শাশ্বত কর

‘সকাল তো সকালই৷ জাস্ট জাগতিক নিয়ম৷ সূর্যের রোটেশান, থুক্কু পৃথিবীর রোটেশানের ফলশ্রুতি৷ এ নিয়ে এত আদিখ্যেতার কী আছে?’
‘তোর মতো পাথর ঘাঁটনেওয়ালা এর থেকে আর কি বেশি বলবে?’
মোজোর অভিমান খানিক সঙ্গত৷ মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে পাঁচ ভাই মিলে৷ সঙ্গে অবশ্য আমিও আছি৷ আমি মা আর বাবা—আমরা তিনজন এসেছি গত পরশু৷ মোজো আর টোকাটুলিরাও ওই ট্রেনে এসেছে৷ ছোদ্দাদু এসেছে ওইদিনই সকালের ট্রেনে৷ দাদানদাকে দেখতেই সবার আসা৷ দাদানদা হল আমার মায়ের বাবা৷ এই তো কাছেই কাঁকেরামপুর হাই স্কুলে হেডমাস্টার ছিলেন৷ বছর ছয়েক হল রিটায়ার করেছেন৷ মোজো, টোকাটুলি, দাদুতুতু আর ছোদ্দাদু হল দাদানদার চার ভাই৷ দিদিদি আর ছোদ্দিদি হল দাদানদার বড়দি আর ছোড়দি৷ দু-জনেই ইস্কুলে পড়াতেন৷ দাদুতুতুও ইস্কুলে পড়াতেন৷ সেই সূত্রে আগে বাইরেই থাকতেন সবাই, অবশ্য রিটায়ারমেন্টের পর তিনজনেই এখন এখানেই থাকেন৷ দাদানদার আবার ব্লাড সুগারের ব্যামো৷ সবাইকে বলে বেড়ান, তিনি নাকি মিষ্টি মানুষ! দাদানদা হেবিব আস্তে আস্তে কথা বলেন৷ দুটো শব্দের মাঝখানে মাঝে মাঝে এতটা সময় নেন যে মা আম্মা কখনো কখনো অধৈর্য হয়ে বলেই ফেলেন, ‘কী হল! পরের কথাটা তো বলো! কথা বলতে এত সময় নিলে কি হয়!’ দাদানদা কিন্তু কিছু বলেন না৷ কেবল কখনো কখনো কপাল কুঁচকোন৷ দাদানদা ভারি মজাও করেন৷ বাবার একটা মুদ্রাদোষ আছে৷ রেগে গেলেই যাকে-তাকে যখন-তখন মদন বলেন! দাদানদা সেই দেখে বলেছেন, ‘আহা! মদন-টদন বোলো না! বরং মধুসূদন বোলো৷ ধূ আর সু মনে মনে বাদ দিয়ে নেবে, তাইলেই দেখবে তোমার যা বলার তা বলাও হবে, অথচ যাকে বলছ, তিনিও শ্রী নারায়ণের নাম শুনে মন খারাপ করবেন না!’
সেই দাদানদার শরীরটা বেশ একটু খারাপ হয়েছিল৷ এখন অবশ্য সেরে গেছেন৷ তবুও দাদানদাকে ডাক্তারদাদু সকালে হাঁটতে বলেছে৷
রাতেরবেলা মামাবাড়ির খাবার টেবিলে বরাবরই দেখেছি ধুন্ধুমার হয়৷ সেদিনও তাই৷ বিভিন্ন কথা নিয়ে একদম মেসির মতো, নেইমারের মতো ড্রিবল হচ্ছে! যেকোনো কথা পড়লেই একেক দাদু একেক রকম করে স্কিল দেখাচ্ছেন! কোনো বিষয়ে কেউ একমত হচ্ছেন না৷ অথচ সেই চরম স্থানে যখনই সেই প্রাতর্ভ্রমণের প্রসঙ্গ উঠল, সব দাদুরা একেবারে একসুরে একসাথে হাউমাউ করে উঠল, ‘না, না! দাদা তুই একা হাঁটতে যাবি কেন? এই সবে অসুখ থেকে উঠলি৷ আমরা সবাই মিলে হাঁটতে যাব’৷ বলেই মোজো আমার দিকে ফিরেছে আর ছোদ্দিদি বলে উঠেছে, ‘কী, নটিকেও নিয়ে যাবি না কি?’
মোজো বলে উঠল, ‘অবভিয়াসলি! এমনিই আর্লি রাইজিং শরীরের জন্যে ভালো, তার উপর এত জন ইন্টেলিজেন্ট দাদুর সাথে মর্নিং ওয়াক—ক-জন এমন সুযোগ পায় বল তো?’ তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, ‘সবসময় কাজের মধ্যে থাকবি, বুঝলি মোজো! কাজ না থাকে তো দৌড়োবি! শুধু শুধুই দৌড়োবি৷ উদ্যম বাড়বে৷ যেকোনো কাজে উদ্যমটাই তো আসল৷ তোমার যতই ক্ষমতা থাক, উদ্যম নাই, তো বাসি সিঙ্গাড়ার মতো ফালতু৷ সিংহও তো বনের রাজা৷ তবুও তাকে শিকার ধরতে হয়৷ শরীরকে মজবুত রাখতে হয়৷ ঝিমন্ত সিংহের কোনো দাম নেই, বুঝলি? ন হি সুপ্তস্য সিংহ প্রবিশন্তি মুখে মৃগাঃ! মনে রাখিস কথাটা’
সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লুম৷
‘আর তা ছাড়া গঙ্গার পারটা সকালবেলা একদম অন্যরকম থাকে৷ বেলোর দেখা উচিত৷’ দাদুতুতু রুটি-তরকারি শেষ করে পাকা সিঙাপুরি কলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল৷
‘তাইলে কী খাড়াইল?’ দিদিদি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল৷
‘খাড়াইল গিয়া এই যে, আমাগো নাতি আমাগো সাথেই মর্নিং ওয়াকে যাইব!’ দাদানদা বলে উঠল৷
‘তাহলে আগামীকাল ভোরবেলায় মিশন মর্নিং ওয়াক! ওকে ব্রাদারস! গুড নাইট!’ ছোদ্দাদু হঠাৎ মিলিটারি মেজাজে কথাগুলো বলেই সেলুট-টেলুট ঠুকে পাক্কা জওয়ানি কায়দায় বেসিনে হাত ধুতে চলে গেল! সেই দেখে দিদিদি আর ছোদ্দিদি হাসতে হাসতে হিক্কা তুলে বলল, ‘ব্যস! হয়ে গেল!’
সেই মতোই ভোর সাড়ে তিনটে থেকে বাড়িময় হাউকাউ! লাভের মধ্যে লাভ ঘণ্টা! চার চারটে বাথরুম একেবারে টোটালি অকুপায়েড! এ বেরোয় তো ও ঢোকে! কেউ আবার বেরিয়েও অতৃপ্তির মুখ করে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে হাঁটেন, খানিক বাদে ফের ঢোকেন৷ ‘শুধু যাওয়া-আসা’—বাবার ফোনে দেবব্রত বিশ্বাস বাজে৷
যাই হোক, দেড় ঘণ্টার কেবল বাহ্যে সংক্রান্ত বাড়াবাড়ির শেষেও টোকাটুলির পেট গড়গড়ির কারণে তাকে ছেড়েই ফুল ব্যাটেলিয়ন পাঁচটা নাগাদ বেরিয়ে টুকটুক চড়ে গঙ্গার পার৷ এখানে এসে যে যার মতো স্পিডে হাঁটছে৷ আমি আর মোজো খানিক হেঁটে এসে ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে ভোরের গঙ্গা উপভোগ করছি৷ আজব দৃশ্য বটে৷ কেউ মেদে ঢেউ তুলে কসরত করছে, কেউ ধুতি লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে জলে ঝাঁপাচ্ছে, কারা যেন গঙ্গা নেমন্তন্ন করছে, কাদের ব্যান্ডপার্টির বিউগল বাজছে ভোঁপর ভোঁপর, ঘাটের পৈঠায় লাইন দিয়ে প্রায় আট-দশ জন একেবারে মাখন ন্যাড়া হচ্ছে৷ পারের বড়ো বড়ো গাছগুলোয় পাখিদের প্রাতঃকালীন সভা বসে গেছে, খানিক দূরে ফেরিঘাটের ওইখান দিয়ে নানান সামান নিয়ে নৌকো চলছে—এই সব দেখে কার না মন বয়ে যায় বলো? সেই জন্যেই হয়তো মোজো ভোরবেলার, ভোরে ওঠার সুফল বলছিল৷ ওদিকে দাদুতুতু সত্যেন দত্তের লেখা ভোরাই কবিতাটা আবৃত্তি করছিল৷ ঠিক সেই সময়ই দৌড়োতে দৌড়োতে ছোদ্দাদু হাজির! ছোদ্দাদুর চেহারাটা বেশ পালোয়ানি, গোঁফটাও দেহাতিদের মতো তিন ভাঁজের৷ এক কথায় জব্বর! এতক্ষণ দৌড়ে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে ওই কথাখানা বলল৷ স্বাভাবিক, এতক্ষণের ইমোশানটার মোশান এভাবে নষ্ট হওয়ায় মোজোও খানিক চটল! ফলত ছোদ্দাদু সম্পর্কে বেমক্কা ওই কথাটা বলে ফেলল! তো ছোদ্দাদুই বা থেমে থাকে কেন? কপালের বিন্দু বিন্দু চকচকে ঘাম রুমালে মুছে বলল—
‘পাথর ঘাঁটতে হলেও তার জন্যে মনোবৃত্তির কিছু এসে যায় না মেজদা! আর ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফর্মেশন, আমি পাথর ঘাঁটিও না৷ ম্যানেজারকে কোনোদিন পাথর ঘাঁটতে হয় না৷ তাও একটা নয়, সাতটা মাইনের ক্লাস্টারের৷ পাথর ঘাঁটা থেকে অনেক ওপরের লেভেল৷’
‘ও! তার মানে তুমি পাথর ঘাঁটাকে নীচু লেভেলে দেখ! শ্রেণিভেদ! ছি ছি ছোটো! এই পরিবারের ছেলে হয়েও কি না তোর এরকম ভাবনা!’
‘এ ভাবনাটা আমার না মেজদা! সকাল সকাল তোর ঠোঁট চুলকোচ্ছে বলে আমার উপর মনগড়া কথা চাপিয়ে ঝগড়ার তাল করছিস৷’
ছোদ্দাদুর প্রতিবাদ বোধ হয় মোজোর কানে গেল না৷ আগের কথার খেই ধরেই বলে চললেন, ‘কী পরিবার আমাদের! জানিস আমাদের গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার গোরা সৈন্য ঠেঙিয়েছিল! আওয়ার গ্র্যান্ডফাদার সাতচল্লিশটা স্কুল এস্টাব্লিশ করেন৷ আর আমাদের ফাদার, পরমপূজ্য পিতৃদেব—তাঁর কথা তো নিশ্চয়ই জানিস?’
‘আমি জানি! আমি জানি!’ মোজোর আঙুল খামচে কাঁই কাঁই করে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন৷ দেশের জন্যে জেল খেটেছিলেন’৷
মোজো আমার মাথায় আলতো চাঁটি মারল৷ এর মানে প্রশংসা৷ বাড়িতে টমি কথা শুনলে বাবা এমনি করে টমির পিঠে চাপড় মারেন৷ টমি আনন্দে তুড়ুক তুড়ুক ন্যাজ নাড়ে৷
আমার তো ন্যাজ নেই৷ মুখ আছে৷ মুখে হাজারো এক্সপ্রেশান আছে৷ কাজেই খুশি খুশি এক্সপ্রেশানে হেসে দিলাম একগাল৷
মোজো ছোদ্দাদুকে বলল, ‘দেখ! এই হল আমাদের বাড়ির শিক্ষা৷ জীবনের আসল শিক্ষা এ ছেলের টেন্ডস টু কমপ্লিট! আর স্কুলে না গেলেও চলে৷’
এমন প্রশংসায় সত্যি সত্যি ন্যাজ নাড়তে ইচ্ছে করছিল৷ বললাম, ‘মোজো! বাবাদেরও সব ইতিহাস আমি জানি৷ জুজুদাদা বলেছেন৷’
‘তবে তো ভবিষ্যতে তোমার কলেজে না গেলেও চলে! তাই না মেজদা?’ মুখে একটা চিড়বিড়ে হাসি ঝুলিয়ে ঠান্ডা গলায় ছোদ্দাদা কথাটা বলল৷
‘সর্দারি করিস না ছোটো! একমাত্র নাতিটাকে কোথায় উৎসাহ দিবি, তা না ডিমোটিভেট করছিস! মোটিভেশান যদি ঠিকঠাক পায় দেখবি এই বেলোই একদিন হয়তো নেপোলিয়ন বোনাপার্তে হবে৷ কাজের জন্যে জীবন উৎসর্গ করবে৷ তোর আর সেজোর মতো দিনের বেলা ভসভসিয়ে ঘুমুবে না৷ প্রয়োজনে ঘোড়ার পিঠেই পাওয়ার ন্যাপ নেবে৷’
‘আমি এখনই তো দিনে ঘুমোই না মোজো!’ প্রশংসার লোভে চ্যাঁচালাম!
‘হ্যাঁ৷ ঘুমোই না আর গুলতি নিয়ে মৌচাকে ঢিলিয়ে বেড়াই!’
দাদুতুতু এতক্ষণ গঙ্গার দিকে মুখ করে কী দেখছিল৷ কথাটা বলতে বলতে ঘুরে দাঁড়াল৷
ছোদ্দাদু সাপোর্ট পেয়ে বলে উঠল, ‘এই দেখ না সেজদা! মেজদা নাতিটার মাথা একেবারে সজনে চেবান চিবুচ্ছে! এখনই প্রশ্রয় পেয়ে বড়োদের কথায় ফুট কাটছে৷ এরপর আর কারও কথায় মান দেবে ও! এখন থেকেই যা শেখানোর ওকে শেখানো দরকার মেজদা৷ বড়ো হয়ে গেলে যতই চেষ্টা করো, আর হবে না! সেই যে কথায় বলে না, কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!’
‘স্নেহ অতি বিষম বস্তু রে ছোটো৷ সবাই বোঝে না৷ অবশ্য তুই, সেজ দু-জনের কেউই বা বুঝবি কেমন করে! দু-জনেরই তো সকল স্নেহ আর অ্যাবস্ট্রাক্ট নেই, একেবারে কংক্রিট! তোদের স্নেহ তো স্নেহ পদার্থ হয়ে সব স্তরে স্তরে জমেছে ভুঁড়িতে! আর তাছাড়া পাথর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে সুকুমার আবেগগুলোও তোর সলিড পাথর হয়ে গিয়েছে৷’
‘মেজদা, কথায় কথায় জীবিকা তুলে কথা বলিস না!’ ছোদ্দাদুর ফেসিয়াল এক্সপ্রেশান বলছে ছোদ্দাদুর রাগ হয়েছে!
‘আমি তোমার জীবিকা তুলে কথা বলিনি৷ জীবিকার রেফারেন্স টেনেছি কেবল পয়েন্ট এস্টাব্লিশ করতে৷ তাও যদি তোমার খারাপ লাগে, বেশ আর বলব না! কিন্তু মনে রেখো, আমার আর আমার নাতির রিলেশান নিয়েও কোনো টিপ্পনি চলবে না!’
‘নাতি তোর একার নয় মেজদা! তোরও যতটা, আমাদেরও ততটা৷ ওর মাথা চিবোলে আমরা প্রোটেস্ট করবই৷ কী বল সেজদা?’
কোথায় সেজদা! দাদুতুতু তো ফের গঙ্গাবক্ষে চক্ষুনিবেশ করেছেন৷ নিশ্চয়ই কিছু ভাবছেন৷ এখন কানের কাছে ঢাক বাজালেও শুনবে না!
দাদুতুতুর সাড়া না পেয়ে ছোদ্দাদু যখন চুপ করেছেন, তখন মোজোর মুখে কেমন একটা যাত্রা কাটিং হু-হু-হা-হা টাইপের রাবুণে হাসির এক্সপ্রেশান!
ছোদ্দাদু আমায় ডেকে বলল, ‘বেলো! বড়দা কোথায় রে?’
‘দাদানদা? ওইত্তো! ওই যে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছে!’
ছোদ্দাদু চিড়বিড়িয়ে বলল, ‘বাঃ! মর্নিং ওয়াকে এসে বসে বসে চা খাওয়া!’ বলেই দুদ্দাড় করে দোকানটার দিকে উঠে গেল৷
মোজো বলল, ‘দেখছিস মোজো! ছোটোটার এতেও হিংসা!’
‘হিংসা কোথায় মোজো!’
‘সে তুই বুঝবি না৷ অনেক ছোটো তুই, তোর মনটা এখনও ঘেঁটুফুলের মতো নরম!’ বড়োদের যে কীসে হিংসা হয় আর হয় না সে বোঝার সাধ্য এখনও তোর হয়নি৷ চল, ওখানে যাই৷ না থাক, আমি এগোই৷ আর তুই সেজটাকে ডেকে নিয়ে আয়৷’
ঘেঁটুফুল আর তেমন নরম কোথায়? ডাউটটা ক্লিয়ার করব বলে মোজোর দিকে ফিরতেই দেখি তিনি ততক্ষণে হাঁটা দিয়েছেন৷ কাজেই আমিও তুড়ুং করে লাফিয়ে অ্যাবাউট টার্ন নিলাম৷ দাদুতুতুর আঙুলটা ধরলাম৷ দাদুতুতু আমার দিকে দেখে বলল, ‘ওই দেখ বেলো! নৌকোটায় কী নিয়ে যাচ্ছে বল তো?’
বললাম, ‘কী আবার! খড়!’
‘বাঃ! বেশ তো ঠিক নিজের খাবারটা চিনে নিয়েছ! কিন্তু চাঁদু, আমি ওই নৌকোটার কথা বলিনি, ওর পিছনেরটা দেখতে বলেছি৷’
সেই নৌকোটা বোঝাই বাঁশ! ভাবলাম বলি, তুমিও ঠিকটাই দেখেছ! কিন্তু বললাম না! সব কথা বলা যায় নাকি!
দাদুতুতু বলল, ‘এখান থেকে সাড়ে সতেরো কিলোমিটার উত্তরে গেলে এই নদীর অন্য রূপ দেখবি! ওখান থেকেই নদীর দুটো ভাগ৷ এক ভাগ এই আমাদের দিকে, আর একটা ভাগ বাংলাদেশে৷’
‘একই নদী, একই জল, তবু দুটো দেশ!’
উত্তরে দাদুতুতু দু-হাত ছড়িয়ে আবৃত্তি করে উঠলেন, ‘এপারে যে বাংলাদেশ,ওপারে সেই বাংলা!’ তারপর ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন, ‘তাই হয় রে বেলো! এসব বড়োদের ভাগাভাগির ব্যাপার! এখন তুই বুঝবি না৷’
খানিক আগে মোজোও একই কথা বলেছিল৷ আরে মোজো তো দাদুতুতুকে ডাকতেও বলেছিল! ভুলে গেছিলাম! যাক বাবা, মনে পড়েছে যখন বলেই দিই—
‘দাদুতুতু! ওখানে সবাই তোমায় ডাকছে৷’
‘তাই না কি! চল তবে!’
ওখানে যেতেই দোকানদাদু দুটো সন্দেশ বিস্কুট হাতে ধরিয়ে দিল৷ বলল, ‘কী দাদাবাবু! মা-বাবা সবাই ভালো আছে তো?’
বিস্কুটটায় কামড় বসিয়ে মাথা নাড়লাম৷
সামনের বেঞ্চিটায় বসে দাদানদা আয়েশ করে গরম চায়ে ফুঁপাড়ছে৷ সরু সরু ধোঁয়াগুলো এলোমেলো হয়ে মিশে যাচ্ছে৷ মোজো দাদানদার পাশেই বসে৷ হাঁ করে তাকিয়ে আছে দাদানদার দিকে৷ খানিকক্ষণ সেই ধোঁয়ার ট্যারাবাঁকা চালচলন দেখে টেখে হঠাৎ বলল—
‘ক্যা রে দাদা! এ তোর কেমন ব্যাপার! তোর মর্নিং ওয়াকের প্রয়োজন বলে আমরা সবাই মিলে বেরোলাম আর আসা ইস্তক একটুও না হেঁটে তুই চায়ে দাঁত ডুবিয়ে বসে আছিস!’
ছোট্ট একটা সিপ করে গলায় একটা তৃপ্তির খ্যাঁকর দিয়ে দাদানদা বলল, ‘শোন মেজো! কাজের আবেগটাই আসল, বেগটা নয়! এই যে সকাল সকাল বেরোবো-বেরোবো ভাব এতে যে টেনশান হল, তাতে কতটা ক্যালোরি ঝরল জানিস! তারপর ওই টুকটুকে চড়ে লাফাতে ঝাঁপাতে কত ক্যালোরি ড্রেইন্ড হয়েছে তার হিসেব করিস? এই সব কিছু মেলালে দেখবি শরীরের যতটা কসরতের দরকার ছিল সবটা হয়ে গেছে৷ কিন্তু ভেবে দেখ, শরীরের কোটা পূরণ হলেও মনের হয়নি৷ সেইটে ঠিক করতে ধাঁই ধপর হাঁটা অথবা কোঁকর কোঁ কোঁকর কোঁ ঝগড়াঝাঁটির প্রয়োজন নেই৷ প্রয়োজন বৈদিক ঋষির মতো মা গঙ্গার সামনে বসে মলয় সমীরণের সাথে নিজ মনকে মিলিয়ে দেওয়া! ওম শান্তি! ওম শান্তি! শান্তিতে মন তুলোর মতো হালকা হয়ে গেলে চোখ বন্ধ করে ভোরের মিঠে হাওয়া চাখা৷’
‘সেই সঙ্গে গেলাস গেলাস চা চাখা! কোন বৈদিক ঋষি সকালে প্রার্থনার বদলে চরণের দোকানে চা চাখতেন বলতে পারিস?’ ছোদ্দাদু বলে উঠল৷
আর বলার সাথে সাথেই সেই চরণদাদু, যে কি না এতক্ষণ একবার দাদানদার কথায় আরেকবার মোজোর কথায় ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে সায় দিচ্ছিল, একেবারে খোনা জেনারেটারের মতো শব্দ করে হেসে উঠল৷
দাদানদা গম্ভীর গলায় বলল, ‘বলতে তো পারি, তবে বুঝবি না৷ বোঝার জন্যে যতটা আক্কেল দরকার তার সিকিভাগও তোদের ঘটে নেই৷ কাজেই পণ্ডশ্রম করব না৷’
ব্যাপারটা হয়তো আরও এগোতো, এগোলো না কেবল টুকটুক মামার দৌলতে৷ কোত্থেকে যেন সেই মুহূর্তেই এসে বলল, ‘দাদা! দেড় ঘণ্টা হয়ে গিছে! এবার বাড়ি চলেন৷ আমার আবার ইস্কুলের বাচ্চা আছে৷ আর দেরি করা যাবে লা গো!’
সবাই মিলে হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়ল৷ মর্নিং ওয়াকের নামে বড়ো বড়ো দাদুদের ফাঁকি দেওয়ার এই পুরো ব্যাপারটা কীভাবে বাড়িতে সবার সামনে প্লেস করব সেই কথাটা ভাবতে ভাবতেই আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে টুকটুকটা দিল ছেড়ে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন