চক্রধরবাবুর চৈতন্যোদয়

শিশির বিশ্বাস

রোদ চড়তেই সোনাখালি জেটিঘাটের ব্যস্ততা তুঙ্গে৷ নোঙর করা দশ-বারোটি ভটভটির কোনোটা থেকে আবাদের আনাজপাতি নামছে৷ কোনোটা থেকে নামছে মাছবোঝাই ঝুড়ি৷ জমা হচ্ছে মহাজনের আড়তে৷ কোনোটায় তোলা হচ্ছে বস্তা বোঝাই ডাল, মশলাপাতি আর মনিহারি জিনিস৷ তেল, ডিজেল, কেরোসিন৷ জিনিসপত্র বোঝাই হলেই ভটভটি রওনা হয়ে যাবে বাদা অঞ্চলের দূর দূর গ্রামে৷ জেটির এক ধারে চক্রধর হালদারের ছোটো এক ভটভটি৷ ছই পর্যন্ত নেই৷ কিন্তু মালিকের দাপট ভয়ানক৷ চিৎকারে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে জনা কয়েক কর্মচারী৷ মাথায় চেপে বড়ো বড়ো বরফের চাঁই আসছে৷ নৌকোয় নামতেই ঝড়ের বেগে সেগুলো টুকরো করে ভরা হচ্ছে প্রমাণ আকারের থার্মোকলের বাক্সে৷ কড়া নজরে তদারক করছেন চক্রধরবাবু৷ কাজে দেরি মানেই চড়া রোদে বরফের দফাসারা! তাই নিমেষে বাক্সবন্দি করা চাই৷ নৌকোর মাঝে হিসেব করে সাজানো গোটা তিরিশেক থার্মোকলের বাক্স৷ বরফে বোঝাই হলেই ছুটবে বাদার দিকে৷ কর্মচারী কারও কাজে ফাঁকি দেবার জো নেই৷
বাজারে হরেক মালের কারবার চক্রধরবাবুর৷ তবে বরফের এই কারবারটা নতুন৷ সবে শুরু করেছেন৷ বাদা জঙ্গলের দূর-দূরান্তের নদী-খালে জেলের দল নৌকোয় মাছ ধরে বেড়ায়৷ আড়তে ফেরার আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায় অনেক সময়৷ ইদানীং তাই বরফের ব্যবস্থা শুরু হয়েছে৷ কলকাতা থেকে ট্রাক বোঝাই বরফ চলে আসে সোনাখালি, বাসন্তী৷ এমনকী গোসাবার কাছে গদখালি পর্যন্ত৷ ভোর হতেই সেই বরফ বোঝাই ভটভটি ছোটে বাদার দিকে৷ মাছ নিয়ে জেলে নৌকো হাঁ করে থাকে বরফের ভটভটির জন্য৷ ভালো লাভের ব্যাবসা৷ সুযোগ বুঝে চক্রধর হালদারও লেগে পড়েছে৷ তিনজন কর্মচারীও রেখেছেন৷ তারাই সামলায় কাজটা৷
ব্যাবসায় চক্রধরবাবুর চোখ শকুনকেও হার মানায়৷ বরফের কারবারে ইদানীং লাভের হারে সামান্য টান পড়তেই টনক নড়তে সময় লাগেনি৷ কর্মচারীদের হুঁশিয়ারি দিয়েও লাভ হয়নি৷ সবার এক উত্তর, বোশেখের চড়া রোদে বরফ নাকি অনেকটাই গলে যাচ্ছে এখন৷ বলা বাহুল্য, চক্রধরবাবুর বিশ্বাস হয়নি৷ তাই আগে থাকতেই মতলব ফেঁদে রেখেছিলেন৷ আজ ভটভটির তিন কর্মচারী, মানে হরেন, বসন্ত আর গৌর কাজে আসতেই জানিয়ে দিয়েছেন, আজ তিনিও সঙ্গে যাবেন৷ শুনে ওরা তো থ! চক্রধর হালদার শুধু বড়ো ব্যাবসাদার নয়, পঞ্চায়েতের চাঁই৷ মানী মানুষ৷ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসন্ত ঢোঁক গিলে কোনোমতে বলেছিল, 'কত্তা আপনি যাবেন! এই রোদে!'
'খুব যে চিন্তা দেখছি!' গোঁফের ফাঁকে বাঁকা হাসি চক্রধরবাবুর, 'এই চিন্তা যদি বরফের উপর একটু থাকত, তো আমার চিন্তাটা কমত বাপু৷'
সময় নষ্ট না করে এরপর কাজে লেগে পড়েছে ওরা৷ ততক্ষণে কুলির মাথায় বড়ো বড়ো বরফের চাঁই আসতে শুরু করেছে৷ সেগুলোকে দ্রুত মাপমতো টুকরো করে থার্মোকলের বাক্সে ভরে ঢাকনা এঁটে থাকে থাকে সাজিয়ে রাখা খুব সহজ কাজ নয়৷ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করার উপায় নেই৷ তিন কর্মচারীর এই সময় দম ফেলার ফুরসত থাকে না৷ তার উপর আজ সামনে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন খোদ মালিক৷ সমানে মুখ চলছে৷ প্রতি মুহূর্তে তিন কর্মচারীর খুঁত ধরে চলেছেন, 'হেই বসন্ত, তোর দেখছি নড়তেই দিন গড়িয়ে যায়! অমন গদাইলশকরি চাল আমার নৌকোয় চলবে না বাপু৷ অন্য কোথাও দেখ বরং৷ অ্যাই ছোঁড়া-৷'
ছোঁড়া মানে গৌর৷ বয়স মাত্রই বারো বছর৷ অভাবের সংসার সামাল দিতে লেখাপড়া ছেড়ে সামান্য মাইনেয় মাস দেড়েক হল কাজে লেগেছে৷ এখনও তেমন সড়গড় হতে পারেনি৷ বেচারা মালিকের চিৎকারে সিটিয়ে ছিল আগে থেকেই৷ হঠাৎ ধমক খেয়ে বেজায় ঘাবড়ে হাত ফসকে বরফের বড়ো এক চাঁই ধপাস করে ফেলে দিল থার্মোকল এক বাক্সের উপর৷ মুহূর্তে সেটার ঢাকনা ভেঙে চৌচির৷
ব্যস আর যায় কোথা! মেজাজ তো তিরিক্ষি হয়েই ছিল৷ প্রায় ফেটে পড়লেন চক্রধরবাবু৷ গালিগালাজের সঙ্গে চড়চাপড়ও জুটল৷ ছেলেমানুষ গৌর মেনে নিয়েছিল ব্যাপারটা৷ এমন আগেও জুটেছে৷ কিন্তু কৃতকর্মের দরুন মালিক যখন এরপর কাজ থেকেই জবাব দিয়ে দিল, তখন ভয়ে ভয়ে বলে ফেলেছিল, 'মাইনের বাকি টাকাটা তাহলে মিটিয়ে দিন মালিক৷ রেশন তোলা হয়নি৷'
উত্তরে টাকা তো জোটেইনি৷ জুটেছে আরও কয়েক দফা চড়চাপড়৷ ব্যাপারটা পছন্দ না হলেও টু শব্দটি করার সাহস পায়নি হরেন আর বসন্ত৷ হাজার হোক, এ তল্লাটে চক্রধর হালদারের প্রতিপত্তি তো কম নয়৷ মুখের উপর কথা বলে এমন সাহস কার! তাই বরফ বাক্সবন্দি হতে যখন ভটভটি ছাড়ার সময় হল, অন্য এক ব্যাপার খেয়াল হলেও মালিকের মেজাজ দেখে কেউ আর উচ্চবাচ্য করেনি৷ হুকুম হতেই ছেড়ে দিয়েছিল ভটভটি৷
বাসন্তী, গদখালির দিক থেকেও গোটা কয়েক বরফের ভটভটি যায়৷ একদমে গোসাবা পার হয়ে একটু হালকা বোধ করলেন চক্রধরবাবু৷ আসার পথেই দেখে নিয়েছেন, ওদিকের কোনো বরফের ভটভটি তার আগে নেই৷ জোয়ার শুরু হবার আগেই পিরখালি ছাড়িয়ে যেতে পারবে৷ জেলে নৌকোর দেখা মিলবে আর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই৷ বরফ ভটভটির দেখা মিললেই দূরের জেলে নৌকো গামছা নাড়তে শুরু করে দেয়৷ সকাল থেকে সবাই হাপিত্যেশ করে থাকে৷ নৌকো বোঝাই বরফ ঝটপট বিক্রি হয়ে যায়৷ আজই হিসেব মিলিয়ে নিতে পারবে, সত্যিই বরফ গলে জল হয়, না হিসেবে জল মেশানো৷ একটাকে তো ছাঁটিয়েছে৷ তেমন বুঝলে বাকিদেরও বিদেয় করে নতুন কর্মচারী নেবে৷ এই বাজারে ভাত ছড়ালে কর্মচারীর অভাব হয় না৷
মতলব ভাঁজতে ভাঁজতে ফের একটু নড়ে বসলেন চক্রধরবাবু৷ আর তখনই খেয়াল হল, সেই ভোরে সামান্য জলখাবার পেটে পড়লেও হঠাৎ বরফের ট্রাক এসে পড়ায় চা খাওয়া হয়নি৷ তারপর তো হতচ্ছাড়াগুলোর জন্য দম ফেলার ফুরসত মেলেনি৷ মনেও পড়েনি৷ এদিকে শেষ বৈশাখের রোদ ইতিমধ্যেই জানান দিতে শুরু করেছে৷ নৌকোর মাঝে ছাতা মাথায় বসে সেটা ভালোই টের পাচ্ছিলেন৷ নৌকোয় স্টোভের ব্যবস্থা রয়েছে৷ জিবটা একটু চেটে নিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ রে বসন্ত, একটু চা বানা দেখি৷ হতভাগা ছোঁড়াটা আজ সকালটাই মাটি করে দিয়েছে!'
হরেন ওধারে হাল ধরে রয়েছে৷ তার নির্দেশ মতো ইঞ্জিন সামাল দিচ্ছিল বসন্ত৷ মালিকের কথায় ঢোঁক গিলে বলল, 'কত্তা, কেরোসিন ফুরিয়ে গেছে৷ তোলা হয়নি৷'
'শয়তানির জায়গা পাসনি!' রোদের তেজে মেজাজ টং হয়ে ছিলই৷ বাজখাঁই গলায় খেঁকিয়ে উঠলেন চক্রধরবাবু, 'সব কয়টাকে তাড়াব এবার৷ সারাদিনে ঝক্কি, না খাইয়ে মেরে ফেলার তাল করেছিস!'
আসল কথাটা বলাই যেত৷ যেভাবে নৌকো ছাড়ার জন্য সমানে তাগাদা চলছিল, কেরোসিনের কথা বলতে গেলে ফের ধমক খেতে হত৷ তাই খেয়াল থাকলেও কেউ উচ্চবাচ্য করেনি৷ ধমক খেয়ে গুটিয়ে গিয়েছিল বসন্ত৷ ওধার থেকে হরেন বলল, 'একটু সবুর করেন কত্তা৷ রান্নার চ্যালা কাঠ তুলতেই হবে৷ চায়ের ব্যবস্থাও হবে তখন৷'
আশ্বাস পেয়ে চক্রধরবাবু তখনকার মতো থামলেন বটে৷ তবে বেশিক্ষণ নয়৷ গদিতে বসলে চায়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় গলা ভেজানো অভ্যেস৷ কর্মচারীদের ফাঁকিবাজি ধরতে এসে এভাবে ফেঁসে যাবেন, ভাবেননি৷ নৌকো ইতিমধ্যে পিরখালির অনেকটা ভিতরে চলে এসেছে৷ চলছে ছোটো এক খাল ধরে৷ দু-ধারে ঘন জঙ্গল৷ সেদিকে তাকিয়ে ফের তাগাদা লাগালেন, 'কী হল রে তোদের? নেমে গোটা কয়েক চ্যালা কাঠ ভেঙে আন এবার৷'
তাগাদা হতে বসন্ত নীরবে হরেনের দিকে তাকাল৷ আসলে জায়গাটা মোটেই ভালো নয়৷ খালের দু-ধারে কয়েক জায়গায় গাছের ডালে বাঁধা রয়েছে ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, নয়তো তেলচিটে গামছা৷ সুন্দরবনের জঙ্গলে কোথাও বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা পড়লে তার সঙ্গীরা খালের ধারে ওগুলো বেঁধে দেয়৷ অন্যরা তাই দেখে সতর্ক হতে পারে৷ বসন্ত ইশারায় সেটা জানিয়েছিল হরেনকে৷ ব্যাপারটা হরেনেরও নজর এড়ায়নি৷ কিন্তু কী করবে বুঝে উঠতে পারল না৷ সন্দেহ নেই, কিছু বলতে গেলেই জুটবে ধমক৷ তার মধ্যেই ফের চক্রধরবাবুর তাগাদা৷ পেটের খিদেটাও এবার চাগাড় দিতে শুরু করেছে৷
বসন্ত বলল, 'তাহলে এখানেই নৌকো ভেড়াও হরেনদা৷ খানিক দূরে একটা কেওড়া গাছ দেখা যাচ্ছে৷ মনে হয়, শুকনো ডালও আছে৷'
হরেন দ্বিরুক্তি করল না৷ ভরসা একটাই, কাপড়ের টুকরোগুলো মাস খানেকের পুরোনো৷ এতদিন বাদার বড়ো শেয়ালের এখানে না থাকারই কথা৷ বড়ো শেয়াল হল বাঘ৷ বাদার মানুষ বনে ঢুকে কখনো বাঘের নাম নেয় না৷ ওই নামে ডাকে৷
পাড়ে নৌকো ভিড়ল একটু পরেই৷ গেরাপি অর্থাৎ নোঙর ফেলে দেওয়া হতেই সময় নষ্ট না করে নেমে পড়ল দু-জন৷ হরেনের হাতে ধারালো দা৷ বসন্ত বাগিয়ে ধরেছে কুড়ুল৷ দু-চারটে শুকনো ডাল কাটতে দা যথেষ্ট হলেও বাদার জঙ্গলের বিপদে যথেষ্ট নয়৷ বসন্তের হাতে কুড়ুল সেই কারণে৷
জোয়ার শুরু হয়ে গেছে৷ ইতিমধ্যে জল অনেকটাই বেড়েছে৷ সামনে হাত কয়েক কাদা-জমি পার হয়ে জঙ্গলে ঢোকার আগে হরেন ঘাড় ফিরিয়ে বলল, 'একটু হুঁশিয়ার থাকবেন কত্তা৷ আমরা মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে আসছি৷'
উত্তরে 'হুঁ' শব্দে তখন ঘাড় নাড়লেও মিনিট তিনেকের মধ্যে চক্রধরবাবু ভিতরে অন্য একটা ব্যাপার টের পেলেন৷ আবাদে বাড়ি হলেও বাদার এই জঙ্গলে খুব বেশি আসেননি৷ দরকারও পড়েনি৷ নৌকোর ছোঁড়াগুলো গত কয়েকদিন ধরেই ঠকাচ্ছে৷ সেটা টের পেয়ে হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন৷ কিন্তু কাজ হয়নি৷ ঘোড়েল কারবারি মানুষ তিনি৷ দিন শেষে হাতেনাতে প্রমাণ করে দেবেন ব্যাপারটা৷ এতক্ষণ তাই মেজাজেই ছিলেন৷ কিন্তু এখন একা নৌকোয় বসে মালুম পেলেন, ঠিক হয়নি বোধ হয়৷ সরু খালের দু-দিকে ঝিম-ধরা জঙ্গল প্রায় থম মেরে রয়েছে৷ একটা পাখপাখালির আওয়াজ নেই৷ শুধু ছলাৎ ছলাৎ শব্দে জোয়ারের জল আছড়ে পড়ার শব্দ৷ ওদিকে হতচ্ছাড়া ছোঁড়া দুটোরও কোনো সাড়া নেই৷ ঘড়ির দিকে তাকালেন৷ সবে মিনিট পাঁচেক হয়েছে৷ রোদের কারণে ছাতা মেলেই রেখেছিলেন৷ কিন্তু ওটার জন্য চারপাশে নজর রাখতে অসুবিধা হচ্ছিল বলে গুটিয়ে রেখে পাশে বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেলেন কয়েক ঢোঁক৷ ওই সময় বনের ভিতর থেকে ঠক ঠক করে কাঠ কাটার আওয়াজ ভেসে এল৷ তাতে একটু যেন ভরসা পেলেন চক্রধরবাবু৷ যাক, কাছেই আছে ওরা৷ কাঠ যা জোগাড় হয়েছে, দেরি না করে তাই নিয়ে চলে আসতে বলবেন কি না ভাবছেন, নৌকোটা দুলে উঠল হঠাৎ৷
জোয়ারের ঢেউয়ে নৌকো সেই থেকেই দুলছে৷ কিন্তু এটা একেবারেই অন্যরকম৷ সন্দেহ হতে ঘাড় ফেরালেন তিনি৷ যা দেখলেন, তাতে মাথাটা ঘুরে উঠল মুহূর্তে৷ নৌকোর গা ঘেঁষে জলের উপর মস্ত এক বাঘের মাথা৷ থাবা বাড়িয়ে নৌকোয় ওঠার চেষ্টা করছে৷ চোখে চোখ পড়তেই মুলোর মতো একরাশ দাঁত বের করে চাপা গর্জন করে উঠল প্রাণীটা৷
চক্রধরবাবুর যেটুকু সাহস অবশিষ্ট ছিল, ওই দাঁত আর চিলতে গর্জনে ততক্ষণে উবে গেছে৷ চিৎকার করে হরেন আর বসন্তকে ডাকার জন্য মস্ত হাঁ করেছিলেন, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হল না৷ তবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেননি৷ বুঝতে পারছিলেন, বাঘটা নদীর ওপারে ছিল৷ হয়তো আগে থেকেই অনুসরণ করে আসছিল৷ আবাদ অঞ্চলে বাস৷ এমন অনেক ঘটনার কথা শুনেছেন৷ সুযোগ পেয়ে এবার নিঃশব্দে সাঁতরে চলে এসেছে৷
জ্ঞান থাকলে কী হবে, ওই দৃশ্য দেখে চক্রধরবাবুর সারা শরীর ততক্ষণে প্রায় পাথর! ওদিকে বার কয়েক চেষ্টা করেও নৌকোয় উঠতে না পেরে বাঘটা আর সময় নষ্ট করল না৷ সাঁতরে সোজা উঠে পড়ল পাড়ের উপর৷ তারপর গা ঝেড়ে একরাশ জল ছিটিয়ে নৌকো লক্ষ করে লাফ৷
ব্যাপারটা ঘটল ওই সময়৷ চক্রধরবাবুর কপাল জোর বলতে হবে৷ নইলে সুন্দরবনের ধূর্ত নরখাদক বাঘের মুখ থেকে তাঁর বাঁচার কথা নয়৷ নৌকোর সামনে আলাদা করে রাখা ছিল সকালে গৌরের ভেঙে ফেলা সেই থার্মোকলের বাক্স৷ ভাঙা ঢাকনা দড়ি পেঁচিয়ে কোনোমতে বেঁধে ঢাকা দেওয়া হয়েছিল বরফ-ভরতি বাক্সটা৷ আলাদা করে রাখা হয়েছিল সেই কারণেই, যাতে নজরে রাখা আর গোড়াতেই খালি করে ফেলা যায়৷ নৌকোর মাঝে উঁচু করে সাজিয়ে রাখা বরফের বাক্সগুলো এড়িয়ে হিসেব করে লাফ দিয়েছিল বাঘটা৷ কিন্তু সেই হিসেবটাই এক্ষেত্রে বেহিসেব হয়ে গেল৷ লাফ দিয়ে বাঘটা এসে পড়ল ফাঁকায় সেই একটেরে বাক্সের উপর৷ ভাঙা ডালা মুহূর্তে ফর্দাফাই হতেই বাঘের সামনের দুই পা বরফের উপর৷ সুন্দরবনের নরখাদক বাঘের অভিজ্ঞতা কম নয়৷ কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি৷ ঠান্ডা বরফে পা পড়তেই বেজায় ঘাবড়ে চাপা আর্তনাদে পা তুলে মুহূর্তে লাফিয়ে পড়ল খালের জলে৷ তিরবেগে সাঁতরে ওপারে উঠেই লেজ নামিয়ে পড়ি-কি-মরি করে ছুটল জঙ্গলের গভীরে৷
বাঘের সেই চাপা আর্তনাদ সামান্য হলেও ওধারে জঙ্গলের ভিতর হরেন আর বসন্তর কানে গিয়েছিল৷ দেরি না করে তৎক্ষণাৎ ছুটে এল দু-জন৷ নৌকোর মাঝে যথাস্থানে বসে আছেন চক্রধর হালদার৷ শুধু ছাতাটা গুটিয়ে রাখা৷ এছাড়া বরফের বাক্সের সেই ভাঙা ঢাকনাটা লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে৷ খোলা বাক্স থেকে কয়েক টুকরো বরফ ছড়িয়ে পড়েছে৷ চমকে উঠে হরেন চেঁচিয়ে বলল, 'কী, কী হয়েছে কত্তা?'
কিন্তু উত্তর দেবে কে? চক্রধরবাবু তখনও পাথরের মতো স্থির! ঠিকরে বেরোনো চোখ দুটোয় পলক নেই৷ মুখে মস্ত একটা হাঁ৷
প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দু-জন এরপর সমানে ঝাঁকাতে শুরু করল তাঁকে৷ কলসি থেকে সমানে জলের ঝাপটা৷ 'ও কত্তা, কত্তা, কথা বলেন৷ কী হয়েছে?'
বার কয়েক ঝাঁকুনি আর জলের ঝাপটার পরে শরীরটা হঠাৎ নড়ে উঠল চক্রধরবাবুর৷ চোখ বুজে খানিক দম নিয়ে ধরা গলায় বললেন, 'ফিরে চল বাবারা৷ সোনাখালি৷'
শুনে আরও ঘাবড়ে গেল দু-জন৷ বসন্ত বলল, 'হরেনদা, কত্তার হুঁশ ফেরেনি এখনও৷ ভুল বকতে লেগেছে!'
'না রে বাবারা৷ চেতনা ফিরেছে আমার৷' সামান্য নড়ে উঠে চক্রধর হালদার ধরা গলায় জানান দিলেন৷
'সে কী কত্তা!' বেজায় ঘাবড়ে হরেন বলল, 'বাক্স-ভরতি বরফের কী হবে তাহলে?'
'কাল বেচিস বাবা৷'
মালিকের মুখে এমন কথা আশা করেনি কেউ৷ হরেন বলল, 'অদ্দেক বরফ যে গলে যাবে কত্তা!'
'যাক৷ তোরা কিন্তু দেরি করিসনি আর৷'
অগত্যা নোঙর তুলে ফের সোনাখালির দিকে নৌকো ঘোরালো দু-জন৷ ইঞ্জিনে স্টার্ট হতে বড়ো একটা নিশ্বাস ছাড়লেন চক্রধরবাবু৷ সামান্য ঢোঁক গিয়ে বললেন, 'আর একটা কথা বাবারা৷ গৌরকে আজই খবর দিস৷ শুধু কাজে বহাল নয়, ওর মাইনেও কিছু বাড়িয়ে দেব৷ বড়ো ভালো রে ছেলেটা!'
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%