হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
কিছুটা তফাতে একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে ড্রাইভার জানতে চাইল, ‘চা খাইবেন ছার? গাড়ি দাঁড় করামু?”
বিকাল হয়ে এসেছে। অফিসে থাকলে এ সময় একবার চা পান করে ইফতিকার । ড্রাইভার এ ব্যাপারটা জানে ।
কুমিল্লার এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটা এতিমখানা আছে। সরকারের তরফে তারই একটা পরিদর্শন করে ঢাকায় ফিরছেন ইফতি। যদিও এ জেলায় আরও কয়েকটা এতিমখানা পরিদর্শন করার জন্য পরপর ক-দিন তাকে এ অঞ্চলে আসতে হবে। কোনো সরকারি ভবনে থাকার ব্যবস্থা হয়তো করে নিতে পারতেন ইফতি। কিন্তু ঢাকার বাসা থেকে এ অঞ্চলের দূরত্ব মাত্র ঘণ্টা তিনেকের পথ। তাছাড়া আয়েষা আর রাসেলকে ছেড়ে বাইরে থাকতে মন চায় না ইফতির। রাসেলের বয়স মাত্র ছয়। যে অপেক্ষা করে থাকে তার আব্বু কখন বাড়ি ফিরবে বলে। তাই ইফতি ঠিক করেছেন এ কয়দিন বাসা থেকেই এদিকে যাওয়া আসা করবেন তিনি। তবে এ জেলাতে পা রাখলেই ইফতির মনে পুরোনো স্মৃতি জেগে ওঠে। তার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে এ জেলাতেই। যদিও যে জায়গাটা ইফতির পরিদর্শনস্থল থেকে অনেকটা দূর, জেলার অপর প্রান্তে এবং এখন যেখানে আর তার নিজের বলতে কেউ নেই। তবে সেই একই জেলা তো বটে, তাই এদিকে এলেই তাঁর মনে পুরোনো স্মৃতি হাতছানি দেয়। তেমনই পুরোনো দিনের কথা ভাবছিলেন ইফতি। চালকের কথা শুনে তিনি বললেন; হ্যাঁ, ভাই দাঁড়ান।'
সরকারি গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল একটু এগিয়ে দোকানটার সামনে। গাড়ি থেকে দু'জনেই নামলেন। কাঁচা রাস্তার গায়েই দরমার বেড়া আর খড়ের ছাউনি দেওয়া নেহাতই ছোট্ট একটা দোকান। সামনে মাটির উনান। এই দুপুরবেলা দোকানে খুব একটা খদ্দের আসে না। দোকানিকে ইফতি দুটো চা দিতে বলাতে সে বলল; ছার একটু বসুন, আমি অখনই বানায় দিতাছি।'
দোকানের বেড়ার গায়ের এক পাশে ছায়াতে বাখারির বেঞ্চ বা সরু মাচার মতো বসার জায়গা করা আছে। ইফতি সেখানে বসলেন। রাস্তার দু-পাশের ঢাল বেয়ে নামলেই দুটো খাল। হয়তো-বা এরা আসলে কোনো নদীর শাখা এরা। তার একটা আবার গিয়ে মিশেছে দূরে একটা জলাশয়ের সঙ্গে। যেটা একটা বিল। কুমিল্লা মানেই তো খালবিলের দেশ সেদিকেই তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন ইফতি। ঠিক ওদিকেই তো অনেক দূরে এক সময় ইফতির বাসা ছিল। যদিও সে বাসা আজ আর নেই। আব্বু আর মা, কবরে ঘুমাতে যাবার পর পাছে সেই অন্য বাসাটা বেদখল হয়ে যায় সেই ভয়ে কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আয়েষার পরামর্শ মেনে ইফতি সেটা বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে মাটির টান বড় টান, তাই ওদিকে তাকিয়ে পুরোনো দিনের কথা ভাবার চেষ্টা করতে লাগলেন ইফতি। যদিও সময় অনেক স্মৃতিকেই মুছে দিয়েছে মন থেকে। খালবিল ঘেরা সেই ছোট্ট গ্রামটাতে প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল ইফতি আর পা রাখেননি। তিনি আর এখন কুমিল্লার কোন প্ৰায় নামহীন গ্রাম কইখালের বাসিন্দা নন, তিনি এখন শহুরে মানুষ, বাস করেন ঢাকার অন্যতম অভিজাত অঞ্চল গুলশন-এক-এ। এখনও বিস্তর ফারাক দু-ই অঞ্চলের মানুষের আভিজাত্য ও জীবনযাত্রায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাচের গ্লাসে চা দিয়ে গেল দোকানি। সস্তা দামের চা। কে আর এ অঞ্চলে ইফতির বাসার মতো দার্জিলিং চা কেনার ক্ষমতা রাখে? দোকানটা যেখানে অবস্থিত এ জায়গা দেখলেই বোঝা যায় চারপাশের বাসিন্দারা হল জেলে জোলা। আর এ অঞ্চলে পাকা ঘরবাড়ি বলতে যা আছে তা সবই সরকারি বদান্যতায় তৈরি স্কুলবাড়ি অথবা অনাথ শিশুদের আবাসস্থল বা এতিমখানা। তবুও স্থান মাহাত্মের কারণেই সম্ভবত আধা নোংরা কাচের গ্লাসে গুঁড়ো দুধ গোলা সেই সস্তা চা-ই কিছুটা সময় নিয়ে বেশ তৃপ্তি করে পান করলেন ইফতি। ড্রাইভারের চা-পানও শেষ হয়ে গেছে। ইফতি তাই এরপর মাচা ছেড়ে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন পয়সা মিটিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসার জন্য।
চায়ের দাম নিশ্চয়ই কুড়ি টাকা হবে । -এ কথা অনুমান করে ইফতি পার্স থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে বাড়িয়ে দিলেন দোকানদারের দিকে। কিন্তু দোকানদার বলল, ‘আমার কাছে তো তিরিশ টাকা ফিরত দিবার মতো খুচরা নেই ছার ।’
ঠিক সেই সময় ইফতির চোখ গেল দোকানের ভিতর রাখা কয়েকটা কাচের বোয়ামের দিকে। অতি সাধারণ ও সস্তা দামের কিছু খাদ্যদ্রব্য রাখা আছে তার মধ্যে। সেই বোয়ামগুলোর একটার দিকে তাকিয়ে ইফতি যেন স্বগোতক্তির স্বরেই বলে উঠলেন; ‘আরে ওগুলো মাছ লজেন্স না!’
দোকানদার জবাব দিল, 'হ্যাঁ, ছার মাছ লজেন।'
বোয়ামটার দিকে তাকিয়ে আর দোকানদারের কথা শুনে ইফতি যেন চলে গেলেন প্রায় চল্লিশ বছর আগের শৈশবে। কুমিল্লার সেই ইশ্বরী পাঠশালা। তার সামনে মাঠের গায়ে একটা ছোট্ট দোকান। টিফিন পিরিয়ডে ছোটছোট ছেলেরা ভিড় জমাতো ওই দোকানে গিয়ে । বিস্কুট, হজমি গুলি ইত্যাদির সঙ্গে সে দোকানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল চিনির তৈরি, মাছের আকৃতির স্বচ্ছ কাচের মতো ইঞ্চি চারেক লম্বা মাছ লজেন্স। চিনিরই রঙিন রস দিয়ে সে মাছের চোখ মুখ, মাছ আঁকা থাকত। ছোট ছোট শিশুদের কাছে তা খেলনা আর খাদ্য দ্রব্য হিসাবে একই সঙ্গে ব্যবহৃত হতো। কী স্বাদ ছিল তার। তা যেন ইফতির এখনও মুখে লেগে আছে! যেন অমৃত! ইফতির ইচ্ছা হল, একটা মুখে দিয়ে চুষে দেখেন তিনি ইফতির কথা শুনে আর তাকে মাছ লজেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দোকানদার একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘লজেন্স দেব ছার?'
ইফতি বললেন, 'হ্যাঁ, দিন।'
লোকটা তাক থেকে বোয়ামটা নামিয়ে কাচের চ্যাপটা ঢাকনা খুলে একটা লজেন্স বার করল। হ্যাঁ, ঠিক সেই একই রকম দেখতে মাছ লজেন্স। চ্যাপ্টা স্বচ্ছ কাচের মতো দেখতে মাছের আকৃতির লজেন্স। তার গায়ে চোখ, আঁশ, লেজ আঁকা আছে। মুহূর্তর মধ্যে তা দেখেই যেন মুখে জল চলে এল ইফতির। তাঁর জিহ্বা যেন ফিরে গেল শৈশবে, ব্যাকুল হয়ে উঠল মাছ লজেন্সের সেই অমৃত আস্বাদ গ্রহণের জন্য। দোকানির থেকে হাত বাড়িয়ে লজেন্সটা নিতে যাচ্ছিলেন ইফতি। কিন্তু ঠিক সেই সময় তার মনে পড়ে গেল রাসেলের কথা। তার যা বয়স, সে বয়সেই তো ইফতির আব্বু ইফতিকে প্রথম মাছ লজেন্স খাইয়ে ছিলেন। কিন্তু এ জিনিস ইফতি এখনও রাসেলকে খাওয়াতে পারেননি। তার কারণ হল এ জিনিস সম্ভবত ঢাকায় পাওয়া যায় না, বিশেষত গুলশন, বনানীর মতো অভিজাত জায়গায় তো এ জিনিস বিক্রি হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই কারণ সেখানের দোকানগুলোতে বিদেশি চকলেট ক্যাডবেরির, বিদেশি লজেন্সের রাজত্ব। সেখানকার মানুষেরা হয়তো কেউ জানেই না যে এ ধরনের অদ্ভুত সুন্দর খেতে মাছ লজেন্স কোথাও ছিল বা আছে। ইফতিতো নিজেই প্রায় ভুলতে বসেছিলেন এ লজেন্সের কথা। তাই রাসেলের মুখে ও জিনিস তুলে দিতে পারেননি তিনি। তবে ঠিক এই মুহূর্তে ইফতির মনে হল, এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। রাসেল নিশ্চয়ই খুব আনন্দ পাবে এ লজেন্স পেয়ে। বাসায় ফিরে তিনি রাসেলের সঙ্গে মাছ লজেন্স মুখে দেবেন। তার সঙ্গে তিনি ফিরে যাবেন তার শৈশবে। যখন তিনি ছিলেন রাসেলের বয়সে অথবা তার থেকে একটু বড়। এ ভাবনাটা মাথায় আসতেই তিনি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেন-এ লজেন্সের দাম কত? '
সে জবাব দিল ‘পাঁচ টাকা ছার।’
ইফতির শৈশবে যে লজেন্সর দাম ছিল পাঁচ পয়সা, তারই দাম এখন পাঁচ টাকা! মাঝে বেশ কয়েকটা যুগ কেটে গেছে, সব চেয়ে বড় কথা সব কিছুর বিচার কি আর দাম দিয়ে করা যায়? এই মাছ লজেন্সের স্মৃতির দাম যে ইফতির কাছে অমূল্য। তিনি নিছকই কৌতূহল বশত প্রশ্নটা করেছেন দোকানদারকে। তাই তিনি আর বেশি বাক্যব্যয় না করে পঞ্চাশ টাকার নোটটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “বাকি টাকাটার মাছ লজেন্স দিয়ে দিন ভাই।' কারণ, এ লজেন্সের যা স্বাদ তাতে রাসেল নিশ্চয়ই একটা খাবার পর আরও খেতে চাইবে। ঢাকায় তো আর এ লজেন্স পাওয়া যাবে না।
দোকানদার গুনে গুনে ছয়টা লজেন্স ঠোঙায় ভরে ইফতির হাতে তুলে দিল। ইফতি ঠোঙাটা সাবধানে তার কোটের পকেটে রেখে গাড়িতে উঠে বসলেন। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হল গাড়ি। আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। বাসা থেকে কল দিয়েছে তাঁকে। ইফতি কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাসেলের গলা শোনা গেল, “তুমি কই? কখন বাসায় ফিরবা আব্বু?”
আব্বুর বড় ভালোবাসার মানিক রাসেল। তাঁর একটু বেশি বয়সেই রাসেলের জন্ম হয়েছে। হয়তো-বা সে কারণেই বাপ-ব্যাটার মধ্যে আদরের টানটা আরও বেশি। ইফতির কলিজা রাসেল। তার কণ্ঠ শুনে ইফতি জবাব দিলেন, ‘আসতাছি সোনা আমার। সন্ধ্যার মধ্যেই বাসায় পৌঁছায় যাব যদি জ্যাম না থাকে। তুমি দুপুরে ঠিক করে খায়ছ তো?”
সে জবাব দিল, “হ্যাঁ, খাইছি।'
এ কথা বলে রাসেল আসল প্রশ্নটা করল, ‘তুমি আমার জন্য কী আনতাছ?'
প্রতিদিনই ইফতি বাড়ি ফেরার আগে রাসেল তাকে ফোন দিয়ে এ কথাটা জানতে চায় । ইফতিও তার জন্য প্রতিদিন কোনো না কোনো কিছু নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ছোটখাটো খেলনা বা খাবার জিনিস, ক্যাডবেরি, চকোলেট এসব। তবে মাছ লজেন্স নয়, কারণ তা ঢাকা বা গুলশুনে পাওয়া যায় না। ইফতি ভেবে রেখেছেন, মাছ লজেন্সটা দিয়ে আজ চমকে দেবেন ছেলেকে। তিনি ব্যাপারটা সম্বন্ধে রাসেলকে না জানাতে চাইলেও তার প্রশ্ন শুনে বলে ফেললেন; মাছ। '
অবশ্য ‘লজেন্স' শব্দটা বলার আগেই তিনি সামলে নিলেন নিজেকে।
‘আচ্ছা আব্বু, তাড়াতাড়ি আইস।'—এ কথা বলে এরপর ফোন কেটে দিল রাসেল । কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের রাস্তা ছেড়ে প্রথমে পাকা সড়কে তারপর মহা সড়কে উঠে পড়ল গাড়ি। মসৃণ সড়ক বেয়ে গাড়ি রওনা হল ঢাকার দিকে। চলার পথে দুটো ভাবনা তাঁর মনকে প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলল। এক তাঁর শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি! কত হারিয়ে যাওয়া মুখ যেন বহুদিন পর উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার মনে—বাবার কোলে চড়ে ঘুরে বেড়ানো, তাঁর বাল্যকাল, কৈশোরের স্মৃতি, তার ফেলে আসা ঈশ্বরী পাঠশালা, তার মাঠ, আর সেই মাঠ সংলগ্ন ছোট দোকানটা! ফেলে আসা দিনের স্মৃতিতে যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন ইফতি। আর এর সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মাঝে তিনি কল্পনা করতে লাগলেন যখন তিনি একটা মাছ লজেন্স রাসেলের হাতে তুলে দেবেন তখন সেটা হাতে নিয়ে, জিভে দিয়ে শৈশবের নির্মল আনন্দে ভরা রাসেলের মুখটা। ঠিক যেমন ইফতির মুখও একদিন আনন্দে ভরে উঠত মাছ লজেন্স চুষতে চুষতে। শৈশব তো সবার একই থাকে তাই না?
এসব ভাবতে ভাবতে ঘণ্টাখানেকের পথ অতিক্রম করে ইফতিকার যে কখন ঢাকায় পৌঁছে গেলেন তা খেয়াল করতে পারলেন না। সারাটা পথ তিনি বিভোর হয়ে অতিক্রম করলেন শৈশবের স্মৃতিতে ডুব দিয়ে ।
‘ছার, আমরা বাসায় পৌঁছে গেছি।' –এ কথা ড্রাইভারের মুখে শুনে ইফতির হুঁশ ফিরল। ড্রাইভার খেয়াল করেছেন ইফতিকার স্যার গভীরভাবে কোনো কিছু চিন্তা করছেন। বাসার কাছে পৌঁছে গেলেও তাঁর নামার উদ্ৰেক নেই ।
ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা এই গুলশন । স্কাই স্ক্র্যাপার বিল্ডিংগুলোতে উচ্চবিত্তদের বাস। আয়েষা যদি তার ব্যবসায়ী পিতার সম্পত্তি না পেত তবে কখনওই ইফতির এখানে বসবাস সম্ভব ছিল না। ড্রাইভারের কথা শুনে ইফতি দেখলেন তিনি তাঁর বহুতলের সামনে পৌঁছে গেছেন। গাড়ি থেকে নেমে ইফতি বহুতলের ঘেরাতে প্রবেশ করে এগোলেন লিফটের দিকে। বাইরে তখন অন্ধকার নামতে শুরু করেছে যেমন নামে ইফতির ফেলে আসা কুমিল্লার গ্রামে। তবে সে জায়গার সঙ্গে পার্থক্য হল এ অঞ্চলে অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে উঠতে শুরু করেছে নাগরিক জীবনের উজ্জ্বল আলো। চোদ্দো তলায় অ্যাপার্টমেন্ট সরকারি বিভাগের বড় অফিসার ইফতিকার সাহেবের। বুক পকেটে এক ঠোঙা মাছ লজেন্স নিয়ে, বলা ভালো এক বুক শৈশব নিয়ে ইফতি লিফটে চেপে তার চোদ্দো তলার ফ্ল্যাটের দিকে উঠতে শুরু করলেন। ডোর বেল বাজাতেই কাজের বুয়া এসে দরজা খুলে দিল। বাসায় পা রাখলেন ইফতি।
তাঁর চোদ্দো তলা আকাশ ছোঁয়া বাসা। ফার্নিশড ফ্ল্যাট। আসবাব, মেঝের কার্পেট, জানলার পর্দা, সব কিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া আয়েষার আব্বুর সৌজন্যে। প্যাসেজে জুতো খুলে ইফতি ড্রইংরুমে সোফায় গিয়ে বসতেই তার পায়ের শব্দে পাশের ঘর থেকে যথারীতি ছুটে এল রাসেল সোনা। সদ্য ঘরে ফেরা সোফায় বসা আব্বুর কাছে এসে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরল সে। ইফতিকারও তাকে সস্নেহে জড়িয়ে ধরে তার কপালে চুমা দিলেন। রাসেল এবার তাঁকে বলল, ‘মাছ আনছ? মাছ?'
ইফতি বললেন, ‘আনছি বাবা।’
এ কথা বলে তিনি কোটের বুক পকেটে রাখা ঠোঙাটা বার করে তার ভিতর থেকে একটা মাছ লজেন্স নিয়ে তুলে ধরলেন রাসেলের সামনে ।
সেটা দেখে বিস্ময় ফুটে উঠল বাচ্চা ছেলেটার চোখে মুখে। মাছ বলতে সে ভেবেছিল যে মাছ এতদিন সে খেয়ে এসেছে তেমন কোনো মাছ এনেছেন আব্বু। ইলিশ, চিংড়ি, পাবদা, বোয়ালের মতো মাছ। রাসেল মাছ খেতে বড় ভালোবাসে। কিন্তু এ কেমন মাছ ?
ইফতি মাছ লজেন্সটা দিলেন তার হাতে। মৃদু বিস্মিতভাবে রাসেল সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। তা দেখে ইফতির মনে হল, ছেলেটা বুঝে উঠতে পারছে না তার হাতের মাছটা কোনো খেলনা নাকি খাদ্যদ্রব্য? ইফতি তাই ছেলের উদ্দেশে বললেন, ‘এটা লজেন্স। মুখে দিয়া দ্যাখো, কী সুন্দর সোয়াদ। আমি যখন তোমার মতো ছোট ছিলাম তখন খাইতাম। ইফতির কথা শুনে রাসেলের চোখে বিস্ময়ের ভাব যেন আরও একটু প্রকট হল। মাছ লজেন্সটা মুখে দিল সে। ইফতি আর একটা মাছ বার করে নিজের মুখে দেবার আগে তাকালেন রাসেলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্য।
ধীরে ধীরে কয়েকবার মাছের গা-টা চাটলো রাসেল। ঠিক যেমন চাটতেন ইফতি। এবার নিশ্চয়ই রাসেলের মুখমণ্ডলে নির্মল আনন্দের ভাব ফুটে উঠবে, যেমন ফুটে উঠত বালক ইফতির। এমনই আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু এরপরই হঠাৎ রাসেলের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেল! সে বেশ জোরে থুঃ থুঃ করে উঠে ওয়াক দিল। যেন কেউ নিমের পাঁচন দিয়েছে তার মুখে! নিজের হাতের মাছ লজেন্সটা আর মুখে দেওয়া হল না ইফতির। ঘটনার আকস্মিকতায় এক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন; ‘কী হল?’
কিন্তু তার আগেই ছেলের ‘ওয়াক, থুঃ’ শব্দ শুনে ঘরে প্রবেশ করল আয়েষা। রাসেলের হাতে তখনও মাছ লজেন্সটা ধরা। বিকৃত মুখে সে তাকাল তার মায়ের দিকে। তা দেখে আয়েষা দ্রুত তার কাছে ছুটে এসে তার হাত থেকে মাছ লজেন্সটা ছিনিয়ে নিয়ে বলে উঠল “কী এটা?’
ইফতি বললেন, ‘মাছ লজেন্স। এতিমখানা থেকে ফেরার পথে কুমিল্লাতে একটা দোকানে দেখতে পেলাম। তাই কিনে আনলাম।'
আয়েষা জিজ্ঞেস করল, 'কত দাম এর?'
ইফতি বললেন, ‘পাঁচ টাকা পিস।’
এরপর তিনি বলতে যাচ্ছিলেন; কেন তিনি এই লজেন্স হঠাৎ কিনে আনলেন। বলতে যাচ্ছিলেন তার ছেলেবেলার মাছ লজেন্সর কথা। কিন্তু তার আগেই আয়েষা তাঁর উদ্দেশ্যে ভর্ৎসনার সুরে বলে উঠল; ‘ছিঃ ছিঃ এই অখাদ্য-কুখাদ্য তুমি ছেলেরে দিতাছ? তোমার কি আক্কেল লোপ পাইতাছে? পাঁচ টাকার লজেন্স! আমার ছেলেটাকে কি তুমি কুমিল্লার এতিম পাইছ?' এই কথা বলেই সে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ইফতি শুনতে পেলেন, বেসিনের কলখোলার শব্দ। পানি দিয়ে বাচ্চাটার মুখ কুলকুচি করাতে করাতে আয়েষা বলছে, ‘লোকটা আমার ছেলেটাকে কোনদিন মাইরা ফেলবে দেখতাছি। নইলে এই এতিম লজেন্স কেউ আইনা দ্যায় ?”
কিছুক্ষণ পর আবার সে ঘরে প্রবেশ করল রাসেল। তার মুখে এবার হাসি ফুটে উঠেছে। মুখের বিস্বাদ দূর করার জন্য রাসেলের মা তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে দামী ক্যাডবেরি। যা খেতে সাধারণত সে অভ্যস্ত।
আগের দিনের মতোই তাঁর কাজ সেরে কুমিল্লার মেঠো পথ ধরে গাড়ি নিয়ে ফিরছিলেন ইফতিকার। বিকাল হতে চলেছে। শেষ দুপুরে আলো ঝিলিক দিচ্ছে পথের দু-পাশের খালবিলে। একটু সতর্কভাবেই রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। গত কালের সেই দোকানটা চোখে পড়তেই ড্রাইভার কিছু বলার আগে ইফতি বললেন, ‘দোকানটার সামনে দাঁড়াবেন ভাই, চা খাব।'
গাঁড়ি দাঁড়াল। তারা দুজন নামলেন। গত দিনের মতো আজও দোকানে অন্য কোনো খদ্দের নেই। চা’ও বানানো ছিল না। গত দিনের মতোই দোকানদার বলল, একটু বসার জন্য, সে চা করে আনছে। ড্রাইভার দোকানের সামনের বেঞ্চে বসলেন আর ইফতি এগোলেন দোকানের পিছন দিকে। যে জায়গা থেকে মৃদু ঢাল বেয়ে নামলেই খালের পাড়। সাবধানে নীচে নেমে খালের পাড়ে এসে দাঁড়ালেন তিনি। সূর্যের আলোয় চিক্ চিক্ করছে খালের পানি। দু-একটা মাছরাঙা উড়ে বেড়াচ্ছে পানির ওপর। বাতাসে মৃদু মৃদু কাঁপছে পানি। ছোট খালটা গিয়ে মিশেছে দূরের বড় নদীতে, জলাশয়ে, তারপর তা বাঁক নিয়ে হারিয়ে গেছে দুরের দিকচক্রবালে। যেদিকে ইফতির জন্মস্থান সেই খালে বিলে ঘেরা অখ্যাত গ্রাম কইখাল। যেখানে রয়েছে ইফতির শৈশব, কৈশোর, সেই ঈশ্বরী পাঠশালা আর সেই মাছ লজেন্সের দোকানটা। কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর ইফতি তার কোটের পকেট থেকে গতকালের মাছ লজেন্সের ঠোঙাটা বার করলেন। না, মাছ লজেন্স তিনি আর মুখে দেননি। দেননি ভয়ে। কে জানে তার শহুরে জিভে যদি আজ মাছ লজেন্সগুলো বিস্বাদ লাগে? যদি বিস্বাদে ভরে ওঠে তার অতীতের স্মৃতি? এ পৃথিবীতে তো আজকে তিনি বলতে গেলে এতিমই। ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের মধুর স্মৃতিগুলো যে তাঁর কাছে অত্যন্ত দামি। হাঁটু মুড়ে খালের পাড়ে বসে পড়লেন ইফতিকার। তারপর ঠোঙা থেকে একটা একটা করে মাছ লজেন্স নিয়ে ভাসিয়ে দিতে লাগলেন পানিতে, আর লজেন্সগুলো যেন জীবন্ত হয়ে তরতর করে সাঁতরে চলল, ভেসে চলল সেদিকে, যেখানে তাদের বাসস্থান, সেই ছোট্ট গ্রাম, সেই ঈশ্বরী পাঠশালা ইফতির শৈশব, কৈশোরের কাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন