শেষ সমাচার

মিমি রাধাকৃষ্ণন

চেয়ারের ওপর পা-টা তুলে নিয়ে মাধুরী বলল—‘‘কনক, তোমাকে যে পাশের বাড়ির খবর নিতে বলেছিলাম, নিয়েছ?’’

কনক এমনিতেই দেড়ফুটিয়া, তায় বসে বসে ঘর মুছছে, ফলে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রায় আকাশপানে চেয়ে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল—‘‘আমারে আবার কীসের খবর নিতে কইলেন দিদি?’’ ওর কথার ধরনে মাধুরী হেসে ফেলল ৷ পাঁচ বাড়িতে ছুটে ছুটে কাজ করে, তার উপর বাড়িতে অভাব অনটন বাদ দিলেও, হাজার ঝঞ্ঝাটে ভরা—সে কী করে মনে রাখবে মাধুরীর এই সাপ্তাহিক আবদার? বলল—‘‘তুমি ভুলে গিয়েছ কনক ৷ এই যে গায়ে লাগানো পাশের বাড়ির তিনতলায় যাঁরা থাকতেন না? তাঁরা কি নেই এখন? আওয়াজ শুনি না, দেখিও না আর ৷ তোমাকে বলেছিলাম না একটু খোঁজ নিতে, এবার মনে পড়েছে? ওঁরা কি বাড়ি বেচে-টেচেই চলে গেলেন নাকি, কে জানে! মনে আছে, তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম একটু খবর করতে?’’

কনক এতক্ষণে স্বস্তিতে একগাল হাসল ৷ মনে পড়েছে, এবং এও বলল যে এবার নিশ্চয়ই খবর নেবে, কারণ ও বাড়ির এক তলায় কাজ করে সোনিয়া, সে ওদের পাড়াতেই থাকে ৷ তাকে জিজ্ঞেস করলেই সঠিক খবরটা পাবে ৷

পাবে ঠিকই, তবে ওই পাওয়াটা যে আর হয়ে উঠবে না, সেটাও ঠিক ৷ আবার ভুলে যাবে ৷ চেয়ারের নীচটা মোছা হয়ে গিয়েছিল—পা নামিয়ে বসে, মাধুরী আবার মন দিয়ে মেল চেক করতে লাগল ৷ কনক মাঝে কথা বলছিল এটা-সেটা, ফলে মাধুরীও হুঁ, হাঁ করছিল প্রায় না শুনেই ৷ এই যেমন—‘‘কী গরম, কী গরম, বিষ্টির দ্যাখা নাই ৷’’ অথবা ‘‘কেরাচিনের মইধ্যে কী না কী মিশাল দ্যায় এক্কেরে ধুয়াঁ ধুঁয়া ৷’’ ‘‘দুধের দাম যেমুন লাফায়ে লাফায়ে বাড়ে, বকনা বাছুরও সেই তালে লাফাইলে বাড়তে পারব না ৷’’ ‘‘বাড়ি বেইচ্যা যায় নাই, মেশোমুশাইরে তো কদিন আগেও দ্যাখলাম, বাজারে কচুর শাক কিনতাছিল...’’

এত রকম বিজ্ঞপ্তির মধ্যেও অন্যমনস্ক মাধুরীর হঠাৎ কানটা খাড়া হল, বলল—‘‘কার কথা বলছ? কোন মেশোমশাই?’’

—‘‘এই যে আপনের পাশের বাড়ির মেশামুশাই?’’

—‘‘দেখেছ! তো এতক্ষণ বললে না কেন? বুঝেছ তো কার কথা বলছি? গায়ে লাগানো বারান্দার—কালোমতন, কাঁচা পাকা চুল..., আর তাঁর স্ত্রী ৷ কচুর শাক কিনেছিলেন যখন, তখন তো ঠিকঠাকই আছেন নিশ্চয়ই ৷ তাহলে আওয়াজ শুনি না কেন?’’

কনক বলল—‘‘আওয়াজ আর কী করবে—যা গরমের গরম! ঘরের মইধ্যে মেশিন চালায়ে টিভি দ্যাকে নিচ্চয় ৷ এই গরমে কাক-পক্ষীও টা টা করে না... ৷’’

মাধুরী আর কথা বাড়াল না ৷ কাকে দেখতে কাকে দেখেছে কচুর শাক কিনতে, তাছাড়া কবে দেখেছে তারও ঠিক নেই ৷ কনক এরকমই ৷ ভালোমানুষিরও শেষ নেই আর কথাবার্তারও মাথামুণ্ডু নেই ৷ মাধুরীর সঙ্গে ওর দেখা হয় কেবল এই রবিবারটাই, ফলে যত কাজের কথা বা অকাজের, স-ব তোলা থাকে এই দিনটার জন্য ৷ অন্যদিন তালা খুলে ফাঁকা ঘরে কাজ-কর্ম সেরে এখানেই স্নান খাওয়া করে, পাখার হাওয়ায় একটু জিরিয়ে নেয় ৷ তবে রবিবার নয়, ওইদিন নাকি ওর ছুটির দিন, তাই খুব তাড়া ৷ পাঁচ বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শেষে ঘরে ফিরে অবেলায় ভাত ফুটিয়ে দুই হাফ-মস্তান, আধ-মাতাল ছেলের সঙ্গে বসে খায় ৷ ভালোই! মাধুরীও তাহলে বেশ নিরিবিলিতে থাকতে পারে গোটা দিনটা ৷

আসলে ও একটু একাচোরা গোছের, নিরালায় একা থাকার মানুষ ৷ মেলামেশা, গালগল্প মাইনাসে চলে বললেই হয় ৷ অবশ্য মেলামেশা না করবার কিছুটা কারণ ওর চাকরিটাও বটে ৷ গোটা দিনটা যদি অফিসেই কাটে, তবে আর করবেটা কী? তার উপর শহরটাও নতুন, চেনাজানা খুঁজতে গেলে হাতের কড়ে আঙুলও ভরবে না ৷ মাধুরী কলকাতা থেকে বদলি হয়ে এ বাড়িতে এসেছিল প্রায় বছর দেড়েক আগে ৷ নতুন চাকরি, নতুন শহর, বয়সটাও কম—বাবা-মা তো ভেবেই অস্থির ৷ কোথায় থাকবে, যাতায়াতের কী ব্যবস্থা ৷ পছন্দমতন বাড়ি নিতে গেলে হাতশূন্য, অন্যদিকে তার অন্যথা হলে রুচিতে বাধবে ৷ তার উপর দু’ তিনজন মিলে থাকতে অনীহা, বাপমায়ের সাহায্য নিতে অস্বীকার, এদিকে চাকরিতে বাড়ির জন্য কোম্পানি লিজ নেই— তাহলে? মুশকিলের ওপর মুশকিল ৷

ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ মাধুরীর বাবার সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে যোগাযোগ হল তাঁর ছেলেবেলাকার প্রাণের বন্ধু সুজন সমাদ্দারের ৷ এটা সেটা গল্পগাছার পর ছেলেপুলের কথা, এবং স্বভাবতই প্রসঙ্গক্রমে এই গৃহবিভ্রাটের ঘটনাও ৷ সব শুনে সমাদ্দার বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বললেন, এতে আর চিন্তা কী? দিল্লির অমুক পাড়ায় একটা বাড়ি তো তাদের অমনিই পড়ে আছে তালাবন্ধ হয়ে! যখন ও শহরে ছিলেন তখন কিনেছিলেন ওই ফ্ল্যাট, থেকেওছেন বছর কয়েক৷ তারপর তো তল্পিতল্পা বেঁধে অস্ট্রেলিয়া! ফলে খাট-পালঙ্ক, গ্যাস, এসি সবই পড়ে আছে যেমন কে তেমন, মায় বাসন-পত্তর পর্যন্ত, তবে কেমন অবস্থায় তা বলা যায় না ৷ কারণ আজকাল তার মোটে যাওয়াই হয় না ওদিকে ৷ বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের সঙ্গে দিন কতক হেসে খেলে থাকবার জন্যই তো দেশে ফেরা, তা তখন কার শখ চাপবে তালা খুলে চামচিকে আর আরশোলা তাড়াতে? মাধুরী থাকুক ওটা সাফসুফ করে ৷ ভাড়াটাড়ার কোনও প্রশ্নই উঠছে না, পয়সায় তাঁদের অরুচি, তায় বন্ধুকন্যা ৷ তবে বিল মিল, ট্যাক্স মাক্স, সে সব যেন যথাস্থানে গিয়ে দিয়ে দেয় সময় মতন—তবেই তারা খুশি ৷ এই বয়সে অত দূরদেশে বসে বসে ও সব ঝক্কি আর পোষায় না ৷ এই ব্যবস্থা যদি মাধুরীর পোষায় তবে অমুকের থেকে চাবি নিয়ে নেয় যেন, তিনি বলে রাখবেন ৷ সেই ছোট্ট কচি মেয়েটা, যে নাকি গাল ফুলিয়ে, হাত ঘুরিয়ে নাচ দেখাত—এতবড়ো হয়ে গেল রে? ডেজ আর ফ্লাইং... ইত্যাদি ৷

তা সে যাইহোক বাড়ি দেখে তো মাধুরী আত্মহারা ৷ মেঘ না চাইতে জলের কথা আছে, কিন্তু এক্ষেত্রে বোধহয় জলের বদলে দুধ ক্ষীর ননী—কী যে নয়, অপূর্ব! বড়ো বড়ো গাছে ঢাকা লম্বা পার্কের ধার ঘেঁষে কোণের বাড়ি ৷ তিনদিক খোলা, এক দিকে গায়ে লাগানো পাশের বাড়ি ৷ বয়স্ক দম্পতি থাকেন ৷ সে সময় বোধহয় বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন বা লুডো খেলছিলেন, অথবা খবরের কাগজ পড়ছিলেন—ঠিক মনে নেই ৷ তবে তাঁদের উৎসুক দৃষ্টিটা স্পষ্ট মনে আছে ৷ অবশ্য মাধুরী তখন ঘুরে ঘুরে ঘর দেখছে—সেই উৎসাহে অন্য আর কিছু কি অত মনে থাকে!

দুটো ঘর আর খাওয়া বসার মস্ত হল, সঙ্গে ঝুল বারান্দা ৷ তা বাদে পেছনে একটা ফালি বারান্দা কাপড়-চোপড় শুকোবার জন্য ৷ বড়ো বেডরুমটা না হয় বন্ধই থাকল তাঁদের ঠাসা জিনিসপত্তরে ৷ ও আর একা একা অত গুচ্ছের ঘর নিয়ে করবেটা কী?

সঙ্গে সঙ্গে সুজনকাকাকে ই-মেলেই ধন্যবাদ, প্রণাম-ট্রনাম ৷ বাবা মাকে ফোন, তৎসহ ঝ্যাঁটা বালতি, ঝুলঝাড়া ফিনাইল... এবং সেই থেকে এ বাড়িতে মহানন্দে দিনযাপন ৷ অবশ্য এ ক্ষেত্রে মহানন্দে না বলে কেবল আনন্দে বলাই ভালো, কারণ এ বাড়ির সব ভালো, বাদে এই গায়ে লাগানো পাশের বাড়ি ৷

দিল্লির মধ্যবিত্ত সব পাড়াতেই গায়ে একেবারে লেপে থাকা এই পাশের বাড়ি ৷ এমন অঁটো-সাঁটো পড়শির ব্যাপারটাতে অন্তত দক্ষিণ কলকাতার মানুষজনেরা তো একেবারেই অভ্যস্ত নয়! এ বাড়িতে বাসন রাখবার আওয়াজ পাশের বাড়িতে বাজছে, ও বাড়ির টিভি সিরিয়ালের ডায়ালগ এ বাড়ির গানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ৷ তবু না হয় ওদিককার জানলা বন্ধ রাখা গেল, কিন্তু বারান্দা? সে যেন ভাগের মা! ওখানে তো মাধুরী দাঁড়াতেই পারে না! পাশের বাড়ির কর্তা-গিন্নি ওখানে বসেই চা খায়, কাগজ পড়ে, ঝগড়া করে, বাজারের ফর্দ মেলায়, মোবাইলে গল্প চলে, কাজের লোককে ফরমাশ করে, সব্জি কাটে, আটা মাখে আর সব চাইতে মুশকিলের ব্যাপার, মাধুরীকে ডেকে ডেকে কেবল হাঁড়ির খবর জানতে চায় ৷ সেও আবার যে সে হাড়ি নয়, শান্তিনিকেতনের হাঁড়ি ৷ কী কুক্ষণে যে প্রথম প্রশ্নেই বলে ফেলেছিল তারা তিন পুরুষ আদতে শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা ৷ বাবা-মা এখনও ওখানেই থাকেন আর তার পড়াশুনোও সেখান থেকেই ৷ ব্যস, আর যায় কোথায়! যখনই বারান্দায় তার পায়ের শব্দ পাবেন বা, বলা যায় নিশ্বাসেরও, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে—‘‘আচ্ছা, তুমি নিবারণ সাহাকে তো চেনো নিশ্চয়ই, বোলপুরে বাড়ি করেছেন, বড়ো মেয়ে—ছোটো ছেলে...?’ নয়তো, ‘‘আমার বৌদির অমুক তো তোমাদের শান্তিনিকেতনেই পড়েছে, দারুণ নাচত, গানও গায় অসাধারণ, সবাই চেনে এক ডাকে... ৷’’ অথবা, ‘‘আমার কাকার কোলিগ বলছিল তার ছেলে তো ওখানেই ইতিহাসের... নাম বললেই চিনবে—ওটাই মনে পড়ছে না, কাল ফোন করে জেনে নেবো ৷’’

ভদ্রমহিলা বোধহয় জনে জনে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন কার কে, কোথায় আছে যারা কোনও কালে, কোনওভাবে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জড়িত ছিল বা এখনও কিছু করে জড়িয়ে-মড়িয়ে আছে—আর খবর পেলেই তৎক্ষণাৎ মাধুরীকে তলব ৷ সে অবশ্য মনে হয় কেবল শান্তিনিকেতন বলেই নয় ৷ মাধুরী কানপুরে থাকলেও সেখানকার তত্ব-তালাশ চলত, অথবা গয়া কিংবা লাদাখ হলেও ছাড় পেত না ৷ ভদ্রমহিলার কৌতূহলটা মারাত্মক আর তার ওপর ভয়ংকর কথুকে ৷ সারাদিন কাজ নেই, কম্ম নেই, বারান্দায় বসে থেকে থেকে হাত পায়ে বাতের ব্যথা, ফলে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামারও উপায় নেই ৷ তো থাকো তিনতলার ঝুল বারান্দায় হা-পিত্যেস করে, কখন ওপাশে ছায়া পড়বে মাধুরীর! অ-দ-ভু-ৎ মহিলা সত্যি!

কলপ দেওয়া কুটকুটে কলো চুল, মোটা মোটা ঠোঁটে কী যেন চিবোতে থাকেন সর্বদা, নাকি সে-ও মুদ্রাদোষ কে জানে? কোন একটা অসুবিধের জন্য হাঁটতেও পারেন না মোটে, কোনওক্রমে বেঁকে চুরে ঠেলে ঠেলে এদিকে ঘেঁষে আসেন কষ্টে-সৃষ্টে, এমনকি হাতের আঙুলগুলোও যেন কেমন, ব্যাঁকা, মোটা, থ্যাবড়ানো—ভালো লাগে না দেখতে ৷ তার উপরে ভাঙা ভাঙা খসখসে আওয়াজ, কথা বলতে গেলে গলা প্রায় বুজেই আসে, স্বরও বের হয় না ৷ তা-ই আবার ঝেড়ে ঝুড়ে সাফ করে ফ্যাঁসফ্যাঁস আওয়াজ তুলে হাঁপিয়ে-দাপিয়ে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন—‘‘জানো তো...?’’

এই বিরক্তিকর ব্যাপারটা নিয়ে মাধুরীর মাঝে-সাঝে কথাও হয়েছে ওর মায়ের সঙ্গে—‘‘সারাক্ষণ খোঁচায়, দাঁড়াতে পারি না বারান্দায়, অতিষ্ট করে ছাড়ছে...’’ ইত্যাদি ৷ তা, ওর মা আর কী বলবেন! ‘‘বারান্দায় না গেলেই হয় ৷ বাড়ি বয়ে তো বিরক্ত করতে আসেন না, তাছাড়া বাড়িতে কি ঘরের অভাব? আসলে ধৈর্য শক্তিরই বড়ো অভাব বাপু তোমাদের, একমাত্র সন্তান কিনা, বড্ড একচোরা ৷ কোথায় বয়স্ক কাপল পাশে থাকেন, আপদে বিপদে— ৷’’ ফলে এখন আর কিছু বলে না মাধুরী ৷ কাপল-এর আধখানা অবশ্য স্বাভাবিক ভদ্র, আপিস করা বাদে আর কখনই বোধ করি কিছু করেননি, ফলে অবসর নেবার পর বাকি আর কিছুই করবারও নেই ৷ বউয়ের ফর্দ মিলিয়ে বাজারটা করে দিয়েই নির্বিকার মুখে খবরের কাগজ পড়েন, নির্লিপ্ত ভাবে টিভি দেখেন, সপ্তাহান্তে আত্মীয়স্বজন এলেও নিরুত্তেজে কথাবার্তা বলেন খানিক... ৷ এঁরা দিল্লিরই বাসিন্দা এবং হয়তো তিনপুরুষেরই ৷ তাই শান্তিনিকেতনে কোনও চেনা, বা প্রায় চেনা, অথবা অচেনা মানুষজনের সঙ্গেও মেলামেশার সুযোগ হয়নি ৷ চোখাচোখি হলে, যা না হয়ে অবশ্য উপায়ও নেই—ভালো আছে কিনা জিজ্ঞেস করেন ৷ শীত, গরম অথবা বর্ষার কথা বলেন, তা বাদে কিছু আপিসের বার্তা ৷ আর দিল্লিতে আগে মাছ কত সস্তা ছিল, ক’টা যেন পুজো হত, ভিড় কত কম—এসব হাতে গোনা ক’টা কথা ৷ উনি মানুষ একেবারেই খারাপ নন, অথবা খারাপ হবার মতন উপায়ই রাখেননি ঈশ্বর ৷ গোবেচারা, নির্বিবাদী, ভীতু আর পাঁচটা মানুষ যেমন হয় তেমনই ৷ সংসারে আছে তো আছে গোছের আর কী... ৷ কিন্তু এখন এই আছেটার ওপরই একটু সন্দেহ হয়েছে মাধুরীর এবং সে কারণেই কনককে ওই জিজ্ঞাসাবাদ ৷

আসলে এবছর শীতে মাস চারেকের জন্য হঠাৎ করে তাকে তার কোম্পানি পাঠালো নেদারল্যান্ডে ৷ গরমে হলে কোনও কথাই ছিল না, কিন্তু ওই শীতে! দিল্লির ঠান্ডাতেই তো ও কাঁপতে কাঁপতে মরে! তবে কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম, কী করা! তাও তো বাঁচোয়া যে এটা তার সুজনকাকার বাড়ি ৷ তা না হলে তো অযথা চারমাস ধরে অতগুলো ভাড়া গুনতে হত ৷ নয়তো বাধ্য হত বাড়ি ছাড়তে ৷ প্রথমটা যদি বা সম্ভব দ্বিতীয়টা তো একেবারেই অসম্ভব ৷ এ বাড়ি ছাড়বার চিন্তা তো দুঃস্বপ্নেও আনা যায় না! ফলে এক সেট চাবির গোছা কনকের জিম্মায় দিয়ে পইপই করে হাজার কথা হাজার বার বুঝিয়ে সুঝিয়ে এক বস্তা টুপি, মোজা, দস্তানা, ওভারকোট, মাফলার নিয়ে রওনা দিল নেদারল্যান্ডে ৷ সেটা ছিল জানুয়ারি মাসের গোড়ার দিক ৷ যাবার আগে এমন কাজের চাপ তার সঙ্গে কেনাকাটা, এর তার সঙ্গে দেখা করা, বাড়ির দায়িত্ব চেনাজানাদের ঘাড়েচাপানোর জন্য তদ্বির করা—সে কারণে বারান্দায় বোধহয় আর বোরোনোই হয়নি ৷ তা বাদে শীতকালে সকাল সন্ধেতে ঠান্ডাও থাকে ওদিকটায়, আর দিনে তো অফিস! ছুটির দিনে ওসব বাড়তি কাজকর্ম সেরেছে নিশ্চয়ই, ঠিক মনে নেই ৷ তবে এটুকু মনে আছে যে পাশের বাড়ির দম্পতিকে বলা হয়নি তার বিদেশ সফরের কথা ৷ বলাটা নিশ্চয়ই ভদ্রতা, কিন্তু তিনিই বা কোন ভদ্রতাটা করেন? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সারাক্ষণ হামলে পড়ে যত রাজ্যের সংবাদ সরবরাহ করতে থাকেন মাধুরীর কাছে ৷ তা সে যাই হোক খবর দেয়নি বটে, তবে খবর পেয়েছে, মানে গলা-টলা বা বলা যায় অস্তিত্ব টের পেয়েছে ৷ কাজের লোকের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলতেন অথবা মোবাইল ফোনে, টিভি চলত জোরে..., বেশ বেশিরকমই ছিলেন তাঁরা ৷ সে বিষয়ে মাধুরী নিশ্চিন্ত, কিন্তু তারপর...?

ফেরার কথা ছিল এপ্রিলের শেষে তা ফিরতে ফিরতে হল মে মাসের গোড়া ৷ এতদিন পরে ফিরলে পুরোনো জায়গাও নতুন লাগে, তবে মাধুরীর লাগছে অনেকটা অচেনাই ৷ তা, সে অবশ্য ক’দিনের মধ্যেই আবার সড়্গড় হয়ে গেল, তবে যেটা হল না সেটা হচ্ছে ওই পাশের বাড়ি ৷ কী হল ওই পড়োশি দম্পতির?

ভদ্রলোক মনে হয় মিঃ ভৌমিক, অরুণ বা অমল এমনই কিছু একটা নাম, আর স্ত্রীর নাম..., স্ত্রীর নাম... রেণুকা..., নাকি মমতা, ঠিক মনে পড়ছে না ৷ কখনও তো ডাকতে হয়নি নাম ধরে অথবা জানাতেও হয়নি কাউকে ৷ নিজে থেকেই ডেকেছে, ঝুঁকে পড়ে ভাঙা গলায় ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে বকবক করেছে, গুষ্টির নাড়িনক্ষত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে এবং অবশ্যই যাদের পূর্বপুরুষ কোনও না কোনও ভাবে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জড়িত ৷

সে যাইহোক তবু এবার কনক যেন কী বলল সোনিয়া না মুনিয়া—তার থেকে যদি কোনও খবর জোগাড় করতে পারে তো ভালো, নয়তো মাধুরী নিজেই কাউকে জিজ্ঞেস করবে ভৌমিকবাবুরা সব ঠিকঠাক আছে তো? আফটার অল প্রতিবেশী, এতদিন হয়ে গেল ৷ প্রথম প্রথম খাপছাড়া লাগত, তারপর নিশ্চিন্ত ৷ এখন আবার কোথায় যেন একটা উদ্বেগ উঁকি দিচ্ছে, অথবা হয়তো ঠিক উদ্বেগ নয়, বলা যায় অস্বস্তি... ৷ কিন্তু কার থেকে যে নেবে খবরটা কে জানে... ৷ মাধুরী এবার আড়মোড়া ভেঙে ঘর ছেড়ে নিরিবিলি নিস্তব্ধ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল ৷

মুখে বলছে বটে উদ্বেগ, অস্বস্তি...আসলে ওর ভেতরে ভেতরে যেটা হচ্ছে..., তা হচ্ছে, অদ্ভুত এক ছমছমে ভাব..., সেটা কেন হচ্ছে?

মাধুরী নেদারল্যান্ড থেকে ফিরেছিল মে মাসের প্রথম হপ্তায় ৷ তারপর ধীরে সুস্থে সড়্গড় হতে আরও একটা মাস, অর্থাৎ জুনের গোড়া ৷ এবার সেই গোড়া থেকেও গড়িয়ে গড়িয়ে মাঝামাঝি হয়ে গেল তবু আকাশে মেঘ-বাদলের দেখা নেই আর নেই পাশে প্রতিবেশীর সাড়াশব্দ ৷ কী যে হল!

মাধুরী ভোরবেলায় উঠে সতেজ ঠান্ডা হাওয়ায় বারান্দায় বসে, চা খায়, খবরের কাগজ পড়ে, সামনের কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ, অমলতাসে পাখিদের লাফঝাঁপ দেখে, রেলিঙের ধারে তাদের জন্য জল রাখে মাটির পাত্রে, দানা দেয়, শেষে বাতাস গরম হতে থাকলে ডানদিকে ধুলোপড়া বন্ধ বারান্দাটার দিকে চেয়ে অস্বস্তিতে কেমন ছটফট করে ঘরে ঢুকে যায় ৷

কনক সেদিন বলছিল অবশ্য, খবর পেয়েছে কোথায় যেন গেছেন দূরে, মেয়ে বা ছেলের কাছে ৷ হবেও বা, তারা বোধহয় বাইরে কোথাও থাকে ৷ মাধুরী তো কখনও জিজ্ঞেস করেনি যে তারা সংখ্যায় কতজন, অথবা কোথায় কোথায় থাকে? অবশ্য কনকের কথা বিশ্বাস করাও মুশকিল, এমনি এমনি বলে দেয় যা হোক কিছু মাথায় এলে ৷ সেদিন যেমন বলেছিল কচুরশাক কিনতে দেখেছে ৷ আরেকদিন বলল—‘‘মাসিমা বোধহয় অসুস্থ, নাকি মেশামুশাই ৷’’ আবার বলল— ‘‘মাধুরী ঠিকই বলেছে, ওই ফ্যলাট নাকি বিক্রি হবে, কে নাকি বলেছে ওকে ৷ কিন্তু কী কারণে যেন বিক্রিও হচ্ছে না, বোধহয় উঁচু বলে ৷ বয়স হয়ে গেলে সিঁড়ি ভাঙা কষ্ট তো!’’ তা, এতগুলো তথ্যের মধ্যে কোনটা যে গ্রহণযোগ্য কে জানে ৷ কিন্তু আর কেই বা আছে জিজ্ঞেস করবার মতন সেটাও তো মাথায় আসে না ৷ দোতলায় মিসেস মেহরা আছেন, যিনি কারোর সঙ্গে কথাই বলেন না ৷ ভুল করে কেউ বেল বাজালে তো ভেতর থেকে গালিগালাজই করেন ৷ তাছাড়া শুনেছে ভয়ংকর বাঙালিবিদ্বেষীও ৷ আর ভৌমিকদেরও কারোর সঙ্গে কখনও হিন্দিতে কথা বলতে শোনেনি মাধুরী ৷ উলটো দিকের বাড়িতে খানকতক ড্রাইভার আর দারোয়ানের সভা বসে, সকাল সন্ধে যাওয়া আসার পথে, তাদের দেখে তো দু’বেলাই ৷ ওরা হচ্ছে সারা পাড়ার খবরের আড়তদার ৷ কিন্তু সারাদিন তাস পেটায়, নিজেরা মধ্যে মধ্যে আমোদ করে গালিগালাজ দিয়ে, ফলে তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে রুচিতে বাধে মাধুরীর ৷ তাহলে বাকি আর কে রইল? রাতে টহল দেয়া চৌকিদার? তাদের তো মুখই দেখেনি কখনও, হুইসল বাজিয়ে সাঁ-সাঁ করে সাইকেল চালিয়ে ছুটে বেড়ায় ৷ এমনই অভ্যেস যে সামনে চোর ডাকাত পড়লেও ধরতে পারবে না মোটে, ঘোরের মধ্যে পথে পথে শুধুই ঘুরে বেড়ায় বনবন করে ৷ সুতরাং কনকই আপাতত ওর একমাত্র সংবাদমাধ্যম ৷

বেশ কিছুদিন আগে যেমন একদিন ওকে জিজ্ঞেস করল যে, যখন মাধুরী ছিল না এখানে, তখন কি তাঁরা ছিলেন? অর্থাৎ সম্প্রতিই গিয়েছেন? তার উত্তরে কনক নির্লিপ্তভাবে বলল—

—‘‘হ, আছিলেন ৷ আমারে একদিন ডাইক্কা ডাইক্কা কইলেন চাইর দিনের জন্য কই জানি যায়, আমি য্যান ঐ ফুলের টবগুলিতে এই দিক দিয়া মগে কইরা জল দিয়া দিই ৷’’

—‘‘দিয়েছিলে?’’

—‘‘দিসি!’’

—‘‘তারপর? গাছগুলো তো মরেই গেল?’’

—‘‘তখন কি মরসে নাকি? তখন তো একেবারে ফনফইন্যা আছিলো ৷’’

—‘‘কবে থেকে এমন হল? আমি তো এসে থেকেই এরকমই দেখছি?’’

—‘‘কী জানি দিদি, আমারে চারদিন কইসে আমি চারদিন দিসি ৷’’

সত্যি, পাঁচ বাড়ির কাজ করে, তার উপর হাজার ঝঞ্ঝাট সংসারে, তার কি অত নজর থাকে চারিদিকে ৷ থাকে হয়তো অন্যদের, কিন্তু কনকের নেই ৷ তবে ওর দেওয়া নানা খণ্ড খণ্ড সমাচার যদি একসঙ্গে যোগ করা যায়, তাহলে ভাবা যায়, হয়তো চারদিনের জন্য ছেলের বাড়ি গিয়ে দু’জনের মধ্যে একজন হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন—বেশিই অসুস্থ ৷ ফলে ওখানেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন, আর এ ভাবে অসুস্থ শরীরে একা রাখা ঠিক নয় বলে ভাবছেন বাড়িটা বিক্রিই করে দেবেন! এবার থেকে আত্মীয়-স্বজনের কাছাকাছিই থাকবেন হয়তো! কত রকমের অসুখ বিসুখ তো হয়! স্ট্রোক টোক, এটা ওটা... ৷

একটা সময় ছিল যখন প্রশ্নবাণের ভয়ে খিল তুলে ঘরে বসে থাকত মাধুরী, আর এখন একটা প্রশ্নের জন্যই বলা যায় হাঁ করে বসে থাকে বারান্দায় ৷ তবে সে অবশ্যই দিনের বেলায়, রাতে নয় ৷ রাত হলে কী যে হয়, বারান্দায় আসতেই ইচ্ছে করে না ৷ অথচ সারাদিনের দাবদাহের পরে রাতটা বড়ো চমৎকার হয় বাইরে ৷ গোটা দুনিয়াটা যেন শীতল হয়ে যায় ৷ পশুপাখি, গাছপালাও হাঁপ ছাড়ে নিশ্চিন্তে ৷ ...কিন্তু মাধুরী নিশ্চিন্ত হয় না ৷ আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ ওই নিঃঝুম বাড়িটা যে কী অস্বাভাবিক রকমের থমথমে হয়ে যায়, তখন মনে হয় যুগ যুগ ধরে যেন এমন ভাবেই পড়ে আছে এখানে—একটা ছাড়া বাড়ি ৷ দুই ফ্ল্যাটের মাঝে, পাঁচিলের গায়ে খান কতক যে ফুলের টব ছিল যাতে বেশ লতাপাতায় ভরে থাকত সে সময়, যাতে কনক মগে করে জলও দিয়েছে চারদিন, সেগুলো এখন সম্পূর্ণ খড় ৷ মোটা ধুলোর আস্তরণে ভরা দুটো চেয়ার পাতা, একটা ফোল্ডিং টিনের ছোটো টেবিলও ৷ রাতে বোধহয় হাওয়া দিলে টবের ওই খড়গুলো খসখস শব্দ করে নড়ে, পায়রা টায়রা গোছের কিছু মনে হয় টিনের টেবিলে নয়তো চেয়ারে হেঁটে বেড়ায়—কী যে অদ্ভুত সব শব্দ হয়...! মাধুরী মোটেই ভীতু না, তবু কেন যে গা শিরশির করে...!

গোটা জুলাই মাস জুড়ে যেমন ছিটেফোঁটাও বৃষ্টি হল না, আর অগস্ট মাসটা শুধু বৃষ্টি বাদলায় নাকানি-চুবুনি ৷ কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! সকালে উঠে থেকে ঝিরিঝিরি, সারা দুপুর মেঘলা, বিকেলে টিপিটিপি, রাতে ঝমঝম, অর্থাৎ বর্ষাকালের যত রকম বৃষ্টির স্যাম্পেল তাঁর স্টকে আছে, একে একে সব ক’টা হিসেব মিলিয়ে মনে করে করে মেলে দেখানো হচ্ছে সারাটা দিন জুড়ে ৷ বিরক্তি ধরে গেল ৷

এই বিরক্তির আরও একটা কারণ, গত পরশু ওদের তিন বন্ধু মিলে জয়পুরের কাছে একটা সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যাবার কথা ছিল, সে তো বানচাল! জুন জুলাইয়ে গরমে দাপিয়ে মরল কিন্তু দু’দিনের ছুটিতে তো আর পাহাড়ে যাওয়া যায় না, ফলে রইল বসে ৷ এবার যাও বা ভাবল শুক্কুরবারে বিকেলে বেরিয়ে রবিবার রাতে ফিরবে, বুকিং টুকিং সারা—কিন্তু কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! ভেতরে চার পাঁচ মাইল নাকি কাঁচা রাস্তা, তাতে গাড়িই যাবে না ৷ যদিও তাদের দু’দিন আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, টাকাও সামান্য কেটে ফেরত পাবে, তবু মন তো খারাপ হয়ই! ফলে গতকাল মনের দুঃখে তিনবন্ধু অফিস ফেরতা সিনেমা দেখল, ভিয়েতনামি খাবার খেল, তারপর বেশ রাত করে বৃষ্টিতে নাজেহাল হয়ে, যে যার বাড়ি ফিরল ৷ রাস্তায় জল জমেছে, অত রাতেও মারাত্মক ট্র্যাফিক জ্যাম, যে অটোটা রাজি হল আসতে, খানিক গিয়ে গেল খারাপ হয়ে ৷ ভাগ্য ভালো সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা অটো পেয়ে গেল, নয়তো এই মুষলধার বৃষ্টিতে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে কী যে করত মাধুরী! তবে প্রচুর জল জমা আর গাড়ি খারাপ হবার দৌলতে রাত হলেও, বড়ো রাস্তা জমজমাট, ভয় করেনি ৷ ভয় কিন্তু পেল ও বাড়ির সামনে এসে ৷

অন্যদিনও রাত হয়ে গেলে পাড়ায় ঢুকে একটু ভয় ভয় করে, কিন্তু সে অন্য ভয় ৷ এ পাড়াটা এমনিতেই একটু বেশি চুপচাপ ৷ বাজার হাট থেকেও সামান্য তফাতে, আর থাকেনও বেশির ভাগ বয়স্ক মানুষ ৷ ফলে পার্কের খেলাধুলো, গাড়ির হর্ন, অল্পবয়সিদের কোলাহল, সবই নামমাত্র ৷ তা বাদে বাড়িটাও তো কোণের দিকের শেষ প্রান্তে, তায় তিনতলা, এবং সর্বোপরি পেছনে তালাবন্ধ গলির বড়ো লোহার গেট, ফলে বড্ড নিরিবিলি ৷ একটু রাত হলেও, মনে হয় যেন নিশুত রাত ৷

এ তো গেল নির্জনতার কথা, তা বাদে এ শহরের দুর্নামও তো আছে, মাধুরীর বয়সটাও নিতান্তই কম, রাত করে ফিরলে সতর্ক তো থাকতেই হবে! বড়ো বড়ো ঝুপসি গাছের ধারে, সার সার গাড়ি নিঃসাড়ে পড়ে থাকে—কে কখন বদমায়েশি করতে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রইল আড়ালে... ৷প্রাইভেট চৌকিদারগুলো সারাদিন সজাগ থেকে পরচর্চা করে আর জুয়ো খেলে সময় কাটায়, আর রাত হতে না হতেই গেটের সামনে বসে বসে এমন ঘুম ঘুমোয়, যে ডাকাত পড়লেও টের পাবে না ৷ এ তো গেল স্বাভাবিক দিনের কথা—বৃষ্টির দিনে তো আর বাইরে থাকবে না! যার যার কর্মস্থলের সিঁড়ির ভেতর ঢুকেই ঘুমোবে, অর্থাৎ কিনা যেমন ছিল কালকে ৷ এ ছাড়া অবশ্য উপায়ই বা কী? ফলে মাধুরী যখন একটা ঝড়ঝড়ে অটোতে প্রচণ্ড ঘটর ঘটর শব্দ তুলে ফিরল, তখন ত্রিসীমানায় কেউ ছিল না ৷ ভাড়া গুনতে সুবিধে হবে বলে বাড়ি থেকে দু পা দূরে, একটা ল্যাম্প পোস্টের নীচে থামতে বলেছিল আর পাশেই একটা বড়োসড়ো বাঁদরলাঠির গাছ থাকাতে মাথাটাও বাঁচবে!

পয়সা দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, বোধহয় পয়সা ফেরত নিচ্ছিল—একবার অভ্যেস বশে এমনিই ওপর দিকে তাকাল ৷ মাধুরীর তিনতলার ফ্ল্যাটের দিকে শিরীষগাছের ডালটা ঝুঁকে থাকায় হল ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বড়ো বারান্দাটা দেখা যাচ্ছিল না, কোণের ছোটোটা দেখল ৷ যা বৃষ্টি—নালি বন্ধ হয়ে ঘরে না জল ঢুকে যায় ৷ হঠাৎ ওপাশের বারান্দার দিকে চোখ গেল, প্রতিবেশীর বন্ধ বারান্দা ৷ আর সঙ্গে সঙ্গে এমন চমকে গেল যে হার্টটা যেন গলার কাছ উঠে এল সহসা ৷

ওই বাড়ি ছাড়িয়ে, রাস্তার কমলা-রঙা জোরালো যে আলো, তা বৃষ্টির তোড়ে সামান্য ঝাপসা ৷ তার উপর গাছপালাও আছে বটে তবে পুরোপুরি ঢাকা না তাতে ৷ ফাঁকা বারান্দায় আধো অন্ধকারে স্পষ্ট দেখল, মাধুরীর বারান্দার দিকে মুখ করে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ৷ ঝুঁকে পড়েনি, উঁকিও দেয়নি, কেবল দাঁড়ানো এদিক ফিরে ৷ পুরুষ না মহিলা বোঝা গেল না, কিন্তু স্পষ্ট কেউ, মানুষ ৷ এত বৃষ্টিতে খোলা বারান্দায়! মাধুরী এমন ভয় পেয়ে গেল যে আর বলবার নয় ৷ ভয়ের দরুন আর নড়তেই পারছিল না ৷ কোনওক্রমে সম্বিত আসতে অটোওয়ালাকেই অনুরোধ করল একটু অপেক্ষা করতে, তাহলে ও দৌড়ে নিজের গেটে ঢুকে যাবে ৷ লোকটি মোটাসোটা বয়স্ক ভালোমানুষ, বলল কিছু ভয় নেই ও অপেক্ষা করছে, করলও ৷ আর মাধুরী কাঁপা কাঁপা অবশ পায়ে দৌড়ে নিজের বাড়ির গেটে ঢুকে গেল, সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠল, চাবি দিয়ে দরজা খুলল, বাড়ির সবক’টা আলো একে একে জ্বেলে দিল, তারপর সেই ঝলমলে পরিচিত নিজের ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ৷ কিন্তু ভয়টা তবু গেল না, কেন ওরকম দেখল?

রাত ঢের হয়েছিল ৷ গরম জলে স্নান করে জামা-কাপড় বদলে, চুল শুকিয়ে, এক কাপ গরম কফি খেল ৷ তারপর একটা বই নিয়ে বিছানায় গেল ৷ সারাদিনের ক্লান্তির পর এই আরামে ঘুম এসে যাচ্ছিল, কিন্তু পুরোপুরি আসছিল না ৷ বারবার কেবল মনে হচ্ছিল কেন দেখল ওরকম?

নিশ্চয়ই গাছের ডালপালা দিয়ে আলো এসে ওরকম বিভ্রান্তি হয়েছিল ৷ আলো-ছায়াতে কত রকম যে হয়! তাছাড়া এও তো হতে পারে যে, সারাদিন মাধুরী তো ছিল না—ভৌমিকরা হয়তো ফিরেই এসেছেন আজ? কিন্তু ওই মুষলধার বৃষ্টিতে...? হতে পারে তাঁদের ছেলে বা বৌমা? বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দেখছিল বাইরেটা, কতকাল হয়তো বৃষ্টিই দেখেনি? দুবাইতে থাকে অথবা আবুধাবি? তাছাড়া অল্প বয়সে কত রকম শখ চাপে! ও-ও তো আজ কেমন কাক-ভেজা ভিজে ফিরল ৷ মাধুরীর মা জানলে হয়তো ঠিক এতটাই অবাক হতেন—‘‘এই বৃষ্টি বদলায় সিনেমা দেখে এমন ভিজে কেউ ফেরে?’’

তবে কথাটা ঠিক এখানেই শেষ নয় ৷ কদিন থেকেই মাধুরীর মনে নানান রকম দ্বন্দ্ব হচ্ছে, নানান বিভ্রান্তি ৷ এর শুরুটা বলা যায় এক গভীর রাতে ৷ মাধুরী ঘুমোচ্ছিল নিজের ঘরে, গাঢ় ঘুম ৷ এই গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ একেবারে স্পষ্ট শুনল তার নাম ধরে ফ্যাঁসফেঁসে ভাঙা গলায় খুব কষ্ট করে প্রাণপণে কেউ ডাকছে—‘‘মাধুরী, মাধুরী...?’’ ঘুমটা ভেঙে গেল ৷ কতক্ষণ ধরে ডেকেছে বলতে পারবে না, তবে ওর কানে গেছে অন্তত বার দুয়েক ৷ প্রথমে ঘুমটা ভাঙল, তারপর একেবারে পুরোপুরি ছেড়ে গেল ৷ মিসেস ভৌমিকের গলা, তবে আরও ফিসফিসে, আরও ক্ষীণ... ৷

প্রথমে ভেবেছিল ও বুঝি অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই উনি কোনও স্পেশাল ইনফরমেশন পেয়ে বারান্দা থেকে ডাকছেন ৷ যেমনটা এই কিছু মাস আগেও ডাকতেন তাকে কারণে-অকারণে ৷ কিন্তু পরে বুঝল তা নয়, আসলে তখন নিশুত রাত ৷ অকারণের তো প্রশ্নই নেই, কারণেও নেহাত মাথা খারাপ না হলে কেউ কাউকে সচরাচর ডাকে না এই সময় ৷

মাধুরী উঠল ৷ আলো জ্বালল, ঘড়ি দেখল—রাত দুটো ৷ তখন প্রচণ্ড গরমের সময়, জানলা দরজা বন্ধ এসি চলছে ৷ বন্ধ শোবার ঘর পেরিয়ে খাবার জায়গা, তারপর বসার, তারও শেষে দরজা খুলে বাইরের বারান্দা, যেখান থেকে পাশের বাড়ির বারান্দায় ঝুঁকে পড়ে ডাকতে পারেন তিনি ৷ কিন্তু তাহলেও তো আওয়াজ আসবার কথা নয়, বিশেষ করে এমন ক্ষীণ স্বর! স্বপ্ন দেখেছে মাধুরী, কিন্তু কী অদ্ভুত স্বপ্ন? যে স্বপ্নের আগু পিছু, কিছু মনে পড়ল না, শুধু শুনতে পেল তার নাম ধরে ডাক! অদ্ভুত! আসলে ক’দিনের ভাবনা চিন্তা থেকেই ঘুমের মধ্যে এরকম শুনছে নিশ্চয়ই, এই ভেবে নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে জল খেল ৷ চারিদিক ভালো করে দেখল, দেখে আবার শুয়ে পড়ল আর ঘুমও এসে গেল যথাসময়ে ৷

আর একদিন রাতের দিকে ও রান্না করছিল ছ্যাঁক-ছোঁক শব্দ করে রান্নাঘরের সামনেই খাবার জায়গায় সুজনকাকাদের সুন্দর গোল টেবিল পাতা, আর তার গায়ে লাগিয়ে বড়ো জানলা ৷ জানলার ওপারে আলো হাওয়া আসবার জন্য একটা বড়োসড়ো শাফট আর তারও ওপারে ভৌমিকদের রান্নাঘর ৷ তাঁরা থাকাকালীন এগজস্ট ফ্যান বয়ে ওদিক থেকে মাছভাজা আর ফোঁড়নের গন্ধ আসত বলে, ও জানলা সব সময় বন্ধই থাকত ৷ এমনকি লম্বা পর্দাও টেনে রাখত সব সময় ৷ কিন্তু এখন কেউ থাকে না বলে জানলা না খুললেও পর্দা সরানো থাকে অনেক সময় ৷ দিনে আলো তো আসে ওপর থেকে! গোলমরিচের কৌটোটা টেবিলে পড়েছিল, নিতে গিয়ে মনে হল ওদিক থেকে যেন ফিকে একটা আলো আসছে ৷ ঠিক সরাসারি রান্নাঘরে নয় কিন্তু ভেতরের কোন ঘরের টিউব লাইট ৷ ভালো করে পরখ করল ও পাশের রান্নাঘরের জানলা ৷ কালি ঝুলি মাখা ছোট্ট জানলা এঁটে বন্ধ, কিন্তু হালকা একটা আলো তো আছে, সাদাটে? তাহলে কি ওরা ফিরে এলেন?

কেমন এক কৌতুহলেই রান্না ফেলে হাতে কৌটো নিয়েই দরজা খুলে প্রায় দৌড়ে মাধুরী বারান্দায় গিয়ে পাশের বারান্দায় নজর করল ৷ ধুলোমাখা, বন্ধ, পরিত্যক্ত এক বারান্দা—দুটো চেয়ার পড়ে আছে যেমন কে তেমন, মানুষজনের সাড়াশব্দ নেই ৷ তাহলে বোধহয় অসময়ে ফিরে শোবার ঘরটুকুই কোনওমতে বাসযোগ্য করে নিয়েছেন, কাল সকালে বাকি সব হবে ৷ নিশ্চিন্তে ফিরে এসে ফের তাকালো খাবার টেবিলের জানলা পেরিয়ে ওপারের রান্নাঘরের দিকে—এক ফোঁটা আলোর রেশও নেই, ঘুরঘুট্টে, অন্ধকার—যেমনটা দেখে আসছে গত এই ক’মাস যাবৎ ৷

মাধুরী রান্নাও শেষ করল, খেলোও, বই নিয়ে শুয়েও পড়ল, কিন্তু মনের ওই খুঁত খুঁতে ভাবটা গেল না ৷ হঠাৎ করে কেন দেখল ওই আলোর রেশ? এসব হচ্ছেটা কী?

এসব অভিজ্ঞতা মাধুরী কাউকে বলেনি, বলবার কথাও না ৷ তবে এমনি কথায় কথায় ওর মাকে একদিন ফোনে বলেছিল যে পাশের বাড়িটা একদম ছাড়া বাড়ি হয়ে পড়ে আছে, ওদিকে তাকালে কেমন গা ছমছম করে ৷ কেউ থাকে না, সাড়াশব্দ নেই... ৷ এ কথায় মন্দিরা একটু বিরক্তই হলেন মনে হল ৷ কারণ তাঁরা থাকাকালীন ছিল হাজার অনুযোগ অভিযোগ—এই করে, সেই করে, হ্যানো, ত্যানো, আবার কিছু না করলেও কমপ্লেন ৷ আদতে একা একা বড়ো হওয়া আদুরে মেয়েদের এই এক ঝঞ্ঝাট ৷ কমপ্লেন করতে যা হোক কিছু বাহানা দরকার, সে হ্যাঁ-ই হোক আর না-ই হোক... ৷ মেয়ের ঘ্যান ঘ্যান শুনে গোড়ার দিকে একদিন তো সুজনবাবুকেই নালিশ করেছিলেন মন্দিরা, যে মাধুরীকে খুব বিরক্ত করে তারা ৷ তা উনি আর কী বলবেন ৷ তাছাড়া তাঁরা থাকতে তো ও বাড়ি তিনতলা হয়ওনি ৷ ছোট্ট একতলা বাড়ি ছিল, খাবার জায়গার শাফট থেকে কেমন রোদ আলো আসত ৷ এদের তো চেনেনই না, কিন্তু অসুবিধে হলে ওদিকে সরু বাঁশের আড়াল তুলে নিক না কেন?

সত্যি তো, কেন করল না? তাহলে ওদিকে তাকাতেই হবে না, অস্বস্তিও কাটবে ৷ ফলে চিক লাগাবার কথা আর একবার মনে করিয়ে দিয়ে, এটা সেটা বলে রেখে দিলেন ফোন ৷ মাধুরীও আর উচ্চবাচ্চ করল না, কারণ তিনি যে অর্থে বলছেন সেটাই তো একমাত্র উপায় না ৷ চিক টাঙালে কি রান্নাঘরের আলোর আভা বন্ধ হবে, নাকি টিভি-র শব্দ?

যেমন হল এই দিন পনেরো আগের এক শনিবারে? মাধুরীর বাড়িতে জনা তিনেক বন্ধু এসেছিল রাতে ৷ গত কালের সিনেমা সঙ্গী দু’জন, আর তাদের মধ্যে একজনের বয়ফ্রেন্ড ৷ তখন মাত্র গরম গিয়ে বর্ষা এসেছে কিন্তু সেদিন বৃষ্টি নেই ৷ ওরা চারজনে হলে বসে গল্প গুজব করছে, বিয়ার খাচ্ছে—এর মধ্যে আলোও গেল চলে ৷ অটোম্যাটিক ইনভার্টারে তৎক্ষণাৎ আলো, পাখার কাজ করবার কথা, তবু কী কারণে কে জানে এল না ৷ মাধুরী ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল—‘‘কী হল, কাল আবার সার্ভিসে খবর দিতে হবে, রবিবার আসবে কিনা কে জানে’’ ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ অন্যরা বলল তাড়া তো নেই, খিদেও পায়নি, একটু অপেক্ষা করা যাক ৷ না-ই এলে তখন না হয় ক্যান্ডেললাইট ডিনার হবে ৷ গরমও তো তেমন নেই ৷ আপাতত বারান্দায় বসা যাক, এমন চমৎকার ব্যালকনি... ৷

কৃষ্ণপক্ষ নিশ্চয়ই, কালো আকাশ ভরা অজস্র তারা, চারিপাশে ঘন সবুজ পরদার মতন বড়ো বড়ো গাছ..., অসাধারণ লাগছিল ৷ সারা এলাকারই আলো গেছে বোধহয়, কারণ রাস্তাঘাটও কালোয় কালো ৷ কেবল কিছু বাড়ির ঘরে প্রয়োজন মতন যৎসামান্য ইনভার্টারের আলো জ্বলছে ৷ আকাশের দিকে চেয়ে ছোট্ট নিচু মোড়ায় বসে পূজা বলল—‘‘ডার্কনেস ইজ সো-ও-ও বিউটিফুল ৷’’ অভয় তাতে যোগ করল—‘‘ডার্কনেস ইজ, সো-ও-ও পীসফুল ৷’’ অন্ধকারে অভয়ের হাতে রাখা প্লেটের ওপর থেকে, শেষ কাবাবটা টপ করে মুখে পুরে নন্দিতা বলল—‘‘ডার্কনেস ইজ সো-ও-ও-ও ইউজফুল ৷’’ সবাই হাসছিল মাধুরীর দিকে তাকিয়ে ৷ এবার মাধুরীর পালা, কিন্তু অন্ধকারের আর কোনও উপকারিতার কথা মাথায় আসছিল না ওর, অপ্রস্তুত মুখে এদিক ওদিক চাইছিল কেবল ৷ কারণ ততক্ষণে চারদিকের ঘনঘোর অন্ধকারের মধ্যে শুধু পাশের বাড়ির বারান্দার বড়ো বড়ো কাচের জানলা ভেদ করে যে বসার ঘর থেকে আলোর ঝলকানিতে চোখ চলে গিয়েছে! ঝলকানি এই অর্থে, যে তা জ্বলছে নিবছে, কম হচ্ছে, বেশি হচ্ছে, আর তার সঙ্গে কথাও... কথা মানে গান—বাংলা সিনেমার টাইপ, টিভি চলছে ৷

খুবই ধীরে আওয়াজ, বেশি নয়, আলোও তার সঙ্গে মানানসই, যেমনটা হয় অন্ধকার ঘরে টিভি চললে ৷ এটা কি তবে বহুদিন থেকে অন করাই আছে? দিনের বেলায় বোঝা যায় না আর চারিদিকে আলো থাকলেও নয়—কী জানি... ৷ মাধুরীর পিঠের দিকটা শিরশির করছিল, ভালো লাগছিল না, তবু মজার গলায় বলল, ‘‘আমার মাথায় কিছু আসে না বাবা, আমি কি পোয়েট, যে রাইম বানাবো? তাছাড়া অন্ধকার আমার ভালোও লাগে না, ভয় লাগে... ৷’’ সবাই ওর কথার ধরনে হেসে ফেলল, অভয় মেয়েদের সরুগলা নকল করে বলল—‘‘ডার্কসেন ইজ সো-ও-ও-ও-ফিয়ারফুল ৷’’ সবার হাসির মধ্যেই দপ করে আলো এসে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গেই নিভে গেল পাশের বাড়ির ঝলকানি ৷ এমনকি ওদের হো-ও-ও শব্দের মধ্যে গানটাও মিলিয়ে গেল বেমালুম ৷

এ সবই মনের ভুল, চোখের ভুল, কানের ভুল—ভুলই, কিন্তু এতদিন তো কোনও ভুলটুল হত না তার? তাহলে কি এই একা থাকবার কুফল এসব? অখণ্ড নিজস্ব সময় আর উদ্ভট চিন্তা ভাবনার অপরিসীম সুযোগ?

গতকাল বৃষ্টিতে অত ভেজার দরুনই হোক, আর ওই উদ্ভট চোখের ভুলের কারণেই হোক, ঘুমটা ভালো হয়নি ৷ ফলে তুলনামূলকভাবে ঘুম ভেঙেছে দেরিতে ৷ আজ রবিবার অফিস নেই বটে, তবে দুপুরের দিকে একবার বেরোতে হবে ৷ নিমরানার দিকে বেড়াতে যাওয়া যখন হলই না, তখন অন্য কাজ কর্ম সেরে রাখবে না হয় ৷ এই অগস্ট মাসটা হল গিয়ে শুধু জন্মদিনের মাস ৷ চেনা জানা, আধচেনা, অচেনা সবাই যেন একেবারে কোমর বেঁধে, চুক্তি করে জন্মেছে এই অগস্ট মাসে, এমনকি মাধুরী নিজেও ৷ ফলে ঝুড়ি ভরে ছোটোখাটো গিফট কিনবে নামে নামে, আর তার নিজের জন্যও অ্যাডভানাস কিছু শপিং ৷ ইচ্ছে আছে ছোটো করে বাড়িতেই একটা ডিনার পার্টির ব্যবস্থা করা, দেখা যাক ৷

মাধুরী হলঘরের আপাদমস্তক কাচে মোড়া জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো—মেঘে মেঘে প্রায় অন্ধকার, তবে বৃষ্টি বোধহয় একটু ধরেছে ৷ এমনকি উত্তরদিকের আকাশ থেকে সামান্য আলোর আভাও দেখা যাচ্ছে ৷ ইশ, যদি একটু রোদ উঠত, কত জামাকাপড় যে শুকোনো যেত ৷ আগের গুলোই শুকোলো না, আজ আবার কাচতে হবে ৷ সকালে গামলায় সাবান জলে ভিজিয়ে রাখবে, কনক পরে কেচেকুচে মেলে দেবে ’খন ৷ পেছনের সরু বারান্দাটাতে তো কাপড় মেললে এমনিতে শুকিয়ে যাবারই কথা, কিন্তু এ ক’দিন এত ছাঁট এসেছে এলোমেলা, যে টিজে ভিজে একশা ৷ সন্ধেবেলা তোলার কথাও মনে থাকে না মোটে, আসলে ওদিকে যাওয়াই তো হয় না ৷ কনকই পরিষ্কার করে, ঝাড়ু বালতি রাখে, কাপড় শুকোয়, আর শীতের দিনে নাকি রোদও পোহায় ৷ ওটা কনকের বারান্দা ৷

মাধুরী বড়ো বারান্দার দরজাটা সামান্য ফাঁক করে হাত বাড়িয়ে ভেজা মেঝে থেকে খবরের কাগজটা নিতে গিয়ে একটু থমকে গেল ৷ পাশের বাড়ি থেকে আওয়াজ আসছে যেন? একটু সময় নিয়ে শুনল ভালো করে, আবার যদি সেই বিভ্রান্তি হয়? না, বেশ স্পষ্ট কথা ৷ অন্যবারের মতন ফিসফিসে বা আভা-টাভা, ছায়া-মায়া নয়, হিন্দিই বেশি তবে তার সঙ্গে ইংরিজিও আছে... ৷ এক সঙ্গে বেশ কয়েকজনের গলা ৷ গতকাল তাহলে তো ঠিকই দেখেছে মাধুরী! আর ভয় টয় পেয়ে কী কাণ্ড... ৷ প্রায় দৌড়ে দরজাটা পুরোপুরি খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই স্পষ্ট চোখে প্রকাশ্য দিবালোকে দেখলো পাশের বাড়ির দরজা খোলা এবং সত্যি সত্যিই ভেতর থেকে একাধিক মানুষজনের গলার আওয়াজও ৷ এবার একটি মহিলার স্বরও ভেসে এল... তবে এ ওই মিসেস ভৌমিকের নয় ৷ অন্য কেউ, অবাঙালি, হিন্দিতে কিছু বলল, অল্পবয়সি মিহিন গলা, রিনরিনে ৷ কাঠের কাজ ভালো না বলল, মেঝে খারাপ ৷ মোটা খসখসে গলায় কেউ খুব বোঝাচ্ছে... এটা সেটা ৷ মাধবী পাকানো খবরের কাগজটা হাতে ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, যেন কোনও কাউকে দেখার অপেক্ষায় ৷ হয়তো ছেলের কাছে গিয়েছিল, এ হচ্ছে গিয়ে ছেলের বউ—সবাই মিলে ফিরে এসেছে..., অথবা মেয়ে জামাই! তিন মিনিট গেল, পাঁচ মিনিট অথবা সাত—কেউ তো বেরোচ্ছেই না ৷ কখনও গলার স্বর ধীরে হয়ে যাচ্ছে কখনও জোরে, মানে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময় ৷

যতই কৌতূহল থাক বা উৎসাহ-ই বলা যায়, তবু কাঁহাতক এমন হাঁ করে চেয়ে থাকা যায় অন্যের দরজার দিকে ৷ এমন সময় একজন বড়ো-সড়ো ভদ্রলোক বেরিয়ে এল পেছনে আরও দু’জন ৷ প্রথম জন সামনের পার্কটা দেখিয়ে তার বিউটি সম্বন্ধে ছোটো খাটো একটা রচনা বলতে থাকল, ‘কত পাখি, কত ফুল, জগিং ট্র্যাক, ভেরি সেফ... ৷ এ তো বাড়ির লোক বলে মনে হচ্ছে না ৷ তবে কি স্রেফ প্রপার্টি ডিলার, বাড়ি বিক্রি করছে? তাইতো বলেছিল কনক, বাড়িটা বিক্রি হবে ৷ কিন্তু কী কারণে যেন হচ্ছে না, উঁচু বলে বোধহয় ৷ কিন্তু প্রপার্টি ডিলার ভদ্রলোক তো জানবেন, ভৌমিকরা এখন কোথায় বা যোগাযোগের ঠিকানা? মাধুরী ভেজা বারান্দায় হাওয়াই চটি পরে সাবধানে পা রাখল, তারপর বেশি না এগিয়ে গলা বাড়িয়ে একবার গলা খাঁকারি দিল ৷ মোটা ভদ্রলোক পেছন ফিরে তাকালো ওর দিকে, সঙ্গে সঙ্গে অন্য দুজনও ৷ মাধুরী বিনীত ভাবে বলল—‘‘হ্যালো, ইস ফ্ল্যাটমে যো রহতে থে, ভৌমিক ফ্যামিলি... উয়ো লোগ—’’

কথাটা শেষ তো দূরের কথা অর্দ্ধেকও হয়নি, ভদ্রালোক কেমন ভয়ংকর মুখ করে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়েই অন্য দুজনকে প্রায় ঠেলে ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে দরজাটা ধড়াম করে বন্ধ করে দিল ৷ তাজ্জব! কী অসভ্য লোকরে বাবা! আর কী চাউনি! সিনেমায় যেমন দেখে ‘মুখ খুললে, লাশ পড়ে যাবে’ ঠিক সে রকম!

রাতটা তা-ও যাহোক কেটেছিল, কিন্তু সকালটা তো শুরু হল আরও খারাপ ভাবে! ভূতের ভয় তাও সহ্য করা যায়, কিন্তু গুন্ডার চোখ রাঙানি?

মাধুরী বিমর্ষ মুখে ঘরে ঢুকে চা বানাতে বসল ৷ এসব বদমাশের কথা যত ভাববে তত মাথা গরম হবে ৷ ভদ্রলোকের ওপর রাগ অভিমান করা যায়, কিন্তু এই নচ্ছার, ছোটোলোক, বিল্ডারকে কি ও বদলাতে পারবে? বাড়ির পেপার, টেপারে কোনও গণ্ডগোল আছে হয়তো, নয়তো ডবল ওয়ারিশ! ভাবছে মাধুরী এ সব কথা বলে দেবে ওর ক্লায়েন্টকে, রাবিশ ৷ যাক, ওদিকে আর যাবেই না, না-হয় ক’দিন ৷ করুক যাকে ইচ্ছে বিক্রি বাটা ৷ নতুন লোক আসবার আগে এবার সত্যি সত্যি একটা চিকওয়ালা ডেকে চিকই লাগিয়ে নেবে সময় মতন ৷ যাই হোক আর তাই হোক, এ বাড়ি ও ছাড়তে পারবে না ৷ এমন মায়া পড়ে গিয়েছে ওর, এত একাত্ম আর প্রিয় ৷ এমন একটা বাসস্থান ছাড়া মানে ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ ৷ আর সুজনকাকা তো বলেইছেন, ‘‘যতদিন ইচ্ছে মনের আনন্দে থাক তুই ওই বাড়িতে, তারপর যখন বিক্রি করবার কথা ভাবব তখন তোর বাবাকেই বলব কিনে নিতে, মেয়ের বিয়ের যৌতুক ৷’’

সুজনকাকা আগেকার মানুষ তাই যৌতুক নিয়ে কৌতুক করলেন ৷ তবে মাধুরী নিজেও তো কিনতে পারে, এখনই না, কিছু বছর পরে? এই দু বছরে যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে উন্নতি হয়েছে ওর চাকরিতে, এমন হতে থাকলে পাঁচ-সাত বছরে, নিশ্চয়ই ভাবতে পারে ৷ আর ভূত প্রেত মানুক না মানুক মাধুরী কিন্তু পয়া অপয়া বেশ ভালো মতনই মানে ৷ এই বাড়িটা ওর পয়া ৷ সবই তো ভালো হচ্ছে ওর, খুবই ভালো... ৷ ভালো চাকরি, এত ভালো বাড়ি, প্রচুর বন্ধু হয়েছে, আর একজন স্পেশাল বন্ধুও ৷ স্বনির্ভর হয়ে একা একা সংসার চালাচ্ছে সুন্দরভাবে, তাই কি কম ভালো নাকি? এমনকি পাশে যদি নতুন লোক আসে—তাও ভালো ৷ সারাদিন একা একা এই নিঝুম পুরীতে থেকে থেকে যে সব ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের গণ্ডগোল শুরু হয়েছে, সে-ও মিটে যাবে তাহলে ৷

চা শেষ করে নিশ্চিন্ত মনে খিচুড়ি বানাবার তোড়জোড় করতে রান্নাঘরে গেল মাধুরী ৷ এবারে ব্রাঞ্চ করে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে যাবে, আর সন্ধের মধ্যেই ফিরে আসবে বাড়ি ৷ রোজ রোজ ভিজলে এবার নির্ঘাৎ নিউমোনিয়া ৷

ভেবে রেখেছিল সন্ধের আগেই ফিরে আসবে, তো ফিরল একেবারে ভর বিকেলেই ৷ অনেকদিন পরে টানা অনেকক্ষণ বৃষ্টি হয়নি বলে, সমগ্র জীবসমাজ মনে হয় আনন্দে বাইরে বেরিয়ে এসেছে ৷ পার্কে বাচ্চারা হুটোপুটি করছে, বড়োরা ধীরে-সুস্থে গল্প করতে করতে হাঁটছে, বুড়োরা বেঞ্চে বসা ৷ সারাদিন হালকা রোদের মতন ছিল ফলে রাস্তাঘাট, নালা নর্দমা সব মোটামুটি শুকনো—মাধুরী অটো রিকশাটা ওর বাড়ির দোরগোড়াতেই দাঁড় করালো, হাত ভর্তি গুচ্ছের ঝোলাঝুলি ৷ তবে পার্কের পাশ থেকে বাঁক নেবার সময় মাথা নিচু করে একবার উঁকি দিয়ে দেখে নিল ওদের বাড়ির এলাকাটা ৷ যেখান থেকে ওর বারান্দাটাও চোখে পড়ে, তৎসহ পাশের বাড়িটাও—দেখল দুটোই একেবারে শুনশান ৷ কায়া-ছায়া কিছুই নেই ৷ দুটো ঘন সবুজ পাতাভরা গাছের মাঝে, দুই সহোদরের মতন দুটি ঝুল বারান্দা সমেত তিনতলাদ্বয় সম্পূর্ণ নিরীহ গোবেচারার মতন চুপচাপ বসে আছে হাঁ করে—ভালো ৷

মাধুরী ঘরে ফিরে জিনিসপত্র নামিয়ে রেখে, জম্পেশ এক কাপ চা বানাল ৷ তারপর প্যাস্ট্রিমার্শে থেকে সদ্য আনা চিকেন প্যাটি নিয়ে বারান্দার দরজাটা খুলে দিয়ে, হল ঘরে পা তুলে খেতে বসল ৷ অনেক আগে খেয়ে বেরিয়েছে বলে একটু খিদেও পাচ্ছিল এখন, আহ, কী আরাম!

সারাদিন বৃষ্টি বাদল গুটিয়ে মুটিয়ে তুলে রাখা ছিল নিশ্চয়ই কিন্তু এখন আবার তা মেলে ধরবার জন্য তোড়জোড় চলছে মনে হচ্ছে ৷ আকাশটা ঘন ভারী, চাঁদোয়ার মতন নেমে এসেছে ৷ গাছের পাতাগুলো আরও যেন ঘন সবুজ—চমৎকার দেখাচ্ছে দুনিয়াটা ৷ তা বাদে বাড়ি-ঘরও কী সুন্দর পরিষ্কার করে রেখেছে কনক ৷ আয়নার মতন ঝকঝকে মেঝে, তকতকে রান্নাঘর, পরিপাটি করে ঝাড়া বিছানা ৷ ধীরে ধীরে সন্ধে হয়ে আসছিল তার সঙ্গে ঘনঘোর মেঘও, ফলে সামান্য অন্ধকার লাগছিল ৷ রাতে আর রান্নাবান্না করবার নেই, বাদলার দিনে কড়কড়ে টোস্ট আর স্যুপ খাবে, ব্যস ৷ মাধুরী নিশ্চিন্ত মনে দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে গিয়ে আলো জ্বেলে টুকিটাকি উপহারের জিনিস পত্রগুলো খুলে টুলে, মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল—এটা ওমুকের, সেটা তমুকের... ৷ একটু ক্লান্ত লাগছিল, বার বার হাই উঠছিল, পরিচ্ছন্ন ঘর আর টানটান বিছানাটা দেখে বড়ো লোভ হল শুয়ে শুয়ে আরাম করে একটা গল্পের বই পড়বার ৷ ছুটির দিনের আলসেমিটা তো আজ আর হয়নি, তাছাড়া নতুন একটা বইও আছে স্টকে, দারুণ ৷

কাল নানান কারণে ঘুমটা ভালো হয়নি, আজও ঘুরেছে টই টই করে ৷ ফলে মাথার কাছে আলোটা জ্বেলে বই নিয়ে বিছানায় গেল, আর সত্যি বলতে কী, দু-চার পাতা পড়তে না পড়তেই অতল ঘুমে ঘুমিয়েই পড়ল ৷

বাবারে বাবা, কী ঘুম, কী ঘুম! তার সঙ্গে অবশ্য স্বপ্ন টপ্নও দেখল যার কোনও মাথা-মুণ্ডু নেই ৷ ওই গল্পের বই থেকে খানিকটা, বাকিটা এদিক ওদিক থেকে জোড়াতালি দিয়ে হাবিজাবি যা হোক ৷ ওই স্বপ্ন দেখে ঘুম অবশ্য ভাঙল না, ভাঙল অনেক পরে, বিকট এক বাজ পড়বার শব্দে ৷ এত জোরে যে মনে হল ওর ঘরেই পড়েছে, একদম কানের পাশেই, বালিশের ওপর ৷

ধড়মড় করে উঠে বসতেই ঘরের আলোটা নিভে গেল, কিন্তু জানলার বাইরে ঘন ঘন আলোর ঝিলিক, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে অনবরত, আর তার সঙ্গে ঝুউম-বৃষ্টি ৷ হঠাৎ ঘুম ভেঙে কোথায় আছে, কেন ঘুমোচ্ছে, দিন না রাত—কিছুই খেয়াল হচ্ছিল না ৷ শেষে ইনভার্টারের আলো জ্বলে উঠতেই আর ঘুমটাও পুরোপুরি কেটে যেতে সম্বিৎ ফিরে পেল ৷ নিজস্ব পরিচিত ঘর, পাশেই পেজমার্ক সমেত নতুন বইটা, মেঝের ওপর জড়ো করা আজকেরই কেনা জিনিস-পত্তর দেখে সব মনে পড়ে গেল ৷ তবে সে সব আজকেরই কেনা নাকি কালকের সেটাতে একটু সন্দেহ আছে—কতক্ষণ ঘুমিয়েছে কে জানে? শেষ বিকেলে সন্ধের মুখে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে আছে, কিন্তু এখন ক’টা বাজে? ঘড়ি দেখল সাড়ে এগারোটা, আর বাইরে তুমুল বৃষ্টি, ধ্যাৎ কোনও মানে হয়?

মাধুরী শোবার ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল, কাচের শার্শির গায়ে লাগানো মস্ত একটা সেগুন গাছ হেলেদুলে হিমসিম খাচ্ছে, আর সঙ্গে তোড়ে জল পড়ার ঝমঝম শব্দ— ৷ জানলা দরজা চারিদিকে বন্ধ আছে, সে বিষয়ে চিন্তা নেই, চিন্তা কেবল রাতে আর ঘুম আসবে না বলে—অসময়ে কী ঘুম ঘুমালো! আর এ কথার সাথে সাথেই মনে হল পেছনের ছোটো বারান্দায় কনকের তো আজ গুচ্ছের কাচা কাপড় মেলে দেবার কথা! সারাদিন হয়তো বা শুকিয়েও গিয়েছিল—আবার গেল, হায়রে! আগে একটু স্যুপ-টুপ বানিয়ে খেয়ে নেবে, নাকি কাপড়গুলো তুলে নেবে, ভাবতে ভাবতে আগে পেছনের বারান্দাতেই গেল ৷

এদিকে ওর একেবারেই আসা হয় না, কারণ পেছনের গলিতে এদিকের মতন ওদিকেও তো সব বাড়ির পেছন ৷ মুখোমুখিতে যাও বা একটু সামলে সুমলে চলে, পিঠেপিঠিতে তো কোনওই ছিরিছাঁদ নেই ৷ সরু সরু বারান্দায় রাজ্যের কাপড় চোপড় মেলা, দুনিয়ার ভাঙাচোরা হাবি-জাবি জড়ো করা, তা বাদে বাথরুমের জানলা, রান্নাঘরের এগজস্ট ফ্যান, সব মিলে কেমন যেন বিরক্তিকর দৃশ্য ৷ যাও বা একটা অমলতাসের ফুলে ভরা গাছ ছিল, সেটাকেও কাটতে কাটতে প্রায় ঝুলঝাড়ার পর্যায়ে এনে ফেলেছে—কবে যে শেষ এসেছে এদিকে তাও মনে পড়ে না মাধুরীর ৷ অবশ্য এটা তো বলা যায় সার্ভিস বারান্দা, ফলে সে কনকেরই আওতায় ৷ কাজ টাজ সেরে ঝাড়ু বালতি রেখে, কাপড় চোপড় মেলে দিয়ে যায়, আবার পরের দিন ও-ই তুলে টুলে ভাঁজ করে ৷ দরজা অন্য সময় এঁটে-সেঁটে বন্ধই থাকে... ৷ মাধুরী দরজাটা সামান্য ফাঁক করে দেখে নিল কাপড় জামার অবস্থাটা ৷ নাহ, মুষলধার বৃষ্টি হলেও ছাঁট বোধহয় উলটো দিকে ছিল ৷ মেঝেটা ভেজা ভেজা, কিন্তু ভেসে যাচ্ছে না ৷ আর কনকও বুদ্ধি করে দেয়ালের গা ঘেঁষে দড়ি টেনে কাপড় মেলেছে—ভাগ্যিস, রোদ দেখে রেলিঙে মেলেনি—মাধুরী পা টিপেটিপে একটা একটা করে ক্লিপ ছাড়িয়ে কাপড় তুলতে লাগল ৷ এক সময় শুকিয়েও গিয়েছিল বোধহয়, এখন আবার ভেজা-ভেজা ড্যাম্প, তবে চুপচুপে নয়—ইস বিকেলে ফিরেই যদি বুদ্ধি করে তুলে রাখত ৷ মনেই পড়েনি! প্রকৃতির শোভা দেখে দেখে তখন চিকেন প্যাটি খেতে ব্যস্ত... ৷

মাধুরী কাপড়গুলো কাঁধের কাছে জড়ো করে করে ওর ঘরের লাগোয়া বারান্দা ছাড়িয়ে সুজনকাকাদের বন্ধ শোবার ঘরের লাগোয়া বারান্দার প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছিল—কত কাপড় যে মেলেছে আজ! ছোটো ছোটো ন্যাপকিন রুমাল বালিসের ওয়ার, তোয়ালে... ৷

এ পাড়ার সব বাড়ির পেছনেই একটা সরু বারান্দা, টানা চলে গিয়েছে রেলের পটরির মতন—কারোর আবার চোরের ভয়ে দু’পাশে কাঁটা দেওয়া থাকে, কারোর গ্রিল ৷ আবার বুদ্ধি করে কেউ কেউ দু’ফুট আগে পিছে করে নয়তো ওপর নীচে ৷ তাতে অবশ্য চোরেদের খুব কিছু অসুবিধে হয় বলে তো মনে হয় না কারণ, তা কেবলওয়ালাদের দেখেই ভালো মতন বোঝা যায় ৷ লাফিয়ে লাফিয়ে এক বারান্দা থেকে অন্য বারান্দায় মুহূর্তের মধ্যে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে টিভির কেবল নয়তো টেলিফোনের তার-টার সারায় ৷

‘‘মা-ধু-রী...?’’

এই আজন্ম-পরিচিত ডাকটায় মাধুরী এতই চমকে উঠল যে মনে হল এখুনি হার্টফেল করবে কিংবা করেই ফেলেছে অলরেডি ৷ তবু ও ডাকের উৎস সন্ধানে ডানপাশে ফিরে তাকালো পাশের বাড়ির সরু বারান্দাটার দিকে—রাস্তার আলো এখনও আসেনি, লোডশেডিং চলছে, তবে মাধুরীর শোবার ঘরের দরজা খোলা থাকবার ফলে তেজালো একটা আলোর ফালি তেরছা ভাবে এসে পড়েছে প্রায় ওর পায়ের পাতা ছাড়িয়ে রেলিঙের ধার পর্যন্ত ৷ সেই জলে ভেজা সোনালি আলোর প্রতিফলনে দেখল, ওর থেকে কয়েক হাত মাত্র দূরে ওরই দিকে ঠিক মুখোমুখি নয়, একটু আড়াআড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এতদিনের প্রার্থিত সেই মিসেস ভৌমিক—মাধুরীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান!

কাঙ্ক্ষিত, ঈপ্সিত... সবই ঠিক, কিন্তু আজ এমনই পরিস্থিতি যে আগের মতনই আজও তেমন খুশির ভাব দেখাতে পারল না ৷ এই বর্ষা, আলোও নেই, তাছাড়া রাত তেমন গভীর না হলেও, অদ্ভুত নিঝুম, আর সে সব বাদ দিলেও, এটা কোনও জায়গা নাকি? এদিকে কস্মিন কালেও মিসেস ভৌমিকের সঙ্গে তার চোখাচোখিও হয়নি, তবে? মাধুরীর একদম ভালো লাগছিল না, মনে হচ্ছিল অন্যদিনের মতোই একটু হুঁ-হাঁ করে ঘরে ঢুকে দরজাটা এঁটে বন্ধ করে দিই ৷ কিন্তু তা না করে, হাতে টাল কাপড়ের পাহাড় নিয়ে একটু অপ্রস্তুত হেসে চিরাচরিত অভ্যেস বসে বলল—‘ভালো?’

আর একথা বলতেই ভদ্রমহিলা মুখের কথাটা একেবারে লুফে নিয়ে অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে গলায় আরও অদ্ভুতভাবে হেসে বললেন— ‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ ভালো, ভালো... ৷ সব থেকে ভালো তোমার সঙ্গে দেখা হল বলে, বাব্বা! কবে থেকে যে...’’ কথাটা শেষ হবার আগেই রাস্তার আলো এসে গেল ৷ রাত তখন ঢের হয়েছিল, তাই অন্য বাড়ির পেছনে আর বাতি জ্বলবার কারণ ছিল না ৷ মাধুরীর একটা ঘরে তো সেই সন্ধে থেকেই জ্বলছে—অন্য সব ঘরেরও বন্ধ, তাছাড়া সেসব জ্বললেও সে আলো এত পেছনে আসবে না ৷ ভৌমিকের বাড়িতে আলো নেই, অন্তত বারান্দা বা শেষের দিকের ঘরে তো নয়ই ৷ কেবল গলির মোড়ের টিউব লাইটের ফ্যাকাশে সাদাটে একটা আলো—সেটাই জ্বলে উঠল খানিক দপদপ করে ৷ ...আর তাতে দেখল মিসেস ভৌমিক বেশ সেজেগুজেই হাসি মুখে তার দিকে চেয়ে আছেন ৷ সাজটা একটু বেশিই—কোথাও গিয়েছিলেন বোধহয় ৷ ছাপা ছাপা এক সিল্কের শাড়িপরা তাতে বেগুনি আর সবুজের প্রাধান্য ৷ গায়ে একটা শালও জড়ানো—সে বোধকরি আজ বাদলার রাত বলে ৷ তা বাদে ওঁর তো গলার কী যেন দোষও আছে... ৷ কানে বড়ো বড়ো দুল, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে চুল বাঁধা, দোকান-টোকান থেকে বেঁধে এলে যেমনটা হয়, মুখেও মেকআপ আছে ৷ ঠোঁট লাল, মুখ সাদা, চোখে কাজল—যা এই ফ্যাকাশে আলোয় আরও বিবর্ণ দেখাচ্ছে ৷ বাবারে মানুষ এমনও সাজে নাকি!

মাধুরী এবার একটু পিছিয়ে এসে বলল—‘‘আচ্ছা... ৷’’ বলেই কাপড়ের বোঝা নিয়ে পেছন ফিরতে গেল, বাকি দু চারটে যা আছে থাকুক, কাল দেখা যাবে ৷ তাছাড়া ওর মাথায় কেবল যে কোনওভাবে ঘরে ঢুকে পড়া ছাড়া আর কোনও বাসনাই ছিল না ৷ চারিদিকটা কী নিশ্চুপ—প্রবল বর্ষণের সঙ্গে বাজ টাজ পড়ে ঘুম ভাঙল অথচ তার পরই কেমন জলের তোড়টা কমে গেল ৷ এখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর একটানা বৃষ্টি..., আবার বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু যেন কোনও শব্দ হচ্ছে না ৷ মিউট করা টেলিভিশনের গায়ে বর্ষার দৃশ্য দেখলে যেমন হয়—তেমন ৷ না, নিঃশব্দ না, শব্দ আছে—ঝিঁঝিঁ পোকা আর ব্যাঙের ডাকের—এত ঝিঁঝিঁ পোকা কোথা থেকে এল? একটানা কোঁ কোঁ শব্দে কান ঝালাপালা—যেন কোনও খাল বিল বা দিঘির ধারে দাঁড়িয়ে আছে মাধুরী, চারিদিকে শত শত জোনাকি উড়ছে৷ জোনাকি, নাকি বাদুলে পোকা! না, জোনাকিই তো জ্বলছে নিবছে... তাদের শান্তিনিকেতনের আশেপাশে যেমনটা দেখা যায় ৷ কিন্তু ওই ‘আচ্ছা’ কথাটা কানে যেতেই মিসেস ভৌমিক এস্ত পায়ে দু’ কদম এগিয়ে এলেন, যেন তাঁর কথা না শুনে মাধুরী চলে গেলে উনি মরেই যাবেন ৷ হাঁপাতে হাঁপাতে জড়ানো পুরুষালি ভাঙা গলায় বললেন—‘‘আচ্ছা বলে চললে নাকি? কত কষ্ট করে তোমায় একটা খবর দিতে এলাম, সমাচার, আর বলছ—আচ্ছা? আসা কি আর অত সহজ নাকি, প্রচুর মেহনত লাগে, বুঝেছ? প্রচণ্ড পরিশ্রম, কবে থেকে চেষ্টা করে করে—এ বাড়ি তো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, শুনেছ...?’’

মাধুরী সামান্য মাথা নাড়ালো—সে জানে, মানে টের পেয়েছিল একটু, আর আজ সকালে তো... ৷ ও ঠিক মুখে কথা বলছিল না, বিড়বিড় করছিল মাত্র ৷ কিন্তু বুঝতে পারছিল না, যে কী আবার খবর দেবেন উনি যার জন্য এমন দুর্যোগের রাতে নির্জন বারান্দায়, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অন্ধকারে? আর কোথা থেকেই বা এত পরিশ্রম করে হাঁপিয়ে দাপিয়ে এলেন? কবে এলেন? এ বাড়িতে তো ছিলেন না, অন্তত সকাল পর্যন্ত তো নয়ই ৷ সেজে গুজে রাত করে নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরেছেন বোধহয় এই মাত্র—বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবার আগে শেষ ক’টা দিন থেকে যাবার ইচ্ছে ৷ সেকথাই জানাতে চান? সামনের ঘর অন্ধকার, পেছনের বারান্দায় আলো দেখে পড়িমরি বেরিয়ে এসেছেন সমাচার শোনাতে ৷ তাছাড়া এই ক’মাসে প্রচুর খবরও জোগাড় করেছেন নিশ্চয়ই শান্তিনিকেতন বিষয়ে—অনেক খোঁজ খবর... ৷ এসব এলোমেলো খানিক কথাবার্তা মাথায় এল বটে তার, তবে ঠিক সংলগ্ন নয়—ভাঙা ভাঙা বিক্ষিপ্ত ৷ আর সবচাইতে অবাক লাগছিল যে, মাধুরীর এসব কথায় তেমন রাগ, বিরক্তি হচ্ছিল না—হচ্ছিল যেটা, তাকে বোধকরি বলা যায় ত্রাস ৷ কারণ উনি এ কথা বলবার মধ্যেই মাধুরী অবাক হয়ে এও দেখল যে তাঁর পেছনে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে, সেও চাদর জড়ানো, ছাপ ছাপ চাদর—সে নড়ছে না মুখ চোখও স্পষ্ট না, মিঃ ভৌমিক নাকি? তাই হবে, কিন্তু কী অদ্ভুত... ৷ উনি সেদিকে চেয়ে, চোখ ফিরিয়ে, আবার মাধুরীর দিকে তাকালেন, তাকিয়ে এবার এতক্ষণে তাঁর প্রথাগত অভ্যাসে ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায় এক নাগাড়ে বলে যেতে লাগলেন গত আট মাসে তাঁর আট খণ্ডের অসমাপ্ত দিনলিপি—মাধুরী এতদিন ধরে ছিলটা কোথায়, হ্যাঁ? হ্যাঁ, ফেব্রুয়ারি মাসে? কত ডাকলেন খুঁজলেন? ঝি মেয়েটাও তেমন—কিছুই বলতে পারে না! তা সে যাই হোক, সে আর এখন কী করা ৷ তবে এখন যা তিনি জানাতে চান, যার জন্য এই ঝঞ্ঝাট—তা হল..., অন্য কথা ৷ মাধুরী নিশ্চয়ই জানে যে তাঁদের ছেলেপুলে নেই—ভাগ্নেকে দত্তক নিয়েছিলেন ৷ সে ছেলে থাকে রিয়াধে, মিডল ইস্ট—চাকরি করে সেখানে, বড়ো চাকরি, ইঞ্জিনিয়ার ৷ সে ছেলের সম্বন্ধ করে বিয়ে ঠিক করেছিলেন তাঁরা ৷ দারুণ সম্বন্ধ—শান্তিনিকেতনের মেয়ে ৷ নাচ জানে, গান জানে, আঁকা জানে—যেমনটা হয় আর কী এখানকার ওখানকার মেয়েরা, আর যেমনটা চেয়েছিলেন তাঁরা ৷ তার উপর তিন পুরুষ না হলেও দু’ পুরুষের বাসিন্দা—মেয়ের বাবার চাকরিই ওখানে ৷ বাড়ি করেছে সীমান্তপল্লিতে, আটকাঠা জমিতে, মস্ত বাড়ি ৷ মার্চে বিয়ে, ফেব্রুয়ারিতে আশীর্বাদ ৷ বিয়ে হবে শান্তিনিকেতনে কিন্তু আশীর্বাদ গুসকরায়, তাদের আদি বাড়িতে ৷ মেয়ের দাদুর সখ এলাহি ব্যবস্থা করবার, প্রথম নাতনি ৷ আত্মীয়-স্বজন, একান্নবর্তী পরিবার ৷

—‘‘আমরা ভাবলাম ভালোই তো, এই ফাঁকে একবার ঘুরে আসাও হবে ৷ কলকাতায় আমাদের মেলা আত্মীয়স্বজন—আর্শীবাদের বাহানায় নেমন্তন্নটাও সেরে আসব ’খন ৷ নেমন্তন্ন কার্ড টার্ড একটু আগেভাগেই ছাপিয়ে, ফেব্রুয়ারিতেই চলে গেলাম একেবারে পাঁচ সাত দিনের জন্য ৷ তোমার ঝি মেয়েটিকে ডেকে বলেছিলাম এ কদিন গাছগুলোতে একটু জল টল দিও—তুলসীগাছ আছে, দেখো বাপু—এ পর্যন্ত সব ঠিকই... ৷

আমার মাথায় আবার আরেকটা প্ল্যানও ছিল ৷ ওখানে তো দিনে দিনে আর্শীবাদ, তারপর দুপুরের খাওয়া, বিকেলে গ্রাম দর্শন করে, আমরা চলে যাব শান্তিনিকেতন ৷ ওখান থেকে নাকি সামান্যই পথ ৷ রাতের আগেই পৌঁছে যাব ৷ পরের দিনটা খুব ভালো করে ঘুরব চারিদিক ৷ শান্তিনিকেতন তো যাইনি কোনওদিন ৷ কবিগুরুর পুণ্যভূমি বলে কথা ৷ ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখব, গাড়ি দেখব, ভাতখাবার থালাবাটি দেখব, পরনের জামাকাপড়... ৷ সে রাতটাও থেকে, সকালে তারাপীঠ, বক্রেশ্বরে পুজো দিয়ে ফিরে যাব কলকাতায়—পরের দিন দিল্লির ফ্লাইট ৷ আমরা বলতে, মিঃ ভৌমিক আর আমি, আমার দুই দাদা, এক বৌদি, দুই দিদি—এই সাতজন ৷ হোটেল বুক করা হল, চারটে এসি ঘর ৷ রাঙামাটি হোটেল, জানো নিশ্চয়ই ৷

তা, দু’দিন কলকাতায় থেকে দেখাসাক্ষাৎ নেমন্তন্ন আর শেষপর্বের বাজার হাট করে, তিনটে ইনোভা গাড়ি নিয়ে আঠেরো জনের দল সকাল সকাল রওনা দিলাম গুসকরার দিকে,’’—এতটা পর্যন্ত বলে একটু থামলেন মিসেস ভৌমিক ৷ সামান্য দম নিলেন, কাশলেন দু’ চারবার, গলা পরিষ্কার করলেন—তারপর আবার হাসলেন কেমন অদ্ভুতভাবে ৷ আসলে অদ্ভুতভাবে বোধহয় নয়, কিন্তু চেহারাটার জন্য ওরকম অদ্ভুত দেখাচ্ছিল ৷ মুখে পাউডার তো নয়, যেন ছাই মেখেছেন ৷ চোখের কাজল ধেবড়ে কেমন কালচে ছায়া, ঠোঁটটা শুকনো খরখরে, কালচে পান খাওয়া, তার মধ্যে ঝকমকে গয়নাগুলো বড্ড বেমানান... ৷

‘‘অনুষ্ঠান খুব ভালোভাবে হল, দারুণ খাওয়া দাওয়া, দারুণ জাঁকজমক—সব সেরে আমাদের দুটো গাড়ির একটা দল বেরিয়ে গেল আগে ৷ ওদের কলকাতায় ফিরতে হবে, একটা নাগেরবাজারে, অন্যটা হাওড়ায় ৷ আমরা তো কাছে, ঘণ্টা খানেকের নাকি পথ ৷ ফলে এটা সেটায় দেরিই হল ৷ শীত না থাকলেও দিন তখনও বড়ো হতে শুরু করেনি, ঝপ করে সন্ধে হয়ে যায় ৷ শেষে টা-টা, বাই বাই, নমস্কার, প্রণাম, কোলাকুলি পর্ব সেরে গাড়িতে চড়ে বসতে বসতে অন্ধকার হয়ে এল ৷ আর মাইল পাঁচেক যেতে না যেতেই গাড়িটাও কেমন গণ্ডগোল শুরু করল ৷ ভালো গাড়ি, নতুনই প্রায়, তবু... ঘড় ঘড় শব্দ, ঘট ঘট আওয়াজ..., শেষে থেমেই গেল ৷ ড্রাইভার খুটুর-খাটুর করল খানিক... আবার চলল ৷ আমাদের কোনও তাড়া তো ছিল না, কেউ ঘুমুচ্ছে, কেউ ঝিমুচ্ছে—আমরা ক’জন ও বাড়ির গল্পে মশগুল—আর আমি আরও মশগুল শান্তিনিকেতনে যাবার আশায় ৷ কতদিনের শখ, ইচ্ছে ছিল তোমার মা, বাবার সঙ্গেও দেখা করবার ৷আমার বেয়ান তো তোমার মাকে খুবই চেনে ৷ উনিই ঠিকানা দিলেন, ফোন নম্বরও ৷ যেতাম নিশ্চয়ই নেমন্তন্ন করতে..., বলতাম, ‘আপনার মেয়েকে কেবল, এর তার কথা বলি, এখন আমার বাড়িতেই আপনার বন্ধুর মেয়ে বা মেয়ের বন্ধু’...’’

মাধুরী নির্বাক হয়ে আদেশ মেনে শুনছিল তাঁর কথা ৷ কোনদিনও তো এতক্ষণ ধরে শোনেনি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ৷ এমন অবলীলায় কথাও বলেনি কখনও ৷ কী যে বলতেন জড়িয়ে জড়িয়ে, কাদের কথা, কীসের কথা—কোনও মাথামুণ্ডু নেই, আজ কিন্তু কেমন কৌতূহল হল ৷ এমন নির্দ্বিধায় বলছেন মায়ের বন্ধুর কথা... ৷ কোন বন্ধু? তাছাড়া তারও বন্ধু বললেন যেন? কে? বলল—‘‘আমাদের চেনে বলেছে? কী নাম আপনার ছেলের বৌয়ের?’’

—‘‘চেনে চেনে, খুব চেনে, তুমিও চেনো, আর এখন তো সবাই চিনে বসে আছে—কলকাতাতেই চিনে গেল, তো ওই ছোট্ট জায়গা ৷’’

—‘‘কী নাম?’’ মাধুরীর এবার ধৈর্য থাকছিল না ৷

—‘‘দুই বোন, প্রয়তি আর প্রত্যুষা, মায়ের নাম প্রণতি, প্রণতি দাস—কী...? চেনো না?’’

মাধুরী অস্ফুটে বলল—‘‘প্রয়তি? আপনি প্রয়তির... তাদের তো—’’

ওকে আর কথা শেষ করতে দিলেন না মিসেস ভৌমিক—‘হ্যাঁ, তাদের তো,... বলো, বলো? ঠিকই ধরেছ..., দেখলে তো, ঠিকই চিনেছ ৷ আর বলতে পারবে না, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না, চিনতে পারছি না, ধরতে পারছি না’... হা- হা- হা... ৷ ওই যে বললাম না গাড়িটা গড়বড় করছিল, আর আমরা ভেতরে মশগুল হয়ে গল্পে মত্ত...! তা, হঠাৎ দেখি তীরের মতন প্রবল বেগে গাড়ি ছুটছে আর তার সাথে সাথে ড্রাইভারের আর্ত চিৎকার, ব্রেক ফেল, স্টিয়ারিং খুলে এসেছে—সে কী স্পীড রে বাবা, যেন উল্কা ৷ চোখের নিমেষে ড্রাইভার দরজা খুলে ঝাঁপ দিল আর সঙ্গে সঙ্গে এক প্রবল ধাক্কা—গাছে টাছে লাগল বোধহয়, তারপর উলটে পালটে পড়ল গিয়ে পাশের নয়ানজুলি না খাল-বিল, কোথায় কে জানে! হল আমার শান্তিনিকেতন দেখা... ৷ বরং পরদিন সবাই দেখল, খবরের কাগজে আমাদের সমাচার... ৷

ছেলে তো বাড়ি বিক্রির জন্য হেদিয়ে আছে ৷ হয়েও যাবে বিক্রি ৷ অপমৃত্যু-টিত্যু মানতে গেলে চলবে নাকি দুনিয়া! কিনে নিয়ে ওই পুজো-টুজো দিয়ে শুদ্ধি করে নেবে! কিন্তু সে যতই হোক, আমার আত্মার তো শান্তি হবে না! তাই ভাবলাম তোমায় তো খবরটা দিতে হবে, যেমন করেই হোক? আমার নিজের বৌমা খোদ শান্তিনিকেতনের মেয়ে, সে খবরটা একবার নিজের মুখে তোমায় দেব না? তাই কি কখনও হয়? আর সত্যি বলতে কি, মুখ তো আমার আছে, নিজেরই! হা- হা- হা- ৷ অন্যদের মতন হয়নি, জানো তো, অত বড়ো দুর্ঘটনা, কিন্তু আমাকে দেখলে নাকি ধরাই যায়নি ৷ আর সবাই তো তালগোল..., আমার কেবল এইদিকটা’’... বলে সেই অদ্ভুত হাসি হেসে মিসেস ভৌমিক খুব ধী-রে ডান পাশে ঘুরে গেলেন—, আর টিউব বাতির ফ্যাকাশে আলোয় মাধুরী দেখল...

কী দেখল আর মনে নেই তার, সব অন্ধকার..., কেবল ঝিঁঝিঁর ডাক আর ব্যাঙের রব, ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি জ্বলা ঘোর আঁধারে পচা পানা, শ্যাওলার গন্ধ মাখা স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা জোলো হাওয়া... ৷

রচনাকাল ২০১২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%