হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিধুভূষণ তাঁর দোকানের সামনে সাইকেল থেকে নামতেই দেখতে পেলেন ভোলা ষাঁড় তাঁর দোকান আগলে দাঁড়িয়ে রজনীগন্ধার ডাঁট চিবোচ্ছে। সদ্য মনে হয় সে সেটা তুলে এনেছে পাশের গলি থেকে। সাইকেলটা পাশের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রেখে এগিয়ে গেলেন তাঁর দোকানের সামনে। দোকান মানে ছবি তোলার দোকান, বিধুভূষণের স্টুডিও। দোকান খোলার জন্য ভোলা ষাঁড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা মিষ্টি গন্ধ এসে লাগল তাঁর নাকে। রজনীগন্ধার গন্ধ। ডাঁটে এখনও একথোকা ফুল লেগে আছে। টাটকা ফুল অর্থাৎ একটু আগেই কোনো লাশ ঢুকেছে শ্মশানে। ব্যাপারটা অনুমান করে বিধুভূষণ একবার তাঁর দোকানের গায়ের গলিটার দিকে তাকালেন। এটাই শ্মশানে ঢোকার রাস্তা। কিছুটা এগিয়েই ইলেকট্রিক চুল্লির ঘরটা। তারপর রাস্তাটা ধাপে ধাপে নেমে মিশে গেছে গঙ্গার বুকে। যেখানে শেষ স্নান করানো হয় শবদেহগুলোর। আর লোকজনের দৈনন্দিন স্নান করবার জন্য, গঙ্গাজল সংগ্রহের জন্য কাছেই আর একটা ঘাট আছে। বিধুভূষণ গলির ভিতর তাকিয়ে দেখলেন তাঁর অনুমানই ঠিক। চুল্লিবাড়ির সিঁড়ির নিচে একটা খাটে একটা মরদেহ নামানো আছে, আর তাকে ঘিরে ছোটখাটো একটা জটলা। বিধুভূষণের একবার মনে হল তারা কি ছবি তোলাবে তাঁকে দিয়ে? পরক্ষণেই মনে মনে হাসলেন তিনি। মরদেহর ছবি শেষ কবে তুলেছেন তা নিজেরই মনে নেই বিধুভূষণের। তবু তিনি তাঁর অভ্যাসমতো প্রতিদিন সকালে এসে তাঁর ছবির দোকান খোলেন। এখানেই বসে থাকেন বিকাল পর্যন্ত।
দোকান খোলার জন্য ষাঁড়টাকে সরাতে হবে। বিধুভূষণ এবার তার লেজটা ধরে মৃদু মোচড় দিতেই চমকে উঠে ষাঁড়টা কিছুটা তফাতে এগিয়ে অসন্তোষের ভঙ্গিতে একবার তাকাল তাঁর দিকে। হেসে ফেললেন বিধুভূষণয়। মনে মনে ষাঁড়টার উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘তোরও যেমন এ জায়গা ছেড়ে অন্য কোনো স্থানে যাবার জায়গা নেই, তেমন আমারও নেই। তাই দোকানটা তো খুলতে হবে। রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে থাকলে খুলব কীভাবে?'
বুড়ো ষাঁড়টাকে হটিয়ে দিয়ে তালা খুলে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কাঠের পাল্লাগুলো দু-পাশে সরিয়ে দোকানে ঢুকলেন বিধুভূষণ। ছোট্ট একটা ঘর। একটা ছোট কাঠের সেলফ আর দুটো চেয়ার। ঘরের কোণে রাখা আছে একটা কুঁজো। আসবাবপত্র বলতে শুধু এটুকুই। তবে ঘরের তিন দিকের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে অজস্র নানাবয়সি মানুষের ছবি। দেওয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো বিধুভূষণেরই তোলা। তবে বিধুভূষণ দোকানের পাল্লা খুললেও সূর্যের আলোতে চোখ মেলে না তারা। সবই মৃত মানুষের ফটোগ্রাফ। শ্মশানেই তোলা কোনো কোনো ছবি হয়তো বা তিরিশ চল্লিশ বছরেরও পুরোনো। পরিবার-পরিজন যারা ছবিগুলো তুলিয়েছিল তারা আর ছবিগুলো নিতে আসেনি। গঙ্গার পাড়ে তারা ছেড়ে রেখে গেছে প্রিয়জনদের স্মৃতি।
চেয়ারটা টেনে স্টুডিওর ভিতর বসলেন বিধুভূষণ। তারপর অভ্যাসবশত তাকালেন দেওয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর দিকে। এঁদের মধ্যে কেউ তাঁর পরিচিত, কেউ অপরিচিত। শ্মশানে তো বহু জায়গা থেকে মানুষকে আনা হয় দাহ করার জন্য। তবে দীর্ঘদিন ওই ছবিগুলোর সঙ্গে থাকতে থাকতে ছবির সবাইকেই আজ খুব পরিচিত বলে মনে হয়। হোক তারা মৃত মানুষ, কিন্তু তাদের সঙ্গে একাত্মবোধ করেন বিধুভূষণ। পিছু ফিরে সময়ও ধরা দেয় চোখের সামনে।
হ্যাঁ। সে একটা সময় ছিল বটে। বছর চল্লিশ আগের কথা। যুবক বিধুভূষণ তখন সদ্য ফটোগ্রাফির দোকান খুলেছিলেন এখানে। তখন এ অঞ্চল শহর হয়ে ওঠেনি। গ্রামের বদলে খুব বেশি হলে গঞ্জ বলা যেতে পারত এ জায়গাকে। এক বন্ধুর পরামর্শেই তিনি এখানে স্টুডিও খুলেছিলেন। তার পিছনে কারণও ছিল। তখন ঘরে ঘরে ক্যামেরা বা পাড়ায় পাড়ায় স্টুডিও ছিল না গ্রামগঞ্জে। গ্রামের সাধারণ মানুষেরা সারা জীবনে হয়তো ছবি তুলত দু-বার। একবার বিয়ের সময় আর একটা শেষযাত্রায়। দ্বিতীয় ছবিটা অবশ্য দেখে যাওয়া হত না তাদের। শিক্ষিত বা পয়সাঅলা পরিবারের মেয়েরা হয়তো বিয়ের সম্বন্ধর জন্য অথবা ছেলে-মেয়েরা কলেজ পাশ করার পর গায়ে কালো গাউন পরে ছবি তুলত, তবে সেসব ছবি তোলা হতো শহরের স্টুডিওতে। সারা জীবন কেউ ছবি না তুললেও সে সময় শেষযাত্রার ছবি তোলার চাহিদা ছিল। মৃতর পরিজনরা ফ্রেমবন্দি করে রাখত তাঁর শেষ স্মৃতি। সে সময় এক একদিন এই শ্মশানে দিনে দশ-বারোটা ছবিও তুলেছেন বিধুভূষণ। দোকান বন্ধ থাকলে সে সময় বিধুভূষণকে বাড়ি থেকে লোক এখানে ডেকে আনত ছবি তোলার জন্য। তখন এ শ্মশানে কাঠে পুড়ত লাশ। মানুষটা চোখের সামনে বাতাসে কালো ছাই হয়ে মিশে যাবার আগে বিধুভূষণ ফিল্মের কালো প্লেটে ধরে রাখতেন তাদের ছবি। বৃদ্ধ বৃদ্ধা, মাঝবয়সি, যুবক-যুবতী নানা মৃত-মানুষের ছবি। তারপর ধীরে ধীরে বিধুভূষণের চোখের সামনে সব কিছু কেমন বদলে গেল। গঞ্জ, শহরে বদলে গেল, ঘরে ঘরে রেডিও এল, টিভি এল, ক্যামেরা এল। পাড়ায় পাড়ায় ফটোগ্রাফির স্টুডিও হল। কত দামি দামি ক্যামেরা তাদের। স্টিল, ভিডিও, কত তাদের বিজ্ঞাপন। তারপর এখন এসেছে মোবাইল ফোনের ক্যামেরা। সবার জীবনেই এখন নানা ছবির ছড়াছড়ি। কেউ আর এখন শ্মশানে ছবি তোলায় না।
শুধু তাই নয়, সে সময় বিধুভূষণের ডাক আসত বিভিন্ন অনুষ্ঠানবাড়ি থেকেও। সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে বহুকাল হল। তা হয়তো-বা এই ছবিগুলোর জন্যই। আড়ালে লোকে তাঁকে ডাকে ‘অপয়া ফটোগ্রাফার' বলে। কয়েকজন তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিল, ‘এই মড়ার ছবিগুলো রাখার কী দরকার! সুন্দর সুন্দর মেয়েদের হাসিমুখের ছবি টাঙাও দোকানে। দেখবে কাস্টমার আসবে দোকানে। এ ছবিগুলোর জন্যই লোকে তোমাকে অপয়া বলে।' তবুও বিধুভূষণ ছবিগুলো সরাতে পারেননি। তাঁর কেমন যেন আত্মীয়তা জড়িয়ে গেছে ছবিগুলোর সঙ্গে একলা মানুষ বিধুভূষণ। বাড়িতে দুটো ভাড়াটে আছে। ডাল-ভাত খেয়ে তাতে পেট চলে যায়। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে শুধু একটা ব্যাপারেই কষ্ট হয় তাঁর মনে। অন্য স্টুডিওতে গেলে যেমন মনে হয় যে চারপাশ থেকে ছবিগুলো তাকিয়ে হাসছে তেমন মনে হয় না এখানে। বিধুভূষণের ছবিরা কেউ হাসে না কোনোদিন। চোখ বোজা, আড়ষ্ট সব মুখ। আর কোনোদিন হাসবে না এই ছবির মানুষগুলো। আর এ ব্যাপারটাই হয়তো ছবিগুলোর প্রতি তাঁর করুণা আরও বাড়ায়। ছবিগুলোকে ভালো করে একবার দেখার পর চশমাটা ধুতির খুঁট দিয়ে মুছে নিয়ে বিধুভূষণ তাকালেন দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিকে। বাংলা ক্যালেন্ডারে এদিনের তারিখের গায়ে লেখা ‘মহাষষ্ঠী' অর্থাৎ দুর্গাপুজো শুরু হতে চলেছে। আজ দেবীর বোধন। ঠিক এই সময় একটা ম্যাটাডোর প্রথমে এসে থামল দোকানের সামনে। লোকজন ভর্তি শববাহী গাড়ি। গাড় থেকে শবদেহ নামিয়ে শ্মশানযাত্রীরা হরিধ্বনি দিতে দিতে ঢুকে গেল পাশের গলিতে। লোকটার আর দুর্গাপুজো দেখা হল না। মৃত্যু কি আর অমাবস্যা-পূর্ণিমা, দুর্গাপুজো লক্ষ্মীপুজো মেনে হয়? যে লোকগুলো শববাহী খাটের পিছনে কাঁদতে কাঁদতে ঢুকল, সামনের দুর্গাপুজোতে তারাই নতুন জামা জুতো পরে আনন্দ করবে এটাই জগতের নিয়ম ।
ম্যাটাডোরের লোকগুলো চলে যাবার পর দেরাজ থেকে তাঁর ক্যামেরাটা বার করে তার লেন্সটা যত্ন করে মুছতে শুরু করলেন বিধুভূষণ। না, সেটা যারা শব নিয়ে ভিতরে গেল তারা তাঁকে ডাকতে আসবে বলে সে আশায় নয়। সে আশা আজকাল আর করেন না তিনি। এটা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ক্যামেরাটার ওপর ঝুঁকে পড়ে লেন্স মুছছিলেন তিনি । হঠাৎ একটা প্রশ্ন কানে এল তাঁর—‘আচ্ছা, ঘাটটা কোথায়?’
মাথা তুলে তাকাতেই বিধুভূষণ দেখলেন তাঁর দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একজন অল্পবয়সি মহিলা। তার গায়ে একটা চাদর জড়ানো আছে। বিধুভূষণ তার প্রশ্নর জবাবে বললেন, শ্মশানঘাট না স্নানের ঘাট? দোকানের পাশের গলিটা হল শ্মশানঘাট। আর একটু এগোলে যে গলিটা পাবেন সেটা স্নানের ঘাট।'
মেয়েটা শুনল তাঁর কথা। কিন্তু কোনো জবাব দিল না। এরপর সে এগোবার জন্য পা বাড়িয়েও যেন থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল দোকানের ভিতর। বিধুভূষণের মনে হল সে যেন দেখছে দোকানের ভিতর টাঙানো ছবিগুলো।
মুহূর্তখানেক পর বিধুভূষণ একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কিছু বলবেন?'
তাঁর কথা শুনে যেন সম্বিত ফিরল মেয়েটার। সে বলল, 'না, কিছু না। ছবিগুলো দেখছিলাম।'—এই বলে সে দোকানের সামনে ছেড়ে এগিয়ে গেল। সে কোন গলিতে ঢুকল তা ঠিক বুঝতে পারলেন না বিধুভূষণ। তিনি আবার ক্যামেরা মোছার কাজে মন দিলেন।
বেলা দুপুর হতে চলল। ইতিমধ্যে বেশ ক-টা বডি ঢুকেছে শ্মশানে। কিন্তু কেউ বিধুভূষণকে ছবি তোলার জন্য ডাকতে আসেনি। তবে মরদেহর ছবি তোলার ব্যাপারে একটা অদ্ভুত কথোপকথন কিছুক্ষণ আগেই শুনতে পেলেন বিধুভূষণ। তিন-চারটে ছেলে পাশের গলি থেকে বেরিয়ে জটলা করছিল বিধুভূষণের দোকানের সামনে। হঠাৎ একটা ছেলের চোখ পড়ল দোকানের ভিতর। সে অন্যদের বলল, 'দ্যাখ সব মড়ার ছবি।'
অন্যরাও তাকাল দোকানের ভিতর। তারপর ছবিগুলো দেখে অন্য একজন বলল, 'একটা কাজ করলে হয় না? বডির সঙ্গে একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে ছেড়ে দিই। আত্মীয়স্বজন তখন খবরটা জেনে যাবে। তাদের ফোন করে আর পয়সা নষ্ট করতে হবে না।'
তার কথা শুনে আর একজন বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। তাই কর। মোবাইলে ক্যামেরা থাকায় কত যে সুবিধা তা আর বলার নেই।' এরপর ছেলেগুলো দোকানের সামনেটা ছেড়ে গলির ভিতর ঢুকে গেল সম্ভবত বডির সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য। দোকানের ভিতরে বসে তাদের কথাবার্তা শুনলেন বিধুভূষণ। একই সঙ্গে তাঁর হাসিও পেল আবার কষ্টও হল।
বিধুভূষণের দোকানের ভিতর বসে রাস্তার ওপারের বাড়িগুলোর মাথার ওপর দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে ছেলেগুলো চলে যাবার পর চুপচাপ বসেছিলেন বিধুভূষণ। শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ ভালো লাগছে দেখতে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবছিলেন তিনি। এই দুর্গাপুজোর সময় বেশ ক-বার তিনি বিভিন্ন পুজো প্যান্ডেলে ছবিও তুলতে গেছিলেন।
ভাবছিলেন বিধুভূষণ। হঠাৎ দোকানের সামনে একটা গাড়ির ব্রেক কষার শব্দে চিন্তাজাল ছিন্ন হল তাঁর। গাড়ি থেকে নামল একজন মাঝবয়সি লোক। পরনে ধোপদুরস্ত পাজামাপাঞ্জাবি। গাড়ি থেকে নেমে সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে দোকানের সামনে এসে বিধুভূষণকে সটান প্রশ্ন করল, ‘আপনি ছবি তোলেন?'
বিধুভূষণ বললেন, ‘হ্যাঁ, কেন?”
লোকটা বলল, ‘একটু রক্ষাকালীর মন্দিরে যেতে পারবেন ছবি তুলতে? বেশি সময় লাগবে না। গাড়িতে যাবেন আবার গাড়িতেই পৌঁছে দিয়ে যাব। যাবেন প্লিজ?' রক্ষাকালীর মন্দিরটা খুব কাছেই। সাইকেলেই পাঁচ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যায়। বিধভূষণ
জানতে চাইলেন, ‘কিসের ছবি?’
লোকটা জবাব দিল, ‘একটা মেয়েকে মন্দিরে দেবতার প্রসাদ মুখে দেবার জন্য আনা হয়েছে। ক্যামেরাম্যানকে যে সঙ্গে আনতে হবে তা খেয়াল ছিল না।'
এসব কাজে ছবি তোলার জন্য কেউ আর আজকাল ডাকতে আসে না বিধুভূষণকে। বহুদিন পর এ ডাক শুনলেন তিনি। তবুও বিধুভূষণ বললেন, 'এখানে অন্য কোনো ক্যামেরাম্যানকে পেলেন না?'
সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ‘আর বলবেন না মশাই। আনন্দনগর থেকে আসছি। আজ বিষ্যুৎবার। এখানে বিষ্যুৎবার যে মার্কেট বন্ধ থাকে জানা ছিল না। সব স্টুডিও বন্ধ। ফটোগ্রাফার খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে গেলাম । ওদিকে যে চারটে স্টেশন পর আনন্দনগরে ফিরে গিয়ে কোনো ফটোগ্রাফার ধরে আনব সে সময় এখন আর নেই। ওদিকে বারবেলা পড়ে গেলে আর মুখে প্রসাদ দেওয়া যাবে না। একজন রিকশাওয়ালা বলল যে এখানে একটা স্টুডিও আছে। তাই এখানের খোঁজ পেলাম। চলুন প্লিজ।'—এই বলে ব্যাগ্রভাবে ঘড়ির দিকে তাকাল ভদ্রলোক ।
বিধুভূষণ এতক্ষণে বুঝলেন ব্যাপারটা। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে আমি যাচ্ছি। তবে গাড়িতে নয়। স্টুডিও বন্ধ করে সাইকেলে যাচ্ছি আমি। খুব বেশি হলে দশ মিনিট সময় লাগবে দোকান বন্ধ করে সেখানে পৌঁছতে। আপনি এগোন আমি আসছি।'
লোকটা পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করে নম্বর ডায়াল করতে করতে বলল, ‘তাড়াতাড়ি আসবেন কিন্তু দাদা। এমনিতেই মেয়ে সন্তান। কোনো কারণে সময় পেরিয়ে গেলে মুখে ভাত না দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে কোনো অমঙ্গল হলে সারা জীবন কথা শুনতে হবে আমাকে।'
বিধুভূষণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “নিশ্চিন্তে থাকুন আমি এখনই আসছি।” লোকটা তাঁর কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে কাকে যেন মোবাইল ফোনে খবরটা দিতে দিতে গাড়িতে উঠে হুঁশ করে বেরিয়ে গেল।
লোকটা চলে যাবার পর ক্যামেরা ইত্যাদি ব্যাগে ভরে ঝাঁপটা কোনোরকমে বন্ধ করে রক্ষাকালীর মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন বিধুভূষণ। ফাঁকা রাস্তাটা গঙ্গার সমান্তরালই এগিয়েছে সামনের দিকে। শ্মশানঘাট, স্নানের ঘাট আর রক্ষাকালীর মন্দির সবই গঙ্গার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর নীল আকাশ। ফাঁকা রাস্তায় সাইকেল চালাতে বেশ ভালো লাগছিল বিধুভূষণের। বিষণ্ণতা কেটে উঠে উৎফুল্ল ভাব ফুটে উঠল তাঁর মনে। যৌবনে তিনি বেশ কয়েকবার রক্ষাকালীর মন্দিরেও ছবি তুলতে গেছেন। বিয়ের ছবি। সে সময় অনেক বিয়েও হতো ওই মন্দিরে। বিধুভূষণের মনে হতে লাগল আবার যেন পিছু হটে সেসব দিনে পৌঁছে গেছেন তিনি। সব বিষণ্ণতা কেটে গেল তাঁর। সাইকেল চালাতে চালাতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিনি পৌঁছে গেলেন রক্ষাকালীর মন্দিরের সামনে।
রক্ষাকালীর মন্দিরটা বেশ প্রাচীন। কেউ কেউ বলেন, এ মন্দিরের বয়স নাকি তিনশো বছর। কোনো এক সওদাগর নাকি একবার গঙ্গাবক্ষে প্রচণ্ড ঝড়-জলের মধ্যে পড়ে মা কালীকে স্মরণ করেন তাঁকে রক্ষা করার জন্য। তাঁর ডাকে ঝড়-জল থেমে যায় এখানে এসে। এখানেই তাঁর বাণিজ্য তরী ভেড়ান সওদাগর। তারপর গড়ে তোলেন এই মন্দির। এ সবই লোকমুখের কথা। তবে দেখলেই বোঝা যায় মন্দিরটা খুব প্রাচীন। মন্দিরের গা বেয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে গঙ্গার ঘাটের দিকে। লোকে ও ঘাটকে বলে, 'সওদাগরের ঘাট'।
বিধুভূষণ এক জায়গাতে রাস্তার পাশে সাইকেলটা রাখলেন। মন্দিরের সামনের রাস্তায় তিন-চারটে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে যে গাড়িটা স্টুডিওতে গেছিল সেটাও আছে। মন্দিরের সামনের ছোট্ট চাতালটাতে বেশ কিছু নারী-পুরুষ। তারা সবাই সেজেগুজে এসেছে। বিধুভূষণকে দেখতে পেয়ে যে লোকটা তাঁকে ডাকতে গেছিল সে সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে এসে তাঁর উদ্দেশে বলল, 'আসুন, আসুন । আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। পূজাপাঠ শেষ। এখন বাচ্চাটার মুখে মায়ের প্রসাদ তুলে দেওয়াই বাকি। আপনি এসে বাঁচালেন আমাকে।
লোকটার সঙ্গে ক্যামেরা বার করতে করতে, চাতালের উপর উঠলেন বিধুভূষণ। ছোট্ট চাতাল। তারপরই মন্দিরের গর্ভগৃহ। সেখানে অবস্থান করছেন দেবী রক্ষাকালী। ক্যামেরা হাতে বিধুভূষণকে ওপরে উঠতে দেখেই তাঁকে রাস্তা করে দেবার জন্য নারী-পুরুষের ভিড়টা সরে দাঁড়াল দু-পাশে। বিধুভূষণ মন্দিরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখানে প্রসাদের পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ঠাকুরমশাই। যার মুখে প্রসাদ দেওয়া হবে তাকেও দেখতে পেলেন বিধুভূষণ। সাত মাসের একটা ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে তার মায়ের কোল আঁকড়ে আছে। গলায় সোনার হার, পায়ে সোনার মল ছোট্ট সুন্দর একটা মেয়ে। ড্যাবড্যাব করে সে তাকিয়ে দেখছে চারপাশে।
বিধুভূষণ সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই ভিড়ের মধ্যে একজন লোক ঠাকুরমশাইকে বলল, “ক্যামেরাম্যান এসে গেছে ঠাকুরমশাই এবার আপনি প্রসাদ দিতে পারেন। কি ক্যামেরাম্যানদাদা, আপনি রেডি তো?'
বিধুভূষণ তাঁর ক্যামেরাটা চোখের সামনে তুলে ধরে ক্যামেরার লেন্সটাকে একটু অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, আমি রেডি।' ঠাকুরমশাই প্রসাদী থালা নিয়ে এগিয়ে এলেন বাচ্চাটার সামনে। থালা থেকে প্রসাদ নিয়ে তিনি তুলে দিতে যাচ্ছিলেন বাচ্চাটার মুখে। বিধুভূষণও ক্যামেরার শাটার টিপতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় কে যেন গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, 'দাঁড়ান দাঁড়ান ঠাকুমশাই।'
সে কথা শুনে থালা থেকে প্রসাদটা তুলেও থেমে গেলেন ঠাকুরমশাই। বিধুভূষণও ক্যামেরাটা নামিয়ে নিলেন। আরও কেউ প্রসাদ দেবার সময় বাচ্চাটার পাশে দাঁড়াবে নাকি ? ভিড়ের মধ্যে থেকে বিধুভূষণের সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন প্রবীণ মানুষ। রাশভারী চেহারা, পরনে ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে মানানসই চশমা। চশমার ফ্রেমটা ভালো করে চোখে উঠিয়ে নিয়ে বিধুভূষণের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, 'আপনার স্টুডিওটা শ্মশানের সামনে না?'
বিধুভূষণ জবাব সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক যে লোকটা বিধুভূষণকে ডেকে এনেছে তার উদ্দেশে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘শুভ কাজে ছবি তোলার জন্য এ কাকে ডেকে আনলি! এ যে শ্মশানের ফটোগ্রাফার !”
দিলেন, 'হ্যাঁ।'
চমকে উঠল উপস্থিত সকলে। যে লোকটা বিধুভূষণকে ডেকেছিল সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল, 'ইয়ে মানে, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আসলে অন্যসব স্টুডিও বন্ধ ছিল...।'
লোকটাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে প্রবীণ ভদ্রলোক তাকে ধমকে উঠে বললেন, “বুঝতে পারিসনি মানে? এর দোকান ভরতি খালি মড়ার ছবি দেখেও বুঝতে পারিসনি? সেবার ছোটকাকা মারা গেলে আমাদের শ্মশানে ইলেকট্রিক চুল্লি বন্ধ থাকায় তাকে দাহ করতে এনেছিলাম এখানকার শ্মশানে। তখনই দেখেছিলাম মড়ার ছবি নিয়ে দোকানে বসেছিল এ লোকটা। একজন লোক বলছিল লোকে একে নাকি ‘অপয়া ফটোগ্রাফার' বলে। আমার নাতনির মুখে প্রসাদ দেওয়ার ছবি শেষে এই অপয়া ফটোগ্রাফার তুলবে। হতে পারে তোদের সঙ্গে আমাদের সম্পত্তি নিয়ে একটা মনোমালিন্য চলছে। তাই বলে তুই আমাদের এত ক্ষতি করতে যাচ্ছিলি?'
উপস্থিত জনতার মধ্যে এবার একটা শোরগোল শুরু হল। যে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই মা এবার ভবিষ্যতে বাচ্চাটার অমঙ্গলের আশঙ্কায় বুকে জাপটে ডুকরে কেঁদে উঠল। যাকে ভর্ৎসনা করা হল সে এবার মিনমিন করে কী একটা জবাবদিহি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার দিকে না তাকিয়ে বিধুভূষণের দিকে তাকিয়ে বাচ্চাটার ঠাকুর্দা অথবা দাদু বলে উঠলে, ‘আপনাকে আমি দেখেই চিনেছি। আচ্ছা বেয়াক্কেলে লোক তো আপনি। ডাকল আর আপনিও পয়সার লোভে ছুটে এলেন। ছিঃ ছিঃ আপনার একবারও মনে হল না যে এই শুভ কাজে আপনার মতো শ্মশানের অপয়া লোক এলে শিশুটার অকল্যাণ হবে? বুঝতে পারছি, শ্মশানের চাঁড়াল-ডোমদের সঙ্গে থাকতে থাকতে, মড়ার ছবি তুলতে তুলতে আপনি যতই ভদ্র পোশাক পরুন না কেন আপনি তাদের মতোই হয়ে গেছেন। কত পয়সা দিতে হবে বলুন? আপনি এখান থেকে চলে যান।' বিধুভূষণের উদ্দেশ্যে একটানা কথাগুলো বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে একতাড়া নোট বার করলেন সেই লোকটা।
বিধুভূষণ মুহূর্তের জন্য যেন পাথরের মূর্তি বনে গেলেন লোকটার কথা শুনে। এত অপমানিত তিনি কোনোদিন হননি। লোকে আড়ালে তাঁকে ‘অপয়া ফটোগ্রাফার’ বলে, তিনি জানেন। তবে সামনাসামনি তাঁকে এ কথা কেউ কোনোদিন বলেনি। আর একটু হলে ক্যামেরাটা খসে পড়ছিল তাঁর হাত থেকে। কোনোরকমে তিনি সেটা সামলে নিয়ে ব্যাগে পুরে ফেললেন। টাকা বার করে লোকটা বললেন, 'বলুন, বলুন, কত দিতে হবে আপনাকে? টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় হন। সময় নষ্ট করবেন না।'
সন্তান কোলে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে মা। অন্য মেয়েরাও তাকে দেখে এবার তার সঙ্গে সুর মেলাল। পুরুষদের মধ্যে কে যেন বলে উঠল, ‘ওর সঙ্গে এত কথার কী আছে? ঘাড় ধাক্কা দিলেই তো হয় ।’
বিধুভূষণ আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। কোনোরকমে চাতাল ছেড়ে নেমে চটিতে পা গলিয়ে সাইকেলে উঠে এগোতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর সামনে এসে পড়ল একটা মেয়ে। আর একটু হলে তিনি তাকে ধাক্কা মারতে যাচ্ছিলেন। মুহূর্তের জন্য তাকে দেখে বিধুভূষণের যেন মনে হল এই মেয়েটাই যেন আজ তাঁর দোকানে এসে ঘাট কোনদিকে তা জানতে চাচ্ছিল। তবে তখন তাঁর এত ভাবার সময় নেই। তাঁর কানে বাজছে সদ্য শোনা কথাগুলো। কোনোরকমে সাইকেলটা সামলে নিয়ে তিনি এগোলেন দোকানে ফেরার জন্য। কোনোরকমে দোকানে পৌঁছে পাল্লা সরিয়ে দোকানে ঢুকলেন তিনি। কুঁজো থেকে জল নিয়ে ঢকঢক করে একগ্লাস জল খেলেন। তারপর ব্যাগটা নামিয়ে চেয়ারে বসলেন। তখনও থরথর করে কাঁপছেন বিধুভূষণ।
নিজের মনকে আপ্রাণ শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন বিধুভূষণ। কিন্তু বার বার রক্ষাকালীর মন্দিরের দৃশ্যটা ভেসে উঠতে লাগল তাঁর চোখে, কথাগুলো বাজতে লাগল তাঁর কানে। এই সত্তর বছরের জীবনে বিধুভূষণ জ্ঞানত কারওর ক্ষতি চাননি, ক্ষতি করেননি। তাঁর উপস্থিতি কি সত্যি ক্ষতি করত ওই ছোট্ট শিশুর জীবনে? বিধুভূষণ কি সত্যিই অপয়া হয়ে গেছেন শ্মশানে থাকতে থাকতে, মড়ার ছবি তুলতে তুলতে? চারপাশের এই ছবিগুলোর মধ্যে থাকতে থাকতে? ভাবতে ভাবতে সময় এগিয়ে চলল। বিধুভূষণের দোকানের সামনে দিয়ে বেশ কয়েকটা গাড়ি শ্মশানে ঢুকল। একটা গাড়ি থেকে তো শবদেহ নামাবার সময় খাটের থেকে একগোছা রজনীগন্ধা খসে পড়ল বিধুভূষণের দোকানের সামনেই। অন্য সময় হলে বিধুভূষণ ফুলের গোছাটাকে দোকানের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলতে বলতেন লোকগুলোকে। কিন্তু ব্যাপারটা তিনি দেখেও যেন খেয়াল করলেন না। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল একসময়। একই কথা ভেবে যাচ্ছেন তিনি—'আমি কি সত্যি অপয়া হয়ে গেছি এই ছবিগুলোর জন্য? আমার কি যাওয়া উচিত ছিল না ওই শুভ কাজে?' একসময় তিনি ফিরে তাকালেন ছবিগুলোর দিকে। হঠাৎ তাঁর মনে হল, আমিই-বা এ ছবিগুলোকে আঁকড়ে রেখেছি কেন? এরাতো আমার কেউ নয় । এরা যাদের পরিজন হত তারাই তো ভুলে গেল এদের? এই ছবিগুলো কেউ কোনোদিন আর নিতে আসবে না। ছবিগুলো সুন্দরও নয়। তারা কেউ কোনোদিন হাসে না বিধুভূষণের দিকে তাকিয়ে, চোখ মেলে না । চোখ বন্ধ, নিষ্প্রাণ ঠোঁট, সার সার মৃত মানুষের ছবি। এদের জন্যই তো তাঁর ‘অপয়া’ নাম। ছবিগুলো গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়াই ভালো । এই প্রথমবার ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বিতৃষ্ণা বোধ করলেন বিধুভূষণ। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার তাঁর মনে হল, এই ছবিগুলোর সঙ্গে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাঁর মনে। ছবিগুলোর মধ্যে বেশ ক-জন মানুষকে তিনি চিনতেনও এই ছোট্ট স্টুডিওতে কত বছর ধরে ছবিগুলো সঙ্গ দিয়ে আসছে বিধুভূষণকে। হতে পারে তারা চোখ মেলে না, হাসে না, এদের জন্যই বিধুভূষণের অপয়া নাম তবুও তো তারা রয়ে গেছে বিধুভূষণের সঙ্গে। তারা আছে যখন থাক না। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হল বিধুভূষণের মনে।
—‘একটু জল খাওয়াবেন?
কথাটা শুনে ফিরে তাকালেন বিধুভূষণ। তিনি খেয়ালই করেননি স্টুডিওর ভিতরে ঢুকে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একজন। তার পরনে শাড়ি। হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগের মতো ছোট ব্যাগও আছে।
বিধুভূষণ নিঃশব্দে উঠে ঘরের কুঁজো থেকে গ্লাস জল নিয়ে এগিয়ে দিলেন তার দিকে। ঢকঢক করে জল খেয়ে সে বলল, 'আর একটু হবে?' আবারও তাকে আর এক গ্লাস জল দিলেন বিধুভূষণ। এক নিঃশ্বাসে জলটুকু খেয়ে গ্লাসটা বিধুভূষণের হাতে ফিরিয়ে দেবার সময় এবার তিনি তাকে চিনতে পারলেন। তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে ঠিক ভদ্রমহিলা না বলে মেয়েই বলা যায়। কত আর বয়স হবে, পঁচিশ-ছাব্বিশ। আরে এই মেয়েটাই তো সকালবেলা তাঁর কাছে ঘাট কোথায় জানতে চেয়েছিল। মেয়েটাকে যেন তিনি রক্ষাকালীর মন্দিরের ওখানেও দেখলেন। আগে তার গায়ে চাদর ছিল বলে এখন তাকে প্রথমে দেখে তিনি চিনতে পারেননি তাকে।
তার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে সেটা যথাস্থানে রাখার পর বিধুভূষণ যখন চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন তখন মেয়েটা বলল, ‘আমি একটু বসব এখানে? একটু পরই আবার চলে
যাব।'
বিধুভূষণ তাকালেন মেয়েটার মুখের দিকে। বিষণ্ণতা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে তার মুখে। একটু ইতস্তত করে বিধুভূষণ বললেন, “বসো।’
বিধুভূষণের কথা শুনে তাঁর কিছুটা তকাতে অন্য চেয়ারটায় বসে রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ছবিগুলো দেখতে লাগল। বিধুভূষণও আবার ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আগের কথাগুলো ভাবতে লাগলেন। 'এই ছবিগুলো কাদের?
প্রশ্নটা শুনে একটু চমকে উঠে জবাব দিলেন, “মৃত মানুষদের। যাদের দাহ করার জন্য এ শ্মশানে আনা হয়েছিল।
মেয়েটা আবার প্রশ্ন করল, 'ছবিগুলো এখানে রয়ে গেল কেন?”
বিধুভূষণ বললেন, 'ছবিগুলো আমিই তুলেছিলাম বিভিন্ন সময়। যারা ছবিগুলো তুলতে দিয়েছিল তারা আর নিয়ে যায়নি তাই।'
—'ভুলে গেছে নিতে?'
এ প্রশ্ন শুনে একটু চুপ করে থেকে বিধুভূষণ বললেন, 'সবাই নিশ্চয় ভোলেনি। হয়তো আসলে মানুষগুলোকেই ভুলে গেছিল তারা। তাই আর ছবিগুলো নিতে আসার প্রয়োজনবোধ হয়নি।'
মেয়েটা প্রশ্ন করল, 'মানুষগুলোকে কেন ভুলে গেল তারা?
একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে মেয়েটার মনে। তিনি বললেন, 'হয়তো যে মানুষকে ছেড়ে বাঁচা সম্ভব নয় বলে মনে হয়, কাল তাকে মানুষ ভুলে যায়। হয়তো এটাই পৃথিবীর নিয়ম।’
বিধুভূষণ বুঝতে পারলেন ছবিগুলো নিয়ে কোনো কারণে
উত্তর শুনে মেয়েটা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘সেটা কেমন ব্যাপার?”
তার প্রশ্ন শুনে হঠাৎ বিধুভূষণের মনে হল, আরে এই অপরিচিত মেয়েটাই তো হয়তো তাঁর ছবিগুলো এখানে রাখা উচিত কিনা সে ব্যাপারে সমাধান করে দিতে পারে। দেওয়ালে টাঙানো যে ছবিগুলোর ব্যাপারে তিনি জানেন সে ব্যাপারে মেয়েটাকে কিছু কথা বলা যাক না? তারপর তিনি তাকে প্রশ্ন করবেন, 'যখন এদের পরিজনরাই এদের ভুলে গেল তখন এই ছবিগুলো রাখার তাঁর দরকার আছে কি?”
কথাগুলো ভেবে নিয়ে তিনি ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওই যে বাঁ-দিকের কোণে গোঁফওয়ালা মৃত মানুষের ছবিটা। ও লোকটা এ অঞ্চলের বড় ব্যবসায়ী ছিল। তিন ছেলে। তারা বিদেশে থাকে। মরদেহের সঙ্গে বড় নাম সংকীর্তনের দল এসেছিল। চন্দন কাঠে দাহ করা হয়েছিল দেহ। ছেলেরাই তার আগে শ্মশানে ছবিটা তুলিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে পুরো টাকাও দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ছবিটা আর তারা নিতে এল না। ছেলেদের মধ্যে একজনের সঙ্গে আমার বাজারে দেখা হয়েছিল এর কিছুদিনের মধ্যে। আমি তাকে ছবিটা নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেই সে বলল, 'আমরা তো আবার বিদেশে ফিরে যাচ্ছি। ওখানে ছোট ফ্ল্যাটে থাকি। আপনাকে তো ছবির টাকা দিয়েছি, ওটা আপনার কাছেই থাক। তেমন হলে ছবিটা গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন...।'
এবার কালো ফ্রেমের ওই মেয়েটার ছবিটা দেখো। তেরো-চোদ্দো বছরের মেয়েটার ছবি। টাইফয়েডে মারা গেছিল মেয়েটা। দেহটা যখন শ্মশানে এল তখন তার বাবা-মায়ের দেহ জড়িয়ে কী কান্না! বুকফাটা সেই হাহাকার যেন এখনও শুনতে পাই আমি। শ্মশানের যে ডোম রোজ মড়া পোড়ায় তার চোখেও জল নেমেছিল সে দৃশ্য দেখে। কিন্তু ছবি তোলার পর সে ছবি আর নিতে এল না বাবা-মা। কিছুদিনের মধ্যে তাদের একটা পুত্রসন্তান জন্মাল । সেই আনন্দেই হয়তো এই হতভাগীকে ভুলে গেল তারা...’
একের পর এক ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে তাদের এখানে রয়ে যাবার কারণ ব্যাখ্যা করতে লাগলেন বিধুভূষণ। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল। দীর্ঘক্ষণ কথা বলে চলার পর শেষ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওটা দেখো। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলে ছিল। একটা মেয়েকে ভালোবাসত। হয়তো-বা মেয়েটাও সে সময়ের জন্য ভালোবেসেছিল তাকে। বিয়ে নিয়ে দু-বাড়িরই অমত। তাই একসঙ্গে বিষ খেল দু'জন। ছেলেটা মরে গেল, মেয়েটা বেঁচে গেল। আসলে নাকি দু'জনে একসঙ্গে বিষ খাবে বললেও শেষ পর্যন্ত হাতে করে মেয়েটার খাবারে বিষ মেশাতে পারেনি ছেলেটা। পোস্টমর্টেমের পরে দু-দিন বাদে যখন বরফমোড়া ছেলেটার দেহ শ্মশানে এল তখন সেই পচাগলা দেহ জাপটে ধরে মেয়েটার সে কী আর্তনাদ! বৃষ্টি নেমেছিল আকাশ ভেঙে। মেয়েটার কাতর অনুরোধেই ছবিটা আমি তুলেছিলাম। কিন্তু সে আর ছবিটা নিতে এল না। তার মন থেকে ছবিটা এখন মুছে গেছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে এখন তার দিব্যি হাসিখুশি পরিবার। এই ছবির মানুষগুলো আমার কেউ হয় না। কিন্তু একদিন এরা কারও কেউ ছিল। এখন এরা শুধু ছবি হয়ে রয়ে গেছে আমার কাছে...’
বিধুভূষণ তাঁর কথা শেষ করে এবার তাঁর প্রশ্নটা জিগ্যেস করার জন্য ফিরে তাকালেন মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটার মুখের বিষণ্ণতা এ সময়ের মধ্যেই কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। বরং মেয়েটার ঠোটের কোণে ফুটে উঠেছে কৌতুকের হাসি। থমকে গেলেন বিধুভূষণ। মেয়েটা হাসছে কেন?
তার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন বিধুভূষণ। মেয়েটা এবার বিধুভূষণকে চমকে দিয়ে বলে উঠল, ‘আপনি আমার একটা ছবি তুলে দেবেন ?'
তার প্রশ্নর জবাবে কী উত্তর দেবেন বিধুভূষণ বুঝে পেলেন না। তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে মেয়েটা বলল, ‘দেবেন? ছবিটা দিয়ে খবরের কাগজে বিয়ের বিজ্ঞাপন দেব।'
বিধুভূষণের এবার মনে হল, তিনি মড়ার ছবি তোলেন বলে কি মেয়েটা বিদ্রুপ করছে তাঁকে? তিনি বললেন, “আমি তো মড়ার ছবি তুলি। শুভ কাজের জন্য ছবি তুলি না। আমি শ্মশানের অপয়া ফটোগ্রাফার।'
মেয়েটা হেসে বলল, 'তা জানি। সব ঘাটে লোকের ভিড় দেখে রক্ষাকালীর মন্দিরের ঘাটে গেছিলাম। আমি ঘটনাটা দেখেছি। সকাল থেকে এ-ঘাট ও-ঘাট ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি। ছবিটা তুলুন আমার। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি আমার। বাড়ির লোকও চিন্তা করছে। ফিরতে হবে। তবে ভয় নেই। ছবিটা আমি দু-দিন পরে এসে অবশ্যই নিয়ে যাব।' শেষ কথাগুলো বেশ দৃঢ়ভাবে বলল মেয়েটা।
তবে কি সত্যিই ছবি তুলতে এসেছে মেয়েটা? ভাবতে লাগলেন বিধুভূষণ ।
“কই, ক্যামেরা বার করুন। বললাম না দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার। ছবি তুলুন' কথাগুলো এবার যেন নির্দেশের ভঙ্গিতে বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে সামনে থেকে সেই মরদেহ থেকে খসে পড়া রজনীগন্ধার গোছাটা কুড়িয়ে স্টুডিওতে ঢুকে সেটা বুকে নিয়ে ছবি তোলার ভঙ্গিতে দাঁড়াল সে।
বিধুভূষণ বলে উঠলেন, 'আরে ওটা তো মড়ার ফুল। ফেলে দাও।'
... মেয়েটা বলল, 'জানি। আমি কিন্তু পাগল নই। নিন, ক্যামেরা বার করে ছবি তুলুন।'
বিধুভূষণ ঠিক বুঝতে পারছেন না কেন মেয়েটা তাঁকে দিয়ে ছবি তোলার জন্য জোরাজুরি করছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বুকে রজনীগন্ধার গোছা ধরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। শেষ বিকালের আলো এসে পড়েছে তার মুখে । সে মুখে কোনো বিষণ্ণতা নেই, বরং তার মুখমণ্ডলে জেগে আছে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। খুব সুন্দর ছবি হবে।
ক্যামেরার লেন্সের ক্যাপটা খুলে সেটা চোখের সামনে তুলে ধরার আগে তবুও একবার থমকে গেলেন বিধুভূষণ। ভাবলেন কাজটা কি তাঁর ঠিক হচ্ছে? শুভ কাজের জন্য ছবি তুলতে চাচ্ছে মেয়েটা। তাকে শেষবারের মতো সতর্ক করার জন্য তিনি বললেন, ভেবে দেখো একবার আমাকে দিয়ে শুভ কাজের ছবি তোলাবে কিনা? আমি শ্মশানের অপয়া ফটোগ্রাফার। মড়া মানুষের ছবি তুলি। তোমার চারপাশে শুধু মড়া মানুষের ছবি।'
মেয়েটা হেসে বলে উঠল, 'ওই জন্যই তো ছবি তোলাব আপনাকে দিয়ে। চারপাশের এই ছবিগুলোই তো আমাকে বাঁচিয়ে দিল।'
বিধুভূষণ বললেন, ‘মানে ?
মেয়েটা বলল, “আমার প্রেমিক আমাকে ছেড়ে গেছে। তাই ডুবে মরতে এসেছিলাম গঙ্গায়। কিন্তু এই ছবিগুলো আর তাদের গল্প আমাকে বুঝিয়ে দিল এ পৃথিবীতে কোনো সম্পর্কই হয়তো সত্যি নয়। তার জন্য আমার মৃত্যু মনে রাখবে না সে। অন্য কেউও আর মনে রাখবে না আমাকে। তার চেয়ে বরং বাঁচা ভালো। নতুন জীবনের সন্ধানে আবার নতুন করে বাঁচা ভালো। এই মৃত মানুষগুলোই জীবন ফিরিয়ে দিল আমার। নইলে অন্ধকার নামলে ঘাট ফাঁকা হলে আমি ঝাঁপ দিতাম জলে। এখন আমি বাঁচব।' কথার শেষে একরাশ হাসি ফুটে উঠল মেয়েটার মুখে।
বিধুভূষণ মেয়েটার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন।
কোথায় যেন ঢাক বাজছে। দেবী দুর্গার বোধনের বাজনা, উৎসবের বাজনা। মেয়েটার বুকে জড়ানো রজনীগন্ধা থেকে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে অপূর্ব এক সুবাস। বিকালের সোনালি আলোতে বিধুভূষণের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সেরা ছবি! ক্যামেরাটা চোখের সামনে তুলে ধরার আগে শেষ একবার মৃত মানুষের ছবিগুলোর দিকে তাকালেন বিধুভূষণ। কোথায় তারা মৃত! বিধুভূষণ দেখলেন চারপাশের ছবিগুলো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। তারা হাসছে বিধুভূষণের দিকে তাকিয়ে! আর দেরি করলেন না বিধুভূষণ । ক্যামেরাটা চোখের সামনে তুলে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ক্যামেরার শাটার তোলার জন্য চাপ দিলেন শ্মশানের অপয়া ফটোগ্রাফার বিধুভূষণ ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন