হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বাইরে বেরবার আগে ঘরের ছিটেবেড়ার দেওয়ালের গায়ে টাঙানো ছোট্ট আয়নাটাতে চড়াই পাখির মতো দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে মুখটা দেখে নিচ্ছিল মালতী। প্রসাধন বলতে তার তেমন কিছু নেই, পোশাক বলতেও অতসীদিদির দেওয়া একটা পুরোনো চুড়িদার। বাচ্চা হবার পর বেশ একটু মুটিয়ে গেছে দিদি। তাই সে তার ওই পুরোনো জিনিসটা দিয়ে দিয়েছে তাকে। ফেরিওয়ালার থেকে কেনা এই ছোট্ট আয়নাতে শুধু মুখটাই দেখা যায় কোনোভাবে, মালতী শুধু দেখার চেষ্টা করল তার টেনে বাঁধা চুলটা আর কপালের মাঝখানে বসানো টিপটা ঠিক বসানো হয়েছে কি না। এটুকু তো দেখতেই হয়, সব মেয়েই দেখে। মালতীও দেখল তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে তাকাল চৌকিটার দিকে। দরজার টিনের আগলটা খোলা। সেখান দিয়ে সকালের আলো এসে পড়েছে চৌকিটার ওপর। ভোলার মুখের ওপর। ঘুমাচ্ছে ভোলা। তার পায়ের কাছে বসে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে মালতীর শাশুড়ি—ভোলার ঠাকুমা। সারাদিন সেই তাকে দেখভাল করে ঠিক যেমন ঋজুকে আগলে রাখে মালতী। ভোলার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মালতী একবার মুহূর্তের জন্য ভাবল যে সে আজ আর অতসীদিদির বাড়ি যাবে না। গতকালই তো দুশো টাকার হিসাবে সপ্তাহের চোদ্দোশো টাকা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে দিদি। আজ গেলে হয়তো দুশো টাকা পাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু কাল থেকে মালতীর কাজ নেই। আয়া সেন্টার থেকে অতসীদিদির বাড়িতে বাচ্চা দেখার কাজ পেয়েছিল মালতী। সে আয়া সেন্টার এখন উঠে গেছে। নতুন কোনো একটা সংস্থা থেকে নাকি এবার অন্য কেউ এসে দায়িত্ব নেবে ঋজুর। তারা ‘আয়া’ নয় ‘গভর্নেস'। ঋজু এবার বড় হবে। তার জন্য মালতীর মতো হায়ার সেকেন্ডারি পাশ আয়ার থেকে প্রশিক্ষিত গভর্নেসের বেশি প্রয়োজন। এ কথাটাই তাকে বলেছে অতসীদিদি। সে একবারও ভাবল না মালতীর কথা। কাজটা গেলে তার কী হবে? তারও তো ঘরে ছোট বাচ্চা আছে। ভোলার জন্মের পরই তার বাবা তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে ঘর বেঁধেছে অন্য মেয়ের সঙ্গে। ভোলা আর তার ঠাকুমার দায়িত্ব মালতীরই কাঁধে। বুড়ি আগে একটা বাড়িতে ঠিকে ঝি-এর কাজ করত। এখন আর পারে না বয়সের কারণে। বাইরে বেরোতে পারে না সে, কিন্তু দিদির বাড়ি যাবে না ভেবেও হঠাৎ ঋজুর মুখটা ভেসে উঠল মালতীর চোখে। ভোলার থেকে চার মাসের ছোট সে। আট মাস বয়স। নার্সিংহোম থেকে আসার ক-দিন পর থেকেই ঋজুকে দেখভাল করেছে সে। এমনকী ঋজুর তিন মাস বয়সে অতসীদিদি যখন চাকরিতে আবার জয়েন করল তখন মা-কে না পেয়ে দুপুরবেলা যখন বাচ্চাটা ছটফট করত, গোলা দুধ খেতে চাইত না তখন মালতী নিজের বুকও দিয়েছে ঋজুকে। রাতে এসে মালতী যখন ভোলাকে নিয়ে শুত তখন দুধের খোঁজে তার এ-বুক ও-বুক করত ভোলা। এক বছর তার বয়স হয়ে গেল কিন্তু মুখ দিয়ে এখনও একটা শব্দ করতে পারে না ভোলা। সে কোনোদিন তাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারবে কি না তা জানা নেই মালতীর। ভোলা পেটে থাকার সময় বর একবার তাকে লাথি মেরেছিল হয়তো-বা সে জন্যই কিছু হয়েছে তার ঋজুকে বুকের দুধ দেবার কথা অবশ্য দিদিকে কোনোদিন জানায়নি মালতী। দিদি আর দাদাবাবু দু'জনেই সরকারি অফিসার। অত বড় মানুষের ছেলে আয়ার দুধ খেয়েছে শুনলে হয়তো আগেই কাজটা যেত। ভোলার দিকে তাকিয়ে মালতী মুহূর্তর জন্য দিদির বাড়িতে যাবে না ভাবলেও অতসীদিদির বাচ্চাটার মুখ ভেসে উঠতেই মালতী ভেবে নিল, না, সে আজ যাবে। এতটা দিন সে দিদির বাচ্চাটাকে তো নিজের সন্তানের মতোই মানুষ করেছে। সত্যি কথা বলতে ভোলার থেকে অনেক বেশি সে নিজেকে দিয়েছে ঋজুকে। এ সবই কি ওই দুশো টাকার জন্যই? দিদি তো সকাল আটটায় বেরিয়ে রাত আটটায় ফেরে। এ সময়টাতে মালতীই তো ছিল তার মা। হয়তো আজকের পর আর কোনো দিন মালতীর দেখা হবে না ঋজুর সঙ্গে। প্রায় জন্ম থেকে শিশুটার সঙ্গে মালতীর সম্পর্ক শেষ হতে চলেছে আজকেই
বেড়ার দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে সাতটা বেজে গেছে। আটটার মধ্যেই দিদির বাড়ি পৌঁছতে হবে মালতীকে। নইলে দিদি অফিসে বেরোতে পারবে না। দিদির বর মানে মালতী যাঁকে দাদা বলে সে চাকরি করে অন্য জায়গাতে দু'সপ্তাহ পর দু'দিনের জন্য বাড়ি এসে চলে যায়। মালতী ঠিক সময় না পৌঁছলে অতসীদিদি ঘর ছাড়বে কীভাবে? টেবিলের ওপর থেকে তার কাপড়ের ব্যাগটা তুলে নিল মালতী। ওতে একটা নাইটি, একটা টিফিন বক্সে গত রাতে রাঁধা ভাত-তরকারি আর টুকিটাকি কিছু জিনিস আছে। ঘুমন্ত ভোলার দিকে শেষ একবার তাকিয়ে নিয়ে তার টালির ছাউনি আর ছিটেবেড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এল মালতী। তাদের দত্তাবাদের বস্তি থেকে কয়েক পা এগোলেই বড় রাস্তা, অটো স্ট্যান্ড। ঘর থেকে বেরিয়ে সে পৌঁছে গেল বড় রাস্তায়। চলতি একটা অটো পেয়ে তাতে চেপে বসল মালতী। অটো এগোল বাগুইহাটির দিকে। ঘুম ভাঙছে শহরের। ট্রেন-বাস ধরার জন্য মানুষ বেরিয়ে পড়েছে। এই রুটে হয়তোবা এই শেষ যাওয়া মালতীর। পরদিন থেকে তাকে আর এপথে আসতে হবে না যদি না কোনো নতুন কাজের সন্ধান মেলে এদিকে। চলন্ত অটোয় বসে তার খালি মনে হতে লাগল ঋজুর কথা। যে গভর্নেস আসবে সে কি মালতীর মতোই হবে? দুধ দেবে ঋজুকে? সেকি মালতী যেমন ঋজুকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসে তেমনই ভালোবাসবে? এসব কথা ভাবতে ভাবতে একসময় নির্দিষ্ট স্টপেজে পৌঁছে গেল মালতী। বড় রাস্তায় নেমে, মালতী ব্যাগ কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে এগোল অতসীদিদির বাড়ির রাস্তায়।
মালতী যখন দিদির বাড়িতে পা রাখল তখন পৌনে আটটা বাজে। প্রতিদিনের মতোই মালতী সোজা গিয়ে ঢুকল বাচ্চাটার ঘরে। তাকে দেখেই অতসীদিদি বলল, ‘এসে গেছ, বাঃ, আমি তোমাকে এখনই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তুমি আজ আসবে কি না?'
মালতী হেসে বলল, ‘কেন, আসব না কেন?'
অতসীদিদি তার কথার কোনো জবাব দিল না। জবাব না দেবার কারণটা অবশ্য অনুমান করল মালতী। মাসের টাকা দিদি মিটিয়ে দিয়েছে। তাকে যে এদিনের পর থেকে আসতে হবে না সেটাও জানিয়ে দিয়েছে। তাই হয়তো দিদি ভেবেছিল মালতীকে আর একদিনের জন্য আসতে বললেও সে হয়তো আর আসবে না। মালতী সত্যি হয়তো আজ আর আসত না যদি না এই বাচ্চাটার জন্য তার মন কেমন করত। তার মনে একটা চাপা ক্ষোভ তো আছেই। এতদিন ধরে এভাবে সে বাচ্চাটাকে আগলে রাখল, আর হঠাৎ তাকে আর আসতে হবে না বলে দিল দিদি।
অফিসে বেরোবার জন্য অতসীদিদি তৈরি হয়েই ছিল। বাইরে বেরোবার আগে মালতীর মতোই একবার নিজেকে দেখে নেবার জন্য আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল দিদি। তবে সে বিরাট আয়না অবশ্য, মালতীর বাড়ির ছিটেবেড়ার গায়ে ঝোলানো এক টুকরো কাচ নয়, একটা আয়না। প্রায় সারা ঘরের ছবি ধরা পড়ে তাতে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এপাশ-ওপাশ ঘুরে তার শাড়িটা পরা ঠিক হয়েছে নাকি একবার দেখে নিল অতসীদিদি। চিরুনিটাও একবার ছুঁইয়ে নিল মাথার সামনের দিকে। তারপর লেদারের দামি ব্যাগটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিল অফিসে বেরোবার জন্য। ঠিক সেই সময় খাটে শোয়া ঋজু অস্পষ্ট শব্দ করে কেঁদে উঠল। উঠে বসার চেষ্টা করছে সে। অতসীদিদি তার দিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘কাঁদে না সোনা কাঁদে না। তোমার জন্যই তো চাকরি করতে যাচ্ছি। তোমাকে পড়াতে হবে, মানুষ করতে হবে। কত টাকা-পয়সা লাগবে। সে জন্যই তো যাচ্ছি সোনা।'
মালতী সঙ্গে সঙ্গে খাটের কাছে গিয়ে বলল, “কাঁদছ কেন ঋজুবাবু, এই তো আমি এসে গেছি...।'
বাচ্চাটা এবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল মালতীর দিকে। কান্না বন্ধ হয়ে গেল তার। ধীরে ধীরে ঠোটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল। শিশুর সরল হাসি।
মালতীর মনে হল অতসীদিদির মুখটা মুহূর্তর জন্য যেন একবার থমথমে হয়ে গেল, কিন্তু তার পরক্ষণেই সে ঋজুর দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বাচ্চাটার উদ্দেশে একটা চুমু ছুঁড়ে দিয়ে ঘরের বাইরে এগোবার জন্য পা বাড়াল। তাকে অনুসরণ করল মালতী। বাড়ি ছেড়ে বেরোবার সময় অতসীদিদি বলল, ‘আজ ফিরতে বেশি দেরি হবে না। বিকাল নাগাদই ফিরে যাব। কাল থেকে যে ঋজুকে দেখবে সে আজ সন্ধ্যাবেলায় একবার আসবে। এ সময়টুকু তুমি....!'
কথাটা শেষ না করে অতসীদিদি রাস্তায় নেমে পড়ল। মালতী দরজা বন্ধ করে আবার বাচ্চাটার ঘরে ফিরে এল। বিছানায় শুয়ে গোল গোল চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে ছোট্ট শিশুটা। সে কি তার মাকে খুঁজছে? ব্যাগ থেকে নাইটিটা বের করে চুড়িদার ছেড়ে সেটা পরতে পরতে মালতীর মনে পড়ে গেল বাচ্চাটাকে বলে যাওয়া অতসীদিদির শেষ, কথাগুলো। দিদি সকালবেলা বেরোবার সময় ঋজু ঘুম ভেঙে উঠে কাঁদলেই তার উদ্দেশে কথাগুলো প্রায়ই বলে দিদি, ‘তোমাকে বড় করার জন্যই তো চাকরি করতে যাচ্ছি সোনা ।'
মালতী এক এক সময় মনে মনে ভাবে, সত্যিই কি তাকে বড় করার জন্য চাকরি করতে যায় দিদি। একটা বাচ্চাকে বড় করার জন্য কত টাকা লাগে? দিদি তো আর মালতী নয় যে কাজে না বেরোলে ছেলের খাবার জুটবে না। দাদাবাবুও তো কত বড় চাকরি করে। অনেক পরিবারেই তো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজন চাকরি করে। তাদের ছেলেমেয়েরা কি মানুষ হয় না? বড় হয় না? মালতী একবার একদিন মুখ ফসকে কথাটা বলেও ফেলেছিল অতসীদিদিকে। ঋজু তখন আরও অনেক ছোট। মাস চারেক বয়স হবে তার । মালতী দিদিকে বলেছিল, ‘এতটুকু বাচ্চাকে ফেলে অফিস যেতে তোমার কষ্ট হয় না দিদি!' আমার তো ভোলাকে ছেড়ে আসতে বুকটা কেমন টনটন করে। নেহাত না এলে পেটের ভাত জুটবে না তাই আসি। ভোলার যদি বাবা থাকত, সে আমাদের দুটো ডাল ভাত খাওয়াতো তবে ভোলাকে ছেড়ে কিছুতেই থাকতাম না আমি।”
মালতীর কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে গেছিল অতসীদিদি। তারপর গম্ভীরভাবে বলেছিল, ‘এসব তুমি বুঝবে না। আমি কত বড় চাকরি করি। অফিসে কত দায়িত্ব। ইচ্ছা থাকলেই কি ঘরে বসে থাকা যায়?’
তাহলে কি অতসীদিদি বাচ্চাটাকে যা বলে যায় তা নিছকই কথার কথা? চাকরির দায়িত্ব, নাকি সন্তানের দায়িত্ব কোন দায়িত্বটা বড় দায়িত্ব তা জানা নেই মালতীর। তার শুধু মনে হয় চাকরিটা হয়তো না করলেও চলত দিদির। পোশাক পালটাতে পালটাতে আজও একবার সে কথাটা ভাবল। এই তো কাল থেকেই নতুন লোক আসবে ঋজুকে দেখবার জন্য। সে যদি মালতীর মতো বাচ্চাটাকে নিজের মতো করে না দেখে মালতী বা অতসীদিদি, কাউকেই তো পাবে না শিশুটা। তখন? পোশাক পালটে ঋজুকে বিছানা থেকে কোলে তুলে নিল মালতী। খোলা জানলা দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে ঋজুর মুখে। আ-উ, নানা দুর্বোধ্য শব্দ করে মালতীর কোলে হাত-পা নেড়ে আনন্দ প্রকাশ শুরু করল বাচ্চাটা। এক এক সময় ঋজু আর ভোলার মুখটা একই রকম মনে হয় মালতীর। একটাই শুধু পার্থক্য তাদের মধ্যে। মালতীর কোলে ঋজুর মতো ভোলাও হাত-পা ছোঁড়ে ঠিকই, কিন্তু ঋজুর মতো কোনো শব্দ বেরোয় না তার মুখ দিয়ে। অতসীদিদিকে ঋজু একদিন ‘মা' বলে ডাকবে, তারপর কথাও বলতে শুরু করবে নিশ্চয়ই একদিন। কিন্তু ভোলা কোনোদিন মালতীকে মা বলে ডাকবে কি না তা জানা নেই। শুধু এই কথাটা যখন মালতীর মনে হয় তখন তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে ওঠে। সব মা-ই তো ‘মা' ডাক শুনতে চায়। তা সে বড়লোক অতসীদিদি হোক বা গরিব মালতী। সকালবেলাটা ঋজুকে খেলাতে, স্নান করাতে, খাওয়াতে কীভাবে যেন অন্য দিনের থেকে দ্রুত কেটে গেল আজ। দুপুর দেড়টা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়ল ঋজু। এরপর নিজের খাওয়া সেরে খাটের পাশে একটা চেয়ার বসল মালতী ।
ঋজু ঘুমোচ্ছে। বাইরে নির্জন দুপুর। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটার মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ঘুমন্ত বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে মালতী ভাবতে লাগল আর কয়েক ঘণ্টা পরই তো তাকে ছেড়ে যেতে হবে তাকে। কাল থেকে ঋজুর নতুন গভর্নেস আসবে। সে কি সত্যিই বাচ্চাটাকে আরও ভালো করে মানুষ করতে পারবে মালতীর থেকে। এতটুকু বাচ্চাকে মানুষ করার জন্য কতখানি শিক্ষার প্রয়োজন হয়? মালতী যে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ সে তো দিদি জানেই। বাচ্চাটাকে কি ছড়ার বই পড়ে শোনাতে পারত না মালতী?” অথবা আর একটু বড় হলে কি তাকে ‘অ-আ-ক-খ’ বা ‘এ-বি-সি-ডি' শেখাতে পারত না সে? তবে কেন এখনই আরও শিক্ষিত গভর্নেসের দরকার হল তার জন্য? নাকি নতুন গভর্নেসকে কাজে নেওয়ার পিছনে অন্য কোনও কারণ আছে? সে কারণটাই খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল সে।
কয়েক মাস ধরে অবশ্য অতসীদিদির আচরণে একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করেছে মালতী। তার ওপর বাচ্চাটার যে একটা টান জন্মেছে সেটা যেন খুব একটা পছন্দ করে না দিদি। এই তো মাসখানেক আগের ঘটনা। ঋজুর সেদিন জ্বর এসেছে। কী একটা কারণে সেদিন অফিস ছুটি থাকায় বাড়িতেই ছিল দিদি। দুপুরবেলায় হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল বাচ্চাটা। দিদি যখন তাকে কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে তার কান্না থামাবার চেষ্টা করেও পারল না তখন মালতী তাকে বলেছিল, 'বাচ্চাটাকে দাও তো দিদি, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি। অনেকক্ষণ ধরে বাচ্চাটাকে শান্ত করার চেষ্টার জন্য ক্লান্ত দিদি বাচ্চাটাকে তুলে দিয়েছিল মালতীর কোলে খুব স্বাভাবিকভাবেই। মালতী তাকে কোলে নিতেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই থেমে গেছিল বাচ্চাটা। হয়তো তার গায়ের গন্ধর জন্যই। সারাদিন তো এই গন্ধর সঙ্গেই লেপটে থাকে শিশুটা। তার পরিচিত গন্ধ এটা। বাচ্চাটার কান্না থামতেই মালতী আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বলেছিল, ‘দেখলে তো আমার কাছে কেমন শান্ত হয়ে গেল ঋজু !’
সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন বদলে গেছিল অতসীদিদির মুখ। মালতীর কোল থেকে সে বাচ্চাটাকে টেনে নিয়ে বলেছিল, ‘আমার পেটের বাচ্চা আমার কাছে চুপ করল না! আমি তো ওর মা। আমার ওপর ভরসা করেই তো ওকে বাকি জীবন কাটাতে হবে।' অতসীদিদির কোলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই আবার কাঁদতে শুরু করেছিল ঋজু। তাই দেখে অতসীদিদি এরপর বলে উঠেছিল, 'কাঁদুক, কাঁদুক। নিজের লোক—পরের লোক চিনতে শিখতে হবে ওকে। এই বলে বাচ্চাটার কান্না থামাবার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করে অতসীদিদি বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল ঋজুকে। মালতীকে অতসীদিদি বলেছিল, 'আমি বাড়িতে থাকলে আমি না বললে ওকে কোলে নেবে না তুমি।'
বাচ্চাটা তারস্বরে কাঁদছিল সেদিন বিছানায় শোয়ানোর পর। যতক্ষণ না সে ক্লান্তঅবসন্নভাবে ঘুমিয়ে পড়ে ততক্ষণ কেঁদেই চলেছিল সে। মালতীর বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু অতসীদিদির কথা অগ্রাহ্য করে বাচ্চাটাকে বুকে তুলে নেবার সাহস হয়নি মালতীর। এক একসময় তো মালতীর কোলেও ঘুমাতে চায় না ভোলা। সে অবশ্য কাঁদতে পারে না। মুখটা কেমন বিকৃত হয়ে যায়। ছটফট করতে থাকে ভোলা। তখন তার ঠাকুমা কোলে তুলে নেয় তাকে। শান্ত হয় ভোলা। তা বলে কি শাশুড়িকে হিংসা করে মালতী। মনে মনে সে ভাবে তার ভোলা যার কাছে ভালো থাকে থাক। ভোলার ভালো লাগাই তো তার কাছে শেষ কথা। শিশুমন বড়দের মতো সম্পর্ক-আত্মীয়তা বা সমাজের অঙ্ক কষে না। যাকে সে সবসময় কাছে পায় তাকেই সে আঁকড়ে ধরে, ভালোবাসে, নিজের বলে মনে করে। অবোধ শিশু জানে না কার পেট থেকে বেরিয়েছে সে।
ঋজুকে নিয়ে এরপরের ঘটনাটা দিন পনেরো আগের। দাদাবাবুও সেদিন বাড়িতে এসেছে দু-রাতের জন্য। সকালবেলায় মালতী ঘরে ঢুকতেই তাকে দেখে হাত-পা ছুঁড়ে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল ঋজু। সে তখন ক-দিন হল পা ছড়িয়ে বসতে পারে। মালতীকে দেখে ঋজু হাসতেই দাদাবাবু অতসীদিদির উদ্দেশে বলেছিল, ‘তোমার ছেলে কিন্তু তোমার থেকে মালতীকে দেখলে বেশি হাসে।'
এ কথাটা হয়তো নিতান্তই সহজভাবে বলেছিল দাদাবাবু। অতসীদিদিকে কোনো খোঁচা দেবার অভিপ্রায় তার ছিল না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই অতসীদিদির মুখটা পালটে গেছিল। মালতীর সামনেই অতসীদিদি তার বরকে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেছিল, 'বলিহারি বুদ্ধি তোমার! অতটুকু বাচ্চা কি আর মানুষ চেনে, মানুষ বোঝে? সে বোধ এখনও ওর হয়নি। নিজের মনের খেয়ালেই ও হাসে কাঁদে। মালতীকে ভালোবেসে ও হাসছে না।'
আর তারপরেই মালতীর উদ্দেশে অতসীদিদি বলে উঠেছিল, ‘তোমার ছেলে তো আবার হাসতেও পারে না তাই না? আমি তো এঘরে আছি এখন। এঘরে হাঁ করে দাঁড়িয়ে না থেকে বাচ্চাটার জামাকাপড়গুলো ছাদে মেলে দিয়ে এসো।'
অতসীদিদির কথা শুনে সেদিনও কিছু বলতে পারেনি মালতী। ঋজুর জামাকাপড়গুলো বালতি থেকে নিয়ে নিঃশব্দে ছাদে উঠে গিয়েছিল। সেগুলো ছাদে মেলে দেবার সময় টুপটুপ করে জল পড়ছিল ছাদে। মালতীর চোখ থেকে তার সঙ্গে দু'ফোঁটা জলও পড়েছিল ছাদে। তা টের পায়নি কেউ।
ঘুমন্ত ঋজুর মুখের দিকে তাকিয়ে মালতী ভাবতে লাগল ঘটনাগুলো। অতসীদিদি কি তাকে হিংসা করে? কিন্তু কেন? অতসীদিদি তো মালতীর চেয়ে অনেক বেশি ফরসা-সুন্দর দেখতে। কত পড়াশোনা করেছে অতসীদিদি। কত ভালো বর তার, কত ভালো চাকরি করে অতসীদিদি। সব দিক থেকেই দিদি অনেক অনেক অনেক এগিয়ে মালতীর থেকে। তবু কেন দিদি হিংসা করবে তাকে? তবে কি দিদি ভাবছে যে তার অনুপস্থিতিতে তার মাতৃত্বে ভাগ বসাচ্ছে মালতী? তার ছেলে মালতীর হয়ে যাচ্ছে এই আশঙ্কাই কি চেপে বসেছে অতসীদিদির মনে? মালতীর খালি মনে হতে লাগল, 'হ্যাঁ, এটাই, এটাই।' মালতীর সান্নিধ্যে আর ঋজুকে থাকতে দিতে চাইছে না দিদি। পাছে দিদির পেটের ছেলে পর হয়ে যায় ভেবে। নইলে মালতীকে কাজ ছাড়িয়ে দেবার কোনো প্রয়োজন ছিল না অতসীদিদির। তার চাকরি যাবার কারণ সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায় মালতী ।
আর তার পরই সে ভাবতে লাগল কেন তার সঙ্গে শুধু এমন হয়। কেন কোনো সে অপরাধ না করেও বারবার দোষী সাব্যস্ত হয়, পরাজিত হয়! নারকেলডাঙা বস্তির মেয়ে হলেও পড়াশোনায় মোটামুটি খারাপ ছিল না সে। বড় সংসারে একবেলা না খেয়ে, কোনো প্রাইভেট টিউশন না নিয়ে মাধ্যমিক ফার্স্ট ডিভিশন আর হায়ার সেকেন্ডারিতে তার কাছাকাছি রেজাল্ট নিয়ে পাশ করেছিল সে। দিদি একবার তাকে গল্প করেছিল যে তার নাকি চার-পাঁচটা মাস্টার ছিল! তাছাড়া নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছে দিদি। তার মতো সুযোগ পেলে মালতী কি দিদির মতো ভালো রেজাল্ট করতে পারত না? ভালো চাকরি পেত না? ভালো বর পেত না? হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরোবার আগেই বাবা মারা গেছিল মালতীর। দাদারা আর তাকে ঘাড়ে রাখতে চাইল না। পঁচিশ হাজার টাকা পণ দিয়ে মালতীর বিয়ে দিয়ে দিল দত্তাবাদের লেদমিস্ত্রি অখিলের সঙ্গে। দু-বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাচ্চা এল মালতীর পেটে।
অখিল ছেড়ে চলে গেল মালতীকে। সব শেষ হয়ে গেল মালতীর জীবনে। কোনো দোষ না করেও জীবনযুদ্ধে হেরে গেল মালতী। অথচ সে একদিন স্বপ্ন দেখত বিএ-এমএ পাশ করে ভালো চাকরি করবে। অথবা তার ভালো বর হবে, কিন্তু কিছুই হল না তার। এমনকী ছেলেটাও এমন হল যে কোনোদিন হয়তো সে মালতীকে মা বলে ডাকতে পারবে না।
অথবা ধরা যাক না কেন তার এ ঘটনাটাই। নিজের সন্তানের মতো অন্যের বাচ্চাকে ভালোবেসে সে কি অন্যায় করেছিল? এখানেও তো হেরে গেল সে। বিনা অপরাধে কাজটা তার চলে গেল। এসব কথা ভাবতে ভাবতে মালতী নিজের মনকে প্রশ্ন করতে লাগল, বারে বারে সে হেরে যায় কেন? পরাজয়ের আত্মগ্লানি আর অতসীদিদির প্রতি তীব্র ক্ষোভ অভিমান আচ্ছন্ন করে ফেলল তার মনকে। কেন, সমাজ-অতসীদিদের কাছে কেন হারল সে? সে কি কোনোদিন জিতবে না? এসব কথা ভাবতে ভাবতে তার বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না সে। দু'চোখ বেয়ে প্লাবনের মতো জল নামতে থাকল তার। একটা কথাই সে ভাবতে লাগল, সে হেরো, সে জীবনযুদ্ধে পরাজিত কোনো আলো নেই তার চারপাশে। সব অন্ধকার। সব অন্ধকার।
বিকেল হয়ে গেল এক সময়। বাইরের আলো মরে আসছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মালতী। ঋজুর দিকে তাকাল সে। ঘুমাচ্ছে ঋজু। দিদি হয়তো এখনই ফিরবে। তাকেও ছেড়ে যেতে হবে এ বাড়ি, ঋজুকেও। মনটাকে এবার শক্ত করার চেষ্টা করল মালতী। ঘরের বাতিটা জ্বালিয়ে নাইটি ছেড়ে চুড়িদার-কামিজ পরে নিল সে। ঋজু ঠিক জেগে উঠল সেই সময়। মুখ দিয়ে আউম্-উম্ এসব শব্দ করতে শুরু করল। না, মালতী আর মায়া বাড়াবে না তার প্রতি। চলে যাবার সময় অতসীদিদি মনে মনে যাই ভাবুক কিন্তু প্রকাশ্যে যেন না বোঝে যে মালতী হেরে গেছে। যাবার বেলায় ঋজুকে বুকে জড়িয়ে আর কাঁদবে না সে। শব্দ করছে ঋজু। মালতী ব্যাগে ভরে ফেলল পোশাকটা । অতসীদিদি বাড়ি ফিরলেই আজকের টাকাটা নিয়ে সে বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু হঠাৎই একটা শব্দ শুনে চমকে উঠে ঋজুর দিকে মালতী তাকাল। তারপর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল সে। ঠিক সেই সময় আরও একটা শব্দ শুনতে পেল সে। কলিংবেলের শব্দ। অতসীদিদি ফিরে এসেছে। ঋজুর দিকে যেতে গিয়েও মালতী ঘর ছেড়ে এগোল দিদিকে দরজা খুলে দেবার জন্য ।
শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বাড়িতে ঢুকল দিদি। তারপর প্রতিদিনের মতো জানতে চাইল ‘ঋজু কী করছে?’
মালতী কোনো উত্তর দিল না। অতসীদিদির পায়ে পায়ে আবার সে ঘরে ঢুকল। হামাগুড়ি দিয়ে সে বিছানায় উঠে বসেছে। তারা দু'জন ঘরে ঢুকতে আবারও সে বলে উঠল—‘ম-মা-মা।’
‘মা’—ডাকছে ঋজু। তার প্রথম বুলি। অতসীদিদি ছুটে গিয়ে ঋজুকে কোলে তুলে নিয়ে বলতে লাগল, আবার বল—মা-মা।' কয়েকবার ডাক দিয়ে আবার থেমে গেল ঋজু। অতসীদিদির মুখে খুশির হাসি। সন্তান আজ তাকে প্রথম ‘মা’ বলে ডেকেছে।
ততক্ষণে বেরোবার জন্য নিজের ব্যাগটাও কাঁধে তুলে নিয়েছে মালতী। সে বেরিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে অতসীদিদি তার ব্যাগ খুলে একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা রাখো। দুশো টাকা তোমার রোজ। আর বাকি টাকা দিয়ে কিছু কিনে নিয়ে যেও বাড়িতে।’
নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করলেও জল নামতে শুরু করেছে মালতীর চোখ বেয়ে। তাই দেখে অতসীদিদি আবারও বলল, ‘বললাম তো, তিনশো টাকা দিয়ে কিছু কিনে নিয়ে যেও ছেলের জন্য।'
অতসীদিদির কথায় মালতী বলল, ‘এ টাকাটা আজ আর আমি নেব না।'
বিস্মিতভাবে অতসীদিদি প্রশ্ন করল, ‘কেন নেবে না কেন?'
তবে কি মালতী আজ ভেবে রেখেছিল যে সে আজ আরও বাড়তি কিছু টাকা বকশিস পাবে? আরও কিছু টাকা তাকে এই শেষবেলায় দেওয়া উচিত কি না তা ভাবতে লাগল অতসীদিদি।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। ঋজু আবারও মা, মা, বলে ডাকতে শুরু করেছে। মালতী ঋজুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, 'ভালো থেকো তুমি। লেখাপড়া শেখো, অনেক বড় মানুষ হও। তুমি যে আমারও সন্তান।'
তারপর অতসীদিদির দিকে তাকিয়ে বলল, 'টাকাটা নেব না কারণ ঋজু যে প্রথমে আমাকেই ‘মা’ বলে ডেকেছে। নিজের ছেলেকে একবেলা দেখার জন্য কি কেউ টাকা নেয়? আনন্দাশ্রু মুছে নিয়ে এরপর সে ঘর, সে বাড়ি ছাড়ল মালতী সারা জীবন ধরে হেরে আসার পর এই প্রথম তার মনে হল সে বিজয়িনী। তার কাছে হেরে গেছে অতসীদিদি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন