দুটো বাঘের বাচ্চাও ছিল

শিশির বিশ্বাস

নাম যাইহোক কুসুমকমল দত্ত ওরফে কুসুম দত্ত বরাবরই কিছু অন্য পথের মানুষ৷ ছেলেবেলায় শুধু লেখাপড়া নয়, ভালো ছিলেন খেলাধুলাতেও৷ স্বপ্ন ছিল বড়ো ফুটবলার হবেন৷ সেই ইচ্ছে অবশ্য বেশিদূর এগোতে পারেনি৷ সুপার ডিভিশনের মাঝারি এক ক্লাবে খেলছেন তখন৷ নজর কেড়েছেন বড়ো ক্লাবের৷ ইচ্ছে পরের বছর সেখানে সই করবেন৷ কিন্তু তার আগেই খেলার মাঠে এক দুর্ঘটনায় হাঁটুতে বড়োসড়ো এক চোট৷ ঠিকমতো চিকিৎসা হলে হয়তো ফের মাঠে ফিরে আসতে পারতেন৷ কিন্তু পয়সার অভাবে হয়নি৷ তবে কুসুম দত্ত ফুটবল ছাড়েননি৷ চাকরির সাথে ছেলেদের কোচিং করান এখন৷ এ ব্যাপারে সুনামও করেছেন৷ তাঁর হাতে তৈরি বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় এখন প্রথম ডিভিশনে দাপিয়ে খেলছে৷ সেই সুবাদেই ডাক এসেছিল সুন্দরবন অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম হেমন্তনগর থেকে৷
হাসনাবাদে এক ফুটবল টুর্নামেন্টে নাম দিয়েছে ওরা৷ প্রতিবছরই খেলতে আসে৷ তারপর প্রথম বা দ্বিতীয় রাউন্ডেই ছিটকে যায়৷ কিন্তু এবার কিছু করে দেখাবার ইচ্ছা৷ কয়েকজন পৃষ্ঠপোষকও পাওয়া গেছে৷ তবে এই ধরনের টুর্নামেন্টে অন্যরা যা করে, অর্থাৎ কলকাতা থেকে প্লেয়ার ভাড়া করে বাজিমাত, তেমন নয়৷ ইচ্ছে কলকাতা থেকে একজন কোচ এনে গ্রামের ছেলেদের তালিম দিয়ে ভালো একটা টিম তৈরি৷ বলা যায়, কুসুম দত্ত ওই কারণেই রাজি হয়েছিলেন৷ দশটা-পাঁচটার চাকরি৷ তাই টানা থাকতে পারেননি৷ হাসনাবাদ থেকে হেমন্তনগর কম পথ নয়৷ লঞ্চ বা ভটভটি নৌকো, তারপর বাস৷ সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টা৷ তবু কয়েক দফায় এসে দিন দুয়েক করে থেকে বাছাই কিছু ছেলেকে তৈরি করেছেন৷ ট্রেনিং শিডিউল করে দিয়ে গেছেন৷ স্যারের আন্তরিকতা দেখে ছেলেরাও ফাঁকি দেয়নি৷ আর তারই ফলশ্রুতি একের পর এক বাধা টপকে ফাইনালে পৌঁছোনো৷
গ্রামের অনামি আনকোরা ছেলেদের নিয়ে তৈরি টিম এভাবে ফাইনালে উঠবে ভাবতেও পারেনি কেউ৷ ফাইনালের দিন পঁচিশটি ভটভটি নৌকো ভাড়া করে গ্রাম ঝাঁটিয়ে ছেলে-বুড়ো এসেছিল খেলা দেখতে৷ দুর্ভাগ্য, শেষ পর্যন্ত টাই ব্রেকারে হেরে গিয়েছে দল৷ কেউ অবশ্য নিরাশ হয়নি তাতে৷ কুসুম দত্ত ফাইনালের আগে গত দু-দিন ছেলেদের নিয়ে পড়ে আছেন৷ ঠিক ছিল খেলা শেষ হলেই কলকাতার ট্রেন ধরবেন৷ কিন্তু সঙ্গের কর্মকর্তারা প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন৷ আগামীকাল স্যারের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন হয়েছে৷ একটা দিন থাকতেই হবে৷
শেষ পর্যন্ত কুসুম দত্ত যে থেকে গিয়েছেন, তা কর্মকর্তাদের অনুরোধে নয়৷ টিমের দুই ডিপ ডিফেন্ডার গোবিন্দ দাস আর শ্রীমন্ত হালদারের কথায়৷ বয়স এখনও কারও আঠারো পার হয়নি৷ কিন্তু গোটা টুর্নামেন্ট দাপিয়ে খেলে গেছে৷ ফাইনালের দিন মাঠে কুসুম দত্ত যখন সবাইকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, ওদের বলেছিলেন, 'মনে রাখিস, ওয়ান টু ওয়ানে অপোনেন্টকে বিট করতে দেওয়া চলবে না৷ তোদের সেই সামর্থ্য কিন্তু আছে৷ পারবি না?'
এই সময় সাধারণত নীরবে মাথা নাড়ে সবাই৷ কিন্তু স্যারের কথা শেষ হতেই দু-জন গর্জে উঠেছিল, 'পারব স্যার৷ দেখে নেবেন৷'
কুসুম দত্ত তখন কথার কথাই ভেবেছিলেন৷ কিন্তু পরে দেখেছেন সারা খেলায় মুখোমুখি কেউ একবারও বিট করতে পারেনি ওদের৷ ফলে স্ট্র্যাটেজি পালটে খেলতে হয়েছে লং বল৷ নয়তো উঁচু সেন্টার৷ তাতেও সুবিধা করতে পারেনি৷ অথচ অপোনেন্ট টিমে ছিল কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা এক ঝাঁক প্রথম ডিভিশনের প্লেয়ার৷ ওদের অনুরোধ এড়ানো তাই সহজ ছিল না৷ পিঠে হাত দিয়ে বলেছিলেন, 'এসব সংবর্ধনা আমার একেবারেই পছন্দ নয় রে৷ আমি কাজ বুঝি৷ টুর্নামেন্টে তোদের পারফরমেন্সই আমার বড়ো সংবর্ধনা৷ সামনেই তোদের পরীক্ষা৷ তাই আর বলছি না৷ তবে ভেবে রেখেছি, আগামী বছর আমার কোচিং সংস্থায় ডাকব তোদের৷ মনে হয়, সেকেন্ড ডিভিশনের কোনো ক্লাবে ঢুকিয়েও দিতে পারব৷ তৈরি থাকিস৷'
বলা বাহুল্য, কুসুম দত্তর ওই কথায় দু-জনের মুখে তৎক্ষণাৎ কথা সরেনি৷ সামলাতে সময় লেগেছিল৷ তারপর একসাথে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল, 'আমরা কিন্তু আপনাকে সংবর্ধনা দেবার জন্য যেতে বলছি না স্যার৷'
'তবে?'
'স্যার, আমাদের সুন্দরবন দেখতে এত মানুষ আসেন৷ অথচ আপনি কিছুই দেখলেন না৷ আমাদের নিয়েই পড়ে রইলেন৷ অন্তত একটা দিন থেকে যান, শুধু বাঘ নয়, বাঘের দুটো বাচ্চাও দেখাব৷ জঙ্গলে এক বাঘিনির দুটো বাচ্চা হয়েছে৷ সুঁতিখালের কাছে এক গর্জন গাছের শেকড়ের তলায় আস্তানা৷ নৌকোয় দূর থেকেই দেখা যায়৷ মাছ ধরতে গিয়ে ক-দিন আগেও দেখে এসেছি আমরা৷ চলুন না স্যার৷'
দুই কিশোরের কথায় এবার নড়ে গিয়েছিলেন কুসুম দত্ত৷ কলকাতার মানুষ হয়েও আগে কোনো দিনই এদিকে আসেনি৷ পরিচিতদের কাছে সুন্দরবন বেড়াবার নানা কথা শুনে ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেছে৷ লাক্সারি হোটেলে রাত কাটানো আর লঞ্চ বা ভটভটি নৌকোয় সারাদিন হইহই করে পিকনিক৷ একেবারেই পছন্দ নয়৷ বরং কাজের খাতিরে এই যে দিন কয়েক বাদার গ্রাম আর কাছ থেকে মানুষগুলোকে দেখলেন, সেটাই অনেক বড়ো প্রাপ্তি৷ তবু জবাব দিতে গিয়ে থমকে গেলেন৷ মনে পড়ে গেল অনেক দিন আগের একটা মানুষের কথা৷
সেদিন আলিপুর কোর্টে গিয়েছিলেন এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে৷ কোর্ট চত্বরেই আলাপ এক দেহাতি মানুষের সঙ্গে৷ সুন্দরবনের গোসাবায় বাড়ি৷ জমিজমা সংক্রান্ত গোলমালে সমন পেয়ে সেই প্রথম আলিপুর কোর্টে৷ কিছুই জানা নেই৷ প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ মানুষটির সেই অবস্থা দেখে সেদিন কিছু সাহায্য করেছিলেন তাঁকে৷ পরে দরকার হতে পারে ভেবে কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিলেন৷ কৃতজ্ঞ মানুষটি হাত ধরে বলেছিল, 'বড়ো উপকার করলেন বাবু৷ মনে থাকবে সারা জীবন৷ আর একটা কথা, আমাদের সুন্দরবনে অনেকেই বেড়াতে আসেন৷ খানিক হইচই করে যান৷ কেউই দেখেন না কিছু৷ তাই ইচ্ছে, অল্প দিনের মধ্যে জঙ্গলে বাঘের বাচ্চা দেখাব আপনাকে৷ এই কোর্টেই খবর দিয়ে যাব৷ শুধু দিনক্ষণ জানিয়ে চলে আসবেন৷'
তেমন কোনো খবর অবশ্য আর পাননি তিনি৷ তবে মাস কয়েক পরে ওই কোর্টেই পরিচিত একজনের কাছে শুনেছিলেন, কিছুদিন আগে লোকটি সুন্দরবনে নৌকো নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের পেটে গেছে৷ কেসের দিন পড়লে তাঁর ছেলেই আসে এখন৷ এতদিন পরে দুই কিশোরের মুখে হঠাৎ সেই বাঘের বাচ্চা দেখাবার প্রস্তাবে হঠাৎ কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়লেন৷ না করতে পারলেন না৷
কুসুম দত্তর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল গ্রামের হেলথ সেন্টারের লাগোয়া ছোটো এক গেস্ট হাউসে৷ গ্রাম থেকে জঙ্গল বেশি দূরে নয়৷ নদীর ওপারেই৷ সকালের দিকে বের হলে দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসা যায়৷ তারপর লঞ্চ আর বাস ধরে হাসনাবাদ পৌঁছোতে পারলেই ট্রেনে কলকাতা৷ পরের দিন সেইভাবেই তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার কিছু ভাবিয়ে তুলেছিল তাঁকে৷
সুন্দরবনের বাঘের গল্প পড়েছেন৷ লোকমুখে শুনেছেনও কম নয়৷ তার উপর বাচ্চা সহ বাঘিনি এমনিতেই বিপজ্জনক৷ অথচ যাচ্ছেন দুই কিশোরের ভরসায়৷ তাই ভেবে রেখেছিলেন, ওদের বুঝিয়ে বলে জঙ্গলের ভিতর সামান্য ঘুরেই ফিরে আসবেন৷ বাঘের বাচ্চা দেখার দরকার নেই৷ কিন্তু গোবিন্দ আর শ্রীমন্ত যখন যথাসময়ে এসে হাজির হল, ওদের উৎসাহ দেখে সেকথা আর মুখ ফুটে বলতে পারলেন না৷ নৌকোয় উঠে বসলেন৷
জোয়ার সবে শুরু হয়েছে৷ মস্ত নদীর রুপোলি ঢেউ রোদে ঝলমল৷ গোড়ায় বেশ ভালোই লাগছিল কুসুম দত্তর৷ কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ বজায় রইল না৷ হেমন্তনগরের এই নদী প্রায় যেন সমুদ্র৷ যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল৷ তিনটে বিশাল নদী এখানে এসে যুক্ত হয়েছে৷ তার দুটোই আবার দক্ষিণ থেকে৷ তাই এই জোয়ারের মুখে ঢেউয়ের দাপট আরও বেশি৷ বিশাল নদীর মাঝে ওদের ছোটো নৌকো প্রায় যেন মোচার খোলা৷ ছই পর্যন্ত নেই৷ রোদ চড়া হয়ে উঠতেই বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে৷ তবে রোদ নয়, জোয়ার শুরু হতে নৌকোর দুলুনি যেভাবে বাড়ছে, সেটাই বেশি ভাবাচ্ছিল তাঁকে৷ দুই কিশোর গোবিন্দ আর শ্রীমন্ত অবশ্য নির্বিকার৷ জোয়ার ঠেলে নিপুণ হাতে দাঁড় টেনে চলেছে৷ গায়ে তেলচিটে জামা৷ মাথায় গামছা৷ দেখে বোঝার উপায় নেই, গতকাল খেলার মাঠে কলকাতার প্রথম ডিভিশনের দুই ফরোয়ার্ডকে মাথা তুলতে দেয়নি৷ হঠাৎ বললেন, 'আর একটা দাঁড় আনলে পারতি৷ তোদের কিছু সাহায্য করতে পারতাম৷'
'তাই হয় স্যার!' সমস্বরে বলে উঠল দু-জন, 'আপনাকে দেখাতে এনেছি৷ দাঁড় টানলে দেখবেন কখন?'
উত্তরে কুসুম দত্ত কিছু বলতে যাচ্ছিলেন৷ আচমকা ঢেউয়ের দাপটে নৌকো প্রায় মোচার খোলার মতো দেড়-দু-হাত করে লাফিয়ে উঠতে লাগল৷ ঢেউয়ের জল আছড়ে পড়তে লাগল নৌকোর উপর৷ প্রায় ভরতি হবার জোগাড়৷ গোবিন্দ দাঁড় টানা থামিয়ে সেই জল সেচতে সেচতে অভয় দিয়ে বলল, 'এ কিছু নয় স্যার৷ সবে জোয়ার শুরু হয়েছে তো৷ এদিকে নদী আবার একটা নয়৷ দুই দিক থেকে জলের স্রোত ঢুকতে শুরু করলে কোথাও এমন হয় কখনো৷'
'একে সামান্য বলছিস!' গোটা কয়েক ভাঁজ পড়ল কুসুম দত্তর কপালে৷ তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে৷
'ভাববেন না স্যার৷' শ্রীমন্ত দাঁড় টানতে টানতেই হাসল৷ 'এ ঢেউ কিছুই নয়৷ সে হয় মার্চ-এপ্রিলে, হঠাৎ যখন কালবৈশাখী ওঠে৷ দেখতে দেখতে কালো হয়ে যায় জলের রং৷ শুরু হয় গোঁ-গোঁ শব্দ৷ আর ঢেউ!' কথা শেষ না করে অল্প চোখ নাচাল ও৷
নৌকোর অবস্থা দেখে কুসুম দত্ত আর কথা বাড়ালেন না৷ গোবিন্দর হাত থেকে জল সেচার বাটি প্রায় কেড়ে নিয়ে বললেন, 'জল আমি সেচে দিচ্ছি৷ তুই নৌকো সামলা বরং৷'
ঢেউয়ের দাপট অবশ্য কমে এল কিছুক্ষণের মধ্যেই৷ কুসুম দত্ত খেয়াল করলেন নদী পার হয়ে ওরা ইতিমধ্যে জঙ্গলের কাছে পৌঁছে গেছে৷ জোয়ারের ঢেউ আছড়ে পড়ছে চড়ার কাদায়৷ চ্যাং মাছের মতো দেখতে কয়েক আকারে মাডস্কিপার কাদার উপর মৌরুসিপাট্টায় ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ বাদার মানুষ এদের মেনিমাছও বলে৷ এছাড়া লাল আর হলুদ রঙের কাঁকড়ার মেলা৷ নরম কাদায় তাদের অসংখ্য গর্ত৷ সেই কাদার চড়া শেষ হলেই শাড়ির সবুজ পাড়ের মতো ঘন অরণ্য৷ দিন কয়েক বাদার গ্রামে এসে তার অনেক গাছই তিনি চিনি ফেলেছেন ইতিমধ্যে৷ গরান, বাইন আর হেঁতালঝাড়৷ কোনোটাই খুব বড়ো নয়৷ তারই মাঝে কোথাও মাথা তুলেছে বড়ো আকারের কেওড়া, কাঁকড়া নয়তো পশুর৷
ভয়ানক বিপদ থেকে সদ্য রেহাই পেয়ে সুন্দরবনের সেই অন্য রূপ বেশ লাগছিল কুসুম দত্তর৷ খানিক এগোতেই সরু এক খাল৷ নৌকো ঢুকে পড়ল সেই খালের ভিতর৷ এতক্ষণ জঙ্গল কিছু দূরে ছিল৷ কুসুম দত্ত দেখলেন, ওরা সেই জঙ্গলের ভিতর ঢুকে পড়েছে এবার৷ সরু সুঁতিখাল৷ দু-দিকে শুধু গাছ আর গাছ৷ ঘন অরণ্য৷ এই সকালে প্রায় ঝিম মেরে রয়েছে৷ খালের উপর ঝুঁকে পড়া কতক গাছ কখনো নৌকো ছুঁয়ে যাচ্ছে৷ একজায়গায় পাড় ভেঙে বড়ো এক হেঁতালঝাড় জলের উপর ঝুঁকে পড়েছে৷ দুই কিশোর সেখানে নৌকো থামিয়ে গোটা কয়েক শুকনো পাতা কেটে আঁটি বেঁধে নিল৷ ফের চলতে শুরু করল নৌকো৷ যত ভিতরে ঢুকছে, জঙ্গল গভীর হচ্ছে আরও৷ চারদিকে এত গাছপালা, অথচ একটা পাখির সাড়াশব্দও নেই৷ নিঃসাড়, ঝিমঝিম করছে৷
মুখে প্রকাশ না করলেও কুসুম দত্তর মতো সাহসী মানুষও হঠাৎ টের পেলেন বুকের ভিতরটা আর স্বাভাবিক নেই৷ ক্রমে হিম হয়ে আসছে৷ খালে জোয়ারের টানে নৌকো বেশ জোরেই চলছে তখন৷ ঢোঁক গিলে বললেন, 'আর কত ভিতরে যেতে হবে রে? খাল ক্রমে যেন ছোটো হয়ে আসছে!'
'এ সুঁতিখাল স্যার৷ জঙ্গলের ভিতর খানিক দূর গিয়ে শেষ হয়ে যায় তো৷ তাই ক্রমে সরু হতে থাকে৷ ভাটার সময় এসব খালে তেমন জলও থাকে না৷ কিন্তু জোয়ার চলছে যখন, সেই আশঙ্কা নেই৷'
কুসুম দত্ত তবু যেন ভরসা পেলেন না৷ বাঘের বাচ্চা দেখতে এই গভীর জঙ্গলে সরু খালের ভিতর আরও যেতে হবে বুঝে বেশ দমে গেলেন৷ ওই সময় নৌকো খালের বাঁক ঘুরতেই চোখে পড়ল প্রশস্ত চড়ায় ছানাপোনা নিয়ে হইচই বাধিয়েছে এক দঙ্গল বানর৷ কাছেই গোটা কয়েক হরিণের একটা দল৷ দিব্যি পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে উঁচুতে গাছের পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে৷ ওদের দেখে হরিণের পাল ছুটে পালালেও বানরের দল পরোয়া করল না৷ চড়ার কাদায় হাত ঢুকিয়ে তাদের কয়েকজন কী খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ একটু পরেই একটা বানর কাদা থেকে টেনে বের করল গাছের নরম একটা শেকড়৷ তারপর খালের জলে বেশ করে ধুয়ে সাফ করে লাফিয়ে উঠে পড়ল কাছেই এক গাছের মগডালে৷ আরামে খেতে লাগল৷
কুসুম দত্ত হাঁ করে দেখছিলেন৷ হঠাৎ খেয়াল করলেন দুই কিশোর গোবিন্দ আর শ্রীমন্তও দাঁড় টানা থামিয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে৷ চোখে হতাশার ছাপ৷ জিজ্ঞাসা করতে যাবেন, তার আগেই গোবিন্দ বলল, 'ব্যাড লাক স্যার৷'
'কেন? কী হয়েছে?' কুসুম দত্তর কন্ঠস্বরে উৎকন্ঠা ঝরে পড়ল৷
'যে গর্জন গাছের কথা বলেছিলাম, আর সামান্যই দূর এখান থেকে৷ বাঘের বাচ্চা দুটো বা তাদের মা, কেউ নেই সেখানে৷ চলে গেছে অন্য কোথাও৷'
ওদের সেই কথায় কিছু খুশিই হলেন কুসুম দত্ত৷ নড়ে উঠে বললেন, 'কী করে বুঝলি?'
'এই বানরের পাল দেখে৷ কাছে বাঘ থাকলে সুন্দরবনে শুধু বানর কেন, হরিণ-শুয়োর কেউ তার ধারেকাছে থাকে না৷ এই সকালে বানরের দল এখানে ভোজের আসর বসিয়েছে মানেই বাঘ বাচ্চাদের নিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও৷'
দুই কিশোরের গলায় হতাশা ঝরে পড়লেও কুসুম দত্ত কিন্তু খুশিই হলেন৷ বললেন, 'যাকগে, তোরা ফিরে চল বরং৷ তবু তো জঙ্গল ঘোরা হল৷ বানর আর হরিণের পালও দেখলাম৷ আর ওই ভয়ানক ঢেউ! সেই অভিজ্ঞতাও তো কম নয়!'
শুনে দু-জন প্রায় হাঁ হাঁ করে উঠল৷ 'তাই কী হয় স্যার! দেখাতে যখন নিয়ে এসেছি, আর একটু সময় দিন৷ পাশেই আর একটা সুঁতিখাল আছে৷ দু-দিকে ঘন জঙ্গল৷ একবার দেখে যাই৷'
দুই কিশোরের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে কুসুম দত্ত আর কথা বললেন না৷ ঘড়ির দিকে তাকালেন৷ হাতে সময় আছে এখনও৷ গোবিন্দ আর শ্রীমন্ত অবশ্য উত্তরের অপেক্ষা না করে ততক্ষণে নৌকো ঘুরিয়ে দিয়েছে৷
বড়ো নদীতে পড়ার পরে প্রায় আধ ঘণ্টার মতো জোরালো স্রোত ঠেলে ওরা ফের এক সুঁতিখালে নৌকো ঢোকাল৷ এই খালটাও প্রায় আগের মতোই৷ দু-ধারে সেই একই রকম ঝিমঝিম করা জঙ্গল৷ কিন্তু দুই কিশোরকে দেখে কুসুম দত্তর মনে হল, এবার ওরা যেন কিছু অতিরিক্ত সতর্ক৷ জোয়ারের টানে নৌকো চলেছে বলেই হয়তো দাঁড়ের গতি কিছু মন্থর৷ দুই কিশোর দাঁড় হাতে নৌকোর এক দিকে৷ কুসুম দত্ত প্রায় মাঝখানে৷ ওর আগে শ্রীমন্ত৷ হঠাৎ সে গলা নামিয়ে বলল, 'কিছু টের পাচ্ছেন স্যার? বাঁ-দিকের জঙ্গলে৷'
উত্তরে সেদিকে খানিক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে তিনি মাথা নাড়লেন৷ নাহ, তেমন কিছুই টের পাচ্ছেন না৷ সন্তর্পণে বললেন, 'কিছু দেখেছিস নাকি?'
'না স্যার৷ দেখিনি এখনও৷ তবে বাঁ-দিকের জঙ্গল বেশ গরম মনে হচ্ছে৷ আপনি সরে আমাদের দু-জনের মাঝে এসে বসুন দেখি৷'
শ্রীমন্তর হাত ধরে কুসুম দত্ত টালমাটাল নৌকোয় দু-জনের মাঝে গিয়ে বসলেন৷ মিনিট দশেকও হয়নি তারপর৷ কুসুম দত্ত সাবধানে তাকিয়ে ছিলেন বাঁ-দিকের জঙ্গলে৷ জোয়ারের জলে খাল এখনও পূর্ণ হয়ে ওঠেনি৷ দু-দিকে ঢালু কাদার চড়া অনেকটাই চওড়া৷ তারপর গরান, বাইন আর হেঁতালের ঘন জঙ্গল৷ হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন সেই গাছপালার ফাঁকে বিদ্যুৎ বেগে গাঢ় হলুদ একটা ছোপ পিছলে গেল৷ তেমন গুরুত্ব দেননি তখন৷ হেঁতালঝাড়ের পাতা কতকটা খেজুর পাতার মতো৷ পুরোনো হয়ে এলে হলুদ রং ধরে৷ তেমন কিছুই ভেবেছিলেন৷ কিন্তু একটু পরে ফের যখন দেখলেন, মুহূর্তে মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল৷ বাঘ! মাত্র হাত কয়েক দূরে৷
কুসুমকমল দত্ত যথেষ্টই সাহসী মানুষ৷ সাহসী কোচ হিসেবেও সুনাম আছে৷ ফার্স্ট হাফে দু-গোলে পিছিয়ে থেকেও ঠান্ডা মাথায় ছেলেদের নির্দেশ দিয়ে বহুবার ম্যাচ বের করে নিয়েছেন৷ এই প্রথম টের পেলেন, শুধু মাথাই ঝিমঝিম করছে, এমন নয়৷ পেটের ভিতরেও কেমন গুলিয়ে উঠছে৷ সরু খাল৷ মাঝ বরাবর নৌকো চললেও পাড় থেকে হাত চারেকের বেশি নয়৷ অর্থাৎ নৌকো থেকে বাঘটা বড়ো জোর হাত দশেক দূরে৷ কাঁপা গলায় বললেন, 'ব-বাঘ শ্রীমন্ত! মনে হচ্ছে আমাদের নৌকো ফলো করে আসছে৷'
দুই কিশোরের হাতের দাঁড় মুহূর্তে থেমে গেল৷ খানিক চেষ্টা করেও কিছু দেখতে পেল না ওরা৷ সামনে অল্প এগোলেই খালের ধারে চড়া মতো খানিকটা ফাঁকা জায়গা৷ আগে গোলপাতার বড়ো ঝাড় ছিল৷ কেটে নিয়ে যাওয়ায় এখন ফাঁকা৷ ওরা সাবধানে দাঁড় টেনে সেই ফাঁকা জায়গার কাছে নৌকো থামাল৷
দু-জনের কপালে এই প্রথম দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ৷ বয়স বেশি না হলেও বাদা জঙ্গলের ব্যাপারে ওদের অভিজ্ঞতা কম নয়৷ স্কুলে পড়ে৷ এবার মাধ্যমিক দেবে৷ কিন্তু পড়ার খরচ, বাড়িতে কিছু সাহায্যের জন্য মাছ ধরতে, নয়তো জ্বালানির জন্য ভেসে আসা মরা পাতা ছেঁকে তুলতে হামেশাই ওদের জঙ্গলে আসতে হয়৷ বেশ জানে, বাঘ নৌকোর পিছু নিয়েছে মানে তার উদ্দেশ্য একেবারেই মহৎ নয়৷ নিশ্চিন্ত হবার জন্যই ওরা নৌকো থামিয়েছিল৷ কিন্তু খানিক অপেক্ষা করার পরেও তেমন কিছু নজরে না পড়ায় স্যারের দেখার ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতে যাবে, তখনই নজরে পড়ল বাঘটাকে৷ ধূর্ত প্রাণীটা এক হেঁতালঝাড়ের পুরোনো হলুদ পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে৷ মুখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা লালা গড়িয়ে পড়ছে৷
শ্রীমন্ত চাপা গলায় বলল, 'একদম ঠিক দেখেছেন স্যার৷ নড়াচড়া না করে সাবধানে আমার চোখের সোজা হেঁতালঝাড়ের হলদে পাতাগুলোর দিকে তাকান৷'
কুসুম দত্ত তাই করলেন৷ তারপর যা দেখলেন, মুহূর্তে মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল৷ এভাবে খোলা জায়গায় বাঘ আগে দেখেননি, এমন নয়৷ কানহা ফরেস্টে বাঘ দেখেছেন৷ রণথম্ভর গিয়েছিলেন৷ বাঘ দেখেছেন সেখানেও৷ খুব কাছ থেকে৷ কিন্তু সেই বাঘের চোখের দৃষ্টি ছিল ধীর-স্থির৷ কিন্তু এই মুহূর্তে যে বাঘটা হেঁতালঝাড়ের আড়াল থেকে শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সে চোখ একেবারেই অন্যরকম৷ হিংস্র শ্বাপদের মতো৷ সামান্য সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে৷ প্রাণীটার সেই চোখের দিকে সামান্য সময় তাকিয়ে থাকাও সহজ নয়৷ কুসুম দত্তও পারলেন না৷ মুহূর্তে চোখ ফিরিয়ে নিলেন৷ পেটের ভিতর আগে থেকেই গোলাচ্ছিল৷ বমি করতে পারলে আরাম হতো৷ কিন্তু কোনো মতে দমন করে কাঁপা গলায় বললেন, 'আ-আর নয়৷ ফিরে চল এবার৷'
পাতার আড়ালে বাঘের সেই রূপ দেখে গোবিন্দ আর শ্রীমন্তও ততক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছে৷ ফিরেই যেতে হবে৷ শয়তানটার মতলব একেবারেই ভালো নয়৷ তার উপর সঙ্গে অনভিজ্ঞ নতুন মানুষ৷ শ্রীমন্ত বলল, 'সরু সুঁতিখাল৷ বাঘের এত কাছে নৌকো ঘোরানো যাবে না৷ আর একটু এগিয়ে যাই৷'
একদম সঠিক সিদ্ধান্ত৷ কুসুম দত্ত কিছু আর বললেন না৷ ওরা নৌকো নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল৷ কিন্তু তেমন সুবিধা হল না৷ ইতিমধ্যে নৌকোর তিন আরোহীর কারও চোখই সেই হেঁতালঝাড়ের উপর থেকে সরেনি৷ নৌকো ফাঁকা জায়গা ছেড়ে সামান্য এগিয়ে যেতেই কুসুম দত্ত সবিস্ময়ে দেখলেন, বাঘটা প্রায় বিদ্যুৎ বেগে সেই ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে ফের ওদের পিছু নিয়েছে৷
'হে-ই-ই-ই, খ-ব-র-দা-র!' হাতের দাঁড় তুলে মুহূর্তে হেঁকে উঠল দুই কিশোর৷
বাঘটাকে আর দেখা যাচ্ছিল না৷ সন্দেহ নেই, ওদের চিৎকারে কোথাও আড়াল নিয়েছে৷ গোবিন্দ বলল, 'শয়তানটার মতলব ভালো নয় শ্রীমন্ত৷ আর যাওয়া যাবে না৷ নৌকো ঘোরাতে হবে৷ এক্ষুনি৷'
দাঁড়ের ঠেলায় দু-জন এরপর নৌকো ঘোরাতে শুরু করেছিল৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য, একে সরু সুঁতিখালের প্রায় শেষ প্রান্ত, তায় জোয়ারের জল এখনও তেমন গভীর হয়নি৷ তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নৌকোর সামনের গলুই খালের পাড়ে ঘন এক হেঁতালঝাড়ের ভিতর আটকে গেল৷ দাঁড় দিয়ে ঠেলতে গিয়ে দেখা গেল খালের চড়ায় নৌকোর তলাও আটকে গেছে৷ এই অবস্থায় ওজন না কমালে নৌকো সরানো সহজ নয়৷ অবশ্য জোয়ার চলছে৷ সামান্য দেরি করলে জল বেড়ে নৌকো আপনিই ভেসে উঠবে হয়তো৷ কিন্তু এই অবস্থায় সেই সময় কোথায়? দাঁড় উঁচিয়ে গোবিন্দ লাফিয়ে নামল নৌকো থেকে৷ মুখে চিৎকার, 'হুঁশিয়ার থাকিস শ্রীমন্ত৷ খ-ব-র-দা . . .৷'
গোবিন্দর মুখের কথা শেষ হতে পেল না৷ তার আগেই এক ব্যাপার ঘটল৷ জঙ্গল ফুঁড়ে চাপা হুংকারে কোথা থেকে বাঘটা সামনে লাফিয়ে এসে পড়ল৷ হিংস্র প্রাণীটাকে এই প্রথম সম্পূর্ণ দেখতে পেলেন কুসুম দত্ত৷ হলদের উপর কালো ডোরা উজ্জ্বল রঙের প্রাণীটা গাছপালার আধো অন্ধকারে যেন আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে৷ তীক্ষ্ণ দুই সার দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা ছিটকে বের হচ্ছে৷ সেদিকে তাকালে বুক্তের রক্ত হিম হয়ে আসতে চায়৷ কিন্তু এতটুকু না ঘাবড়ে গোবিন্দ হাতের দাঁড় উঁচিয়ে পালটা হুংকার ছাড়ল৷ 'হে-ই-ই-ই, খ-ব-র-দা-র'!
নৌকোয় শ্রীমন্ত যেন এমন একটা ঘটনার জন্য তৈরি হয়েই ছিল৷ কুসুম দত্ত দেখলেন, শ্রীমন্ত ইতিমধ্যেই খানিক আগে কেটে রাখা শুকনো হেঁতাল পাতার আঁটি হাতে নিয়ে জ্বেলে ফেলেছে৷ বার কয়েক ঝাঁকিয়ে আগুনটা জোরাল করে সেটা এগিয়ে দিল ডাঙায় দাঁড়ানো গোবিন্দর দিকে৷ মুহূর্তে সেটা হাতে নিয়ে গোবিন্দ এগিয়ে গেল কয়েক পা৷ আড়াল থেকে সামনে লাফিয়ে পড়ে বাঘটা আর এগোতে পারেনি৷ গোবিন্দর হাতের দাঁড় আর চিৎকারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল৷ এবার আগুন দেখে পিছিয়ে গেল কয়েক পা৷
গোবিন্দ অবশ্য ছাড়বার পাত্র নয়৷ সেও হাতের মশাল নাড়তে নাড়তে এগিয়ে গেল৷ মুখে চিৎকার৷ এদিকে শ্রীমন্তও বসে নেই৷ মাথার গামছা খুলে দাঁড়ের মাথায় পেঁচিয়ে নিয়েছে৷ নৌকোয় পাটাতনের তলায় ছোটো এক বোতলে কেরোসিন ছিল৷ গামছায় ঢেলে জ্বালিয়ে ফেলেছে সেটা৷ স্যারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাতের সেই মশাল সমানে নাড়ছে৷ মুখে চিৎকার৷ মিনিট কয়েক চলল এই ভাবেই৷ দুই কিশোরের দাপটে বাঘটাই শেষে এক পা এক পা করে পিছু হঠতে শুরু করল৷ তারপর ঢুকে পড়ল জঙ্গলের গভীরে৷
সারাটা সময় নৌকোয় প্রায় জড় পদার্থের মতো বসে ছিলেন কুসুম দত্ত৷ সামনে ওই ভয়ানক দৃশ্য দেখে চোখের পাতা প্রায় স্থির৷ সম্ভবত বাহ্যজ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছিলেন৷ শ্রীমন্ত কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে সাড় ফিরে এল৷ 'চিন্তা করবেন না স্যার৷ আমরা আছি৷'
মাথা সামান্য ঝাঁকিয়ে নিয়ে কুসুম দত্ত কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন৷ বুঝতে পারলেন, কিছু সময় না গেলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা সম্ভব নয়৷ পেটের ভিতরে থেকে থেকেই কেঁপে উঠছিল তাঁর৷ এমন দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি৷ ইতিমধ্যে গোবিন্দ আর শ্রীমন্ত নৌকো ঘুরিয়ে দাঁড় টানতে শুরু করেছে৷ মুখে কথা নেই৷ দু-জনের চোখ শুধু চরকির মতো পাক খেয়ে চলেছে৷ ফালাফালা করে ফেলছে দু-দিকের জঙ্গল৷
প্রায় মিনিট দশেক পরে কুসুম দত্ত প্রথম কথা বলার অবস্থায় এলেন৷ তখনও তিনি দু-জনের মাঝে বসে৷ গলা ঝেড়ে নিয়ে ধরা গলায় বললেন, 'তোদের অসুবিধা হচ্ছে বোধ হয়৷ আমি সরে বসছি৷'
'একদম নয় স্যার৷' প্রায় হাঁ হাঁ করে উঠল ওরা, 'একদম নয়৷ আমাদের দুই জনের মাঝেই থাকুন আপনি৷ জঙ্গল থেকে আগে বের হই৷'
কুসুম দত্ত তখন কিছু না বললেও সামান্য উশখুশ করে একটু পরে বললেন, 'কিছু মনে করিস না তোরা৷ আমি একটা সিগারেট খাব এবার৷'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ স্যার৷' একসাথে বলে উঠল ওরা, 'তাতে আমাদেরও কিছু সুবিধা হতে পারে৷'
ওদের কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পারলেও কুসুম দত্ত তা নিয়ে মাথা ঘামালেন না৷ আসলে সিগারেট খাওয়া অভ্যাস৷ চেষ্টা করেও ছাড়তে পারেননি৷ তবে ছেলেদের সামনে ওটা এড়িয়ে চলার চেষ্টাই করেন৷ তাই পকেটে থাকলেও এতক্ষণ বের করেননি৷ কিন্তু এই অবস্থায় একটা সিগারেট না খেলে কিছুতেই যে স্বাভাবিক হতে পারবেন না, তা বেশ বুঝতে পারছিলেন৷
একটা সিগারেট খাবেন বলেছিলেন৷ কিন্তু টেনশন কাটাতে কখন যে দ্বিতীয় সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছেন, টেরও পাননি৷ উজান ঠেলে নৌকো তখন সুঁতিখালের মুখে৷ গাছপালার ফাঁক দিয়ে বড়ো নদী দেখা যাচ্ছে৷ প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে শ্রীমন্ত প্রায় তৈরি হয়েই ছিল৷ হঠাৎ দাঁড় ফেলে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ 'হে-ই-ই-ই, খ-ব-র-দা-র৷'
হাতের দুই আঙুলে ধরা সিগারেট কুসুম দত্ত তখন মুখে তুলতে যাচ্ছিলেন৷ থতমত খেয়ে থেমে গেলেন৷ ততক্ষণে শ্রীমন্ত প্রায় ছোঁ মেরে তার হাত থেকে আধ খাওয়া জ্বলন্ত সিগারেটটা ছিনিয়ে নিয়েছে৷ খালের ঠিক মুখেই বড়ো এক হেঁতালঝাড়৷ জোয়ারের জল আছড়ে পড়ছে৷ কুসুম দত্ত অবাক হয়ে দেখলেন নিমেষে পকেট থেকে একটা চকলেট বোমা বের করে সিগারেটের আগুনে পলতে জ্বেলে শ্রীমন্ত ছুড়ে দিল সেই হেঁতালঝাড়ের দিকে৷
প্রায় নিস্তব্ধ জঙ্গলে জোরালো শব্দে ফাটল সেটা৷ আলোর ঝলকানি৷ মুহূর্তে জঙ্গল কাঁপিয়ে 'ঘড়াম' করে রক্ত জল করা পালটা আওয়াজ হল৷ ডোরাকাটা হলদে একটা প্রাণী প্রায় বিদ্যুৎ বেগে ছিটকে বের হল হেঁতালঝাড়ের ভিতর থেকে৷ হারিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে৷ তবু নৌকো থামিয়ে আরও একটা চকলেট বোম ফাটানো হল৷ কোনো সাড়া না পেয়ে এবার সাবধানে খাল থেকে বের হয়ে এল ওরা৷
বড়ো নদীতে পড়ে দুই কিশোর প্রায় হাঁফ ছাড়ল যেন৷ ওদের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই চাঙা হয়ে উঠলেন কুসুম দত্ত৷ বরাবরই সাহসী মানুষ৷ হঠাৎ নতুন এই অভিজ্ঞতায় বেজায় ঘাবড়ে গেলেও এখন ভিতরে অন্য এক অনুভূতি টের পাচ্ছিলেন৷ নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে সেই কথাই ভাবছিলেন৷ গোবিন্দ বলল, 'স্যার, বাড়িতে মা আপনার জন্য রান্না করেছেন৷ খেয়ে সামান্য জিরিয়ে নিলেও হাসনাবাদের লঞ্চ ধরিয়ে দিতে পারব৷'
আরামে ধোঁয়া ছেড়ে কুসুম দত্ত বললেন, 'আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি রে৷ আজ থেকেই যাব এখানে৷ যে অভিজ্ঞতা হল, এখনই তোদের ছেড়ে যেতে মন চাইছে না৷'
'কিন্তু আজ ফিরে না গেলে . . .৷' অল্প থামল গোবিন্দ৷ সামান্য ইতস্তত করে বলল, 'রাতে বিপদ হতে পারে আপনার৷'
'কেন রে?' হালকা স্বরে কুসুম দত্ত বললেন৷
'স্যার, বাঘটা সম্ভবত আপনাকেই টার্গেট করেছিল৷ চলন্ত নৌকোয় দু-জনের মাঝে থাকার কারণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেনি৷ আমাদের কাউকে টার্গেট করলে সেই সুযোগ ছিল ওর৷ হয়তো চেষ্টা করত৷ বিশেষ করে যখন নৌকো থেকে নেমেছিলাম৷ বাদার বাঘের এই এক ব্যাপার৷ শিকার একবার নির্দিষ্ট করে ফেললে, সহজে আর বদলায় না৷ তাই আগুন দেখে পিছু হটলেও ছুটে এসে ঘাপটি মেরে ছিল খালের মুখে হেঁতালঝাড়ের আড়ালে৷ সুন্দরবনের ক্ষুধার্ত নরখাদক বড়ো ভয়ানক স্যার৷ একবার যখন পিছু নিয়েছে রাতে নদী পার হয়ে চলেও আসতে পারে৷'
'কী যে বলিস!' কুসুম দত্ত অল্প হাসলেন৷ 'এত বড়ো নদী!'
স্যারের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে ওরা তখন অবশ্য আর কথা বলেনি৷ তবে ওদের আশঙ্কা অমূলক ছিল না৷ কুসুম দত্তর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল হেলথ সেন্টারের গেস্ট হাউসে৷ পাকা বাড়ি হলেও নদীর ধারে ছোটো এক কামরার ঘর৷ লাগোয়া টয়লেট না থাকায় রাতে দরকার পড়লে বের হতেই হয়৷ সেই ভয়টাই পাচ্ছিল ওরা৷ স্যার যা মানুষ বললেও হয়তো কানে তুলবেন না৷ আর সেই কারণে স্যারের কোনো আপত্তিতেই কান দেয়নি৷ খাওয়া-দাওয়ার পর সেই দুপুরে প্রায় জোর করে লঞ্চে তুলে দিয়েছিল৷
রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলেও পরের দিন সকালে যথাসময়ে তৈরি হয়ে কুসুম দত্ত বেরোতে যাবেন, মোবাইলে ফোন এল৷ সাড়া দিতেই ও প্রান্ত থেকে গোবিন্দর কন্ঠস্বর, 'স্যার ভাগ্যিস আপনাকে রাজি করাতে পেরেছিলাম!'
'ক-কেন? কী হয়েছে?'
'যেমনটা অনুমান করেছিলাম, ঠিক তাই হয়েছে স্যার৷ নরখাদক বাঘটা নদী পার হয়ে রাতেই হানা দিয়েছিল আপনার খোঁজে৷ প্রায় সারা গ্রাম টহল দিয়ে গেছে৷ এমনকী গেস্ট হাউসের পিছনেও কিছু সময় ওত পেতে ছিল৷ নরম মাটিতে গভীর পায়ের দাগ৷ শেষে কাছেই এক বাড়ির গোয়াল থেকে একটা বাছুর মেরে তুলে নিয়ে গেছে৷ গ্রামে তাই নিয়ে সকাল থেকে বিরাট হইচই৷ বহুদিন এমন হয়নি কিনা৷ তবু যদি আপনাকে বাঘের বাচ্চা দেখাতে পারতাম৷ তা তো হলই না৷ মাঝখান থেকে এই অঘটন৷ বাছুরের মালিক বনদপ্তর থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবে অবশ্য৷ তাহলেও . . .৷'
'বাঘের বাচ্চা দেখতে পাইনি কে বলল?' গোবিন্দর কথা শেষ হবার আগেই এ-প্রান্ত থেকে কুসুম দত্ত বললেন, 'দু-দুটো বাঘের বাচ্চাও তো ছিল রে৷ নিজের চোখেই দেখলাম৷'
'বা-বাঘের বাচ্চা!' ফোনের ওদিকে গোবিন্দ প্রায় আকাশ থেকে পড়ল৷ 'আমরা তো দেখিনি৷'
'আমি কিন্তু দেখেছি রে৷' মুচকি হাসলেন কুসুম দত্ত৷ 'দু-দুটো বাঘের বাচ্চা!'
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%