হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অনিন্দ্যদের গাড়ি বাঁক নিতেই চোখে পড়ল পেল্লাই বাড়িটা। সামনে একটা বিরাট তোরণ ! আর সেটা অতিক্রম করলেই বেশ অনেকটা ফাঁকা জমির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় থামওয়ালা পুরানো দিনের সেই বাড়ি। যেটা চোখে পড়া মাত্রই পল্লব বলল, ‘দ্যাখ, এবার বিশ্বাস হচ্ছে তো? স্কুল, কলেজে পড়ার সময় যখন আমি বলতাম, আমার সোনামাসি জমিদার বাড়ির বউ, মেসোমশাই বর্ধমানের এক জায়গার জমিদার ছিলেন, তখন তো কত আওয়াজ দিতিস। তোরণের মাথায় ওই যে ঘরের মতো জায়গা দেখছিস, ও জায়গাতে বসে নহবত বাজানো হতো। সোনামাসির বিয়ের সময় টানা সাতদিন নহবত বেজেছিল।’
অনিন্দ্য গাড়িটা সেই নহবত তোরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে পল্লবের লেগ পুল করার জন্য বলল, “তুই টানা সাতদিন ধরে সেই বাজনা শুনেছিলি?”
খোঁচাটা গায়ে না মেখে পল্লব বলল, “না, আমি তখন জন্মাইনি। বড়মাসি, মানে সোনামাসির তেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, আর আমার মেসোমশাইকেও চোখে দেখিনি । আমার ঠিক মতো জ্ঞান হবার আগেই তিনি মারা যান।’
এ কথা বলে একটু হেসে সে বলল, “তবে এই সোনামাসির জন্যেই দাদুর সংসারটা ভেসে যায়নি। দাদু তো ছিলেন সেই যুগে ভূমি-রাজস্ব বিভাগের সামান্য কেরানি। কত আর বেতন ছিল তাঁর? দাদুর চার মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ের খরচ, এই সোনামাসি অর্থাৎ, মেসোমশাই দিয়েছিলেন।”
নহবত তোরণের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে বাড়ির পোর্টিকোতে গাড়ি থামাল অনিন্দ্য। বেশ কয়েকবার হর্ন বাজিয়ে গাড়ি থেকে নেমে কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড থামওয়ালা বারান্দায় ওঠার সময় অনিন্দ্য খেয়াল করল, কিছুটা তফাতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ধুলোমাখা একটা ঘোড়ার গাড়ি। যা জানান দিচ্ছে সত্যিই এ বাড়ির একদিন বৈভব ছিল।
গাড়ির হর্নের শব্দ শুনেই মনে হয় বারান্দার একটা দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা। চোখে চশমা, পরনে সাদা থান, মাথার চুলও সব সাদা। তাঁর উন্মুক্ত কাঁধ আর হাতের চামড়ার রং-এখনও ধবধবে ফরসা। এক ঝলক তাঁকে দেখলেই মনে হয়, তাঁর মধ্যে একটা বনেদী ভাব আছে। বৃদ্ধাকে দেখেই তাঁর দিকে এগিয়ে গেল পল্লব। আর তার পিছনে অনিন্দ্যও। পল্লব বৃদ্ধাকে ধপ করে প্রণাম করে বলল, “চলে এলাম সোনামাসি। এখানে এক বিয়েবাড়িতে কাল এসেছিলাম। ভাবলাম ফেরার পথে তোমার এখানে ঘুরে যাই। মা-ও সে কথা বলে দিয়েছিল। এ আমার ছোটবেলার বন্ধু অনিন্দ্য। ব্যাঙ্কে চাকরি করে। ওর গাড়িতেই এলাম।”
অনিন্দ্যও মাথা ঝুঁকিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল তাঁকে। তিনি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বললেন, ‘বেঁচে থাকো বাবা।'
এরপর তিনি তাদের নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢোকার আগে অনিন্দ্যর নতুন কেনা ঝকঝকে সাদা গাড়িটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে পল্লবকে বললেন, “বুঝলি বাবা, একবার সে সময় আমার একটা মোটর গাড়ির শখ হয়েছিল। তোর মেসোশাইকে সে কথা বলতেই তিনি বলেছিলেন, জমিদার গিন্নিরা মোটর গাড়িতে চড়ে না, ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে। ওটাই তাদের আভিজাত্য। আর তার ক'দিনের মধ্যে তিনি আস্ত একটা ঘোড়ার গাড়ি কিনিয়ে আনিয়েছিলেন আমার জন্য। লোকটা আমাকে বড় ভালোবাসতেন কিনা!'
বৃদ্ধার সঙ্গে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল তারা। কয়েকটা ঘর পেরিয়ে অনিন্দ্যরা বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করল। শান বাঁধানো প্রাঙ্গণের শেষ প্রান্তে একটা নাট মন্দির মতো দেখা যাচ্ছে। বারান্দা দিয়ে অনিন্দ্যদের নিয়ে একটা ঘরে ঢুকলেন বৃদ্ধা। চক মেশানো পাথরের মেঝেতে রাখা পুরানো আমলের সোফাসেট। সারা দেওয়াল জুড়ে চারপাশে টাঙানো আছে পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র। কয়েকটা ডাল ভেঙে গেলেও মাথার ওপর একটা ঝাড়বাতি এখনও ঝুলছে সে ঘরের সিলিং থেকে। সে ঘরেই অনিন্দ্যদের নিয়ে বসলেন বৃদ্ধা।
বসার পর সোনামাসি বললেন, ‘এই ভর দুপুরে তোদের খাবারের কী ব্যবস্থা করি বল তো? রান্নার লোকটাও বিকালের আগে আসবে না। একটা সময় ছিল যখন এ বাড়ির রান্না ঘরে আগুন কখনও নিভত না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পাত পড়ত এ বাড়িতে। তবে তোরা যখন এসেছিস তখন কিন্তু রাতে থেকে যেতে হবে। তোর মেসোমশাই বলতেন কেউ বাড়িতে এলে তাকে অন্তত এক বেলা না খাইয়ে ছাড়লে গৃহস্থের অকল্যাণ হয়। মালতী ফিরলে দেখি কী ব্যবস্থা করা যায় ?
পল্লব বলল, ‘সে নয় আজকের দিনটা থাকব। কিন্তু আমাদের দুপুরের খাওয়া নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমরা খেয়ে এসেছি।
এরপর বৃদ্ধা কিছুক্ষণ ধরে পল্লবের কাছ থেকে তার পরিবারের নানা খবরাখবর নেবার পর অনিন্দ্যকে প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কোথায় থাকো বাবা? তোমাদের দেশ কোথায়?'
অনিন্দ্য বলল, “আমি বর্তমানে থাকি দক্ষিণ কলকাতায়। আমার জন্ম এদেশে। তবে বাবা, ঠাকুর্দা দেশ বিভাগের সময় ওপার বাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এসে প্রথমে ঠাই নিয়েছিলেন রানাঘাটের এক কলোনিতে।'
অনিন্দ্যর কথা শুনে বৃদ্ধা যেন নাক সিটকিয়ে বললেন, ‘ও কলোনি। জানো, এ বাড়ির ছাদে দাঁড়ালে চারপাশে যত জমি জিরেত চোখে পড়ে, তা এক সময় পল্লবের মেসোমশাইয়েরই ছিল। তারপর একসময় সরকার অপারেশন বর্গা, কী একটা করল, আমাদের সব জমি ছোটলোকদের হাতে চলে গেল! যারা আমাদের জমিতে মুনিষ খাটত তারাই তখন জমির মালিক হয়ে বসল ।
বৃদ্ধার বলা ‘ছোটলোক' শব্দটা খট করে কানে লাগল অনিন্দ্যর। অনিন্দ্য তার বাবার মুখে গল্প শুনেছে, ওপার বাংলা থেকে যখন বাস্তুচ্যুত হয়ে তার ঠাকুর্দা প্রথম এদেশে আসেন, তখন সংসার চালাবার জন্য তাঁকেও নাকি লোকের জমিতে কাজ করতে হয়েছিল।
বৃদ্ধা এরপর মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সে একদিন ছিল! কত লোকজন, জমি জিরেত, উৎসব, রাজবাড়ির মতো গমগম করত এ বাড়ি। আর আমি এখন একলা এ বাড়িতে পড়ে আছি।'
পল্লব সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “আমরা তো তোমাকে বারবার কলকাতায় আমাদের কাছে থাকতে বলেছি।”
সোনামাসি বললেন, ‘তা কী হয় বাবা! এ বাড়িতে তোর মেসোমশাইয়ের কত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। মানুষটা যে আমাকে চোখে হারাতেন। আমার সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য ছিল আঠারো বছরের। কিন্তু যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন একদিনের জন্যও কাছছাড়া করেননি। সে কারণে বিয়ের পর তাঁকে ছেড়ে কোনোদিন আমি একদিনের জন্যও বাপের বাড়ি যাইনি। তিরাশি বছর বয়স হল। সত্তর বছর এ বাড়িতে কাটালাম। আর কোথাও যাবার মন নেই।'
এ কথা বলে কয়েক মুহূর্ত থামলেন বৃদ্ধা। তারপর অনিন্দ্যদের পিছনের দিকের দেওয়ালে আঙুল তুলে দেখিয়ে তাকে বললেন, ‘পল্লবের মেসোমশাইয়ের সব জিনিস আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। যেমন ওই চাবুকটাও । ওটাকে নামিয়ে এখনও মাঝে মাঝে আমি তেল মাখিয়ে রোদে দিই, তিনি যেমন দিতেন।'
বৃদ্ধার কথা শুনে অনিন্দ্য ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, দেওয়ালের গায়ে একটা কালো হিলহিলে সাপের মতো দেখতে চামড়ার চাবুক ঝুলছে। আর তার মুখের কাছে একটা কোনো ধাতুর টুকরো বাঁধা। যেটা দেখে অনিন্দ্য মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, “উনি কি সত্যি চাবুক চালাতেন?”
সোনামাসি ঠোটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, কখনও কখনও চালাতেন। শরীরে জমিদারের রক্ত ছিল তো! কথায় বলত, যে জমিদারের জুড়ি গাড়ি আর চাবুক নেই, সে জমিদারই নয়। অবাধ্য প্রজাদের শিক্ষা দিতে, কখনও বিবাদ বিসংবাদ মেটাতে যৌবনে ওই চাবুক ব্যবহার করতেন তিনি। সবাই ওই চাবুকটাকে খুব ভয় পেত। দু-বার ওই চাবুক চালাবার দরকার হতো না। একবার চাবুক চালালেই ওই সিসার টুকরোর আঘাতে পিঠ লম্বাভাবে চিরে যেত। সে দাগ কোনোদিন মিলাত না। তবে তিনি বিনা কারণে প্রজাদের চাবুক চালাতেন না ।'
বৃদ্ধা তাঁর স্বামীর সম্পর্কে যাই বলুন না কেন, তাঁর কথা শুনে আর চাবুকটা দেখে অনিন্দ্যর মনে মুহূর্তের জন্য যেন ভেসে উঠল সিনেমার পর্দা বা বইয়ের পাতায় দেখা কোনো অত্যাচারী ভূস্বামীর ছবি! গরিব অসহায় প্রজার হাত বেঁধে তার পিঠে চাবুক চালাচ্ছে জমিদার !
সোনামাসি এরপর পল্লবের সঙ্গে কিছু পারিবারিক কথা জিজ্ঞাসাবাদের পর বললেন, “চলো এবার, তোমাদের থাকার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। বিকাল হলে, রোদের তেজ কমলে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাব। তাঁর সঙ্গে উঠে গিয়ে কাছেই একটা ঘরে ঢুকল অনিন্দ্যরা। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা আছে বিরাট বড় খাট, যাকে আসলে পালঙ্ক বলে। কাঠের জলচৌকিতে পা রেখে উঠতে হয় সেই উঁচু পালঙ্কে। তার ওপর প্রায় ছয় ইঞ্চি পুরু গদি। এছাড়া একটা বিরাট বড় বেলজিয়াম কাচের আয়না, কাঠের কারুকাজ করা চেয়ার-টেবিল রয়েছে সেই ঘরে। বৃদ্ধা তাঁর ঘর দেখিয়ে চলে যাবার পর দরজা বন্ধ করে তারা দু'জন খাটে উঠতেই তাদের অর্ধেক শরীর ডুবে গেল গদিতে। পল্লব উল্লসিতভাবে বলল, ‘একদিন কমপ্লিট রেস্ট নেওয়া যাবে আরাম করে। হুইস্কির বোতল, গ্লাস, জল, সব ব্যাগে আছে। সন্ধ্যা হলেই বসে যাব।'
বিকাল পাঁচটা নাগাদ দরজাতে টোকা দেবার শব্দ শুনে অনিন্দ্য দেখল, একটা বউ চা-বিস্কুট নিয়ে দাঁড়িয়ে । তাকে দেখে অনিন্দ্যরা অনুমান করল, সম্ভবত সে মালতী নামের পরিচারিকাই হবে। চা-বিস্কুট খেয়ে ঘরের বাইরে বেরোতেই তারা দেখতে পেল সোনামাসি দাঁড়িয়ে সম্ভবত তাদের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তারা দু'জন সামনে যেতেই তিনি অনিন্দ্যকে বললেন, ‘চলো এবার বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাই। এত বড় বাড়ি দেখার, এমন বাড়িতে থাকার সৌভাগ্য তো সবার হয় না। এ দেশে অনেকেই হয়তো আজ নানাভাবে পয়সা, গাড়ি-বাড়ি করেছে। কিন্তু খোঁজ নিলে হয়তো এক সময় দেখা যাবে তাদের পূর্বপুরুষ রিফিউজি ছিল। আসলে বনেদিয়ানার ব্যাপারটাই আলাদা। যা ছিল পল্লবের মেসোমশাইয়ের রক্তে।'
সোনামাসির এ কথাটা শুনে অনিন্দ্যর কেন জানি মনে হয়, তাঁর এ কথার মধ্যে যেন অনিন্দ্যর প্রতি একটা খোঁচা আছে। যেন তিনি ইঙ্গিতে তাকে বলতে চাইছেন, তোমরা যতই গাড়ি, বাড়ি করো না কেন, আভিজাত্যে আমাদের সমতুল্য নও।
বৃদ্ধার পিছন পিছন বিশাল বাড়িটার ভিতর নানা জায়গাতে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল অনিন্দ্য এবং পল্লব। কোনোটা নাচ ঘর, যেখানে এক সময় বেনারসী বাইজির নাচ দেখতেন পল্লবের মেসোমশাই আর তাঁর পূর্বপুরুষ জমিদাররা। কোনো ঘর আবার ছিল জমিদারদের ইয়ার দোস্তদের নিয়ে আড্ডাখানা, আবার কোনো ঘর হয়তো-বা জমিদারদের শ্বেতপাথরের টেবিল বসানো ভোজন কক্ষ ছিল। ঘরগুলোর অধিকাংশই মার্বেল পাথরে মোড়া। বয়সের ভারে মার্বেল পাথরের মেঝেতে চিড় ধরলেও তা বনেদিয়ানা, আভিজাত্যের সাক্ষী দিচ্ছে। ঘরগুলো দেখাতে দেখাতে বৃদ্ধা খালি অনিন্দ্যদের বলে যেতে থাকলেন চৌধুরি বংশের গরিমার কথা আর পল্লবের মেসোমশাই তাকে কত ভালোবাসতেন, সে কথা। যেমন, একটা ঘরে প্রায় একটা দেওয়াল জোড়া কাঠের কারুকাজ করা ফ্রেমে বসানো বেলজিয়াম কাচের আয়না দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এমন আয়না নিশ্চয়ই আগে দেখোনি? খাঁটি বিদেশি জিনিস। আমার সাজবার জন্য তিনি ষাটবছর আগে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলেন। তোমাদের বউদের এমন আয়নাতে মুখ দেখার সৌভাগ্য হবে না। এ ঘরের সব আসবাবই সেগুন কাঠের। ঘরটা আমার খুব প্রিয়। আমি মাঝেমাঝেই এ ঘরে বসে পল্লবের মেসোমশাইয়ের কথা ভাবি।
অনিন্দ্য, বৃদ্ধার কথাগুলোর মধ্যে একটা কথা বারবার খেয়াল করতে লাগল। তার বলা কথাগুলোর মধ্যে সবসময় যেন একটা খোঁচা বা অবজ্ঞার ভাব থাকছে অনিন্দ্যর প্রতি। এই যেমন আয়নাটা দেখাবার সময় বললেন, তাঁর মতো এমন আয়নাতে মুখ দেখার সৌভাগ্য অনিন্দ্যর মতো লোকের বউদের হবে না ।
এঘর-ওঘর তাদেরকে দেখাবার পর তিনি তাদের নিয়ে উপস্থিত হলেন প্রাঙ্গণের শেষ প্রান্তে মন্দিরের সামনে। একটা উঁচু বেদির ওপর দাঁড়িয়ে মন্দিরটা। কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে সেখানে উঠতে হয়। তার নিচে দাঁড়িয়ে সোনামাসি বললেন, ‘এ মন্দিরে তিনশো বছরের প্রাচীন অষ্ট ধাতুর তৈরি চণ্ডী মূর্তি আছে। জমিদার বংশের কুলদেবী। এক সময় আমার উনি মোষ বলি দিতেন এখানে।’
নিচ থেকে গর্ভগৃহর বিগ্রহটা দেখা যাচ্ছে না। সেটা দেখার জন্য কৌতূহলী হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছিল অনিন্দ্য আর পল্লব। ঠিক সেই মুহূর্তে অনিন্দ্যর উদ্দেশে বৃদ্ধা প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা জাতে কী? ব্রাহ্মণ, না অন্য জাতের ?”
অনিন্দ্য জবাব দিল, 'কায়স্থ।'
বৃদ্ধা বললেন, ‘তবে পল্লব ওপরে যাক। তুমি নিচে থাকো। ব্রাহ্মণ ছাড়া ওপরে ওঠার নিয়ম নেই।'
তাঁর কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল অনিন্দ্য। বেশ অবাক হয়ে গেল সে। অনিন্দ্য থামতেই, পল্লবও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সোনামাসি এবার তার উদ্দেশে বললেন, ‘বুঝলি পলু, তোর মেসোমশাই পারিবারিক নিয়ম নীতিকে খুব মর্যাদা দিতেন। বনেদি ঐতিহ্য জেনে পারিবারিক নিয়ম ভাঙাকে কোনোদিনই বরদাস্ত করতেন না। আমিও তাই তাঁর নিয়ম মেনে চলি। একবার আমাদের ঘোড়ার গাড়ির সদগোপ দারোয়ান নিয়ম জানা থাকলেও ওপরে উঠে পড়েছিল। মেসোমশাই জানতে পেরে চাবুকের এক ঘা বসিয়েছিলেন তার পিঠে। তোমাদের বলছিলাম না, ও চাবুকের বাড়ি একবার খেলে তার দাগ সারাজীবন থাকে। আমরা যখন তাঁর গাড়িতে উঠতাম তখন তার ঘামে ভেজা গায়ে লেপটে থাকা ফতুয়ার ভিতর দিয়ে কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত দাগটা স্পষ্ট চোখে পড়ত। আজ যদি আমার উনি বেঁচে থাকতেন, কেউ এ মন্দিরের নিয়ম ভাঙলে তিনি একই কাণ্ড করতেন।'
এবার তাঁর কথা শুনে মুখে কিছু না বললেও অনিন্দ্য স্পষ্ট অপমানিত বোধ করল।
বৃদ্ধা যা বলছেন, তার অর্থ হল, অনিন্দ্য যদি মন্দিরে উঠত আর মেসোমশাই যদি বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি তাকে চাবকাতেন। আর সেটা তিনি ঠিক কাজই করতেন পারিবারিক অনুশাসন রক্ষার্থে।
অনিন্দ্য মন্দিরে উঠতে পারল না দেখে পল্লবও আর ওপরে উঠল না। বাড়িটা ঘুরে দেখা শেষ হয়ে গেছিল, তাই তারা নিজেদের ঘরে ফিরে এল। তবে অনিন্দ্যর মনের অপমান বোধকে আরও জাগিয়ে তোলার জন্য তখনও একটা ঘটনা বাকি ছিল, যেটা ঘটল রাতে খাবার টেবিলে।
সন্ধ্যাবেলা ঘরে ঢুকে মদ্যপান করতে বসেছিল অনিন্দ্য আর পল্লব। কেন জানি বৃদ্ধার কথার খোঁচাগুলো অনিন্দ্য চেষ্টা করেও ভুলতে পারছিল না। একটা তীব্র অপমানবোধ যেন তার মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছিল। রাত আটটা নাগাদ রাতের খাবারের জন্য ডাক এল তাদের। খাবার ঘরে শ্বেত পাথরের একটা টেবিলে খেতে বসল তারা। পোর্সিলিনের ফিনফিনে পাতলা ডিনার সেটে ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, মিষ্টি। সামনে দাঁড়িয়ে মালতী আর সোনামাসি। খাওয়া শুরু করার পর অনিন্দ্য একটা বাটি তুলতে যেতেই হঠাৎ প্লেটের সঙ্গে বাটিটা ঠোক্কর খাওয়াতে মৃদু টং করে শব্দ হল। আর সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধা বলে উঠলেন, ‘একটু সাবধানে খাও। তোমার তো এ জিনিসে খাওয়ার অভ্যাস নেই। অনেক দামি জিনিস, খাঁটি পোর্সিলিনের তৈরি। ভাঙলে আর পাওয়া যাবে না। পল্লবের মেসোমশাই আমার জন্মদিনে এই ডিনার সেট উপহার দিয়েছিলেন।'
অন্য কোনো জায়গা হলে হয়তো অনিন্দ্য তখনই খাবার ফেলে উঠে পড়ত। কিন্তু পাছে পল্লব মনে আঘাত পায়, তাই সে কিছু না বলে কোনোরকমে খাওয়া সারলো। অনিন্দ্যর মুখ গম্ভীর দেখে ব্যাপারটা আঁচ করে ঘরে ফেরার পর পল্লব বলল, 'কিছু মনে করিস না ভাই। বুড়ি মানুষ, একলা থাকে। ঠিকভাবে কথা বলতে ভুলে গেছে।'
অনিন্দ্যর মনের মধ্যে তখন তীব্র অপমানবোধ পাঁক খাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবেই বাড়িতে আসার মুহূর্ত থেকেই তাকে অপমান করে গেছেন বৃদ্ধ। কখনও গাড়ি নিয়ে, কখনও আয়না নিয়ে, কখনও তার জাত নিয়ে, আর শেষ পর্যন্ত পোর্সিলিনের প্লেট নিয়ে। পল্লবের কথা শুনে শোবার আগে অনিন্দ্য শুধু তাকে বলল, “কাল ভোরবেলাই রওনা দেব। চা, রাস্তাতেই খাব।'
পরদিন সকালে অনিন্দ্যর যখন ঘুম ভাঙল তার আগেই উঠে বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে আছে পল্লব। আসলে মাঝ রাত পর্যন্ত অপমান বোধ কুরে কুরে খাচ্ছিল তাকে। তাই ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হল তার। সেই অপমানিত ভাব ঘুম ভাঙার পরও রয়েছে তার মধ্যে ঘুম ভাঙার পর পল্লব তাকে বলল, 'চটপট তৈরি হয়ে নে। সোনামাসিকে বলে এলাম, আমরা বেরোচ্ছি। মালতী সদর দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে।' তার কথা শুনে অনিন্দ্যর মনে হল, পল্লবও যেন চায় না যে অনিন্দ্য আর সোনামাসির মুখোমুখি হোক ।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ল তারা। কিন্তু সদর দরজাতে পৌঁছাতেই অনিন্দ্য, পল্লবকে বলল, ‘এই নে চাবি, তুই গাড়িতে গিয়ে বোস। আমি চিরুনিটা ঘরে ফেলে এলাম। সেটা নিয়ে আসি। এ কথা বলে পল্লবের হাতে গাড়ির চাবি দিয়ে সে আবার বাড়ির ভিতর দিকে ঢুকল। না, আসলে চিরুনি আনতে নয়, অনিন্দ্য গত রাতেই ভেবে রেখেছিল, সে একটা কথা বলে যাবে বৃদ্ধাকে। নইলে তার মন শান্ত হবে না। না, সে অপমানের প্রতিশোধ নিতে কোনো কটু কথা বলবে না বৃদ্ধাকে। সে সব তার রুচিতে বাঁধবে। সে ভেবে রেখেছে, সে শুধু তাঁকে বলবে, “মানুষের পরিশ্রম লব্ধ অর্থ কিন্তু বংশানুক্রমে পাওয়া বৈভব, সম্মান, জাতের চেয়েও অনেক বেশি দামি।'
বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে একটু খুঁজতেই সেই বিরাট আয়না লাগানো ঘরের চৌকাঠে বৃদ্ধাকে দেখতে পেয়ে অনিন্দ্য তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখ পড়ল ঘরের ভিতরের আয়নাটার দিকে। তার ভিতর দিয়ে পুরোটা ঘর আর দরজার সামনে দাঁড়ানো তাদের দুজনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই আয়নার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল অনিন্দ্য। অবশ্য এরপরই তার খেয়াল হল, বৃদ্ধা উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন তার দিকে। যে কথাটা সে পল্লবের সোনামাসিকে বলতে এসেছিল, সেটা আর তাঁকে বলতে পারল না অনিন্দ্য। বৃদ্ধার উদ্দেশে সে শুধু বলল, ‘চলে যাবার আগে দেখা করে গেলাম। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন এই কামনা করি।' এরপর বাড়ি ছেড়ে সোজা গাড়িতে গিয়ে বসল অনিন্দ্য।
সেই নহবত তোরণ অতিক্রম করে গাড়ি নিয়ে এগোতে এগোতে পল্লব বলল, ‘সোনামাসির জন্য খুব খরাপ লাগে বুঝলি। সেই যে এ বাড়িতে এসে ঢুকেছিলেন আর কোনোদিন বাপের বাড়ি ফিরলেন না। ভবিষ্যতেও ফিরবেন বলে মনে হল না । মেসোমশাইয়ের স্মৃতি নিয়ে একলা রয়ে গেলেন এ বাড়িতে।'
পল্লবের কথা শুনে অনিন্দ্যও বলল, ‘আমারও খুব খারাপ লাগছে ওনার কথা ভেবে।' না, পল্লবের মন রাখার জন্য অনিন্দ্য কথাটা বলল না তাকে। সত্যিই বৃদ্ধার ওপর তার এখন আর কোনো রাগ, ক্ষোভ নেই। বরং তাঁর প্রতি করুণার উদ্রেক হচ্ছে অনিন্দ্যর মনে। তবে তার কারণটা পল্লবকে সে জানাবে না। মুহূর্তের জন্য অনিন্দ্যর চোখে ভেসে উঠল একটা দৃশ্য। বিরাট বেলজিয়াম কাচের আয়না দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাঁর উন্মুক্ত ফরসা পিঠটা। যে পিঠের মধ্যে লম্বালম্বিভাবে কোমর পর্যন্ত জেগে আছে একটা কাটা দাগ! চাবুকের দাগ! যে দাগ কোনোদিন মুছবে না। সে দাগ লোকাবার জন্যই হয়তো তার এত আভিজাত্যের গল্প! স্বামীর ভালোবাসার গল্প! সে আভিজাত্যের দাগ লোকাবার জন্যই হয়তো সোনামাসিদের আর কোনোদিন বাইরের পৃথিবীতে ফেরা হয় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন