পিসিদের বনতলির দালান বাড়িটা ছেলেবেলায় আমাদের কাছে ছিল এক রোমাঞ্চকর জগৎ৷ দু-তলা মস্ত কোঠা বাড়ি৷ একালের তুলনায় হয়তো তেমন কিছু নয়৷ কিন্তু সেকালে আমাদের সেই অজ পাড়াগাঁয়, পিসিদের দালান বাড়ির জুড়ি আশপাশে একটিও ছিল না৷ বাড়ির মাথায় সিংহমূর্তি দুটো অনেক দূর থেকে দেখা যেত৷ আমরা ছোটোরা, পিসিদের বাড়িতে বেড়াতে আসতাম গোরুর গাড়িতে চেপে৷ বর্ষায় নৌকোয়৷ সিংহ দুটো কে আগে দেখতে পায়, তাই নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত৷ অবশ্য আমরা যখন দেখেছি, পিসিদের অবস্থা তখন পড়তির দিকে৷ এজমালি বাড়ির অবস্থাও বেশ করুণ৷ অনেক দিন চুনকাম হয়নি৷ দেওয়াল জুড়ে শ্যাওলার ছোপ৷ কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে৷ ফাটল ধরেছে নানা জায়গায়৷ একতলার মেঝে আর সিঁড়ির কতক ফাটল তো বেশ বিপজ্জনক৷ সেগুলোর বেশিরভাগই নাকি সাপখোপের আস্তানা৷ তবে দেখিনি কখনো৷ দু-চারটে গল্প যা শুনতাম, তাতে ভয়ের চাইতে রোমাঞ্চ জাগত বেশি৷ এমন রোমাঞ্চের উপকরণ পিসিদের বাড়িতে ছড়ানো ছিল আরও৷
উপর-নীচ মিলিয়ে গোটা পনেরোর মতো ঘর৷ এর মধ্যে থাকার জন্য ব্যবহার হত চার-পাঁচটা মাত্র৷ বাকিগুলো ছিল গুদাম৷ জমিজমা ছাড়াও কেনা-বেচার ব্যাবসা ছিল ওনাদের৷ পাটের গাঁট, কলাই বা ধানের বস্তায় সেগুলো বোঝাই থাকত৷ জানলা-দরজা বন্ধ মালপত্র বোঝাই এই অন্ধকার ঘরগুলোও টানত আমাদের৷ বিশেষ করে আখের গুড়ের জালা বোঝাই ঘরগুলো৷ অন্ধকার ঘরে মুখ-ঢাকা মস্ত জালাগুলো সার বেঁধে সাজানো থাকত৷ ফাঁক-ফোকর দিয়ে ভিতরে উঁকি মারলে প্রথমেই মনে পড়ত যকের ধনের কথা৷ এছাড়া ছিল দু-তলার বারান্দার সিলিং-এ গোটা কয়েক মস্ত মৌচাক৷ গ্রামের মানুষ হয়েও অত বড়ো মৌচাক দেখিনি৷ মজা হত খেতে ফুলের মরসুমে৷ চাকে এত মধু জমা হত যে, টপটপ করে মধু গড়িয়ে পড়ত৷ এই সময় পিসিদের বাড়িতে এলেই তক্কে-তক্কে থাকতাম৷ মধু গড়াতে শুরু করলেই বাটি পেতে ধরে রাখতাম৷ ডানপিটে কেউ চাকের নীচে বসে জিব বাড়িয়ে দিত৷ টপটপ করে গরম মধু ঝরে পড়ত জিবের উপর৷ একবার তো এভাবে মধু খেতে গিয়ে খুড়তুতো ভাই বুলুর জিবে একটা ডাঁশা মৌমাছি বোঁ করে উড়ে এসে হুল ফুটিয়ে দিয়েছিল৷ মুখ-টুখ ফুলে সে এক কাণ্ড৷ বুলুর অবশ্য সে কারণে বিশেষ চৈতন্যোদয় হয়নি৷ তবে পিসিদের বাড়িতে আমাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল, একতলার উঁচু বারান্দায় ওঠার প্রশস্ত সিঁড়ির দু-পাশে সিমেন্টের এক জোড়া প্রমাণ সাইজের হাতির মাথা৷ মস্ত শুঁড় সিঁড়ির ধার বরাবর উঠোনে এসে মিশেছে৷ অনেক দিনের পুরোনো হলেও নীল কাচের চোখদুটো জ্বলজ্বল করত৷ দুপুরে সব যখন ঝিমিয়ে পড়ত, আমি আর বুলু সিঁড়ির দু-ধারে সেই হাতি দুটোর উপর বসতাম৷ হাতে থাকত পাটকাঠির লাঠি৷ হাতির পিঠে আফ্রিকার জঙ্গলে আমরা তখন দুই খুদে অভিযাত্রী৷ সেই নিঝুম দুপুরে দুই কিশোরের লাগামছাড়া কল্পনা সামান্য সময়ের মধ্যে কত কাণ্ড যে ঘটিয়ে ফেলত!
এ ব্যাপারে ঘৃতাহুতি জুগিয়েছিল একটা ঘটনা৷ সরকারি দপ্তর থেকে সেবার গ্রামে সিনেমা দেখাতে এসেছিল৷ স্কুলের মাঠে অনেকের সঙ্গে আমরাও গিয়েছিলাম৷ ইংরেজি ছবি, কথাবার্তা কিছুই প্রায় বুঝিনি৷ কিন্তু তাতে গল্পটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি৷ আফ্রিকার গভীর অরণ্যে ভীষণ বিপদে পড়েছে এক অভিযাত্রী দল৷ বুনো হাতির পিঠে এক কিশোর বার-বার সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করছে তাদের৷ জ্যান্ত হাতি তখনও দেখিনি৷ কিন্তু দুপুরের সেই খেলায় নতুন রসদ জুগিয়েছিল সিনেমাটা৷ তখন বয়সটাই যে ছিল ওইরকম৷ সবে হাই স্কুলে উঠেছি৷ স্কুলের লাইব্রেরি থেকে হেমেন রায়ের জয়ন্ত-মানিক আর টার্জান সিরিজের দু-চারখানা বই পড়া হয়ে গেছে৷ সুতরাং সেই গণ্ডগ্রামে থেকেও আমরা তখন অন্য এক জগতের বাসিন্দা৷ আর এসব ব্যাপারে জুড়ি ছিল না বুলুর৷ কত রকমের মতলব যে ওর মাথায় খেলত! হঠাৎ একদিন বলল, 'বুঝলি পোনু, পিসিদের বাড়িতে নির্ঘাত গুপ্তধন পোঁতা আছে৷ এবার পুজোয় গিয়ে খুঁজতে হবে৷'
তখন সবে ট্রেজার আইল্যান্ড পড়ে শেষ করেছি৷ ক্যাপ্টেন ফ্লিন্টের গুপ্তধন বুলুর মাথাটা যে খেয়ে ফেলেছে, বুঝতে বিলম্ব হয়নি৷ শুনে হেসে ফেলেছিলাম৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে এভাবে সত্যি হবে, তখন ভাবতেও পারিনি৷
আগেই বলেছি পিসেমশাইরা একসময় বেশ ধনী পরিবার ছিলেন৷ বাড়িটা তাঁর ঠাকুরদার বাবা শিবনারায়ণ রায়ের আমলের৷ তিনি নাওয়ারার জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারী ছিলেন৷ তারপর ধাপে ধাপে উন্নতি করে ছোটো একটা তালুক কিনে ফেলেন৷ পরিবর্তনটা দু-এক দিনে হয়নি৷ তবু অনেকেই বলত, তিনি নাকি মাটির নীচে কয়েক ঘড়া মোহর পেয়েছিলেন৷ সোজা কথায় গুপ্তধন৷ সেবার পুজোর দিন কয়েক আগে পিসিদের বাড়িতে গিয়ে দেখি হইহই ব্যাপার৷ সে কথায় যাওয়ার আগে বলে রাখি, এ বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল ওই শিবনারায়ণ রায়ের আমলে৷ বাড়ির একধারে মস্ত আটচালা মণ্ডপ৷ মণ্ডপে সারা বছর পড়ে থাকত প্রতিমার কাঠ-খড়ের পুরোনো কাঠামো৷ প্রতি বছর পুজোর আগে তার উপর মাটি চাপিয়ে গড়া হয় নতুন প্রতিমা৷ এ জন্য দশমীর রাতে নদীর ঘাটে প্রতিমা ভাসানের পরে কাঠামো যাতে ভেসে না যায় সে ব্যবস্থাও করা হত৷ পরদিন রং মাটি সব ধুয়ে গেলে তুলে আনা হত৷ এই প্রথা চলে আসছে সেই গোড়া থেকে৷ সুতরাং বলা যায়, প্রতিমার কাঠামোও সেই আমলের৷ যদিও বলাই বাহুল্য, পরবর্তী সময়ে তাতে মেরামত, অদলবদল হয়েছে বহুবার৷ সেবার পিসিদের বাড়িতে হইচই ওই প্রতিমা নিয়েই৷
পুজোর দিন দশেক আগে হঠাৎ কোথা থেকে এক বুড়ো আধপাগল গোছের অপরিচিত মানুষ এসে হাজির৷ সে সময় এসব নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাত না কেউ৷ পিসিদের বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই এমন এক-আধজন লোকের পাত পড়ত৷ যাই হোক, লোকটি রাতে আশ্রয় নিয়েছিল কাছারি ঘরে৷ পাশেই মণ্ডপ ঘরে তখন দুর্গা প্রতিমার কাজ চলছে৷ মাটির কাজ প্রায় শেষ৷ জনা দুই কারিগর এসেছে এজন্য৷ তারা থাকত কাছারি ঘরে৷ সেদিন রাতে মৃদু খুটখাট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তাদের৷ সন্দেহ হতে বাইরে বের হয়ে দেখে, পাশে মণ্ডপ ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে৷ শব্দটা সেখানে৷ এরপর পায়ে পায়ে সেদিকে এগিয়ে সবার তো আক্কেল গুড়ুম হবার জোগাড়৷ কী ভয়ানক! ভিতরে দুর্গাপ্রতিমার সামনে টেমির আবছা আলোয় সেই অপরিচিত লোকটা মোটাসোটা গণেশের মূর্তিটা কেটে নীচে নামিয়ে দা দিয়ে ফালা ফালা করে চিরে খড়কুটোর ভিতর কী খুঁজছে৷
কাণ্ড দেখে সবাই চেঁচিয়ে উঠতে লোকটা পালাবার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু সফল হতে পারেনি৷ তারপর তাকে ঘিরে গ্রামের কয়েক-শো মানুষের হইচই৷ চেপে ধরতে সেই রাতেই লোকটা গড়গড় করে অনেক কিছু বলে ফেলে৷ তবে তাতে কৌতূহল কিছুমাত্র কমেনি, বরং চতুর্গুণ বেড়েছে৷
বৃদ্ধ মানুষটির নাম রামরতন রায়৷ একসময় তিনি নাকি পিসেমশাইয়ের বাবা ভবনারায়ণ রায়ের বন্ধু ছিলেন৷ একসাথে জেলা সদরের স্কুলে পড়তেন৷ থাকতেন একই ঘরে৷ সেই সময় পিসের ঠাকুরদা দর্পনারায়ণ রায় হঠাৎ মারা যান৷ ব্যাপারটা হয়তো অনুমান করেছিলেন তিনি৷ মৃত্যুর দিন কয়েক আগে সদরে ছেলের কাছে তাই একটা চিঠি লিখেছিলেন৷ চিঠিতে সাংসারিক নানা কথার সঙ্গে ছিল খাপছাড়া একটা লাইন, 'খুব দরকার পড়লে পশ্চিম গণেশের নাকের ডগায় খুঁজে দেখো৷'
চিঠির ওই লাইনটা নিয়ে ভবনারায়ণ বন্ধু রামরতনের সঙ্গে সেদিন আলোচনাও করেছিলেন৷ কিন্তু সুরাহা হয়নি৷ তার দিন কয়েকের মধ্যেই পিতার মৃত্যুর খবর পেয়ে ভবনারায়ণ গ্রামে চলে গেলেন৷ দু-জনের মধ্যে তেমন যোগাযোগ আর ছিল না৷ ভবনারায়ণ ব্যাপারটা নিয়ে পরে মাথা ঘামিয়েছিলেন হয়তো৷ তবে তিনি নিজে ব্যাপারটা একরকম ভুলেই গিয়েছিলেন৷ তারপর অনেক ঘটনা ঘটে গেছে রামরতনবাবুর জীবনে৷ উপার্জনক্ষম দু-দুটি পুত্র মারা গেছে অকালে৷ সেই শোকে পাগল হয়ে মারা গেছেন স্ত্রীও৷ তিনি নিজেও তেমন সুস্থ নন৷ সম্প্রতি একমাত্র নাতনির বিয়ে ঠিক করেছেন৷ মোটামুটি ব্যবস্থা হলেও বাকি হাজার খানেক টাকা আর কিছুতেই জোগাড় করে উঠতে পারেননি৷ এদিকে দিন এগিয়ে আসছে৷ এই সময় একদিন হঠাৎই সেই চিঠির কথা মনে পড়তে আচমকা রহস্যটা ফাঁস হয়ে যায় তাঁর কাছে৷ দর্পনারায়ণ রায় ওই চিঠিতে ছেলেকে কিছু লুকোনো ধনসম্পত্তির হদিশ দিয়ে গিয়েছিলেন৷ আর সেই ধনসম্পত্তির সঙ্গে একটা গণেশ মূর্তির বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে৷ সুতরাং, আর দেরি না করে বৃদ্ধ হাজির হয় যথাস্থানে৷ ইচ্ছে ছিল, বাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারীদের সব খুলে বলবেন৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভরসা পাননি৷ পুজোর মাত্র কয়েকদিন বাকি৷ প্রতিমা তৈরির কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে৷ এই অবস্থায় কেউ যদি তেমন আমল না দেয়৷ আসলে বৃদ্ধের তখন ধারণা, গুপ্তধন রয়েছে দুর্গা প্রতিমার ওই গণেশ মূর্তির ভিতর৷ অগত্যা বয়স্থা নাতনির বিয়ের টাকা জোগাড় করতে গভীর রাত্তিরে নিজেই এই অন্যায় কাজে হাত লাগিয়েছিলেন৷
আমরা যখন পিসিদের বাড়িতে গেছি, ঘটনা তখন আরও গড়িয়েছে৷ একেই তো শিবনারায়ণ রায়ের ধনসম্পত্তি নিয়ে নানা জনশ্রুতি আগে থাকতেই চালু ছিল৷ এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও খানিকটা৷ চারপাশে রাষ্ট্র হয়ে গেছে, শিবনারায়ণ রায়ের গুপ্তধনের কিছু অংশ নাকি এ বাড়িতে এখনও লুকোনো রয়েছে৷ ব্যাপারটা পিসেমশাইকেও ভাবিয়ে তুলেছে৷ খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, বৃদ্ধ নিজের বা তাঁর পরিবার সম্পর্কে যা বলেছেন, তা সত্যি৷ তাই ঠিক করেছেন বৃদ্ধের কথার সূত্র ধরে একটু অনুসন্ধান করে দেখবেন৷ তাতে আর কিছু না হোক, চারপাশে গুজব যা ছড়িয়েছে তার অন্তত কিছুটা নিরসন হবে৷ বলা বাহুল্য, গণেশের মূর্তির ভিতর পাওয়া যায়নি কিছুই৷
প্রতিমার অন্যান্য মূর্তিগুলোতে অবশ্য আর হাত দেওয়া হয়নি৷ তবে ইতিমধ্যেই গণেশের ঠিক সামনে মেঝের মাটি খুঁড়ে দেখা হয়েছে৷ মেলেনি কিছুই৷ পুজোর মুখে এর বেশি আর সম্ভব হয়নি৷ তবে ঠিক হয়েছে পুজোর পরে প্রতিমা সরিয়ে পুরো মণ্ডপ খুঁড়ে দেখা হবে৷
এই অবস্থায় আমাদের মতো খুদে গোয়েন্দার পক্ষে চুপ করে বসে থাকা কোনোমতেই সম্ভব ছিল না৷ পুজোর আনন্দের থেকেও এ রোমাঞ্চের স্বাদ অনেক বেশি৷ আমার নিজের অবশ্য সন্দেহ ছিল তখনও৷ বুলুকে বললাম, 'ব্যাপারটা তুই সত্যি বলে বিশ্বাস করিস?'
বুলু ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, 'আলবত৷ তা ছাড়া পিসেমশাই নিজেই যখন ব্যাপারটা উড়িয়ে দেননি, তখন আমাদের অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই৷'
যুক্তি অকাট্য৷ তবু বললাম, 'তা নাহয় হল৷ কিন্তু এমনও তো হতে পারে, সেই ধনসম্পত্তি ভবনারায়ণ রায় আগেই বের করে নিয়েছেন৷ চিঠি তো তাঁকেই লেখা৷'
আমার যুক্তি বুলু উড়িয়ে দিল না, 'এটা মন্দ বলিসনি৷ তবে এমন হলে বাড়ির কেউ-না-কেউ জানতে পারত৷ অন্তত পিসেমশাই৷ তা ছাড়া খাজনা বাকির দায়ে ওই ভবনারায়ণ রায়ের আমলেই তো শুনেছি জমিদারি নিলামে ওঠে৷ আমার তাই মনে হয় তিনি চিঠিটাকে তেমন গুরুত্ব দেননি৷ আর দিলেও লুকোনো ধনসম্পদগুলো খোঁজার তেমন চেষ্টা করেননি৷ গুপ্তধন যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে৷ সুতরাং অযথা সময় নষ্ট না করে কাজে লেগে পড়৷ তোকে তো আগেই বলেছিলাম, এ বাড়িতে কোথাও গুপ্তধন রয়েছে৷ এবার সূত্র যখন মিলেছে, মাথা খাটিয়ে সমাধান একটা করবই৷'
বুলু বলল বটে, কিন্তু ব্যাপার হল, সূত্রটা এতই ক্ষীণ যে, তার থেকে কোনো সমাধানে আসা সহজ নয়৷ তারপর সেই আধপাগলা বৃদ্ধ রামরতন রায়ের পক্ষে এই এত বছর পরে চিঠির কথাগুলো কি সঠিক মনে রাখা সম্ভব? মানুষটির সঙ্গে একবার দেখা করতে পারলে সুবিধে হত৷ খুঁটিয়ে জানা যেত৷ কিন্তু দিন কয়েক আগেই তিনি বাড়ি চলে গেছেন৷ তাঁর বাড়িও অনেক দূরে৷ আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়৷ অবশ্য বাড়তি সুবিধাও একটা ছিল আমাদের৷ তা হল অফুরন্ত সময়৷ পুজোর বাড়ি৷ সবাই যে-যার কাজে ব্যস্ত৷ আমাদের নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো সময় নেই কারও৷ হাতে তাই অঢেল সময়৷
ক্ষীণ একটু সূত্র ধরে যা পাওয়া গেছে তাতে 'গণেশ' শব্দটাই যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তাতে সন্দেহ নেই৷ বৃদ্ধ রামরতনবাবুও তেমন অনুমানে দুর্গা প্রতিমার গণেশ বেচারিকে নামিয়ে ফালা ফালা করেছেন৷ কিন্তু মেলেনি কিছুই৷ আমার তাই মনে হচ্ছিল, এ বাড়ির কোথাও আর একটা গণেশ রয়েছে৷ বুলুকে সে কথা ব্যক্ত করতেই ও বলল, 'ঠিক বলেছিস৷ তবে সেই সাথে আরও একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে৷ মনে রাখিস, পুরো কথাটা ছিল, পশ্চিম গণেশের নাকের ডগায়৷ অর্থাৎ, অন্তত দুটো গণেশ এ বাড়িতে থাকার কথা৷ তার পশ্চিম দিকেরটাই আমাদের দরকার৷'
বুলু থামতে আমি বললাম, 'তাই যদি হয়, তবে তো মনে হচ্ছে এখানে ওই দুর্গা প্রতিমার গণেশের কথাই বলা হয়েছে৷ কারণ, এটিও রয়েছে ওই পশ্চিম দিকেই৷'
বুলুকে এবার বেশ চিন্তিত মনে হল৷ তারপর হঠাৎ চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, 'আমরা কী বোকা রে পোনু! এত কিছু ভাবলাম, আর সোজা কথার সোজা অর্থটাই ধরতে পারলাম না কেউ!'
'কী অর্থ রে?' ওর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বোধগম্য হল না৷ হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম৷ দেখে ও একটু দম নিয়ে বলল, 'পোনু ভালো করে ভেবে দেখ, আসলে কথাটা ছিল, পশ্চিম গণেশের নাকের ডগায়৷ অর্থাৎ গণেশ নয়, তার নাকটাই এখানে মুখ্য৷ আর সেটাই আমরা ধরতে পারিনি-৷' বলতে বলতে বুলু থমকে গেল হঠাৎ৷ তারপর করুণ গলায় বলল, 'হ্যাঁরে পোনু, গণেশের নাক কোথায় বলত?'
বুলুর প্রশ্নে আমিও ঘাবড়ে গেলাম৷ তাইতো, গণেশের নাক কোথায়? চোখ, মুখ, কান সবই রয়েছে৷ নাকটাই শুধু বাদ৷ বলা বাহুল্য, কোনো উত্তরই জোগাল না৷
অবশ্য নাক সমস্যা নিয়ে খুব বেশি হাবুডুবু খেতে হয়নি৷ অনেক ভেবেও কোনো কিনারা করতে না পেরে শেষে ধরা হল কমলদাকে৷ কমলদা পিসির বড়ো ছেলে৷ সদরে কলেজে পড়ে৷ পুজোয় বাড়িতে এসেছে৷ আমাদের প্রশ্ন শুনে তো হেসেই খুন৷ তারপর বলল, 'কী কাণ্ড! গণেশের মাথায় অতবড়ো একটা শুঁড়, আর তোরা নাক খুঁজে পাচ্ছিস না? আরে পাগলা, ওই শুঁড়টাই তো গণেশের নাক৷'
অপমানটা হজম করতে হল৷ কিন্তু নাক সমস্যা মিটলেও আসল কাজ কিছুই তেমন হল না৷ পার হয়ে গেল আরও কয়েকটা দিন৷ এদিকে প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ৷ রং চড়ানো হচ্ছে৷ মণ্ডপঘরের সামনে মস্ত উঠোন জুড়ে ম্যারাপ বাঁধার কাজ চলছে৷ অন্যান্য বছর আমরা ছোটোরা এই সব নিয়ে মেতে থাকি৷ কিন্তু এবার ওসব নিয়ে বিন্দুমাত্রও উৎসাহ নেই দু-জনের৷
গণেশের নাক, অর্থাৎ শুঁড়ের সূত্র ধরে এগিয়ে কিন্তু তেমন সুবিধা হয়নি৷ গোড়ায় মনে হয়েছিল গণেশের শুঁড়টা কোনো এক বিশেষ জায়গা নির্দেশ করছে৷ আর সেখানেই রয়েছে গুপ্তধন৷ পিসিদের বাড়ির দুর্গা প্রতিমা আমাদের এতবার দেখা যে, তার প্রতিটি খুঁটিনাটি মুখস্থ৷ বেশ মনে আছে, শুঁড়ের ডগাটা সামান্য বাঁকানো ছিল নীচের দিকে৷ কারিগররা গণেশের নতুন যে মূর্তি বানিয়েছেন তার শুঁড়ের ডগাটাও একইভাবে নীচের দিকে বাঁকানো৷ সেই হিসেবে গণেশের সামনে মণ্ডপের মেঝের নীচেই পোঁতা রয়েছে গুপ্তধন৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পিসেমশাই ইতিমধ্যে জায়গাটা খুঁড়ে দেখেছেন৷ শুধু সেইটুকুই নয়, আশপাশের আরও অনেকটা মেঝে৷ তবু প্রশ্ন একটা থেকেই যায়৷ প্রতিমা বর্তমানে যেখানে রয়েছে বরাবর সেখানেই ছিল তো? নাকি ইতিমধ্যে স্থান বদল হয়েছে? এ ব্যাপারে কয়েকজনকে প্রশ্ন করেও কিন্তু কিছু জানা গেল না৷
দেখতে দেখতে হইহই করে ষষ্ঠীর দিন এসে পড়ল৷ বাড়ির ছোটোদের আনন্দ এই দিনেই সবচেয়ে বেশি৷ ভোর থেকে ড্যাম-কুড়-কুড় ঢাকের আওয়াজ৷ ধূপধুনোর গন্ধ৷ তাড়াতাড়ি চান করে এলাম সবাই৷ তারপর নতুন জামাকাপড় পরে মা দুর্গাকে প্রণাম করে কপালে চন্দনের ফোঁটা লাগিয়ে পিসিদের মস্ত বারান্দায় কলাপাতা পেতে চিঁড়ে-দই খেতে বসে গেলাম৷ সঙ্গে খাজা, কদমা আর বড়ো মর্তমান কলা৷ পুজোর নতুন জামাকাপড়ে আমাদের কাছে এ দিনটির আনন্দই ছিল আলাদা৷ কিন্তু এসবের কিছুতেই সেবার আর মন বসল না কারও৷ এভাবেই কাটল সারা দিন৷ পরদিন মহাসপ্তমী৷ ভোর সকালে আমাদের ছোটোদের কাজ, হাতে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ফুল তুলে বেড়ানো৷ কারা কত বেশি ফুল তুলতে পারে তাই নিয়ে রেষারেষিও চলত৷ সুতরাং যারা আগে ঘুম থেকে উঠতে পারত সুবিধা হত তাদেরই৷ পিসিদের বাড়িতে আমি আর বুলু বরাবর একসাথে শুতাম৷ ঘুমের ব্যাপারে দু-জনের বেশ বদনাম ছিল বলে ফুল তোলায় কখনোই বিশেষ জুত করতে পারিনি৷ সেবার কিন্তু অন্যরকম হল৷ শেষ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতে বুঝলাম বুলু ঠেলছে আমাকে৷ ও আগেই উঠে বসেছে৷ শেষ রাত্তিরের আবছা আলোয় চোখ কচলে দেখি পাশে বসে দরদর করে ঘামছে৷ প্রায় উদ্ভ্রান্ত অবস্থা৷ চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ তাড়াতাড়ি উঠে বসে বললাম, 'কী রে এখনই ফুল তুলতে বের হবি?'
সে কথা ওর কানে গেছে বলে মনে হল না৷ নিঃশব্দ আমার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে শেষে বলল, 'পোনু রে পেয়ে গেছি৷'
এবার ঘামবার পালা আমার৷ বুলু যে কী বলতে চাইছে তখন বুঝতে বাকি নেই৷ কোনোমতে বললাম, 'কো-কোথায় রে?'
বুলুর উত্তেজনা ইতিমধ্যে খানিক কমেছে৷ চারপাশে সন্তর্পণে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, 'গণেশের নাক কোথায় থাকে রে পোনু?'
এমন উত্তর মোটেই আশা করিনি৷ প্রায় রুদ্ধশ্বাসে বললাম, 'কোথায় আবার! গণেশের মাথায়৷ তুই বলতে চাইছিস সোনাদানাগুলো ওই পুরোনো গণেশের মাথার ভিতর ভরা ছিল? ধরা পড়ার আগেই সরিয়ে ফেলেছেন রামরতনবাবু?'
সামান্য মাথা নাড়ল বুলু, 'পাগল হয়েছিস! ওই খড় বিচালির তৈরি গণেশের মাথার ভিতর কেউ সোনাদানা রাখে! হ্যাঁ রে পোনু, গণেশের মাথাটা কার বলত?'
'কার আবার, হাতির৷' চটপট জবাব দিলাম৷ জন্মের সময় শনির কোপে গণেশের মাথা উড়ে গিয়েছিল৷ কোনো উপায় না দেখে তাড়াতাড়ি একটা হাতির মাথা কেটে এনে গণেশের ধরে জুড়ে সে যাত্রায় বাঁচিয়ে তোলা হয়েছিল তাঁকে৷ সেই থেকে গণেশের মাথাটা হাতির৷ এ গল্প ঠাকুরমার কাছে শুনেছি বহুবার৷ আমার জবাব শুনে বুলু বলল, 'গণেশ নয়, রহস্যের চাবিকাঠি হল ওই হাতির মাথা৷ চিঠির সংকেতে এই সামান্য প্যাঁচটুকুর আশ্রয় নিয়েছিলেন দর্পনারায়ণ রায়৷ আর সেটাই আমরা কেউ বুঝে উঠতে পারিনি৷ এ বাড়িতে হাতির মাথা কিন্তু আরও আছে রে পোনু৷ একটা নয়, পুরো এক জোড়া৷'
বুলু কী বলতে চাইছে ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি৷ উত্তেজনায় ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বললাম, 'তুই-তুই কি বারান্দার সিঁড়ির দু-পাশে হাতির মাথা দুটোর কথা বলছিস? ওদের শুঁড়ের ডগার কাছে মাটির তলায় পোঁতা আছে সোনাদানাগুলো?'
বুলু মৃদু হাসল, 'দুটোর নীচেই নয় রে৷ শুধু পশ্চিম দিকে যেটা রয়েছে৷ এই ক-দিন কত ভেবেছি, কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারিনি৷ আর কাণ্ড দেখ, আজ শেষ রাত্তিরে ঘুম ভাঙতে কেমন টুক করে সমাধান হয়ে গেল! এ নিশ্চয় মা দুর্গার আশীর্বাদ! কাল নতুন জামাকাপড় পরে প্রণাম করার সময় মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম তো!'
রহস্যের এমন চমকপ্রদ সমাধানের পরেও অন্য এক ব্যাপার ভীষণ ভাবিয়ে তুলল আমাদের৷ এ কথা কি বিশ্বাস করবে সবাই? নিতান্ত নাবালক দুই খুদে গোয়েন্দার গোয়েন্দাগিরিকে কি পাত্তা দেবে কেউ? রাশভারী মানুষ পিসেমশাই তো হেসেই উড়িয়ে দেবেন৷ আর যদি সামান্য গুরুত্ব দিয়েও দেখেন, তাহলেও পুজোর ভিতর খোঁড়াখুঁড়িতে কেউ রাজি হবেন না৷ অথচ দশমীর পরদিনই আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে৷ এত কাণ্ডের পরে আসল সময় উপস্থিত থাকতে পারব না, সেটা ভাবাই যায় না৷ তা ছাড়া আরও একটা বিপদ রয়েছে৷ ব্যাপারটা একবার ফাঁস হয়ে গেলে পাঁচকান হতে সময় লাগবে না৷ সেটা একেবারেই ঠিক হবে না৷ অতএব অন্য রাস্তা ধরতে হল৷
পুজোর ক-দিন দু-জনের যে কী উৎকন্ঠায় কাটল, তা আর বলার নয়৷ অথচ উৎসবের বাড়ি সারাদিন মানুষে গমগম৷ ঢাকের আওয়াজ, ধূপধুনোর ম-ম গন্ধের ভিতর পুজোর মন্ত্র, চণ্ডীপাঠ আর অঞ্জলি, পুজোর প্রসাদ৷ এসব ছাড়াও গোটা কয়েক পেট্রোম্যাক্স-এর আলোয় ঝলমলে মেরাপের নীচে সন্ধ্যে থেকে পালাগান৷ কিন্তু কিছুতেই মন বসল না আমাদের৷ এমনকী, নবমীর রাত্তিরে অমন জমাট রূপবান পালার অর্ধেক দেখে উঠে এলাম৷
দশমী এসে গেল৷ প্রতিমার বিসর্জন হত বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে নদীতে৷ পুজোর ক-দিনের মতোই সমান জমজমাট ছিল বিসর্জন অনুষ্ঠান৷ বাড়িসুদ্ধ মানুষ তো বটেই গ্রামের ছেলে-বুড়ো অনেকেই সেই ভাসান যাত্রায় সঙ্গী হত৷ বিসর্জনের পরে বিলোনো হত কয়েক ধামা কদমা আর ফেনি বাতাসা৷ গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য এই দিনটিই বেছে রেখেছিলাম আমরা৷ বিকেলে আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকর্মের পরে যথা সময়ে বিরাট ভাসানের দল রওনা হয়ে পড়ল৷ সঙ্গে আমরাও৷ কিন্তু খানিক দূর গিয়ে এক ফাঁকে ভিড় থেকে আলাদা হয়ে টুক করে ফিরে এলাম বাড়িতে৷
ক-দিনের গমগমে বাড়ি তখন প্রায় নিস্তব্ধ৷ বয়স্ক মেয়েরা ছাড়া বাড়িতে তেমন কেউ নেই৷ মস্ত উঠোন ফাঁকা৷ বারান্দার সিঁড়ির পশ্চিম দিকের হাতির শুঁড়ের ডগার সম্ভাব্য কতটা জায়গা খুঁড়তে হবে সেটা আগেই ঠিক করা ছিল৷ অযথা সময় নষ্ট না করে দু-জনে দুটো কোদাল হাতে চটপট কাজে নেমে পড়লাম৷ তবে বেশিক্ষণ গোপন রাখা গেল না৷ প্রায় নিস্তব্ধ বাড়ি৷ ধুপধাপ কোদালের শব্দ কতক্ষণ আর চাপা থাকে? বোধ হয় গোটা বিশেক কোপও পড়েনি, শব্দ শুনে কয়েকজন বের হয়ে এলেন৷ কাণ্ড দেখে পিসি অবাক হয়ে বললেন, 'এ কী রে! তোরা কী করছিস ওখানে? ভাসানে যাসনি!'
এমনটা যে হতে পারে তা জানাই ছিল৷ জবাবটা তৈরি করেই রেখেছিলাম৷ বুলু ঝটপট বলল, 'পিসি, কী এক দরকারে ভাসানে যাওয়ার আগে পিসেমশাই আমাদের জায়গাটা খুঁড়ে রাখতে বলে গেছেন৷'
ওঁরা আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না৷ শেষ বাধাটা পার হওয়া গেল৷ অবশ্য যত সহজে কাজটা সেরে ফেলা যাবে ভেবেছিলাম তা হল না৷ উঠোনে গোবর লেপা অনেক দিনের শক্ত মাটি৷ হাঁপিয়ে উঠলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই৷ কিন্তু সেসব কিছুমাত্র গ্রাহ্য না করে যথাসম্ভব দ্রুত কোদাল চালিয়ে চললাম৷ তবু কিছুই প্রায় হল না৷ ঘণ্টা দেড়েক পরে ভাসানের দল যখন হইহই করে ফিরে এল আমরা তখন হাত তিনেকের বেশি খুঁড়ে উঠতে পারিনি৷ সারা শরীর মাটি আর ঘামে জবজব৷ কাণ্ড দেখে পিসে নিজেই এগিয়ে এলেন৷ একটুও না ঘাবড়ে আমরা এবার একে একে পুরো ব্যাপারটা খুলে বললাম তাঁকে৷ শুনে সবাই তো প্রায় হতভম্ব৷ পিসে বললেন, 'এমন উদ্ভট ব্যাপার কী করে তোদের মাথায় খেলল বল তো!'
কিন্তু পিসে যাই বলুন, তাতে তখন আর কিছু যায় আসে না৷ সিঁড়ির মুখে বিরাট গর্ত৷ মাটিতে ছয়লাপ৷ সঙ্গে গুপ্তধনের হাতছানি৷ এরপর শেষ না দেখে আর উপায় কী? অত্যুৎসাহী কয়েকজন তো ততক্ষণে গর্তে নেমে হইহই করে মাটি কাটতে শুরু করে দিয়েছে৷ পিসেমশাইও আর আপত্তি করলেন না৷
তারপর? তারপর আরও খানিক মাটি খুঁড়তে প্রায় এক মানুষ নীচে কোদালের ফলায় কী একটা ঠং করে উঠল৷ আরও কয়েক মিনিট রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করার পরে মাটির নীচ থেকে বের হয়ে এল পুরোনো আমলের মস্ত এক পেতলের কলসি৷ উপস্থিত সবার মধ্যে তখন চরম উত্তেজনা৷ শুধুমাত্র আমাদের দু-জনের ভিতর উত্তেজনার বিন্দুমাত্রও আর অবশিষ্ট নেই৷ মনে আছে, সেই কলসি উপরে তুলতে দু-জন জোয়ান মানুষ হিমশিম খেয়ে গিয়েছিল৷
ঢাকনা খুলতে আমরা অবশ্য একটু নিরাশই হয়ে পড়েছিলাম৷ সোনাদানা নয়, ভিতরে শুধু কোম্পানি আমলের পুরোনো রুপোর টাকা৷ কিন্তু আমরা নিরাশ হলে কী হবে, বাড়ির সবার কাছে দু-জন সেদিন দিগবিজয়ী বীর৷ যেন বিশ্ব জয় করে ফিরেছি৷ অত খাতির তার আগে কখনো পাইনি৷
মাস কয়েক বাদে ফাইনাল পরীক্ষার পরে পিসেমশাই আমাদের দু-জনকে কলকাতায় বেড়াতে নিয়ে এলেন৷ লঞ্চ আর ট্রেনে চেপে সেই আমাদের প্রথম কলকাতায় আসা৷ দিন সাতেক ছিলাম৷ গড়ের মাঠে গোরাদের ফুটবল, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, জাহাজঘাট, ভিক্টোরিয়া হল, হাওড়ার পুল এমনকী সিনেমা হাউসে টার্জানের ছবিও দেখলাম৷ রাশভারী পিসেমশাই তখন অন্য মানুষ৷ ফেরার সময় কিনে দিয়েছিলেন একগাদা অ্যাডভেঞ্চারের বই৷ আমাদের কাছে ওটাই ছিল সেরা পুরস্কার৷ বৃদ্ধ রামরতনবাবুকেও নিরাশ করেননি তিনি৷ মেয়ের বিয়ের জন্য পুরো এক হাজার টাকাই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন৷