মিমি রাধাকৃষ্ণন
উইন্ড-স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই প্রদোষ বলল—‘‘বাঁ দিকে একটু নজর রেখো তো মহেশ? ছোটো বড়ো কোনও রকম সাইনবোর্ড চোখে পড়লেই বলো ৷ ভাইতেরী ছাড়িয়ে এসেছি, সে-ও দু কিলোমিটারের বেশিই হবে ৷ এ তো প্রায় সুলতান বাথারি পৌঁছে গেলাম—মারিয়াম্মার টিকিও দেখছি না, কোথায় গেলেন সব?’’
অনুরোধটা কানে যেতেই মহেশ সঙ্গে সঙ্গে জানলার কাচ খানিক নামিয়ে নিল ৷ বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা, ভেতরে বাষ্প, এ অবস্থায় আবছা চোখে বোর্ড তো দৃষ্টি এড়াতেই পারে ৷ তার উপর দু’ধারের জঙ্গল, আগাছা বছর’ভর বৃষ্টির জল পেয়ে মিনিটে, দু-ইঞ্চি করে বাড়ে, এবং জলে রোদে লতা- পাতায়, আদ্যিকালের সে বোর্ডের সাইনেও কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা ঈশ্বর জানেন ৷ কারণ প্রদোষস্যার না হলেও, মহেশ তো মাসে দু-মাসে অন্তত আসেই এ পথে! কখনও এ জায়গার অস্তিত্ব তো দূরের কথা, নামও কানে যায়নি!
টাউনের গিশগিশে ভিড় ছাড়াবার খানিক পর থেকেই এদিকের রাস্তা একেবারেই ফাঁকা, তবু প্রদোষ ধীর গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল ৷ একে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, তায় মনে হচ্ছে বাঁ-ডান শুনতে কোথাও একটা গণ্ডগোল করে ফেলেছে ৷ নয়তো এতখানি রাস্তা পেরিয়ে এসেও একটা লোকালয় চোখে পড়ল না! একপাশে, খুব উঁচু না হলেও পাহাড়ের চড়াই, অন্যদিকে ঢাল ৷ তাতে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ডালপালা ছড়ানো মহীরুহ, লতাগুল্ম, ছোটো ছোটো ঝর্না, ঝিঁঝির ডাক, কখনও মেঘ, কখনও কুয়াশা, আবার ফিকে রোদের আভাস ৷ এমন দৃশ্যের অবশ্য তুলনা হয় না, তবে যদি না গন্তব্যের চিন্তা থাকে ৷ আর এই চিন্তার ফাঁকেই মহেশ তাকে প্রায় ঠেলা দিয়ে বলল—‘‘স্যার দেখুন তো, আপনার ডানদিকে..., ওই যে...?’’
প্রদোষ তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘোরাল—ঠিকই, বোর্ড একটা দেখা যাচ্ছে ৷ অতঃপর গাড়ি থামিয়ে ভালো-মতন লক্ষ্য করে দেখা গেল, দুটো লোহার ডান্ডার ওপর কোনওকালের হলুদ-রঙা জংধরা ফুট চারেকের একটা বোর্ড, তাতে ততোধিক বিবর্ণ অর্ধবিলুপ্ত কালো রঙে লেখা—‘গুড শোফার্ড’স হসপিটাল ৷ রেজি নং...২৫৩... ৷ পো: ভাইতেরী, ওইনার্ড ডি: কেরালা স্টেট’ ৷
নিশ্চিন্তে শ্বাস ফেলে প্রদোষ বলল—‘‘মহেশ দেখেছ? ওফ, তোমার কথায় যা চিন্তায় পড়েছিলাম...! অবশ্য এমন রং-চটা বোর্ড! দোষও দেয়া যায় না, নজর এড়াতেই পারে ৷ যাক গে বাঁ-চা গেল... ৷ তা এটাই তো রাস্তা, গাড়ি ঘোরাই তাহলে?’’ উত্তরের অপেক্ষা না করে ডানদিকের খোয়া ওঠা, সরু রাস্তায় গাড়ি ঘুরিয়ে বাঁক নিয়ে সামান্য এগিয়ে যেতেই এবার চোখে পড়ল হাসপাতালের নাম লেখা বেশ বড়োসড়ো রঙিন, সুন্দর একটা বোর্ড, যার নীচে মোটা লাল-রঙা তির চিহ্নে পুবদিকে যাবার নিশানা ৷
এদিকটা পুবদিক বলেই হয়তো সকাল থেকে রোদ পেয়ে ঝলমল করছে, গাছপালাও শুকনো ঝরঝরে ৷ চওড়া পাকা রাস্তা নয় বটে, তবে মসৃণ, সরল ৷ অন্তত, ঢোকার মুখের মতন খোয়া ওঠা, এবড়ো-খেবড়ো নয় ৷ এদিকটাতে বিস্তীর্ণ কফির বাগান, তার সঙ্গে মাঝে মধ্যে কাজু আর কোকো, ফলে শ্যাওলাপড়া দৈত্যের মতন মহীরুহ আর লতাগুল্মে ছাওয়া অন্ধকার স্যাঁতস্যেতে ভাবটাও নেই ৷ প্রদোষ বেশ ফুরফুরে মনে মহেশের দিকে চেয়ে অকারণেই হাসল একবার ৷ সত্যি, পথের সামান্য এদিক আর ওদিকে দৃশ্য কেমন বদলে যায়, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া আর মানুষের মনও ৷
খানিক এগিয়েই রাস্তাটা চাতালের মতন খানিক চওড়া হয়ে গিয়েছে, যেখানে গাড়ি-টাড়িও দাঁড়াতে পারে, মানুষজনও ৷ একদিকে সিমেন্টের মামুলি দুটো বেঞ্চও, অন্যধারে বড়ো ঝাঁকড়া একটা গাছ ৷ তার গায়ে টিনের লম্বা পাতে, কাঁচাহাতে আঁকা অদ্ভুত সব অজানা-অচেনা রং আর আকৃতি ও ফলের ছবি, এবং দুর্বোধ্য মালায়ালাম বর্ণমালার সঙ্গে বড়ো বড়ো করে ইংরিজিতে লেখা ‘মারিয়াজ জুস পয়েন্ট’ ৷ তার পেছনদিকে ধাপ কাটা কাটা চওড়া সিঁড়ির মাথায় বারান্দা দেয়া পরিচ্ছন্ন একটা ছো-ট্টো ঘর ৷
শব্দ-জব্দ বা ধাঁধা নিয়ে বসে অনেকক্ষণ মাথা চুলকে, পেনসিল কামড়ে শেষমেশ টপাটপ উত্তরগুলো পেয়ে গেলে যেমনটা হয়, প্রদোষের অবস্থাটা ছিল তার চেয়েও শতগুণ আমোদের ৷ আনন্দে শিস দিয়ে একটা সুর তুলল খানিক, তার সঙ্গে স্টিয়ারিঙে টোকা দিয়ে দিয়ে তাল, আর এমন হরষের মধ্যেই বাঁ-ধরে পাহাড়ের দেয়ালটা পেরুতেই চোখের সামনে একেবারে সশরীরে এসে হাজির হলেন ছেলেবেলা থেকে গল্পশোনা, তাদের রূপকথার রাজপুত্তুর বেবীমাসির যক্ষের ধন সে-ই ‘গুড শেফার্ডস হসপিটাল’ ৷ সামনের রাস্তা থেকে আর্চ করা বড়ো গেট, তারপর সিঁড়ি, শেষে তিন ধাপে ভাগ করা নীল নীল জানলা দরজা আর টিনের ছাতওয়ালা দোতলা সাদা ধবধবে হাসপাতাল বাড়ি ৷
প্রদোষ গাড়ি থেকে নেমে আড়মোড়া ভেঙে হালকা গলায় মহেশের দিকে চেয়ে বলল—‘‘আগে একটু ভেতরটা ঘুরে আসা যাক, তারপর জুস কর্নারের দিকে যাওয়া যাবে’খন...?’’
প্রদোষের ফার্টিলাইজার কোম্পানির হেড অফিস যদিও ব্যাঙ্গালোরে, কিন্তু গোটা দাক্ষিণাত্যেই তাকে ঘুরে বেড়াতে হয় খুব ঘন ঘন, এবং তার মধ্যেও সর্বাপেক্ষা এই কেরালা স্টেটে ৷ সেজন্য অবশ্য গাঁয়ে-গঞ্জে গাড়ি নিয়ে এমন পথ খুঁজে খুঁজে মরতে হয় না, তার পরিদর্শনক্ষেত্র কেবলমাত্র রাজধানী বা খুব বেশি হলে দু-একটা বড়ো বড়ো শহর ৷ তবে, গত ক’বছর যাবৎ, দু-একমাস অন্তর এক আধবেলার জন্য হলেও হাঁচড়ে পাঁচড়ে ত্রিচুড়টা একবার অন্তত ছুঁয়ে যাচ্ছে তার বেবীমাসিকে দেখবার জন্য ৷ প্রদোষের একমাত্র জীবিত মাসি ৷ পিতৃকুলের অবশিষ্টাংশরা কেউই আর নেই, মাতৃকুলেরও তথৈবচ, বাদে সবেধন নীলমণি এই বেবীমাসি ৷ অবশ্য সে নীলমণি লতাটিরও অস্তিত্ব আর কতদিন, কে জানে! গত কার্তিক মাসে নব্বই পেরিয়েছেন, ফের আশ্বিনও তো এসে গেল...! বছর তিনেক যাবৎ দিন না গুনলেও বলা যায় প্রায় মাস গোনাই ৷ আবার সে গুনতে গুনতে অবশ্য বছরও গড়িয়ে যাচ্ছে কোনওক্রমে ৷ এমনটা বললে অবশ্য মনে হয় যেন তিনি বেঁচেও আছেন ওই কোনওক্রমেই, তবে তা কিন্তু নয়! মাথা এখনও স্বচ্ছ, পরিস্কার—ফলে ঠাট্টা-:ইয়ার্কি এখনও পর্যন্ত চলে পুরোদমে ৷ সকাল-বিকেল শাড়ি বদল করে, শীর্ণ হাতে প্রায় কনুয়ের কাছে ঘড়ি বেঁধে, ওডিকোলন মেখে এঘর-ওঘর ঘুর ঘুর করেন স্বাভাবিকভাবে হেঁটে-চলেই ৷ তিনবেলা খাবার টেবিলে বসেন, সকালে খবরের কাগজ পড়েন, বিকেলে দেখেন টিভি-র নিউজ ৷ রাতে নিজে হাতে রেকর্ড চালিয়ে গান শোনেন, গল্পের বই নিয়ে বিছানায় শুতে যান ৷
তবে, এতো গেল নিত্যকার কথা, বছরের মধ্যে ছ’আটমাস ৷ বাকি সময়ে কিন্তু সামান্য জ্বর-জ্বারি, পেটের অসুখ হলেও গেল গেল রব ওঠে ৷ উঠবেই, বয়সটা তো আর ছেলেখেলা নয় ৷ এক থেকে একানব্বই মুখে মুখে কেবল গুনে উঠতেই হাঁপ ধরে যায়, তার সাথে আবার এতগুলো বছর... ৷ সেস-ব জড়ো করে দিন কাটানো কি চাট্টিখানি কথা?
এবার বেবীমাসির একানব্বইয়ের জন্মদিনের বাকি আছে আর মাত্র তেইশ দিন ৷ সে উপলক্ষে মেয়ে আসছে মার্কিনমুলুক থেকে ৷ এদেশ ওদেশের খানকতক নাতিপুতি, ভাগ্নে, ভাইপোও নাকি উপস্থিত হবে সে সময়—ছোটোখাটো একটা উৎসবই হচ্ছে মনে হয়—ফ্যামিলি গ্যাদারিং ৷ প্রদোষ সে সময় থাকতে পারবে না, বাইরে যাবে৷ তাই হাতে সময় নিয়ে নিরিবিলিতে দেখা করে গেল আগেভাগেই ৷
দুপুরে খেয়েদেয়ে কাল বিকেলেই ফিরে যেত কালিকটে, তারপর সকালে মিটিং সেরে সো-জা মাইসোর ৷ কিন্তু কী-যে ভালো লাগছিল আবার সেই ছোট্টো ছেলেটি হয়ে গিয়ে, গা এলিয়ে গল্প শুনতে... ৷ কত গল্প, যেন গল্পের রত্নভাণ্ডার-খাজানা ৷ বেবীমাসির সঙ্গে সঙ্গে এসবও তো হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য ৷ কতদিনের কত ঘটনা, কত স্মৃতি, কত যে চরিত্র... ৷ এই কারণেই কী যে খেয়াল হল, রাতে থেকেই গেল একেবারে ৷ ব্যাঙ্গালোরে জানিয়ে দিল ফিরছে না ৷ অফিসে জানাল সকাল দশটার মধ্যে কালিকটে যেন গাড়ি পাঠানো হয় মিটিং সেরে মাইসোর যাবে—ফ্লাইট পুরো ফুল ৷ ইতিমধ্যে সকালের ট্রেনে ত্রিচুর থেকে ফারুকি পৌঁছে যাবে—ঘণ্টা আড়াইয়ের পথ, চমৎকার জার্নি ৷
কথা সবই ঠিক, মিটিংও জরুরি, ফ্লাইটও ফুল ৷ তবে প্রদোষের শখ হয়েছিল, বা বলা যায় বাই চেপেছিল যে, এবার কালিকটের কাজ সেরে গাড়ি নিয়ে ওয়াইনাড হয়ে মাইসোর যাবার পথে বেবীমাসির স্বপ্নের সেই ‘গুড শেফার্ড’স হসপিটাল’ একবার চাক্ষুষ দেখে যায়—এতকাল থেকে এতবার, এত শুনেছে তারা—এতরকম ভাবে... ৷ এ তো বলা যায় তার যাওয়া-আসার পথেই—কেন যে তবু যায়নি এতদিন! আসলে গাড়িতে অতখানি পথ উজিয়ে যায় না কিনা! তা, এবার গেলেই হয়! এমনিতে প্রতিবারের সাক্ষাতেই, সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও একবার অন্তত ‘গুড শেফার্ড’স’ ঢুকে তো পড়বেই ৷ কিন্তু এবার সময়টা বেশি পাবার জন্যই হোক, বা অন্য কোনও কারণে, বার বার, ঘুরে ঘুরে, ফিরে ফিরে, আসছিল সেই হাসপাতালের কথা-ই ৷ কেমন দেখতে ছিল হাসপাতাল বাড়িটা, বেবীমাসির কোয়ার্টার থেকেই বা কেমন দৃশ্য দেখা যেত ৷ তাঁর কোলিগদের সহৃদয়তা, আর সর্বোপরি মারিয়াম্মার জুস কর্নার ৷ কত দেশে, কত রকমের ফলের রসই না চেখে দেখেছেন, কিন্তু ভাইথেরীর অরেঞ্জা—সে জুসের তুলনাই হয় না—অমৃত ৷
সেই শোনা গল্পই আবার করে শুনছিল প্রদোষ, সেই ছোটোবেলাকার মতনই আগ্রহ নিয়ে—এত ভালোলাগছিল তার! আর তখনই মাথার মধ্যে ঘুরছিল যদি একবার ঘুরে যেতে পারে, তাহলে আসছে বার অন্তত বেবীমাসিকে গিয়ে সাতকাহন করে বলতে পারে তার অভিজ্ঞতার কথা ৷ কত খুশি যে হবেন ৷ ছেলেপুলেদের কতবার নাকি বলেছেন—কোনও ইনেটারেস্টই নেই মোটে! তা, সে যাই হোক—ভাগ্যিস এল—খুবই সুন্দর, চমৎকার অভিজ্ঞতা, অসম্ভব আনন্দ হচ্ছে তার ৷ মনে হচ্ছে মাইসোর না গিয়ে ত্রিচুরই ফিরে যাবে বেবীমাসিকে গল্প শোনাতে ৷ আহ, স্বর্গীয় দৃশ্য! এবার বাকি কেবল ওই অমৃতফলের রসটা খাওয়া ৷
এই বেবীমাসি হচ্ছেন প্রদোষের মায়ের নয়নের মণি, একমাত্র ছোটো বোন ৷ সে সময়ে দাদু চাকরি করতেন মাদ্রাজে, আর তখনই অসময়ে হঠাৎ দিদিমা মারা যাওয়াতে মা-মাসিকে উপায় না দেখে তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওদিককারই মিশনারি হস্টেলে ৷ পরে মা গেলেন আর্ট কলেজে আর মাসি মেডিকেলে, তবে দুই-ই ওই ম্যাড্রাসেই ৷ এতবছর ওইদিকে থাকবার পর আর অন্যদিক পছন্দ হত না কিনা সে কারণেই মাসি কেরালারই এক গণ্যমান্য পরিবারের মহামান্য ডাক্তারকে বিয়ে করে থিতু হলেন এই ত্রিচুরে ৷ মেসো অবশ্য খুব অল্প বয়সে মারা যান, খুবই কম বয়সে, কিন্তু বেবীমাসি ছোটো মেয়ে নিয়ে এখেনেই থেকে যান ৷ হসপিটালের চাকরি ছিল, বড়ো চেম্বারও ছিল শহরে, তাছাড়া শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজন..., তারা সবাই ভালোবাসত তাঁকে ৷ অপূর্ব রূপসী, বিদুষী তো বটেই, গান করতেন চমৎকার আর সব চাইতে জরুরি যেটা—রসবোধ একেবারে ষোলআনা ৷ অর্থাৎ যাকে বলে খাঁটি সেন্স অফ হিউমার... ৷ এমন দুর্ভাগ্য, এমন দুঃসহ একাকিত্বকেও হেলায় কেমন অবহেলা করতে পারেন, সে না দেখলে ভাবা যায় না ৷ বিরাট বাগান-ঘেরা, বিশাল সাবেকি বাড়িতে, পুরোনো স্মৃতি আর নিত্যনতুন শখ নিয়ে সবার প্রিয় এই উদারমনা, নীতিপরায়না সংযমী মানুষটি একেবারে একাই থাকেন ৷ দেখা-সাক্ষাৎ করতে অবশ্য লোকজনের বিরাম নেই—সর্বক্ষণই জনসমাগম, সবাই-ই আসে, যেমন প্রায়শই আসে প্রদোষও ৷
তা, এই বেবীমাসি বিয়ের আগে বছর দুয়েক চাকরিসূত্রে থেকেছিলেন এই গুড শেফার্ড’স হসপিটালে—মেসো তখন পড়তে গিয়েছেন বিলেতে, ফিরে এলেই শুভ-বিবাহ ৷ তার আগের সুগন্ধী, বাতাসি, মধুময় সময়টা তার কেটেছিল এই ভাইথেরীর মিশনারি হাসপাতালের এক নম্বর ছোট্টো বাংলোয় ৷ ওখানেই বসে বসে পরবর্তী জীবনের স্বপ্ন দেখতেন ৷ সেই স্বপ্নজালে বোনা গোছা গোছা চিঠি লিখতেন বিলেতে তাঁর হবু স্বামীকে, আর পেতেনও তার দিস্তা ভরা উত্তর ৷ ঋতু পরিবর্তন দেখতেন—সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়... ৷ এককথায় ওখানে থেকেই দিন গুনে গুনে, আশাভরা নিটোল, সুন্দর, সতেজ একটা জীবনের অপেক্ষা করতেন বছরভর ৷
সে সব সোনায় মোড়া দিনগুলো কি আর ভোলা যায় সহজে? অন্তত বেবীমাসি তো কিছুতেই ভোলেননি আর ভুলতে দেনওনি কাউকে ৷ ভুলতে দেননি বটে, তবে সে জায়গা কিন্তু আর দেখাতেও পারেননি কাউকে—এমনকি তাঁর স্বামীকেও না ৷ ক’বছরই বা তিনি বেঁচে ছিলেন! ও-ই ‘যাব, যাচ্ছি’ করেই হয়তো হয়নি সে সময় ৷ পরবর্তীকালে মেয়ে, দিদি, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন কাউকে যাওয়াতে পারেননি আর ৷ এমনকি নিজেও যাননি আর ৷ সবাইকে কেবল গল্প বলে বলেই মুখস্থ করিয়ে ফেলেছেন রাস্তা-ঘাট, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, মাঠ-ঘাট সমেত গোটা সেই ‘দি গ্রেট গুড শেফার্ড’স হসপিটাল’টা ৷
এ সময়টা বোধহয় লাঞ্চ ব্রেক, ফলে আউটডোর ক্লিনিক বন্ধ—ডাক্তার-বদ্যিও নেই বললেই হয় ৷ দু’একজন হয়তো দাঁড়িয়ে গল্প করছে ঢিলে ঢালা ভঙ্গিতে ৷ ঢাকা বারান্দার লম্বা লম্বা বেঞ্চে কিছু রুগি আর তাদের পরিজনেরা এখনও পা তুলে বসে বসে ঝিমুচ্ছে ৷ তাদের যাবার তাড়া আছে বলে: তো মনে হয় না ৷ খানিক নীচে নার্সেস কোয়ার্টারের চাল দেখা যাচ্ছে—তিনটি তরুণী সিস্টার জোরে জোরে কথা বলে সেদিকেই নেমে গেল তরতরিয়ে—প্রদোষ মেন বিল্ডিং-এর ভেতরে ঢুকল ৷
এ ধরনের মিশনারি ছোটো: হাসপাতাল যেমনটা হয় তেমনই—অতিশয় পরিচ্ছন্ন, শান্ত, কঠিন নিয়ম শৃঙ্খলাবদ্ধ...৷ যদিও সে এসবের সঙ্গে তেমন পরিচিতি নয়, তবু আন্দাজ করতে পারে ৷ শহরের বড়ো বড়ো হাসপাতাল বা ছোটো নার্সিং হোমের সঙ্গে এর তুলনাও চলে না—এখানে লোকসংখ্যাই বা কতটুকু? আর একটা কথা ৷ কেবল পরিচ্ছন্নতা দেখলেই তো চলে না, তার সাথে দেখতে হবে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ সুবিধেও আছে, কিনা ৷ সেটি আছে বলে অন্তত দেখে তো মনে হয় না ৷ বেবীমাসির থেকে সত্তর বছর আগেকার যে রকম বিবরণ তারা পেয়ে আসছে, আজও তো মনে হয় তার চেয়ে বাড়া-কমা কিছুই হয়নি ৷ আদতে টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, জন্ডিস ইত্যাদিতে দূর দূর থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে, পায়ে হেঁটে আসা রুগিদের, যাতায়াতের ধকল থেকে রেহাই দেবার জন্যই কটা দিন আরামে থেকে যাবার ব্যবস্থা যেন ৷ আর আছে মেটারনিটি ওয়ার্ড, যেমনটা তখনও ছিল এবং তত্বাবধানে ছিলেন, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ শ্রীমতী বেবীআম্মা পোদোয়াল ৷ প্রদোষ বারান্দার শেষের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে পেছন দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে পাহাড়ের পুবদিকে মুখ করা ছোটো ছোটো চারটে ফুটফুটে বাংলো ৷ এরই প্রথম, ওই এক নম্বর কটেজটায় বেবীমাসি কাটিয়েছেন তাঁর জীবনের মহার্ঘ দুটি বছর ৷ সেদিকে চেয়ে আনন্দ, বিষাদ সব মিলিয়ে প্রদোষের কেমন যে একটা অনুভূতি হচ্ছিল, সে আর বলার নয় ৷
তারে মেলা ফ্যাকাশে একটা শাড়ি আর টুকিটাকি গামছা-জামা রোদে, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ৷ সামনে ছোট্ট বারান্দা, ছিট কাপড়ের পর্দা দেওয়া জানলা, সিঁড়ির ধারে পেতলের ছোটো একটা বালতি আর ঘটি রাখা পা ধোবার জন্য—মনে হচ্ছে বেবীমাসিই যেন রেখে গিয়েছেন ডিউটি শেষে ব্যবহার করবেন বলে ৷ প্রদোষ এবার ফিরতি পথ ধরল ৷ এখনও হয়তো অল্পবয়সি কোনও ডাক্তারনিই থাকেন ওখানে, এমন উঁকিঝুঁকি দিলে, শেষে লোক জড়ো করবে নিশ্চয়ই ৷ যদিও এই যে সে গটগটিয়ে গোটা হাসপাতাল ঘুরে বেড়াচ্ছে এখনও পর্যন্ত কোনও কর্মচারী, দারোয়ান বা গার্ড কেউ কিন্তু তাকে বাধা দেওয়া তো দূরের কথা, কোনও প্রশ্নও করেনি—অদ্ভুত...! পঞ্চাশ, একশো বছর আগে এমনটা চললেও, আজকাল তো একেবারেই তা অসম্ভব? সব জায়গায় সই করো, সিসি টিভি, সে সব পরবর্তীকালে কাজে লাগুক বা না-ই লাগুক, মজার ব্যাপার ৷ সে যেন ইনভিজিবল ম্যান, ঘুরে বেড়াচ্ছে যত্র তত্র হাওয়ার মতন—ভালো ৷ হতে পারে লাঞ্চ আওয়ার্সে আলসেমি এটা? হ্যাপি আওয়ার্স! সব হাফ-ফ্রি অথবা ফুল যাই হোক, জুস কর্নারে আশা করা যায় লাঞ্চ ব্রেক নেই—ওই অমৃত রস না খাওয়া হলে এই পরিক্রমাই যে অসমাপ্ত! চারিদিকে তাড়াতাড়ি চোখ বুলিয়ে নিয়ে, মহেশের খোঁজে এবার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল প্রদোষ ৷
মাইসোর পৌঁছে, মিটিং সেরে, ব্যাঙ্গালোরের বিখ্যাত ট্রাফিক ডিঙিয়ে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে সন্ধ্যা গড়িয়ে প্রায় রাতই বলা যায় ৷ ভোর-সকাল থেকে চলেছে এই সফর—ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল ৷ ফলে গরমজলে বেশ করে স্নান সেরে, হালকা কিছু খেয়ে নিয়েই, গান চালিয়ে একটা ম্যাগাজিন হাতে সোফায় বসল প্রদোষ, এবং তার আধ ঘণ্টার মধ্যেই গভীর ঘুম ৷
অত তাড়াতাড়ি ঘুমের কারণে, বলাই বাহুল্য তা ভাঙলও অতি ভোর-সকালে ৷ অত সকালে খবরের কাগজও আসে না, তাই এককাপ চা বানিয়ে আরাম করে চুমুক দেবার আগে মনে হল, সেল ফোনটা গতকাল থেকে মিউটে রাখা আছে, তা বাদে মেলও চেক করা যাক ৷ ফোনটা হাতে নিতে প্রথমেই দেখে গতকাল রাতে ত্রিচুর থেকে তিনটে মিসডকল, আমেরিকার আম্মুদির মেল, সর্বোপরি মোহন চেটার এসএমএস—‘বেবীমাসি নেই’... ৷
খবরটা পড়ে এমনই ‘হতভম্ব’ হয়ে গিয়েছিল প্রদোষ যে সামান্যক্ষণ ঠিক বুঝেই উঠতে পারছিল না কী করবে, বা করা উচিত ৷ অন্যমনস্ক হয়ে চশমাটা বার দুয়েক খোলা-পরা করল, তারপর ছোটো ছোটো চুমুকে চা-টাও শেষ করে ফেলল তলানি পর্যন্ত, তবু ঘোরটা কাটছিল না যেন, বেবীমাসি নেই...!
প্রায় বিরানব্বই বছরের মানুষ—তার থাকাটাই একটা খবর, না থাকাটা নয় ৷ যতই মাথা চোখ কান পরিষ্কার থাকুক, রসবোধেরও ঘাটতি না হোক—তবু ৷ গত কয়েক বছর থেকে সবাই-ই মোটামুটি তৈরি, এমনকি প্রদোষ নিজেও ৷ নয়তো সাতকাজ ফেলে, উলটোপথে বার বার দেখা করবার জন্য যাবেই বা কেন? সেটা কথা নয় ৷ কথা হচ্ছে গতকাল ঠিক এ সময়ে যাঁর সঙ্গে বসে চা খেয়েছে, আর এই মুহূর্তে যাঁর কথা ভাবছিল যে, চা-টা শেষ করেই ফোন করবে গতকালের অবিস্মরণীয় ঘটনাটা সবিস্তারে শোনাবার জন্য—সে নেই! ভাগ্যের পরিহাস কি একই বলে?
ভাগ্যের পরিহাস দিয়েই ঘটনাটা শেষ হতে পারত এখানে, কিন্তু সে না হয়ে প্রদোষই হল শেষে পরিহাসের পাত্র ৷ বেবীমাসির একমাত্র মেয়ে আম্মুদি, আর এদিক-সেদিক থেকে জড়ো হওয়া নাতিপুতিরা যতজন পারল এসে, পাঁচ দিনের মাথায় তাঁকে বরফ ঘর থেকে বের করে যখন সৎকার সম্পন্ন করল—সে সময়ে প্রদোষ যেতে পারেনি, সে গেল সপ্তম দিনে ৷ সামনে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ৷ বাড়িভরতি লোকজনে সরগরম, তারই মধ্যে একটু ফাঁকা পেয়ে, রুদ্ধস্বরে, অশ্রুসিক্ত নয়নে, আম্মুদিকে সে বলে ফেলল হাসপাতাল পরিদর্শনের ওই সংক্ষিপ্ত বিবরণ ৷
মায়ের বয়সের তুলনায় ছেলেমানুষ তবু বয়স তো হয়েছে! হাজার লৌকিকতা, মানসিকচাপে ক্লান্ত আম্মুদি বোধহয় অন্যমনস্ক ছিলেন, ফলে কী শুনতে কী শুনলেন কে জানে, বললেন—‘‘সত্যিই, মায়ের জীবনটাই কেবল সব হারানোর জন্য ৷ হাসপাতালটাও যদি থাকত...! আর সবই দেখ, কেমন অস্বাভাবিক যাওয়া ৷ বাবা গেলেন যুদ্ধে, হাসপাতালটা গেল পুড়ে... ৷ তবু বলব একদিনের জন্যও হা-হুতাশ করে চোখের জল ফেলতে দেখিনি ৷’’
তা, দেখেননি, তবে আম্মু যেমন দিনান্তবেলার অবসরে ছোটো ভাইয়ের কাছে বসে সেদিন মনের কথা যেটুকু বললেন তাতে প্রদোষের চোখের জল, গলার বাষ্প সব উড়ে গিয়ে বাকি যা রইল, তা হল কেবল অবাক বিস্ময় ৷ অর্থাৎ ঘটনাটা হল, বেবীমাসীর বিয়ে ও আম্মুর জন্মের সামান্য পরে, পঞ্চাশ সালের আশ্বিনমাসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গোটা হাসপাতাল পুড়ে ছাই হয়ে যায় ৷ ছোটো হাসপাতাল, সামান্যই ব্যবস্থা, তবু তিন উইং মিলে মোট চল্লিশটা বেড ৷ তার মধ্যে বত্রিশ জন রুগিই বেঘোরে মারা যায় সেই আগুনে ৷ দূরে-দূরে গ্রাম ৷ মাঝরাত্তিতে কে আসবে পাহাড় ডিঙিয়ে আগুন নেভাতে? তা বাদে এতো স্বাভাবিক... ৷
এত পর্যন্ত বলে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আম্মুদি আবার এর তার কথায় ব্যাস্ত হয়ে গেলে প্রদোষ একরাশ বিহ্বলতা, ধন্দ আর বুদ্ধির অগম্য চিন্তা নিয়ে ঘোর-লাগা দৃষ্টিতে গুটি গুটি অন্যদিকের ভিন্ন দলের দিকে গিয়ে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবার সেই হাসপাতালের প্রসঙ্গ তুলল ৷ পাঁচ-সাতজন গোমড়ামুখো ছিলেন সেখানে, তারা তো এতক্ষণে গালগল্পের একটা প্রসঙ্গ পেয়ে মহা খুশি ৷ গুছিয়ে বসে, সবাই মিলে যা বলল তার সংক্ষিপ্তসার হল—যদিও বলা হয়েছিল তা বৈদ্যুতিক কারণে কিন্তু তা একেবারেই অসম্ভব ৷ সেকালে এমন এসি-র ধুম ছিল না, গাদাগুচ্ছের গ্যাজেটের জট পাকানো তারও নয় আর অস্থায়ী কানেকশনের তো প্রশ্নই ওঠে না ৷ ঘরে ঘরে ক’টা মিটমিটে বাল্বের আলো আর পাখা, বিশেষ ক্ষেত্রে খান কতক জোরালো লাইট ৷ তাতে অমন অঘটন হয় নাকি? পুলিসও জানে, প্রেসও জানে, পাবলিকও জানে, পরম পিতা যিশুও জানেন যে, আসলে সেটা ছিল ধামা-চাপা দেওয়া অস্বাভাবিক একটা কেলেঙ্কারি ৷ তা, নাহলে প্রতিটি ওয়ার্ডের দরজার বাইরে থেকে শিকল তোলা থাকে? ফাদার থাম্পি তো তার তিনমাস আগে থেকেই উন্মাদ ৷ সেই হিংস্র পাগল রক্ষাকর্তাকে অ্যাসাইলামে না পাঠিয়ে করিয়ে যাচ্ছে তাকে দিয়ে আর্তের সেবা ৷ ভাইজাক থেকে নাকি বদলি ফাদার এই এলেন বলে ৷ হল তো আর্তের সেবা ৷ বদলে প্রতি বছর ওই তারিখে আর্তনাদ শোনে সবাই ৷ দূরের গ্রাম থেকে ধোঁয়ার কুন্ডুলি দেখা যায়, সঙ্গে পোড়া গন্ধ... ৷ ভাগ্য ভালো ফাদার আত্মহত্যা করল, নয়তো পাবলিক পুড়িয়েই মারত ৷
প্রদোষ কোনও কথা বলছিল না, বললে তাকেও তারা হিংস্র না হোক, বদ্ধ পাগল তো বলবেই ৷ ফলে, সবার ব্যাখ্যা শেষ হতে একবার কেবল জিজ্ঞেস করল যে, নতুন করে আবার কোনও হাসপাতাল বানানো হয়েছিল বোধহয় আশে-পাশে ৷ কারণ, বোর্ড যেন দেখেছিল কবে একবার ৷ যাদের উদ্দেশে বলা, সমস্বরে রে-রে করে তেড়ে এল তারা ৷ বানাবার নাকি হিম্মৎই নেই! ওই নামও উচ্চারণ করে না কেউ গোটা তল্লাটে ৷ ওদিকে এখন অনেক ক’টা হাসপাতাল হয়েছে ৷ তারই বোর্ড দেখে থাকবে হয়ত ৷
প্রদোষ মাথা নাড়ল—হতে পারে, তবে সে রাতে ঘুম হল না একেবারেই ৷ সকাল হতে না হতেই সাত তাড়াতাড়ি ফিরে গেল কর্মস্থল ব্যাঙ্গালোরে, এবং এবার অবশ্যই প্লেনে ৷
শরৎকাল, সুন্দর সময়, অনেকদিন থেকে প্রদোষ ভেবে রেখেছিল, এ সময়টা কোথাও একবার বেড়িয়ে আসবে, কিন্তু কী যে হয়েছে, ইচ্ছেই হচ্ছে না ৷ মাথার মধ্যে সারাদিন যদি একটা পোকা নড়েচড়ে বেড়ায়, অন্যদিকে মন যায় কখনও? একবার মনে হচ্ছে ত্রিচুরে সবাই মিলে পরামর্শ করে তার সঙ্গে মজা করেছে ৷ আবার মনে হচ্ছে, এটা একটা মজার সময়? আদতে তারই মাথার ব্যামো ৷ এখনও পুরোপুরি হয়নি, তবে সূত্রপাত এবং তাতেই কুপোকাৎ ৷
এমনই বিপর্যস্ত অবস্থায় এক পরিচিত মনোবিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে খুলে বলল ঘটনাটা, তবে নিজের বদলে অন্যের নাম দিয়ে ৷ যেমনটা হয় আর কি এমন ক্ষেত্রে ৷ শুনে তো সে মস্ত লম্বা চওড়া ব্যাখা করল ৷ ‘শিশুকাল থেকে শুনে শুনে, মনের গভীরের ইচ্ছে..., মাসি অসুস্থ..., কল্পনায় ঘুরে এসে বাস্তবের সঙ্গে গুলিয়ে-টুলিয়ে, ইত্যাদি... ৷’ প্রদোষ ‘হবেওবা’ বলে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে এল—ডিজগাস্টিং ৷ অতঃপর অফিস থেকে বহু ঝামেলায় মহেশের নম্বর জোগাড় করে ফোন করল সোজাসুজি—এই এক রাজসাক্ষী ৷ কিন্তু প্রদোষের ওই, ‘তুমি তো ছিলে আমার সঙ্গে আগাগোড়া,’ ‘তুমি তো দেখেছ সচক্ষে,’ তুমিই তো প্রথমে দেখেছিলে বোর্ডটা,’ ইত্যাদি ক্রমাগত জিজ্ঞাসাবাদে ভয় পেয়ে সে বলল—‘‘কেন স্যার, কী হয়েছে, তবে আমি তো বোনের বিয়েতে ধারওয়ার এসেছি—আমাকে কিছুতে জড়াবেন না স্যার ৷ এমনিতেই জেরবার ঝামেলায়—ছুটিতে আছি স্যার... ৷’’—হল ৷
তবে মন দুর্বল হয়ে গেলে যা হয় আর কী ৷ মনের ভার লাঘব করতে, নিজস্ব দ্বন্দ-টন্দ নিয়ে যেখানে সেখানে পসরা সাজিয়ে আলোচনা করতে বসে যায় ৷ সেরকমই এক বয়স্ক প্রতিবেশীকেও খুব সমঝদার বিচক্ষণ ভেবে, কথা প্রসঙ্গে এবং বলাই বাহুল্য অমুক-তমুকের নাম দিয়ে, নিজের আনসলভড প্রবলেমের ঘটনাটি জানিয়ে দিল ৷ এবং তিনি তাতে যা ব্যাখ্যা দিলেন, তারপরই স্থির সিদ্ধান্তে এল যে, এ সম্পর্কে আর কোনও আলোচনা নিষ্প্রয়োজন ৷ কারণ, তিনি বললেন, বেবীমাসি নাকি টের পেয়েছিলেন তার শেষ সময় দোরগোড়ায় ৷ তিনি তাঁর এতকালের একান্ত মনোবাঞ্ছাটি, তাঁর স্নেহের প্রিয় পাত্রটিকে একবারের জন্য প্রত্যক্ষ করিয়ে দিয়েছেন—এমনটি নাকি হয় ৷ পবিত্র আত্মার অণু-পরমাণু কোথায় যেন নিবদ্ধ করে, কী কী যে ক্ষমতার বলে, ইত্যাদি ৷ তা, সে যাই হোক, লৌকিক-অলৌলিক সব ব্যাখায় জ্ঞানলাভের পরে মনে হল—ঢের হয়েছে ৷ কাজকর্মে ঢুকে গেলে ওসব হেঁয়ালিও আপনা থেকে উবে যাবে ৷
আবার মাঝে মাঝে হঠাৎ করে মনে পড়েও যায় ৷ তা, এরকমই এক মুহূর্তে হঠাৎ মনে হল, এত উৎকন্ঠার মধ্যে না থেকে, ফের একবার দেখে এলেই তো হয়! এবারও কালিকট থেকে না হয় গাড়ি নিয়ে ফিরবে মাইসোর? কেউ সঙ্গে রইল তো ভালো, না হলেও ক্ষতি নেই, একাই যাবে!
বড়ো রাস্তার ধারে যেখানে লতা-পাতায় ঢাকা পুরোনো বোর্ডটা ছিল, সেখানে যখন প্রদোষ পৌঁছালো—বেলা তখন প্রায় এগারোটা হবে ৷ আকাশ পরিষ্কার, বৃষ্টি নেই, রোদও অপেক্ষাকৃত নরম ৷ সেখান থেকে গন্তব্য সামান্যই পথ ৷ তবু পায়ে না হেঁটে, প্রদোষ গাড়িটা ডানদিকের কাঁচা রাস্তায় ঘুরিয়ে নিল যেমনটা নিয়েছিল সেবার এবং তা নিতেই প্রথম খটকা ৷ আগেরবার ঠিক এমন জায়গাটাতেই বড়ো সড়ো, রঙিন নতুন একটা সাইনবোর্ড দেখেছিল—সেটি নেই ৷ তৎসহ কাঁচা মসৃণ রাস্তার বদলে বহুকালের অব্যবহৃত, ভাঙা, এবড়ো-খেবড়ো পথ ৷ সে পথে মাঝে মধ্যে এত বড়ো বড়ো ঝোপ-ঝাড় গজিয়ে গিয়েছে যে গত কুড়ি দিনে তো দূরের কথা, বিশ বছরেও গাড়ি চলেছে কিনা সন্দেহ ৷ কোথাও কোথাও ওপরের বড়ো বড়ো পাথর গড়িয়ে নেমে এসেছে, কোথাও আবার রাস্তার ধার ভেঙে গড়িয়ে গিয়েছে খাদানে ৷ কম বেশি এমনটাও যে হবার সম্ভব না থাকতে পারে, এ বিষয়ে প্রদোষ যেন পুরোপুরি না হলেও, সামান্য তৈরিই ছিল ৷ কারণ এতদিন ধরে, এত লোকের থেকে, এত রকম শুনেছে তো, ফলে দ্বন্দ্ব বা অনিশ্চয়তা ঘুরছিলই মাথায় ৷ আর তা নাহলে তো গোড়াতে সন্দেহ হতেই ও পথে আর পা-ই বাড়াত না, অর্থাৎ গাড়িই ঢোকাত না মোটে ৷ ফলে স্থির মস্তিষ্কে শেষ না দেখে ছাড়ব না গোছের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে, একটু কসরত করে এগিয়ে গেল সামান্য তফাতে চওড়া চাতালের দিকে ৷ সেখানেই গাড়িটা রেখে হেঁটে যাবে সামনে, যেমনটা সেবারেও রেখেছিল—তেমনটাই ৷
খোওয়া-ওঠা পরিত্যক্ত শূন্য চাতাল থেকে সোজা এগিয়ে বাঁক ঘুরতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রদোষ ৷ নীল আকাশ, স্বচ্ছ বাতাস চারিদিকে ঘন সবুজ ঢেউয়ের মতন ছড়িয়ে আছে পাহাড়ি বনতল ৷ তার মাঝে রাস্তার শেষে, ভাঙা কালো, দরজা-জানলা, চালবিহীন একটা ভয়ংকর ধ্বংসস্তূপ ৷ খাবলা-খাবলা সিমেন্ট ওঠা, ইটভাঙা ধাপকাটা সিঁড়ি আছে উঠবার, তারপরেই কালো গহ্বরের মতন হাঁ-করা বারান্দার প্রবেশ পথ ৷ তাতে ছাত আছে, তবে দু’পাশের পোড়া, কালো দেয়াল দেওয়া ‘মেল’ আর ‘ফিমেল’ ওয়ার্ডের ওপরে একেবারে খোলা ঝলমলে শরতের আকাশ ৷ ওই ভয়ংকর কদর্য অভিশপ্ত ধ্বংসস্তূপের থেকে, সেই উদার-উন্মুক্ত আকাশটাও কেমন যেন ভয়ানক পরিহাসের ঠেকছে—প্রদোষ সে দৃশ্য দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল ৷ এই বারান্দার শেষ প্রান্ত থেকে, যেখানে একতলার সিঁড়ি নেমে গিয়েছিল, সেটিকে মনে হচ্ছে পাতালের দ্বার—অন্ধকার, গুমোট, আগাছায় ভরা, ঘন কালো আলকাতরার মতন ৷
প্রদোষ ফিরেই আসছিল, সহসা কী মনে হতে মোবাইল থেকে ফ্লাশ লাইটটা ফেলল সিঁড়ির নীচের দিকে—কিছুই দেখা গেল না, যাবার কথাও নয় ৷ সিঁড়িতে কী-ই বা থাকবে... ৷ কিন্তু..., কিন্তু... এমন নিঃস্তব্ধ থমথমে, জমাট নিঃশব্দ এলাকায় যেখানে একটা পাখি বা পোকার ডাকও নেই, এমনকি পাতাও বুঝি হাওয়ায় সামান্যতমও শব্দ করে দুলছে না—হঠাৎ যেন কিছুর শব্দ শুনল প্রদোষ ৷ শব্দ মানে আওয়াজ..., এবং সে ধাতব নয় জান্তব... ৷ প্রথমে ঠিক বুঝতে পারছিল না এ কেমন ডাক! কুকুর থাকে নাকি? বাচ্চা দিয়েছে? কিন্তু এদিকে তো ত্রিসীমানার মধ্যেও জনবসতির ‘চিহ্নমাত্র নেই, কুকুর বেড়াল আসবেটা কোথা থেকে! যেমন ঘন জঙ্গল এদিকটায়, অন্য কোনও জন্তু হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়—প্রদোষ তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়িয়ে পা চালাল, আর সঙ্গে সঙ্গেই সেই শব্দটা এবার বেশ স্পষ্ট হয়ে কানে গেল ৷ চাপা গোঙানি, তার সাথে দমচাপা নিঃশ্বাস, কঁকিয়ে-কঁকিয়ে কাঁদছে..., একজন না, তার বেশি... ৷ এ তো জন্তু নয়, এ তো...!
প্রদোষ বিহ্বল হয়ে প্রায় ছুটতে লাগল বাইরের দিকে ৷ ততক্ষণে সামান্যই, তবে অদ্ভুত এক হালকা ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছিল চারিদিক ৷ প্রায় নিভে আসা আগুন থেকে যেমন পাক খেয়ে খেয়ে অল্প অল্প ধোঁয়া বেরুতে থাকে, তেমনই ধোঁয়া ধিকি ধিকি করে ছড়িয়ে পড়ছিল একদিক থেকে অন্য দিকে..., তার সঙ্গে উৎকট, পোড়া কটু গন্ধ—গা গুলিয়ে বমি পাচ্ছিল তার ৷
প্রায় টলতে টলতে কোনওক্রমে বাইরে এসে প্রথমেই বড়ো করে নিশ্বাস নিল প্রদোষ—আহ ৷ ওই কদর্য দুর্গন্ধ আর ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মরেই যাচ্ছিল সে—সত্যিই মরে যাচ্ছিল ৷ এদিকে কিচ্ছুটি নেই ৷ না ওই ভয়াবহ চাপা আর্তনাদ, না ওই কুৎসিত গন্ধ ৷ কেমন চমৎকার সুন্দর অমলিন চারিদিক, তার মধ্যে বাঁ-দিকে কেবল চালছাড়া খান কতক ভাঙা কটেজ বে-আব্রু পড়ে আছে ৷
ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে, শ্রান্ত ভারী পা-টা কোনও মতে টেনে টেনে সামান্য এগুতেই কেউ যেন প্রায় তার পিঠ ছুঁয়েই একটু কাশল—কথা শুরু করবার আগে যেমন ভাবে গলাটা একবার পরিষ্কার করে নেয় অস্বস্তিতে, অনেকটা সে ধরনেরই বলা যায় ৷ প্রদোষ হঠাৎ এমন চমকে গিয়েছিল, মনে হল তার হৃৎদপিণ্ডটা বুঝি বন্ধই হয়ে গেল—আর সেটা কোনওমতে সামলে নিতেই পিঠ বেয়ে অদ্ভুত এক হিম স্রোত বয়ে যেতে লাগল, চোখ ঝাপসা... ৷ সে অবস্থাতেই ঘাড়ের কাছে গম্ভীর অথচ ফ্যাসফ্যাসে অস্বাভাবিক স্বরে, খুব ধী-রে কেউ প্রশ্ন করল—‘‘হ্যালো...? হ্যালো ইয়ংম্যান, এদিকে কোথায় অ্যাঁ...? হসপিটালে? দেখাতে এসেছ, নাকি দেখতে... হা-হা-হা ৷’’
প্রদোষের পা দুটো সম্পূর্ণ যেন গেঁথে গিয়েছিল ওই ভাঙা রাস্তার সাথে ৷ নড়াচড়া তো দূরের কথা, ঘাড়টাও ঘোরাতে পারছিল না এক ইঞ্চিও ৷ গোটা শরীরটা যেন বরফে তৈরি ঠান্ডা..., শক্ত... ৷ তারই মধ্যে কীভাবে যেন বিড়বিড় করে বলল—‘‘ফা-দা-র-থা-ম-পি-ই...!’’ কথাটা তৎক্ষণাৎ একেবারে লুফে নিল ফাদার—‘‘ইয়েস ৷ ইউ আর রাইট ৷ হা-হা-হা’’—লম্বা সাদা জামাটা দুলিয়ে দুলিয়ে, খোবলানো, ফাটা, আগাছায় ভরা সিঁড়ি দিয়ে গটগটিয়ে উঠে, ভাঙা পোড়া অন্ধকার প্রবেশদ্বারের ভেতর দিয়ে, বারান্দার শেষ প্রান্তের সেই আলকাতরা মাখানো ঘন, কালো জমাট বাঁধা গহ্বরের ভেতর নেমে গেলেন ৷
রচনাকাল ২০১৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন