মহাশোলের টোপ

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

রেলস্টেশন থেকে রিকশাভ্যানটা রমানাথকে নিয়ে এসে নামিয়ে দিল পাকা রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানটা৷ তার আর এগোবার উপায় ছিল না৷ সামনের মেঠো রাস্তায় হাঁটু সমান কাদা৷ আর সেই রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু বর্ষার জল-ডোবা ধানখেত৷ বেলা দুপুর হলেও কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে৷ টিপটিপ করে বৃষ্টিও পড়ছে৷ স্টেশন থেকে এদিকে আসার পথে টোকা মাথায় দেওয়া চাষা-ভূষো শ্রেণির লোকজন ছাড়া তেমন বেশি মানুষজন চোখে পড়েনি রমানাথের৷

রিকশাভ্যান থেকে নেমে রমানাথ প্রথমে তার চটিজুতো কাঁধের ব্যাগের মধ্যে পুরে ধুতিটা একটু গুটিয়ে নিলেন, তারপর এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে তার হুইলসমেত ছিপটা নিয়ে নেমে পড়লেন কর্দমাক্ত পথে৷ দু-পাশের ধানখেত থেকে অবিশ্রান্ত ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে, সেই শব্দ শুনতে শুনতে এগোলেন তিনি৷ কিছুটা এগোবার পরই দেখতে পেলেন৷ কয়েকজনকে৷ কাদা-মাখা গা, কাদা-মাখা পা, সদ্য খেতের কাজ করে রাস্তায় উঠে এসে দাঁড়িয়েছে তারা৷ কালিদহটা কোথায় তা ভালো করে জেনে নেবার জন্য রমানাথ তাদের সামনে এগিয়ে গেলেন৷ তিনি কিছু জিগ্যেস করার আগেই লোকগুলোর মধ্যে একজন তাকে প্রশ্ণ করল, ‘বাবু কোথা থেকে আসছেন?’

রমানাথ জবাব দিলেন, ‘কলকাতা৷’

‘কলকাতা থেকে এতদূরে মাছ ধরতে এসেছেন!’ বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল লোকটার চোখে৷

তা কলকাতা থেকে এ-জায়গাটা বেশ দূর বটে৷ প্রথমে ট্রেন, তারপর বাস, কলকাতা থেকে বর্ধমানের এই গ্রামে আসতে রমাপদর প্রায় সাত ঘণ্টা মতো সময় লেগে গেল৷ কিন্তু কী করবেন রামপদ! নেশা বড় বালাই৷ মাছ ধরার নেশা৷ এই নেশার তাগিদেই সব কাজ ফেলে তিনি কলকাতা থেকে ছুটে যান নানা জায়গাতে৷ কখনও রানাঘাটের পালচৌধুরীদের পুকুরে, কখনও কাঁচরাপাড়ার রেলের জলাশয়ে আবার কখনও বা বারাসাতের নীলকুঠির বিলে৷ মাছ ধরার নেশাটা বড় প্রবল রমাপদর৷

তিনি লোকটার কথা শুনে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, কলকাতা৷ কালিদহটা কোনদিকে?’

লোকটা একটা গ্রামের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘এই খাল ধরে চলে যান৷ মাঠের শেষ মাথায় ওই যে দূরে একটা বাড়ি নজরে আসছে, ওটাই কালিকাপুর জমিদারবাড়ি৷ ওর পেছনেই কালিদহ৷ ওদিকে যাবার একটা পাকা রাস্তা আছে ঠিকই৷ কিন্তু সে-পথ ঘুরতে গেলে অনেক ঘুরতে হবে৷

পাশ থেকে একজন প্রশ্ণ করল, ‘আপনি কি কালিদহর মহাশোল ধরতে এসেছেন?’

তার মানে ওই মহাশোলের খবরটা এখানকার অনেকেরই জানা৷ রমানাথ বললেন, ‘হ্যাঁ, ওই মহাশোল ধরতেই এসেছি৷ খুব বড় মাছ বুঝি?’

একজন বলল, ‘হ্যাঁ, খুব বড় মাছ! যখন সে ঘাই দেয়, খেলা করে তখন তোলপাড় হয় দহর জল৷ ও-দহে অনেকে ডুবে মরেছে বলে লোকজন খুব একটা যায় না ওদিকে৷ তবে আমি একবার একটা লাশ তুলতে গেছিলাম ওখানে৷ কিন্তু ওই মহাশোলকে তো আপনি ধরতে পারবেন না বাবু৷’

এগোতে গিয়েও কথাটা শুনে থমকে দাঁড়ালেন রমাপদ৷ তারপর প্রশ্ণ করলেন, ‘কেন? ধরতে পারব না কেন?’

লোকটা জবাব দেওয়ার আগে কেমন যেন একটু ইতস্তত করল৷ যেন রমাপদ মাছটা ধরতে পারবে না এ কথাটা বলে সে ঠিক করেনি, এ কথাটা বুঝতে পেরেছে সে৷ রমাপদ আবার জানতে চাইল, ‘কেন, পারব না কেন?’

লোকটা এবার জবাব দিল, ‘ও মাছ শুধু রাজাবাবুই ধরতে পারেন৷ আর কেউ পারে না৷ বারো বছর পর পরই মাছ একবার ধরা হয়৷ তার পরদিন আবার নতুন মাছ ছাড়া হয়৷ সেটা আবার ধরা হয় বারো বছর পর৷ এমনই হয়ে আসছে রাজাবাবুর ঠাকুরদার আমল থেকে৷ ও মাছের টোপ রাজাবাবুরা ছাড়া আর কেউ জানে না৷’

কথাগুলো বলে লোকগুলো আর দাঁড়াল না৷ তারা আবার খেতের জলকাদায় নেমে গেল৷ আর রমাপদও এগোলেন তাদের দেখানো আলপথ বেয়ে৷ লোকগুলোর মুখে মাছ ধরতে না-পারার কথাটা শুনে প্রথমে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল রমাপদর৷ কিন্তু পরক্ষণেই তিনি হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলেন এমন রটনা তো গ্রামগঞ্জে কতই থাকে৷ ঘটনাচক্রে হয়তো রাজাবাবুরাই মাছটা বেশ কয়েকবার ধরেছেন৷ তার অর্থ এই নয় যে আর কেউ কোনওদিন ধরতে পারবে না৷ সেই রসিকবিলের বিশ সের ওজনের রুইমাছটার কথাই ধরা যাক না কেন৷ লোকে তো বলত, সে আসলে মাছ নয়, মৎস্যকন্যা৷ তাকে কোনওদিন ধরা যাবে না৷ কিন্তু তাকেই তো রসগোল্লার রসে চোবানো পাঁউরুটির মণ্ডর সঙ্গে বাঁকুড়া থেকে আনা বিশেষ ধরনের লাল পিঁপড়ের ডিম দিয়ে ছিপে গেঁথেছিলেন রমানাথ৷

অথবা গোচারণের পুকুরের সেই বিশাল কাতলাটা? লোকে বলত তার ঠোঁট নাকি এত পিছল যে বাঁকানো বঁড়শিও পিছলে যায়! শেষপর্যন্ত বিশেষভাবে তৈরি খুবই শক্ত অথচ পুঁটি মাছ ধরার মতো ছোট্ট বঁড়শি দিয়েই তাকে পাড়ে তুলেছিলেন রমানাথ৷ পরে দেখা গিয়েছিল যে প্রকৃতির কোনও অদ্ভুত খেয়ালে তার মুখের হাঁ-টা এত ছোট ছিল যে বড় বঁড়শি গিলতে পারত না সে৷

এসব কথা ভাবতেই মনে বল ফিরে পেলেন রমানাথ৷ পাকা মাছশিকারি তিনি৷ মাছটা ঠিক কেমন সে কথাই ভাবতে লাগলেন তিনি৷

আর তার সঙ্গে ভাবতে লাগলেন খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনটার কথা৷ ওই বিজ্ঞাপনটা না দেখলে এতদূর ছুটে আসতেন না তিনি৷ খবরের কাগজে ছোট ছোট অনেক বিজ্ঞাপন ছাপা হয় যেগুলো সাধারণত চোখ এড়িয়ে যায় সাধারণ মানুষের৷ কিন্তু সেসব বিজ্ঞাপনের খোঁজ রাখে সন্ধানীরা৷ সাধারণত বিলে বা পুকুরে মাছ ধরার জন্য টিকিট লাগে৷ সাধারণত পুকুরের মাছ বুঝে একশো থেকে পাঁচশো টাকারও টিকিট করা হয়৷ ধরা মাছের আকৃতি আর ওজন বুঝে হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার মূল্য দেওয়া হয় মাছ শিকারিদের৷ তার সঙ্গে মাছ ধরা তো থাকবেই৷

এমন টুকটাক মাছ ধরার বিজ্ঞাপন মাঝে মাঝে থাকে কাগজে৷ কিন্তু এ বিজ্ঞাপনটা আকৃতিতে তেমনই ছোট হলেও টিকিটের মূল্য আর পুরস্কারের মূল্য বিচারে এত বড় বিজ্ঞাপন এর আগে রমানাথ দেখেননি৷ টিকিট মূল্য দশ হাজার টাকা আর পুরস্কারমূল্য এক লাখ টাকা! ভাবা যায়? হয়তো উটকো লোকদের এ প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেই টিকিটের দাম এত বেশি ধার্য করা হয়েছে৷ আর সেজন্য পুরস্কারমূল্যটাও বেড়েছে৷

মাছটাকে ধরতে পারলে কেল্লা ফতে৷ এর আগে বেশ কিছু জায়গাতে বড় বড় শোল মাছ ধরেছেন রমানাথ৷ ও-মাছ কী টোপ গেলে না-গেলে, তা বিলক্ষণ জানেন মাছ শিকারি রমানাথ৷ সেইমতো তিনি টোপগুলো সঙ্গেও এনেছেন৷ তার ব্যাগের মধ্যে কাচের জারে রাখা আছে সেগুলো৷

রমানাথ আলপথ ভেঙে এক সময় পৌঁছে গেলেন বাড়িটার সামনে৷ অন্যদিক থেকে একটা পাকা রাস্তা ঘুরপথে এসে থেমেছে বাড়িটার সামনে৷ বিশাল জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা৷ তবে তার চেহারা দেখে মনে হয় বাড়িটার বয়স দু-তিনশো বছর হবে৷ তার একটা অংশ ভেঙে পড়েছে, বাকি অংশ এখনও দাঁড়িয়ে থাকলেও দেওয়াল-থামের গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে৷ তবে দোতলা বাড়িটার কলেবর দেখলে এখনও বোঝা যায় যে, বাড়িটা যাঁরা বানিয়েছিলেন তাঁরা যথেষ্ট বিত্তশালী ছিলেন৷ হয়তো বা এ-তল্লাটের জমিদার ভূস্বামী গোছের কেউ হবেন৷ যে কারণে তাদের বর্তমান উত্তরসূরীদের এখনও ‘রাজাবাবু’ বলে স্থানীয় মানুষরা৷ বাড়িটার পিছনে গাছগাছালির আড়ালে একটা জলাশয়ও যেন চোখে পড়ল রমানাথের৷

বাড়িটার সামনের ফাঁকা জমিতে বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ দু-একটা গাড়ির মাথায় হুইল-ছিপ ইত্যাদি বাঁধা৷ কয়েকজন লোক ইতস্ততভাবে বাড়িটার বাইরে ঘোরাফেরা করছে, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে৷ তাদের ভাবভঙ্গি, পোশাক দেখে ঠিক স্থানীয় লোক বলে মনে হয় না৷ রমানাথ বুঝতে পারলেন, এঁরাও তাঁর মতো মাছ ধরতে এসেছেন৷ কোথায় টিকিট দেওয়া হচ্ছে সে কথাটা তাঁদেরই একজনকে জিগ্যেস করতে আঙুল তুলে তিনি বাড়িটার একটা অংশ দেখিয়ে দিলেন৷ রমানাথ এগোলেন সেদিকে৷

ঘরটা সম্ভবত কাছারি ঘর ছিল৷ কর্মচারীদের বসার জন্য উঁচু গদি-আঁটা জায়গা আছে৷ সেখানে বসে আছেন দুজন লোক৷ কয়েকজন মাছ শিকারীর থেকে টাকা বুঝে নিয়ে টিকিট করাচ্ছে তারা৷ ছাতা বন্ধ করে ছিপটাকে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রেখে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন রমানাথ৷ একটা জিনিস তিনি বুঝতে পারলেন যে বাইরে যারা রয়েছে বা টিকিটের লাইনে যারা রয়েছেন তারা কেউ গ্রামের মানুষ নয়৷ সবাই বাইরের লোক৷

গ্রামের লোক টিকিট কেনার জন্য এত টাকা পাবে কোথায়? আর তার ওপর যখন তাদের বিশ্বাস যে রাজাবাবু ছাড়া কেউ ওই মহাশোল ধরতে পারবেন না৷ তখন কারও কাছে টাকা যদিও বা থেকেও থাকে, তা নষ্ট করে লাভ কী?

সামনের দু-তিনজনের টিকিট কাটা শেষ হলে রমানাথ লোকদুটোর সামনে এসে পকেট থেকে টাকা বার করলেন৷ যে টাকা নিচ্ছিল সে বলল, ‘শর্তগুলো জানেন তো? একদিনে একবেলার জন্যই এ টিকিট৷ আগামীকাল বেলা বারোটা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত৷ তার মধ্যেই যদি মাছটা ধরা হয়ে যায় তো তবে আর বসারই দরকার হবে না৷ জলের ধারে বসার মাচার জন্য লটারি হবে একটু পরে৷ কুড়ি জনের নাম নেওয়া হবে ঠিক হয়েছিল আগে আসার ভিত্তিতে৷ আপনিই কুড়ি নম্বর লোক৷ লটারিতে বসার যে জায়গা পাবেন সেখানেই বসতে হবে কিন্তু৷’

রমানাথ শুনে টাকাটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, টিকিটটা দিন৷’

টাকা নিয়ে টিকিট আর রসিদ কাটতে কাটতে লোকটা বলল, ‘দূর দূর থেকে আপনারা এসেছেন৷ কাছাকাছি কোনও হোটেল নেই৷ তাই এ-বাড়িতেই আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন রাজাবাবু৷ টিকিট পিছু একটা ঘর বরাদ্দ৷ একজন সঙ্গী নিয়ে আপনি সেখানে থাকতে পারেন৷ টিকিটের নম্বর-ই ঘরের নম্বর৷ দরজার বাইরে কাগজ সাঁটা আছে৷’

এ কথা বলার পর লোকটা একটু হেসে বলল, ‘আপনাদের জন্য একটা খুশির খবর আছে৷ কাল রাজাবাবুর ঠাকুর্দা কালীকৃষ্ণর জন্মদিন৷ যিনি এই জমিদারির পত্তন করেছিলেন৷ রাজাবাবুও কাল আপনাদের সঙ্গে মাছ ধরতে বসবেন৷ তিনি ঠিক করেছেন যে, তিনি ছাড়া আপনাদের মধ্যে কেউ যদি মাছটা ধরতে পারেন তবে তাকে পুরস্কার তো দেওয়া হবেই, তার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেককে টিকিটের টাকাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে৷ কাজেই মাছটা আপনি না-ধরতে পারলেও টিকিটের টাকা ফেরত পাবেন৷’

তার কথা শুনে রমানাথ মনে মনে একবার ভাবলেন, ‘তবে কি রাজাবাবু এবারও নিশ্চিত যে, মাছটা তিনি এবারও নিজেই ধরবেন?’

ঠিক এই মুহূর্তে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, বিপিন ক’জন হল?’

ওপর থেকে, সম্ভবত দোতলা থেকে একটা সিঁড়ি নেমে এসেছে ঘরে৷ সেই সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গাতে এসে দাঁড়িয়েছেন একজন গৌরবর্ণ, দীর্ঘকায় প্রৌঢ় ব্যক্তি৷ তাঁর পরনে ধুতি আর পিরান, পায়ে শুঁড়তোলা সাদা চটি, বৃষস্কন্ধ লোকটার গলা থেকে ঝুলছে মোটা সোনার হার৷ হাতের ঘড়িটাও সম্ভবত সোনার-ই মনে হয়৷ তাঁকে দেখেই যে লোক দুজন টাকা নিচ্ছিল তারা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই কুড়ি জন হল রাজাবাবু৷’

এই তাহলে রাজাবাবু! রমানাথসহ ঘরের আরও অন্যরা তাকাল তাঁর দিকে৷

রাজাবাবু জবাব শুনে বললেন, ‘আর একজনকেও টিকিট দেবে না৷ খেয়াল রেখো কোনও উটকো লোক যেন বাড়িতে না-ঢোকে৷ আর ডাক্তার এলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ওপরে পাঠিয়ে দাও৷’

আর একজন কর্মচারী বলল, ‘আচ্ছা হুজুর৷ আর বিপিন আপনার হুইল-ছিপ সব ঠিক করে রেখেছে৷’

রাজাবাবু একটা শব্দ করলেন, ‘হুম্!’ তারপর ঘরে উপস্থিত অন্য লোকগুলোর দিকে যেন একটু তাচ্ছিল্য ভরে তাকিয়ে আবার ওপর দিকে মিলিয়ে গেলেন৷ রমানাথ তাঁকে দেখে বুঝতে পারলেন যে কালের নিয়মে হয়তো এখন রাজাবাবুদের জমিদারি গেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও তাঁদের ধমনীতে আভিজাত্যের নীল রক্ত আছে৷ রমানাথদের মতো সাধারণ মানুষদের এখনও এই রাজাবাবুরা খুব একটা যে ধর্তব্যের মধ্যে রাখেন না, তা তাঁর চালচলনেই বোঝা গেল৷

রাজাবাবু অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর থাকার ঘর কোন দিকে জেনে নিয়ে দেওয়াল থেকে ছিপটা তুলে নিয়ে ঘরের উদ্দেশে এগোতে যাচ্ছিলেন রমানাথ৷ কিন্তু ঠিক সেই সময় ঘরে ঢুকল একজন লোক৷ তার এক হাতে একটা ছিপ থাকলেও তার চেহারা দেখে বেশ অবাক হলেন রমানাথ৷ লোকটার চোখে কালো চশমা, গেরুয়া বসন, জটাজুটধারী মুখমণ্ডল, আর এক হাতে ঝোলানো আছে কমণ্ডলু গোছের একটা পাত্র৷ তার মুখটা মাটি লেপা৷ সম্ভবত গঙ্গাজল আছে ওই পাত্রে৷ দেখেই বোঝা যায়, লোকটা সাধুসন্ন্যাসী গোত্রের৷ বেশ বয়সও হয়েছে তার৷ বেশ কিছু দাড়িতে পাক ধরেছে৷ যারা টিকিট দিচ্ছিল তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল লোকটা৷ তারা তাঁর দিকে তাকাতেই সন্ন্যাসী তার কাঁধের ঝোলা থেকে কাগজ মোড়ানো একটা পুরনো নোটের বান্ডিল বার করে বললেন, ‘টিকিট দাও৷ টিকিট কিনব৷’

রাজাবাবুদের লোক দুজন বেশ অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে৷ তারপর একজন বলল, ‘টিকিট শেষ৷ আর দেওয়া যাবে না৷’

আর তার পরই লোক দু’জনের মধ্যে যে বয়স্ক কর্মচারীটি বলল, ‘এবার মনে পড়েছে আপনাকে৷ গতবারও মাছ ধরার সময় আপনি এসেছিলেন না?’

সন্ন্যাসী বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ চিনতে পেরেছ? বারো বছর আগে৷ সেই যে সেবার, মাছ ধরার পরের দিন-ই একটা বাচ্চা জলে ডুবে মারা গেছিল!’

রাজাবাবুর বয়স্ক কর্মচারী বলল, ‘তখন আপনি আর একটু জোয়ান ছিলেন বলে প্রথমে আপনাকে চিনতে পারিনি৷’

তার কথা শুনে সন্ন্যাসী বললেন, ‘দেখো না ভাই, একটু চেষ্টা করে৷ কতদূর থেকে ছুটে এলাম! বারো বছর ধরে ভিক্ষা করে টিকিটের টাকা জমালাম! শেষে ফিরে যাব?’

রাজাবাবুর লোকটা এবার একটু কঠোরভাবে বলল, ‘না, আর কিছু করার নেই৷’

সন্ন্যাসীর মুখে বিমর্ষ ভাব ফুটে উঠল৷ তিনি বললেন, ‘তবে আর কিছুই করার নেই৷ কিন্তু আজকের রাতটা কি এখানে কাটানো যাবে? বাইরে দুর্যোগ নামতে চলেছে৷ এখন আমি কোথায় যাই?’

সন্ন্যাসীর দুরবস্থা দেখে সম্ভবত মায়া হল রাজাবাবুর লোকটার মনে৷ সে বলল, ‘টিকিট ছাড়া বাইরের লোকজনের থাকার হুকুম নেই৷ এক-এক ঘরে দুজন লোক৷ কাউকে বলে দেখুন যারা টিকিটি কেটেছে, যদি কারও ঘরে থাকতে পারেন! রাজাবাবুকে বলব যে আপনি তার সঙ্গী৷’

কথাটা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে সন্ন্যাসী তাকালেন ঘরের অন্যদের দিকে৷ রমাপদ ছাড়া অন্যরা নিশ্চুপ৷ কারণ অন্য সকলেই এত দূর এসেছে বলে সঙ্গী নিয়ে এসেছে৷ রমাপদর কিন্তু বেশ মায়া হল লোকটার কথা শুনে৷ সাধু সন্ন্যাসীর ওপর তেমন আর বিশ্বাস না থাকলেও লোকটা যে তার ভিক্ষার টাকা জমিয়ে মাছ ধরার নেশায় এতদূর ছুটে এসেছে, এ ব্যাপারটা আকৃষ্ট করল তাঁকে৷

রমাপদ নিজেও অনেক কষ্ট করে জোগাড় করেছেন টাকাটা৷ এ নেশার টানটা তিনি বোঝেন৷ একটু ভেবে নিয়ে শেষে তিনি বলেই ফেললেন, ‘একটা রাতের ব্যাপার তো? ঠিক আছে, আমার কোনও সঙ্গী নেই৷ আপনি রাতটা আমার সঙ্গে কাটাতে পারেন৷’

কথাটা শুনেই যেন উৎফুল্ল হয়ে উঠল কালো চশমা-পরা সন্ন্যাসীর মুখটা৷ তিনি বললেন, ‘অনেক ধন্যবাদ৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনাকে আমি বিরক্ত করব না৷’ এই বলে সন্ন্যাসী ঘরের এককোণে গিয়ে দাঁড়ালেন৷

কুড়িজন লোক হয়ে গেছে৷ অতএব এবার লটারি করতে হবে বসার জায়গার জন্য৷ রাজাবাবুর একজন কর্মচারী গিয়ে বাইরে থেকে টিকিটধারীদের ডেকে আনলেন লটারির জন্য৷ লটারি হল৷ রমানাথের ভাগ্যে যে-নম্বরটা উঠল তাতে মনটা একটু খুঁতখুঁত করে উঠল তাঁর৷ রমানাথের নম্বর তেরো৷ আনলাকি থার্টিন! রমানাথ মাছ ধরার সময় অন্য কোনও সংস্কার না মানলেও এই সংস্কারটা মানেন৷ কারণ, যতবার তিনি এই তেরো নম্বর টিকিট পেয়েছেন ততবার তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেননি মাছ ধরায়৷ কিন্তু কী আর করা যাবে?

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে-ঘর ছাড়লেন রমানাথ৷ আর তাঁর পিছু পিছু সেই সন্ন্যাসীও৷ মাথা গোঁজার আস্তানায় যাওয়ার আগে রমানাথ সন্ন্যাসীকে বললেন, ‘ঘরে যাওয়ার আগে একবার জলাশয়টা দেখে আসি৷ সেটা না দেখলে মন কেমন করছে৷ আপনার মাছ ধরার নেশা দেখে আশ্চর্য লাগছে৷ আপনার কী নাম? কোথা থেকে আসছেন?’

সন্ন্যাসী হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ চলুন৷ আগে এসেছি বলে এ জায়গা আমি চিনি৷ দহটা বাড়ির পিছনেই৷ পূর্বাশ্রমে আমার একটা নাম ছিল বটে৷ কিন্তু লোকে আমাকে এখন ‘‘অঘোরবাবা’’ বলে৷ হরিদ্বারের কাছাকাছি এক জায়গাতে গঙ্গার পাড়ে আমার ডেরা৷’

রমাপদ বিস্মিতভাবে বললেন, ‘অতদূর থেকে মাছ ধরার নেশায় এখানে এসেছেন? কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে?’

সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাঁ, অত দূর থেকে৷ তবে বিজ্ঞাপন দেখে নয়৷ বারো বছর পর পর নির্দিষ্ট দিনে মাছ ধরার এই আয়োজন হয়৷ তারিখটা মনে ছিল তাই এসেছিলাম৷ তাড়াতাড়ি পা চালান৷ আকাশের যা অবস্থা তাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে৷’

সত্যিই কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ৷ অঘোর সন্ন্যাসীকে অনুসরণ করলেন রমাপদ৷ বাড়িটার পিছন দিকে একটু এগিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন কালিদহে৷

কালিদহ বেশ বড় দিঘি৷ অন্তত বিঘা সাত-আটেক তো হবেই৷ তার পাড়ে বড় বড় প্রাচীন গাছ সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷ কালিদহ সত্যিই যেন কালিদহ, জলের রং এমনিতে কালো৷ তার ওপর আবার মেঘের ছায়া পড়ে তাকে আরও ঘোর কৃষ্ণবর্ণ করে তুলেছে৷ কালিদহের পাড় ঘেঁষে মোথা ঘাস আর ঘাসের জঙ্গল৷ শ্যাওলাপূর্ণ জলরাশিতে ইতিমধ্যে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে৷ এই পরিবেশে মাছেরা জলতলের ওপরে উঠে খেলা করে, ঘাই দেয়৷ কিন্তু জলের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেও বৃষ্টির ফোঁটা ছাড়া অন্য কোনও তরঙ্গ রমাপদর চোখে ধরা দিল না৷ অর্থাৎ দহর জলে অন্য কোনও মাছ নেই৷ আর সেই মহাশোল হয়তো লুকিয়ে আছে এই শ্যাওলা ঢাকা কালো দিঘির গভীরে কোথাও৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল৷ রমাপদ এবার ফিরে চললেন জমিদারবাড়িতে ফেরার জন্য৷ বাড়িটাতে তাঁরা ঢুকতে যাচ্ছেন ঠিক সেইসময় একটা গাড়ি এসে থামল সেখানে৷ গাড়ি থেকে ছাতা মাথায় নামল একজন লোক৷ তার গলায় স্টেথোস্কোপ৷ হাতে ধরা আছে একটা বাক্সমতো জিনিস৷ বয়স্ক সেই ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভিতর দ্রুত ঢুকে গেলেন৷ তাকে দেখে রমানাথ সন্ন্যাসীকে বললেন, ‘ভদ্রলোক মনে হয় ডাক্তার৷ রাজাবাবু তাঁর কর্মচারীদের ডাক্তার আসবে বলেছিলেন৷’

সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বললেন, ‘আগেরবার এসে আমি লোকটাকে দেখেছি৷ ওরা রাজাবাবুর পরিবারের বংশানুক্রমিক চিকিৎসক৷ অর্থাৎ ডাক্তারের বাপ-ঠাকুর্দাও রাজাবাবুর বাপ-ঠাকুর্দার চিকিৎসা করেছেন৷

বাড়ির ভিতর ঢুকে সন্ন্যাসীকে নিয়ে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে পড়লেন৷ ঘরে ঢুকেই সন্ন্যাসী মাটিতে একটা আসন বিছিয়ে সান্ধ্য উপাসনায় বসার প্রস্তুতি শুরু করলেন৷

রমানাথের হঠাৎ খেয়াল হল তাঁর টোপের কথা৷ সেগুলো মরে যায়নি তো? সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার ব্যাগ থেকে বার করলেন টোপের পাত্রটা৷ বেশ বড় জলপূর্ণ একটা কাচের বয়াম৷ তার মাথায় টিনের ঢাকনাতে ছোট ছোট ছিদ্র করা৷ সেই জলের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে আঙুলের মতো দৈর্ঘ্যের বেশ কয়েকটা সরপঁুটি৷ বসিরহাটের এক মিষ্টি জলের ভেরি থেকে তিনি সংগ্রহ করেছেন এগুলো৷ শোল মাছের অব্যর্থ টোপ৷ রমানাথবাবু সেগুলো টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেসময় সন্ন্যাসীর নজর পড়ল তার ওপর৷ সন্ন্যাসী বলে উঠলেন, ‘ও টোপে কাজ হবে না আপনার৷’

রমানাথবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘কাজ হবে না কেন? এ-টোপ দিয়ে অনেক বড় বড় শোল ধরেছি আমি৷’

সন্ন্যাসী এবার যেন বেশ দৃঢ়ভাবেই বললেন, ‘আমি জানি হবে না৷ ও টোপ মহাশোল কাল গিলবে না৷’ এ কথা বলে ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন তিনি৷

বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে৷ অন্ধকারও নেমে গেছে৷ রমানাথ যতক্ষণ জেগে রইলেন ততক্ষণ ধ্যানস্থভাবেই দেখলেন সন্ন্যাসীকে৷ বহু দূর থেকে এখানে ছুটে এসেছেন রমানাথ৷ শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে৷ কাজেই তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে বাইরে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি৷

এক সময় জমিদারবাড়ির সব আলো নিবে গেল৷ নিস্তব্ধ হয়ে গেল সবকিছু৷ বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে৷ ধ্যান ভাঙল সন্ন্যাসীর৷ বাতি নিবিয়ে তিনি ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলেন৷ শেষ রাতে আধো ঘুমে রমাপদ যেন একবার দেখলেন বাইরে থেকে সন্ন্যাসী ঘরে ঢুকলেন, তারপর আবার অন্ধকার থাকতেই বাইরে বেরিয়ে গেলেন৷ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রমানাথ দেখলেন সন্ন্যাসী বা তার জিনিসপত্র কিছুই নেই ঘরে৷ মনে মনে একটু ক্ষুণ্ণ্ হলেন রমানাথ৷ লোকটা যাওয়ার আগে একবার বলে গেল না! সাধু সন্ন্যাসীদের মতিগতিই বোঝা ভার৷

শেষ রাতে বৃষ্টি থেমেছিল ঠিকই৷ কিন্তু এদিনও সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার৷ বর্ষাকাল যেমন হয়, যে-কোনও সময় বৃষ্টি-হতে পারে৷ সারা সকাল নিজের ঘরেই রমানাথ কাটিয়ে দিলেন৷ সকাল থেকেই বেশ উত্তেজনা অনুভব করছেন তিনি৷ বারবার তাই তিনি ছিপ পরীক্ষা করলেন, হুইল ঘুরিয়ে দেখে নিলেন সেটা ঠিক কাজ করছে কি না, বঁড়শি টিপে টিপে পরীক্ষা করলেন সেটা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না৷ এসব করে শেষপর্যন্ত মহাশোল ধরার জন্য বেরিয়ে পড়লেন তিনি৷ অন্য প্রতিযোগীরাও তখন তাদের ছিপ, টোপ ইত্যাদি নিয়ে এগোচ্ছেন সেদিকে৷ তাদের পায়ে পায়ে রমানাথও কালিদহের পাড়ে গিয়ে উপস্থিত হলেন৷

জলাশয়ের চারপাশে ছোট ছোট বাঁশের মাচা বানানো হয়েছে বসার জন্য৷ একজন লোক টিকিট মিলিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন কার বসার জায়গা কোনটা৷ রমানাথকেও তাঁর মাচাটা দেখিয়ে দিল একজন৷ জায়গাটা বেশ পছন্দ হল রমানাথের৷ তার পিছনেই একটা গাছ৷ তার ডালপালা মাথার ওপর দিয়ে চাঁদোয়ার মতো জলের ওপর আকাশটা আড়াল করে রেখেছে৷

বারোটা বাজতে খুব বেশি দেরি নেই৷ রমানাথ গিয়ে বসলেন সেই মাচায়৷ আশেপাশের মাচাতেও অন্য লোকজন বসে মাছ ধরার সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখছে মাচাতে৷ রমানাথ যেখানে বসেছেন তার কয়েকটা মাচার তফাতে একটা মাচার মাথায় বেশ বড় একটা রঙিন ছাতা টাঙানো৷ রমানাথ বুঝতে পারলেন ওটাই রাজাবাবুর মাচা৷ সব লোকজন মাচায় বসার পর যখন বারোটা প্রায় বাজতে চলেছে তখন এসে উপস্থিত হলেন রাজাবাবু৷ দুজন লোক তাঁর সঙ্গে৷ একজন তাঁর মাথায় ছাতা ধরে৷ আর অন্যজনের হাতে রাজাবাবুর ছিপ আর একটা বাক্স৷ সেই বাক্সটা দেখে চিনতে পারলেন রমানাথ৷ এই বাক্সটাই গতকাল ধরা ছিল ডাক্তারের হাতে৷ এ ধরনের বাক্স আগে দেখেছেন রমানাথ৷ এই বাক্সগুলোর মধ্যে সাধারণত বরফ দিয়ে লেমোনেড, আইসক্রিম ইত্যাদি রাখা হয়৷

কারও প্রতি কোনও দৃষ্টিপাত না করে রাজাবাবু রমানাথদের সামনে দিয়ে গিয়ে তাঁর মাচায় উঠে বসলেন৷ সঙ্গী দু’জন তাঁর মাচায় ছিপ আর বাক্স নামিয়ে দিয়ে চলে গেল৷

বারোটা বাজল এখনই৷ রমানাথ প্রস্তুত হলেন৷ ঠিক বারোটায় ঢং করে ঘণ্টার শব্দ করল একজন৷ চারপাশ থেকে ছপাৎ ছপাৎ করে জলে ছিপ ফেলার শব্দ শুরু হল৷ রমানাথ শিশি থেকে তার টোপ বার করলেন৷ জ্যান্ত সরপুঁটির লেজের দিকে নিপুণ হাতে এমন ভাবে বঁড়শি গাঁথলেন যে, জলে বঁড়শি গাঁথা অবস্থায় মাছটা মরবে না৷ খেলে বেড়াবে৷ সেটাই আকৃষ্ট করবে মহাশোলকে৷ তারপর সে টোপ গিলবে৷

বঁড়শিটা গেঁথেই জলের দিকে টোপ ছুড়লেন তিনি৷ ছপাৎ করে শব্দ হল৷ জলে পড়ে মাছটা একবার লাফাল৷ তারপর জলের তলায় হারিয়ে গেল৷ ফাতনাটা একটু নড়েচড়ে স্থির হয়ে গেল৷ ছিপটা শক্ত হাতে ধরে বসলেন রমানাথ৷

এরপর রমানাথ তাকালেন রাজাবাবুর দিকে৷ তিনি সেই লেমনেডের বাক্সটা খুলে কী যেন একটা বার করলেন৷ তার মানে সেটা তাঁর টোপের বাক্স৷ কী টোপ সেটা অত দূর থেকে বুঝতে পারছেন না রমানাথ৷ তিনি তাঁর টোপটা বার করে প্রথমে যেন সেটা বঁড়শিতে গাঁথকে গেলেন৷ কিন্তু পরক্ষণেই তিনি সেই টোপটা নেড়েচেড়ে দেখে অনেকটা ক্রুদ্ধভাবেই যেন জলে ফেলে দিলেন৷ তারপর হাত নেড়ে সম্ভবত তাঁর লোকজনকে ডাকলেন৷

মিনিটখানেকের মধ্যেই একজন উপস্থিত হল তাঁর কাছে৷ রাজাবাবু তাকে কী যেন বললেন৷ লোকটা সঙ্গে-সঙ্গে ঊধর্বশ্বাসে ছুটল রাজবাড়ির দিকে৷ রমানাথের মনে হল যে, রাজাবাবু হয়তো কোনও সরঞ্জাম ফেলে এসেছেন৷ আর সেটাই আনতে ছুটল লোকটা৷ ছিপ না ফেলে রাজাবাবু তাকিয়ে রইলেন জলের দিকে৷ রমানাথ মন দিলেন নিজের ফাতনার দিকে!

সময় এগিয়ে চলল৷ নিস্তব্ধ দহ৷ ছিপ ফেলে নিশ্চুপভাবে বসে আছে সবাই৷ একমাত্র রাজাবাবু ছাড়া৷ মাথার ওপর মেঘ ঘনাতে শুরু করেছে৷ টিপটিপ বৃষ্টিও শুরু হল একসময়৷ ছাতা খুললেন রমানাথ৷ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে দহর কালো জলে৷ ঠিক এই সময় হঠাৎ সেই মহাশোল যেন মনের আনন্দে নেচে উঠে ঘাই দিল জলে৷ এত বড় ঘাই যে জলাশয়ের কেন্দ্র থেকে সেই জলতরঙ্গ এসে লাগল পাড়গুলোতে! তা দেখে রমানাথ বুঝতে পারলেন মাছটা সত্যি মহাশোল! মহামৎস্য! দৈর্ঘ্যে অন্তত চার হাত হবে, আর ওজনও সেই অনুপাতে! বার কয়েক ঘা দিয়ে সবাইকে তার উপস্থিতি জানিয়ে আবার জলের নীচে হারিয়ে গেল মৎস্যরাজ৷

সময় এগিয়ে চলল৷ আরও এক ঘণ্টা, দু’ঘণ্টা৷ আর হদিশ মিলল না সেই মৎস্য অবতারের৷ বৃষ্টি ক্রমশ আরও বাড়ছে৷ আরও কালো হয়ে আসছে আকাশ৷ যেন এখনই সন্ধ্যা নামতে চলেছে৷ কিন্তু কারোর ফাতনাই একবারের জন্যও কেঁপে ওঠেনি৷

যারা মাছ ধরে তাদের মাছের প্রত্যাশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু এক্ষেত্রে সময় সীমিত৷ তার ওপর আবার একটা নির্দিষ্ট মাছ ধরার প্রত্যাশায় দুর্যোগ মাথায় নিয়ে বসে আছে সকলে৷ তাই সবাই একটু উশখুশ করতে লাগল৷ জলে ছিপ না ফেললেও রাজাবাবুর উত্তেজনাই সব থেকে বেশি মনে হল রমানাথের৷ তিনি অস্থিরভাবে বার বার পিছনে তাকাচ্ছেন৷ অবশ্য তার কারণ বোধগম্য হল না রমাপদর৷

এক সময় রমাপদরও মনে হতে লাগল যে, ওই মহাশোল কি সত্যিই কারও টোপ গিলবে না? মাঝে মাঝে এমন হয়৷ বড় মাছ একবার ঘাই দিয়ে নীচে নেমে স্থির হয়ে যায়৷ তখন আর সে টোপ গেলে না৷

সময় এগিয়ে চলল আরও৷ আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কালো হয়ে উঠল দহর জল৷ রমানাথ কেমন যেন হতাশ হয়ে পড়তে লাগলেন৷ আর তো ঘণ্টাখানেক সময় হাতে! এসব ভাবতে ভাবতেই একটা বড় মেঘ ঢেকে দিল আকাশটাকে৷ সত্যিই এবার রাতের অন্ধকার নেমে এল৷ পঁচিশ-তিরিশ হাত দূরেরও কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ হাল ছেড়ে দিয়ে ছিপ তুলে ফেললেন রমানাথের পাশের মাচার ভদ্রলোক৷ রমানাথ কী করবেন ভাবছেন ঠিক এমন সময় পিছন থেকে একটা চাপা কণ্ঠস্বর, ‘ও টোপে হবে না৷ টোপ দিচ্ছি, বঁড়শিতে নতুন টোপ গাঁথুন৷’

রমানাথ চমকে উঠে পিছনে ফিরে দেখলেন, আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন সাধু৷ তাঁর হাতে-ধরা সেই কমণ্ডলু ধরনের পাত্রটা দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এর মধ্যে টোপ আছে৷ মহাশোলের অব্যর্থ টোপ৷’

রমানাথ অবাক হয়ে গেলেন তার কথা শুনে৷ তিনি বলনে, ‘কীসের টোপ?’

সন্ন্যাসী বললেন, ‘পরে জানতে পারবেন৷ ছিপটা তুলে বঁড়শিটা এদিকে ফেলুন৷ টোপ গাঁথার পর জলে সে টোপ ফেলুন৷ দেরি করবেন না৷ কেউ এলে আমাকে দেখে ফেলতে পারে৷ তা ছাড়া রাজাবাবু টোপ আনতে লোক পাঠিয়েছেন৷ তারা এসে গেলে রাজাবাবু ঠিক সেই টোপ দিয়ে মাছ গাঁথবেন৷’

রমানাথ তার কথা শুনে কী করবেন তা বুঝতে না পেরে ইতস্তত করতে লাগলেন৷

সন্ন্যাসী এবার বললেন, ‘বিশ্বাস করুন আমাকে৷ এ-টোপ মহাশোল গিলবেই৷ জলের নীচে এ টোপের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সে৷ তীর বরাবর জলের নীচে পাক খাচ্ছে তার এই মহার্ঘ্য খাদ্যের আশায়৷ সময় নষ্ট করবেন না, ছিপ ওঠান, ছিপ ওঠান...৷’

সন্ন্যাসীর কথার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যা ধীরে ধীরে প্রভাবিত করে ফেলল রমানাথকে৷ এক সময় তিনি ছিপ তুলে সুতো সমতে বঁড়শিটা ছুড়ে দিলেন পিছন দিকে৷ ছিপটা অবশ্য তাঁর হাতেই ধরা রইল৷ তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে৷ অন্ধকারে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ সন্ন্যাসী তার কমণ্ডলু থেকে কী যেন একটা জিনিস বার করে দ্রুত গাঁথলেন বঁড়শিতে৷ তারপর বললেন, ‘টোপটা এবার হাতে না ধরে ছিপ ঘুরিয়ে জলে ফেলুন৷’

সন্ন্যাসীর নির্দেশমতো সে-কাজটাই করলেন রমানাথ৷ টুপ করে শব্দ করে ফাতনা সমেত বঁড়শিসমেত জলে ডুবে গেল টোপটা৷ সন্ন্যাসী বললেন, ‘এখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে মহাকালীর একটা পুরোনো মন্দির আছে৷ লোককে জিগ্যেস করলে দেখিয়ে দেবে জায়গাটা৷ আমার টাকার দরকার নেই৷ তবে সম্ভব হলে আজ রাতে মাছটা সেখানে নিয়ে যাবেন৷ আমি সেখানে রাত্রিবাস করব৷’ এই বলে রমানাথকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেলেন তিনি৷

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ কেটে আলো ফুটতে শুরু করল৷ বৃষ্টিটাও একটু কমে এল৷ ফাতনার দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসীর কথা ভাবতে লাগলেন রমানাথ৷ অদ্ভুত ব্যাপার! কী টোপ দিয়ে গেলেন তিনি?

ফাতনার দিকেই তাকিয়েছিলেন রমানাথ৷ হঠাৎ তাঁর মনে হল ফাতনাটা যেন একবার একটু নড়ল! দৃষ্টি বিভ্রম নয় তো! আবারও কাঁপল ফাতনাটা৷ কেঁপে উঠল রমানাথের বুকও৷ একবার, দুবার, তিনবার! তারপরই ‘ফাতনা’ ডুবে গেল জলে৷

ব্যাপারটা সত্যি কি না বুঝতে রমানাথের যে-কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল তার মধ্যেই সুতোয় টান পড়ল৷ ছিপ সামলে হুইল থেকে সুতো ছাড়তে শুরু করলেন তিনি৷ টোপ গিলেছে মহাশোল৷ গলায় বঁড়শি আটকে পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে সে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হল জলে৷ জলের ওপর লাফিয়ে উঠল বঁড়শি-বেঁধা মাছটা৷

এতক্ষণে সবাই বুঝতে পারল ব্যাপারটা কী ঘটেছে৷ ছিপ সামলাতে সামলাতে রমানাথের চোখ পড়ল রাজাবাবুর দিকে৷ উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে তিনি তাকিয়ে আছেন রমানাথের দিকে৷ আর এরপরই রমানাথ দেখল তিনি তার হাতের দামি ইংলন্ড ছিপটা প্রচণ্ড ক্রোধে হতাশায় হাঁটুর ওপর ভেঙে জলে ছুড়ে ফেলে ছুটতে শুরু করলেন রাজবাড়ির দিকে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই রমানাথ দক্ষ হাতে মাছটাকে খেলিয়ে পাড়ে তুলে ফেললেন৷ মাছের মুখ থেকে সুতোটা কেটে দিলেন তিনি৷ প্রায় পাঁচ হাত লম্বা মাছটার পেট না চিরলে বঁড়শি বেরোবে না৷

চারপাশটা বেশ অন্ধকার৷ পাড়াগ্রামে রাত আটটা মানে বেশ অনেক রাত৷ তবে বৃষ্টিটা থেমেছে৷ আর একটা গাড়ি ভাড়া করে এনেছেন তিনি৷ গাড়ি ছাড়া এতগুলো টাকা নিয়ে কলকাতার দিকে এত রাতে রওনা হতে ভরসা পাননি তিনি৷ তার ওপর আবার তাঁকে সন্ন্যাসীর জন্য এ-জায়গায় আসতে হত৷

এদিকে আসতে আসতে সারা পথ একটাই কথা রমানাথ ভেবেছেন৷ কী এমন অব্যর্থ টোপ দিলেন সন্ন্যাসী যে, মাছটা ধরা পড়ল? মন্ত্রপূত কিছু? কিন্তু এ ব্যাপার আবার ঠিক বিশ্বাস করেন না রমানাথ৷ তবে তা কীসের টোপ? সন্ন্যাসীকে মাছটা দেখাবার আগে মাছের পেট চিরতেও পারছেন না তিনি৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রমানাথের কৌতূহলটা বেড়েই চলেছে৷

গাড়িটা মন্দিরের সামনে থামল৷ পোড়ো মন্দির৷ কোথাও কোনও আলো নেই বা লোকজনও নেই৷ আশেপাশে বসতিও নেই কোনও৷ বড় রাস্তার পাশে শুধু ধানখেত৷ ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে৷ গাড়ি থামার শব্দেই বুঝি কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার মন্দির থেকে একটা মোমবাতি হাতে বেরিয়ে এলেন একজন৷ সেই অঘোর সন্ন্যাসী৷ তাঁকে দেখে গাড়ি থেকে মাছটা নিয়ে নামলেন রমানাথ৷ এতবড় মাছ যে তার মাথা আর লেজের দিকে দড়ি বাঁধা থাকলেও তা মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে৷ আর তেমনই ভারী৷

সন্ন্যাসী তাঁকে দেখে ইশারায় মন্দিরে ভিতরে ঢুকতে বললেন৷ চাতালে উঠে মাছসমেত মন্দিরে প্রবেশ করলেন রমানাথ৷ সন্ন্যাসীকে অনুসরণ করে মন্দিরের একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে একটা বেদির মতো জায়গাতে মাছটা নামাতে বললেন তিনি৷ সেই বেদির একপাশে সন্ন্যাসীর সেই কমণ্ডলু আর ঝোলাও রাখা আছে৷ সন্ন্যাসীর ইশারায় মাছটা সেখানেই রাখলেন রমানাথ৷ সন্ন্যাসী জিগ্যেস করলেন, ‘রাজাবাবুর খবর কী?’

রমানাথ জবাব দিলেন, ‘শুনলাম তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে৷ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে৷ তাঁর কর্মচারীদের একজন বলল যে তার ফলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছেন৷ আর কোনওদিন মাছ ধরতে বসতে পারবেন না তিনি৷

তাঁর জবাব শুনে সন্ন্যাসী মাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তিন লক্ষ টাকার ক্ষতির ধাক্কা সামলাতে পারেননি রাজাবাবু৷ এমনিতেই বেহিসেবি জীবনযাত্রায় বর্তমানে ধারে জর্জরিত তিনি৷ ভেবেছিলেন মাছটা ধরে টিকিটের টাকায় ধার মেটাবেন৷ তবে পাপ কাউকে ছাড়ে না৷ তিন-পুরুষ ধরে ওই ডাক্তারদের সাহায্যে কত মানুষকে যে মাছ ধরার বাজিতে ঠকিয়েছেন তার হিসেব নাই৷ ওই ডাক্তাররাই তো টোপ আর মাছের খাবার সরবরাহ করত রাজাবাবুদের৷ ঈশ্বর একদিন তাদেরও নিশ্চয়ই শাস্তি দেবেন৷ আমার বাবার জমি-জায়গা এই মাছ ধরার বাজিতে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রাজাবাবুর বাবা৷ আমার বাবা সব হারিয়ে আত্মহত্যা করলেন, মা না-খেতে পেয়ে মারা গেলেন, আর আমি শেষপর্যন্ত অনাথ হয়ে সন্ন্যাসী হলাম৷ তবে আমার একটা অনুরোধ আছে৷ টাকাপয়সা আমার চাই না৷ তবে মাছটা আপনি আমাকে দিয়ে দিন৷’

তাঁর কথা শুনে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেলেন রমানাথ৷ তিনি কী জবাব দেবেন বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলেন৷

সন্ন্যাসী মাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার আগে তাঁর মুখে শুনেছিলাম ঘটনাটা৷ আমার খালি মনে হত মহাশোলের টোপটা কী এমন জিনিস যে একমাত্র রাজাবাবুরাই মাছ ধরতে পারেন? কেমন যেন জেদ চেপে গেছিল আমার মনে৷ যে-মাছ আমার বাবার মৃত্যুর কারণ তাকে আমাকে ধরতেই হবে৷ গতবার আমি তাই এলাম এখানে৷ ভিক্ষার টাকা জমিয়ে টিকিট কাটলেও মাছটা রাজাবাবুই ধরলেন৷ তবে সেবার এসে মাছ ধরতে না পারলেও রাজাবাবুর টোপ সম্বন্ধে যেন একটা আবছা ধারণা হয়েছিল আমার মনে৷

সন্ন্যাসীর জীবন৷ ঘুরতে ঘুরতে হরিদ্বারের কাছে এক অঘোর সন্ন্যাসীদের ডেরায় উপস্থিত হলাম৷ তাদের ভাবনায় দীক্ষিত হলাম৷ সাধনার উপচার সংগ্রহের জন্য আমরা বসে থাকতাম গঙ্গার ধারে৷ মাথার মধ্যে কিন্তু ঘুরঘুর করত রাজাবাবুদের টোপের ব্যাপারটা৷ তখনই একদিন আমার চোখ খুলে গেল৷ বুঝতে পারলাম মহাশোলের টোপের ব্যাপারটা কী৷ তাই বারো বছর পর আবার ভিক্ষার টাকা জমিয়ে টোপ নিয়ে চলে এলাম৷ আর গতকাল রাত্রে ডাক্তারের দেওয়া টোপটা ফেলে দিয়ে রাজাবাবুর টোপের বাক্সে রেখে এলাম একই রকম দেখতে একটা জিনিস৷’

রমানাথ আরও বিস্মিতভাবে বললেন, ‘ব্যাপারটা শুনলাম৷ টাকার অর্ধেক অংশ আমি দিতে চাই আপনাকে৷ মাছটাও দিতে তেমন আপত্তি নেই৷ তবে রাজাবাবুরা কী টোপ দিয়ে মাছ ধরতেন? আপনার দেওয়া সেই অব্যর্থ টোপটাই বা কী ছিল?’

সন্ন্যাসী বললেন, ‘আমি সেটাই তো আপনাকে জানতে দিতে চাই না৷ পাছে আপনি সেটা আবার ব্যবহার করতে শুরু করেন৷ বড় মাছের বিশেষত মাংসাশী মাছের এর চেয়ে প্রিয় খাদ্য নেই৷ ঠিক আছে৷ মাছটা আপনি নিয়ে যান, টোপটা আমি নিয়ে নিই৷ সেটা আপনার দেখার দরকার নেই৷’ এই বলে সন্ন্যাসী তাঁর ঝোলার ভিতর থেকে একটা ছোট ছুরি বার করে এগিয়ে গেলেন মাছটার কাছে৷

দেহ দিয়ে রমানাথের দৃষ্টিকে আড়াল করে মাছের পেট চিরে বঁড়শি থেকে টোপটা খুলে নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে রমানাথের দিকে ফিরে বললেন, ‘এবার মাছটা আপনি নিয়ে যেতে পারেন৷’

রমানাথ সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বললেন, ‘ইচ্ছা থাকলে আপনার এখানে না এসে মাছটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে পেট চিরে টোপটা দেখতে পারতাম আমি৷ তা কিন্তু করিনি৷ আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এ-টোপ কোনওদিন ব্যবহার করব না আমি৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷’

সন্ন্যাসী তাঁর কালো চশমার আড়াল থেকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন রমানাথের দিকে৷ তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি আপনাকে বিশ্বাস করলাম৷’

সন্ন্যাসী এবার ধীরে ধীরে মেলে ধরলেন তাঁর হাতটা৷ একটা গোল বলের মতো ছোট জিনিস৷ ভালো করে সেটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন রমানাথ৷ সন্ন্যাসীর হাতে জেগে আছে একটা ‘চোখ’! অক্ষিগোলক!

রমানাথ কয়েক মুহূর্ত বাক্রুদ্ধ হয়ে থাকার পর প্রশ্ণ করলেন, ‘কীসের চোখ এটা?’

সন্ন্যাসী শান্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘মানুষের’৷

আঁতকে উঠলেন রমানাথ৷

সন্ন্যাসীর ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল৷ তিনি এরপর বললেন, ‘তবে এটা আমার চোখ৷ বাঁ-চোখের দৃষ্টিশক্তি চলে গিয়েছিল৷ ডাক্তারকে বললাম চোখটা তুলে পাথরের চোখ বসাতে৷ তারপর আমার এই চোখটা কমণ্ডলুতে আরকে ভিজিয়ে টোপ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ছুটে এলাম এখানে৷ রাজাবাবুর ডাক্তারও তাঁকে এমন একটা সত্যি চোখ মর্গ থেকে সংগ্রহ করে এনে দিয়েছিল গতকাল৷ সেটা ফেলে দিয়ে আমি তার জায়গায় রেখে এলাম আমার পাথরের চোখটা৷ জানেন তো, অঘোর সন্ন্যাসীরা নদী থেকে জলে-ভাসা লাশ সংগ্রহ করে৷ গতবার মাছ ধরার পরের দিন একটা বাচ্চা ছেলে দহের জলে ডুবে মারা গিয়েছিল৷ তার লাশ যখন তোলা হল তখন দেখেছিলাম তার চোখ দুটো নেই৷ আর গঙ্গার তীরে যে মৃতদেহ ভেসে আসে খেয়াল করবেন তাদের চোখ থাকে না৷ মাছের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য মানুষের চোখ৷ মহাশোলের টোপ...’

কথা বলতে বলতে চোখের চশমা খুলে ফেললেন সন্ন্যাসী৷ রমানাথ দেখতে পেলেন তাঁর বাঁ-চোখের কোটরে জমাট বাঁধা অন্ধকার! সন্ন্যাসী তাঁর চোখটা হাতের কমণ্ডলুর মধ্যে যত্ন করে রেখে বললেন, ‘এটাকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেব৷ হয়তো বা কোনও মহাশোলের কাজে লাগবে৷’

সন্ন্যাসীর পিছন পিছনই রমানাথও মাছটা নিয়ে মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলেন৷ রমানাথ চড়ে বসলেন গাড়িতে৷ আর সন্ন্যাসী ভেজা বাতাসে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন তাঁর হাতের কমণ্ডলুতে মহাশোলের টোপ নিয়ে৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%