হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
প্রথমে বনগাঁর পেট্রোপোল সীমান্তের অভিবাসন দপ্তর থেকে দেশের বাইরে যাবার জন্য ছাড়পত্র নেওয়া। তারপর সার্কাসের এরিনার মতো বা একটা খাঁচার মতো জায়গা। যার পোশাকি নাম—‘নো ম্যানস ল্যান্ড।' অর্থাৎ যে জমি কোনো দেশের নয়। ভারত ভূখণ্ড দিয়ে সেই খাঁচার মতো ‘নো ম্যানস ল্যান্ড' অতিক্রম করে অন্যপাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে ফাগুন যখন প্রথমবার বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখল তখন শরীরের মধ্যে স্পষ্ট একটা শিহরন বোধ করল সে। আর তারই সঙ্গে সঙ্গে অবধারিতভাবে ফাগুনের মনে পড়ে গেল তার মা-র কথা। এদেশ তার মা-র জন্মভূমি। জন্ম থেকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত এদেশের মাটিতেই তিনি জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তারপর হল দেশ বিভাগ। অন্য বহু পরিবারের মতো ফাগুনের মা-কেও পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে পাড়ি দিতে হয়েছিল কলকাতার বুকে। রেলের চাকরির সুবাদে ফাগুনের দাদু তিরিশের দশকের শেষ থেকেই কলকাতাতে বসবাস করতেন বলে শুনেছেন ফাগুন। তবে দুটো দেশ আলাদা হবার আগে পর্যন্ত তাঁর পরিবার অর্থাৎ ফাগুনের মা-মামা-দিদিমারা ঢাকাতেই থাকতেন। মাঝে মাঝে এ পথেই অর্থাৎ বেনাপোল-পেট্রাপোল হয়েই রানাঘাট থেকে ট্রেন ধরে কলকাতায় দাদুর কাছে আসতেন তাঁরা। মায়ের মুখে ও কথা বহুবার শুনেছে ফাগুন।
কলকাতা থেকে ফ্লাইটে ঢাকা বলতে গেলে আধঘণ্টার দূরত্বের। এয়ারপোর্টের ফর্মালিটিজ মেনে খুব বেশি হলে ফাগুনের তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগত ঢাকায় পা রাখতে । আর কলকাতা থেকে পেট্রাপোল, বেনাপোল হয়ে ঢাকা পৌঁছতে অন্তত তেরো-চোদ্দো ঘণ্টা সময় লেগে যাবে। তবু সে এ-পথে এসেছে তার মা-র মুখে বহুবার শোনা জায়গাগুলোকে একটু চোখে দেখার জন্য। হয়তোবা মায়ের গর্ভে থাকার সময় মায়ের আবেগের ব্যাপারগুলোও কোনোভাবে সঞ্চারিত হয়ে যায় সন্তানের মধ্যেও। হ্যাঁ, ফাগুনের মায়ের বড় আবেগ। ভালোবাসা ছিল এদেশটা—তার ফেলে আসা দেশের প্রতি। বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই মা-র কথা মনে পড়তেই ফাগুনের মনে বেদনা মিশ্রিত এক অদ্ভুত আনন্দ অনুভূতি হল। শব্দ দিয়ে ধরা যায় না যে আনন্দ অনুভূতিকে।
বাংলাদেশ অভিবাসন দপ্তরের কাজ মিটিয়ে তার বাইরে এসে দাঁড়াতে আরও আধঘণ্টা মতো সময় লাগল ফাগুনের। সকাল ন-টা বাজে, চারপাশে ঝলমলে আলো। রাস্তায় সীমান্ত পারাপারকারী লোকজনের ভিড়। কয়েক-পা এগিয়ে রাস্তার ওপরই বাস স্ট্যান্ড। ঢাকা ও অন্যত্রগামী সার সার বাস সেখানে দাঁড়িয়ে। ফাগুনের লাগেজ বলতে বিশেষ কিছু নেই। পিঠে একটা রুকস্যাকের মতো ব্যাগ। তাতে রয়েছে তিনচার দিনের মতো কাপড় জামা আর টুকটাক কিছু জিনিস। আর পাসপোর্ট, টাকা-পয়সা, জরুরি কাগজপত্র রয়েছে তার কোমরে বাঁধা পাউচ ব্যাগে। বাস স্ট্যান্ডে ফাগুন পৌঁছে গেল হাঁটতে হাঁটতে। রাস্তার পাশে সার সার খাবারের নতুন-পুরোনো দোকান, পরোটা, মিষ্টি থেকে শুরু করে মাছ-ভাতের। আর আছে বাস ও মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টারগুলো। ঢাকা পৌঁছবার বাস ভাড়া ও যাত্রাপথের খাওয়া-দাওয়ার জন্য ফাগুনের কিছু বাংলাদেশি টাকার দরকার। বাকি টাকার ব্যবস্থা সে হোটেলে পৌঁছবার পর তার কোম্পানির লোকজন এখানে যারা আছেন তারাই করে দেবেন। হ্যাঁ, ফাগুনকে তার অফিস থেকেই এক সপ্তাহের জন্য কাজে বাংলাদেশে পাঠানা হয়েছে।
একটা এক্সচেঞ্জ অফিসে ঢুকে ভারতীয় টাকার বিনিময়ে কিছু বাংলাদেশের টাকা সংগ্রহ করে নিল ফাগুন। তারপর বাসের টিকিট কাউন্টারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারল সরাসরি ঢাকাগামী বাসগুলো সবই রওনা হবে বেলা বারোটার সময়। অর্থাৎ ঘণ্টাতিনেক পর। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে ফাগুনকে। হঠাৎই একটা টিকিট কাউন্টার থেকে একটা লোকের হাঁক-ডাক শুনতে পেল ফাগুন। লোকটা চ্যাচাচ্ছে— গোয়ালন্দ! গোয়ালন্দ! এখনই বাস রওনা হবে। সিট খালি আছে। কোনো সমস্যা নাই।'
চর ফাগুন তার মা-র মুখে কতবার যে ও জায়গার নাম শুনেছে তার হিসাব নেই। ওই গোয়ালন্দ ঘাট দিয়ে পদ্মা পেরিয়েই ঢাকা যেতে হয়। লোকটার মুখে গোয়ালন্দ নামটা শুনেই ফাগুন হাজির হল লোকটার কাছে। সে জানালো এখনই বাস ছাড়বে। ফাগুনকে ঢাকা যেতে হলে গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছে স্টিমারে পদ্মা পেরিয়ে আবার ওপাশ থেকে বাস ধরে ঢাকা যেতে হবে। যদিও যে বাসটা গোয়ালন্দ যাচ্ছে সেটা এসি বাস নয় তবুও এই বসন্তর দুপুরে নন-এসি বাসে যেতে খুব একটা অসুবিধা হবে না বলেই মনে হল ফাগুনের। আর বাস কোম্পানির লোকটা, বলল সে ‘গাইড' অর্থাৎ যাত্রীদের যে খেয়াল রাখে, ড্রাইভারের পিছনে বাসের প্রথম সারিতে সেই গাইডের পাশেই বসার আসন দেওয়া হবে তাকে। তিন ঘণ্টা সময়টা কম সময় নয়, তাই এই সময়টা যাত্রাপথে এগিয়ে থাকার অবশেষে গোয়ালন্দর বাসেই চড়ে বসল ফাগুন। বেনাপোল সীমান্ত থেকে বেশ কিছু যাত্রী নিয়ে বাস রওনা হয়ে গেল গোয়ালন্দর উদ্দেশ্যে।
সীমান্ত সংলগ্ন শহর ছেড়ে এক সময় গোয়ালন্দর সড়ক ধরল বাস। মসৃণ রাস্তার দু-পাশে কোথাও বাড়ি-ঘর দোকানপাট; আবার কোথাওবা ধানের ক্ষেত আর আম-কাঠালের বাগান। রাস্তার পাশে বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন বা পথ নির্দেশক সাইনবোর্ডগুলো সব বাংলাতে লেখা। যেন ভিন দেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গেরই কোনো গ্রামের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে বাসটা গাইড বলে লোকটা তার আসনে না বসে বাসের ইঞ্জিনের ওপর বসে ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প করছে। কাজেই দুটো আসনই ফাগুনের দখলে। জানলার গায়ে যে নিজে বসে, পাশের আসনে রেখেছে তার ব্যাগটা। জানলার বাইরে তাকিয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে ফাগুনের আবারও মনে পড়তে লাগল তার মায়ের কথা। এ পথেই তো তিনি একদিন যাওয়া আসা করতেন। শেষ বারও তিনি নিশ্চই এ পথ ধরেই কলকাতা গেছিলেন। ফাগুনের মা চলে গেছেন প্রায় দশ বছর হয়ে গেল। মৃত্যুর আগে তাঁর জীবনের শেষের দিকে তিনি প্রায় বলতেন এদেশে ফেলে আসা তার শৈশব-কৈশোর-যৌবনের কথা। এ জায়গাটাকে তিনি বহু যুগ আগে ছেড়ে এলেও ওর কথা তিনি কোনোদিনই ভুলতে পারেননি। আর বার্ধক্যে পৌঁছালে নাকি শৈশব-কৈশোরের কথা, যেখানে যে সব দিন কেটেছে, সে সব জায়গার কথা নাকি খুব বেশি করে মনে পড়ে মানুষের। মারা যাবার ক-দিন আগে মা একবার তাকে বলেছিলেন; ‘তুই একবার আমাকে বাংলাদেশ নিয়ে যাবি? তুই তো বলিস যে ঢাকাতেও নাকি তোদের কোম্পানির অফিস আছে। আমার বড় দেখতে ইচ্ছা করে ঢাকার মগ বাজারের বাড়িটা এখনও আছে কিনা? দেখতে ইচ্ছা করে গোয়ালন্দ স্টিমার ঘাট, সেখানকার হোটেলগুলো, সেখানে যাওয়া-আসার পথে মাছের ঝোল দিয়ে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত খেতাম আমরা। বড় দেখতে ইচ্ছা করে আমার পদ্মা নদী, ঢাকার বুড়ি গঙ্গা নদী ।'
মা-র যা তখন শরীরের অবস্থা ছিল তাতে আর তখন তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না ফাগুনের। তাছাড়া ফাগুন তখন তাদের কোম্পানির অতি সাধারণ একজন কর্মী ছিল। উচ্চপদস্থ কোনো কর্মী ছাড়া কোম্পানি তাদের কোনো কর্মীকে বাংলাদেশে পাঠাত না। কাজেই ফাগুনের হাত ধরে তার জন্মভূমির মাটিতে আর পা রাখা হয়নি তার মা-র।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলল বাস। মাঝে মাঝে কখনও কখনও থেমে যাত্রীও তুলতে থাকল বাসটা। নানা গ্রাম, শহর অতিক্রম করতে লাগল বাস। তাদের কিছু নাম হয়তো কোথাও ফাগুন শুনেছে বা পড়েছে। অধিকাংশ জায়গার নামই তার জানার কথা নয়। কিন্তু যাত্রাপথের প্রতিটা স্থানের নাম যেন তার মা-র মুখ থেকে শোনা বলে মনে হতে লাগল ফাগুনের। তার যেন মনে হতে লাগল দু-পাশের সব কিছুর সঙ্গে একদিন মিশে ছিল তার মা-র অস্তিত্ত্ব। প্রতিটা জায়গার কথাই যেন ফাগুন তার মায়ের মুখ থেকে শুনেছে মা চলে যাবার পর ব্যস্ত নাগরিক জীবনে তার মা-র কথা এভাবে কোনোদিন আগে মনে পড়েনি ফাগুনের। আজ একাকী এই বাস যাত্রায় মায়ের মাতৃভূমে পা রেখে মায়ের নানা স্মৃতি ভিড় করে আসতে লাগল ফাগুনের মনে। তার মনে হতে লাগল, মা যদি তার সঙ্গে আজ সফরসঙ্গী হতেন তবে এ সব জায়গাগুলো দেখে কত আনন্দ পেতেন তিনি। মা-র কথা ভেবে তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছার কথা ভেবে, বিশেষত এই পৃথিবীর বুকে তাঁর অস্তিত্বহীনতার কথা ভেবে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা যেন ঘিরে ধরতে লাগল ফাগুনকে।
বাস এক সময় ফরিদপুর জেলার ওপর দিয়ে এগোতে লাগল। এই বিখ্যাত জেলার নাম ফাগুন মায়ের মুখে শুনেছে বহুবার। খবরের কাগজেও পড়েছে এ জেলার নাম। এ জেলার কোথায় যেন এক আত্মীয়র বাড়ি আসা যাওয়া ছিল ফাগুনের মা-র।
সময় আরও এগিয়ে চলল, ফরিদপুর অতিক্রম করার পর হঠাৎই একটা বুড়ি আর এক যুবক হাত দেখিয়ে বাস থামিয়ে বাসে উঠে পড়ল। তারা দুজন বাসের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়াল ফাগুনের সামনেই। তাদের দুজনের পোশাক দেখেই মনে হয় তারা দুজন গরিব ঘরের মানুষ। বুড়িটার পরনে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটা ছাপা শাড়ি। আর ছেলেটার পরনে পুরোনো জ্যালজ্যালে একটা শার্ট আর প্যান্ট। মুখে বেশ কয়েকদিনের না কামানো বাসি দাড়ি। বয়সের ভারে বুড়িটার মুখে অসংখ্য বলি রেখা ফুটে উঠেছে, ঝুলে পড়েছে হাতের চামড়া, দাঁড়ানোর ভঙ্গিও বেশ ন্যুব্জ ধরনের। ফাগুনের মনে হল বুড়িটার বয়স আশির কোঠায় হবে। বাসের ঝাঁকুনিতে দাঁড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে বুড়িটার। ফাগুনের পাশের সিটটা ফাঁকাই ছিল। সে বুড়িটাকে বলল, ‘আপনি এখানে বসুন।’
তার কথা শুনে বুড়িটা বলল, ‘গাইড যদি বকে? আমরা গরিব মানুষ, পুরো ভাড়া দেই না ।’
ফাগুন বলল, “সিট যখন খালি আছে তখন বসুন। গাইড এলে বলব, আমি আপনাকে বসতে বলেছি।' ফাগুন এরপর ব্যাগটাকে নিজের কোলে নিয়ে নিল, আর তার পাশের আসনে বসল বুড়ি। ফাগুন খেয়াল করল গাইড লোকটা বুড়িটা যে বসল তা খেয়াল করল, কিন্তু কিছু বলল না। ব্যাগটা কোলে নেওয়াতে ফাগুনের কোমরে বাঁধা পাউচ ব্যাগটায় চাপ লাগছিল। তাই ফাগুন এরপর সেই ছোট ব্যাগটা কোমর থেকে খুলে বড় ব্যাগটার মধ্যে পুরে নিল। বুড়িটা তাকিয়ে আছে ফাগুনের মুখের দিকে। জানলার বাইরে আবার চোখ রাখার আগে ফাগুন বুড়িটাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছেন আপনারা?' এখন বাসায় ফিরছি। গোয়ালন্দ স্টিমার
বুড়িটা জবাব দিল, ‘এসেছিলাম ফরিদপুরে। ঘাটেই আমার বাসা ।’
গোয়ালন্দ ঘাটেই বুড়িটা থাকে শুনে ফাগুন তাকে প্রশ্ন করল। ‘ওপারে যাবার জন্য সবসময় স্টিমার মেলে'।
বুড়িটা প্রথমে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আধঘণ্টা অন্তর।’
তারপর প্রশ্ন করল। ‘বাপ তুমি কোথায় যাবে?'
ফাগুন জবাব দিল, ঢাকা যাব।'
—“ঢাকায় তোমার কে থাকে? তুমি কোথায় থাকো? জানতে চাইল কৌতূহলী বুড়িটা।
ফাগুন বলল, ‘ঢাকাতে কেউ থাকে না। আমি কলকাতা থেকে ঢাকা যাচ্ছি অফিসের কাজে। তবে এক সময় এদেশটা আমার মায়ের দেশ ছিল। এটা আমার মায়ের দেশ। তিনি দেশ বিদেশের বিভাগের পর কলকাতা চলে গেছিলেন।'
বুড়ি বলল, “ও তোমার মা কলকাতা থাকেন? এদেশের অনেক মেয়েই সে সময় ওপারে চলে গেছিল।'
ফাগুন মৃদু বিষণ্ণভাবে হেসে জবাব দিল; ‘থাকেন নয়, থাকতেন। মা, মারা গেছেন। এ দেশে পা রেখে মা'র কথা খুব বেশি মনে পড়ছে।'—এই শেষ বাক্যটা কিছুটা স্বগতোক্তির সঙ্গে বলে জানলার দিকে ফাগুন মুখ ফেরাল।
বুড়িটা এরপর তাকে আর কোনো প্রশ্ন করল না। আর ফাগুনও বাইরে ধাবমান দৃশ্যর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল তার মায়ের কথা। মা-র মৃত্যুর এত বছর পর তার শূন্যতা যেন প্রচণ্ডভাবে অনুভূত হতে লাগল ফাগুনের মনে।'
মা-র কথা ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টা দুয়েকের যাত্রাপথ কীভাবে যে কেটে গেল তা ফাগুন বুঝে উঠতে পারল না। অবশেষে শেষ দুপুরে বাস এসে পৌঁছে গেল। ফাগুনের পাশের সিট থেকে ওঠার সময় বুড়িটা ফাগুনের উদ্দেশ্যে বলল, 'ভালোভাবে ঢাকাতে পৌঁছি বাপ। আল্লা তোমারে ভালো রাখুন।’
নিজের ব্যাগটা পিঠে নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল ফাগুন। বুড়িটা আর ছেলেটাও অন্যদের সঙ্গে নামল বাস থেকে। তারপর হারিয়ে গেল জন অরণ্যে। ফাগুনকে বাস যেখানে নামাল সেখান থেকে জেটি পর্যন্ত বেশ খানিকটা পথ। জায়গাটা জনকোলাহলপূর্ণ। রাস্তার দু-পাশে অনেক খাবারের দোকান। দোকানিরা হাঁকডাক করছে খদ্দের ধরার জন্য। দোকানগুলোর কোনোটার মাথায় লেখা ‘হিন্দু হোটেল, ‘কোনোটার বা মাথায় লেখা 'মুসলিম হোটেল।' তার মা-র আমলেও হোটেলগুলোর সাইনবোর্ডে জাত বাঁচানোর জন্য এসব লেখা থাকত বলে ফাগুন শুনেছে। অর্থাৎ এত বছর পরও এ জায়গাটার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ফাগুনকে তার মা একবার গল্প করেছিলেন যে গোয়ালন্দের স্টিমারঘাটে নাকি ভালো মুরগির মাংস আর ভাত পাওয়া যায়। মা-র খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল গোয়ালন্দর মুরগির ঝোল খাওয়ার, কিন্তু খাওয়া হয়নি। ফাগুন মনে মনে ভাবল, ‘আজ যদি তার মা বেঁচে থাকতেন তবে তার সামান্য সাধটা পূর্ণ করতে পারত ফাগুন।' গোয়ালন্দতে নামার পর ফাগুন যেন আরও বেশি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তার মা-র কথা ভেবে ।
ভিড় ঠেলে এক সময় জেটিতে পৌঁছে গেল ফাগুন। জায়গাটাতে পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। তার সামনে উন্মুক্ত পদ্মা! মা-র মুখে গল্প শোনা পদ্মা নদী! কী বিশাল এই নদী! ওপার দেখা যায় না তার! কত রকমের নৌকা। বিশাল বিশাল বার্জ আর যাত্রীবোঝাই দোতলা তিনতলা স্টিমার আসা-যাওয়া করছে পদ্মার বুকে। কত বড় বড় গাড়ি আর লোকজন নিয়ে পদ্মা পারাবার করছে জলযানগুলো। স্টিমারের সাইরেনের ‘ভোঁ’ আওয়াজ আর লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচি, মাইকে লঞ্চ ছাড়বার ঘোষণাতে সরগরম ফেরিঘাট। ব্যাপারটা চোখে না দেখলে ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। মায়ের মুখে শোনা গোয়ালন্দ স্টিমারঘাট!
বেশ খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে চারপাশের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পর ফাগুন এগোলো স্টিমারে চাপার জন্য কাছের একটা টিকিট কাউন্টারের দিকে। সেখানে পৌঁছে ব্যাগ থেকে তার পাউচ ব্যাগটা বার করার জন্য বড় ব্যাগটা পিঠ থেকে নামাতেই চমকে উঠল ফাল্গুন। পিঠের ব্যাগের চেনটা খোলা। আর পাউচ ব্যাগটা তার মধ্যে নেই। ব্যাগের অন্য খোপগুলোও তন্ন তন্ন করে খুঁজল ফাগুন। না সেই ছোট ব্যাগটা কোথাও নেই! শিহরন খেলে গেল ফাগুনের শরীরে। সে বুঝতে পারল কেউ তুলে নিয়েছে তার পাউচ ব্যাগটা। তার মধ্যেই যে ছিল তার টাকা-পয়সা, পরিচয়পত্র সর্বোপরি তার পাসপোর্টটা! এদেশে তার ঢোকা বেরোবার ছাড়পত্র যে ওই পাসপোর্ট! বেশ কিছুক্ষণ হতভম্বর মতো দাঁড়িয়ে রইল ফাগুন। তার যে সমূহ বিপদ ঘটে গেছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না ফাগুনের। ঢাকার সেই হোটেল পর্যন্ত পৌছতে পারলে তারপর হয়তো কিছু ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু সে হোটেল পর্যন্ত সে পৌঁছবে কীভাবে? একটা পয়সাও যে তার পকেটে নেই। এই অচেনা দেশে কে পয়সা ধার দেবে তাকে। প্রথম পদার্পন যে দেশটাকে তার খুব চেনা মনে হচ্ছিল এ ঘটনাতে মুহূর্তের মধ্যে যেন অচেনা মনে হত লাগল তার। ফাগুনের একবার মনে হল কাছে কোনো থানা আছে নাকি তা জেনে নিয়ে সে সেখানে যায় ঘটনাটা জানাবার জন্য। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল সেখানে গেলে ওদেশের পুলিশ যদি তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে আটক করে তখন কী হবে? এ সময় তার কী করা উচিত ফাগুন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। উদ্ভ্রান্তের মতো সে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল বিকালের গোয়ালন্দ ঘাটে।
আরও বেশ কিছু সময় কেটে গেল এরপর। শীতের বিকাল। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে। তখন ফাগুন কী করবে, কোথায় যাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ফাগুন। উৎকণ্ঠায় ক্রমশ যেন অবসন্ন হতে শুরু
করল তার শরীর। ঠিক এমন সময় হঠাৎই ফাগুন দেখতে পেল একজনকে। বাসে তার পাশে বসা সেই বুড়িটা; চারপাশের ভিড়ের মধ্যে তাকিয়ে সে যেন কাউকে খুঁজছে। আর এরপরই তাদের দুজনের মধ্যে চোখাচোখি হয়ে গেল। ফাগুন এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো তার সামনে। তাকে দেখে বুড়িটার মুখে হাসি ফুটে উঠল। অর্থাৎ বুড়িটা চিনতে পেরেছে তাকে। বুড়িটা স্থানীয় মানুষ, যদি সে ফাগুনকে কোনো সাহায্য করতে পারে একথা ভেবে ফাগুন তাকে বলল; আমার টাকা-পয়সা, পাসপোর্ট, কাগজপত্র রাখা ব্যাগটা কখন কে যেন আমার বড় ব্যাগ থেকে তুলে নিয়েছে। সর্বস্ব খোয়া গেছে আমার, এখন আমি কী করব। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
ফাগুনের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বুড়ি বলল, ‘তোমার ভয় নেই বাপ। কাছেই আমার বাসা। তুমি সেথায় চলো।'
জলে ডুবতে থাকা মানুষ যেমন ডোবার আগে খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে তেমনই বুড়িটার কথা শুনে তাকে অনুসরণ করল ফাগুন।
ঘাটের হই-হট্টগোল থেকে কিছুটা তফাতে বেশ কয়েকটা বেড়ার ঘর দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় সে জায়গাটা গরিব মানুষের বাসস্থান। সেখানে পৌঁছে বুড়িটা ফাগুনকে নিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করল। আধো অন্ধকার ঘরটার মধ্যে দৈন্যর ছাপ স্পষ্ট। একটা পুরোনো চৌকির ওপর নোংরা তোশক পাতা, কয়েকটা জামা কাপড় ঝুলছে দড়ি থেকে, আর সামান্য কয়েকটা টুকিটাকি জিনিস ছাড়া সে কুড়ে ঘরে কিছু নেই। ঘরে ঢোকার পর বুড়ি একটা কলাই করা গ্লাসে কুজো থেকে জল এনে দিল ফাগুনকে। উৎকণ্ঠায় ফাগুনের গলাটা কাঠ হয়ে গেছিল। ফাগুন ঢকঢক করে জলটা পান করে বুড়িকে বলল, 'এখন আমি কী করি বলুন তো? '
বুড়ির মুখে আবারও একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল; আমি তো তোমাকে খুঁজতেই স্টিমার ঘাটে গেছিলাম।'—এ কথা বলে বুড়িটা ফাগুনকে চমকে দিয়ে তার তোশকের নীচ থেকে খোয়া যাওয়া পাউচ ব্যাগটা বার করে ফাগুনের হাতে দিল।
ফাগুন বিস্মিতভাবে তাকে প্রশ্ন করল। ‘এ ব্যাগ কোথায় পেলেন আপনি?’
বুড়িটা বলল, 'হাফিজুল আমার ছেলে, সে বাসে আমার সঙ্গে ছিল, যাকে ফরিদপুরের জেল থেকে আমি ছাড়িয়ে আনছিলাম সঙ্গে করে সেই তুলে নিয়েছিল তোমার ব্যাগ তুমি যখন বাস থেকে নামছিলে তখন মনে হয়। স্বভাব যায় না মলে। তবে ব্যাগের টাকা পয়সাগুলো সে নিয়ে গেছে। কাগজপত্রগুলো আছে। পাসপোর্টের ছবি দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওটা তোমার ব্যাগ।' একথা বলার পর বুড়ি তার আঁচলের খুঁট থেকে দলামোচড়া কয়েকটা নোট বার করে ফাগুনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এ ক-টা টাকা তুমি রাখো বাপ। এ টাকায় তুমি ঢাকা পৌঁছুতে পারবে। এ কোনো চুরির টাকা নয়, একটা হোটেলে আমি কাজ করি সেখান থেকে পাওয়া টাকা।'
টাকাটা হাতে নিয়ে বিস্মিত ফাগুন কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে থাকার পর জানতে চাইল, 'ব্যাগটা আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন কেন? টাকাটাই-বা দিচ্ছেন কেন?’
বুড়ি হেসে জবাব দিল, ‘ওই যে তুমি বলেছিলে এটা তোমার মায়ের দেশ, এদেশে এসে তোমার মায়ের কথা মনে পড়েছ। কোনো মা কি চায় তার ছেলে তার দেশে এসে বিপদে পড়ুক? তাই দিলাম।'
একথা শোনার পর বুড়িটাকে কী বলবে ফাগুন বুঝে উঠতে পারল না। বুড়ির ঘর ছেড়ে এরপর ফাগুন রওনা হল স্টিমার ঘাটের জেটির দিকে বুড়ির দেওয়া টাকাতেই টিকিট কেটে একটা স্টিমারে উঠে পড়ল ফাল্গুন। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। যে ঘটনা ঘটল তার আকস্মিকতায় ফাগুনের মনের বিস্ময় তখনও না কাটলেও উত্তেজনার ভাব অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। স্টিমারের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ফাগুন। স্টিমার ছাড়ার আগে ইঞ্জিন চালু করে শেষ ভোঁ দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ফাগুনের চোখে পড়ল বুড়িটা এসে দাঁড়িয়েছে লঞ্চঘাটে। সে তাকিয়ে আছে লঞ্চটার দিকে। হঠাৎ এবার ফাগুনের মনে হল মায়ের অভাবে গোয়ালন্দ স্টিমার ঘাট পর্যন্ত যাত্রা পথে সে যে নিঃসঙ্গতা অনুভব করছিল তার মায়ের অভাবে তা আর নেই। দেশ, কাল, স্থান যাই হোক না কেন মায়েরা সব জায়গাতেই থাকে। ওই তো ফাগুনের মা বেলাশেষের আলো মেখে গোয়ালন্দের স্টিমার ঘাটে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে তার দিকে ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন