প্রথম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

পার্থমেসোর সঙ্গে জমিয়ে দাবা খেলছিল টুপুর। খেলা তো নয়, যুদ্ধ! শুরু হয়েছে সেই দুপুর থেকে, রবিবারের বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধে, এখনও লড়াই থামার কোনও লক্ষণ নেই। টক্কর চলছে সমানে-সমানে। দু’পক্ষেরই স্নায়ু টানটান, একটা কী হয়, কী হয় ভাব! কালো বোড়েটাকে ষষ্ঠ ঘরে ঠেলে দিয়ে টুপুর একবার চোরা চোখে দেখে নিল পার্থমেসোকে। মাথাখানা চৌষট্টি খোপের বোর্ডের উপর ঝুঁকে পড়েছে, ভুরুতে ইয়া মোটা ভাঁজ। হবেই তো! মেসোর হাল এবারও মোটেই সুবিধের নয়। টুপুর খুইয়েছে একটা গজ, একটা ঘোড়া, আর দু’খানা বোড়ে। ওদিকে মেসোর দু’টো হাতিই খতম, তিন-তিনখানা সাদা বোড়ে অক্কা পেয়েছে, সাদা মন্ত্রীরও ল্যাজে-গোবরে দশা।

মেসোকে আরও চাপে ফেলতে টুপুর তাড়া লাগাল, “কী গো, আর কত ভাববে? মুভ করো।”

পার্থ গম্ভীর মুখে বলল, “দাঁড়া, দাঁড়া। সব দিকটা বুঝে নিই।”

“কম্পিটিশনে খেললে তুমি কিন্তু টাইম প্রবলেমে পড়ে যাবে। কোথাও তোমায় এত সময় দেবে না।”

“খুব ডেঁপো হয়েছিস তো! আমাকে নিয়ম শেখাচ্ছিস?” পার্থর দৃষ্টি তেরচা হল, “কবে থেকে দাবায় এত ওস্তাদ বনে গেলি রে? অবনীদার সঙ্গে রোজ প্র্যাক্টিস করিস বুঝি?”

“বাবা আজকাল থোড়াই দাবা খেলেন।”

“তা হলে কি তোর মাসির ট্রেনিং?”

টুপুর মুচকি হাসল। পার্থমেসোকে কেন বলতে যাবে, মিতিনমাসির টিপ্‌স সে পাচ্ছে বটে, কিন্তু আদতে তার উন্নতি তো ঘটেছে কম্পিউটারের সঙ্গে খেলে-খেলে। এই তো, এ বাড়িতে আসার পর, গত সাতদিনে আরও কত নতুন-নতুন চাল যে শিখল। নানান ধরনের ডিফেন্স, নয়া-নয়া কৌশলে আক্রমণ…। কম্পিউটারের শিক্ষা থেকেই তো এবার রক্ষণব্যূহ সাজিয়েছে নিমো-ইন্ডিয়ান কায়দায়, যা ভেদ করতে হিমশিম খাচ্ছে মেসো। এখন একবার যদি ভুল করে মন্ত্রীটাকে পিছিয়ে নেয়…।

হ্যাঁ, তাই হল। মন্ত্রী কোনাকুনি দু’ধাপ হঠে গিয়েছে। ব্যস, টুপুরকে আর পায় কে! লাফিয়ে উঠল কালো ঘোড়া, আড়াই ঘরের মোক্ষম প্যাঁচে একসঙ্গে পাকড়াও করেছে সাদা মন্ত্রী আর নৌকোকে। মেসোর মাথায় হাত। চুল খামচাচ্ছে।

ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে বুমবুমের প্রবেশ। পার্কে ফুটবল পেটাতে গিয়েছিল, বিস্তর আছাড় খেয়েছে, সর্বাঙ্গ ধুলোকাদায় মাখামাখি। সটান টুপুরের পাশে বসে পড়ে বলল, “ও মা, তোমরা এখনও খেলছ?”

পার্থ গোমড়া গলায় বলল, “সোফা নোংরা কোরো না বুমবুম। যাও, জামা-প্যান্ট বদলে এসো।”

“বুঝেছি।” বুমবুম ফিচেল হাসল, “তুমি টুপুরদিদির কাছে হারছ।”

“চোপ! যাও এখান থেকে।”

বুমবুম পলকে ধাঁ। পার্থর ধমক শুনে এবার মিতিন আবির্ভূত হয়েছে। চোখ ঘুরিয়ে বলল, “ব্যাপারটা কী? হঠাৎ চেঁচামেচি কেন ? টুপুরের সঙ্গে পারছ না বুঝি?”

পার্থ অপ্রস্তুত হয়েছে এতক্ষণে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আরে দুর, টুপুরের সঙ্গে আবার পারাপারির কী আছে! ছোটদের জিতিয়ে দিলে তবেই তো তারা খেলায় উৎসাহ পাবে।”

“ভুলভাল যুক্তি সাজিয়ো না,” মিতিন ফিক করে হাসল, “দাবাটা ছোটরাই ভাল খেলে স্যার। তারা অনায়াসেই বড়দের পটকে দেয়। কেন বলো তো?”

“ছোটদের মাথায় প্যাঁচপয়জারগুলো ভাল খেলে বোধ হয়।”

“আজ্ঞে না স্যার। ছোটদের মেমরি ব্যাঙ্কের স্টক কম, কিন্তু যেটুকু তাদের মেমরিতে থাকে, সেটুকু তারা সঙ্গে-সঙ্গে স্মরণে আনতে পারে। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক দেখবে, অতিরিক্ত মেমরির ভারে হ্যাং করে যায়। আমাদের, বড়দের হয় সেই দশা। ছোটরা অবলীলায় সম্ভাব্য ষাট-পঁয়ষট্টিটা চাল মাথায় রেখে সেই অনুযায়ী আক্রমণ শানিয়ে যায়। বড়রা কিন্তু তা পারে না। তাই একটা বয়সের পর ফিশার-কাসপারভদের মতো প্রতিভাধরদেরও দাবার আসর থেকে সরে যেতে হয়। অথচ ওঁরাই পনেরো-যোলো বছর বয়সে দুনিয়া কাঁপিয়েছিলেন। তিরিশ পেরোবার আগেই হয়েছিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।”

“রাইট, রাইট।” পার্থ উজ্জীবিত হয়েছে, “বিশ্বনাথন আনন্দই তো কম বয়সে…। কিংবা আমাদের ঘরের ছেলে সূর্যশেখর বা দিব্যেন্দু…”

“অতএব বুঝতে পারছ, টুপুরের কাছে হারায় কোনও লজ্জা নেই।”

“যাঃ, লজ্জা পাব কেন!” টুপুরের মাথায় আলগা চাপড় দিল পার্থ, “মন দিয়ে দাবাটা খেল রে টুপুর। তোর হবে। আমাকে যখন দু-দু’বার হারাতে পেরেছিস…। জানিস তো, আমি খুব একটা হেঁজিপেঁজি প্লেয়ার নই। আন্ডার ফিফটিনের স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে…”

“তুমি লাস্ট হয়েছিলে, তাই তো?” মিতিন ফোড়ন কাটল।

“নো। আমার নীচে আরও দু’জন ছিল।” পার্থ হ্যা হ্যা হাসছে, “যাক গে, একটু গরম-গরম কফি খাওয়াবে?”

“দিচ্ছি। কিন্তু তোমাদের খেলাটা যে এবার বন্ধ করতে হবে।”

“কেন?”

“আমার কাছে এক্ষুনি একজন আসবেন।”

“কে?”

“জনৈক আর্মেনিয়ান মহিলা।”

“আর্মেনিয়ান? তিনি তোমার সন্ধান পেলেন কী করে?”

“হয়তো কাগজে পড়ে। কিংবা কোনও ম্যাগাজিন-ট্যাগাজিন। আমার থার্ড আইয়ের নাম তো এখন একেবারে অপরিচিত নয়।”

দাবা ভুলে গিয়েছে টুপুর। টগবগ করে ফুটছে উত্তেজনায়। চোখ গোল-গোল করে বলল, “তা হলে একটা নতুন কেস বলো? আমার সামার ভেকেশনটা তা হলে মাঠে মারা যাচ্ছে না?”

“ধীরে মিস ওয়াটসন, ধীরে। আগে তিনি পায়ের ধুলো দিন, তাঁর সমস্যাটা কী শুনি, আদৌ তাঁকে ক্লায়েন্ট হিসেবে নেব কিনা ভেবে দেখি… তারপর না হয় নাচনকোদনটা শুরু করিস।”

তা মিতিন যতই জল ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করুক, টুপুরের কৌতূহল কিন্তু নিবল না। একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে সে। মিতিন রান্নাঘরে যেতেই পার্থমেসোকে জিজ্ঞেস করল, “আর্মেনিয়ান মহিলার কী কেস হতে পারে বলো তো?”

পার্থ দাবার খুঁটি বাক্সে পুরছিল। ঠোঁট উলটে বলল, “কী করে আন্দাজ করি বল! দু-চার দিনের মধ্যে লোকাল আর্মেনিয়ানদের নিয়ে কোনও ঘটনা কাগজে বেরিয়েছে কিনা তাও তো মনে পড়ছে না। তবে এটুকু বলতে পারি, আর্মেনিয়ানরা মূলত বেনিয়া। অর্থাৎ কেসটা ধরলে তোর মাসির টু পাইস আসবে।”

মিতিন শুনতে পেয়েছে কথাগুলো। গলা উঠিয়ে বলল, “গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল কোরো না। কলকাতার আর্মেনিয়ানরা মোটেই তেমন বড়লোক নন। অন্তত এখন যাঁরা থাকেন। এবং এঁদের অধিকাংশই বয়স্ক। অনেকে চার্চ থেকে সাহায্য পান, আবার কেউ- কেউ ক্রিশ্চানদের হোম-টোমেও আছেন।”

পার্থ বলল, “যাচ্চলে, তা হলে তুমি মহিলাকে আসতে বললে কেন? বেগার খাটবে নাকি?”

মিতিন ফের গলা তুলে বলল, “ঠিকঠাক কেস হলে এই প্রজ্ঞাপারমিতা মুখার্জি কখনওই টাকার হিসেব করে না স্যার।”

এ কথা জজেও মানে। টুপুর মনে-মনে সায় দিল। নয়-নয় করে কম কেসে তো মাসির শাগরেদি করল না সে। স্রেফ অর্থপ্রাপ্তির আশায় মিতিনমাসি কোনও রহস্যের পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছে, এমনটা কি কখনও দেখেছে? এই তো, গত বছরই কী দারুণ একটা কেরামতি দেখাল। বিয়ের বাহাত্তর ঘণ্টা আগে কনের নেকলেস উধাও। মাত্র এক দিনেই মিতিনমাসি উদ্ধার করে আনল কণ্ঠহার। গরিব মেয়েটার বাবার কাছ থেকে একটা পয়সাও নেয়নি মিতিনমাসি। তেমন অভাগা কেউ এলে মিতিনমাসি অবশ্যই এবারও টাকা নিয়ে মাথা ঘামাবে না।

দাবার বোর্ড আর ঘুঁটি রাখতে গিয়েছিল পার্থ। ফিরে সোফায় হেলান দিয়েছে। বিজ্ঞ ভঙ্গিতে বলল, “কলকাতার সঙ্গে আর্মেনিয়ানদের কিন্তু একটা নাড়ির টান আছে।”

টুপুর নড়ে বসল, “কী রকম?”

“সাদা চামড়াদের মধ্যে ওরাই কলকাতার সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দা। ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমারদের ঢের আগে ওরা এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। প্রত্যক্ষ প্রমাণও আছে। জব চার্নক আমাদের এই শহরে এসেছিলেন ষোলোশো নব্বইতে। তার অন্তত ষাট বছর আগে কলকাতায় এক আর্মেনিয়ান মহিলাকে সমাধি দেওয়া হয়। মহিলার নাম ছিল রেজা বিবি। বিশ্বাস না হয় আর্মেনিয়ান চার্চের গোরস্থানে গিয়ে সমাধিফলকটা দেখে আসতে পারিস।”

ছোট ট্রে-তে কফি সাজিয়ে মিতিন হাজির। কাপগুলো হাতে- হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,”তাতে কিছুই প্রমাণ হয় না স্যার। একটা মাত্র সমাধি দেখেই ধরে নেব, আর্মেনিয়ানরা তখন এখানে বাস করত?”

“কেন ধরব না শুনি?”

“গির্জার সমাধিক্ষেত্রে ওই সময়কার আর কোনও আর্মেনিয়ানের সমাধি নেই, তাই। ইতিহাস বলছে, ওখানে নেক্সট সমাধি আছে সতেরোশো কুড়িতে। মাঝে আশি-নব্বই বছরে আর একজনও আর্মেনিয়ান মারা যাননি বলতে চাও?” কফিতে চুমুক দিয়ে মিতিন টুপুরের দিকে ফিরল, “আসলে কী হয়েছিল জানিস? কলকাতা তো তখন ঘোর জঙ্গল। বনজঙ্গলের ফাঁকে-ফাঁকে গোটাকয়েক গ্রাম ছাড়া এখানে আর কিস্যু ছিল না। …আমার ধারণা, নদী দিয়ে তখন হয়তো কোনও আর্মেনিয়ান জাহাজ যাচ্ছিল, ওই মহিলা কোনও অসুখবিসুখে জাহাজে মারা যান, কাছেই ডাঙায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তারপর যখন শহরটা গড়ে উঠল, তখন ওই সমাধিটা খুঁজে পেয়ে আর্মেনিয়ানরা ওখানেই একটা চার্চ প্রতিষ্ঠা করলেন।”

পার্থ ভুরু কুঁচকে বলল, “তার মানে আর্মেনিয়ান চার্চ পরে হয়েছে?”

“অবশ্যই। রেজা বিবি মারা গিয়েছেন ষোলোশো তিরিশে। আর চার্চটা তৈরি হয়েছে সতেরোশো চব্বিশে। মাঝে চুরানব্বইটা বছরের ব্যবধান, বুঝলে।”

তর্কে জুত করতে না পেরে পার্থ গুম। টুপুর মুগ্ধ চোখে মিতিনকে বলল, “তুমি আর্মেনিয়ানদের সম্পর্কেও এত খবর রাখো?”

মিতিন চোখ টিপে বলল, “ধুস, আমিও কি এত জানতাম নাকি? মহিলা কাল ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার পর ইন্টারনেট ঘেঁটে মগজব্যাঙ্কটাকে একটু ভারী করে নিলাম। তোর মেসো তো পুরনো কলকাতার উপর হেভি ফান্ডা লড়ায়, ওকেও একটু চিপে দেওয়া গেল।”

এবার পার্থও হেসে ফেলেছে। মিতিনকে পালটা খোঁচা দেওয়ার জন্য জিভে শান দিতে যাচ্ছিল, ডোরবেল টুংটাং।।

টুপুর অস্ফুটে বলল, “মহিলা এসে গেলেন নাকি?”

“মনে হচ্ছে।” মিতিন দেওয়ালঘড়িটা দেখল, “খুব পাংচুয়াল তো! সাড়ে ছ’টায় আসবেন বলেছিলেন, একেবারে কাঁটায়- কাঁটায়!”

মাসি-বোনঝির কথার মাঝেই পার্থ গিয়ে দরজা খুলেছিল। আহ্বান জানিয়ে যে মহিলাকে অন্দরে নিয়ে এল, সে কিন্তু মোটেই প্রবীণা নয়। বড়জোর মিতিনের বয়সি, দু’-এক বছরের ছোটও হতে পারে। দেখে দীনদরিদ্র ভাবাও অসম্ভব। রীতিমতো ঝকঝকে চেহারা, তকতকে বেশবাস। গায়ের রংটি পাকা গমের মতো। কোঁকড়া-কোঁকড়া একমাথা কুচকুচে কালো চুল টানটান করে বাঁধা। নীলচে চোখে বিদেশিনী-বিদেশিনী আভাস। পরনে লং স্কার্ট, আর ফুলহাতা বাহারি টপ। দু’টোই যথেষ্ট মহার্ঘ। হাতে কালো ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলছে। ব্যাগের গায়ে নামী ইতালিয়ান কোম্পানির মনোগ্রাম।

মিতিন উঠে সৌজন্যের সুরে বলল, “আই অ্যাম প্রজ্ঞাপারমিতা মুখার্জি। ইউ ক্যান কল মি মিতিন।”

“আই অ্যাম হাসমিক। হাসমিক ভারদোন৷” ডিম্বাকৃতি মিষ্টি মুখখানায় হাসি ফুটেছে। ইংরেজি টান মেশানো বাংলায় বলল, “আর্মেনিয়ানে হাসমিক মানে ইংরেজিতে জেসমিন। আমাকে সবাই ‘জেসমিন’ বলেই ডাকে।”

“নাইস নেম। প্লিজ টেক ইওর সিট।”

জেসমিন ছোট সোফাটায় বসেছে। একটু যেন আড়ষ্ট। পার্থ আর টুপুরের সঙ্গে জেসমিনের পরিচয় করিয়ে দিয়ে মিতিন বলল, “কফি চলবে?”

“নো থ্যাংকস। আমি চা-কফি খুব কম খাই।”

“অ্যাজ ইউ প্লিজ।”

টেবিলে পড়ে থাকা কফির ট্রে-টা ডাইনিং টেবিলে রেখে এল মিতিন। এক গ্লাস জলও এনেছে। টেবিলে গ্লাসটা নামিয়ে বড় সোফাটায় বসল। টুপুরের পাশে। কেজো গলায় বলল, “হ্যাঁ, এবার শোনা যাক আপনার প্রবলেমটা কী?”

পার্থ আর টুপুরকে এক ঝলক দেখে নিয়ে জেসমিন বলল, “কীভাবে যে স্টার্ট করি…। আমি থাকি মারকুইস স্ট্রিটে…।”

“নিজেদের বাড়ি?”

“না। আমার আঙ্কল, মানে পিসেমশাইয়ের বাড়ি। অনেক বছর ধরেই পিসি-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে আছি। ওঁদের কোনও সন্তান নেই তো, আমিই ওঁদের মেয়ের মতো।”

“আপনার বাবা-মা…?”

“নেই। রাশিয়া ভেঙে যখন আবার আর্মেনিয়া স্বাধীন হল, আমাকে পিসির কাছে রেখে বাবা-মা একবার দেশটা দেখতে যান। ওখানেই এক প্লেন ক্র্যাশে দু’জনে একসঙ্গে…।” জেসমিন কপালে- বুকে হাত ছুঁইয়ে ক্রস আঁকল, “তখন আই ওয়াজ সিক্সটিন। তারপর থেকে আঙ্কল-আন্টির কাছেই থাকি।”

“বিয়ে করেননি?”

“এখনও হয়ে ওঠেনি।”

“আঙ্কল-আন্টির দেখভাল করার জন্যেই কি…?”

“খানিকটা হয়তো তাই।” জেসমিন হালকা নিশ্বাস ফেলল, “আর এই মুহূর্তে তো বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না।”

“কেন?”

“রিসেন্টলি আঙ্কল মারা গেলেন। গত বাইশে ডিসেম্বর। জাস্ট তিন মাস হয়েছে।”

“ও। কী হয়েছিল আঙ্কলের?”

“হার্ট অ্যাটাক। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ারও সুযোগ পাইনি।”

“কত বয়স হয়েছিল?”

“নট মাচ। ওনলি সেভেনটি থ্রি।”

মিতিনমাসির প্রশ্ন করার ধারাটা লক্ষ করছিল টুপুর। ক্রমাগত কথা চালাচালি করে কী সুন্দরভাবে সহজ করে দিচ্ছে জেসমিনকে। সঙ্গে-সঙ্গে জানা হয়ে যাচ্ছে ছোটখাটো তথ্য। যা হয়তো আপাতচোখে অদরকারি, আবার কাজে লেগে যেতেও পারে।

আলাপচারিতার ফাঁকে জেসমিন কখন যেন হাতে তুলে নিয়েছিল গ্লাসটা। জলটুকু শেষ করে একটুক্ষণ চুপ। তারপর গলা ঝেড়ে বলল, “হ্যাঁ, যা বলতে আসা। আমরা খুব বিপদে পড়েছি ম্যাডাম।”

“কী রকম?”

“একটা হিরে ছিল বাড়িতে। আঙ্কলের মৃত্যুর পর থেকে সেটা মিসিং।”

“হিরে ?” পার্থ ফস করে বলে উঠেছে, “কত বড়?”

“প্রায় পাঁচ ক্যারাট।”

টুপুরের চোখ পিটপিট। বলে কী জেসমিন? অত বড় একটা হিরে গায়েব?

অধ্যায় ১ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%