প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
জাপানী বোমার ভয়ে গোটা কলিকাতা মনুষ্যশূন্য বলিয়া বোধ হইতেছে, অবশ্য পৌষের শীতটিও মন্দ পড়েনি এবার। কারণ যাহাই হউক না কেন, সদাচঞ্চল হ্যারিসন রোডে গাড়িঘোড়ার আওয়াজ কদাচিৎ পাওয়া যাইতেছে। শহরের আওয়াজ বিনা, প্রভাতী চা এবং জলখাবারের সময়টিকে এই শেষ কিছুদিন যাবৎ অপরিচিত ঠেকিতেছে।
ব্যোমকেশ এ নিয়ে আদৌ মাথা ভার করিতেছে কিনা তা বোঝা দায়। অন্য যে কোনও দিনের মতনই আজও সে খবরের কাগজখানার প্রথম প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্তে, এবং পুনরায় শেষ থেকে প্রথমে যাতায়াত করিতেছে। বলিলাম, “হিরোহিতোর ভয়ে তোমার মক্কেলরা এখন কতদিন অজ্ঞাতবাসে থাকেন দেখো।”
সমস্ত বিজ্ঞাপনেই বোধ হয় চোখ বোলানো শেষ হইয়াছিল, ব্যোমকেশ কাগজটি গুছিয়া রাখিতে রাখিতে বলিল, “কিছু কিছু নয় বাবা, কিছু কিছু নয়।”
আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, “সে আবার কী!”
“আশ্চর্য, এ লেখা আগে পড়োনি নাকি?
দুনিয়ার মাঝে বাবা কিছু কিছু নয়, কিছু কিছু নয়।
নয়ন মুদিলে সব অন্ধকারময়, বাবা অন্ধকারময়।।
ধন বল জল বল, সহায় সম্পদ বল,
পদ্মদলগত জল, চিহ্ন নাহি রয়।”
এ লেখা সত্যই পড়িনি, কার লেখা সে কথা জিজ্ঞাসা করিতে ব্যোমকেশ মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল। আমি তাগাদা দিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময়ে সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। আমাকে উদগ্রীব হতে দেখে ব্যোমকেশ বলিল, “চিন্তা নেই। অত ভারী পায়ের আওয়াজ মক্কেলের নয়, পুলিশেরই হয়।”
ডিডাকশনটি সঠিক, মিনিটখানেকের মধ্যে আমাদের পূর্বপরিচিত বীরেনবাবু ঘরে প্রবেশ করিলেন। ভদ্রলোক হাস্যমুখর এমন অপবাদ কেউ দেবে না, কিন্তু আজকে তাঁর ভ্রূযুগল যে পরিমাণ কুঞ্চিত হইয়া আছে, তাহাতে স্বাভাবিক আদর আপ্যায়ন করাও উচিত বোধ হইল না। চেয়ারে বসিতে বসিতে বললেন, “কমিশনার সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন, সে খবর দিতেই আসা।”
ব্যোমকেশ একটা সিগারেট ঠোঁটে ধরাইয়া বীরেনবাবুর দিকে প্যাকেটটি এগিয়ে দিল। তিনি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিতে করিতে বলিলেম, “আমি সাহেবকে বলেছিলাম ব্যোমকেশবাবুর কাছে এখনই যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সে কথা তিনি শুনলে তো! তারপর আজ সকালে যা ঘটেছে...” বলিতে বলিতে বীরেনবাবুর খেয়াল হইল তাঁর শ্রোতৃবৃন্দ ভূমিকাটুকু সম্বন্ধেও অবহিত নন। আমাদের দিকে তাকাইয়া বলিলেন, “এ ঘটনা আপনাদের জানার কথা নয়, কারণ শুরুতে খবরওয়ালারাও টের পায়নি। আর যখন তারা টের পেয়েছে, তখন পুলিশ নিজে তাদের অনুরোধ করেছে খবর না ছাপাতে। যদিও তারা বোধ হয় সে অনুরোধ আর রাখবে না।”
ব্যোমকেশ ঠোঁট থেকে সিগারেটটা সরাইয়া বলিয়া উঠিল, “বলেন কী! পুলিশকে হাতজোড় করতে হচ্ছে খবরের কাগজের কাছে? অবস্থা তাহলে নিতান্তই বেগতিক।”
হাতজোড় করিবার প্রসঙ্গটি সম্ভবত বীরেনবাবুর মনঃপূত হইল না। একটি অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “কারণ আছে। পুরো ঘটনা না শুনলে বুঝতে পারবেন না।”
“তিন সপ্তাহ আগে রামবাগান অঞ্চলে গলির গলি তস্য গলির মধ্যে একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। অন্য সময়ে মৃতদেহটি নিয়ে আদপেই কোনও হট্টগোল হওয়ার কথা ছিল না। পেশাগত কারণে ও অঞ্চলটিতে মাঝেসাঝেই এ ধরনের অপরাধ ঘটে থাকে।”
ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, “অর্থাৎ খুন যিনি হয়েছেন, তাঁর পেশাটি ছিল আদিমতম?”
বীরেনবাবু মাথা নাড়িলেন।
“ঠিকই বুঝেছেন, রামবাগান বলে কথা। তা যা বলছিলাম, এবারে কিন্তু এই খুন নিয়ে কিছু হইচই হল, যদিও শেষরাতের ওই লাশ পুলিশ আসার আগে জনাদুয়েক মানুষই দেখেছিল। কিন্তু অপরাধের নৃশংসতা তাদের এতই বিহ্বল করে তুলল যে, চেনাশোনাদের ঘটনাটার ব্যাপারে না বলে পারল না।” কিয়ৎকাল নীরব থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল, “নৃশংসতার ধরনটা জানা যায়?”
“সে কথাতেই আসছিলাম। পুলিশের কাজ তো আর আজকে শুরু করিনি, কিন্তু এ ধাঁচের হত্যাকাণ্ড আমার চাকুরিজীবনে দেখিওনি, শুনিওনি। হতভাগিনীর গলা কেটে খুন করা হয়েছে, কিন্তু সেটি নৃশংসতার শুরু মাত্র।
“খুন করার পর মহিলার শরীরটিকে হত্যাকারী উন্মুক্ত করে ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি বার করে নিয়েছে।”
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ শুনিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। ব্যোমকেশ মুখে বিশেষ রেখাপাত হইল না, দেখিলাম সে নিমগ্ন চিত্তে বীরেনবাবুর কথাই শুনিতেছে।
“সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলিতে চলিতেই গত সপ্তাহে আরেকটি খুন হয়। একই মহল্লা, এবারেও শিকার আরেক দেহোপজীবিনী। এবং...”
“এনারও শরীরটিকে তছনছ করে গেছে?”
বীরেনবাবু মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইলেন।
ব্যোমকেশ বলিল, “কিন্তু আজ সকালে বোধ হয় দ্বিতীয় খুনের রহস্যোদঘাটনের জন্য সে চত্বরে যাননি?”
বীরেনবাবু একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, “ঠিকই ধরেছেন, আজ সকালেই তৃতীয় একটি লাশ পাওয়া গেছে। অবিকল একই পদ্ধতি। রামবাগানে এখন বিকালের পর থেকে আর লোকজন বেরোচ্ছে না। এদিকে কাগজওলারা আর এ খবর চেপে রাখবে না বলেই আমার ধারণা, হয়তো কাল সকালেই দেখতে পাবেন।”
ব্যোমকেশ অন্যমনে বলিল, “জাপানী বোমার ভয়ে রাস্তাঘাট এমনিই ফাঁকা, খুনী তারই ফায়দা তুলছে। তার ওপর এয়ার রেডের আশঙ্কায় রাস্তায় সামান্য আলোটুকুও থাকছে না।”
“খুবই সম্ভব। যাই হোক, আমাকে এখনই লালবাজারে ফিরতে হবে। আজকালের মধ্যে একবার কর্তার সঙ্গে দেখা করে আসবেন। বুঝতেই পারছেন, আর্জেন্ট তলব পাঠিয়েছেন।”
বীরেনবাবু বিদায় নেওয়ার পর ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “কী মনে হচ্ছে ব্যোমকেশ? এমনতর নৃশংসতা যে কল্পনা করাও মুশকিল।”
ব্যোমকেশ আরামকেদারায় হেলান দিয়া বলিল, “মনুষ্যচরিত্র অজিত, আমাদের সীমিত কল্পনাশক্তি দিয়ে তার তল খুঁজে পাবে এ আশা করোই বা কেন? হাজারখানা মোডাস অপারেন্ডি থাকতে পারে। ষড়রিপুর যে কোনওটিই প্রবলতর হয়ে উঠতে পারে।”
“বলো কী! কাম–ক্রোধ–মোহ নয় তাও বোঝা গেল। কিন্তু বাকিগুলো?”
“সেও ভাবলে ঠিকই পেয়ে যাবে। হতেই তো পারে অপরাধী তার এই আপাতব্যাখ্যাহীন নৃশংসতার মধ্য দিয়েই একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে, হেঁয়ালির ছন্দটা কেউ মেলাতে পারে কিনা সেটাই দেখতে চায়। এ-ও তো এক ধরনের মদমত্ততাই। এবার যদি মাৎসর্যের কথা ধরো...”
ব্যোমকেশ আরও কিছু বলিতে যাচ্ছিল, এমন সময়ে পুঁটিরাম ঘরে প্রবেশ করিল, “বাবু, তার।”
টেলিগ্রামটি পড়িতে পড়িতে ব্যোমকেশের চোখে যেন একপলকের জন্য ঝিলিক খেলিয়া গেল। পড়া হইয়া যাওয়ার পর টেলিগ্রামটি সামনের জলচৌকিতে রাখিয়া বলিল, “নাও, একদিনে দু-দুখানা রহস্য। এই না হা মক্কেল, যো মক্কেল করে কাঁদছিলে?”

টেলিগ্রামটি তুলিয়া দেখি জনৈক সুবিমল সান্যাল ব্যোমকেশের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করিয়াছেন। জানাইয়াছেন আজ শেষ-অপরাহ্ণে দেখা করিতে চান।
ব্যোমকেশ বলিল, “ভাবছি এখনই একবার কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। যদি তদন্তের ভার নিতেই হয়, তাহলে বীরেনবাবুর থেকে সহযোগিতা যে নিতান্তই কাম্য, সেটা সাহেবকে একবার মনে করানো দরকার।”
বলিলাম, “রামবাগানেও যাবে নাকি?”
ব্যোমকেশ বিমনা স্বরে বলিল, “হয়তো, হয়তো নয়। লালবাজার থেকে কী খবরাখবর পাওয়া যায়, তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু।”
আমি আর বাক্যব্যয় না করিয়া লেখার খাতাটি টানিয়া লইলাম। অবস্থাগতিক যা দেখিতেছি, মাসাধিককাল হয়তো রাত্রে লেখালেখি করাই যাইবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন