অতীতবিলাস

পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়

জানলায় হেলান দিয়ে কমলা রঙের সূর্যটাকে সামনের অ্যাপার্টমেন্টের জলের ট্যাঙ্কের গা ঘেঁষে ক্রমাগত নীচে নেমে যেতে দেখছে উত্তরা৷ মাঝে মাঝে কমপ্লেক্সের পার্কটা থেকে বাচ্চাদের খেলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে৷ বড় রাস্তার হোর্ডিংয়ে লাগানো সমুদ্রর নতুন সিনেমার পোস্টারটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে৷ সিনেমার নাম—‘অচেনা পরিচিত’৷ আকাশি রঙের স্যুট, টাই আর ব্যাকব্রাশ করা চুলে একটু বেশিই হ্যান্ডসাম লাগছে সমুদ্রকে৷ একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে উত্তরা৷ নাহ! আর পারা যাচ্ছে না৷ এবার সমুদ্রকে বলতেই হবে যে ওর পক্ষে এই সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা আর বোধ হয় সম্ভব না৷ নিত্য অ্যাডজাস্টমেন্টের চাপে হাঁপিয়ে উঠেছে উত্তরা৷ সমুদ্রকে আজকাল কতটুকুই বা পায় ও? রাত তিনটের আগে বাড়ি ফেরে না সমুদ্র৷ তারপরেও স্ক্রিপ্ট পড়া, শিডিউল ঠিক করা, অফিশিয়াল কাজ৷ আউটডোর শুট বা শোজ থাকলে তো কথাই নেই৷ ওর টিম মেম্বাররা তো রীতিমতো বাড়ি লাগোয়া অফিসটাতে থাকতেই শুরু করে দিয়েছে৷ অথচ সমুদ্রর এই সাকসেসটা দেখার জন্য কতকিছুই না করেছে উত্তরা! সমুদ্র তখন স্ট্রাগলিং অ্যাক্টর৷ সেলসম্যানের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে টালিগঞ্জে স্টুডিয়োর ফ্লোরে ফ্লোরে ঘুরে বেড়ায় একটা ছোট কাজ পাওয়ার আশায়৷ ভোরে উঠে সারা দিনের খাবার রান্না করে, সমুদ্রকে তিনটে আলাদা টিফিন বক্সে গুছিয়ে দেওয়া, নিজের স্বল্প মাইনেতে সারা মাস সংসার চালিয়ে নামমাত্র সেভিংস করা, দিনের পর দিন স্রেফ ভাত, ডাল আর অর্ধেক ডিম সেদ্ধ খেয়ে থাকা- সব হাসিমুখে করেছে উত্তরা৷ ওরা তখন পাতিপুকুরের সেই এক দোতলা বাড়ির নীচের তলার একটা ঘরে ভাড়া থাকত৷ জলকষ্ট, মশার উপদ্রব, অর্থাভাব থাকা সত্ত্বেও ভালবাসা ছিল ওদের সংসারে৷ আর স্বপ্ন ছিল দু’চোখ ভরা৷ সেই স্বপ্নই আজ বাস্তব৷ সমুদ্র একজন সুপারস্টার৷ গত দু’বছরে পরপর পাঁচটা ছবিই সুপারহিট৷ এখন তাই ডিরেক্টর প্রোডিউসারদের ভিড় বাড়ি অবধি চলে আসে মাঝে মাঝেই৷ সমুদ্র যে উত্তরাকে ভালবাসে না- এমন নয়৷ নিজের স্ত্রীর প্রতি সব দায়িত্ব ও মেটায়৷ মেটেরিয়ালিস্টিক কোনওরকম অভাবই উত্তরার নেই৷ তবুও ওর মন খারাপ হয়৷ ডিপ্রেসড লাগে৷ কত দিন সমুদ্র জিজ্ঞেস করেনি, ‘কেমন আছ?’ পাশে বসে গল্প করেনি৷

একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যায়নি ওরা৷ ‘ম্যাম, আসব?’ দরজায় শব্দ পেয়ে নিজেকে সামলে নিল উত্তরা৷ মুখে হাসি টেনে বলল, ‘হ্যাঁ৷ এসো৷’

—‘হাই, ম্যাম!’ ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে পরী- সমুদ্রর টিমের একজন৷ একগাল হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘একটা নিউজ চ্যানেল থেকে আপনার একটা বাইট চাইছে৷ ওই ‘অচেনা পরিচিত’র প্রোমোশন৷ আপনি রাজি?’

—‘সমুদ্রর সঙ্গে তো? ও কখন আসবে?’

—‘না, ম্যাম৷ আপনার একার ইন্টারভিউ৷ স্যার তো আজ ভীষণ বিজি- সময় হবে না৷’

—‘সমুদ্র বলল যে আমায় ইন্টারভিউটা দিতে হবে?’ স্বগতোক্তির স্বরে জিজ্ঞেস করল উত্তরা৷

—‘স্যারকে জানানো হয়নি, ম্যাম৷ ছোট্ট একটা ব্যাপার তো! আমরা টিমের তরফ থেকেই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি৷ ডাইরেক্ট৷’

—‘আমি দেব না ইন্টারভিউ৷ সরি!’ ফের জানলার দিকে ফিরে দাঁড়াল উত্তরা৷ রাগে ওর মাথায় আগুন জ্বলছে৷ পরী বোধ হয় এই উত্তরটার জন্য তৈরি ছিল না৷ তাই একটু হকচকিয়ে গেল প্রথমে৷ তারপর আমতা আমতা করে বলল, ‘বাট দিস ইজ সাচ আ স্মল থিং, ম্যাম৷ দু’মিনিটের একটা বাইট...!’

—‘দিস ইজ নট আ স্মল থিং ফর মি, পরী৷ তোমাদের স্যার আমার বস নন যে এগুলো আমাকে করতেই হবে৷ আমি সমুদ্রর স্ত্রী৷ আমি এক্সপেক্ট করি যে এই ধরনের রিক্যুয়েস্ট আমাকে করার অধিকার স্রেফ সমুদ্রর আছে৷ তোমাদের নেই,’ বিছানায় বসে পড়ল উত্তরা৷ দু’হাতে মাথাটা ধরে বলল, ‘আয়্যাম সরি৷ নাও লিভ!’

—‘সরি, ম্যাম৷ আমি সেইরকম মিন করতে চাইনি...৷’

—‘...লিভ!’ রাগত দৃষ্টিতে পরীর দিকে তাকাল উত্তরা৷ বছর বাইশের মেয়েটা কী বুঝল কে জানে! দ্রুত দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল উত্তরা৷ এই মুহূর্তগুলোই ওকে আরও ডিপ্রেসড করে দেয়৷ এই ছোট্ট কথাটা তো সমুদ্র নিজেই ওকে বলতে পারত ফোন করে৷ কিন্তু ও এতটাই টেকেন ফর গ্রান্টেড যে সমুদ্রর টিম মেম্বাররা খবরটা ওদের ভীষণ বিজি স্যারকে দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করল না! পায়ে পায়ে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল উত্তরা৷ কিচেন থেকে বাসনপত্র নাড়ার শব্দ আসছে৷ সেদিকে এগোতে এগোতেই গলার স্বর ওপরে তুলল ও, ‘শিখাদি!’

—‘বলো,’ রান্নাঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মারল বছর পঞ্চান্নর শিখা৷ এই বাড়ির সর্বক্ষণের হাউজহেল্প৷

—‘লাল রঙের ট্রলি ব্যাগটা স্টোররুম থেকে বের করে একটু আমার ঘরে দিয়ে যাও না গো৷’

—‘কোথাও যাবে, বৌদিমণি?’

—হ্যাঁ৷ কিছু দিন মায়ের কাছে গিয়ে থেকে আসি৷ ইচ্ছে করছে খুব৷’

—‘আচ্ছা! এক্ষুনি দিচ্ছি,’ শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে স্টোররুমের দিকে পা বাড়াল শিখা৷ আনমনে হাসল উত্তরা৷ ও নিজেও কত ভাল অভিনেত্রী হয়ে গিয়েছে! বানানো কথাগুলো দিয়ে কী সুন্দর কনভিন্স করে ফেলল শিখাদি’কে৷

গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে সমুদ্র৷ অনেক দিন পর রাত এগারোটার মধ্যে বাড়ি ফিরছে ও৷ পাশে বসে ওর হেয়ার ড্রেসার অমিত আর সামনে সর্বক্ষণের সহকারী রাহুল৷ নতুন ফিল্মের ওয়ার্কশপটা আজ যেন একটু তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেল৷ সকালে প্রোমোশন, বিকেলে ডাবিং, সন্ধেয় ওয়ার্কশপ- রীতিমতো ক্লান্ত লাগছে সমুদ্রর৷ কাল আবার শুটিং আছে৷ ঠিক পৌনে এগারোটায় ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে কলিংবেলে হাত ছোঁয়াল সমুদ্র৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দরজা খুলে দিল মিনার৷ সমুদ্রর টিমের মার্কেটিংটা ওই সামলায়৷ ‘কালকের শিডিউলটা বলো!’ অফিসে ঢুকল সমুদ্র৷

—সকাল আটটায় কল টাইম স্যার৷ লোকেশন শোভাবাজার রাজবাড়ি৷ একটানা শুটিং৷ তারপর সন্ধেবেলায় একটা রেডিও স্টেশনে প্রোমোশনের জন্য যেতে হবে,’ ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে এক নিঃশ্বাসে বলে গেল পরী৷

—‘ওকে! কে কে লোকেশনে থাকছে কাল?’

—‘স্যার, আমি আর তথাগত যাব কাল৷ রাহুলদা আর অমিত তো থাকছেই৷ মিনার আর আকাশ কাল একবার জেপি প্রোডাকশন হাউজে যাবে৷ কিছু কাজ আছে৷’

—‘ওকে! তোমরা এবার এসো দেন৷ নীচে অসিতগাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে৷ প্রত্যেককে নামিয়ে দেবে,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সমুদ্র, ‘বাই!’

—‘স্যার, একটা সমস্যা হয়েছে,’ ঢোক গিলল পরী৷

—‘কী সমস্যা?’

—‘স্যার, একটা নিউজ চ্যানেল থেকে ম্যামের একটা ছোট্ট বাইট চাইছিল৷ সো উই আসকড হার ইফ শি ইজ উইলিং৷ শি রিফিউজড৷ কিন্তু স্যার, ম্যাম মনে হয় ব্যাপারটাকে অন্যভাবে নিয়েছেন৷ সন্ধেবেলা ব্যাগ গুছিয়ে বাপের

বাড়ি চলে গিয়েছেন৷’

—‘হোয়াট?’ আকাশ থেকে পড়েছে সমুদ্র৷

—‘উই আর রিয়্যালি সরি, স্যার৷ দ্যাট ওয়াজ নেভার আওয়ার ইনটেনশন’, কথা হাতড়াচ্ছে মিনার৷ সমুদ্র কখনওই মাথা গরম করে না৷ কিন্তু আজ হঠাৎ টেনশন হচ্ছে ওর৷ উত্তরা সামান্য শপিংয়ে গেলেও সমুদ্রকে টেক্সট করে জানিয়ে দেয়৷ আর আজ সোজা বাপের বাড়ি চলে গেল অথচ জানাল না৷ দ্রুত নিজেকে সামলে নিল সমুদ্র৷ বিরক্তি মেশানো স্বরে বলল, ‘তোমাদের কতবার বলতে হবে টু কিপ মাই পার্সোনাল অ্যান্ড প্রফেশনাল লাইফ অ্যাপার্ট? এনিওয়ে, আমি দেখছি৷ টেনশন করো না৷ এখন বাড়ি যাও৷’ তারপর দ্রুত হাঁটা লাগাল বাড়ির ভিতরের দিকে৷ অন্যান্য দিন বেডরুমের আলো জ্বলে৷ আজ অন্ধকার৷ ঘরে ঢুকে সুইচবোর্ড হাতড়ে আলোটা জ্বালল সমুদ্র৷ শিখাদি এসে দাঁড়িয়েছে, ‘দাদাবাবু, খেতে দিই? না কি খেয়ে এসেছেন?’

—‘উত্তরা...?’

—‘...বাপের বাড়ি গিয়েছে৷ বলল মায়ের জন্য মন খারাপ করছে৷’

—‘ওহ! কবে আসবে—বলে গিয়েছে কিছু?’

—‘না তো! আপনাকে বলে যায়নি?’

—‘উঁ?’ নিজেকে সামলে নিল সমুদ্র, ‘হুঁ৷ মেসেজ করেছে তো৷ আমার খিদে নেই, শিখাদি৷ তুমি যাও৷ ঘুমিয়ে পড়ো৷’

—‘আচ্ছা!’ দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল শিখা৷ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে উত্তরার নম্বরে কল করল সমুদ্র৷ ফোন তুলল না উত্তরা৷ একটু ইতস্তত করে শাশুড়ি মা’র নম্বরটা ডায়াল করল সমুদ্র৷ কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ঘুম জড়ানো গলায় ফোন তুললেন রমা দেবী, ‘সমুদ্র? এত রাতে ফোন করছ? সব ঠিক আছে তো?’

—‘হ্যাঁ, মা৷ সব ঠিক৷ আমি আসলে উত্তরার ব্যাপারে জানতে ফোন করেছিলাম৷ ঠিক আছে তো ও? আমার ফোন তুলল না- তাই চিন্তা হচ্ছিল৷’

—‘হুঁ৷ ঠিক আছে৷ ঘুমিয়ে পড়েছে বোধ হয়৷ আমি বরং কাল সকালে তোমায় ওকে ফোন করতে বলব৷’

—‘না না৷ আমিই ফোন করব৷ রাখি, মা৷ গুড নাইট!’ ফোনটা কেটে দিল সমুদ্র৷ ঘরে এখনও উত্তরার পারফিউমের গন্ধ রয়ে গেছে৷ জামাকাপড় না বদলেই বিছানায় শুয়ে পড়ল সমুদ্র৷ সব ক্লান্তি যেন কোথায় উড়ে গিয়েছে৷ ঘুম আসছে না কিছুতেই৷ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে উত্তরার কথা ভাবার চেষ্টা করল ও৷ আজ সকালে কথা হয়েছিল একবারও? উঁহু! মনে পড়ছে না৷ চোখ বুজলেই যে হাসিমুখ উত্তরার কথা মনে পড়ছে—তা অনেক পুরনো৷ তখন সবে কাজ শুরু করেছে সমুদ্র৷ উত্তরা সবসময় ব্যস্ত থাকত ওকে নিয়ে৷ আচ্ছা, উত্তরা এখন কেমন আছে? ওর দিনগুলো কেমন করে কাটে? আনন্দ আছে ওর জীবনে?

‘সমুদ্র ফোন করেছিল তোকে?’ চায়ের কাপটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন রমা৷

খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিল উত্তরা৷ দু’দিকে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘জানি না!’

—‘জানি না মানে? কাল রাতে আমায় ফোন করেছিল ও৷ তুই নাকি ওর ফোন তুলিসনি৷ আমি বললাম ঘুমোচ্ছে বোধহয়৷’

—‘হুঁ৷ মিসড কল পেয়েছি৷’

—‘তা রিং ব্যাক করিসনি?’

—‘নাহ! সে ব্যস্ত মানুষ৷ শট, ইন্টারভিউ কত কী সামলাতে হয়৷ খামোখা আমি ফোন করে বিরক্ত করতে যাব কেন?’ বাঁকা হাসল উত্তরা৷

—‘অ্যাই, কী হয়েছে বল তো? ঝামেলা হয়েছে তোদের মধ্যে?’ সোজা হয়ে বসলেন রমা৷

—‘না তো! ঝামেলা করতেও দু’জন লোক লাগে, মা৷ সমুদ্রর সে সময় কই?’ হাসল উত্তরা, ‘যাক গে! তুমি বসো৷ আমি ঘরে যাই৷’ কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রেখে উঠে গেল উত্তরা৷ আহিরীটোলা ঘাটের কাছের এই বাড়িটাতেই জন্ম আর বেড়ে ওঠা ওর৷ শরিকি বাড়ি৷ একান্নবর্তী পরিবার হলেও হেঁশেল আলাদা৷ তবে আজকাল উত্তরা এলেই একটা চাপা ফিসফাস শুরু হয়ে যায়৷ এই বুঝি সুপারস্টার সমুদ্র এল৷ অথচ ওদের যখন বিয়ে হয়েছিল, তখন সমুদ্রকে তেমন পাত্তাও দেয়নি কেউ৷ শুনতে হয়েছিল, ‘উত্তরাটার যে কী পছন্দ! শেষে কি না এক সেলসম্যান! তায় আবার বাপ মা মরা! এর থেকে বাবা-মার পছন্দ করা কাউকেই বিয়ে করতে পারতিস৷ অন্তত একটা ঠিকানা তো থাকত৷’ এসব ভাবলেই হাসি পায় উত্তরার৷ ওর বাবা শিশিরবাবুর একটা কসমেটিক্সের দোকান আছে৷ ভালই চলে যায়৷ তাছাড়া, সমুদ্র বছর দেড়েক আগে ওদের পোর্শনটা রেনোভেট করে দিয়েছে দায়িত্ব নিয়ে৷ উত্তরা না করেনি৷ কোনওরকম সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ হয়ে নাক গলাতে ওর ভালো লাগে না৷ তবে এই নতুন সাজসজ্জা পুরনো বাড়িটার সঙ্গে বড্ড বেমানান ঠেকে৷ বারান্দা থেকে উঠোনের দিকে উঁকি মারল উত্তরা৷ মেজ জেঠি কাপড় মেলছে৷ পাশেই স্কিপিং করছে মান্তু- ছোটকার ছোট ছেলে৷ হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল ওর৷ সমুদ্র৷ সাউন্ডটা অফ করে দিয়ে মোবাইলটা হাউজকোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল উত্তরা৷ একটু পরেই মায়ের ফোনের রিংটোন কানে এল ওর৷ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল ও৷ মা ডাকতে এলেন কিছুক্ষণ পর৷ তারপর সাড়া না পেয়ে চলে গেলেন৷ পাশের টেবিল থেকে লিপস্টিকের একটা লিফলেট নিয়ে দেখতে শুরু করল উত্তরা৷

ভ্যানিটি ভ্যানে বসে একটা স্ক্রিপ্ট পড়ছে সমুদ্র৷ তবে স্পাইরাল বাইন্ডিং করা কাগজগুলো খোলাই আছে কেবল সামনে৷ সমুদ্রর মন অন্য কোথাও৷ সেটে লাঞ্চ চলছে এখন৷ সমুদ্রর খাবার বাড়ি থেকেই আসে৷ চিকেন স্যুপ আর স্যালাড৷ ‘স্যার, কনগ্র্যাচুলেশনস!’ দরজা ঠেলে উঁকি মারল পরী৷

—‘ফর হোয়াট?’

—‘ইউ হ্যাভ ওয়ান দ্য ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড!’ পরীর খুশি আর ধরছে না, ‘অঙ্কুরদা মানে ডিরেক্টর ফোন করে কনফার্ম করলেন৷’

—‘কই? আমি তো কোনও ফোন বা লেটার পেলাম না!’ সমুদ্র বিহ্বল৷

—‘পাবেন পাবেন৷ টিভিতে দেখাচ্ছে শুনলাম৷ নিউজ পোর্টালের ফেসবুক পেজে আপলোড হলেই আপনাকে দেখাব! মিষ্টি আনাই, স্যার?’

—‘হ্যাঁ হ্যাঁ৷ নিশ্চয়ই৷ সেলিব্রেট করো৷ আর শোনো!’

—‘বলুন?’

—‘আজ বিকেলের রেডিও শো-তে আমি প্রথম পনেরো মিনিটের বেশি সময় দিতে পারব না৷ এক জায়গায় যেতে হবে৷ কাজ আছে৷’

—‘পনেরো মিনিট?’ দু’মিনিট কী যেন ভাবল পরী, ‘আচ্ছা৷ ঠিক আছে৷ আমি কথা বলে নেব৷’

—‘থ্যাঙ্ক ইউ৷’

—‘এক্ষুনি মিডিয়া চলে আসবে স্যার৷ বি প্রিপেয়ার্ড৷’

—‘হ্যাঁ৷ আমি আসছি আর একটু পরেই,’ হাসল সমুদ্র৷

—‘ওকে!’ চলে গেল পরী৷ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইল সমুদ্র৷ এই খবরটা সবার আগে যাকে দিতে ইচ্ছে করছে, সে ফোন তুলবে না— ও জানে৷ তাহলে কাকে ফোন করা উচিত? কাজিনদের কাউকে? না কি ছোটকাকুকে? অথবা বন্ধুদের? বাবা-মা হারা সমুদ্রর হঠাৎ খুব শিখাদির কথা মনে পড়ল৷ সত্যিই তো সারাক্ষণ বাড়িতে থাকা লোকটাই তো সবথেকে আপন৷ আত্মিক সম্পর্কের আত্মীয়৷ বেশি না ভেবে বাড়িতে ফোন করল সমুদ্র৷ অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর শিখাদি ফোন তুলল, ‘হ্যালো?’

—‘শিখাদি, আমি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি!’ শিশুর সারল্যে হেসে উঠল সমুদ্র৷

—‘কী পেয়েছেন, দাদাবাবু? কোনও পুরস্কার-টুরস্কার?’

—‘হ্যাঁ৷ অনেক বড় একটা পুরস্কার৷’

—‘বাহ! খুব খুশির খবর তো! আপনার আরও নাম হোক, দাদাবাবু৷’

—‘তুমি সত্যিই খুশি হয়েছ, শিখাদি?’ সমুদ্রর গলায় বাষ্প৷

—‘হুঁ৷ খুউব খুশি হয়েছি!’

—‘আচ্ছা, আমি রাখছি৷ মিডিয়া এসে গিয়েছে,’ ফোনটা কেটে দিল সমুদ্র৷ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বর দিকে তাকাল একবার৷ তারপর লাইট নিভিয়ে বেরিয়ে গেল ভ্যান থেকে৷ বাইরে বেশ রোদ৷ সমুদ্রর মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক স্পটবয়৷ একটু দূরেই নবাগতা হিরোইন মুকুলিকা একটা শেডের তলায় দাঁড়িয়ে কলকল করে ঘামছে৷ ওর মা একটা প্লাস্টিকের হাতপাখা দিয়ে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন অনবরত৷ নিজের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল সমুদ্রর৷ এত বড় একটা প্রাপ্তির দিনে এইরকম ঘটনাগুলোই গ্রাউন্ডেড থাকতে সাহায্য করে৷ ‘ম্যাডামের মাথায় ছাতাটা ধরো,’ স্পটবয়ের দিকে তাকাল সমুদ্র৷

—‘আপনি?’

—‘আহ! যা বলছি সেটা করো৷’

—‘আচ্ছা,’ ছেলেটা মুকুলিকার পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷ দৃশ্যতই স্বস্তি পেলেন ওর মা৷ সৌজন্যমূলক মাথা নাড়লেন৷ ‘থ্যাঙ্ক ইউ, দাদা৷ আর কনগ্র্যাটস৷ সো হ্যাপি ফর ইউ!’ হাসল মুকুলিকা৷

—‘থ্যাঙ্ক ইউ! আর দাদা নয়— সমুদ্র৷ হিরোইনদের দাদা হওয়া হিরোদের ওয়ার্সট নাইটমেয়ার,’ মুকুলিকাদের দিকে হাতনেড়ে ভ্যানের পিছন দিকটায় এগিয়ে গেল সমুদ্র৷ হঠাৎ খুব সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে ওর৷

‘ও-মা! অ্যাই উত্তরা, দেখ টিভিতে কী দেখাচ্ছে৷ শিগগির আয়৷ কী রে? কোথায় গেলি?’ মায়ের ডাকে চমকে উঠল উত্তরা৷ লাঞ্চ করে উঠে বারান্দায় বসে নখ কাটছে ও৷ এখনও ডান হাতের তিনটে আঙুল বাকি৷ গলার স্বর কিঞ্চিৎ ওপরে তুলে বলল, ‘আসছি!’

—‘আসছি নয়৷ এক্ষুনি আয়৷ আমাদের সমুদ্র জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে রে!’ রমাদেবীর গলা ধরে এসেছে৷ কথাটা উত্তরার কানে ঢুকে ব্রেনকে স্পর্শ করতে যেন বেশ কিছুক্ষণ সময় নিল৷ বারান্দার মাঝখানে নেল কাটার আর মোবাইলটা ফেলে দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে দৌড়ল ও৷ একটা বাংলা নিউজ চ্যানেলের স্ক্রলবারে বারবার দেখাচ্ছে খবরটা৷ স্ক্রিনের অর্ধেকটায় একটা প্রেস কনফারেন্স দেখানো হচ্ছে লাইভ৷ সমুদ্র মাইক হাতে অনেক কিছু বলছে৷ আর অন্যদিকে সমুদ্রর বিভিন্ন আর্কাইভড ছবি৷ কোনও কিছুই কানে ঢুকছে না উত্তরার৷ ঝাপসা চোখে, বিহ্বল দাঁড়িয়ে আছে ও৷ ‘কী হল? অ্যাই?’ মায়ের ঝাঁকুনিতে ঘোর কাটল ওর, ‘ফোন কর সমুদ্রকে!’

—‘কেন?’ নিজেকে সামলে নিল উত্তরা৷

—‘কেন মানে কী? এত বড় একটা প্রাপ্তি! আর তুই ফোন করবি না?’

—‘কী দরকার? এই তো প্রেস ডেকে সববাইকে একসঙ্গে থ্যাঙ্ক ইউ বলে দিচ্ছে৷ আর ফোন করে কী হবে? আমি বরং যাই৷ ঘুম পাচ্ছে,’ মুখে হাত চাপা দিয়ে একটা হাই তুলল উত্তরা৷ তারপর ধীর পায়ে বারান্দা থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল৷ খাটের ওপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে মোবাইলটা সুইচ অফ করে দিল৷ নয় তো এক্ষুনি পরিচিতদের ফোন আসতে শুরু করবে৷ এই মুহূর্তে কারুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না ওর৷

সন্ধেবেলায়, রান্নাঘরে চিকেন ম্যারিনেট করছিল উত্তরা৷ ও এসেছে বলেই বাবা চিকেন এনেছেন৷ মা-র তো এখন টিভি ছাড়া অন্য কোনওদিকে মন নেই৷ তাই ওকেই হাত লাগাতে হয়েছে৷ হঠাৎ উঠোনে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে পলকের জন্য থমকাল উত্তরা৷ এই বাড়িতে কারুর গাড়ি নেই৷ তবে ছোটকাকুর ক্যাটারিং-এর ব্যবসার জিনিসপত্র ম্যাটাডোরে করে যাওয়া আসা করে৷ কিন্তু এই আওয়াজটা ম্যাটাডোরের নয়৷ রান্নাঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারল উত্তরা৷ যা ভেবেছে ঠিক তাই- সমুদ্র এসেছে! মিনিট তিনেকের মধ্যেই বেল বাজল বাড়ির৷ রমা দেবী গিয়ে দরজা খুললেন৷ আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেক, ফুল এবং আরও কিছু গিফট নিয়ে হাসিমুখে ঢুকে এল সমুদ্র৷

প্রণাম করল রমাদেবীকে৷ হাতে ধরা জিনিসপত্রগুলো টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল, ‘ও কোথায়?’

—‘মাংস রাঁধছে,’ রান্নাঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন রমাদেবী৷ সেইদিকেই এগিয়ে গেল সমুদ্র, ‘উত্তরা?’

—‘তুমি এখানে? শুটিং নেই?’

—‘ছিল৷ প্যাক আপ হয়ে গিয়েছে৷’

—‘ওহ! তবে ডাবিং, স্ক্রিপ্ট রিডিং, ইন্টারভিউ, শো, ফটোশুট, অ্যাডশুট- কিছু একটা তো নিশ্চয়ই আছে৷ সেখানে না গিয়ে এখানে এসে সময় নষ্ট করছ কেন বলো তো?’

—‘আজ আর কিছু নেই৷’

—‘সিরিয়াসলি?’ সমুদ্রর দিকে ফিরল উত্তরা, ‘তোমার ফ্রি টাইম থাকে? ওরে বাবা! এতদিন তো জানতে পারিনি৷’

—‘আমাকে কনগ্র্যাচুলেশন জানাবে না?’

—‘ওহ, হ্যাঁ৷ অনেক অভিনন্দন৷’

—‘বাড়ি চলো, উত্তরা’ সমুদ্রর কথাটা নিজের কানেই প্রার্থনার মতো শোনাল৷

—‘তুমি বরং আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও, সমুদ্র৷ আমি আর পারছি না- বিশ্বাস করো!’ উত্তরার গলায় আর্তি৷ সমুদ্র কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল; কিন্তু ততক্ষণে ওদের ড্রয়িংরুমে এসে ভিড় করেছে বাড়ির সবাই৷ প্রত্যেকের হাতে ফোন আর তাতে ক্যামেরা অন করা৷ সদ্য সদ্য জাতীয় পুরস্কার পাওয়া আত্মীয়ের সঙ্গে ফেসবুকে ফটো না দিলে যে প্রেস্টিজ থাকবে না!

‘আমি তাহলে উঠি এবার!’ সমুদ্র রমা দেবীর দিকে তাকাল৷ আত্মীয়রা সবেমাত্র চলে গেলেন৷ কেক কাটা হয়েছে একটু আগে৷ প্রত্যেককে কেক দিয়েছে উত্তরা৷ সমুদ্র তখন ছবি তুলতে ব্যস্ত৷ তবে বারবার উত্তরার দিকে তাকাচ্ছিল ও৷ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে কিছু বলতে চায়৷ ইচ্ছে করেই ওকে এড়িয়ে গিয়েছে উত্তরা৷ শিশিরবাবুও ফিরে এসেছেন৷ উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ‘সে কী করে হয়? এতদিন পরে এলে খেয়ে যাও৷’

—‘ও এসব খায় না, বাবা৷ আলাদা ডায়েট ফুড আছে৷ তুমি ওকে আটকিও না৷ কাল নিশ্চয়ই শুটিং আছে,’ রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল উত্তরা৷ ওর দিকে আহত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সমুদ্র বলল, ‘আমার আজ খুব ভাত খেতে ইচ্ছে করছে৷ ভাত, ডাল আর আধখানা ডিম৷ দিতে পারবে, উত্তরা?’

—‘হ্যাঁ৷ নিশ্চয়ই,’ এগিয়ে এলেন রমা, ‘কেন দিতে পারবে না? আমি করে দিচ্ছি৷’

—‘থাক, মা! আমি পারব৷ তুমি বসো,’ গলার কাছে জমে ওঠা কান্নার দলাটাকে গিলে নিয়ে ফের রান্নাঘরে ঢুকে গেল উত্তরা৷

উত্তরাদের বাড়ি থেকে ফিরেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা হতে চলল৷ কিন্তু এখনও চেঞ্জ করেনি সমুদ্র৷ অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে আছে৷ কারুর সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না ওর৷ কালকের শিডিউল বলার জন্য মিনার নক করেছিল একটু আগে৷ একটা কাগজে ডিটেলস লিখে দিয়ে ওকে চলে যেতে বলেছে সমুদ্র৷ কিচ্ছু ভাল লাগছে না ওর৷ ওই বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় উত্তরা গেট অবধি এসেছিল৷ গাড়িতে ওঠার আগে ওর হাতদুটো ধরে সমুদ্র বলেছিল, ‘আমার কমিটমেন্টস থাকে, উত্তরা৷’ বাঁকা হেসে উত্তরা জবাব দিয়েছিল, ‘তুমি আমাকেও অনেক কিছু কমিট করেছিলে, সমুদ্র৷ বিয়ের সময়৷ সেগুলো বোধ হয় ভুলে গিয়েছ৷ আসলে সব কমিটমেন্টস তো আর কন্ট্র্যাক্ট হিসেবে রিনিউ করা হয় না!’ আর কিছু বলতে পারেনি সমুদ্র৷ গাড়িতে উঠে কাচ তুলে দিয়েছে দরজার৷ তারপর থেকেই ভীষণ গিল্টি লাগছে নিজেকে৷ ‘দাদাবাবু, ঘুমোননি এখনও? ঘরে আলো জ্বলছে দেখে এলাম,’ শিখাদি এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়৷

—‘ঘুম আসছে না৷’

—আপনি তো দেখছি বাইরের জামাকাপড়ই ছাড়েননি৷ ঘরের জামা পরে, চোখে মুখে জল দিয়ে আসুন৷ দেখবেন ঘুম এসে যাবে৷’

—‘তোমার বৌদিমণি আজ আমার কাছ থেকে ডিভোর্স চেয়েছে, শিখাদি৷’

—‘এটা আপনি কী বললেন, দাদাবাবু?’ সমুদ্রর পাশে গিয়ে দাঁড়াল শিখা, ‘বৌদিমণি নিজে বলেছে এমন কথা?’

—‘হুঁ৷ ও আর আমার সঙ্গে থাকতে চায় না৷’

—‘ও বৌদিমণির রাগের কথা, দাদাবাবু৷ আপনি কিছু মনে করবেন না৷ একা একা থাকে সারাদিন৷ অভিমান হয়েছে৷’

—‘আমি ওকে ভালবাসি, শিখাদি৷ বিশ্বাস করো৷ কিন্তু আমি কী করব বলো? কাজের ধরনটাই এইরকম আমার৷ তাছাড়া, উত্তরা তো সব বুঝত৷ হঠাৎ কী যে হল ওর!’

—‘বললুম তো অভিমান হয়েছে৷ আমার একটা কথা শুনবেন, দাদাবাবু?’

—‘কী কথা?’

—‘আমার বৌদিমণি খুব সাধারণ, দাদাবাবু৷ আপনি ওকে মাঝে মাঝে অতীত ফিরিয়ে দেবেন৷ দেখবেন, ওই আপনাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে,’ হাসল শিখা৷ তারপর দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘নিন, ঘুমিয়ে পড়ুন এবার৷ শোওয়ার আগে একবার ইষ্টনাম স্মরণ করে নেবেন৷ দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে,’ শিখা চলে গেল দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে৷ ওর চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সমুদ্র৷ তারপর হাসল আলতো৷

হাতিবাগানে এসেছে উত্তরা৷ লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে দেখছে এদিক ওদিক৷ অনেক দিন পর এত লোক, ধুলো, ঘাম, গাড়ির হর্ন, ট্রাম, রাস্তার পাশের খাওয়ার দোকান ইত্যাদি- বেশ লাগছে ওর৷ তবে অনভ্যাসে মাঝেমাঝেই হোঁচট খাচ্ছে৷ ধাক্কা লেগে যাচ্ছে অন্যদের সঙ্গে৷ একজন ডাবওয়ালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল উত্তরা, ‘একটা শাঁস ছাড়া ডাব দেবেন৷’ তারপর ব্যাগ থেকে টাকা বের করার সময় ওর পাশে এক বোহেমিয়ান ট্যুরিস্ট এসে দাঁড়ালেন৷ উত্তরার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলুন, ম্যাম৷ থিয়েটার দেখে আসি৷’ চমকে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল উত্তরা৷ গলার স্বরটা ওর ভীষণ চেনা—সমুদ্র৷ কাঁধ অবধি লম্বা চুল, গগলস, চাপ দাড়ি, গলায় হার, হাতে আংটি ইত্যাদি পরে একদম বোহেমিয়ান লাগছে৷ কিন্তু সমুদ্র এখানে কী করছে? তাও আবার বাউন্সার ছাড়া? এক্ষুনি যদি ভিড় জমে যায়? তীব্র অবিশ্বাসে উত্তরা বলে উঠল, ‘তুমি এখানে কী করছ?’

—‘কী আবার করছি? দেখতেই তো পারছ—বউয়ের সঙ্গে ঘুরতে এসেছি৷ সেই আগের মতো৷ চলো! আধঘণ্টার মধ্যে শো,’ হাসল সমুদ্র৷

—‘কেউ চিনতে পারল?’ উত্তরার গলায় উৎকন্ঠা৷

—‘চিনতে পারলে মেকআপ ম্যানের চাকরি ছাঁটাই৷ এসো তো,’ উত্তরার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল সমুদ্র৷ স্টার থিয়েটার খুব একটা দূরে নয়৷ কিন্তু উত্তরার মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে হাঁটছে ও৷ সমুদ্র ভীষণ যত্নে ওকে নিয়ে রাস্তা পার করছে৷ হাসছে নিজের মনে৷ উত্তরার মতো ওর একটুও ভয় নেই৷ উৎকণ্ঠা নেই৷ টেনশন নেই৷ ‘তোমার শুটিং নেই আজ?’

—‘আছে৷ আমি বাঙ্ক করেছি,’ চোখ টিপল সমুদ্র৷ ওর কথাগুলো কেমন রহস্যের মতো ঠেকছে উত্তরার কাছে৷ কিন্তু অদ্ভুত এক ভালবাসাও ছুঁয়ে যাচ্ছে ওকে৷ ভাল লাগছে সমুদ্রকে কাছে পেতে৷ আর কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না৷ সমুদ্রর সঙ্গে প্রথম আলাপ এই স্টার থিয়েটারেই৷

উত্তরা তখন কলেজ ছাত্রী৷ প্রথমবার বান্ধবীর জন্য অপেক্ষা করছিল গেটের

বাইরে৷ ঝাঁকড়া চুলের সমুদ্র অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল পাশে৷ হঠাৎ আলাপ করার জন্য জিজ্ঞেস করেছিল, ‘প্রথম এলেন বুঝি?’ মায়ামাখানো মুখের ছেলেটাকে বেশ ভাল লেগেছিল উত্তরার৷ আলাপ না করে থাকতে পারেনি৷ আর আজ আবার সেই স্টার থিয়েটার!

আজ সারাদিনের ঘটনা প্রবাহ এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না উত্তরার৷ তবে সে ব্যাপারে ভাবতে গেলেই গাল দুটো গোলাপি হয়ে যাচ্ছে ওর৷ থিয়েটার দেখে বেরিয়েই তড়িঘড়ি অন্য একটা গাড়িতে শুটিং লোকেশনের উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছিল সমুদ্র৷ আর অসিতের ওপর দায়িত্ব ছিল উত্তরাকে আহিরীটোলার এই বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার৷ আজ আর সমুদ্র একবারও বাড়ি ফেরার কথা বলেনি৷ তবে ডিভোর্স বা সেপারেশন প্রসঙ্গেও ওদের কোনও কথা হয়নি৷ দুজনেই পরস্পরকে কিছু সময় দিতে আর নিতে রাজি হয়েছে৷ প্রেমিকের পাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নাটক দেখেছে উত্তরা- অনেক দিন পর! গুমোট গরমটা কেটে আজ হাওয়া দিচ্ছে অল্প অল্প৷ বারান্দায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সেই হাওয়াই গায়ে মাখছিল উত্তরা৷ কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে৷ বারান্দার এককোণে মেলে রাখা শুকনো জামাকাপড়গুলো জলদি তুলে নিয়ে ঘরে চলে গেল উত্তরা৷

পরের দিন সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙতেই অবাক হ’ল উত্তরা৷ ন’টা বাজছে৷ এ তো বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে! গতরাতের বৃষ্টির পরের ঠান্ডার আমেজেই এতক্ষণ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে ও৷ ‘সমুদ্র এসেছে৷ ড্রয়িংরুমে বসে আছে৷ দেখ তো চিনতে পারিস কি না? আমি তো বাপু চিনতেই পারিনি,’ হাসলেন রমাদেবী৷

—‘আজও ছদ্মবেশে?’

—‘আজও মানে? আগেও করেছে বুঝি এমন?’ রমাদেবী অবাক৷

—‘ওই আর কী!’ বিছানা থেকে নেমে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াল উত্তরা৷ সমুদ্র বসে আছে৷ আজ অবশ্য অন্য গেট আপ—একজন পাগড়ি পরা পাঞ্জাবি ভদ্রলোক৷ উত্তরাকে দেখেই বলল, ‘গুড মর্নিং৷ জলদি রেডি হো যাইয়ে, মেমসাব৷ কুমোরটুলি যানা হ্যায়!’

—‘আজও?’ উত্তরার চোখ থেকে ঘুম উড়ে গিয়েছে৷

—‘জি, হাঁ৷ আজও,’ চোখ টিপল সমুদ্র, ‘পৌনে দশটায় অসিতকে আসতে বলেছি৷ সো, ইউ হ্যাভ ফর্টি মিনিটস ইন ইওর হ্যান্ডস৷’

—‘কেন করছ এসব, সমুদ্র? বড্ড চোখে লাগছে!’

—‘যাতে আবার মনে দাগ কাটতে পারি!’ হাসল সমুদ্র৷ আর কিছু বলতে পারল না উত্তরা৷ ফিরে গেল ঘরে৷ সমুদ্রর সঙ্গে প্রথম ডেট বলতে এই কুমোরটুলিতেই এসেছিল উত্তরা৷ তখন দুর্গাপুজোর মাত্র চার পাঁচদিন বাকি৷ পুরো এলাকার ব্যস্ততা তুঙ্গে৷ ভীষণ ভিড়৷ অহরহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বড় বড় প্রতিমা৷ পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে৷ সেই-ই ওদের প্রথম হাতে হাত৷ কাঁধে কাঁধ৷ তবে আজ অত ভিড় নেই৷ পুজো আসতে ঢের দেরি৷ কিন্তু দুর্গাপ্রতিমার কাঠামো বাঁধা হয়ে গিয়েছে প্রায় সব জায়গায়ই৷ দু’-একটা জায়গায় মাটির প্রথম প্রলেপও পড়েছে৷ কালকের বৃষ্টির দরুন কাদা হয়েছে বেশ৷ পালাজোটা বেশ খানিকটা তুলে হাঁটতে হচ্ছে উত্তরাকে৷ সমুদ্রর অবশ্য সেসব দিকে হুঁশ নেই৷ চোস্ত হিন্দিতে কথা বলে যাচ্ছে৷ ভাবটা এমন যেন ও উত্তরার বন্ধু৷ প্রথমবারের জন্য কলকাতা এসেছে৷ তাই ওকে শহর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে উত্তরা৷ লোকজন মাঝেমাঝেই তাকিয়ে দেখছে সমুদ্রকে৷ তখনই ভয় লেগে যাচ্ছে উত্তরার৷ সদ্য জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে শহর জুড়ে বেশ হুল্লোড় শুরু হয়েছে ওকে নিয়ে৷ রোজই কোনও না কোনও নিউজ পেপারে ইন্টারভিউ বেরোচ্ছে৷ উত্তরা মাঝে মাঝেই জানার চেষ্টা করছে যে শুটিং ফেলে এই ঘোরাফেরা কীভাবে ম্যানেজ করছে সমুদ্র! কিন্তু ভীষণ কৌশলে সমুদ্র এড়িয়ে যাচ্ছে এই প্রসঙ্গ৷ সেলিব্রিটিসূচক যাবতীয় ভার ঝেড়ে ফেলে এক্কেবারে সাধারণ মানুষের মতো মিশে যাচ্ছে শহরের ভিড়ে৷ উত্তরার ভাল লাগছে এই সমুদ্রকে৷ কাছে পেতে ইচ্ছে করছে৷ ভালবাসতে ইচ্ছে করছে আবার! আজ উত্তরাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গেল সমুদ্র৷ তবে ওপরে আসেনি৷ যাওয়ার আগে কেবল বলে গিয়েছে, ‘কাল খুব স্পেশাল এক জায়গায় যাব, উত্তরা৷ সকাল আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে থেকো৷’

‘তুমি এইরকমভাবে কোথাও গেলে কতটা ভিড় হয়ে যাবে- বুঝতে পারছ?’ উত্তরা সন্ত্রস্ত৷ আজ কোনওরকম মেক আপ নেয়নি সমুদ্র৷ যে কেউ দেখলেই চিনতে পেরে যাবে৷ ‘অন্তত একটা দাড়ি বা গোঁফ লাগালে তো পারতে!’

—‘কিচ্ছু হবে না৷ রিল্যাক্স৷’ সানগ্লাসটা খুলে নিয়ে পকেটে ঢোকাল সমুদ্র৷

—‘ওটাও খুলে ফেললে? আজ ভিড়ে পদপিষ্ট হওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না আমাদের,’ ঠোঁট উল্টোল উত্তরা, ‘বাই দ্য ওয়ে, যাচ্ছি কোথায় আমরা?’

—‘ক্রমশ প্রকাশ্য!’

—‘ওকে!’ চুপ করে গেল উত্তরা৷ রাস্তা দেখতে লাগল এক মনে৷ কিছু সময় পরপরই সিগন্যালে দাঁড়াচ্ছে গাড়ি৷ জেব্রা ক্রসিং দিয়ে তখন হেঁটে যাচ্ছেন অনেক মানুষ৷ অদ্ভুত এক ছন্দ! অসাধারণ বোঝাপড়া! শ্যামবাজার পাঁচ মাথা মোড় থেকে গাড়িটা আর জি করের রাস্তায় ঘুরতেই নড়েচড়ে বসল উত্তরা৷ সমুদ্রর দিকে তাকিয়ে একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘পাতিপুকুর?’

—‘পা-তি-পু-কু-র!’ হাসল সমুদ্র৷

সেই পুরনো বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা৷ হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল উত্তরা৷ বাড়িটা গঠনগতভাবে একইরকম আছে৷ কিন্তু বয়সের ছাপ পড়েছে৷ পাড়ায় ফ্ল্যাটবাড়ি হয়েছে বেশ অনেকগুলো৷ রাস্তাটা আরও চওড়া হয়েছে৷ মন দিয়ে সবকিছু অপলক দেখছে উত্তরা৷ কত্ত স্মৃতিভিড় করে আসছে মনে! সমুদ্র ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির কলিংবেল বাজিয়েছে৷ একটা টুপির সাহায্যে নিজের মুখটা ঢেকে নিয়েছে অদ্ভুত দক্ষতায়৷ তাছাড়া গাড়ির আড়ালে থাকার কারণে রাস্তা থেকে ওকে দেখা যাচ্ছে না৷ বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন এক মধ্যবয়সি মহিলা৷ সমুদ্রকে দেখে চমকালেন জোর, ‘আপনি? অভিনেতা সমুদ্র? আমি আপনার খুব বড় ফ্যান৷ ‘হেরে গেলে হিরো নয়’ বইটা পুরো মুখস্থ৷’

—‘ইয়ে,’ অপ্রস্তুত হাসল সমুদ্র, ‘মিস্টার বিশ্বাস? আছেন?’

—‘মেসোমশাই? হ্যাঁ, আছেন তো৷ কিন্তু খুব অসুস্থ৷ হাঁটতে চলতে আর পারেন না৷ দোতলায় নিজের ঘরে শুয়ে থাকেন সারাদিন৷’

—‘মাসিমা?’ উত্তরা গিয়ে দাঁড়াল সমুদ্রর পাশে৷

—‘আছেন৷ ডেকে দিচ্ছি৷ আপনারা ভেতরে এসে দাঁড়ান৷ পাড়ায় খবর রটে গেলে ভিড় হয়ে যাবে,’ একগাল হাসলেন মহিলা৷ তারপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন৷ বাড়ির ভিতরে ঢুকে এল উত্তরা- সমুদ্র৷ ওরা যে ঘরটায় থাকত, সেটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে৷ দরজা বন্ধ৷ হঠাৎ সমুদ্রর হাতটা শক্ত করে ধরে দাঁড়াল উত্তরা৷ অতীতকে সবসময়ই সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ঠিক আগের মতো করেই পেতে ইচ্ছে হয়৷ উত্তরারও খুব ইচ্ছে করছে পুরনো সমুদ্রকে নিয়ে ওই পুরনো ঘরটায় ঢুকতে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন স্মৃতিকণা দেবী, এই বাড়ির গিন্নী৷ সমুদ্র উত্তরাকে দেখে থমকালেন একটু৷ তারপর বললেন, ‘তোমায় তো টিভিতে দেখি, বাবা৷ কিন্তু এই মেয়েটাকে তো দেখি না৷ খুব মনে পড়ে ওর কথা৷ কী কষ্টটাই না করেছে!’

—‘কেমন আছেন, মাসিমা?’ উত্তরা প্রণাম করল ওঁকে৷

—‘চলছে রে, মেয়ে৷ তোরা হঠাৎ?’

—‘এই ঘরটা একটু দেখতে চাই, মাসিমা৷ অতীত ঘুরতে বেরিয়েছি আমরা৷’

—‘হ্যাঁ৷ নিশ্চয়ই,’ স্মৃতিকণা হাসলেন, ‘এসো৷’ তারপর ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে খুলে দিলেন ওই ঘরটার দরজা৷ সঙ্গে সঙ্গে একটা দমকা হাওয়া এসে লাগল সমুদ্র আর উত্তরার নাকে৷ মুহূর্তে এদিক ওদিক হয়ে গেল জীবনের পৃষ্ঠাগুলো৷ মিলেমিশে একাকার! ঘরটা একইরকম রয়ে গিয়েছে৷ খাট আর ছোট আলমারিটাও আছে৷ নিজেদের সংগ্রাম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সমুদ্র আর উত্তরা৷ ‘একটা জিনিস দেখবে, উত্তরা?’ জিজ্ঞেস করল সমুদ্র৷

—‘কী?’

—‘এই দেখো,’ দরজার পিছনটা দেখাল সমুদ্র৷ নীল কালির পেনের আঁচড়ে লেখা ‘উত্তরা আর সমুদ্রর সংসার’৷ উত্তরার মনে পড়ে গেল সব৷ ওদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকীতে স্ত্রীকে দেওয়ার মতো কিছু ছিল না সমুদ্রর৷ তাই ওটা লিখে কিছু স্বপ্ন উপহার দিয়েছিল৷ চোখের জল বাঁধ মানছে না কারুরই৷ স্মৃতিকণা বললেন, ‘তোমরা যাওয়ার পর আর ভাড়া দিইনি৷ হাজার হোক, সুপারস্টারের ঘর!’

মেসোমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে, বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনদার মুদিখানার দোকানে গিয়ে দাঁড়াল সমুদ্র আর উত্তরা৷ নীতিনদা বুড়ো হয়েছেন৷ চুল দাড়িতে ধূসর ছোপ৷ চোখে চশমা৷ তবুও চিনতে পারলেন ওদের৷ কী বলবেন বুঝতে না পেরে যখন কথা হাতড়াচ্ছেন, সমুদ্র বলল, ‘তোমার সেই স্পেশাল চানাচুর এখনও পাওয়া যায়, নীতিনদা? দাও তো এক ঠোঙা৷ কত দিন খাই না!’ আনন্দে সমুদ্রকে জড়িয়ে ধরলেন নীতিন৷ দোকানের বাকিরাও প্রথমে সমুদ্রকে দেখে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন৷ একটু ধাতস্থ হতেই সেলফির আবদারে ঘিরে ফেললেন তাদের প্রিয় নায়ককে৷ সকলের সঙ্গে হাসিমুখে সেলফি তুলল সমুদ্র৷ ততক্ষণে দোকানটা ভাল করে দেখছিল উত্তরা৷ ওদের এক কামরার সংসারের সব জিনিস এখান থেকেই কেনা হত! কতবার হাসি মুখে ধারে জিনিস দিয়ে দিয়েছে নীতিনদা৷ উত্তরা অবশ্য মাইনে পাওয়া মাত্রই মিটিয়ে দিত সব৷ তবুও উপকারীর উপকার কখনও ভুলতে নেই! ঠিক দুপুর বারোটায় গাড়িতে উঠে বসল উত্তরা আর সমুদ্র৷ ‘অসিত, বৌদিকে আহিরীটোলায় নামিয়ে আমি স্টুডিয়োয়...৷’

—‘...আমি বাড়ি যাব,’ সমুদ্রকে কথা শেষ করতে দিল না উত্তরা, ‘টালিগঞ্জ!’

—‘আর ইউ শিওর?’

—‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট!’

—‘বেশ৷ তবে আমাদের বাড়িতেই চলো, অসিত,’ হাসল সমুদ্র৷ এটাই তো ও চেয়েছিল৷ উত্তরা ফিরছে নিজের বাড়িতে৷ ওদের বাড়িতে৷ শিখাদিকে একবার ধন্যবাদ দিতে হবে৷ অতীতে ঘোরা খুব দরকার৷ নয় তো বর্তমান বড্ড বোরিং হয়ে যায় আর ভবিষ্যৎ টেকেন ফর গ্রান্টেড৷ উত্তরার হাতের ওপর হাত রাখল সমুদ্র৷ স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে আলতো হাসল উত্তরা৷ আকাশে কালো মেঘ করেছে৷ বৃষ্টি হতেপারে৷ সমুদ্র চায় আজ বৃষ্টি নামুক৷ সব টানাপোড়েনের সংসারগুলোতে ভালবাসা হয়ে ঝরে পড়ুক৷

অধ্যায় ১ / ৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%