বিষ্ণুচটির গড়ুরবাবা

শিশির বিশ্বাস

এদিকের পাহাড়ে তখনও গাড়ি চলার রাস্তা হয়নি৷ গ্রামের মানুষ চড়াই পথে হেঁটে পেরোত মাইলের পর মাইল৷ তার উপর অনেকের পিঠে থাকত মস্ত বোঝা৷ চলতে চলতে হাঁপ ধরে আসত৷ যখন আর চলতে পারত না, সামান্য বিশ্রাম৷ তারপর ফের পথ চলা৷ ভিন গাঁয়ে কুটুমবাড়ি যেতে কখনো দুটো দিনও পার হয়ে যেত৷ অনেক গাঁয়ে জেলাসদরে গেছে এমন মানুষ একজনও ছিল না৷ সে সব বেশ কয়েক বছর আগের কথা৷ চামোলি জেলার এমনই এক গ্রাম বিষ্ণুচটি৷ গ্রামের খানিক আগে খাড়াই পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ক্ষীরগঙ্গা ঝরনা যেখানে দুধগঙ্গা নদীতে আছড়ে পড়েছে, তার কাছেই পথের ধারে মস্ত এক ধুপি গাছ৷ পাশ দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে খাড়াই পথ চলে গেছে বিষ্ণুচটির দিকে৷ সেদিকের যাত্রীদের অনেকটা চড়াই পথ ভাঙতে হবে এবার৷ তবে সেজন্য নয়, এই গাছের কাছে পৌঁছে উপর দিকে তাকালেই গড়ুরবাবার ঢিপি৷ পাহাড়ের মাঝে খানিক ফাঁকায় উটের কুঁজের মতো ন্যাড়া এক ছোটো পাথুরে পাহাড়৷ এদিকের দেহাতি মানুষের গড়ুরবাবা৷ যত ব্যস্ততাই থাক, পথ চলতি মানুষ এখানে এসে সামান্য দাঁড়াবেই৷ ভক্তিভরে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম জানাবে গড়ুরবাবাকে৷ এমনকী যারা অন্য দিকে যাবে তারাও৷
এদিকের পুরোনো মানুষ যারা, তারা এখনও গড়ুরবাবার কথা উঠলে ভক্তিভরে দু-হাত কপালে ঠেকায়৷ কৌতূহলী শ্রোতাকে শোনায় সেই কাহিনি৷ সে আজকের কথা নয়৷ পৃথিবী তখন অন্য রকম ছিল৷ আকাশে তখনও চন্দ্র-সূর্য ছিল৷ গাছে পাখি৷ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বয়ে যাওয়া দুধগঙ্গা নদী আর ঝরনার কলতান৷ ভোরের বাতাস, খেতের ফসল৷ কিন্তু তার রূপ, রস, গন্ধ ছিল ভিন্ন৷ তখনকার মানুষও ছিল অন্যরকম৷ কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে গড়ুরবাবার কথা আগে বলি৷ এদিকের ছেলে-বুড়ো সবাই জানত গল্পটা৷ সেও অনেক কাল আগের কথা৷ ভগবান বিষ্ণু তাঁর বাহন গড়ুরের পিঠে চেপে আকাশপথে চলেছেন কৈলাসের দিকে৷ এই বিষ্ণুচটির কাছে এসে স্থানটি বড়ো পছন্দ হল তাঁর৷ বাহন গড়ুরকে নামতে আদেশ করলেন৷ গড়ুরের তখন বয়স হয়েছে৷ টানা অনেকক্ষণ উড়ে পরিশ্রান্ত৷ আদেশ পেয়ে প্রভুকে নামিয়ে সামান্য জিরিয়ে নেবার জন্য বসলেন৷ তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন, খেয়াল নেই৷ তাঁর সেই ঘুম যখন ভাঙল, দেখেন ভগবান একাই চলে গেছেন৷ উদবিগ্ন গড়ুর স্মরণ করলেন তাঁকে৷ দৈববাণী হল, 'ব্যস্ত হোয়ো না বৎস৷ আপাতত ওইখানেই অবস্থান করো তুমি৷ চমৎকার স্থানটির রক্ষার দায়িত্ব রইল তোমার উপর৷ সময় হলে আবার ডেকে পাঠাব৷'
ভগবানের নির্দেশে গড়ুর সেই থেকে এখানে অবস্থান করে আছেন৷ ক্রমে তাঁর দেহ পাথর হয়ে গেছে৷ কিন্তু প্রভুর আদেশ ভোলেননি৷ এই অঞ্চলের পাহাড়, নদী, অরণ্য আজও রক্ষা করে চলেছেন৷ অন্যথা হয়নি৷ বিপদে তিনিই রক্ষা করবেন সবাইকে৷ শহরের মানুষ এসব গল্পকথা বলে উড়িয়ে দেবে হয়তো৷ কিন্তু দেহাতি পাহাড়ের মানুষ সেকথা ভাবতে পারেনি কোনো দিন৷ গড়ুরবাবাকে তুষ্ট করতে তারাও সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলতেন৷ ন্যূনতম প্রয়োজন ছাড়া কখনো গাছ বা পাহাড়ের ক্ষতি করেনি কেউ৷ এমনকী ফসল রোয়ার মরসুমে জমি তৈরি বা খেতে চাষ দেওয়ার আগেও ভক্তিভরে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে এসেছে, তিনি যেন ক্ষমা করেন তাদের৷ তারপর পুজো দেওয়া হত গড়ুরবাবার উদ্দেশ্যে৷ তারা জানত, গড়ুরবাবা তাদের প্রার্থনার কথা ভগবানের কাছে পৌঁছে দেবেন৷ গ্রামের মানুষের সারা বছরের ফসল, অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা তিনিই করবেন৷
দুর্গম পাহাড় অঞ্চলে এরপর শুরু হল পথঘাট তৈরির কাজ৷ অল্প দিনের মধ্যেই চালু হয়ে গেল বাস৷ অন্য আরও অনেক গাড়ি৷ ক্রমে বাইরের মানুষ একজন দু-জন করে আসতে শুরু করল৷ গোড়ায় তারাই টের পেয়েছিল ব্যাপারটা৷ সেবার শহর থেকে জনা কয়েক মানুষ পাহাড়ে ট্রেকিং করতে এসেছে৷ বিষ্ণুচটির কাছে এসে ইচ্ছে হল ক্ষীরগঙ্গার পাশ ধরে যতটা পারা যায় উপরে ঘুরে আসবে৷ সমস্যা হল পিঠের ভারী রাকস্যাকগুলো নিয়ে৷ ঘণ্টা কয়েকের ব্যাপার৷ অযথা রাকস্যাকগুলো বয়ে লাভ নেই৷ বরং স্থানীয় কারও জিম্মায় রেখে যাওয়াই ভালো৷ পথে দেহাতি একজনকে পেয়ে তাকে সেই কথাই বলেছিল তারা৷ উত্তরে লোকটা ওদের দিকে হাঁ করে খানিক তাকিয়ে থেকে বলেছিল, 'তার কী দরকার শেঠ! পথের পাশে নামিয়ে রেখে চলে যান৷ গ্রাম এখান থেকে অনেকটাই চড়াই পথ৷ অযথা কষ্ট করবেন কেন?'
এরপর অনেক ভাবে চেষ্টা করেও মানুষটাকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারেনি তারা৷ শেষে মালপত্র সেইখানে পথের পাশে নামিয়ে রেখে চলে গিয়েছিল ট্রেকিংয়ে৷ মাথায় দুশ্চিন্তা কিছু ছিলই৷ দরকারি সমস্ত জিনিসপত্র ওই রাকস্যাকে৷ অবাঞ্ছিত কিছু ঘটে গেলে সর্বনাশের বাকি থাকবে না৷ তাই যথাসম্ভব তাড়াতাড়িই ফিরে এসেছিল ওরা৷ অবাক হয়ে দেখেছিল, যেভাবে ওরা রাকস্যাকগুলো রেখে গিয়েছিল, ঠিক সেই ভাবেই পড়ে রয়েছে৷ একটি জিনিসও খোয়া যায়নি৷
এসব বেশ কয়েক বছর আগের কথা৷ তারপর ক্ষীরগঙ্গা আর দুধগঙ্গা দিয়ে গড়িয়ে গেছে অনেক জল৷ মাত্র কয়েক ঘর মানুষের সেই বিষ্ণুচটি এখন আর চেনার উপায় নেই৷ যে গ্রামে একটা পাঠশালা ছিল না সেখানে এখন হাই স্কুল৷ আগে ক্ষীরগঙ্গা ঝরনার দু-ধারে ছিল নানা আকারের ধুপি, চীর আর ভূর্জর অরণ্য৷ শীতে ক্ষীণ হয়ে আসা ক্ষীরগঙ্গার ধারা তাদের ডাল-পাতার ফাঁকে দিনভর লুকোচুরি খেলত৷ রডোডেনড্রনের আগুন ঝরানো থোকায় জলে লাল রং ধরত৷ সেসবের বেশিরভাগই সাফ হয়ে গেছে অনেক দিন৷ এমনকী গ্রামের কাছে পথের ধারে সেই যে ধুপি গাছ, তাও কাটা পড়েছে৷ সাফ হয়ে গেছে চারপাশের আরও অনেক গাছপালা৷ সেখানে এখন সরকারি অফিস৷ ক্ষীরগঙ্গা ঝরনাধারায় বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরির তোড়জোড় চলছে৷ দিনভর ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটানোর শব্দ৷ ক্রেন আর বুলডোজারের ঘড়ঘড় আওয়াজ৷ উপর দিকে তাকালে রাস্তা থেকে তাই আর এখন গড়ুরবাবাকে দেখা যায় না৷ তবে তা নিয়ে নতুন প্রজন্মের তেমন আক্ষেপ নেই৷ ভিন গাঁয়ের অনেকে ভুলেই গেছে তাঁর কথা৷ পাশ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে ছুটে যায় গাড়ি, কেউ ফিরেও তাকায় না৷ কিছুটা ব্যতিক্রম এই বিষ্ণুচটির মানুষ৷ তাও যাঁরা বয়সে প্রাচীন, শুধু তাঁরাই৷ তাঁদেরই একজন সুরজদেও৷ বয়স প্রায় আশি৷ শরীর এখনও যথেষ্টই মজবুত৷ টনটনে স্মৃতিশক্তি৷ পুরোনো সেই সব দিনের কিছুই ভোলেননি এখনও৷ দিন কয়েক আগে গ্রামের এক গৃহস্থের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে৷ সবাই ভিন গাঁয়ে আত্মীয়র বিয়েতে গিয়েছিল৷ চোর রাতে তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে টাকাপয়সা, সোনাদানা যা ছিল সব নিয়ে গেছে৷ সন্দেহ নেই, এ কাজে গ্রামেরই কেউ জড়িত৷ ভাবতে গিয়ে প্রায় শিউরে ওঠেন সুরজদেও৷ গড়ুরবাবা এ পাপ কি সইবেন?
পুরোনো দিনের কয়েকজনকে নিয়ে সুরজদেও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন৷ কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারেননি৷ নতুন প্রজন্মের ছেলেরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে৷ জুটেছে পাগলাবুড়ো বদনাম৷ মানুষটি তাতে অবশ্য দমেননি৷ এখনও কাঁধে একটা ময়লা ঝুলি নিয়ে দিনভর ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে৷ কোথাও ভিড় দেখলেই দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করেন, 'ভাইরা, স্বর্গ থেকে নামা পবিত্র ক্ষীরগঙ্গা আটকে এই যে বাঁধ তৈরির কাজ চলছে, বারুদ ফাটিয়ে পাহাড় ভাঙা হচ্ছে, এ ঘোরতর অন্যায়৷ এ পাপ ভগবান সইবেন না৷ সইবেন না গড়ুরবাবা-৷'
এসব অবশ্য কানে নেয় না কেউ৷ পাগলাবুড়োর প্রলাপ শুরু হতেই ফাঁকা হয়ে যায় চারপাশ৷ তো চলছিল এইভাবেই৷ এরই মধ্যে ঘটল ব্যাপারটা৷ সুরজদেও-র এতদিনের প্রচেষ্টা সেই প্রথম কিছু আলো দেখাল৷ কানাঘুসো শোনা যাচ্ছিল ক-দিন ধরেই৷ কিন্তু বিশ্বাস করতে পারেনি কেউ৷ এমনকী সুরজদেও নিজেও৷ এরপর হঠাৎ একদিন গাড়ি-ভরতি কুলি-মজুর, আর সার্ভেয়ার এসে গড়ুরবাবার সেই পাথুরে ঢিপির মাথায় তাঁবু ফেলে মাপজোখ শুরু করে দিতেই হইচই শুরু হল বিষ্ণুচটি গ্রামে৷ প্রাচীনদের সঙ্গে কিছু নবীন গ্রামবাসীও এগিয়ে এল৷ গড়ুরবাবা পাহাড়কে তারা ভগবান বলে মানে৷ সেই পাহাড়ের মাথায় হোটেল বানাতে তারা কিছুতেই দেবে না৷
খবর পেয়ে পরের দিনই হেলিকপ্টারে ছুটে এলেন মন্ত্রী৷ এ অঞ্চলের উন্নয়নের দায়িত্ব তাঁর৷ প্রভূত ক্ষমতাশালী যে সংস্থা এখানে হোটেল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, নানা কারণে তাঁদের কথা শুনতেই হয় তাঁকে৷ অনেকটা সময় নিয়ে তিনি গ্রামের মানুষকে বোঝালেন, এখানে পাঁচ তারা হোটেল তৈরি হলে, গ্রামের চেহারাই বদলে যাবে৷ তৈরি হবে হেলিপ্যাড৷ দেশ-বিদেশ থেকে রহিস আদমি আসবে৷ কাজ পাবে অনেকে৷
কিন্তু কোনোভাবেই তিনি গ্রামবাসীর মন গলাতে পারলেন না৷ সুরজদেও তো সাফ জানিয়ে দিলেন, ফের কেউ গড়ুরবাবার উপর চড়তে গেলে তাঁর মৃতদেহের উপর দিয়ে যেতে হবে৷
মন্ত্রী ফিরে গেলেন৷ কিন্তু প্রচেষ্টা জারি রইল৷ এল দফায় দফায় নানা পদের সরকারি অফিসার৷ সঙ্গে পুলিশ৷ এল হুমকি৷ কিন্তু কোনো কিছুই দমাতে পারল না বিষ্ণুচটির মানুষকে৷ ততদিনে তাদের এই প্রচেষ্টায় শামিল হয়েছেন আশেপাশের আরও অনেক গ্রামের মানুষ৷ গড়ুরবাবার অবমাননা তাঁরা কিছুতেই সইবে না৷
পুলিশের তরফে সুরজদেওকে গ্রেফতারের প্রস্তাব এল৷ কিন্তু ওই বয়সের এক মানুষকে জেলে ভরলে হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবে তখনই সায় এল না৷
সরকারের তরফে যখন এইসব চলছে, তখন ওদিকে পাহাড়ে শুরু হয়ে গেছে অন্য এক ব্যাপার৷ দিন কয়েক ধরেই ক্রমশ ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ৷ ঘন ঘন বৃষ্টি৷ বর্ষাকালে পাহাড়ে এমন প্রতি বছরই হয়৷ ফুলে-ফেঁপে ওঠে দুধগঙ্গার জল৷ গুম গুম শব্দে আছড়ে পড়া ক্ষীরগঙ্গার দিকে তাকালে বুক ঢিপ ঢিপ করে৷ তারপর ফের শান্ত হয়ে যায় সব৷ কিন্তু এবার যেন অন্য রূপ৷ আকাশে বেড়েই চলেছে মেঘ৷ বিরাম নেই বৃষ্টির৷ দিন কয়েক ধরে সবাই ঘরে বন্দি৷ বিশ্রাম নেই শুধু সুরজদেও-এর৷ বৃষ্টি মাথায় বৃদ্ধ মানুষটি ছুটছেন গ্রাম থেকে গ্রামে৷ হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন, 'সাবধান হও গো তোমরা৷ ভগবান রুষ্ট হয়েছেন৷ রুষ্ট হয়েছেন গড়ুরবাবা৷ ভয়ানক কিছু ঘটবে এবার হুঁশিয়ার৷'
পাগলাবুড়োর প্রলাপ ভেবে কান দেয়নি তেমন কেউ৷ কিন্তু আকাশে জমাট মেঘের ঘনঘটা কমার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না৷ বরং বাড়তেই লাগল৷ তার মধ্যেই এক রাতে শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি৷ দুধগঙ্গার জল আগেই অনেক বেড়ে গিয়েছিল৷ সেই রাতে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফুলে উঠল৷ তীব্র স্রোতের টানে গুম গুম শব্দে গড়িয়ে চলল বড়ো বড়ো পাথর৷ সেই সাথে মোচার খোলের মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলল দু-দিকের ঘরবাড়ি৷ সুরজদেও-এর কথায় যারা সতর্ক হয়ে আগেই ব্যবস্থা নিয়েছিল, তারা বাঁচল বটে৷ কিন্তু ততক্ষণে ক্ষীরগঙ্গার জলধারা হঠাৎ তুফান হয়ে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে৷ জলের তোড়ে পাহাড় বেয়ে প্রচণ্ড শব্দে ঠিকরে গড়িয়ে আসছে বড়ো বড়ো পাথর৷ সেই আঘাতে মজবুত দালান বাড়ি পর্যন্ত কেঁপে উঠছে থরথর করে৷ কতক তাসের ঘরের মতো ভেঙে গড়িয়ে চলেছে দুধগঙ্গার দিকে৷ চারদিকে পাহাড় ধসে পড়ার আওয়াজ৷ সেই ভীষণ শব্দে শত শত মানুষের অন্তিম আর্তনাদ কোথায় হারিয়ে গেল! আর যাদের তখনও সেই অবস্থা হয়নি, আতঙ্কে কাঠ হয়ে পড়ে রইল৷
এরই মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু বিষ্ণুচটি৷ জলধারা বা গড়িয়ে আসা পাথর কোনোটাই এখানে তেমন মারাত্মক হয়নি৷ বিশাল আকারের বোল্ডার আর জলধারা গড়ুরবাবার গায়ে বিপুল শব্দে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ে সেখানেই জমা হয়েছে৷ আর নীচে গড়িয়ে আসতে পারেনি৷ ঘন ঘন বিদ্যুৎ-এর আলোয় গ্রামবাসীরা বেশ বুঝতে পারছিল, সেই বিষম আঘাতে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে গড়ুরবাবা৷ বোল্ডারের আঘাতে মুষলধারায় বৃষ্টির ভিতরও ছিটকে উঠছে আগুনের ফুলকি৷ গড়ুরবাবা একাই ঠেকিয়ে রেখেছেন৷ সেই দৃশ্য দেখে অনেক দিন পরে বিষ্ণুচটির ঘরে ঘরে প্রার্থনা শুরু হয়েছিল, রক্ষা করো গড়ুরবাবা, রক্ষা করো৷
একসময় দিনের আলো ফুটল৷ আকাশ মেঘলা হলেও বৃষ্টি তখন ধরে এসেছে৷ ভয়ে ভয়ে একজন দু-জন করে বিষ্ণুচটির মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে৷ চারপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ধ্বংসস্তূপ৷ ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন৷ একটি গাছপালাও অক্ষত নেই৷ ব্যতিক্রম শুধু এই বিষ্ণুচটি৷ যেমন ছিল তেমনই রয়েছে৷ বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই গড়ুরবাবার নামে জয়ধ্বনি উঠল৷ কিন্তু বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল৷ জয়ধ্বনির মাঝেই কয়েকজন লক্ষ করল গড়ুরবাবা হঠাৎ দুলতে শুরু করেছে৷ মুহূর্তে দ্বিগুণ হল হর্ষধ্বনি৷ নতজানু হয়ে শুরু হল প্রার্থনা৷ গড়ুরবাবা এতদিন পরে জেগে উঠেছেন!
গ্রামের বৃদ্ধ সুরজদেও চিৎকার করে উঠলেন ওই সময়, 'পালাও, পালাও সবাই! পাহাড়ে পাপের বোঝা পূর্ণ হয়েছে৷ গড়ুরবাবা ভগবানের কাছে ফিরে যাবেন এবার৷ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বিষ্ণুচটি৷ পালাও! যে যেদিকে পারো পালাও৷ এক মুহূর্ত দেরি কোরো না কেউ৷'
বৃদ্ধ পাগলাবুড়োর হুঁশিয়ারি এবার আর কেউ উড়িয়ে দিতে পারেনি৷ গ্রাম ছেড়ে দিগবিদিক হারিয়ে ছুটতে শুরু করেছিল সবাই৷ হুঁশিয়ারি দিয়ে একমাত্র সুরজদেওই শুধু ছুটে বেড়াচ্ছিলেন বিষ্ণুচটির পথে পথে৷
ভয়ানক ব্যাপারটা ঘটেছিল ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই৷ গগনবিদারী আওয়াজে হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল মাটি, চারপাশের পাহাড়, নদী আর ঝরনা৷ কান-ফাটানো সেই আওয়াজের ভিতর গড়ুরবাবা ভেঙে গুঁড়িয়ে গড়িয়ে আসতে লাগল নীচে৷ সেই সঙ্গে বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো ধেয়ে এল রাতভর জমে ওঠা রাশি রাশি পাথর আর জলধারা৷ নিমেষে গিলে ফেলল সব৷
সেই প্রলয় যখন থামল, বিষ্ণুচটি গ্রামের কোনো চিহ্নই তখন নেই৷ অদৃশ্য হয়েছেন গড়ুরবাবাও৷ ভগবান তাঁর প্রিয় বাহনটিকে ফের ডেকে নিয়েছেন নিজের কাছে৷ তবে যাবার আগে তিনি রক্ষা করে গেছেন বিষ্ণুচটির মানুষগুলোকে৷ একমাত্র বৃদ্ধ সুরজদেওর কোনো সন্ধান মেলেনি৷ ভগবানের কাছে ফিরে যাবার সময় গড়ুরবাবা তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন৷
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%