হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
রিকশো থেকে নেমে নির্মাল্য দেখতে পেল শ্মশানে ঢোকার মুখেই মিউনিসিপ্যালিটির শববাহী গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। আর তার কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান অর্থাৎ প্রশান্তর এসইউভি গাড়িটা। অফিসের কাজে গত সাতদিন নির্মাল্য শহরের বাইরে থাকলেও বিজন, ধৃতিমান, রবির সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা হয়েছে নির্মাল্যর। তাদের থেকে নির্মাল্য জেনেছে যে রঞ্জনার হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপার থেকে যে সংক্রান্ত অন্য সব ব্যাপার তার নানা ব্যস্ততার মধ্যেও সামলে আসছে প্রশান্ত। রঞ্জনা আর নবারুণের পারিবারিক বন্ধুর দায়িত্ব পালন করেছে প্রশান্ত। নির্মাল্য, বিজন, রবি, প্রশান্ত, নবারুণ দীর্ঘ দিনের বন্ধু হলেও নবারুণ ও রঞ্জনার সঙ্গে প্রশান্তর ঘনিষ্ঠতাই সব থেকে বেশি।
শ্মশানের ভিতর ঢোকার মুখেই একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল বিজন, রবি আর ধৃতিমান। নির্মাল্য তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ধূমান জানতে চাইল, ‘কিরে কখন ফিরলি?”
নির্মাল্য জবাব দিল, 'এই একটু আগে। বাড়িতে ব্যাগটা ফেলেই ছুটে এলাম। তোরা বডি নিয়ে কখন এলি?”
রবি বলল, ‘মিনিট চল্লিশ আগে। হাসপাতাল থেকে বডি রিলিজ, শববাহী গাড়ির ব্যবস্থা সবই প্রশান্ত করেছে। একটা বডি ঢুকেছে, সেটা বেরোলেই রঞ্জনারটা ঢুকবে। প্রশান্ত আছে, এদিক থেকে সমস্যার কিছু নেই। তবে...'। এই বলে থামল রবি ।
নির্মাল্য জানতে চাইল, ‘তবে কী?’
রবি জবাব দিল, ‘মদ খেয়ে চুর হয়ে আছে নবারুণ'।
কথাটা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল নির্মাল্য। বছর কুড়ি আগে একবার প্রচণ্ড মদ্যপান শুরু করেছিল নবারুণ। এমনকী রাস্তা ঘাটে অনেক সময় পড়ে থাকত নবারুণ। শেষ পর্যন্ত রঞ্জনাই তাকে সে পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। তারপর মদ একদম ছেড়ে দিয়েছিল নবারুণ। এই কুড়ি বছরে মদ তো দূরে থাক একটা সিগারেট কেউ তাকে খেতে দেখেনি। সেই নবারুণ মদে চুর হয়ে স্ত্রীর মৃতদেহ দাহ করতে এসেছে! বিজন বলল, ‘এই বয়সে এসে পঁচিশ বছর ঘর সংসার করার পর রঞ্জনার মৃত্যুটা মনে হয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না নবারুণ। তার ওপর ওর ছেলেমেয়েও নেই যে ওকে সামলাবে। নবারুণটা একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে গেল।'
ধৃতিমান বলল, “ওর পক্ষে যে রঞ্জনার মৃত্যুটা কতটা মারাত্মক তা বোঝাই যাচ্ছে। সকাল থেকে আমাদের কারও সঙ্গে একটাও কথা বলেনি, এমনকী প্রশান্তর সঙ্গেও নয়। যে রঞ্জনা একদিন ওকে মদ ছাড়িয়েছিল বহু কষ্ট করে তার মৃত্যু যন্ত্রণা ভোলার জন্য আজ তার মৃতদেহ নিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলে এসেছে সে। দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছে না। ভাগ্যিস প্রশান্ত সঙ্গে ছিল।'
বিজন এরপর নির্মাল্যকে বলল, 'তুই নবারুণের কাছে গিয়ে দেখ। আমাদের মধ্যে তোর সঙ্গেই তো ওর একটু বেশি বন্ধুত্ব। দ্যাখ যদি ওঁকে সামলাতে পারিস একটু কাঁদলেও হয়তো ও কিছুটা হালকা হতে পারবে। নবারুণ একেবারে থম মেরে গেছে।'
বিজনদের কথা শুনে নির্মাল্য শ্মশানের ভিতর প্রবেশ করল। কিছুটা তফাতেই দাঁড়িয়ে আছে চুল্লি ঘরটা। তার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিছু শ্মশানযাত্রী। কোমরে গামছা বাঁধা। যে বডিটা এখন ঘরের ভিতর পুড়ছে তার লোকজন।
গেট দিয়ে শ্মশানের ভিতরে প্রবেশ করলেই ডান হাতে শ্মশানের অফিস ঘর। তার ঠিক সামনে শেডের নিচে একটা চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিল প্রশান্ত। তার এক হাতে চায়ের কাপ। অন্য হাতে কিং সাইজ সিগারেট। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে শ্মশানকর্মীরা। তারা মিউনিসিপ্যালিটির কর্মী, শ্মশানের কাজের দায়িত্বে আছে। প্রশান্ত চেয়ারম্যানসাহেব বলে কথা। তার নামে বাঘে গুরুতেও শহরে এক ঘাটে জল খায়। তাকে ঘিরে ভিড় তো হবেই । নির্মাল্যকে দেখতে পেয়ে প্রশান্ত চোখের ইশারা করল। প্রশান্তর দৃষ্টি অনুসরণ করে নির্মাল্য দেখতে পেল নবারুণকে। উলটোদিকে একটা গাছের নিচে বেদির ওপর একলা বসে আছে নবারুণ। তার সামনেই একটু তফাতে মাটিতে বাখারির চালিতে শুয়ে আছে রঞ্জনার মৃতদেহ।
নির্মাল্য এগিয়ে গেল নবারুণের কাছে। ঘোলাটে দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে তার সামনে শুয়ে থাকা রঞ্জনার দিকে। নির্মাল্যও তাকাল মৃতদেহটার দিকে। মৃত্যুর আগে শেষ কটা মাস বেশ কষ্ট পেয়েছিল রঞ্জনা তার লিভার ক্যান্সারে। এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন ঘুমোচ্ছে। এক সময় রঞ্জনার এই চোখ ঝলসানো রূপের জন্য নবারুণ বন্ধুদের কাছে বেশ ঈর্ষার পাত্র ছিল। সেই রূপ আরও যেন ফুটে বেরোচ্ছে! মনে হচ্ছে এখনই হয়তো সে উঠে মুক্তার মতো হেসে বলবে, ‘কী নির্মাল্যদা, কেমন আছেন?'। মৃত্যু হয়তোবা আলাদা একটা প্রশান্তি এনে দেয় মৃত মানুষের মুখমণ্ডলে। চওড়া করে রঞ্জনার সিঁথিতে সিঁদুর পরানো হয়েছে স্নান করানোর পর। লোকে বলে সধবার মৃত্যু হলে নাকি তার স্বর্গবাস হয়। হয়তোবা সে কারণেই তার সিঁথিতে সিঁদুরের আধিক্য ।
এক টুকরো সাদা কাপড়ে ঢাকা রঞ্জনার দেহ পুড়ে যাবার অপেক্ষাতে নির্মাল্য দেহটার দিকে তাকিয়ে একবার হাতজোড় করে তাকে প্রণাম জানিয়ে নবারুণের পাশে বসল। নির্মাল্য হাত রাখল নবারুণের কাঁধে। সান্ত্বনার হাত।
নির্মাল্যর দিকে মুখ ঘোরালো নবারুণ। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র মদের গন্ধ এসে লাগল নির্মাল্যর নাকে। এই প্রথম মুখ খুলল নবারুণ। ঘোলাটে দৃষ্টিতে নির্মাল্যর দিকে তাকিয়ে নবারুণ বলল, ‘রঞ্জনার সাথে আমাদের প্রথম দেখার কথা মনে পড়ে ?'
একটু চুপ করে থেকে নির্মাল্য বলল, 'হ্যাঁ। সেবার বইমেলাতে আমাদের দুজনেরই প্রথম বই বেরিয়েছিল। আমার উপন্যাস আর তোর কবিতার বই। হঠাৎ তোর সামনে একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়ে তোর বইটা খুলে বলল, ‘একটা অটোগ্রাফ দেবেন? আপনার কবিতা আমার খুব ভালো লাগে? '
কলম খুলে তুই জিজ্ঞেস করলি আপনার নাম কী? সে জবাব দিল, ‘রঞ্জনা'।
নির্মাল্যর জবাব শুনে জড়ানো গলাতে নবারুণ প্রথমে বলল, ‘তোর মনে আছে দেখছি ! পৃথিবীতে কত কিছু ঘটে তাই না! তার কোনোটা জানা যায় আবার কোনোটা জানা যায় না ।
এ কথা বলার পর নবারুণ, রঞ্জনার মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে বলল, “বীরভোগ্যা নারী। বীরভোগ্যা রঞ্জনা'।
রঞ্জনার সঙ্গে সম্পর্ক হবার পর নবারুণের বন্ধুরা যখন ব্যাপারটা নিয়ে ঈর্ষা প্রকাশ করত তখন নবারুণ মজা করে এ কথাটা বলত বন্ধুদের। যাক বহু বছর পর নবারুণের মুখে কথাটা শুনল নির্মাল্য—‘বীরভোগ্যা রঞ্জনা।'
কথাটা বলেই অবশ্য চুপ মেরে গেল নবারুণ। অন্য বন্ধুরাও চায়ের দোকান থেকে এসে পড়ল এরপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগের লাশটা পোড়ানো হল। রঞ্জনার লাশটা ধৃতিমান, রবিরা উঠিয়ে নিয়ে এগোলো চুল্লি ঘরের দিকে। নবারুণ এত মদ খেয়েছে যে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। চুল্লিতে রঞ্জনার দেহটা ঢোকাবার আগে নির্মাল্য কোনোরকমে ধরে তুলে নিয়ে গিয়ে হাজির হল সেখানে। পুরোহিতের দেওয়া চন্দন কাঠের টুকরোটা রঞ্জনার বুকের ওপর রাখার সময় নির্মাল্যর মনে হল নবারুণ যেন আবারও বিড় বিড় করে বলে উঠল 'বীরভোগ্যা রঞ্জনা'।
চুল্লির ভিতর ঢুকে গেল রঞ্জনার দেহ। নির্মাল্যরা, নবারুণকে বাইরে এনে আবার বসাল। নবারুণ বসার পরই কোমরের নীচ থেকে একটা মদের বোতল বার করল। সেটা দেখেই বিজন নবারুণকে বলে উঠল, “কী করছিস তুই! নিজেকে শেষ করবি নাকি। থাম এবার’। কথাটা শুনে নবারুণ, বিজনের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন অদ্ভুতভাবে একবার নিঃশব্দে হাসল। তারপর ঢকঢক করে মদটা গিলে ফেলল। এ যেন কুড়ি বছর আগের সেই হঠাৎ বেহেড মাতাল হয়ে যাওয়া নবারুণ। যাকে পথের ধার থেকে প্রশান্তর সাহায্যে বাড়ি নিয়ে যেত ছিল। নির্মাল্যদের সাথে
যেত রঞ্জনা। প্রশান্ত অবশ্য তখন চেয়ারম্যান হয়নি। উঠতি এই রবিবারের বিকালগুলোতে নিয়মিত আড্ডা দিত হরিদার চায়ের দোকানে।
প্রশান্তর তত্ত্বাবধানে দাহ কার্য সঠিকভাবেই সম্পন্ন হল। প্রশান্তর গাড়িতেই কোনোরকমে নবারুণকে উঠিয়ে গাড়িতে উঠে বসল সবাই। একই পাড়াতেই সবার বাড়ি। নবারুণকে প্রথমে তার বাড়িতে নামিয়ে একে একে অন্যদের নামাবার পর গাড়ি নিয়ে চলে গেল প্ৰশান্ত ।
বিকাল পাঁচটা নাগাদ হরিদার চায়ের দোকানে প্রতি রবিবারের মতোই গিয়ে হাজির হল নির্মাল্য। গত তিরিশ বছর ধরে এটাই বন্ধুদের আড্ডাস্থল। কাজের চাপে এখন অবশ্য এখানে প্রতিদিন আসা হয় না কারওরই। তবে রবিবার বিকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তাদের আড্ডা বসে এখানে। নবারুণও আসে। প্রশান্ত অবশ্য এখন আর পারে না তার কাজের চাপে। তাছাড়া চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়াটা এখন তার পক্ষে ঠিক শোভনীয় নয় । সে তাদের পার্টি অফিসে বসে।
নির্মাল্য, হরিদার চায়ের দোকানে উপস্থিত হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে বিজন, ধৃতিমান, রবিও উপস্থিত হল। দোকান ঘরের বাইরে রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসল সবাই। শীতের বেলা, রোদ মরে গেছে। সাড়ে পাঁচটাতেই অন্ধকার নামবে। হরিদা চায়ের কাপ হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল। নিঃশব্দে চা-পান করল সবাই। চা শেষ করে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধৃতিমান নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, ‘প্রশান্ত কিন্তু সত্যিই অনেক কিছু করল! ওর এত কাজের চাপ, পার্টির চাপ, মিউনিসিপ্যালিটির কাজের চাপ। তার মধ্যে থেকেও কত সময় দিল রঞ্জনার জন্য। হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে দাহকাজ সব দাঁড়িয়ে থেকে করল। নিজের ডিগনিটি ভুলে বেহেড মাতাল হয়ে যাওয়া নবারুণকে বাড়িতেও পৌঁছে দিল। ওকে তো পাবলিককে নিয়ে চলতে হয়। নিজের ইমেজের পরোয়াও করল না। আমরা আর কতটুকু করলাম? যা করার সব ওই তো করল।'
বিজন বলল, ‘ঠিক তাই। শুধু এখন নয়, প্রশান্ত আগেও রঞ্জনা আর নবারুণের পাশে দাঁড়িয়েছে। তোদের মনে আছে, নবারুণ আর রঞ্জনার বিয়ের তিন চার বছরের মধ্যেই যখন নবারুণ হঠাৎ মারাত্মক নেশা করতে শুরু করেছিল তখনও প্রশান্ত রঞ্জনার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেকদিন ওরা দুজন রাতের বেলা এখান ওখান থেকে খুঁজে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেত নবারুণকে। স্ত্রী হিসাবে রঞ্জনা তো দায়িত্ব পালন করেছিলই কিন্তু নবারুণকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মদ্যপান ছাড়ানোর পিছনে প্রশান্তরও ভূমিকা ছিল। আমি তো এও শুনেছি যে প্রশান্ত নাকি একবার সে সময় নবারুণকে এ বলেও ভয় দেখিয়েছিল যে নবারুণ মদ খাওয়া না ছাড়লে সে তাকে জেলে ঢোকাবার ব্যবস্থা করবে'।
ধৃতিমান বলল, ‘বড় ভালো মেয়ে ছিল রঞ্জনা। শুধু সুন্দরী নয়, কেমন হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল। আমাদের বউগুলোর মতো গোমড়া হয়ে থাকতে দেখিনি। সবসময় ও হাসি মুখে আগলে রাখত নবারুণকে। এমন বউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। রঞ্জনার এভাবে চলে যাওয়া সত্যি বড় মর্মান্তিক। একলা হয়ে গেল নবারুণ। এই পঞ্চাশ বছর বয়সে নবারুণ নিশ্চয়ই আর বিয়ে করবে না'।
রবি বলল, ‘আজ নবারুণকে দেখে আমার অন্য আশঙ্কা হচ্ছে। যে নবারুণ গত কুড়ি বছর এক ফোঁটা মদ ছোঁয়নি সে কি আবার নতুন করে মদ ধরল রঞ্জনার চলে যাবার ব্যথা ভুলতে? ব্যাপারটা যদি সত্যি হয় তবে এখন কে সামলাবে ওকে? আমাদের কথা তো নবারুণ শুনবে না। রঞ্জনাও নেই। আর প্রশান্তরও এখন অত সময়ও নেই যে আগলে রাখবে নবারুণকে। এমন হবে না তো যে রাস্তার পাশে অথবা পানশালার সামনে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকবে নবারুণ ?”
বিজন বলল, 'আমার তো মনে হয় সেদিকেই ব্যাপারটা গড়াতে যাচ্ছে। আমি যখন শ্মশানে নবারুণকে মদ খেতে বারণ করলাম তখনও মদ গলায় ঢালবার আগে কেমন অদ্ভুত হাসল খেয়াল করেছিলি?”
নির্মাল্য বলল, 'হ্যাঁ। আমি খেয়াল করেছি'।
বিজন বলল, ‘আমার যেন মনে হল যে ওভাবে সে হেসে বলতে চাইল, ‘খাব, বেশ করব। এবার থেকে রোজ খাব। আমাকে আর বাধা দেবার কেউ নেই। রঞ্জনা নেই” ।
ধৃতিমান বলল, “ব্যাপারটা যদি সত্যি সেদিকেই গড়ায় তবে কী করা যাবে?'
রবি চিন্তান্বিতভাবে বলল, আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন বড় হয়েছে তারা দেখবে বাবার বন্ধু রাস্তাতে মাল টেনে পড়ে আছে। তার চেয়েও বড় কথা আমাদের চোখের সামনেই ও হয়তো শেষ হয়ে গেল দেখতে হবে। এই প্রথম অবস্থাতেই যদি ওকে কোনোভাবে মদ্যপান থেকে আটকানো যায় তাহলে হয়তো নবারুণও পরে আর নাও ধরতে পারে'।
ধৃতিমান বলল, “নবারুণকে কে বোঝাবে সেটা? আমাদের কারও কথা ও শুনবে ভেবেছিস। এমনিতেই ও বরাবর একটু অন্তর্মুখী প্রকৃতির। আর নিজের মনে যেটা ভাবে সেটাই করে'।
রবি বলল, “নির্মাল্যর কথা ও হয়তো শুনলেও শুনতে পারে। নবারুনের তো সব থেকে পুরোনো বন্ধু নির্মাল্যই। দুজনে একসময় একসঙ্গে লেখালিখি করত। একসঙ্গে নানা অনুষ্ঠানে যেত। নির্মাল্য একবার চেষ্টা করে দেখতে পারে'।
নির্মাল্য বলল, ‘সে সব বহু যুগ আগের কথা। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পর থেকে আমার কাছ থেকেও নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিল, লেখালিখিও বন্ধ করে দিল। এমনকী সে কেন হঠাৎ এমন করে মদ ধরেছিল সেটাও আমার কাছে অজানা। গত কুড়ি বছর ধরে এই চায়ের দোকানে তোদের মতো ওর সঙ্গে আমার যতটুকু যোগাযোগ। তোরা যখন বলছিস তখন আমি ওর বাড়ি গিয়ে চেষ্টা করব ব্যাপারটা বোঝাতে।'
চায়ের দোকানে কথা বলতে বলতেই এরপর অন্ধকার নামতে শুরু করল। স্ট্রিট লাইট জ্বলে উঠল। হরিদা আর এক রাউন্ড চা দিয়ে যাবার পর সে চা শেষ করে ধৃতিমান বলল, ‘আমাকে এবার উঠতে হবে। দিনের বেলা তো শ্মশানেই কেটে গেল। কাল থেকে আবার অফিস। সপ্তাহর বাজারটা করে রাখতে হবে। তবে নবারুণের ব্যাপারটা মাথায় চিন্তা রয়ে গেল। রঞ্জনার পিছন পিছন মদ না তাকে আবার টেনে নিয়ে যায়।
আড্ডাটা আর সেদিন তেমন হল না। ধৃতিমান চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে রবি আর বিজনও নিজের কাজে বেরিয়ে গেল। নির্মাল্য একলা বসে রইল। তবে সবাই যে নবারুণের মদ্যপানের ভবিষ্যৎ চিন্তা নিয়ে গেল তা বুঝতে অসুবিধা হল না নির্মাল্যর।
নির্মাল্য বসে বসে ভাবতে লাগল পুরোনো দিনের কথা। নবারুণের কথা, রঞ্জনার কথা কৈশোরে একই সঙ্গে লেখালেখি শুরু করেছিল। নবারুণ বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় কবিতা লেখা ছেড়ে মদ্যপান ধরেছিল। নির্মাল্য ভেবেছিল সব নেশার রোগ কেটে যাবার পর নবারুণ হয়তো আবার লেখার জগতে ফিরে আসবে, কিন্তু নবারুণ আর কলম ধরেনি। নির্মাল্য অবশ্য একটা সংবাদপত্রের অফিসে চাকরি করার পাশাপাশি এখনও লেখে। লেখক হিসেবে বেশ কিছুটা নামও হয়েছে তার। নবারুণ যদি আজ লেখার সঙ্গে যুক্ত থাকত তবে সে আরও কোনো বড় জায়গাতে যেতে পারত বলে নির্মাল্যর ধারণা। এক সময় যেখানেই গল্প পাঠ, কবিতা পাঠের আসর বসত সেখানেই তারা দুজনেই ছুটত। বিশেষত এই শীতকালে নানা বইমেলা, গল্প পাঠের, কবিতার আসরে যেত তারা। রঞ্জনার সঙ্গে নবারুণের পরিচয় হবার পর থেকে সে সব জায়গাতে রঞ্জনাও গিয়ে হাজির হতো। তেমনই এক গল্প পাঠের আসরে রঞ্জনাকে লেখা কবিতা সম্মিলিত প্রথম প্রেমপত্রটা নির্মাল্যর হাত দিয়ে সবার অগোচরে রঞ্জনাকে পাঠিয়েছিল নবারুণ। বিয়ের আগে রঞ্জনাকে নিয়ে নবারুণ একবার ডায়মন্ড হারবারে বেড়াতে গেছিল, আর নির্মাল্য তাদের সঙ্গে গেছিল ভ্যানগার্ড হিসাবে। অন্য বন্ধুরা ভেবেছিল নির্মাল্য আর নবারুণ মনে হয় কোনো গল্প কবিতার অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। যৌবনের সোনালি স্মৃতি সব।
তবে অন্য বন্ধুদের মতো নবারুণের নতুন করে মদ্যপান শুরু করার ব্যাপারটা নির্মাল্যর মনেও একটা আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে নির্মাল্যর মনে হল নবারুণ এখন কী করছে? তার নেশা কি কেটেছে? নাকি নেশা কাটার পর আবার সে মদ খেতে শুরু করেছে?
পরপর টানা ক-দিন অফিস নির্মাল্যকে ছুটি দিয়েছে। বাড়িতে তেমন কোনো কাজ নেই। নির্মাল্য চায়ের দোকানে এসেছিল রাত আটটা পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার জন্যই। আড্ডাটা তেমন হল না ।
—“আচ্ছা, নবারুণের বাড়ি গেলে কেমন হয়? হয়তো সে এখন একাকিত্ব কাটাবার জন্য কোনো সঙ্গী খুঁজছে। এ সময় তার কাছে কারও থাকা দরকার। তাছাড়া সম্ভব হলে তাকে বোঝানোও যাবে বন্ধুদের দুশ্চিন্তার কথা।'
এ কথা ভেবে নিয়ে নির্মাল্য কিছুক্ষণের মধ্যেই উঠে পড়ল চায়ের দোকান থেকে। পায়ে হেঁটে সে পৌঁছে গেল নবারুণের বাড়ির সামনে। বেশ বড় বাড়ি। সামনে একটা ছোট বাগানও আছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত রঞ্জনাই ওই বাগানের পরিচর্যা করত।
গেট খুলে বাগান পেরিয়ে নবারুণের বারন্দায় উঠে দরজাতে টোকা দিল নির্মাল্য। প্রথমে কোনো সাড়া এল না। তবে দরজার পাল্লাটা একটু ফাঁক হয়ে গেল। ভিতরে আলো জ্বলছে। পাল্লা ঠেলে নবারুণের ড্রয়িং রুমে পা রেখে নির্মাল্য হাঁক দিল ‘নবারুণ? আমি নির্মাল্য এসেছি'।
বাড়ির ভিতরের কোনো ঘর থেকে এবার নবারুণের গলা শোনা গেল ‘কে নির্মাল্য ! দু-মিনিট বস, আমি আসছি'।
নির্মাল্য বলল, ‘আচ্ছা আয়’।
জবাব দিয়ে নির্মাল্য তাকালো ঘরটার চারদিকে। বহুদিন পর আজ নির্মাল্য পা রাখল নবারুণের এ ঘরে। পরিপাটি ভাবে সাজানো ঘরটাতে একপাশে দেওয়াল ঘেঁষা টেবিলের ওপর রাখা আছে রঞ্জনার ফ্রেমে বাঁধানো একটা বেশ বড় ছবি। রঞ্জনা যেন সেই ছবির ভিতর থেকে তাকিয়ে হাসছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা সোফা। আর সামনে কাচের টপওয়ালা একটা ছোট টি টেবিল। নির্মাল্য সোফায় বসতে যাচ্ছিল হঠাৎ তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা লাল কাপড়ে বাঁধাই করা একটা খাতা। পুরানো খাতাটা দেখেই নির্মাল্য খাতাটা চিনতে পারল। এই খেড়োর খাতার মতো কাপড় মোড়ানো খাতাটাতেই এক সময় কবিতা লিখত নবারুণ! নবারুণ কি আবার তবে কবিতা লিখছে?
নির্মাল্য উৎসাহিত হয়ে খাতাটা তুলে নিল। একটা পাতার ভেতর কলম গোঁজা। সেই পাতাটাই নির্মাল্য খুলল। না কবিতা নয় নবারুণ সদ্য কিছু লিখেছে সেখানে। নির্মাল্যর চোখ আটকে গেল লেখাটাতে। নবারুণ লিখেছে—
“রঞ্জনাকে দাহ করে শ্মশান থেকে ফিরলাম। জীবনের একটা নিষ্ঠুর অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল আজ। বহু বছর পর আজ আমাকে এত মদ্যপান করতে দেখে আমার বন্ধুরা সবাই নিশ্চিত আতঙ্কিত, ব্যথিত। তারা হয়তো ভাবছে রঞ্জনার শোকে কাতর হয়ে আমি আবার কুড়ি বছর আগের সেদিনে ফিরে যাব যেদিন আমি মাতাল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতাম । বন্ধুরা জানে না আমার আজকের এই শেষ মদ্যপান আমার নিজের প্রতি নিজের কথা রাখা ।
হয়তোবা কোনো অসহায় মানুষের উদ্যাপন। আমার বন্ধুরা কোনোদিন জানবে না কেন আমি মাতাল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতাম। যেদিন আমি প্রশান্ত আর রঞ্জনাকে আমার বাড়িতে এক বিছানায় দেখি সেদিন আমি সহ্য করতে পারিনি সে দৃশ্য। প্রতিবাদ করে কোনো ফল হতো না। প্রশান্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা আর রঞ্জনার স্পৃহার কাছে আমি তখন অসহায় আমাকে ওরা শাসিয়ে ছিল প্রতিবাদ করলে বধূ নির্যাতনের মামলাতে আমাকে ওরা ফাসাবে। ভয়, লজ্জাতে সে কথা বলতে পারিনি। বললে হয়তো সে কথা কেউ বিশ্বাস করত না। আমি মদ ধরলাম। শুরু করলাম প্রচণ্ড মদ খাওয়া। বাড়িতে থাকতে ঘৃণা হতো বলে রাস্তাতে পড়ে থাকতাম। রঞ্জনা আর প্রশান্ত যে আমাকে রাস্তা থেকে তুলে আনত তার পিছনে কারণ ছিল। আমি বাড়িতে থাকা অবস্থায় প্রশান্ত আমার বাড়িতে রাত কাটালেও প্রতিবেশীরা সন্দেহ করবে না। আমার বন্ধুরা মনে করে আমাকে মদ্যপান ছাড়ানোর কৃতিত্ব রঞ্জনার ব্যাপারটা তা নয়। আমার সে সময় হঠাৎ একদিন মনে হল, এ আমি কী করছি? কেন নিজেকে এমন ভাবে শেষ করছি? তাতে ভবিষ্যতে রঞ্জনারই সুবিধা হবে। না আমাকে বাঁচতে হবে। দেখে যেতে হবে রঞ্জনার মৃত্যু। যেদিন তা দেখব সেদিন তা উদযাপনের জন্য শেষবারের মতো মদ্যপান করব। আর তারপর থেকে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে মদ ছেড়ে রঞ্জনার মৃত্যু কামনা করেছি এই কুড়ি বছর ধরে। হয়তো ব্যাপারটা কাকতালীয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত আজ রঞ্জনার মৃত্যু দেখলাম আমি। নিজের কাছে নিজের দেওয়া কথা রাখতে শেষবারের জন্য আজ মদ খেলাম। রঞ্জনা এখন মৃত। এখন আর রঞ্জনার প্রতি ক্ষোভ, ঘৃণা নেই আমার। সে আর এখন বীরভোগ্যা প্রশান্তর রঞ্জনা নয়। আমার মতো নিরীহ মানুষের রঞ্জনা'।
নবারুণের পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে এরপর তাড়াতাড়ি খাতাবন্ধ করে সেটা রেখে দিল নির্মাল্য। নবারুণ ঘরে ঢুকল, তার হাতে একটা ফুলের মালা। সে বলল, 'বাগান থেকে ফুলে তুলে মালা গাঁথলাম'। —কথাটা বলে সে এগিয়ে গিয়ে মালাটা যত্ন করে পরিয়ে দিল রঞ্জনার ছবিতে। তারপর সে আবার ফিরে তাকাল নির্মাল্যর দিকে। না তার মুখে কোনো ঘৃণা জেগে নেই সেটা বুঝতে পারল নির্মাল্য।
নবারুণ তাকে বলল, ‘ভয় নেই তোদের। আমি আর মদ ছোঁব না। ভাবছি আবার কবিতা লেখা শুরু করব'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন