প্রশান্তকুমারের প্রতিশ্রুতি

মিমি রাধাকৃষ্ণন

ড্রাইভওয়ে থেকেই একটু গলা চড়িয়ে বিদিশা বলল—‘‘সুধীর? ছোটেলালকে জিজ্ঞেস করো তো, কখন স্টেশন যাবে? সাহেবের দাদা আসছেন তো আজ ৷ আমি পেছনের বারান্দায় আছি, কেমন?’’ কথাটা শেষ করে চারদিকে একবার চোখ বোলাল বিদিশা ৷ ভেতর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কুয়াশা, কিন্তু এ ঝিরিঝিরি হালকা বৃষ্টিই ৷ বাংলায় যাকে বলে ইলশেগুড়ি, এ যেন তারও ছোটো ভাই, খোসা ইলশেগুড়ি ৷ এতে চুপচুপে ভেজা না হলেও, গা-হাত-পা স্যাঁতসেঁতে হয়ে নেতিয়ে যায়—যা বিদিশার একেবারে অসহ্য! তায় আবার ওর গলাব্যথার ধাত ৷ এ বছর বর্ষা তো মনে হয় শেষই হবে না—কী যে অলুক্ষুনে বৃষ্টিতে ধরল... ৷ এমন বিটকেল সময়ে হাতের হাজার কাজ শিকেয় তুলে শখ করে কেউ আসে এখানে? তবুও একরকম প্রায় বাধ্য হয়েই অন্যের শখ মেটাতে, বা বলা যায় আবদার রাখতেই, গতকাল এই ঝুম বৃষ্টি মাথায় করে এসে পৌঁছেছে এখানে, এই পিপলিপুরার পারিজাত বাংলোয় ৷ বলাই বাহুল্য, এটি তাদের বসতবাড়ি নয়, নেহাতই ছুটি কাটাবার ডেরা ৷

তবে এ ক্ষেত্রে ছুটি তার মোটেও ছিল না, বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তবে জোগাড় করতে হয়েছে, এবং আপাতত সেটি কোনওমতে কাটিয়ে উঠতে পারলেই বাঁচোয়া ৷

আসলে বছর পাঁচেক আগে, বিদিশার স্বামী রঞ্জন, অফিসের কোনও একটা কনফারেন্সে এদিকে এসে, সহসা অতিরিক্ত বিমোহিত হয়ে কথাচ্ছলে সামান্য বোধহয় ইচ্ছা প্রকাশ করে—এদিকে যদি... ৷ এবং মজার কথা হচ্ছে, ওই প্রথম দিনই ম্যানেজারমশাইও গল্পচ্ছলে জানিয়ে দিলেন যে, এই দেড়-দু’ মাইলের মধ্যেই গ্রামের বাস্তুজমি কিনে এক ডেভেলপার পাঁচিল ঘিরে চমৎকার ক’টি যেন বাংলো বানিয়েছেন—যার মধ্যে একটি এখনও আইবুড়ো বসে আছে—তা একেবারে পাকা খবর ৷ সুতরাং পরদিনই ফুরসত হতে, তা দেখতে গিয়ে তো রঞ্জন সম্পূর্ণ আত্মহারা হয়ে কেবল পাকা কথাই নয়, রীতিমতন আশীর্বাদ সেরেই ফিরে এল ৷ আর সেই থেকে পিপলিপুরা হল গিয়ে তাদের আরাম-বিরামের শৌখিন আস্তানা ৷

সত্যি, স্থানটি বড়োই মনোরম ৷ তবে দূরত্বও তো কম নয় ৷ কাছাকাছি এয়ারপোর্ট বলতে—ব্যাঙ্গালোর ৷ সেখান থেকেও আবার আড়াই ঘণ্টার পথ ৷ এতখানি হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কি আর ঘন ঘন আসা যায়? তবু নিয়ম করে পনেরো-বিশ দিনের জন্য স-পরিবারে এখনও পর্যন্ত আসে অন্তত শীতের ছুটিতে ৷ সে সময় ছেলেমেয়েদের বন্ধুরাও আসে—দু’-চার দিন থেকে হয়তো বা গোয়া যায়, নয়তো হাম্পি অথবা বান্দিপুর... ৷ রঞ্জন তাদের সঙ্গ ধরে না, তবে এত ফাঁকা নিরিবিলিও বোধ করি বেশি দিন তার সহ্য হয় না ৷ সন্ধে থেকে ঝিঁঝির ডাক আর হুক্কাহুয়া... ৷ ফলে ফের লোকজনকে ডাকতেই থাকে—চেনাজানা, আধা চেনা, প্রায় অচেনা... ৷ কতরকম লোভও দেখায়—‘এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসব’ ‘ঝরনার ধারে লাঞ্চ,’ ‘সন্ধেবেলায় বিয়ারের সঙ্গে নদীর ছোটো, টাটকা মাছ ভাজা’... ৷

শুনতে তো খুবই ভালো, এলে পরে আরওই ভালো, তবে ক’জনই বা পারে সেটা বাস্তবে করে দেখাতে? তবু মাঝে, মাঝেই আড্ডার মধ্যে কথা ওঠে—‘এবার পুজোয় চলো তোমাদের পিপলিপুরা’, নয়তো ‘বড়োদিনে’, অথবা ‘হোলিতে’... ৷ শেষমেশ তাদেরও হয়তো মেয়ে ফেরে সিঙ্গাপুর থেকে, ছেলের বিয়ের রিসেপশন হয়, নয়তো মায়ের হাঁটুর রিপ্লেসমেন্ট—প্ল্যানটা পিছিয়ে যায়... ৷ গত পাঁচ বছর ধরে যেমনটা হচ্ছিল রঞ্জনের এই দাদা প্রশান্ত সমাদ্দারেরও ৷

গরম কফি হাতে নিয়ে এসবই সাত-পাঁচ ভাবছিল বিদিশা, ভালোই লাগছিল ৷ তবে, আর কতক্ষণ লাগবে তা বলা যায় না ৷ কারণ সেই যে গতকাল ছাতা মাথায় দিয়ে, গা-পিঠ বাঁচিয়ে কোনওক্রমে হুড়মুড়িয়ে বাংলোয় এসে ঢুকেছে, সেই থেকে তারই ভেতর কেবল ঘুরপাক ৷ এ জানলা থেকে ও জানলা, নয়তো ভাগ্য বেজায় সুপ্রসন্ন হলে বারান্দা পর্যন্ত—ব্যাস ৷ তারপর এই যে সুধীর, সে-ও তো ভ্যানিশ, পুনের ট্রেন কী যেন নাম, সমঝোতা না আজাদ হিন্দ—সে যে ছাই কখন লোন্ডাগাঁও এসে পৌঁছুবে..., জানাবে তো একবার...! অসুস্থ, বয়স্ক, একলা মানুষ... ৷

আজ যিনি আসছেন, এই প্রশান্ত সমাদ্দার, ইনি হলেন রঞ্জনদের পিসতুতো দাদা ৷ বলতে গেলে পিসির ছেলে, আদতে নিজের দাদার থেকে কম কিছু না ৷ ওদের পিসেমশাই ছিলেন বড়ো নিষ্ঠুর, ক্রুর প্রকৃতির, তৎসহ অসৎ অমানুষও বলা যায় ৷ তদুপরি পিসিও ছিলেন অদ্ভুত ৷ ছেলেপুলেদের নজরই দিতেন না—স্বামীর ওপর ঘৃণা ছিল, সংসারে বিতৃষ্ণা ৷ ফলে দাদামণিরা চার ভাইবোন, মামাবাড়িতেই থাকত বেশি, অর্থাৎ বিদিশার শ্বশুরবাড়িতে ৷ বড়ো বাড়ি, বেশি বেশি লোকজন, তার মধ্যেও কেউ কেউ তো কারও বেশি বেশি প্রিয় মানুষ হয় ৷ তেমনই হয়েছিল এ ক্ষেত্রেও ৷ এই পিসতুতো দাদাটি চারদিকের বাঁদর-হনুমান মারকুটে আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে, এই একাচোরা, নির্বিবাদী ছোটো ভাই রঞ্জনকে কী যে ভালোবাসতেন ৷ সারাক্ষণ চোখে হারাতেন একেবারে ৷ তা, সেই স্নেহপর্ব যদিও রঞ্জনের নিতান্তই শিশু বা বালককালের কথা, কারণ বয়সের তাদের তফাত ছিল বেশ... ৷ বোধহয় বছর আটেকের ৷ ফলে ছোটো ভাই একটু বড়ো হতে না হতে, তিনি ততদিনে চাকরি নিয়ে দেশান্তরী ৷ বাড়িতে আর তেমন দেখাসাক্ষাৎ তো ছিল না, কিন্তু পরে, রঞ্জন যখন হস্টেলে, সে সময় সহসা মনে পড়লেই, তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করতেন ৷ সে তো আর সেলফোনের যুগ নয়—ফোন মানেই ট্রাংকল ৷ তাতেও তো আবার আদ্দেক সময় কাজই হত না ৷ হয় লাইন খারাপ, নয়তো খুঁজে-পেতে ডেকে আনবার দায়িত্বে কেউ নেই ৷ সে কারণে উনি ট্রেনে চেপে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে হস্টেলেই হাজির হতেন ৷ এবং সেই হাজিরার সময়ও হত পুরোপুরি অসময়—হয় কাকভোর, না হলে গভীর রাত ৷ তখন নাকি হুলুস্থুলু পড়ে যেত ৷ চৌকিদার দরজা খুলবে না কিছুতেই, উনিও মরিয়া হয়ে ওয়ার্ডেনকে ডাকাডাকি করছেন—ছেলেরা ঘুম ভেঙে গালি দিচ্ছে... ৷ এ হয়তো বার তিনেকের ঘটনা, তবু বারবার তো! ফলে, রঞ্জনও লজ্জায়-বিরক্তিতে একেবারে একশেষ হয়ে থাকত ৷ এ সবই বিদিশার শোনা কথা ৷ কথায় কথায় শুনেছে হয়তো বিয়ের আগে, অথবা গল্পের ছলে মশকরা করে এর-তার কাছে ৷ অথচ যার জন্য এত কাণ্ড, সেই আদরের ছোটো ভাইটি অর্থাৎ রঞ্জন, তার কিন্তু এই দাদার প্রতি তে-ম-ন টান তো দূরের কথা, স্বাভাবিক একটা যে ভালোবাসা, তাও যেন ছিল না বললেই হয় ৷ এ কথা স্বভাবতই মুখে বলতে হয় না, বিস্তর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে টের পাওয়া যায় বেশ ৷ বিদিশার অবাক লাগত ৷ তেমন পছন্দের না হতে পারে, কিন্তু যে এত ভালোবাসে—অন্ধ ভালোবাসা... কী জানি, এমনটা কেন হয়... ৷

এই প্রশান্ত ছিলেন তাঁদের গোটা পরিবারের সর্বাপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ সন্তান ৷ কনিষ্ঠদের তাঁকে আদর করে ডাকতে শেখানো হয়েছিল ‘দাদামণি’ ৷ ওই ডাকটা চিরকালই সবাই বাধ্য হয়ে ডেকে গেছে বটে, কিন্তু যত্ন সহকারে আদরটি বাদ দিয়ে ৷

চেহারাটা একটু অন্যরকম ছিল—কোঁচকানো ঝাঁকড়া চুল, চওড়া চোয়াল, পুরু ঠোঁট, ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ, খর্বকায়—বাঙালি না হয়ে উগান্ডার বাসিন্দা হলেই তাঁকে যেন মানাত ভালো ৷ চোখে-মুখে বুদ্ধির ছাপ ছিল না, মগজের পরিমাণ নিশ্চয়ই আরও কম ৷ কিন্তু মজা করে কথা বলতেন দারুণ ৷ নিজেকে নিয়ে মশকরা, আশপাশের মানুষজনকে নিয়ে কৌতুক, এমনকি সে রঙ্গতামাশা থেকে আকাশ-বাতাস, পশুপাখিও বাদ যেত না যেন ৷ ফেল করতে করতে কোনওক্রমে স্কুলটুকু ডিঙিয়ে বাবার ভয়ে সেই যে বাড়ি থেকে পালিয়ে আর্মিতে ঢুকেছিলেন—সেই থেকে চিরকালই ঘরছাড়া ৷ তা, ঘর ছেড়ে তো কত লোকেই থাকে, কিন্তু দাদামণির জীবনটা যেন কেমন ছন্নছাড়া, বেয়াড়া হয়ে গেল ৷ একে তো ওই অল্প বয়স থেকে কো-ন সব অজ জায়গায় দিন কাটানো—গহন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়, ধু ধু মরুভূমি—তায় ভোর থেকে কুচকাওয়াজ আর বন্দুক ছোড়া, বিকেল হলে হাবিজাবি সিনেমার সামনে বসে মদের আসর—এ কি কোনও জীবন!

এ সময়ই কাউকে না জানিয়ে আর্মি হসপিটালের এক নার্সকে বিয়ে করেছিলেন পছন্দ করে, হয়তো জাতপাতের অমিল ছিল বা আরও অন্য কিছু ৷ পিতৃদেবকে তো জানতেন, ফলে কে আর সাধ করে লাঠিপেটা খেতে চায় ৷ এর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই কী কারণে যেন মেয়েটি মারা যায় আর সে সময় তিনি এমনই মদে ডুবে গেলেন যে চাকরিটিই যায় যায়... ৷ খবর পেয়ে পিসেমশাই তাঁকে ঘাড় ধরে টেনে এনে তৎক্ষণাৎ নিজেদের পছন্দসই এক কন্যা জোগাড় করে হুড়মুড়িয়ে বিয়ে দিয়ে দেন ৷ সে বউকে দেখেছে বিদিশা ৷ বদরাগি, মুখরা, পুরুষালি চেহারা ৷ বনমানুষের মতন অস্বাভাবিক লম্বা লম্বা লোমশ হাত, কুঁতকুঁতে ফ্যাকাশে দুটো চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি—এমন মেয়েকে দেখে-শুনে পছন্দ করে কেউ বউমা করে আনতে পারে? যা হোক, সে বউদি বাপের বাড়িতেই থাকত দু’টি ছেলেকে নিয়ে, আর দাদামণি ঘুরে বেড়াতেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বদলি হয়ে ৷ শেষমেশ অবসর নিয়ে পুনের কাছে বাড়ি করেন, তখন থেকে বাপের বাড়ির পাট তুলে, দুই পুত্র সমেত বউদিও সেখানের স্থায়ী বাসিন্দা ৷ তারা চাকরিবাকরি করে, অথবা ব্যাবসাপত্তর ৷ বিয়ে শাদি করে, থাকে সবাই একসঙ্গে... ৷

এতটা পর্যন্ত বলতে গেলে তো মোটামুটি ঠিকঠাকই, তবে দাদামণি কিন্তু সেই ছোটোবেলাকার মতনই বেঠিক রয়ে গেলেন চিরটা কাল ৷ টাকাপয়সার অসুবিধে নেই, সাধারণ অর্থে সেবাযত্ন যাকে বলে, তা-ও বোধ করি জুটে যায়, তবে..., তবে, বড়ো দুর্ভাগ্য মানুষটার—অভাগা যাকে বলে, তা-ই... ৷ নয়তো এমনটা কেন হবে? শরীর মানে রোগের ডিপো ৷ ব্লাড সুগার, হাই ব্লাড প্রেশার, থাইরয়েড, কিডনিতে যেন কী, লিভারে তো প্রচুর কিছু ৷ হার্ট, লাংস দুটোই বেয়াড়া অবাধ্য ৷ তারই মধ্যে গোটা দিন ধরে মদ্যপান, অন্য গুণও আছে পুরো মাত্রায় ৷ ফলে, মাঝেমধ্যে পোষা নেড়ি কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে বেপাত্তাই হয়ে যান কাউকে না জানিয়ে ৷ আবার ফিরেও আসেন যেন কীসের টানে ৷ ছেলেপুলেরা মাথা ঘামায় না, এমনকি স্ত্রী-ও না ৷ ওই, আছে তো আছে—এই পর্যন্ত ৷ বাকি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক নামমাত্র ৷ মাঝেমধ্যে নম্বর মিলিয়ে নাকি ফোন করেন একে- তাকে, তৎসহ অবশ্যই রঞ্জনকেও ৷ অন্যদেরটা বলতে পারবে না, তবে ভাইয়ের জবাবটা তো শোনে বিদিশা এপার থেকে! ‘হুঁ’, ‘হাঁ’, আর ‘ঠিক আছে’ ছাড়া কিছুই তো কানে যায় না আর..., হায় রে... ৷ একেকটা মানুষের জন্মই হয় বুঝি বা অবহেলা পাবার জন্য ৷ তা সে ইচ্ছাকৃতই হোক বা অনিচ্ছাকৃত... ৷

তবে এই চারদিকের অনাদর-অবহেলা খানিকটা হলেও বোধহয় পুষিয়ে দিয়েছে বিদিশা ৷ সে অর্থে পরিচয় খুবই কম ৷ কেবল লোকমুখে বার্তা আর কানাঘুষোটুকুই বলা যায় সম্বল ৷ কিন্তু ওই যে গল্প শুনেছে ছোটো বেলাকার, তারপর বাকিটাও বোধ করি বুঝে নিয়েছে নিজের থেকেই ৷ সেই সূত্র ধরেই—ঠিক ভালোবাসা নয়, আর ভালোলাগা বা শ্রদ্ধা-ভক্তির তো প্রশ্নই ওঠে না, তবুও অদ্ভুত এক মায়া তৈরি হয়েছে তাঁর প্রতি ৷ অথবা বলতে খারাপ লাগলেও বলা যায় দয়াই ৷ ন’মাসে, ছ’মাসে নিজেই ফোন করে বিদিশা, হেসে হেসে গল্প করে, অনেক শোনায়, অনেক কথা শোনেও মন দিয়ে... ৷ রঞ্জনদের পরিবারের ব্রাত্যজন এই দাদামণি দুনিয়াতে ভালোবাসেন বোধ করি সবাইকেই, নিশ্চয়ই শ্রদ্ধা-ভক্তি তদুপরি প্রেমও করেন জনে জনে—তবে স্মরণ করেন একমাত্র বিদিশাকে—সে বিষয়ে কেবল সে-ই নয়, সবাই নিশ্চিন্ত ৷ এ নিয়ে হাসিঠাট্টাও চলে সবার মধ্যে ৷ তবে কথাটা কিন্তু একশো ভাগ সত্যি, কী-ই যে ভালোবাসেন উনি এই ভ্রাতৃবধূকে, তা বলবার নয় ৷ এ জন্য কিন্তু ফোন করেন না, অসময়ে উড়ে পুড়ে এসে হাজির হওয়া তো দূরেরই কথা, তবু সে টের পায় তাঁর স্নেহের আতিশয্য, যেমনটা বহুদিন আগে সবাই জানত রঞ্জনের ক্ষেত্রেও ৷

তা, সব আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের মতন এই দাদামণিও পিপলিপুরা আসবার জন্য প্ল্যান কষেছেন গত পাঁচ বছর ধরে ৷ কারণ বিদিশাই বোধ করি কথার ছলে কখনও বলেছিল, ‘‘চমৎকার জায়গা, আসুন না একবার, আমরা যখন থাকব ওখানে...?’’

তখনও বোধহয় চাকরি ছিল, বলেছিলেন—এলটিসি নিয়ে আসবেন প্লেনে চেপে ৷ যাবার জায়গা নেই বলে, ওসব বেনিফিট সব জলে যায় ৷ তারপর শুনল অবসর নিয়েছেন ৷ তখন বললেন, দরকার নেই ওসবের ৷ পুনে থেকে সোজা ট্রেন ৷ খবর নিয়েছেন—আসছেন এইবার ৷ এরকম করেই চলছিল আর কী এতদিন—হঠাৎ শুনল, খুব বেশি অসুস্থ, আর্মি হাসপাতালে আছেন, অবস্থা ভালো নয়, অত্যন্ত সংকটজনক ৷ দু’চার দিন ফোন-টোন করল অনেকে—বড়ো পরিবারে এদিক-ওদিকে লোকজনের তো অভাব নেই ৷ একবার একটু ভালো হয়ে বাড়ি ফিরছেন, আবার অবনতি—হাসপাতাল ৷ রঞ্জনের এক দিদি বলল—‘‘আর্মি হাসপাতাল বলে টানাহ্যাঁচড়া করছে বারবার, নয়তো কেউ করে? লিভারটি গেছে, লাংসে জল, হার্টটা কেবল ধুকপুক করে, আর তা-ই নিয়েই ছাড়া পেয়ে মদে ডুবে বসে—ছেলে দুটোর ধৈর্য আছে বলতে হবে...’’

বিদিশা তখন ঘন ঘন খবর নিত ছেলেদের থেকেই... ৷ গত মাসে হঠাৎ সে ফোন ধরলেন দাদামণিই ৷ সে কী-ই খুশি ৷ বললেন, তার গলার স্বরটা শোনবার জন্যই নাকি মরণদোর থেকে ফিরে এসেছেন এবার ৷ আবেগে কাঁপা-কাঁপা শোনাচ্ছিল কথাগুলো, তা বাদে দুর্বলও তো তখন ৷ যদিও বললেন একদম ভালো আছেন ৷ সবাই বলেছে, বিদিশা যে ফোন করে নিয়মিত খবর নিয়েছে, সে কারণে নাকি এখন ফোনের ধারেই বসে থাকেন গোটা দিন ৷ বিদিশাও এ কথা শুনে আপ্লুত ৷ বলল—‘‘ভালো তো হতেই হবে ৷ আর একদম ভালো হয়ে পিপলিপুরা আসতে হবে না? কথা দিয়েছিলেন যে?’’

এ সমস্তই কথার কথা ৷ অসুস্থ মানুষকে ভরসা দেবার নানান বাক্য যেমন অহরহই বলে থাকে সবাই... ৷ তবে প্রশান্ত সমাদ্দার লুফে নিলেন কথাটা, বললেন—‘‘মনে আছে, মনে আছে সব ৷ দেখো, আমি এই আশাতেই ভালো হয়ে যাব—দেখো তুমি ৷ মানুষের বাঁচার জন্য কোনও আশা দরকার, বুঝলে ছোটো, হোপ ৷ তুমি আমাকে ডেকেছিলে, সে আমি ভুলে যাব? আর-একটু ভালো হয়েই জানাব, বুঝলে? আসব, এখান থেকে রাতে চাপব ট্রেনে...’’ ইত্যাদি বলে-টলে সে দিনের মতন কথোপকথন শেষ ৷ রাতে রঞ্জনকে বলল বিদিশা ৷ ওর সাধারণ আমন্ত্রণ বিনিময়কে তেমন গুরুত্ব না দিলেও, একটু হুঁশিয়ার করতেও ছাড়ল না অবশ্য ৷ বলল—‘ওকে চেনো না তুমি, খ্যাপাটে মানুষ, এই শরীরে যদি রওনা দেয়! মার্ডার কেসে পড়বে ৷’’ বিদিশাও চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল—‘‘কী যে বলো, গলা যদি শুনতে—দুর্বল... ৷’’ ব্যাস, সে দিনের পর্ব মোটামুটি এখানেই শেষ ৷

মাসখানেক আগে, সে দিন সেপ্টেম্বরের পয়লা বা দোসরা, ঠিক মনে নেই—অকস্মাৎ ফোন ৷ অচেনা নম্বরে অন্যমনস্কভাবেই বলল—‘‘হ্যালো?’’

‘‘ছোটো, আমি পুনে থেকে বলছি ৷’’

‘‘দাদামণি?’’

বিদিশা অবাক হয়ে গেল—একে তো জীবনে এই প্রথমবার নিজে থেকে ফোন করলেন তাকে ৷ দ্বিতীয়ত, গলার স্বর চমৎকার সতেজ, যেমনটা জীবনে আজ পর্যন্ত কদাচ শোনেনি ও! দশ-পনেরো-বিশ বছর আগেও যা অভিজ্ঞতা—হয় মদ্যপানের পর হালকা জড়ানো, নয় ডিপ্রেশনে বেশি আবেগ মাখানো, তা নয়তো নিজেরই কোনও কৃতকর্মের গ্লানিতে জড়োসড়ো—সে যা-ই হোক, মোট কথা, সে দিন বেশ খানিকক্ষণ কথা হবার পর বৃত্তান্ত যা দাঁড়াল—শরীর শুধু একেবারে নয়, অতিরিক্তই সুস্থ-সবল ৷ ফলে তিনি আসছেন ৷ সামনের মাসের তিন তারিখের টিকিট কিনেই রেখেছেন—পুনে থেকে মন্ডিগাঁও ৷ আজাদ হিন্দ না ঝিন্দের বন্দি, কী যেন একটা সুপারফাস্ট ট্রেন—যেটা যায় ম্যাঙ্গালোর ৷ রিটার্নও হয়ে গেছে—সাত তারিখ ৷ বিদিশার কথা ভেবেই এই সময় রেখেছেন—গান্ধীজয়ন্তী, শনি-রবি, সঙ্গে বকরি-ইদ ৷ এর পর থেকে আনন্দে নাকি তাঁর খিদে বেড়ে গেছে, ঘুম চলে গেছে—এখন থেকেই জিনিসপত্তর গুছোতে লেগেছেন—নয়তো কোনটা কখন ভুলে যান কে জানে..., বিশেষ করে একটা জিনিস যা দেখে বিদিশারা সবাই অবাক হয়ে যাবে ৷ খুব বেশি দিন তো অবশ্য নেইও—মাত্র একটা মাস—দু’ তারিখ রাতে চাপছেন, তিন তারিখ ভোর সকালে ইত্যাদি... ৷

বিদিশা হাসছিল এপার থেকে তাঁর সরলতা দেখে ৷ ছেলেমানুষের কাণ্ড দেখো ৷ কত সময় কাজের চাপ থাকে বা অন্য অসুবিধে—তারপর বাইরে বাইরেও যেতে হয়, কিছু আলোচনা না করে এমন হুট করে ৷ যা-ই হোক, যথাসময়ে একটা ওপেন টিকিট কেটে রাখল ব্যাঙ্গালোর যাতায়াতের, রঞ্জনও ভদ্রতা করে জানাল সে-ও নাকি চেষ্টা করবে থাকতে ওই সময় ৷

দিন পনেরো পরে বিদিশাই ফোন করে জিজ্ঞেস করল সব ঠিকঠাক আছে কি না ৷ সে দিন ট্রেনের নামটা বললেন, সময়টাও ৷ গাড়ির-ড্রাইভার যদি অপেক্ষা করে, সে তো অতি উত্তম, কিন্তু অত-শত ঝঞ্ঝাট কেন আবার? যা-ই হোক, অবশেষে দেখা হচ্ছে তাহলে ৷ প্রশান্ত সমাদ্দার নেই কথায় ভারী গলায় হাসছিলেন হো হো করে, হাসাচ্ছিলেন তারও বেশি—খুব খুশি ৷

অতঃপর গান্ধীজয়ন্তীর দিন সকালেই বিদিশা চলে এল ব্যাঙ্গালোর ৷ সেখান থেকে দিন সাতেকের সওদা করে সোজা পিপলিপুরা ৷ গোটা রাস্তায় কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! প্রথম দিকে ভালোই লাগছিল ৷ জঙ্গল ছোটো ছোটো ঢিপি পাহাড়, ঘন সবুজ গাছপালার মধ্যে তিরতিরে ঝরনা, আবার একটু লোকালয়, আবার একটু খেতখামার, তারপরই বনভূমি, সঙ্গে বৃষ্টি ৷ কাজ নেই, কর্ম নেই, জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখো, আকাশ-পাতাল চিন্তা করো! চেনা ড্রাইভার ছোটেলাল চালাচ্ছে গাড়ি, বাংলোতে বড়ো বড়ো ছাতা আছে, চৌকিদার গেট খুলে, ছাতা ধরে ঘরে পৌঁছে দেবে—ভাবনা কী?

ভাবনা তখন ছিল না, হচ্ছে এখন ৷ কারণ, ঠিক চার দিন আগে একটা ফোন এল সমাদ্দারবাবুর ৷ বিদিশা যথানিয়মে জানাল, কোনও চিন্তা নেই, সে সময়মতন পৌঁছে যাবে—সব তৈরি... ৷ উত্তরে হরেকরকম শব্দ এল, কথা নয় ৷ বিদিশা ‘হ্যালো হ্যালো’ করল খানিক—‘‘শুনতে পাচ্ছেন-দাদামণি?’’

একটা হালকা ঘড়ঘড়ে শব্দ এল—‘‘পা-চ-ছি..., কেবল, তোমার..., ডাকটাই..., শুনতে পা-চ-ছি ৷ তু-মি, থাকবে তো—ও-খা-নে?’’

‘‘হ্যাঁ, থাকব তো ৷ সে জন্যই তো যাচ্ছি! আপনার ট্রেনের নাম, বোগি নম্বর, সব জানিয়ে দিয়েছি ড্রাইভারকে ৷ থাকবে কামরার সামনে—চিন্তা করবেন না... ৷’’

ওদিক থেকে আর কথা আসছিল না, কেবল কেমন ভোঁস ভোঁস শব্দ—লাইনটা একদম খারাপ ৷ আবার হঠাৎ কথা ফের শোনা গেল—‘‘ছো-টো-ও-ও-ও..., আস-বো..., তুমি... ডা-া-া-া-াক...লে... ৷’’ তারপর আবার সেই ফোঁস ফোঁস, ভোঁস ভোঁস—আচ্ছা মুশকিল! কিছুই কি শুনতে পাচ্ছেন না নাকি? কী যন্ত্রণা! বিদিশা তবু খানিক চেপে রইল রিসিভারটা কানে—কোনও শব্দই নেই—একেবারে নিঃশব্দ..., ধু-উ-র ৷ আর কী যে এক ‘ডাকলে, ডাকলে’, ‘ডাক শুনছি’ করে গেলেন...! আবার মদ্যপান-টান করে বসে নেই তো? পানদোষীদের তো ওই এক ৷ সুখে-দুঃখে, উত্তেজনায়, অবসাদে—সহায় ওই একটিই ৷ তদুপরি মুশকিল হচ্ছে, এ কথা রঞ্জনকে বলাও যাবে না মোটে! বাঁকা হাসি হাসবে, মানেটা হচ্ছে—‘‘বোঝো এবার... ৷’’

পরের দু’দিন চলল নানান তানা-বানায় ৷ ঘরের হাজার কাজ, অফিসেরও গুচ্ছের ৷ শেষে এয়ারপোর্ট যাবার পথে ফোন করল আবার—কোনও শব্দই নেই! আসলে সে দিনই নিশ্চয় যন্ত্রটা আধা বিকল ছিল, অতঃপর পুরোপুরি ‘গন’ ৷ যা-ই হোক, মনে মনে ভেবে নিল, আগে যখন সেল ফোন ছিল না, তখন কি আর মানুষ নড়াচড়া করেনি...?

‘‘দিদি?’’

বিদিশা চটক ভেঙে দেখে, সামনে ছাতা মাথায় সুধীর ৷ কুয়াশা বৃষ্টি থেকে, কখন যে ঝিরিঝিরি হয়ে, শেষে ঝমঝমে শুরু হয়েছে, খেয়ালই ছিল না আর, ক’টা বাজে?

‘‘দিদি, ছোটেলাল খবর নিয়েছে, সব ট্রেন দারুণ লেট, লাইনে জল ঢুকেছে ৷ সময়মতন এলে তো, টাইম ক-খ-ন পেরিয়ে গেছে ৷ বাস-টাসও চলছে না ৷ বাজার সাইড জলে ডোবা, সব ফাঁকা... ৷’’

‘‘তাহলে?’’

‘‘সকালে আসতে পারবে না দিদি, দুপুরের পরে যদি ক্লিয়ার হয়... ৷’’

তা, এসব হল গিয়ে তিন তারিখের কথা, তেসরা অক্টোবর সকাল ৷ সেদিন তো ছোটেলাল এসেও বড়ো সুসংবাদ দিল—যে, এদিকে আসবার সব ট্রেন ক্যানসেল ৷ কোঙ্কণ রেলওয়ের লাইন বন্ধ ধস নেমে ৷ হাওড়া-মারগাঁও জলের তলায়, পুনা-ম্যাঙ্গালোর প্রথমে বলেছিল লেট, তারপর সে-ও বাতিল... ৷

বাঃ, বড়ো আনন্দের কথা ৷ এবার থাকো বসে মাথায় হাত দিয়ে! কারণ অমুক লাইনের মেরামতির কাজ চলছে, তমুক লাইনে এখন তোড়ে জল ঢুকতে শুরু করেছে, কোথায় ছোটো একটা পুল ভেঙেছে, এবং অঝোর ধারা বৃষ্টিরও তো বিরাম নেই ৷ ছোটেলালও সশরীরে এসে এইসব ফিরিস্তির সাতকাহন দিয়ে গেল বটে, তবে বিদিশার সেসব মাথায় ঢুকল না পুরোপুরি ৷ কেবল যেটা বুঝল, তা হল, এখন তার ঘোর বিপদ ৷

সে একা হলে তো চিন্তা ছিল না ৷ বাড়িতে অন্নসংস্থান আছে, মায় ওষুধপত্তর, তা বাদে ফিরে যেতে এখনও দিন পাঁচেক ৷ ততদিনে গাড়িতে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছোনো তেমন কোনও ব্যাপার নয়—একমাত্র বলতে গেলে শুধু ঘরবন্দি থাকা, তা, এটুকু তো মেনে নিতেই হবে! এই অনাসৃষ্টি বৃষ্টি তো কারুর হাতে নেই! কিন্তু চিন্তার আসল কারণ হচ্ছেন—শ্রীপ্রশান্ত সমাদ্দার ৷ তিনি যদি রওনা দিয়ে থাকেন এবং তার সম্ভাবনাই বেশি—তাহলে কোথায় যে আটকে থাকবেন! তারপর ট্রেন হয়তো ঘুরিয়ে দিল, তাহলে কী হবে? আর উনি যদি কোনও একটা স্টেশনে নেমে ভাবেন, ‘ট্রেন বন্ধ, তো একটা গাড়ি ভাড়া করে এগিয়ে যাই’, তবে কী উপায়? কোন এক অচিনপুরে আটকে গিয়ে ফোন করলেও তো বুঝবে না বিদিশা! সে কেবল এয়ারপোর্টে নেমে, গাড়িতে চেপে হুশ করে চলে আসে পিপলিপুরার নন্দনকানন এস্টেটের পাঁচ নম্বর বাংলো পারিজাতে ৷ কী যে করবে সে এখন...!

রঞ্জন বম্বেতে, ছেলেমেয়েরা দিল্লি ৷ খবরাখবর হচ্ছিল নিয়মিত, কিন্তু আজ থেকে সব বন্ধ ৷ ফোন আসছেও না, যাচ্ছেও না—বোঝো! ওই অসুস্থ শরীর দাদামণির ৷ মরণাপন্ন অবস্থা থেকে সুস্থ হলেও, কতটাই বা হবেন? একা একা ট্রেন জার্নি, তার উপর কবে থেকে উত্তেজনা... ৷ তা বাদে বাড়িতে জানিয়ে-টানিয়ে আসছেন কি না তাও তো জানা নেই! ছেলেপুলের সঙ্গে সে সময় কথা হত দাদামণিরই ফোনে, আলাদা করে কথা তো হয়নি কখনও ওদের সঙ্গে! সুতরাং চিন্তাভাবনায় মাথা খারাপ করে খানিক ঘর-বার পায়চারি হল, শেষে চাল-ডাল, সবজিপাতি সব দিয়ে তরিবত করে খিচুড়ি বানাতে বসল বিদিশা ৷ খানিকটা খাবে এখন, বাকিটা রেখে দেবে ৷ কোনও অলৌকিক ক্ষমতার বশে মিঃ সমাদ্দার যদি এসে পৌঁছুতে পারেন শেষমেশ এই পাঁচ নম্বর পারিজাত বাংলোয়, কোনও মির্যাকল করে—তার জন্য ৷ হতেও পারে, বলা যায় না ৷ যেমনটা সে শুনেছে অল্প বয়সে রঞ্জনের কাছে, তার এক শতাংশও যদি টিকে থাকে এখনও পর্যন্ত, তাহলে উড়েপুড়ে, সাঁতরে, গড়িয়ে, যেমন করে হোক, এই পাঁচ দিনের মধ্যে অন্তত এসে যে পৌঁছোবেনই, এতে সে স্থির নিশ্চিত... ৷

দুপুর যতই গড়াচ্ছিল, ততই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছিল চারদিকের ৷ আকাশটা ঘন কালো হয়ে একেবারে নেমে এসেছে ছাতের মাথায় ৷ বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টিতে দু’হাত দূরেরও কিচ্ছুটি দেখা যায় না ৷ মনে হচ্ছে প্রতিটি জানলা- দরজার সামনে যেন সাদা সাদা চাদর মেলা, যা আবার দমকা হাওয়ায় এপাশ-ওপাশ দুলছেও ৷ দুপুরে খিচুড়ি আর ডবল ডিমের অমলেট খেয়ে, আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ দোতলার শোয়ার ঘরে কখন যে সাতবাসি সমাচারপত্র পড়তে পড়তে ঘুমিয়েই পড়েছে বিদিশা—খেয়ালই নেই ৷ সে ঘুম যখন ভাঙল—চারদিক ঘোর অন্ধকার ৷

কোথায় আছে, কী হচ্ছে কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না একেবারে ৷ দমচাপা গুমোট অবস্থায় হাঁপও ধরে যাচ্ছিল ৷ মনে হচ্ছিল সে যেন পানাপুকুরের শ্যাওলা-ধরা পোড়ো নির্জন একটা ঘাটে, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে একা একা বসে কার যেন অপেক্ষা করছে বাদলার অন্ধকারে ৷ স্বপ্ন দেখছিল বোধহয়, দুঃস্বপ্ন... ৷ হাতঘড়ির বোতাম টিপে সময় দেখল—বেলা যায়নি, বিকেল মাত্র চারটে ৷ লেট আফটারনুনই বলা যায়, তবে দেখে মনে হচ্ছে যেন মধ্যরাত্রি ৷ গোটা বাড়ি ঘুরঘুট্টি অন্ধকার ৷ অবিশ্রান্ত এলোপাথাড়ি বৃষ্টির মধ্যে জনমানবশূন্য এস্টেট এলাকায়ও আলোর লেশমাত্র নেই ৷ তদুপরি চারদিক বন্ধ থাকবার ফলে ঘরের মধ্যে একটা বাষ্প তৈরি হয়েছে—স্যাঁতস্যাতে, ভেজা-ভেজা, ভারী... বিদিশার ভালো লাগছিল না ৷ তবুও উঠে বাতি জ্বালাল, তারপর একে একে লাউঞ্জ, সিঁড়ি, নীচের বসার ঘর, শেষে রান্নাঘরেরও ৷ আর ওই আলো বড়ো বড়ো কাচের জানলা দিয়ে বাইরের চাতালে পড়াতে সামান্য চিকমিকও করে উঠল! অন্য দিন এখানে রাস্তাঘাট, পুলসাইড ও বাগান সন্ধে থেকে একেবারে আলোয় ঝলমল করে ৷ তখন বরং বিদিশাই বলে—কেউ নেই, ফাঁকা সব, অকারণে এত অপচয়... ৷ তখন শুনবে না, নিয়মমাফিক জ্বালবেই ৷ কিন্তু আজ প্রয়োজনেও—, ঘড়িতে সময় হয়নি যে!

এই বাংলোগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া আছে একটা কোম্পানিকে ৷ তারা বাগান বানায়, পুল পরিষ্কার করে, ঘর খুলে সাফসুতরো রাখে ৷ দু’টি চৌকিদার, ক’টা মালি, জমাদার কোয়ার্টারেই থাকে, আর বাকিরা আসে দিনের ডিউটিতে ৷ ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় বেশ জমজমাটই থাকে জায়গাটা ৷ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে, বাগানে বসে মধ্যাহ্নভোজ সারে... ৷ আজও হয়তো এসেছিল, কাজও করেছে বাংলোর ভেতরে, বেলা গড়াতে চলেও গিয়েছে যে যার মতো ৷ আর বাদবাকিরা দরজা এঁটে টিভি দেখছে কোয়ার্টারে ৷ তা বাদে করবেটাই বা কী? গোটা এলাকা শুনশান, শুধু একটানা বৃষ্টির শব্দ—তুমুল বৃষ্টি... ৷ বিদিশা দুধে ফোটানো আদা-চা বানিয়ে বসার ঘরের টিভির সামনে এসে বসল, সময় তো কাটবে ৷ কিন্তু রিমোট টিপে অনই হল না! অন-অফ করল বারকতক, থাবড়াল থপথপ করে, কিছুতেই কিছু না... ৷ স্ক্রিন জুড়ে কেবল অসংখ্য এলোমেলো ঝিরিঝিরি তারা, আর কান ফাটানো ঘসঘস শব্দ—ধুর ৷ অন্য সময় ইচ্ছেও হয় না, সময়ও থাকে না, আর আজ যখন অফুরন্ত সময়, অনিচ্ছারও কারণ নেই, তখন ইনিই বেঁকে বসলেন একেবারে ৷ এখন স্যাঁতসেঁতে ঘরে কেবল হাত-পা কোলে করে ভেজা কাঠের মতন থাকো বসে একা একা! অগত্যা বারান্দার দরজাটা সামান্য ফাঁক করে নিজের মনেই গুনগুনিয়ে গান-টান গাইছিল বোধহয়, আর ঠিক তখনই—‘‘কে?’’

ত্রস্ত পায়ে লাফিয়ে উঠে, কাঁপা-কাঁপা তীক্ষ্ণ গলায় আবার বলল, ‘‘কে? কে ওখানে?’’

সামনে বারান্দা, তারপর ক’ধাপ সিঁড়ি নেমে বাগানের শুরু, সঙ্গে সাঁতার-পুকুর ৷ খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে জোরালো ত্যারচা আলো যেখানে জলের ওপর পড়েছে, সেখানে কালো একটা ছায়া পড়ল ৷ লম্বা..., ভয়ংকর লম্বা, কালো, মনুষ্যাকৃতিই হবে, তবে পুরোপুরি স্পষ্ট নয় ৷ অবিশ্রান্ত জলের ফোঁটা পড়া অসমান পুকুরের ওপর সে প্রতিবিম্ব টলোমলো করে দুলছিল ৷ গানে বিভোর, অন্যমনস্ক বিদিশার বুদ্ধিশুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল নিশ্চয়ই, নয়তো নির্জন পুরীতে, এই অবাস্তব লোকাতীত জলছবিকে কেউ আবার পরিচয় জিজ্ঞেস করে?

তবে অজান্তে ওই প্রশ্নটা করে কিন্তু কাজের কাজই করেছিল বলতে হয় ৷ কারণ, ভয়ার্ত, ফ্যাকাশে বিদিশাকে অবাক করে ওই ছায়ার পরিসর থেকে খানিক দূরে দাঁড়ানো বর্ষাতি পরা মানুষটা, থাবড়া-টাবড়া মেরে অনেক কষ্টে তার মস্ত স্টিলের টর্চটা জ্বেলে বলল, ‘‘দিদি, আমি সুধীর ৷’’

বিদিশার বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগল শ্বাস ফেলে মোটামুটি স্বাভাবিক হতে ৷ কিন্তু..., এ সুধীর! এমন সাদাসিধে আটপৌরে মানুষটা নিজের অমন বিদঘুটে ছায়াটা ফেলল কীভাবে? অদ্ভুত...! ওর ঘোর যেন কাটছিল না তখনও ৷

‘‘দিদি, দরজা খোলা রাখবেন না ৷ এই সময় সাপখোপ সব চান্স পেলেই ঘরে সিঁধোতে চায় ৷ খিল তুলে ওপরে চলে যান দিদি ৷ সাহেবের দাদা আজ আর আসবে না, কোনও চান্সই নেই—অবস্থা তো দেখছেন..., চারদিক ডুবে গেছে ৷’’

বৃষ্টির ঝাপটার মধ্যে বারান্দায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুধীরের কথাগুলো শুনছিল বটে, তবে ঠিকঠাক মন দিতে পারছিল না যেন... ৷ বর্ষা-রাতে একটা ছায়া দেখে এত ভয় পেল সে? এটা ঠিকই যে, গোটা এস্টেটে সে বাদে আর কোনও বাসিন্দা নেই ৷ এবং যাদের ওপর ভরসা করেই থাকে তারা, সেই চৌকিদারদেরও যে কতরকম দুর্নীতি থাকে! সে তো ভীতকর হতেই পারে..., খুবই সম্ভব ৷ তবে..., তবে, বিদিশা কিন্তু কেমন যেন একটা অচেনা ভয় পেল, ...হঠাৎ... ৷ এমন অনুভূতি তো তার কখনও হয়নি! হাত-পাগুলো তখনও ঠান্ডা শক্ত লাগছিল, গলা শুকনো, পিঠ দিয়ে ঠান্ডা বরফ-জল বয়ে যাচ্ছিল কুলকুল করে... ৷ কোনওমতে অপ্রস্তুতভাবে ভাঙা-ভাঙা ফ্যাঁসফেঁসে গলায় অতি কষ্টে বলল, ‘‘থ্যাংক ইউ সুধীর... ৷’’ আর বলবার সঙ্গে সঙ্গে অতি বাধ্য মেয়ের মতন দোর বন্ধ করে, ওই শক্ত ঠান্ডা হাত-পা নিয়ে কোনওমতে প্রায় পড়ি-মরি করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরেও চলল তড়বড়িয়ে ৷

দোতলার চারদিক বন্ধ ৷ উজ্জ্বল আলো ভরা ঘরটায় এসে ভালো লাগছিল বিদিশার ৷ মনে হচ্ছিল, হাতে বেশ কাজকর্ম নিয়ে মশগুল হয়ে সন্ধেটা কোনওমতে যদি কাটিয়ে দিতে পারত, তাহলে কী যে মজা হত...! তাহলে ওই ভয়ের চিন্তাভাবনা বা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার ব্যাপারটা বেমালুম ভুলেই যেত অনায়াসে ৷ আদতে অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকলেই তো যত রাজ্যের হাবিজাবি চিন্তা মাথায় ঢোকে... ৷ অলস মস্তিষ্কে শয়তানরা বাসা বাঁধবার জন্য কত রকম ভাবে যে ফন্দি আঁটে! ফলে কাজ খুঁজে খুঁজে শেষমেশ হাতের কাছে আলমারিটা পেয়ে, সেটাই গুছোতে বসল মন দিয়ে ৷ যার যত বাতিল, অকেজো জিনিস এনে জড়ো করে তো এখানে! এসব ঝেড়ে-বেছে, পাট করে দিব্যি কেটে যাবে সময়টা ৷ বেশ হবে, অকাজের ভূতও মাথা থেকে নেমে দৌড়ে পালাতে পার পাবে না আর ৷

তা সে ঝাড়া-বাছা, পাট করা নিয়ে এমনই মশগুল হয়ে গিয়েছিল যে সময়ের জ্ঞানই ছিল না মোটে ৷ তারপর পায়ে ঝিঝি, কোমর কনকন, তা বাদে সামান্য খিদেরও উদ্রেক হওয়াতে, সব গুছিয়ে রেখে ভাবল, ন’টা বেজে গিয়েছে, বৃষ্টিরও এ জম্মে থামবার লক্ষণ নেই, না থামুক—এবার বরং নীচে গিয়ে একটু প্যাকেটের স্যুপ আর টোস্ট খেলে হয় ৷ এই ভেবে দোতলার জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল ৷

উফ, কী অসাধারণ সুন্দর যে লাগছিল বাইরেটা, অপার্থিব সৌন্দর্য ৷ বাগানে আলো পড়ে অল্পস্বল্প গাছের আভাস ৷ কানা-উঁচু সাঁতার পুকুরের ভেতর জ্বলন্ত আলোগুলোর জন্য মনে হচ্ছে যেন ওটা একটা থিয়েটারের স্টেজ—চারদিকে আলো-টালো দিয়ে, বাতাসি পর্দা টাঙিয়ে জবরদস্ত একটা ড্রামা শুরুর অপেক্ষা ৷ বিদিশা এবার জানলার একটা পাট খুলেই দিল, বেশ লাগছে ৷ বন্ধ ঘরে, ঠান্ডা ভেজা-ভেজা একটা হাওয়া ঢুকে সতেজ লাগছিল, অথচ টালির লম্বা ঢাকনা থাকবার দরুন ছাটও আসছিল না ৷ তবু পরখ করবার জন্য সামান্য ঝুঁকে মুখ বাড়াল ৷ ডান দিকে ছ’ নম্বর বাংলোর অংশ, তাদের লন, আর ঢোকার মুখের ঝুমকো লতার তোরণ ৷ ছবির মতন সুন্দর... ৷ বিদিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ৷ সব কিছু এমন সুন্দর থেকেও, কেন যে অমন অসুন্দর হয়ে গেল ওই বাংলো মালিকের জীবনটা, হায় রে!

কানাডার বাসিন্দা, ইহুদি কাজিম ইজাকুল কিনেছিলেন ওই ‘গুলমোহর’ বাংলো ৷ দু’জনে থাকত, প্রথমে ভেবেছিল বুঝি স্বামী-স্ত্রী ৷ পরে শুনল উইডো দিদি আর ব্যাচেলর ভাই ৷ বয়স্ক দুটো মানুষ, মোটাসোটা, হাসিখুশি, সারাদিন নিজেদের মনে নিরিবিলিতে আছে... ৷ ও দেশের ভয়ংকর ঠান্ডা এড়াতে শীতের ছ’টা মাস এই গরমের জায়গায় কাটাত খালি গায়ে লনে বসে বই পড়ে, সাঁতার কেটে আর পাখা চালিয়ে আরাম করে ৷ বাড়িতে আসা-যাওয়া তেমন ছিল না—ওই হাত নাড়া আর বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে দুটো সৌজন্যমূলক বার্তা বিনিময়, ব্যাস ৷ খুবই সজ্জন, ভদ্র, তবে একটু খুঁতখুঁতে বাতিকগ্রস্ত ছিলেন বোধহয় মহিলা, আর ভাইও যেন সামান্য স্লো! একই কথা বারবার বলেন, হাসতে থাকলে থামেন না—সে যা-ই হোক, কিন্তু কী যে হল, এবার মার্চ মাসে ফিরে গিয়েই, কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন মহিলা ৷ গাড়িটা চালচ্ছিল ভাই... তারও হাত-পা ভেঙেচুরে... ৷

শুনে কী যে অবস্থা হয়েছিল বিদিশার..., চোখের সামনে ভাসে একেবারে ৷ গরমের সময় এবার এসেছিল ক’দিনের জন্য রঞ্জনের সঙ্গে ৷ তখন তো একেবারে সদ্য, ফলে, মোটে তাকাতেই পারত না ওদিকে ৷ তারপর যা হয়..., সবই সয়ে যায় আর কী... ৷ বন্ধই পড়ে আছে ৷ এবার নিশ্চয়ই বিক্রি হয়ে যাবে ৷ কাজিম তো আর আসবে না বলেই দিয়েছে ৷ অসুস্থ শরীর, কেনই বা আসবে একা একা? এখনও রেখে দিয়েছে, তাই এস্টেটের তদারককারীরা অন্য সব বাংলোর মতনই বাগান সাজায়, পুল পরিষ্কার করে ঘরদোর সাফসুতরো রাখে... ৷ এর পরে যাবে অন্য হাতে—এই তো জীবন... ৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরেই যাচ্ছিল বিদিশা একতলায় রান্নাঘরের দিকে—হঠাৎ মনে হল, দোতলার ওই শোবার ঘরে যেন আলো জ্বলছে না? হ্যাঁ, আলোই তো জ্বলছে...!

কোণের ওই ঘরটা আসলে এ বাড়ি থেকে সবচেয়ে কাছে, ফলে এই বৃষ্টিতে একটু আবছা হলেও দেখা যাচ্ছে বেশ ৷ তা ছাড়া..., এক পাট জানলাও তো খোলা! তা-ই দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, টালির উঁচু ছাদ থেকে লম্বা রডের সঙ্গে পুরোনো স্টাইলের কালচে-রঙা পাখাটাও যে ঘুরে চলেছে ধীরে ধীরে পাক দিয়ে দিয়ে—এতদিন ধরে ঠিক যেমনটা দেখে এসেছে গোটা শীতকাল জুড়ে ৷

বিদিশার প্রথমে একটু অবাক লাগছিল—ঠিক দেখছে তো? কিন্তু প্রস্তরবৎ চেয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশই তার শরীরটা অদ্ভুত রকমের অবশ হয়ে আসছিল ৷ কুলকুল করে ঠান্ডা জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল সারা দেহে ৷ মাথাটা ঝিমঝিম, চোখ ঘোলাটে—ঠিকই তো দেখছে সে! অথচ এমনটা তো কখনওই হবার কথা নয়, তাহলে এটা হচ্ছেটা কী? এত মাসের অব্যবহৃত এ বাড়িতে এ তো অসম্ভব! তবু কী এক অবাধ্য কৌতূহলে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করতে থাকল বিদিশা-ঘরে কেউ হাঁটছেও কি? ডান দিকে সামান্য হেলে গিয়ে, ভারী শরীরে ধীরে ধীরে...? পায়ের পাতায় কী একটা যেন অসুবিধে থাকার দরুন সব সময় বুটের মতন একটা ঢাকা, ভারী জুতো পরত এলমা ৷ হ্যাঁ, কালো একটা ছায়া সরে সরে যাচ্ছে না অনবরত? যাচ্ছে, পায়চারি করছে... ৷ অবশ হয়ে এগিয়ে যাবার মুহূর্তে, সমস্ত শরীর দিয়ে শেষবারের মতন একবার প্রতিরোধ করতে চাইল নিজেকে—হতেই পারে না, অসম্ভব ৷ শক্ত মনে, স্পষ্ট চোখে চাইল বিদিশা ৷ না, ওটা নিশ্চয়ই ওই লম্বা পাখার ছায়া, ঘুরে ঘুরে পড়ছে আলোর বিপরীতে... ৷

আচ্ছা, সে না হয় হল, কিন্তু সেটা চলছে কেন? আর, আর আলোটা? এই অস্বাভাবিক ত্রাস থেকে রেহাই পেতে মরিয়া হয়ে বিদিশা কাঁপা-কাঁপা হাতে জানলাটা সন্তর্পণে বন্ধ করে, ঠান্ডা, অবশ, ভারী পা-টাকে টেনে টেনে কোনওক্রমে ঘরের অন্য প্রান্তে ছুটে গেল ৷ আর সঙ্গে সঙ্গে ওই ভয়-ভীতি-ত্রাস—সব যেন কর্পূরের মতন উবেও গেল এক নিমেষে ৷ অমন বোকার মতন হঠাৎ ভয় পেল কেন বিদিশা? আসলে মনটা যখন দুর্বল থাকে, চারদিকের অতি পরিচিত জিনিসগুলোও যেন অপরিচিত ঠেকে, আর স্বাভাবিকগুলোও অস্বাভাবিক, যেমনটা হয়েছিল তখন সুধীরকে দেখে ৷ আদতে, চৌকিদাররাই বোধহয় তাদের কোয়ার্টার ছেড়ে ওখানে আস্তানা গেড়েছে! ফাঁকা বাংলো পড়ে আছে, থাকো আরামে হাত-পা ছড়িয়ে! অথবা কাজের লোকেরা দিনের বেলায় আলো জ্বেলে, পাখা চালিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করে, শেষে বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে নিশ্চয়ই...! দিনের বেলায় সামান্য হলেও আলো থাকাতে নজরে পড়েনি, রাত হতে সেটাই জানান দিচ্ছে! তা-ই তো, এ তো জলের মতন সিম্পল অ্যান্ড ক্লিয়ার ৷ এই সাধারণ ব্যাপারটা তখন মাথায় না এসে অকারণে কেঁপে কেঁপে মরল বিদিশা—ছিঃ, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, ওর ওই ভয় পাওয়াটাকেই যেন ভয় পাচ্ছিল এখন সে ৷ তামাম দুনিয়া কেমন একা একা ঘুরে বেড়িয়ে, শেষে এই নিরীহ গ্রামে এমন তাগড়া ভয়ের খপ্পরে! এমনটা তো কখনও হয়নি, এমন রক্ত হিম হয়ে যাওয়া অবশ আতঙ্ক!

বিদিশা খিদে-টিদের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ৷ এখন আবার সব কিছু থিতু হয়ে আসাতে, গরম স্যুপের কথা খেয়াল হল ৷ রাত বেশি হয়নি অবশ্য, তবু সব সেরে রাখলেই ভালো ৷ নীচে রান্নাঘরে যাবার আগেই বেশ সময় নিয়ে বিদিশা বিছানা তৈরি করে, জামাকাপড় বদলে, গরম জলে হাত-মুখ ধুল ভালো করে ৷ শেষে তরতাজা হয়ে মনে হল, এখন অন্তত একটা পাট জানলা খুলে না রাখলে রাতে মোটে ঘুমোতেই পারবে না, কী গুমোট যে হয়ে আছে ঘরটা, ভ্যাপসা ৷ পুলের দিকের নয়, আর পশ্চিমের তো মোটেই নয় ৷ তাহলে বাকি থাকল পুবের, ওটি বিছানা থেকে বেশ খানিক তফাতেও আছে, ফলে ছাট-টাট আসবারও সম্ভাবনা নেই কোনও ৷ তা বাদে বম্বের বাসিন্দা এই দেশাইদের চার নম্বর বাংলো সম্পূর্ণ ‘দোষমুক্ত’ ৷ এরা এখানে বেশি দিন টানা না থাকলেও, ছেলেপুলে, নাতিপুতি নিয়ে আসেও খুব ঘন ঘন ৷ আর আমুদে, হুল্লোড়ে, অতি ব্যস্ত সফল ব্যবসায়ীর জমজমাট পরিবারটি—সবাই সুস্থ আছে পুরোপুরি ৷ এবং এদের আনাচ-কানাচেও সবাই ফাস্ট, স্লোয়ের ধারেকাছেও যায় না কেউ ৷ এমনকি কারও পায়ের দোষও নেই মোটে ৷ বিদিশা পুবের প্রথম জানলাটা হালকা মনে নিশ্চিন্তে খুলতেই চমকে উঠল—ও কী! গেটের বাইরে—ও কে দাঁ-ড়ি-য়ে!

এবার তো আর বিকেলের সেই জলে ভাসা ছায়ার মতন অস্পষ্ট অবয়ব নয়! এ তো একেবারে চোখের সামনে জলজ্যান্ত স্পষ্ট...! জোরালো আলোয় কালো চকচক করছে একটা বি-শা-ল...দে-হ...! ভাঙা, চেরা স্বরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিল বিদিশা—‘‘কে-এ-এ? কে ওখানে...?’’

শরীরটা সামান্যক্ষণ দাঁড়াল, তারপর এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে তীব্র একটা শিস দিল মুখে... ৷ বিদিশার ভয়ে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এখুনি বন্ধ ঘরের ভেতরে, ঠিক তার পেছনে ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে, অন্যজনও আবার ঠিক সেরকম শিস দিয়ে তার উত্তরটাও দেবে—‘‘অল ক্লিয়ার... ৷’’

এ হয়তো একটা মুহূর্তের ব্যাপার, সামান্যক্ষণই, কিন্তু ঠিক হুবহু গত দু’বারের মতনই অভিজ্ঞতাটা—পিঠ-কোমর সব শক্ত হয়ে যাচ্ছিল, হাত-পা ঠান্ডা, চোখ ঝাপসা, আর তীব্র কনকনে একটা যন্ত্রণা ওঠানামা করছিল যেন শিরদাঁড়া বেয়ে... ৷ বিদিশা জানলার বরগা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, এক চুলও নড়তে পারছিল না মোটে... ৷ কিন্তু বিশাল মনুষ্যদেহটা নড়ে উঠল ৷ নড়েচড়ে একটু সরে যেতেই, অবয়বটা ধীরে ধীরে ছোটো হতে হতে প্রায় স্বাভাবিক আয়তনেই চলে এল ৷ তারপর আলো পড়ে চকচক করা আপাদমস্তক কালো বর্ষাতির পকেট থেকে বাঁশি বার করে জোরে বাজাল সেটা আরও একবার—সুধীর কি? না, এবার আর সুধীর না, কী যেন অন্য ছেলেটার নাম—বেণী না বেণু—সে-ই ৷ বর্ষাতির নীচ দিয়ে রোগা, সরু সরু খালি পা দেখা যাচ্ছে ৷ বাইরে জমকালো আলো জ্বলছে বলে মস্ত টর্চটা আর সঙ্গে রাখেনি অযথা... ৷ বেচারা, এই ভয়ংকর বাদুলে রাতে, খেয়েদেয়ে শুতে যাবার আগে, নেহাতই কর্তব্যরক্ষায়, শেষবারের মতন দু’জনে মিলে টহল দিয়ে গেল আর কী... ৷

বিদিশারও হাত-পায়ের সাড় ফিরে এসে আবার একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেল ৷ কোমর-পিঠের যন্ত্রণা গায়েব, দৃষ্টি স্বচ্ছ, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস... ৷ নিজেকে এমন বোকা, বেকুব লাগছিল যে বলবার নয় ৷ কিন্তু এ কীসের তামাশা চলছে? এসব হচ্ছেটাই বা কেন? কাউকে বলতে পারবে সে এইসব অভিজ্ঞতার কথা? বিশ্বাস করবে কেউ? —‘সামনের স্যুইমিং পুলে একটা টলোমলো ছায়া ভাসছে,’ ‘আট মাস যাবৎ বন্ধ, পরিত্যক্ত বাংলোর দোতলার ঘরে আলো জ্বেলে, পাখা চালিয়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চলেছে মৃত এলমা... ৷’ ‘এবার তাকে ষড়যন্ত্র করে মারবার জন্য, নাকি ধরবার জন্য—কে জানে, চকচকে কালো বি-শা-ল শরীরের দুই অশরীরী শিস-টিস দিয়ে আধমরা করল... ৷’ ভাগ্যিস এই বৃষ্টির তাণ্ডবে ওর অমন মরণাত্মক আর্তস্বর শুনতে পায়নি তারা! পেলে, বেচারারাই বরং ভয় পেত বেশি—উফ, কী যে হচ্ছে ওর আজ!

তবে এখন যে ওইসব কাণ্ডর কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে—সেটা যেমন সত্যি, আবার খানিক আগে অমন মরণ ভয়টা যে পেয়েছিল, সেটাও তো একশো ভাগ সত্যি... ৷ আসলে এই নির্জন প্রবাসের পাগুলে বৃষ্টিতে পুরো অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকা, তার সঙ্গে ফোন-টোন, টিভি ইত্যাদি সমস্ত জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, তদুপরি শ্রীপ্রশান্ত সমাদ্দার মশাইয়ের প্রতি গোটা দিন ধরে ওই প্রবল দুশ্চিন্তা—সব কিছু মিলেমিশেই বলা যায় এমন মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে সে ৷ তা নয়তো বারবার এমন রক্ত হিম করা ভয় কেনই বা চেপে ধরবে তাকে? বিদিশা জানলার ধারকাছও মাড়াল না আর ৷ থাক, খোলাই পড়ে থাক ওগুলো ৷ বৃষ্টির ছাট, বাদলা হাওয়া, বর্ষার পোকামাকড়, এমনকি সাপখোপও যদি দোতলার জানলা বেয়ে ঘরে আসতে চায়, তো আসুক—সমুদ্রে শয়ন যার, শিশিরে কী আসে যায়!

রাত কত হয়েছিল ঠিক বলা যায় না, কারণ ঘড়ি ছিল না সঙ্গে ৷ তবে খুব বেশি নয় ৷ খাওয়াদাওয়া সেরে বোতলে জল ভরছিল রান্নাঘরে—দরজায় শব্দ হল, খট, খট, খট...! খুব জোরে নয়, মৃদুর দিকেই বলা যায়, তবে বেশ স্পষ্ট ৷ বিদিশা অবাক হয়ে কান পাতল সামান্যক্ষণ, দরজারই শব্দ তো? যেন কোনও শক্ত জিনিস দিয়ে কাঠের ওপর বাজাল বার তিনেক... ৷ গোটা দিনে তো অবিরাম তুমুল বৃষ্টি ব্যতীত ঝিঁঝি পোকা বা ব্যাঙের ডাকও কানে আসেনি—হঠাৎ...!

একতলার রান্নাঘরের একটা দিক জুড়ে কেবল কাচেরই জানলা, যা দিয়ে ড্রাইভওয়ে দেখা যায়—সামনেই সদর দরজা ৷ কিন্তু এত রাতে দরজায় আসবেটা কে? চৌকিদার হলে তো জানলার সামনেই দাঁড়াবে, অথবা বেল বাজাতেই বা অসুবিধে কী? বোতলের জল উপচে পড়ছে, বিদিশা স্থির মাথায় সব বোতাম-টোতাম বন্ধ করে জানলার বাইরে চেয়ে অপেক্ষা করল খানিক ৷ —নাহ, শব্দ বা শব্দকারী কিছুই নেই ৷ ফ্রিজ থেকে কোনও শব্দ হল বোধহয়, বা ইনভার্টারে... ৷

‘টিং...টং... ৷’ নিঝুম গোটা বাড়িটার আনাচকানাচ জুড়ে এবার নিশ্চিতভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল যান্ত্রিক কলিং বেলের শব্দটা ৷ বিদিশা ছোটো মোড়ায় চেপে উঁকি দিল জানলার দিকে, দেখা গেল না কাউকে ৷ এমন খোলামেলা বাংলো বাড়ি যে বন্ধ দরজা দিয়ে দেখবার বোধহয় কোনও ব্যবস্থাই নেই ৷ তবু বিদিশা দরজার দিকেই গেল ৷ এস্টেটেরই কেউ হবে, কারণ মেন গেট তো বন্ধ বাইরে ৷

খান তিনেক আগল সরিয়ে দরজার পাল্লা সামান্য ফাঁক করে দেখল—কেউ তো নেই... ৷ এবার আবার কেমন যেন অস্বস্তি শুরু হচ্ছিল বিদিশার, ভয় না... একটা অদ্ভুত অস্বাচ্ছন্দ্য বলা যায় ৷ সামনে বাঁধানো চাতালের ওপর টালিতে ছাওয়া পোর্টিকো, একরাশ দ্বন্দ্ব নিয়ে মুখ বাড়াল বিদিশা ৷ আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে নজর করল, দরজার পাল্লা থেকে সামান্য তফাতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সারাদিনের আকাঙ্ক্ষিত মানুষটি শ্রীপ্রশান্তকুমার সমাদ্দার—ওরফে দাদামণি ৷

সাদাসিধে, পরিচ্ছন্ন, পাটভাঙা জামাকাপড়, পায়ের কাছে একটা ব্যাগ, হাতে ছোটো ফোলিও গোছের—হতভম্ব বিদিশার দিকে চেয়ে অপ্রস্তুতভাবে হেসে বললেন, ‘‘ছোটো! আশা ছেড়ে দিয়েছিলে তো? দেবারই কথা, এমনটা হবার তো কোনও কথা ছিল না... ৷’’

এতক্ষণে বিদিশার মুখে যেন কথা ফুটল—‘‘আমি ভাবতেই পারছি না! বাইরে কেন, আসুন?’

বিদিশা ঝুঁকে ব্যাগটা তুলতে যাচ্ছিল, উনি ভাবলেন বুঝি প্রণাম ৷ প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, ‘‘আরে না, না, যাকে-তাকে প্রণাম কোরো না ছোটো ৷ আগে জন্মালেই যদি প্রণামের যোগ্য হতে হয়—’’ বলে নিজেই তুলে নিলেন:ব্যাগটা ৷ করিডোরটা একটু সরু, বিদিশা সরে এসে ঢুকবার জায়গা করে দিল, ‘‘দাদামণি, ব্যাগটা তাহলে এ ঘরেই রেখে দিন, এটাই এখন আপনার..., আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না ৷’’

প্রশান্তকুমার বাড়ি ঢুকেই ঠিক ডান দিকে লাগোয়া একতলার গেস্টরুমে ব্যাগটা রেখে চারদিকে চেয়ে বললেন, ‘‘বাহ, চমৎকার ৷’’ তারপর ফের যোগ করলেন, ‘‘অবিশ্বাস্য কত কিছু যে বিশ্বাস করতে হয়, সব কিছুই উড়িয়ে দিলে চলে? আমিও তো কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না, আমার ওই ছোট্ট ভাইটার এমন একটা স্বপ্নপুরী—নাকি বাতাসবাড়ি, না, জলমহল বলাই ভালো ৷’’ বিদিশাও দরজার খিল-টিল তুলে বলল, ‘‘জুতো- টুতো খুলে ফেলুন দাদামণি, ভেজা জুতোয় ঠান্ডা লেগে যাবে ৷ জামা তো ভেজেনি মনে হচ্ছে—কিন্তু, এলেনটা কীভাবে—? রঞ্জন ঠিকই বলে—’’

প্রশান্তকুমার সামনেই একটা চেয়ারে বসে প্রথমে জুতো খুললেন, তারপর মোজা ৷ পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখে বললেন, ‘‘কী বলে রঞ্জন? না, কিছুই ভেজেনি, চিন্তা কোরো না, আমার ঠান্ডাও লাগবে না, গরমও না ৷’’ বিদিশা হাসল—‘‘খুব ভালো কথা, হি-ম্যান ৷ একেবারে হাত-মুখ ধুয়ে নেবেন নাকি? আসুন এদিকে, আরাম করে বসবেন—’’

বিদিশা শোবার ঘরের দরজা থেকে সরে গেল—উনি বাথরুম-টাথরুমে যাবেন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা অশোভন ৷

এক গেলাস জল নিয়ে ফিরে আসতেই বিদিশা দেখল, প্রশান্তকুমার ইতিমধ্যে বসার ঘরের কোনার সোফাটিতে বসে, ক্লান্ত চোখে ঘাড়-মাথা ঘুরিয়ে চারদিকটা দেখছেন চেয়ে চেয়ে ৷ মুখে তখনও সেই অস্বস্তির একটা হাসি সমেত জড়োসড়ো ভাব ৷ এতক্ষণে জোরালো আলোর সামনে মুখোমুখি বসল দু’জনে, কতকাল পরে দেখা ৷ শেষ বোধহয় দেখেছে কুন্তিমাসির মেয়ের বিয়েতে ৷ সে-ও অন্তত বছর পনেরো? যদি না আরও বেশি হয় ৷ রোগা হয়েছেন, খুবই রোগা ৷ ফলে বেঢপ:গড়নের বেঁটে মানুষটাকে এখন নেহাতই ছোট্টখাট্ট দেখাচ্ছে ৷ মাথার বিশাল ঝাঁকড়া ভয়ংকর কোঁচকানো কুচকুচে কালো চুল পাতলা হয়ে টাক পড়ে গেছে, আর যেটুকু আছে তাও বলতে গেলে সাদা ৷ গাল-টাল ভেঙে বদলে গেছে চওড়া মুখাবয়ব, গায়ের রং-টা কেবল এখনও কালো, তবে সেও আগের তুলনায় ফ্যাকাশেই বলা যায় ৷ তা ছাড়া ওই পুরু ঠোঁটটা ভেতরে ঢুকে মুখের আদলই বদলে দিয়েছে ৷ রাস্তায় দেখলে বিদিশা চিনতে পারত না ৷ অবশ্য দেখতই বা কোন রাস্তায়! সে যে কীভাবে আপ্যায়ন করবে, কী বলবে, কী করবে, কিছুই না বুঝে জলটা দিয়ে হাসিমুখে কেবল বসেই রইল সামনে ৷ অথচ কত কিছুর যে ব্যবস্থা রেখেছিল! এলে পরে গন্ধলেবুর শরবত, দুপুরে নিম-বেগুন, পাতলা মুসুরির ডাল, রাতে চিকেনের ঝোল ৷ ব্যাঙ্গালোর থেকে হরেকরকম সবজি কিনেছে বেছে বেছে, ফল, মাছ, মুরগি... ৷ আ-রাঁধা সব পড়ে রইল ফ্রিজের মধ্যে, আর এখন কেবল এক গ্লাস জল তৎসহ হাঁড়িতে এক কাঁড়ি খিচুড়ি নিয়ে বসে আছে অতিথিসেবা করতে ৷

প্রশান্তকুমারের অবশ্য এসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ আদরযত্নের ত্রুটিবিচ্যুতিতে কিছুই আসে যায় না ৷ উনি জলের গেলাসটা সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে পরম তৃপ্তির একটা শব্দ করলেন ৷ ‘‘আহ— জলেরও যে এত স্বাদ, সে তো জানতামই না...!’’

বিদিশার হাসি পেয়ে গিয়েছিল, যেন পিপলিপুরার সুমিষ্ট জল পেলে উনি আর কোনও পানীয়ই ছুঁতেন না জীবনে ৷ তবে মুখে কিছুই বলল না, শত হোক, সম্পর্কে ভাশুর-গুরুজন, আর কতটুকুই বা পরিচয় ৷ উনি কিন্তু সে ভাবনাটা লুফে নিয়ে বেশ হাসলেন একচোট, তারপর বললেন, ‘‘স্বাদ কি কেবল গেলাসের জলে হয় ছোটো? স্বাদ হয় জীবনে ৷ মমতা, সম্মান, ভালোবাসা—এসব থাকলে, পচা পানাপুকুরের জল খেয়েও দিব্যি আরাম, আর সেটি যার না জুটল, তাকে ছুটতে হয় অন্য পানীয়র খোঁজে ৷ সবই এই, বুঝলে ছোটো, স-ব এই... ৷’’ বলে উনি আঙুল দিয়ে টোকা মারলেন কপালে আর তা দেখেই খানিক আগের ওই দরজায় টোকা দেওয়াটা তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল বিদিশার ৷ ফলে বেশ আদুরে কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল, ‘‘এবার বলুন দাদামণি, আপনার পথবৃত্তান্ত ৷ এখানে এলেনটা কী করে? সকাল থেকে যা অবস্থা ৷ আচ্ছা, তার আগে কিছু খেয়ে নিন, অনেক রাত তো হল ৷’’ বলে, তার হাঁড়ি ভরা স্পেশাল খিচুড়ির কথা জানাল, সঙ্গে ডিম ভাজা বা বেগুন—মিষ্টি কিছু নেই, চাটনিও না, সে কাল হবে’খন ৷ তা বাদে ওঁর তো ব্লাড সুগারও ৷

খিচুড়ির কথায় প্রশান্তকুমার ছেলেমানুষের মতন প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, এত রাতে আবার ভাজাভুজির হাঙ্গামার কী প্রয়োজন? ওই খিচুড়িই তো যথেষ্ট—কিন্তু ছোটো যেন কদাচ আর এই সুগার-মুগার হাবিজাবির কথা না বলে ৷ উনি এখন মুক্ত পুরুষ—ঢের হয়েছে ৷ উফ, ও একটা জীবন নাকি? শরীর তো না, বাকসো ভরা শুধু যত রাজ্যের নোংরা আধিব্যাধির ফিক্সড ডিপোজিট, একবার ঢুকে চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে ৷ ওই সুদের আয় খরচা করতেই প্রতি মাসে হাসপাতালে—আসল জমাতে তো হাতই পড়েনি এখনও ৷ গোড়ার দিকের সংকোচ ভেঙে প্রশান্তকুমার আবার সেই সেদিনকার টেলিফোনের বাক্যালাপের মতন প্রচণ্ড হাসাচ্ছিলেন, আর নিজে একেবারে প্রাণ খুলে হাসছিলেন আরও বেশি ৷ হাসতে হাসতেই বিদিশা বেগুন ভাজছিল, টেবিল গোছাচ্ছিল, সামান্য দূরত্বে বসে খাওয়া দেখছিল দাদামণির, আর সঙ্গে সঙ্গে রাতও বাড়ছিল ঢের ৷

প্রশান্তকুমার ছোটোবেলাকার গল্প শোনাচ্ছিলেন ৷ কত ভাইবোন, কত হই- হুল্লোড় ৷ ভাইগুলো কত বদমাশ ছিল, আর বোনগুলো কেমন টেঁটিয়া... ৷ কেবল রঞ্জনটা ছিল সর্বকালের ভ্যাবলাকান্ত ৷ সবাই ওকে ভয় দেখাত, খাবার কেড়ে খেয়ে নিত, ভাগেরটুকুও পেত না মোটে ৷ অভাগার দল, মর তোরা ওই ভাগবাটোয়ারা করে—রঞ্জনের ওসবে লোভও ছিল না ৷ ও কেবল ভালোবাসত ওর দাদামণিকে ৷ সর্বজনবিদিত রঞ্জনের সেই ভালোবাসার টানেই উনি ছুটে ছুটে বাড়ি ফিরতেন ৷ আর লুকিয়ে লুকিয়ে জিনিস আনতেন, কেবল ওই ভাইটার জন্য—মিলিটারি ছুরি, আর্মি কম্পাস, কম্বল লাগানো ঠান্ডা জলের বোতল, এনামেলের মগ, এটা-সেটা ৷ এসব তো ছোটোর সবই শোনা কথা, কত শুনেছে রঞ্জনের কাছে, কিছু কিছু দেখেওছে নিশ্চয়ই ৷ তবে যেটা দেখেনি, হয়তো বা শোনেওনি কখনও, সেই সবই জড়ো করে আজ নিয়ে এসেছেন প্রশান্তকুমার বিদিশাকে দেবেন বলে ৷ ছেলেমেয়েদের কাছেও রইবে বাবার শিশুবেলাকার অমূল্য স্মৃতি! কতকাল ধরে যে আগলে রেখেছেন তিনি—কত শহর, কত নগর, কত রণভূমি, যুদ্ধক্ষেত্র ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু ওই পোর্টফোলিয়ো তিনি কখনও হাতছাড়া করেননি ৷

বিদিশা অবশ্য ঠিক এই পর্যায়ের খুঁটিনাটি ঘটনা কিছুই প্রায় শোনেনি, চোখে দেখা তো দূরের কথা ৷ ফলে এতকাল ধরে আগলে রাখা সে অমূল্য ধন সম্বন্ধেই বা কোন হদিশটা পাবে? পারিবারিক ছবি-টবি হবে হয়তো, যার কপি তার শ্বশুরবাড়িতেও আছে, দেখেছে আগে! তবু স্বভাবতই স্মিতমুখে একতরফা সেসব স্মৃতিচারণাই বসে বসে শুনে যাচ্ছিল মন দিয়ে ৷ শেষে খাওয়াদাওয়া সাঙ্গ হতে একবার বড়ো কাচের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন ৷ দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘বাহ ৷’’

বিদিশা তখন বাসনপত্তর তুলে, টেবিল গোছাচ্ছিল ৷ গোছানোর আর কী! একটা প্লেট, একটা গেলাস, ঘিয়ের শিশি, কাঁচা লংকার বাটি—ওই আর কী ৷ বলল—‘‘বাইরে ‘বাহ’টা আর কী দেখতে পেলেন আপনি? দু’হাত দূরত্বটুকুও নজরে আসছে না! জানলা মনে হচ্ছে আষ্টেপৃষ্ঠে সাদা কাপড়ে বাঁধা ৷ আশা করা যায় আগামীকাল বৃষ্টি না থামলেও আলো অন্তত ফুটবে—তখন দেখবেন ৷ এখানে পূর্ণিমাটা যা হয় না...!’’

প্রশান্তকুমার অত কথা শুনছিলেন বলে মনে হল না, বললেন—‘‘ছোটো, তুমি কাজ সেরে এসো ৷ তোমায় সব বুঝিয়ে-টুঝিয়ে দিই..., নয়তো—’’ বলে, সোফায় বসে, রেক্সিনের বেরঙা সেই পোর্টফোলিয়োটা বার করে কোলের ওপর রাখলেন ৷ বিদিশাও তৎক্ষণাৎ বাধ্য মেয়ের মতন হাত মুছে-টুছে বসল এসে সামনে ৷

একঘেয়ে ভাবে সমানে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে বলে তারতম্য তেমন গোচরে আসছিল না, তবে সামান্য ধরেছিল বোধহয় ৷ তা নয়তো জানলার বাইরে বাতাবিলেবুর গাছটা দেখা যেত না ৷ এমনকি একটু ঠাহর করলে পাশের বাংলোটাও যেন আবছা আবছা নজরে আসছিল—ভালো... ৷ সমাদ্দারমশাই ক্লিপ খুলে ভেতর থেকে সাবধানে প্লাস্টিকে জড়ানো এক গোছা কাগজ বার করলেন—‘‘প্রথমে ছবি ৷ ছবিগুলো দেখো, আমি ব্যাকগ্রাউন্ডটা বলতে থাকি... ৷ নয়তো এ কথা জানাবার কেউ থাকবে না ৷ কেউ তো জানে না ৷’’

বিদিশা খানিক উৎসুক হয়েই চেয়ে রইল তাঁর ক্রিয়াকলাপের দিকে—বাকিটা ভান ৷ পুরোনো ছবি-টবিতে সত্যিই কৌতূহল হয় ৷ আগেকার হাতে গোনা অল্প সংখ্যক সাদা-কালো ছবি, তার পেছনে কত ঘটনা, কত চরিত্র, এখনকার দিনের মতন উপচে পড়া ছবির প্রোডাকশন তো নয়, যা তোলার লোকের অভাব নেই! অভাব কেবল দেখবার লোকের ৷ তবে এমন সরল খ্যাপাটে, স্নেহপ্রবণ মানুষের সামনে একটু বেশি মাত্রায় কৌতূহলও না দেখালেই নয় ৷ এ যেন তাঁর অফুরন্ত নির্ভেজাল বাৎসল্যের সামান্য প্রত্যুত্তর—‘‘প্রথমে এটা দেখো, চিনতে পারো...?’’ উনি প্যাকেট থেকে সযত্নে একটা মাঝারি আকারের ছবি বার করে নিজেই মন দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন—‘‘রঞ্জু ৷ রাঙামামার বাড়ির পেছনে সবাই ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল, বিশ্বকর্মা পুজো ৷ হাঁদাটা হাঁ করে বসে বসে দেখছিল ওই বদমাশগুলোর কসরত ৷ কী মিষ্টি মুখখানা দেখো...? অপূর্ব সুন্দর ৷’’ প্রশান্তকুমার চকচকে চোখে নিজের মনেই মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে হাসছিলেন, ভাবছিলেন, বলছিলেন নানান কথা—তবে, বিদিশাকে দেখাচ্ছিলেন না তেমন, ভুলেই গিয়েছিলেন ৷

তাঁর সোনামামা নাকি একটা ক্যামেরা দিয়েছিলেন, মানে বিদিশার শ্বশুর—আগফা ক্লিক থ্রি ৷ তা-ই দিয়ে তোলা ৷ সে সময় ওইটুকু খরচ করতেই প্রাণ বেরুত—ফিল্ম কেনা, ওয়াশ করা, প্রিন্ট..., সে বেজায় খরচ ৷ কতটুকুই বা মাইনে পেতেন... ৷ ওই ছুটিছাটায় আসবার সময় ফিল্ম ভরতেন ৷ বছরে ওই একটিবার, আর বাকি বছরটা সেই ছবি চেয়ে চেয়ে দেখতেন প্রাণ ভরে ৷ কোলের ওপর হাত জড়ো করা, গায়ে গেঞ্জি, ঢলঢলে প্যান্ট, পাশে জামাটা খুলে রেখেছে, ভাদ্দর মাসের গুমোট গরম তো! জামার রংটা ছিল ঘন নীল, তাতে সাদা সাদা ফুটকি ৷ সেবারই পুজোতে পাওয়া..., অন্যদেরগুলো একরঙা, কেবল ওরটাতেই..., স্পেশাল কিনা!

বিদিশা এবার হাত বাড়াল, আর অবাক হয়ে দেখল সত্যি, এ সময়কার এমন স্বাভাবিক আটপৌরে ছবি সে কখনও আগে দেখেনি, চমৎকার ৷ ঘামে লেপটে থাকা এলোমেলো চুল, আকাশের দিকে চেয়ে থাকা বড়ো বড়ো চোখ..., কী টুলটুলে মিষ্টি মুখটা!

প্রশান্তকুমার একের পর এক ছবির পসরা বার করে রাখছিলেন সামনের টেবিলে, সঙ্গে ধারাবিবরণী, আর বিদিশাও মনোযোগ দিয়ে দেখে দেখে মিলিয়ে নিচ্ছিল তার সঙ্গে... ৷ কখনও গাছে উঠে পেয়ারা খাচ্ছে, কখনও ছোট্ট ছাগলছানা কোলে হাসছে হি হি করে, নয়তো স্কুলের ফাংশনে মাইকের সামনে কবিতা বলছে, মাথায় টুপি, গলায় স্কার্ফ বেঁধে বিউগল বাজাচ্ছে পনেরোই অগস্ট, স্যাক রেসে বস্তায় ঢুকে লাফাচ্ছে সবার সাথে, তারপর কতরকম সময় কতরকম ক্ষেত্রে পুরস্কার নিচ্ছে ঝুঁকে ঝুঁকে... ৷ কলেজ হস্টেলেরও কিছু ছবি আছে, তাতে রঞ্জন নেই—কেবলই ক্লীবনিং ৷ রঞ্জনের ঘর, ডাঁই করা বই... হাবিজাবি..., মশারি ঝুলছে, খাটের ছত্রিতে জামা-প্যান্ট, ডাইনিং হল, কমন রুম... ৷ এ ক্ষেত্রে রঞ্জনের হয়তো মজা লাগবে, তবে বিদিশার তেমন কিছুই লাগল না ৷ এর পর শুরু হল কাগজের কাটিং ৷ কোথায় কোথায় খেলতে গিয়েছে, কোথায় ডিবেটে প্রাইজ পেয়েছে, কোথায় বিজ্ঞানমেলায় ভাগ নিয়েছে ৷ এসব খুব বেশি নয়, সামান্যই, তবু পড়তে তো হবে ৷ অতঃপর চিঠি ৷ বাঁকা বাঁকা হাতের লেখায় ‘দাদামণি, তুমি এসো—ইতি রঞ্জন ৷’ যুক্তাক্ষর শেখেনি তখনও ৷ কখনও কারও সম্বন্ধে নালিশ—তাকে বিছানার ধারে শুতে দেওয়া হয় না, ডিমের কুসুমটা খেয়ে ফেলে ৷ কখনও ‘এবার এলে যেন দীপকের মতন একটা পেনসিল বক্স আনে—গিটারের শেপ-এ ৷’

চিঠি সাকুল্যে খান চার-পাঁচেক মাত্র, কিন্তু তার আনন্দের রসদ একেবারে অ-সী-ম ৷ এক-দু’লাইনের চিঠি, খুব বেশি হলে পাঁচ-সাত ৷ কোনটা পেনসিলে লেখা, কোনওটা কলমে, দুটো ছবিও আছে—জাহাজ আর শুঁয়োপোকার ৷ পাঠ্য বই-টই থেকে দেখে আঁকা ৷ বিদিশা উলটেপালটে দেখছিল তারিখ-সাল, হাসছিল—সত্যিই অমূল্য রতন ৷

প্রশান্তকুমার প্রথমে উৎসাহ নিয়ে কথা বলছিলেন ঢের, শেষে কখন যে চুপ করে গিয়েছেন, বিদিশা ঠিক খেয়ালই করেনি ৷ এতক্ষণে ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়ই ৷ কত রাত হল..., তা বাদে ট্রেন জার্নি, আর সে জার্নিও যে কেমন, সে তো এতক্ষণেও শুনে উঠতে পারল না ৷ বিদিশা হাতের ছবি, চিঠি গুছিয়ে নিয়ে ডাকল, ‘‘দাদামণি? এবার উঠুন, অনেক রাত হল... ৷ আপনার বিছানা করাই আছে ৷’’

মিঃ সমাদ্দার গভীর নিদ্রা থেকে যেন সামান্য চোখ মেলে তাকালেন ৷ চোখের পাতা ভারী, মুখটা খানিক ফাঁক—কী অসম্ভব ক্লান্ত, ফ্যাকাশে আর দুর্বল দেখাচ্ছে ৷ সোফায় বসেই মাথাটা ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন, চোখটা আবার বুজে যাচ্ছে ধীরে ধীরে ৷ বিদিশা আবার ডাকল, ‘‘দাদামণি—?’’ ধড়মড় করে নড়েচড়ে এবার বসলেন খাড়া হয়ে ৷ কাঁপা-কাঁপা হাতে তাড়াহুড়ো করে, বিদিশার সামনে থেকে প্যাকেটটা তুলে ভরতে লাগলেন ছবিগুলো ৷ ঠিকমতন ঢোকাতে পারছেন না, এলোমেলো হয়ে ঝরে যাচ্ছে হাত থেকে ৷ তুলতে গিয়ে ঝুঁকে পড়ছেন মেঝের দিকে, টেবিলে গুঁতো খেলেন ৷ বিদিশার অবাক লাগছিল—কী হল হঠাৎ? শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে? সারাদিনে ওষুধপত্তর হয়তো কিছুই খাননি নিয়ম করে? এতটা অসুস্থ...!

প্রশান্তবাবু কোনওমতে ঠেসেঠুসে প্যাকেটের মধ্যে সব ভরে নিয়ে, বিদিশার হাতে গুঁজে দিলেন—তবে কীভাবে যে দিলেন, সে আর বলবার নয় ৷ তারপর ভাঙা-ভাঙা ফ্যাসফেসে গলায় ঢোঁক গিলে, শ্বাস নিয়ে যা বললেন, তা হল—তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয়, স্নেহের ধন, আনন্দের উৎস, উৎসাহের প্রেরণা—এই কনিষ্ঠ ভ্রাতৃবধূকে কোনও দিনও কিছু দিতে পারেননি ৷ একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাত্র, সেটাও রাখতে পারবেন না? এমনই হতভাগ্য তার? আজ তাই বহু কষ্টে, মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রমে, সমগ্র একাগ্রতা আর সাধনার জোরে বিদিশার কাছে এসে পৌঁছুতে পেরেছেন ৷ তাঁর মতন পাপী-তাপীর পক্ষে যা বলা যায় অসাধ্যসাধন ৷ জীবদ্দশায় তিনি কিছুই করতে পারেননি, কিছুই নয়, কিন্তু আজ এই..., বলে, এ সময় এমন কাশতে থাকলেন, যে শেষই করতে পারলেন না কথাটা ৷ শেষে সামান্য সামলে নিয়ে ফের বললেন, শেষমেশ এটুকু যে পেরেছেন, তাতে তিনি তৃপ্ত ৷ শান্তি পেলেন ৷ উনি যে এখানে আসবেন বলতেন, তাদের কাছে, সে তো আর কেবল কথার কথা নয়... ৷ কবে থেকে এগুলো গুছিয়ে রেখেছেন, আগলে আগলে, বুকে ধরে, সে তো তাদের জিম্মায় দেবেন বলেই! না আসতে পারলে কী হত? কোথায় যেত এসব অমূল্য ধন? ...ইত্যাদি ৷

এ কথাগুলো যে তিনি কত পরিশ্রমে আর কত সময় নিয়ে বলে উঠলেন, সে কেবল বিদিশাই জানে ৷ কাশছিলেন, হিক্কা উঠছিল, মাঝেমধ্যে ফিসফিসিয়ে, কখনও খোনা গলায় ঘড়ঘড়ে শব্দ তুলে... ৷ শেষে ওই অবস্থাতেই আবার টলোমলো পায়ে উঠেও দাঁড়ালেন, দেয়াল ধরে ধরে এগিয়ে গেলেন বসার ঘর ছেড়ে, তাঁর নির্ধারিত বিশ্রামকক্ষটির দিকে ৷ বিদিশা হাত বাড়াচ্ছিল ধরবার জন্য, উনি হাত নেড়ে মানা করলেন, ফলে সে যে এমন অবস্থায় কী করবে বুঝেই উঠতে পারছিল না, কেবল সন্তর্পণে পেছন পেছন এগুতে লাগল ৷ করিডোরের শেষ প্রান্তে, যেখানে লম্বা তারের ডগায় বাহারে ঢাকা দেওয়া একটা আলো ঝুলছে, কোনওক্রমে এতটা পৌঁছে, দরজার ল্যাচ ধরে টাল সামলে ঘুরে দাঁড়ালেন পেছন ফিরে—‘‘ছো-টো, তুমি... যা ও..., আর পারছি না, পারছি না... ৷’’ শেষে হ্যাঁচকা টানে দরজাটা খুলে ভেতরে প্রায় হুমড়ি খেয়ে ঢুকে পড়লেন ৷ ঘরটা অন্ধকার ছিল ৷ বিদিশাও না ঢুকেই দরজার পাশে আলোর সুইচটা টিপে দিল ৷ ঘরে টানটান বিছানা পাতাই আছে, সাইড টেবিলে জলের বোতলও, ওঁর ছোটো ব্যাগটা কোথায় রেখেছেন কে জানে...! প্রশান্ত সমাদ্দার হাত নেড়ে বিদিশাকে বেরিয়ে যেতে বললেন, দরজা বন্ধ করবেন ৷ করুন, কিন্তু এমন চেহারা...! গোটা মুখে যেন ছাই মাখা, ফ্যাকাশে চামড়া, ফোলা, আধবোজা চোখের কোণ বেয়ে জল গড়াচ্ছে, মুখটা যেন সামান্য বাঁকাও লাগছে না? এমনটা তো ছিলেন না খানিক আগেও? এসেছিলেন তো দিব্যি! রোগা হয়েছেন, বয়সও বেড়েছে—কতদিন ধরে অতটা অসুস্থ ছিলেন, তার প্রকোপ তো পড়বেই, শরীরে! তবু হাসিখুশি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, উগ্র সেন্টের গন্ধ ছড়িয়ে... ৷ কত গল্প হল, কত রসিকতা, বিকেল থেকে বিদিশার ওই অস্বস্তি, ভয়-দুর্ভাবনা কোথায় যে উড়ে গিয়েছিল এক নিমেষে... ৷ কিন্তু এখন এ আবার কী শুরু হল? এতটা অসুস্থ অথচ একরোখা মানুষকে নিয়ে এমন বিভুঁইয়ে কী যে করবে সে! হতভম্ব বিদিশা এমনিতেও ঘরে অবশ্য ঢোকেনি, তবু দু’পা পিছিয়ে গেল, আর তৎক্ষণাৎ উনি দরজাটা বন্ধ করতে করতে বললেন, ‘‘মঙ্গল করুন, ভ-গ-বা-ন, স-বা-র ভা-লো...’’ আর কোনও কথা শোনা গেল না ৷ তবু বিদিশা দরজায় টোকা দিয়ে বলল, ‘‘দাদামণি, দরজায় ছিটকিনি দেবেন না, শুনছেন?’’ তেমন কোনও উত্তর পেল না, এমনকি অন্য কোনও শব্দও নয় ৷ শুয়ে পড়লেন? বিদিশা বন্ধ দরজায় সামনে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে—না, সম্পূর্ণ নিঃশব্দ!

হঠাৎ কী যে হল, এমনটা করবার মানে কী? বিদিশার একদম ভালো লাগছিল না ৷ অকস্মাৎ যদি শরীরটা বেশিই খারাপ লাগে, ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েন? যার কাছে এসেছেন এত দূর থেকে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে, তাকে তো বলবেন ৷ তাকে ছুঁতেও না দিয়ে, ধুম করে দরজা বন্ধ! এ কেমন ব্যবহার? কোনও ওষুধপত্তরের রিঅ্যাকশন মানে কুফল, নাকি সময়মতন নিয়ম করে তা না খাবার ফল? তা ছাড়া ওঁকে কতটুকুই বা চেনে সে? হয়তো বা এমন ওলটপালট হতেই থাকেন তিনি দিনরাত! মুড চেঞ্জ! আর তার সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু! হাতে গুনে ক’বারই এদিক-ওদিক দেখেছে মাত্র আর কদাচিৎ টেলিফোনে বাক্যালাপ—তা, তার থেকে কী-ই বা জানতে পারবে? খ্যাপ্যাটে, পাগলাটে, বেশি রকমের ইমোশনাল ৷ রাতের দিকে হয়তো এরকমই বেসামাল হয়ে যান, কে জানে! অত মদ খেতেন, এ কি তারই জের নাকি? বিদিশা বড়ো দরজার বন্ধ ছিটকিনি পরখ করে, রান্নাঘর, বসার ঘরে আলো নিবিয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল—না, বাকি সব ঠিক আছে ৷ করিডোরের বাতিটা জ্বলুক, রাতে এসে আবার একবার দেখে যাবে’খন... ৷ অবশ্য রাতের আর বাকিই বা কী, মাঝরাত তো কখন পেরিয়ে গিয়েছে... ৷ এর পর ঘুমও কি আর আসবে? বিদিশা দোতলার সিঁড়ির দিকে চলল ৷

অবিরাম বৃষ্টি আর বৃষ্টি ৷ আকাশ একেবারে দাতাকর্ণ হয়ে বসে আছে ৷ বৃষ্টির ঝুলি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই দান চলতেই থাকবে... ৷ চলুক... ৷

অতঃপর জামা-টামা বদল করে, আলো নিবিয়ে এবার বিছানাতেই গেল—ঘুম আসুক আর না আসুক, চোখ বন্ধ করে শুয়ে তো থাকা যাক! ওই থাকতে থাকতেই যদি..., আসলে এমন অশান্ত, অস্থির মনে ঘুম কিছুতেই আসে না ৷ টালির ছাদে ঝপঝপ, পুলের জলে ছপছপ, চিকের গায়ে ঝমঝম—আ-দিগন্ত কেবল বারিষধারায় ঢাকা—নানান শব্দের সমন্বয় ৷ তবে তুলনামূলকভাবে বিকেলের থেকে মনে হয় কম ৷ আগামীকাল হয়তো আরও কম হবে, পরশু আরও, আরও কম, হতে হতে একেবারেই ভ্যানিশ... ৷ যদিও প্রশান্তকুমারকে পিপলিপুরা ঘুরিয়ে দেখাবার শখ মিটে গিয়েছে ৷ এমনকি নিজের মনে রাস্তা ধরে হেঁটে চলার শৌখিনতাও আর নয় ৷ তবু বিদিশার এই মুহূর্তে প্রাণমন দিয়ে আর কিছু না, শুধু মাত্র এই অলুক্ষুনে বৃষ্টি থেকে পরিত্রাণ পেতে ইচ্ছে করছিল মাত্র ৷ আর সেটি বন্ধ হলেই একটি কামনা— তার স্বামীর এই অসুস্থ অগ্রজটি যেন তাকে আর কোনও বেশিরকম দুর্বিপাকে না ফেলে, কোনওক্রমে সময়মতন ফিরে যেতে পারেন—ব্যাস, আর কিচ্ছুটি নয়, এবং ভালোয় ভালোয় এ ঝঞ্ঝাটটি মিটে গেলে, সে আর কোনও দিনও, কাউকে নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে পিপলিপুরায় আমন্ত্রণ জানাবে না—প্রতিজ্ঞা... ৷ তার নিজের জীবনে ঝঞ্ঝাট যেন কিছু কম আছে, যে সাধ করে খাল কেটে কুমির ডেকে আনতে হবে? যতই স্নেহপ্রবণ, দুঃখী, একাকী হোন না কেন, প্রচণ্ড অসুস্থ, ভয়ানক অস্বাভাবিক এবং অতিরিক্ত অদ্ভুত তো বটে! এমন একজন প্রায় অচেনা, অজানা, কেবলমাত্র লোকমুখে শোনা গল্প-কাহিনির চরিত্রকে নিয়ে, এভাবে এখানে লাফাতে লাফাতে চলে আসবার মতন হঠকারিতা সে বুঝি আর জীবনেও করেনি ৷ রঞ্জন যদি আর-একটু জোর দিয়ে বারণ করত...! যা-ই হোক, সে ভুল, দোষ বা বোকামি—যা-ই হয়ে থাকুক, আর ও নিয়ে কোনও চিন্তা নয় ৷ এখন সে নিশ্চিন্ত, নির্ঝঞ্ঝাট ঘুমের জন্য ভেড়া গুনবে ৷ গুনতে গুনতেও ঘুম না এলে সাপ, ব্যাঙ, টিকটিকি, আরশোলা সবার চোদ্দো গুষ্টিকে টেনে এনে তাদেরও লাইন করিয়ে গুনতে থাকবে ৷ তবু তেনার কথা আর মাথায় আনবে না—ঢের হয়েছে, নমস্কার প্লাস ক্ষ্যামস্কার... ৷ বিদিশা মস্ত একটা হাই তুলে, বর্ষণমুখরিত অন্ধকারে, গায়ের চাদরটা গলা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গুটিশুটি দিয়ে পাশ ফিরল... ৷

‘ঘুম আসবে না’, হেনতেন আগে থেকে কত কিছুই না ভেবে রেখেছিল বিদিশা ৷ আদতে কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, সেসব কিছুই না ৷ তা সে মাঝরাত বা শেষ রাত, যা-ই পার হয়ে যাক না কেন, সেই স্বল্প দৈর্ঘ্যের চমৎকার নিটোল, গাঢ় ঘুমটা আসতে সময় লেগেছিল বড়োজোর মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিট ৷ কেবল তা-ই নয়, সময়মতন সকালে তা ভাঙলও বটে ৷ আকাশ তখনও অন্ধকার না হলেও মেঘলা ৷ রোদ-টোদ ওঠবার কোনও সম্ভাবনা নেই ৷ গতকালের মতনই বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরিঝিরি—সকালের দিকে হয়তো এমনধারাই হবার রেওয়াজ, তারপরে বাড়বে ধীরে ধীরে...!

এক পয়েন্টে হালকা করে পাখা চলায়; এই বাদলার সকালে শীত করছিল বেশ ৷ সে কারণেই ঘুমটা ভেঙেছে হয়তো, কারণ পাতলা চাদর গায়ে থাকলেও কুঁকড়ে-মুকড়ে শুয়ে ছিল সে—হাতের তেলো, পায়ের পাতা ঠান্ডা ৷ নিস্তব্ধ, নিরালা বাড়িতে কেবল পাশে রাখা ঘড়ির শব্দ হচ্ছে—টিক, টিক, টিক... ৷ এমনটা না হলে, আরও ঘণ্টা দু’য়েকের আগে হয়তো চোখই খুলত না ৷ আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে গিয়ে হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসে ঘড়ি দেখল বিদিশা ৷ ওরে বাবা রে, গতকালের কথা যে কেমন বেমালুম ভুলে গিয়েছিল! তার কি এখন আলসেমি করবার সময়? নীচে কী যে চলছে কে জানে! তবে বেলা তত হয়নি—আটটা দশ ৷ ঝটপট তৈরি হয়ে, গতকাল থেকে জ্বলতে থাকা বাতিগুলো নেবাতে নেবাতে নীচে নামল বিদিশা ৷

সিঁড়ির শেষে বাঁ দিকে ঘুরলে রান্নাঘর, ডান দিকে করিডোরের শেষে গেস্টরুম ৷ বিদিশা বাঁ দিকে যেতে গিয়েও কী ভেবে একবার দাঁড়াল ৷ দিনের আলোয় জ্বলে থাকা চারিদিকের আলোগুলো কেমন অদ্ভুত ম্রিয়মাণ নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে, আর গতকাল রাতের দাদামণির সেই উগ্র কড়া সেন্টের গন্ধ গোটা রাত ধরে বন্ধ ঘরে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে, ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে উৎকট বাস ছড়াচ্ছে—থাক ৷ গতকাল মাঝরাত পর্যন্ত যা গিয়েছে! এখন এই শান্ত সাতসকালে আবার করে আর কোনওরকম ঝঞ্ঝাট নেবার এতটুকুও উৎসাহ পাচ্ছিল না বিদিশা ৷ থাকুন যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুমিয়ে ৷ ডেকে তুলে চা দেবার মতন আহাম্মকি আর করে সে? বিদিশা চা ভিজিয়ে দিয়ে, পর্দা-টর্দা সরিয়ে কোনওক্রমে সকালটাকে যেন ঘরে টেনে আনবার চেষ্টা করল ৷

জানলার কাচে বাষ্প, মেঝে মনে হয় ভেজা ন্যাকড়ায় মোছা হয়েছে এইমাত্র ৷ সোফায় কুশন-টুশনও তথৈবচ ৷ বিদিশা গরম চায়ের মগ নিয়ে কোথায় বসবে বুঝে উঠতে পারছিল না ৷ সমাদ্দার মশাইও কখন ওঠেন সাধারণত, সে-ও বলেননি কিছু, ফলে বিদিশা জানলার ধারেই দাঁড়িয়ে রইল সামান্যক্ষণ ৷ অবশ্য বলবেই বা কী? ঠিকঠাক বলবার অবস্থা কি আর ছিল তাঁর শেষ পর্যন্ত? হাঁপিয়ে-টাপিয়ে, হিক্কা তুলে, টলোমলো পায়ে পড়ি-মরি করেই তো ঢুকে গেলেন ঘরে ৷ তখন ওই গভীর রাতে এরকম দস্তুরি কথাবার্তার আর সুযোগই বা হল কোথায়? তবে তারই মধ্যে কাল রাতে কথায় কথায় শুনেছিল মনে আছে যে, আদা দিয়ে দুধে ফোটানো চা খান তাঁরা ৷ বাঙালি গৃহস্থ বাড়ির টুপি পরানো, পটে ভেজানো বিবিয়ানা চা তাঁর মুখে রোচেই না মোটে ৷ তা, এবার বোধ করি হাই টাইম, সেরকম এক কাপ চা নিয়ে দরজায় টোকা মারা—যদি উঠে থাকেন? আফটার অল, অতিথি তো বটে, তায় গুরুজন এবং অসুস্থ ৷

আদা-টাদা ছেঁচে তরিবত করে চা বানিয়ে গেস্টরুমের দিকেই যাবার কথা ভাবছিল, কিন্তু খানিক তফাতে ছাতা মাথায় সুধীর আর তার সহকারীকে দেখতে পেয়ে মত বদলাল বিদিশা ৷ প্রকাশ্য দিবালোক না হলেও, যথেষ্ট আলোক তো বটেই, ফলে গতকালের মতন বিভ্রান্তির কোনওই কারণ নেই ৷ দাদামণি উঠে পড়লে তাঁর সামনে আর জিজ্ঞেস করা হবে না ৷ তবে তার বড়ো কৌতূহল হচ্ছিল, কাল রাতে কখন, কীভাবে তিনি এলেন ৷ আর ওই তুমুল বৃষ্টিতে গেটটা খুললই বা কে? সেই হস্টেলের উদ্ভট প্রক্রিয়ায় কোনওক্রমে ঠেলেঠুলে, চেঁচিয়ে, ধাক্কা মেরে খুলিয়েছেন তো বটেই, কিন্তু সে আওয়াজই বা তারা পেল কীভাবে? পটকা ফাটালেন নাকি? সত্যি, অসীম ক্ষমতা! এমনিতেও তাকে ওদিকে গিয়ে একবার রঞ্জনকে ফোনের জন্য চেষ্টা করতে হবে—টাওয়ার আসেই না এদিকে! ফলে বড়ো ছাতাটা খুলে, সাবধানে জল বাঁচিয়ে কাছাকাছি গিয়ে বলল, ‘‘সুধীর?’’

‘‘গুড মর্নিং ম্যাডাম...’’ হাসল সুধীর, অন্য ছেলেটিও হাত ঠেকাল কপালে ৷

‘‘গুড মর্নিং ৷ আচ্ছা শোনো...?’’ কৌতূহলী প্রশ্নটা কীভাবে শুরু করবে সামান্যক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, ‘‘ কাল... সাহেবের দাদার যে আসবার কথা ছিল, জানো তো...?’’ কথাটা শেষও হয়নি, ঠিক সেই মুহূর্তেই বিদিশাকে অবাক করে দিয়ে প্রায় দেড় দিন পরে ওর হাতের ফোনটা সহসা সুরেলা শব্দে বেজে উঠল—টিং টিং টিং... ৷ আহ, রঞ্জনের ফোন ৷ সুধীররা বশংবদ দাঁড়িয়ে ছিল, ম্যাডাম কাল রাতের কথা কী যেন বলছিলেন, তা শোনবার জন্য ৷ বিদিশা হাত নেড়ে ওদের একটু অপেক্ষা করতে বলল ইশারায় ৷ ‘‘বাবা রে, এতক্ষণে এসেছে ফোন, সে আবার কখন কেটে যায়...’’ বলে, ফোনের বোতাম টিপল সাবধানে—‘‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, রঞ্জন? কাল থেকে ফোন তো বিকল...,র্যাদার পরশু থেকেই... ৷ এই তো প্রথম রিং হল..., যা কাণ্ড চলছে...! তোমরা সব ঠিক তো...? হ্যা-লো-ও-ও, শুনতে পাচ্ছ...?’’ স্বাভাবিক উৎকণ্ঠায় একনাগাড়ে খানকতক প্রশ্ন করে সামান্য থামতেই ওপার থেকে রঞ্জনের সম্পূর্ণ স্পষ্ট, পরিষ্কারভাবে গলা খাঁকরানির আওয়াজ শোনা গেল ৷ যেন, গলা-টলা পরিষ্কার করে বেশ গুছিয়ে-গাছিয়ে তৈরি হল কথা বলবার জন্য ৷

‘‘...হ্যাঁ..., এমনিতে আমরা তো ঠি-ক-ই ৷’’ রঞ্জনের এমন দোনামোনা স্বরে ‘ঠিক’ থাকাটা কেমন যেন বেঠিকই ঠেকল বিদিশার কাছে ৷ বলল, ‘‘আর অমনিতে...?’’ —‘‘অমনিতে বলতে..., তুমি যে জন্য গেলে..., মানে..., এত ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট করে..., মানে...’’

বিদিশার আর ওই টেনে টেনে কথা শোনবার ধৈর্য থাকছিল না, বিরক্তি হচ্ছিল মনে মনে ৷ বলল, ‘‘মানে কী? বলবে তো?’’

‘‘না, মানে, কাল রাতে..., দাদামণি আর নেই... ৷’’

বিদিশা বুঝতেই পারল না, নাকি ধরতেই পারল না, কে জানে, মোটামুটি স্বাভাবিক, নিশ্চিন্ত গলাতেই বলল, ‘‘কে নেই বললে?’’ ওই সামান্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যে, ও যে তার নিকট ভালোবাসার মানুষগুলোকে কী ভয়ংকর সব বিপদের ভেতর ঘুরপাক খাওয়াচ্ছিল, যাতে করে মাথাটাই খেলছিল না নিশ্চয়ই ৷ রঞ্জন আবার একটু সময় নিয়ে বলল, ‘‘দাদামণি..., বিদিশা, দাদামণি... ৷’’

এবার স্পষ্ট উত্তরটা পেয়েও, কী এক অজ্ঞাত কারণে শ্বাস ছেড়ে হালকা গলায় বলল, ‘‘ও-ও-ও ৷’’ আসলে, হাজার দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা স্থায়ীভাবে থাবা গেড়ে বসেই থাকে মনের কোণে, যার জন্য মাথাটা একটু এলোমেলো হয়ে যায় ৷ তা বাদে, গতকালের রাত সমেত গোটা দিনটা তো বলা যায় বেশ বেশিরকমই ওভারডোজ ৷ তা না হলে সাতসকালে এ হেন একটা খবর পেয়েও কেউ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে! তবে মন্দের ভালো এই যে, খুব মন্থর গতিতে হলেও, ওর সংবিৎটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে ফিরেও আসছিল ৷ তারই ফলস্বরূপ ক্ষীণ অস্ফুট স্বরে বলল, ‘‘দা-দা-ম-ণি, মা-নে প্র-শা-ন্ত-ও-ও—’’, ওপার থেকে রঞ্জন এই ভাব প্রকাশটা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিল ৷ যার জন্য এতদিন ধরে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে, হাজার কাজ ফেলে, হাঁপিয়ে-দাপিয়ে ওই নির্বান্ধব পুরীতে বন্যাপ্লাবনের মধ্যে বসে বসে অপেক্ষা করছে, হঠাৎ যদি শোনে সে আর কোনওমতে, কোনও দিনই পৌঁছুতে পারবে না সেখানে—এমন একটা খবর দেওয়া এবং নেওয়া দুটোই প্রায় সমানভাবে ভয়ানক ৷ খুব নরম গলায় বলল, ‘‘হ্যাঁ বিদিশা, দাদামণি ৷ তুমি নিশ্চয়ই চেন্নাই থেকে আর কথাই বলতে পারোনি?’’

ভাবলেশহীন গলায় বিদিশা বলল, ‘‘না... ৷’’

‘‘দিন পাঁচেক আগে আবার শরীরটা নাকি খারাপ হল, সেদিনই ভরতি করবার কথা, কিন্তু জ্ঞান থাকতে কিছুতেই যাবে না ৷ ভাবছিল হাসপাতালটা ঠেকিয়ে রাখতে পারলে, পিপলিপুরা আর ঠেকায় কে ৷ পরদিন অবস্থা বেশি খারাপ হতে ভরতি করল..., তখন আর জ্ঞান তেমন ছিল না বললেই হয়... ৷’’

বিদিশা এপার থেকে বিড়বিড় করল, ‘‘না, ছিল তা নয়তো আর কেউ টেলিফোন করতে পারে? ওটা আসলে টেলিফোনের গোলযোগ ছিল না, ছিল প্রাণযন্ত্রের, আমি বুঝিনি ৷’’ রঞ্জন এসব কথা কিছুই বুঝতে পারছিল না ৷ ভাবছিল বিদিশা বুঝি ওপার থেকে নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ৷ সামান্য সময় দিয়ে বলল, ‘‘পরশুর আগের দিন থেকে ভেন্টিলেটরে ছিল, গতকাল রাত আটটা নাগাদ সব শেষ... ৷ রাতটা মরচুয়ারিতে রেখেছিল—এদিক থেকে যদি কেউ যায় ৷ কে আর যাবে! সবারই বয়স হয়েছে, এমন হুট করে তো..., তাই সকালেই ৷ বুঝলে বিদিশা, তোমার তো অবস্থা বুঝতেই পারছি..., কিন্তু আমারও কেমন যে লাগচ্ছে...! কাল রাতে বারবার ঘুম ভেঙেছে ৷ ভোরের দিকে চোখটা বোধহয় একটু লেগেছিল—স্পষ্ট মনে হল, একদম মাথার কাছে দাঁড়ানো ৷ চেনাই যাচ্ছে না ৷ রো-গা... ৷ আমার দেখা দাদামণি এ যেন নয়, তবু কী করে বুঝলাম কে জানে? সেই থেকে জেগেই আছি ৷’’

বিদিশা আবারও ফিসফিসিয়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, বড্ড রোগা, তোবড়ানো গাল, দাঁত বাঁধানো ৷ সত্যি চেনা যায় না ৷’’ রঞ্জন নিজের থেকেই বলে যাচ্ছিল, ‘‘কিছুদিন যাবৎ এতটাই ভালো ছিল, বুঝলে..., একদম নাকি ফিট ৷জিনিসপত্তর গুছিয়ে-গাছিয়ে..., স্যুটকেসে একেবারে তালা-টালা লাগিয়ে রেডি... ৷ বারবার সবাইকে বলছে, ছোটোকে নাকি কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রক্ষা করতেই হবে... ৷ নয়তো মুখরক্ষা হবে না, সে ভারী লজ্জার! দারুণ ভালোবাসত তো তোমায়! বুলুদি তো তাই বলছিল ৷ কত লোককে সারাজীবন ধরে কত প্রতিশ্রুতি যে দিল, এখন তো দেখা যাচ্ছে ছোটোর প্রতিশ্রুতিরক্ষার ঠ্যালায় মরেও যেন আর শান্তি পাবে না ৷’’

বিদিশার এসব পারিবারিক কূটকচালি শুনতে একদম ভালো লাগছিল না ৷ ধীরে বলল, ‘‘তোমায় সব ভুলভাল তথ্য দিয়েছে তোমার বুলুদি, রঞ্জন... ৷’’

‘‘অ্যাঁ...?’’

‘‘হ্যাঁ ৷ ঠিক আছে ৷ পরে কথা হবে, এখন রাখছি... ৷’’ বলে, ফোনের বোতাম টিপে দিয়ে মনে মনে বলল, ‘‘স্যুটকেস গোছাননি, ওটা ছিল ছোটো একটা হ্যান্ডব্যাগ—গ্রে রঙের, যার সামনের দিকের বড়ো একটা পকেটে উঁচু হয়ে ছিল তোমার জীবনের নানা তথ্যে সমৃদ্ধ সেই রেক্সিনের পোর্টফোলিয়োটা... ৷’’

সনৎ অপেক্ষা করে করে অন্য দিকে চলে গেলেও, সুধীর তখনও দাঁড়িয়ে ছিল বিদিশার নির্দেশের অপেক্ষায় ৷ এখন ফোন বন্ধ করতেই জিজ্ঞেস করল, ‘‘সাহেবের দাদার কথা কী বলছিলেন ম্যাডাম? উনি কি আজকে আসবেন বললেন?’’

বিদিশা খুব ধীর-স্থিরভাবে কাউকে কোনও স্বাভাবিকতা বুঝতে না দিয়ে মাথা নাড়ল—না ৷ অর্থাৎ আসবে না ৷ তারপর মুখে বলল, ‘‘সাহেবের দাদার কথার জন্য না, বলছিলাম—ছ’নম্বর বাংলোর দোতলার শোবার ঘর খুলে আলো-পাখা বন্ধ করে দিয়ো, গতকাল থেকে চলছে ৷ মেয়েরা পরিষ্কার করে, বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে... ৷ আমার ঘর থেকে স্পষ্ট দেখা যায় কিনা..., বিদ্যুতের কী অপচয়!’’

সুধীর সাত হাত জিব কেটে স্যরি বুঝিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল—বিদিশা আর দাঁড়াল না ৷ ভেজা ছাতাটার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব ভয়, ত্রাস, বেদনা, দুঃখ, কৌতূহল, বিরক্তি ইত্যাদি সবরকম সম্ভাব্য অনুভূতিগুলোও ঝেড়েঝুড়ে ফেলে, বন্ধ করে, পোর্টিকোর এক কোণে ঠেস দিয়ে রেখে সো-জা গেল রান্নাঘরে—যেখানে গতকাল রাতের খিচুড়ি খাওয়া—ধোয়া প্লেটটা ঠেকনা দিয়ে দাঁড় করানো, পাশে উপুড় করা কাঁচের গেলাসটাও ৷

অন্য দিকে ছোট্ট কাচের বাটিতে বাড়তি দুটো কাঁচা লংকা আর আচারের অবশিষ্টাংশ... ৷

এবার নিচু হয়ে ঝুঁকে গারবেজের জায়গাটা দেখল ৷ ক’টা ঠোঙা-মোঙা, এটা-সেটার ওপরে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে গত রাতের প্লেট থেকে ফেলা উচ্ছিষ্ট—ফোড়নের বড়ো একটা তেজপাতা, আধখানা শুকনো লংকা আর ঝটপট ভেজে দেয়া চাকা চাকা দুটো গোল বেগুন ভাজার, টেপের ফিতের মতন ন্যাতাপ্যাতা সরু সরু খোসা... ৷

এবার আর অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে, মরিয়া হয়ে বিদিশা এক ছুটে করিডোরের শেষ প্রান্তে গিয়ে গেস্টরুমের বন্ধ দরজার হাতলটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল শব্দ করে ৷ পর্দা টানা নিপাট বিছানা সমেত শূন্য ঘরখানা তখনও অন্ধকার ৷ এমনকি গতকাল সকাল থেকে যেমন গেলাস সমেত জলের বোতলটি ভরে রাখা ছিল সাইড টেবিলের ওপর—নিখুঁতভাবে ঠিক তেমনটিই পড়ে আছে সেখানেই... ৷ কেবল তফাতের মধ্যে ঘরের ভেতরটা একেবারে কনকনে বরফ-শীতল, যেন আইস বক্স অথবা রেফ্রিজারেটরের ফ্রিজার একেবারে ৷ তৎসহ গতকালের সেই উগ্র, উৎকট, সস্তা সেন্টের গন্ধের বদলে ফিনাইল ডেটল স্পিরিট, ব্লিচিং পাউডার অথবা ডিডিটি, গ্যামাক্সিন ইত্যাদি আরও হাজারোরকম অজানা-অচেনা ওষুধপত্তরের গন্ধযুক্ত বায়ুর সঙ্গে দমচাপা, স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা, কটু একটা দুর্গন্ধও... ৷

মাথাটা ঘুরে গিয়ে পুরো শরীরটাই দুলে উঠল বিদিশার, তার সঙ্গে গা গুলিয়ে বমি ভাব ৷ মাথার ভেতর কুলকুল করে ঠান্ডা স্রোতবয়ে যাচ্ছিল, চোখ অন্ধকার, হাত-পা অবশ—গতকাল গোটা দিন ধরে বারবার শারীরিক অস্বস্তির যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তারই যেন জবরদস্ত ফাইনাল পারফর্ম্যান্স একটা... ৷ খুবই অল্প সময় নিশ্চয়ই—কয়েকটা সেকেন্ড হয়তো বা, তারই মধ্যে কোনওমতে হাত বাড়িয়ে দরজার পাল্লাটা ধরে, চোখ বন্ধ করে, নিজেকে প্রাণপণ শক্ত হয়ে সামলে নেবার চেষ্টাটুকু করতে না করতেই—সঙ্গে সঙ্গে সেই গন্ধটাও কেমন ফিকে হতে হতে, ক্রমশ একেবারেই মিলিয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে ৷ বর্ষাকালের স্বাভাবিক একতলার বন্ধ একটা ঘর যেমনটা হবার কথা, তার চেয়ে কোনও দিক থেকেই অবাস্তব কিছুই নয়... ৷ বিদিশা এবার কলের পুতুলের মতন বসবার ঘরে এসে, বরফ-ঠান্ডা, কাঁপা-কাঁপা দুর্বল হাতে সেন্টার টেবিল থেকে তুলে নিল গতকালের উপহার; সেই দুষ্প্রাপ্য মহার্ঘ ছাইরঙা রেক্সিনের ফাইলটা ৷

আপাতত সাবধানে লুকিয়ে রাখতে হবে এটিকে ৷ তারপরে সময়-সুযোগমতন অন্য কোনও তালুক থেকে ডাকযোগে নিজেকেই, নিজের নামে, নিজস্ব ঠিকানায় পাঠাতে হবে অতি গোপনে, তবে অবশ্যই দাদামণি শ্রীপ্রশান্ত সমাদ্দারের ব’কলমে ৷ তা না হলে, কেউ বিশ্বাস করবে, এই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কল্পকথা? আর তার প্রয়োজনই বা কী!

রচনাকাল ২০১৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%