷ ননীগোপাল এসে তাকে জানাল, ‘স্যার এসেছেন৷ তিনি আপনাকে তাঁর চেম্বারে ডাকছেন৷’
নিজের সেই গদি আঁটা চেয়ারে বসেছিলেন ডাক্তার ঘটক৷ নবারুণ তাঁর ঘরে ঢুকতেই তিনি ইশারায় বসতে বললেন তাকে৷ বসল নবারুণ৷ ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘কী করছিলে তুমি? ঘুমোচ্ছিলে? আমি এই একটু আগেই এখানে এলাম৷’
নবারুণ বলল, দুপুরে একটু ঘুমোলাম৷ বসেছিলাম ঘরে৷ আপনাকে তো মনে হয় দেখলাম পিছনের জমিটাতে যেখানে ঘরটা আছে সেখানে যেতে৷’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘হ্যাঁ, গুরুদেব এসেছেন৷ আমার মাথার ওপর যে ছবিটা দেখছ ওটা তাঁরই৷ ওঁকেই আনতে গিয়েছিলাম রেলস্টেশনে৷ ট্রেন লেট ছিল৷ তাই আসতে একটু দেরি হল৷ উনি ক’দিন থাকবেন এখানে৷ বছরে একবার আসেন৷ ওই ঘরটাতে ক’দিন থাকেন৷’
একদা প্রবল নাস্তিক, মেডিকেল কলেজের ভূতপূর্ব প্রফেসরের কথা শুনে এবার স্পষ্টতই বিস্মিতভাবে তাকাল নবারুণ৷ ডাক্তার ঘটকের সে-দৃষ্টি পাঠ করতে অসুবিধা হল না৷ তিনি বললেন, ‘কী ভাবছ? তোমাদের মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ঘটকের সঙ্গে আজকের আমাকে ঠিক মেলাতে পারছ না তাই না? আসলে জীবন বড় বিচিত্র৷ একদিন আমি বুঝতে পারলাম আমাদের চেনা-জানা জীবনের পরিধির বাইরেও এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা জানি না৷ এ-কথাটা আমি জানতাম না যদি গুরুদেবের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হত৷ আমরা ক্ষুদ্র মানুষ, দু’পাতা বিজ্ঞানের বই পড়ে নিজেদের পণ্ডিত মনে করি৷ অথচ আমাদের সে জ্ঞান কত তুচ্ছ৷ তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই যে আজ আমি এই নার্সিংহোম, দু-দুটো কোল্ড স্টোরেজ, একটা প্যাথলজি ক্লিনিকের মালিক৷ কলকাতার নিউ আলিপুরে একটা দু’হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট আর এখানে শহরে একটা তিনতলা বাড়ি করেছি৷ নতুন একটা নার্সিংহোম খুলতে যাচ্ছি আর এখানে একটা বটলিং প্ল্যান্ট৷
অথচ কী ছিলাম আমি! সরকারি হাসপাতালের একটা দেড় কামরার কোয়ার্টারে থাকতাম, আর আমার হুগলির গ্রামে সামান্য কিছু জমি ছিল৷ আজ আমাকে যা দেখছ, আমার যা হয়েছে তা সবই গুরুদেবের কৃপায়৷ ভাগ্যিস তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল! তোমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব৷ আশীর্বাদ নিও৷ তোমার সব দুর্যোগ কেটে যাবে৷’
তাঁর কথা শুনে নবারুণ জানতে চাইল, ‘কীভাবে আপনার সঙ্গে পরিচয় হল তাঁর? ওনার নাম কী? কোথায় থাকেন?’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘ওঁনাকে সবাই ‘অঘোরবাবা’ বলে ডাকেন৷ আমিও তাই বলি৷ তন্ত্রসিদ্ধ যোগীপুরুষ৷ তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম জানি না৷ সেটা জিগ্যেস করাও উচিত নয়৷ উনি থাকেন বেনারসে৷ ওখানে ‘হরিশচন্দ্র ঘাট’ বলে একটা ঘাট আছে হয়তো শুনেছ৷ শ্মশানঘাট, যেখানে রাজা হরিশচন্দ্র চণ্ডালের কাজ করতেন বলে কথিত৷ সেখানে এক কুটিরে থাকেন গুরুদেব৷
ওঁর সঙ্গে পরিচয় বেশ অদ্ভুতভাবে৷ গঙ্গাসাগর মেলার সময় পুণ্যার্থীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মেডিকেল ক্যাম্প করা হয় নিশ্চয় জানো৷ তার ইনচার্জ করে আমাকে পাঠানো হয়েছিল সেখানে৷ আমি তখন মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত৷ প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতাম না আমি৷ সরকারি চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম৷ সেই পরিশ্রমের টাকা আমি লগ্ণি করেছিলাম একটা নতুন ওষুধ কোম্পানিতে৷ আসলে সেটা কোনও কোম্পানি ছিল না, কাগজ-কলমে দেখানো একটা কোম্পানি৷ তারা আমাকে প্রতারিত করে আমার সঞ্চিত টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল৷ অন্ধকার নেমে এল আমার জীবনে৷
সারা জীবনের সঞ্চয় চলে গেছে! ঠিক সেই সময় আমার দেখা তাঁর সঙ্গে৷ বাবুঘাটের রেলিং-এ হেলান দিয়ে সেই কুয়াশা মাখানো অন্ধকারে বসেছিলেন তিনি৷ আমি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম৷ হঠাৎ তিনি কৃপা করে ডাকলেন আমাকে৷ আমি তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি গড়গড় করে বলে দিলেন আমার জীবনের সব কথা৷ এমনকী যে কথা আমি ছাড়া অন্য কারও জানার কথা নয়, সে কথাও৷
এত বিস্মিত আমি কোনওদিন হইনি৷ সেই প্রথম আমি সম্মোহিত হয়ে কোনও সাধু-সন্ন্যাসীর পা-ছুঁয়ে প্রণাম করলাম৷ তিনি আমার মাথায় হাত রেখে অভয় দিয়ে বললেন, ‘তোর কোনও ভয় নেই৷ আমি তোর সঙ্গে আছি৷ তুই চাকরি ছেড়ে দে৷ কোনও ‘‘কূর্মভূমি’’-তে গিয়ে সেখানে আমার দেওয়া তন্ত্রবৃক্ষ রোপন করে সেখানে নিজের ব্যবসা শুরু কর৷ তোর নাম-যশ-অর্থ সবই হবে৷ আমি যাব তোর কাছে৷’
তাঁর কথা শুনে সে-কাজ করলাম আমি৷ খুঁজে-পেতে কলকাতা থেকে এই কূর্মভূমিতে চলে এলাম৷ ব্যাংক লোন নিয়ে, গ্রামের জমি বিক্রি করে এখানে এই জমি কিনলাম৷ পঞ্চবৃক্ষ বা তন্ত্রবৃক্ষ রোপণ করলাম এখানে৷ তারপর নার্সিংহোম খুললাম৷ আজ এই শূন্য নার্সিংহোম দেখে তুমি ধারণাই করতে পারবে না কী রমরম করে চলেছে নার্সিংহোমটা৷ রোজ-ই স্থানাভাবে অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হত৷ কুড়িজন ডাক্তার আর সত্তর জন মেডিকেল স্টাফ ছিল এখানে৷ আর তারপর...’
ডাক্তার ঘটকের কথার মাঝেই নবারুণ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘কূর্মভূমি মানে?’
ঘটক বললেন, ‘এই বর্ধমান জেলার কিছু জায়গায় কিছু কূর্মভূমি আছে৷ অর্থাৎ কচ্ছপের পিঠের মতো উঁচু জমি৷ বীরভূম জেলাতেও এই কূর্মভূমি দেখা যায়৷ এই কূর্মভূমিকে বলে ‘সাধনপীঠ’৷ তন্ত্র সাধনার উৎকৃষ্ট জায়গা৷ যে জমির ওপর এই নার্সিংহোম, প্রাচীর ঘেরা জায়গা, সেটা যদি তুমি ভালো করে দেখো তবে বুঝতে পারবে যে, এটা আশেপাশের জমিগুলোর তুলনায় কচ্ছপের পিঠের মতো কিছুটা উঁচু৷ এটা কূর্মভূমি...’
ডাক্তার ঘটক হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু দরজা টেনে ঘরে প্রবেশ করলেন মাঝবয়সি একজন লোক৷ তাঁর গলায় স্টেথিস্কোপ ঝুলছে৷ তাঁকে দেখেই ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘আসুন, আসুন, ডাক্তার দাস৷ এই হল ডাক্তার নবারুণ গুপ্ত৷ যার কথা আপনাকে বলেছিলাম৷
নবারুণ হাতজোড় করে নমস্কার জানাল তাঁকে৷ তিনিও প্রতি নমস্কার জানালেন৷ ডাক্তার ঘটক এরপর ডাক্তার দাসকে প্রশ্ণ করলেন, ‘পেশেন্ট দুজনকে কেমন দেখলেন?’
ডাক্তার দাস জবাব দিলেন, ‘দেখার তো বিশেষ কিছু নেই৷ নর্মাল কেস৷ তবে বুড়োটার প্রেশার একটু ওঠা নামা করছে৷ ওকে একটা ওষুধ দিলাম৷ আর পেশেন্ট পার্টিরা এসেছিল৷ আমি তাদের বলে দিয়েছি যে আর তিনদিনের মধ্যে তাদের পেশেন্ট নিয়ে যেতে হবে এখান থেকে৷ বুড়োটার বাড়ির লোক অবশ্য একটু গররাজি ছিল৷ বুড়োটাকে নার্সিংহোমে ফেলে রেখে ঝঞ্ঝাট এড়াতে চায় তারা৷ তবে শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হয়েছে৷’
কথাটা শুনে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘বাঃ বেশ৷ আজ মঙ্গলবার৷ রবিবার কালীপুজো৷ শুক্রবারে মধ্যে পেশেন্ট দুজনকে সরিয়ে দিতে হবে৷ নর্মাল কেস হলেও কিছু চিন্তা তো এদের জন্য আমার থাকেই৷ ওদিকে নতুন নার্সিংহোমটা ওপেন না হওয়া পর্যন্ত আমার যা চাপ যাচ্ছে তা তো আপনি জানেনই৷ এই পেশেন্ট দু-জন চলে গেলে আমার মেন্টাল রিলিফ হয়৷’
ঘড়ি দেখলেন ডাক্তার দাস৷ তারপর বললেন, ‘সাতটায় কিন্তু নতুন নার্সিংহোমে সেই এক্স-রে কোম্পানির টেকনিশিয়ানদের আসার কথা আপনার খেয়াল আছে তো?’
কথাটা শুনে ডাক্তার ঘটক মৃদু চমকে উঠলেন৷ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘দেখেছেন, ব্যাপারটা একদম খেয়াল ছিল না৷ চলুন, চলুন৷’
ডাক্তার ঘটকের চেম্বার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল তিনজন৷ নবারুণ বাইরের গেট পর্যন্ত এল তাঁদের সঙ্গে৷ গেটের বাইরে দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ ডাক্তার ঘটকের ‘এসইউভি’ আর ডাক্তার দাসের একটা পুরোনো ফিয়েট৷ ননীগোপাল গেট খুলে দিল৷ বাইরে বেরোবার সময় ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘কাল সকালে আসব৷ তোমার ইচ্ছা হলে পেশেন্ট দুজনকে দেখে আসতে পারো৷ সময় কাটবে৷’
ডাক্তার দাসও হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, দেখে আসুন ওদের দুজনকে৷’
দুজন দুটো গাড়িতে উঠে রওনা হয়ে যাবার পর নবারুণ আবার নার্সিংহোমের ভিতরে ঢুকল৷ তার কোনও কাজ নেই৷ হ্যাঁ, সেই দুজন পেশেন্টকে দেখে আসা যেতে পারে৷
ভিতরে ঢুকে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল দোতলায়৷ কাঠের আর প্লাইউডের পার্টিশন দেওয়া ছোট ছোট কেবিন৷ তার একটার সামনে বসেছিল একজন আয়া৷ অন্যজন বাড়ি চলে গেছে৷ নবারুণকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে সে প্রথমে তাকে নিয়ে প্রবেশ করল সামনের কেবিনটাতে৷ সেখানে বেডে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ৷ বয়স আশির ওপরেই হবে৷ বিছানা থেকে নেমেছে ক্যাথিটারের নল৷ শূন্য দৃষ্টিতে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ৷ নবারুণ তাঁর বেডের পাশে দাঁড়াল৷ নবারুণকে দেখিয়ে আয়া বৃদ্ধের উদ্দেশে বলল, ‘ইনি আমাদের নতুন ডাক্তারবাবু৷ আপনাকে দেখতে এসেছেন দাদু৷’ তার কথায় বৃদ্ধ কী বুঝল কে জানে! তিনি শুধু একইভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আমি কবে বাড়ি যাব?’
নবারুণ জবাব দিল, ‘আর দু-দিনের মধ্যেই৷’
বৃদ্ধ আর কোনও কথা বললেন না৷ আয়া বলল, ‘উনি খালি একই কথা বলেন৷’
ওই ঘরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আয়ার সঙ্গে পাশের কেবিনে ঢুকল নবারুণ৷ মাঝবয়সি একজন শুয়ে আছে বেডে৷ ডানপায়ে প্লাস্টার, ট্রাকশন৷ একটা খবরের কাগজ পড়ছিল সে৷ আয়া নবারুণের পরিচয় দিল তাকে৷ নবারুণ তাকে জিগ্যেস করল, ‘কীভাবে পা ভাঙলেন?’
লোকটা জবাব দিল, ‘বাইক অ্যাক্সিডেন্টে৷’
তারপর সে বলল, ‘আমি আবার বাইক চালাতে পারব তো ডাক্তারবাবু? আমি একটা সার কোম্পানিতে চাকরি করি৷ বাইক নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হয়৷ বাইক না চালাতে পারলে পেট চলবে না৷’
নবারুণ অর্থপেডিক নয়৷ তবু সে তার মনোবল বাড়াবার জন্য বলল, ‘পারবেন৷ তবে একটু সময় লাগবে৷’
তার কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হল লোকটা৷
পেশেন্ট দুজনকে এক ঝলক দেখা হয়ে গেল নবারুণের৷ তাদের বিশেষ কিছু করার নেই৷ আয়া রয়ে গেল সেখানেই৷ নবারুণ এগোল নীচে ফেরার জন্য৷ প্যাসেজ দিয়ে এগিয়ে দোতলার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ এসে নীচে নামতে যাচ্ছিল সে৷ হঠাৎ একটা শব্দ শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল৷ তিনতলার সিঁড়ি উঠে গেছে ওপর দিকে৷ একটা চাপা কান্নার শব্দ যেন ভেসে এল ওপর থেকে৷ কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার৷ তারপরেই শব্দটা থেমে গেল৷
নবারুণের হঠাৎ মনে পড়ে গেল বিকেলবেলা পিছনের জমিটা থেকে ফেরার সময় একজনকে জানলা বন্ধ করতে দেখেছিল সে৷ তবে তিনতলায় কি কেউ থাকে? সে কি পেশেন্ট? নাকি অন্য কেউ? ডাক্তার ঘটক তো বললেন, যে দুজন পেশেন্টকে সে এখন দেখে এল তারা ছাড়া অন্য কোনও পেশেন্ট নেই নার্সিংহোমে৷ তাহলে কি সে ভুল শুনল শব্দটা? নারীকণ্ঠের কান্নার শব্দই তো যেন কানে বাজল তার! কথাটা ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করল সে৷
ভোর ছ’টা নাগাদ ঘুম ভাঙল নবারুণের বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে জানলা খুলল সে৷ একরাশ আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে৷ বাইরে সকালের আলোতে ঝলমল করছে মাঠটা৷ তার জানলার কিছুটা তফাতে মাঠ থেকে পোকা খুঁটে খাচ্ছে একদল ছাতারে পাখি৷ অন্য বেশ কয়েকটা পাখির ডাকও ভেসে আসছে পিছনের জমিটা থেকে৷ বহুদিন পর রাতে ভালো ঘুম হয়েছে নবারুণের৷ না, কোনও দুঃস্বপ্ণ সে দেখেনি৷ বেশ একটু চনমনে লাগছে মনটা৷ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েও বেশ ভালো লাগল তার৷ ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল জমিটার শেষ প্রান্তের দিকে৷ হাঁটতেও বেশ ভালোই লাগছে নবারুণের৷ সূর্য উঠলেও বাতাসে ঠান্ডা মেজাজ আছে একটা৷
হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে গেল জমিটার শেষ প্রান্তে৷ আর তখনই দেখতে পেল তাঁকে৷ সেই গাছের দঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে সূর্যালোকে এসে দাঁড়ালেন তিনি৷ টকটকে ফর্সা রং, তীক্ষ্ন নাসা, উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি, শ্মশ্রুমণ্ডিত এক পুরুষ৷ তাঁর মাথার দীর্ঘ কেশরাশি কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে, রক্তাম্বরে আবৃত সারা দেহ, গলায় রক্ত-রুদ্রাক্ষের মালা৷ কপালে একটা বেশ বড় সিঁদুরের ফোঁটা৷ তাঁকে দেখে নবারুণের মনে হল তাঁর বয়স মনে হয় প্রৌঢ়ত্বের সীমানায়, তবে দেহ এখনও নির্মেদ৷ শালগাছের মতো ঋজু৷ অঘোরবাবা! অঘোর তান্ত্রিক!
তিনি তীক্ষ্ন অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন নবারুণের দিকে৷ এমনিতে কোনও দিন কোনও সাধুসঙ্গ করেনি নবারুণ৷ সাধু-সন্ন্যাসী-দেব-দ্বিজে খুব একটা বিশ্বাস করে না সে, তবে অশ্রদ্ধাও সে করে না কাউকে৷ তাই সে হাতজোড় করে নমস্কার জানাল অঘোরবাবার উদ্দেশে৷
নবারুণ তাঁকে নমস্কার জানাতে তিনিও তাঁর ডান হাতটা একটু ওপরে তুললেন আশীর্বাদের ভঙ্গিতে৷ তারপর স্মিত হেসে বললেন, ‘এতদিন খুব বিপদের মধ্যে ছিলে তুমি৷ হাসপাতাল, মর্গে ঘোরাঘুরি করতে তো৷ অতৃপ্ত প্রেতাত্মার দৃষ্টি পড়েছিল তোমার ওপর৷ শহরে থাকলে আরও ক্ষতি হত তোমার৷ বাঁচতে না৷ সে তোমাকে ছাড়ত না৷ তোমার পিছু ধাওয়া করে সে এই প্রাচীরের দরজা পর্যন্ত এসে ফিরে গেছে৷ আমার বন্ধন দেওয়া আছে এ জায়গাতে৷ তাই সে ভিতরে ঢুকতে পারেনি৷ সে আর আসবে না৷ সব ঠিক হয়ে যাবে তোমার৷ নাম-যশ-অর্থ সব-ই হবে৷’
প্রেতাত্মা বা এসব ব্যাপারে কোনও বিশ্বাস নেই নবারুণের৷ আর তার অতীতের দুর্ঘটনার কথাটা হয়তো ডাক্তার ঘটক-ই বলেছেন তাঁকে৷ অঘোরবাবার কথা শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল নবারুণ৷
সম্ভবত তার মনের ভাব পাঠ করেই সন্ন্যাসী বললেন, ‘কী ভাবছ, অম্বরীশ আমাকে বলেছে তোমার বিপর্যয়ের কথা? না, সে আমাকে কোনও কথাই বলেনি৷ তাকে জিগ্যেস করে দেখতে পারো৷’
নবারুণ তাকাল তাঁর চোখের দিকে৷ সে কী জবাব দেবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না৷
তান্ত্রিকের ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার যেন একটু চওড়া হল৷ তিনি আর কোনও কথা বললেন না নবারুণের উদ্দেশ্যে৷ শুধু সামনের গাছটার মাথার দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন, ‘কুহকিনী?’
একটা খচর খচর শব্দ হল গাছটার পাতায়৷ তারপর পাতার আড়াল থেকে একটা প্রাণী গুঁড়ি বেয়ে নেমে এসে দাঁড়াল অঘোরবাবার পায়ের কাছে৷ বেশ বড় আর কুচকুচে কালো একটা বেড়াল৷ এই বড় আর কালো বেড়াল সাধারণত চোখে পড়ে না৷ তান্ত্রিক সন্ন্যাসী মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে কোলে তুলে নিলেন বেড়ালটাকে৷ তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন৷
নবারুণ এবার ফেরার পথ ধরল৷ বাড়িটার কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ তার চোখ পড়ল তিনতলার দিকে৷ কাচের শার্শি দেওয়া সার সার জানলাগুলো বন্ধ থাকলেও একটা ঘরের জানলার পাল্লা খোলা৷ সম্ভবত ওই জানলাটাই গতকাল বিকেলে বন্ধ হতে দেখেছিল সে৷ নীচ থেকে সেই ঘরের ভিতর কেউ আছে কি না বুঝতে পারল না নবারুণ৷ সে নার্সিংহোমের ভিতর ঢুকল৷
ঠিক সেই সময় ডাক্তার ঘটকের গাড়িটা মাঠে ঢুকে এগোলো অঘোরবাবার ঘরের দিকে৷ নবারুণ নিজের ঘরে না-ঢুকে প্যাসেজ দিয়ে এগিয়ে এসে বসল নার্সিংহোমের বাইরের দিকের রিসেপশনে৷ সেখান থেকে নার্সিংহোমের বাইরের বড় রাস্তাটা দেখা যায়, গাড়ি চলাচল দেখা যায়, আর কেউ যদি আসে তবে তার সঙ্গে কথা বললেও কিছুটা সময় কাটবে৷ সব ভেবেই সেখানে এসে বসল সে৷ সকাল সাড়ে আটটায় একটা লোক এলও ঠিক-ই, কিন্তু সে পেশেন্ট পার্টির লোক৷ নবারুণের সঙ্গে কথা না বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল৷ তার কিছুক্ষণ পর অবশ্য ডাক্তার ঘটক তাঁর গুরুদেবের সাক্ষাৎ সেরে ফিরে এলেন৷ রিসেপশনে ঢুকে তিনি নবারুণকে দেখেই বললেন, ‘কী ঘুম কেমন হল? নতুন জায়গাতে কোনও অসুবিধা হয়নি তো?’
নবারুণ উঠে দাঁড়িয়ে জবাব দিলে, ‘না স্যার, কোনও অসুবিধা হয়নি৷ বরং অনেকদিন পর যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোলাম৷’
ডাক্তার ঘটক একটা চেয়ার টেনে নিয়ে নবারুণের পাশে বসতে বসতে বললেন, ‘বলছি তো কদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে৷’
এরপর তিনি হেসে বললেন, ‘আরে আমি অঘোরবাবার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ করাবার আগেই তো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল তোমার! তাঁর সঙ্গেই দেখা করে এলাম আমি৷ উনি তোমাকে কী বলেছেন জানি না, কিন্তু তোমার অতীতের সব কথা তিনি আমাকে গড়গড় করে বলে গেলেন৷ এমনকী মালবিকার অবসাদে আত্মহত্যা করার ঘটনাটাও!’
হঠাৎ এভাবে মালবিকার কথা উঠে আসতেই মুহূর্তের মধ্যে বিষণ্ণ্ হয়ে গেল নবারুণের মুখটা৷ ব্যাপারটা ধরতে পেরে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘সরি৷ আমি বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা৷ ওর কথাটা তোলা আমার ঠিক হয়নি৷ তবে গুরুদেব যখন আছেন তখন একদিন দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে৷’
নবারুণ মালবিকার ভাবনাটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বলল, ‘না, না, ঠিক আছে৷ তা অঘোরবাবা কি প্রতিবছর এখানে আসেন?’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘বছর দশেক আগে আমি যখন কলকাতার চাকরিটা ছেড়ে এখানে আসি তখন তিনি একবার এসেছিলেন ওই তন্ত্রবৃক্ষগুলো নিয়ে তা রোপণের জন্য৷ মাঝে কয়েকবারও তিনি এখানে এসেছেন৷ গত তিনবছর ধরে তিনি প্রতিবছর আসেন এখানে, এ সময়৷ তারপর কালীপুজোর দিন আবার ফিরে যান৷ আমার উন্নতির জন্য যজ্ঞ করেন তিনি৷ তাঁর কৃপাতেই তো সব৷’
নবারুণ বলল, ‘তন্ত্রবৃক্ষ মানে ওই যে জমিটার পিছনে যে গাছগুলো আছে সেগুলো? ওখানে একটা বেদিও আছে দেখলাম৷ তন্ত্রবৃক্ষ মানে?’
ডাক্তার ঘটক জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, ওই বেদিতেই যজ্ঞ করেন তিনি৷ পাঁচটা তন্ত্রবৃক্ষ আছে ওখানে৷ বট-অশ্বত্থ, ঘোড়া নিম, হরীতকী আর পাকুড়৷’
নবারুণ কৌতূহলী হয়ে আবার জানতে চাইল ‘তন্ত্রবৃক্ষ’ মানে?
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘মানে তন্ত্রমতে ওদের চারা প্রস্তুত করা হয়৷’
‘কীভাবে?’
নবারুণের এ-প্রশ্ণর জবাবে মুহূর্ত খানেক চুপ করে থেকে ডাক্তার ঘটক একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘এ সব তন্ত্রসাধনা, ডাকিনী সাধনার গূঢ়কথা৷ তোমার শুনতে ভালো লাগবে কি না জানি না৷ অন্য কেউ হলে প্রশ্ণের জবাব দিতাম না৷ তুমি বলেই বলছি৷ ব্যাপারটা কাউকে বোলো না৷ নদীর পাড়ে লাশ ভেসে আসে জানো তো? বিশেষত বড় বড় নদীতে৷ নদী থেকে প্রথমে সংগ্রহ করতে হয় অপঘাতে মৃত অথচ বিকৃতিহীন কোনও ষোড়শী মেয়ের টাটকা লাশ৷ তন্ত্র সাধনার মাধ্যমে প্রথমে সে-লাশে তার আত্মাকে ফিরিয়ে আনতে হয়৷ তারপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় তার দুই অক্ষি-কোটরে, মুখগহ্বরে, নাভিতে, যোনিতে প্রোথিত করতে হয় আঙুল সমেত পঞ্চতন্ত্র বৃক্ষের চারা৷ আঙুলের মতো আকার তখন তাদের৷ ওই মৃতদেহের-ই দেহরস সংগ্রহ করে ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে চারাগাছগুলো৷ একসময় যখন দেহের মাংস মাটির সঙ্গে মিশে যায় তখন কঙ্কালের ভিতর থেকে উঁকি মারতে থাকে লকলকে চারাগাছগুলো৷ তখন তাদের সেখান থেকে তুলে এনে সাধনার স্থানে বসানো হয়৷ এ গাছগুলো গুরুদেব এনেছিলেন বেনারসের হরিশচন্দ্র ঘাট থেকে৷ সেখানেই নাকি ভেসে এসেছিল সেই মেয়ের লাশটা৷ অবিকৃত লাশ ছিল৷ বিষ প্রয়োগে মৃত্যু হয়েছিল তার৷’
নবারুণ মৃদু চমকে উঠল চারাগাছ তৈরির প্রক্রিয়াটা শুনে৷ মনে মনে সে কল্পনা করল ঘটনাটা৷ ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগল না তার৷ ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘হয়তো ব্যাপারটা শুনে তোমার অস্বস্তি হচ্ছে, বিস্মিত হচ্ছ, আমারও প্রাথমিক অবস্থায় হত৷ কিন্তু এসব সাধনার-ই অঙ্গ৷ শক্তিকে জাগ্রত করার অঙ্গ৷’
এসব আলোচনা আর শুনতে ভালো লাগছিল না নবারুণের৷ ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন অস্বস্তি হচ্ছে তার৷ ডিসেকশন রুমে অনেক মৃতদেহ ঘেঁটেছে নবারুণ৷ কিন্তু তা সবই পড়াশোনার স্বার্থে৷ মৃতদেহ নিয়ে তার তেমন কোনও আলাদা অস্বস্তি নেই৷ কিন্তু তা বলে এমনভাবে ব্যবহার করা হবে মৃতদেহটা? প্রসঙ্গটা পালটাবার জন্য নবারুণ বলল, ‘এখানে কোনও বইপত্র আছে? আমার তো কোনও কাজ নেই৷ তবে সেসব পড়ে একটু সময় কাটত৷’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘এখানে কিছু মেডিকেল জার্নাল ছিল ঠিকই৷ কিন্তু সেসব সরিয়ে ফেলা হয়েছে অন্য জিনিসপত্রের সঙ্গে৷ সেগুলো কোথাও আছে ঠিকই, কিন্তু কোথায় আছে কে জানে! তবে শহরের মাঝখানে একটা বইয়ের দোকান আছে৷ সেখানে মেডিকেল জার্নাল পাওয়া না গেলেও সাধারণ বইপত্র-ম্যাগাজিন পাওয়া যায়৷ সেসব কেনার ইচ্ছা হলে কাল বা পরশু তোমাকে সময় করে নিয়ে যাব সেখানে৷’
ডাক্তার ঘটক এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমাকে যেতে হবে এবার৷ আর নতুন নার্সিংহোম নিয়ে যা চাপ চলছে আমার! নতুন মেশিনগুলো বসছে সেখানে, ফার্নিশের কাজও বাকি৷ তার ওপর ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নতুন কিছু স্টাফও নিয়োগ করতে হবে সেখানে৷ সব মিলিয়ে জেরবার অবস্থা৷ তবে সময়-সুযোগ বুঝে আমি রোজ-ই ঘুরে যাব এখানে৷ গুরুদেব আছেন, তাঁর জন্য তো আসতেই হবে৷ তার ওপর তুমিও আছ৷’
উঠে দাঁড়াল নবারুণও৷ সে জানতে চাইল, ‘নার্সিংহোমের ইনোগোরেশন কবে হবে?’
বাইরের দিকে এগোতে এগোতে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘আজ বুধবার৷ রবিবার কালীপুজো৷ শনিবার আমার মঙ্গল কামনায়, নতুন নার্সিংহোমের আর যে বটলিংপ্লান্টটা এখানে হবে, তার মঙ্গলার্থে যজ্ঞ করবেন গুরুদেব৷ রবিবার তিনি চলে যাবেন৷ ভাবছি সোম বা মঙ্গলবার থেকেই চালু করে দেব নার্সিংহোমটা৷ ওখানে যে হসপিটাল কোয়ার্টার হচ্ছে তার ইলেকট্রিকাল ওয়ারিং-এর কাজ সামান্য বাকি৷ আশা করছি শনিবার সকালের মধ্যেই সেখানে তোমার থাকার জন্য একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে যাবে৷ কষ্ট করে তিনটে দিন এখানে কাটিয়ে নাও৷’
রিসেপশন ছেড়ে বাইরে গাড়ি পর্যন্ত ডাক্তার ঘটককে এগিয়ে দিল নবারুণ৷ তিনি গাড়িতে ওঠার সময় নবারুণ বলল, ‘তবে আমাকে ওই বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবেন স্যার৷’
গাড়িতে উঠতে উঠতে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘আচ্ছা, দেখা যাক কখন সময় বার করতে পারি৷’
ডাক্তার ঘটক গাড়িতে উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলেন৷
নবারুণ আবার তার নিজের জায়গায় এসে বসল৷ বড় রাস্তা দিয়ে হুশহুশ করে চলে যাচ্ছে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকগুলো৷ নার্সিংহোমের ভিতরে বসে সে তাকিয়ে রইল রাস্তার দিকে৷ ঘণ্টাখানেক সেখানে বসে থাকার পর তার একঘেয়ে লাগতে লাগল সেসব দৃশ্য৷ ঘরে ফিরে গেল সে৷ বেলা বারোটা নাগাদ খাবার দিয়ে গেল ননীগোপাল৷ খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল নবারুণ৷
যখন ঘুম ভাঙল তখন রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল সে৷ অনেক আগেই অন্ধকার নেমেছে মাঠটাতে৷ চাঁদও উঠেছে৷ তবে নখের মতো ক্ষীণ চাঁদ৷ আর তিনদিন পর-ই তো অমাবস্যা৷ ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বাজে৷ এতক্ষণ একটানা ঘুমিয়েছে নবারুণ! নিজেই সে অবাক হয়ে গেল ব্যাপারটা দেখে৷ তারপর মনে মনে ভাবল যে, গত দু-বছর সে অনেক সময় রাতের পর রাত ঘুমোয়নি৷ দিনেরবেলা ঘুমানো তো দূরস্ত৷ হয়তো সে-ক্লান্তিই এখন পুষিয়ে নিচ্ছে তার দেহ৷ একদিক থেকে ব্যাপারটা তার দেহের পক্ষে ভালো৷ তাছাড়া ঘুমানোর ফলে তার সময়টাও কেটে যাচ্ছে৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় বসে রইল নবারুণ৷ তারপর সে ভাবল, ‘যাই, একবার পেশেন্ট দুজনকে দেখে আসি৷ আবার তো এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসবে না নিশ্চয়ই৷’
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর ছেড়ে বেরোল নবারুণ৷ রিসেপশনের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় সে উঠতে শুরু করল৷ দোতলার ল্যান্ডিং-এ উঠে প্যাসেজ ধরে পেশেন্ট কেবিনের দিকে এগোতে যাচ্ছিল সে৷ ঠিক সেইসময় ওপর থেকে যেন আবার কান্নার শব্দ ভেসে এল৷ অস্পষ্ট শব্দ হলেও কাঁদছে কেউ৷ সম্ভবত নারীকণ্ঠের শব্দ৷ তার মনে পড়ে গেল তিনতলার খোলা জানলার কথা৷ তবে কি সেখানে কোনও পেশেন্ট আছে? যার কথা তাকে বলতে ভুলে গেছেন ডাক্তার ঘটক? দোতলার পেশেন্টদের ঘরের দিকে না গিয়ে একটু কৌতূহলবশত সে উঠতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার দিকে৷
তিনতলার প্যাসেজগুলো অন্ধকার৷ তবে কান্নার শব্দ অনুমান করে সে এগোল৷ দু-পাশে সার সার শূন্য কেবিন৷ তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সে দাঁড়াল সেই ঘরটার সামনে৷
হ্যাঁ, কান্নাটা ঘরের ভিতর থেকেই আসছে৷ নারীকণ্ঠের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না! নার্সিংহোমটা লোকশূন্য নিঝুম বলে সে শব্দ দোতলার ল্যান্ডিং পর্যন্ত পৌঁছোয়৷ তবে ঘরের ভিতর আলো জ্বলছে৷ দরজার পাল্লাটা বন্ধ নয়, ভেজানো৷ মহিলা কেবিন৷ তাই ভিতরে ঢোকার আগে বাইরে থেকে একবার টোকা দিল নবারুণ৷ কান্নার শব্দ সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল৷ ঘরের ভিতর থেকে একটা কম্পিত নারীকণ্ঠ শোনা গেল ‘কে?’
নবারুণ বলল, ‘আমি নার্সিংহোমের ডাক্তারবাবু৷ নতুন এসেছি৷’
মুহূর্তের নিস্তব্ধতা৷ তারপর ভিতর থেকে শোনা গেল, ‘দরজা তো খোলাই আছে৷’ নবারুণ কেবিনে পা রাখল৷ একপাশে দেওয়াল সংলগ্ণ বেডে বসে আছে একজন নারী৷ তাকে দেখে চমকে উঠল নবারুণ৷ আরে, এ যে মালবিকা! সেই ডাগর চোখ, পাতলা ঠোঁঠ, মাথায় ঘন কুঞ্চিত কেশরাশি, শ্যামবর্ণা ছোটখাটো দেহ! কিন্তু মুহূর্তর মধ্যেই নিজের ভুল বুঝতে পারল নবারুণ৷ মালবিকার সঙ্গে তার চেহারার বেশ কিছু সাদৃশ্য থাকলেও সে মালবিকা নয়৷ নেহাতই এক গ্রাম্য নারী৷ তার পরনে সস্তা দামের ছাপা শাড়ি৷ বিবাহিতা, সিঁথিতে অস্পষ্ট সিঁদুরের দাগ আর হাতে শাঁখা আছে৷
আসলে মালবিকা তার মনকে আজও এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে তার সঙ্গে কারও সাদৃশ্য থাকলেই তাকে মালবিকা বলে মনে হয় নবারুণের৷ মালবিকার অনুপস্থিতিটা নবারুণের মন এখনও মেনে নিতে পারছে না৷ বেশ কিছুদিন আগে নবারুণ একবার রেল স্টেশনে এক মহিলাকে মালবিকা বলে ডাকতে যাচ্ছিল৷ ব্যাপারটা ধরতে পারল নবারুণ৷ ভালো করে বউটার দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল তার পেটের কাছটা স্ফিত৷ এ নারী সন্তানসম্ভবা!
বউ বা মেয়েটা কিন্তু মালবিকার বয়সি-ই হবে৷ বছর তিরিশ বয়স তার৷ শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিয়ে সে তাকাল নবারুণের দিকে৷ নবারুণ তাঁকে প্রশ্ণ করল, ‘কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে? কোনও যন্ত্রণা হচ্ছে?’
প্রথম প্রশ্ণের জবাব না দিয়ে সে পালটা প্রশ্ণ করল, ‘তুমি আমাকে দেখতে এসেছ?’
গ্রাম্য মহিলা৷ তাই তার সম্ভাষণটা ‘আপনি’ না হয়ে ‘তুমি’ হল৷
নবারুণও এবার তাকে তুমি করেই বলল, ‘কী অসুবিধা তোমার? কবে এসেছ এখানে? কী নাম তোমার?’
সে জবাব দিল, ‘শ্যামা৷’ তারপর বলল, ‘বাচ্চা হবে আমার৷ ক’দিন আগেই এসেছি৷ এর আগেও দু-বার এসেছিলাম এখানে৷’
নবারুণ আবার প্রশ্ণ করে, ‘কী অসুবিধা হচ্ছে তোমার?’
সে বলল, ‘কিছু না৷’
‘তবে কাঁদছ কেন?’
শ্যামা জবাব দিল, ‘অসুবিধা কিছু হয় না৷ তবে পেটের বাচ্চা বাঁচে না৷ এর আগে দু-বার এলাম এখানে৷ কিন্তু বাচ্চা বাঁচল না৷ এবার আমার বাচ্চা বাঁচবে তো?’ জলভরা চোখে সে প্রশ্ণ করল নবারুণকে৷
নবারুণ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নয়৷ সে সার্জেন৷ তাছাড়া এই মেয়েটার কী কমপ্লিকেশনস্ তা জানা নেই নবারুণের৷ তাই সে তার উদ্দেশে বলল, ‘যে ডাক্তারবাবু তোমাকে দেখছেন তিনি নিশ্চয়ই চেষ্টা করবেন৷’
‘তাহলে তুমি কিছু বলতে পারবে না?’ এই বলে শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল মেয়েটা৷ তারপর চোখে আঁচল চাপা দিল৷ শব্দ না করলেও নবারুণ বুঝতে পারল মেয়েটা কাঁদছে৷
কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল নবারুণ৷ মহিলা কেবিন৷ তার ওপর বেশ রাত হয়েছে, চার চারপাশে কেউ নেই৷ হাসপাতালের শিশুমৃত্যুর সেই মিথ্যা দায়টা তার ওপর এসে পড়ার পর সাবধানী হয়ে গেছে নবারুণ৷ কখন কীসের মিথ্যে বদনাম এসে পড়ে, বলা যায় না৷ তাই কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে নীচে দোতলায় নেমে এল নবারুণ৷
প্রথমে বৃদ্ধের ঘরে গিয়ে কিছু মামুলি কথা বলল৷ এতে কিছুটা সময় কাটল তার৷ তারপর করিডোর বেয়ে নীচে নিজের ঘরে ফেরার জন্য পা বাড়াল৷ সে যখন সিঁড়ি বেয়ে নামতে যাচ্ছে তখন তিনতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে একটা জিনিস দেখতে পেল৷ অঘোর তান্ত্রিকের সেই মিশমিশে কালো বিড়ালটা সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার দিকে উঠে যাচ্ছে৷
বিড়ালটার নামটা মনে পড়ে গেল তার! কুহকিনী! বেশ অদ্ভুত নাম! এই তান্ত্রিকটান্ত্রিকদের সব ব্যাপারই বড় অদ্ভুত হয়৷ এমনকী পোষ্যর নামও৷ কথাগুলো ভেবে আবার সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল৷
সারারাত মালবিকার-ই স্বপ্ণ দেখেছে নবারুণ৷ তার ফেলে আসা সোনালি দিনগুলোর স্বপ্ণ৷ তখন সে মেডিকেল কলেজ আর মালবিকা প্রেসিডেন্সির৷ কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া, কখনও আউট্রাম ঘাটে ঘুরে বেড়াত তারা৷ সেই স্বপ্ণই সারারাত ঘুমের মধ্যে দেখেছে সে৷ ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার পরই এরপর অদ্ভুতভাবে মনে পড়ে গেল শ্যামা নামের সেই মেয়েটার কথা৷ নবারুণ ভাবল, ওই মেয়েটার সঙ্গে মালবিকার সাদৃশ্যের কারণেই কি সে সারারাত স্বপ্ণ দেখল মালবিকার?
হতে পারে! ঘড়ির দিকে তাকাল নবারুণ৷ বেলা আটটা বাজে৷ বেশ দেরি হয়ে গেছে তার উঠতে৷ ঘড়ি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বিছানা ছেড়ে নেমে জানলা খুলে সে দেখতে পেল ডাক্তার ঘটকের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে দূরে, সেই অঘোর তান্ত্রিকের ঘরের সামনে৷ নবারুণ তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে মুখ ধুয়ে নিল৷ বেসিনটা সেখানেই আছে৷ তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে নেমে পড়ল মাঠে৷ সে দেখতে পেল সেই গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার ঘটক আর অঘোরবাবা৷ নবারুণ এগোল লক্ষ করে৷
নবারুণ যখন তাঁদের কাছাকাছি পৌঁছোল তখন তাঁরা গাছের দঙ্গলের ভিতরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন৷ ডাক্তার ঘটককে বলা তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর একটা কথাই শুধু তার কানে এল—‘এই ডাকিনীযজ্ঞর প্রধান উপচারই হল ওই জীবন্ত ব্রহ্ম উপবীত৷ সেটার অভাবেই কেউ এই যজ্ঞ করতে পারে না৷’
আর এরপরই সম্ভবত নবারুণের পদশব্দে ঘুরে দাঁড়ালেন তাঁরা৷ অঘোরবাবার কোলে সেই মিশমিশে কালো বিড়ালটা৷ তাকে দেখতে পেয়ে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘আরে তুমি এসে গেছ! বাবাকে প্রণাম করো৷’
সত্যি কী এই অদ্ভুত পৃথিবী! একসময় চূড়ান্ত নাস্তিক মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডাক্তার ঘটক এখন গুরুবাদ, তন্ত্রসাধনায় বিশ্বাসী! সত্যিই মানুষকে সময় কত পালটে দেয়! মনে মনে ভাবল নবারুণ৷ পা ছুঁয়ে নয়, ডাক্তার ঘটকের কথায় তন্ত্রসাধকের উদ্দেশে হাতজোড় করে নমস্কার জানাল নবারুণ৷
স্মিত হাসলেন সাধুবাবা৷
ডাক্তার ঘটক অঘোর সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি দিব্যজ্ঞানী, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা৷ আমি না বললেও আপনি তো সবই জানেন ওর সম্পর্কে৷’
সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বললন, ‘হ্যাঁ, জানি৷ শিশু মৃত্যুর কলঙ্ক লেগে আছে ওর৷’
ডাক্তার ঘটক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘কিন্তু ওর কোনও দোষ ছিল না৷’
অঘোর তান্ত্রিক বললেন, ‘হ্যাঁ, সে-ও জানি৷ ওর ভবিষ্যৎ আমি দেখতে পাচ্ছি৷ খুব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ৷ তবে...’
‘তবে কী?’ ডাক্তার ঘটক জানতে চাইলেন৷
একটু চুপ করে থেকে সেই তান্ত্রিক সন্ন্যাসী বললেন, ‘আমি ললাট-লিখন পড়তে পারি৷ ও সেই শিশুর মৃত্যুর কারণ না হলেও ওর ললাটে নরহত্যা লেখা আছে৷’
কথাটা শুনে চমকে উঠল দুজনেই৷
নবারুণ বেশ একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বলে উঠল, ‘আপনি কি এসব আগাম জানতে পারেন? এ কথা কীভাবে বলছেন?’
তিনি হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ পারি৷ এমনকী জন্ম-মৃত্যুও৷’
নবারুণ বলল, ‘নিজেরটাও?’
এবার যেন গম্ভীর হয়ে গেল অঘোর সন্ন্যাসীর মুখটা৷ তিনি বললেন, ‘না৷ তৃতীয়বার ডাকিনী-যজ্ঞ না করলে সে-জ্ঞান অর্জন হয় না৷ সেই একটা কাজ-ই শুধু বাকি৷ তবে তিনদিনের মধ্যেই সে-জ্ঞান করায়ত্ত হবে আমার৷’ এই বলে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন তাঁর ঘরের দিকে৷
তাঁর ওইভাবে চলে যাওয়া দেখে মনে হয় একটু ভয় পেয়ে গেলেন ডাক্তার ঘটক৷ তিনি নবারুণকে বললেন, ‘একটু সাবধানে কথা বোলো ওঁর সঙ্গে৷ বোঝোই তো সন্ন্যাসী মানুষ৷ এমনিতে উনি ঠান্ডা প্রকৃতির, কিন্তু এঁরা কুপিত হলে ভয়ংকর৷ অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে৷’
নবারুণ বুঝতে পারল তার সংযত হওয়ার প্রয়োজন ছিল৷ সে বলল,‘আচ্ছা মনে রাখব৷’
ডাক্তার ঘটকের গাড়িতেই নবারুণ ফিরে এল নার্সিংহোমে৷ রিসেপশনেই গত দিনের মতো বসল তারা৷ ডাক্তার ঘটকের সঙ্গে দু-একটা কথা বলার পরই নবারুণের হঠাৎ মনে পড়ে গেল শ্যামা নামের সেই মেয়েটার কথা—৷
নবারুণ বলল, ‘তিনতলার ঘরে একজন মহিলা পেশেন্ট আছে আমাকে বলেননি তো?’
‘প্রশ্ণটা শুনেই মৃদু চমকে উঠে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘তোমার সঙ্গে তার কীভাবে দেখা হল? সে কিছু বলেছে নাকি তোমাকে?’
নবারুণ বলল, ‘কাঁদছিল মেয়েটা৷ সেই শব্দ শুনে দোতলা থেকে তিনতলায় ওর ঘরে গিয়েছিলাম৷ না তেমন কিছু বলেনি৷ শুধু বলল তার বাচ্চা নাকি বাঁচে না৷ ব্যস, এইটুকুই কথা হয়েছে৷’
ডাক্তার ঘটক বললেন, হ্যাঁ, পাঁচ-ছ-মাসেই অ্যাবরশন হয়ে যায়৷ গত দুবার তাই হয়েছে৷ ওর কথা তোমাকে বলিনি কারণ ও ফ্রি-পেশেন্ট৷ বাড়িতে বর মারধর করে৷ একবার সে ওর পেটে লাথি মেরেছিল গর্ভাবস্থায়৷ তার থেকেই এই কমপ্লিকেশন মনে হয়৷ কিছুদিন আগে এসেও আমার হাতে পায়ে ধরে বলল, ‘ডাক্তারবাবু৷ বর মারধর করছে৷ তুমি এখানে আমাকে থাকতে দাও৷’ আগে এখানে দু’দুবার আসার কারণে সে আমাকে চেনে৷ আমি তাকে না-করতে পারলাম না৷ ভাবলাম ঘর যখন খালি তখন থাক না৷ আমিই তাকে মাঝে মাঝে দেখে আসি৷ দেখা যাক, এবার যদি তার পেটের বাচ্চাটা বাঁচে! তবে ওর মনে হয় একটু-আধটু মাথার গণ্ডগোলও আছে৷ মাঝে মাঝে আবোল-তাবোল বকে৷ কান্নাকাটি করে৷ ওকে তোমার পেশেন্ট হিসাবে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই৷’
এরপর প্রসঙ্গ পালটে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘বুঝলে, আমার ওপর এখন ভীষণ চাপ৷ একে তো নার্সিংহোম নিয়ে জেরবার৷ তার ওপর সেই মহাযজ্ঞের জন্যও নানা জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে হবে৷ তবে যজ্ঞটা হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত৷ তোমার কপালে নরহত্যা লেখা আছে, গুরুদেবের ও- কথাটাতে কিছু মনে কোরো না৷ ডাক্তারের হাতে তো অনিচ্ছাকৃতভাবে কত মানুষের প্রাণ যায়৷ হয়তো তিনি সে-কথাই বললেন৷ আমাকেও তো তিনি বলেছেন যে, আমারও নাকি শীঘ্রই একটা মৃত্যুযোগ আছে৷ তবে ডাকিনী যজ্ঞের পর সেটা কেটে যাবে৷’
ডাক্তার ঘটক যজ্ঞের জন্য জিনিসপত্র সংগ্রহের কথা বলাতে নবারুণ এরপর বলল, ‘আপনার গুরুদেব আপনাকে কী একটা জীবন্ত ব্রহ্ম উপবীতের কথা বলছিলেন, সেটা কী?’
নবারুণ প্রশ্ণটা করতেই গম্ভীর হয়ে গেল ডাক্তার ঘটকের মুখ৷ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘ব্রহ্ম উপবীতের ব্যাপারটা তন্ত্র-সাধনার গূঢ় বিষয়৷ এটা তোমাকে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷’
এরপরই তিনি হেসে বললেন, ‘বুঝলে নবারুণ৷ অসীম ক্ষমতা-সম্পন্ন আমার এই তন্ত্রসিদ্ধ যোগীপুরুষ৷ নইলে কি আমার মতো ঘোর নাস্তিকও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে! ডাকিনী হাকিনী সবাই তাঁর বশীভূত৷’
এ কথা শুনে নবারুণ মৃদু হেসে বলল, ‘ওঁর পোষ্য আর তার নামটাও বড় অদ্ভুত, কুহকিনী!’
ডাক্তার ঘটক কিন্তু হাসলেন না তার কথায়৷ তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, ‘কুহকিনী’ নয়, ‘কুহকিনী মা’ বলবে৷ ও আসলে এক ডাকিনী৷ জানো উনি মানুষের মতো কথা বলতে পারেন৷’
নবারুণের কথাটা শুনে বেশ হাসি পেলেও সে সেটা প্রকাশ করল না ডাক্তার ঘটকের সামনে৷ কারণ, সেটা অভদ্রতা হবে৷ সে শুধু বিস্মিত হল এই ভেবে যে, ডাক্তার ঘটকের মতো মানুষও এসব আজগুবি ব্যাপারে আজকাল বিশ্বাস করেন!
এসব প্রসঙ্গ থেকে দূরে সরে গিয়ে নবারুণ এরপর বলল, ‘সময় কাটছে না৷ বইয়ের দোকানে কবে যাওয়া যেতে পারে?’
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘আমি তোমাকে নিজে নিয়ে যেতে না পারলেও আমার ড্রাইভার সে-জায়গা চেনে৷ দেখি তাকে দিয়ে তোমাকে সেখানে পাঠানো যায় কিনা?’
এরপর নবারুণের সঙ্গে মামুলি কিছু কথা বলে নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে গেলেন ঘটক স্যার৷
সারা দুপুরটা জেগেই কাটাল নবারুণ৷ বিছানায় শুলেও ঘুম এল না তার৷ আবারও বার বার ঘুরেফিরে তার মনে আসছে মালবিকার কথা৷ আর কেন জানি অদ্ভুতভাবে তার চোখে ভেসে আসছে শ্যামা নামের সেই গ্রাম্য রমণীর কথা৷ চেহারার সাদৃশ্যের জন্যই কি তাকে মনে পড়ছে নবারুণের? নইলে তো তাকে মনে পড়ার তেমন কোনও কারণ নেই তার৷
শেষ বিকেল পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে মালবিকার কথাই ভাবল নবারুণ৷ তারপর পোশাক পালটে ঘর ছেড়ে পিছনের মাঠে নেমে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল৷ মাঠের শেষ পর্যন্ত গেল সে৷ অঘোর সন্ন্যাসীর ঘরটা ভিতর থেকে তালা-বন্ধ৷ গাছগুলোর দিকে তাকাল সে৷ অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে গাছগুলোর ভিতরের জায়গাটাতে৷ ফেরার পথ ধরল নবারুণ৷ বাড়িটাতে ঢোকার মুখে আগের দিনের মতোই তার চোখ গেল তিনতলার ঘরের জানলাটাতে৷ আধো-অন্ধকারে সেখানে জেগে আছে একটা মুখ৷ নবারুণের কেন জানি মনে হল সে যেন একবার হাত নেড়ে ডাকল তাকে৷ সে যখন ঘরে ফিরল তখনই অন্ধকার নামল বাইরে৷
ঘরে ফিরে আসার পর কেমন যেন খচখচ করতে লাগল নবারুণের মনটা৷ মেয়েটা তাকে ডাকল নাকি! একসময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল নবারুণ৷ দেখতে পেল ডাক্তার দাস তাঁর পেশেন্ট দেখে নার্সিংহোম থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছেন৷ নিস্তব্ধ নার্সিংহোম৷ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সে সোজা হাজির হল তিনতলার সেই ঘরের সামনে, তারপর টোকা দিল দরজার পাল্লায়৷ বউটা বলল, ‘ভিতরে এসো৷’
আগের দিনের মতো একইভাবে বেডে বসেছিল মেয়েটা৷ পাশে একটা কলাই করা পাত্রে মুড়ি রাখা৷ নবারুণ একটু ইতস্তত করে তাকে প্রশ্ণ করল, ‘তুমি কি আমাকে ওপর থেকে ডাকছিলে?’
শ্যামা নামের মেয়েটা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ৷’
‘কেন? কোনও অসুবিধা হচ্ছে?’ জানতে চাইল নবারুণ৷
একটু ইতস্তত করে শ্যামা বলল, ‘তুমি তো নীচে থাকো৷ কোনও লোককে দেখেছ? রোগা, কালো একটা হাত কাটা?’
নবারুণ বলল, ‘না, তেমন কাউকে দেখিনি৷’
‘দেখোনি?’ একটু বিষণ্ণ্ভাবে কথাটা বলল বউটা৷
নবারুণ বলল, ‘কে লোকটা? কাকে খুঁজছ তুমি?’
শ্যামা জবাব দিল, ‘আমার বর৷ সেই যে দিয়ে গেল, আর এল না৷’ যদি সে আসে তবে আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে বোলো৷’
নবারুণ জানতে চাইলে, ‘কী করে সে?’
শ্যামা বলল, ‘কিছু না৷ লেদ কলে কাজ করত৷ সেখানে হাতটা গেল...৷’
নবারুণকে ডাক্তার ঘটক বলছিলেন যে বর একবার নাকি মেয়েটার পেটে লাথি মেরেছিল৷ তারপর থেকে এই অবস্থা মেয়েটার৷ অথচ তাকেই দেখার জন্য মেয়েটার কত আকাঙক্ষা৷ একটু চুপ করে থেকে নবারুণ বলল, ‘ঠিক আছে, তাকে দেখলে আমি কথাটা বলব৷ তোমাকে আর কেউ দেখতে আসে না? তাদেরকে দিয়ে তো খবরটা পাঠাতে পারো?’
শ্যামা জবাব দিল, ‘না, কেউ আসে না৷ এরপর সে আরও কোনও কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ যেন আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার চোখ দুটো৷ আর এরপর নবারুণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে পাশ থেকে মুড়ির পাত্রটা তুলে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারল দরজা লক্ষ্য করে৷ দরজার কাছে আছড়ে পড়ে ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল সেটা৷ মেয়েটা কি তবে সত্যি পাগল হয়ে গেছে? ডাক্তার ঘটক তো বলেছিলেন যে মেয়েটার একটু মাথার গন্ডগোলও আছে৷ নবারুন পিছনে দরজার দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না৷ কিন্তু শ্যামা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘আবার সেই অপয়া বেড়ালটা এল! প্রতিবারই-ও আসে...৷’
নবারুণ জানতে চাইল, ‘কোন বেড়ালটা?’
শ্যামা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘সেই কালো বেড়ালটা! এবারও আমার পেটের বাচ্চাটা বাঁচবে না৷’
গ্রামাঞ্চলে বেড়ালকে মা-ষষ্ঠীর বাহন ভাবলেও বেড়াল, বিশেষত কালো বেড়াল নিয়ে নানা সংস্কার আছে৷ মেয়েটা হয়তো সেই সংস্কার থেকেই কথাগুলো বলছে৷ তাকে আশ্বস্ত করার জন্য নবারুণ বলল, ‘এসব বেড়াল-টেড়ালে কিছু হয় না৷ ডাক্তারবাবুরা নিশ্চয়ই দেখবেন যাতে তোমার বাচ্চাটা ভালোভাবে জন্মায় সে ব্যাপারে৷’
নবারুণের কথায় সে কোনও জবাব দিল না৷ একইভাবে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকল৷
নবারুণের কিছু করার নেই৷ সে বেরিয়ে এল ঘর থেকে৷ আর তারপরই সে দেখতে পেল তাকে৷ কিছুটা তফাতে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে দাঁড়িয়ে আছে সেই কালো রঙের বেড়ালটা৷ শুধু তার চোখদুটো জ্বলছে৷ অঘোর তান্ত্রিকের সেই পোষা বেড়ালটা, ‘কুহকিনী!’
নবারুণ তাকে তাড়া দিতেই প্যাসেজ ধরে সিঁড়ির দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল সে৷
তার পিছন পিছন নবারুণও নেমে এল দোতলায়৷ দোতলায় সিঁড়ির মুখে একজন আয়া দাঁড়িয়ে আছে৷ সম্ভবত তিনতলার ঘরে মেয়েটার বাটি ছোড়ার শব্দ শুনে কেবিন ছেড়ে সে সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে৷ নবারুণকে দেখে সে মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, ‘স্যার, আপনি ওপরে ছিলেন!’
নবারুণ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল ‘হ্যাঁ৷’ তারপর বলল, ‘ওপরে বেড়াল ওঠে, আপনারা খেয়াল করেন না? ইনফেকশন হতে পারে পেশেন্টদের৷’
আয়া মাথা নীচু করে জবাব দিল, ‘আমরা কোনও বেড়ালকে ওপরে উঠতে দিই না৷ কিন্তু কুহকিনী মা তো...৷’
তার অসম্পূর্ণ কথা বুঝতে অসুবিধা হল না নবারুণের৷ কুহকিনী মা! গুরুদেবের পোষ্য বলে কথা৷ তাই তাকে কেউ বাধা দেয় না৷ নার্সিংহোমে অবারিত দ্বার তার৷ নবারুণ তাই আর কোনও কথা না বলে নীচে নামার জন্য পা বাড়াল৷
পরদিন সকালে নবারুণ যখন বিছানা ছাড়ল তখন আটটা বাজে৷ ঘর থেকেই বেশ কিছু লোকজনের কথাবার্তার হালকা আওয়াজ শুনতে পেল৷ রিসেপশনের দিক থেকে শব্দটা আসছে৷ ফ্রেশ হয়ে সে যখন রিসেপশনে এসে পৌঁছোল তখন দেখতে পেল সাত-আটজন লোককে৷ পেশেন্ট-পার্টি সব৷ ডাক্তার দাসও সেখানে আছেন৷ আরও একটা লোকও সেখানে আছে৷ সে পেশেন্ট পার্টিদের থেকে রসিদ কেটে পাওনা বুঝে নিচ্ছে৷ বুড়ো আর পা-ভাঙা লোকটাকেও স্ট্রেচারে করে নীচে নামিয়ে আনা হয়েছে৷ তবে শ্যামা বলে মেয়েটা সেখানে নেই৷
নবারুণকে দেখে ডাক্তার দাস এগিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘গুড মর্নিং৷ পেশেন্টদের রিলিজ করে দেওয়া হচ্ছে৷ এরা চলে যাওয়ার পর আপনাকে ডাকতে যাচ্ছিলাম আমি৷ ডাক্তার ঘটক কাজে ব্যস্ত৷ তিনি আমাকে বলেছেন আপনাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যেতে৷ এরা চলে গেলে আমার সঙ্গে আপনি বেরিয়ে পড়বেন৷ আমার একটা চেম্বার আছে পথে, আমি সেখানে নেমে যাব৷ আমার ড্রাইভার আপনাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে৷ তারপর কাজ শেষ হলে আপনাকে আবার নামিয়ে দিয়ে যাব৷’
নবারুণ বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ৷ আসলে এখানে আমার কোনও কাজ নেই তো৷ খাচ্ছি আর ঘুমোচ্ছি, একদম হাঁপিয়ে উঠেছি৷ বই থাকলে একটু সময় কাটানো যাবে৷’
ডাক্তার দাস বললেন, ‘আজকের দিন-রাতটাই শুধু অসুবিধা হবে৷ নতুন নার্সিংহোমে আপনার থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে৷ কাল সকালে ডাক্তার ঘটক এসে আপনাকে সেখানে থাকার জন্য নিয়ে যাবেন৷’
পেশেন্ট-পার্টিরা গাড়ি নিয়েই এসেছিল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে তারা নিজেদের পেশেন্ট নিয়ে চলে গেল৷ নবারুণ একবার জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল যে, সেই মেয়েটাও চলে গেছে কি না? কিন্তু প্রশ্ণটা করতে গিয়েও সে করল না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই নবারুণ ডাক্তার দাস আর তার সেই সঙ্গীর সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসল৷
শহরের দিকে এগোবার সময় ডাক্তার দাস নবারুণের উদ্দেশে হেসে বলল, ‘আপনাকে প্রথম দিন যেমন দেখেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি ফ্রেশ দেখাচ্ছে আজ৷ এটা দরকার ছিল আপনার৷ ক’দিনের মধ্যে আপনার এমন চাপ শুরু হবে যে দেখবেন এক ঘণ্টা বিশ্রামের ফুরসত পাচ্ছেন না৷ নতুন নার্সিংহোমে একশোটা বেড৷ সে অনুসারে কাজের চাপ থাকবে৷’ নতুন নার্সিংহোম প্রসঙ্গে আরও কিছু টুকটাক কথা বলতে বলতে শহরে ঢুকল নবারুণরা৷
ছোট মফস্সল শহর৷ একটু ঘিঞ্জিও বটে৷ রাস্তায় সাইকেল রিকশা৷ লোকজনের ভিড়৷ শহরে ঢুকে রাস্তার পাশে এক জায়গাতে নেমে গেলেন তার সঙ্গী৷ তারপর গাড়িটা শহরের আরও একটু ভিতরে ঢুকে তাকে নামাল একটা বইয়ের দোকানের সামনে৷
দোকানে ঢুকল নবারুণ৷ মফস্সল শহরের বইয়ের দোকান৷ একই-সঙ্গে র্যাকগুলোতে পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে পাঠ্যপুস্তক, গল্প-উপন্যাসের বই, রামকৃষ্ণ কথামৃত থেকে শুরু করে বাৎসায়ন পর্যন্ত৷ সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, খাতা-পেনও বিক্রি হয় দোকানটাতে৷ র্যাকগুলোর দিকে তাকিয়ে তার পছন্দের বইয়ের সন্ধান করতেই পরিচিত লেখকদের বেশ কয়েকটা গল্প-উপন্যাসের সন্ধান পেয়েও গেল নবারুণ৷ দোকানদারকে বইগুলো দিতে বলল৷
লোকটা বইগুলো নামিয়ে বিল করতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় সামনের র্যাকটাতে হঠাৎ-ই একটা বইয়ের ওপর নজর পড়ল তার৷ বেশ মোটা বই—‘বৃহৎ তন্ত্র সাধনা৷’—এ ধরনের বই রেল স্টেশনের কিয়স্কে, বাসস্ট্যান্ডে অনেকবার দেখেছে নবারুণ৷ কিন্তু এসব বশীকরণ, তন্ত্রসাধনা- গুপ্তবিদ্যা বইয়ের ওপর কোনওদিনই কোনও আগ্রহ ছিল না তার৷ থাকার কথাও নয়৷
কিন্তু হঠাৎই যেন আগ্রহ হল বইটার প্রতি৷ হয়তো বা এ প্রসঙ্গে ডাক্তার ঘটকের কাছে নানা উদ্ভট ব্যাপার শোনার জন্যই বা তাঁর সেই তন্ত্রসিদ্ধ গুরুদেবকে দেখার জন্যই৷ সে এসব ব্যাপার বিশ্বাস না করলেও এই বইটা বলেই হয়তো সেই উদ্ভট ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে জানা যেতে পারে৷ বইয়ের কথা পড়ে চমকে দেওয়া যেতে পারে ডাক্তার ঘটককে, সবচেয়ে বড় কথা হল সময়টা কাটবে—এই ভেবে সে দোকানদারকে প্রথমে বলল তার হাতে বইটা দেওয়ার জন্য৷ তারপর বইটা হাতে নিয়ে একটু উলটেপালটে দেখে সে দোকানদারকে বলল, বইটা দিয়ে দিতে৷
দোকানদার যেন একটু বিস্মিত হল তার কথা শুনে৷ অনেকদিন কোনও খবরের কাগজও পড়েনি নবারুণ৷ বেশ কয়েকটা দৈনিক সংবাদপত্রও কিনল সে৷ তারপর দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসল৷ কিছু সময়ের মধ্যেই সে আবার ফিরে এল তার থাকার জায়গায়৷
দুপুরটা নবারুণ চার-পাঁচটা খবরের কাগজ পড়েই কাটিয়ে দিল৷ একসময় বিকেল হয়ে এল৷ নবারুণ ভাবল পিছনের জমিটা থেকে একবার ঘুরে আসা যাক৷ সেইমতো কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর ছেড়ে পিছনের জমিটাতে নামল সে৷ হাঁটতে হাঁটতে নবারুণ গিয়ে উপস্থিত হল জমিটার শেষ প্রান্তে৷ অঘোর তান্ত্রিকের ঘরটা ভিতর থেকে বন্ধ৷ সে এরপর এগোল গাছগুলোর দিকে৷ সেদিকে এগোতেই গাছের মাথায় বসে থাকা একঝাঁক কাক হঠাৎ ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠে পাক খেতে থাকল৷ তারপরই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল তার৷ গাছের একটা গুঁড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ডাক্তার ঘটকের কুহকিনী মা৷ সে কামড়ে ধরে আছে একটা পাখির ডানা৷ সদ্য মনে হয় সেই পাখিটাকে ধরেছে সে৷
ঘুঘুর মতো দেখতে একটা পাখি৷ হয়তো বা হরিয়াল৷ ডানা ঝাপটাচ্ছে পাখিটা৷ রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে তার ডানা থেকে৷ বীভৎস দৃশ্য৷ হয়তো বা বেড়ালটার মুখ থেকে সেই সুন্দর পাখিটাকে এখনও বাঁচানো যাবে— এই ভেবে নবারুণ মাটিতে পড়ে থাকা একটা ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে বেড়ালটাকে মারতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ-ই পিছন থেকে একটা কর্কশ চিৎকার শুনল সে, ‘খবরদার, ওকে আঘাত করলে তোমার ক্ষতি হবে৷ থামো...৷’
থমকে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকাল নবারুণ৷ সেই অঘোর সন্ন্যাসী কখন যেন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন৷ তাঁর চোখে স্পষ্ট অসন্তোষের ছাপ৷ নবারুণ তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি ক্রুদ্ধভাবে বলে উঠলেন, ‘তুমি কুহকিনীকে আঘাত করতে চাইছ কেন?’
নবারুণ বলল, ‘ও ওই সুন্দর পাখিটাকে মারছে৷ পাখিটাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি৷’
অঘোর তান্ত্রিক বললেন, ‘কিন্তু ওটা ওর স্বাভাবিক খাদ্য৷’
প্রভুকে দেখতে পেয়েই কুহকিনী ছুটে গেল অঘোর তান্ত্রিকের পায়ের কাছে৷ পাখিটা তখনও মৃদু ছটফট করছে৷ নবারুণ বলে উঠল, ‘পাখিটাকে ওর মুখ থেকে ছাড়িয়ে দিন৷ হয়তো বা এখনও বেঁচে যাবে পাখিটা৷ ও মেরে ফেলবে পাখিটাকে৷’
একটা অদ্ভুত হাসি এবার ফুটে উঠল অঘোর তান্ত্রিকের মুখে৷ তিনি বললেন, ‘পাখিটাকে খাদ্য হিসাবে হত্যা করছে কুহকিনী৷ কিন্তু তোমার হাতে যে নরহত্যা লেখা আছে৷ আবারও কথাটা বলছি তোমাকে৷’
তাঁর কথা শুনে এবার স্তম্ভিত হয়ে গেল নবারুণ৷ সে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না৷ পাখিটার জীবন শেষ হয়ে এসেছিল৷ ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে কুহকিনীর মুখে নেতিয়ে পড়ল সে৷ সেই অবস্থাতেই তাঁর আদরের কুহকিনীকে কোলে নিয়ে ঘরে ফিরে গেলেন সন্ন্যাসী৷
অঘোর তান্ত্রিকের কথা শুনে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নবারুণ৷ লোকটা কি পাগল, নাকি ওসব কথা বলে নবারুণের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে? বেশ কিছুক্ষণ নবারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল৷ তারপর এগোলো বাড়িটাতে ফেরার জন্য৷ অন্ধকার প্রায় হয়ে এসেছে৷ তবে বাড়িটাতে ঢোকার সময় ওপরের দিকে জানলাটা আজ বন্ধ৷ নবারুণ নিজের ঘরে এসে ঢুকল৷
ঠিক সেই সময় রিসেপশনের বাইরে থেকে একটা চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ তার কানে এল৷ নবারুণ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এগোলো রিসেপশনের দিকে৷ না, ঠিক রিসেপশন নয়, রিসেপশনের বাইরে মেইন গেটের কাছে চিৎকার-চেঁচামেচি হচ্ছে৷ গেটটা বন্ধ৷ ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে গেটম্যান ননীগোপাল৷ আর গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে এক হাতে সেটা ধরে ঝাঁকাচ্ছে একজন৷ সেই লোকটাই চিৎকার করছে৷
রিসেপশনের দরজার সামনে থেকে নবারুণ দেখল লোকটাকে৷ ক্ষয়াটে চেহারার মাঝবয়সি একটা লোক৷ তার একটা হাত কবজি থেকে কাটা৷ লোকটা টলছে৷ অর্থাৎ নেশা করে আছে৷ শ্যামা নামে মেয়েটার বলা-কথা মনে পড়ে গেল নবারুণের৷ তাহলে এ লোকটাই শ্যামার বর৷ লোকটা গেট ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর জড়ানো গলায় বলছে, আমারই বউ, আর তার সঙ্গে দেখা হবে না৷ এ কেমন নিয়ম গা...৷
আর ননীগোপাল বলছে, ‘বলছি তো বড় স্যারের বারণ আছে৷ তোমাকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না৷ তার ওপর তুমি মদ খেয়ে আছ৷ তুমি স্যারের সঙ্গে দেখা করো৷’
হাতকাটা লোকটা বলল, ‘দেখা করতে গিয়েছিলাম তো কিন্তু ঘটক ডাক্তারকে পেলাম না৷ অন্য সময় তো বাড়ি গিয়ে বলে যে, বউকে বাচ্চা বিয়াও! আর এখন চার দিন ধরে তার পাত্তা নেই৷ এদিকে টাকা যা দিয়েছিল সব শেষ...
নবারুণ কথাটা শুনে বেশ অবাক হল৷ ডাক্তার ঘটক এ-লোকটাকে সন্তানের জন্ম দিতে বলেছেন? কী বলছে লোকটা? পরক্ষণেই অবশ্য মনে হল যে, লোকটা মাতাল৷ নেশার ঘোরে লোকটা কী বলছে ঠিক নেই৷ লোকটা আবারও গেট ঝাঁকিয়ে বলে, ‘ঢুকতে দাও৷ ঢুকতে দাও আমাকে৷ নিজের ইস্ত্রি, তাকে দেখতে পাব না?’
গেটম্যান ননীগোপাল কঠিন স্বরে বলল, ‘না, দেব না৷’
লোকটা এরপর কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল৷ তারপর বলল, ‘যেতে পারি৷ তবে কুড়িটা টাকা দাও৷ মাল খাব৷ নইলে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব আর গেট ঝাঁকাব৷’
ননীগোপাল আপদটাকে বিদায় করার জন্য কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘টাকা দিলে ঠিক যাবি তো?’
হাতকাটা লোকটা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিক যাব৷’
ননীগোপাল এরপর তার পকেট থেকে দুটো দশ টাকার নোট বার করে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে দিল তার দিকে৷ লোকটা খপ করে টাকাটা নিল৷ যেন স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য নয়, এই টাকার জন্যই এখানে এসেছিল সে৷ কারণ, টাকাটা হাতে নিতেই হাসি ফুটে উঠল লোকটার মুখে৷ সে ননীগোপালের উদ্দেশ্যে বলল, ‘বেঁচে থাকো বাবা, বেঁচে থাকো৷ আর ঘটক ডাক্তারকে বোলো যে, দুটো বাচ্চা তো নষ্ট হল৷ এবার যেন আমার একটা ছেলে হয় বাবা৷’—এই বলে সে টলতে টলতে গেট ছেড়ে এগোল বড় রাস্তার দিকে৷
লোকটাকে বিদায় করে পিছনে ফিরতেই ননীগোপাল দেখতে পেল নবারুণকে৷ সে মনে হয় আন্দাজ করল যে, নবারুণ ঘটনাটা দেখেছে৷ তাই সে একটু অসহায়ভাবে বলল, ‘কী করব স্যার? লোকটা ভিতরে ঢুকতে চাইছিল, এদিকে বড় স্যারের কড়া হুকুম যে তিনি না-থাকলে যেন ওকে নার্সিংহোমে ঢুকতে না দেওয়া হয়৷ তার ওপর লোকটা গলা পর্যন্ত মদ খেয়ে আছে৷ ওপরে উঠে যদি সে কোনও কাণ্ড ঘটায় তবে আমার চাকরি যাবে৷ আমি কী করব স্যার?’
ননীগোপালের কথা শুনে নবারুণ বুঝতে পারল তার মানে মেয়েটা এখনও সেখানে আছে৷ হয়তো এখন সে তিনতলার একলা ঘরে বসে তার স্বামীর প্রতীক্ষা করছে৷ কেয়ারটেকার ননীগোপালের কিছু করার নেই৷ ডাক্তার ঘটকের কড়া হুকুম আছে এ-ব্যাপারে৷ তবে তার বর যে তাকে একেবারে ভুলে যায়নি, তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, এটা জানতে পারলে হয়তো কিছুটা শান্তি পাবে মেয়েটা৷ খবরটা তাকে দিতে পারলে ভালো হয়৷
মনে মনে এ-কথা ভেবে নিয়ে নবারুণ গেটম্যানকে বলল, ‘হ্যাঁ, তোমার কিছু করার নেই৷ তারপর দরজা ছেড়ে রিসেপশনের ভিতরে উঠে এগোলো সিঁড়ির দিকে৷ সিঁড়ির ঠিক মুখটাতেই একটা কোলাপসিবল গেট বসানো আছে৷ অন্যদিন সেটা হাট করে দু’পাশে সরানো থাকে৷ আজ সেটা টানা৷ তবে তালা দেওয়া নেই৷ নবারুণ গেটটা খুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল ওপরদিকে৷ ঠিক সেইসময় অন্ধকার নামল বাইরে৷
নবারুণ তিনতলায় উঠে ওই ঘরটার সামনে পৌঁছে গেল৷ আজ কিন্তু ঘরের দরজাটা ভেজানো নেই, ভেতর থেকে বন্ধ করা৷ দরজায় টোকা দিতেই সেই নারীর কাঁপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল—কে? কে এসেছ?’
নবারুণ জবাব দিল, ‘আমি ডাক্তার৷’
নবারুণের কণ্ঠস্বর মনে হয় চিনতে পারল মেয়েটা৷ দরজাটা খুলে গেল তারপর৷ বাইরে কয়েক হাত তফাতে দাঁড়িয়ে আছে নবারুণ৷ শ্যামা দরজার বাইরে অন্ধকার প্যাসেজের দিকে গলা বাড়িয়ে একবার দেখে নিয়ে একটু ভয়ার্তভাবে বলল, ‘ও নেই তো?’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নবারুণ প্যাসেজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কে? কার কথা বলছ?’
মেয়েটা বলল, ‘ওই কালো বেড়ালটা!’
নবারুণ বলল, ‘না, সে এখানে নেই৷’
মেয়েটা এবার তাকে তাড়া দিয়ে বলল, ‘ভেতরে এসো, ভেতরে এসো৷’
নবারুণ ঘরে ঢুকতেই সে সঙ্গে সঙ্গে দরজার ছিটকিনি তুলে দিল৷ এ ব্যাপারটাতে নবারুণের একটু অস্বস্তি হলেও সে মুখে কিছু বলল না৷ তবে সম্ভবত নবারুণের অস্বস্তিটা আন্দাজ করেই শ্যামা বলল, ‘ওই বেড়ালটা অপয়া৷ ও আমার বাচ্চা খেয়েছে৷ ওর ভয়েই দরজা-জানলা সব বন্ধ করে বসে আছি৷’
কোনও কোনও সময় ভাগাড়ে মৃত পরিত্যক্ত বাচ্চার মৃতদেহ কুকুর-বেড়াল খায় নবারুণ শুনেছে৷ একবার খবরের কাগজে বেরিয়েও ছিল সে ছবি৷ তা নিয়ে খুব হইচইও হয়েছিল৷ কিন্তু পেটের বাচ্চাকে বেড়াল খাবে কীভাবে, বউটার পেটে যে আছে সে তো এখনও ভূমিষ্ঠ হয়নি! শ্যামা সম্ভবত সংস্কার মতোই কথাটা বলছে মনে হয় নবারুণের৷ সে তাকে শান্ত করার জন্য বলল, ‘শোনো, তোমার বর আজ একটু আগে এসেছিল তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য৷ কিন্তু গেটম্যান তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি৷ কারণ, ডাক্তার ঘটকের নিষেধ আছে আর তাছাড়া সে মদ খেয়ে আছে৷’
শ্যামা তার বরের ফিরে যাবার কথাটাতে আজ যেন তেমন গুরুত্ব দিল না৷ সে বিড়বিড় করে বলল, ‘সে-ই তো প্রতিবার ডাক্তারবাবুর কথা শুনে আমাকে জোর করে এখানে আনে৷ যখন ফিরিয়ে নিয়ে যার তখন সব শেষ হয়ে গেছে৷ ডাক্তারবাবুর থেকে টাকা নেয় ও৷’
মেয়েটার শেষের কথাটা বুঝতে না পেরে নবারুণ সে সম্বন্ধে তাকে প্রশ্ণ করতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু তার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়ল শ্যামা৷ ‘আমাকে তুমি বাঁচাও ডাক্তার৷ আমার পেটের বাচ্চাকে এবারের জন্য বাঁচাও৷’ কথাটা বলতে বলতে হঠাৎ-ই সে জড়িয়ে ধরল নবারুণকে৷
মুহূর্তের জন্য নবারুণের মনে হল তাকে যে জড়িয়ে ধরেছে সে শ্যামা নয়, সে মালবিকা৷ ঠিক এভাবেই সে নবারুণকে জড়িয়ে কেঁদে উঠেছিল, হাসপাতালের ঘটনাটা ঘটার পর শেষবারের জন্য যেদিন তাদের একান্তে দেখা হয়েছিল! সে-ও বলেছিল ‘তুমি আমাকে বাঁচাও৷’ যার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল যে, ‘তোমার কিছু হলে আমার কী হবে?’
নবারুণকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটা কেঁদে চলেছে, ‘আমাকে তুমি বাঁচাও, আমার সন্তানটাকে বাঁচাও’ বলে!
বিহ্বল হয়ে পড়েছিল নবারুণও৷ কিন্তু সে সম্বিৎ ফিরে পেল৷ নার্সিংহোম জনশূন্য৷ বন্ধ ঘরে তাকে জড়িয়ে ধরেছে এক রমণী৷ কখন কী ঘটে যায় কে বলতে পারে? হয়তো এই মেয়েটাই শেষে বলল যে...৷ তখন মেয়েটার কথাই সবাই বিশ্বাস করবে৷
কোনওরকমে আলিঙ্গনমুক্ত করে নবারুণ বাইরে বেরিয়ে এল৷ এবং দরজাও বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু সেই বন্ধ, ঘরের ভিতর থেকে মেয়েটার করুণ আর্তি শোনা যেতে লাগল, ‘ডাক্তার তুমি আমাকে বাঁচাও৷ আমার সন্তানকে বাঁচাও...৷’
সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে যাচ্ছিল নবারুণ৷ ঠিক সেইসময় সে দেখল, সেই বেড়ালটা—কুহকিনী সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে ওপর দিকে৷ নবারুণকে দেখে বিড়ালটা কিন্তু পিছিয়ে গেল না৷ বরং নবারুণের মনে হল সে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে নবারুণের দিকে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছিল৷ নবারুণের তাকে দেখে মাথাটা কেমন গরম হয়ে গেল৷ সে সপাটে একটা লাথি কষাল কুহকিনীকে লক্ষ্য করে৷ একটা অদ্ভুত চিৎকার করে নীচে ছিটকে পড়ল বেড়ালটা৷ তারপর কোথায় যেন মিলিয়ে গেল!
ঘরে ফিরে এল নবারুণ৷ কানে এখনও বাজছে মেয়েটার আর্তনাদ৷ বেশ কিছুক্ষণ সে চুপচাপ বসে রইল৷ একসময় খেয়াল হল, বেশ ঠান্ডা লাগছে৷ নবারুণ উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানলাটা বন্ধ করার জন্য৷ ঠিক সেই সময় সে জানলার কিছুটা তফাতে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে-থাকা অঘোরবাবাকে দেখতে পেল৷ তিনি তাকিয়ে আছেন নবারুণের দিকে৷ তাঁর চোখ দুটো যেন জ্বলছে৷ মুহূর্তখানেক, আর তার পরই তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন অন্ধকারের মধ্যে৷
তিনি কি ঘরের ভেতর থাকা নবারুণকেই লক্ষ করছিলেন? নাকি তাঁর পোষ্যের সন্ধানে তিনি এসেছিলেন তা বুঝতে পারল না নবারুণ৷ রাত আটটা নাগাদ ননীগোপাল খাবার দিতে এসে বলে গেল, আপনি তো কাল স্যার চলে যাবেন৷ আপনি চলে যাওয়ার পর কাল থেকে তিন-চারদিনের জন্য আমারও ছুটি৷ বাড়ি যাব৷ কাল সকালের পর আবার নতুন নার্সিংহোমে দেখা হবে আপনার সঙ্গে৷
রাতের খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ল নবারুণ৷ কিন্তু সারারাত ধরে আবারও সে মালবিকার স্বপ্ণ দেখতে শুরু করল৷ তবে এ-রাতের স্বপ্ণটা বেশ অদ্ভুত৷ স্বপ্ণের মধ্যে সে কখনও দেখতে পেল মালবিকার মুখ, আবার কখনও শ্যামার মুখ৷ দুটো মুখ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে লাগল তার স্বপ্ণে৷
ছয়
সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙল নবারুণের৷ তার পরও বেশ কিছুক্ষণ ধরে স্বপ্ণটা অনুরণিত হতে লাগল তার মনের মধ্যে৷ দুটো মুখ কেমন যেন মিলেমিশে যাচ্ছে তার মনে৷ একসময় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল নবারুণ৷ মুখ ধুয়ে মাঠে নামার সময় একবার সে তাকাল জানলাটার দিকে৷ পাল্লাটা খোলা৷ সেদিকে তাকিয়ে নিয়ে সে অন্যদিনের মতোই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল জমিটার শেষ প্রান্তে৷
অঘোর তান্ত্রিকের ঘরের দরজাটা বন্ধ৷ এরপর সে এগোল গাছে-ঘেরা জায়গাটার দিকে৷ পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়েছে বেদিটার ওপর৷ সেটা জল দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করেছে কেউ৷ বেদি সংলগ্ণ জমির আগাছাগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে৷ আজই তো অঘোর তান্ত্রিকের সেই মহাযজ্ঞ করার কথা৷ নবারুণ বুঝতে পারল সেজন্যই পরিষ্কার করা হয়েছে ওই জায়গা৷
কিছুক্ষণ সেদিকে থাকার পর নবারুণ ফিরতে শুরু করল৷ বাড়িটার ভিতরে ঢোকার আগেই সে দেখতে পেল শ্যামাকে৷ জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে৷ প্রভাতি সূর্যকিরণ এসে পড়েছে তার মুখে৷ নবারুণের মনে হল, ঠিক যেন মালবিকা বিষণ্ণ্ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে৷ এর পরেই মনে মনে হাসল নবারুণ৷ না, মালবিকা আর কোনওদিন-ই ফিরবে না৷ তবে যাওয়ার আগে শেষ একবার মেয়েটার সঙ্গে দেখা করে তাকে ভরসা দিয়ে যাবে মনে মনে ভেবে নিল নবারুণ৷
ঘরে ঢুকে তার টুকটাক যেসব জিনিস ঘরের মধ্যে ছিল তা গুছিয়ে নিয়ে স্নান সেরে তৈরি হয়ে ন’টা নাগাদ রিসেপশনে এসে দাঁড়াল৷ ডাক্তার ঘটক নিশ্চয়ই কিছুক্ষণের মধ্যে আসবেন৷ তার আগে একবার মেয়েটার সঙ্গে দেখা করে আসবে, এই ভেবে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু সে দরজার বাইরে তাকিয়ে দেখল যে, ডাক্তার ঘটকের গাড়িটা বাইরের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ অর্থাৎ তিনি চলে এসেছেন৷ আর তারপরই ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন ডাক্তার ঘটক৷ তাঁর মুখ যেন ঈষৎ গম্ভীর৷ নীচে নেমে তিনি প্রথমে সিঁড়ির মুখের কোলাপসিবল গেটটা টানলেন৷ তারপর পকেট থেকে তালাচাবি বার করে তাতে তালা লাগালেন৷ নবারুণ বুঝতে পারল, তার ওপরে ওঠার পথ বন্ধ হয়ে গেল৷ সে বলল, ‘মেয়েটাকে তো জানলায় দেখলাম৷ তবে তালা দিয়ে দিচ্ছেন কেন?’
ডাক্তার ঘটক কয়েক মুহূর্ত তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তাকে পালটা প্রশ্ণ করলেন, ‘কাল কি তুমি কুহকিনী মাকে আঘাত করেছিলে?’
নবারুণ একটু বিস্মিত হল কথাটা শুনে৷ তখন তার আশপাশে তো কেউ ছিল না৷ ব্যাপারটা তিনি জানলেন কীভাবে? একটু ইতস্তত করে সে জবাব দিল, হ্যাঁ৷ বেড়ালটা ওপরে উঠছিল৷ মেয়েটা খুব ভয় পায় বেড়ালটা দেখে...
নবারুণের কথা শেষ হওয়ার আগেই ডাক্তার ঘটক একটু ভর্ৎসনার সুরে বললেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি৷ কুহকিনী মা ফিরে গিয়ে কথাটা বলেছেন বাবাকে৷ তিনিই কথাটা বলেছেন আমাকে৷ তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তোমার ওপর৷ আমি তোমার হয়ে তাঁর কাছ ক্ষমা চেয়ে তাকে ঠান্ডা করেছি৷ নইলে ক্ষতি হত তোমার৷’
ডাক্তার ঘটকের কথা শুনে হঠাৎ নবারুণের মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের সেই দৃশ্য৷ জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে তার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছেন অঘোর তান্ত্রিক৷ তাহলে কি তিনি সে কারণেই ছুটে এসেছিলেন? ওই কালো বেড়ালটা কি সত্যি তাকে খবরটা দিয়েছিল? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?
ডাক্তার ঘটকের কথার কী জবাব দেবে তা বুঝে উঠতে পারল না নবারুণ৷ সে চুপ করে রইল৷
ডাক্তার ঘটক অবশ্য এরপর নিজেকে সামলে নিলেন৷ মৃদু হেসে নরম গলায় তিনি প্রথমে বললেন, ‘থাক, এসব ব্যাপার নিয়ে আর ভেবো না৷ আমি সামলে নিয়েছি ব্যাপারটা৷ চিয়ার আপ মাই বয়৷ তুমি তৈরি তো? এখনই কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে বেরোব৷ আজ আমার অনেক কাজ৷ আজ ভূতচতুর্দশীর রাতে ডাকিনী মহাযজ্ঞে বসবেন গুরুদেব৷ তার জন্য সারাদিন নানা ব্যবস্থা করতে হবে৷’
এ কথা বলার পর তিনি কোলাপসিবল গেটটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তালা দিয়ে দিলাম৷ আমরা তো সবাই এখন চলে যাব৷ দিনকাল ভালো নয়, তাই দিলাম৷’
নবারুণ এবার বলল, এভাবে একা একা থাকবে মেয়েটা? অন্য দুজন পেশেন্ট তো চলে গেল৷ ওকে ছাড়লেন না কেন?
ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘বেশিক্ষণ নয়৷ ঘণ্টাখানেকের জন্য মাত্র৷ আমি তো আবার এখানে ফিরেই আসছি৷ তারপর সারা দিন সারা রাত এখানে কাটাব৷ আর মেয়েটাকে তো ওর বর নিতে এল না৷ কোনও ভাটিখানায় পড়ে আছে হয়তো৷ দেখি আজ রাতে যজ্ঞের কাজটা মিটলে ও-ব্যাটাকে খুঁজে এনে বউটাকে তার হাতে তুলে দেব৷’
কথাটা শুনে নবারুণ বলল, ‘কাল সন্ধ্যায় লোকটা এসেছিল৷ আপনার বারণ থাকায় ননীগোপাল তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি৷’
নবারুণের কথা শুনে ডাক্তার ঘটক মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘তাই নাকি! লোকটা এলে তার সঙ্গে বউটাকে ছেড়ে দিতে বলে যাওয়া উচিত ছিল আমার৷ আসলে লোকটা মাতাল অবস্থায় থাকে৷ তাই তাকে আমি না থাকলে ভিতরে ঢুকতে বারণ করে দিয়ে গিয়েছিলাম ননীগোপালকে৷ এর আগে লোকটা একবার অন্য পেশেন্টের কেবিনে ঢুকে ঝামেলা পাকিয়েছিল৷’
এ কথা বলার পর ডাক্তার ঘটক ঘড়ি দেখে বললেন, ‘এবার তোমার ব্যাগট্যাগ নিয়ে এসো৷ আজ আমার অনেক কাজ...’
নবারুণ আর দাঁড়াল না৷ সে এগোল ঘরের দিকে৷ ঘরে ঢুকে সে ব্যাগটা নিয়ে তাকাল জানলার দিকে৷ সে দেখতে পেল ননীগোপালকে৷ মাঠ পেরিয়ে জানলার কাছে এসে পড়েছে৷ লোকটা এ-ক’দিন খাবারের ব্যবস্থা করেছে নবারুণের৷ সে ইশারায় ডাকল তাকে৷ তারপর পকেট থেকে একশো টাকার দুটো নোট নিয়ে জানলা দিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘এটা রাখো৷ আমি চলে যাচ্ছি৷ নতুন নার্সিংহোমে আবার দেখা হবে৷’
ননীগোপাল খুশি হয়ে টাকাটা নিয়ে বলল, ‘আপনারা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমিও বেরোব৷ বড় স্যার একটা ট্রলি-বেড সাধুবাবার ঘরে রেখে আসতে বললেন, সেটা রেখে এলাম৷’
ট্রলি-বেড কেন? ও-ঘরে কি বিছানা নেই? প্রশ্ণটা মনে এল নবারুণের৷ তবে সে প্রশ্ণটা করল না ননীগোপালকে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই নার্সিংহোম ছেড়ে ডাক্তার ঘটকের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল নবারুণ৷
শহরে এসে ঢুকল নবারুণরা৷ পরদিন কালীপুজো৷ তাই বাজারে লোকজনের কেনাকাটার বেশ ভিড়৷ জায়গায় জায়গায় কালীপুজোর প্যান্ডেল৷ মাইক বাজছে৷ ডাক্তার ঘটক নবারুণকে নিয়ে নামলেন শহরের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে নার্সিংহোমের সামনে৷
ঝঁা-চকচকে বিশাল পাঁচতলা নার্সিংহোম৷ বেশ কয়েক কোটি টাকার প্রজেক্ট হবে৷ নবারুণ বিস্মিতভাবে তাকিয়ে রইল বাড়িটার দিকে৷ তাকে নিয়ে নার্সিংহোমের ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘এসব যা দেখছ তা সবই গুরুদেবের কৃপায়৷ তাঁর ওপর ভরসা রাখলে একদিন তোমারও এমন হবে৷’
নবারুণকে নিয়ে ডাক্তার ঘটক উপস্থিত হলেন বাড়ির পিছনের অংশে৷ ডক্টরস কোয়ার্টার্স৷ সার সার এসি বসানো ঘর সেখানে৷ কেয়ারটেকার গোছের একজন লোক এসে সেলাম ঠুকল তাঁদের সামনে৷ তাকে দেখিয়ে ডাক্তার ঘটক নবারুণকে বললেন, ‘এ তোমার খাওয়ার ব্যবস্থা করবে৷ কোনও চিন্তা নেই৷ সব বলা আছে৷’
একটা ঘর খুলে দিল লোকটা৷ নবারুণরা প্রবেশ করল সে-ঘরে, ওয়েল ফার্নিসড্ ঘর৷ খাট-আলমারি সবই আছে৷ ঘরের সঙ্গেই একটা ছোট কিচেন আর বাথরুম৷ সেঘরে ঢুকে মামুলি কিছু কথাবার্তার পর ডাক্তার ঘটক বললেন, ‘আমি এবার যাচ্ছি৷ কাল সকালে আবার দেখা হবে৷ আজ সারারাত যজ্ঞ হবে৷ সে-কাজ শেষ হলে গুরুদেবকে ভোরবেলা যাত্রা করিয়েই আমি এখানে ন’টা নাগাদ চলে আসব৷’—এই বলে নবারুণের ঘর ছেড়ে, নার্সিংহোম ছেড়ে মহাযজ্ঞের প্রস্তুতির জন্য রওনা হয়ে গেলেন ডাক্তার ঘটক৷
দুপুরে ঠিক সময়েই খাবার এসে গিয়েছিল নবারুণের৷ তারপর টানা ঘুম দিয়ে নবারুণ যখন উঠল তখন সন্ধ্যা নেমেছে৷ জানলার সামনে এসে দাঁড়াল নবারুণ৷ নার্সিংহোমের অনুচ্চ প্রাচীরের ওপাশে রাস্তায় লোক চলাচল করছে৷ জানলা ধরে দাঁড়িয়ে লোক চলাচল দেখতে লাগল সে৷ এই নার্সিংহোমেই নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে সে৷ আস্তে আস্তে এখানকার রাস্তাঘাট, লোকজন সবার সঙ্গেই পরিচিত হবে৷ কলকাতা থেকে অনেক দূরে এখানকার জনজীবনের সঙ্গে মিশে যাবে সে৷ রাস্তার লোক চলাচল দেখতে দেখতে এসবই ভাবছিল নবারুণ৷
একসময় আশপাশের কয়েকটা বাড়ির ছাদে প্রদীপের আলো জ্বলে উঠল৷ ভূতচতুর্দশীর রাত৷ এ-রাতে নাকি প্রেতাত্মারা জেগে ওঠে৷ আর তাদের দূরে সরাবার জন্যই নাকি আলো জ্বালানো হয়, এ-কথা শুনেছে নবারুণ৷
এরপর কোথায় যেন ঢাক বাজতে শুরু করল৷ নিশ্চয়ই কাছের কোনও পুজো প্যান্ডেল থেকে ভেসে আসছে ওই শব্দ৷ কালীপুজো ব্যাপারটা মনে আসতেই নবারুণের ধীরে ধীরে আবারও মনে পড়ে যেতে লাগল দু-বছর আগের সে-রাতের ঘটনাটা৷ আর তার সঙ্গে মনে পড়ে যেতে লাগল মালবিকার স্মৃতি৷ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ নবারুণের ঘরে এসে রাতের খাবার দিয়ে লোকটা বলে গেল তার বাড়িতে কিছু কাজ আছে বলে আজ সে তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে৷ যদি নবারুণকে কোনও কাজে বাইরে বেরোতে হয় তার জন্য সদর দরজার একটা চাবিও সে দিয়ে গেল নবারুণকে৷ রাতটা এই নতুন নার্সিংহোমে একলাই কাটাতে হবে নবারুণকে৷ পরদিন ভোরেই আবার ফিরে আসবে লোকটা৷
সে চলে যাওয়ার পর আবারও যেন পুরোনো কথাগুলো ঘিরে ধরতে লাগল নবারুণকে৷ সে-ভাবনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নবারুণ ভাবল যে, বইগুলো একবার নেড়েচেড়ে দেখা যাক৷ তন্ত্রের ব্যাপার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা নেই তার৷ দেখা যাক বইটা কী বলে? এই ভেবে বইটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে৷
সত্যিই বইটার মধ্যে কিছুক্ষণের মধ্যে ডুবে গেল সে৷ সত্যিই কী অদ্ভুত বিষয় সব! বশীকরণ, বাণমারা, প্রেতাত্মাকে জাগানো কত কিছুর পদ্ধতি লেখা আছে সেখানে৷ ব্যাপারগুলো নবারুণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে না হলেও সেগুলো বেশ অদ্ভুত বলে পড়তে বেশ আগ্রহও লাগছিল৷ কখনও কখনও তার বেশ মজাও লাগছিল৷ এক জায়গায় যেমন লেখা আছে যে, শকুনির ডিম পারদপূর্ণ করে মুখে দিয়ে নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ করলে নাকি শুক্লপক্ষের শেষ রাতে শূন্য মার্গে বিচরণ করা যায়৷ আবার মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে জলের ওপর হাঁটার কৌশলও লেখা আছে৷ বিভিন্ন যজ্ঞের জন্য, তন্ত্রসাধনার জন্য নানা উপকরণও লেখা আছে সে বইতে৷
শবসাধনার জন্য নরদেহের কথা তো আছেই, আছে বিভিন্ন সাধনার জন্য ব্যবহার্য নরকরোটিসহ বিভিন্ন মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপচারের কথা৷ আছে কালো বেড়ালের হাড়, কাকের চঞ্চু, বানরের চামড়াসহ কর্তিত হাত-এসব অদ্ভুত উপকরণের কথা৷ মোটা বইটার পাতার পর পাতা উলটে পড়ে যেতে লাগল নবারুণ৷ বাইরে রাত বাড়তে লাগল৷ স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল রাস্তার কোলাহল৷
বইটা পড়তে পড়তে একসময় একটা অধ্যায়ে এসে উপস্থিত হল নবারুণ৷ ‘ডাকিনী মহাযজ্ঞ’ সম্বন্ধে সেখানে লেখা আছে৷ এ যজ্ঞই তো আজ করতে চলেছেন ডাক্তার ঘটকের অঘোর তান্ত্রিক৷ ব্যাপারটা বোঝার জন্য সে উৎসাহভরে অধ্যায়টা পড়তে শুরু করল৷ আর সেখানেই সে পেয়ে গেল জীবন্ত ‘ব্রহ্ম উপবীতে’র ব্যাপারটা৷ যা এ-যজ্ঞের প্রধান উপচার৷ যা ধারণ করে এ-যজ্ঞে বসতে হবে৷ আর সেটা পড়েই খাট ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বসল নবারুণ৷ তার কাছে মুহূর্তের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেল ব্যাপারটা৷ তার কানে বেজে উঠল শ্যামা নামের মেয়েটার কাতর কণ্ঠস্বর—আমাকে তুমি বাঁচাও! আমার পেটের বাচ্চাটাকে তুমি বাঁচাও...! কেঁপে উঠল নবারুণের শরীর৷ বইতে যা লেখা আছে তা সংগ্রহের জন্যই কি মেয়েটাকে রাখা?
মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল নবারুণের৷ তার চোখে খালি ভেসে উঠতে লাগল মেয়েটার মুখটা৷ আর তারপর সেই মুখ বদলে গেল মালবিকার মুখে৷ সে যেন বলছে, ‘তুমি আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও...!’
তার ডাক আর সহ্য করতে পারছে না নবারুণ৷ সে এক সময় চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, আমি বাঁচাব তোমাকে৷ আমি আসছি, আমি আসছি৷ এ ঘটনা আমি কিছুতেই ঘটতে দেব না...’
ঘর ছেড়ে পাগলের মতো ছিটকে বেরোল নবারুণ৷ তারপর কোনও রকমে দরজা খুলে নার্সিংহোম থেকেও৷ মালবিকা যে ডাকছে তাকে৷ নবারুণকে বাঁচাতে হবে৷ বাঁচাতে হবে তার পেটের বাচ্চাটাকে৷
কিন্তু কীভাবে সে পৌঁছোবে সেখানে? রাত এগোরোটা বাজে৷ মফস্সলের রাত৷ পথঘাট সব শুনশান হয়ে গিয়েছে৷ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে সে একসময় পেয়ে গেল এক মাতাল সাইকেল রিকশওলাকে৷ নবারুণ তার পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে দিতেই সে-জায়গায় পৌঁছে দিতে রাজি হয়ে গেল লোকটা৷ নবারুণ চড়ে বসল তার রিকশায়৷ সারা পৃথিবী যেন ঘুমিয়ে পড়েছে৷ দু-একটা কুকুর ছাড়া কেউ জেগে নেই রাস্তায়৷ নবারুণ খালি লোকটাকে তাড়া দিতে লাগল৷ ‘আরও জোরে, আরও জোরে চালাও...৷’
তাড়া দেওয়া সত্ত্বেও প্রায় চল্লিশ মিনিট লেগে গেল তার সে-জায়গায় পৌঁছোতে৷ নার্সিংহোমের কিছুটা তফাতে তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল রিকশটা৷
ভূতচতুর্দশীর রাত্রি৷ আকাশে চাঁদ নেই৷ একটা আবছা আলো শুধু আছে৷ তার মধ্যে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা৷ নবারুণ এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল গেটের সামনে৷ কোনও শব্দ বাড়িটার ভিতর থেকে না এলেও ডাক্তার ঘটকের গাড়িটা অন্ধকারে মিশে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে৷ অর্থাৎ তিনি আছেন এখানে৷ গেটটা সন্তর্পণে খুলে ভিতরে ঢুকল নবারুণ৷ রিসেপশনের দরজাও খোলা৷ সে ভিতরে ঢুকে দেখল সিঁড়ির মুখের কোলাপসিবল গেটটাও খোলা ৷ তবে কি ডাক্তার ঘটক ওপরে গেছেন? আর সময় নষ্ট না করে নবারুণ দ্রুত উঠতে শুরু করল ওপরে৷ সে-ঘরটাতে পৌঁছে গেল নবারুণ৷
কিন্তু শূন্য ঘর৷ সেখানে কেউ নেই৷ জানলাটাও খোলা৷ সে তাকাল বাইরের দিকে৷ অন্ধকারে ডুবে আছে মাঠটাও, তবে তারই মধ্যে সেই গাছের জটলার ভিতর একটা আলো দেখল সে৷ তার মানে হয়তো তারা সেখানেই আছে৷ আবার দ্রুত ফিরতে শুরু করল নবারুণ৷ নীচে নেমে পিছনের জমিটাতে গিয়ে প্রাচীরের গা ঘেঁষে এগোতে লাগল মাঠের শেষ প্রান্তে সেই গাছে-ঘেরা জায়গার দিকে৷ হ্যাঁ, আলোটো ওর ভিতর থেকেই আসছে৷ ইলেকট্রিক বাতি নয়, মশালজাতীয় কোনও কিছুর আলো৷ যজ্ঞাগ্ণিও হতে পারে৷
নবারুণ উপস্থিত হল জায়গাটার কাছে৷ সে একবার তাকাল সেই ঘরটার দিকে৷ দরজা বন্ধ৷ কিন্তু ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ মুহূর্তের জন্য যেন কানে এল তার৷ ব্যাপারটা নবারুণের মনের ভুলও হতে পারে৷ নবারুণ গাছগুলোর কাছে গিয়ে গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে উঁকি দিল ভিতরে৷
বেদির ওপর বসে আছেন অঘোর তান্ত্রিক৷ তাঁর দেহের নিম্নাংশে রক্তাম্বর৷ দেহের ঊধর্বাংশ উন্মুক্ত৷ গলায়, বাহুতে রুদ্রাক্ষের মালা৷ কপালে রক্ততিলক৷ তার সামনেই বেদিতে যজ্ঞাগ্ণি জ্বলছে৷ সেই আলোই ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে গাছে-ঘেরা সেই বৃত্তাকার জায়গার মাঝে৷ যেখানে আগুন জ্বলছে তার চারপাশে চারটে নরকরোটি রাখা৷ বেদির ওপর সাজানো যজ্ঞের নানা উপকরণ৷ বেদির গায়েই অঘোর সন্ন্যাসীর হাতের নাগালের মধ্যেই মাটিতে প্রোথিত আছে ধারালো একটা ত্রিশূল৷ আর অন্যপাশে কিছুটা তফাতে আধো অন্ধকারে বসে আছে অঘোর সন্ন্যাসীর সেই কুহকিনী৷
সন্ন্যাসী মাঝে মাঝে ধুনো ছেটাচ্ছেন আগুনে৷ তাতে দপ্ করে জ্বলে উঠছে আগুনের শিখা৷ আর সেই আলোতে জ্বলজ্বল করছে প্রাণীটার চোখ দুটো৷ কীসের জন্য সে যেন প্রতীক্ষা করছে৷ সেটা কী তা বইটা পড়ে জেনে গিয়েছে নবারুণও৷ আলো এসে পড়েছে অঘোর তান্ত্রিকের মুখেও৷ তিনি মাঝে মাঝে ডান হাত দিয়ে আগুনে ধুনো ছুড়ছেন ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টি তাঁর সেই ঘরটার দিকে৷ তিনিও যেন কীসের একটা প্রতীক্ষা করছেন৷
তাহলে কি ওই ঘরেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে বউটাকে? শ্যামাকে? ট্রলি-বেডটা কি তার জন্যই ওঘরে পাঠানো হয়েছিল? যাতে অপারেশন টেবিলের মতো ওটাকে ব্যবহার করা যায়...৷
সে গাছের আড়াল থেকে এগোতে যাচ্ছিল ঘরটার দিকে৷ ঠিক সেইসময় ডাক্তার ঘটক সেই ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হলেন গাছের আড়ালে থাকা ফাঁকা জায়গাটার মধ্যে৷ ডাক্তার ঘটকের পরনেও লুঙ্গির মতো রক্তবস্ত্র৷ ঊধর্বাঙ্গ উন্মুক্ত৷ তাঁর কোলে ধরা আছে লালচে রঙের কী যেন একটা জিনিস৷ তাঁকে দেখেই অঘোরতান্ত্রিক উঠে দাঁড়িয়ে ব্যগ্রভাবে বললেন, ‘দাও দাও৷ ওর মধ্যে প্রাণ থাকতেই ওকে ধারণ করতে হবে৷’
শিষ্যের কাছ থেকে জিনিসটা নিয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেটা ধারণ করলেন অঘোর তান্ত্রিক৷ ডাকিনী যজ্ঞের প্রধান উপচার—ব্রহ্ম উপবীত৷
নবারুণ দেখল, হ্যাঁ, এই উপবীতের কথাই তো লেখা ছিল সেই বইতে৷ মাতৃগর্ভ থেকে পাঁচ মাসের সন্তান বা ভ্রূণকে উৎপাটিত করতে হবে মায়ের সঙ্গে বাচ্চার সংযোগস্থাপনকারী নাড়ি বা কডসমেত৷ সেই নাড়িটাই ধারণ করতে হবে উপবীত বা পৈতের মতো৷ সেই সন্তানের দেহে তখনও প্রাণ থাকবে৷ স্পন্দিত হবে সে৷ তার সঙ্গে স্পন্দিত হবে সেই ব্রহ্ম উপবীত—জীবন্ত উপবীত৷ সেই কম্পন থেমে যাওয়ার আগেই ডাকিনী যজ্ঞের মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করতে হবে৷ আবির্ভাব হবে ডাকিনীর৷ তাকে শুধু দেখতে পাবে ব্রহ্ম উপবীতধারী৷ সে মনস্কাম পূর্ণ করবে তান্ত্রিকের৷ যজ্ঞ শেষে হোমাগ্ণিতে প্রথমে সমর্পণ করতে হবে সেই উপবীত৷ তারপর সেই শিশুর অর্ধদগ্দ মাংস উৎসর্গ করতে হবে কোনও কালো বেড়ালকে৷ এমনই কথা লেখা ছিল বইটাতে৷
হ্যাঁ, ওই তো যজ্ঞের আগুনে নবারুণ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সেই নাড়ি বা কর্ডটাকে উপবীতের মতো গলায় ধারণ করে অগ্ণিকুণ্ডের সামনে বসে পড়লেন অঘোর তান্ত্রিক৷
এক বীভৎস দৃশ্য৷ তাঁর পেটের কাছে নাড়ি থেকে লকেটের মতো ঝুলছে ভ্রূণটা৷ শেষ মুহূর্তে স্থির হয়ে যাওয়ার আগে থরথর করে কাঁপছে সে৷ তার সঙ্গে স্পন্দিত হচ্ছে নাড়ি-ব্রহ্ম উপবীতটাও৷ তার থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে অঘোরবাবার সর্বাঙ্গে৷ মন্ত্রোচ্চারণ করতে শুরু করেছেন অঘোর তান্ত্রিক৷
আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠছে যজ্ঞের আগুন৷ সে-আগুনে ভয়ংকর লাগছে অঘোর তান্ত্রিকের মুখটা৷ তার চোখদুটো যেন জ্বলছে৷ জ্বলছে কুহকিনীর চোখও৷ লোলুপ দৃষ্টিতে সে চেয়ে আছে তার প্রভুর উপবীতের দিকে৷ তার সঙ্গে ঝুলতে থাকা সেই নরম লাল মাংসপিণ্ডের দিকে৷
দৃশ্যটা দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর বনে গিয়েছিল নবারুণ৷ তার হুঁশ ফিরল একটা ভয়ংকর চিৎকারে৷ সেখানে ছুটতে ছুটতে প্রবেশ করল এক নারী৷ সম্পূর্ণ উলঙ্গ সে৷ কৃষ্ণবর্ণ, মাথার চুল উড়ছে৷ সাক্ষাৎ রণচণ্ডী কালীমূর্তি যেন৷ তার পেটের কাছটা ফাঁক হয়ে আছে৷ রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে সেখান থেকে৷ তার এক হাতে ধরা আছে একটা স্ক্যালপল বা অস্ত্রোপচারের ছুরি৷ যে ছুরি দিয়ে সম্ভবত ডাক্তার ঘটক তার পেট চিরে বাচ্চাটকে বার করে এনেছিলেন তার নাড়িসমেত৷
সেই নারী চিৎকার করে বলে উঠল, ‘দে, দে, আমার বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দে৷ আমি এবার আর তোদের নিতে দেব না ওকে৷’ আর এরপরই সম্ভবত শ্যামার চোখ গেল অঘোর তান্ত্রিকের দিকে৷ সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য সে এগোতে লাগল তার দিকে৷ মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন অঘোর তান্ত্রিক৷ মেয়েটা বেদির উপর উঠতে যাচ্ছিল৷ সেসময় আটকাতে গেলেন ডাক্তার ঘটক৷
কিন্তু আজ আর কোনও বাধা মানবে না সেই রণচণ্ডী নারী৷ ডাক্তার ঘটক তার পথ আটকে দাঁড়ালেন ঠিকই৷ কিন্তু সেই সন্তানহারা নারীমূর্তি প্রচণ্ড আক্রোশে তার হাতের স্ক্যালপলটা চালিয়ে দিল ডাক্তার ঘটকের কণ্ঠনালী লক্ষ্য করে৷ ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল ডাক্তার ঘটকের গলা থেকে৷ পিছু হটে তিনি ছিটকে পড়লেন বেদির ওপর৷ ছত্রখান হয়ে গেল অঘোর তান্ত্রিকের সামনে সাজিয়ে রাখা যজ্ঞের উপচারগুলো৷
অগ্ণিকুণ্ড থেকে দু-একটা জ্বলন্ত কাঠও ছিটকে পড়ল এদিক-ওদিক৷ ব্যাপারটা দেখে কুহকিনী আতঙ্কে লাফ দিল বেদিতে উঠে প্রভুর কাছে যাওয়ার জন্য৷ কিন্তু সে গিয়ে পড়ল ঘিয়ের সরার উপর৷ পাশেই ছিল একটা জ্বলন্ত কাঠ৷ মুহূর্তের মধ্যেই আগুন লেগে গেল কুহকিনীর ঘি-মাখা রোমশ শরীরে৷ একটা জ্বলন্ত অগ্ণিপিণ্ডর মতো সে ছোটাছুটি করতে লাগল চারপাশে৷ এদিকে শ্যামার শরীরও অবসন্ন হয়ে এসেছে৷ তার চেরা পেট দিয়ে রক্ত ঝরছে৷ বেদিটাতে উঠতে গিয়েও সে আর উঠতে পারল না সেখানে৷ টলতে টলতে সে পড়ে গেল বেদির একটু তফাতে৷ জীবন শেষ হয়ে এসেছে তার৷ হাত থেকে ছিটকে পড়ল স্ক্যালপলটা৷
ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন অঘোর তান্ত্রিকও৷ একবার তিনি তাকালেন চারপাশে ছুটন্ত সেই অগ্ণিগোলকের দিকে৷ তারপর আর্তনাদ করে উঠলেন ‘কুহকিনী’ বলে!
বেদি থেকে লাফিয়ে নামলেন অঘোরবাবা৷ তুলে নিলেন পায়ের সামনে পড়ে থাকা স্ক্যালপলটা৷ তারপর তিনি এগোতে থাকলেন কিছুটা তফাতে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে৷ যার জন্য তাঁর যজ্ঞ পণ্ড হল, তাঁর আদরের কুহকিনীর মৃত্যু হতে চলেছে, তাকে তিনি কিছুতেই বাঁচতে দেবেন না৷ আদিম জিঘাংসা ফুটে উঠেছে তাঁর চোখে-মুখে৷ নিভে যাবার আগে দপদপ করছে সেই অগ্ণিকুণ্ড, বেদির ওপর পড়ে আছে ডাক্তার ঘটকের কণ্ঠনালী ছিন্ন মৃতদেহ৷ মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করতে-করতে চারপাশে অগ্ণিগোলকের মতো ছোটাছুটি করছে কুহকিনী, মাথার ওপরের গাছ থেকে ডানা ঝাপটে অন্ধকারে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে ভয়ার্ত পাখির দল৷ সব মিলিয়ে এক বীভৎস নারকীয় পরিবেশ চারদিকে৷ আর অস্ত্রটা উঁচিয়ে ধরে মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে এক পা-এক পা করে এগোচ্ছে এক নরপিশাচ৷
উত্তেজনার বশে নবারুণ কখন যেন গাছের আড়াল থেকে বেদির কাছে চলে এসেছে খেয়াল নেই তার৷ তাকে খেয়াল করেননি অঘোর সন্ন্যাসী৷ তার দিকে পিছন ফিরে তিনি এগোচ্ছেন মেয়েটার দিকে৷ শেষ মুহূর্তে একবার উঠে বসার চেষ্টা করল সেই মেয়েটা৷ অঘোর সন্ন্যাসীর গলায় ঝুলতে থাকা তার সন্তানকে দেখতে পেয়ে সে বলে উঠল, ‘দে, দে, আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দে...!’
অট্টহাস্য করে উঠলেন অঘোর তান্ত্রিক৷ বীভৎস সেই হাসি৷ স্ক্যালপলটা তিনি বাগিয়ে ধরেছেন তাঁর সামনের দেহটা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার জন্য৷ তাঁর পৈশাচিক হাসি প্রতিধবনিত হচ্ছে গাছের প্রাচীরে৷ শেষ মুহূর্তে হয়তো মেয়েটা দেখতে পেয়ে গেল বেদির কাছে এসে দাঁড়ানো নবারুণকে৷ তাঁর উদ্দেশে সে অন্তিম আর্তনাদ করে উঠল, ‘আমাকে তুমি বাঁচাও৷ আমার বাচ্চাটাকে তুমি রক্ষা করো৷’
নবারুণ তার দিকে তাকিয়ে দেখল, আরে, মাটিতে যে পড়ে আছে সে তো মালবিকা! আর তার দিকে শ্বাপদের মতো এগোচ্ছে অঘোর তান্ত্রিক৷ এবার আর অপেক্ষা করল না নবারুণ৷ হয়তো এটা তার দৃষ্টিবিভ্রম৷ তবু এসব ভাবার সময় এখন আর নেই৷ বেদির পাশেই মাটিতে গাঁথা ছিল ত্রিশূলটা৷ সেটা তুলে নিল নবারুণ৷ অঘোর তান্ত্রিক তখন ঝাঁপাতে যাচ্ছে মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটার ওপর৷ ঠিক সেই মুহূর্তে অঘোর তান্ত্রিকের উন্মুক্ত পিঠ লক্ষ্য করে সে দেহের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে আঘাত হানল৷ ত্রিশূলের তিনটে ফলাই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল অঘোর তান্ত্রিকের বুক-পিঠ৷ মাটির ওপর পড়ে স্থির হয়ে গেল তাঁর দেহ৷ এই প্রথম সজ্ঞানে মানুষ খুন করল নবারুণ৷
হয়তো তান্ত্রিকের কথাই সত্যি হল৷ নবারুণ এরপর ঝুঁকে পড়ল সেই নারীদেহের ওপর৷ তবে নবারুণ এবার বুঝতে পারল সে-নারী মালবিকা নয়, সে শ্যামাই৷ সে-দেহেও তখন প্রাণ নেই৷ এরপর একটা কাজ করল নবারুণ৷ অন্তিম ইচ্ছাপূরণের জন্য সে তান্ত্রিকের দেহ থেকে বাচ্চার মৃতদেহটা নিয়ে পুরে দিল মায়ের জঠরে৷ এরপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল নবারুণ৷
আগুনটা নিভে গিয়েছে৷ চারপাশে শুধু জমাট-বাঁধা অন্ধকার৷ মাঠ অতিক্রম করে একসময় নার্সিংহোমের বাইরে বড় রাস্তায় উঠে এল নবারুণ৷ দুটো আলোকবিন্দু দূর থেকে এগিয়ে আসছে৷ সেটা থামাবার জন্য নবারুণ এগোলো৷ কেউ কিছু জানবার আগে এ-জায়গা ছেড়ে তাকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন