অর্জুন সর্দার

শিশির বিশ্বাস

রোদে পোড়া হালকা-পাতলা ছেলেটার সঙ্গে প্রথম দেখা সাতজেলিয়ার দত্তর ঘাটে৷ গোড়ায় শুরুটা করেছিল নেপালদা৷ সুযোগ পেলেই কাউকে নিয়ে একটু মশকরা করা স্বভাব৷ তার উপর মেজাজ মোটেই ভালো নেই তখন৷ সুন্দরবন বেড়াতে এসে নৌকোয় ঘোরা হয়ে গেছে দিন দুয়েক৷ অথচ যে জন্য আসা, তার কিছুই হয়নি৷ নেপালদার মেজাজ তাই চড়েই রয়েছে একটু৷ আসলে পুজোর পরে সেবার সুন্দরবনে বেড়াবার এই আয়োজনের উদ্যোক্তা গৌর হলেও নেপালদার আগ্রহটাও কম ছিল না৷ পিছনে কারণও ছিল৷ ওর পরিচিত কে নাকি সুন্দরবনে বেড়াতে এসে একসাথে জোড়া বাঘ দেখে গেছে৷ সেই থেকে ব্যাপারটা ঢুকে রয়েছে তার মাথায়৷ কাজের মানুষ গৌর কিন্তু অনেক খোঁজখবর করেই আয়োজন করেছিল৷
সুন্দরবন ঘোরবার সেরা সময় পুজোর পরে এই অক্টোবর৷ চমৎকার শান্ত নদী৷ রাতে ভয়ানক হিম বা ভোরের কুয়াশা থাকে না৷ রাতে ফুটফুটে জ্যোৎস্নার আলোয় মায়াবী পরিবেশ৷ এসবের খানিকটা আঁচ পেয়ে গিয়েছিলাম সেই প্রথম দিনই৷ গোসাবা হয়ে সরু এক খাল দুর্গাদোয়ানি ধরে আমাদের ভটভটি গোমদি নদীতে এসে পড়তেই দেখি সামনে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি৷ একদিন বাদেই কোজাগরী পূর্ণিমা, বিকেলের মরা আলোয় দিগন্তের কাছে পুব আকাশে থালার মতো বড়ো একটা চাঁদ৷ ওপারে সেই আকাঙ্খিত সুন্দরবনের জঙ্গল৷ বাইন, গরান, গর্জন প্রভৃতি রকমারি গাছের ঘন অরণ্য৷ শুধু সবুজ আর সবুজ৷ খানিক বাদে ভটভটি যখন ওপারে জঙ্গলের ধার ঘেঁষে চলতে শুরু করল দেখি ছোটো এক হরিণের পাল৷ শিংওয়ালা বড়ো একটা হরিণ দিব্যি দু-পায়ে ভর দিয়ে গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে৷
তারপর দু-দিন পার হয়ে গেছে, ঘোরা হয়ে গেছে সুন্দরবনের অনেক গলিঘুঁজি৷ সরু খাল, নদী, কিন্তু আসল ব্যাপারটা সিদ্ধ হয়নি৷ অর্থাৎ বাঘের দেখা৷ সুতরাং নেপালদার মেজাজও আর ভালো হয়নি৷ এই সময়ই দেখা সেই ছেলেটার সঙ্গে৷ আমাদের ভটভটি তখন একটু বেলার দিকে দত্তর ঘাটে ভিড়েছে৷ সামনে বিশাল দত্তর গাং৷ তিনটে নদী এসে মিলেছে এখানে৷ সেদিকে তাকালে যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল৷ বড়ো বড়ো ঢেউ আছড়ে এসে পড়ছে গরান কাঠের নড়বড়ে জেটির গায়ে৷ সামান্য হাটবাজার সারতে কয়েকজন গ্রামের দিকে গেছে৷ বাকিদের গুলতানি চলছে নৌকোয়৷ ঘাটের একধারে বসা ছেলেটার দিকে নজর পড়ল সবার৷ বড়োজোর বছর তেরো বয়স৷ একমাথা উশকোখুশকো চুলে তেল পড়েনি অনেক দিন৷ রোগা খড়ি-ওঠা শরীর৷ খানিক আগে কাজের তাগিদে নদীর কাদায় নামতে হয়েছিল হয়তো৷ হাঁটু পর্যন্ত সেই পুরু কাদা শুকিয়ে সাদা হয়ে রয়েছে এখন৷ একটু মজা করতেই নেপালদা ছেলেটাকে লক্ষ করে বলল, 'দারুণ মোজা পরেছিস দেখছি!'
আনমনে বসে ছিল ছেলেটা৷ মুহূর্তে খরখর হয়ে উঠল চোখ দুটো৷ একটু আগের শুকনো মুখ শক্ত হয়ে উঠল ক্রমশ৷ ধারালো গলায় বলল, 'বাদাবনের কতটুকু জানেন বাবু?'
খোঁচাটা যে এমন হুল হয়ে ফিরবে ভাবতেই পারেনি কেউ৷ চাঁই নেপালদা অবশ্য দমবার পাত্র নয়৷ তড়িৎ গতিতে উত্তর ছুড়ে দিল, 'তুই জানিস বুঝি? তা বাঘ দেখাতে পারবি আমাদের?'
'শুধু বাঘই দেখবেন বাবু? আর কিছু নয়?' একটুও না দমে বলল ছেলেটা৷
'আর কিছু নয় বলছিস কী রে? বাঘ, কুমির, কামট এসব দেখতেই তো এসেছি এখানে৷ পারবি দেখাতে?'
'পারব না কেন বাবু! তবে ব্যাপারটা কী জানেন, আপনারা আসেন বাঘ দেখতে৷ আর এখানে গাঁয়ের মানুষ বনে যায় ওই প্রাণীটির সঙ্গে যাতে দেখা না হয় সেই প্রার্থনা নিয়ে৷ বনবিবি কখনো শোনেন, কখনো শোনেন না৷ মানুষগুলোর কপাল পোড়ে তখন৷'
'বাহ! বেশ কথা শিখেছিস দেখছি! কোন ক্লাসে পড়িস?' নেপালদা চমৎকৃত৷
'বললাম না, বাদার কিছুই জানেন না৷' মৃদু হাসল ছেলেটা৷ 'পূর্ণিমার গোনে ক-দিন মাছের মরসুম এখন৷ ক্লাসের সময় কোথায় বাবু?'
পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে বাদার নদীতে মাছের মরসুম৷ সন্দেহ নেই, ছেলেটা শেষ রাত থেকে লেগে ছিল সেই কাজে৷ পায়ের শুকনো কাদা সেই সময়ের৷ কিন্তু ছেলেটার মুখের ওই বাঁকা হাসি তখন নেপালদার মাথায় আগুন জ্বেলে দিয়েছে৷ বলল, 'তা তো বুঝলাম৷ কিন্তু একটু আগের কথা ভুলে যাসনি তো?'
'ভুলব কেন বাবু?' ছেলেটা দমল না একটুও৷ 'কিন্তু তাহলে যে একটু দেরি করতে হবে আপনাদের৷ সেই শেষ রাতে বেরিয়েছি, বাড়ি যেতে হবে একবার৷'
ছেলেটার নাম অর্জুন সর্দার৷ নেপালদা সম্মতি দিতে এরপর ও চলে গিয়েছিল বাড়ির দিকে৷ অনেকেই অবশ্য ভাবেনি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসবে সে৷ এমনকী, নেপালদাও৷ আর সত্যিই তাই৷ ক্রমশ সময় গড়িয়ে চলেছে, অথচ দেখা নেই ছেলেটার৷ কতক্ষণ আর সময় নষ্ট করা যায়৷ তবে ব্যতিক্রম গৌর৷ ও আগেও এদিকে বার কয়েক এসেছে৷ অনেক কিছুই চেনাজানা৷ ঘটনার সময় কেনাকাটা করতে গ্রামের দিকে গিয়েছিল৷ সব শুনে খোঁজ নিয়ে বলল, 'ছেলেটার বাড়ি কাছে নয়৷ মাইল চারেক এখান থেকে৷ উচিত ছিল ভ্যান রিকশার ভাড়াটা দিয়ে দেওয়া৷ তা যখন হয়নি, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে৷'
নেপালদা নিজেই আপত্তি তুলেছিল এরপর৷ কিন্তু নেপালদার অনেক কিছু মেনে নিলেও এই ব্যাপারটায় সায় দেয়নি গৌর৷ শুধু বলেছে, 'ছোটো ছেলে৷ অত দূর থেকে এসে দেখবে আমরা নেই, সেটা ঠিক হবে না নেপালদা৷'
গৌর দেখেনি ছেলেটাকে৷ কীসের জোরে একথা বলেছিল তা সে-ই জানে৷ তবে সেটা যে পরে নেপালদার সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, ভাবতে পারেনি কেউ৷ কিন্তু সে তো পরের কথা৷ বরং আগের কথাই বলি৷
প্রায় ঘণ্টা দুই পরে অর্জুন কিন্তু সত্যি এসে হাজির হল ঘাটে৷ প্রায় ছুটতে ছুটতে৷ হাতে একটা ছোটো পুঁটলিতে দু-একটা জামাকাপড়৷ ততক্ষণে প্রায় বিক্ষোভ শুরু হয়ে গেছে কম-বেশি সবার মধ্যে৷ ছেলেটাকে দেখেই প্রায় হুংকার দিয়ে উঠল নেপালদা, 'তোর এত দেরি হবে বলিসনি তো ছোঁড়া! দিনটা নষ্ট করে দিলি৷'
অর্জুন অবশ্য দমল না একটুও৷ একগাল হেসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, 'সে কথা তো তখন শুধোননি বাবু৷ আমি কিন্তু বাড়িতে গিয়ে একটুও দেরি করিনি৷ ছুটে গেছি আর এসেছি৷'
ছেলেটা যে বিশেষ বাড়িয়ে বলেনি সেটা বোঝা যাচ্ছিল৷ সারা শরীর ঘামে জবজব করছে৷ রীতিমতো হাঁপাচ্ছে৷ মোক্ষম জবাব পেয়ে নেপালদা তাই আর কথা বাড়াল না৷ আপন মনে গজগজ করতে লাগল৷ ভটভটি ছেড়ে দিল৷
একটা দিন কেটে গেছে তারপর৷ ঘোরা হয়ে গেছে আরও অনেকটাই৷ অর্জুনের কথায় ভটভটি ঢোকানো হয়েছে কয়েকটা সরু খালে৷ কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়নি৷ নেপালদা তো বটেই, ইতিমধ্যে অনেকেই টিপ্পনি কাটতে শুরু করেছে ওকে৷ তবে দরকারে ফাইফরমাশটা ভালোই খাটছে ছেলেটা৷ এরই মধ্যে দারুণ একটা কাজও করে ফেলল৷ ভাটা শুরু হয়েছে৷ কয়েক জনেরই ইচ্ছেয় মাঝি নৌকো ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা খালে৷ দু-দিকে ঘন জঙ্গল৷ বড়ো বড়ো গাছে ছেয়ে রয়েছে আকাশ৷ এই দুপুরেও ছমছমে অন্ধকার৷ খানিক ঢুকতেই অর্জুন হঠাৎ জলের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'জলের যা টান, এ মজা শিস-খাল বাবু! এই ভাটায় আরও ভিতরে গেলে বিপদ হবে৷ নৌকো ফেরান৷'
শুনে হেসে উঠল সবাই৷ সবচেয়ে বেশি নেপালদা৷ ধমক দিয়ে বলল, 'থাম ছোঁড়া৷ বাঘ দেখাবি বলে নিয়ে এসে ভয় পেয়ে গেলি এর মধ্যেই!'
এই প্রথম দমে গিয়েছিল অর্জুন৷ পরিণামটা টের পাওয়া গিয়েছিল অচিরেই৷ খালটা সরু হয়ে আসছিল ক্রমেই৷ খানিক বাদে মাঝি নিজেই ব্যাপারটা আঁচ করে বলল, 'এ মজা শিস-খালই বাবু৷ আরও ভিতরে গেলে বিপদে পড়তে হবে৷'
কিন্তু বিপদের তখন যে আর বাকি নেই, বুঝতেও পারেনি কেউ৷ ফেরবার জন্য তাড়াতাড়ি ভটভটি ঘোরাতে গিয়ে হঠাৎ তার তলা মাটিতে গেল আটকে৷ শুধু তাই নয় ভটভটির পিছনের দিকের খানিকটা ঢুকে গেল পাড়ে ঘন এক হেঁতালঝাড়ের ভিতর৷ যথাসাধ্য চেষ্টা করেও মাঝি তার নৌকো নড়াতে পারল না৷
ব্যাপারটা যে কতখানি ভয়ানক তখন বুঝতে বাকি নেই কারও৷ নদীর মাঝে নিরাপদে নৌকোয় বসে জঙ্গল দেখতে বেশ লাগে৷ কিন্তু সেই জঙ্গলে যখন নৌকোর গলুই আটকে যায়, তখন আর মজা নয়, শুরু হয় অন্য জিনিস৷ তার উপর, খানিক আগে খালের ধারে এক গাছের ডালে বাঁধা ছেঁড়া একটা গামছা দেখে এসেছি৷ দিন কয়েক আগেই নাকি ওখানে বাঘে মানুষ নিয়েছে৷ এই জঙ্গলে যে বাঘ আছে সেটা অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার জন্যই ওই নিশান৷ ব্যাপার দেখে কারও মুখে কথা নেই আর৷ ব্যতিক্রম নয় নেপালদাও৷ এদিকে ভাটায় তখন দ্রুত জল নেমে চলেছে৷ যত দেরি হবে, নৌকো আরও বসে যাবে৷ ফের পুরো জোয়ার না আসা পর্যন্ত এই ভয়ানক জঙ্গলের মধ্যে নৌকোয় পড়ে থাকতে হবে৷
এই অবস্থায় আর সময় নষ্ট না করে মাঝিদের একজনকে নিয়ে অর্জুন নিজেই নেমে পড়ল সেই হেঁতালঝাড়ের ভিতর৷ ঠেলে বের করে দিল নৌকো৷ প্রায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল সবার৷
বয়সে ছোটো হলেও ছেলেটা যে বাদার অনেক কিছুই জানে এরপর মানতে বাধ্য হয়েছিল সবাই৷ জিজ্ঞেস করতে ব্যাপারটা সাফ করেও দিয়েছিল ও৷ মজা শিস-খাল, অর্থাৎ যে খালের অন্য মুখ জঙ্গলের ভিতর ক্রমশ সরু হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, সেই খালে ভাটায় জল নামে দ্রুত৷ স্রোতের টান তাই খুব বেশি৷ আর ফোড়ন-খাল, অর্থাৎ যে খালের দুই মাথাই জঙ্গল ফুঁড়ে দুই দিকে কোনো বড়ো নদীতে মিশেছে, সেই খালে ভাটায় জল নামে দুই মুখ দিয়েই৷ তাই স্রোতের টান তেমন বেশি হয় না৷ এমনকী অনেক সময় দেখা যায়, খালের দুই পার ধরে দুই বিপরীতমুখী স্রোত চলেছে দুই দিকে৷
ব্যাপারটা জলের মতোই সহজ হয়তো৷ কিন্তু জলের টান দেখে সেটা বোঝা যে মোটেই সহজ নয়, তা বলাই বাহুল্য৷ অর্জুনের খাতির তাই এরপর বেড়েছিল খানিকটা৷ অবশ্য বাঘ দেখাতে পারেনি বলে ও নিজেই দমে গিয়েছিল একটু৷ নেপালদাও খোঁচাচ্ছিল মাঝেমধ্যে৷ এর খানিক বাদেই ঘটল সেই ব্যাপার৷
অর্জুনের নির্দেশে ভটভটি তখন একটা ফোড়ন খালে ঢুকেছে৷ বেশ চওড়া খাল৷ ভাটা হলেও জল রয়েছে যথেষ্ট৷ দু-দিকে নিবিড় ঘন জঙ্গল৷ বড়ো বড়ো গাছ৷ এই দুপুরেও মরা আলোয় ঝিমঝিম করছে চারপাশ৷ সেই খালের ভিতর খানিক এগিয়ে একটা শাখা বেরিয়েছে বাঁ-দিকে৷ সেই বাঁকের কাছে ভটভটি পৌঁছোতে হাত দেখিয়ে চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল অর্জুন, 'ওই দেখুন বাবু, কুমির!'
একসাথে সব কয়টা চোখ মুহূর্তে গিয়ে পড়ল অর্জুনের হাত লক্ষ করে৷ বাঁ-দিকের খালটা খানিক গিয়ে বাঁক নিয়েছে৷ সেই বাঁকের মুখে উঁচু পাড়ের উপর দিবানিদ্রা সারছে মস্ত এক কুমির৷ তাড়াতাড়ি নৌকো ঘোরানো হল সেই খালের ভিতর৷ অত বড়ো কুমির দেখে ততক্ষণে রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে৷ গোড়ায় দূর থেকেই প্রাণীটিকে দেখা হচ্ছিল৷ কিন্তু সাহস বাড়তে ধীরে ধীরে খানিক কাছে নেওয়া হল নৌকো৷ নোনা জলের অত বড়ো কুমির আগে দেখিনি৷ নাক থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত প্রায় ফুট কুড়ি লম্বা৷ হাঁ করে তাকিয়ে আছি সবাই৷ ভটভটির ইঞ্জিন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ প্রায় মিনিট পাঁচেক কেটে গেছে৷ বিশাল প্রাণীটির কিন্তু সাড়াশব্দ নেই৷ চোখ বন্ধ৷ প্রায় মড়ার মতোই পড়ে রয়েছে নদীর উঁচু পাড়ের উপর৷ দেখে কে যেন বলল, 'এটা মরা কুমির নয়তো?'
নেপালদা বোধ হয় তৈরি হয়েই ছিল৷ সায় দিয়ে বলল, 'তাই তো মনে হচ্ছে রে৷ একটু নড়েও তো না৷ কী রে অর্জুন, বাঘ দেখাবি কথা দিয়ে শেষে এক মরা কুমিরের কাছে নিয়ে এলি!'
উত্তরে অর্জুন নীরবে নেপালদার দিকে তাকাল৷ ঝিলিক দিয়ে উঠল চোখ দুটো৷ বলল, 'নৌকো আর একটু কাছে নেবেন নাকি?'
সাহস পেয়ে নেপালদা এবার মাঝিদের নৌকো আরও কাছে নিতে বলল৷ আদেশ পেয়ে ফের চালু হল ইঞ্জিন৷ ভটভটি চলতে শুরু করল৷ কিন্তু মাঝি সামলাতে পারল না৷ গতি কমাবার আগেই নৌকো এগিয়ে গেল অনেকটাই৷ প্রায় পাড়ের কাছে৷ তারপরেই ঘটল এক ভয়ানক ব্যাপার৷ উপরে কুমিরটা সজাগ হয়ে উঠল মুহূর্তে৷ নড়ে উঠল লেজ৷ তারপর সড়াৎ করে ঢাল বেয়ে নেমে এল নীচের দিকে৷ ততক্ষণে ভটভটি গতি সামাল দিতে না পেরে আরও সামনে এসে পড়েছে৷ ফলে যা হবার তাই ঘটল৷ অত বড়ো কুমিরটা হুড়মুড় করে এসে পড়ল একেবারে নৌকোর উপর৷ কাত হয়ে গেল নৌকো৷ সামনে ছিল খাওয়ার জলের বড়ো ড্রাম৷ লেজের ঝাপটায় উলটে গেল সেটা৷ ভাগ্যিস, নীচে সেই মুহূর্তে কেউ ছিল না৷ সবাই ছাদের উপর৷ তাই বড়ো বিপদ হল না৷ কিন্তু যা হল, তাও কম নয়৷ ছোটো ভটভটি নৌকো৷ অত বড়ো কুমিরটা ওই ভাবে তার উপর এসে পড়তেই সেটা একেই গিয়েছিল কাত হয়ে, তার উপর আতঙ্কে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি৷ ওদিকে কুমিরটাও তখন বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে প্রায় দাপাদাপি জুড়ে দিয়েছে নৌকোয়৷ বিপজ্জনক ভাবে দুলতে শুরু করেছে ভটভটি৷ দাপাদাপিতে পাটাতন ভেঙে কুমিরটা একবার নৌকোর খোলের ভিতর ঢুকে গেলে দেখতে হত না৷ কিন্তু তার আগেই প্রাণীটা খানিক সামলে ছিটকে পড়ল নদীর জলে৷ দেখা গেল না আর৷
পুরো ব্যাপারটা ঘটতে দেড়-দুই সেকেন্ডের বেশি লাগেনি৷ কিন্তু তাতেই দারুণ আতঙ্কে প্রায় কাঠ হয়ে গেছে সবাই৷ তার মধ্যেই হঠাৎ খেয়াল হল টাল সামলাতে না পেরে খোদ নেপালদা কখন পড়ে গেছে জলে৷ সাঁতার না জানায় হাবুডুবু খেতে খেতে স্রোতের টানে ভেসেও গেছে খানিক৷ আমাদের মধ্যে সাঁতার জানে অনেকেই৷ কিন্তু একটু আগে অত বড়ো কুমির দেখার পরে কে নামবে জলে! সবাই হায় হায় করে উঠলেও তাই জলে নামতে সাহস পাচ্ছে না কেউ৷ ইতস্তত করছে মাঝিরাও৷ সেই সময় অর্জুন একাই লাফিয়ে পড়ল জলে৷ তিরবেগে নেপালদার কাছে৷ কিন্তু বিপদ আরও বাড়ল তাতে৷ ও কাছে যেতেই হাবুডুবু খেতে খেতে নেপালদা দু-হাতে জড়িয়ে ধরল তাকে৷ অত বড়ো চেহারার মানুষটা ওই ভাবে জড়িয়ে ধরতে সামলাতে পারল না অর্জুন৷ জড়াজড়ি করে একসাথে ডুবে গেল দু-জনেই৷
ব্যাপার দেখে তখন বাকরোধ হয়ে গেছে সবার৷ দু-জনের কারও আর বাঁচার আশা নেই, যখন ভাবতে শুরু করেছে সবাই, সেই সময় ফের ভেসে উঠল দু-জন৷ নেপালদা মড়ার মতো নেতিয়ে পড়েছে তখন৷ সাড় নেই শরীরে৷ অর্জুন ওই অবস্থায় তাকে দ্রুত টেনে আনল নৌকোর কাছে৷ ধরাধরি করে তোলা হল উপরে৷ নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে৷ ব্যাপার কী, যখন ভাবছে সবাই, তখন অর্জুনই খোলসা করল সেটা৷ ততক্ষণে সে-ও লাফিয়ে উঠে পড়েছে নৌকোয়৷ 'ও ভাববেন না বাবু৷ উনি তখন এমন জড়িয়ে ধরেছিলেন যে, হাত আর কনুই দিয়ে গোটা কয়েক গুঁতো মারতেই হল৷ নইলে ডুবে মরতাম দু-জনেই৷'
নেপালদার জ্ঞান ফিরতে অবশ্য সময় লাগেনি৷ তবে সে-দিনটা আর কারও পেটে পড়েনি কিছু৷ খাওয়ার জল নেই এক ফোঁটা৷ রান্নাও বন্ধ৷ কাছাকাছি গ্রামের ঘাটে ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা৷ সারা সময়টা নেপালদা প্রায় গুম হয়ে রইল৷ এমনকী কলকাতায় ফিরেও কারও সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেনি৷ বলতে গেলে একরকম ছাড়াছাড়িই হয়ে গেছে৷
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%