হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

একটা পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট সমতলমতো একখণ্ড জায়গাতে গাইডের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলাম আমি আর হার্বাট৷ আমাদের চারপাশে ছোট-ছোট পান্না সবুজ পাহাড় খাড়া হয়ে উঠে গেছে নীল আকাশের দিকে৷ পাহাড়গুলোর মাথাগুলো কুয়াশায় মোড়া৷ আর তার ধাপে ধাপে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যের নানা চিহ্ণ৷ কোথাও পাথুরে দেওয়ালের খণ্ডাংশ, কোথাও ছাদহীন ঘরের চিহ্ণ, আবার কোথাও বা পাথুরে সোপানশ্রেণি বা কোনও স্তম্ভর ভগ্ণাবশেষ৷ একবুক স্মৃতি নিয়ে আজও আন্দিজ পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে তারা৷ মাচু পিচু! প্রাচীন ইনকা সভ্যতার বিখ্যাত নগরীর ধবংসাবশেষ৷ কেউ বলেন, এই নগরী নাকি একসময় প্রাচীন ইনকাদের গোপন সাধনাস্থল ছিল৷ আবার কেউ কেউ বলেন যে, সূর্যদেবের উপাসক স্বর্ণনগরীর বাসিন্দা ইনকারা নাকি তাদের স্বর্ণভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিল আন্দিজ পাহাড়ের কোলে এই গোপন নগরীতেই৷ তবে এসব ঘটনার সত্য-মিথ্যা নিশ্চিত ভাবে যাচাই করার কোনও সুযোগ আর নেই৷ কারণ হাজার বছরের প্রাচীন এই নগরীর ধবংসাবশেষ কোনও কথা বলতে পারে না৷ অতএব গাইডের কথাই ভরসা৷
আমি আর হার্বাট দুজনেই এক বহুজাতিক সফটওয়ার কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মী৷ হার্বাট আমার চেয়েও উচ্চপদে আসীন৷ আমি ইন্ডিয়া থেকে আর হার্বাট ইউ.কে থেকে গতকাল ইনকা সভ্যতার সময়ের সাবেক রাজধানী কুজকোতে এসেছিলাম আমাদের কোম্পানির কনফারেন্সে যোগ দিতে৷ সে-কাজ মিটে যাবার পর আজ সকালে গাড়িতে ঘণ্টা দুইয়ের রাস্তা পেরিয়ে উপস্থিত হয়েছি ইউনেস্কোর এই হেরিটেজ সাইট মাচুপিচু দেখার জন্য৷
পাহাড়ের পাদদেশে একটা ছোট্ট হোটেলে রাত্রিবাসের জন্য ঘর ভাড়া নিয়েছি আমরা৷ ইচ্ছা আছে আজকের রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল সকালে কুজকো হয়ে লিমা ফিরে সেখান থেকে ফ্লাইট ধরে যে-যার নিজের দেশে পাড়ি দেব৷ গল্প-উপন্যাসে কত পড়েছি ইনকাদের কাহিনি! তাই এত কাছে এসে বঞ্চিত হতে চাইনি এ-জায়গার দর্শনলাভ থেকে৷
গাইড তার কথা বলতে বলতে পাহাড়ের ধাপ বেয়ে এগোতে লাগল৷ আমরা তাকে অনুসরণ করতে করতে শুনছিলাম তার কথা৷ সে বলে চলেছিল লাটিন আমেরিকার প্রাচীন জনজাতি ইনকাদের নানা গল্প—তাদের স্বর্ণবৈভবের কথা, আর শেষ পর্যন্ত সেই সোনার লোভে কীভাবে স্পেনিয়ার্ড হার্নাদো কার্তেজ ধবংস করেছিল ইনকাদের, কেমনভাবে স্পেনীয় হানাদাররা শেষ ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালপাকে মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসির দড়ি পড়িয়েছিল, সে কাহিনি৷ পাহাড়ের ধাপে দাড়িয়ে থাকা স্থাপত্য চিহ্ণগুলো দেখিয়ে বোঝাচ্ছিল তার কোনটা মন্দির ছিল, কোনটা উপাসনাস্থল, পুরোহিত বা দেবদাসীদের থাকার জায়গা ছিল৷
এটা টুরিস্ট সিজন নয়, বর্ষাকাল৷ মাঝে মাঝে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ছে৷ পাহাড়গুলোর মাথার ওপর থেকে নীল আকাশের বুকে মাঝে মাঝে মেঘ ভেসে আসছে, আবার উধাও হয়ে যাচ্ছে৷ সামান্য কিছু টুরিস্ট ইতিউতি ঘুরছে৷ পাহাড়ের ঢালগুলোতে চড়ে বেড়াচ্ছে অনেকটা ডঁটের মতো লম্বা গলাওলা, কিন্তু আকারে অনেক ছোট প্রাণী, লামার দল৷ পশমলা এই প্রাণীগুলো শুধু লাতিন আমেরিকাতেই পাওয়া যায়৷
গাইডের পিছন পিছন ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গাতে এসে দাঁড়ালাম আমরা৷ পাহাড়ের ঢালে সেখানে পাথর-বাঁধানো চত্বর৷ আর তার গা ঘেঁসে সার সার বেশ কয়েকটা ছাদহীন ঘর দাঁড়িয়ে আছে৷ সেই চত্বরটা দেখিয়ে গাইড বলল, ‘এ-জায়গাতে একসময় সূর্যমন্দির ছিল৷ আর যে-ঘরগুলো দেখছেন সেখানে থাকতেন এক্লাকুনরা৷’
‘এক্লাকুনরা মানে?’
গাইড জবাব দিল, ‘দেবতার সেবিকা ছিলেন সেই কুমারী নারীরা৷ তারা কোনও দিন এই মন্দিরের বাইরে যেতেন না৷ একমাত্র রাজা ও রানি ছাড়া তাঁদের সঙ্গে কেউ সাক্ষাৎ করতে পারত না৷ তাঁদের দিকে তাকানোও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল৷ আর কোনও কারণে কোনও পুরুষ তাঁদের স্পর্শ করলে তার মৃত্যু অবধারিত ছিল৷ প্রতিবছর একটা নির্দিষ্ট দিনে একজন এক্লাকুনকে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে তাঁকে মমি বানিয়ে রাখা হত আন্দিজ পাহাড়ের গোপন স্থানে৷ এক্লাকুনরা অমর৷ তারা মৃত্যুহীন৷ তাদের মমিগুলো আজও প্রাণ ফিরে পায়...’
গাইডের কথা শুনে হার্বাট মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার শেষ কথাগুলো ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়৷ হাজার বছরের প্রাচীন মমি প্রাণ ফিরে পায়!’
গাইড কিন্তু রর্বাটের ব্যঙ্গের হাসি গায়ে মাখল না৷ বরং সে আরও গম্ভীরভাবে বলল, ‘হাসবেন না সাহেব৷ এখানে বেশ কয়েকটা মন্দিরে এক্লাকুন মমি পাওয়া গেছে৷ অনেকেই তাদের জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখেছে৷ নড়তে দেখেছে৷ এখানেও তেমন একটা এক্লাকুন মন্দির আছে৷’
হার্বাট সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ণ করল, তুমি আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারবে?’
গাইড বলল ‘আমি কেন, কোনও গাইড-ই তোমাদের সেখানে নিয়ে যাবে না৷ সে-মন্দিরে প্রবেশ করলে এক্লাকুনদেবী জেগে উঠে ক্রুদ্ধ হবেন৷ তাঁকে ছুঁলে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্য অবধারিত৷ এমনকী সে-মন্দিরে প্রবেশ করলেও বছরখানেকের মধ্যেই মৃত্যু হয়৷ একবার এক সাহেব ঝড়-জলের রাতে আমাদের কথা না-শুনে ওখানে গেছিলেন, পরদিন মন্দিরের বাইরে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়৷ এমনকী স্থানীয় যে দুজন লোক সেই মৃতদেহটা তুলে এনেছিল তারা বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মারা যায়৷ এমনই ভয়ঙ্কর রাগ দেবী এক্লাকুনের৷’
কথাটা শুনে হার্বাট কী যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ছাদহীন ভাঙা ঘরগুলোর দেওয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চারজন মেয়ে৷ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল তারা৷ তাদের পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঝুলের রেশমি রংচঙে পোশাক, মাথার চুল কপালের সামনে সোনালি রিবন দিয়ে বাঁধা, হাতে কানে গলায় পাথরের তৈরি সাবেকি ইনকা গহনা৷ বয়স সম্ভবত ষোলো থেকে আঠারো হবে৷ তাদের দিকে তাকিয়ে যেখানে আমার চোখ আটকে গেল তা হল তাদের বুকের কাছটা৷ অন্তর্বাসহীন প্রস্ফুটিত বুকগুলো যেন মসৃণ রেশমের আবরণ ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ তাদের শঙ্খর মতো স্তন, স্তনবৃন্ত সব-ই স্পষ্ট দৃশ্যমান৷
সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফেরালাম আমি৷ হার্বাট বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তাদের দিকে৷ বলা ভালো, তাদের স্তনের দিকে৷ তারপর গাইডকে প্রশ্ণ করল, ‘এরা কারা?’
গাইড জবাব দিল, ‘এরা দেবী এক্লাকুন সেজেছে৷ ইচ্ছা হলে আপনারা ওদের কিছু সাহায্য করতে পারেন৷’
গাইডের কথা শুনে হার্বাট একটা দশ সোল বা পেরুভিয়ান টাকার নোট বের করে সেটা ফেলল এক এক্লাকুনের হাতে-ধরা ঝুড়িতে৷ মেয়েগুলো আবার চলে গেল সেই ভাঙা দেওয়ালগুলোর আড়ালে৷
আমাদের নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল গাইড৷ হঠাৎ হার্বাট তাকে প্রশ্ণ করল ‘এক্লাকুনদের পাওয়া যায়?’
গাইড বলল, ‘তার মানে?’
হার্বাট বলল, ‘মানে হল টাকা দিলে কি ওদের কেউ আমার সঙ্গে রাত কাটাবে?’
গাইড কথাটা শুনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘এ কথা কখনও মনে আনবেন না৷ ওরা প্রত্যেকেই এক্লাকুনদেবীদের মতোই কুমারী৷ তাছাড়া এক্লাকুনদেবী সাজে ওরা৷ এ-চিন্তা মাথায় আনলে আপনার ক্ষতি হতে পারে৷’
হার্বাট বলল, ‘তাহলে ওরা পোশাকের তলা থেকে বুক দেখিয়ে আমাদের প্রলুব্ধ করছিল কেন?’
গাইড বলল, ‘না, প্রলুব্ধ নয়৷ আসলে এক্লাকুনদেবীরা অমন পোশাক পরতেন৷’
গাইড এরপর আর কোনও কথা বলল না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই স্মারকগুলো দেখানো শেষ করে পয়সা বুঝে নিয়ে চলে গেল৷
সে চলে যাবার পর আমি হার্বাটকে বললাম, ‘তুমি সত্যিই মেয়েগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী নাকি?’
হার্বাট বলল, ‘পেলে মন্দ হত না৷ দেখে ভার্জিন বলেই মনে হল৷ আমি এমন মেয়েই পছন্দ করি৷’
আমি আর এ-ব্যাপারে কথা বাড়ালাম না৷ গাইড চলে গেছে ঠিকই৷ কিন্তু আমাদের কোনও তাড়া নেই৷ তাই জায়গাটাতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম আমরা৷
হঠাৎ একটা ছোটখাটো ভিড় দেখে আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম সে জায়গাতে৷ একটা পাথুরে প্রাচীরের সঙ্গে তেরপলের আচ্ছাদন টাঙিয়ে একটা তাবু বানানো হয়েছে৷ তার সামনে নানান আকারের প্রাচীন ইনকাদের মূর্তি, বাসনপত্র ইত্যাদির রেপ্লিকা রাখা৷
ঘাসের বোনা টুপি পরা স্থানীয় এক বৃদ্ধ একটা লামাকে নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে৷ লামাটা সুন্দরভাবে সাজানো৷ প্রাণীটার গলায়, চারপায়ে রঙিন ফিতে বাঁধা, পিঠ থেকে ঝুলছে পুঁতির ঝালর৷ বৃদ্ধর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে এক্লাকুন-সাজা একটা মেয়ে৷ হতে পারে এ মেয়েটিও সেই এক্লাকুন সাজা মেয়ে চারজনের মধ্যে ছিল৷ আসলে মেয়েগুলো প্রায় একই বয়সি আর একইরকম পোশাকে সজ্জিত ছিল বলে আমার চোখে তখন তাদের সবাইকেই একইরকম লাগছিল৷
তাঁবুটার সামনে জটলাটা কেন তা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম৷ ভিড়ের মধ্যে এক শ্বেতাঙ্গ টুরিস্ট দাঁড়িয়েছিল৷ অসংখ্য বলি-রেখাময় মুখমণ্ডলের পেরুভিয়ান লামা মালিকের হাতে ধরা ছিল তারের তৈরি বেশ বড় কয়েকটা রিং৷ দশ সোলের বিনিময়ে বৃদ্ধ সেই রিংগুলো তুলে দিল শ্বেতাঙ্গ লোকটার হাতে৷ তারপর তাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালো লামাটার থেকে হাত কুড়ি দূরে মাটিতে খড়ি কাটা একটা জায়গার সামনে৷
টুরিস্টটাকে সে-জায়গায় দাঁড় করিয়ে বৃদ্ধ আবার আগের জায়গাতে ফিরে এসে লামাটার উদ্দেশ্যে কী যেন বলতেই সে তার লম্বা গলাটা তুলে স্থির হয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল৷ আসলে খেলাটা হচ্ছে লোকটা যদি তার হাতের রিং-তিনটের কোনওটা ছুড়ে লামাটার গলায় পরাতে পারে তাহলে তাবুর সামনে রাখা স্যুভেনিরগুলোর কোনও একটা সে নিতে পারবে আর টাকাটাও ফেরত পাবে৷ না-পারলে টাকাটা পাবে লামার মালিক৷ বলা যেতে পারে ওটা একধরনের জুয়া৷
খেলাটা দেখতে লাগলাম আমরা৷ লামালা বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ টুরিস্টকে ইশারা করল রিং ছোড়ার জন্য৷ ছুড়ল লোকটা৷ প্রথম রিংটা লামার বেশ কয়েক হাত তফাত দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ সেটা লুফে নিল লামালা বুড়োটা৷ ব্যাপারটা যত সোজা মনে হয় ঠিক তত সোজা নয়৷ দ্বিতীয় রিংটা বেশ সাবধানে ছুড়ল লোকটা৷ রিংটা লামার গলায় হয়তো আটকে যেত কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঘাড় সরিয়ে নিল লামাটা৷ তার গলায় লেগে ছিটকে পড়ল রিংটা৷ টুরিস্ট তাই দেখে বলে উঠল, ‘তোমার লামাটা মাথা সরিয়ে নিল কেন? আমি এরজন্য আর একটা বাড়তি সুযোগ পাব তো?’
বৃদ্ধ পেরুভিয়ান বলল, ‘না, পাবে না৷ এটাও তো খেলার একটা অঙ্গ৷ সে কখন মাথা নাড়বে তা তার মর্জি৷ আমার বা তোমার কারো জানা নেই৷’
অগত্যা লোকটা তার হাতের শেষ রিংটা ছুড়ল৷ সেটাও হয়তো লামাটার গলায় আটকাত কিন্তু শেষমুহূর্তে আবারও একই কাণ্ড করল প্রাণীটা৷ ঘাড় ফিরিয়ে নিল৷ রিংটা ছিটকে পড়ল মাটিতে৷ বৃদ্ধ কুড়িয়ে নিল সেটা৷ হাসি ফুটে উঠেছে তার মুখে৷ টাকাটা পকেটস্থ করতে পেরেছে সে৷ টুরিস্ট ব্যাজার মুখে এগোল অন্য দিকে৷ ভিড়টাও ভেঙে গেল৷ আর আমরাও খেলাটা দেখে এগোলাম অন্যদিকে৷
কিন্তু কিছুটা এগিয়েই হার্বাট থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে বলল, ‘চলো তো একবার লামালাটার কাছে যাওয়া যাক৷’
আমি বললাম, ‘কেন, তুমি খেলবে নাকি?’
হার্বাট সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, ‘দেখা যাক৷’
পিছু ফিরে কিছুটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম সেই লামালার সামনে৷ আমাদের দেখে লামালা হাসল৷ মেয়েটাও হাসল৷ স্বাভাবিক কারণেই আমার আর হার্বাটের চোখ মুহূর্তের জন্য আটকে গেল মেয়টার বুকের ওপর৷ হয়তো বা এ-খেলাতে খদ্দেরকে আকৃষ্ট করার জন্যই মেয়েটাকে এক্লাকুন সাজিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে৷ বুড়ো লোকটা প্রশ্ণ করল, ‘তোমরা খেলবে?’
হার্বাট বলল, ‘খেলব৷ কিন্তু তার আগে একটা জিনিস জানার প্রয়োজন৷ রিংটা লামার গলায় পড়ার আগের মুহূর্তে প্রাণীটা ঘাড় সরাচ্ছে কেন? কোনও ট্রেনিং দেওয়া আছে নাকি?’
বৃদ্ধ বলল, ‘না, ওটা ওর মর্জির ব্যাপার৷ ওর গলায় যে রিং পড়ানো যায়, আর ও যে সব সময় ঘাড় ফেরায় না সেটা আমি তোমাদের দেখাচ্ছি৷’
কথাগুলো বলে বৃদ্ধ লামাটাকে গলা তুলিয়ে দাঁড় করিয়ে রিং নিয়ে হাত কুড়ি দূরে খড়ি-কাটা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াল৷ তারপর পরপর তিনটে রিং ছুড়ল লামাটাকে লক্ষ্য করে৷ লামাটা একবারের জন্য ঘাড় ফেরাল না৷ তিনটে রিং-ই পরপর জমা হল লামাটার গলায়! বৃদ্ধ হেসে আমাদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘কী দেখলে তো?’
হার্বাট একটা দশ সোলের নোট বের করে বৃদ্ধর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘প্রথমে আমার বন্ধু খেলবে৷ তারপর দেখি আমি খেলি কিনা!’
হার্বাটের কথা শুনে আমি মৃদু বিস্মিত হলেও আপত্তি করলাম না৷ বৃদ্ধ আমার হাতে তিনটে রিং ধরিয়ে দিল৷ আমি গিয়ে দাঁড়ালাম সেই খড়ি-কাটা জায়গাটাতে৷
ঘাড় তুলে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে লামাটা৷ আমি প্রথম রিংটা ছুড়লাম৷ লামাটার দু-হাত দূর দিয়ে বেরিয়ে গেল সেটা৷ দ্বিতীয় রিংটা যত্ন করে ছুড়লাম৷ সেটা লামাটার গলার আরও ঘনিষ্ঠ হলেও লক্ষ্যভেদ করতে পারলাম না৷ তৃতীয় রিংটা ছোড়ার আগে আমি বেশ কিছুক্ষণ মনসংযোগ করলাম৷ আমার হাত থেকে ছুটে গেল রিংটা৷ এবার কিন্তু নিশ্চিতভাবেই সেটা লামার মাথা দিয়ে গলে যেতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, শেষ মুহূর্তে প্রাণীটা মাথা সরিয়ে নিল৷ তার ঘাড়ে ধাক্কা খেয়ে রিংটা জমা হল বৃদ্ধের হাতে৷ দশ সোল গচ্চা গেল!
আমি একটু হতাশ ভাবে তাকালাম হার্বাটের দিকে৷ দেখি সে কৌতূকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ আমি আবার ফিরে এসে হার্বাটের পাশে দাঁড়ালাম৷
বৃদ্ধ এবার হার্বাটকে বলল, ‘তুমি এবার খেলবে তো?’
হার্বাট চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘আচ্ছা এই তাবুর সামনে লামাসমেত যেসব জিনিস আছে তা সব তোমার নিজের তো?’
বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, সব নিজের৷ কেন?’
রবার্ট তার ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকিয়ে বলল, ‘চলো, তবে একটা বড় বাজি খেলা যাক৷ দশ সোল নয় দশহাজার সোলের খেলা৷ আমি যদি জিতি তো তোমার সব জিনিস আমার৷ আর হারলে দশ হাজার সোল তোমার৷’
কথাটা শুনে আমার-ই মতো বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল বৃদ্ধ আর এক্লাকুন মেয়েটার মুখে৷ দশ হাজার সোল!
হার্বাট ব্যাগ থেকে একটা একশো সোলের বান্ডিল বের করে মেলে ধরল বৃদ্ধর সামনে৷ জানি হার্বাটের অনেক টাকা৷ কিন্তু সে পাগল হয়ে গেল নাকি? আমি মুহূর্তের মধ্যে বিস্ময়ের ভাব কাটিয়ে উঠে তাকে নিরস্ত করার জন্য বললাম, ‘হার্বাট, এ কী করছ তুমি? এত টাকা জুয়ায় বাজি ধরছ?’
হার্বাট আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আরে আমাদের জীবনটাই তো একটা বড় জুয়া৷ আজ আছি কাল বেঁচে থাকব কিনা কে বলতে পারে? দেখাই যাক না বাজি ধরে কী হয়?’
বৃদ্ধ মনে হয় বুঝে উঠতে পারছিল না কী করবে৷ কিন্তু হঠাৎ সেই মেয়েটা কয়েক পা এগিয়ে এসে হার্বাটের হাত থেকে টাকার বান্ডিলটা নিয়ে প্রথমে তাকে বলল, ‘ঠিক আছে, এ-শর্তে আমরা রাজি৷’
দশহাজার সোল মানে অনেকগুলো টাকা৷ যে মূর্তিগুলো রয়েছে তার মিলিত দাম হাজার সোল হবে কিনা সন্দেহ৷ কাজেই বৃদ্ধও এবার বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, আমি রাজি৷ হারলে আমার যা আছে সব তোমার৷’
বাজির শর্ত পাকা হয়ে গেল উভয় তরফে৷
বৃদ্ধের হাত থেকে তিনটে রিং নিল হার্বাট৷ তারপর আমার হাতে তার ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে গিয়ে দাঁড়াল খড়ি দিয়ে দাগকাটা জায়গাটাতে৷ আমার বুক ঢিপ্ঢিপ্ করতে লাগল৷ পারবে কি হার্বাট? এতগুলো টাকা!
হার্বাট কিন্তু স্থির অচঞ্চল৷ একবার সে শুধু তাকাল আমার দিকে, তারপর মনঃসংযোগ করল লামাটার দিকে৷ প্রাণীটা আবারও গলা তুলে দাঁড়িয়েছে বৃদ্ধর নির্দেশে৷ বৃদ্ধ হার্বাটকে ইঙ্গিত করল রিংটা ছোড়ার জন্য৷
প্রথম রিংটা ছুড়ল হার্বাট৷ অব্যর্থ লক্ষ্যে যেন সেটা লামার আকাশের দিকে তুলে ধরা মাথা গলে গলায় প্রবেশ করতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু শেষ মুহূর্তে লামাটা মাথা সরিয়ে নিল৷ তার লম্বা কণ্ঠদেশে আঘাত করে মাটিতে ছিটকে পড়ল রিংটা৷ আবছা হাসি যেন ফুটে উঠল সেই পেরুভিয়ান বৃদ্ধ ও এক্লাকুন মেয়েটার ঠোঁটের কোণে৷ বৃদ্ধ কুড়িয়ে নিল রিংটা৷ হার্বাট প্রস্তুত হল দ্বিতীয় রিংটা ছোড়ার জন্য৷
কিছু সময়ের বিলম্ব৷ হার্বাট ছুড়ল দ্বিতীয় রিংটা৷ এ-রিংটা লামাটাকে স্পর্শ করা তো দূরে থাক, বেশ অনেকটা দূর দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ এত দূর দিয়ে আমার ছোড়া রিংগুলোও কোনওটা যায়নি৷ গাড়িতে আসার সময় এই সাতসকালেই বেশ কয়েকটা ক্যান্ডবিয়ার খেয়েছিল হার্বাট৷ তবে কি নেশার ঘোরেই বাজিটা সে ধরল! বৃদ্ধের হাসিটা এবার আরও চওড়া হল৷
এবার তৃতীয়, অর্থাৎ লাস্ট চান্স৷ হার্বাট এবার ব্যর্থ হলে দশ হাজার সোল চলে যাবে লোকটা আর মেয়েটার হাতে৷ যদিও টাকাটা আমার নয়, তবুও উত্তেজনায় যেন হাতুড়ি পেটা শুরু হল আমার বুকে৷ হার্বাট ধীরে ধীরে রিংটা তুলে ধরল ছোড়ার জন্য৷ কিন্তু রিংটা ছুড়তে গিয়েও শেষ মুহূর্তে হাতটা নামিয়ে নিল সে৷ তারপর বৃদ্ধ আর মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোমরা লামাটার থেকে দূরে গিয়ে ওই যে স্তম্ভটা আছে পিছনদিকে, ওখানে গিয়ে দাঁড়াও৷’
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে জিগ্যেস করল ‘কেন? ওখানে গিয়ে দাঁড়াব কেন?’
হার্বাট অক্লেশে বলল, ‘তোমার পোশাকের ভিতর দিয়ে দেখা যাওয়া স্তন আর তোমার সঙ্গী লামালা বৃদ্ধর মুখ আমার মনঃসংযোগের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, তাই৷ আশা করি ওখানে দাঁড়ালেও তোমরা দেখতে পাবে যে প্রাণীটার গলায় আমি রিং পরাতে পেরেছি কিনা?’
হার্বাটের কথা শুনেও কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল তারা৷ তা দেখে হার্বাট ধমকের সুরে বলে উঠল, ‘কী হল? আপত্তিটা কোথায় শুনি? বলছি তো সরে যাও ওই স্তম্ভর কাছে৷ আমার মনঃসংযোগ নষ্ট কোরো না৷’
হাবার্টের ধমক খেয়ে বুড়ো আর তরুণীর ঠোঁটের কোণে জেগে থাকা হাসি যেন এবার মিলিয়ে গেল৷ হার্বাট আবারও চিৎকার করে বলল, ‘কী হল? কথা কানে যাচ্ছে না? তবে আমি আর খেলব না৷ এই মেয়ে, তুমি তোমার বুক দেখিয়ে আর লামালা তুমি তোমার মুখ দেখিয়ে মন সংযোগ নষ্ট করছ আমার৷ হয় সরে যাও, নইলে আমার টাকা ফেরত দাও৷ আমি আর বাজি খেলব না৷’
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথমে রক্তিম হয়ে উঠল মেয়েটার মুখ৷ নিশ্চিতভাবে তার বুক দেখানোর কথাটা শুনেই৷ বুড়োটার দিকে তাকিয়ে নিজস্ব ভাষায় কী যেন বলল মেয়েটা৷ তারপর নিতান্ত অনিচ্ছাকৃতভাবেই যেন হার্বাটের নির্দেশ মেনে এগোল লামাটার পিছন দিকে সেই স্তম্ভর দিকে৷ আমি স্পষ্ট লক্ষ করলাম যে, আবছা হাসি ফুটে উঠেছে হার্বাটের ঠোঁটের কোণে৷
এবার তৃতীয় এবং শেষ সুযোগ৷ হার্বাটের কথা পালন করেছে বুড়ো আর মেয়েটা৷ এবার নিষ্ফল হলে হার্বাটের আর কিছু বলার নেই৷ দশ হাজার সোল গুনাগার দিতে হবে তাকে৷ উত্তেজনায় আমার হৃৎপিণ্ড যেন ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে৷
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা৷ হার্বাটের দৃষ্টি লামাটার দিকে নিবদ্ধ৷ ধীরে ধীরে রিং ধরা হাতটা মাথার ওপর তুলল হার্বাট৷ তারপর সেটা ছুড়ে দিল লামাটার গলা লক্ষ্য করে৷
কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন আমার সব কিছু চিন্তা, দৃষ্টি লোপ পেয়েছিল৷ আর তারপর সম্বিত ফিরে পেতেই দেখলাম, লামাটার গলায় ঝুলছে হার্বাটের হাতের রিংটা! হার্বাট জায়গাটা ছেড়ে এগিয়ে আসছে৷ তার মুখে বিজয়ীর হাসি৷ বাজি জিতে গেছে সে!
হার্বাট এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার কাঁধে হাত রাখল৷ তখনও আমার ঘোর পুরোপুরি কাটেনি৷ যেন বিশ্বাসই হতে চাইছে না ব্যাপারটা৷ বুড়োটা আর মেয়েটাও সামনে এসে দাঁড়াল৷ তাদের চোখেও বিস্ময়৷ এমনটা হবে সম্ভবত তা ভাবতে পারেনি কেউ৷
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা৷ তারপর বৃদ্ধ মাথা নীচু করে বলল, ‘তুমি জিতে গেছ৷ টাকা ফেরত দিচ্ছি৷ আর জিনিসগুলোও নিয়ে যাও৷’
এক্লাকুন তার পোশাকের ভিতর থেকে টাকার বান্ডিলটা বের করল৷
হার্বাট পেরুভিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল, ‘টাকা ফেরত দিতে হবে না৷ আমি শুধু একটা জিনিস-ই নেব৷’
‘কী জিনিস?’ জানতে চাইল বুড়োটা৷
একটু চুপ করে থেকে আমাকে বিস্মিত করে হার্বাট জবাব দিল, ‘তোমার সঙ্গী এই মেয়েটাকে নেব৷ তবে শুধু আজকের রাতের জন্য৷’
হার্বাটের কথা শুনে বৃদ্ধ আর মেয়েটা আমার মতোই চমকে উঠল৷ লামালা বলে উঠল, ‘এ কী বলছ তুমি?’
হার্বাটের মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না৷ সে বলল, ‘ঠিকই বলছি৷ তুমি তো বলেছিলে তোমার যা আছে তা বাজি জিতলে সব পাব৷’
বৃদ্ধ বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, আমি তা বলেছিলাম ঠিকই কিন্তু আমার কথার অর্থ এই ছিল না৷’
আমি এবার হার্বাটকে থামাবার জন্য বললাম, ‘টাকাটা নিয়ে এবার ফিরে চলো হার্বাট৷ কী হচ্ছে এসব?’
হার্বাট কথাটা শুনে আমাকে ধমকের সুরে বলল, ‘তুমি চুপ করো৷ ইচ্ছা হলে তুমি চলে যেতে পারো৷ এই বুড়ো আর এক্লাকুন-সাজা মেয়েটা লোক ঠকায়৷ আমি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছি৷ বাজি যখন জিতেছি তখন এই মেয়েটাকে আজ রাতের জন্য চাই৷
আমি বললাম, ‘ওরা লোক ঠকায় মানে?’
হার্বাট দৃঢ়ভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, লোক ঠকাবার কারবার করে এরা৷ রিংটা গলায় পড়ার উপক্রম হলেই লামাটা মাথা সরায় কেন জানো? লামাটার দৃষ্টি থাকে তার মাথার সঙ্গে সমান্তরালে কিছুটা তফাতে দাঁড়ানো এই এক্লাকুনের ওপর৷ রিংটা লামাটার গলায় পড়ার সম্ভাবনা হলেই এই মেয়েটা মাথার ওপর দু-হাত তোলে৷ লোকজনের দৃষ্টি লামা আর যে লোক রিং ছুড়ছে তার ওপর থাকে বলে মেয়েটাকে তেমনভাবে কেউ খেয়াল করে না৷ আর খেয়াল করলেও মনে হতে পারে যে, মেয়েটা হয়তো উত্তেজনার বশে হাত ওপরে তুলছে৷
কিন্তু ওটাই হল আসল সংকেত৷ ওই সংকেত লক্ষ করেই লামাটা মাথা ঘোরায়৷ এমন-ই ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে ওকে৷ ব্যাপারটা আমি ধরে ফেলেছি৷ ইচ্ছাকৃতভাবেই আমি দ্বিতীয় রিংটা দূরে ছুড়েছিলাম যাতে এদের মনে কোনও সন্দেহ না জাগে সেজন্য৷ তারপর বুড়ো আর মেয়েটাকে লামাটার পিছনে তার দৃষ্টিশক্তির বাইরে পাঠিয়েছিলাম যাতে তারা কোনও সংকেত করতে না পারে তাই৷’
কথাগুলো বলে হার্বাট তাকাল লামালা আর মেয়েটার দিকে৷ হার্বাটের কথাগুলো শুনে বৃদ্ধর লোলচর্ম যেন আরও ঝুলে গেল, আর ফ্যাকাশে হয়ে গেল মেয়েটার মুখটাও৷ ধরা পড়ে গেছে তারা৷
আমি কথাটা শুনে বিস্মিত হলেও আবারও হার্বাটের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘যা হবার হল৷ চলো এবার টাকাটা নিয়ে ফিরে যাই৷’
আমার কথার কোনও জবাব দিল না হার্বাট৷ কথাটা পাত্তা দিল বলেও মনে হল না৷ বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘কী করবে বলো?’
বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘না, এ হয় না৷ অসম্ভব৷ আমার যা অন্য কিছু আছে তুমি নিয়ে যাও৷’
হার্বাট হেসে বলল, ‘ওসব মূর্তি-আবর্জনা নিয়ে আমি কী করব? যা চাচ্ছি তাই দাও৷ একটা রাতের তো ব্যাপার৷ কেউ কিছু জানবে না৷ তাছাড়া টাকাটাও তোমার হবে৷ এত টাকা জীবনে কামাতে পারবে না তুমি৷’
বৃদ্ধ আবারও বলল, ‘না, এ সম্ভব নয়৷’
কথাটা শুনে রবার্ট হেসে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, ব্যাপারটা যখন সম্ভব নয়, তখন আমি টুরিস্টদের আর এখানকার কর্ত্তৃপক্ষকে জানাব ব্যাপারটা৷ জানাব কীভাবে বিদেশী টুরিস্টদের ঠকাও তোমরা৷ ব্যাপারটা সবাই যখন জানতে পারবে তখন তোমার ব্যবসা তো বন্ধ হবেই, তার সঙ্গে সঙ্গে জেলের ঘানিও টানতে হবে৷’
হার্বাটের কথাগুলো শুনতে শুনতে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল তাদের মুখে৷ চুপ করে রইল তারা৷
দূর থেকে একদল টুরিস্ট এগিয়ে আসছিল৷ তাদের দেখিয়ে হার্বাট বৃদ্ধকে বলল, ‘তোমরা যখন রাজি নও তখন ওই ট্যুরিস্টদলটাকে দিয়েই আমার কাজটা শুরু করা যাক?’
এক্লাকুন মেয়েটা এবার তাদের নিজস্ব ভাষায় কী যেন বলল বৃদ্ধের উদ্দেশ্যে৷ তারপর হার্বাটকে বলল, ‘ওসবের কোনও দরকার নেই৷ তুমি কোন হোটেলে উঠেছ?’
হার্বাট বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, ‘হোটেল সান টেম্পল৷’
মেয়েটা জবাব দিল, ‘ঠিক আছে, রাত দশটায় আমি যাব সেখানে৷ তবে হোটেলে ব্যাপারটা হবে না৷ আমি অন্য জায়গাতে নিয়ে যাব তোমাকে৷ হোটেলে পুলিশের ভয় আছে৷ এসব ব্যাপারে এখানকার আইন খুব কড়া৷ একসঙ্গে ধরা পড়লে দুজনেরই জেল হবে৷’
হার্বাট বলল, ‘আচ্ছা, তবে তাই হবে৷ তোমার জন্য অপেক্ষা করব৷ তবে আমরা বিদেশী বলে চালাকি করার চেষ্টা কোরোনা৷ তাতে বিপদ হবে তোমাদের৷’
ট্যুরিস্টদের দলটা কাছে এসে পড়েছে৷ মেয়েটা আর সময় নষ্ট না করে বলল, ‘নিশ্চিন্তে থাকো, আমরা পালাব না৷ এ জায়গা ছেড়ে আর অন্য কোথাও যাবার জায়গা নেই আমাদের৷’
বুড়ো লামালাটা শুধু একবার মাথা নীচু করে আক্ষেপের স্বরে বলল, ‘তোমরা শ্বেতাঙ্গরা যুগ যুগ ধরে আর কত অপমান করবে আমাদের?’ —বৃদ্ধ যেন কিছুতেই মানতে পারছে না ব্যাপারটা৷
হার্বাট কিন্তু গায়ে মাখল না বৃদ্ধের কথা৷ এক্লাকুন সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘মনে থাকে যেন৷ আমি তোমার প্রতীক্ষায় রইলাম৷’
মাথা নাড়িয়ে বিষণ্ণ্ভাবে হার্বাটের কথায় সম্মতি জানাল মেয়েটা৷
ট্যুরিস্টের দলটা খুব কাছে এসে পড়েছে৷ তাই এবার আমরা এগোলাম৷ অন্য দিকে৷ একটা ফাঁকা জায়গাতে পৌঁছে আমি বেশ উষ্মা প্রকাশ করে বললাম, ‘কাজটা তুমি ঠিক করছ না হার্বাট৷ অচেনা জায়গা৷ বিপদ হতে পারে৷ তাছাড়া অমন অল্পবয়েসি কুমারী মেয়ে...৷’
হার্বাট কথাটা শুনে হেসে বলল, ‘ভার্জিন গার্ল বলেই তো বেশি পছন্দ আমার৷ দেখো ‘রয়’, তোমাদের ইন্ডিয়ানদের মতো সেক্স নিয়ে কোনও ট্যাবু নেই আমাদের৷ জীবন একটাই৷ তাকে উপভোগ করতে শিখেছি আমরা৷ এই যে নিজের দেশ থেকে এতদূর এসেছি, তা তো কেবল টাকা কামাবার জন্যই৷ আর আমি টাকা কামাই জাগতিক সুখ ভোগ করার জন্য৷ আর তার সর্বপ্রধান বিষয় হল নারীসঙ্গ—নারীদেহ৷ অপছন্দ হলে তুমি আমাকে ত্যাগ করতে পারো৷’
কথাটা শুনে আমার হার্বাটের ওপর বিতৃষ্ণা জন্মালেও আমি আর এ-প্রসঙ্গে একটা কথাও তাকে বললাম না৷ ঘটনাচক্রে আমরা এ-জায়গায় একসঙ্গে বেড়াতে এসেছি বটে, কিন্তু হার্বাট আমার কেউ হয় না৷ এ ব্যাপারটা একান্তই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত৷ ভালো-মন্দ যা-ই হোক, তার দায়ভার হার্বাটের ওপরই বর্তাবে৷
যদিও বেলা দুপুর, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য ঢেকে গেল মেঘের আড়ালে৷ জোর বৃষ্টি শুরু হবে মনে করে আমরা নীচে নামতে শুরু করলাম, হোটেলে ফেরার জন্য৷
মাঝদুপুরে হোটেলে ফিরে এসেছিলাম আমরা৷ তারপরই বৃষ্টি নামল৷ ছোট হোটেল৷ রাস্তার ধারেই পাশাপাশি দুটো ঘর বরাদ্দ আমাদের জন্য৷ কাচের জানলার পাল্লা খুললেই পাহাড়ের থাকগুলো আর তার গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপত্যচিহ্ণগুলো নীচ থেকে দেখা যায়৷ দুপুরের খাওয়া সেরে আমি জানলার ধারে বসলাম৷ বৃষ্টিস্নাত পাহাড়গুলো খুব সুন্দর দেখাচ্ছে৷ পাহাড়ের ঢালগুলো আরও বেশি সবুজ মনে হচ্ছে৷ আবার যখন কালো মেঘ এসে সূর্যকে ঢেকে দিচ্ছে তখন সবকিছু অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে৷
শেষ বিকেলে অবশ্য কিছুক্ষণের জন্য বৃষ্টি থামল৷ দিনের শেষ আলো এসে রাঙিয়ে দিল পাহাড়ের থাকগুলোতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপত্যগুলোকে৷ সে এক অপরূপ দৃশ্য! তবে এসব কিছুর মধ্যেই আমার মাঝে মাঝে মনে পড়ছিল হার্বাটের বাজির ব্যাপারটা৷
সন্ধ্যার কিছু আগে হার্বাট আমার ঘরে এল৷ সঙ্গে বেশ বড় একটা হুইস্কির বোতল৷ আমার উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘কয়েক ঘণ্টা বেশ ভালো করে ঘুমিয়ে নিলাম৷ রাতে অভিসারে বেরোতে হবে তো তাই৷ চলো ব্যাপারটা সেলিব্রেট করা যাক৷’
আমি শুধু বললাম, ‘তাহলে তুমি যাচ্ছই!’
টেবিলের সামনে বসে মদের বোতলটা খুলতে খুলতে হার্বাট হেসে বলল, ‘যাব৷ যাব না কেন? জীবন তো একটাই৷ এবং তা উপভোগ করার জন্যই৷ এই যে আমরা এখন মুখোমুখি বসে আছি, কিন্তু কে বলতে পারে হয়তো কাল আমাদের দুজনের মধ্যে একজন হয়তো পৃথিবীতেই নেই! যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ জীবনটাকে উপভোগ করা দরকার৷ আমার জীবনদর্শন এটাই এবং আমি মনে করি সবার ক্ষেত্রে এটাই জীবনদর্শন হওয়া উচিত৷’
আমি আর এ-প্রসঙ্গে হার্বাটের সঙ্গে বিতর্কে গেলাম না৷
বোতলটা খোলা হল৷ দুটো গ্লাসে মদ ঢালা হল৷ পান শুরু করলাম আমরা৷ বাইরে তখন অন্ধকার নামতে শুরু করেছে, ধীরে ধীর চোখের সামনে হারিয়ে যেতে লাগল সবকিছু৷ চুপচাপ বসে গ্লাসে চুমুক দিতে লাগলাম আমরা৷
সময় এগিয়ে চলল৷ নিকষ কালো অন্ধকারের পর আবছা একটা চাঁদও দেখা গেল৷ মেঘে ঢাকা চাঁদ৷ আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে টিপ টিপ করে৷ আমি তিন পেগ মদ খাবার পরই মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করতে লাগল, ঘুম পেতে লাগল৷ বেশ কড়া হুইস্কি৷ হার্বাট মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, ‘তুমি শুয়ে পড়ো৷ তোমার তো আর জেগে থাকার তাড়া নেই৷’ কথাটা বলে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে গ্লাসে আর এক পেগ মদ ঢালল হার্বাট৷ আর, আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পাশের বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম৷ ঘুম নেমে এল আমার চোখে৷
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এক অদ্ভুত স্বপ্ণ দেখছিলাম আমি৷ পাহাড়ের ঢালে ইনকাদের স্বর্ণনগরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি৷ ঘুরতে ঘুরতে একটা মন্দিরের সামনে উপস্থিত হলাম৷ তার স্তম্ভ, চূড়া সব কিছু সোনায় মোড়া৷ সে মন্দিরে প্রবেশ করলাম আমি৷ সোনায় মোড়া কক্ষ-অলিন্দ অতিক্রম করে অবশেষে প্রবেশ করলাম এক কক্ষে৷ সেখানে আমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল এক নারী৷ আমার পায়ের শব্দে ফিরে তাকাল সে৷ তার পরনে লম্বা ঝুলের রংচঙে পোশাক, সঙ্গে স্বর্ণ আভূষণ, চুলগুলো মাথার সামনে সোনার সুতোয় বোনা ফিতে দিয়ে বাঁধা৷ আমার দৃষ্টি আটকে গেল তার বুকের কাছে৷ মসৃণ পোশাকের ভিতর থেকে যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে তার শঙ্খের মতো স্তনযুগল৷ কিন্তু আমাকে দেখেই যেন সেই সুন্দরীর চোখ দুটো জ্বলে উঠল৷ সে বলল, ‘একি, তুমি এক্লাকুন মন্দিরে প্রবেশ করেছ কেন? জানো না এ-মন্দিরে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ?’
ততক্ষণে সেই যুবতীর স্তনদুটো যেন আমাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে৷ আমি জবাব দিলাম, ‘এখানে না এলে কি তোমার মতো সুন্দরীকে দেখতে পেতাম?’
কথাটা শুনেই রাগে কাঁপতে লাগল সেই এক্লাকুন৷ তারপর সে বলল, ‘তুই এক্লাকুনকে দর্শন করলি৷ বাজে চিন্তা করলি, তুই ধবংস হ, ধবংস হ৷ বজ্রপাত হোক তোর মাথায়৷’
তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড জোরে বজ্রপাতের শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ! কিসের ঝনঝন শব্দ শোনা গেল তার সঙ্গে! এ পর্যন্ত স্বপ্ণটা দেখেই আমার ঘুম ভেঙে গেল৷ বিছানায় উঠে বসে আমি দেখলাম জানলার কাচের শার্শিটা সত্যি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে! মুহুর্মুহু বাজ পড়ছে বাইরে৷ কেঁপে উঠছে ঘরটা৷ বাজের শব্দের আঘাতেই সম্ভবত ভেঙেছে জানলার কাচটা৷
আমার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা বোতলটার দিকে৷ বোতলটা পুরো খালি! হার্বাট গেল কোথায়? তার পরই আমার কেন জানি না চোখ চলে গেল জানলার বাইরে৷ ঠিক সেই সময় আকাশে বিদ্যুতের ঝলক দেখা গেল৷ কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হল বাইরেটা৷ দেখলাম সামনের ঢাল বেয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে উঠতে শুরু করেছে দুটো অবয়ব৷ একজন নারী আর তার কিছুটা তফাতে একজন পুরুষ৷ আমার বিন্দুমাত্র বুঝতে অসুবিধা হল না তারা কারা? সেই এক্লাকুন-সাজা নারী আর হার্বাট!
আর এর পরই আমার বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল৷ এই দুর্যোগের রাতে হার্বাট এই অচেনা জায়গাতে নৈশ অভিযানে বেরোল, তার কিছু হবে না তো? আর কিছু না হোক ভেজা পাহাড়ের ঢালে পা পিছলেও তো দুর্ঘটনা হতে পারে? হার্বাট প্রচুর পরিমাণে মদ গিলেছে৷ সে এখন সুস্থ অবস্থায় নেই৷
আবার একবার বিদ্যুতের চমক হল৷ আমি আবার তাদের দেখতে পেলাম৷ ঢাল বেয়ে বেশ অনেকটা ওপরে উঠে প্রাচীন নগরীর ধবংসস্তূপের মধ্যে প্রবেশ করতে চলেছে তারা!
মুহূর্তের মধ্যে আমি আমার কর্তব্য ঠিক করে নিলাম৷ থামাতে হবে হার্বাটকে৷ মদ আর যৌনতার নেশায় কাণ্ডজ্ঞান সম্ভবত লোপ পেয়েছে৷ তেমন হলে হোটেলেই ফিরিয়ে আনতে হবে দুজনকে৷ এই দুর্যোগের রাতে নিশ্চয়ই পুলিশ হানা দেবে না হোটেলে৷ খাট ছেড়ে লাফিয়ে নামলাম আমি৷ আর মিনিট খানেকের মধ্যেই হোটেলের বাইরে বেরিয়ে ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলাম৷
বৃষ্টিও শুরু হয়েছে৷ কড় কড় শব্দে বাজ পড়ছে৷ ঢাল বেয়ে আমি প্রথমে প্রাচীন নগরীর চাতালে উঠে এলাম৷ বিদ্যুতের ঝলকে মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হচ্ছে আশেপাশে পাথুরে ধাপের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন কাঠামোগুলো, পরক্ষণেই আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে সব কিছু৷ সেই বিদ্যুৎ চমকের আলোতেই বেশ অনেকটা দূরে একটা ঢাল বেয়ে এক্লাকুন আর হার্বাটকে এগোতে দেখলাম৷ আমি চিৎকার করে উঠলাম—‘হার্বাট কোথায় যাচ্ছ? থামো৷’
কিন্তু বাজের শব্দে আমার কণ্ঠস্বর ঢাকা পড়ে গেল৷ আমি অনুসরণ করার চেষ্টা করতে লাগলাম তাদের৷ মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে হয়তো তাদের দেখা যাচ্ছে, আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তারা৷ আমি কোন দিকে যাচ্ছি তা বুঝতে পারছি না, শুধু এ-ধাপ ও-ধাপ অতিক্রম করে অনুসরণ করে চলেছি তাদের৷ কত পাথুরে চত্বর, প্রাচীন ধবংসাবশেষ অতিক্রম করে চলছি তা খেয়াল নেই৷ মাঝে মাঝে বৃষ্টির জলে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে চোখ, বধির হয়ে যাচ্ছে কান৷ তবু তাদের অনুসরণ করে চলেছি আমি৷
অবশেষে এসে উপস্থিত হলাম পাহাড়ের একটা প্রশস্ত ধাপে৷ বিশাল একটা পাথুরে চত্বর৷ আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট একটা প্রাচীন কাঠামো৷ তবে সেটা ছাদহীন নয়, মোটামুটি এখনও সে তার অবয়বটাকে ধরে রেখেছে৷ গঠন দেখে মনে হচ্ছে, হয়তো বা সেটা কোনও মন্দির ছিল৷
বিদ্যুতের চমক অব্যাহত৷ আর সেই আলোতেই আমি দেখতে পেলাম হার্বাটকে৷ কাঠামোটার প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছে সে৷ মেয়েটাকে দেখতে পেলাম না৷ সম্ভবত সে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করেছে৷ আমি তাকে দেখামাত্রই চিৎকার করে উঠলাম ‘হার্বাট দাঁড়াও’ বলে৷ কিন্তু হার্বাট আমার কথা হয়তো শুনতে পেল না৷ অন্ধকার মন্দিরের মধ্যে সে প্রবেশ করল৷
অগত্যা আমিও এগোলাম সেদিকে৷ ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবল বৃষ্টি শুরু হল৷ মুষলধারে বৃষ্টি৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাজের শব্দে থরথর করে কাঁপতে লাগল চারদিক৷ তারই মধ্যে নিরুপায় হয়ে মন্দিরের দিকে এগোলাম৷ কিছুটা এগিয়ে একটা বাঁধা পেলাম৷ মন্দিরের সামনের অংশটা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা৷ কোনও রকমে তার ফাঁক গলে আমি মন্দিরের প্রবেশতোরণের সামনে এসে দাঁড়ালাম, ঠিক যে-জায়গাতে কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়েছিল হার্বাট৷
পাথুরে কাঠামোটার ভিতর খেলা করছে জমাট বাঁধা অন্ধকার৷ একটু ইতস্তত করে আমি প্রবেশ করলাম তার ভিতরে৷ মুর্হুমুহু বাজের শব্দে কেঁপে উঠছে প্রাচীন কাঠামোটা৷ কোনও স্তম্ভ বা পাথর খসে পড়লেই মৃত্যু নিশ্চিত৷ মাঝে মাঝে হয়তো বিদ্যুতের আলো দেওয়াল-ছাদের ফাটল বা উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করছে৷ সেই আলোতে চোখে পড়ছে দেওয়াল বা স্তম্ভর গায়ে খোদিত বিভিন্ন প্রাচীন মূর্তি৷ হ্যাঁ, সম্ভবত এটা মন্দির ছিল৷ কাঠামোটার ভিতর প্রবেশ করে একটা জিনিস অনুভব করলাম আমি৷ মন্দিরের ভিতরে বাতাসটা যেন ভারী৷ শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে৷ হার্বাটের নাম ধরে মাঝে মাঝে ডাকতে ডাকতে অন্ধকার হাতড়ে এগোতে লাগলাম৷ কিন্তু হার্বাটের কোনও সাড়া পেলাম না৷ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে আমার, গলাটা যেন ফুলে উঠছে, ব্যথাও শুরু হয়েছে৷ মন্দিরের বাইরে বেরোতে হবে আমাকে৷ উন্মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে হবে৷—এ-ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আবার বাইরে বেরোতে যাচ্ছিলাম আমি৷
ঠিক তখনই বিদ্যুতের আলোতে সামনের ঘরটার ভিতর একটা জিনিস চোখে পড়াতে আমি থমকে দাঁড়ালাম৷ বেশ বড় ঘরটার চারপাশে বেশ কয়েকটা প্রবেশমুখ আছে৷ খোলা জানলা আছে৷ তা দিয়ে বিদ্যুতের ঝলক বাইরে থেকে প্রবেশ করে আলোকিত করে তুলছে ঘরটাকে৷ বাইরে প্রতিমুহূর্তেই বিদ্যুৎ ঝলকে উঠছে৷ আর সেই আলোতে আমি দেখলাম ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা নীচু বেদির ওপর হাঁটুমুড়ে উবু হয়ে বসে আছে সেই এক্লাকুন নারী৷ তার থুতনিটা হাঁটুর ওপর রাখা৷ চোখে পাতাগুলো আর ঠোঁটদুটো মৃদু মৃদু কাঁপছে বিদ্যুতের ঝলকে৷ নাকের পাটা ফুলে উঠছে মাঝে মাঝে৷
আর এরপরই আমি দেখতে পেলাম হার্বাটকে৷ অন্য দিক থেকে ঘরে প্রবেশ করল সে৷ আমি ডাকতে গেলাম হার্বাটকে৷ কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না৷ কেউ যেন টিপে ধরে আছে আমার গলাটা৷ আমি তাকিয়ে রইলাম ঘরের ভিতর৷ ঈষৎ টলতে টলতে হার্বাট এগোচ্ছে সেই নারীর দিকে৷ বিদ্যুতের ঝলকে তার চোখে-মুখে স্পষ্ট জেগে উঠেছে কামার্ত ভাব৷
হার্বাট এসে দাঁড়াল সেই নারীর সামনে৷ এবার থরথর করে কেঁপে উঠল সেই নারী৷ হার্বাট একটু ঝুঁকে প্রথমে দু-হাত দিয়ে তার কাঁধ স্পর্শ করল৷ তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট নামিয়ে আনতে লাগল এক্লাকুনের ঠোঁটের ওপর৷
হার্বাট এক্লাকুনের ঠোঁটে ঠোঁট স্পর্শকরা মাত্রই বেশ কয়েকবার একসঙ্গে বিদ্যুতের ঝলক দেখা দিল৷ বাজের প্রচণ্ড গর্জনে থরথর করে কেঁপে উঠল কাঠামোটা৷ আর তার পরক্ষণেই সে সেই নারীদেহ ছেড়ে ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠে আতঙ্কিতভাবে চিৎকার করে উঠল, ‘মমি! মমি!’ তারপর সে ছুটে বেরিয়ে গেল সে-ঘর ছেড়ে৷ তার আর্তনাদ মন্দিরের ভিতর হারিয়ে যেতে লাগল বাজের শব্দের সঙ্গে৷
কিন্তু ওই নারী যদি সত্যি এক্লাকুন মমি হয়ে থাকে তবে সে কী করে জীবন্ত হয়ে উঠল? বিদ্যুতের প্রত্যেকটা ঝলকের সঙ্গে আমি যে এখনও দেখতে পাচ্ছি তার চোখের তারা, ঠোঁট কাঁপছে! ফুলে উঠছে নাকের পাটা! তাহলে কি এক্লাকুন মমি সত্যিই জীবন্ত হয়ে ওঠে? আতঙ্কে হিম হয়ে গেলাম আমি৷ আমার যেন মনে হল, এবার সে ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাকাচ্ছে আমার দিকে!
আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না আমি৷ মন্দিরের বাইরে যাবার জন্য ছুটতে শুরু করলাম৷ ভাগ্য হয়তো আমার সঙ্গী হয়েছিল, তাই বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি৷ চত্বরটা অতিক্রম করে কাঁটাতারের বাইরে এসে শেষবারের জন্য মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম৷ এক অপার্থিব ভৌতিক সবুজ কুয়াশার চাদর যেন গ্রাস করে নিচ্ছে প্রাচীন কাঠামোটাকে৷
একবার সেদিকে তাকিয়ে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আবার ছুটতে লাগলাম৷ কিন্তু কিছুটা এগিয়েই আমাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল৷ বিদ্যুতের আলোতে দেখলাম আমার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে সেই এক্লাকুন নারী! তার ঠোঁটের কোণে জেগে আছে বিদ্রুপের হাসি! তাহলে কি এই জীবন্ত মমি আমাকে পালাতে দেবে না? প্রচণ্ড আতঙ্কে আমার হাত-পা অবসন্ন হয়ে আসতে লাগল৷ মাটিতে পড়ে গেলাম আমি৷
পাথুরে একটা জমিতে বসেছিলাম আমি৷ আমাকে ঘিরে বেশ কয়েকজন লোক৷ এই মনুমেন্টের কিউরেটর আর কয়েকজন পুলিশ কর্মী৷ কিছুক্ষণ আগে আমার জ্ঞান ফিরেছে এদের চেষ্টাতেই৷ তারপর তারা আমাকে ধরাধরি করে এনে বসিয়েছে এখানে৷ বৃষ্টি কখন থেমে গেছে জানি না৷ রৌদ্রকরোজ্জ্বল মেঘমুক্ত আকাশ এখন৷ সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সবুজ পাহাড়ের থাক গুলোতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর গায়ে৷ সুন্দর সকাল৷
আমি যেখানে বসে আছি তার কিছুটা তফাতে কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে সেই পাথুরে চত্বর আর তার শেষপ্রান্তে সকালের সূর্যালোকে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন সেই কাঠামো বা মন্দিরটা৷ আমার চোখ গেল সেই প্রাচীন মন্দিরের প্রবেশতোরণের ঠিক বাইরে মাটিতে পড়ে থাকা একটা দেহের ওপর৷ তার পোশাকের রং দেখে আমি বুঝতে পারলাম সে কে৷ হার্বাটের দেহ৷ শেষ পর্যন্ত মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে সে৷
ধীরে ধীরে আমি উঠে দাঁড়ালাম৷ কাঁটাতারের ওপাশে মন্দিরের সামনে পড়ে থাকা দেহটার দিকে দূর থেকে তাকিয়ে কিউরেটর ভদ্রলোক প্রশ্ণ করলেন, ‘উনি কি আপনার সঙ্গী ছিলেন?’
আমি জবাব দিলাম ‘হ্যাঁ৷ আমরা একই কোম্পানিতে চাকরি করি৷ একটা কনফারেন্সে এসেছিলাম এখানে লিমাতে৷ তারপর গতকাল মাচুপিচু বেড়াতে এসেছিলাম৷ কাল রাতে মন্দিরে ঢুকেছিলাম৷’
লোকটা প্রশ্ণ করল, ‘কিন্তু কেন? কীভাবেই বা আপনারা এখানে এলেন?’
সত্যি জবাবটা দিলে মৃত মানুষের ওপর কলঙ্ক লেপন করা হবে৷ তাই আমি বললাম—‘হার্বাট বৃষ্টির মধ্যে রাতে ঘর ছেড়েছিল৷ তাকে অনুসরণ করে আমি মন্দিরে প্রবেশ করি৷ ঘরের মধ্যে একটা এক্লাকুন মমি রাখা ছিল৷ সে জীবন্ত৷ হার্বাট তাকে স্পর্শ করেই ভয় পেয়ে গেল৷ আমিও ভয় পেয়ে গেলাম৷ আমি পালাতে পারলাম কিন্তু সে পারল না...৷’
একজন পুলিশ কর্মী বলে উঠল, ‘ব্যাড লাক৷ কেন যে লোকটা মন্দিরে প্রবেশ করতে গেল? ছুঁতে গেল মমিটাকে? ওই এক্লাকুন মমিটা আছে বলেই আমরা কোনও টুরিস্টকে প্রবেশ করতে দিই না ওখানে৷ কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে রেখেছি জায়গাটা৷ তবু দুর্ঘটানাটা ঘটলই৷
আমি বলে উঠলাম, ‘তবে কি এক্লাকুন মমি সত্যি জীবন্ত হয়ে ওঠে? আমি তাকে নড়তে দেখেছি৷ তার চোখের পাতা, ঠোঁট নড়ছিল! কেঁপে উঠেছিল তার শরীর!’
কিউরেটর ভদ্রলোক বলল, ‘হ্যাঁ, অনেকেই অমন দেখেছে ঝড়বাদলের রাতে৷ তবে ওটা বিদ্যুতের আলোতে দৃষ্টি বিভ্রম৷ বাজের গর্জনে চারপাশের সব কিছুর সঙ্গে মমিটাও কেঁপে ওঠে৷ পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারনে অতিবড় যুক্তিবাদীও তা দেখে ভয় পেয়ে যায়৷’
আমি বললাম, ‘তবে হার্বাট মারা গেল কেন?’
জবাব এল, ‘সে মমিটাকে ছুঁয়েছিল বলে৷ তীব্র বিষের ভাণ্ডার ওই এক্লাকুন মমির দেহ৷ জীবিত অবস্থায় এক্লাকুন রমণীদের কেউ স্পর্শ করতে পারত না৷ মৃত্যুর পরও যাতে তাদের কেউ স্পর্শ না করতে পারে সে জন্য তীব্র বিষ মাখিয়ে রাখা হত এক্লাকুন মমির শরীরে৷ হাজার বছর পরও সেই বিষ অতিমাত্রায় সক্রিয়৷ ছঁুলেই মৃত্যু৷ যে কারণে মিউজিয়ামে রাখা হয় না এক্লাকুন মমি৷ এ মমি স্পর্শ করে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷’
আমি বলে উঠলাম, ‘কিন্তু ওই সবুজাভ ভৌতিক কুয়াশা? যা গ্রাস করে নিচ্ছিল মন্দিরটাকে?’
লোকটা জবাব দিল ‘হ্যাঁ, ওই অদ্ভুত কুয়াশার জন্যও মন্দিরে প্রবেশ করে অনেকের মৃত্যু হয়৷ আসলে বর্ষার জল চুঁইয়ে মন্দিরের নীচে পৌঁছে কোনও রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে মেশে৷ যার ফলে হলদেটে সবুজ ক্লোরিন গ্যাস সৃষ্টি হয়৷ বিষাক্ত সেই মারণ গ্যাসই ওই কুয়াশার সৃষ্টি করে৷ এক্লাকুন মমিকে স্পর্শ না করলেও ঝড়বাদলের রাতে ওই মন্দিরের ভিতর কেউ বেশীক্ষণ থাকলে মৃত্যু অবধারিত৷ এই গ্যাসের কারণেও মৃত্যু হয়েছে অনেকের৷’
লোকগুলোর কথাবার্তা শুনে এবার ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করল ব্যাপারটা৷ তবে কি লামালার সেই সঙ্গীনি এক্লাকুন-সাজা নারী কৌশলে হার্বাটকে শাস্তি দেবার জন্য তাকে মন্দিরে প্রবেশ করিয়ে নিজে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল? পালাবার সময় তাকেই কি দেখে আমি ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম?
একজন পুলিশ কর্মী এরপর বলল, ‘আমাদের লোক আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দিচ্ছে৷ আপাতত আপনি সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নিন৷ লাশটা উঠিয়ে নেবার ব্যবস্থা করার পর আমরা আবার যাব আপনার কাছে৷’
এর পর আমি অন্য একজন পুলিশকর্মীর সঙ্গে রওনা হলাম নীচে ফেরার জন্য৷
ফেরার পথে হঠাৎ-ই রাস্তার পাশে একটা চাতালে ছোটখাটো ভিড় চোখে পড়ল আমার৷ সেই তাঁবুটা৷ আর তার সামনে লামটাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধ আর তার সঙ্গীনি সেই এক্লাকুন সুন্দরী৷ মুহূর্তর জন্য যেন তার সঙ্গে চোখাচোখি হল আমার৷ আমাকে সে চিনতে পারল৷ এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে৷ বিদ্রুপের হাসি৷
আমি তার মুখ বা বুক, আর কোনও কিছুর দিকে না তাকিয়ে দ্রুত নীচে ফেরার পথ ধরলাম৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন