বইপাড়া ও বারবনিতা

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

এ গলির পোশাকি নাম প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট। যদিও এ গলি হাড়কাটা গলি নামেই বেশি বিখ্যাত বা কুখ্যাত। এ পাড়া থেকে ট্রামলাইন ধরে কিছুটা এগোলেই উত্তরে কলকাতার সংস্কৃতির পীঠস্থান কলেজ স্ট্রিট বা বইপাড়া। শুধু সার সার বইয়ের দোকানই নয়, সেখানে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল থেকে বাঙালির মননচর্চা কেন্দ্র, বহুচর্চিত কফি হাউস কলেজ স্ট্রিট আর হাড়কাটা গলি, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে বেশ্যালয়ের এমন নিকটবর্তী সহাবস্থান এদেশে সচরাচর দেখা যায় না। যদিও অনেক পণ্ডিত লেখকরা, সমাজবিজ্ঞান গবেষক বলে থাকেন, সাহিত্যের সঙ্গে, সাহিত্যিকদের সঙ্গে বেশ্যালয়ের, সমাজের চোখে অবৈধ যৌনতার সম্পর্ক নাকি সেই রামায়ণ-মহাভারতের কাল থেকেই চলে আসছে!

যৌনতাই নাকি শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

তবে চম্পার অতশত নিগূঢ় সামাজিক তত্ত্ব জানা নেই, কারণ সে লেখক, কবি বা সমাজ গবেষক নয়, তার বিদ্যা শুধু গ্রামের স্কুলে ক্লাস এইট অবধি। চম্পা বর্তমানে নিজের পরিচয় সম্পর্কে জানে, সে হাড়কাটা গলির বাসিন্দা, তাকে শরীর বেচে খেতে হয়। অর্থাৎ চলতি কথায় লোকে তাকে বেশ্যা বলে।

বেলা তিনটে বাজে। গলির ভিতর থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার মুখটাতে শিব মন্দিরের গায়ে এসে দাঁড়াল চম্পা। ট্রাম লাইন বিছানো বড় রাস্তা চলে গেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে । গরমের দুপুর হলেও রাস্তায় ট্যাক্সি আর বাসের বিরাম নেই। চম্পার চোখের সামনে দিয়ে হুশ হুশ করে এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে গাড়িগুলো।

গলির মুখে বড় রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে চম্পা চারপাশে তাকিয়ে একবার দেখার চেষ্টা করল যে এখন কেউ আছে কিনা যাকে তার খদ্দের বলে মনে হয়। এমন কেউ যে হয়তো এ গলিতে ঢোকার আগে কিছুটা তফাত থেকে গলির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে এ গলির ভিতর যাওয়া উচিত হবে কিনা?

নাহ্! সন্ধানী চোখে তাকিয়েও তেমন কোনো সম্ভাব্য খদ্দের নজরে পড়ল না হাড়কাটা গলির চম্পার। সে এরপর ভাবতে লাগল কোনদিকে যাবে?

আগে এমন গলি ছেড়ে ফ্লাইং খদ্দের ধরার জন্য বাইরে বেরোতে হতো না চম্পাদের। করোনা আর লকডাউন অনেকটাই শেষ করে দিয়েছে এ গলির ব্যবসাকে। যদিও লকডাউন কয়েক মাস হল উঠে গেছে, দোকানপাট সব খুলে গেছে, যানবাহন চলছে, বাইরের পৃথিবীর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক তবুও হাড়কাটা গলির হাল তখনও ফেরেনি। তাই গলি ছেড়ে বেরোতে হচ্ছে চম্পা আর চম্পাদের মতন অনেককেই। গলির মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর চম্পা হাঁটতে শুরু করল উত্তর দিকে।

খদ্দেরের আশায় এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চম্পা পৌঁছে গেল কলেজ স্ট্রিট বই পাড়ার মুখটাতে। ডান পাশে কলেজ স্কোয়ারের বাইরে বড় রাস্তার গা ঘেঁষে আর বাম দিকে ইউনিভার্সিটির গায়ে সার সার বইয়ের গুমটি। লোকজনের ভিড় শুরু হয়েছে দুপুর থেকেই। গুমটির সামনে টুল নিয়ে বসে পথচারী খদ্দেরদের উদ্দেশে হাঁক দিচ্ছে দোকানদারেরা। ওই হাঁকডাকের সঙ্গে দু-পাড়ার যেন বেশ একটা মিল আছে। পেটের জন্যই হাঁকডাক করে সবাই। তবে চম্পা যতবারই বই পাড়াতে আসে তার মনটা কিছু সময়ের জন্য বিষণ্ণ হয়ে যায় দোকানগুলিতে থাক থাক সাজানো বইগুলি দেখে।

সে কি পড়তে পারত না ওই বইগুলো? পড়তে ভালো লাগত চম্পার। ক্লাস এইটের বাংলা বইয়ের সব পড়া পড়ে ফেলেছিল সে। সুন্দরবনে তাদের গ্রামের স্কুলে একটা বড় কাচের আলমারিতে ঠাসা গল্পের বই ছিল। ক্লাস নাইনে উঠলে সেই বইগুলো মেয়েদের পড়তে দেওয়া হতো। অপ্রতুলতার জন্য তা নিচু ক্লাসের মেয়েদের দেওয়া সম্ভব হতো না। চম্পার খুব ইচ্ছে ছিল সেই আলমারির থেকে বই নিয়ে পড়ার, আরও অনেক বই পড়ার। কিন্তু তা আর হল না। তার আগেই আয়লা ঝড় এল। সেবারের আয়লা ঝড় শুধুমাত্র মানুষের ঘড় ভাঙেনি, অনেক মানুষের অনেক স্বপ্নও ভেঙেছে। ক্লাস নাইনে আর ওঠা হয়নি চম্পার। হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে চম্পাকে গ্রামেরই এক যুবকের সঙ্গে মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারে।

বর তাকে কলকাতায় এনে বছরখানেকের মধ্যেই একজনের কাছে বেচে দিয়ে কোথায় যেন কেটে পড়ল। তারপরও বেশ কয়েকবার চম্পার শরীর হাতবদল হবার পর শরীরের জন্যই চম্পার স্থান হল হাড়কাটা গলিতে। সেদিনের চোদ্দোর চম্পা আজ ছাব্বিশ। মাঝে কেটে গেছে এক যুগ অর্থাৎ বারোটা বছর। চম্পা এখন নিজেও জানে, বোঝে নিজের শরীরটাই তার একমাত্র সম্পদ।

তবুও এই জায়গাটা এলেই তার সেই হারিয়ে যাওয়া জীবনের স্কুলের বইয়ের আলমারিটার কথা মনে পড়ে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হল না । ফুটপাথ ধরে এগোতে এগোতে চম্পা কলেজ স্কোয়ারে ঢুকে পড়ল। ভিতরে তেমন কেউ নেই ।

দু-এক জোড়া নরনারী ছাতার আড়ালে বেঞ্চে বসে আছে। পুরো মাঠটাকে বেড় দিয়ে অন্য প্রান্ত দিয়ে কলেজ স্ট্রিটের অন্দরে ঢুকে এল সে। তারপর কিছুটা এগিয়ে ফুটপাতের এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।

দুপুর হলেও এ জায়গাটা বেশ সরগরম। রাস্তার দু-পাশে ছোট বড় বইয়ের দোকান। তাদের কাউন্টারে, রাস্তায় লোকের ভিড়। তাদের সঙ্গে রয়েছে কাগজের রিম, বই নিয়ে চলা ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালাদের আনাগোনা। কখনওবা সঙ্কীর্ণ রাস্তায় চারচাকা গাড়ি ঢুকে পড়ে গোলমাল আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চম্পা চারপাশে তাকাতে লাগল। পথ চলতি দু-একজনকে চোখের ইশারাও করল, কিন্তু কোনো কাজ হল না। এবার হঠাৎই সে খেয়াল করল তার কিছুটা তফাতে একটা বড় বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো একটা মাঝবয়সি লোক যেন তাকে আড়চোখে দেখছে। লোকটার পরনে ধোপদুরস্ত পাজামা পাঞ্জাবি, হাতে দামি ঘড়ি, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। তাকে দেখতে ভদ্রঘরের লোকের মতন। লোকটার চেহারাতেও একটা আভিজাত্য আছে। চম্পা লোকটার দিকে তাকাল। হ্যাঁ, সিগারেট টানতে টানতে লোকটা আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। ব্যাপারটা সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর চম্পা হাসল লোকটার দিকে তাকিয়ে। লোকটার ঠোটের কোণেও এবার হাসি ফুটে উঠল। চম্পা তা দেখে বুঝল তার সিগনাল ধরতে পেরেছে লোকটা। চম্পা চোখের ইশারা করল। তা দেখে আবারও হাসি ফুটে উঠল লোকটার ঠোটে। চম্পা তার অভিজ্ঞতায় দেখেছে এ ধরনের ভদ্র দেখতে ফ্লাইং কাস্টমারেরা সাধারণত হাড়কাটা গলিতে তার সঙ্গে যেতে চায় না। এদের জন্য হোটেলের ঘরের ব্যবস্থা করতে হয়। বিছানাতে শোয়ার জন্য ঘণ্টা পিছু ভাড়া দেওয়া তেমন বেশ কিছু হোটেল, গেস্ট হাউস চম্পার এ তল্লাটে জানা আছে।

দুই

লোকটা রাজি হলে সমস্যা হবে না। চম্পা তাই এরপর লোকটার দিকে এগোতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি কোথা থেকে লোকটার সামনে হাজির হয়ে বলল ‘সুধন্যবাবু, আপনি দোকানের ভিতর না ঢুকে বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? আপনার মতন বিখ্যাত লেখককে আমি দোকানের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি, এ কথা প্রচার হলে লোকে কি ভাববে? আসলে দোকান থেকে বেরিয়ে আমায় একটু প্রেসে ছুটতে হয়েছিল তাই আসতে পাঁচ মিনিট দেরি হল। চলুন, চলুন, ভিতরে চলুন। প্রকাশক হিসেবে আমার, এই মলয় সাধুখাঁর তো বইপাড়াতে কম দিন হল না। কোন লেখকের কত দাম আমি তা জানি।' ঝড়ের বেগে কথা বলে মলয় সাধুখাঁ নামের লোকটা এরপর কাঁধে ব্যাগওয়ালা লেখককে নিয়ে সামনেই তাঁর দোকানের ভিতর ঢুকে পড়ল।

তাদের কথা শুনে চম্পা ভাবল, কাঁধে ঝোলা ব্যাগওয়ালা সুধন্য নামের লোকটা কি তাকে দেখেই দোকানে না ঢুকে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল?

লোকটা কি তার শরীরটা পেতে চায়? দ্বিতীয় লোকটা হঠাৎ চলে আসাতে সে কথা বলতে পারল না চম্পার সঙ্গে?

একটু ভাবার পর চম্পার মনে হল লোকটা দোকানের বাইরে না বেরোনো পর্যন্ত তার এখানে অপেক্ষা করা প্রয়োজন যদি না অন্য কাস্টমার পাওয়া যায়। আর লোকটাকে চোখের ইশারাতে এটাও জানিয়ে দেওয়া দরকার যে চম্পা তার জন্য অপেক্ষা করছে।

যদি কোনোভাবে দোকানটার সামনে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দোকানের ভিতরে থাকা লেখককে চোখের ইশারা করা যায়। এই ভেবে নিয়ে চম্পা এগোলো সেই বইয়ের দোকানের দিকে। চম্পার বুক সমান উঁচু দোকানের কাউন্টার। দোকানটার সামনে গিয়ে সে মাথা উঁচু করে দেখতে যাচ্ছিল যে ভিতরে বসা তার সম্ভাব্য খদ্দেরকে দেখা যায় কি না। ঠিক সেই সময় দোকানের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন সেই প্রৌঢ় দোকান মালিক। অন্য ফুটপাথে একটা চায়ের দোকান আছে, এই বইয়ের দোকানের ঠিক উলটোদিকেই। বইয়ের দোকানের মালিক চায়ের দোকানদারকে চেঁচিয়ে বলল, 'চটপট একটা স্পেশাল চা আর এক প্যাকেট ভালো সিগারেট দিয়ে যা তো।'

এ কথা বলে লোকটা আবার বইয়ের দোকানের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই তার সঙ্গে চম্পার চোখাচোখি হয়ে গেল। চম্পার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল লোকটা। তারপর চম্পার উদ্দেশে বলল ‘আমার দোকানের সামনে ছাড়া আর কোথাও দাঁড়াবার জায়গা পেলে না। যাও ভাগো এখান থেকে। যত সব বারবনিতা।'

চম্পা তার কথা শুনে বুঝতে পারল লোকটার চোখে তার পরিচয় ধরা পড়ে গেছে। হয়তোবা সেটা চম্পার চড়া মেকাপের কারণে। পাছে লোকটা আরও চিৎকার করে সেই ভয়ে সে দোকানের থেকে সরে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল। পিছন থেকে আবারও সে শুনতে পেল দোকানে ঢুকে যাওয়ার আগে লোকটার গলা ‘যত সব বারবনিতার দল'।

তিন

চম্পা কিন্তু বেশিদুর গেল না। দশ-বারোটা দোকান পেরিয়ে গিয়ে সে থামল। কাঁধে ব্যাগওয়ালা লোকটা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরোবে। চম্পার অপেক্ষা করে দেখা দরকার লোকটার জন্য। তাই সে সেখানে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল দোকানটার দিকে। চম্পা ভাবতে লাগল বইয়ের দোকানের লোকটা যে তাকে বারবনিতা বলল তার মানে কি? নিজের সম্পর্কে বেশ্যা শব্দটা অনেকবার শুনলেও বারবনিতা শব্দটা এর আগে কোনোদিন শোনেনি সে।

তাই বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পরও শব্দটার মানে উদ্ধার করতে পারল না চম্পা। তবে সে এটুকু অনুমান করতে পারল যে শব্দটার মানে ভালো কিছু নয়। তবে কেন জানি শব্দটা তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল? সে দেখল চাওয়ালা চা পৌঁছে দিল সেই বইয়ের দোকানে। প্রায় আধঘণ্টা সময় কেটে গেল দেখতে দেখতে আর তারপরই বাইরে বেরিয়ে এল কাঁধে ঝোলা ব্যাগওয়ালা সেই লোকটা যে দোকানের সামনে ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে যেন কাউকে খুঁজতে লাগল। চম্পার মনে হল লোকটা তাকে খুঁজছে তাই সে আর দেরি না করে এগুলো লোকটার দিকে।

কিন্তু লোকটার কাছে পৌঁছেও থেমে যেতে হল চম্পাকে। আবারও লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল একজন। মাঝবয়সি এক মহিলা। তার পরনে দামি শাড়ি। গলায়, কানে সোনার গহনা। তাকে দেখেই বোঝা যায় পয়সাওয়ালা ঘরের বউ সে। সিঁথিতে সিঁদুর আছে। কাঁধে ব্যাগওয়ালা লোকটা মাঝবয়সি বউটাকে প্রশ্ন করল আসতে এত দেরি করলে কেন বউটা বলল আমার বাড়ি কম দূর! কলকাতা পৌঁছাতেই তো ট্রেনে দু-ঘণ্টা লেগে গেল। তারপর এখানে আসার জন্য কিছুতেই ট্যাক্সি পাচ্ছিলাম না।

এ কথা বলার পর বউটা রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে কাঁধে ব্যাগওয়ালা লেখক যে দোকান থেকে বাইরে বেরোল সেই দোকানের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল ‘মলয়বাবুর সঙ্গে ফাইনাল কথা হল? আমাকে কি এখন ওঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে? কাঁধে ব্যাগওয়ালা সুধন্য নামের লোকটা বলল ‘থাক আর এখন দেখা করার দরকার নেই। যা কথা বলার বলে নিয়েছি। এবার এখান থেকে যেখানে যাবার কথা সেখানে যাব। সেখানে গিয়ে মলয়বাবুর সঙ্গে কি কথা হল বলছি তোমাকে ।

ঠিক এই সময়ে একটা ফাঁকা ট্যাক্সি যাচ্ছিল সামনে দিয়ে। কাঁধে ব্যাগওয়ালা লোকটা ট্যাক্সিটা থামিয়ে বউটাকে নিয়ে হারিয়ে গেল চম্পার সামনে থেকে।

চম্পা বুঝতে পারল লোকটা সম্ভবত বউটার জন্যই বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। লোকটার জন্য এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেও কোনো কাজ না হওয়াতে বেশ একটু হতাশ হল চম্পা। সেও বুঝতে পারল এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে খদ্দের মিলবে না। তাকে অন্য কোথাও যেতে হবে। কিন্তু চাইলেই তো আর সব জায়গায় যাওয়া যায় না। চম্পার মতন মেয়েদের ফ্লাইং কাস্টমার ধরার জন্য এলাকা ভাগ করা আছে। হাড়কাটা গলির মেয়েদের খদ্দের ধরার সীমানা উত্তর দিকে কলেজ স্ট্রিটের শেষ মাথা পর্যন্ত। তার ওপাশটা শোভাবাজার-সোনাগাছির মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট। আর দক্ষিণ দিকে চম্পা যেতে পারে চাঁদনি অবধি। ধর্মতলা থেকে পার্কস্ট্রিট আবার অন্য মেয়েদের জন্য বরাদ্দ। একটু ভেবে নিয়ে চম্পা এরপর হাঁটতে শুরু করল চাঁদনি যাবার জন্য। সেখানে বেশ কয়েকটা পানশালা, হোটেল, গেস্ট হাউস আছে। তার মধ্যে একটা গেস্ট হাউস চম্পার চেনা। খদ্দেরদের ঘণ্টা হিসেবে ঘর ভাড়া দেয় তারা।

কলেজ স্ট্রিট ছেড়ে বেরিয়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরে খদ্দেরের সন্ধানে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় চম্পা পৌঁছে গেল চাঁদনির মোড়ে। একটা গলির মুখে ঘণ্টায় ঘর ভাড়া দেওয়া সেই গেস্টহাউসের গেটের মুখে একটা পান গুমটির সামনে দাঁড়াল চম্পা। গুমটির ছেলেটা চম্পাকে চেনে। ইতিপূর্বে বার কয়েক সে চম্পাকে খদ্দের নিয়ে এই গেস্ট হাউস-এর ভেতরে ঢুকতে দেখেছে, তাই সে চম্পাকে সেখানে দাঁড়াতে দিতে আপত্তি করল না। ইতিমধ্যে বিকাল সাড়ে চারটে বেজে গেছে। অফিসগুলো ছুটি হতে শুরু করেছে। তার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় গাড়ি আর মানুষের ভিড় বেড়ে চলেছে। চম্পার সন্ধানী চোখ চারপাশে ঘুরতে লাগল খদ্দেরের আশায়।

চার

মিনিট পনেরো দাঁড়াবার পর চম্পা একটা খদ্দের পেয়ে গেল। পানশালা থেকে মদ্যপান করে বেরোনো একটা ছেলে। চম্পা তাকে ইশারা করতেই কাছে এগিয়ে এল ছেলেটা। একটু দর কষাকষির পর চম্পাকে পাঁচশো টাকা দিতে রাজি হল সে। পাশের গেস্ট হাউসের ঘর ভাড়া অবশ্য ছেলেটাই দেবে। এক ঘণ্টার জন্য তিনশো টাকা। চম্পা ছেলেটাকে পান গুমটির একপাশে দাঁড় করিয়ে অন্য পাশের দরজা দিয়ে গেস্ট হাউসের ভিতর ঢুকল। ম্যানেজার বলল একটা জোড়া এক ঘণ্টার জন্য ঘর ভাড়া নিয়েছে। সময় হয়ে এসেছে। ঘরটা আর মিনিট পনেরোর মধ্যে খালি হবে। চম্পা বাইরে এসে ছেলেটাকে বলল, “দশ, পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঘর খালি হয়ে যাবে। চিন্তা নেই ।'

কিন্তু পাঁচ মিনিট কাটতে না কাটতেই চম্পার মনে হল ছেলেটার মধ্যে হঠাৎ একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে। হয়তোবা পথচারীর কেউ কেউ আড়চোখে তার সঙ্গে ছেলেটাকে দেখছে বলে দশ মিনিট কাটতে না কাটতেই ছেলেটা তার পাশ থেকে পায়ে পায়ে একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়াল তারপর এক মিনিটের মধ্যেই হঠাৎই ছুটে গিয়ে একটা চলন্ত বাসে উঠে পড়ল। চম্পা বুঝতে পারল তার দিনটা আজ সত্যিই খারাপ। যাওবা একটা খদ্দের পাওয়া গেল সেটাও ঘর না পাওয়াতে হাতছাড়া হয়ে গেল। চম্পা সিদ্ধান্ত নিল ও এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে। একটু পরে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের বারগুলোতে খদ্দেরের ভিড় বাড়বে। তখন যদি তার মধ্যে কাউকে নিজের খদ্দের বানাতে পারে সেজন্য । পান গুমটির এক পাশে দাঁড়িয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় চারপাশে তাকাতে তাকাতে আবারও চম্পার মাথায় ঘুরঘুর করতে লাগল সেই শব্দ বারবনিতা। চম্পা ভাবতে লাগল যদি সে ক্লাস নাইনে উঠতে পারত, তাহলে সে নিশ্চয়ই ওই শব্দের মানে জানতে পারত। ওটা যে শিক্ষিত লোকদের গালাগালি সেটা চম্পা আন্দাজ করতে পারছে। আর এরপরই হঠাৎই দু'জন নর-নারী গেস্ট হাউসের বাইরে এসে দাঁড়াল। তারা চম্পার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালেও তাদের দেখে চিনতে পারল চম্পা। কলেজ স্ট্রিটের কাঁধে ঝোলা ব্যাগওয়ালা সেই লোকটা, আর সেই বউটা যারা চম্পার চোখের সামনে দিয়ে ট্যাক্সি চেপে উধাও হয়ে গেছিল। চম্পা বুঝতে পারল তারাই তবে ঘণ্টা ধরে ঘর ভাড়া নিয়েছিল গেস্ট হাউসের। এদের জন্যই খদ্দের হাতছাড়া হল চম্পার ।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে লোকটা প্রথমে বলল, প্রিপেড ট্যাক্সিটা এখনই চলে আসবে, আমি মাঝপথে নেমে যাব।' গুমটির আড়াল থেকে চম্পা কান খাড়া করল তার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা সেই দু'জনের কথোপকথন শোনার জন্য।

বউটা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল ‘আমি এখনও ভাবতে পারছি না যে আমার কবিতার বই ছাপা হতে চলেছে।’

লোকটা বলল ‘প্রকাশক মলয়বাবু প্রথমে একটু পাশ কাটাবার চেষ্টা করছিলেন। বলছিলেন, অগ্নিমিত্রা, সুরঞ্জন, দেবযানী এসব নামের নতুন কবিরা নাকি আজকাল খুব ভালো লিখছে। কোনো সুপারিশ ছাড়াই তাঁরা বড় বড় কাগজে লিখছে। তিনি তাঁদের বই আগে করতে চান। তোমারটা না হয় পরে করবেন। কিন্তু ও কথা শুনে আমি তাঁকে যেই বললাম যে আমার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি কবে তাকে দেব কি না তা আমি ঠিক এই মুহূর্তে বলতে পারছি না তখনই তিনি আমার কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে তোমার বই ছাপাতে রাজি হয়ে গেলেন। বইমেলার আগেই বইটা বেরোবে কথা দিয়েছেন ।' কথাটা শুনে বউটা বলল ‘আমি জানি তুমি ছিলে বলেই সবকিছু সম্ভব হল। কিন্তু বইটার কি নাম দেওয়া যায় বলত।' লোকটা বলল ‘এমন একটা নাম যা পাঠকদের আকৃষ্ট করবে। ছুরির ফলার মতো বিদ্ধ করবে। ক্যাচি একটা নাম।' বউটা বলল “তুমি একটা নাম ভাবো না ।' লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল 'হ্যাঁ, একটা নাম মাথায় এল। সাহসী একটা নাম। সাহসী না হলে কিন্তু কবি হওয়া যায় না।'

বউটা বলল ‘আমি সাহসী না হলে কি অতদূর থেকে কলকাতা এসে এই গেস্ট হাউসের রুমে সময় কাটাতাম।'

‘বইটার নাম দিতে পারো— ‘ল্যাংটো হতে চাই' একদম ঝড় তুলে দেবে নামটা।’

বউটা বলল 'ঠিক আছে, তবে তাই হবে। আমার সাহসের অভাব নেই।' ঠিক এই সময় একটা সাদা রঙের প্রিপেইড ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল সামনের রাস্তাতে। লোকটা বউটাকে নিয়ে উঠে পড়ল ট্যাক্সিতে। চম্পা ক্লাস নাইনে উঠতে না পারলেও বুঝতে পারল লোকটা আসলে বউটার খদ্দের। সেই শব্দটার মানে না জানলেও শব্দটা চম্পার মাথার মধ্যে ঘুর ঘুর করছিল। ট্যাক্সিটার দিকে তাকিয়ে চম্পা বউটার উদ্দেশে মনে মনে বলল, ‘যত্তসব বারবনিতা’।

লোকটা জবাব দিল

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%