হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

‘নিক্সন পার্ল কোম্পানি’-র মালিক মোটাসোটা গোলগাল চেহারার নিক্সন সাহেব তাঁর সোনার চশমাটার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে মৃগাঙ্ককে বললেন, ‘আমেরিকাতে আমি প্রায় তিরিশবছর ধরে পার্ল জুয়েলারির ব্যবসা করছি তা আপনি আমাদের একজন দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে জানেন৷ জাপান, সিংহল, পারস্য অর্থাৎ ইরাকের বসর ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আমরা মুক্তো সংগ্রহ করি এবং এদেশে ব্যবসা করি৷ আমাদের কোম্পানির তরুণ প্রতিনিধি হিসাবে আপনাকেও বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিল ওসব জায়গাতে৷ এবং আপনি দক্ষতার সঙ্গে কোম্পানির দায়িত্ব পালন করেছেন তাই তো?’
মৃগাঙ্ক প্রায় দশবছর কাজ করছে ফ্লোরিডার এই জুয়েলারি কোম্পানিতে৷ নিষ্ঠার সঙ্গেই সে কোম্পানির কাজের দায়িত্ব পালন করে আসছে৷ মালিকের কথা শুনে সে বিনীতভাবে বলল, ‘দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছি কিনা জানি না তবে আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করি আমার কর্তব্য পালন করতে৷’
নিক্সন মনে হয় খুশি হলেন মৃগাঙ্কর কথা শুনে৷ নাকের ডগা থেকে চশমাটা একটু ওপরে তুলে নিয়ে মৃদু হেসে তিনি বললেন, ‘ইয়ং-ম্যান, সেজন্যই আপনাকে একটা বিশেষ দায়িত্ব দিতে চাই আমি৷’
মৃগাঙ্ক জানতে চাইল, ‘কী দায়িত্ব?’
নিক্সন তার প্রশ্ণের জবাবে একটা পোস্টকার্ড আকারের ফটোগ্রাফ বাড়িয়ে দিলেন মৃগাঙ্কর দিকে৷ মৃগাঙ্ক ছবিটা হাতে নিয়ে তাকাল সেটার দিকে৷ ক্যামেরায় তোলা ছবি৷ বিচিত্র সাজে সজ্জিত এক মহিলার ছবি৷ তার পোশাক দেখে মৃগাঙ্কর মনে হল, সে আমেরিকা মহাদেশের কোনও নেটিভ মহিলা হবে৷ মানে যারা এ-মহাদেশের আদি বাসিন্দা৷ মেয়ে বা সেই মহিলার কোমর থেকে ঊরু পর্যন্ত পশুচর্মের আবরণে ঢাকা, ঊর্দ্ধাঙ্গেও পশুচর্মের বক্ষআবরণী৷ দুই হাত ও দুই পায়ে মোটা ভারী ধাতুর বালা, গলায় ধাতুর কণ্ঠ বন্ধনী৷ মাথায় একটা অদ্ভুত মুকুট, বাঁকানো দাঁত বেরিয়ে আছে তার থেকে৷ ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, আসলে একটা হাঙরের দাঁতসুদ্ধ চোয়াল মুকুট হিসেবে পরা আছে তার মাথায়৷ তাতে আবার দুটো বড়বড় রঙিন পালক গোঁজা৷ যেমন পালক ব্যবহার করে রেডইন্ডিয়ানরা৷
তবে তার সাজ-পোশাকের মধ্যে যে-জিনিসটা মৃগাঙ্কর সব থেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল তা হল তার গলার হারের ছরা৷ নিটোল গোল গোল সাদা পিংপং বলের মতো দেখতে জিনিসগুলো সুতোয় গেঁথে বানানো হয়েছে মালাটা৷ বলের মতো জিনিসগুলোর একটা ঔজ্জ্বল্য আছে, ঠিক যেমন মুক্তোর হয়! কিন্তু মুক্তো কী এত বড় হয়? নাকি ওগুলো পাথরের বল?’
নিক্সন বললেন, ‘ছবিটার দিকে তাকিয়ে আপনি কী চিন্তা করছেন আমি জানি৷ আপনার কৌতূহল নিরসনের জন্য বলি, আপনি ছবিটার যে জিনিসটা দেখে সেটা কী হতে পারে ভাবছেন, সেটা হল আসলে পার্ল—মুক্তো৷ অন্তত প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ তাই বলছে৷’
এই নিক্সন পার্ল কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে ছোট-বড় নানা মুক্তো দেখার সৌভাগ্য মৃগাঙ্করও হয়েছে৷ তা বলে এত বড় মুক্তো? বিস্মিতভাবে মৃগাঙ্ক তাকাল নিক্সনের দিকে৷
নিক্সন এরপর বললেন, ‘আমি এ-ব্যবসা করতে গিয়ে নানা দুর্লভ মুক্তোর কথা শুনেছি, দেখেছি৷ যেমন মিশরসম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা নাকি দুষ্প্রাপ্য নীল মুক্তোর মালা পড়তেন৷ স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের কাছে নাকি পায়রার ডিমের মতো মুক্তো ছিল, সেসব আমি চোখে না দেখলেও পর্তুগালের মিউজিয়ামে রাখা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুক্তো আমি দেখেছি যা একমাত্র আকারে ওই নেটিভ আমেরিকান রমনীর মুক্তোগুলোর সমান৷ কাজেই ওই আকারের মুক্তো অতি দুর্লভ হলেও অসম্ভব নয়৷ ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস যখন প্রথম এই দ্বীপে যান তখনও তার বিবরণে এই আরাওয়াক নেটিভ আমেরিকান রমণীদের কণ্ঠসজ্জায় এই বিরাট বিরাট মুক্তো দেখার কথা উল্লেখ আছে৷ এরপর স্পেনীয় দখলদার, ফরাসি জলদস্যুরাও ওই মুক্তো দেখেছে বলে তাদের বিবরণে দাবী করে৷’
এই পর্যন্ত বলে তিনি একটু থামলেন তারপর আবার বললেন, ‘তবে আপনার হাতে যে ছবিটা আছে সেটা সাম্প্রতিক তোলা৷ গতবছর ঘটনাচক্রে ইউনেস্কোর এক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন আরাওয়াক নেটিভদের উৎসবের দিনে৷ ইউনেস্কো থেকে ঘোষিত সংরক্ষিত জনজাতি আরাওয়াকদের দেখতে গেছিলেন তিনি৷ কলম্বাস যখন সে দ্বীপ আবিষ্কার করেন তখন সেখানকার একমাত্র অধিবাসী ছিল এই আরাওয়াকরাই৷ স্পেনীয়রা আরওয়াকদের প্রায় নিশ্চিহ্ণ করে দেয়৷ এখন সেখানে আফ্রিকানদের বংশধররাই, কালো মানুষরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ খুব সামান্য আরওয়াক সেখানে টিকে আছে৷
যাই হোক ইউনেস্কোর প্রতিনিধি লুথার কিং নামের ভদ্রলোক বেশ কিছুদিন ছিলেন ওখানে, এবং অসংখ্য ছবি তোলেন৷ এ-ছবি তারই একটা৷ ভদ্রলোকের অবশ্য খুব একটা আগ্রহ নেই এসব ব্যাপারে৷ হয়তো এ ব্যাপারে জানা নেই বলেই তার আগ্রহ নেই৷ কিন্তু এ ছবি দেখে ব্যাপারটা সম্বন্ধে আগ্রহ সঞ্চারিত হয়েছে আমার মনে৷ এবং আমার ব্যবসার কারণেই আগ্রহটা বেশ প্রবল৷ ঘটনাচক্রে ছবিটা দেখার পর আমি যোগাযোগ করেছিলাম লুথার নামের ভদ্রলোকের সঙ্গে৷ তিনিও আমাদের এই ইউ এস-এ তে ফ্লোরিডায় থাকেন৷ তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার ব্যাপারটা সম্বন্ধে আগ্রহ আরও বেড়েছে৷’
এ পর্যন্ত শুনে মৃগাঙ্ক প্রশ্ণ করল, ‘আপনি যে-জায়গার কথা বলে চলেছেন সে-জায়গা কোথায়?’
নিক্সন বললেন, ‘দেশটা হল ফ্লোরিডার ৯৭০ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এক স্বাধীন রাষ্ট্র—হাইতি৷ আর এই আরওয়াকরা বসবাস করে এই দ্বীপরাষ্ট্রের দক্ষিণে ক্যারিবিয়ান সাগরের উপকূলে এক জায়গাতে৷ তথাকথিত সভ্য সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই থাকে তারা৷ সভ্য পৃথিবীর সঙ্গে খুব একটা বৈরিতা বা সখ্যতা—এ-দুইয়ের কোনওটাই তাদের নেই৷ উপকূল অঞ্চলে মাছ শিকার, আর জঙ্গল থেকে পশুশিকার করেই তাদের জীবন কাটে৷’
এ-কথা বলে মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে নিক্সন বললেন, ‘লুথারের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি যে ওরা নাকি তাদের উৎসবে এক নারীকে এই মুক্তোমালা দিয়ে সাজিয়ে আরাধনা করার পর, কিছুদিনের মধ্যেই সেই মুক্তোমালা সমুদ্রে বিসর্জন দেয়৷ পরের বছর আবার উৎসবের কিছুদিন আগে এই মুক্তো সংগ্রহ করে মালা গাঁথা হয়৷ লুথারের থেকে শোনা এই কথাটাই আমার আগ্রহ আমার বাড়িয়ে দিয়েছে৷ অর্থাৎ এই প্রাচীন আমেরিকান জনগোষ্ঠী নিশ্চয়ই জানে যে, ক্যারিবিয়ান সাগরের কোনও এক জায়গাতে এই বিরাট বিরাট মুক্তো পাওয়া যায়৷ যার একটার দাম-ই কয়েক লাখ ডলার হতে পারে৷’
মৃগাঙ্ক জানতে চাইল, ‘ওই লুথার নামের ভদ্রলোককে কি ওরা বলেছে যে কোথা থেকে ওরা মুক্তো সংগ্রহ করে?’
নিক্সন হেসে বললেন, ‘লুথারকে জিগ্যেস করায় তিনি বললেন সামান্য কৌতূহলবশত তিনি একবার আরাওয়াক গোষ্ঠীপতির কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে তারা ওই বড় বড় মুক্ত কোথা থেকে সংগ্রহ করে? জবাবে সেই গোষ্ঠীপতি ওঝা বা পুরোহিত নাকি বলেছিলেন যে, ‘‘মেডুসার ওই মুক্তোমালা আমরা সংগ্রহ করি মানুষের পেট থেকে৷’’ ভাবুন একবার, ঝিনুকের পেট থেকে নয়, মানুষের পেট থেকে! লুথার অবশ্য এসব মুক্তো-টুক্তো নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী নন বলে ব্যাপারটা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ণ করেননি৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘মেডুসা! সেই ভয়ঙ্কর দেবীর কথা তো আমি গল্পে পড়েছি! তার মাথার চুলগুলো হল ফনা-তোলা সাপ৷ সেই দেবী বা অপদেবী কোনও মানুষের দিকে তাকালে পাথর হয়ে যেত সে৷’
নিক্সন বললেন, ‘পুরাণ-কথিত সেই দেবীর কথা আমিও গল্পে পড়েছি৷ তার সঙ্গে এই আরাওয়াকদের মেডুসার কোনও সম্পর্ক আছে কিনা জানি না, তবে আরাওয়াকরা মুক্তোমালাশোভিত যে-নারীকে দেবী হিসেবে পুজো করে তাকে মেডুসার নামেই ডাকে৷’
এরপর নিক্সন কয়েক মুহূর্ত মৃগাঙ্কর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাকে কেন ডেকেছি জানেন? আপনাকে একবার সে-জায়গাতে যেতে হবে৷ রওনা হতে হবে কালকেই৷ কারণ তাদের দেবী পুজোর উৎসবের আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি৷ নিশ্চই তারা এসময় সমুদ্র থেকে মুক্তো সংগ্রহ করবে৷ আপনাকে জানার চেষ্টা করতে হবে যে ক্যারিবিয়ান উপকূলের কোথা থেকে তারা ওই মুক্তো সংগ্রহ করে৷ কি, সে-জায়গাতে আপনি যেতে রাজি তো?’
মুক্তো কোম্পানির মালিক নিক্সন এমনই কোনও প্রস্তাব দেবেন তা অনুমান করছিল মৃগাঙ্ক৷ একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, ‘আমি কীভাবে, কী পরিচয় দিয়ে পৌছোব সেখানে?’
নিক্সন বললেন, ‘এখান থেকে আকাশপথে প্রথমে আপনি নামবেন হাইতির রাজধানী পোর্টপ্রিন্সে৷ সেখানে আমাদের স্থানীয় এজেন্ট লুইস থাকবেন৷ পোর্টপ্রিন্স বন্দর থেকে লঞ্চে লুইস আপনাকে নিয়ে যাবে আরাওয়াকদের অঞ্চলে৷ তবে লঞ্চ সেই দ্বীপে ভিড়বে না৷ লঞ্চের লোকরা আপনাকে ক্যানোতে করে পৌঁছে দেবে সমুদ্রখাড়ির সেই দ্বীপে৷ একলাই আপনাকে সেখানে যেতে হবে৷ সঙ্গে স্যাটেলাইট ফোন দেওয়া হবে৷ আপনার কাজ মিটে গেলে তাদের ফোনে জানালে তারা আবার আপনাকে সেখান থেকে উঠিয়ে নেবে৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘আপনার সেই লুইস নামের এজেন্ট তো আমার সঙ্গে যেতে পারত, তবে কিছুটা সুবিধা হত৷ স্থানীয় মানুষ সে...৷’
নিক্সন বললেন, ‘এখানে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে৷ সে নিগ্র-বংশোদ্ভূত৷ তাদের খুব একটা পছন্দ করে না আরাওয়াকরা৷ তাদের ধারণা এই কালো মানুষরাই তাদের দেশ দখল করে নিয়েছে৷ যদিও ব্যাপারটা মোটেও তাই নয়৷ শ্বেতাঙ্গদের ক্রীতদাস হিসাবেই তারা প্রথম সে-দেশে গেছিল তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হয়ে ওঠে৷ লুইস সঙ্গে থাকলে হয়তো সমস্যা হতে পারে৷ আরাওয়াকরা হয়তো পত্রপাঠ আপনাকে বিদায় করে দিল সেখান থেকে৷
তবে আরাওয়াকদের সঙ্গে কথা বলতে আপনার খুব একটা সমস্যা হবে না৷ ইউনেস্কোর লোকজন, খ্রিস্টান মিশনারিরা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের লোকজন মাঝে মাঝে সেখানে যাওয়া-আসা করার কারণে আরাওয়াকরা সবাই না হলেও ওই দলপতি বা ওঝাসহ বেশ কয়েকজন ইংরাজি বুঝতে পারে ও ভাঙা ভাঙা ইংরাজি বলতে পারে৷ আপনিও আমাদের কোম্পানির প্রতিনিধি হিসাবে ওদের জন্য সাহায্য নিয়ে যাবেন৷ লুইস সেসব জিনিস সরবরাহ করবে আপনাকে৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘আমাকে কোনও অস্ত্র দেওয়া হবে কি নিরাপত্তার কারণে?’
নিক্সন বললেন, ‘না, কোনও অস্ত্র থাকবে না৷ আরাওয়াকরা ইউনেস্কোর সংরক্ষিত জনজাতী বলে সে দ্বীপে কোনও অস্ত্র নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ৷ যদিও আরাওয়াকরা নিজেরা তির ধনুক, বর্শা ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহার করে৷ একই রকম নিয়ম ঘোষিত আছে আন্দামানের জারোয়া দ্বীপেও৷ আপনি সেখানেও অস্ত্র বহন করতে পারবেন না৷ তবে আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই৷ আরওয়াকরা বেশ শান্ত প্রকৃতির৷ আদিম জনজাতি হলেও তারা সভ্য মানুষ৷’
এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিক্সন বললেন, ‘আপনার যাবার সব ব্যবস্থা আমি করছি৷ কাল ভোরের ফ্লাইট ধরলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আপনি হাইতি পৌঁছবেন৷ আর সেখান থেকে কাল বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাবেন আরাওয়াক নেটিভ আমেরিকানদের গ্রামে৷ বেস্ট অব লাক৷ ‘এ-ছবিটা আপনি সঙ্গে রেখে দিন৷’
পরদিন দুপুরে লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়েছিল মৃগাঙ্ক৷ তার পাশে দাঁড়িয়ে লুইস,নিক্সন কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট৷ তার কাছ থেকেই আরওয়াক দ্বীপের সম্বন্ধে নানারকম তথ্য সংগ্রহ করছিল মৃগাঙ্ক৷ লুইস-ই তাকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে লঞ্চে এনে তুলেছে৷ আরও জনসাতেক লোকও আছে তাদের সঙ্গে৷ সবাই তারা কৃষ্ণাঙ্গ৷ এদেশে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে, দেশটাকে আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্গত বলে মনেই হয় না৷
সমুদ্রের জলরাশি ভেদ করে দ্রুত এগোচ্ছিল লঞ্চটা৷ মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছে নানা ছোট-বড় দ্বীপ, নির্জন বালুতটের ওপাশে সার সার নারকেলগাছ৷ ঘণ্টা সাতেকের সমুদ্রযাত্রা প্রায় শেষ হতে চলেছে৷ কারণ, লুইস জানাল যে ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যে সে-জায়গাতে পৌঁছে যাব আমরা৷’
মৃগাঙ্ক প্রশ্ণ করল তাকে, ‘আপনি আগে ওখানে গেছেন নিশ্চই?’
লুইস জবাব দিল, ‘ও-দ্বীপের পাশ দিয়ে গেলেও নামিনি কখনও৷ কারণ ওরা আমাদের পছন্দ করে না৷ তবে ওরা নির্বিবাদী৷ মাঝে মাঝে ওদের ছই-অলা জেলে-নৌকো মাছের সন্ধানে সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়৷ আপনাকে আমরা দ্বীপে নামিয়ে দেব৷ তারপর কাজ মিটে গেলে আপনি আমাদের স্যাটেলাইট ফোনে যোগাযোগ করবেন৷ স্যাটেলাইট-ফোনসেট দিয়ে দিয়েছি আপনার ব্যাগে৷ আর কিছু সামুদ্রিক সাপের বিষের অ্যান্টিভেনাসও দিয়েছি৷ ওই একটা ব্যাপারেই সাবধান৷ এসব দ্বীপগুলোতে প্রচুর সাপ আছে৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘আচ্ছা৷ মুক্তোর সন্ধানে কোস্টাল অঞ্চলে কাজ করতে যেতে হয় বলে ভেনাস ইঞ্জেকশন নেবার পদ্ধতি আমার জানা আছে৷ কিন্তু আপনি কি জানেন যে কেন আমি ও-দ্বীপে যাচ্ছি?’
লুইস জবাব দিল, ‘নিক্সন আমাকে বলেছেন কথাটা৷ আপনি ওখানে যাচ্ছেন ওদের মেডুসাদেবীর মুক্তোর সন্ধানে৷ ওই মুক্তোর গল্প বহু দিন ধরে এ-তল্লাটে প্রচলিত৷ তবে গল্প নয়, সত্যি৷ বহু লোকে দেখেছে ওই মুক্ত হার৷ কিন্তু কিছুতেই ওরা বলতে চায় না যে, সমুদ্রের কোন অংশ থেকে তারা ওই মুক্তো সংগ্রহ করে৷ কেউ এ ব্যাপারে জিগ্যেস করলেই ওরা মজা করে এক অদ্ভুত কথা বলে—ঝিনুকের পেটে নয়, মানুষের পেটে নাকি ওই মুক্তো পাওয়া যায়৷ উৎসবের শেষে সমুদ্রের গভীরে নাকি ওরা বিসর্জন দেয় ওই মুক্তোমালা৷ দেখুন যদি আপনি কোনওভাবে খবর সংগ্রহ করতে পারেন৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘দেখা যাক কী হয়?’
জল কেটে এগিয়ে চলল লঞ্চ৷ বিকেল নাগাদ বেশ বড় একটা দ্বীপ দেখা গেল৷ তার চারপাশে সোনালি বালুতটে গিয়ে আছড়ে পড়ছে ঊর্মিমালা৷ আর বালুতটের ওপাশে ঘন নারকেলগাছের সারি আন্দোলিত হচ্ছে সমুদ্র বাতাসে৷ দু-চারটে ছোট বড় নৌকাও রাখা আছে বালুতটে৷ ছবির মতো এক শান্ত-সুন্দর দ্বীপ৷ লুইস বলল, ‘ওই হল আরাওয়াক দ্বীপ৷’
দ্বীপের কাছাকাছি যতদূর লঞ্চ যেতে পারে সে পর্যন্ত গিয়ে লঞ্চটা দাঁড়িয়ে পড়ে বেশ কয়েকবার ভোঁ বাজাল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই নারকেল গাছগুলোর আড়াল থেকে একদল লোক বেড়িয়ে এসে দাঁড়াল বালুতটে৷ তাদের দেখে লঞ্চের সারেং একটা সাদা পতাকা নাড়ল তাদের উদ্দেশ্যে৷ তা দেখে তারাও একটা সাদা কাপড় নাড়ল৷ লঞ্চের থেকে একটা ছোট নৌকো জলে নামিয়ে তাতে মালপত্রসমেত মৃগাঙ্ককে ওঠানো হল৷ একজন লোক দাঁড় টেনে মৃগাঙ্ককে নিয়ে চলল পাড়ের দিকে৷
মৃগাঙ্কদের নৌকোটাকে এগিয়ে যেতে দেখে সে-লোকগুলোও এগিয়ে এসে হাঁটুজলে দাঁড়াল৷ নৌকা গিয়ে থামল তাদের সামনে৷ জনা সাত-আটেক লোক৷ তাদের পরনে ছাগলের চামড়ার তৈরি হাতকাটা জ্যাকেট, গোড়ালির ওপর পর্যন্ত ওঠানো পশুচর্মের তৈরি প্যান্টের মতো পোশাক, মাথায় প্রাচীন নাবিকদের মতো টুপি, তার ফাঁক গলে লম্বা বেণী ঝুলছে পিঠের ওপর৷ লালচে বর্ণের শক্তপোক্ত লোকগুলোর হাতে ধরা আছে মাছ ধরার কোঁচের মতো দেখতে বর্শা৷
একজন লোক প্রথমে নৌকোর কাছে এসে দাঁড়াল৷ অসংখ্য বলিরেখাময় মুখ তার৷ এ-লোকের সাজগোজের একটু ভিন্নতা আছে৷ মাথার টুপিতে গোঁজা আছে বেশ কয়েকটা বড় বড় রঙিন পালক৷ কানে সোনার মাকড়ি৷ কোমরবন্ধ হিসেবে বাঁধা আছে একটা সাপের চামড়া, তার থেকে ঝুলছে একটা ছুরি৷ এ-লোকটার গলাতে বেশ কয়েক ছড়া মালা ঝুলছে৷ তবে তা মুক্তোর নয়, নানা রঙের পাথরের মালা৷ লোকটা বারান্দালা চামড়ার টুপির নীচ দিয়ে মৃগাঙ্কদের দিকে তাকিয়ে সন্দিগ্দভাবে ভাঙা ভাঙা ইংরাজীতে প্রশ্ণ করল ‘তোমরা কারা? কেন এসেছ এখানে?’
মৃগাঙ্ক জবাব দিল, ‘আমি আমেরিকা থেকে আসছি৷ কিছু উপহারও এনেছি তোমাদের দ্বীপের মানুষদের জন্য৷ আমি ক’দিন থাকতে চাই এখানে৷’
লোকটা বলল, ‘আমেরিকা! কিন্তু তুমি সাদাও নও, কালোও নও৷ কোন দেশের মানুষ তুমি?’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘ইন্ডিয়ান’৷ কাজের সূত্রে আমেরিকায় থাকি৷’
ইতিমধ্যে লোকটার অন্য সঙ্গীরাও তার পাশে এসে দাঁড়াল৷ মৃগাঙ্কর জবাবে লোকটা কী বুঝল কে জানে নৌকোতে রাখা বস্তাগুলো দেখিয়ে বিজাতীয় ভাষায় তার সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলে নিয়ে মৃগাঙ্ককে বলল, ‘আমার নাম ম্যাকাও৷ আমাদের গ্রামের মাথা আমি৷ তুমি যখন থাকবে বলে এসেছ তখন থাকতে দিতে আপত্তি নেই আমাদের৷ তবে আমাদের কোনও ব্যাপারে নাক গলালে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের জলে নামিয়ে দেব৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘তোমাদের কোনও ব্যাপারে আমি নাক গলাব না৷ আমি শুধু এই সুন্দরদ্বীপে ক’দিনের জন্য ঘুরে-বেড়াতে এসেছি৷’
ম্যাকাও বলল, ‘হ্যাঁ, কথাটা মনে থাকে যেন৷’ এর পর লোকটা তার সঙ্গীদের নির্দেশ দিল নৌকো থেকে জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে নেবার জন্য৷ সেসব সমেত মৃগাঙ্ককে নিয়ে দলটা বালুতট পেরিয়ে চলল নারকেলগাছের আড়ালে-থাকা তাদের গ্রামের দিকে৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামে পৌঁছে গেল তারা৷ নারকেলগাছের পাতায় ছাওয়া কুড়ি-পঁচিশটা কুঁড়েঘর দাঁড়িয়ে আছে বৃত্তাকার একটা ফাঁকা জায়গার মাঝখানে৷ ঘরগুলোর সামনে খুঁটির মাথায় হাঙরের দাঁতসুদ্ধ চোয়াল, বিভিন্ন পশু-পাখির মাথা ইত্যাদি দিয়ে সাজানো৷ ছাগল, শূকরসহ বেশ কিছু গবাদি পশু আছে গ্রামে৷ আর আছে ছোট আকৃতির অনেক বানর৷ এক জায়গাতে স্তূপাকৃত প্রচুর নারকেল রাখা আছে৷ তার ওপর লাফালাফি করছে তারা৷
মৃগাঙ্ককে নিয়ে লোকগুলো গ্রামে প্রবেশ করতেই কিছু নারীও বেরিয়ে এল কুটির ছেড়ে৷ কয়েকজন শিশুও আছে তাদের সঙ্গে৷ বিভিন্নবয়সি সেসব নারীরাও চামড়ার পোশাকে সজ্জিত৷ গলা থেকে ঝুলছে নানা ধরনের পাথরের মালা, মাথায় গোঁজা নানা রঙের পাখির পালক৷ মৃগাঙ্ক খেয়াল করেছে প্যারাকিট অর্থাৎ টিয়া প্রজাতির নানা বড় বড় পাখি আছে এ-দ্বীপে৷ নানা রঙের পাখি৷ নারকেলগাছগুলোর মাথায় ওড়াউড়ি করছে তারা৷
মৃগাঙ্ককে নিয়ে লোকগুলো উপস্থিত হল একটা কুঁড়েঘরের সামনে৷ তারপর তাকে নিয়ে কুঁড়েঘরের ভিতরে ঢুকল ম্যাকাও৷ খড়ের বিছানা আছে সেখানে৷ একটা জলের পাত্রও আছে৷ ম্যাকাও বলল, ‘এই তোমার থাকার জায়গা৷ দু-বেলা তোমার খাবার দিয়ে যাবে আমাদের লোকেরা৷ তবে তোমাকে নিয়ে দ্বীপ দেখাতে পারবে না কেউ৷ আমরা এখন খুব ব্যস্ত৷ তোমাকে নিজে নিজেই ঘুরে বেড়াতে হবে৷ তবে একটু সাবধানে বেড়িও৷ দ্বীপে কিন্তু প্রচুর সাপ আছে৷’
মৃগাঙ্ককে ঘরে রেখে এরপর লোকগুলো চলে গেল সে-জায়গা ছেড়ে৷
মৃগাঙ্ক সামান্য কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ঘর ছেড়ে৷ সূর্য ডুবতে আরও বেশ কিছু সময় বাকি আছে৷ প্রথমে ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরগুলোর মাঝখানে ফাঁকা জমিটাতে এসে দাঁড়াল সে৷ নারী-শিশুর দলও এখন বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে৷ কয়েকজন আরওয়াক রমণী ফাঁকা জমিটার মাঝখানে বাঁশ-ডালপালার কাঠামো দিয়ে মঞ্চ তৈরির কাজ করছে৷ মৃগাঙ্ক পায়ে পায়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল৷ তারপর একজনকে প্রশ্ণ করল, ‘এখানে কী হবে?’
মেয়েটা জবাব দিল, ‘দেবী মেডুসার উৎসবের মঞ্চ বাঁধা হচ্ছে৷ আর কদিন পরই দেবীর পুজো আছে৷’
মৃগাঙ্ক এরপর জানতে চাইল, ‘গ্রামের পুরুষরা সব কোথায় গেল?’
মেয়েটা নারকেল বনের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওই যে ওদিকে৷’
মৃগাঙ্ক তার কথা শুনে হাঁটতে শুরু করল সেদিকে৷ নারকেল বনের ভিতরে ঢুকে কিছুটা তফাতেই একটা ভাঙা কুটির চোখে পড়ল তার৷ যদি লোকগুলোকে সেখানে পাওয়া যায়, কোনও তথ্য সংগ্রহ করা যায় তাই ঘরটার দিকে এগোল সে৷ পাতায় ছাওয়া ঘরটার একটা জানলা আছে৷ সে জানলা দিয়ে ঘরের ভিতর উঁকি দিল মৃগাঙ্ক৷ ম্যাকাও সহ গ্রামের পুরুষ মানুষেরা সমবেত হয়েছে সেখানেই৷ তবে ম্যাকাও ছাড়া অন্যদের উর্দ্ধাঙ্গে কোনও পোশাক নেই৷ সবল চেহারার লোকগুলো খালি গায়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে৷ ম্যাকাও একটা লোকের দেহের ওপর ঝুঁকে পড়ে কী যেন পরীক্ষা করছে৷ দাঁড়িয়ে-থাকা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ-ই যেন কী একটা অদ্ভুত ব্যাপার ধরা পড়তে যাচ্ছিল মৃগাঙ্কর চোখে৷ কিন্তু সে ভালো করে ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই ম্যাকাও মুখ তুলে তাকাল জানলার দিকে৷ মৃগাঙ্ককে দেখতে পেয়ে সে বলল, ‘তুমি এখানে কেন?’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘তোমাদের সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলতে এলাম৷’
জবাব শুনে ম্যাকাও একটু রুক্ষভাবে বলল, ‘আমরা এখন ব্যস্ত আছি৷ তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই৷ তুমি নিজের মতো ঘুরে বেড়াও৷’
এরপর আর কোনও কথা চলে না৷ কাজেই মৃগাঙ্ক এগোল অন্যদিকে৷ দ্বীপের চারপাশে শুধু নারকেলগাছ৷ কোনও কোনও গাছের গায়ে বিরাট বিরাট পাতালা উদ্ভিদ নাগপাশের মতো গুঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নারকেল পাতার সঙ্গে মিলেমিশে মাথার ওপর পাতার জটলা সৃষ্টি করেছে৷ সমুদ্র বাতাসে দুলছে গাছের মাথাগুলো৷ মাঝে মাঝে গাছগুলোর ফাঁকগুলো
দিয়ে চোখে পড়ছে উন্মুক্ত তটরেখা, আর তার বুকে আঁছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউ৷
ঘণ্টাখানেক একা একা ঘুরে বেড়াবার পর আবার গ্রামের ভিতর প্রবেশ করল সে৷ ম্যাকাওসহ গ্রামের পুরুষরা সবাই আবার গ্রামে ফিরে এসেছে৷ একটা ঘরের সামনে কী ব্যাপারে যেন উত্তেজিতভাবে জটলা করছে তারা৷ আর এর পরই মৃগাঙ্ক দেখল, একটা লোককে যেন জোর করেই ঘরের মধ্যে ঠেলে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে খিল উঠিয়ে দিল তারা৷ মৃগাঙ্ক ব্যাপারটা দেখে একটু থমকে দাঁড়ালেও সেদিকে এগোল না৷ এটা ওদের নিজস্ব কোনও ঝামেলা হবে হয়তো৷ মৃগাঙ্কর ব্যাপারটাতে মাথা গলিয়ে লাভ নেই৷ সে এগোল নিজের ঘরের দিকে৷
কিন্তু ঘরের ভিতর ঢুকেই চমকে উঠল সে৷ জানলা দিয়ে একদল বাঁদর ঢুকেছে ঘরের ভিতর৷ ব্যাগগুলোর চেন খুলে গেছিল মৃগাঙ্ক৷ খাবারের সন্ধানে ব্যাগ থেকে জিনিসপত্র বের করে লন্ডভন্ড করছে বাঁদরের দল৷ মৃগাঙ্ক ঘরে ঢুকতেই প্রাণীগুলো ভয় পেয়ে দুড়দাড় করে লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল৷ মৃগাঙ্কর সঙ্গে-আনা কয়েকটা শুকনো খাবারের প্যাকেটও নিয়ে গেল তারা৷ মৃগাঙ্ক আর বাইরে বেরোল না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামল দ্বীপে৷ এখানে আলোর কোনও ব্যবস্থা নেই৷ মৃগাঙ্ক একটা মোম জ্বালালো৷ অন্ধকার নামার কিছুক্ষণ পর একজন লোক এসে খাবার দিয়ে গেল৷ আটার মণ্ড আর ঝলসানো মাছ৷ খাওয়া সেরে খড়ের বিছানায় শুতেই পথশ্রমের ক্লান্তিতে ঘুম নেমে এল তার চোখে৷ ঘুমিয়ে পড়ল সারা গ্রামটাও৷
ভোরের দিকে হঠাৎ-ই একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মৃগাঙ্কর৷ গ্রামের কোনও একটা ঘর থেকে যেন তীব্র আর্তনাদ ভেসে আসছে৷ জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে দেখল, আকাশে শুকতারা ফুটে উঠেছে৷ বাইরে থেকে ভেসে আসা সেই আর্তনাদ শুনতে শুনতে আলো ফোটার প্রতীক্ষা করতে লাগল সে৷
আকাশ একটু পরিষ্কার হতেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল মৃগাঙ্ক৷ সেই আর্তনাদ তখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে৷ মৃগাঙ্ক দেখতে পেল গতকালের সেই ঘরটার সামনে ভিড় করেছে গ্রামের পুরুষরা৷ অস্পষ্ট একটা আর্তনাদ মাঝে মাঝে ভেসে আসছে সেখান থেকে৷ এবার আর কৌতূহল দমন করতে না পেরে মৃগাঙ্ক এগিয়ে গেল সেদিকে৷ ঘরের দরজাটা এখন খোলা৷ আর তার ঠিক বাইরে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে একটা লোক৷ মুখ দিয়ে গাঁজলা উঠছে৷ মৃদু আর্তনাদ করছে লোকটা৷ মৃগাঙ্ক ভিড়ের মধ্যে ম্যাকাওকে দেখে প্রশ্ণ করল, ‘এ লোকটার, কী হয়েছে?’
প্রশ্ণটা শুনে ম্যাকাও ইশারায় কিছুটা তফাতে একটা জিনিসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাল মৃগাঙ্কর৷ সেখানে মাটির সঙ্গে কোঁচ দিয়ে গাঁথা একটা সাপ৷ এ-লোকটাকে সাপে কেটেছে৷ সম্ভবত ঘরেই ছিল কালো রঙের অচেনা সামুদ্রিক সাপটা৷ আর সে ঘর থেকে পালাবার সময় তাকে কোঁচ দিয়ে মারা হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই৷ কথাবার্তার মাধ্যমে মৃগাঙ্ক জানতে পারল এ-লোকটার নাম প্যারোট৷ বিশেষ কারণবশত তাকে এঘরে আটকে রাখা হয়েছিল৷ ভোররাতে তাকে সাপে কাটে৷ সাপের কামড়টাও দেখতে পেল মৃগাঙ্ক৷ লোকটার বাঁম হাতের পাতার ওপর জেগে আছে সর্পদংশনের চিহ্ণ৷ দুটো লাল বিন্দু৷ এখনও লোকটা জ্ঞান হারায়নি৷ শুধু আতঙ্কিত বিষ্ফারিত চোখে অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আর অস্পষ্ট আর্তনাদ করছে৷
মৃগাঙ্ক বলল, ‘আমার কাছে সাপের কামড়ের ইঞ্জেকশন আছে৷ একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক একে বাঁচানো যায় কিনা?’
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাকাও বলল, ‘দেখো দেখো ওকে বাঁচাতে পারো কিনা? ও মারা গেলে দেবীর উৎসব করা যাবে না৷ তাহলে ভয়ঙ্কর কাণ্ড হবে৷ সমুদ্রে মাছ পাওয়া যাবে না, না-খেয়ে মরব আমরা৷ অথবা জলোচ্ছ্বাসে দ্বীপ ভেসে মারা যাব সবাই৷’
মৃগাঙ্ক খেয়াল করল আশেপাশের লোকজনের চোখে কেমন যেন ভয়ার্ত ভাব ফুটে উঠেছে৷ আর কথা না-বাড়িয়ে মৃগাঙ্ক ছুটল তার কুঁড়ের দিকে, ভেনস অ্যাম্পুল আর সিরিঞ্জ আনার জন্য৷ জিনিসগুলো নিয়ে মৃগাঙ্ক আবার হাজির হল সে-জায়গাতে৷ ইতিমধ্যে লোকটা যেন আরও নিস্তেজ হয়ে পড়েছে৷ লোকটাকে প্রথমে ধরাধরি করে আবার ঘরের ভিতর নিয়ে খড়ের বিছানায় শোয়ানো হল৷ মৃগাঙ্ক ইঞ্জেকশন দিল লোকটাকে৷ তারপর লোকটার চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে সবাই প্রতীক্ষা করতে লাগল সে-ইঞ্জেকশন কোনও কাজ দিয়েছে কিনা দেখার জন্য৷
বাইরে সূর্যদেব আকাশে উঠতে শুরু করলেন৷ সময় এগিয়ে চলল৷ খুব দামি ইঞ্জেকশন৷ কিন্তু তবুও যেন আস্তে আস্তে আরও নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগল লোকটা৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গে যেন আরও বেশি ভয়ার্ত ভাব ফুটে উঠতে লাগল দাঁড়িয়ে-থাকা লোকগুলোর চোখেমুখে৷ ম্যাকাওয়ের অসংখ্য বলিরেখাময় মুখমন্ডল যেন দুশ্চিন্তায় আরও বেশি কুঞ্চিত হতে লাগল৷ ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেল৷ প্যারোট নামের লোকটাকে তখন যেন একদম নিস্পন্দ মনে হচ্ছে৷ মৌনতা ভঙ্গ করে একটা লোকের উদ্দেশ্যে ম্যাকাও বলল, ‘শার্ক, ওর নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখো৷’
দেখল লোকটা৷ তারপর ভয়ার্তভাবে বলল, ‘প্যারোটের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে!’
মৃগাঙ্ক নিজে ডাক্তার নয়৷ তবে লোকটার দেহ পরীক্ষা করে তারও যেন মনে হল লোকটা মারা গেছে৷ শ্বাস পড়ছে না, চোখের মণি স্থির৷ বুকের ধুকপুকানিও যেন থেমে গেছে৷’
মাথার থেকে টুপি খুলে ম্যাকাও বলল, ‘আমারও মনে হচ্ছিল প্যারোট আর বাঁচবে না৷ ও-সাপ কামড়ালে কাউকে কোনভাবে বাঁচানো যায় না৷’
কথাটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে একজন লোক আতঙ্কিতভাবে বলে উঠল ‘তবে কি দেবী মেডুসার পুজো বন্ধ হবে অলঙ্কারের অভাবে?’
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে রইল ম্যাকাও৷ প্রবল দুশ্চিন্তা গ্রস্থ তার মুখ৷ তারপর সে ঘরের অন্যান্য আতঙ্কগ্রস্থ মুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলো, প্যারোটের দেহটাকে সমুদ্রর পারে রেখে আসা যাক৷ সমুদ্র ভাসিয়ে নিয়ে যাক ওর দেহ৷’
কিছুক্ষণের মধ্যেই ধরাধরি করে প্যারোটের দেহটা ঘর থেকে বের করা হল৷ ইতিমধ্যে গ্রামের নারী-শিশুরাও ভিড় জমিয়েছিল ঘরের বাইরে৷ মৃতদেহটা দেখেই যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল তাদের মুখ৷ একজন বয়ঃজ্যেষ্ঠা নারী হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠল ‘মেডুসা মেডুসা’ বলে৷ তারপর সবাই যেন কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেল৷ এক অখণ্ড নীরবতা নেমে এল চারপাশে৷
প্যারোটের মরদেহ নিয়ে ম্যাকাওয়ের নেতৃত্বে গ্রামের পুরুষরা এগোল সমুদ্রের দিকে৷ আর মৃগাঙ্ক ফিরে চলল তার কুঁড়ের দিকে৷ এখানে এসেই যে তাকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তা সে ভাবেনি৷ সে ভাবতে লাগল, লোকটার মৃত্যুর জন্য যদি মেডুসার পুজো বন্ধ হয়ে যায় তবে তার এখানে আসাটাই হয়তো পন্ড হবে৷
ঘরে ঢুকে সে ব্যাপারটা ভাবতে লাগল৷ হঠাৎ একটা লোকের বক্তব্যও তার মনে এল৷ লোকটা বলছিল যে অলঙ্কারের অভাবে দেবী মেডুসার পুজো বন্ধ হবে? তাহলে কি যে লোকটা মারা গেল সে-ই দেবীর অলঙ্কার সংগ্রহ করত? অলঙ্কার মানে কি সেই মুক্তো, যার সন্ধান করতে এ-দ্বীপে ছুটে এসেছে মৃগাঙ্ক৷ একটা ব্যাপার মৃগাঙ্ক ম্যাকাও আর তার সঙ্গীদের কথোপকথনে বুঝতে পেরেছে যে, প্যারোট নামের লোকটার মৃত্যুতে এরা যতটা না শোকাহত তার থেকে অনেক বেশি আতঙ্কিত লোকটার মৃত্যুতে দেবী মেডুসার পুজো বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে৷
আরও সময় এগিয়ে চলল৷ বেলা দশটা নাগাদ মৃগাঙ্কর আর ঘরে থাকতে ভালো লাগল না৷ পরিস্থিতি বোঝার জন্য ঘর থেকে বেরোল সে৷ বাইরে বেরিয়েই সে দেখতে পেল সর্দার ম্যাকাও আর তার সেই অনুচর শার্ক এগিয়ে আসছে তার ঘরের দিকে৷ তারা এসে মৃগাঙ্কর মুখোমুখি দাঁড়াল৷ ম্যাকাও, মৃগাঙ্কর উদ্দেশ্যে বলল, ‘প্যারোটকে সমুদ্রের পাড়ে রেখে আসা হয়েছে৷ এতক্ষণে হয়তো সমুদ্রের জল ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার দেহ৷ আমরা মৃতর অন্তিমকাজ এভাবেই সম্পন্ন করি৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘ব্যাপারটা খুব দুর্ভাগ্যজনক৷ তোমাদের আমার সমবেদনা জানাচ্ছি৷’
ম্যাকাও বলল, ‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা দুর্র্ভগ্যজনক তো বটেই৷ দেবীর পুজো যদি বন্ধ হয় তবে দুর্যোগ নেমে আসবে আমাদের ওপর৷ তাছাড়া তুমি যার খোঁজে এসেছ, দেবীর গলার সেই মুক্তোমালাটাও তোমার দেখা হবে না৷’
ম্যাকাওয়ের শেষ কথাটাতে চমকে গেল মৃগাঙ্ক৷ সে জানল কী করে যে, সে ওই মেডুসার মুক্তোর সন্ধানে এসেছে?’
এ-প্রশ্ণের জবাব অবশ্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মৃগাঙ্ক পেয়ে গেল৷ ম্যাকাও তার পোশাকের মধ্যে থেকে একটা ছেঁড়া, দোমড়ানো কাগজের টুকরো বের করে এগিয়ে দিল মৃগাঙ্কর হাতে৷ নিক্সনের দেওয়া মুক্তোমালা- শোভিত মেডুসা-সাজা সেই আরওয়াক রমণীর ফটোগ্রাফ৷ যা ছিল তার ব্যাগের মধ্যে! জিনিসটা যে খোয়া গেছিল তা বুঝতে পারেনি মৃগাঙ্ক৷
ছবিটা মৃগাঙ্কর হাতে তুলে দিয়ে ম্যাকাও বলল, ‘আমরা যে বাঁদরগুলোকে দিয়ে নারকেল পাড়াই তারা তোমার ঘরে ঢুকে এ-ছবিও নিয়ে গেছিল৷ একটা বাঁদর চিবুচ্ছিল এটা৷ তার থেকে এটা একজন গতকাল সন্ধ্যাতে উদ্ধার করে আমাকে দেয়৷ আর কদিন পরেই দেবীর পুজো আমার একটা সন্দেহ প্রথমেই হয়েছিল যে, হঠাৎ তুমি এসময় উপস্থিত হলে কেন? ছবিটা দেখার পর ব্যাপারটা স্পষ্ট হল আমার কাছে৷ দেবী মেডুসার মুক্তোমালার সন্ধানেই তুমি এখানে এসেছ৷ নইলে এ-ছবি তোমার কাছে থাকবে কেন? আমি ঠিক বলছি কিনা বলো?’
ম্যাকাওয়ের কথা শুনে কী জবাব দেবে তা বুঝতে না পেরে মৃগাঙ্ক তাকিয়ে রইল ম্যাকাওয়ের দিকে৷ আবছা হাসি ফুটে উঠেছে ম্যাকাওয়ের মুখে৷ ধরা পড়ে গেছে মৃগাঙ্ক৷
বেশ কয়েক মুহূর্তের নীরবতা৷ ম্যাকাও তার পর বলল, ‘তোমাকে একটা কথা বলি, দেবীর পুজো বন্ধ হোক আমরা তা কিছুতেই চাই না৷ আর তুমিও নিশ্চই ওই মুক্তো কোথায় পাওয়া যায় সে-রহস্য থেকে বঞ্চিত হতে চাও না৷ তুমি যদি চাও তবে সে-সন্ধান তুমি পেতে পারো৷’
কথাটা শুনে মৃগাঙ্ক এবার বলল, ‘কীভাবে?’
ম্যাকাও বলল, ‘মেডুসা দেবীর পুজোর প্রধান উপচার তাঁর কণ্ঠশোভিত ওই মুক্তোছড়া৷ ওই মুক্তোমালায় স্বজ্জিত না করলে দেবীর পূজো হবে না৷ সমুদ্রর গভীরে এক গোপন জায়গাতে গিয়ে সে-মুক্তো সংগ্রহ করি আমরা৷ তুমি যদি আমাদের সঙ্গে গিয়ে সেই মুক্তো আহরণে সহায়তা করো তবে তোমার আমার দুজনের-ই কাজ হয়৷ যাবে আমাদের সঙ্গে?’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘হ্যাঁ, যাব৷ কখন যেতে হবে?’
ম্যাকাও বলল, ‘এখনই রওনা হতে হবে৷ আজ সূর্যোদয়ের পরই যাত্রা শুরু করার কথা ছিল আমাদের৷ কিন্তু প্যারোটের মৃত্যুটা সব গোলমাল করে দিল৷ মুক্তো আহরণে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা ছিল তার৷ সে কাজটা তোমাকেই করতে হবে৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘ঠিক আছে আমি রাজি৷’
কিছুক্ষণের মধ্যেই ম্যাকাও আর তার অনুচর শার্কের সঙ্গে গ্রাম ছাড়ল মৃগাঙ্ক৷ নারকেল বন অতিক্রম করে সমুদ্রের পাড়ে এসে উপস্থিত হল তিনজন৷ একটা বেশ বড় পালতোলা নৌকা ভাসছে সমুদ্রর জলে৷ শনে ছাওয়া কাঠের বেশ কয়েকটা ঘরও আছে নৌকোতে৷ মৃগাঙ্ক ও-নৌকো আগে দেখেনি৷ জল ভেঙে নৌকোতে ওঠার জন্য এগোতে এগোতে সমুদ্রতটের একটা জায়গার দিকে তাকিয়ে ম্যাকাও বলল, ‘ওখানেই প্যারোটের মৃতদেহটা রাখা হয়েছিল৷ এখন দেখছি না৷ সমুদ্র ভাসিয়ে নিয়ে গেছে দেহটা৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘তোমরা লোকটাকে ঘরে আটক করেছিলে কেন?’
আরওয়াক দলপতি জবাব দিল, ‘ওকে নিয়ে আজ আমাদের সমুদ্রে ভাসার কথা ছিল৷ কিন্তু ও রাজি হচ্ছিল না৷ ভেবেছিলাম সারারাত ওকে আটকে রাখলে হয়তো মত পরিবর্তন করবে৷ শেষ পর্যন্ত কিন্তু ও নিজেকে বাঁচাতে পারল না৷ দেবী মেডুসার মুক্তো সংগ্রহের কাজে রাজি না-হওয়ায় হয়তো দেবী মেডুসার অভিশাপেই মৃত্যু হল তার৷’
জল ভেঙে নৌকোতে উঠল মৃগাঙ্করা৷ নোঙর হিসেবে একটা ভারী পাথরখণ্ড মোটা কাছি দিয়ে জলে ফেলা ছিল৷ ম্যাকাও আর শার্ক মিলে সেটা ওপরে টেনে তুলল৷ মৃগাঙ্কদের নৌকো ভেসে পড়ল সমুদ্রর জলে৷
মৃগাঙ্ক খেয়াল করল, তাদের নৌকোটার সঙ্গে নারকেলগাছের গুড়ির মধ্যে গর্ত করে তৈরি একটা ছোট কালো জাতীয় নৌকোও কাছি দিয়ে বাঁধা৷ সেটাও সমুদ্রের ঢেউ-এ দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল বড় নৌকোটার সঙ্গে৷ সমুদ্রর বাতাস পাল ঠেলে নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্যারিবিয়ান সাগরের গভীরে৷ দাঁড় বাইতে হচ্ছে না৷ শুধু হাল ধরে বসে আছে শার্ক৷ আর তার পাশে বসে ম্যাকাও৷
মৃগাঙ্ক গিয়ে বসল তাদের কিছুটা তফাতে এক জায়গাতে৷ চারপাশে তাকিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল কোনদিকে যাচ্ছে৷ প্রথম অবস্থায় তার চোখে পড়তে লাগল ছোট-বড় নানা দ্বীপ৷ কিন্তু আস্তে আস্তে সেসব দ্বীপ হারিয়ে যেতে লাগল তার চোখের আড়ালে৷ গভীর থেকে গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করতে লাগল নৌকো৷ মৃগাঙ্ক একবার ম্যাকাওকে জিগ্যেস করল, ‘আমরা কোনদিকে যাচ্ছি?’
ম্যাকাও শুধু জবাব দিল, ‘দেবী মেডুসার ইচ্ছায় বাতাস আমাদের যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকে৷’
জবাব শুনে মৃগাঙ্ক বুঝতে পারল, এব্যাপারে এখনই কিছু বলতে রাজি নয় এই আরওয়াক৷
সূর্য ঠিক মাথার ওপর পৌঁছল৷ এগিয়ে চলল নৌকো৷ খোলা জায়গাতে বাতাস থাকলেও সূর্যের তাপে গরম লাগতে শুরু করল মৃগাঙ্কর৷ তাছাড়া সমুদ্রের জলে সূর্যরশ্মির প্রতিফলনও চোখে পীড়া দিচ্ছে৷ তার থেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত হতে নৌকোর ঘরগুলোর মধ্যে গিয়ে ঢুকল মৃগাঙ্ক৷ ছোট কাঠের ঘরগুলোর মধ্যে কিছু নেই, শুধু একটা ঘরের মধ্যে লম্বা একটা টেবিল আছে৷ সেটা আবার মেঝের সঙ্গে পেরেক পুঁতে আটকানো৷ টেবিলটা দেখে তার ওপরই শুয়ে পড়ল সে৷ নৌকার দুলুনিতে অনিচ্ছাকৃতভাবেই ঘুম নেমে এল তার চোখে৷
একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে যখন মৃগাঙ্কর ঘুম ভাঙল তখন ঘণ্টা তিনেক সময় কেটে গেছে৷ মৃগাঙ্ক তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এল৷ সামনে একটা বালির চর৷ সেখানেই নোঙর ফেলা হয়েছে৷ আর তার ঝাঁকুনিতেই ঘুম ভেঙেছে মৃগাঙ্কর৷
এ কোন জায়গা? এখানেই কি তবে মুক্তো পাওয়া যায়?
মৃগাঙ্কর সঙ্গে চোখাচোখি হল ম্যাকাওয়ের৷ তার মনের ভাব পাঠ করেই যেন ম্যাকাও বলল, ‘হ্যাঁ, এটাই সেই জায়গা, যেখান থেকে মেডুসার মুক্তো সংগ্রহ করে নিয়ে যাব আমি৷’
মৃগাঙ্ক আকাশের দিকে তাকিয়ে জায়গাটার অবস্থান বোঝার চেষ্টা করতে লাগল৷
শার্ক নামের লোকটা নৌকোর পাটাতনের কাঠ সরাল৷ তার ভিতর থেকে একে একে বের করতে লাগল ছুরি, দড়ি এসব৷ মৃগাঙ্ক ভাবল এবার নিশ্চয়ই সমুদ্রের তলায় নেমে ঝিনুক তোলার প্রস্তুতি শুরু হল৷ যে ঝিনুকে অত বড় মুক্তো থাকে সে ঝিনুকগুলোও নিশ্চয়ই বেশ বড়ই হবে৷ কিন্তু নৌকোর খোল থেকে সব শেষে যে-জিনিসটা টেনে বের করল তা দেখে একটু অবাক হল মৃগাঙ্ক৷ সেটা হারপুনের মতো একটা অস্ত্র! মৃগাঙ্ক, ম্যাকাওকে প্রশ্ণ করল, ‘হারপুন দিয়ে কী হবে?’
জবাবে ম্যাকাও আঙুল তুলে দেখাল জলের দিকে৷ সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল মৃগাঙ্ক৷ ব্যাপারটা এতক্ষণ সে খেয়াল করেনি৷ বালির চরা সংলগ্ণ সমুদ্রে, নৌকোর আশেপাশে পাক খাচ্ছে ক্যারিবিয়ান সাগরের বিখ্যাত গ্যালানো হাঙরের ঝাঁক! আকারে ছোট হলেও এই হাঙরের দাঁত অতি মারাত্মক ধারালো আর তীক্ষ্ন৷ এক কামড়ে এরা যে-কোনও মানুষকে দু-টুকরো করে ফেলতে পারে৷ এ সমুদ্রে নামা মানেই নির্ঘাত মৃত্যু৷
মৃগাঙ্কর চোখে বিস্ময়ের ভাব লক্ষ করে ম্যাকাও বলল, ‘মুক্তো সংগ্রহ করার জন্য আগে আমাদের হাঙর মারতে হবে একটা৷ এটাই রীতি৷’ কিছুক্ষণের মধ্যেই হার পুণে দড়ি পড়াল শার্ক৷ তারপর হাঙরগুলোকে দেখে নিয়ে হারপুন ছুড়ল নৌকোর পাশে ঘোরা একটা হাঙরকে লক্ষ্য করে৷ অব্যর্থ লক্ষ্য৷ হাঙর মারার নৈপুন্যের জন্যই হয়তো বা লোকটার নাম শার্ক হবে৷ দড়ি-টেনে হারপুনবিদ্ধ, হাঙরটাকে নৌকোয় তুলে ফেলল শার্ক৷ হাঙরের ফাঁক-করা মুখের ভিতর জেগে আছে সার সার তীক্ষ্ন বীভৎস দাঁতগুলো৷ কী ভয়ঙ্কর দাঁত! হাঙরটাকে নৌকোয় তোলার পর শার্ক একটা বড় ছুরি দিয়ে হাঙরের মাথাটা কেটে রেখে দেহটা ছুড়ে ফেলল জলে৷ স্বজাতীয় মাংস ছিড়ে খাবার জন্যই মেতে উঠল হাঙরগুলো৷
তাই দেখে মৃগাঙ্ক বলল, ‘এখান থেকে মুক্তো কীভাবে সংগ্রহ করবে? কীভাবে জলে নামবে?’
তার কথা শুনে ম্যাকাও বলল, ‘ও মুক্তো সংগ্রহ করা হবে চাঁদ ওঠার পর৷ তখন সব কিছু শান্ত হয়ে যাবে৷’
শার্ক নামের লোকটা হাঙরের কাটা-মাথাটা নিয়ে এরপর তার কাজ শুরু করল৷ মৃগাঙ্ক দেখল, লোকটা একটা ছুরি দিয়ে হাঙরের মারাত্মক দাঁতগুলো চোয়াল থেকে খুলে একটা পাত্রে রাখছে৷ সেগুলো দিয়ে কি হবে তা ঠিক বুঝতে পারল না মৃগাঙ্ক৷ সময় এগিয়ে চলল৷ বিকেল হয়ে গেল, তারপর একসময় সমুদ্রের বুকে লাল আবীর গুলে সূর্যদেব বিদায় নিতে বসলেন৷ ম্যাকাও, মৃগাঙ্ককে বলল, ‘এবার আপনি বিশ্রাম নিন৷ মুক্তো সংগ্রহ করার সময় আপনাকে ডাকব৷’
ঘরে ঢুকে টেবিলটার ওপর বসল মৃগাঙ্ক৷ কিছুক্ষণ পর শার্ক একটা পাত্রে ডালের মতো কিছুটা তরল খাবার দিয়ে গেল৷ মৃগাঙ্ক পাত্রটা নিয়ে একটা চুমুক দিল তাতে৷ দ্বিতীয় চুমুক যখন সে দিতে যাচ্ছে ঠিক তখনই যেন একটা প্রচণ্ড চপেটাঘাত হল তার গালে৷ তার হাত থেকে ছিটকে পড়ল বাটিটা৷ ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল মৃগাঙ্কর৷ তারপরই সে দেখল, ঘরের মেঝের খড়ের ওপর পড়ে ছটফট করছে একটা উড়ুক্কু মাছ৷ জল থেকে উড়ে খোলা জানলা দিয়ে ভিতরে ঢুকে সেটা আছড়ে পড়েছিল মৃগাঙ্কর গালে৷ মৃগাঙ্ক মাছটাকে তুলে নিয়ে আবার জলে ফেলে দিল৷ কেমন যেন ঘুম পাচ্ছে মৃগাঙ্কর৷ টেবিলটার ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল সে৷
মৃগাঙ্কর যখন হুঁশ ফিরল তখন খোলা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি পড়ল তার৷ চাঁদ উঠে গেছে অনেকক্ষণ৷ তবে মাঝে মাঝে তা ঢেকে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে৷ বেশ বাতাসও বইছে৷ মাঝে মাঝেই ঢেউয়ের আঘাতে নৌকাটা দুলছে৷ মৃগাঙ্কর মনে পড়ল, ম্যাকাও বলেছিল চাঁদ উঠলে মুক্তো সংগ্রহ করবে তারা৷ কথাটা মনে হতেই তাড়াতাড়ি উঠে বসতে যাচ্ছিল মৃগাঙ্ক৷ কিন্তু পারল না৷ আর এরপরই মৃগাঙ্ক বুঝতে পারল তার শরীরটা টেবিলের সঙ্গে দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা! কী হল ব্যাপারটা? সে আঁধো-অন্ধকার ঘরের চারপাশে তাকিয়ে ম্যাকাওকে ডাকতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা মশাল হাতে তার সঙ্গীকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল ম্যাকাও৷ তার সঙ্গী শার্কের হাতে ধরা থালার মতো একটা পাত্র৷
মৃগাঙ্ক তাকে দেখে বলে উঠল, ‘আমাকে কে বেঁধেছে? কেন?’
হাসল ম্যাকাও৷ তারপর ধীরেসুস্থে হাতের মশালটা কাঠের দেওয়ালের গায়ে এক জায়গাতে গুঁজে বলল, ‘তোমার জ্ঞান ফিরে গেছে দেখছি! খাবারটা তাহলে পুরোটা খাওনি তুমি৷ যা হোক, তাতে আমার কাজের তেমন অসুবিধে হবে না৷’
মৃগাঙ্ক আবার বলে উঠল, ‘আমাকে বেঁধে রেখেছ কেন?’
ম্যাকাও বলল, ‘তোমাকে তো বলেইছিলাম চাঁদ উঠলে মুক্তো সংগ্রহ করব আমরা৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘তার সঙ্গে আমাকে বেঁধে রাখার সম্পর্ক কী? তোমরা কি আমাকে সে-ব্যাপারটা দেখতে দিতে চাও না?’
ম্যাকাও অদ্ভুত হেসে বলল, ‘তুমি কতদূর থেকে ছুটে এসেছ মেডুসার মুক্তো কীভাবে কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয় তা জানার জন্য৷ সেটা কি তোমাকে আমি না জানিয়ে পারি? আর একটু পরেই তুমি জেনে যাবে ব্যাপারটা৷ অবশ্য ফিরে গিয়ে তুমি অন্যদের ব্যাপারটা সম্বন্ধে জানাতে পারবে কিনা তা আমার জানা নেই৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘তার মানে?’
ম্যাকাও আর শার্ক কিছুটা এগিয়ে এল মৃগাঙ্কর কাছে৷ তাদের দুজনের মুখেই কেমন যেন একটা হিংস্র ভাব ফুটে উঠেছে৷ ম্যাকাও হিসহিস করে বলে উঠল, ‘ব্যাপারটা জানার জন্য খুব শখ ছিল তোমাদের৷ যাতে কোটি কোটি ডলার কামাতে পারো তোমরা৷ এবার তোমাকে জানাচ্ছি ব্যাপারটা৷ এ-মুক্তো সত্যি সংগ্রহ করা হয় মানুষের পেট থেকে৷ তোমার পেট থেকেও আমি সংগ্রহ করব ওই মুক্তো৷ দাঁতগুলো কী ধারালো দেখেছ? তোমার পেট চেরার সময় তোমার মালুম-ই হবে না’—এই বলে সে শার্কের হাতে-ধরা প্লেটটা দেখাল৷
মৃগাঙ্ক দেখল সেই প্লেট বা থালার ওপর সার্জিকাল নাইফের মতো সুন্দরভাবে সাজানো আছে হাঙরের তীক্ষ্ন বাঁকানো দাঁতগুলো৷ বড় থেকে ছোট নানা আকৃতির দাঁত৷
সেগুলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মৃগাঙ্ক আতঙ্কে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘তোমরা কি পাগল হয়ে গেছ? মানুষের পেটে কখনও মুক্তো পাওয়া যায়?’
ম্যাকাও প্লেট থেকে বেশ বড় একটা দাঁত তুলে নিয়ে সেটাকে ঠিক যেভাবে ব্লেড ধরে তেমনভাবে ধরল ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে৷ ব্লেডের থেকেও ধারালো হাঙরের বাঁকানো দাঁত৷ সেটাকে একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিয়ে সে বলল, ‘না, পাগল হইনি৷ ব্যাপারটা তুমি এখন-ই বুঝতে পারবে৷’ কথাগুলো বলে টেবিলের দিকে পা বাড়াল ম্যাকাও৷
আতঙ্কে হিম হয়ে আসছে মৃগাঙ্কর শরীর৷ সে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলের নীচে একটা খচ্খচ্ শব্দ হল৷ সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে মৃগাঙ্কর টেবিল আর ম্যাকাওদের মাঝে আবির্ভূত হল একজন৷ মৃগাঙ্কর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালেও সে একজন আরওয়াক৷ তাকে দেখেই থমকে দাঁড়াল ম্যাকাও৷ বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল ম্যাকাও আর শার্কের মুখে৷ কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা৷ শার্কের মুখে ফুটে উঠতে লাগল আতঙ্কের ভাব৷ তার হাতে ধরা প্লেটটা কাঁপতে থাকল৷
ম্যাকাও বলে উঠল, ‘প্যারোট তুমি?’
লোকটা জবাব দিল, ‘আমার-ই তো এখানে আসার কথা ছিল৷ তাই চলে এলাম৷’
মৃগাঙ্ক এবার বুঝতে পারল, এ-লোকটা সেই সাপে-কাটা প্যারোট৷ কিন্তু সে জবাবটা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই শার্কের হাত থেকে প্লেটটা খসে পড়ল৷ আতঙ্কে সে ছুটল জানলার দিকে৷ তারপর খোলা জানলা দিয়ে সোজা ঝাঁপ দিল সমুদ্রের জলে৷ আর তার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মারনার্তনাদ ভেসে এল সমুদ্রের বুক থেকে৷ যে হাঙরের দাঁতগুলো এতক্ষণ সাজিয়ে ধরে রেখেছিল সে, সেই দাঁতগুলোই এখন ছিড়ে খাচ্ছে তার দেহ!
হতভাগ্য লোকটার আর্তনাদ মিলিয়ে গেল৷ কিন্তু সঙ্গীর আকস্মিক এই মৃত্যু কিন্তু তেমন বিচলিত করতে পারল না ম্যাকাওকে৷ বরং ঘটনাতে তার চোখে-মুখে আরও হিংস্র ভাব ফুটে উঠল৷ ম্যাকাও প্যারোটের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, ‘ও তোমাকে প্রেতাত্মা ভেবে জলে ঝাঁপ দিলেও আমাকে তুমি বোকা বানাতে পারবে না৷ ওই ইঞ্জেকশনটা নেবার ফলে তুমি সুস্থ হয়ে উঠেছ৷ তারপর আমরা যখন তোমাকে সমুদ্রের পাড়ে ফেলে গ্রামে গেছিলাম তখন তুমি জ্ঞান ফিরে পেয়ে এই নৌকোতে উঠে লুকিয়ে ছিলে৷ আমাকে আমার কাজ করতে দাও৷ লোকটার পেট চিরব আমি৷’
মৃগাঙ্কর মনে হল ম্যাকাওয়ের যুক্তিটা সত্যি৷ জ্ঞান ফিরে আসার পর লোকটা নিশ্চয়ই নৌকোতে এসে উঠেছিল৷
ম্যাকাওয়ের কথা শুনে প্যারোট বলে লোকটা তার কাছে গিয়ে তেরছা- ভাবে দাঁড়িয়ে তার জামাটা প্রথমে ওপরদিকে তুলে ধরল৷ লোকটার মুখ, শরীর এবার দৃশ্যমান হল মৃগাঙ্কর চোখে৷ প্যারোট তার উন্মুক্ত পেটটা দেখিয়ে ম্যাকাওকে বলল, ‘এখান থেকেই তো তোমার মুক্তো নেবার কথা ছিল৷ এখান থেকেই নাও৷ ওই লোকটার পেট চিরতে দেব না তোমাকে৷’
বেশ কঠিন স্বরে কথাগুলো বলল প্যারোট৷ কথাটা শুনে দপ্ করে জ্বলে উঠল ম্যাকাও-এর চোখ৷ সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, এবার দুটো মুক্তোর ছড়া পড়াব দেবীকে৷ তোরটাও নেব, আর এই বিদেশীরটাও নেব৷ অনেক মুক্তো পাওয়া যাবে৷’ এই বলে সে প্যারোটের দিকে এগিয়ে গিয়ে দু-আঙুলের ফাঁকে ধরা হাঙরের দাঁতটা চালাল প্যারোটের পেট লক্ষ্য করে৷
কিন্তু দাঁতটা প্যারোটের পেট ছুঁয়ে গেলেও কোনও আঁচড়-ও কাটতে পারল না৷ ম্যাকাও-র চোখে ফুটে উঠল বিস্ময়ের ভাব আর প্যারোটের চোখে এক বিদ্রুপের হাসি! এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে ম্যাকাও আবার সজোরে হাঙরের দাঁত চালাল প্যারোটের পেট লক্ষ্য করে৷ কিন্তু ব্লেডের চেয়েও ভয়ঙ্কর দাঁত এবারও আঁচড় কাটল না তার পেটে৷ ম্যাকাওয়ের উদ্দেশ্যে এবার লোকটা বলল, ‘আমার পেটের দিকে না-তাকিয়ে নিজের পেটের দিকে তাকাও৷’
ম্যাকাও তাকাল, আর মৃগাঙ্কও তাকাল ম্যাকাওয়ের পেটের দিকে৷ প্যারোটের পেটে নয়, যেন নিজের পেটেই হাঙরের দাঁত চালিয়েছে ম্যাকাও৷ দুটো চেরা দাগ! রক্তের স্রোতের সঙ্গে ম্যাকাওয়ের নাড়িভুঁড়ি যেন বাইরে বেরিয়ে আসছে! ম্যাকাওয়ের শরীরটা কেঁপে উঠল থরথর করে৷ তার হাত থেকে খসে পড়ল হাঙরের দাঁতটা৷ আর তারপর ম্যাকাও ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল!
নৌকোটা প্রচণ্ড দুলছে৷ হাঙরের দাঁতটা কুড়িয়ে নিয়ে প্যারোট এগিয়ে এল মৃগাঙ্কের দিকে৷ সে কি মৃগাঙ্কর পেট চিরবে নাকি? লোকটা এগিয়ে এসে হাঙরের দাঁতটা দিয়ে দড়ির বাঁধন কেটে তার হাত ধরে ঘরের বাইরে বের করে আনল৷ বাইরে প্রচণ্ড তুফান শুরু হয়েছে৷ মৃগাঙ্ককে নিয়ে লোকটা চড়ে বসল ক্যানোটাতে৷ ক্যানো নিয়ে উত্তাল সমুদ্রে ভেসে পড়ার আগে হাঙরের দাঁত দিয়ে নৌকোর নোঙরের কাছিটাও কেটে দিল৷ ঝড়ের গতিতে সমুদ্রের অন্যদিকে ভেসে গেল নৌকো৷ আর ক্যানোর দাঁড় বাইতে শুরু করল লোকটা৷ উত্তাল সমুদ্রে মোচার খোলার মতো দুলতে থাকল নৌকো৷
মৃগাঙ্ক যেন একটা আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে ছিল৷ যখন তার হুঁশ ফিরল ততক্ষণে তারা ঝঞ্ঝাপূর্ণ সমুদ্র-অঞ্চল অতিক্রম করে এসেছে৷ কোনদিকে এসেছে, কত সময় কেটেছে তার খেয়াল নেই৷ চারপাশে এখন শান্ত সমুদ্র, চাঁদের আলো খেলা করছে জলে৷ শান্ত মনে ক্যানোর দাঁড় বাইছে প্যারোট৷ মৃগাঙ্ক ধাতস্থ হতে আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় নিল৷ হঠাৎ দূরে একটা আলোক বিন্দু দেখা গেল৷ সেটা দেখিয়ে প্যারোট বলল, ‘ওটা মাছ ধরার জাহাজ৷ এ-নৌকো তোমাকে পৌঁছে দেবে ওখানে৷ তুমি বেঁচে গেলে৷’
মৃগাঙ্ক এবার প্রশ্ণ করল, ‘তুমি আমাকে বাঁচালে কেন?’
প্যারোট জবাব দিল, ‘তুমি আমাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলে তাই৷ আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের পেট চিরে মুক্তো তৈরির এপ্রথা আমি বন্ধ করতে চেয়েছিলাম৷ বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এতে৷ এজন্যই আমাদের জনজাতি নিশ্চিহ্ণ হতে চলেছে৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘মানুষের পেট চিরে মুক্তো তৈরি মানে?’
প্যারোট দাঁড় টানতে টানতে বলল, ‘এ এক প্রাচীন প্রথা আমাদের৷ দেবী মেডুসার গলায় তোমরা যে জিনিসগুলোকে দেখো তা আসলে ঝিনুকের পেটের মুক্তো নয়৷ ওই হাঙরের দাঁত দিয়ে মানুষের পেট চিরে তার অন্ত্রের একটা অংশ কেটে বের করা হয়৷ তারপর সেটাকে বিশেষ পদ্ধতিতে ক্ষার দিয়ে মেজে আরও সাদা চকচকে করা হয়৷ তারপর তার ভিতর বাতাস পুরে ছোট ছোট বলের মতো বানানো হয়৷ হাতে না নিলে তুমি জিনিসটা দেখে আসলে বুঝতেই পারবে না যে সেটা আসল মুক্তো নয়৷ এই বাতাস-পোরা মানুষের তৈরি মুক্তো বেশিদিন থাকে না৷ পচে যায়৷ তাই আমরা একে সমুদ্রে বিসর্জন দিই৷ মজার ব্যাপার হল, মেডুসাদেবীর উপাসনার জন্য তৈরি এ-মুক্তো কীভাবে বানানো হয় তা লোকজনকে না বললেও আমরা যখন বলি যে, এ মুক্তো মানুষের পেটে পাওয়া যায় তখন সে-কথা কিন্তু বাইরের পৃথিবীর লোক বিশ্বাস করে না৷ অথচ আমরা কৌশলে সত্যি কথাই বলি৷’
এরপর দাঁড় বাইতে বাইতে আরওয়াক বলল, ‘আমাদের গ্রামের সবার পেট থেকেই আগে একবার নাড়ি নেওয়া হয়েছে৷ আমারও নাড়ি নেওয়া হয়েছে৷ দ্বিতীয়বার নেবার পর আর কেউ বাঁচে না৷ আমার অন্ত্র না-পেয়ে শেষে ওরা তোমার থেকে তা নেওয়ার চেষ্টা করছিল৷’
মৃগাঙ্কর এবার মনে হল, গ্রামের সেই নারকেলবনের মধ্যে সারবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে-থাকা আরওয়াকদের সবার পেটে যেন একটা করে কাটা দাগ ছিল! ব্যাপারটা সে বুঝেও ঠিক বুঝতে পারেনি!
প্যারোটের কথাগুলো শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে৷
ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে জেলেনৌকোর আলো৷ প্যারোট একসময় বলল, ‘এবার আমি ফিরে যাই৷ সমুদ্রস্রোত পৌঁছে দেবে তোমাকে ওই জেলে- নৌকোতে৷ কিন্তু তুমি আর কোনওদিন ও-দ্বীপে যেও না৷’
মৃগাঙ্ক বলল, ‘কীভাবে ফিরবে তুমি? কোথায় যাবে?’
চাঁদের আলোতে একটা বিষণ্ণ্ হাসি ফুটে উঠল প্যারোটের ঠোঁটে৷ সে জবাব দিল, ‘দেখি সমুদ্রস্রোত কোথায় নিয়ে যায় আমাকে!’ এ-কথা বলে লোকটা ক্যানো ছেড়ে নেমে গেল জলে৷ চাঁদের আলোতে প্যারোটের দেহটা ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গেল ঢেউ-এর আড়ালে৷
মৃগাঙ্কর হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, সাপের ভেনাসটা সত্যি লোকটার ওপর কাজ করেছিল তো? নাকি অন্যকিছু! নইলে হাঙরের দাঁতের আঘাত প্যারোটের পেটকে স্পর্শ করল না কেন? কেনই বা চিরে গেল ম্যাকাওর পেট? প্যারোট জলের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেল?
কিছুক্ষণের মধ্যেই জেলে নৌকো থেকে সার্চ লাইটের তীব্র আলো এসে পড়ল মৃগাঙ্কর ক্যানোটাতে৷ একটা চিৎকার শোনা গেল, ‘অ্যাহয়? কে তুমি?’
মৃগাঙ্ক জবাব দিল, ‘অ্যাহয়৷ আমি আরওয়াক দ্বীপ থেকে আসছি৷ আমাকে তোমাদের নৌকোয় তোলো...’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন