হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

পাইনবনের মাথার ওপর তুষারধবল পর্বতশৃঙ্গের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তে লাগল রেশমপথের ওপর৷ যেমন রোজ ছড়িয়ে পড়ে হাজার বছরের প্রাচীন পথের ওপর৷ অন্যদিন আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাম বেজে ওঠে৷ তার গম্ভীর শব্দ প্রতিধবনিত হয় আশপাশের পর্বতশৃঙ্গগুলোতে৷ সেই শব্দে মঠের ছোট ছোট বাচ্চারা ঘুম ভেঙে উঠে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে প্রার্থনার জন্য সমবেত হয় মঠের সামনে তুষারাবৃত চত্বরটাতে৷ শুরু হয়ে যায় মঠের দৈনন্দিন কাজ৷
কিন্তু আজ ড্রাম বাজল না৷ যদিও তুষারঝড় থেমে গিয়েছে শেষ রাতেই, আর তারও আগে মেশিনগানের র্যাট...র্যাট শব্দ৷ কিন্তু বলা যায় না, আবারও হয়তো গুলি ছুটে আসতে পারে উত্তরদিকের ওই পাহাড়গুলোর মাথার ওপর থেকে৷
ওটা অন্য দেশ৷ একসময় এ-মঠের প্রায় সবাই ওদেশেই থাকত৷ তারপর শরণার্থী হয়ে উপস্থিত হয়েছে এদেশে৷ আশ্রয় নিয়েছে এ-মঠে৷ তিববতী শরণার্থী তারা৷ সিল্করুট বা রেশমপথে চীন সীমান্তে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত এই লাকাং মঠ এখন তাদের আশ্রয়স্থল৷
সারা মঠ গত রাত জেগে কাটিয়েছে দরজা-জানলা বন্ধ করে৷ নির্বাণের তো ঘুমোবার কোনও প্রশ্ণই ছিল না৷ সারারাত সে আর কয়েকজন লামা মিলে কোনওরকমে ধরে রেখেছিল রবিনকে৷ সারারাত ধরে রবিন আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তাদের হাত ছিটকে মঠ ছেড়ে সামনের চত্বরটায় বেরোবার জন্য৷ কখনও সে ধস্তাধস্তি করেছে, গালাগালি করেছে, কখনও বা বাচ্চা ছেলের মতো কান্নাকাটি করেছে তাকে মঠের বাইরের চত্বরটাতে যেতে দেওয়ার জন্য৷ তারপর শেষরাতের দিকে মানসিক-শারীরিকভাবে বিধবস্ত অবসন্ন হয়ে কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে৷ একদম ভেঙে পড়েছে সে৷
ভোরে আলো ফোটার পর নির্বাণরা যে-ঘরে আছে তার জানলাটা একজন লামা একটু ফাঁক করল৷ ঘরটার এক কোণে সিলিং-এর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে আছে রবিন৷ নির্বাণ জানলার কাছে গিয়ে তাকাল বাইরের চত্বরটার দিকে৷ বরফাবৃত চত্বরটার ঠিক মাঝখানে যেখানে সেই অদ্ভুতদর্শন, বলা ভালো সেই ভয়ালদর্শন তিববতি দেবতার মূর্তিটা দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার নীচেই মাটিতে কী যেন পড়ে আছে! যদিও সেটা প্রায় বরফে ঢাকা, তবুও নির্র্বণ অনুমান করল কী পড়ে আছে সেখানে৷ নির্বাণ চেয়ে রইল বাইরের দিকে৷
গতকাল বিকেলে গ্যাংটক থেকে তারা যখন এই লাকাং মঠে এসে পৌঁছেছিল তখন তারা কেউ-ই ভাবতে পারেনি যে এক রাতের মধ্যেই এমন কোনও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যেতে পারে৷ হাজার বছরের প্রাচীন রেশমপথের অতুলনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এই প্রাচীন তিববতী মঠে উপস্থিত হয়েছিল তারা৷ মঠাধ্যক্ষও তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন৷ সূর্য ডোবার আগে পর্যন্ত নির্বাণরা মঠের চারপাশে ঘুরেছে, সারা মঠে ছড়িয়ে থাকা অদ্ভুত দর্শন মূর্তিগুলোর ছবি তুলেছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলেছে৷
জুলিয়া তো একদম আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল এখানে এসে৷ যদিও এখানে আসার আগে একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করছিল জুলিয়ার মনে৷ কারণ, এখানে আসার পথে একবার রেশমপথে একটা দোকানে চা খেতে গাড়ি দাঁড় করিয়েছিল নির্বাণরা৷ তারা এই লাকাং মঠে আসছে শুনে বৃদ্ধ তিববতি দোকানি তাদের বলেছিল যে হাজার বছরের প্রাচীন এই মঠ নাকি তিববতি তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান৷ এ মঠ নাকি শবসাধনার কেন্দ্র৷ জুলিয়ার ভয় ছিল যে এ মঠে এলে হয়তো মৃতদেহ-টেহ দেখতে হতে পারে৷ কিন্তু এখানে পৌঁছে তারা অনেক ভয়াল-দর্শন মূর্তি দেখলেও কোনও মৃতদেহ দেখেনি৷ অথচ সেই জুলিয়া নিজেই এখন...
আলো ছড়িয়ে পড়তে লাগল মঠের চারপাশে৷ চারপাশে কাছে-দূরে একসময় সব কিছু স্পষ্ট হয়ে গেল৷ রেশমপথের পাকদণ্ডী, তার গায়ের পাইনবন, নীল আকাশের বুকে সার সার তুষারধবল পর্বতশৃঙ্গ৷ বাইরের দিকেই তাকিয়েছিল নির্বাণ৷ মাঝে মাঝেই তার চোখ চলে যাচ্ছিল সেই মূর্তিটার নীচে পড়ে থাকা জিনিসটার দিকে৷
বেশ কিছু সময় আরও কেটে গেল৷ নির্বাণ খেয়াল করল মঠের অন্য অংশের জানলাগুলোও খুলতে শুরু করেছে৷ জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লামারাও তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে মূর্তির নীচে পড়ে-থাকা জিনিসটাকে৷ এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ঘরের দরজার বাইরে খড়মের শব্দ শুনে ফিরে দাঁড়াল নির্বাণ৷ রবিন যাতে কোনওভাবেই ঘর থেকে গুলিবর্ষণের মধ্যে বাইরে বেরোতে না পারে সেজন্য দরজাটা বাইরে থেকেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল৷ দরজা খুলে গেল৷ ঘরে প্রবেশ করলেন মঠাধ্যক্ষ লামা পেংবু৷ মুণ্ডিত মস্তক, অসংখ্য বলিরেখাময় মুখ দেখে তাঁর সঠিক বয়স আন্দাজ করা যায় না৷ গতকাল এখানকার একজন লামা নির্বাণদের বলেছিলেন যে মঠাধ্যক্ষর বয়স নাকি একশো বছর!
তাছাড়া এখানে আরও একজন অতি প্রাচীন লামা নাকি আছেন যাঁর বয়স নাকি পাঁচশো বছর! তার নাম চোগস সাঙ৷ লামা চোগস সাঙ নাকি ভূগর্ভস্থ তাঁর কক্ষে থাকেন৷ কক্ষ ছেড়ে বাইরে বেরোন না৷ নির্বাণরা ব্যাপারটা বিশ্বাস না করলেও মঠাধ্যক্ষ পেংবু লামা বয়সে যে অতিবৃদ্ধ তা তাঁকে দেখলে বোঝা যায়৷ তবে সদাহাস্যময় লোকটির মুখে এখন আর হাসি নেই৷ রবিনের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে তিনি নির্বাণের উদ্দেশে বললেন, ‘চলুন, এবার ওকে বাইরে নিয়ে যেতে হবে৷’
ঘরে আরও তিনজন লামা ছিল৷ তারা ধরাধরি করে উঠে দাঁড় করাল রবিনকে৷ তারপর তাকে নিয়ে ঘর ছেড়ে, মঠের ভিতর থেকে বাইরে বেরোল তারা৷ ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন লামা মূর্তিটার কাছে পৌঁছে গিয়ে গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে জায়গাটাকে৷ রবিনকে নিয়ে ধীর পায়ে সেদিকে যখন নির্বাণরা এগোচ্ছে তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে থেকে ওপরে উঠে এল ইন্দো-টিবেটিয়ান বর্ডার ফোর্সের কয়েকজন লোকও৷ নির্বাণদের সঙ্গে একই সময় তারাও উপস্থিত হল মূর্তিটার নীচে৷ নির্বাণরা সেখানে উপস্থিত হতেই লামার দল একপাশে একটু সরে দাঁড়াল৷
ইতিমধ্যে তার ওপর থেকে বরফের আবরণ সরিয়ে ফেলেছে লামারা৷ নির্বাণদের চোখের সামনে মাটিতে পড়ে আছে একটা দেহ—জুলিয়ার লাশ! তবে তার মুখে যন্ত্রণার কোনও চিহ্ণ নেই৷ খোলা চোখ, তার ঠোঁটের কোণে যেন আবছা হাসির ছোঁয়াও লেগে আছে৷ যেন এখনই সে উঠে বসে বলবে—‘গুড মর্নিং৷’ এমনই জীবন্ত তার দেহ! সামনে সে কিছু বোঝার আগেই মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নিয়েছে তার জীবন৷ যে জন্য কোনও যন্ত্রণার ছাপ ধরা পড়েনি তার মুখে৷
খুব ভালো করে দেখার পর নির্বাণ জুলিয়ার বুকের বাঁদিকে একটা যেন ছিদ্র দেখতে পেল৷ সম্ভবত ওই একটাই গুলি লেগেছিল তার দেহে৷ আর লেগেছিল একদম মর্মস্থলে৷ আর তাতেই মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণহীন হয়ে যায় তার দেহ৷ নির্বাকভাবে সবাই চেয়ে রইল জুলিয়ার মৃতদেহের দিকে৷ সেদিকে তাকিয়ে যেন পাথরের মূর্তি বনে গেছে রবিন৷
নির্বাণ পিঠের ওপর পিছন থেকেই একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই সে ফিরে তাকিয়ে দেখল ইন্দো-টিবেটিয়ান ফোর্সের একজন অফিসার ইশারায় তাকে একটু বাইরে আসতে বলছেন সামনে থেকে৷ নির্বাণ সরে এল জটলার বাইরে৷ নির্বাণ দেখল ভদ্রলোকের বুকের নেমেপ্লেটে লেখা আছে ডুকপা৷ পদমর্যাদায় লেফটেন্যান্ট৷ সম্ভবত এই অফিসারও জন্মসূত্রে তিববতি৷ তিনি চাপা স্বরে নির্বাণের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি তো এই ব্রিটিশ দম্পতির সঙ্গী হয়ে এখানে এসেছেন তাই না? আমাকে গতকালই বর্ডার চেকপোস্টের লোকেরা খবর দিয়েছিল যে এক ব্রিটিশ দম্পতি আর একজন বাঙালি লাকাং মঠে গিয়েছে৷ আপনারা এখানে এসেছিলেন কেন?’
নির্বাণ বলল, ‘আমি কলকাতা থেকে এই সিল্করুটের ছবি তুলতে এসেছিলাম৷ গ্যাংটকের হোটেলে আসার সময় রবিন আর জুলিয়ার সঙ্গে পরিচয়৷ জুলিয়ার একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে যার কাজ বিশ্বে নানা প্রান্তের শরণার্থী শিশুদের ওষুধ, খাবার ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করা৷ সে কাজেই ওরা এখানে এসেছিল৷ আমি ওদের সঙ্গী হয়ে যাই৷ কাল বিকেলে আমাদের গাড়ি এসে এখানে নামিয়ে দিয়ে যায়৷ কথা ছিল আগামীকাল আমরা আবার ফিরে যাব৷ কিন্তু...’
অফিসার শুনে বললেন, ‘বুঝলাম৷ সীমান্তের ওপার থেকে যারা এমঠের ওপর গুলি চালিয়েছে তাদের এমঠের ওপর রাগ আছে কারণ, এমঠ এখন তিববতি শরণার্থী শিশুদের আশ্রয়স্থল বলে৷ মাঝে অবশ্য কয়েকমাস গোলাগুলি বন্ধ ছিল, কাল আবার হল৷ আমরাও অবশ্য পাল্টা জবাব দিয়েছি, কিন্তু শুধু এই মহিলার গায়েই বা গুলি লাগল কীভাবে?
নির্বাণ জবাব দিল—রাতের খাওয়া সেরে আমরা একটা ঘরে বসে গল্প করছিলাম৷ খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলোয় বাইরেটা দেখা যাচ্ছিল৷ অপূর্ব দেখাচ্ছিল বাইরেটা! জ্যোৎস্না যেন চুইয়ে পড়ছিল পর্বতশৃঙ্গ থেকে৷ এইসময় তারই মধ্যে পেঁজা তুলোর মতো তুষারপাত শুরু হল৷ সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে জুলিয়া বলল যে, সে একবার বাইরের চত্বরে বেরিয়ে ভালো করে দেখবে চারপাশের দৃশ্য৷ আমি আর রবিন ঘরেই রইলাম৷ সে ঘর ছেড়ে বেরোল৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই খোলা জানলা দিয়ে আমরা দুজনেই দেখলাম যে জুলিয়া মঠের বাইরে বেরিয়ে এগোচ্ছে এক দিকে৷ নির্দিষ্ট জায়গাতে যখন সে পৌঁছোল ঠিক তখনই হঠাৎ পাহাড়ের মাথা থেকে খটখট শব্দ শুরু হল! ছিটকে উঠতে লাগল এই চত্বরের বরফ৷ আর তারপরই দেখলাম জুলিয়া পড়ে গেল৷ মুহূর্তের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হল সারা মঠ জুড়ে৷ দরজা-জানলা সব দুমদাম করে বন্ধ হতে লাগল৷ আমি আর রবিন যখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মঠের বাইরে বেরোবার দরজার সামনে এলাম তখন সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ মঠাধ্যক্ষ আর অন্য লামারা বললেন যে, কিছুতেই আর বাইরে বেরোনো যাবে না৷ বেরোলেই নির্ঘাত মৃত্যু৷ সীমান্তের ওপার থেকে মঠ লক্ষ্য করে গুলিবৃষ্টি শুরু হয়েছে! বাইরে বেরিয়ে কিছুতেই তারা মরতে দেবেন না আমাদের৷ এদিকে বাইরে পড়ে রয়েছে জুলিয়া৷ রবিন আপ্রাণ চেষ্টা করছিল বাইরে যেতে৷ অতিকষ্টে তাকে ঘরবন্দি করা হয়!
অফিসার বললেন, ‘মৃত মহিলা বিদেশি নাগরিক৷ আর্মির তত্ত্বাবধানেই আমরা দেহ ফিরিয়ে নিয়ে যাব৷ ব্রিটিশ এম্বাসিকেও সরকার মারফত ব্যাপারটা জানাতে হবে৷ চলুন এবার কথা বলা যাক মঠাধ্যক্ষ আর রবিন নামের ওই ব্রিটিশ যুবকের সঙ্গে৷’
কয়েক পা এগিয়ে এরপর নির্বাণ আর সেনা অফিসার গিয়ে দাঁড়াল সেই জটলার মাঝে৷ রবিন তখনও পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে তার সঙ্গিনীর মৃতদেহের দিকে৷ নির্বাণ আর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অফিসার ডুকপাও তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ ডুকপা চাপা স্বরে মঠাধ্যক্ষর কানের কাছে নির্বাণের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো বলে জানতে চাইলেন ব্যাপারটা সত্যি কি না?
সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন মঠাধ্যক্ষ৷ ঘটনা সম্বন্ধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তিববতি বংশোদ্ভব অফিসার এবার নিশ্চিত হলেন৷ এরপর একটু ইতস্তত করে তিনি নিশ্চল রবিনের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আমরা সবাই খুব দুঃখিত৷ কিন্তু আপনার সঙ্গিনীর মৃতদেহ নিয়ে এবার ফিরতে হবে নীচে৷ আপনাকে আর আপনার ভারতীয় সঙ্গীকেও আমরা নীচে নিয়ে যাব৷ আপনার সঙ্গিনীর মৃতদেহ যাতে আপনি দেশে নিয়ে যেতে পারেন তার সব ব্যবস্থা করবে ভারত সরকার৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন এ ব্যাপারে৷ আপনারা এদেশের অতিথি ছিলেন৷ কোনও অমর্যাদা হবে না আপনার বা আপনার সঙ্গিনীর মৃতদেহের৷’
—এই বলে অফিসার তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে জুলিয়ার মৃতদেহটা মাটি থেকে ওঠাবার ইঙ্গিত করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তা শুনে হঠাৎ-ই থরথর করে কেঁপে উঠল রবিন৷ তারপর তার পাশে দাঁড়ানো মঠাধ্যক্ষ বৃদ্ধ লামা পেংবুর দু’কাঁধ ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘তোমরা শঠ—প্রবঞ্চক! মিথ্যাবাদী! তোমরা বলেছিলে যে এ-মঠে এলে আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না৷ তোমাদের অনাথ শিশুদের সাহায্য করার জন্য কতদূর থেকে ছুটে এসেছিল জুলিয়া, আমরা! তার প্রতিদান এই হল? এই মূর্তিটা দেখিয়ে তুমি কাল বলেছিলে যে এই মূর্তি সবাইকে রক্ষা করে৷ কারও কোনও ক্ষতি হয় না এ-মঠে এলে৷ এ মঠ নাকি তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান! সমস্ত অশুভ শক্তি দূরে থাকে এই মঠ থেকে! এ-মঠ আগলে রাখেন তোমাদের তন্ত্রসাধনার এই দেবতা! এর মধ্যে মৃতদেহও নাকি পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে...’
রবিনের কথা মিথ্যা নয়৷ সত্যিই এই কথাগুলো গতকাল বিকেলে বলেছিলেন মঠাধ্যক্ষ পেংবু৷ নির্বাণও তার সাক্ষী৷ এই মঠ যে একদা সত্যিই তিববতিদের শব-সাধনার পীঠস্থান ছিল, এ কথাও নির্বাণদের তখন কথাপ্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন বৃদ্ধ মঠাধ্যক্ষ পেংবু৷ এরপর রবিন মঠাধ্যক্ষের কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, ‘তোমরা যদি মিথ্যাবাদী না হও, তোমাদের দেবতা যদি মিথ্যা না হয় তবে বাঁচিয়ে তোলো আমার জুলিয়াকে৷ বাঁচিয়ে তোলো...৷’
বৃদ্ধ মঠাধ্যক্ষর কাঁধ ধরে তাকে পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল রবিন৷ নিশ্চুপ বৃদ্ধ লামা, তাঁর সঙ্গী অন্য লামারা, নির্বাণ, সীমান্তরক্ষী অফিসার ডুকপাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ বৃদ্ধ মঠাধ্যক্ষের কাঁধ ঝাঁকিয়ে রবিন পাগলের মতো বলে চলেছে—‘অন্তত একবারের জন্য, কিছুক্ষণের জন্য তোমরা বাঁচিয়ে তোলো আমার জুলিয়াকে৷ তবে বুঝব তোমাদের কথা সত্যি, তোমাদের সাধনা, তোমাদের দেবতা সত্যি...৷’
হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর কানে এল সবার—‘না, আমাদের দেবতা মিথ্যা নয়, আমাদের সাধনা মিথ্যা নয়৷’ চমকে উঠে সবাই তাকাল সেই কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে৷ এমনকী রবিনও থেমে গিয়ে তাকাল সেদিকে৷ তাদের কিছুটা তফাতে কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন অতিবৃদ্ধ এক লামা৷ তাঁরও মুণ্ডিত মস্তক, লোল চর্মাবৃতদেহ, পরনে সামান্য রক্তবস্ত্র৷ নির্বাণ খেয়াল করল যে দীর্ঘদিন না-কাটার ফলে তাঁর হাতের নখগুলো পুরু হয়ে বাজপাখির নখের মতো বেঁকে গিয়েছে৷ তবে অতিবৃদ্ধ হলেও তাঁর চোখের জ্যোতিটা যেন খুব উজ্জ্বল!
নির্বাণের মনে হল, ‘এই কি তবে সেই এ মঠের অতিপ্রাচীন লামা? এই কি সেই চোগস সাঙ? মঠাধ্যক্ষসহ সবাই তাঁকে দেখামাত্রই মাথা নীচু করে দাঁড়াল৷
রবিন তাঁর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর বলে উঠল, ‘পারবে? পারবে তুমি আমার জুলিয়ার প্রাণ ফিরিয়ে দিতে? অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও?’
অতিবৃদ্ধ লামা ধীর-শান্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, পারব৷ অন্তত আজ রাতের জন্য হলেও পারব৷ কিন্তু তুমি এই মৃতের পুনরুত্থান সহ্য করতে পারবে তো?’
রবিন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ পারব৷ নিশ্চয়ই পারব৷ তুমি একবারের জন্য অন্তত জীবন্ত করে তোলো আমার জুলিয়াকে৷ দোহাই তোমার...৷’
সেই অতিবৃদ্ধ লামা বললেন, ‘আচ্ছা বেশ৷ কিন্তু একটা শর্ত আছে আমার৷’
রবিন বলে উঠল, ‘তোমার সব শর্ত পূরণ করতে রাজি আমি৷ শুধু একবারের জন্য জীবিত করে তোলো জুলিয়াকে৷ আমায় শেষ একবার চুম্বন করতে দাও তাকে৷’
অতিবৃদ্ধ লামা বললেন, ‘এক রাতের জন্য আমি জীবিত করে তুলব এই মৃত নারীকে৷ তবে শর্ত একটাই, তার দেহের অতি ক্ষুদ্র অংশ কিন্তু আমি রেখে দেব আমার কাছে৷ কাল ভোরবেলায় মৃতদেহে তুমি তা ফেরত পাবে না৷’
রবিনের কথা শুনে অতিবৃদ্ধ লামার ঠোঁটের কোণে যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল৷ তিনি বললেন, ‘তবে মৃতদেহ মঠের ভিতর নিয়ে যেতে হবে৷’
রবিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আপনি যা করতে বলবেন তাই করব৷ এ মৃতদেহ এখানেই থাকবে৷ দেখি আপনি তাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন কি না!’
লামা চোগস সাঙ এরপর মঠাধ্যক্ষ পেংবুর উদ্দেশে তিববতি ভাষায় সম্ভবত বললেন মৃতদেহটাকে মঠের ভিতর নিয়ে যাওয়ার জন্য৷ কারণ, তাঁর কথা শুনে মঠাধ্যক্ষ পেংবু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অফিসার ডুকপার উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা ফিরে যাও৷ কাল সকালে এসো৷’
ডুকপা নিজে জন্মসূত্রে তিববতি৷ কাজেই মঠাধ্যক্ষের আদেশের বিরোধিতা করল না হয়তো বা তার ধর্মভাবের জন্য৷ সে শুধু নির্বাণের উদ্দেশে বলল, ‘আপনি কি আমাদের সঙ্গে নীচে ফিরে যাবেন? নাকি কাল ফিরবেন?’
নির্বাণ বলল, ‘না, আমি কাল রবিন আর জুলিয়ার মরদেহের সঙ্গে নীচে নামব৷ আমরা একসঙ্গে এসেছিলাম, একসঙ্গেই ফিরব৷ রবিনের পাশে থাকাটা এখন জরুরি৷’
তার জবাব পেয়ে অগত্যা মঠের সামনের চত্বর ছেড়ে নীচে নামার পথ ধরলেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অফিসার ও তার জওয়ানরা৷ অতিবৃদ্ধ লামা চোগস সাঙ তিববতি ভাষায় কী যেন নির্দেশ দিলেন মঠাধ্যক্ষকে৷ তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে মঠের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷
এরপর মঠাধ্যক্ষ পেংবুর নির্দেশে বরফের চাদরের ওপর থেকে কয়েকজন লামা ধরাধরি করে জুলিয়ার দেহটাকে উঠিয়ে নিয়ে এগোল মঠের ভিতরে যাওয়ার জন্য৷ তাদের অনুসরণ করল নির্বাণ আর রবিনসহ মঠাধ্যক্ষ৷ নির্বাণের সঙ্গেই হাঁটছিলেন মঠাধ্যক্ষ পেংবু৷ নির্বাণ তাঁকে প্রশ্ণ করল, ‘সত্যি কি আপনারা জীবিত করে তুলতে পারবেন এই মৃতদেহকে?’
মঠাধ্যক্ষ বললেন, ‘লামা চোগস সাঙ যখন বললেন, তখন নিশ্চয়ই কাজটা করতে পারবেন তিনি৷ লামা চোগস সাঙ প্রেতসিদ্ধ পুরুষ৷ তিনি জানেন কীভাবে প্রেতাত্মাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হয় মৃতের শরীরে৷’
নির্বাণ বলল, ‘কীভাবে তিনি বাঁচিয়ে তুলবেন মৃতাকে?’
মঠাধ্যক্ষ বললেন, ‘তিববতি তন্ত্রসাধনার এই পদ্ধতির নাম ‘‘রোলাং’’৷ চোগস সাঙ মিলিত হবেন ওই মৃতদেহের সঙ্গে৷ তারপর মৃতদেহে আত্মা প্রবেশ করিয়ে আবার তাকে জাগিয়ে তুলবেন একরাতের জন্য৷’ —এ কথা বলার পর মঠাধ্যক্ষ বললেন, ‘শব-সাধনার ব্যবস্থা করে দিয়েই আমরা সবাই নীচে অন্য একটা মঠে নেমে যাব৷ বলা যায় না, রাতে আবার গুলিবৃষ্টি হতে পারে, সীমান্তের ওপার থেকে কামানের গোলাও ছোড়া হতে পারে৷ তাছাড়া রাতে যখন ওই প্রেতাত্মা জীবিত হয়ে উঠবে তখন এখানে বেশি লোকের থাকা বাঞ্ছনীয় নয়৷
তিববতি তন্ত্রসাধনার শবসাধনা নিয়ে নানা গল্প শোনা যায় বটে৷ নির্বাণও এমন গল্প কিছু শুনেছে৷ কিন্তু সত্যি কি মৃত মানুষের মধ্যে আবার প্রাণ-প্রতিষ্ঠা সম্ভব? ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না নির্বাণ৷ কিন্তু মুখে কিছু না বলে সে অনুসরণ করল অন্যদের৷
জুলিয়ার শবদেহ নিয়ে মঠের ভিতর প্রবেশ করা হল৷ মঠাধ্যক্ষ রবিনকে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই চান যে আপনার সঙ্গিনীকে জীবিত করে তুলুন লামা চোগস সাঙ? আমরা তার আয়োজন শুরু করব এখন৷ কিন্তু তার জন্য কিছু শর্ত মানতে হবে আপনাকে৷’
রবিন আচ্ছন্নর মতো বলল, ‘হ্যাঁ, মানব, মানব৷ শুধু জুলিয়াকে আপনারা ফিরিয়ে দিন৷’
মঠাধ্যক্ষ বললেন, ‘কিছু সময়ের মধ্যেই জুলিয়ার দেহ নিয়ে সাধনকক্ষে সাধনা শুরু করবেন প্রেতসিদ্ধ লামা৷ বাইরে থেকে দরজা ধাক্কা দিয়ে বা চিৎকার করে তাঁর ধ্যানভঙ্গ করা যাবে না৷ তাতে সাধক ও আপনার দুজনেরই বিপদ হতে পারে৷ আপনি সারাদিন এ-ঘরেই থাকবেন৷ আর দ্বিতীয় কথা হল, লামা চোগস সাঙ যে-জিনিসটা নেবেন সেটা ফেরত পাওয়ার কোনও চেষ্টা করবেন না৷ তাতে আপনার মৃত্যুও ঘটতে পারে৷’
রবিন বলল, ‘আমি সব মানতে রাজি আছি, সব মানতে৷ শুধু আপনারা ওকে একবার বাঁচিয়ে তুলুন৷’
পেংবু বললেন, ‘তাই হবে৷ আপনি ঘরে গিয়ে থাকুন৷ অন্ধকার নামলে যখন আপনার সঙ্গিনী জীবন্ত হয়ে উঠবেন তখন আপনি ঠিক জানতে পারবেন৷’
কথাগুলো শুনে বিধবস্ত রবিন টলতে টলতে চলে গেল মঠের যে-ঘরে তারা রাত কাটিয়েছে সে ঘরের দিকে৷ আর মঠাধ্যক্ষ পেংবুর নির্দেশে জুলিয়ার মৃতদেহটাকে অন্য লামারা নিয়ে চলল সাধন কক্ষের দিকে৷ মঠাধ্যক্ষর সঙ্গে নির্বাণও তাদের অনুসরণ করল৷ বেশ কয়েকটা অলিন্দ পেরিয়ে তারা এসে প্রবেশ করল একটা ঘরে৷ তার সিলিং থেকে নেমে এসেছে ভয়ংকর চিত্রশোভিত নানা ধরনের প্রাচীন থাংকা বা রেশমের কাপড়৷ পাথর আর কাঠের দেওয়ালগুলোতে খচিত আছে তিববতি অপদেবতার বীভৎস সব মূর্তি৷
ঘরের এক প্রান্তে একটা নীচু বেদি মতো জায়গা৷ তার চারপাশে সাজানো রয়েছে নরকরোটি, মানুষের হাড়গোড়৷ আর জমে রয়েছে যুগ যুগ যুগ ধরে জমে থাকা ধূপের ছাই৷
ওই ছাইয়ের স্তূপ আর একটা অদ্ভুত গন্ধ বুঝিয়ে দিচ্ছে ও-ঘরটা বহু প্রাচীন৷ ঘরে ঢোকার পর মঠাধ্যক্ষ পেংবু চাপা স্বরে বললেন, ‘এই ঘরটাকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে এই মঠ৷ যুগ যুগ ধরে এ-ঘরে শব-সাধনা করেছেন প্রাচীন লামারা৷ যাঁরা এ-ঘরে শব-সাধনা করেছেন তাদের মধ্যে এখন কেবল জীবিত আছেন লামা চোগস সাঙ৷ এ-ঘরে আমরা ট্যুরিস্টদের ঢুকতে দিই না৷ ঘটনাচক্রে আপনি ঘরটা দেখতে পেলেন৷’
ঘরে ঢুকে প্রথমে জুলিয়ার মৃতদেহ মাটিতে নামিয়ে রাখা হল৷ একদল লামা গোছা গোছা ধূপ জ্বালাতে শুরু করল বেদিটার চারপাশে৷ অন্যদিকে জুলিয়ার পোশাক খুলতে শুরু করল৷ সম্পূর্ণ নিরাভরণ করা হল তাকে৷ একটা সুতোও তার দেহে রাখা হল না৷ নির্বাণ দেখল, হ্যাঁ, শুধুমাত্র একটাই ক্ষতচিহ্ণ তার দেহে৷ ঠিক বাঁ-দিকের বুকে৷ তাছাড়া তার সারা দেহ একদম নিখুঁত৷ কোথাও নতুন বা পুরোনো আঁচড়ের দাগও নেই তার শরীরে৷ কী সুন্দর এই যুবতীর দেহ! এখনও যেন তা কোনও পুরুষকে আকৃষ্ট করতে পারে!
জুলিয়ার দেহটাকে উন্মুক্ত করার পর তার দেহটাকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে চিৎ করে শোয়ানো হল বেদির ওপর৷ তার হাত-দুটো টান টান করে ছড়িয়ে দেওয়া হল দু’পাশে৷ পা-দুটোও দু-পাশে যথাসম্ভব সরানো হল৷ ঘরের জানলাগুলো আগে থেকেই বন্ধ ছিল৷ ঘরে শুধু আলো ঢুকছিল দরজা দিয়ে৷ জুলিয়ার শবদেহ ঘরে রেখে দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালেন সবাই৷
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল৷ আধো অন্ধকার অলিন্দপথে এসে দাঁড়ালেন অতিবৃদ্ধ লামা চোগস সাঙ৷ তাঁকে দেখে এবার বেশ চমকেই গেল নির্বাণ৷ তার দেহে এখন একখণ্ড বস্ত্রও নেই৷ হাড়ের ওপর শুধু যেন চামড়ার আচ্ছাদন দেওয়া দেহ৷ একটানা পাতলা কাপড়ের চামড়াটা টেনে খসিয়ে দিলেই যেন তার কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়বে৷ বুকের কাছে তিনি একটা চাল মাপার কুনকির মতো রুপোর কৌটো ধরে আছেন৷ দীর্ঘদিন না-কাটার ফলে তার হাত-পায়ের নখগুলো লম্বা হয়ে বাজপাখির নখের মতো বেঁকে গিয়েছে৷
কিন্তু এই অতিবৃদ্ধ লামার দেহেও পোশাক নেই কেন? জুলিয়ার দেহও তো নিরাভরণ করা হল৷ তবে মঠাধ্যক্ষর বলা ‘মিলিত হওয়া’ কথাটার মানে কী—প্রশ্ণটা মুহূর্তের জন্য মৃদু ঘুরপাক খেল নির্বাণের মনে৷ চোগস সাঙ দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই তাকে দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত করল মঠাধ্যক্ষসহ অন্যারা৷ নির্বাণও করল৷
চোগস সাঙ তাঁর হাতে-ধরা ঢাকনাওলা রুপোর পাত্রটা মঠাধ্যক্ষর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সাধনকক্ষে প্রবেশ করলেন৷ বাইরে থেকে একজন লামা ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন৷ অন্ধকার ঘরটার মধ্যে শুধু রইল লামা চোগস সাঙ আর সেই শবদেহটা৷
সঙ্গীদের নিয়ে মঠাধ্যক্ষ এবার সেই দরজার কিছুটা তফাতে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ তারপর অন্য লামাদের উদ্দেশে তিববতি ভাষায় কী যেন বললেন৷ কিন্তু তার কথা শুনে মাথা নীচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অন্য লামারা৷ মঠাধ্যক্ষর ভ্রূহীন মুখ যেন ধীরে ধীরে কুঞ্চিত হয়ে উঠল৷ তিনি এরপর নির্বাণকে বললেন, ‘একটা সমস্যায় পড়া গেল৷ এই পাত্রটা নিয়ে রাতে কাউকে উপস্থিত থাকতে হবে৷ চোগস সাঙ সাধনা শেষ করে বেরিয়ে ঠিক সময়ে তিনি একটা জিনিস রাখবেন এই কৌটার ভিতর৷ কিন্তু প্রচলিত নিয়ম হল যে, এই কৌটোটা রাতের জন্য ধারণ করবে যে, তাকে এই কৌটোটা সূর্যোদয়ের পর মঠে রেখে এ-মঠ ছেড়ে চলে যেতে হবে৷ তিনি আর কোনওদিন মঠে প্রবেশ করতে পারবেন না৷’
নির্বাণ জানতে চাইল, ‘এ নিয়ম কেন?’
মঠাধ্যক্ষ বললেন, ‘কারণ, এর ভিতর বৃদ্ধ লামা যে-জিনিসটা রাখবেন তার অসীম ক্ষমতা৷ যে পাত্রটা ধারণ করবে সে যাতে ভবিষ্যতে জিনিসটা হস্তগত করার চেষ্টা না-করে, তার প্রতি লোভ না করে সেজন্য এ-প্রথা চলে আসছে৷ কাজেই স্বাভাবিক নিয়মে এখানে উপস্থিত লামারা কেউ এ-মঠের প্রবেশাধিকার হারাতে চান না৷’
নির্বাণ ব্যাপারটা শুনে আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘আচ্ছা, আমি যদি কৌটোটা নিয়ে আজ রাতে এখানে থাকি? আমি তো আর কোনওদিন এখানে ফিরে আসব না৷’
বৃদ্ধ মঠাধ্যক্ষ কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন নির্বাণের দিকে৷ তারপর বললেন, ‘আপনার সাহস আছে? ওই মহিলার মৃতদেহ যখন জীবন্ত হয়ে চলাফেরা করবে তখন আপনি সে-দৃশ্য সহ্য করতে পারবেন তো?’
মৃতদেহ যে সত্যি জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে সেকথা ঠিক বিশ্বাস হয় না নির্বাণের৷ তবে রাতে কী ঘটতে চলেছে তার সাক্ষী হতে চায় সে৷ তাছাড়া রবিনকে এ-অবস্থায় মঠে একা রেখে যাওয়াও ঠিক নয়৷ তাই সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি পারব৷ আপনি ওটা আমার হাতে দিন৷’
লামা আর কোনও উপায় না দেখে নির্বাণের হাতে কৌটোটা তুলে দিয়ে বললেন, ‘সাধনা শেষে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আপনাকে ঠিক সময় ডাকবেন চোগস সাঙ৷ আপনি সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের কাছে কৌটোটা ধরবেন৷ চোগস সাঙ কৌটোর ভিতর জিনিসটা মুখ থেকে রাখলেই সঙ্গে সঙ্গে কৌটোর মুখ বন্ধ করে দেবেন৷ কোনওভাবেই আর কৌটোর মুখ খুলে জিনিসটা দেখার চেষ্টা করবেন না৷ তাহলে আপনার বিপদ হবে৷ মৃত্যুও হতে পারে৷ কাল ভোরে আমি এসে কৌটোটা নেব৷’
নির্বাণ প্রশ্ণ করল, ‘লামা কী রাখবেন এই কৌটোতে?’
মঠাধ্যক্ষ বললেন, ‘তা আপনাকে এখন বলা যাবে না৷ চোগস সাঙ জিনিসটা কৌটোতে রাখার সময় যদি দৈবাৎ জিনিসটা আপনি দেখতে পারেন তখন চিনলে চিনবেন৷ নচেৎ নয়৷ আবারও আপনাকে সাবধান করছি জিনিসটা রাখার পর কৌটো খুললে বিপদ হবে৷ এবার ঘরে ফিরে যান৷ আমরাও মঠ ত্যাগ করব৷’
কৌটোটা নিয়ে আবার নিজেদের সেই ঘরে ফিরে এল নির্বাণ৷ ঘরের মেঝেতে আচ্ছন্নর মতো শূন্য দৃষ্টিতে বসে আছে রবিন৷ সে কোনও কথা বলল না৷ নির্বাণ তাকে বিরক্ত করল না৷ সে গিয়ে দাঁড়াল জানলার ধারে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দেখতে পেল ছোট শিশুদের নিয়ে লামার সার বেঁধে মঠ ছেড়ে নীচে নেমে যাচ্ছে৷ জনশূন্য হয়ে গেল মঠ৷ রয়ে গেল তারা চারজন৷ তিনজন জীবন্ত মানুষ, আর একটা লাশ৷
সারাটা দিন বলতে গেলে সে ঘরেই কেটে গেল নির্বাণের৷ রবিন সারাদিন পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল মেঝেতে৷ নির্বাণ তাকে একবার বিস্কিট আর জল খাওয়াতে গেলে শুধু বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেল রবিন৷ তারপর অস্পষ্টভাবে শুধু একবার জানতে চেয়েছিল, ‘জুলিয়া আবার প্রাণ ফিরে পাবে তো?’
সঙ্গীনীহারা বিপর্যস্ত রবিনকে আশ্বস্ত করার জন্য নির্বাণ শুধু জবাব দিয়েছিল, ‘লামারা তো তাই বলছেন৷ জুলিয়ার মরদেহ নিয়ে ধ্যানে বসেছেন লামা চোগস সাঙ৷ অন্ধকার নামার পর তিনি নাকি একরাতের জন্য ফিরিয়ে দেবেন জুলিয়ার প্রাণ৷’ মাঝে অবশ্য শেষ দুপুরে একবার কিছুক্ষণের জন্য সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল নির্বাণ৷ অলিন্দ পেরিয়ে সে উপস্থিত হয়েছিল সেই সাধনকক্ষের আসনে৷ দরজা আগের মতো বন্ধ ছিল৷ কিন্তু সেখানে পৌঁছোতেই কেমন যেন অস্বস্তিবোধ হতে শুরু করেছিল তার৷ শূন্য এ-মঠে কোথাও কোনও শব্দ নেই৷ নির্বাণের মনে হচ্ছিল সেই দরজার বাইরে আশপাশের দেওয়ালের গায়ে পাথর বা কাঠখোদাই মূর্তিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে চারপাশ থেকে তাকিয়ে তাকে দেখছে! কিম্ভূতকিমাকার বীভৎস সব মূর্তি! অস্বস্তি এড়াতে নির্বাণ ফিরে এসেছিল ঘরে৷
অন্ধকারটা এদিন যেন বেশ তাড়াতাড়িই নামল রেশমপথের এই প্রাচীন তিববতি গুম্ফার বাইরে৷ বিকেল হতে না হতেই নির্বাণ জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল আকাশটা যেন কেমন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল আর তার সঙ্গে সঙ্গে ঝিরঝিরি তুষারপাত শুরু হল৷ ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসতে লাগল এই অচেনা-অজানা পরিবেশের বুকে৷
অন্ধকার নামার পর সঙ্গে আনা চার্জার লাইটটা জ্বালিয়ে ফেলল নির্বাণ৷ আর তার কিছুক্ষণ পরই আস্তে আস্তে অবসাদ ভেঙে উঠে দাঁড়াল রবিন৷ বাইরে একসময় বাতাসের শব্দ শোনা গেল৷ সেই বাতাস হয়তো বা মেঘকে সরিয়ে দিল৷ চাঁদ উঠল আকাশে৷ গোল থালার মতো বেশ বড় চাঁদ৷ তবে বাতাসের শব্দ আর তুষারপাত কিন্তু থামল না৷
নির্বাণ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সেই দৃশ্য৷ আর রাত যত বাড়তে লাগল ততই যেন উত্তেজনা পেয়ে বসতে লাগল রবিনকে৷ অস্থিরভাবে সে ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি শুরু করল আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘আর কতক্ষণ? আর কতক্ষণ? জুলিয়া তুমি ফিরে আসবে তো?’
জুলিয়া ফিরে আসতে পারে নির্বাণ এ-কথা বিশ্বাস করলেও শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা কী ঘটে তা দেখার ব্যাপারে নির্বাণের কৌতূহলের সীমা নেই৷ মাঝেমধ্যেই সে তার কোটের পকেটে রাখা সেই কৌটোটার অস্তিত্ব হাত দিয়ে অনুভব করতে লাগল আর প্রতীক্ষা করতে লাগল, কখন তাদের ডাক আসে৷
রাত বেড়ে চলল৷ সাতটা-আটটা-ন’টা৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলল তাদের উত্তেজনা আর বাইরে বাতাস-তুষারপাত৷ এ এক অসহনীয় প্রতীক্ষা! রুপোর কৌটোটা কোটের পকেট থেকে বার করে নাড়াচাড়া শুরু করল নির্বাণ৷
তবে শেষপর্যন্ত প্রতীক্ষার অবসান হল৷ কোথায় যেন প্রথমে একটা অস্পষ্ট শব্দ হল৷ তারপর ধীরে ধীরে একটা পদশব্দ এগিয়ে এসে থামল দরজার বাইরে৷ আর উৎকণ্ঠা সহ্য হচ্ছিল না রবিন বা নির্বাণের৷ সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল রবিন৷ বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন লামা চোগস সাঙ৷ তার এক হাতে ধরা বেশ বড় একটা প্রদীপ৷ সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে লামার মুখমণ্ডলে৷ সে মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করল নির্বাণ৷ লামার গাল দুটো একবার এপাশে অন্যবার ওপাশে ফুলে উঠছে৷ ওভাবে লামা গাল ফুলিয়ে নাচাচ্ছে কেন? ভালো করে লামার মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বাণের পরমুহূর্তেই মনে হল, লামা আসলে গাল নাচাচ্ছে না৷ তার মুখের ভিতর কিছু আছে৷ আর সেটাই লামার মুখের ভিতর থেকে বাইরে বেরোবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে৷ আর তারই ধাক্কায় অতিবৃদ্ধ লামার চর্মসার গাল ফুলে উঠছে!
মুখের ভিতর কী ধরে রেখেছেন লামা? জীবন্ত কিছু কি? নির্বাণ কোনও বইতে যেন পড়েছিল যে, অনেক সন্ন্যাসী নাকি মুখে জীবন্ত কই মাছ পুরে কৃচ্ছসাধন করে তপস্যা করেন! তেমন কিছু কি?
বৃদ্ধ লামাকে দেখার পর রবিন বলে উঠল, ‘কোথায়, জুলিয়া কোথায়?’
হাতের ইশারায় চোগস সাঙ অনুসরণ করতে বললেন তাঁকে৷ প্রদীপের আলোয় ধীর পায়ে অন্ধকার অলিন্দগুলো দিয়ে এগোতে লাগলেন৷ সেই ম্লান আলোয় প্রাচীন মঠের দেওয়ালের গায়ে পড়া নিজেদের ছায়াগুলোও যেন অদ্ভুত মনে হতে লাগল৷ বিশেষত, শীর্ণ-উলঙ্গ চোগস সাঙের ছায়াটা দেখে মনে হতে লাগল ঠিক যেন একটা কঙ্কালের ছায়া!
সাধনকক্ষের কিছুটা তফাতে এসে থামলেন লামা৷ কক্ষের দরজা খোলা৷ ভিতরে জমাট বাঁধা অন্ধকার৷ সেদিকে তাকিয়ে রবিন বলে উঠল, ‘কই, জুলিয়া কই?’
রবিন প্রশ্ণটা করার সঙ্গে সঙ্গেই একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ শোনা গেল ঘরের ভিতর৷ আর সেই শব্দটা ক্রমশ দরজার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ এরপর অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে যে আত্মপ্রকাশ করল তাকে দেখে নির্বাণের এতদিনের বিশ্বাস-অবিশ্বাস সব মাথার মধ্যে এলোমেলো হয়ে গেল৷
হ্যাঁ, ঘরের বাইরে যে এসে দাঁড়িয়েছে সে জুলিয়াই৷ সম্পূর্ণ নগ্ণ দেহ তার৷ বুকের মধ্যে গুলির ছিদ্রটাও যেন দেখা যাচ্ছে! আর একটা ক্ষীণ রক্তধারা যেন তার মুখের কষ গড়িয়ে নামছে৷
তবে কি লামা সত্যিই তার মৃতদেহে আত্মাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? নির্বাণ তার মনকে এই বলে আপ্রাণ প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করল যে, হয়তো জুলিয়া তখনও মরেনি৷ আর সেটা বুঝতে পেরেছিলেন লামা৷ তারপর বন্ধ ঘরে কোনও ওষুধ বা অন্য কিছুর সাহায্যে তার জ্ঞান ফিরিয়ে তাকে উঠে দাঁড় করিয়েছেন৷
জীবন্ত জুলিয়াকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গিয়েছিল রবিনও৷ তারপর সে ছুটে গিয়ে জুলিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল—‘তুমি বেঁচে আছ জুলিয়া! তুমি সত্যিই বেঁচে আছ! চলো আমরা এখনই বেরোব৷ এই ভয়ংকর জায়গা, এই দেশ ছেড়ে দেশে ফিরে যাব৷’
তার কথার প্রত্যুত্তরে জুলিয়া গোঁ গোঁ আর্তনাদ করে কী যেন বলার চেষ্টা করতে লাগল৷
লামার কয়েক পা তফাতে দাঁড়িয়েছিল নির্বাণ৷ লামার মুখের ভিতরের সেই জিনিসটা যেন তার গাল ফুঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ বৃদ্ধ লামা আর সেটাকে মুখের ভিতর ধরে রাখতে পারছেন না৷ মুখ লাল হয়ে উঠেছে তাঁর, চোখের কোটর থেকে মণিদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ আলিঙ্গনরত রবিন আর জুলিয়ার দিক থেকে নির্বাণ দৃষ্টি ফেরাতেই লামা চোগস সাঙ নির্বাণের হাতে-ধরা কৌটোটার দিকে তাকিয়ে তাকে কাছে ডাকলেন৷
ওদিকে তখন রবিন জুলিয়াকে জাপটে ধরে বলছে, ‘তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? কোথায় কষ্ট? কীসের কষ্ট?’
নির্বাণ, লামার নির্দেশ পালন করে তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে কৌটোর ঢাকনাটা সরাল৷ লামা ঝুঁকে পড়ে কৌটোর ভিতর মুখ থেকে জনিসটা রাখতে যাচ্ছিলেন৷ ঠিক সেই সময় রবিন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘জুলিয়া, তোমার এ ক্ষতি করল! কে করল?
তার চিৎকার শুনে চমকে উঠে নির্বাণ আর লামা চোগস সাঙ ফিরে তাকাল আলিঙ্গনরত যুগলের দিকে৷ রবিনের প্রশ্ণের জবাবে জুলিয়া করুণ স্বরে গুঙিয়ে উঠে হাতের ইশারায় দেখিয়েছিল চোগস সাঙকে৷ আর সঙ্গে সঙ্গে জুলিয়াকে ছেড়ে দিয়ে রবিন লামার উদ্দেশে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘শয়তান, তুই এতবড় ক্ষতি করলি কেন জুলিয়ার? এ কথা বলেই সে ছুটে এসে সজোরে ঘুসি মারল জীর্ণ লামার পেটে৷
লামার হাত থেকে খসে পড়ল প্রদীপটা৷ আর ঘুসির আঘাতে চোগস সাঙের মুখ থেকে ফাঁক হয়ে কী যেন একটা ছোট্ট জিনিস সোজা ছিটকে বেরিয়ে কাকতালীয়ভাবে সোজা ঢুকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাণের জামার ভেতর৷
বাতিটা পড়ে নিভে গিয়েছে৷ চারপাশে একটা ঝটাপটি শুরু হল অন্ধকারের মধ্যে৷ নির্বাণের জামার ভেতর জিনিসটা বাইরে বেরোবার জন্য ছটফট করছে! নির্বাণ অন্ধকারের মধ্যেই নিজের জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে জিনিসটা খপ করে ধরে ফেলল৷ জিনিসটাকে ধরে তার মনে হল সেটা ছোট মাছের মতো কোনও কিছু হবে৷ মাছের মতোই সেটা পিচ্ছিল আর ঠান্ডা৷ তার হাতের মুঠির মধ্যে ছটফট করছে৷
হঠাৎ একইসঙ্গে অন্ধকারে আর্তনাদ করে উঠল লামা আর রবিন৷ আর তার পরমুহূর্তেই শোনা গেল নারীকণ্ঠের রক্তজল-করা এক অদ্ভুত হাসি৷ জুলিয়ার হাসি! অট্টহাস্য করছে জুলিয়া!
ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝতে পারছে না নির্বাণ৷ সে চেষ্টা করতে লাগল তার হাতের জিনিসটা কৌটোতে ভরে ফেলার৷ অন্ধকারের মধ্যে কাজটা করতে একটু সময় লাগল তার৷ জুলিয়ার হাসি তখন অলিন্দ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বাইরের দিকে৷ তার সঙ্গে ভারী কোনও জিনিস মেঝের উপর দিয়ে ঘসটে টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ!
কোনওক্রমে জিনিসটাকে কৌটোর মধ্যে পুরে সেই ভয়ংকর হাসিকে অনুসরণ করল নির্বাণ৷ সে মঠের দরজার বাইরে বেরিয়ে এসে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল৷ তুষারপাত আর বাতাস বইছে বাইরে৷ আর সেই ঝোড়ো বাতাস আর তুষারপাতের মধ্যে চাঁদের আলোয় জুলিয়া কোনও অমানুষিক দানবীয় শক্তিতে দু-হাতে চোগস সাঙ আর রবিনের গলা দুটো ধরে মাটির ওপর তাদের দেহ দুটোকে টানতে টানতে এগিয়ে চলেছে! বলা ভালো উড়ে চলেছে৷ দেখে মনে হয় ও-দেহদুটোতে আর প্রাণ নেই৷ চত্বরের যে পাশটায় খাদ সেখানে পৌঁছে গেল জুলিয়া৷
এই বীভৎস দৃশ্য আর সহ্য করতে না পেরে নিজের অজান্তেই যেন আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল নির্বাণ৷ আর সেই চিৎকার শুনেই সম্ভবত দেহদুটোকে নিয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে নির্বাণের দিকে ফিরে তাকাল জুলিয়া৷ কী বীভৎস তার মুখমণ্ডল! মুখের দু’পাশের কষ গড়িয়ে তাজা রক্ত পড়ছে! চোখের মণিদুটো জ্বলছে হিংস্র শ্বাপদের মতো! সত্যি যেন সে প্রেতলোকের বাসিন্দা!
নির্বাণকে দেখে সে একরাশ ঘৃণা-হিংস্রতা নিয়ে যেন এগোতে যাচ্ছিল নির্বাণের দিকে৷ কিন্তু এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল নির্বাণের হাতে ধরা কৌটোটার দিকে তাকিয়ে৷ জ্ঞান হারাবার আগে নির্বাণ দেখল, শেষ একটা আর্তনাদ করে জুলিয়া দেহদুটোকে শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে ঝাঁপ দিল খাদে৷
তিনদিন পর সকালে আর্মি হাসপাতালের জানলার সামনে দাঁড়িয়েছিল নির্বাণ৷ সেই টিবেটিয়ান সীমান্তবাহিনীর অফিসার ঘটনার পরদিন ভোরে মঠ চত্বর থেকে তুষারে প্রায় চাপা পড়া অচৈতন্য নির্বাণকে উদ্ধার করে এই হাসপাতালে এনে ভরতি করেন৷ তার জ্ঞান ফিরতে আরও একদিন সময় লেগেছিল৷ তবে এখন সে সুস্থ৷ আর একটু পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে৷
কাঠের তৈরি হাসপাতালের দোতলার জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল নির্বাণ৷ তার জানলার ঠিক নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নাম না-জানা একটা পাহাড়ি নদী৷ ওপর থেকে রেশমপথের পাকদণ্ডীটাও চোখে পড়ছে৷ তার দু’পাশে ঘন পাইন বন, মাথার ওপর উত্তুঙ্গ তুষার শৃঙ্গগুলো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷ আরও দূরে যেখানে রেশমপথের পাকদণ্ডীগুলো ও ওপরদিকে উঠে ঘন কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে সেদিকে তাকিয়ে নির্বাণ ভাবছিল হয়তো বা ওই কুয়াশার আড়ালেই কোথাও দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রাচীন মঠ৷ যেখানে রয়ে গেল রবিন-জুলিয়া আর তার দেখা সেই ভয়ংকর ঘটনার স্মৃতি৷ সে স্মৃতিকে অবশ্য মন থেকে মুছে ফেলতে চায় নির্বাণ৷
ভাবছিল নির্বাণ৷ এমন সময় ঘরে প্রবেশ করলেন ইন্দোটিবেটিয়ান ফোর্সের সেই অফিসার ডুকপা৷ তার হাতে ধরা ফুলের স্তবকটা নির্বাণের হাতে দিয়ে তিনি বললেন—‘আজ তো আপনি চলে যাবেন তাই দেখা করতে এলাম৷ নীচে আর্মির গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ তারা আপনাকে গ্যাংটকে পৌঁছে দেবে৷’
এ কথা বলার পর ডুকপা বললেন, ‘আপনি এতদিন অসুস্থ ছিলেন বলে প্রশ্ণটা করিনি৷ আসলে সেদিন রাতে ব্যাপারটা কী ঘটেছিল বলুন তো?’
একটু চুপ করে থেকে নির্বাণ সংক্ষেপে প্রথমে মোটামুটি বলল ব্যাপারটা৷ তারপর তাকে প্রশ্ণ করল, ‘আচ্ছা, ‘‘রোলাং’’ কাকে বলে আপনি জানেন? মঠাধ্যক্ষ বলেছিলেন, লামা চোগস সাঙ যে পদ্ধতিতে মৃতাকে পুনর্জন্ম দেবেন তার নাম নাকি ‘রোলাং’৷’
ভদ্রলোক তার কথার জবাবে বললেন, ‘ব্যাপারটা সত্য-মিথ্যা না জানলেও যেহেতু আমি জন্মসূত্রে তিববতি, তাই তিববতি শব-সাধনার এই পদ্ধতির কথা আমিও শুনেছি৷ মৃতদেহের শরীরে আত্মা প্রবেশ করিয়ে কিছু সময়ের জন্য আবার নাকি জীবন্ত করা হয় দেহকে৷ এ সাধনা সম্বন্ধে যতটুকু শুনেছি তাতে সাধক মৃতদেহ নিয়ে অন্ধকার ঘরে সারাদিন সাধনা করেন৷ এ পদ্ধতিতে মৃতদেহকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে চিৎ করে শুইয়ে তার ওপর সাধক শুয়ে পড়েন মৃতের প্রত্যেকটা অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গ মিলিয়ে৷ মৃতদেহ যদি নারীর হয় তবে সাধক লিঙ্গ প্রবেশ করান মৃতার যোনীতে৷ তারপর মৃতের মুখে মুখ লাগিয়ে সাধক বীজমন্ত্র জপ করতে থাকেন৷
ভদ্রলোক একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, একসময় মন্ত্রের জোরে মৃতদেহে আত্মা প্রবেশ করে৷ দেহটা জীবন্ত হয়ে উঠে সাধককে তার ওপর থেকে ছিটকে ফেলতে চায়৷ এ সময় যখন সেই শবাত্মা জিভ বার করে তখন সেই সাধক কামড়ে সেই জিভ কেটে নিজের মুখে নিয়ে নেন৷ সেই জিভ নাকি জীবন্ত৷ তার মধ্যেই আত্মার ক্ষতিকর শক্তি আবদ্ধ থাকে৷ জিভটাকে এরপর পুরে ফেলতে হয় মন্ত্রপূত পাত্রে৷ যা পরে শুকিয়ে তন্ত্রসাধনার কাজে ব্যবহার করা হয়৷ যার কাছে ওই জিভের পাত্র থাকে কোনও আত্মা নাকি তার কোনও ক্ষতি করতে পারে না৷ কিন্তু কোনওভাবে সেই জিভ পাত্রে ভরার আগে সাধকের মুখ থেকে যদি পড়ে যায় তবে সেই মুহূর্তে সাধকের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পুনরুত্থিত মৃতদেহের ওপর থেকে৷ মৃতদেহ তখন স্বমূর্তি ধারণ করে৷ হিংস্র হয়ে উঠে সেই প্রেতাত্মা হত্যা করে সাধক ও অন্যদের৷’ নির্বাণের প্রশ্ণের উত্তর জানিয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন তিনি৷
নির্বাণকেও এবার বেরোতে হবে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই পোশাক বদলে নিল সে৷ একজন হাসপাতাল কর্মী তার কোটটা দিয়ে গিয়েছে৷ সেটা গায়ে দিয়ে কোটের পকেটে হাত দিতেই নির্বাণের হাত ঠেকল একটা জিনিসে৷ সেটা বার করেই চমকে উঠল নির্বাণ৷ সেই রুপোর কৌটোটা! নিশ্চয়ই কৌটোটা তার দেহের পাশে পড়ে থাকতে দেখে তার কোটের পকেটে ভরে দিয়েছিল কেউ৷
মুহূর্তের মধ্যে নির্বাণের মনে পড়ে গেল ঘটনাটা৷ তার দেহের ভিতর খেলা করছে—লাফাচ্ছে মাছের মতো পিচ্ছিল—ঠান্ডা একটা জিনিস! লামা চোগস সাঙের মুখ থেকে বেরিয়ে-আসা কামড়ে ছিঁড়ে আনা প্রেতাত্মা জুলিয়ার জীবন্ত জিভ! ব্যাপারটা মনে পড়তেই কেঁপে উঠল নির্বাণ৷ তারপর জানলার কাছে এগিয়ে গিয়ে ঢাকনাবন্ধ ছোট্ট রুপোর পাত্রটা নীচে নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ফেরার জন্য ঘর ছাড়ল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন