বদন চাঁদের বদান্যতা

মিমি রাধাকৃষ্ণন

ভাদ্রমাসের গুমোট সন্ধেরাতে, মস্ত ছাতের এ মাথা ও মাথা আপন মনে পায়চারি করতে করতে অকস্মাৎ বদনচাঁদের সাথে সাক্ষাৎ হল শ্রীমতী বেণুবীণা দত্ত ওরফে বাচ্চু রায়ের ৷

ঘটনাটা বলতে অবশ্য যতটা সহজ, অর্থাৎ এক বাক্যেই সমাপ্ত, কার্যত কিন্তু তা মোটেই নয় ৷ অতি দুরূহ ব্যাপার ৷ মেলা কারিকুরি আর চূড়ান্ত প্যাঁচালো ধূর্তোমির একেবারে একশেষ না হলে পরে এমনটি অসম্ভব ৷ তার একটা প্রধান কারণ হল, শামসিপুরের বড়ো তরফের খাসমহল, এই চামেলিকুঞ্জ, সাধারণের যাতায়াতের আওতা, মানে—আমলা বাড়ি, খাজাঞ্চি খানা, বার দেউড়ি, পিছদুয়ারি ইত্যাদি ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামের ব্যবহারযোগ্য এলাকা থেকে বেশ খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে ৷ তায় তার ছাতে যাবার সিঁড়ি উঠেছে অন্দরের মাঝ বরাবর ৷ সেই প্রাইভেট ছাতে আবার বাড়ির গণ্যমান্য লেডিজের নিরিবিলি একাকী সান্ধ্য-ভ্রমণ ৷ তা, সে সময়ে এমন ধারা অচেনা-অজানা উটকো মানুষের আচমকা আগমন-একেবারে দেড়শো বছরের সম্পূর্ণ নিয়ম লঙ্ঘনকারী বে-আইনি অনাচার ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়? কিছুই না ৷ অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে নেহাত কোনও দুর্ঘটনা ব্যতীত এ হেন ঘটনা ঘটা, সম্পূর্ণ দুর্ঘটনারই শামিল ৷

চিরকালের নিয়ম মেনে, বনেদি বাড়ির তো বটেই, এমনকি মধ্যবিত্ত সাধারণ গৃহস্থ পরিবারের ছাতও কিন্তু থাকে মোটামুটি বাড়ির মেয়েদের এক্তিয়ারে ৷ তারা সকাল বিকেল হাওয়া খায়, এটা সেটা রোদ্দুরে দেয়, বালিকারা চু কিৎ কিৎ খেলে ৷ ফলে পুরুষমানুষেরা খুব প্রয়োজন না হলে এ এলাকাটা একটু এড়িয়েই চলে ৷

সে, চলতে পারে, কিন্তু তবুও তাকে সম্পূর্ণ পুরুষ বর্জিত তো বলা যায় না! বিশেষত এই চামেলিকুঞ্জের ছাত ৷ কত কাজে, অকাজে তাদের যেতে হয় সেখেনে ৷ যেমন বেলার দিকে নিয়ম করে ঝাড়ু দেয় নিতাই কামলা ৷ নালির মুখে জড়ো হওয়া খড়কুটো, শুকনো পাতা-মাতা সাফ করে ৷ ছিরু ধোপা গোটা বাড়ির কাপড়-চোপড় ধোয়া-কাচাটা কুয়োতলায় করলেও, ছাতে নিয়ে যায় লম্বা তারে টান টান করে মেলবার জন্য ৷ তারপর পুতুল রানি আর মানদামাসি সেই সুবাদে সারা দুপুর থাকে তার তত্বাবধানের বাহানায় সে সময়ে বাড়ির পুরোনো ভৃত্য শ্রেণির দু’ চারজনও অবাধে যাতায়াত করে—বিড়ি তামাক খায়, বসে গাল-গপ্প করে, জিরোয় খানিক ৷ শেষে দুপুর গড়ালে সব শুকনো কাপড় টেনে টুনে পাট করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় তারা ৷ তা বাদে, মোটা মোটা লেপ-তোশকও নিয়মিত রোদ্দুরে দিয়ে আসে—বড়ি আমসত্ব আচার পাঁপড়..., গরম শাল-দোশালায় হাওয়া খাওয়ায়, পুরোনো বই-পত্তর রোদে দেয় ৷ তা, সেসবও অবশ্য ফাঁকা হয়ে যায় বিকেলের চা পর্বের আগেই—এরা সবাই চোদ্দ পুরুষের নাম ধাম জানা বংশানুক্রমে এ বাড়িরই কর্মীবৃন্দ ৷ অবশ্য টিভি-র ডিশ, টেলিফোনের লাইন, বা চুন-সুরকির অন্য মেরামতির কাজের দরুন, বাড়তি অচেনা মানুষজনকেও ওপরে আসতে হয় বটে, কিন্তু সে ক্ষেত্রে সব সময়ই তদারকিতে বিশ্বস্ত পুরোনো কর্মচারী বা আমলা-কামলাও থাকে সঙ্গে ৷

তা, দিনমানে ছাত ব্যবহারের মোটামুটি এই হল গিয়ে রোজনামচা, আর ভোর সকালে এবং সন্ধের পর, নিরিবিলি এ এলাকাটা হয় পুরোপুরি ‘লেডিজ স্পেশাল’ ৷ নেহাত তলব না পড়লে, তখন হেঁশেলের ঠাকুর বা নাট মন্দিরের পুরুতমশাই-ও আগবাড়িয়ে হুট-হাট হাজির হয় না কদাচ, এমনটাই হল দস্তুর ৷ এ হেন পরিস্থিতিতে সহসা সেথায় ভুঁইফেঁাড় বদনচাঁদের এই আগমনটিকে তাহলে চন্দ্রপৃষ্ঠে মনুষ্য অবতরণের ন্যায় বিরলতম ইভেন্ট ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়? কিছুই না!

সুতরাং এমন অবস্থায় যে কোনও একাকী মহিলারই প্রাণ ভয়ে প্রাণপণে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ ‘চোর-চোর’, নিদেনপক্ষে অন্তত ‘কে-কে’ করে গলা চিরে আর্তনাদ করাটাই স্বাভাবিক! কিন্তু মাথাভরা নানান এলোমেলো চিন্তায় সদাসর্বদা এমনই উদভ্রান্ত বাচ্চু রায়, যে অত্যাশ্চর্য এই ঘটনায় বিচলিত হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর মধ্যে কিন্তু সামান্যতম বিকারও লক্ষ্য করা গেল না মোটে ৷ সে অবশ্য না যাবারই কথা ৷ কারণ ভয়-ভাবনা ঢুকবার জন্যও সামান্য ফাঁকা জায়গা তো প্রয়োজন! সেটি কি আর আছে কোনওখানে?

এমনিতেই তাঁর মাথাটা ঠাসা থাকে বিচিত্র সব ক্রিয়েটিভ আইডিয়াতে ৷ তদুপরি জন্মাবধি প্রায় আগমার্কের সীল দেয়া ‘ভাবুক প্রকৃতি’ নামে খ্যাত, ‘আলা ভোলা’, ‘ভুলোমনা’ ৷ এটা হারাচ্ছেন, সেটা ফেলছেন, ওটা ভুলছেন..., শেষে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে ৷ তাছাড়া আগবাড়িয়ে কত মানুষের কত দায়িত্ব যে ঘাড়ে নেন সাধ করে! ফলে স্বভাবতই নিত্যকর্মটি সারতেই তাঁর গলা জল-হাবুডুবু অবস্থা ৷ তাঁর সঙ্গে আবার যদি যোগ হয় বোঝার ওপর শাকের আঁটি এক জরুরি তলবের হুকুমদারি, বেচারি তাহলে যায় কোথায়?

গ্রীষ্ণ-বর্ষা কাটলেই প্রকৃতিতে যেমন ভাসে উৎসবের সুবাস, মানুষের ঘরে ঘরেও তেমনই শুরু হয় তার প্রস্তুতির পালা—যার সর্বাপেক্ষা প্রথম সাড়াটি বুঝি নজরে আসে রায় পরিবারের সদাব্যস্ত বা বলা যায় ব্যতিব্যস্ত এই সর্বকনিষ্ঠ সদস্যাটির মধ্যে ৷ ফলে প্রতি বছরের মতন এবারেও ঘাড়ের একদিকে ঝুলছে তাঁদের সেই বিখ্যাত ‘কাশের গুচ্ছ’ নামক শারদোৎসবের মহড়ার খাঁড়া ৷ অন্য অংশে পাঠভবন রি-ইউনিয়নের বিশাল ব্যবস্থাপনার তোড়জোড়, যে সবে তাঁরা সবাই কার্যত যুক্ত না হয়েও, আপাদমস্তক সংযুক্ত ৷ আর মাঝামাঝি শূন্যস্থানটি দখল করে রেখেছে, গত দশবছর যাবৎ রাত্রিদিন পরিশ্রমে প্রায় শেষ পর্যায়ে আসা তাঁর লেখা ‘লুপ্ত দিনের গুপ্ত ব্যঞ্জন’ নামক কিলো খানেক ওজনের অসাধারণ সেই পুস্তকটি, এবারই বই মেলার আগে তারই আঁকা ছবি সহ ছেপে বেরুবার জন্য প্রকাশকের তাড়া ৷ এ তো গেল মরশুমি ব্যস্ততা ৷ তা বাদে বারোমাসে প্রায় ডজন খানেক সমাজসেবামূলক কাজেও একেবারেই চব্বিশ ঘণ্টা নিমজ্জিত ৷

তা এ জাতীয় যাবতীয় হাজার কাজের চাপে যখন ভাবছেন দম ফেলার সময়টুকু কোনওমতে বাঁচিয়ে ফেলতে পারলে কাজ আর কোন দিক থেকে কতখানি এগুনো যেতে পারে, ঠিক সে সময়ই বড়ো তরফ থেকে ছোটোকাকাবাবুর এই তলব—‘আর্জেন্ট ডিসকাস, কাম শার্প’ ৷

টেলিগ্রামের দিন গেলেও পুরোনো মানুষটি এখনও অতিপ্রয়োজনে এস এমএস করেন ওই ভাষাতেই, এবং অতিশয় প্রয়োজন বিনা সেটিও কদাচ নয় ৷ কিন্তু এই বার্তা পেয়ে তো বেণুবীণা ওরফে বাচ্চু রায়ের মাথায় হাত! খাইসে রে, বলে কী!! এ তো গোদের ওপর মারাত্মক বড়ো সাইজের বিষ ফোঁড়া —এবার উপায়?

বাবা জ্যাঠারা গত হয়ে তলানিতে এসে ঠেকেছেন এখন গুরুজন বলতে সবেধন নীলমণি এই ছোটোকাকাবাবুতে ৷ কিন্তু ওই তলানিই প্রয়োজনে উপচে ওঠে ঘড়ার কানা পর্যন্ত ৷ সেকেলে প্রবচন মতো ‘শাসন করা তারেই সাজে সোহাগ করে যে’ বাক্যটি একালেও যদি গুটিকয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে থাকে, তাহলে ছোটো কাকাবাবু বলা যায় তার অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ ৷ এবং সোহাগের আতিশয্যটি এখন আর প্রকাশ্যে তেমন টের পাওয়া না গেলেও, প্রথমটি কিন্তু একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকের মতনই অতিশয় দৃশ্যমান ৷ এক একটি রায় জারি করে, আরাম কেদারায় বসে গড়্গড়ায় ফুঁ দিয়ে হিজ হাইনেস চোখ দুটি বন্ধ করলেন মানে—ব্যস ৷ এর উপর আর কোনও মন্তব্য নিস্প্রয়োজন ৷ তবে, অতি প্রয়োজন বিনা সেটিও কদাচ নয় ৷

কিন্তু এমন একটা ডাক আসতে পারে তেমনটার ইশারা-ইঙ্গিত তিনি পাচ্ছিলেন অবশ্য কিছুদিন ধরে ৷ যার জন্য প্ল্যান প্রোগ্রামের কথাও ভাবছিলেন কাজের ফাঁকে-ফোকরে ঢিমে তালে ৷ একবার তাড়া খেয়ে মাপ-জোক সেরেছিলেন বাধ্য হয়ে আর বার কতক ব্যাজার মুখে ছক নকশা কাটাও দেখতে হয়েছিল মনে আছে ৷ পছন্দই হচ্ছিল না কিছু, ফলে গুরুত্বও দেননি তেমন ৷ তা বাদে অসংলগ্ন চিন্তা-ভাবনায় স্থিরও করতে পাচ্ছিলেন না, আদতে তিনি চান-টা কী? একবার ধুয়ো তুলেছিলেন ওই পাকশালাটা রেখেই ডাইনে বাঁয়ে ঘর তুলে বৃদ্ধাশ্রম করবেন ৷ পরিবারের বুড়োবুড়িরা সেখানে থাকবেন শেষ জীবনটা মনের আনন্দে... ৷ ওই স্মৃতিময় ঘর-দালান ভেঙে নতুন বাড়ি গড়বার কী দরকার? যে নিরামিষ পাকশালে বড়ো ঠাকুমা জলচৌকিতে বসে রান্নার তদারকি করতেন, ইঁদারার ধারের নাইবার ঘেরা-ঘরে বটুমা, ফুলপিসিরা ব্যাসন হলুদ রগড়ে স্নান করতেন, কত পুরোনো গাছের ছায়ায়, কত কালের স্মৃতি, হায়রে!...

তারপর সেই সুবাদে পয়সার শ্রাদ্ধ করে বার কতক নকশা-টকশা বানালেন খানিক, তার দ্বিগুণ হল বাতিল ৷ তারপর আবার যে কে সেই ৷ এবং যাদের কথা মাথায় রেখে এই সম্ভাব্য প্রকল্প তাঁরা অতঃপর সবাই স্বর্গবাসী হয়ে লাইনের গোড়ায় তাঁকেই, এগিয়ে আনলেন যথাসময়ে, —তবুও টনক নড়ল না ৷ কিছু বছর আগে, সে-ও বোধকরি এদিককার অনুরোধ উপরোধেই হবে হয়তো, বেশ ক’দিন মাতামাতি করলেন নতুন আইডিয়া নিয়ে ৷ অবসর নেবার পর এখানেই বেশিটা সময় কাটাবার জন্য একটি আবাস তৈরির ছক ৷ ক’টা যেন ঘর হবে, কোনদিকে যেন বারান্দা, এটা-সেটা... ৷ তা, সেও তামাদি হয়ে গেল, কাজের চাপে, নাকি সময়ের অভাবে বা অন্য কিছু কারণে কে জানে ৷ অতঃপর যথা পূর্বং তথা পরং ৷ তবে সম্প্রতি এই কানাঘুষো, কানে যেতে মাত্র ভাবছিলেন, শারদোৎসব, বর্ষশেষ ইত্যাদি ইত্যাদির কর্মকাণ্ড একটু সামলে নিয়ে, বছরের গোড়ার দিকে হাত খালি হলেই এবার ফের শুরু করে দেবেন—ফাইনাল ৷ নেহাত ওই হাতটাই খালি হচ্ছিল না কিছুতেই, এই যা... ৷ তা, সে খালি হাত করিয়ে ছাড়লেন ছোটোকাকাবাবুই স্বয়ং ৷

ব্যাপারটা হল এই—শামসিপুরের বড়ো তরফের রায়েদের কিংবদন্তী সেই জমিদারি খেতাব এখন বেহাত হয়ে গেলেও, জমি-জমা তো আছে যথাস্থানেই ৷ বিঘের পর বিঘে চাষের জমি, সার সার সুবিখ্যাত ল্যাংড়া আমের বাগান, তা বাদে কত মৌজা তহশীল, দিঘি পুকুর, বাজার স্কুল কলেজ আরও কী কী কে জানে ৷ আর আজকাল এক লপ্তে এই বিশাল সম্পত্তি সামলানো মানে, এক কথায় যাকে বলে—অসম্ভব ৷ এ পার্টি এক খাবলা পকেটে ঢোকালো তো অন্যপার্টি দু’ খাবলা পুরল মুখে ৷ মামলা-মোকদ্দমা পুলিস কেস, লাঠালাঠি সামলাতে মাইনে করা দু’ দুটো উকিলের গোটা বছর নাজেহাল অবস্থা ৷ তার উপর একটা কী যেন আইনও জারি হল কবে যেন, কত বিঘের বেশি যেন বাস্তুজমি রাখতে গেলে কী কী যেন মারাত্মক ট্যাক্স বসবে, নাকি বাজেয়াপ্ত বা অন্য কিছুও হতে পারে ৷ ফলে কিছু বছর আগে, বসতবাড়ি লাগোয়া বেশ খানিক বাস্তু জমিজিরেত, ছোটো ছোটো ভাগে বিভক্ত করে, অংশীদারদের নামে নামে বিলিয়ে, মাথার বোঝা সামান্য লাঘব করবার চেষ্টা করা হয়েছিল তখনকার মতন ৷ অর্থাৎ নিজের-নিজের সম্পত্তি এবার সামলাও নিজস্ব দায়িত্বে! তা বাদে খাসমহল চামেলি কুঞ্জ আয়তনে সে যত বিশালই হোক না কেন, গত একশো বছরে, ষষ্ঠীর কৃপায় বলতে নেই তার লোকসংখ্যারও তো মন্দ বৃদ্ধিলাভ ঘটেনি! সে ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা অবশ্যই অতি উত্তম বন্দোবস্ত ৷ সবার মধ্যে থেকেও বেশ নিজের মতন বাস ৷

সে সময় থেকেই যার যার রাজ্যপাট তৈরি শুরু করেছিল ধীরে ধীরে ৷ কেউ শহরে থাকে ম-স্ত আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িতে, বিলাস ব্যসনের সব ব্যবস্থা আছে—জমি নেই ৷ ফলে, সে ফুলে ফলে ভরা বাগান-ঘেরা বাড়ি বানালো একটা ছোট্ট ৷ কেউ বা পুকুরও কাটল তার একধারে ৷ পালা পার্বণে টলটলে জলের ধারে সবাই মিলে বসে যায় ছিপ নিয়ে ৷ কেউ আবার অবসর নিয়ে এখানেই বসবাস শুরু করেছেন পাকাপাকি ভাবে... চমৎকার ব্যবস্থা ৷ বড়োবাড়ি রইল হাতের নাগালে, আবার কেমন নিরিবিলি নিজস্ব পরিসর ৷ দারোয়ান আছে দেখাশুনোর জন্য, কারও বা কেয়ার-টেকার ৷ এর অসুবিধে হলে সে সামলাচ্ছে, তার সুবিধে মতন ও দেখছে, নিজেদের মধ্যে যেমনটা হয় আর কী! ছুটি-ছাটায় বন্ধু পরিজনেরও অবাধ যাতায়াত— বাদে আমাদের বাচ্চু রায় ৷

তাঁর ভাগে পড়েছে, খাজাঞ্চিখানার পুবে, প্রাচীন আম জাম বকুল গাছে ছাওয়া, বড়ো ইঁদারা আর ছাত-খোলা পাঁচিল ঘেরা মেয়েদের সেকালের নাইবার ঘর সমেত, পুরোনো পাকশালার সংলগ্ন মোট এক বিঘে জমি ৷ ভাগে সে পড়েছে বটে..., তবে ও পড়েই আছে যেমনকে তেমন, তাঁর গা-ই নেই মোটে! একে তো কর্ম-ব্যস্ততার কথা যতই বলুন, আদতে আঠেরো মাসে বছর ৷ সময় মতন কিছুই হয়ে ওঠে না, তা বাদে তার পছন্দটাও আর পাঁচ জনের চেয়ে একটু স্বতন্ত্র—আলটপকা নতুন কিছু মেনে নিতে তার সময় লাগে ঢের ৷ সাবেক কালের চিরাচরিত যা কিছু দেখে আসছেন, যাতে তিনি অভ্যস্থ, সেটি ছাড়া অন্য কিছু সয় না মোটে ৷ আর এই মনোভাবটাই তাকে বিপাকে ফেলেছে আরও দশগুণ ৷ তা বলে পুরোনো বাড়ির মায়া কাটিয়ে নড়া-চড়া যে হয়নি তা তো নয় ৷ বিয়ের পর থেকে কর্নেল সাহেবের সঙ্গে প্রতি বছরই তো শহর বদল করতে হয়েছে কোথাও মায়ায় না জড়িয়ে! অবসর নেবার পরও কলকাতায় সাত তলার টঙের ওপর, ঝাঁ চকচকে আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িতে পাখির বাসার মতন নতুন সংসারও ৷ তার আগে স্কুল কলেজের কথা ধরলে, হস্টেলে নিয়মমাফিক প্রতি ছ’মাস অন্তর তল্পিতল্পা বগলে ঘর পালটানোর দস্তুর ছিল, মায় ঘরের বাসিন্দাও ৷ সারাটা জীবনই তো শুধু পালটানো বদলানো, শিফটিং রিশাফলিং করা হয়েছে, করেওছেন বাধ্য হয়ে ৷ কেবলমাত্র—বাদে শামসিপুরের এই বড়ো তরফের চামেলিকুঞ্জ ৷

সাত রাজ্য ঘুরে, বারদুয়ারিতে এসে, গাড়ি থেকে নামলেই এখনও মনে হয়—এই এলাম চেনা দুনিয়ায় ৷ চেনা গন্ধ, চেনা-শোনা মানুষ, চেনা-জানা রীত-রেওয়াজ, চেনা চেনা খাবারের স্বাদ... ৷ কিন্তু সে সব চেনা অভ্যেসগুলোও এবার তো ঝেড়ে ফেলতেই হবে বাধ্য হয়ে ৷ হায়রে...!

যা আছে, সেটাকেই যদি একটু রদবদল করে গুছিয়ে-গাছিয়ে ফেলতে পারতেন...! কিন্তু তার জন্যও তো সময়-সুযোগ মতন কোমর বেঁধে নামতে হয়? ম্যাজিক করে হাতে ধরে তো কেউ আর দেবে না তাঁকে, যে, এই নাও! তার জন্য পরিশ্রম লাগে, অধ্যবসায় ৷ তৎসহ জোরদার কল্পনাশক্তির ব্যবহারিক উপস্থাপনা ৷ যেমনটা ছিল সেজোকাকার ছেলে বাবুয়ার ৷ আমলাঘর আর পিলখানার উঠোনটুকু পেয়েই, খানিক ভাঙল, খানিক গড়ল, ওমুক জায়গায় তমুক, ওই বদলে সেই..., ব্যস! তাতে মানানসই গাছপালা পুতে, লতা-পাতা সাজিয়ে এমন একটা দেখনদার হেরিটেজ বাংলো বানিয়ে ফেলল যে চামেলিকুঞ্জে অতিথি অভ্যাগত এলে ওদিকটাও একবার ঘুরিয়ে দেখানো হয় অবশ্যই—কনডাকটেড ট্রিপ ৷ তারা মোটরে চেপে ল্যাংড়া আমের বাগান, ঘাগর দিঘিতে নৌকো বিহার, নাট মন্দিরে সন্ধ্যারতি, সাবেক বাড়ির রীত-রেওয়াজ, পিলখানা, তোপশালা এটা সেটা পরখ করে, জয়জয়কার দিয়ে, শেষে ফিরে যায় যথাস্থানে ৷

তবে এও ঠিক, ও বাড়ির কাজ চলাকালীন বাবুয়াকে বার কতক তো দেখেছেনও বাচ্চু রায় ৷ ওরে বাবারে! কী পরিশ্রম! প্রায় দেড় দু’ বছর প্রতি মাসে এসে, ছাতা মাথায় কাঠফাটা রোদ্দুর, ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ দেখা! ইট কাঠ বালি পাথর আনতে টাউনের আড়তখানায় ছোটা! মাস কয়েকের মধ্যেই দেখে আর চেনা-ই যেত না তাকে ৷ দড়ি পাকানো শরীর, তামাটে গায়ের রং! কে বলবে যে সে নামী বিলিতি কোম্পানির, দামি সাহেব ৷

অতশত বাবু পোষাবে না বাচ্চু রায়ের ৷ তার জন্য আলাদা মনোবাঞ্ছা চাই, ভিন্ন রকম অভিপ্রায়, আর স্থির সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ৷ সে কারণে ওই কর্মকাণ্ড দেখে, ভাইকে আড়ে-ঠাড়ে বলেওছিলেন একবার যে, নিজেরটির সঙ্গে সঙ্গে যদি তার বোনেরটি অর্থাৎ বেণুবীণারটিও সেরে ফেলতেন একবারে... ৷ ঝঞ্ঝাট বাঁচাতে দুই ভাইয়ের একসাথে পৈতে অন্নপ্রাশন ইত্যাদি যেমন হয় আর কী! এক ঢিলে দুটো পাখিই বেঁচে যেত তাহলে ৷ তার কিনা বেশ উর্বর আইডিয়া মাথায় আর অপর্যাপ্ত পরিশ্রমের ক্ষমতাও ৷ তা, তাই শুনে সবার সামনে ঘর ফাটিয়ে এমন অট্টহাস্য হাসল বাবুয়া যেন সে এক দারুণ আমুদে প্রস্তাব ৷ বলে, সে পাখি বাঁচলেও, তার প্রাণ-পাখিটি যে খাঁচা-ছাড়া হয়ে যাবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই ৷ একেই জমিদারের গাড়ির ধাঁচায়, ঠিকাদারের ইঞ্জিন জুতে নিয়ে, ঠেলে-ঠুলে চালাচ্ছেন কোনওমতে ৷ এর সঙ্গে আর একটি যোগ হলে একেবারে অক্কা ৷ তা, বাচ্চু যে আনাচ-কানাচ থেকে যাবতীয় প্রাচীন খুঁটি-নাটি সংগ্রহ করছে, তার মধ্যে দেখুক না কেন আলাদীনবাবুর টুকরো-টাকরা স্মৃতিচিহ্ন-টিহ্ন যদি কিছু পড়ে থাকে এদিক সেদিক...? ঘষাঘষিতে ওই প্রদীপ দত্তকে একবার পেয়ে গেলেই, ব্যস ৷ ঢিল-টিলও ছুড়তে হবে না, বাড়ির প্ল্যান হাতে নিয়ে বশংবদ পাখিই এসে পায়ের কাছে পড়বে সটান ৷ অতঃপর ঘর-ভর্তি মানুষজন এমন হাসির কথায় হেসেই অস্থির, যা দেখে বাচ্চু রায়ই বা স্থির থাকেন কোন আক্কেলে! ফলে সে চিন্তায় অঙ্কুরেই বালি ৷

আসল কথা, এ পরিবারকে ওপর ওপর যতই আঁটোসাঁটো লাগুক না কেন, ভেতরে সব দাঁতকপাটি ৷ বোনের জন্য এক্সট্রা আর দেড়টা মাত্র বছর ডোনেট করতে পারলে, আজ কি আর তাকে এমন আতান্তরে পড়তে হত কখনও? মুখেই কেবল যৌথ পরিবার, হ্যানো-ত্যানো, আসলে তো ঘণ্টা ৷ দোল-দুর্গোৎসবে সব জড়ো হয়ে বাজি পোড়াচ্ছে, ঢাক বাজাচ্ছে, মুখে হাসি, চোখে আনন্দ, কাজের বেলায়—ব্যাং ৷ সৎ পরামর্শ দেবার একটা কেউ নেই দুনিয়ায় ৷ আগ বাড়িয়ে সাহায্যকারীও না ৷ পারে কেবল শাসন করতে, আর হম্বিতম্বি, ধমকধামক ৷ চেষ্টা তো করেছেন তিনি৷ করেননি একেবারে তা তো নয় পছন্দ না হলে দোষ কি তার? ফলে বার কতক ডিজাইন বদলে বদলে আপাতত আর্কিটেক্টের সঙ্গে কথাই বন্ধ ৷ ঠিকাদারও মাপ জোক করে করে, শেষে বসে বসে হাপিয়ে উঠেছে ৷ অন্য জ্ঞাতিগুষ্টির ভাই বোনের তৈরি ওই সব পাওনা জমিতে নতুন বাড়ি ঘরে শ্যাওলাও জমতে শুরু করেছে ৷ বাগানের চারাগাছগুলো বেড়ে বেড়ে বুড়ো হয়ে গেল ক-বে! তৎসহ বাচ্চু রায় নিজেও ৷ বাড়ি আর হল না তাঁর ৷

প্রথম দিকে তো অতশত গা করেনি কেউ! মনে হয়েছে আছে তো ব্যবস্থা, ভেবে চিন্তে করবে ’খন সময় বুঝে! কিন্তু বাকি আর সব জিনিসের মতন সময়েরও কিন্তু একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে, এবং সেটি পেরিয়ে গেলে অনিবার্য ভাবে পচন ধরারও সম্ভাবনা ষোল আনা, যেমনটি হয়েছে এ ক্ষেত্রে ৷

তার উপরে ভাগের আসবাবও তো কিছু কম নয় ৷ সে সবও তো বিলি ব্যবস্থা হয়েছে সমপরিমাণে ৷ কলকাতার বাগান-ঘেরা ‘রায় বাটি’ ভেঙে ফ্ল্যাট বাড়ি উঠল, তার সরঞ্জাম; চাঁচোলের মহাল বিক্রি হল সেখানকারও আলিসান খাটপালঙ্ক থেকে শুরু করে গৃহসজ্জা বাবদ অন্যান্য সমস্ত খুঁটিনাটি... ৷ সেও আবার নিজের নামে ধার্যটুকু নিয়েই শেষ নয়, অন্যদের বাতিল করা সামগ্রীও যে জমা করবেন স-ব! অতকালের স্মৃতি জড়ানো আসবাব-পত্তর, তৈজসাদি নাকি বুকে ধরে ফেলাই যায় না কখনও ৷

তা, যায় না ফেলা, তবে জড়ো করে রাখেনই বা কোথায়? কলকাতার ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকবে না অতশত, আর তাঁর বাড়ি তো এখানে, কাগজের নকশাতেও না, কেবল ভারচুয়াল স্পেসেই ৷ ফলে, বাড়তি সমস্ত কিছু এনে জড়ো করে রাখা হচ্ছে ওপর মহলের শোবার ঘরেতেই! দুটো পালঙ্কের পর আড়াআড়ি ঢুকেছে আরও একটা ৷ কোণের দিকে সার সার তিনটে ড্রেসিং আয়না ৷ খাটের নীচে বাসনের ডাঁই ৷ আলমারির মাথায় সাবেককালের ঘড়ি থেকে দাবার-ছক, ঠাকুমার পানের বাটা, জ্যাঠাবাবুর লাঠি, ফুলকাকিমার সেলাই বাকসো... ৷ দাসি-বাঁদিরা ঘর-দোর পরিষ্কার করতে হয়রানির একশেষ ৷ পালা-পার্বণে লোকজনের সমাগম হলে, সাবধানে পা ফেলতে হয় ৷ বাচ্চারা ছুটেছুটি করতে, ঘাড়ে মাথায় ফেলছে এটা ওটা—কী ঝঞ্ঝাট! মুখে কেউ তেমন বলেনি গোড়ায়, ভেবেছে নিজের হলেই তো ফাঁকা হয়ে যাবে সব ৷ আহা রে, নরম মনের মেয়ে, অতকালের কাছের মানুষদের ব্যবহার করা কত পরিচিত সব তৈজস-পত্তর, সে ত্যাজ্য করা কি মুখের কথা? তার জন্য বুকের পাটা চাই ৷ কিন্তু তারাই বা কত সহ্য করবে? ফলে নালিশ যাচ্ছে জায়গা মতন!

এ তো গেল ঘর-দোরের অবস্থা, তা বাদে তাঁর প্রাপ্ত খাস-জমিটির দশা আরও শোচনীয় এবং অপ্রীতিকর ৷ কারণ বড়ো তরফের এ বাড়ির একটা বিশেষত্বই যেন, তার আনাচ-কানাচ, সিঁড়ি ছাত সর্বত্র একেবারে ঝকঝকে তকতকে যাকে বলে টিপটপ ৷ অতবড়ো দালানবাড়ির কোথাও বাড়তি একটুকরো কাগজও পড়ে থাকতে দেখবে না কেউ, বা উঁচু পাঁচিল-ঘেরা অমন বিশাল জমিতে একটা আগাছা বা জমা জল, অথবা পচা মরা ডালপাতা কিংবা সংসারের বাতিল করা এটা ওটা ৷ এক্ষত্রে, এমনতরো রায় এস্টেটের বাচ্চু রায়ের ভাগের মহালটা যেমনকে তেমন ভাবে পড়ে আছে, যেন একটা অনাথ, বেওয়ারিশ ছাড়া জমির মতন! বাটোয়ারার পড়েও বহুদিন পর্যন্ত, খাস মহলের সঙ্গে ওই জমির দেখাশুনো করা হত—ঝাঁট-পাট দেওয়া, আগাছা নিড়োনো ৷ শেষে অন্যেরা বাড়িঘর বানাতে থাকলে বড়ো পাঁচিলের গায়ে লাগা ও অঞ্চলটি হয়ে গেল পুরোপুরি একটেরে, আর সময়ও তো কম কাটেনি, কতদিন আর চলবে সে পর্ব? মানুষের ধৈর্য্য বলেও তো একটা ব্যাপার আছে না কী? ফলে সবাই বিরক্ত...! গুণের মেয়ে, নাচছ, গাইছ, বই লিখছ—খুবই সুখের কথা ৷ তা বলে সংসারের কর্তব্যটাও ভুলে থাকতে হবে?

রাত-বিরেতে লোকজন ঘুর ঘুর করে ওদিক পানে, দিন দুপুরেও খুটুর খাটুর শব্দ হয় ৷ হবে নাই বা কেন? অমন নিরিবিলি ছাড়া জমি পেলে সাপ-খোপ, চোর-ছ্যাঁচর তো বটেই, এবার ভূতে এসেও আস্তানা গাড়বে নিশ্চিত ৷ অতএব যে বয়োজ্যেষ্ঠ ছোটোকাকা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে ওই টেলিগ্রামি সংক্ষিপ্ত শব্দে তলব দিয়ে আনিয়ে নিয়ে নজরবন্দি করে রেখেছেন ভাইঝিকে ৷ বাড়ি শুরু না করলে এবার শামসিপুরের বাইরে পা-ও রাখতে দেবেন না মোটে ৷ আগামী সোমবার কনট্রাক্টর আসবে, পরশু থেকে মজদুর লাগবে, শুভস্য শীঘ্রম ৷ নকশা টকশা যা হয়েছে তাতেই হবে, কাল সকালেই বসতে হবে কাকাবাবুর কাছে ইত্যাদি ৷ যেহেতু এই সাবেক বাড়ির রেওয়াজ মেনে গুরুজনদের শ্রদ্ধা ভক্তি যা-ই করুক না কেন, ভয়টা করা হয় সব চাইতে বেশি ৷ সেহেতু পত্রপাঠ তৎক্ষণাৎ সব ছেড়ে ছুড়ে, উড়ে পুড়ে সে-ই যে চামেলিকুঞ্জে এসে হাজির হয়ে পুবের ঘরে ঢুকেছেন একবার, সেখান থেকে আজই প্রথমবার মাত্র পা রাখলেন এই ছাতে ৷

অথচ হুলিয়া পেয়ে পড়ি মরি করে তিনি তো সশরীরে এসে হাজির, কিন্তু সঙ্গে নকশা টকশা, মাপ জোকের কাগজ-পত্তর, মায় মিউটেশন, রেজিস্ট্রেশনের, ওরিজিনাল তো দূরের কথা কপিটি পর্যন্ত নেই ৷ কো-ন কালে বানানো হয়েছিল সে কোথায় যে গেছে কে জানে! গাঁয়ে-গঞ্জে শেষের দুটি বাদেও আপাতত কাজ তো চলে যাবে, কিন্তু প্রথমগুলো? একবার লম্বা দালান সমেত সার সার ঘরওয়ালা বৃদ্ধাশ্রমের ডিজাইন হয়েছিল মনে আছে ৷ তারপর সেটি বাতিল করে দোতলা বসতবাড়ি, অতঃপর একতলা বাংলো টাইপ—সামনে বারান্দা, পেছনে কী যেন... ৷ দুটো বাথরুম, একটা রসুই ঘর, নাকি তার উলটো? এলোমেলো মাথায় কিচ্ছুটি মনে পড়ছে না ৷ কতবার বদল হয়েছে, কতরকম ভাবে, সে কখনও থাকে কারুর মনে? কেবল মনে পড়ছে কাল তাঁর কপালে আছে, সর্ব সম্মুখে চরম দুর্দশা লেখা আছে ৷ এ অবস্থায় সীতার মতন যদি পাতালে ঢুকতে পারতেন কিংবা সতীর মতন দেহত্যাগ..., নাকি তারও উলটো? সতীর মতন পাতালে..., আউলা মাতায় সেটাও যে ছাই গুলিয়ে যাচ্ছে...!

তবে একদিন ভেবে ভেবে, নিজেকে টেম্পোরারি আড়াল করবার মতন ঢাল একটা পেয়েছেন হাতে যে—কাল থেকে দালান ভাঙবার কাজ তো শুরু হোক! তারপর ওই পুরোনো পাকশাল, ভাঁড়ারের শক্ত পোক্ত তিরিশ ইঞ্চি মোটা দেওয়াল, ছাত ভেঙে গুঁড়িয়ে ফ্ল্যাট করতে করতে যেমন করে হোক লোকাল কোনও নকশাদার ডেকে এনে, যা হোক কিছু একটা খাড়া করে প্রাণটা বাঁচিয়ে ফেলবেন আপাতত ৷ আগে প্রাণ বাঁচলে তবে না মান! অতঃপর দম নিয়ে ভাবা যাবে, অতঃকিম? নাকি ঘোড়ারই ডিম ৷ দত্তমশাই কী যে ভাববেন, আর ছেলে-মেয়েরা তো আরও দশগুণ, এবং আত্মীয়-স্বজনের গুণের মাত্রাটা একশো না দেড়শো, সেটা তো ধারণারও বাইরে ৷ তার সাথে হাসা হাসি, তামাশা, মশকরা, টিপ্পুনি... ৷ দোষও দেওয়া যায় না, সবুরে মেওয়া ফলার কথা শোনা যায়, তার ক্ষেত্রে তো ফলতে চলেছে ওলকচু ৷ উপরন্তু নির্লিপ্ত মুখে, জল্লাদের মতন ওই সব স্মৃতি মেদুর এতকালের দালান কোঠা ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলার রায়ও দিতে হবে! হায়রে হায় ৷ এ দুঃখ বোঝায় কাকে! নিজের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন, অগোছালো, ছেলেমানুষি স্বভাবের জন্য এই প্রথম, নিজের ওপরই অসীম বিরক্তিতে, অপার দুঃখে, আর অনন্ত চিন্তায় পাগল-পারা অসহায় বেণুবীণা ওরফে বাচ্চু রায় সন্ধে রাতের অন্ধকারে একা একা চামেলিকুঞ্জের সুগন্ধ মাখা, বি-শা-ল নির্জন ছাতে পায়চারি করতে লাগলেন এমাথা থেকে ওমাথা ৷

অন্ধকার মোটামুটি গাঢ় হওয়াতে কালো আকাশে খানকতক তারাও ফুটেছে ৷ দেউড়ির জোরালো আলোটা এদিক থেকে বড্ড চোখে লাগে বলে বাচ্চু রায় অন্যদিকে সরে, বড়ো গাছের আড়াল করা এলাকাটার প্রায় শেষ প্রান্তে যেতেই, অদ্ভুত ‘খুঁক খুঁক’ গোছের একটা আওয়াজ পেলেন যেন ৷ প্রথমটা গা করেননি, হয়তো বা ভেবেছিলেন ঝাঁকড়া গাছে বাসা বাঁধা কোনও পাখি টাখি হবে, বা কী জানি কী... ৷ পরক্ষণেই স্পষ্ট গলা খাঁকরানি এবং ‘খুকুরানি দিদিমণি’ নামে, একেবারে সরাসরি তাকেই সম্বোধন ৷

নিজের এলোমেলো শতেক চিন্তায় তিনি এমনই মগ্ন ছিলেন, যে সহসা তাঁর মাথাতেই এল না বহুযুগের ওপার থেকে তামাদি হওয়া এ নামে আর তাকে ডাকবেটা কে! ফলে পিছু ডাকে স্বাভাবিক ভাবেই ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন, ঝাপসা অন্ধকারে সামান্য তফাতে একটি কৃষ্ণকায়, কৃশ অবয়ব ৷ শরীরের অংশটি আবছায়াতে তেমন স্পষ্ট না হলেও সাদাটে ধুতি আর গায়ের ফ্যাকাশে পিরানে বুঝতে পারলেন যে এ বাড়িরই কর্মচারী এবং নির্ঘাৎ কাকাবাবুর আগাম আদেশে সিঁড়ি ভেঙে ডাকতে এসেছে তাকে ৷ হাতে ঘড়ি নেই, সময়ও ঠাহর হল না কতক্ষণ ধরে পায়চারি চলছে ছাতে, বললেন—‘‘কটা বাজে? কোথায় কাকাবাবু?’’

কিংকরটি সর্দি বসা চাপা গলায় জানাল যে, সময়ের হিসেব তারও নেই, আর কে কোথায় আছে, সেও সঠিক জানা নেই তার, তবে প্রয়োজনে নিমেষে জেনে আসতে পারে ৷ সে এসেছে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটা বিশেষ প্রয়োজনে...৷

আগামীকাল অমাবস্যা, পরশু মহালয়া হয়ে পিতৃপক্ষ শেষ ৷ তোষাখানার ধারে অস্থায়ী কড়া বাতি জ্বেলে প্রতিমা গড়ার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে পুরোদমে ৷ ঘরে ঘরে মানুষজনও আসতে শুরু করেছে একে একে ৷ আজ পুবের ঘরে আলো জ্বলল তো কাল উত্তর-পশ্চিমের ৷ ফলে, বাড়তি কাজ-কম্মের জন্য কম করেও ডজন খানেক অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ করা হয় এই সময়ে ৷ তবে সে ক্ষেত্রেও মোটামুটি বাঁধা-ধরা মানুষজনই আসে প্রতিবছর ৷:চিন্তামগ্ন, বিভ্রান্ত বাচ্চু রায়ের এবার যেন সংবিৎ ফিরে এল, আর এও মনে পড়ল ফেলে আসা সেই নামটা ছাড়া, আর... কিছুই তো পরিচিত লাগছে না তাঁর! না চেহারা, না গলার স্বর... ৷ আর কিছুই না জেনে ইনিই বা হাজির হলেন কেন? একটু অস্বস্তিতে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন বাচ্চু রায়—একা, নাকি কয়েকজন? মুখে বললেন—‘‘তা তুমি..., এখেনে..., মানে, কী চাও? আমি ঠিক... ৷’ কথাটা শুনেই ঝাপসা ধুতি—পিরান সামান্য পিছিয়ে গিয়ে একেবারে নব্বই ডিগ্রি ঝুঁকে পড়ে কেবল হাতজোড়ই করল না, অন্ধকারে যদি দৃষ্টিগোচর না হয়, তাই মুখেও বলল—‘‘গড় হই শ্রীচরণে ৷’’

বাড়ির সর্বাপেক্ষা ছোটো মেয়ে হলেও বয়স হল প্রায় তিন কুড়ি, ফলে এ বাড়ির রেওয়াজ মতন দু বেলা প্রণাম টনাম পাবার মেলা অভ্যেস আছে তাঁর ৷ বিশেষত সেবক শ্রেণিরা তো বয়স-টয়সেরও ধার ধারে না ৷ নেই কথাতেও গড় হচ্ছে, সাষ্টাঙ্গে ৷ হাতজোড় ছাড়া যেন কথাও বেরোয় না ৷ কোন কালে জমিদারি পাঠ উঠে গেলেও, গ্রামে গঞ্জের রীত-রেওয়াজ, পাঁচ পুরুষেও অত সহজ না কাটানো ৷ তাই স্বাভাবিক ভাবেই বললেন—‘‘সে না হয় হলে, তবে ব্যাপার কী?’’

—‘‘বেপার এট্টা আছেন এঁজ্ঞে, এট্টা আজ্জি আছেন আপনের তরে ৷ ভস্যা দিলি পরে নিবিধন কত্তাম, বড়ো আতামতরে পইরে পরে আপনের তরে আসা গো...’’

কীসের ভরসা, কীসের আর্জি বা আতান্তর কিছুই বুঝতে না পেরে তিনি অপেক্ষা করলেন খানিক ৷ আদতে তাঁর নিজেরই তো বলবার কথা এসব! যা আতান্তরে পড়েছেন তিনি! বললেন—‘‘তা এখেনে কেন? নীচে যাও! আমি নামব একটু পরে ৷ তোমার নাম কী? চিনতে পারছি না ঠিক... ৷’’ আর মনে মনে বললেন, ‘যত্ত ঝঞ্ঝাট ৷ বারান্দা-ভরা লোকের মাঝ দিয়ে উঠে এল সটান ওপরে, কেউ দেখল না ৷ আর আমাকে বলার বেলায়— ছাড়া জমিতে চোর ডাকাতের আস্তানা ৷’

চিন্তাটা শেষও হয়নি, মাথার চিন্তা লুফে নিয়ে, লোকটি বলল, ‘‘সিঁড়ি দিয়ে তো আসি নাই ঘুর পথে ৷ সেদিক দিয়ে সোজা আলাম ৷’’ বলে একদম উলটোবাগে হাত ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিল, এবং কাঁচুমাচু-স্বরে বলল যে, তার পক্ষে নীচে গিয়ে কথা বলা নাকি একেবারেই অসম্ভব ৷ রোদ আলো বিজলিবাতি সয়না কিনা মোটে! তৎসহ এও বলল যে, মুখ চেনাও সম্ভব নয়, তবে পরিচয় দিলে হয়তো ধরতে পারবেন ৷ শিশুকালে দেখেছেন বটে তাকে, সে-ও নাম মনে থাকবার কথা নয় অবশ্য ৷ নাম তার বদনচাঁদ ৷ গোটা গুষ্টি তারা এ বাড়ির নুন খেয়েই প্রতিপালিত ৷ এবং ছেলের নাম বললে তো এক ডাকেই চিনবেন সবাই—পবন ক্ষ্যাপা ৷

ভয়-ভাবনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, কৌতূহল, অনিশ্চয়তা ইত্যাদি নানান প্রকার অবস্থার মধ্যবর্তী বাচ্চু রায়ের, এবার নিজের অজান্তেই হাঁ হয়ে গেল মুখটা—পবন মানে, এবাড়ির বহুকালের ডান হাত! ম্যারাপ বাঁধছে, কল সারাচ্ছে, মাটি খুঁড়ছে, দড়ি টাঙাচ্ছে—অর্থাৎ কাঁঠালি কলারও চতুর্গুণ অর্পরিহার্য মানুষটি! গত বছর পুজোর মুখে নাটমন্দিরে হাসতে হাসতে চাঁদোয়া টাঙাতে গিয়ে, দুম করে মরে গেল সবাইকে কাঁদিয়ে ৷ বয়স হয়েছিল মোটামুটি, অসুখবিসুখও ছিল বোধহয় ভেতরে ভেতরে—কিডনির গণ্ডগোল, হার্টও খারাপ ৷ কিন্তু তার বাবা! সে তো প্রায়... গত জন্মের কথা! বেশ মনে আছে—বদনা...! ছোটোবেলায় নিজের নাম বলতে গেলে বলতেন, ‘‘ডাকনাম বাচ্চু, ভালোনাম খুকুরানি দিদিমণি’’ তা, সে তো বদনার দেওয়াই নাম...! মুখে বললেন—‘‘তুমি বদনচাঁদ? কী বলছ তুমি! পাগলের প্রলাপ..., সে কোনকালে ৷ আমরা কলকাতায় থাকতেই তো তুমি..., আমার তখন বছর পাঁচেক বয়স ৷ ফাজলামি করছ?’’

এ কথায় বদনচাঁদ হাতটাত কচলে নতমুখে, দ্বিধা ভরে যেই উত্তরটি দিল, তাতে বাচ্চু রায়ের তৎক্ষণাৎ ভিরমি খেয়ে, উলটে পড়ে, হার্ট ফেল করবার কথা ছিল, কিন্তু আদতে সে সব কিছুই হল না ৷ হয়তো, অতিপরিচিত পরিবেশ, পূর্ব পরিচিত প্রিয় মানুষ জনের ক্ষেত্রে জীবিত-মৃত বা ভূত ভবিষ্যতের কোনও তফাত হয় না বলেই এমন অবাক কাণ্ড...!

বদনচাঁদ তার নিজের ভাষায় যা জানাল, তার সংক্ষিপ্তসার হল গিয়ে যে, মদন ঢালি, বালক বয়সে আদত বাড়ির ফাই-ফরমাশের কাজ দিয়ে শুরু করলেও, পরবর্তী কালে নতুন মহল চামেলিকুঞ্জে বহাল হয় খাস চলনদার হিসেবে৷ বদনের তখন জন্মও হয়নি ৷ পরে নিয়মমাফিক সে-ও রাখাল, পাঙ্খাপুলার, বাতিদার, হুঁকাদার ইত্যাদি বিভিন্ন কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে অতিক্রম করে, স্থায়ী পদ পায় বড়োবাবু অর্থাৎ জ্যাঠামশাইয়ের দফতরের অতি বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী হিসেবে৷ সে সময় খুকরানি দিদিমণিরা মেজোবাবুর সঙ্গে যখন আসতেন কলকাতা থেকে, বদনচাঁদের কাজ হত, তাঁকে কাঁধে চাপিয়ে ঘুরিয়ে—বেড়িয়ে বায়না সামলানো ৷ তা, প্রায় সে সময়েই এক কালবৈশাখী ঝড়ের দুপুরে, পুরোনো পাকশালের পেছন দিকে নারকেল গাছে বাজ পড়ায়, বিদ্যুৎ-স্পৃষ্ট হয়ে অকস্মাৎ মৃত্যু হয় তার ৷ পবন তখন কিশোর, আর একটু ক্ষাপাটেও বটে ৷ তবু দয়ার সাগর বড়োবাবুর কৃপায় কাজ জুটে যায় তৎক্ষণাৎ ৷ আপাতত পবনার দুই ছেলেও এ বাড়িতে বহাল ৷ একটা বুঝি কাঠের মিস্তিরি অন্যটা ইলেকটিরির কাজ করে ৷ কাজ মানে ওই আর কী...দুটো হয়তো পেরেক ঠুকল কোথাও, র্যাঁদা মারল বার কতক, বিজলি বাতি লাগালো মই-এ চেপে, নয়তো তার টেনে আনল এঘর থেকে ওঘর... এই সব আর কী... ৷ গায়ে গতরের পরিশ্রমের কাজে কম্মে ঘণ্টা ৷ পশ্চিমে টিনের চালওয়ালা পাকা ঘর পেয়েছে, সামনে দাওয়া, রেতের বেলায় ঘরে টিভি চলে, পেসার কুকারে সিটি শোনা যায়... ৷ এদিক সেদিক দেখে থাকলেও, তাদের তেমন চেনে না বদনচাঁদ ৷

তা... এখন কথা হচ্ছে, খুকুরানি দিদিমণির ভাগে পাওয়া ওই জমিতে গত পঞ্চান্ন বছর যাবৎ পরিবার-বিচ্ছিন্ন বদনচাঁদের একাকী বসবাস ৷ নিজেদের গাঁ-বাড়ি কোথায় ছিল কেউ আর বলতে পারবে না, চার-পুরুষের হেথায়ই বাস, হেথায়ই সৎকার ৷ কিন্তু কেতারখালি মৌজোর মামুনাদিয়া শ্মশানঘাটে অন্যান্যদের মতন দাহ-সৎকার হলেও, তার কিনা অপমিত্তু, তাই তার মিত্তু হয়েও মিত্তু নাই ৷ অর্থাৎ জনমে-মরণে মনিব বাড়িতেই ঠাঁই ৷ সেটি পাওয়া কি মুখের কথা! এ হল গিয়ে তার উপরি পাওনা ৷ শতেক জনম পুণ্যি থাকলে তবে এমনটি হয় ৷ সুতরাং পুরোনো পাকশালের পশ্চিমে, ভাড়ার আর জ্বালানি কাঠের আড়তের মধ্যবর্তী অংশে, টিনের চাল, শান বাঁধানো পাকা মেঝের চৌহদ্দিতে তার রিটায়ার্ড লাইফের নিরালা নির্ঝঞ্ঝাট কোয়ার্টার ৷ কিন্তু গত মাস খানেক থেকে সেই বাসেই হয়েছে মস্ত ঝঞ্ঝাট ৷ সকাল থেকে ফিতে লাঠি নিয়ে মাপ-জোক হয় ৷ বাড়ির নকশা হাতে কনট্রাক্টর আসে ৷ একদিন তো ইট কাঠ জানালা দরজার দামদরও করে গেল টাউনের এক ঠেকাদার—ওই পাকশালা চত্বর নাকি ভেঙে ফ্যালাট করে বাচ্চু রায়ের বাড়ি হবে... ৷ চুন সুরকির গাঁথনি দেয়া, পঙ্খের দেয়ালে নকশা তোলা অতো সুন্দর পাকাপোক্ত সাবেক ঘর, সে গুঁড়িয়ে, আ-পলকা, ফংবেনের ঠুনকো বাসা বানানো কি উচিত কাজ? আর, এ বয়সে, এতকালের আস্তানা ছেড়ে, বুড়োমানুষ, সে-ই বা নতুন করে যায় কোথায়? মানুষ এখন মানুষকেই রেয়াত করে না, তো ভূত-প্রেত..., ঢিলিয়ে তাড়াবে তার ছায়াটুকুও দেখলে ৷

শেষের দিকে বদনচাঁদের ভাঙা ভাঙা সর্দি বসা গলাখানা কান্নায় প্রায় বুজে আসছিল ৷ আর চোখের কোলে জলও বোধহয় ৷ কারণ ধুতির খুঁট তুলে ধরছিল মাথাটা নিচু করে ৷ তা দেখে আবেগপ্রবণ বাচ্চু রায় ওরফে বেণুবীণা দত্তরও গাল বেয়ে জলের ধারা ৷ শিশু বয়সের সে সব দিনের কথা স্মরণে নেই আর, অথবা সামান্য কিছু মিছু থাকলে, তা ঘষা ঘষা অস্পষ্ট, তবে নামে জানেন ৷ আরও জানেন পাকশালের পুবে মাথাকাটা সেই নারকেল গাছটা, যার পাঁচ কাঁদি ঝুনো নারকেল সমেত বদনচাঁদ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিল ৷ সেটি তো এখনও বিদ্যমান, তৎসহ ডালপালা বিস্তারিত সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার বিবরণও ৷ তবে, সে যে এখনও ওই চত্বরেই বসবাস করে, সে তো টেরটি পায়নি কেউ! কাউকে দেখা না দিয়ে, পরিত্যক্ত ভাঁড়ার ঘরের কোন ঘুপচিতে জড়ো-সড়ো হয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছে বেচারা! অথচ সব পুরোনো পরিবারের মতন এই সাবেক কালের চার পুরুষি জমিদার বাড়ির আনাচ-কানাচে অশরীরী আত্মার কমতিও তো নেই কোনও!

দেউড়ির চৌকিদার রহিম মিয়াকে তো এখনও ঠকঠক করে লাঠি ঠুকে ঘুরে বেড়াতে দেখে রাত দুপুরে কত লোকে ভির্মি খেয়েছে ৷ সাবিত্রী-ঝির ভরদুপুরে পিছদুয়ারি কুয়োতলায় খড়মড় করে পাঁজা-পাঁজা বাসন মাজার আওয়াজ শুনে দল বেঁধে গিয়ে দেখেছে, মজা কুয়োর পাড় তখনও টাটকা জলে ভেজা ৷ এঁটো কাঁটা, ছাই ছোবড়া পড়ে আছে এদিক ওদিক... ৷ অথবা, আশি বছরের তালাবন্ধ বাবাদের স্বদেশি করা ছোটোকাকার ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে সেজবাতির আলো দেখা যায় নিয়মিত... ৷ এমন আরও কত শত দুর্ঘটনার ঘটনা যে ছড়িয়ে আছে রায় বাড়ির রটনার মধ্যে ৷ এই সব ডাকসাইটে অশরীরীদের মধ্যে বদনচাঁদের নাম উল্লেখও তো করে না কেউ, ইশ রে... ৷

এমন অন্যায় গাফিলতির কারণে মায়া মমতায় বাচ্চু রায়ের মনটাও গলে গিয়ে বেয়ে বেয়ে পড়ছিল চোখের জলের মতন ৷ বললেন—‘‘তুমি একদম চিন্তা কোরো না বদনচাঁদ, নিরিবিলি চোখের আড়ালে তোমার কোয়ার্টারের ব্যবস্থা আমি করব ৷ বলো, কোন এরিয়াটা তোমার পছন্দ?’’

এতখানি ভরসা পেয়ে, নির্ভয়ে নাক-গলা ঝেড়ে বদনচাঁদ জানাল—‘‘ওই পুরোনো পাকশালের পুবে... ৷’’ অর্থাৎ কিনা এতকাল যেখানে আছে, ঠিক সেই স্থানেই ৷

অতঃপর ফের বাচ্চু রায় পড়লেন মহা ফাঁপড়ে ৷ ও জমি তো পড়েছে তারই ভাগে, আর যা নিয়ে এই অকূল পাথার চিন্তা মাথায়! পাঁচ সাত বছর আগে হলে, সাত পাঁচ অত না ভেবে অনায়াসেই বলে দেওয়া যেত যে থাকুক না সে তার নির্দিষ্ট জায়গায়, কোনও চিন্তা নেই ৷ কিন্তু এখন তো সে প্রায় দেবোত্তর সম্পত্তি! ভূতোত্তর বলে দান করে দেবার আর কোনও ক্ষমতাই যে নেই! কাল সকালে ছোটকাকাবাবুর সঙ্গে বসতে হবে নকশা হাতে কনট্রাক্টর সাহেবকে কপি দেওয়া হবে ৷ ঠিকাদার আসবে ৷ বদনচাঁদ ঠিকই বলেছে, আগে জানলা দরজা বিক্রি হবে, তারপর ইট পাথর ৷ শেষে শূন্য গড়ের মাঠে ক’দিনের মধ্যেই মাথা তুলবে, পাঁচিল তোলা ইতিহাস-হীনা, দু’ হাজার স্কোয়ার ফুটের আধুনিক এই ঠাঁই... ৷

মনের কথাটা ফের লুফে নিয়ে সর্বজ্ঞ বদনচাঁদ বলল—‘‘হাজু-বাজু মানুষ আমরা, কত্তা লোগেরে আইজ্ঞা দেয়া অধম্মের সমান—তবে নিভ্যয় দিলি পরে এট্টা আজ্জি রাখি চরণতলে—ও দালান মোটে ভাঙতি দিবেন না ৷’’

বাচ্চু রায় হাসলেন মনে মনে—দেবার যেন কত মালিক তিনি! ওই নামেই মালিক, কামে না ৷ মুখে বললেন—‘‘এখন আর দ্বিতীয় চিন্তার সময় নেই বদনা ৷ পরিবারের সবাই আমার বিপক্ষে ৷ কাল সকালের মধ্যে নকশা জমা করতেই হবে ৷ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, লোক লশকরের ব্যাবস্থা করেই আসছেন ৷ নকশা হাতে পেলেই শাবল গাঁইতির কাজ শুরু করে ফিরে যাবেন—এতগুলো বছর কেন যে নষ্ট করলাম ৷ টাকা-পয়সার শ্রাদ্ধ করেছি, তার সঙ্গে সময়, মান-সম্মান—, সব জলে গিয়েছে, সব—সব ৷ এখন মরণকালে হরির নাম ৷ আমার আর ভালো লাগে না, নিজের ওপরই এমন বিরক্তি... ৷’’

—‘‘কাজের বোঝা মাতার পরে পড়লি পরে বিরত্তির হয় বটে, তবে নিজের পতি বিরকতর হবা কাজের কাজ লয় মোটে ৷ কাজ কম্ম লয়—ছয় হয়ি যায় ৷ ঠান্ডা মাতায় ভাবতি হবে...’’

—‘‘ভাবার আর আছেটা কী? চার দিন-চার রাত ভেবে ভেবে একটা উপায় পেলাম, এখন বলছ...’’

বাচ্চু রায়কে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বদনচাঁদ বলল—‘‘এতকালের দালান কোঠা..., কেবল চারদিনের চিন্তা-ভাবনায় নিসপিত্তি করলেন বল্লিই কি তার নিসপিত্তি হয়?’’

বাচ্চু রায়ের বিরক্ত লাগছিল ৷ একে তো এবার বৃষ্টি-বাদলার আকাল হাওয়াতে শরৎকালটি হয়েছে জষ্ঠি মাসেরও অধম, তায় এবার সুযোগ বুঝে বদনা-ভূতও শুরু করল তাকে দর্শনতত্ব বোঝাতে ৷ পড়েছে কুয়োতে, এখন ব্যাঙের লাথি তো খেতেই হবে... ৷ ফলে স্বভাব-বিরুদ্ধ যথাসম্ভব খরখরে গলায় বললেন—‘‘তা, সে দেড়শো বছরের দালানকোঠার নিষ্পত্তি করতে কী তাহলে আগামী দেড়শো বছর লাগাব?’’

গলার স্বরে বা প্রশ্নের ভাষাতে, বদনচাঁদ তৎক্ষণাৎ একেবারে কাঁচুমাচু হয়ে যেন নুয়ে পড়ল মেঝের ওপরে ৷ তারপর কাঠির মতন দুটো হাত কানে দিয়ে মাথাটা নাড়তেই লাগল অনবরত খটখট করে ৷ তার সঙ্গে জিভও কেটেছিল নির্ঘাৎ আধহাত, তবে কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার গৃহ মস্তকের বিপরীত অংশে থাকবার ফলে, সেটি আর নেহাৎ দৃষ্টিগোচর হল না এই যা! অতঃপর সে পর্ব চুকলে, অধোবদনে বলল—‘‘খুকুরানি দিদিমণি গো, ছুটো মুখে বড়ো কতা মোটে সাজে না, তবু বলি—হাতি কুঁপে পড়ুক বা পাঁকেই পড়ুক, হাতি হাতিই থাকে—গজ-রা-জ... ৷ কতায় বলে মরা হাতির ল্যাক ট্যাকা..., সে কি ওমনি বলে...? দিদিমণি গো, নিজির তরে তেমন কতা কইতে নাই—কতাটা হতিছিল ভেন্ন ৷ ওই পাকশালের বেত্তান্ত, ওটি...’’ কথাটা আর শেষ না করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল বদনচাঁদ ৷ একে তো এতকালের একেবারে প্রায় নিত্যসত্য, কোয়ার্টারটি সহসা ভেকেট করবার নোটিশ নিয়ে মাস কতক যাবৎ দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় টালমাটাল দিনযাপন ৷ তায় খানিক আগে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, এ বাড়ির ছোটোখুকির কাছে চড়া গলায় কড়া কথা—এমতাবস্থায় নির্বিরোধী, গোবেচারা বদনচাঁদ বেচারা যায় কোথায়? গরিব গুর্বো সাধারণ কামলা মজুর, বুড়োমানুষ হলে প্রয়োজনে জীবনের বাকি ক’টা দিন না হয গাছ তলাতে আশ্রয় নিয়ে হরিনাম জপে, গঙ্গা লাভের অপেক্ষা করতে পারে ৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে গুড়ে বালি তো দূরের কথা, গুড় চিনি বালি সিমেন্ট, কিছুমাত্রও সিনে আসছে না! মৃত্যুর পর এই অনন্ত সময়:, তার কেবল সীমাহীন কাল নির্বাহ...! ফলে এ দুর্বিপাকে এমনতরো বিচলিত হওয়াই সমীচীন! অনুতাপী বাচ্চু রায় পড়লেন এবারও মহা ফাঁপড়ে ৷ তাপিত, বিষাদী বাস্তুহারা আত্মাটিকে বরদানের সামান্য উপায় যদি থাকত এই অক্ষমের...! এমকি পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনারও তো না ৷ ‘হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করি হস্তে হবে ব্যথা’... ৷ ভাবনাটা শেষও হয়নি, বদনা যেন লাফিয়ে উঠল, বলল—‘‘শেষেরটার নাই বটে, পেরথমেরটা আছে ৷’’

বাচ্চু রায় ঠিক ধরতে পারলেন না, বদনা বলছেটা কী ৷ কারণ সাধারণ মানুষের এমন তর ভাবনা চিন্তার উত্তর শুনে অভ্যেস নেই কিনা? তাই অবাক হয়ে বললেন—‘‘কী আছে...?’’

এতক্ষণে হাসি ফুটল অপর পক্ষের মুখে, প্রত্যয়ী কণ্ঠে, অটল স্বরে বদনা বলল—‘‘উপায় ৷ উপায় আছে আমার কাছে ৷ ও দালান ভাঙতে দুবোনি ৷ চুন সুরকির গাঁথনি দোওয়া, পঙ্খের লকশা তোলা দিয়াল, মানুষ সমান উঁচু দালানের সাবেক ঘর গুঁড়িয়ে ঠুনকো, আ-পলকা বাসা তোলা কি ল্যাজ্য কাজ? ...সে হবে নি... ৷’’ এমনই বদ্ধমূল, দৃঢ় একটা নিষেধাজ্ঞা ছিল বদনার যে আমতা আমতা করে বাচ্চু রায় বললেন—‘‘দুবোনি, হবেনি’’ বললে কী আর হয় বদনচাঁদ? তোমার দুর্দশার কথা খুব বুঝতে পারছি আমি, কিন্তু আমার অবস্থা তুমি এ-কে-বা-রেই বুঝছ না ৷ তোমার থেকেও শতগুণ দুর্দশা..., যাকে বলে রাহুর দশা আমার ৷’’

এবার কথা শেষ করা পর্যন্ত যা হোক অপেক্ষা করেই হড়বড়িয়ে বলল—‘‘বুঝেছি! খুব বুঝেছি!! লিশ্চয় বুঝেছি!!!’’

—‘‘ছাই বুঝেছ ৷ বুঝলে আর এমন অপারগের কাছে এই আবেদন করো? এদিকে মুখের কথা ফোটার আগে তো সর্বজ্ঞ সব জেনে বসে আছ, ওদিকে ছোটকর্তাকে যেন চেন না এতদিনেও? আর রায় বাড়ির বাকি সব বয়োজ্যেষ্ঠদের? সব মোড়ল ৷ দত্ত সাহেব শ্বশুরকুলের মানুষজনকে স্ত্রীর হয়ে একটি কথাও বলবেন না, অবশ্য আমাকেও তো বলেননি কোনও কালে ৷ কেন যে বলেননি! কেউ বলেনি, কেউ না ৷ আদতে কেউ নেই আমার ওয়েল উইশার, কেউ নেই ৷ আমার আর ভালো লাগে না বদনা, কী যে দুঃখ, নিজের ওপরই বিতৃষ্ণা..., ঠুঁটো জগন্নাথ... অকর্মার ধাড়ি-একটা আমি ৷’’

—‘‘ইঁ-ইঁ-ইঁ..., অকম্মা, বিকম্মা নিজির পতি বুল্লে পরেই মানব কিনা! ছেলেকাল থিকে আতুপুতু করি করি কেউ কিচুটি শিখায় নাই—তাই ৷ পাঁচ বছর কাল পর্যন্তর কলি কাঁখে ঘুরলেন, পা-টি মোটি রাখেননি জমিতে ৷ তা, আমার বজ্জাঘাত হলিপর আপনিকি চলা বন্দ করিছেন? উপায় নাই কান্দে চড়বার, চড়েন নাই! নিজি নিজিই চলতি লেগেছেন! হুঁঃ, ‘কেউ নাই, কেউ নাই... ৷’ চারিদিকে কত উপদিষ্টা..., চেয়ে দ্যাকলে, তবে না দ্যাকবেন? চুকখানি খুলি রাকলেই কি সব দেকা যায় গো দিদিমণি? মনটারে সজাগ রাকতি হয় সদা-সব্বদা ৷ শিশুকালে ছাই মাটি ঘাঁটাঘাঁটি করি খেলনাপাতি চলে বটে, তা বলে বয়স কালে সে সব বাদ দিতি হবে না? মাজে-মদ্যি সূয্যির দিকে চেইয়ে সময় জাঁচ করতি হয় গো দিদিমণি, তাহলি কারুর মুখঝামটা খাতি হয় না ৷ তা, ছাড়েন সে সব, ফের বলবেন— বদনা আমায় তত্ব দ্যায়, এই দ্যায়, সেই দ্যায়... ৷’’

জীবনদর্শনের ব্যাখা, তবে শেষমেশ ওই ‘তত্ব দেয়ার’ পর্বে এসে ঠিক ধরতে পারছিল না, ব্যাপারটা কী? বদনচাঁদ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল—‘‘ওই বল্লিন তখন হাতির কথা, কাঁপের কথা... ৷’’

বাচ্চু রায় বল্লেন—‘‘ও..., হ্যাঁ..., তত্ব কথা... ৷’’ আর ঠিক সেই সময়ই আশপাশের বড়ো বড়ো গাছে থাকা কোনও ঘুমন্ত পাখির বাচ্চা বোধহয় গরম বা খিদে-তেষ্টায় হঠাৎ ঘুম ভেঙে খানিক ক্যাঁ-ক্যাঁ করে কেঁদে নিয়েই, মায়ের পাখার হাওয়া পেয়ে বা পোকা-মাকড় মুখে নিয়ে ফের ঘুমিয়েও পড়ল ৷ বদনচাঁদের খেয়াল হল সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, বাচ্চু রায় ভুলে গেলেও, তাঁর এবার নীচে যাবার ডাক আসবে ৷ ফলে, সহসা বদনচাঁদ আর দ্বিরুক্তি না করে, হাত ঘুরিয়ে একটা পাট করা খবরের কাগজ মতন ফর ফর করে খুলে, চোখের সামনে মেলে ধরে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—‘‘বলি নাই, উপায় আছে? খুকুরানি দিদিমণি এটি দ্যাখো দিকিনি?’’

বাচ্চু রায় একটু অবাক হয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন একটা কাগজ তো বটেই, তবে একটু ভিন্ন প্রকৃতির ৷ মোটা, তেল-তেলে, আর অন্ধকারেও যা জ্বলজ্বল করে—রেডিয়াম দেওয়া বোধহয় ৷ তা, যাই হোক, তাতে বাচ্চু রায় আঁধার রাতেও প-ষ্ট দেখলেন, চকচকে মসৃণ আলোর আভাস মাখানো সেই স্পেশাল কাগজের উপর চমৎকার কালোনিয়াল স্টাইলে একটা বাংলো বাড়ির ছবি ৷ খুব ছোটো না, বেশ ছড়ানো মতন ৷ ব্রিটিশ আমলে সাহেবদের রেসিডেন্সি বাংলো যেমনটা হত—ধরনটা তেমন ৷ ধাপকাটা চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে, কাঠের রেলিং ঘেরা, মাথায় ক্যানোপি ঢাকা প্রশস্ত ম-স্ত বারান্দা ৷ তার শেষে ঘরে ঢোকার দরজা, দু’পাশে শার্শি দেওয়া লম্বা লম্বা জানলা, কাঠের খাম্বা দেওয়া পিলারগুলো সার সার চলে গেছে বারান্দার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত... ৷ তা বাদেও চোখ বুলিয়ে বাদ বাকি আরও যা-যা দেখলেন, মনে হল, আজি হ’তে শতবর্ষ আগে মেম হয়ে জন্মালে বে-শ হত... ৷

অবশ্য আশপাশের বড়ো বড়ো গাছপালাগুলো খুবই পরিচিত, মানে আজন্মকালের চেনা আম জাম কাঁঠাল তেঁতুল বকুল ইত্যাদিতে ঘেরা... ৷ বহু প্রাচীন সব বৃক্ষ, তৎসহ একপাশে কপিকল সহ বিশাল এক ইঁদারাও —যা এ বাড়ির মহিমা আরও যেন বাড়িয়ে দিয়েছে... ৷ ওই ইঁদারার গায়ে লাগা, জাফরি কাটা ছাত খোলা একটা ঘরও বোধহয়—বাচ্চু রায় উৎসুক হয়ে, তার খোলা-ছাত দিয়ে নজর দিলেন ভেতর পানে ৷ চারিদিকে থাকে থাকে সুন্দর করে সাজানো টবে, হরেক রকম বাহারে গাছপালা, লতাগুল্ম...!—ও হরি! মাথার ওপর লম্বা পাইপ দিয়ে যে শাওয়ার ফিট করা ঝরনা ৷ দেয়ালের নকশা করা খোপে প্রসাধন সামগ্রী রাখবার ব্যবস্থাও...! বাহ, এতো ইঁদারার সাথে যোগ করা সেকালের নাইবার ঘরেই একালের আধুনিক বন্দোবস্ত! বাচ্চু রায় ঘাড় ঘুরিয়ে চারিপাশ দেখতে লাগলেন—বি-উ-টি ফুল ৷ মাথার ওপর তেঁতুল গাছের ডাল এসে পড়েছে, তাতে ঝিরিঝিরি পাতা হাওয়ায় কাঁপছে, টবের অর্কিড জাতীয় পাতার মাঝে বেগনে, গোলাপি ছোটো ছোটো ফুল... ৷ তাঁর অত খেয়াল ছিল না, যে ওই অদ্ভুত আলোর আভা দেওয়া মসৃণ কাগজে বাড়ির ছবিটা নেহাতই সাদাকালো সুন্দর একটা হাতে আঁকা স্কেচ ছিল, নাকি রঙিন ফোটোগ্রাফ? তবে, তেমন বিশ্লেষক সজাগ মনোভাব থাকলে কি আর তাঁর জন্মাবধি ভাবুক আখ্যান মেলে? ওসব কারণ অকারণ, কেন, কী-র ঘোর প্যাঁচের আশাপাশও মাড়ান না তিনি ৷ তা, সে যাই হোক ৷ কাগজে আঁকা ছবি দেখতে দেখতে এমন মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন বাচ্চু রায়, যে হুঁশই হয়নি কখন যে তিনি বদনার সঙ্গে, সেই চওড়া ধাপ-কাটা সিঁড়ি বেয়ে, সবুজ কাঠের রেলিং তোলা বারান্দায় উঠতে শুরু করেছেন ৷ চোখে ঘোর লাগা দৃষ্টি, মুখে ভ্যাবলা হাসি, ঘাড় ঘুরিয়ে চারিপাশ দেখতে দেখতে যন্ত্রচালিতের মতন পা ফেলছিলেন ধীরে ধীরে... ৷

পাশে পাশে যেতে যেতে বদনচাঁদ এবার ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল —‘‘বাড়ি তাহলি খুকুরানি দিদিমণির পসন্দ হইঞ্চে বলেন?’’

সহসা ঘোর কাটিয়ে, ভুরু কুঁচকে বাচ্চু রায় বললেন—‘‘এমন কথা বলো না বদনা...! কার অপছন্দ হবে বল দিকিনি এমন বাড়ি? কিন্তু...!’’

—‘‘কিনতুক কী?’’ পাশ থেকে কালো পানা ছোট্ট মুখটা বাড়িয়ে, জ্বলজ্বলে চোখে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল তাঁর উত্তরের জন্য ৷

—‘‘মানে কার বাড়ি? কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে..., কোথায় দেখেছি! ছোটবেলা জ্যাঠাবাবুদের সঙ্গে গিয়েছিলাম যেন চেঞ্জে এমনতরো বাংলোয়! ওই কুয়োতলা, সিঁড়ির ধা-প...’’

বদনচাঁদ তার হালকা পলকা শরীরটা আনন্দে প্রায় দুলিয়ে দিয়ে ফুর্তিতে গদগদ হয়ে বলল—‘‘মনির মইধ্যে চিষ্টা দ্যাকেন দিকি, কুতায় দ্যাকা?’’ বাচ্চু রায় মনের মধ্যে বাধ্য মেয়ের মতন স্মৃতি হাতড়াবার চেষ্টা করছিলেন কিনা বলা যায় না, তবে বেশ উৎসাহ নিয়ে দরজা ঠেলে ঝকঝকে মডার্ন টালি বসানো বড়ো ঘরে ঢুকলেন—তারপর পাশের দরজা দিয়ে অন্য ঘরে ৷ আবার সে ঘরেরও দরজা খুলে হাল ফ্যাশানের বাথরুমে—‘‘বাহ... ৷ হাজারিবাগ, নাকি ম্যাকলাস্কিগঞ্জ...? পাহাড়ে নয়..., কারণ ওই বড়ো বড়ো গাছগুলো প্লেনস-এর ৷ পাহাড়ে হয় না অত... ৷ ডুয়ার্সে হয়..., আটিয়াবাড়ি গিয়েছিলাম..., নাহ..., তা সে মনে হয় চাং বাংলো ৷ আচ্ছা, ওদিকেও বারান্দা আছে? আর খানসমার ঘর? লম্বা ক্যানোপি দিয়ে বারান্দা থেকে যাবার পথ? তা-হ-লে...!’’

—‘‘আছে, সব আছে, তবে সে আপনের চিনা লয় ৷ ভাঁড়ার ঘরখানি বদলি দিয়ে বিলিতি পাকশাল? আর পিছদুয়ারি বারিন্দা শার্শি দি ঢাকি দিয়ে ভাত খাবার টেবুল...? ওই আর কি, খানিক ভাঙা হল, খানিক গড়া, এদিক বদলি ওদিক, সেদিক বদলি এদিক..., ব্যাস ৷ কেবল কয়লাকুঠি, কাঠকুটো জ্বালানি আড়তের এই স্থানটা এট্টুখানি ঠেইলে দিচি বাইরপানে ৷’’ তারপর নতচোখে লাজুক মুখে বলল—‘‘ওইটেই আমার এতকালের বাসস্থান... ৷ এট্টু সাইরে-সুইরে নিলিম আর কী ৷ যাতায়াতের পথও করলাম বাইর দিয়ে, ভেন্নদোর ৷ কী দরকার অবরে-সবরে পরিবারকে উতত্যততো করার ৷ ওই আপনদের মতনই গো দিদিমণি, সকলের মইধ্যে থেকেও বেশ কিনা, আপনের মতন বসবাস... ৷ বলি, এই বেলা চিনতি পারলেন?’’

ভ্যাবলা চোখে মাথা নাড়লেন বাচ্চু রায়, অর্থাৎ চোখে চিনতে না পারলেও নামে চিনলেন ৷ তাহলে কি এটাই সেই...?

—‘‘এবার পিছন বাগে চান দিকিনি?’’ বদনচাঁদের নির্দেশে নিশিতে পাওয়া মানুষের মতন পিছন ফিরে চাইতেই, হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ একেবারে দু’হাত লাফিয়ে উঠল বিস্ময়ে—ওই তো চামেলিকুঞ্জ...! বাঁয়ে দরদালান, সামনে কেয়ারি করা, ফোয়ারা দেওয়া বাগানের মাঝ বরাবর মোরাম বিছানো পথের শেষে নকশা তোলা লোহার থামের গা বেয়ে চামেলির লতাপাতা উঠে ছেয়ে দিয়েছে তার আনাচ-কানাচ ৷ আর সেই সুগন্ধী ছায়াপথ থেকে খাঁজ কাটা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে শামসিপুরের বড়ো তরফের খাসমহল—চামেলিকুজ্ঞের অন্দরের মাঝ বরাবর দিয়ে ৷ দোতলার একদিকে সেজোকাকাবাবুর অংশ, অন্যদিকে ছোটোকাকাবাবুর ৷ মাঝের চবুতরা থেকে সিঁড়ি আবার বাঁক নিল ওপর দিকে ৷ আধ-ভেজানো ছাতের দরজার একপাশে পুজোর বাসনের ঘর ৷ ঘুরে গিয়ে বাড়তি লেপ তোশক, বালিশ তাকিয়ার চিলে ঘর—যার বাইরে মিটমিটে একটা বাল্বের আলোতে একলক্ষ পোকা উড়ে উড়ে নৃত্য করছে ৷ কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার নিরিবিলি ছাতে বদনচাঁদের হাতে ধরা বিভাময় কাগজে আঁকা এই বাড়িঘরই তাহলে সেই পুরোনো পাকশালা আর তার সংলগ্ন এলাকা, অর্থাৎ তারই ভাগে পাওয়া...?

—‘‘এজ্ঞে হাঁ ৷ এই হল বাড়ির নকশা, মাপ-জোঁক, এই জমির জরিপ..., বুলু পিন্ট, খসড়া নং ৷ রিজিস্টিরি, মিউটিশনের দুটি করে কপিও করি রেকিচি আগে ভাগে—যা হারানি স্বভাব আপনের... ৷’’ বাচ্চু রায় আনন্দে এমনই চিৎকার দিয়ে উঠলেন যে, ছাতের উঁচু পাঁচিল ঘেরা আম জাম লিচু কাঁঠাল গাছে বসবাসকারী পক্ষীকুলের কচি ছানারা, কাঁচা ঘুম ভেঙে ফের কাঁদাকাটা শুরু করে দেবে, সেই ভয়ে তাদের মায়েরা বিরক্তিতে প্রাণপণে গালিগালাজ করতে করতে পাখা ঝটপটিয়ে উঠল ৷ ‘বুড়ো মানুষের ঢং দ্যাখো? মরণ... ৷’ আর তাই শুনে সহসা সংবিৎ ফিরে পেয়ে, বদন চাঁদের হাত থেকে বাড়ির প্ল্যান-মা্যান, খসড়া-মসরা, ব্লু প্রিন্ট, জেরক্স কপি হ্যানো-ত্যানো সব ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে শিশুর মতন লাফাতে লাফাতে সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল খুকুরানি দিদিমণি, ওরফে বাচ্চু রায়—‘‘কাকাবাবুর কাছে এখনই জমা করে দিয়ে আসি বদনকাকা—নয়তো আবার কো-থায় হারাব...! আমাকে বিশ্বাস নেই বাপু!’’

—‘‘ইঁ ইঁ ইঁ..., আর হারাতে দিলি তো? রইলেম না আপনের ঘরের লগে লগে, আমার নিজির কোয়ার্টরে? আমারও কাজ জুটল এট্টা! মনিব বাড়িতে বহাল হলিম ফের... ৷ কাউরে আর এট্টা কথা কতে দিব না আপনের তরে ৷ পয়োজনে ধমক-ধামকও দিব কিন্তুক! কিছু কতে পাবেন না তখন ৷’’

—‘‘দিও, তবে রয়ে সয়ে ৷ আর কাজকর্মও চালাবে বুঝে শুনে ৷ বুঝলে? তা না হলে বাবুয়া কিন্তু রটিয়ে দেবে প্রদীপ দত্তের কথা...!’’

—‘‘হেঁ, হেঁ..., যা রটেন, তার কতকটা তো বটেন?’’

সিঁড়ির মোড়ে পা দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাচ্চু রায় বললেন—‘‘উফ, খুব কথা ফুটেছে না...! নাহ, কাগজপত্তর জমা দিয়েই আসি তড়িঘড়ি, তোমাকেও বিশ্বাস নেই বাপু! ভুতুড়ে কাণ্ড যত... ৷ শোনো, তুমিই আমাকে খুঁজে নেবে, নাকি আমি তোমাকে?’’

ছাতের মাথায়, অন্ধকার ছায়াছায়া বদনচাঁদ বেশ অহংকারের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলল—‘‘ওটি আপনের কম্ম নয় খুকুরানি দিদিমণি: ৷ যত ল্যাখা পড়াই করুন, আর বাদ্যি গীতেও ওস্তাদ হন..., ওইটি এখনও আপনের আয়ত্বে নাই গো... ৷ এইবার সত্যি সত্যি পা চালান, নাটমন্দিরে রামকানাইয়ের আরতি শুরু হলি বলে..., আপনেরে ডাইকতে আসবে আখুনি ৷ গড় হই গো, ছিরি চরণে শতকোটি পনাম ৷ দু পক্ষেরই হয়ে গেল কিনা মিটমাট? তবে...?’’

খোনা গলায় হা-হা করে হাসতে হাসতে বদনচাঁদের চোখ দিয়ে জল এসে গিয়েছিল বোধহয় আনন্দে, আর তার বদান্যতার আতিশয্যে এই খুকুরানি দিদিমণিরও... ৷

রচনাকাল ২০১৬

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%