জনাইগড়ের জঙ্গল রহস্য

শিশির বিশ্বাস

এক দিকে গঙ্গা৷ অন্য দিকে পাহাড় আর জঙ্গল৷ মাঝে সরু এক পায়ে চলা পথ৷ কিছু দূর যাবার পরে নতুন একটা রাস্তা বাঁ-দিকে চলে গেছে৷ মণিকাকু একদিন বেড়াতে নিয়ে এসেছিলেন এদিকে৷ বাঁ-দিকের রাস্তাটা সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি৷ সৌম্য জিজ্ঞাসা করতে চোখ বড়ো করে সন্তর্পণে বলেছিলেন, 'ওদিকে জনাইগড়ের জঙ্গল এলাকা৷ যায় না কেউ৷'
শেষ বিকেলে সূর্য তখন দিগন্তের ওপারে৷ নদীর বুকে লাল আভা মরে এসেছে অনেকটা৷ মণিকাকু দেরি না করে বলেছিলেন, 'সন্ধ্যে হয়ে আসছে৷ ফিরতে হবে এবার৷'
এর আগে অনেক জায়গাতেই বেড়াতে গেছে সৌম্য৷ কিন্তু এমন চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশি পায়নি৷ ট্রেনে সাহেবগঞ্জ পৌঁছে আসতে হয় এই জনাইগড়৷ মণিকাকু এখানে পি.ডব্লিউ.ডি.-র ইঞ্জিনিয়ার৷ মাস কয়েক হল পোস্টিং পেয়েছেন৷ মণিকাকু অবশ্য এসবের কিছুই বাড়িতে ভাঙেনি৷ সন্দেহ নেই, সৌম্যর কথা ভেবেই৷ তবে যেটুকু কানে এসেছে, তাতে ওর বুঝতে বাকি থাকেনি৷ তাই স্কুলের পরীক্ষা শেষ হতে একাই চলে এসেছে৷ মণিকাকু তাঁর এই দামাল ভাগনেটিকে বিলক্ষণ চেনেন৷ তাই প্রথম দিন নিজেই নিয়ে বেরিয়েছিলেন৷ তার মধ্যেই ওই ব্যাপার৷ সৌম্য অবশ্য মণিকাকুর কথায় কান না দিয়ে বলেছিল, 'কেন কাকু? এখনও তো আলো-৷'
সৌম্যর কথা তখনও শেষ হয়নি৷ হঠাৎ দূরে জঙ্গলের দিক থেকে ঢং ঢং শব্দে ঘণ্টার আওয়াজ শুরু হল৷ প্রায় তৎক্ষণাৎ কাছেই ঘন গাছপালার ভিতর হুড়মুড় শব্দে কোনো প্রাণী ছুটে গেল৷ চমকে উঠে চোখ ফিরিয়েও সৌম্য দেখতে পেল না কিছু৷ বলল, 'ওটা কী মণিকাকু?'
উত্তরে ওর হাত ধরে হনহন করে চলতে চলতে মণিকাকু বললেন, 'এ কলকাতা নয় সৌম্য৷ জনাইগড়ের জঙ্গলে শুধু বুনো জানোয়ার নয়, অন্য বদনামও আছে৷ অন্ধকার নামলে কেউ আর এদিকে আসে না৷'
মণিকাকুর দিকে তাকিয়ে সৌম্য আর কোনো প্রশ্ন করেনি৷ কিন্তু ভিতরে ততক্ষণে জমে উঠেছে এক ঝাঁক প্রশ্ন৷ সেগুলো নিয়ে পরের দিনই হাজির হয়েছিল বুধনের কাছে৷ বুধন মণিকাকুর বাসায় মাঝবয়সি কাজের মানুষ৷ প্রতিদিন সকালে আসে৷ ঘরের সব কাজ সেরে দুপুরের আগেই ফিরে যায়৷ কিন্তু বুধনের কাছ থেকে জানা গেল সামান্যই৷ সহজ নির্বিরোধী মানুষ বুধন একটু ভিতু গোছের৷ প্রশ্ন করতেই দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেছিল, 'খবরদার, ওদিকে যেয়ো না দাদাবাবু৷'
'কেন?' অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল সৌম্য৷
'জায়গাটা ভালো নয়৷' ফের কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিল বুধন, 'ওদিকে অপদেবতাদের বাস৷ ভর দুপুরে হা-হা শব্দে কখনো হেঁকে ওঠেন তাঁরা৷ আগে ওদিকে যারা কাঠ বা পাতা কুড়োতে যেত, তাদের অনেকেই সেই ডাক শুনেছে৷' বেচারার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এ ব্যাপারে বেশিক্ষণ আলোচনায় একেবারেই রাজি নয়৷
কিন্তু সৌম্য নাছোড়৷ তাড়াতাড়ি বলল, 'তবে গত সন্ধ্যেয় ওদিক থেকে যে ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেলাম!'
'পোড়ো এক মন্দির আছে ওদিকে৷ ভিতরে ঘণ্টা বাঁধা৷ ওদিকে যেনারা থাকেন, কখনো ভর সন্ধ্যেয় তারাই সেই ঘণ্টা বাজিয়ে জানান দেয়৷' বলতে গিয়ে শঙ্কার ছায়া বুধনের চোখে৷
কৌতূহল না মিটলেও বুধনকে আর ঘাঁটায়নি ও৷ তবে সেজন্য নতুন তথ্য জোগাড়ে সমস্যা হয়নি৷ সেসব বুধন যেমন বলেছিল, তার চাইতে কম রোমহর্ষক নয়৷ জনাইগড়ের জঙ্গলের ভিতর মন্দিরই আছে একটা৷ অনেক দিনের পুরোনো৷ সংস্কারের অভাবে এখন প্রায় জীর্ণ দশা৷ কাছেই রয়েছে ছোটো এক পাহাড়ি নদী৷ নাম কমলাঝোরা৷ ভুলেও সেই নদীর কাছে কেউ যায় না৷
এসব খবর সৌম্য যার কাছ থেকে জোগাড় করেছিল সে ঈশা গুছাই৷ মণিকাকুর অফিসের চাপরাশি৷ হঠাৎ জ্বরে পড়ে মণিকাকু সেদিন অফিসে যেতে পারেনি৷ খানিক বেলায় ঈশা গুছাই অফিসের কিছু কাগজপত্র নিয়ে এসেছিল৷ ছোটোখাটো চেহারার মানুষটির গা ভরতি নানা রঙের অদ্ভুত সব পাথরের গয়না৷ তার উপর ওই অদ্ভুত নাম৷ সব মিলিয়ে বেশ অবাকই হয়েছিল ও৷ পরে মণিকাকুর কাছেই জেনেছিল, ঈশা গুছাই রাজমহল পাহাড়ের আদি মানুষ৷ একসময় পাহাড়েই বাস করত ওরা৷ এখন কিছুটা ছড়িয়ে পড়লেও পুরোনো রীতিনীতি ছাড়েনি৷ অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে তেমন মেলামেশাও করে না৷ ব্যতিক্রম ঈশা গুছাই৷ কাজ করে পি.ডব্লিউ.ডি. অফিসে৷ যেমন ভালোমানুষ, তেমন বিশ্বস্ত৷ কাজেরও বটে৷ অফিসের সবাই পছন্দ করে ওকে৷ কিন্তু ঈশা গুছাইও থাকে না এখানে৷ অফিসে যাওয়া-আসা করে মাইল তিনেক দূরে পাহাড়ের কাছে ওদের গ্রাম থেকে৷ পুরোটাই নির্জন বনপথ৷ ঈশা গুছাই অবশ্য পরোয়া করে না৷ প্রতিদিন ঠিক সময়ে অফিসে আসে৷ সাহেবরা আসার আগেই তাদের চেয়ার-টেবিল ঝাড়পোঁছ করে রাখে৷ কাজে ফাঁকি দিতে জানে না৷
এহেন মানুষের সঙ্গে আলাপ জমাতে সৌম্য এরপর দেরি করেনি৷ মণিকাকুর কোয়ার্টার অফিসের কাছেই৷ তাই সমস্যা হয়নি৷ ঈশা গুছাইও নিরাশ করেনি ওকে৷ দিন কয়েকের মধ্যে সৌম্য অনেক কথাই জেনেছে ওর কাছ থেকে৷ সেদিন কথার ফাঁকে পাহাড়ি নদীর কথা জিজ্ঞাসা করেছিল ওকেও৷
উত্তরে ডান হাত কপালে আর বুকে ঠেকিয়ে ঈশা গুছাই বলেছিল, 'ওই কমলাঝোরা আগে এমন ছিল না ছোটোবাবু৷ তিরতির করে সামান্য জল বইত মাত্র৷ এখন রাক্ষসী৷ ফি বছর মানুষের রক্ত ছাড়া ওর পেট ভরে না৷ আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েও তখন এক নদী বইত৷ তারও নাম ছিল কমলা নদী৷ গ্রামের মানুষ বলত কমলা মাই৷ ওই নদীর জলই তখন ছিল গ্রামের মানুষের ভরসা৷ খেতে ফসল ফলত ওই জলে৷ তারপর হঠাৎই অল্প দিনের মধ্যে শুকিয়ে গেল কমলা নদী৷ জলের অভাবে সাফ হয়ে গেল গ্রাম৷ অনেকেই চলে গেছে পাহাড়ের অন্য দিকে৷ সব মানুষের পাপে ছোটোবাবু৷'
'পাপ! কেন?' ঈশা গুছাই থামতে প্রশ্ন করল সৌম্য৷
'বললাম তো, আমাদের মানুষের পাপ৷' ধরা গলায় উত্তর দিল ঈশা গুছাই, 'ক-দিন আগেও এই জনাইগড় অন্যরকম ছিল! মানুষের হাতে আজ সব শেষ হবার জোগাড়! সাফ হয়ে গেছে জঙ্গল, গাছপালা৷ শুনতে পাই, পাহাড়েও নাকি হাত পড়বে এবার৷ পাথর ফাটিয়ে চালান যাবে কারখানায়৷'
ঈশা গুছাইয়ের সঙ্গে সেদিন অনেক কথা হয়েছিল৷ তবু কৌতূহল মেটেনি৷ আসলে ওর স্বভাবটাই ওইরকম৷ মাথায় কিছু চাপলে তার শেষ না দেখে ছাড়া নেই৷ পরের দিনই ফের মণিকাকুকে ধরেছিল৷ রাতে তখন খেতে বসেছে৷ ও ফস করে বলল, 'জঙ্গলের ভিতর একটা মন্দির আছে মণিকাকু৷ সেদিন সন্ধ্যেয় সেখানেই ঘণ্টা বাজছিল৷ তুমি বলনি তো!'
প্লেটে ডিমের কালিয়া ঢেলে ভাত মাখছিলেন মণিকাকু৷ থেমে গিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন, 'মন্দিরের কথা যখন জেনেছিস, কেন বলিনি, তা বুঝতে পেরেছিস নিশ্চয়৷ তোকে ভরসা করা-৷'
'তুমি ওসব বিশ্বাস করো?' মণিকাকু কথা শেষ করার আগেই প্রসঙ্গ পালটে সৌম্য বলল৷
'তা করি না ঠিকই৷' ফের ভাত মাখতে মাখতে মণিকাকু বললেন, 'তবে কমলাঝোরা নামের ওই নদীটি কিন্তু খুব বিপজ্জনক৷ যখন-তখন হড়কা বান নামে৷ মুহূর্তে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়৷ অনেকে মারা গেছে৷ শুনেছি, আগে ওদিকে লোকবসতি ছিল৷ কিন্তু এখন আর নেই৷ কেউ যায়ও না৷'
'ওদিকে কিন্তু মানুষের বাস আছে৷'
'তুই কী করে জানলি?' খাওয়া থামিয়ে মণিকাকু ওর দিকে তাকালেন৷ তাঁর চোখে সামান্য হলেও ফের সন্দেহের ছোঁওয়া৷
'বা রে, তাহলে কে ঘণ্টা বাজায়? নিশ্চয় পুজো হয় মন্দিরে৷'
'তাই বল!' মণিকাকু সামান্য স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, 'তবে আমাদের তেমন মনে হয়নি৷ মাস কয়েক আগে সার্ভের কাজে ওদিকে যেতে হয়েছিল৷ জঙ্গলের ভিতর মন্দিরটা তখন দেখেছি৷ পোড়ো ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে৷ ভিতরে বড়ো এক ঘণ্টা ঝুলছে৷ কিন্তু ধারেকাছে জনমানুষ কাউকে দেখিনি৷ আমার মনে হয়, সন্ধ্যেয় জোরে বাতাস বইলে কখনো দুলে ওঠে ঘণ্টাটা৷ আওয়াজ হয়৷ সে যাই হোক, এবার খেয়ে নে৷ রাত কম হয়নি৷'
আগামী কাল খুব ভোরেই মণিকাকুর অফিসের কাজে বাইরে যাবার কথা৷ ফিরতে রাত হয়ে যাবে৷ তাই একটু আগেভাগেই শুয়ে পড়ার ইচ্ছে৷ সৌম্যও কোনো প্রশ্ন আর করেনি৷ বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে শুয়ে পড়েছে৷ আসলে খানিক আগে খবরটা পেয়ে ও প্ল্যান তৈরি করে ফেলেছে৷ এমন চমৎকার সুযোগ পরে আর না-ও মিলতে পারে৷
মণিকাকুর মতলব অবশ্য সৌম্য তখন মোটেই আঁচ করতে পারেনি৷ পরের দিন ভোরে মণিকাকু বের হয়ে যাবার খানিক পরেই কাঁধে বড়ো এক বোঁচকা নিয়ে ঈশা গুছাই এসে হাজির৷ সব শুনে সৌম্যর তো অথৈ জলে পড়ার অবস্থা৷ মণিকাকু আজ ওকে সৌম্যর দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন৷ ঈশা গুছাই সারাদিন ওর কাছেই থাকবে৷ সৌম্য যখন ঈশা গুছাইকে কীভাবে ম্যানেজ করা যায় ভাবছে, তখন হঠাইৎ মুশকিল আসান৷ খানিক বেলায় ঈশা গুছাই কাঁচুমাচু মুখে ওকে বলল, 'সাহেবের মুখের উপর আমি না করতে পারিনি ছোটোবাবু৷ কিন্তু দুপুরের দিকে আমার একটা জরুরি অন্য কাজ আছে৷ যেতেই হবে সেখানে৷ তোমার অসুবিধা হবে না তো?'
বলা বাহুল্য ওই কথায় প্রায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল সৌম্যর৷ তাড়াতাড়ি বলল, 'তুমি কিচ্ছু ভেবো না কাকু৷ কোনো অসুবিধা হবে না৷ দুপুর কেন, তার আগেও চলে যেতে পারো৷'
সৌম্য বললেও ঈশা গুছাই তা করেনি৷ তবে তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বেলা বাড়তে ক্রমশ চঞ্চল হয়ে উঠছে মানুষটা৷ শেষে ঘড়ির কাঁটা যখন দুটোর ঘর ছুঁতে চলেছে, ঈশা গুছাই বলল, 'এবার তাহলে আমি যাই ছোটোবাবু৷ তুমি সাবধানে থেকো কিন্তু৷'
সঙ্গের মস্ত বোঁচকা কাঁধে চাপিয়ে প্রায় হনহন করে বের হয়ে গেল ঈশা গুছাই৷ ছটফট করছিল সৌম্য নিজেও৷ কাজের মানুষ বুধন আগেই চলে গেছে৷ ঈশা গুছাই বের হয়ে যেতে দরজায় তালা লাগিয়ে সেও বেরিয়ে পড়ল৷
হাতে সময় বেশি নেই৷ দ্রুত পা চালিয়ে সেদিনের সেই দুই রাস্তার মোড়ে পৌঁছোতে লাগল আধ ঘণ্টার মতো৷ তারপর ধরল বাঁ-দিকের সেই সরু পায়ে চলা পথটা৷ এমনিতেই এদিকে বাড়িঘর প্রায় নেই৷ ঝোপঝাড়, গাছপালার জটলা৷ পথে মানুষও কম৷ দুপুরের নির্জন বনপথ প্রায় ঝিমঝিম করছে৷ তার উপর খানিক চলার পরে পায়ে চলা পথের রেখা একসময় মিলিয়ে এল৷ বর্তমানে এদিকে মানুষের আনাগোনা বিশেষ নেই৷ তাই পায়ে চলা পথের রেখা থাকার কথা নয়৷ সৌম্য একটু ভাবনায় পড়ে গেল৷ এভাবে আন্দাজে জঙ্গলের ভিতর পোড়ো এক মন্দির খুঁজে বের করা খুব মুশকিল৷ তার চেয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই নদীটা বরং খুঁজে বের করা সহজ৷ গাছপালার মাথার উপর দিয়ে পাহাড়টাও দেখা যাচ্ছে৷ বেশি সময় লাগার কথা নয়৷
সৌম্যর হিসেব কিন্তু মিলল না৷ যথেষ্ট দ্রুত পা চালিয়ে ও যখন পাহাড়ের কাছে পৌঁছোল সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে অনেকটাই ঢলে পড়েছে৷ পাথুরে জমির কারণে জঙ্গল এদিকে কিছু পাতলা৷ ছোটো আকারের ঝোপঝাড়ই বেশি৷ তবু সূর্য পাহাড়ের ওদিকে ঢলে পড়ায় রোদ নেই৷ আলোর তেজও কম৷ ব্যাপারটা খেয়াল হতে একটু দমে গেল৷ অনেকটা পথ ফিরতে হবে৷ বেশি দেরি করা চলবে না৷ কিন্তু পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই কমলাঝোরা নদীর দেখা তখনও মেলেনি৷ সৌম্য বুঝতে পারছিল, নদীর খোঁজ পেতে পাহাড়ে উঠতে হবে৷ আকারে তেমন বড়ো না হলেও পাহাড়ের ঢাল তেমন সমান নয়৷ ছোটো-বড়ো নানা আকারের শিরা নেমেছে৷ সম্ভবত তারই কোনো খাঁজে নদীটা রয়েছে৷
হাতে ঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল ও৷ রোদ পাহাড়ের আড়ালে থাকায় আর গাছপালার দরুন আলো কমে এলেও সন্ধ্যে নামতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি৷ চেষ্টা করাই যায়৷ তেমন উঁচু পাহাড় নয়৷ খুব দেরি হলেও মাথায় উঠতে ঘণ্টা খানেকের বেশি লাগবে না৷ তারপরেও হাতে সময় কিছু থাকে৷ মনস্থির করে সৌম্য এরপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল৷
একসময় এই পাহাড়ে মানুষের আনাগোনা ভালোই ছিল৷ প্রায় বিলীন হয়ে আসা একাধিক পায়ে চলা পথই তার প্রমাণ৷ এমনকী দু-চারটে পাকদণ্ডীর অস্তিত্বও টের পাওয়া যায়৷ ও যথাসম্ভব সেই পাকদণ্ডী ধরে উঠতে লাগল৷
নীচ থেকে পাহাড়ের উচ্চতা অনুমান করা যে সহজ নয়, খানিক চড়াই ভাঙার পরেই বুঝতে পারল সৌম্য৷ যত উপরে উঠছে, পাহাড়ের মাথা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে৷ বাড়ছে উচ্চতাও৷ জঙ্গলও ক্রমশ ঘন হচ্ছে৷ যাকে ও ছোটো এক টিলা ভেবেছিল, তা বহুদূর প্রসারিত ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি৷ সৌম্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, পৌনে এক ঘণ্টার মতো সময় পার হয়ে গেছে৷ ঘন ঘন পাকদণ্ডী ভাঙার কারণে উঠে এসেছে অনেকটা উঁচুতে৷ নদীর খোঁজ তখনও মেলেনি৷ কী করবে ভাবছে৷ হঠাৎ খুব কাছেই 'হা-হা-আ-আ-আ' শব্দে কেউ চিৎকার করে উঠল৷
নির্জন বনভূমির মাঝে হঠাৎ এই ব্যাপার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার পক্ষে যথেষ্ট৷ ব্যতিক্রম নয় সৌম্যও৷ তবে সামলে উঠতে সময় লাগল না৷ থমকে দাঁড়িয়ে সাবধানে উপর দিকে তাকাল৷ আওয়াজটা ওই দিক থেকেই এসেছে৷ কিন্তু কিছুই হদিশ করতে পারল না৷ সব আবার সেই আগের মতো নিঝুম৷ শুধু গাছপালার ভিতর দমকা বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ৷ পাকদণ্ডী ভাঙার সুবিধার জন্য হাতে একটা লাঠি আগেই ছিল৷ সামান্য অপেক্ষার পরে ও সেটা বাগিয়ে ধরে সাবধানে এগিয়ে গেল সেই দিকে৷
গোড়ায় সন্দেহ হয়েছিল, আওয়াজটা কোনো বন্য জন্তুর৷ কিন্তু অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পরেও তেমন কিছু নজরে পড়ল না৷ কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার হল৷ এগোবার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালা ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছিল৷ হঠাৎ পাহাড়ের এক খাঁজের দিকে নজর পড়তে সৌম্যর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ যার খোঁজে এই পাহাড়ে ওঠা, অদূরে সেই কমলাঝোরা নদী৷ পাহাড়ের এক খাঁজের মাঝে তিরতির করে বয়ে চলেছে৷ নালাই বলা যায়৷ গোড়ালিও হয়তো ডুববে না৷ অথচ যখন-তখন হড়কা বানের কারণে এই নদী এদিকের আতঙ্ক৷ কেউ তাই কাছে ঘেঁষে না৷ ঈশা গুছাইয়ের কাছে শুনেছে কমলাঝোরা এমন ভয়ানক আগে ছিল না৷ বছর কয়েক আগে এদিকে এক ভূমিকম্প হয়েছিল৷ তার অল্প দিনের মধ্যেই পালটে যায় সব৷ সরু এই পাহাড়ি নদীতে শুরু হল ভয়ানক হড়কা বান৷ পাহাড়ে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হড়কা বানের কারণ৷ কিন্তু এই কমলাঝোরায় হড়কা বান হয় সারা বছর ধরেই৷ অদ্ভুত এই ব্যাপারের কারণ মণিকাকুকে জিজ্ঞাসা করেছিল ও৷ মণিকাকু বলেছিলেন, সুবিস্তৃত উঁচু-নীচু পাহাড় শ্রেণির নানা খাঁজে সারা বছর জল জমে থাকে৷ সাইফন ক্রিয়ায় পাহাড়ের নানা ফাটলের ভিতর দিয়ে এই জল নীচে নেমে আসতে পারে৷ অনেক পাহাড়ি নদী এভাবেই সৃষ্টি হয়৷ তবে নানা কারণে ফাটলের ভিতর জলের এই প্রবাহ সমান না-ও থাকতে পারে৷ কোনো কারণে জলপ্রবাহ হঠাৎ যদি বেড়ে যায়, বর্ষা ছাড়াও নেমে আসতে পারে হড়কা বান৷
ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে ঈশা গুছাইয়ের অন্য একটা কথা মনে পড়ে যেতে প্রায় চমকে উঠল সৌম্য৷ সেই সময় হঠাৎ এক ঝলক দমকা বাতাস ছুটে আসতে সামনে কমলাঝোরা নালার মাঝ থেকে ফের সেই 'হা-হা-আ-আ-আ' আওয়াজ৷
তবে এবার আর চমকাল না ও৷ সাবধানে পায়ে পায়ে নেমে গেল নালার মাঝে৷ বিশাল এক বোল্ডার পড়ে আছে সেখানে৷ চারপাশে জমাট বেঁধে রয়েছে জলস্রোতে গড়িয়ে আসা ছোটো পাথর আর বালির স্তূপ৷ তবু সামান্য লক্ষ করতেই শব্দের রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কাছে৷
যখন-তখন নেমে আসা হড়কা বানের কারণে জায়গাটা ভয়ানক বিপজ্জনক৷ অনতিবিলম্বে স্থান ত্যাগ করাই উচিত৷ তবু সাবধানে চোখ-কান খোলা রেখে সৌম্য তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷ হাতের সেই লাঠি দিয়ে যথাসম্ভব খুঁচিয়ে বোল্ডারের চারপাশে জমে ওঠা বালি আর পাথরের স্তূপ দুই হাতে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে শুরু করল৷ খানিক সাফ হতেই বুঝল, অনুমান একদম সঠিক৷ বিশাল বোল্ডারের তলায় বড়ো আকারের এক ফোকর তথা টানেলের মুখ৷ দমকা বাতাস বোল্ডারে আছড়ে পড়লেই কিছু বাতাস ঢুকে পড়ে টানেলের ভিতর৷ তখনই আওয়াজটা ওঠে৷ চারপাশে বালি-পাথর জমে ওঠায় আওয়াজ এখন কমে গেছে৷ নইলে আগে আরও জোরালো ছিল৷ উৎসাহে সৌম্যর কাজের গতি এবার আরও বাড়ল৷ প্রায় মিনিট কুড়ি টানা কাজ করার পরে যখন থামল, ঘামে জবজব করছে শরীর৷ তবে বোল্ডারের নীচে টানেলের মুখের অনেকটাই সাফ হয়েছে৷ বালি-পাথর আরও সাফ করতে পারলে ভালো হত৷ কিন্তু বিকেলের আলোর দিকে তাকিয়ে আর দেরি করতে ভরসা পেল না৷ কাজ থামিয়ে ফেরার পথ ধরল৷
পাহাড় বেয়ে সহজে নেমে এলেও সৌম্য সমস্যায় পড়ল জঙ্গলের ভিতর৷ পথের সামান্য নিশানা যা ছিল, আলো কমে আসায় তার কিছুই আর নজরে পড়ছে না৷ আসবার সময় লক্ষ্য ছিল পাহাড়, তাই সুবিধা ছিল৷ ফেরার পথে তেমন নিশানা নেই৷ যথেষ্ট হুঁশিয়ার হয়ে চলার পরেও সৌম্য একসময় বুঝতে পারল, সে পথ হারিয়ে ফেলেছে৷ এদিকে আলো দ্রুত মরে আসছে৷ সৌম্য জঙ্গলের মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে চারপাশে নজর ঘোরাল৷ জঙ্গলের ভিতর আলো যথেষ্ট কমে এলেও আকাশে ভালোই আলো রয়েছে৷ সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে উঠল ও৷ কী কাণ্ড! ওই তো সেই মন্দিরটা! গাছপালার মাথায় আধভাঙা চুড়ো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে৷ অথচ আসবার সময় অনেক চেষ্টা করেও সন্ধান পায়নি৷
ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেছে৷ মাথার উপর বিপদ কম নয়৷ তবু মন্দিরের চুড়োটা নজরে পড়তে সৌম্যর চোখ দুটো চকচক করে উঠল৷ বড়োজোর মিনিট দুয়েকের পথ৷ ও কী করবে ভাবছে, হঠাৎ ঢং ঢং করে জোরালো শব্দে ঘণ্টা বাজতে শুরু করল৷ সেই সাথে ভারী সুরেলা গলায় মানুষের আওয়াজ, 'আয়ে, আয়ে হো-ও-ও৷ কালী মাইকে পশুয়া সব আয়ে হো-ও-ও৷'
ঘণ্টা বেজে উঠতেই ঝোপঝাড়ের ভিতর কিছু প্রাণীর ছুটোছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু সেজন্য নয়, সৌম্য চমকে উঠল ওই গলার আওয়াজে৷ স্বরটা পরিচিত৷ এক মুহূর্ত দেরি না করে ও এগিয়ে গেল সেই মন্দিরের দিকে৷
ইট আর পাথরে তৈরি মন্দিরটার প্রায় জীর্ণ দশা৷ সামনে প্রশস্ত চত্বরে খানিক আগে সামান্য ঝাড়পোঁছ হয়েছে৷ এক পাশে ইট-পাথর সাজিয়ে তৈরি উনুনে হালকা ধোঁয়ার রেখা৷ সামান্য আগে কিছু রান্না হয়েছে সেখানে৷ মহা উৎসাহে মন্দিরের খোলা দরজা দিয়ে শেয়ালের দল ছুটে ঢুকে পড়ছে ভিতরে৷ মন্দিরের এক দিকের দেওয়ালের কিছু অংশ ভেঙে স্তূপাকার হয়ে রয়েছে ইট-পাথর৷ কতক শেয়াল সেই স্তূপ টপকে দেওয়ালের ফোকর গলেও লাফিয়ে পড়ছে ভিতরে৷ অদূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে লক্ষ করছিল সৌম্য৷ ভিতর থেকে তখনও ঘণ্টার সঙ্গে সেই কন্ঠস্বর, আয়ে-এ-এ, আয়ে হো৷ কালী মাইকে পশুয়া সব আয়ে হো-ও-ও৷
সৌম্যর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল দরজা দিয়ে একবার ভিতরে উঁকি মেরে দেখে৷ কিন্তু শেয়াল আসার তখনও বিরাম নেই দেখে ঝুঁকি নিল না৷ নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল৷ একটু বাদে ঘণ্টার আওয়াজের সঙ্গে কন্ঠস্বরটাও থেমে গেল৷ সামান্য গলা ঝেড়ে নিয়ে সৌম্য এবার উঁচু গলায় বলল, 'ঈশাকাকু, আমি সৌম্য, একবার বাইরে আসবে?'
সৌম্যর ডাকে মুহূর্তে প্রায় হন্তদন্ত হয়ে মন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল ঈশা গুছাই৷
'ছোটোবাবু! তুমি, তুমি এখানে কী করে এলে!' একরাশ উৎকন্ঠা ঝরে পড়ল গলায়৷
ঈশা গুছাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে পাশ কাটিয়ে সৌম্য বলল, 'তাহলে তুমিই এই সময় মন্দিরে ঘণ্টা বাজিয়ে শেয়ালদের ভোজ খাওয়াও?'
'ওই সামান্য কিছু চাল-ডালের খিচুড়ি৷' ধরা পড়ে গিয়ে লাজুক হাসল ঈশা গুছাই৷ 'কালী মায়ের সন্তান ওরা৷ মায়ের মন্দিরে ওদের সামান্য সেবা দিলে মা হয়তো খুশি হবেন৷ তাঁর দয়া হলে কমলা নদী ফের জলে ভরে উঠবে আবার৷'
'তুমি ঠিকই বলেছ ঈশাকাকু৷' শান্ত গলায় সৌম্য বলল, 'কালীমা তোমার এই কাজে খুশি হয়েছেন৷ কমলা নদী কয়েক দিনের মধ্যে ফের জলে ভরে উঠবে৷ রাক্ষসী কমলাঝোরারও রক্তের স্বাদ মিটবে বোধ হয়৷'
বলা বাহুল্য, সৌম্যর কাছে এমন কথা আশা করেনি ঈশা গুছাই৷ ব্যাপারটা হৃদয়ংগম করতে তাই সময় লাগল৷ তারপর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল ওকে, 'তুমি, তুমি কী করে জানলে ছোটোবাবু?'
'আমি জানি৷ তুমি দেখে নিয়ো, কমলা নদী ফের জলে ভরে উঠবে কয়েক দিনের মধ্যেই৷' একই রকম শান্ত অথচ দৃঢ় গলা সৌম্যর৷
সৌম্যর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ঈশা গুছাই৷ ও থামতে কাঁপা গলায় বলল, 'তোমার ভালো হোক ছোটোবাবু৷ যদি সত্যি হয়, আমাদের সারা গ্রাম তোমাকে মাথায় করে রাখবে৷'
'মাথায় করে রাখার দরকার নেই ঈশাকাকু৷ রাত হয়ে গেছে৷ আপাতত আমাকে ঘরে পৌঁছে দিলেই চলবে৷'
সারাটা পথ ঈশা গুছাই এরপর একটি কথাও বলেনি৷ হঠাৎ এই ব্যাপারে থম মেরে গিয়েছিল মানুষটা৷ সেটাই স্বাভাবিক৷ তাতে সুবিধাই হয়েছে সৌম্যর৷ ওর কোনো প্রশ্নের জবাব আর দিতে হয়নি৷ রাতে মণিকাকুকেও কিছু বলেনি৷ কিন্তু পরের দিন আর চেপে রাখা গেল না৷ সকালে যথাসময় মণিকাকু অফিসে বের হয়ে গিয়েছিলেন৷ ফিরে এলেন খানিক বাদেই৷ চোখ কপালে তুলে বললেন, 'কী কাণ্ড! তুই কাল একা জঙ্গলের দিকে গিয়েছিলি, একবারও বলিসনি তো!'
'কে বলেছে? চোখ নাচিয়ে সৌম্য বলল৷'
'কে আবার? ঈশা গুছাই৷ তুই নাকি গতকাল ওকে বলেছিলি ওদের কমলা নদী কয়েক দিনের মধ্যেই ফের জলে ভরে উঠবে৷ তা কয়েক দিন লাগেনি, গত রাতেই শুকিয়ে যাওয়া কমলা নদীতে ফের অল্প হলেও জল এসেছে৷ হইহই পড়ে গেছে৷ ওদের সারা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গেছে তোর কথা৷ তোকে সংবর্ধনা জানাতে একটু পরেই এসে পড়বে ওরা৷'
মণিকাকুর ওই কথায় ডাকাবুকো সৌম্যর চোখে হঠাৎ অন্ধকার নেমে এল৷ মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, 'কমলা নদীর এই জলধারা কিন্তু বেশি দিন থাকবে না মণিকাকু৷ ঈশা গুছাইদের এই আনন্দ বাঁচিয়ে রাখতে তাই একটা কাজ করতে হবে তোমাদের৷ পি.ডব্লিউ.ডি. দপ্তর সহজেই পারবে কাজটা৷'
সৌম্যর সেই কথার অর্থ বুঝতে না পেরে মণিকাকু বললেন, 'হেঁয়ালি না করে একটু ভেঙে বল বাপু৷ দু-দিন বেড়াতে এসে এতদিনের জমে ওঠা জনাইগড়ের জঙ্গল রহস্য কীভাবে ভেদ করলি, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!'
সৌম্য বলল, 'ঠিক তা নয় মণিকাকু৷ গতকাল ওদিকে গিয়েছিলাম পোড়ো মন্দির আর কমলাঝোরা দেখার জন্য৷' একে একে ও সব কথা খুলে বলল এরপর৷
মণিকাকু বললেন, 'তোকে বলেছি বোধ হয়৷ বছর কয়েক আগে এক রাতে এদিকে একটা ভূমিকম্প হয়েছিল৷ সম্ভবত সেই সময় বোল্ডারটা গড়িয়ে এসে এঁটে গিয়েছিল ঝোরার মাঝে টানেলের মুখে৷ মনে হচ্ছে, সেই থেকেই যত বিপত্তির শুরু৷'
'ঠিক তাই মণিকাকু,' সৌম্য বলল, 'ওই টানেল দিয়ে আগে ঝোরার হড়কা বানের জল গড়িয়ে চলে যেত কমলা নদীতে৷ মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই জলধারা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ গতকাল টানেলের মুখ সামান্য পরিষ্কার করে দিতেই ফের হড়কা বানের জল টানেলের ভিতর দিয়ে কমলা নদীতে গড়িয়ে যেতে শুরু করেছে৷ কিন্তু এই জলধারা বেশিদিন থাকবে না৷ জলের তোড়ে বালি-পাথর গড়িয়ে এসে ফের বন্ধ হয়ে যাবে ফাঁকটা৷ তাই পাথরটা তোমাদের সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে৷ খুব তাড়াতাড়ি৷'
'থ্যাঙ্ক ইউ৷ দারুণ কাজ করেছিস তুই৷ তাই প্রথম অভিনন্দন আমার তরফ থেকেই৷ আজই একবার দেখে আসব জায়গাটা৷' সৌম্যর পিঠটা মৃদু চাপড়ে দিয়ে বললেন মণিকাকু৷
'আর একটা কথা মণিকাকু,' সৌম্য বলল, 'গতকাল ভেবেছিলাম ঈশা গুছাইদের দিয়ে সরিয়ে দেব পাথরটা৷ কিন্তু ফেরার সময় মন্দিরে ঈশা গুছাইকে শেয়ালদের ভোজ খাওয়াতে দেখে মনে হল, আসল ব্যাপারটা ওদের জানতে দেওয়া ঠিক হবে না৷ কিছু না হোক, ওদের ওই বিশ্বাসের অন্য মূল্য তো আছে৷ তাই না?'
-------------------------------
কাল্পনিক হলেও গল্পটিতে কিছু বাস্তব ঘটনার ছায়া বর্তমান৷
অধ্যায় ১ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%