সাধুচরণের সাগর পাড়ি

শিশির বিশ্বাস

কথায় আছে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়৷ সন্দেহ নেই, দোষটা ষোলো আনা সাধুচরণের৷ একেই দুই সিলিন্ডারের ট্রলার, 'বাবা ভোলানাথ' আকারে ছোটো হলেও মালিক হরিপদ মান্নার তেজ কম নয়৷ পার্টির খাতিরে সিন্ডিকেটেও দাপট৷ ট্রলারের ছ-জন কর্মচারী সবসময় তটস্থ হয়ে থাকে৷ পান থেকে চুন খসার জো নেই, তার উপর ভরা ইলিশের মরসুম৷ আকাশে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির বিরাম নেই৷ মাছও ধরা পড়ছে৷ অথচ হরিপদ মান্নার ট্রলারে ইলিশের দেখা নেই৷ বৃষ্টি মাথায় গলদঘর্ম হয়ে আড়াই হাজার হাত মনোফিলের জাল টানাই সার৷ হেঁইয়ো হেঁইয়ো রবে ডেকে জালের পাহাড় জমে যায়, অথচ ইলিশ কুল্যে গোটা কয়েক৷ কপাল খারাপ ছাড়া আর কী? হরিপদ মান্নার ধারণা, সবকিছুর মূলে অপয়া সাধুচরণটা৷ হতভাগা মাছমারা বাড়ির ছেলে, তার কিনা মতলব অন্য কাজে ভেড়ার! মা গঙ্গা সইবে কেন?
ব্যাপারটা অবশ্য মিথ্যে নয়৷ সাধুচরণের বাবা মহাদেব সর্দার হরিপদর ট্রলারেই জাল টানত৷ কাজের মানুষ ছিল৷ ইলিশের এই মরসুমে জল দেখেই টের পেত ইলিশের ঝাঁকের হদিশ৷ তেমন সন্দেহ হলেই বলত, 'হরিপদদা ট্রলার বাঁ-দিকে ঘোরাও দেখি৷ মনে হচ্ছে, বড়ো ঝাঁক৷'
ট্রলারের পিছনে বাঁধা জলের নীচে তখন মস্ত মোজার মতো টানা জাল৷ মহাদেব সর্দারের নির্দেশ হলেই ট্রলার ঘুরত সেই দিকে৷ অনুমানে ভুল হত কালেভদ্রে৷ কয়েক দিনেই ট্রলার ভরে উঠত মাছে৷ একবার তো জালে এত বড়ো এক ঝাঁক আটকেছিল, মাছের টানে বেহাল ট্রলার গোত্তা খেয়ে ডোবার উপক্রম৷ উপায় না দেখে আড়াই হাজার হাত মনোফিলের জালের দড়ি দায়ের কোপে কেটেই দিতে হয়েছিল৷ আর সামান্য দেরি হলে সবসুদ্ধু ডুবে মরতে হত৷ নতুন কেনা জাল৷ যাকে বলে, মাথায় বাড়ি৷ কিন্তু তেমন কষ্ট হয়নি৷ হরিপদ এখনও কাউকে পেলে রীতিমতো গর্ব করেই শোনায় সেই গল্প৷ সেই মহাদেব সর্দার হঠাৎ মারা যেতে কম কষ্ট পায়নি হরিপদ নিজেও৷ সংসারের হাল দেখে নিজেই যেচে কাজ দিয়েছিল ছেলে সাধুচরণকে৷ কিন্তু অমন গুণী বাপের ছেলে যে এমন হতভাগা, কে জানত! ধীরে ধীরে সাধুচরণের অনেক কথাই কানে এসেছে৷ তবু বাপ মহাদেবের কথা ভেবেই বিদেয় করেনি৷ আর একটা কারণও আছে৷ প্রকাশ্যে হরিপদ মান্না সেটা স্বীকার করেনি কখনো৷ ভাঙেওনি কারও কাছে৷ কিন্তু আজ যা হল, জেটিতে ফিরে সোজা ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বিদেয় করে দেবে৷ যেখানে পারিস, করে খেগে যা৷ হরিপদর ঠেকে আর ঠাঁই নেই৷
ব্যাপারটা সাধুচরণও বুঝে ফেলেছে ইতিমধ্যে৷ সত্যি, ভয়ানক ভুল হয়ে গেছে গত রাতে৷ বেঁচে থাকতে বাবা অনেক বলেছিল৷ কিন্তু মাছমারা বাড়ির ছেলে সাধুচরণ তখন গরজ করেনি৷ আসলে এসব কাজ মোটেই পছন্দ হয়নি ওর৷ ওর আগে তিনটে বোন৷ বাড়িতে আদর তাই একটু বেশিই ছিল৷ বাবা কখনো জোর করেনি৷ বরং ছেলেকে গাঁয়ের স্কুলে ভরতি করে দিয়েছিলেন৷ পৈতৃক কাজে মন নেই যখন, যদি লেখাপড়াটা শিখতে পারে৷ কিন্তু তাতেও সাধুচরণের মন লাগেনি৷ স্কুল ফাঁকি দিয়ে পড়ে থাকত পাশের গাঁয়ে জুড়োন জ্যাঠার কামারশালায়৷ কাজটা বেজায় পছন্দ হয়েছিল৷ হ্যাঁ, একটা কাজের মতো কাজ বটে! এক টুকরো লোহা পিটিয়ে কী না গড়া যায়! দা, কুড়ুল, হেঁশো৷ শুধু একটু মাথা খাটাও৷ তারপর ওই পান খাওয়ানো! দেখলে মনে হয় বেজায় সহজ৷ আগুনে পুড়িয়ে টকটকে লাল হলেই দু-বার ঠুকে নুনজলে ছ্যাঁৎ করে ফেলে দাও৷ কিন্তু আদতে তো তা নয়৷ অনেক হিসেব আছে৷ তবেই না মামুলি কাঁচা লোহায় তৈরি কুড়ুল বা দায়ের ফলা হয়ে উঠবে খাঁটি ইস্পাত৷ অসাবধানে গজালের উপর কোপ পড়লে গজাল দু-টুকরো হয়ে যাবে, দায়ের ফলার কিচ্ছু হবে না৷ কাজটা বড়ো ভালো পারত কামার জ্যাঠা৷ দূর থেকেও মানুষ ছুটে আসত তার ঠেকে৷ জ্যাঠা গর্ব করে বলত, 'হুঁ-হুঁ বাবা, কামারের কেরামতি তো ওইখানে! শেখা অত সহজ নয় বাপু৷'
আসলে কামার জ্যাঠার কাছে মনের ইচ্ছেটা একদিন বলেই ফেলেছিল সাধুচরণ৷ স্কুল ফাঁকি দিয়ে দু-বেলা কামারশালায় হাপর টানা, ফাইফরমাশ খাটলে কী হবে, শেখায়নি বুড়ো৷ তাতে বরং জেদ চেপে গিয়েছিল৷ হাপর টানার ফাঁকে হাঁ করে কাজ দেখত৷ কিছু শিখেও ফেলেছিল৷ স্বপ্ন দেখত, গাঁয়ে নিজেই একটা কামারশালা দেবে৷ দেখিয়ে দেবে, সাধুচরণের হাতের কাজেও জাদু আছে৷ বিশ গাঁয়ের মানুষ কাজ নিয়ে ছুটে আসবে ওর কাছে৷ কিন্তু তার আগেই দু-দিনের জ্বরে বাবা হঠাৎ মারা যেতেই সব গোলমাল হয়ে গেল৷ বাড়িতে পেট তো কম নয়৷ ওর আগে তিন বোন৷ বিয়ের বয়স হয়েছে৷ মা অকূল পাথারে৷ অগত্যা হরিপদ জ্যাঠার ট্রলারে এই কাজ৷
দু-বেলা গালমন্দ খেলেও টিকে ছিল এতদিন৷ কিন্তু এবার যে বিদেয় নিতেই হবে, বুঝতে বাকি নেই৷ গত কাল সারা দিন জাল টানাই সার হয়েছে৷ মাছ পড়েনি৷ হরিপদ মান্নার মেজাজ ভালো থাকার কথা নয়৷ সন্ধ্যে রাতে শেষবার জাল টানার পরে সাধুচরণের উপর হুকুম হয়েছিল, ট্রলার নোঙর করার৷ এমন কিছু কঠিন কাজ নয়৷ কিন্তু সাধুচরণ হিসেব ঠিক রাখতে পারেনি৷ তখন ভাটার টান চলছে৷ নোঙরের আড়াইশো হাত কাছির প্রায় বারো আনা নেমে যাওয়ার পরে যখন মাটি পাওয়া গেল, গেরো মেরে দিয়েছিল৷ ভাটার কথা মাথাতেই আসেনি৷ উচিত ছিল, কাছি আরও হাত পনেরো বাড়তি রেখে গেরো দেওয়া৷ তাতেই সর্বনাশ হয়েছে৷
দিনভর খাটুনির পরে এক সানকি করে নুন-পান্তা পেটে দিয়ে সবাই মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল এরপর৷ এদিকে যে সর্বনাশ হয়ে গেছে, জানতেই পারেনি কেউ৷ শেষ রাতে ব্যাপারটা নজরে পড়ে খোদ হরিপদ মান্নার৷ ততক্ষণে সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে৷ নোঙরের কাছি বাড়তি না রাখায় জোয়ারে জল বাড়তেই কাছিতে টান পড়ে নোঙর উপড়ে স্রোতের টানে ভেসে গেছে ট্রলার৷ তারপর ভাটায় ফের জল নামতে সাগরের মাঝে কোথাও আটকে গেছে৷
হরিপদর হাউমাউ চিৎকারে জেগে উঠে বাকি সবার মাথায় হাত৷ গভীর সমুদ্রে যেসব ট্রলার মাছ ধরতে যায় তাদের কাছে এর চাইতে ভয়ানক আর কিছু হয় না৷ ট্রলার ফের নোঙর হয়ে রয়েছে বটে, তবে জোরালো স্রোতে কত দূর ভেসে এসেছে অন্ধকারে বোঝার উপায় নেই! বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে পড়লে ট্রলার তো যাবেই, খুলনার জেলে ক-বছর ঘানি টানতে হবে ঠিক নেই৷ তারপর ডাকাতের উপদ্রব৷ বাঁচার উপায় একটাই, আলো ফোটার আগে সরে পড়া৷ কিন্তু বর্ষার আকাশে ঘন মেঘ৷ একটা তারার দেখা নেই যে দিক ঠিক করা যায়৷ অগত্যা দিনের আলো না ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় কিছু নেই৷
আজ আর শুধু হরিপদ নয়, গালমন্দ জুটল সঙ্গীদের কাছ থেকেও৷ সত্যি কথা বলতে কী, ট্রলারের কাজে এসব ভুলের ক্ষমা নেই৷ সারাটা সময় গুম হয়ে রইল সাধুচরণ৷ ট্রলারসুদ্ধ সবার ঘণ্টা দুয়েক প্রায় দম বন্ধ করে কাটল৷ তারপর একটু একটু করে পুব আকাশ ফরসা হল সামান্য৷ আকাশে মেঘ অল্প হালকা হতে পুব আকাশে বড়ো শুকতারা জ্বলজ্বল করে উঠল৷ অভিজ্ঞ হরিপদ মান্না চারপাশে খানিক চোখ বুলিয়ে কিছুটা যেন ভরসা পেল৷ নাহ, ট্রলার সম্ভবত বাংলাদেশের দিকে ভেসে আসেনি৷ হরেক স্রোতের টানাপোড়েনে চলে এসেছে আরও দক্ষিণে, দূর সাগরে৷ ততক্ষণে আলো আরও কিছু ফরসা হয়েছে৷ তাড়াতাড়ি নোঙর তুলে ইঞ্জিন চালু করতে বলবে, হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল একজন, 'সর্বনাশ হয়েছে হরিপদদা! ডাকাত!'
মুহূর্তে ট্রলারের বাকি সবাই ঘাড় ফেরাল সেদিকে৷ অন্ধকারে এতক্ষণ ঠাওর করা যায়নি, অল্প দূরে নোঙর করে রয়েছে বড়ো এক বিদেশি ট্রলার৷ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া থেকে এসব ট্রলার এদিকে মাছ ধরতে আসে৷ হামেশাই ঢুকে পড়ে দেশের জল সীমানার ভিতর৷ কেউ টিকিও ছুঁতে পারে না৷ মাছ ধরার জন্য বিশাল আয়োজন থাকে ওদের৷ স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো ছবি দেখে বুঝে নিতে পারে, জলের তলায় কাছাকাছি কোথায় মাছের বড়ো ঝাঁক রয়েছে৷ সেই হিসেবে জাল ফেলে৷ এছাড়া সঙ্গে উর্দিধারী ক্রু, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, রাইফেল হাতে গার্ড৷ প্রতিবাদ দূরে থাক, এসব ট্রলার দেখলে হরিপদদা সরে পড়ে মুহূর্তে৷ ধারেকাছে মাড়ায় না৷ অসাবধানে ধাক্কা লেগে ওদের পলকা দেশি ট্রলার ডুবে যেতে পারে যেকোনো সময়ে৷ শুধু তাই নয়, ভয়ানক হেনস্তাও হতে হয় কখনো৷ কিন্তু এক্ষেত্রে ওদের ভয়ের কারণ অন্য৷ অত্যাধুনিক এসব ট্রলারে জোরালো আলোর ব্যবস্থা থাকে৷ জ্বলে রাতভর৷ কিন্তু এতে তা নেই৷ অন্ধকারে আলো নিভিয়ে নোঙর করে রয়েছে৷ তাই সন্দেহ অমূলক নয়৷ ডাকাতের লঞ্চ হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা৷
ব্যাপার দেখে সবার তখন হতবুদ্ধি অবস্থা৷ এমনকী হরিপদ, এসব ব্যাপারে যার মাথা বরাবরই সাফ, তাকিয়ে আছে হাঁ করে৷ মুখে কথা নেই৷ পাশ থেকে একজন বলল, 'হরিপদদা, এখনও সময় আছে বোধ হয়৷ ইঞ্জিনে ফুল স্পিড দিয়ে একবার চেষ্টা করা যায়৷'
কিন্তু হরিপদর তরফ থেকে সাড়া এল না৷ অভিজ্ঞ মানুষ৷ বেশ জানে, সেই চেষ্টা বাতুলতা মাত্র৷ বরং অন্য কিছু মনে হচ্ছিল ওর৷ ধারাল চোখে আধো অন্ধকারেও দেখে নিয়েছে, ট্রলারে থাইল্যান্ডের ফ্ল্যাগ৷ সিন্ডিকেটের অফিসে যাওয়া-আসার কারণে এসব বিদেশি ট্রলারের কিছু খোঁজখবর জানা আছে৷ অন্তত পঞ্চাশ ফুট লম্বা ট্রলার৷ কম করেও সাড়ে চারশো হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিন৷ এতবড়ো ট্রলার, আর যাই হোক, ডাকাত নয় হয়তো৷ ইতিমধ্যে ডেকের উপর উর্দিপরা জনা কয়েক ক্রু দেখা যাচ্ছে৷ হাত নেড়ে ডাকছে ওদের৷ বড়ো একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, 'তেমন মনে হচ্ছে না রে৷ মনে হয়, কোনো বিপদে পড়েছে ওরা৷ দেখছিস না, হাত নেড়ে ডাকছে৷'
'তা ডাকুক হরিপদদা৷ এখন সরে পড়াই মঙ্গল৷ কী মতলব কে জানে৷ ধরা পড়লে প্রাণটাই যাবে হয়তো৷' কয়েকজন মত প্রকাশ করল৷
'তা হতেও পারে৷' হরিপদ ঘাড় নাড়ল৷ 'হতচ্ছাড়া সাধু যে সর্বনাশটা করেছে, ধরে নে, চলেই গেছে প্রাণটা৷ নতুন আর কী ক্ষতি হবে! বরং দেখাই যাক৷ নোঙর তুলে ইঞ্জিন চালু কর বরং৷'
খোদ মালিকের ইচ্ছে৷ অনিচ্ছা সত্ত্বেও নোঙর তুলে চালু করতে হল ট্রলার৷ এগিয়ে চলল সেই বিদেশি জলযানের দিকে৷
ইতিমধ্যে লাল টিপের মতো পুব আকাশে সূর্য উঁকি মারতে ভালোই ফরসা হয়েছে চারপাশ৷ তারই মধ্যে হরিপদ মান্নার ট্রলার যখন সেই বিদেশি জলযানের কাছে এসে দাঁড়াল, রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে সেখানে৷ ডেকের উপর উর্দিপরা জনা আষ্টেক মানুষ৷ তাদের একজনের পোশাক দেখেই বোঝা যায়, ক্যাপ্টেন৷ ওরা কাছে আসতেই ইংরেজিতে তিনি চিৎকার করে কী বলতে লাগলেন৷ সে কথার বিন্দু বিসর্গও কেউ বুঝতে পারল না৷ তবে অভিজ্ঞ হরিপদ কিছুটা যেন অনুমান করতে পারল৷ মাথা আর হাত নাড়িয়ে বলল, 'হোয়াট সার? কী হয়েছে?'
হরিপদর সেই ইংরেজি-বাংলা মেশানো উত্তরে বিদেশি ট্রলারের ক্যাপ্টেন অবশ্য বুঝে ফেললেন, ইংরেজিতে হবে না৷ অগত্যা হাত-পা নেড়ে ইশারায় বোঝাতে শুরু করলেন ব্যাপারটা৷ সেই সাথে দু-একটা ইংরেজি শব্দ৷ মিনিট কয়েক প্রাণান্ত পরিশ্রমের পরে ক্যাপ্টেন যখন থামলেন, তখন শুধু হরিপদ নয়, অন্যরাও কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে৷ গত দু-দিন ধরে ইঞ্জিন খারাপ হয়ে বিদেশি ট্রলারটা দাঁড়িয়ে আছে এখানে৷ একই কারণে জেনারেটরও বন্ধ৷ ব্যাটারি চার্জ করা যাচ্ছে না৷ এদিকে ট্রলারের ইঞ্জিনিয়ার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী৷ সব মিলিয়ে ভয়ানক বিপদে পড়ে সাহায্য চাইছে ওদের৷
এই অবস্থায় কী সাহায্য ওদের করবে, কেউ যখন বুঝে উঠতে পারছে না৷ বিদেশি ট্রলারের ক্যাপ্টেন হঠাৎ বললেন, 'স্যার, হ্যাভ ইউ এনি ইঞ্জিনিয়ার?'
ক্যাপ্টেনের সেই কথা গোড়ায় বুঝতে পারেনি হরিপদ৷ অগত্যা সামান্য চোখ নাচাল৷ বুঝতে পেরে ক্যাপ্টেন পাশে এক ক্রুকে কিছু নির্দেশ দিতে সে ছুটে ডেকের নীচে চলে গেল৷ একটু পরেই টুলস, যন্ত্রপাতি বোঝাই বড়ো এক বাক্স এনে হাজির করতে ক্যাপ্টেন ভিতর থেকে গোটা কয়েক স্ক্র ড্রাইভার, প্লায়ার বের করে দেখাতে ঘাড় নাড়ল হরিপদ৷ পাশে একজন জিজ্ঞাসা করল, 'কী বলছে হরিপদদা?'
'বলছে, আমাদের সঙ্গে কোনো ইঞ্জিনিয়ার আছে কি না৷ তাকে দিয়ে ওদের ইঞ্জিন মেরামত করাবে৷'
শুনে বাকিরা হাসবে কি কাঁদবে, যখন বুঝে উঠতে পারছে না, হরিপদ হঠাৎ বলল, 'ইয়েস৷ হ্যাঁ স্যার৷'
'থ্যাঙ্ক গড!' প্রায় যেন হাঁফ ছাড়লেন ক্যাপ্টেন৷ 'প্লিজ, সেন্ড হিম টু আওয়ার ট্রলার৷ উই পে ফর ইট৷'
ক্যাপ্টেনের কথা বুঝতে না পারলেও হরিপদ ততক্ষণে ব্যাপারটা অনুমান করে ফেলেছে৷ পাশে সাধুচরণের পিঠে হাত রেখে বলল, 'সাহেবদের ট্রলারে চলে যা সাধু৷ ইঞ্জিনটা মেরামত করে দিয়ে আয়৷ দেখতেই পাচ্ছিস, বড্ড বিপদে পড়েছেন ওনারা৷'
'আ-আমি!' হরিপদ মান্নার কথায় সাধুচরণ প্রায় খাবি খেল৷ 'আ-আমি মেরামতের কী জানি কাকা!'
'খুব জানিস৷ সেবার আমার বাবা ভোলানাথের ইঞ্জিন খারাপ হলে মেরামত করে দিসনি?'
তেমন ব্যাপার একটা হয়েছিল বটে৷ মাছ ধরতে বেরিয়ে সেবার হঠাৎই খারাপ হয়ে গিয়েছিল বাবা ভোলানাথের ইঞ্জিন৷ এসব খুচখাচ সমস্যা হরিপদ নিজের হাতেই মেরামত করে৷ কিন্তু সেবার আর কুলোয়নি৷ সাধুচরণ পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল৷ ফস করে বলল, 'কাকা আমাকে একটু দেখতে দেবে৷ চেষ্টা করে দেখি৷'
অন্য সময় হলে হয়তো ধমকে ভাগিয়ে দিত হরিপদ৷ কিন্তু মাঝ সমুদ্রে তখন সেই উপায় ছিল না৷ তার উপর লক্ষ করেছে, জাল টানার থেকে ছোঁড়ার এসব দিকে আগ্রহ বেশি৷ প্রায়ই ইঞ্জিনের কাছে এসে তাকিয়ে থাকে৷ কলকবজা বোঝার চেষ্টা করে৷ তাই আর দ্বিরুক্তি করেনি৷ সাধুচরণের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল কাজটা৷ আশ্চর্য, সময় লাগলেও সাধুচরণ দিব্যি সারিয়ে ফেলেছিল ইঞ্জিন৷ সেকথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সাধুচরণ৷ হরিপদর কথায় মনে পড়ে গেল৷ কিন্তু সে ছিল দুই সিলিন্ডারের ছোটো এক ইঞ্জিন৷ আর এটা! ভয়ে ভয়ে বলল, 'কাকা, এটা কত সিলিন্ডারের ইঞ্জিন;'
'তার আমি কী জানি!' ঠোঁট ওলটাল হরিপদ৷ 'তবে চার সিলিন্ডারের কম তো নয়৷ উঠে দেখ না আগে হতভাগা৷'
'তাহলে তুমিও সঙ্গে চলো কাকা৷ বড্ড ভয় করতেচে৷'
থাই ট্রলারের ইঞ্জিনঘরে সব দেখে সাধুচরণের তো চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়! বিশাল ইঞ্জিন৷ হরিপদকাকা চার সিলিন্ডার বলেছিল৷ আসলে আরও বেশি, পুরো ছয় সিলিন্ডারের৷ সব মিলিয়ে এলাহি ব্যবস্থা৷ ও হাঁ করে দেখছে৷ ট্রলারের ক্যাপ্টেন ভয় ভয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, 'প্লিজ স্যার৷ ডু সামথিং৷'
খালি গায়ে গামছা পরা সাধুচরণ বিরক্ত হয়ে খিঁচিয়ে উঠল, 'আগে এট্টু বুঝতি দাও রে বাপু৷'
আসলে সেই ঝাঁ চকচকে ইঞ্জিনঘরে বিশাল যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে সাধুচরণের মাথায় তখন পোকা নড়তে শুরু করেছে৷ হ্যাঁ, মেরামত করতে হলে এমন ইঞ্জিন! কাজ করেও সুখ৷
সাধুচরণের সেই ধমকে ক্যাপ্টেন কী বুঝলেন কে জানে৷ তবে এরপর আর টু শব্দটি করেননি তিনি৷ আর সাধুচরণ? থাই ট্রলারের জনা কয়েক ক্রু নিয়ে সেই যে কাজে লেগে পড়েছিল, মুখ তোলার সময় পায়নি৷ দফায় দফায় চা-স্ন্যাক্স এসেছে৷ রকমারি লাঞ্চ৷ কিছুই মুখে তোলেনি৷ কেমন যেন নেশার মতো পেয়ে বসেছিল ওকে৷ হাতে হরেকরকম স্ক্র ড্রাইভার আর স্প্যানার নিয়ে ইঞ্জিনের এক-একটা অংশ বেমালুম খুলে ফেলেছে৷ একটুও বুক কাঁপেনি৷ সন্দেহ হলে স্পেয়ার পার্টস খুঁজে বদলে দিয়ে জুড়ে দিয়েছে নিখুঁত ভাবে৷ তারপর হাত দিয়েছে অন্য অংশে৷
সময় লাগল৷ সেই ভোরে ভালো করে আলো ফোটার আগেই কাজ শুরু করেছিল সাধুচরণ৷ যখন শেষ করল, সন্ধ্যে নেমে এসেছে৷ ব্যাটারি ডাউন হয়ে রয়েছে৷ তাই হ্যান্ডেল মারতে হল৷ দু-বার ঘোরাতেই গরগর করে চলতে শুরু করল থাই ট্রলারের ইঞ্জিন৷ দেখে খুশিতে হইহই করে উঠল সবাই৷ হুঁশ ফিরল সাধুচরণেরও৷ মাথা সামান্য ঝাঁকিয়ে নিয়ে হাঁক পাড়ল, 'এক খাবলা গুড় দিয়ে আমার পান্তাটা এবার আনো তো কাকা৷ খিদেয় জ্বলে যাচ্ছে পেট৷ একদম টের পাইনি গো!'
প্রাপ্তিযোগ যে ভালোই ঘটবে, বুঝতে বাকি থাকেনি অভিজ্ঞ হরিপদ মান্নার৷ কার্যক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না৷ খুশি হয়ে থাই ট্রলারের ক্যাপ্টেন ফিস হোল্ড (মাছ রাখার ঠান্ডা ঘর) খুলে কয়েক কুইন্টাল ইলিশ তুলে দিলেন বাবা ভোলানাথে৷ সেই সাথে ক্যান বোঝাই ভালোমন্দ খাবার৷ পরিবর্তে একটাই অনুরোধ ছিল থাই ক্যাপ্টেনের৷ ওরা দেরি না করে দেশে ফিশিং পোর্টে ফিরে যাবে এবার৷ ইঞ্জিন চেকআপ হবে সেখানে৷ অনেকটা পথ৷ ফের সমস্যা হলে বিপদ৷ তাই সাধুচরণকে সঙ্গে রাখতে চায়৷ পোর্টে পৌঁছেই প্লেনে ফেরার ব্যবস্থা করে দেবে৷ থাই বাট (থাইল্যান্ডের মুদ্রা) নয়, উপযুক্ত পারিশ্রমিক ডলারেই দেওয়া হবে তাকে৷ বড়ো জোর এক সপ্তাহের ব্যাপার৷
ব্যাপারটা হরিপদর হাতে ছিল না৷ কিন্তু প্রস্তাব শুনে সাধুচরণ নিজেই এক কথায় রাজি হয়ে গেল৷ হরিপদ তবু বলেছিল, 'ভালো করে ভেবে দেখ সাধু৷ বিদেশবিভুঁই৷'
উত্তরে সাধুচরণ বলেছিল, 'তা ঠিক কাকা৷ তবে সুযোগ যখন এয়েচে, সাগরটা একবার পাড়ি দিয়েই আসি৷ তিনটে বোনেরই বিয়ে দিতে হবে৷ টাকাটাও দরকার৷ তুমি মাকে একটু বুঝিয়ে বোলো৷'
এক সপ্তাহ নয়৷ সাধুচরণ ফিরল প্রায় মাস ছয়েক পরে৷ আসলে সেই থাই ফিশিং কোম্পানি সাধুচরণকে আর ছাড়েনি৷ মোটা মাইনের চাকরি দিয়েছে৷ সেই খবর জানিয়ে বাড়িতে নিয়মিত মোটা টাকাও পাঠিয়েছে সাধুচরণ৷ তবে খুশি হলেও ওর বিধবা মা ছেলেকে দেখার জন্য ক্রমে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন৷
সেদিন হরিপদ মান্না বাড়িতেই৷ সামনে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় ঝাঁ চকচকে এক গাড়ি এসে থামল৷ উর্দিধারী সোফার নেমে পিছনের দরজা খুলে দিতে কোট-প্যান্ট আর টাই পরা যে মানুষটি নামল, গোড়ায় তাকে চিনতেই পারেনি হরিপদ৷ হাঁ করে তাকিয়ে আছে৷ কোট-প্যান্ট পরা মানুষটি এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে৷ 'কাকা, কোম্পানি আমাকে টেরেনিং-এর জন্য আমেরিকা পাঠাচ্চে৷ আরও আগেই পাঠাত৷ ঘোড়ার ডিম ইংরিজিটা কিছুতেই আর সড়গড় হচ্ছিল না৷ কোম্পানির বাবুরা তাই দেরি কত্তেছিল৷ তা একদিন সাফ জানিয়ে দিলাম, আমার কাজ তো বাপু যন্ত্রপাতি, কলকবজা নিয়ে৷ ঘোড়ার ডিম ইংরিজির দরকারটা কী? না পোষায় তো ছেড়ে দে বাপু৷ ঢের কোম্পানি হাঁ করে আচে সাধুচরণের জন্য৷ সেই হুমকির পরে বাবুরা আর দেরি করেনি৷ এদিকে পাসফুট-ভিসা নিয়েও নাকি ঝামেলা রয়েছে৷ তা সে কোম্পানির ব্যাপার৷ ওরাই বুঝবে৷ দমদমে পেলেন থেকে নেমেই তাই বাড়ি যাবার আগে ছুটে এলাম তোমার কাছে৷ সেদিন ওই ভরসাটুকু না জোগালে-৷'
'আরে না রে বাপু৷' সাধুচরণের কথার মাঝে মুখ কাঁচুমাচু করে হরিপদ মান্না বলল, 'আজ সত্যি কথাই বলি তোকে৷ সুযোগ আসতে সেদিন দাঁও লাগিয়ে দিয়েছিলাম রে৷ মনে হয়েছিল, লেগেও যেতে পারে৷ তোকে তো কোনোদিন বলিনি, বাবা ভোলানাথের ইঞ্জিন সেই যে তুই মেরামত করে দিয়েছিলি, খুব ভরসা হয়নি আমার৷ জেটিতে ফিরে ভালো মিস্ত্রি দেখিয়েছিলাম৷ তোর কাজ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল সে৷ জানতে চাইছিল, কাকে দিয়ে করিয়েছি৷ বেশ বুঝতে পারছি, থাই ট্রলার দেশে ফিরে যাকে দিয়ে ইঞ্জিন পরীক্ষা করিয়েছে, তিনিও ওই একই কথা বলেছেন৷ অথচ তোর ভুলের জন্য সেদিন যা নয় তাই বলে গালি দিয়েছি৷ হয়তো কাজ থেকে ছাড়িয়েও দিতাম৷ আসলে ব্যাপার কী জানিস, এ দেশে গুণের কদর নেই৷ তাই তো মহাদেবদার মতো গুণী মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়৷ তুই কিন্তু বাবা অনেক দূর পৌঁছোবি৷ পাড়ি দিবি অনেক সাগর৷'
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%