উটকো আপদ আর কাকে বলে! একেই গোবিন্দ ঢালির তখন শিরে সংক্রান্তি৷ চলেছে সেই ব্যারাকপুরের দিকে৷ কোম্পানি নতুন সেপাই নিচ্ছে পল্টনে৷ যদি শিকে ছেড়ে, সেই ভরসায় পরশু রাত থেকে পথে৷ আরও নাকি দিন কয়েক লাগবে৷ গোবিন্দ অবশ্য সেজন্য পরোয়া করে না৷ এসব ভালোই অভ্যাস আছে৷ আসল ভাবনা, একটা হিল্লে হবে কি না৷ তার মধ্যে উটকো আপদ এই রাসু রায়৷
গত রাতে যে চটিতে ছিল, দেখা সেখানেই৷ লোকটাকে মোটেই সুবিধের মনে হয়নি৷ তাই এড়িয়েই গিয়েছিল৷ কিন্তু আজ ভোরে চটি থেকে বের হবার সময় সে কাউমাউ করে জানাল, সেও নাকি চলেছে সিপাইদলে নাম লেখাতে৷ মুরুব্বি ধরে এক সুপারিশপত্রও লিখিয়ে এনেছে৷ কিন্তু সমস্যা হয়েছে, পথঘাট তেমন জানা নেই৷ ব্যারাকপুর তো কম দূর নয়৷ তার উপর পথে নানা বিপদ৷ এই অবস্থায় গোবিন্দ ভাই যদি সঙ্গে নেয় তো নিশ্চিন্ত হতে পারে৷
ওইভাবে কেউ অনুরোধ করলে কি আর মানা করা যায়? গোবিন্দও রাজি হয়েছিল৷ কিন্তু বিকেলের মধ্যেই টের পেয়েছে, কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি৷ দুপুরে পেটে কিছু দেবার জন্য ওরা তখন এক চটিতে৷ গোবিন্দর থামার ইচ্ছে ছিল না৷ সঙ্গে পুঁটলিতে চিঁড়ে রয়েছে৷ তাই চিবিয়ে কোনো এক পুকুর থেকে আঁজলা ভরে জল খেলেই মিটে যায়৷ কিন্তু রাসু রায় রাজি হয়নি৷ খাবার পাতে সামান্য হলেও তার ভালোমন্দ দরকার৷ নতুন সঙ্গীকেও পেট পুরে খাওয়াবে আজ৷
দুপুরের ভোজটা তাই ভালোই হয়েছিল৷ সরেস দই, কলা আর পাটালি দিয়ে এক পেট চিঁড়ে-মুড়ি৷ সঙ্গে গোটা ছয়েক করে কড়া পাকের সন্দেশ৷ খাবার পরেই রাসু রায় বায়না ধরল, একটু গড়িয়ে নেবে৷ অমন ভোজের পর সামান্য গড়িয়ে নিতে গোবিন্দরও আপত্তি হয়নি৷
পেশার তাগিদেই গোবিন্দ যেমন নিমেষে ঘুমিয়ে পড়তে পারে৷ ভাঙতেও সময় লাগে না৷ আজও ব্যতিক্রম হয়নি৷ ঘুম ভেঙে যখন উঠে বসল, সূর্য পশ্চিম আকাশে খুব বেশি গড়াতে পারেনি৷ কিন্তু রাসু রায় কোথায়? কাছেই চাদর বিছিয়ে শুয়েছিল৷ এখন চাদরটা রয়েছে বটে৷ তবে মানুষটা নেই৷
এক হাটের মাঝে চটি৷ তবে হাটবার না হওয়ায় হাট একেবারেই ফাঁকা৷ উঠে সামান্য খোঁজাখুঁজি করতেই সন্ধান মিলল লোকটার৷ হাটের পিছনে এক গাছতলায় বসে রাসু রায় জনা কয়েক অপরিচিত মানুষের সঙ্গে নীচু গলায় কথা বলছে৷ সন্দেহ হলেও গোবিন্দ সেদিকে আর যায়নি৷ খানিক বাদে লোকটা ফিরে আসার পরে হালকা গলায় শুধিয়েছিল, 'হঠাৎ উঠে কোন দিকে গেছলেন গো কত্তা?'
'আর বোলো না ভাই৷ পেটে এমন কামড় দিল, ছুটতে হয়েছিল মাঠের দিকে৷'
বেমালুম মিছে কথা৷ তবু গোবিন্দ ঘাঁটায়নি৷ গত কয়েক দিনে অনেকটাই বদলে গেছে ও৷ আগের গোবিন্দ আর নেই৷ সময়টা মোটেই ভালো নয়৷ পল্টনের সেপাইরা হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে ওঠায় কোম্পানির সাহেবরা বেজায় খেপে রয়েছে৷ সন্দেহ হলেই সোজা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিচ্ছে৷ তার উপর হঠাৎ মাথা গরম করে ওদিকে যা কাণ্ড করে এসেছে, একেবারেই ঠিক হয়নি৷ নইলে এভাবে গ্রাম ছাড়তে হয়! দিব্যি ছিল৷ আশপাশের বিশটা গ্রাম গোবিন্দ ঢালির নামে কাঁপত৷ সে ছিল জমিদার রাধাকান্ত চৌধুরীর সেরা লাঠিয়াল৷
গ্রামের অনেকেই বুঝিয়েছিল, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ চলে না৷ কিন্তু গোবিন্দ বরাবরই একবগ্গা৷ কানে নেয়নি৷ দাপুটে জমিদার রাধাকান্ত চৌধুরীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তখন৷ জনা তিরিশের এক লেঠেল দলের সর্দার হবার সুবাদে নদীর নতুন চর দখল বা অন্য কাজেকর্মে জমিদার সেরেস্তায় ডাক পড়ত হামেশাই৷ কোনো দিন হেরে পালিয়ে আসতে হয়নি৷ কাছারিতে বেজায় খাতির৷ তারপর হঠাৎই ঝামেলার শুরু৷
পদ্মার বড়ো এক চর দখল নিয়ে কাজিয়া বেধেছিল পাশের জমিদার ওসমান আলির সঙ্গে৷ জমিদার ওসমান আলিও কম যায় না৷ তাই আপসে মেটেনি৷ চর দখল নিয়ে দুই পক্ষের সেদিন লড়াই হয়েছিল আধ বেলার উপর৷ লাশ পড়েছিল গোটা কয়েক৷ শেষে ওসমান আলির দলবল পালাতে পথ পায়নি৷ পাওনাগণ্ডা নিয়ে এরপরেই গোল বাধল রাধাকান্ত চৌধুরীর সঙ্গে৷
গোবিন্দ পরে অবশ্য টের পেয়েছিল, তখন রাধাকান্ত চৌধুরীও বেজায় চাপে৷ জেলায় ঘাঁটি গেড়েছেন মরিসন সাহেব৷ কোম্পানির পুলিশের জাঁদরেল কর্তা৷ বেজায় কড়া মানুষ৷ মারদাঙ্গার সেই খবর কানে যেতেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন থানাদার দারোগাবাবুকে৷ সেই হ্যাপা সামলাতে তখন অনেক খরচ হয়ে গেছে৷ তা সেটা তিনি বলতেই পারতেন৷ অবস্থা বিবেচনা করে গোবিন্দ হয়তো মেনে নিত৷ কিন্তু হাজার হোক, তিনি জমিদার মানুষ৷ সামান্য এক বাগদি লেঠেল সর্দারের কাছে খাটো হতে সম্মানে বাধে৷ তাই কাছারিতে সবার সামনে তাকে জাত তুলে গালি দিল৷
মুহূর্তে মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল গোবিন্দর৷ হাতের মস্ত বাঁশের লাঠি ঠুকে হুংকার দিয়ে উঠেছিল, 'খবরদার!'
তারপর রাধাকান্ত চৌধুরীর দিকে একদলা থুথু ছিটিয়ে গটমট করে বেরিয়ে এসেছিল৷ ভরা সেরেস্তায় মানুষ তখন কম নয়৷ রাধাকান্ত চৌধুরীর নিজস্ব লেঠেলও ছিল জনা কয়েক৷ কিন্তু আচমকা গোবিন্দর সেই হুংকারে কেঁপে গিয়েছিল সবাই৷ নড়ার সাহস হয়নি৷ নইলে অন্য কেউ হলে তার ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা হয়ে যেত সেই মুহূর্তেই৷
এসব দিন কুড়ি আগের কথা৷ ব্যাপারটা যে সহজে মিটবে না, জানাই ছিল৷ সতর্ক ছিল গোবিন্দও৷ কিন্তু দিন কয়েকের মধ্যেই টের পেল, খোদ জমিদারের সঙ্গে টক্কর এক লাঠিয়ালের কর্ম নয়৷ ততদিনে দলের জনা কয়েক লাঠিয়াল দল ছেড়েছে৷ নাম লিখিয়েছে জমিদারের লেঠেল দলে৷ খোদ ঘনশ্যামও রয়েছে তাদের মধ্যে৷ শুনে মাথায় প্রায় খুন চড়ে গিয়েছিল৷ আনাড়ি ঘনশ্যামকে প্রায় হাতে ধরে লাঠি-সড়কি চালাতে শিখিয়েছে৷ দলে এখন ওর ডান হাত৷ রাগ হওয়াই স্বাভাবিক৷ ভেবেছিল যাবার আগে বেইমানটাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে যাবে৷ কিন্তু তা আর হল না৷ তার আগেই সেদিন রাতে কারা ঘরে আগুন লাগাল৷
ঢালিপাড়ায় ঢুকে খোদ গোবিন্দর ঘরে আগুন, সহজ ব্যাপার নয়! পিছনে শুধু জমিদার নয়, ঢালিপাড়ার কিছু মানুষও রয়েছে, বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়৷ সান্ত্বনা একটাই, গোবিন্দকে পুড়িয়ে মারার মতলব করেনি তারা৷ সেই রাতে বাড়ি ছিল না গোবিন্দ৷ ভিন গাঁয়ে মুরুব্বি আবদুল চাচার কাছে গিয়েছিল কিছু পরামর্শর জন্য৷ মুর্শিদাবাদের নবাবের পাইক দলে আবদুল চাচা কাজ করেছে কিছুদিন৷ অনেক খবর রাখে আবদুল চাচা৷
এক শাগরেদের মুখে খবরটা সেই রাতেই পৌঁছে গিয়েছিল গোবিন্দর কানে৷ সেই খবর শুনে অভিজ্ঞ আবদুল চাচা তখন কোম্পানির পল্টনে নাম লেখাবার পরামর্শটা দিয়েছিল৷ পশ্চিমে কোম্পানির সেপাইরা হঠাৎ নাকি সাহেবদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে৷ সাহেবরা তাই পল্টনে নতুন সেপাই নিচ্ছে৷ দরকার শুধু একজন মুরুব্বির৷ সাহেবরা অচেনা কাউকে আর পল্টনে নিতে রাজি নয়৷
আবদুল চাচার সেই কথায় একটু দমেই গিয়েছিল গোবিন্দ৷ অপরিচিত জায়গায় কোথায় মুরুব্বি মিলবে? তবু রাজি হয়ে গিয়েছিল৷ বিয়ে-থা করেনি৷ গত সালে মা মারা যাবার পরে ঝাড়া হাত-পা৷ বিদায় নিয়ে সেই রাতেই পথে নেমে পড়েছিল৷
ব্যারাকপুরে কোম্পানির ঠেক কাছে নয়৷ তায় অচেনা পথ৷ ক-দিন যে লাগবে, জানা নেই৷ পথে বিপদও কম নয়৷ ঠগি, ঠ্যাঙাড়ে সর্বত্র৷ তবে পাকা লাঠিয়াল গোবিন্দর কাছে ওরা কোনো সমস্যাই নয়৷ সমস্যা একজন মুরুব্বির৷ আবদুল চাচা বলেই দিয়েছেন, গোবিন্দর যা চেহারা, কলজের জোর, পল্টনে লুফে নেবে কোম্পানির সাহেবরা৷ দরকার শুধু একজন মুরুব্বির৷ চেনাজানা কেউ তদবির না করলে এখন সেপাই দলে ঢোকা মুশকিল৷ রাসু রায় লোকটার আর্জি শুনে গোবিন্দ তখন যে রাজি হয়েছিল, তা ওই কারণে৷ কোনো এক বড়ো মুরুব্বির কাছ থেকে নাকি সুপারিশ লিখিয়ে এনেছে৷ কোম্পানির ঠেকে গেলেই চাকরি বাঁধা৷ এমন একজন সঙ্গে থাকলে শিকে ছিঁড়তেও পারে৷
কিন্তু অন্য বিপদও যে রয়েছে, তখন তলিয়ে ভাবেনি৷ দুপুরে ও ঘুমিয়ে পড়তে লোকটা যেভাবে চুপিসারে উঠে গিয়ে কয়েকজন অপরিচিত লোকের সঙ্গে গুজগুজ করছিল, তাতে সন্দেহ নেই, কিছু অন্য মতলব আছে৷
সেপাইরা হঠাৎ বেঁকে বসতে কোম্পানির শাসন কিছুদিন হল টালমাটাল৷ জমিদার রাধাকান্ত চৌধুরীর কাছারিতেই শুনেছে এসব৷ আখের গুছিয়ে নেবার এই নাকি সময়৷ অনেকেই নাকি এখন সেই ধান্দায় লেগে পড়েছে৷ পথে ঠগিদের উৎপাত তাই বেজায় বেড়েছে৷ বিশেষ করে গামছামোড়া ঠগি৷ তাদের দলে দু-চার জনের বেশি লোক থাকে না৷ সঙ্গে অস্ত্র বলতে একটা গামছা৷ তাই চেনা মুশকিল৷ পথ চলতি মানুষের মূল সঙ্গীই যে ওই গামছা৷ পুকুরে স্নান, দারুণ রোদে মাথায়, আরও হরেক কাজে গামছাই সাধারণ মানুষের ভরসা৷ গামছা রয়েছে গোবিন্দর সঙ্গেও৷ তাই কে যে গামছামোড়া দলের লোক বোঝা মুশকিল৷ কথায় মন ভিজিয়ে তারা অপরিচিত কারও সঙ্গী হয়৷ তারপর সুযোগ পেলেই নির্জন জায়গায় গলায় গামছার ফাঁস লাগিয়ে খুন করে সর্বস্ব নিয়ে চম্পট৷ পথে অচেনা মানুষকে তাই বিশ্বাস করা শক্ত৷
ধুতি মেরজাই পরা হলেও আর পাঁচজনের মতো রাসু রায়ের সঙ্গেও রয়েছে গামছা৷ সঙ্গে সুযোগের অপেক্ষায় আশপাশে গা-ঢাকা দিয়ে ষণ্ডাচেহারার জনাকয়েক সাগরেদ৷ দুই আর দুইয়ে চার ছাড়া আর কী?
গোবিন্দ এমন কিছু পয়সাওয়ালা মানুষ নয়৷ তার উপর জমানো যা ছিল, হঠাৎ বের হয়ে পড়ায়, সব সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেনি৷ কোমরে বাঁধা গেঁজেয় রয়েছে সামান্য কিছু টাকা৷ তা দিনকাল যা খারাপ, ঠগি-ঠ্যাঙাড়ের কাছে সেটাই অনেক৷
গোবিন্দ তাই সেই থেকে বেজায় সতর্ক৷ সন্দেহের কথা ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করেনি৷ তবু রাসু রায় একবার কৌশলে জানতে চেয়েছিল, বিকেলে সে মাঠ থেকে ফিরে আসার কতক্ষণ আগে গোবিন্দর ঘুম ভেঙেছে৷ যথেষ্ট সর্তক হয়েই উত্তর দিয়েছে গোবিন্দ৷ একেবারেই ফাঁদে পা দেয়নি৷
ইদানীং সন্ধ্যের পর বড়ো একটা কেউ পথ চলে না৷ গোবিন্দ অবশ্য পরোয়া করে না৷ আবদুল চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিন তো সারা রাতই পথ চলেছে৷ ভেবেছিল, সঙ্গী রাসু রায় আজ সন্ধ্যের পরেই কোনো চটিতে আশ্রয় নিতে চাইবে৷ সন্ধ্যেয় এক ভাঙা হাটে চটি মিলতে গোবিন্দ বলেওছিল তাকে৷ কিন্তু রাসু রায় রাজি হয়নি৷ সাফ জানিয়েছে, 'কী দরকার বাপু! যদি আরও কিছু পথ এগিয়ে থাকা যায়, অসুবিধা কী?'
এরপর লোকটার মতলব বুঝতে আর বাকি থাকেনি গোবিন্দর৷ মুখ লুকিয়ে সামান্য মুচকি হেসেছিল শুধু৷ গোবিন্দ ঢালি কী চিজ যথাসময়ে টের পাবে বাপু৷ রোসো৷
অন্ধকার একটু পরেই ঘন হয়েছে আরও৷ গোবিন্দ ইচ্ছে করেই চলার গতি বাড়িয়েছে৷ লাঠিয়াল সর্দার৷ ওর সেই গতির সঙ্গে তাল রাখা সহজ নয়৷ কিন্তু দিব্যি তাল দিয়ে গেছে লোকটা৷ শেষে রাতের দেড় প্রহর যখন পার হয়েছে, পথের পাশে এক চটির দেখা মিলল৷ পাশেই গোটা কয়েক চালা৷ ঘরবাড়ি৷ বোধ হয় কোনো মহাজন বা জমিদারের খামার বাড়ি৷ পাশে দুটো বড়ো ধানের মরাই, ঢেঁকিঘর৷ কিন্তু কোথাও মানুষের সাড়াশব্দ নেই৷ তবে সামনে পথের উপর চটিঘরে মৃদু আলো দেখে বোঝা যায়, ভিতরে মানুষ রয়েছে৷
রাসু রায় বলল, 'দাদাগো, রাত অনেক হয়েছে, আজকের মতো এই চটিতেই থেকে যাই৷'
রাত প্রায় দেড় প্রহর৷ কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ খানিক বাদেই পশ্চিম আকাশে ডুব দেবে৷ গাঢ় অন্ধকারে পথ চলতে তখন সমস্যা বাড়বে৷ কিন্তু গোবিন্দ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না৷ সন্তর্পণে চারপাশে একবার চোখ ঘোরাল৷ তারপর বেজায় খুশি হয়ে অল্প ঘাড় নাড়ল মাত্র৷ এতটা পথ একটানা হেঁটে এসে রাসু রায় তখন হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে৷ দেরি না করে এগিয়ে গেল চটিঘরের দিকে৷
মজবুত দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷ সামান্য টোকা দিয়ে রাসু রায়ই বলল, 'দরজা খোলেন গো৷ রেতের মতো এট্টু ঠাঁই দরকার৷'
বার কয়েক টোকা পড়ার পর খটাশ করে দরজা ফাঁক হল সামান্য৷ রোগা লিকলিকে চেহারার একটা মানুষ ভিতর থেকে উঁকি মারল৷ বাইরে দু-জনের উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল, 'একেনে মোটে জায়গা নেই কত্তা৷ মেলা মানুষ৷ পরের চটি দ্যাকেন৷'
তাতে রাসু রায় ত্রস্ত হয়ে বলল, 'সে কী কথা গো! পরের চটি তো সেই দুই কোশ পথ! এই রেতে মোটে আর চলার শক্তি নেই৷ ঠাঁই একটু দিতেই হবে৷'
দরজার ফাঁকে লোকটা ইতস্তত করছিল৷ ভিতর থেকে একজন খরখরে গলায় বলল, 'এক রত্তি জায়গা নেই৷ এর মধ্যে আবার মানুষ ঢোকাবে মুদির পো! মানা করে দাও৷'
লোকটার কথা শেষ হতেই একসাথে গোটা কয়েক গলা হইহই করে উঠল, 'থামেন দেখি৷ এট্টু দয়ামায়া নেই গা! তা ওনারা ক-জন গো মুদির পো?'
পথের ধারে এসব চটিতে শুধু চিঁড়ে-মুড়ি নয়, মুদির মালপত্রও মেলে৷ চটিওয়ালাদের তাই মুদির পো বলেই ডাকা হয়৷ উত্তরে দরজার ওধারে চটিওয়ালা এক মুহূর্ত কী ভাবল৷ তারপর ঘাড় ফিরিয়ে বলল, 'দু-জন গো৷'
কয়েক মুহূর্ত ওদিকে কোনো শব্দ নেই৷ তারপর একজন বলল, 'তালে আসতে দাও৷ মোটে তো দু-জন৷ ব্যবস্থা হয়ে যাবে৷'
চটিওয়ালা ওদের দিকে মুখ ফেরাল এবার৷ ঘাড় নেড়ে বলল, 'এই রেতে তেমন খাবারের ব্যবস্থা কিন্তু করতে পারবনি বাপু৷ চাট্টি চিঁড়ে-মুড়ির ব্যবস্থা হতে পারে বড়ো জোর৷ কলসিতে জলও কিচু আচে৷'
'ওতেই হবে৷' রাসু রায় প্রায় হাঁফ ছাড়ল যেন৷ তারপর পিছনে গোবিন্দর দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, 'তাহলে চলে এসো গো দাদা৷'
গোবিন্দ এ যাবত একটি কথাও বলেনি৷ এবারেও উত্তর করল না৷ ইতিমধ্যে চটিওয়ালা দরজা খুলে দিতে সঙ্গী ঢুকে পড়েছে৷ সাবধানে সেও পা রাখল ভিতরে৷
মাঝারি আকারের ঘর৷ একধারে নীচু মাচায় চিঁড়ে-মুড়ি ভরতি দুটো মাটির জালা৷ গোটা কয়েক ছোটো-বড়ো মাটির গামলা৷ একটা থেকে ভুরুভুরু করে ঝোলা গুড়ের গন্ধ৷ এছাড়া কামরার বাকিটা জুড়ে হোগলার মাদুর পাতা৷ শুয়ে-বসে একঝাঁক মানুষ তার উপর৷ ওরা ঢুকতেই ওধারে এক মাঝবয়েসি মানুষ ফের খরখর করে উঠল৷ 'মুদির পো, ফের মানুষ তো ঢোকালে৷ কোতায় যায়গা হয় বলো দেখি৷ এখেনে এত মানুষ, সেকথা আগে বললেই পারতে৷ সেই বিকেলে এসিচি৷ অন্য কোতাও চলে যেতাম৷'
সেই কথায় মুদির পো অবশ্য কোনো জবাব দিল না৷ মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসল৷ চটিওয়ালার সেই মুচকি হাসি গোবিন্দর চোখ এড়াল না৷ সঙ্গী রাসু রায় অবশ্য ইতিমধ্যে মাদুরের একধারে জায়গা করে বসে পড়েছে৷ গোবিন্দকে পাশে বসে পড়তে ইঙ্গিত করে বলল, 'শুনলে তো বাপু৷ এই রেতে চিঁড়ে-মুড়ি ছাড়া কিছুই মিলবে না৷ তাই চাট্টি নিয়ে নেই৷ কী বল?'
ভুরভুরে ঝোলা গুড়ের গন্ধে রাসু রায়ের পেটে তখন মোচড় দিতে শুরু করেছে৷ সেই দুপুরের পরে কিছু আর পেটে পড়েনি৷ তার উপর এতটা পথ হেঁটে আসা৷ খিদে গোবিন্দরও পেয়েছে৷ কিন্তু মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, এই রাতে আর খাওয়ার ইচ্ছে নেই৷
আসলে তখন তার মাথার ভিতর অনেক ব্যাপার ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে৷ হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে মুদির ওই মুচকি হাসি৷ আর এই রাতে রাসু রায় লোকটার এখানে ঠাঁই নেবার এত গরজ৷ দুটোই যথেষ্ট সন্দেহজনক৷ দেখতে ছোটোখাটো হলে কী হবে৷ যেভাবে লোকটা পাল্লা দিয়ে এতটা পথ হেঁটে এল, সাধারণ মানুষের কর্ম নয়৷ আজ সকালে যে জানিয়েছিল, পথঘাট চেনে না৷ সে দিব্যি বলে ফেলল সামনে দুই ক্রোশের মধ্যে কোনো চটি নেই! ব্যাটা ভিজে বেড়াল! তবে সেও গোবিন্দ ঢালি৷ লাঠিয়াল সর্দার৷
বেজায় খিদে পেলেও গোবিন্দ তাই খেতে রাজি হয়নি৷ ঘুম অবশ্য তেমন গাঢ় নয় ওর৷ তবু এই খিদের মুখে পেট ভরিয়ে ঝুঁকি নেওয়া যায় না৷ ও চারপাশে চোখ ঘোরাল৷ ঘরের কোনে উনুন৷ তাতে মোটা একটা কাঠ গোঁজা৷ সেই হালকা আলোয় দেখতে পেল ভিতরে ওরা ছাড়া আরও জনা কুড়ি মানুষ৷ কয়েকজনের বেশ তাগড়াই চেহারা৷ কেউ বসে ঢুলছে৷ কেউ চিতপাত হয়ে শুয়ে৷ ঘুমোচ্ছে না জেগে, বোঝার উপায় নেই৷ ভাঁজ করা তেলচিটে এক গামছা মাথার নীচে দিয়ে ওর পাশে একজন চিত হয়ে পড়ে আছে৷ ঘরের কোনে রাখা কলসি থেকে ঢক ঢক করে অনেকটা জল খেয়ে গোবিন্দ গামছার একধারে বাঁধা চিঁড়ের পুঁটলিটা মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়ল পাশে৷ একটু গড়িয়ে নিলে শরীরটা কিছু চাঙা হয়ে উঠবে৷ ওপাশে রাসু রায় তখন মস্ত এক মালসায় ভেজানো চিঁড়ে-গুড় নিয়ে খেতে বসেছে৷
কতক্ষণ ওইভাবে পড়ে ছিল হুঁশ নেই গোবিন্দর৷ বোধ হয় ঘুমিয়েই পড়েছিল৷ হালকা গোঁ গোঁ শব্দে আচমকাই সেটা ভেঙে গেল৷ নিমেষে উঠে বসতে যাবে, টের পেল কয়েকজন চেপে ধরে আছে ওকে৷ মুহূর্তে চোখ মেলে তাকাল৷ তিনটে ষণ্ডা চেহারার মানুষ চেপে বসেছে ওর উপর৷ পাশে শুয়ে থাকা সেই লোকটাও আছে তার মধ্যে৷ লেঠেল সর্দার গোবিন্দ ঢালি আর দেরি করল না৷ লোহার মতো দুটো হাত বাড়িয়ে তিনটে মানুষকে চেপে ধরল বুকের উপর৷ শুনতে পেল, ঘরের ওদিক থেকে কেউ বলছে, 'আরে সুমুন্দিকে ধর আগে৷ তখনই বলেছিলাম, তিনজন ওর ব্যবস্থা করতে পারবেনি৷ হেই ট্যাংরা, গামছা নিয়ে কাজটা সেরে ফেল এবার৷ দেরি করিসনি৷'
ততক্ষণে যা বুঝবার গোবিন্দ বুঝে ফেলেছে৷ শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে এবার ও লাফ দিল একটা৷ তিনটে মানুষকে ছিটকে ফেলে যখন উঠে দাঁড়াল, দেখতে পেল পাশে রাসু রায় শুধু নয়, খরখরে গলায় যে ওদের ঘরে ঠাঁই দিতে আপত্তি করছিল সেই লোকটা সহ আরও তিনজনের গলায় গামছা পেঁচিয়ে চেপে ধরেছে কয়েকজন৷ দরজা হাট করে খোলা৷ চটিওয়ালা মুদি ঘরে নেই৷ কখন বের হয়ে গেছে৷ এক মুহূর্ত দেরি না করে সেও দরজা দিয়ে ছুটে বের হয়ে পড়ল৷
চটিঘরের পাশেই খোলা এক ঢেঁকিঘর৷ বস্তুত কাছে ওই ঢেঁকিঘরটা দেখেই রাসু রায়ের কথায় এখানে রাত কাটাতে রাজি হয়েছিল ও৷ সঙ্গে লাঠি-সড়কি নেই৷ দরকার হলে দিব্যি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে৷ ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে গোবিন্দ সেই ঢেঁকি দু-হাতে তুলে চাপা হুংকার দিয়ে উঠল, 'আয় এবার!'
পিছনে তাড়া করে আসছিল জনা পাঁচেক ষণ্ডা৷ ঢেঁকি হাতে গোবিন্দর সেই মূর্তি দেখে মুহূর্তে থমকে দাঁড়াল৷ তারপর অন্ধকারে পিছন ফিরে দৌড়৷ ঘরে ঢুকে গোবিন্দ এরপর রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাকিদের উপর৷
বেগতিক দেখে দলের অন্যরাও শিকার ফেলে দরজা দিয়ে পালাবার চেষ্টাই করেছিল৷ কিন্তু সফল হতে পারেনি৷ অগত্যা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরের ভিতর শুধু মানুষের আর্তনাদ৷ ঢেঁকির ঘায়ে হাত-পা ভেঙে কারও নড়ার উপায় নেই৷ মাথাও ফেটেছে কয়েকজনের৷ নিশ্চিন্ত হয়ে গোবিন্দ এরপর ঢেঁকি নামিয়ে আক্রান্ত রাসু রায় আর অন্যদের নিয়ে পড়ল৷ গোড়ায় ভেবেছিল, গামছার ফাঁসে হয়তো মারাই গেছে৷ কিন্তু পরে বুঝল, প্রাণ আছে তখনও৷ গোঁ-গোঁ আওয়াজে ও জেগে উঠতে গামছামোড়ার দল কাজ শেষ করতে পারেনি৷
সামান্য শুশ্রূষার পর চাঙা হয়ে প্রথমেই উঠে বসল রাসু রায়৷ অবাক হয়ে লোকটা যখন তার দিকে তাকিয়ে আছে গোবিন্দ বলল, 'তুমি, তুমি গামছামোড়ার দলের লোক নও! অথচ সেই থেকে সন্দেহ করে আসচি৷ সত্যিই আস্ত পাঁঠা আমি৷'
হাঁপাচ্ছিল রাসু রায়৷ কোনোমতে বলল, 'কিন্তু আমি যে ভাই রামপাঁঠা৷ সাতসকালে তোমার ষণ্ডা চেহারা, গলায় চিঁড়ের পুঁটলি বাঁধা গামছা দেখে আমিও যে তোমাকে গামছামোড়া দলের পান্ডা ঠাউরে বসে আছি৷ ওফ! আর একটু হলে প্রাণটাই বেরিয়ে যেত!'
'তাহলে তখন গাছতলায় কাদের সঙ্গে কথা বলতেছিলে? তারা তোমার দলের মানুষ নয়?' গোবিন্দর বিস্ময় তখনও কাটেনি৷
'দলের মানুষই তো৷' সামান্য দম নিল রাসু রায়৷ তারপর কোমরের কশি থেকে একটা ছোটো বাঁশি বের করে গোবিন্দর হাতে দিয়ে বলল, 'জোরে তিনবার বাজাও দেখি বাপু৷ আমার আর ফুঁ দেবার শক্তি নেই৷'
বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল গোবিন্দর৷ কথামতো বাঁশি বাজাতেই খানিক বাদে অন্ধকার ফুঁড়ে মশাল হাতে কোথা থেকে জনা পনেরো পাগড়িধারী পেয়াদা ছুটে এল৷
ধন্দ সাফ হতে এরপর আর দেরি হয়নি ওর৷ কী ভয়ানক, যে রাসু রায়কে ও গামছামোড়া ঠাউরে বসে আছে তিনি আর কেউ নয়, ডাকসাইটে দারোগা রাজারাম রায়৷ নামটা জমিদার রাধাকান্ত চৌধুরীর কাছেই শুনেছে৷ জেলার বড়ো সাহেবের কাছের মানুষ৷ বাঘের মতো ভয় পায় সবাই৷ সেই রাজারাম রায় ছদ্মবেশে বের হয়েছে গামছামোড়ার খোঁজে৷ সঙ্গে জনা কয়েক পেয়াদা৷ তারা অবশ্য আড়ালেই থাকত৷ সেদিন দুপুরে গোবিন্দ ঘুমিয়ে পড়তে গোপনে হাজির হয়েছিল তাদের কাছে৷ পরামর্শ হয়েছিল, রাতে বর্তমান চটিতেই থাকবেন দারোগা সাহেব৷ কাছেই থাকবে পেয়াদার দল৷ গোবিন্দকে বেচাল দেখলেই বাঁশিতে ফুঁ দেবেন তিনি৷ কিন্তু হিসেবে ভুল৷ সময়মতো গোবিন্দ জেগে না উঠলে প্রাণটাই খোয়াতে হত আজ৷
দারোগা রাজারাম রায় পরে অবশ্য ভালোই কাজ দেখিয়েছিলেন৷ ঘরের ভিতর ঘায়েল হয়ে যে কয়জন গামছামোড়া ধরা পড়েছিল, তাদের জেরা করে একে একে পাকড়াও করেছিলেন দলের বাকি সবাইকে৷ রেহাই পায়নি চটিওয়ালাও৷ গামছামোড়া দলের সঙ্গে সাঁট ছিল তারও৷ সেই সূত্র ধরে ক্রমে জল গড়িয়েছিল অনেক দূর৷ ধরা পড়েছিল আরও গোটা কয়েক গামছামোড়া ঠগির দল৷ ফাঁস হয়েছিল তাদের পৃষ্ঠপোষক কয়েকজন জমিদারের কীর্তিও৷
তবে গোবিন্দর আর সেপাই পল্টনে যাওয়া হয়নি৷ দারোগা রাজারাম রায় তাকে ভরতি করে নিয়েছিলেন থানার পেয়াদার দলে৷ একেবারে সর্দার পেয়াদা৷
_______________________
গামছামোড়া ঠগি কোনো কাল্পনিক নাম নয়৷ একসময় গ্রাম বাংলার পথে প্রায় আতঙ্ক ছিল এরা৷ এই কাহিনি যে সময়ের, সেই ঊনবিংশ শতকের মধ্য পর্বেও এদের সম্পূর্ণ দমন করা যায়নি৷