অসুখ নামের সুখ

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

তনিমার মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভাঙল প্রণবের। তিনি চোখ মেলতেই তনিমা বলল, ‘ন-টা বাজতে চলল, উঠে পড়ো! উঠে পড়ো। আজ না রবিবার! তোমার আড্ডা দিতে যাবার কথা?’ তনিমা কথাটা মনে করিয়ে দিতেই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলেন প্রণব। স্ত্রী তনিমা তাঁকে জাগিয়ে দিয়ে চলে গেল নিজের কাজে।

হ্যাঁ, তেমনই কথা হয়ে আছে। আজ থেকে প্রতি রবিবার প্রণব তাঁর পুরোনো পাড়া উত্তর কলকাতার আর্মহাস্ট স্ট্রিটে আড্ডা মারতে যাবে। বিকাশকে তিনি ফোন করেছিলেন। ঠিক দশটাতে সে দাঁড়িয়ে থাকবে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে। তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে তারা চলে যাবেন তাঁদের পুরানো আড্ডাস্থল উত্তর কলকাতার এক পুরোনো চায়ের দোকানের ঠেকে বা আড্ডাস্থলে। যৌবনে যেখানে এক সময় সকাল দশটা থেকে বেলা একটা তারপর আবার সন্ধ্যা ছ-টা থেকে রাত ন-টা পর্যন্ত আড্ডা দেবার জন্য বাঁধা ছিল প্রণবের প্রতিটা রবিবার। তাছাড়া সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতেও কখনও তিনি সময় পেলে হানা দিতেন সে দোকানে আড্ডার লোভে। বলাবাহুল্য শুধু তিনি নন, তাঁর বন্ধু-বান্ধবরাও নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন সেই আড্ডায়। বলা যেতে পারে ওই আড্ডাস্থল নেশার মতো ছিল প্রণবের কাছে। তারপর প্রণবের বাবার উত্তর কলকাতার বাসা বাড়ি ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতাতে নিজেদের বাড়ি উঠে আসা, প্রণবের চাকরি পাওয়া, ধীরে ধীরে ওই আড্ডার জায়গার সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচে গেছিল প্রণবের। মাঝে পঁয়ত্রিশটা বছর দেখতে দেখতে হঠাৎই কেমন যেন আশ্চর্য ভাবে কেটে গেল! তবে সেই আড্ডার ঠেক এখনও রয়ে গেছে। বন্ধু বিকাশের সঙ্গে এত বছর পরও তাঁর কিছুটা যোগাযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বা পথে-ঘাটে কখনওবা তাঁর রবিবারের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখাও হয়েছে প্রণবের। তাঁদের মুখ থেকেই প্ৰণব শুনতেন, সেই আড্ডা আজও আছে। সবাই না থাকলেও বিকাশ, শ্যামল, অনন্ত, প্রেমেন, কাজল—এরা প্রতি রবিবারই সে জায়গাতে ঘণ্টাখানেক আড্ডা মারে। প্রণব মাঝে মধ্যে ভাবতেন তিনিও সেখানে রবিবার গিয়ে আড্ডা দেবেন। কিন্তু তা আ হয়ে ওঠেনি। সরকারি চাকরির সুবাদে প্রণবকে যেতে হতো তার কর্মস্থল এক মফস্সল শহরে। সকাল আটটায় বেরোতেন আর ফিরতেন সন্ধ্যা সাতটায়। ছুটির দিন বলতে ছিল ওই রবিবারটা। সেদিন আবার রাজ্যের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কর্তব্য এসে জমা হতো তাঁর ওপর। কাজেই তাঁর ভাবনাটা এতদিন শুধু ভাবনা হিসাবেই থেকে গেছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। মাস তিনেক হল চাকরি থেকে অবয়ব নিয়েছেন প্রণব। তাঁর একমাত্র ছেলে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে ব্যাঙ্গালোরে সেটেলড হয়েছে। বলা যেতে পারে এখন নির্ঝঞ্ঝাট অবসর জীবনযাপনের সময় প্রণবের। ক-দিন আগে স্ত্রী তনিমার সঙ্গে কী একটা আলোচনা প্রসঙ্গে প্রণব উল্লেখ করেছিলেন তাঁর যৌবনস্থলের আড্ডার কথা। আর সে আড্ডা যে এখনও চলে সেটাও তিনি বলেছিলেন তাকে। কথাটা শুনেই তনিমা বলেছিল, শুধু শরীর সুস্থ থাকলেই হবে? মনের সুস্থতাও তো থাকা প্রয়োজন। বয়স বাড়ছে, ভবিষ্যতেও শরীরটা ঠিক রাখতে হলে মনটাও ঠিক রাখতে হবে। রবিবার ঘুম থেকে উঠে টিভি খুলে সারা বেলা বসে না থেকে এবার থেকে রবিবার বাইরে বেরিয়ে আড্ডা দিয়ে আসবে। নইলে ঘরে বসে বসে সময়ের আগেই অথর্ব হয়ে যাবে।'

তনিমার কথাটা মনে ধরেছিল প্রণবের। সেদিনই তিনি ঠিক করেছিলেন এবার থেকে তিনি আড্ডা দিতে যাবেন। বিকাশকে ফোন করতেই সে আগ্রহে তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেই আড্ডাস্থলে। আর আজ সেই রবিবার !

বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন প্রণব। তারপর প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে, টিফিন খেয়ে তার ছোট চার চাকার গাড়িটা নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন বহু যুগ পর তার রবিবারের আড্ডায় যোগ দেবার জন্য।

দুই

দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়ার বাড়ি থেকে সেই আড্ডাস্থলে পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগবে না প্রণবের। সাধারণ নিয়মে এক ঘণ্টা সময়ের বেশ আগেই তাঁর সেখানে পৌঁছবার কথা। বিকাশ দাঁড়িয়ে থাকবে দশটায়। প্রণব সেই সময়ের অঙ্ক কষেই বাড়ি থেকে বেরোলেন।

রবিবার বলে রাস্তায় গাড়ির জ্যাম তেমন একটা নেই। বহুদিন পর যৌবনের সেই আড্ডাস্থলে যাচ্ছেন বলে মনের ভিতর বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করতে লাগলেন প্রণব। ষাট বছর বয়সি মানুষের কাছে ‘যৌবন' শব্দের অর্থই তো হল সোনালি স্মৃতি। সেদিনগুলো যতই সাদামাটা এমনকী নানান কষ্ট-দুঃখে-ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ হোক না কেন সে সময় থেকে বহুদুর হেঁটে চলে আসার পর পিছু ফিরে তাকালে সেদিনগুলোর প্রতি কেমন একটা আশ্চর্য ভালো লাগা কাজ করে। প্রণবের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ব্যতিক্রম নয়। কত বছর পরে দেখা হচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই পুরোনো দিনের কথা উঠবেই আলোচনায়। স্মৃতির সরণী বেয়ে সবাই পৌঁছে যাবেন, ফেলে আসা সেই সোনালি দিনগুলোতে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে প্রণব আন্দাজ করার চেষ্টা করতে লাগলেন তাঁকে দেখে পুরোনো দিনের কী কী আলোচনা উঠে আসতে পারে আজকের আড্ডাতে?

প্রণবের প্রথমে মনে পড়ল একটা ঘটনার কথা—সুমিতা নামের একটা মেয়ে পাশের পাড়া থেকে পড়তে আসত তাঁদের ওই পুরানো পাড়াতে। কলেজ না ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে। দেখতে বেশ সুন্দরী। বয়স তখন তার কুড়ি বাইশ হবে। রবিবার সকালে ওই চায়ের ঠেকের সামনে দিয়ে পায়ে হেঁটে সে তার প্রফেসারের বাড়ি যেত। প্রণবেরও তখন একই রকম বয়স হবে। যৌবনের যা ধর্ম, প্রণবের ভালো লেগে গেছিল মেয়েটাকে। ঠিক হল প্রণব মেয়েটাকে প্রেমের প্রস্তাব দেবে। সে সময় প্রেম প্রস্তাবের অন্যতম মাধ্যম ছিল প্রেমের কবিতা বা কোটেশন লেখা হাত চিঠি। শ্যামল সে সময় কবিতা লিখত। সেই লিখে দিয়েছিল সেই চিঠি। তারপর একটা রবিবার মেয়েটা যখন তার টিউশন থেকে সেরে ফিরছে তখন প্রণব, শ্যামলকে সঙ্গে নিয়ে সাইকেল করে মেয়েটার পাশ দিয়ে যাবার সময় তার গায়ে ছুড়ে দিয়েছিলেন সেই চিঠি। তারপর একটা সপ্তাহ ধরে ব্যাপারটার ফলাফল জানার জন্য যে কী উৎকণ্ঠা, উদ্দীপক আলোচনা বন্ধুদের মধ্যে। তবে সে ব্যাপারের সমাপ্তি ঘটেছিলএকটু অন্যরকমভাবে। আজ ঘটনাটা নিয়ে প্রণবেশ মনে হাসি পেলেও যে সময় ব্যাপারটা বেশ গম্ভীরভাবে দেখা হয়েছিল প্রণবের কাছে। দেখতে দেখতে তো পরের রবিবার এসে গেল। প্রণব একরাশ উত্তেজনা নিয়ে সেই রবিবার সকালে বাড়ি থেকে আড্ডাস্থলে বেরোতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময় অনন্ত এসে খবর দিল তাদের আড্ডার ঠেকের সামনে একটা পুলিশের জিপ এসে দাঁড়িয়েছে। প্রেমেন একলা বসেছিল সেখানে। পুলিশ তাকে জিপে তুলে নিয়েছে, এবং আরও কয়েকজন ইভটিজারকে ধরার জন্য তারা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে যাত্রায় বহু কষ্টে ওই চায়ের দোকানেই আড্ডা দিতে আসা পাড়ারই এক নেতা গোছের লোকের সাহায্যে কোনোক্রমে প্রেমেনের, বিশেষত প্রণবের নিজের জেলে যাত্রা ঠেকানো গেছিল। মেয়েটার বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে দিয়ে প্রত্যাহার করানো হয়েছিল পুলিশের কাছে করা অভিযোগ’–এ ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আজকের আড্ডায় উঠে আসবে বলে মনে হল প্রণবের। অথবা সেই মুকুন্দ তালুকদারের বাড়ি, ‘বেয়ারিং’ খাওয়ার ব্যাপারটা! ‘বেয়ারিং” শব্দটা যে সময় একটা চালু শব্দ ছিল। যার অর্থ ছিল, বিনা নিমন্ত্রণে কোনো বাড়িতে দলবদ্ধভাবে গিয়ে খেয়ে আসা। চায়ের দোকান এমন একটা জায়গা যেখানে পৃথিবীর যাবতীয় খবর এসে হাজির হয়। ওই চায়ের ঠেকেই একদিন খবর এল সামনেই মুকুন্দ তালুকদারের ছেলের বিয়ে-বউভাত। এবং এও জানা গেল যে মুকুন্দ তালুকদার নাকি গরিব কন্যাপক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের পণ নিয়েছেন। কিশোর বা তরুণ বয়সে মাথায় নানান অদ্ভুত বুদ্ধির উদয় হয় আবেগ বা খেয়ালের বশে। পণ নেওয়া একটা বাজে ব্যাপার। কাজেই সিদ্ধান্ত হল বরপক্ষকে ছোট হলেও একটা শাস্তি দিতে হবে। কী শাস্তি? বেয়ারিং খেতে যাওয়া হবে মুকুন্দ তালুকদারের বাড়িতে। পরিকল্পনা মতো সেই চায়ের ঠেকের বন্ধুরা বউভাতের দিন সন্ধ্যার পর হাজির হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান বাড়িতে। দ্বিতীয় ব্যাচেই বসে পড়েছিল তারা। পাড়ার ছেলে বলে নিমন্ত্রিত না হলেও তাদের তুলে দিতে সাহস পায়নি মুকুন্দ তালুকদার। তারপর সবাই মিলে যে কী খাওয়া। কাজল একাই খেয়ে ফেলেছিল চল্লিশ পিস লেডিকিনি, বিকাশ সাটিয়ে দিয়েছিল পঁচিশ পিস মাছ। আর অন্যরাও খেয়েছিল যথাসম্ভব। তারপর যখন বেগতিক দেখে মুকুন্দ তালুকদার তাদের সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়িয়েছিল তখন ক্ষান্ত দিয়েছিল তারা। -এ ব্যাপারটাও হয়তো আজ আড্ডায় উঠবে ভাবলেন প্রণব কিংবা, হয়তো আলোচনায় উঠবে কালীপুজোর সময় সারারাত জেগে সবাই মিলে জলসা দেখার ব্যাপারটা। কত বড় বড় শিল্পী সে সময় ও তল্লাটে আসতেন জলসা করতে। বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে তাদের আনা নিয়ে চাপা প্রতিযোগিতাও চলত। কে কত বড় শিল্পী আনতে পারে তার প্রতিযোগিতা। আর তাদের সেই প্রতিযোগিতাতে লাভ হতো সাধারণ দর্শকদের। বড় বড় শিল্পীদের কাছ থেকে দেখাশোনার সুযোগ পেতেন প্রণবের মতো সাধারণ মানুষেরা কোন ক্লাব কোন শিল্পীকে আনছে তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নানান আলোচনা চলত। তারপর আসত সেই জলসার রাতগুলো! কী রোমাঞ্চকর ছিল সেই রাতগুলো! ভাবলে উত্তেজনায় এখনও গায়ে কাঁটা দেয় প্রণবের। তিনি ভাবলেন, আজ নিশ্চয়ই একবার উঠবে সেই সব রাতের কথা! এতদিন পর পুরানো আড্ডাস্থলে বন্ধুদের সঙ্গে এসব সম্ভাব্য আলোচনার কথা ভাবতে ভাবতে প্রণব এক সময় পৌঁছে গেলেন কলেজ স্ট্রিট মোড়ে রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল বিকাশ। চটপট সে গাড়িতে উঠে বলল, 'তুই আজ এত বছর পর আড্ডায় যাচ্ছিস বলে কী যে আনন্দ হচ্ছে তোকে বোঝাতে পারব না। সবাই খুব খুশি হবে।'

প্রণব বললেন, ‘আমারও একটা অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছে! কত বছর পর ওখানে যাচ্ছি! আমার আনন্দ অনুভূতিটা আমি ঠিক তোকে বোঝাতে পারব না। তোর সঙ্গে তো না হয় আমার মাঝে মধ্যে যোগাযোগ, কথাবার্তা হয়। কয়েকজনের মুখ তো আমি বহুবছর দেখিনি! দু-একটা কথা বলতে না বলতেই তারা পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেল আর্মহাস্ট স্ট্রিটের নির্দিষ্ট জায়গার কাছে।

তিন

তাদের আড্ডাস্থলটা বড় রাস্তা ছেড়ে একটা গলির মধ্যে। গাড়িটা বিকাশের কথা মতো বড় রাস্তার গায়ে এক দোকানদারের তত্ত্বাবধানে পার্ক করে প্রণব তার সঙ্গে এগোলেন সেই গলির দিকে। কলকাতার উত্তর দিকের অংশটা দক্ষিণ কলকাতার মতো তখনও তেমন বদলে যায়নি। আকাশের বুকে দু-একটা বহুতল মাথা তুলে দাঁড়ালেও পুরানো দিনের ছোট-বড় বাড়িগুলো মোটামুটি একই রকম আছে। এমনকী দোকান পাটগুলোও তেমন বদলায়নি। বিশেষত মিষ্টির দোকান আর তেলে ভাজার দোকানগুলো। যাদেরকে উত্তর কলকাতার ট্রেডমার্কও বলা চলে। প্রণবের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলটার সঙ্গে। জায়গাটার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ব্যাপারটা দেখে বেশ খুশিই হলেন প্রণব। এক মিনিটও সময় লাগল না। বিকাশের সঙ্গে প্রণব গিয়ে হাজির হলেন তাঁর প্রথম যৌবনের নানান স্মৃতি আধারিত সেই চায়ের দোকানের সামনে

দোকানটা এখনও একইরকম আছে। মাথায় অ্যাসবেস্টসের ছাদ। সামনে ভাজ করা কাঠের দরজা। ভিতরে কিছু টেবিল চেয়ার, তার এক পাশে চা বানানোর জন্য উঠোন, আর দোকানের সামনে কয়েকটা ছোট বেঞ্চ রাস্তার গায়ে আড্ডা দেবার জন্য। বিকাশের কথাই ঠিক, শ্যামল, অনন্ত, প্রেমেন, কাজল, সবাই সেই বেঞ্চগুলোতে বসেছিল যেমন তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেও বসে থাকত তারা। তবে চারপাশ বা দোকানটার তেমন কোনো পরিবর্তন না হলেও বয়স লোকগুলোর চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। যার মাথায় কোঁকড়া চুল ছিল তার মাথায় হয়তো এখন টাক। সেদিনের কোনো প্যাকাটি চেহারার যুবকের আজ হয়তো বিশাল ভুড়ি, কারও পাঁক ধরেছে একদা তার কাজল কালে ভ্রুতে। তাঁরা সবাই বলতে গেলে প্রণবের সমবয়সি। দু-তিন বছর বয়সের ফারাক হতে পারে কারও কারও মধ্যে। তবে একটা ব্যাপারে প্রণব আর তাঁর আড্ডার বন্ধুরা ভাগ্যবান বলা যেতে পারে। প্রণব, বিকাশের মাধ্যমে তার বন্ধুদের সম্পর্কে যতটুকু জেনেছেন তাতে তারা যে যার মতো চাকরি বা ব্যাবসা করলেও সবাই প্রণবের মতো ডালভাত খাবার ক্ষমতা রাখে। আর্থিক কষ্ট বলতে যা বোঝায় তা তাদের মধ্যে নেই। প্রণব তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই এক সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো তাঁরা। কয়েক মুহূর্তর জন্য যেন একটা আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হল সে জায়গাতে। কেউ প্রণবের হাত জড়িয়ে ধরল, কাউকে আবার আলিঙ্গন করলেন প্রণব। তিনি যখন এই চায়ের দোকানে আড্ডা মারতেন তখন এ দোকান চালাত হরেনদা। এখন দোকান চালায় তার মাঝবয়সি ছেলে হাবুল। বিকাশ তার সঙ্গেও পরিচয় করাল প্রণবের। এসব মেটার পর দোকানের সামনে রাখা নিচু বেঞ্চদুটোতে অন্য পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে ভাগাভাগি করে আড্ডা দিতে বসলেন প্রণব। ঠিক যেমন বসতেন তিন যুগ আগে। প্রণবই প্রথম চা'য়ের অর্ডার দিলেন। সেই বিশেষ আকৃতির ছোট ধরনের ভাঁড়ের দুধ-চা। শীতের রোদ গায়ে মেখে তাদের আড্ডা শুরু হল তারপর।

শ্যামল তাঁকে প্রথমে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর বাড়ির লোকজন কেমন আছে? তোর শরীর মন কেমন আছে তাই বল?

প্রণব জবাব দিলেন, সবাই ভালোই আছে। আমিও ঠিকই আছি। সুগার-প্রেসার নর্মাল অন্য কোনো রোগও ধরেনি এখনও। আর সেটা যাতে না ধরে সে জন্যই এখানে আসা।' –একথা বলে হাসলেন প্রণব।'

তাঁর উত্তর শুনে অনন্ত বলল, “বাঃ, তোর শরীর ঠিক আছে জেনে ভালো লাগল। তবে কী জানিস, বাইরে থেকে অনেক সময় ব্যাপারটা বোঝা যায় না। অনেক সময়ই আমাদের গায়ে-হাতে-পায়ে ব্যথা হয়, হয় কিনা ? '

প্রণব জবাব দিলেন 'হ্যাঁ হয়।'

অনন্ত বলল, ‘বছর দুই আগে আমারও বাঁ-কাঁধে ব্যথা হয়েছিল দু-দিন ধরে। ব্যাপারটাকে আমি পাত্তা দেইনি। তারপরই হঠাৎ একদিন মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম বাড়ির মধ্যে। নার্সিংহোমে নিয়ে যেতেই ধরা পড়ল হার্ট ব্লকেজ। স্টেইন বসাতে হল। ওই কাঁধে ব্যথাটাই নাকি ওয়ার্নিং ছিল, আমি বুঝতে পারিনি। আমি বাড়িতে না পড়ে রাস্তায় পড়ে থাকলে কি ভয়ংকর কাণ্ড ঘটতো বল তো!' চা তৈরিই হচ্ছিল। তাদের কথার মাঝে দোকানদার

অসুখ নামের সুখ — ১১৩ আমি আপনাকে নতুন বানিয়ে দিচ্ছি।

ছেলেটা একটা প্লেটে করে গরম চায়ের ভাঁড়গুলো এনে ধরল। সবাই একটা করে ভাঁড় তুলে নিল। প্রণবও একটা ভাঁড় তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিলেন যেমন দিতেন বহু বছর আগে এখানে বসে । কিন্তু কাজল চা'য়ের ভাঁড়টা মুখে তুলেই যেন ছ্যাঁকা খেয়েছে, এমনভাবে সেটা নামিয়ে রেখে দোকানির উদ্দেশে মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বলল, 'তুই আমার জন্য আলাদা চা' দিতে পারলি না? তুইও দিলি, আর আমিও বেখেয়ালে ওটায় মুখ দিয়ে ফেললাম ! হাবুল নামের লোকটা তার কথা শুনে ভুল স্বীকারের ঢঙে বলল; ওটা, ফেলে দিন ।

ব্যাপারটা বুঝতে না পেড়ে বিজন তার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন; তোর চায়ে কী হল?

কাজল বলল, ‘আমি মিষ্টি খাই না। ও চিনি দেওয়া চা দিয়ে ফেলেছে আমাকে ।

প্রণব কথাটা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন; সে কী রে তুই মিষ্টি খাস না। সেই একবার মুকুন্দ তালুকদারের বাড়ি বেয়ারিং খেতে গিয়ে চল্লিশ পিস লেডিকিনি সাটিয়েছিলিস সে কথাই ভাবতে ভাবতে আসছিলাম। কী দিন ছিল সে সব!'

প্রণবের কথা শুনে সেই ফেলে আসা সোনালি দিনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে চাইল না কাজল। সে বর্তমানে তার মিষ্টি না খাওয়ার ব্যাপারটা খোলসা করে বলল; ওসব দিনের কথা বাদ দে। সুগার বুঝলি সুগার : আমাকে ইনসুলিনও নিতে হয়েছে। এখন যদিও মোটামুটি নর্মাল তবে মিষ্টি খাওয়া একদম বাদ।'

এ কথা বলে একটু থেমে প্রণবের উদ্দেশে সুপরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল; তুই বলছিস বটে তোর সুগার নেই, তবে ধরতে কতক্ষণ? ওর একটা লক্ষণ হল মাঝে মাঝে দুর্বলতা ভাব। তোর হলেই বুঝবি সুগার হবার সম্ভাবনা থাকতে পারে। অনেক সময়ই এ রোগটা আমাদের মতো বেশি বয়সে ধরা পড়ে। অতএব আগে থেকেই সাবধান।”

হাবুল এসে আবারও একটা চায়ের ভাঁড় ধরিয়ে দিয়ে গেল কাজলের হাতে। আবারও কথাবার্তা শুরু হল বন্ধুদের মধ্যে। পুরোনো দিনের কথা নয়, বর্তমান সময় নিয়েই কথাবার্তা। প্রণব চেষ্টা করতে লাগলেন পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থনের জন্য। চা খাওয়া হয়ে যাবার পর হঠাৎই কিছুটা তফাতে টাঙানো একটা ব্যানারের দিকে চোখ গেল প্রণবের। মাসখানেক আগের কালীপুজো উপলক্ষে টাঙানো ব্যানার। সেটা দেখেই প্রণব তার বন্ধুদের উদ্দেশে বললেন; তোরাতো সব ওখানে কাছেপিঠেই থাকিস। এখনও ওখানে কালীপুজো উপলক্ষে জলসা হয়? তোরা দেখতে যাস? কীভাবে যে সে সব রাতগুলো স্বপ্নের মতো কেটে যেত তা বোঝাই তাই না?'

শ্যামল এ প্রশ্নের উত্তরে জবাব দিয়ে বলল, 'দু-একটা হয় বটে। আমার বাড়ির পাশেই একটা হয়ে বটে। তবে আমি যাই না। শীতকালে, বা শীতের মুখে যখন থেকে কুয়াশা পড়তে শুরু করে তখন থেকে সন্ধ্যার পর আমার বাইরে বেরোনো বারণ। ব্রঙ্কো নিমুনিয়ার ধাত আমার। ঠান্ডা লাগানো আমার একেবারে বারণ। এত সাবধানে থাকি তবু এই শীতকালে অনেক সময় আমার শ্বাসকষ্ট হয়। তুই জানলা খুলে ঘুমাস নাকি। আমি ঘুমাতাম। ডাক্তারবাবু বলেছেন ওভাবেই আমি ঠান্ডা লাগার রোগটা বাঁধিয়ে ছিলাম। এখন আর সেটা যাচ্ছে না।'

অনন্ত, শ্যামলের কথা শুনে বলল; যাবে না কেন? তোকে তো কতদিন ধরে বলছি ডাক্তার চেঞ্জ করতে। বললাম ডাক্তার চন্দকে একবার দেখিয়ে নে। সব ঠিক হয়ে যাবে, তা তুই শুনছিস না। পরে আছিস সেই রুগি আটকে রাখা ডাক্তারের কাছে!

কাজল এরপর শ্যামলের উদ্দেশে বলল, “তবে তুই যাই বল ডাক্তার চন্দ কিন্তু হাই পাওয়ার স্টেরয়েড ইউস করেন। আমার ভায়রার অবস্থা খারাপ করে ছেড়ে ছিলেন। শেষে ডাক্তার শাসমল ওঁকে বাঁচান।”

বিকাশও এবার সেই আলোচনায় যোগ দিল। সে বলল তোরা যাই বলিস না কেন সত্যিকারের ডাক্তার যদি কাউকে বলতে হয় তবে তিনি ডাক্তার পাণিগ্রাহী। যেমন তাঁর নার্সিংহোম, তেমন তার চিকিৎসা: আমার শাশুড়িকে অ্যাডমিট করিয়েছিলাম ওঁর কাছে। প্রায় একজন মরা মানুষকে জ্যান্ত করে বাড়ি ফেরত পাঠিয়েছিলেন।

শ্যামল বলল, ‘পাণিগ্রাহীর নার্সিংহোমটা ভালো ঠিকই তবে ওদের খাই অনেক বেশি। সামান্য জ্বর, সর্দি নিয়ে ওখানে একদিন ভর্তি থাকলেও পঞ্চাশ হাজার বিল করে দেয়। সেদিক থেকে বলতে গেলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য ডাক্তার মজুমদারের নার্সিংহোম সব থেকে ভালো। আমার দাদার ছেলে ভাইরাস জ্বরের কারণে তিনদিন ভর্তি ছিল ওখানে। বেড ভাড়া আর ওষুধপত্র, ডাক্তার ইত্যাদি নিয়ে মাত্র দশ হাজার টাকা চার্জ করেছিল। আর এটাই যদি পাণিগ্রাহীর নার্সিং হোম হতো...।

প্রণব দেখলেন আড্ডার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ালো, অসুস্থতা-ডাক্তার-ওষুধ-নার্সিংহোম এসব। সময় যত এগিয়ে চলল, ওই আলোচনা তত আরও গভীর থেকে গভীরে পৌঁছতে লাগল। প্রণবের সামনে সবাই যেন প্রমাণ করতে চাইল এ ব্যাপারে তারা প্রত্যেকেই কত জানে। সময় এগিয়ে চলল, আরও দু-রাউন্ড চা এল, কিন্তু রোগ হাসপাতাল নিয়ে আলোচনার বিরাম নেই। প্রণব তারই মাঝে বেশ কয়েকবার পুরোনো দিনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউ যেন আমলই দিল না তাঁর কথায়, অগত্যা শ্রোতার ভূমিকা পালন করতে লাগলেন তিনি। বেলা বেড়ে চলল। তবুও শেষ একবার সেই পুরোনো দিনে ফেরার চেষ্টা করলেন প্রণব। হাবুল শেষ বারের মতো একবার চা দিতে আসায় মুহূর্তের জন্য বন্ধুরা তাদের আলোচনা থামতেই সেই সুযোগ নিয়ে প্রণব বললেন, প্রেমেন, তোর মনে আছে সেই একটা মেয়েকে চিঠি দিয়ে তোকে আমি কী বিপদে ফেলেছিলাম? পুলিশ এখানে এসে তোকে জিপে তুলে নিয়েছিল? সে সব দিন ভালো মন্দ মিশিয়ে বড় রোম্যান্টিক ছিল তাই না? প্রেমেন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘মনে আছে। ইদানীং তাকে আমি মাঝে মাঝেই দেখতে পাই।' প্ৰণব কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসলেন। আজ এতদিন পরও মেয়েটার সম্পর্কে জানার জন্য একটা অদ্ভুত আকুলতা ফুটে উঠল প্রণবের মনে। একই সঙ্গে তিনি ভাবলেন এবার নিশ্চয়ই অসুখ— ডাক্তারের আলোচনা ছেড়ে পুরোনো দিনের কথায় ফিরে যাবে সবাই। প্রণব প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় দেখিস তাকে?’

প্রেমেন তার হাতে ধরা সিগারেটের শেষ অংশে ফুক ফুক করে দু-বার টান দিয়ে বলল, ‘কাছেই একটা ডিসপেনসারিতে। আমার বউ আর্থারাইটিসের রুগী। আমি ওই ডিসপেনসারিতে বউকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাই। সেখানে সেও চিকিৎসার জন্য যায় । সে আমাকে চিনতে না পারলেও আমি তাকে চিনতে পেরেছি। এখনতো আর সে সেই ছিপছিপে মেয়ে নয়, ভারিক্কি চেহারার একটা বউ। আর্থারাইটিসের জন্য হাঁটতে পারে না। গাড়ি থেকে তাকে ধরে ধরে নামাতে হয়।'—এ কথা বলে সে তার হাতের সিগারেটের টুকরোটা এমনভাবে ছুড়ে ফেলল যেন পুরোনো দিনের সেই ঘটনার স্মৃতিকে সে ওই সিগারেটের টুকরোর মতোই ছুড়ে ফেলে দিয়েছে! তারপর শুরু হল আর্থারাইটিস নিয়ে আলোচনা। প্রণব ছাড়া অন্য সবাই যোগ দিল তাতে। প্রণব বেশ অবাক হলেন ব্যাপারটাতে। শেষ যে স্মৃতিটা তিনি বন্ধুদের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সেটাও শেষে অসুখের আলোচনায় পর্যবসিত হল! নির্বাক হয়ে তিনি শুনে যেতে লাগলেন সেই আলোচনা ।

চার

এক সময় প্রণবের ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল। বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “সাড়ে বারোটা রাতে। এবার আমাকে ফিরতে হবে।'

তাঁর কথা শুনে আলোচনা থামল এবার। শ্যামল বলল, 'চলে যাবি? তুই তো কোনো কথাই বললি না আজকে। এখনই বাড়ি যাবি বলছিস, ঘড়ি ধরে কোনো ওষুধ খেতে হয় নাকি তোকে?

প্রণব জবাবে হেসে বললেন, 'বললামই তো, এখনও কোনো রোগ ধরেনি আমাকে। বাড়ির সবাইও সুস্থ।'

কথাটা শুনে অনন্ত বলল;’ সত্যি বলছিস তোর কোনো রোগই নেই? থাকলে কিন্তু আমাদের কাছে গোপন করবি না।’

প্রেমেন বলল, ‘নেই ভালো তবে তা ধরতে কতক্ষণ?’

কাজল বলল, “কিছু হলেই আমাদের তা সঙ্গে সঙ্গে জানাবি। আমাদের মতো তোকে অসুখ, ডাক্তার, ওষুধ, হাসপাতালের ব্যাপারে সাজেশন কেউ দিতে পারবে না।’

অনন্ত বলল, ‘কাঁধে ব্যথা হলে নেগলেক্ট করবি না।'

কাজল বলল, 'শরীর দুর্বল লাগলেই খেয়াল রাখবি ওটা সুগারের লক্ষণ হতে পারে।’

শ্যামল বলল; ‘একদম জানলা খুলে ঘুমাবি না।'

প্রেমেনও হয়তো এসব ব্যাপার নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রণব হেসে বললেন; 'চলি।'

এ কথা বলে অন্য কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। বিকাশ অনুসরণ করলে তাকে।

গাড়িটা যেখানে রাখা ছিল, সেখানে গিয়ে বিকাশকে নিয়ে গাড়িতে উঠে ফেরার পথ ধরলেন প্রণব। বিকাশ তাকে বলল; ‘এত দিন পর আড্ডায় এসে কেমন লাগল তোর?”

প্রণব তাকে পালটা প্রশ্ন করল, “তোরা কি প্রতি রবিবার এসব নিয়েই আলোচনা করিস?”

বিকাশ তাকে বলল; “তা বলতে পারিস। আমাদের যা বয়স তাতে এখন সব থেকে ইম্পর্টান্ট আলোচনা এসবই।”

প্রণব আর কোনো প্রশ্ন করলেন না তাকে। দেখতে দেখতেই কলেজ স্ট্রিট এসে গেল । গাড়ি থেকে নামার সময় বিকাশ তাকে জিজ্ঞেস করল; ‘আগামী রবিবার আসবি তো?”

প্রণব জবাব দিল, 'এলে তোকে ফোনে জানিয়ে দেব।'

বিকাশ নেমে গেলেন, বাড়ি ফেরার জন্য প্রণব রওনা হলেন আড্ডার আলোচনার কথা ভাবতে ভাবতে। তার মনে হতে লাগল যাদের সঙ্গে তিনি আজ বহু আশা নিয়ে আড্ডা দিতে গেছিলেন তারা কারা। অসুখ-বিসুখ তো যে কোনো বয়সে, বিশেষত এ বয়সে এসে সবারই হতে পারে, তার নিজেরও যে কোনোদিন হতে পারে। কিন্তু এই লোকগুলো আসলে ‘অসুখ' নামের ‘অসুখে ভুগছে না তো? নইলে এছাড়া তাদের অন্য কোনো আলোচনা নেই কেন? নারী নেই, গান নেই, খেলা নেই, পুরোনো কোনো স্মৃতি নেই শুধু অসুখের আলোচনা। প্রণব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি আর আড্ডায় যাবেন না। কাপন শরীরে রোগ ধরার আগেই তিনি মনের রোগ ধরাতে চান না। কোনো কোনো দিন তো তাঁর কাঁধ ব্যথা হয়, দুর্বলও লাগে কোনো কোনোদিন, আর জানলা খুলে ঘুমানোও প্রণবের বরাবরের অভ্যাস। আর সব থেকে বড় কথা চোখ বুজলেই এত বছর পরেও সেই রন্ধী মেয়েটাতো হেঁটে যাওয়া দেখতে পান তিনি। যতদিন পর্যন্ত সম্ভব ওই আড্ডায় উপস্থিত না হয়ে প্ৰণব সেটাই দেখে যেতে চান ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%