মিমি রাধাকৃষ্ণন
ঘরের চারিদিকটা ঘাড় ঘুড়িয়ে একবার পরখ করে নিয়ে মঞ্জরি বলল—‘‘সবার হয়ে গিয়েছে তো? তৈরি? চা করতে বলি তা হলে?’’
কেতকী হাতের কাছে সুদৃশ্য একটা কৌটো পেয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিরীক্ষণ করতে করতে বলল—‘‘বল ৷ তবে একটু হাত খুলে, দিল খুলে, দিতে বলবি ৷ কিপটের মতন ছিপিতে ভরে ভরে কী-ই চা দেয় রে? ওগুলো কাপ?’’ বলে সেই বাহারে ডিব্বাটা খুলে, তার থেকে দরাজ হাতে ক্রিম তুলে হাতে পায়ে ঘষতে লাগল নিবিষ্ট মনে ৷
গার্গী তৎক্ষণাৎ সায় দিল —‘‘ঠিক বলেছ, কাপ তো নয় মোটেই ৷ ওই—আর্মি ব্যারাকের কিছুর একটা ছিপি টিপিই হবে নিশ্চয়—টোটা, কার্তুজের ঢাকা গোছের—মঞ্জরি, গেলাসে দিতে বল ৷ কড়ক চায়ে, দুধ শক্কর ৷ তবে মশলাপাতি যেন না দেয়... ৷ ওসব তুলে রাখুক আমাদের বিরিয়ানির জন্য ৷ আহ, যা আরাম লাগছে এখন..!’’ ফরমায়েশটা জারি করে গার্গী এবার পরিপাটি হয়ে গরম জামা, মোজা টোজা প’রে, পা ঢেকে বসল কম্বলে ৷ মঞ্জরি হাসছিল ওদের কথায়—‘‘ক্যান্টনমেন্টে আছিস বলেই টোটা-কার্তুজ, না? তারও আবার ছিপি! চোখে দেখেছিস ওসব জিনিস কখনও? য-ত্ত সব... ৷’’
নীলাঞ্জনা আরাম করে খাটিয়ায় বসে বসে এসএমএস করছিল, চোখ না তুলেই বলল—‘‘রাগ কোরো না মা-জননী ৷ অতিথি দেব ভবঃ ৷ যাও, চট করে চায়ের কথাটা বলে দিয়ে এসো গে যাও ৷ শেষমেশ ‘চা-চা, চা-চা’ করে মরে গেলে, পরের জন্মে চা-তক হবি..., আর সে ভারি ঝঞ্ঝাটের জন্ম ৷ উফ সারাটা দিন রোদে পুড়ে, হাওয়ায় শুকিয়ে একেবারে কিসমিসটি হয়ে গিয়েছিলাম রে! এখন আবার জলে ভিজে, তেলে ডুবে, তাজা আঙুরটি... ৷’’
—‘‘ও-ই! ওরে আমার আঙুরবালা! এসো, তোমায় তেলে ভেজে, রসে ডোবাচ্ছি! তোমরা সবাই অতিথি, আর এ কেবল আমারই বাপের ধর্মশালা না? চাতক হলে তুই হবি, আমার কী?’’
—‘‘বাপের ধর্মশালা নয়, দাদুর ৷ মুখ খারাপ কোরো না মামণি, যাও ৷’’
কথার পিঠে আবার গালিগালাজ করতে যাচ্ছিল মঞ্জরি, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ কী মনে পড়তে সব ভুলে সম্পূর্ণ অন্য সুরে বলল—‘‘দাঁড়া, মোতিলালকে ছাতুর পকোড়া করতে বলি ৷ এদিকে ওর খুব চল, বুঝলি? দিদিমাও করতেন ৷ হিং টিং আরও কী-কী সব দিয়ে, ছোট্ট ছোট্ট বড়ির মতন... ৷ ধনেপাতার চাটনি দিয়ে খেতাম—মোতিলালজি...?’’
—‘‘হিং টিং আর ছট! তা বাদে আবার কী থাকবে? বলে দে, বলে দে ৷ পকোড়া ছাড়া কি আর আড্ডা জমে? গেলাস ভরা আদা চা, হিং টিং ছট পকোড়া আর ভূতের গল্প... ৷ তা, আমি তো আর কলকাতা ফিরছি না বাপু—ফাইনাল ৷’’
নিশ্চিন্ত গলায় গার্গী বলল—‘‘আমিও না ৷ কেতকী তুমি?’’
—‘‘আমি এখনও ঠিক বলতে পারছি না ৷ দেখি ছাতু-মাতুর বড়া কী পদার্থে দাঁড়ায় ৷ চায়ের পরিমাণ কতটা থাকে, ভূতের গল্পের কোয়ালিটি কেমন হয়..., তারপর ৷’’
নীলাঞ্জনা কটমট করে চেয়ে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে কেতকীর হাত থেকে নিজের ক্রিমের কৌটোটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল—‘‘তা-ই বলি, এত চেনা চেনা গন্ধ কেন ৷ ব-দ মা-শ ৷ গার্গী? চা এলে আমায় ডেকে দিও—তব তক কে লিয়ে আজ্ঞা দিজিয়ে—’’ বলেই কম্বলে মাথা ঢেকে ফেলল, আর কেতকীও তৎক্ষণাৎ অপমানটা সম্পূর্ণ হজম করে, চোখ মটকে নির্বিকার গলায় রায় দিল—‘‘লো ভল্যুমে নাক ডাকিস, নীলাক্ষী-নীলাঞ্জনা-নীলাতঙ্ক ৷ নয়তো গার্গীর ওই মিহিন চা হাজিরার ডাক, শুনতেই পাবি না ৷’’
গার্গী আর কেতকীর হাসির মধ্যেই মঞ্জরি এসে জানাল—এক্ষুনি চা আসছে, সঙ্গে ও-ই-ই ছাতুর পকোড়া ৷ তাহলে খাটিয়া দুটোও জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হোক, সবাই একসঙ্গে বসা যাবে কম্বল জড়িয়ে ৷ কেতকী সঙ্গে সঙ্গে আদুরে গলায় আব্দার করল—‘‘আঁ-মিঁ নীলাঞ্জনার পাঁ-শে ৷ ও আমার সব থেকে প্রিয় বন্ধু, একদম বে-স্ট ফ্রেন্ড, না রে নীলা...?’’ নীলাঞ্জনা উঠে বসতে বসতে বলল—‘‘বেস্ট ফ্রেন্ড! ফ্রেন্ড না ঘণ্টা ৷ শত্রু... ৷ আমার এগারোশো টাকা দামের নতুন নাইট ক্রিম! নিজের পয়সায় তো সর্ষের তেল মুখে মাখিস, এখন মাগনা পেয়ে হাতে, পায়ে নাইট ক্রিম!’’
চার বন্ধুর খাটিয়া ঠেলাঠেলি, কম্বল টানাটানি, হাসা-হাসি মশকরার মধ্যে এ বাড়ির রক্ষক মোতিলাল একটা বারকোশে দুটো বড়ো বাটি আর ধোঁয়া ওঠা চারটে গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকতেই মেয়েরা সব হৈ-হৈ করে উঠল ৷ এমনটা না হলে আর ছুটি! তাও আবার একসঙ্গে এতকাল পরে, এবং এই প্রায় নাম না জানা অজ গঞ্জে!
খুব একটা প্ল্যান প্রোগ্র্যাম না করে, বলতে গেলে মোটামুটি একটু হুট করেই, এই চার বন্ধু গতকাল এসে পৌঁছেছে উত্তরপ্রদেশের ছোটোর থেকেও ছোটো একটা টাউন, এই গাউটগঞ্জে ৷ রেলস্টেশনটার নাম অবশ্য ভীমনগর ৷ তবে সে নামেই ভীম, কামে তাল পাতার সেপাইয়েরও ছোটো ভাগ্নে ৷
ধুলোমাখা দীন হীন, এলে বেলে বিএ ফেল এমন শহরে কেউ যে দূর দূরান্ত থেকে ট্রেনে চেপে বেড়াতে আসতে পারে, শুনে লোক চোখ কপালে তুলবে ৷ একটা তোবড়ানো বাস, খানকতক এলোমেলো মলিন ভটভটি, দু’চারটে ভাঙাচোরা গাড়ি আর ততোধিক বিবর্ণ বিভিন্ন বয়সের গুচ্ছের মেয়ে-পুরুষ, দোকানপাট, সবজিপাতি, গোরু ছাগল, ঠ্যালাগাড়ি ভরা হাবিজাবি সস্তা প্লাস্টিকে দ্রব্য—এই হচ্ছে ভীমনগরের স্টেশন চত্বরের বিবরণ ৷ এমনতরো জায়গা, যেমনটা হয় আর কী!
স্টেশন থেকে আর্মির জিপে চেপে মাইল পাঁচেক দূরের এই গাউটগঞ্জে সটান যখন এসে পৌঁছল, সন্ধে তখন হয় হয় ৷ অতঃপর সেই মোড়ের মাথার ধুলো-নোংরা, ঘেয়ো কুকর, হ্যাজাক বাতি, চালাঘর, ছোটো ছোটো দোকান-পাট বাঁদিকে রেখে, ডাইনে বাঁক নিলেই দৃশ্য সম্পূর্ণ আলাদা ৷ সে তো হবেই, ক্যান্টনমেন্ট বলে কথা ৷ কামান সাজানো বড়ো ফটক, কালো রাস্তা, সাদা খড়ির দাগ, আধ শোওয়া লাল ইটের কেয়ারি, গাছের চারিধারে জালি ইটের রং করা ঘেরাটোপ, খটখটে মানুষের ঠক ঠক জুতোর আওয়াজ, লম্বা লম্বা ব্যারাক বাড়ি, পুরোনো ধাঁচের একতলা বাংলো—স্টেশন থেকে পাঁচ মাইল দূরের এই গাউটগঞ্জ হচ্ছে ব্রিটিশ আমলের বহু পুরোনো আর্মি বেস ক্যাম্প ৷ বাইরের ফলকে বড়ো বড়ো করে লেখায় তার নজির আছে যে কত সালে তৈরি হয়ে, কত সাল পর্যন্ত এর কতটা গুরুত্ব ছিল ৷ কী কী ক্ষেত্রে ট্রেনিং হত, যার মধ্যে পরবর্তীকালে স্বনামধন্য কে কে যেন ছিলেন... ৷ এ-তো গেল ইতিহাস, আর ভূগোল বলতে গেলে বলা যায়—এ হল গিয়ে ব্রিটিশ রাজত্বের, একেবারে গোড়ার দিককার ছাউনি ৷ যার আধ মাইলের মধ্যে অর্ধচন্দ্রাকার একটা চমৎকার বাঁক নিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে ৷ একশো দেড়শো বছরের কম বয়সি গাছ প্রায় চোখে পড়ে না বললেই হয়—তবে তার চেয়েও বড়ো কথা, মঞ্জরির দাদু কর্নেল কৃষ্ণমাণিক্য চক্রবর্তী এককালে এখানে একটানা প্রায় সাত বছর পোস্টেড ছিলেন ৷ ফলে মঞ্জরির মা মাসিরা বড়োই হয়েছেন এখানে ৷ যদিও স্কুল কলেজের অসুবিধার জন্য তাঁরা শান্তিনিকেতনের হস্টেলেই থেকেছেন, তবু তাঁদেরও বলতে গেলে বেস ক্যাম্প তো এই গাউটগঞ্জই বটে!
এখানে মঞ্জরি, কেতকী আর নীলাঞ্জনা—এই তিনজন, একই স্কুল, কলেজে ছোটো থেকে পড়েছে, কেবল চতুর্থজন গার্গী একটু দলছুট ৷ ও হচ্ছে মঞ্জরির খুড়তুতো বোন অর্থাৎ কাকার মেয়ে ৷ আবার মঞ্জরির মা মাসিদের প্রাণের বন্ধুর মেয়ে বলে, সে অর্থে মাসতুতো বোনও বটে ৷ হস্টেলে না থাকলেও কেতকীদের সঙ্গে খুবই হৃদ্যতা ৷ দিন দশেক আগে তিনজনের দলটা যখন ইন্টারনেট ঘেঁটেঘুঁটে এমন তর একটা প্ল্যান কষল ভায়া গাউটগঞ্জ, খবর পেয়ে, নামটা শুনে, অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই গার্গী বলে বসল—‘‘তবে আমিও আসি?’’
এমন ঝাঁপিয়ে না পড়লে কি আর বেড়ানো হয়? তায় গাউটগঞ্জে? একবার গরমের ছুটিতে মঞ্জরির মায়েদের তিন বোনের সঙ্গে গার্গীর মা আর এক বন্ধু, প্রায় মাসখানেক কাটিয়ে গিয়েছেন এ বাড়িতে ৷ ফলে এখানেই নাকি তাঁদের সারা জীবনের পাথেয় হিন্দি শিক্ষা, আর উত্তর ভারতের রীত রেওয়াজের সঙ্গে পরিচয় ৷ গার্গী কতকাল ধরে, কত রকম ভাবে যে শুনেছে এই গাউটগঞ্জের কথা, সে আর বলবার নয় ৷ তা বাদে, মঞ্জরির সব বন্ধুদের অতি প্রিয় মাসিমা মালতী ঘোষাল, নিজেও গল্প করতে পারেন চমৎকার ৷ যাতে অতি সাধারণ ঘটনার বিবরণও অতিশয় অসাধারণ হয়ে যায়—যেমনটা হয়েছে এ বাড়ির গল্পও ৷
গরমের রাতে পিছুদুয়ারি উঠোনে সার সার নেয়ারের খাটিয়া পেতে ঘুমোনো, কুয়োতলায় তেল ব্যাসন মেখে স্নান, সারা দুপুর ছায়া ঘেরা, নিকোনো তেঁতুলতলায় শতরঞ্জি পেতে হাতের কাজের মকশো, বিকেলে উর্দিপরা জওয়ান বডিগার্ড নিয়ে গঙ্গাঁতীরে হাওয়া খেতে যাওয়া ৷ সন্ধেতে নামমাত্র ছুটির কাজটুকু সেরেই, আবার রাতের খাটিয়া পাতার পর্ব—অর্থাৎ এককথায় বলতে গেলে হস্টেল-তরো হস্টেল লাইফ ৷ ওদের এই পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে যোগ হত পাশের বাড়ির, অর্থাৎ বাইশ নম্বরের প্রতিবেশী বন্ধু, মালতী ঘোষালদের গ্রীষ্ম আর পুজোর ছুটির সহচরী—কুসুম ৷
গায়ে লাগানো বাসস্থান হলেও দু’বাড়ির জীবন ধারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ৷ বেশি রকম পুরোনো পন্থী, রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবার এবং সব অর্থেই ঘোরতর নিরামিষাশী সে কথা বলাই বাহুল্য ৷ সে দ্বিবেদী পরিবারের সঙ্গে তেমন গলাগলি ঘনিষ্ঠতা থাক বা না থাক, তবু কুসুম ছিল বলতে গেলে এ বাড়িরই মেয়ে ৷ বিশেষ করে যখন সদলবলে তিন বোন বাড়ি ফিরত হস্টেল থেকে ৷
তা, মালতী ঘোষাল রসিয়ে-জারিয়ে, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে, এ বাড়ির যত গল্পই করুন না কেন, সে উৎস সন্ধানেও মেয়েদের এই দলটা কিন্তু গাউটগঞ্জে আসেনি ৷ এসেছে, এখানে হল্ট করে, দূরের জঙ্গলে বেড়াতে যেতে ৷ এবং কর্নেল চক্রবর্তীর জামাই অর্থাৎ মঞ্জরির বাবা ব্রিগেডিয়ার ঘোষালের বদান্যতায়ই বলা যায় এই সফরসূচি ৷ ফাঁসির পরওয়ানা পাওয়া তাঁর এক্স শ্বশুরবাড়িটি একেবারে পঞ্চত্ব প্রাপ্তির আগে, মেয়েরা একবার যদি দর্শন করে যেতে পারে, সে তো বেশ কথা! আর সরকারি ফরেস্ট বাংলোর ব্যবস্থা যখন কার কাকা না জ্যাঠা করেইছেন, ঘোষালমশাইও এটুকু মাত্র করতেই পারেন ৷ তৎসহ একটা জিপগাড়ি আর এক নজরদার ৷
মঞ্জরিদের এক সময়কার এই মামাবাড়ি পরে হয়েছিল অফিসার’স মেস ৷ তা সে-ও ক’বছর পর হল গেস্ট হাউস ৷ অতঃপর, এটি পুরোপুরি ভেঙে কী যেন একটা বানাবার কথা চলছে, চলুক ৷ ভাগ্যিস ওরা তার আগেই এখানে এসে জড়ো হতে পারল! আর কতটা সুবিধেও হল তাদের! একে সুবিধের, তায় মনোরম ৷ আর এতকাল তারা যেমন হাঁ করে এ বাড়ির সেকালের গল্প শুনত, এবার মা-মাসিরাও তেমন হাঁ করে অপেক্ষা করছেন, সেকালের বাড়ির একালের গল্প শুনবার জন্য, এবং বলাইবাহুল্য, এখানে এসে কিন্তু তাদের দা-রু-ণ লাগছে ৷
তা-বাদে, সরাসরি ওই জঙ্গলে যেতে গেলে, এমনিতেও সারাদিনের বড়ো গোলমেলে পথ ৷ তার আগে আবার দুই কলকাতাবাসীর ট্রেনের ধকল ৷ তাই ঠিক হল সবাই দিল্লি জড়ো হোক, সেখান থেকে মাত্র ঘণ্টা ছয়েকের চমৎকার ট্রেনজার্নি ভীমনগরী হয়ে, গাউটগঞ্জ ৷ দুটো রাত কাটিয়ে, এখান থেকেই জিপগাড়ি নিয়ে সোজা ধুঁধুলকোটা ফরেস্ট ৷ চারদিনের জন্য বনবিভাগের বাংলো বুকিং করা আছে ৷ ইচ্ছে হলে নদীর ধারে বসে থাকো, ইচ্ছে না হলে জঙ্গলে বাঘ-ভাল্লুক দেখতে যাও ৷ সঙ্গে জিপ থাকবে, তার উপর নাকি এক সিপাইও ৷
ফেরবার পথে অবশ্য অন্য ব্যবস্থা ৷ এলাহাবাদ এসে সবাই টা-টা সেরে দু’জন ফিরবে কলকাতায় ৷ বাকি দু’জন দিল্লি ৷ চমৎকার শক্তপোক্ত পাকা ব্যবস্থা এবং ওরাও আনন্দে আত্মহারা ৷
গতকাল এখানে এসে যখন পৌঁছেছে—সন্ধে তখন প্রায় হয় হয় ৷ সবাই ক্লান্ত ছিল ৷ আসা যাওয়ার ধকল তো আছে বটেই, তাছাড়া তার আগের পর্বও তো কিছু ফেলনা নয়! অর্থাৎ ধর্মক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্রের নানান জোড়াতালি, ঝঞ্ঝাট ৷ ক’টাদিনের জন্য হাঁপ ছাড়তে এলেও তো, তার জোগাড় যন্তরে হাঁপ ধরে যায়! ফলে আজকের মতনই গরম জলে স্নান-টান সেরে, মোতিলাল যতক্ষণে রাতের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, ততক্ষণ এরকমই সবাই মিলে কম্বলের তলায় হাত-পা মুড়ে প্রাণপণে গল্প জুড়েছে ৷ বাড়ি-ঘর বা আশপাশের আর কিছু নজরই করেনি মোটে ৷ তাছাড়া ততক্ষণে অবশ্য পুরোপুরি অন্ধকারও হয়ে গিয়েছিল ৷ দেখেছিল কেবল মস্ত বড়ো বড়ো দুটো শোবার ঘর আর ততোধিক বড়ো একটা বিশাল বাথরুম ৷ ফলে মোতিলালের সঙ্গে হাতে হাতে অন্য ঘর থেকে দুটো খাটিয়া এ ঘরে এনে, হস্টেলের ডর্মেটরি বানিয়ে ফেলেই নিশ্চিন্ত হয়েছিল মাত্র—তা না হলে গল্প জমবে কী ভাবে?
গতকাল রাতও মোটে জাগতে পারেনি—ওই মেরে কেটে যদি সাড়ে দশ হয় ৷ ক্লান্ত তো ছিলই, তার উপর ওই স্নান, শেষে গরম গরম ঘি মাখানো রুটি-ভাজি, আর নিশ্চিন্ত প্রাণালাপই বোধকরি কড়া ঘুমের ওষুধের কাজ করেছিল ৷ তা বাদে ফোন নেই, টিভি নেই, গাড়ি ঘোড়ার কান ফাটানো বিকট শব্দ নেই—আওয়াজ বলতে কেবল টুংটাং মিহিন সাইকেলের ঘন্টি— তা, সে ধ্বনিতে ঘুম ভাঙার চাইতে, ঘুম পাড়ানোই মনে হয় শতগুণ সহজ ৷ ফলে আজ একটু বিফোর টাইমেই প্রত্যেকের ঘুম ভেঙেছে এবং ওই মনোহর সকালে বাইরে এসে, যাকে বলে তারা বিমোহিত ৷
ফটক দিয়ে ঢুকে হেলাফেলার সামান্য বাগানে মাঘের শেষের গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদির অফুরন্ত রঙের বাহার ৷ এলা খড়ির ফিকে হলুদ-রঙা মোটা দেওয়ালের আর্চ করা প্রশস্ত বারান্দা—পেছনের বিশাল তেঁতুল গাছের নীচে মস্ত উঠোন ৷ একপাশে লাটা-খাম্বা লাগানো ইঁদারা—সব দেখে দেখে মনে হচ্ছিল, মালতী ঘোষালের মুখে শোনা গল্পের যেন সিনেমাটা দেখবার সুযোগ হল বহুদিন পরে ৷ এখন সেটটা যেমনকে তেমন পড়ে আছে, কেবল কুশীলবরা উধাও ৷
সকালে জলখাবার খেয়ে একটু বেলার দিকে গঙ্গার ধারে গিয়েছিল ৷ ওখানেই পিকনিক সেরে ফিরতে ফিরতে প্রায় কালকের মতন না হলেও, কাছাকাছি অন্ধকার ৷ গোটা দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ওই শীতের হাওয়ার ধুলো মেখে, আলসেমি করে, ফের স্নান সেরে, এই বসেছে সব জড়ো হয়ে আড্ডা মারতে ৷ দুপুরের গোছাগোছা পুরি আলু, লাড্ডু এখনও হজম হয়নি, তবু লোভে পড়ে কী এক ছাতুর পকোড়া নিয়ে আঁটঘাঁট বেঁধে বসেছে ভূতের গল্পের আসরে ৷
বড়ো ঘরের তিনদিকে চারটি খাটিয়া, একদিকে আয়না লাগানো পুরোনো একটা আলমারি, দু’দিকে দুটো কাঠের মামুলি টেবিল চেয়ার, সামনে দরজা—যা দিয়ে বাইরের বারান্দায় যাওয়া যায় ৷ অন্য শোবার ঘরের দরজাটা এদিক থেকে ছিটকিনি তোলা—কী দরকার একটা হা-হা করা ফাঁকা ঘর খুলে রাখবার! সেকালে ওটিই বোধহয় মঞ্জরির দিদিমা দাদুর শোবার ঘর ছিল, এটি ছিল মা-মাসিদের ৷
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কেতকী বলল—‘‘শোন, হাবিজাবি গল্প ঢের শুনেছি, ভূতের নামে ভণ্ডামি ৷ আর নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলেও তো সেই প্ল্যানচেটে জগদীশ বোস আর বিদ্যাসাগরের কাছে পরীক্ষার আগাম প্রশ্নপত্র চাওয়া, না হলে বকুলবীথিতে গুরুদেবের পায়ের খসখস..., আম্রকুঞ্জে গলা খাকরানি... ৷ শুনতে শুনতে কান পেকে গেল ৷ আজ হবে অন্য অভিজ্ঞতার কথা ৷ শুধু ভূতের না ৷ কে, কবে, কী কারণে অসম্ভব ভয় পেয়েছে, তার গল্প ৷ সে ভৌতিক গা-ছমছমেও হতে পারে, বা অন্য রকমও ৷ মানে ভয় পাওয়া—যে কোনও খানে, যে কোনও রকম ভাবে ৷’’
গার্গী ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, সে রকম ভয়ের বলতে কী রকম ভয়ের গল্প ৷ ভয় তো কত রকম হয়! একবার ইয়োরোপে গিয়ে তিনদিনের জন্য পাসপোর্ট হারিয়ে গিয়েছিল ৷ সে কি ভূতের চেয়ে কম ভয়ের? সে কাহিনি ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে গেলে তো সবাই হাই তুলতে থাকবে!
মঞ্জরি বেশ মন দিয়ে শুনছিল কথাগুলো, শেষে ভেবে চিন্তে উত্তর দিল—‘‘না, তোর দিক থেকে ঠিকই বলেছিস ৷ তবে কেতকী বোধহয় যেটা বলতে চাইছে..., আমি হয়তো তার কিছুটা ধরতে পারছি ৷ মানে, ধর, আমরা অকারণেও অনেক ব্যাপারে ভয় পাই তো? হঠাৎ কিছু দেখে, কিছু শুনে, গা শিরশির করতে থাকে ৷ দারুণ ভয় পেয়ে যাই ৷ তারপর সেটা কেটে যেতেই একদম বোকা বনে যাই ৷ তখন হয়তো তার বিশ্লেষণ করি—কেন এমন হল? সেরকমই ঘটনা, ‘নিজের ভাষায় সুন্দর করিয়া গুছাইয়া লিখো ৷’ তাই তো?’’
কেতকী বলল, ‘‘অনেকটা ৷ যেমন ধর—সে একটা স্বপ্নও হতে পারে, বা ছোট্ট একটা ঘটনা, কিন্তু সত্যি ৷ মানে ওই সামান্য ঘটনাতেও সত্যি সত্যি ভয় পাওয়া—আশা করি সবাই বুঝেছ? ঠিক আছে—প্রথম শুরু করবে গার্গী ৷’’
গার্গী মাত্র নিশ্চিন্তে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল, ওর নাম শুনে একেবারে আঁতকে উঠল—‘‘আরে, প্রথমেই আমি কেন? সবার থেকে একটু শুনে টুনে নিই আগে! ভাবতেও তো হবে?’’
—‘‘সবারই তো সবার থেকে আগে শুনতে হবে গার্গী? একবার শুরু করলে দেখবে তরতরিয়ে চলবে ৷’’
মঞ্জরিও তাতে সায় দিল ৷ ‘‘আরে বাবা, সবার জীবনেই ভয়-ভাবনা, আনন্দ, দুঃখের তারতম্য থাকে—তা সেটাকে পুরিয়ে দিতে হবে বলবার ক্ষমতা দিয়ে ৷’’
—‘‘যেটা আমার একেবারেই নেই ৷ প্রথমেই আমাকে কেন টানলে? তোমরা সব শান্তিনিকেতনের..., তোমাদের কত, ধু—র! আচ্ছা, ঠিক আছে ৷ ঘ্যান-ঘ্যান না করে শুরু করছি, পড়েছি যখন যবনের হাতে ৷’’ বলে, কেতকীর দিকে চাইল একবার ৷ ‘‘তবে, ঘুম এসে গেলে আমাকে দুষো না ৷’’
—‘‘না, না, একদম না ৷ কেবল ঢুলু ঢুলু চোখে থামিয়ে দেব, তারপর সবার গল্পের শেষে, খাওয়া দাওয়ার পরে, লেপমুড়ি দিয়ে, ফের শুরু করতে বলব—লুলাবাই... ৷’’
নীলাঞ্জনার কথায় সবাই হেসে উঠতেই, গার্গী শুরু করল তার গল্প ৷
‘‘আমার তখন ফার্স্ট ইয়ার ৷ বাড়ি ছেড়ে প্রথম আইআইটি-র হস্টেলে গিয়েছি ৷ মোটামুটি কালীপুজোর পর-টর হবে, মানে শীত পড়েনি..., একটু শীত শীত ভাব ৷ কলেজ, হস্টেল, কিছুই তখনও সড়োগড়ো হয়নি—মাত্র তো মাস দুয়েকের অভিজ্ঞতা, তায় মাঝে আবার পুজোর ছুটিও গেল ৷ সকালে ক্লাসে গিয়েছি, তখন ঠিকই ছিলাম, কিন্তু লাঞ্চের আগেই মনে হল জ্বর আসছে—চোখ জ্বালা, মাথা ব্যথা, নাক বন্ধ ৷ একে হেমন্তকাল, হঠাৎ করে হিম পড়তে শুরু করেছে, তায় ছুটির পর হস্টেলে ফিরে খুব করে ধুলোটুলো ঝেড়ে ঘর পরিষ্কার করেছিলাম—আমার আবার মাকড়সার জালে খুব অ্যালার্জি, আর ধুলোতে তো বটেই ৷ হাঁপানির মতন হয়ে যেত, তদুপরি গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে তখন ছাতিম ফুল ফুটবার সময় ৷ ফলে আমায় জ্বরজ্বারি, সর্দি-কাশিতে নাস্তানাবুদ করবার জন্য সব ব্যবস্থাই মজুত ৷ লাঞ্চে ডাইনিং হলে গিয়ে সামান্য কী খেলাম কে জানে, রুম মেটকে বলে, কোনওক্রমে ঘরে ফিরে এলাম ৷ ও যেন ক্লাসে বলে দেয় সেকেন্ড হাফে আর যেতে পারব না—জ্বর আসছে ৷ মেয়েটা ছিল অন্ধ্রের, একটা আবোদা ঢ্যাবা-টাইপ ৷ সে তৎক্ষণাৎ মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে ফিরে গেল ক্লাসে ৷ আমিও নিজের ঘরে ঢুকলাম ৷
ততক্ষণে শীত করতে শুরু করেছে—গা খুব গরম, হাত পা ঠান্ডা ৷ আমি ঠান্ডা মাথায়, জামা কাপড় বদল করে, জলের বোতল, গেলাস মাথার কাছে রেখে, দরজায় ছিটকিনি দিয়ে, বালাপোশ গায়ে তরিবৎ করে শয্যা নেবার আগে পাউচ থেকে খান দুয়েক ক্রোসিন আর অ্যাভিল বের করে, টপাটপ জল দিয়ে গিলে ফেললাম ৷ আমাদের সময় অ্যান্টি অ্যালার্জি এই অ্যাভিলের খুব চল ছিল ৷ নাক সুড়সুড়, কী কান কটকট হল বা না হল, প্রথমেই গোটা কতক খেয়ে বসতাম—বাজে ওষুধ ৷ আজকাল এ সবের অত চল নেই ৷
তা, খানিক সময় হেঁচে টেঁচে, কেঁপে টেপে দু দুটো অ্যাভিলের মহিমায় একটু ঘুম ঘুম ভাব—শেষে পুরোপুরিই ঘুমিয়ে পড়লাম ৷
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম বলতে পারব না, হঠাৎ সিক্সথ সেন্সে এ মনে হল, ঘরে কেউ আছে ৷ আমি তখন এত ক্লান্ত অবসন্ন যে, ধড়মড়িয়ে উঠে বসবার ক্ষমতাও নেই ৷ অতিকষ্টে কেবল চোখ মেললাম ৷ এবং ভয়ংকর অবাক হয়ে দেখলাম—ঘটনাটা একশো-ভাগ সত্যি—আমার চৌকির পায়ের দিকে সে দাঁড়িয়ে আছে ৷’’
এই বলে গার্গী সামান্য থেমে চায়ে চুমুক দিতেই উৎকণ্ঠায় নীলাঞ্জনা বলল—‘‘সে বলতে? তোমার চেনা কেউ...?’’
নির্বিকার, গম্ভীর গলায় গার্গী উত্তর দিল—‘‘চে-না সে অর্থে বলা যায় না, আবার অচেনাও নয় ৷ ফ্যাকল্টির গায়ে লাগানো একটা ধাবা ছিল, নামে পঞ্জাবি, তবে ট্রু সেন্সে পাঁচমিশালি ৷ পরোটা-ভুজিয়া, ব্রেড পকোড়া, মশালা চায়ে জাতীয় হাবিজাবি খাদ্যের সঙ্গে সে-ই আমার প্রথম পরিচয় ৷ কাজে কম্মে সময় বয়ে গেলে, ও-ই ছিল আমাদের অন্নপূর্ণার মন্দির ৷ এই ধাবায় একটা লোক কাজ করত, তবে সার্ভিংয়ে না, এমন কি ক্যাশ-ট্যাশ বা কাউন্টারেও না ৷ পাশের দিকে একটু ঘেরা মতন জায়গা ছিল, ওখানে বড়ো বড়ো বাসন মাজত ৷ তখন তো কয়লার যুগ—কয়লা ভাঙত, বেঞ্চ-টেঞ্চগুলো রাতে তুলে রাখত, সকালে ফের পাতত—মানে সব ভারী কাজ আর কী! অদ্ভুত ছিল লোকটা ৷ সে সময় তো অত দুনিয়া দেখিনি—লাদাখ, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড তো দূরের কথা আসামও যাইনি ৷ ওই লোকটা বোধ হয় ওই সব দিককার, ট্রাইবাল ৷ রোগা, বেঁটে পাকানো গড়ন ৷ খাওয়া খাওয়া কালো দাঁত, কুঁতকুঁতে চোখ, ভয়ংকর নোংরা, খাটো একটা জোব্বা গোছের পড়ত, মাথায় টুপি, কানে দুল ৷ ছকু, কাঞ্চা, জন—হাজার লোকে হাজার নামে ডাকত ওকে ৷ কোনও কারণ ছাড়াই—আমার লোকটাকে ভালো লাগত না ৷ হয়তো অত হতশ্রী, হতভাগ্য বলেই কিনা জানি না, অথবা আমার চেনা অন্য লোকেদের চেয়ে বেশভূষা, চেহারায় আলাদা বলেও হতে পারে—ওর দর্শনে আমি একদম স্বস্তি পেতাম না ৷ হিন্দি জানত না, বাংলাও না ৷ কথায় জড়তা ছিল, অথবা আধা বোবা ৷ একটু কুঁজো মতন, নুলো ৷ মাইনে-পত্তর নাকি পেত না, ওই খাওয়া, থাকা ৷ সবার থেকে দশ বিশ পয়সা চাইত, দিতও সবাই ৷ ওই পয়সায় মদ খেয়ে চূড় হয়ে থাকত, পরদিন মালিকের গালি-গালাজ, চড়-চাপড়... ৷ রাস্তার কুকুরের জীবন যাকে বলে ৷ এই লোকটার জন্য আমার ক্যান্টিনে যেতেই ইচ্ছে করত না ৷ আর সে-ই... কিনা...!
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ, হাত পা নাড়তে পারছি না—ভারী লোহার মতন শক্ত, ঠান্ডা... ৷ ভয়ে বুকে ব্যথা করছিল, আর নিঃশব্দে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলাম, ভাবছিলাম হে ঈশ্বর, এই লোকটা আমায় নিয়ে কী করবে! এর হাতে আমার মৃত্যু, নাকি তার থেকেও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে? সে কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, নড়ছিলও না ৷ ডোরাকাটা জোব্বা গায়ে, কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ, মাথায় রোজকার মতন ক্যাপের বদলে, নাগা টাগা বা ওই ধরনের লম্বা বেতের মুকুটের ধাচে টুপি, যার উপর দিকে লম্বা লম্বা তীর, আর বড়ো বড়ো পালক লাগানো—আমি অবশ শরীরে, ভয়ে, ত্রাসে জীবনের শেষবারের মতন চোখটা খুললাম বা বন্ধ করলাম—ঠিক খেয়াল নেই ৷ কিন্তু তখনই চোখের সামনে থেকে সেই ভয়ানক মানুষের অবয়বটা ধীরে ধীরে একেবারে মিলিয়ে গেল ৷ অবাক হয়ে দেখলাম, আমার চৌকির শেষে, দু’থাকের নীচু বইয়ের র্যাক, যার ওপরে কাঠের লম্বা তক্তার মধ্যে কাপড় টাপড় ঝোলাবার যে হুক, সেই হুকের থেকে ঝুলছে আমার অতি সাধের নীল সবুজে ডোরাকাটা হাঁটু পর্যন্ত ঝুলের ডাস্টার কোটটা ৷ একই হুকে, ক্লাস থেকে ফিরে কোনওমতে লটকে দিয়েছিলাম কাঁধের রাজস্থানি ঝোলাটাও ৷ অন্য হুকে ওপর দিকে দাঁড় করানো আছে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি লোকাল মেলায় কেনা ওয়েস্টপেপার বাস্কেটটা ৷ টেবিলে নষ্ট হবার ভয়ে, যার ভেতরে রোল করে ভরে রাখতাম—প্ল্যানিং, ডিজাইনের কাগজ, বড়ো বড়ো স্কেল সেটস স্কোয়ার ইত্যাদি ৷ ঘুম, ওষুধ আর জ্বরর ঘোরে, ওই তিনটি জিনিস একত্রে মিলেমিশে এই কাণ্ড ৷ ক্রোসিনের কল্যাণে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছিল, জামা টামা, ঘাড়-গলা ভিজে চুপচুপে ৷ নাক বন্ধ থাকবার দরুন মুখ দিয়ে শ্বাস নিয়েছি—গলা শুকনো, বালাপোশটা ছুড়ে ফেলে, ওই কোট, ঝোলা টুপির দিকে অপলকে চেয়ে চেয়ে গোটা বোতলের জলটা শেষ করলাম ৷ মনে হচ্ছিল আমি সামান্য নজর সরালেই বুঝি সে আবার জোব্বা পরে, টুপি লাগিয়ে, ঝোলা কাঁধে দাঁড়িয়ে পড়বে পায়ের কাছে ৷
সামান্য ধাতস্থ হয়ে এবার আমি ভালো করে দরজার দিকে চাইলাম, ছিটকিনি যথারীতি বন্ধ ৷ বিকেল হয়ে আসছে, স্টাফ কোয়ার্টারের বাচ্চারা চ্যাঁচামেচি করে খেলা করছে কম্পাউন্ডে ৷ কোনওখানে, কোনওদিক দিয়েই কোনও কিছুর মধ্যেই অস্বাভাবিকতার নাম গন্ধও নেই ৷ ফলে চৌবাচ্চার ঠান্ডা জলে, হাতে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এসে, ঘেমো জামাকাপড় বদলে, একবার মনে হল ডিপার্টমেন্টেই চলে যাব কিনা ৷ পরে ভাবলাম, ক্লাস তো শেষ অলরেডি ৷ অতঃপর সবাই হয়তো এখন ওই ধাবায় গিয়েই আড্ডা মারবে ৷ সামহাউ আজকে, এই মুহূর্তে আমার আর কোনও মতেই ওই ধাবায় যাবার মুড ছিল না, তা বাদে ক্লান্তও লাগছিল ৷ একেবারে রাতে খেতে যাব ডাইনিং হলে—সামনেই সাবমিশান, বাতি জ্বেলে আমি টেবিলে কাজ নিয়ে বসলাম ৷ বসলাম বটে, তবে কাজও এগোচ্ছিল না, মনও বসছিল না ৷ বার বার কেবল মনে হচ্ছিল, এত ভয় পেলাম আমি, এ-ত? এমন মারাত্মক অস্বাভাবিক ভয়, ...সত্যি বলতে, এমন রক্ত জল করা ভয় বোধকরি আমি আর কখনও পাইনি, অথচ এ-তো হ্যালুসিনেশন! জ্বরের ঘোর, ওষুধের প্রকোপ, সব মিলেমিশে একটা বিভ্রান্তি... ৷ বোবায়ও ধরেছিল নিশ্চয়ই, কারণ আমি তো গোঙাচ্ছিলাম, শব্দ আসছিল না—সবই হল, বুঝলামও, ভুলও ভাঙল ৷ তবে ওই মারাত্মক ভয়টা তো ভয়ানক ভাবে সত্যি ৷ ওরকম ভয়ে, দুর্বল শরীরে মানুষ হার্টফেলও করতে পারে, আমি বেঁচে গিয়েছি ৷
যথাসময়ে ডাইনিং হলে গিয়েছি ৷ বাইচান্স, সেদিনই টেবিলে সব ক্লাসমেটরাও আছে ৷ জিজ্ঞেস করলাম—‘আজ ক্লাসে কী হল? আমি তো সেকেন্ড হাফ করতেই পারলাম না—হঠাৎ এমন ভালুকে জ্বর এল, অ্যালার্জি... ৷’ সবাই-ই জিজ্ঞেস করল—এখন কেমন আছি ৷ আমি বললাম—‘দ্বিগুণ ওষুধে চর্তুগুণ ফল—একদম ফিট ৷’ বলাইবাহুল্য ওসব দুঃস্বপ্ন, ভয় টয় কিছুই জানলাম না ৷ জানালে হতই বা কী? ও বোঝানো আর বোঝা, দুই-ই অসম্ভব ৷ যাই হোক, ওরা জানাল—অমুকের ক্লাসে তমুক হল, তমুকের পিরিয়ডে অমুক—তবে শেষ ক্লাসটায় ওরা আর কেউই যায়নি ৷ কে যেন এসে খবর দিল, ধাবার মজদুর আছে না, খানদুং? ওই যে বাসন-টাসন ধোয়, পয়সা চায় আর মদ খায়—সে দারুণ অসুস্থ হয়ে একেবারে মর মর ৷ ধাবাওয়ালা ভয় পেয়ে ক্লাসে এসে খবর দিয়েছিল ৷ তৎক্ষণাৎ ছেলেরা ছুটল, হেলথ সেন্টারে নিয়েও গেল—তবে, ও আর বাঁচবে না ৷ রক্ত বমি টমি করে..., জ্ঞানও নেই... ৷ কেউ বলছে মদে বিষক্রিয়া, কেউ বলছে শরীরেই বিষ ৷ পালস পাচ্ছে না, প্রেসার ফল ৷ হেলথ সেন্টারই বা কী করবে? বেচারাদের সম্পত্তি বলতে তো এক বোতল স্যালাইন, একটা ভাঙা প্রেশার মাপার যন্ত্র, আর খান কতক লাল নীল বড়ি ৷
একজন বলল—‘ওর শরীরেও যেন কত সম্পত্তি! এখনও পর্যন্ত যে খানকতক ওই ভাঙাচোরা, অকেজো হার্ট লাং লিভার নিয়ে টিকে আছে, এই ঢের’... অন্যজন বলল—‘এমন জীবন না থাকাই ভালো ৷ অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়ে থাকলে তাকে দেখবে কে? এদের দেশ, গাঁ পরিবার কিচ্ছুটি থাকে না ৷ কোথায় যে জন্মে যায়, কোথায় কোথায় জীবন কাটায়..., আহারে... ৷’
এত কিছু শুনেও কেন যেন আমার কোনওরকম কষ্ট হল না কোনও বিষাদও না ৷ বরং ওকে আর দেখতে হবে না ভেবে বেশ যেন নিশ্চন্তই লাগল ৷ লোভে পড়ে কিছু খেয়ে ফেলে, শেষে বদ হজম হয়ে বমি হলে যেমন সেই নির্দোষ জিনিসটিও আর কখনও মুখে তুলতে সাধ যায় না, এও তেমনই ৷ তবে, এ নির্দোষ হলেও, আমি তাকে সাধ করে তো ডাকিনি ৷ সে নিজে নিজেই এসেছিল মরণ ভয় দেখাতে ৷
ঘরে ফিরে এসে প্রথমেই আমি হুক থেকে ডাস্টার কোটটা নামালাম, তারপর ঝোলাটা, শেষে ঝুড়িটাও তুলে রেখেদিলাম ঘরের কোণে ৷ মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই রাত কাটল ৷ তবে...’’ খানিক চুপ করে থেকে শেষে বলল—‘‘তবে..., মেয়েরা জানত না ৷ লোকটি আসলে সন্ধে নাগাদই মারা গিয়েছিল—ওই হেলথ সেন্টারেই ৷ রাতে সবাই চাঁদা টাঁদা তুলে ধাবায় দিয়ে এল সৎকারের জন্য, আমিও দিলাম..., কিন্তু...’’ কথাটা আর শেষ করল না ৷ দরকার বা কী?
সবাই চুপ করে হাঁ করে শুনে যাচ্ছিল ৷ গার্গী থামতেই, মঞ্জরি বলল—‘‘বা-বাঃ! ‘পারব না’, ‘ও আগে বলুক’, ‘ক্ষমতা নেই’, কত কিছুর পর, এত কিছু...? দা-রু-ণ ৷ আমার বোন বলে বলছি না, বল তোরা?’’
কেতকী বলল—‘‘সত্যি ভালো ৷ ফার্স্ট হাফটা বুদ্ধির ব্যাখা, দ্বিতীয়টা বুদ্ধিতে যার ব্যাখা চলে না ৷’’
নীলাঞ্জনা খানিক চুপ করে ছিল, শেষে বলল—‘‘লোকটা নিজের দেশ দেখেনি, মা-বাপকেও হয়তো না ৷ জীবনে যা পারেনি, তারই শেষে এসে, যেমনটা হয়তো তার সাধ ছিল, ঠিক তেমনটাই—পরিষ্কার জামা পরে, মাথায় তাদের রীত-রেওয়াজের তীর-পালকের টুপি চাপিয়ে, নিজের উপার্জনে কেনা, পরিজনের জন্য সম্ভারের ঝোলা কাঁধে নিয়ে হয়তো পাড়ি দিল তার দেশের দিকে! তার পূর্বপুরুষ কোনও এককালে যেখানে জন্মেছিল... ৷ গার্গী, তোমার হুকে ঝোলানো দ্রব্যাদি নেহাতই নিমিত্ত মাত্র ৷ —খুব ভালো ৷ তবে, এমন একটা গল্পের পর অন্তত পক্ষে দশ মিনিটের বিরতি চাই ৷ তারপর শুরু করবে মঞ্জরি ৷’’
অতঃপর দশ নয়, পাঁচ মিনিটের বিরতিতেই মঞ্জরি শুরু করল তার নির্বাচিত সত্য ঘটনা, এবং অবশ্যই শর্ত অনুসারে ভয়ের ৷
‘‘আমি হস্টেলের গল্পই করছি, তবে ভূতের না, কেবল ভয়ের ৷ আর সে আমার জীবনের সব চাইতে ভয়ানক ভয়ের কিনা বলতে পারব না, তবে, গার্গীর গল্পের ঘটনার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে বলে আজ মনে পড়ল ৷ অবশ্য ওর শেষার্ধের অলৌকিক সত্য ঘটনাটা বাদ দিয়ে ৷
শান্তিনিকেতনে স্কুল ছেড়ে তখন সদ্য কলেজে ৷ শিক্ষাভবনে পড়ি ৷ থাকা বিড়লা হস্টেলে ৷ বর্ষাকাল, অগস্টের শেষের দিকে কোনও বুধবার সেদিন ৷ সারাদিন বৃষ্টি গিয়েছে, ঝিরিঝিরি, ঝমঝম, ইলশেগুঁড়ি—শেষ মেশ ঝরে ঝরে ক্লান্ত হয়ে শেষ বিকেলে একদম থেমে গেল ৷ আর জানিসই তো, তখনই শুরু হয় ব্যাঙের ডাক, ঘ্যাং ঘ্যাং, হস্টেলের স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, মিটিমিটি আলো, গোটাদিন ঘরবন্দি—বিরক্ত লাগছিল ৷ সন্ধে হতেই যার যার কৃষ্ণেরা গেটের মুখে সাইকেলে, পায়ে হেঁটে, অন্যের ক্যারিয়ারে চেপে সব হাজির ৷ আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের রাধারাও ট্রাংক থেকে সাত তাড়াতাড়ি নাইলন, ডেক্রনের শাড়ি বের করে, ছাতা নিয়ে, হাওয়াই চটি পরে, টর্চ, মশার ধূপ, কার্বোলিক অ্যাসিডের শিশি ঝোলায় পুরে, হেলে দুলে অভিসারে ভ্যানিস... ৷ যথা নিয়মে আমাদের মতন খানকতক মোটা দানার কাঁকরই কেবল ছাঁকনিতে আটকে পড়ে রইল ঘরের কোণে ৷
গুলুদি বলল—‘‘আদা দিয়ে চা কর দিকিনি, আর কার ঘরে মুড়ি আছে বের কর, চানাচুর দিয়ে মাখ ভালো করে... ৷’’ আমার একদম ইচ্ছে করছিল না ওদের সঙ্গে বসে বসে ফ্যাঁদড়া প্যাচাল পাড়তে ৷ শাড়ি পড়ে, ঝোলা নিয়ে, ছাতা নিয়ে বেরুতে যাচ্ছি, সেন কোয়েলি বলল—‘‘কোথায় যাচ্ছিস রে? চল ৷ রঞ্জনীর দিকে যাই ৷’’ ওর রুমমেট রেখা গুহদি বলল, ওরও কী কী যেন কিনতে হবে, সুতো, মোমবাতি, চা পাতা, পোস্টার কালার... ৷ কিছুই না, আসলে কোনও একটা বাহানায় বেরুব, ব্যাস ৷ আজকালকার শহুরে বাচ্চাদের মতন আমাদের তো উইক এন্ডের আর কোনও সাধ-আহলাদ ছিল না, থাকবার মধ্যে কালে ভদ্রে রিকশা চেপে চিত্রা-বিচিত্রায় সিনেমা দেখা, তা না হলে অদ্বৈত সুইটসে সিঙারা মিষ্টি খেয়ে লঙ্কা জয় করা ৷
তা সে যাই হোক, খুশি মনে লাফাতে লাফাতে আমরা তো রওনা হলাম ৷ রুটটা তো জানিস তোরা—বিড়লা থেকে বেরিয়ে কলাভবনের ভেতর দিয়ে আড়াআড়ি গিয়ে, পুরোনো মেলার মাঠ ডিঙিয়ে কো-অপের পাশ দিয়ে সোজা রঞ্জনী ৷ ধীরে সুস্থে, দেখে-বেছে, জিনিসপত্তর যা কিনবার কিনলামও, তার সঙ্গে কিছু বাড়তিও ৷ অগস্ট মাস জুড়ে কেবল জন্মদিন, আমি দুটো চকোলেট নিলাম, আর টর্চের ব্যাটারি ৷ কোয়েলি সবজির দোকান থেকে দুটো টোম্যাটো, একটা শশা কিনে বলল, আগামীকাল নাকি স্যান্ডউইচ বানাবে ৷ আমাদের তো তাই শুনে আগামীকালের অপেক্ষায় তৎক্ষণাৎ জিভে জল ৷ যাই হোক, সহদেবের দোকান থেকে তিনটে আলাদা ছোটো ঠোঙায় মুড়ি আর আলুর চপ কিনে খেতে খেতে, হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে, গলা মিলিয়ে গান গাইতে গাইতে মহানন্দে ফিরছি—দারুণ কাটল সন্ধেটা, ভাগ্যিস বেরুলাম!
আমরা রবীন্দ্রভবনের দিক থেকে রাস্তা পেরিয়ে নন্দনের সামনে হয়ে, লোহার গেট দিয়ে কলাভবনে ঢুকলাম ৷ আমার মুড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবু ঠোঙাটা হাতে ধরা ৷ কোয়েলি ধীরে ধীরে খায়, ওর শেষই হয়নি, রেখা গুহ খাচ্ছিল না ৷ ওর নাকি ঝাল লেগেছে, লঙ্কা পড়েছে মুখে ৷ আমিই হাত বাড়াচ্ছিলাম ওর ঠোঙায় ৷ আমাদের কাঁধের ব্যাগে সামান্য জিনিস পত্তর, হাতে মুড়ির ঠোঙা, বন্ধ ছাতা বগলে চাপা ৷ পায়ে চলা রাস্তা, মাঝে মাঝে বেশ গর্ত, তাতে বৃষ্টির জল জমে আছে ৷ গোড়ার দিকে আলো ছিল না, কিন্তু ক্রাফট সেকশনের সামনে আলো জ্বলে ৷ তবে, আমাদের নিত্যকার চেনা রাস্তা, উঁচু নিচু, খানাখন্দ, স-ব জানা ৷ কোয়েলি ওর বৌঠানের গল্প করছিল, আমরা সাবধানে পা ফেলে, গল্প শুনতে শুনতে চলছিলাম কোনাকুনি ৷ বড়ো বড়ো গাছ থেকে তখনও টুপটাপ জল ঝরে পড়ছিল, ব্যাঙ ডাকছিল অনবরত ৷ চারিপাশে আর কেউ ছিল না আমরা বাদে ৷ আমরা নাক বরাবর যাচ্ছিলাম, হঠাৎ কেন যে ডানদিকে চাইলাম জানি না, তাকিয়েই হঠাৎ ‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম একসঙ্গে তিনজনেই ৷
দিনের বেলায় ক্লাস ঘরগুলো বা চত্বর যেমনই জমজমাট থাকে, রাতে ঠিক হয় তার বিপরীত ৷ তায় ছুটির দিন, সারাদিন বাদলা ৷ থমথমে নির্জন অন্ধকার দোতলা ক্লাস ঘরটার সামনে বেদীর ওপরে বাটিকের রং-চোবানোর যে লম্বা লম্বা লোহার পরতগুলো থাকে, অন্ধকারে সামান্য আলোয় সেগুলো মনে হচ্ছে যেন সার বাঁধা কালো কালো তিনটে কফিন ৷ আর সেখান থেকে মোরাম বাঁধানো পথের ধারে জারুল গাছের সারি—খানিক তফাতে সেই একটা গাছের নীচে, মাথায় কালো টুপি পরে ধূসর-রঙা রেনকোট গায়ে, হাঁটু পর্যন্ত কালো চকচকে গাম বুট পায়ে, পকেটে হাত ঢুকিয়ে, সেই কফিনগুলোর দিকে চেয়ে আছে একটা লোক... ৷ আমরা তিনজনেই থমকে গিয়েছিলাম ৷ কোয়েলির বৌঠানের গল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আর আমার মুড়ি চিবোনোও ৷ এমন ব্যাঙ-ডাকা ঘন ঘোর বর্ষার নির্জন সন্ধে রাতে, এ কে এখানে, এমন অদ্ভুত সাজে!
হয়তো এক মুহূর্ত বা দু’ সেকেন্ড, তাতেই আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, বাকি দু’জনের কথা আর মনেই ছিল না, শিরদঁাড়া বেয়ে কেবল ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, আমি যাকে বলে প্রস্তরবৎ দাঁড়িয়ে ছিলাম এক দৃষ্টে ওই মুখাবয়বহীন বর্ষাতি গায়ে অশরীরীটির দিকে চেয়ে ৷ হঠাৎ সামান্য হাওয়া বইল বোধহয়, পুবের বাদুলে হাওয়ায় জারুল গাছের পাতা দুলে উঠে কোণের আলোটা নড়ে গেল ৷ আর চোখের সামনে স্পষ্ট দেখলাম যাকে রেইন কোট পড়া মানুষ ভেবেছিলাম ওটাও একটা জারুল গাছই ৷ একটু বড়ো তাই গুঁড়িটাও সামান্য মোটা এবড়ো-খেবড়ো, আঁকাবাঁকা ৷ হালকা আলো পড়ে জলে ভেজা গা-টা চকচকে ধূসর প্লাস্টিকের মতন দেখাচ্ছে ৷ ফুট পাঁচেকের উচ্চতায় ছোট্ট একটা ডাল বেরিয়ে তাতে কতক পাতা গজিয়েছে, অত কম আলোয় যা নাকি একেবারে ঝুপসি কালো, মনে হচ্ছে টুপির মতন ৷ নীচে গোড়ার দিকটা পোকামাকড়, ঘুণের ভয়ে সচরাচর যেমন আলকাতরা মাখানো হয়—তারচেয়ে বেশি কিছু না ৷ অর্থাৎ ওই ভেজা আলকাতরাই হাঁটু পর্যন্ত কালো কুচকুচে, চকচকে গামবুট পরে দাঁড়িয়ে আছে—দেখলাম, ভালোকথা, একেবারে নিশ্চিন্ত ৷ নির্বিষ বি-নাইন, গোবেচারা, অসাড় গাছটিকে আর কোনও মতেই ভয় পাবার কারণ নেই ৷ কিন্তু আমরা তিনজনেই ওই বিভ্রান্তিটা স্পষ্ট হয়ে যাবার পরই যেন সব থেকে বেশি ভয় পেলাম ৷ ‘সব থেকে ভয় পেলাম’ এই কারণে বলছি যে, তা হলে পড়ি কি মরি করে তিনজনেই কেন ছুট দিলাম? কোয়েলিদির কাঁধ থেকে ঝোলাটা পড়ে গিয়েছিল, তার সঙ্গে সঙ্গে আমার বগলদাবা ছাতাটাও ৷ রেখা গুহ সব চাইতে আগে মুড়ির ঠোঙাটা ফেলে ছুটেছিল, পথে খুলে পড়েছিল চশমা... ৷ আমরা তিনজনেই জল-কাদা তোয়াক্কা না করে, ইট পাথরে হোঁচট খেয়ে, অন্ধের মতন প্রাণ ভয়ে যেন কেবল ছুটছিলাম... ৷ সামনের দিকে খানিক দৌড়ে, একেবারে কালোবাড়ির সামনে এসে, তবে আমরা শ্বাস ফেললাম ৷ ওখানে আলো ছিল, বেদিতে বসে ছেলে মেয়েরা গল্প করছিল, রাস্তা দিয়ে সাইকেল যাচ্ছিল, ট্রিং ট্রিং ঘন্টি বাজিয়ে—আমরা একে অপরের দিকে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে ভাবছিলাম—কেন এত ভয় পেলাম? একেবারে তিনজনে এক সঙ্গে?
পরে পরস্পরের সাথে আলোচনা করে জেনেছিলাম যে, তিনজনে তিনটে অ্যাংগেল থেকে কিন্তু ঠিক একই জিনিস দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পরেছিলাম ৷ একই রকম নিঃশ্বাস বন্ধ করা ত্রাসে, পিঠ বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, আবার তিনজনেরই একসঙ্গে সে ভয় ভেঙে গিয়েছিল! অন্য কী এক অজানা ভয়ে, সব ছুড়ে ফেলে প্রাণ নিয়ে দৌড়োতে হয়েছিল সবাইকে—কেন? আমরা সবাই জানি, সামান্য এক আধ ইঞ্চির তফাতে নড়ে গেলে, আলো-ছায়ার খেলা সম্পূর্ণ বদলে যায় ৷ সে ক্ষেত্রে আমরা তো এক দেড় ফুটেরও বেশি ব্যবধ্যনে ছিলাম, তবে?...’’
মঞ্জরি থামলে, কেতকী বলল, ‘‘আমার সেদিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে রে ৷ বাদল আর সুব্রতকে নিয়ে, টর্চ জ্বেলে আমরা রেখা গুহ-র চশমা খুঁজতে গিয়েছিলাম ৷ আর কোয়েলি সেনের তো তখন খেয়ালই হয়নি যে, ঝোলাটা কাঁধে নেই ৷ বেচারির নতুন কেনা বাল্বটাই ভেঙে গিয়েছিল—মনে আছে... ৷’’
নীলাঞ্জনা বলল তারও নাকি মনে আছে ৷ ঠিকই বলেছে অগস্টের শেষেই ওর জন্মদিনে কালোর দোকানে চা মিষ্টি খেতে খেতে এই গল্পটা হচ্ছিল ৷ পরে সে ঘটনা আবার কাহিনি হয়ে ডাল-পালা বিস্তার করে হল, কলাভবনে একটা লোক হাতে ব্লান্ট অবজেক্ট নিয়ে, রেনকোটে গা ঢেকে, গাছের আড়ালে ওত পেতে দাঁড়িয়েছিল ৷ ওরা তিনজনে চিৎকার করে লোক জড়ো করাতে, অস্ত্রটা ফেলে পালিয়ে গিয়েছে ৷ সত্যি..., তিলকে তাল না, তালগাছ বানানো হত... ৷
সামান্যক্ষণ চুপচাপ, পকোড়া খাওয়া চলল—মঞ্জরি ইতস্তত করে বলল—‘‘আমারটা তেমন জমল না, না রে? ঠিক বোঝাতে পারলাম না বোধহয় ৷ আসলে রজ্জুতে সর্পভ্রম—এ তো হয়ই! দেখে আঁতকে উঠল, পালালো, কিন্তু সাপটাকে দড়ি বুঝতে পারবার পর দৌড়নো...! একা তো নয়, তিনজনে, আর সে ভয়..., উফ... ৷ ওই গাছটার যেন সে রাতে জেদ চেপে গিয়েছিল, ওই তিন কিশোরীকে ভয় দেখিয়ে দম বন্ধ করে মেরে ফেলবার জন্য ৷ একা একা গোটা দিন ভিজে ভিজে শয়তানি খেলছিল মাথায় ৷ পরে যেতে আসতে কতবার দেখেছি ওটাকে ৷ নিরীহ, গোবেচারা, বিশেষত্বহীন জাস্ট ফুল-ফলহীন বুড়ো একটা জারুল গাছ... ৷’’
কেতকী বোধহয় সে-ই সময় ফিরে গিয়েছিল, সে রাতের ঘটনা, সে সব হারিয়ে যাওয়া সহচরদের সান্নিধ্যে—চোখ বন্ধ করে বলল—‘‘সে-ই মনে পড়ে বর্ষার রাতে, চক্ষে নাহি কো ঘুম ৷ টর্চ নিয়ে হাতে, তাড়াতাড়ি ছুটে, ব্যাগ কুড়োবার ধুম... ৷ কে বলে তোর গল্প জমেনি ৷ জমেও গেছে, মজেও গেছি ৷ তুই-ই তো তখন বুদ্ধদেবের মতন বাক্য বললি, সবার জীবনে নাকি ভয়, ভাবনা, নষ্টামি, দুষ্টামি—সব কিছুরই তারতম্য থাকে ৷ কিন্তু মালতী ঘোষালের মেয়ে হয়েও যদি সেটা পোষাতে না পারিস—ধিক ৷ আমার তো ভাই খুব ভালো লেগেছে ৷ আমি তো ইতিমধ্যে তোদের তিনজনের সঙ্গে রঞ্জনী গিয়ে, মুড়ি আলুর চপ খেয়ে, ব্যাঙের ডাক শুনতে শুনতে দিব্যি ছোট্ট একটা ট্যুর সেরেও এলাম ৷’’
গার্গী আর নীলাঞ্জনারও নাকি খুব ভালো লেগেছে, তৎসহ প্রথম গল্পটার সঙ্গে একটা প্রবাহধারাও আছে ৷ আর যাই হোক না কেন, আমাদের সে সময়কার চোখে দেখা, কানে শোনা ‘স-ই-ত্য ঘটনা’, তার মূল্যই আলাদা ৷
নীলাঞ্জনা বলল, তাহলে সে-ও না হয় সে সময়কার এমনধারা একটা ঘটনাই বলবে ৷ যদিও তাতে ওই দৃষ্টিবিভ্রমের কোনও ব্যাপার ছিল না, ছিল কাকতালীয়ও সম্পর্কের অদ্ভুত এক কারসাজি ৷ আর স্থান কাল পাত্রও প্রায় একই বলা যায়, সামান্য যদি বা এদিক আর ওদিকের তফাত ৷ তাই এই ঘটনার কথা যদিও মনে এল, তবুও কতটা গুছিয়ে-গাছিয়ে বলতে পারবে জানে না ৷ নিজ গুণে যেন বুঝে নেয় তারা ৷ ওর সঙ্গে সেদিন মঞ্জরি তো ছিলই কিন্তু কেতকীরটা মনে পড়ছে না ৷ আরও ক’জন ছিল, তাদের নাম সময় মতন আসবে ৷ তাহলে শুরু করছে?
ঢোক গিলে ওইটুকু সময়ের মধ্যে শুরু করবার আগেই কেতকী বলল—ওর কথা তো নীলাঞ্জনার কখনই মনে পড়ে না, অথচ সে কিনা ওর সব চাইতে প্রিয় বন্ধু—বেস্ট ফ্রেন্ড... ৷ সে কথায় পাত্তাও না দিয়ে শুরু করল তার অস্বাভাবিকতার নিজস্ব ঘনঘটা ৷
‘‘আমি যেদিনকার কথা বলছি, সেদিনটাও ছিল ঘন-ঘোর বর্ষার দিন, বর্ষাকালও ৷ সে সময়কার শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে, তার মাত্র ক’দিন আগে একটা ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিল—সেই, পাঠভবনের পিকনিকে গিয়ে ক্যানেলে... ৷ যাই হোক, আমি আর সে দুর্বিসহ দিনটার দিকে যাচ্ছি না, তোদের সবারই তো সে রাতের কথা মনে আছে ৷ সন্ধে থেকে বৃষ্টি শুরু হল, তার সঙ্গে ঘণ্টাঘরের বিরামহীন পাঁচটা করে বিপদ ঘণ্টা... ৷ কী ভয়ানক যে নাড়া দিয়েছিল সেদিনের গোটা ব্যাপারটা...! ওরকম বিভীষিকাময় মৃত্যুর অভিজ্ঞতাই বা তখন আমাদের কতটুকু! ফের, স্বাভাবিকভাবেই ক্লাস-টাস যাচ্ছি, গল্পগুজব চলছে—তবে মন ভালো নেই ৷ আমাদের মধ্যে কেউ বাচ্চাটার পিসিকে চেনে, কেউ মাকে, কেউ বা প্রতিবেশী, রোজ সন্ধেতে কান পেতে থাকতাম, মনে হত পাঁচটা ঘণ্টা বাজছে না? তার সঙ্গে একঘেয়ে টা-না অবিরাম বৃষ্টি তো চলছেই... ৷
তা, এরকমই এক বুধবারের সন্ধের দিকে, বৃষ্টি একটু ধরেছে, মনে হল, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যাই একটু ঘুরে আসি ৷ তৎক্ষণাৎ মঞ্জরি বলল ও-ও যাবে, মন্দিরা আর বুইয়াও রাজি ৷ ফোল্ডিং ছাতা তখন হাতে গুণে ক’জনের কাছেই বা থাকত? তা-ই ঘেংটে মেংটে খান দুয়েক, এর তার থেকে জোগাড় করে, ঝোলায় পুরে বেরুচ্ছি—শুভ্রাও দেখি তার ঘর থেকে বেড়িয়ে বলে—‘চল ৷’
সত্যি বলতে, অতি বিরাট দল করে হৈ হৈ করতে করতে বেরুবার শখ তেমন ছিলই না ৷ ভেবেছিলাম কেবল মঞ্জরি আর আমি একটু না হয় হেঁটেই আসব ৷ নয়তো গেলাম হয়তো পুষ্পাদি বা শর্বাণীদির কাছে... ৷ যা হোক, অগত্যা চললাম পাঁচজনেই দল বেঁধে ৷ তখন কটাই বা দোকান ছিল ওদিকে—তাও বুধবার সব বন্ধ ৷ সুতরাং কিছুই সওদা করবারও নেই ৷ ঠিক হল কালোর দোকানে চা সিঙারা খাব, আর ফিরতি পথের জন্য সহদেবের মুড়ি আলুর চপ,... তো চলেছি... ৷ ব্যাং ডাকছে, কোথাও কোথাও গর্তে লাল জল জমে আছে, তখনও পুরোপুরি অন্ধকার হয়নি ৷ সামান্য আলোর রেশ আছে আকাশে, কিন্তু আমাদের গল্পের মধ্যে আলোর এতটুকু নামগন্ধও নেই ৷ মন্দিরা তখন সবিস্তারে শুরু করেছে ওদের কালচিনি চা- বাগানের মার্ডার কেস ৷ সে থামতে না থামতেই বুইয়া আরম্ভ করল, ওর পিসতুতো ভাইয়ের স্কুটার অ্যাক্সিডেন্ট ৷ শুভ্রার স্টকেও নিশ্চয়ই এরকম প্রচুর ছিল, তবে সেদিন কী হল কে জানে, ও সে সব নিয়ে চৈত্র সেল-এর স্টক ক্লিয়ারেন্সে না গিয়ে কৌতূহলে কেবল খোঁচাতে লাগল, তারপর কী হল? তারপর কী হল? অতঃপর অপমৃত্যুর ক’দিনে শ্রাদ্ধ, গয়ায় গিয়ে পিন্ডি, না মিন্ডি... ৷ আমার এত বিরক্ত লাগছিল যে গোটা রাস্তায় একটাও কথা বলছিলাম না ৷ তৎসহ মঞ্জরিও একদম চুপ ৷ ওই যে বলে না, ‘ভূতের ভয়ে চড়লাম গাছে, ভূত বলে পাইলাম কাছে?’ যেই মন খারাপের তাড়নায় হাওয়া খেতে বেরুলাম, সে দ্বিগুণ হয়ে চেপে বসছিল আমাদের মনে ৷ কালোর দোকানে ও রকম গোমড়া মুখে সিঙাড়া দিয়ে চা খেলাম, সঙ্গে আরও খান-কতক সত্য দুর্ঘটনার আগাগোড়া রোমহর্ষক বর্ণনা ৷ হঠাৎ শুভ্রা বলল—‘শান্তিনিকেতন হস্টেলে কিন্তু এই প্রথম অপমৃত্যু... ৷’ বলে আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিল, আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে একেবারে তড়বড়িয়ে বলে উঠলাম—‘না তো! প্রথম কেন হবে! ছন্দাদি তো এই ক’বছর আগেই মাত্র মারা গিয়েছে স্টোভ বার্স্ট করে—জানতিস না? আমাদের হস্টেলেই তো?’ মঞ্জরি কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি ওর হাতটা টিপে ধরলাম ৷ শুভ্রা অবাক হয়ে বলল—‘আমাদের হস্টেলে! মানে আনন্দসদনে?’ মন্দিরারা এরকমই আধা খাঁগচড়া গল্প একটা শুনেছিল বটে সামান্য, তবে কবে, কোথায়, কেন—সেসব কিছুই জানত না ৷ জিজ্ঞেস করল—‘তোরা চিনতিস নাকি আবার?’ আমি মঞ্জরির হাতটা টিপে রেখেই বললাম—‘হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ ৷ মঞ্জরিও চিনত ৷ সেদিনটাও এমন বর্ষার রাতই ছিল ৷’
এতটা বলে, খানিক থেমে খাটিয়ার বাকি তিনজনের দিকে চেয়ে বলল—‘‘তোরা তো এ গল্প জানিস, তবে শান্তিনিকেতনের অ-বাসিন্দা গার্গীর জন্য সংক্ষেপে একটু বলে দিচ্ছি যে, আমরা কেন, আমার দিদিরাও চোখে দেখেনি ওই কিংবদন্তী ছন্দাদিকে ৷ দিদিদের আগের রীতাদি, মিমিদিদের সময় বোধহয় ছন্দা নন্দী নামে একজন এসেছিল ক্রাফট-এর দু’বছর সার্টিফিকেট কোর্সে ৷ তবে তা শেষ করতে পারেনি, কয়েক মাসই মাত্র ছিল ৷ বেশি রকম সাদাসিধে, বলা যায় খুবই নিরেস চেহারার, অবিবাহিতা বয়স্কা মেয়ে ৷ কারুর সঙ্গে তেমন মেলামেশা করত না, বাইরে টাইরেও বেরুত কম ৷ তার কারণ অবশ্য ভিন্ন—ওর পায়ে খুঁত ছিল ৷ একটা পা বোধহয় বাঁকা বা ছোটো—খুঁড়িয়ে হাঁটত ৷ তবে, ওরকম করেই ক্লাসে তো যেতেই হত, কিচেনে খেতেও ৷ তা, সে যাই হোক, সেই ছন্দা নন্দী বাটিক করতে বসে কেরোসিন-ভরা মোম গলাবার হ্যারিকেন উলটে আগুন লাগিয়ে ফেলল ৷ কী ভাবে কী হয়েছিল বলা যায় না, মানে জানি না ৷ তবে শাড়িটাড়িতেও আগুন ধরে গিয়েছিল, বিছানাপত্তরেও বোধহয় ৷ চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে সবাই এসে কী রকম করে যে, আগুন আয়ত্তে এনেছিল কে জানে! সেদিনও সন্ধ্যায় সিংহসদনে পাঁচটা করে ঘণ্টা বেজেছিল ৷ বিশ্বভারতী হাসপাতালে ভর্তিও করা হল সঙ্গে সঙ্গে, পরে দুর্গাপুর না আসানসোলে ট্রান্সফার করা হলে ক’দিন পরে মারা যায় ৷
খুবই দুঃখের কথা, তবে অনেককাল কেটে গেলে যা হয় আর কী! তা বাদে, আমরা তো কখনও দেখিওনি, আমাদের চেনা-জানারাও যেন কেউ দেখেনি তাকে ৷ কেবল মুখে মুখে কথা ফিরতে ফিরতে তা বিশাল কলেবর ধারণ করেছিল ৷ সময়সুবিধে মতন তার মৃত্যুদিনটা পালটাতে থাকত ৷ শীতে প্রসঙ্গ উঠলে বলত, ‘এই রকমই একটা শীতের রাতে’ বসন্তে বলত ‘এমনই ঠিক দোলের আগের দিন...’, বর্ষায় তো কথাই নেই, যেমন আমিও বলেছিলাম ৷ এমনকি দরকার মতন তার হস্টেলও বদল হত, আর ঘর তো বটেই... ৷
তবে পুল্টিদি একবার কাকে যেন একটা কথা বলেছিল, সেটা পরবর্তী কালে খুব পপুলার হয়ে গেল ৷ আমাদের হস্টেলের পুরোনো অ্যাকাশিয়া গাছে, একটা ছোট্ট পাখি ডাকত, এখনও ডাকে ৷ মিহিন গলায় একেবারে ঘুঙুরের ডাক ৷ খানিক থেমে থেমে, যেন তাল দিচ্ছে ক’টা ঘুঙুরের থোকা বাজিয়ে, তাও আবার অন্ধকারে বসে ৷ অর্থাৎ দেখা তো যেতই না, আর দিনের বেলায় শোনাও যেত না ৷ নাকি বাড়তি শব্দে চাপা পড়ে যেত সেই ডাক, কে জানে! পুল্টিদি হঠাৎ বলে বসল, ওটা নাকি পাখির ডাক নয়, ওটা ছন্দা নন্দীর পায়ের নূপুর ৷ ও কিনা খোঁড়া ছিল, তাই তালটাও ওরকম ঝোঁক দিয়ে পড়ে, এক পায়ে ঝুম ঝুম! বোঝ ৷
পরবর্তীকালে যে-ই শুনেছে ওই ডাক, তাকেই কান পেতে শুনে দু’বার ভাবতে হয়েছে কিন্তু! সত্যি আমাদের বালিকা বয়সে ওই পাখির ডাকটা শুনলে গা-টা একটু কিন্তু শিরশির করত ৷ অথচ কেউই আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন তুলত না যে, যে মেয়ে ন্যাতাপ্যাতা সাদা ফ্যাকাশে শাড়ি ছাড়া পড়ত না, কালো ফিতে দিয়ে শক্ত বিনুনি, চোখে চশমা, ছিট কাপড়ের ব্লাউজ, হিল লাগানো স্পেশাল বুট জুতো—সে কেন হঠাৎ পায়ে নূপুর পরে ঝমঝমিয়ে চলতে যাবে! যাবে না, তবে গল্পকে তো অলি-গলি পেরিয়ে চলতে হবে, তাই সে সরবে চলতেই থাকত... ৷
তা, সে যাই হোক, আমি তো বলে বসলাম তাকে খুব জানতাম ৷ আমাদের কালোর দোকান পর্ব শেষ হয়েছিল, সহদেবদার দোকানে গরম আলুর চপের জন্য অপেক্ষা করছি ৷ ভাজা হলেই ঠোঙায় ভরে মুড়ির সঙ্গে দেবে ৷ আমরা বেঞ্চে ল্যাজ ঝুলিয়ে বসে বসে তার জোগাড় দেখছি ৷ আমি ওইসব ভয়ানক ভয়ানক দুর্ঘটনার কথা, ছোট্ট ছেলেটার কথা, সর্বোপরি আমাদের মন খারাপের কথা এড়াতে, ওদের মন গড়া গল্প বলে ভয় পাওয়াব ভেবে নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে প্রথমেই শুরু করলাম—
‘ছন্দাদি তো বড়ো দুঃখী, একলা ছিল, বন্ধু টন্ধু ছিলই না ৷ ও-ই রুমমেট ৷ তার সঙ্গে যা হোক দু চারটে বাক্যালাপ আর গোটা দিন মুখ গুঁজে বাটিক ৷ পায়ের প্রবলেমের জন্য বিয়ে হয়নি, নাকি নিজেই করেনি কে জানে ৷ তবে আমরা যখন দেখেছি, বেশ বয়স হয়েছিল, বিএ-টিএ পাশ করে এসেছিল কিনা! তা বাদে ওর স্বভাবের জন্যও বুড়োটে দেখাত ৷ রোগাটে গড়ন, একটু বেঁটে, কালোর দিকেই গায়ের রং, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা ৷ সব সময় কী কারণে কে জানে, সাদা শাড়ি ছাড়া পড়তই না ৷ অন্তত আমি তাকে ধবধবে সাদা শাড়ি বাদে দেখেছি বলে তো মনে নেই ৷ কিন্তু সব থেকে মজার ব্যাপার হল, এত যার সাদাসিধে আটপৌরে সাজগোজ, তারও একটা দারুণ শৌখিনতা ছিল ৷ কোমরে বড়ো-সড়ো রুপোর ঝুমঝুমি দেওয়া অতিশয় বাহারে একটা চাবির রিং ঝোলাত সব সময় ৷ বেশ দু’তিন থাক দেওয়া, সুদৃশ্য কারুকার্যের ৷ ওটা নাকি ওর দিদিমা, না ঠাকুমার ছিল ৷ ছোটো থেকে মা তাকে কোমরে পরিয়ে রাখতেন, যাতে হাঁটাচলা করলে ঝুমঝুম শব্দ হয় ৷ সে সময়ে হাঁটার আরও বেশি অসুবিধে ছিল কিনা, যদি পড়ে টড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে টের পাওয়া যাবে ৷ ওই স্পেশাল জুতোও তো তখন তৈরি হয়নি! আমার অবাক লাগে, এখন যখন শুনি, ও পায়ে নাকি নূপুর পড়ত... ৷’
সহদেবদার আলুর চপ তখন রেডি, আমরা যার যার মুড়ির ঠোঙা হাতে, বেঞ্চ ছেড়ে রাস্তায় পা বাড়ালাম ৷ বুইয়া একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—‘হঠাৎ নূপুর পরবার কথা আবার এল কোথা থেকে?’
আমি ওকে আরও অবাক করিয়ে দিয়ে বললাম—‘কেন, শুনিসনি? গোটা আশ্রম চত্বরে সবাই তো শুনেছে সে শব্দ, এখনও শোনে... ৷ সন্ধের দিকেই বেশি শোনা যায়, এই ধর সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত..., এই সময়ের মধ্যে ৷ কলাভবন, কিচেনের পথ, হস্টেল, এই পরিধি ৷ ঝুম-ঝুম-ঝুম শুনিসনি কখনও?’
মন্দিরা একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিল, বলল—‘হ্যাঁ-হ্যাঁ শুনেছি তো? ক-ত শুনেছি! বুইয়া তুইও তো...,’ বলে কথাটা আর শেষ না করে, ফের বলল, ‘ঠিকই বলেছিস, রাতের দিকেই ৷ সত্যি, ও সময় তো পাখি ডাকে না! আমি ভাবি পোকা-টোকা হবে কোনও ৷’ আমি ওর কথাটা লুফে নিয়ে বললাম—‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, পো-কা! পোকা অমন মিহিন রিন ঠিন আওয়াজ করতে পারলে লোকে ঘরে ঘরে পোকাই পুষত!’ আবার আমি সেই পুরোনো চাল চাললাম, বললাম—‘তা ছাড়া সব সময় শুনতেও পাবি না, শুধু এই বর্ষাকালটা ৷ দ্যাখ, এই ব্রাহ্ম-পরিবেশেও অতৃপ্ত আত্মা-টাত্মা মানুক না মানুক, কেউ অবিশ্বাসও তো করতে পারবে না! প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আছে, সে যত বড়ো ব্রহ্মদত্যিই হোক না কেন—সববাই শুনেছে ৷ কীরে শুভ্রা? তুই তো দেখছি কোনও কথাই বলছিস না, শুনিসনি তুই?’
শুভ্রার আসলে ভয়ের চোটেই কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—এতক্ষণে কোনওক্রমে ঢোক গিলে, ভাঙা গলায় বলল—‘থাম না, থাক না যতরাজ্যের এসব বাজে কথা ৷ হ্যাঁ শুনেছি, কুমকুমদি বলেছিল ওটা পাখি ৷’ —‘হ্যাঁ, কুমকুমদি তো বলবেই, ও যেন চিনত না ছন্দাদিকে! তুই যা ভিতু, ‘ভ’ দিয়ে কথা বললেই তো তোর দাঁতকপাটি লাগে ৷ আসল কথাটা বললে ওকে তো তুই বাথরুমেও যেতে দিবি না—রুমমেট না তোর?’ শুভ্রা আর কোনও কথা না বলে সবার মাঝখানে গায়ে গায়ে লেগে হাঁটতে লাগল, মাটির দিকে চেয়ে ৷ যেন আশপাশে তাকালেও কোনও অশৈলী জিনিস চোখে পড়ে যেতে পারে ৷
আমার তো এমনিতেই কোনও ভয় ডর নেই জানিসই ৷ পাঠভবনে থাকতে আমাকেই ভূত বলতিস তোরা ৷ ফলে, আরও কী কী বলে, আরও-ও ভয় দেখাতে পারি তাই মনে মনে হাতড়াতে হাতড়াতে পুরোনো মেলার মাঠে নামলাম ৷ ওখান থেকে কোনাকুনি শর্টকাট করে, পাকা রাস্তায় পড়ে, ছাতিম তলা দিয়ে সোজা কিচেনের দিকে যাব ৷ তখন একেবারেই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল—বেশ ঘন অন্ধকার ৷ আকাশে মেঘ থাকায় চাঁদ-তারারও বালাই নেই, আর মাঠে তো বিজলি আলোও থাকত না ৷ ফলে মন্দিরা ঝোলা থেকে টর্চ বের করে পায়ের কাছে দুর্বল একটা আলো ফেলতেই, বুইয়া বলল—‘এই অন্ধকারে মাঠ ডিঙিয়ে যাবার দরকার কী? চল না, রাস্তা দিয়ে ঘুরে যাই?’ শুভ্রা সঙ্গে সঙ্গে বলল—‘চল, চল, রাস্তায় আলো তো আছে ৷ আমাদের অত তাড়া কীসের?’
আমি জানি ভয়ে ওর একা পেছন ফিরে ঘুরে দাঁড়াবারও ক্ষমতা নেই, তায় হাঁটা দেওয়া! তাই কথা চাপা দিয়ে প্রশ্ন করলাম—‘বুইয়া, তুই না বলছিলিস কী সব, শ্রাদ্ধ, পিন্ডির কথা? তা, ছন্দাদি তো সাদা সিধে হিন্দু বাড়ির মেয়ে, ওর বাড়িতে নিশ্চয়ই সে স-ব ব্যবস্থাই হয়েছিল? অপমৃত্যু বলে কথা—তা—তাহলে, তার আত্মা কেন শান্তি পেল না রে? সবাই শোনে, সবাই দেখে...!’ বুইয়া ঘাবড়ে গিয়ে বলল—‘আমি বলিনি, শুভ্রা বলল ৷ ওকেই জিজ্ঞেস কর না?’ মন্দিরা সে প্রশ্নে না গিয়ে খুব ধীরে জিজ্ঞেস করল—‘দেখে মা-নে?’ শুভ্রা প্রায় কান্নার গলায় কাতরে বলল—‘চুপ করবি? আমার আর ভাললাগছে না ৷ ঘাট হয়েছিল তোদের সঙ্গে আসার... ৷’ শেষের দিকে ওর গলা প্রায় বুজে আসছিল ৷ আমিও ‘ঢের হয়েছে’ বলে তখন থেমে যেতে পারতাম, কিন্তু আমার সে সময় কেবল ভয় দেখানো না, গল্প বলাও ভর করেছে যে! ফলে, নির্বাক মঞ্জরির দিকে চেয়ে বললাম—‘কী রে, সবাই কী দেখে বল না তুই? জানিস তো?’
মঞ্জরি লাঠি না ভেঙে সাপটি মেরে ফেলে বলল—‘জানি, কিন্তু দেখি তো নি! তুই-ই বল না?’
আমরা তখন মাঠের মাঝামাঝি পেরিয়ে গিয়েছি, সামনেই পাকা রাস্তা, আলোও দেখা যাচ্ছে বুঝি বা, দু একটা সাইকেল গেল ৷ গন্তব্য প্রায় এসে যাচ্ছে দেখে মরিয়া হয়ে বললাম—‘হাঁটা-চলার অসুবিধে থাকবার দরুন, আর সঙ্গীসাথিও তো ছিল না কোনও, তাই এই রঞ্জনী-টঞ্জনি বা ত্রয়ী যাবার হলে, একা একা রিকশা করে যাতায়াত করত, আর সেটা যেত বেশ ঘন-ঘনই ৷ ওই রুপোর চাবির রিঙের মতন এটিও ওর আর এক শৌখিনতাই ছিল ৷ যে দুই শৌখিনতার জেরে এখনও এ এলাকার মানুষ তাকে ভুলে উঠতে পারছে না ৷ বেচারা! বঞ্চিত একাকী জীবনের সব চাইতে মূল্যবান, মহার্ঘ্য ক’টা মাস এখানেই ওর কেটেছিল কিনা, ফলে ও-ই বা সে মায়া কাটিয়ে যায় কী ভাবে? এখনও এই বর্ষাকালে, মানে এই জুলাই-অগস্টের সন্ধেতে অনেকে দেখেছে, ফাঁকা নির্জন পাকা রাস্তায়, কলাভবনের দিক থেকে একটা রিকশোয়, একা-একা একজন সাদা ধবধবে শাড়ি পড়ে টান টান হয়ে বসে রঞ্জনীর দিকে চলে যাচ্ছে ৷ অনেকে আবার এ-ও বলেছে যে এখানকার দস্তুরে মাথা হেলিয়ে নাকি বলে—কী-ই, ভা-লো...? সেটা জানি না, ও সব কল্পকথা, তবে বাকিটা না মেনে উপায় নেই, কারণ তাহলে যারা বলেছে, তাঁদেরও না মানতে হয়!’
পাকা রাস্তায় উঠতে আমাদের আর কয়েক মিটার মাত্র বাকি, আলো ফেলে ধীরে ধীরে হাঁটছিলাম তো! কেউ আর তখন কোনও কথা বলছিল না ৷ মনে হচ্ছিল সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে আছে, কতক্ষণে পিচ রাস্তায়, ল্যাম্পপোস্টের তলায় পড়বে ৷ আমারও মিশন সাকসেসফুল, নিশ্চিন্তে গুনগুনিয়ে গান ধরলাম ‘মোর ভাবনারে, কী হাওয়ায়, মাতালো ও-ও-ও’ ৷ এমন সময় মঞ্জরি, সহসা হ্যাঁচকা টান দিয়ে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল মাঝপথে, সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও ৷ আমিই বুঝি গল্পের ঝোঁকে আর গানের তালে ঠিকমতন ঠাহর করিনি, বাকিদের কিন্তু আগে ভাগেই নজরে এসেছিল—এতক্ষণে আমিও দেখলাম ৷
কলাভবনের সামনের রাস্তায় নন্দন পেরিয়ে রবীন্দ্রভবনের সামনে দিয়ে, বর্ষা ভেজা, ব্যাঙ ডাকা, মিটিমিটি বিজলি বাতি জ্বলা নির্জন কালো রাস্তা দিয়ে, একটা মাত্র রিকশ ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে ৷ তখনও আবছা আলোয় সওয়ারি বা চালকের অবয়ব দৃষ্টিগোচর হয়নি, কিন্তু যেটা স্পষ্ট কর্ণগোচরে আসছে সেটা হল আমাদের সবার পরিচিত সেই পোকা, পাখি, নূপুর বা রুপোর চাবি রিঙের হালকা ঝুম ঝুম শব্দ...! একই তালে, একই ছন্দে, ফিকে থেকে গাঢ় হয়ে এগিয়ে আসছে সামনের দিকে—তালে তালে, ঝু-ম, ঝু-ম-ঝু-ম...!
অন্যদের কথা বলতে পারব না, কিন্তু আমি একেবারে অবাক বিস্ময়ে, মাটিতে পা গেঁথে হাঁ করে দাঁড়িয়েছিলাম ৷ ততক্ষণে রিকশাটাও ছাতিমতলা ছাড়িয়েছে—একেবারে আমাদের কাছাকাছিই ৷ আমি হতভম্ব হয়ে স্পষ্ট তখন দেখলাম, ধীরে ধীরে প্যাডেল করা কালো কালো রোগা পটকা একটা অচেনা রিকশাওয়ালার পেছনে টান টান হয়ে বসে আছে, ধবধবে সাদা শাড়ি পড়া, স্থির একাকী এক মহিলা ৷ বসে থাকবার দরুন তার খর্বাকৃতি শরীর বোঝা যাচ্ছে না, রাস্তার বিজলি আলোতে, শ্যামলা কৃষ্ণকায়া মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে ৷ কেমন নিদারুণ বিষন্ন ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশ, পরিচিত গাছপালা, প্রিয় পরিবেশ, মায়াময় এই প্রকৃতি দেখতে দেখতে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে... এতকালের কিংবদন্তী, আমার সদ্যবলা গল্পের দুঃখী নায়িকা... ৷ এরপর মন্দির পেরিয়ে এগিয়ে যাবে, পোস্ট অফিসের সামনে দিয়ে বাঁ দিকে ঘুরে রঞ্জনীর দিকে... ৷
আমি, মনে হচ্ছিল মাটিতে ঢুকে যাচ্ছি, নাকি বরফে জমে যাচ্ছি ৷ অথবা হার্ট ফেলই করেছি, বেঁচে নেই বোধ হয়—হাত পা তো নাড়বার প্রশ্নই নেই কোনও—এ-ও কী সম্ভব!
কাঁচা নরম মাটির মধ্যে বরফের পা গেঁথে, নিষ্পলক দৃষ্টিতে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে, মৃতবৎ অনন্তকাল দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই ৷ রিকশাটা একদম আমাদের সামনে দিয়ে ধীর গতিতে ঝুমঝুম শব্দ তুলে ক্রস করে যেতে যেতে, পেছনে বসা শুভ্রবসনা, একাকী সওয়ারিটি সামান্যক্ষণের জন্য, বিষন্ন চিত্তে তার মায়াময় আকাশ বাতাস পর্যবেক্ষণ স্থগিত রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে, অন্ধকারে বজ্রাহত একদল কিশোরীকে দেখে হঠাৎ ঘাড় হেলিয়ে বলল—‘‘কী-ই-ই, ভা-লো-ও-ও-ও...?’’
পাশে তখন কীসের যেন আর্তনাদ, ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর, আরও কী, কী যেন সব... ৷ আমি সেদিকে নজর না দিয়ে ঝাপসা চোখে সামনের দিকে চাইলাম ৷ চাকায় ঘণ্টা বাঁধা রিকশাটা টুং টাং শব্দ করে তখন তো মন্দির পেরিয়ে আরও এগিয়ে যাচ্ছে ৷ পেছনের সীটে বসা হালকা-রঙা শাড়ি পরিহিতা, ফর্সা লম্বা, মোহময়ী সুন্দরী, ইংরিজি ডিপার্টমেন্টের সুহৃতাদিও চিরাচরিত সৌজন্যমূলক প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েই আবার আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণও করছেন—কেবল আমি, অকস্মাৎ সংবিৎ ফিরে পেয়ে, চিৎকার করে, অগ্র-পশ্চাৎ না দেখে, খানা-খন্দ পেরিয়ে যেদিকে চোখ যায় ছুট দিলাম, সঙ্গে ‘নীলাঞ্জনা, দাঁড়া দাঁড়া’ বলে মঞ্জরিও... ৷
বলতে গেলে জীবনে ওই আমার সত্যিকারের প্রথম ভয় ৷ তার আগে ভয় বলে ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হত না, তাই বোধহয় ঈশ্বর মনগড়া একটা অহেতুক ভয় দেখিয়ে, ভয়ের অনুভূতিটা চিরতরে আমার মাথায় গেঁথে দিলেন ৷ মঞ্জরি, তোর মনে পড়ছে তো?’’ মঞ্জরি মাথা নাড়ল, তার সব মনে আছে ৷
‘‘এমনকি পরের দিনের ঘটনাও মনে আছে, শিশিরদা ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন তোকে ৷’’
—‘‘হ্যাঁ, ডেকে পাঠিয়ে গোটা ঘটনাটা শুনে খুব হেসেছিলেন ৷ তারপর কেউ এলে, নিজেই আবার বলতেন সে গল্প ৷ ক্রমশ ওটা সত্যিকারের একটা গল্পই তৈরি হয়েছিল ৷’’
—‘‘শুভ্রাটার অবস্থা খুব খারাপ হয়েছিল—এমনিতেই দুর্বল চিত্ত..., কেঁদে কেটে, ভির্মি খেয়ে, নালিশ করে..., ও তো বাড়িই চলে গেল! নেহাত প্রাণ হাতে আমার ওই দৌড়টাও দেখেছিল বলে রক্ষে, তা না হলে, আমাকে জেলে ঢোকাত—উফ!’’
গার্গী বলল—‘‘সত্যি, তোমাদের স্টকে কত গল্প...দারুণ! মমো? তুই তো বলিসনি কখনও এটা?’’
মঞ্জরি বলল—‘‘আগে আমি বলে দিলে, এ ব্যাটা তাহলে কী বলত? তাছাড়া আমি এত ভালো করে বলতেও পারতাম না ৷ আমি তো ছিলামই ওই সময়—তাও যেন শুনতে শুনতে কেমন কেমন লাগছিল..., উফ বাবা! পারেও বটে নীলাঞ্জনাটা ৷ সুহৃতাদিকে কোন আক্কেলে যে ছন্দা নন্দী দেখে, সবাই মিলে দাঁতকপাটি লাগালাম, সত্যি!... নে, এবার কেতোর টার্ন, ভালো বলতে না পারলে ফাইন হবে, নে ওঠ!’’
কেতকী কম্বল-টম্বল গায়ে মাথায় ভালো করে টেনে মুড়িসুড়ি দিয়ে বলল—‘‘আগেই নিয়ে নে ফাইনটা ৷ আমি বলতে টলতে পারব না ৷’’
—‘ইশ রে, হাঁ করে ইল্লি, তুই-ই তো তুললি বায়নাটা ৷ এখন আমরা সবাই মুখে ফেনা তুলে ভ্যাজর ভ্যাজর করলাম, আর তুই শুনে শুনে মৌতাত করলি, ওঠ বলছি?’’
—‘‘আরে-এ-এ! বল বল বললেই কি বলা যায়! আমি জানতে চাইলাম, ভূত, প্রেত, অশরীরী—এসব তো ছাড়, একেবারে ছেড়েই দে ৷ কিন্তু সে সব ছাড়াও ভয় মানুষ পায় কী করে, সেটা তোদের থেকে একবার শুনব ৷ শুনে দেখব, এরকম অভিজ্ঞতা আমার ইহকালে কখনও হয়েছে কি-না? ভয় তো পাইনি, কদাচ নয় ৷ ভেবেছিলাম একদম একই অভিজ্ঞতায় দু’জনের মনে, দু’ রকম রি-অ্যাকশান হয় কিনা ৷ দেখলাম দুর্ভাগ্যবশত সেরকম অভিজ্ঞতাও হয়নি ৷ আমার প্রিয় বন্ধু, বেস্টফ্রেন্ডরাও আমাকে সে অভিজ্ঞতায় শামিল হওয়া থেকে চিরকাল বঞ্চিত করে রেখেছে—তাহলে আমি কীসের গল্প বলব? কোন অভিজ্ঞতার?’’
—‘‘মারব থাপ্পড়, এখানে আসবার কথা ভাববার আগেই, প্রথমে তোকে জানাইনি? অকৃতজ্ঞ!’’ মঞ্জরি ওর কম্বল টেনে নিয়ে চ্যাঁচাচ্ছিল ৷ —‘‘হ্যাঁ, এখানে সঙ্গী করেছিস, এবার ফিরে গিয়ে না হয় কৃতজ্ঞতাবশত ধুঁধুলকোটার বিভীষিকাময় রাতের অভিজ্ঞতার ঘটনা জাঁক করে সবাইকে বলব—তোরাও শুনতে আসিস ৷ কিন্তু কালোর দোকানে আর রঞ্জনীতে যাবার সময় তো ডাকিসনি!’’
—‘‘বেশ করেছি ডাকিনি ৷ বিশ বছর আগেকার কাসুন্দি ঘাঁটতে বসেছে, বদমাস... ৷ ঠিক আছে, তুই এই ট্রিপের গল্পই বল ৷ মিথ্যে কথা বলতে, আর বানাতে তো ওস্তাদ ৷ দেখা না দেখায় তোর কী যায় আসে রে? তুই আগাম জঙ্গলের বিভীষিকাময় রাতের গল্পই বল ৷ নয়তো মার খেয়ে আজ রাতেই মরবি আমাদের হাতে ৷’’ নীলাঞ্জনা ঠেলেঠুলে ওকে কোনওমতে বসিয়ে দিল বলিস ঠেস দিয়ে ৷
—‘‘অপঘাতে?’’
‘‘হ্যাঁ, অপঘাতে ৷ চুপচাপ শুরু কর ৷’’
—‘‘কী বিপরীতার্থক শব্দ! ‘চুপচাপ গল্প বল ৷’ আচ্ছা বেশ, কটা বাজে? পৌনে আট? ঠিক আছে, আটটায় গল্প শেষ করে খাব ৷ মোতিলালজিকে বলে রাখ ৷’’
মোতিলালজির কথা বলতে না বলতেই দরজার সামনে সে নিজেই এসে হাজির ৷ আর কিছু লাগবে কি না, চা বা কফি, তা বাদে রাতের খাবার কখন দেবে?
মেয়েরা জানিয়ে দিল, এখন আর চা কফি খেলে রাতে ঘুম হবে না, সারাদিন কতবার যে খেয়েছে! রাতে সাড়ে আটটা নাগাদ খাবার দিলেই হবে ৷ কাল তো আবার সকাল-সকালই রওনা, অনেকখানি পথ..., কী হচ্ছে ডিনারে?
মোতিলালজি বলল—‘‘বহৎ আচ্ছা, তেমন আর কী ৷ এই, রুটি, ডাল, ভাজি, সুজি কা হাল...’’ ৷ কথার মাঝে ফটকের বাইরে একটানা সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বাজনা চলতে থাকায়, হঠাৎই ভুরু কুঁচকে, অর্ধসমাপ্ত মেনু বলে, বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়েই গেল একেবারে, আর তার পেছন থেকে ওর মেয়েটিও ৷ গতকাল থেকে বার কতক দেখেছে ওকে ৷ বাবাকে রসুইঘরের ভেতরে বোধহয় সাহায্য করে, তবে বাইরে না ৷ এমনকি জল, চা বা এটা সেটা দিতে নিতেও বার বার ওই মোতিলালজিই আসে—মেয়েটিকে কখনও পাঠায় না ৷ এটা তো সেক্ষেত্রে অতিথি-শালা, হাজার রকম লোকজন আসা-যাওয়া করে, বাবা বোধহয় চায় না, মেয়ে চা জল দিতে এসে তাদের খপ্পরে পড়ে ৷ ওদের কোয়ার্টার কি পেছনে না পাশে, ঠিক জানে না ৷ পরিবারের আর কাউকেও দেখেনি—এক ওই মেয়ে ৷ এখানকার আর্মি স্কুলে পড়ে বোধহয়! সব সময় একই ইউনিফর্ম, নীলচে কামিজ, সাদা দুপাট্টা ৷ অবশ্য দেখেছেই বা কত! কাল রাতে হয়তো একবার, আর আজ সন্ধেয় বার দুয়েক ৷ না, আজ যখন ওরা দুপুরে পিকনিকে যাচ্ছিল, তখনও ছাতের আলসেতে দেখেছে ৷ মিষ্টি মেয়েটা, ভদ্র... ৷ তবে, বয়ফ্রেন্ড টয়ফ্রেন্ড আছে বোধহয়, সাইকেলের ঘন্টি বাজায়, আর বাবা তাতে তিতবিরক্ত হয় এবং কন্যা হয় চপলা... ৷
কেতকী বলল—‘‘আমি ধুঁধুলকোটা জঙ্গল পর্যন্ত যাচ্ছি না, এখানের গল্পই বলছি ৷ এ বাড়ির ৷ মঞ্জরি, মালতীমাসির সেই বন্ধুর নাম কী ছিল রে? যে এ বাড়িতে থাকত, পাশে..., খুব বন্ধু?’’
—‘‘কুসম ৷ তার সাথে লতা পাতা আরও কিছু ছিল ৷ বালা বা কুমারী, সব শেষে দ্বিবেদী—কেন?’’
—‘‘এমনি ৷ আর কবে মারা গিয়েছিল? কী হয়ে?—অসুখ?’’
—‘‘কবে, বলতে পারব না ৷ মায়েরা আর তখন এখানে থাকেন না ৷ দাদু বদলি হয়েছিলেন কোথায় যেন ৷ মা কলেজে, মণিমাসিও বোধহয় ৷ আসলে সদ্য সদ্য খবরটা পায়নি তো! হয়তো এক দু বছর পর, তা-ও, এর তার থেকে ৷ মনে হয় বিয়ে দিয়েছিল এদিকেই কোথায় যেন—একদম অপছন্দের বিয়ে ৷ খুব অল্পদিন পরেই মারা যায় ৷ যতদূর জানি বাচ্চা হতে গিয়ে ৷ আমি ঠিক জানি না রে, মা-রাও জানেন কিনা সন্দেহ ৷ তা, তোর অত কথায় দরকার কী? যা ইচ্ছে দে-না নাম, মীনাকুমারী, মধুবালা... ৷ অসুখও তাই, যক্ষা, পিলিয়া, দিল কী বিমারী... ৷ ঢের ভ্যানতাড়া করেছিস, নে, শুরু কর-ওয়ান, টু, থ্রি’’—
কেতকী শুরু করল—‘‘আমি বেশি আগের কথায় যাচ্ছি না, দিল্লিবাস, ট্রেন জার্নি, এখানে আসবার প্ল্যান প্রোগাম, এসব টাটকা ঘটনা, সবাই জানে ৷ যা কেউ জানে না, এ বাড়ির ইতিহাস, তার নানান ঘটনা, তৎসহ দুর্ঘটনা—আমি সে কথাই বলছি ৷ এমনকি এ বাড়ি তৈরি হয়েছে কবে, কী কারণে, কে প্রথম থেকেছে, কী উদ্দেশ্যে—তাও না বলে, সরাসরি ধর ঊনপঞ্চাশ থেকে ছাপান্ন সাতান্ন সাল পর্যন্ত—এই সাত আট বছরের বাসিন্দাদের কথাই বলছি ৷ বিশেষ করে তার একটি বাসিন্দা—যাকে নিয়ে আজকের গল্প’’—
‘এই বড়ো সাহেবি বাংলো, যার নাম রবার্ট জনস রেসিডেন্সি, বা শর্টে রেসিডেন্সি বাংলো—উনিশশো পঞ্চাশের মাঝামাঝি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দুই দেশি কর্মচারীর বাসস্থানে পরিবর্তিত হয় ৷ যার একটি অংশে মঞ্জরির দাদু কর্নেল চক্রবর্তী আসেন বদলি হয়ে, অন্যদিকে তাঁর সহকর্মী কর্নেল বা যাই হোক—দ্বিবেদী ৷ বাইরের ফলকে ঘনঘটার যাই নামই থেকে থাক না কেন, ততদিনে বিভক্ত এই দেশি বাংলোর নাম হয়েছে, একুশ আর বাইশ নম্বর কর্নেল রোড ৷ মালতীমাসিদের পারিবারিক বন্ধু কুসুমলতারা থাকত গায়ে লাগানো বাইশ নম্বরে ৷ তবে এত গায়ে গায়ে, এত পাশাপাশি থাকলেও, এই দুই পরিবারের আদব কায়দা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ৷ এ বাড়ির কথা তো আমরা জানিই ৷ দিদিমা অর্গান বাজিয়ে গান গাইতেন, মুক্তোর মালা, জর্জেট শাড়ি পরে পার্টি যেতেন, তিন মেয়ে শান্তিনিকেতনের হস্টেলে—ছুটিতে আসে ৷ তখন রোজ গান নাটক পিকনিক ৷ আর ও বাড়িতে দাদা দিদি পিসি কাকা—কুসুমরা চার ভাই বোন ৷ উত্তরপ্রদেশের রক্ষণশীল পরিবার, তায় ব্রাহ্মণ ৷ তা, তাদের রহন-সহন তো আলাদা হবেই ৷ তবে তার মধ্যেও ওদেরটা যেন আরও একটু বাড়াবাড়ি রকমেরই আলাদা ৷ খাওয়া, শোওয়া পুজো পাঠের রকমভেদ বোঝা যায়, কিন্তু তার ওপরেও ওদের ছিল ছোঁওয়া-ছুঁয়ি, জাতপাত ৷ ‘‘মেয়েদের উঁচু গলায় হাসতে নেই, গান তো নয়ই ৷ নাটক করে খারাপ মেয়েরা, নাচে কেবল পাগলেতে ৷’’ কত ছোটো বয়স থেকে কুসুম মাকে রান্নায় সাহায্য করত—সংসারের অন্য কাজেও ৷ আচার দিত, পাপড় বানাত ৷ তবু কুসুম ছিল একটু ভিন্ন প্রকৃতির ৷ কর্মপটু—সুশীলা তো বটেই, তার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক আধুনিক একটা চিন্তাবোধ ছিল তার, যা ওই পরিবারে অতিশয় বিরল ৷ তার অবশ্য সিংহ ভাগ কারণ—পাশের বাঙালি এই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা৷ পড়াশোনায় ভালো ছিল, উচ্চাশাও কিছু কম ছিল না, তবে সবচেয়ে আধিক্য ছিল বোধকরি তার রোমান্টিসিজমের৷ হৃদয়ভরা টলটলে কোমল সে প্রেম, পশু পাখি, প্রকৃতির প্রতি তো ছিলই, তা বাদে বাড়তিটুকু রাখা ছিল গোপনে৷ ফলে যথা সময়ে, ‘এ প্রেম কুসুম যদি হত’ ভেবে, সে কুসুম প্রাণ হতে ছিঁড়ে লয়ে দুম করে, করে বসল তার চরণে দান ৷
ছেলেটি ওর চাইতে বছর দুয়েকের মাত্র বড়ো ৷ কানপুর আইআইটিতে সে বছরই ভর্তি হয়েছে ৷ কী ভাবে ভাব-টাব হল ঈশ্বরই জানেন—সেকেন্ড উইং-এর কমান্ডার যাদবের ছোটোভাই ৷ মালতীদেরও চেনা ৷ রোগা পাতলা, মুখ চোরা, ছোটো শহরের মেধাবী ছাত্র যেমনটা হয় আর কী! তবে, এমন ধারা ছেলেরা পাগলের মতন মুখ গুঁজে পড়াশুনো ছাড়া, প্রেমেও যে এমন পাগল হয়, সে ধারণাটি মোটেই ছিল না ৷ ঘটনার সূত্রপাত বোধকরি আরও বছর দু’য়েক আগেই—অর্থাৎ স্কুল ফাইনাল আর হায়ার সেকেন্ডারির পুণ্যতিথি থেকে ৷ কোচিং ক্লাসে যেত-টেত বোধহয়...! আমি অবশ্য যে সময়কার কথা বলছি, সেটি তখন প্রায় পরিপক্ক স্টেজে, অর্থাৎ কানাঘুষো থেকে লোক জানাজানি পর্যন্ত ৷
সেকালে, এরকম পরিবারে, গৃহস্থবাড়ির মেয়ের প্রেম করা নয়, কেবল প্রেমে পড়বারই আর এক নাম ছিল ‘মুখে চুন কালি’ ৷ তদুপরি সে যদি হয় ভিন্ন জাত ৷ হলদোয়ানির দ্বিবেদী—কংসরাজের বংশধর পরিবারের কাছে, বিহারের যাদবরা হল প্রায় ডোম মেথরের তুল্য—জলচল যদি বা হয় জানি না, কিন্তু বিবাহ তো চোদ্দ পুরুষের নরক-টরক আরও কী কী বাস ৷ পাতকের পাতক, মহাপাতক যাকে বলে ৷ কুসুমের হায়ার সেকেন্ডারির আর তখন মাত্র কয়েক মাস—ব্যাস, হয়ে গেল কুসুমলতা গৃহবন্দি ৷ স্কুল তো বন্ধই, কোচিং, টিউশন—কিচ্ছু না ৷ ফটকের বাইরে, ছাতে ওঠা মানা—থাকো বসে ঘরের মধ্যে ৷ বাড়ির বড়ো মেয়ে, সে কিনা—ছিঃ, ছিঃ... ৷
অতঃপর সঙ্গে সঙ্গে কোনওমতে তড়িঘড়ি ঠিকুজি, পরিবারের লিস্টি আর মেমোরি স্টুডিয়োতে তোলা সাদা কালো ছবি নিয়ে চারিদিকে ঘটক ছুটল, যথাসম্ভব চুপি চুপি ঘরের বেড়াল পার করবার আকাঙ্ক্ষায় ৷ পেয়েও গেল সঙ্গে সঙ্গে ৷ ৷ পাত্র রেলের পাকা চাকুরে ৷ মোগলসরাইয়ে পোস্টিং, উন্নতির আশা না থাকলেও, একেবারে নিরাশাও বলা যায় না ৷ বড়ো পরিবার, উঁচু ঘর, তবে পাত্রপক্ষ পরীক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি নয়—কী হবে ঘোড়র ডিম ডিগ্রি নিয়ে, ছেলে ওধারে হাত পুড়িয়ে রান্না করে খাচ্ছে, ইত্যাদি... ৷
এপক্ষ হাতে চাঁদ পেল, ওপক্ষ চাঁদি ৷ নিঃশব্দে পোঁটলা-পুঁটলি বাঁধা ছাঁদা করে দেশের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে—হয়ে গেল মুখ রক্ষা ৷ পরীক্ষা দেওয়া হল না, পড়াশুনো শিকেয়, চির পরিচিত গাউটগঞ্জ থেকে চির বিতাড়িত, বিধ্বস্ত কুসুমকলিটি, উগ্র পুরোনোপন্থী-নিম্নবিত্ত, বিশাল পরিবারের মেজো বউ হয়ে সংসার করতে লাগল, কানপুর থেকে সামান্য দূরত্বে মোগল-সরাই জংশনের এক চিলতে রেলওয়ে কোয়ার্টারে...!’—এত পর্যন্ত বলে, কেতকী ঘরের ছাতের দিকে মুখ তুলে, গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল, ‘‘বাবুল মোরা, নাইহার ছুটই যায়... ৷’’ এবং গান সামান্য থামতেই তেরিয়া হয়ে নীলাঞ্জনা বলল—‘‘এই তোর ভয়ের গল্প? তার জন্য নাম ধাম, মৃত্যুর কারণ—কত শত ডেটা কালেকশন! এ তো বিফল প্রেমের গল্প, তাও থার্ড গ্রেড ৷ গাঁয়ের ঘরে ঘরে আকছার এমনটাই হয় ৷ যে কোনও মফসসলের শহরে গিয়ে দশজনকে জড়ো করে একটা প্রেমের গল্প বলতে দে, ঠিক এই গল্পই বলবে ৷ তুই ফাইন দে, আমরা আর শুনব না ৷ মঞ্জরি হাই তুলছে, গার্গী ঢুলে পড়ছে, আর আমার রা-গে গা পিত্তি জ্বলছে... নচ্ছার একটা ৷’’
কেতকী হাঁ হাঁ করে চ্যাঁচামেচি জুড়ল ৷ ‘‘আরে, আসল ব্যাপারটা তো আসেইনি, আগেই বাগড়া দিয়ে আমার মুডটা খিঁচড়ে দিলি ৷ এ তো শুধু প্রেম পরিণয়, পরিণতিটা তো শোন?’’
গার্গী ওদের কথায় হাসচ্ছিল, বলল—‘‘বলো, বলো ৷ সত্যি শেষ পর্যন্ত না শুনলে গল্পের মোচড়টা পাবে কী করে? তা বাদে ডিনার হতে এখনও ঢের দেরি ৷ শেষ করো তুমি ৷’’
কেতকী ‘‘ওহ, গুড’’ বলে আবার শুরু করতেই, মঞ্জরির চোখ গেল দরজার সামনে দাঁড়ানো মোতিলালজির মেয়ের দিকে ৷ চৌকাঠে ঠেস দিয়ে টলটলে চোখে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে কেতকীর দিকে ৷ কতক্ষণ ধরে ঠায় দাঁড়ানো, কে জানে! আর বাংলা কথাও কী বুঝছে সে-ই জানে ৷ তবু হাতের ইশারায় ঘরে আসবার জন্য ডাকল মঞ্জরি, চেয়ারটা দেখিয়ে বসতেও বলল ৷ আগে খেয়াল করেনি, ইশ... ছেলেমানুষ...! মেয়েটি সামান্য ইতস্তত করে ধীর পায়ে, নিঃশব্দে বসল এসে কোণের চেয়ারটায় জড়োসড়ো হয়ে ৷ তারপর নিম্নপলক চোখে, একাগ্র মনে গোগ্রাসে যেন গিলতে লাগল কেতকীর গল্প ৷
কেতকী বলছিল—‘‘ইতিমধ্যে কর্নেল চক্রবর্তী তো বদলি হয়েছেনই, দ্বিবেদীও হুড়মুড়িয়ে বদলি নিলেন, গাউটগঞ্জের কানাঘুষো গুজব রটনার থেকে বহু দূরে, হায়দ্রাবাদ না কোথায় যেন ৷ আর সে বছরই ভাদ্র-আশ্বিন মাস নাগাদ, কাছাকাছি কোনও এক ছোট্ট হেলথ সেন্টারে মৃত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে সেপ্টোসিমিয়ায় মারা যায় আঠারো বছরের কুসুমলতা ৷
গল্প সেখানেই শেষ হতে পারত, তবু হল না ৷ কারণ, সদ্য যুবক রমেশ যাদবের যখন কর্ণগোচর হল, কুসুমলতাটির প্রতি অন্যায় অবিচারের ব্যবস্থা, তৎক্ষণাৎ সে ফিরে এসেছিল গাউটগঞ্জ, কিন্তু ততক্ষণে তো তারা মেয়ে নিয়ে পালিয়েছে গাঁয়ের দিকে, এমনকি বিয়ে শাদির পর্বও সারা ৷
রাগে দুঃখে অপমানে, দু’দিন নাকি খিল তুলে যে ঘরে ঢুকেছিল রমেশ, তৃতীয়দিনে দরজা ভেঙেই সে ঘরে ঢুকতে হল পুলিসকে... ৷
এ তো গেল কুসুম কোমল, নবীন একটা প্রেমের মর্মান্তিক পরিণতি ৷ কিন্তু ওই যে অপমৃত্যু! রাগ, ঘৃণা অপমান বেদনা আর বিষাদভরা, দুঃখময়, অতৃপ্ত আত্মা—তার তো মুক্তি নেই! তাই সেই দায়বদ্ধ কিশোর-কিশোরী এখনও অপেক্ষা করে আছে, গাউটগঞ্জের কর্নেল রোডের আশেপাশে ৷ ভোর সকালে, ভর দুপুরে, সাঁঝের বেলায় নিরিবিলি নিঝুম বাইশ নম্বর বাড়ির সামনে ক্রিং ক্রিং করে সাইকেলের মৃদু শব্দ হলেই, চপল পায়ে ছাদে উঠে উঁকি মারে কিশোরী ৷ তেঁতুলতলা থেকে নিমেষে মিলিয়ে যায় দুটি ছায়া ৷ তালা মারা, নিরালা শূন্য বাড়ির ফটক, খুট করে আপনিই খুলে যায় সকাল বিকেল... ৷ রেসিডেন্সি বাংলো বদল হয় অফিসার্স মেসে ৷ অফিসার্স মেস বদলে হয় ট্রানজিট কোয়ার্টারে ৷ তারপর ট্রেনার্স হস্টেলে, অতঃপর নন অফিসার্স গেস্ট হাউস, কিন্তু কোনওটাই টেকসই হয় না তেমন ৷ হবে কী করে? এমন অপবাদের ভূত-বাংলায় চৌকিদার থাকবে না, কুক বা ব্যাটম্যানও না ৷ তাহলে ব্রিগেডিয়ার সাহেব করবেন টা কী? নিজে এসে তো আর অপবাদ ঘুচিয়ে বসতে পারেন না ডান্ডা নিয়ে ৷ তার চেয়ে বাড়ি ভাঙার স্যাংশন পেপারে সই করে দেওয়া হাজার গুণ নিরাপদ—ভেঙে চুরে হোক এখেনে অফিস বাড়ি বা যা হোক কিছু... ৷’’
কেতকীর গল্প শেষ হবার আগেই বাইরের রাস্তায় এমন মিহিন শব্দে সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ বেজে উঠল যে চারজনেই ঘাড় ফিরিয়ে চেয়ে, হেসে ফেলল শব্দ করে, এমনকি নীলাঞ্জনাও ৷ কেবল মোতিলালের মেয়ে, হাসলও না, ঘাড়ও ঘোরাল না ৷ ও কিনা এ শব্দে একেবারে অভ্যস্থ, প্রতিনিয়তই তো শুনছে, রাত দিন ৷ তা বাদে হাসতে যাবেই বা কেন, বাংলা বোঝে নাকি, যে ও গল্পের ক্রিং ক্রিং শব্দের তৎপর্য বুঝবে?
মেয়েটি গল্পের শেষেও কেমন ঘোরের মধ্যে যেন বসেছিল চুপ করে, কথাও বলছিল না, নড়াচড়াও না ৷ তা-ও ভালোই লাগছিল মনে হয়, সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক ৷ এমন নির্বন্ধব পুরীতে খানকতক ভিনদেশি দিদি বা আন্টি, হাসি ঠাট্টা করছে নিজেদের মধ্যে, খারাপ লাগবার কারণ তো নেই! মঞ্জরি জিজ্ঞেস করল যে, তারা সবাই ভয়ের গল্পের আসর বসিয়েছে—ভূতের ৷ তা, তারও কি এমন ভূতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঘটনা আছে নাকি মজুদ? তাহলে এবার সে-ও বলুক! ওরা সবাই হিন্দি জানে অল্পবিস্তর—বুঝতে পারবে ৷
সে তো পারবে, কিন্তু মেয়েটি যেন সব কথা বুঝে উঠতে পারল না, বলল, তাদের পরিবার বা স্বজনেরা মানে যে, সাত্বিক পবিত্র বাড়িতে ওসব ভূত—প্রেত কখনও ঢুকতে সাহস করে না ৷ তারা কিনা পুজো পাঠ করে, স্নান না করে রসুইঘরে ঢোকে না, এঁটো-কাঁটা, জন্তু-জানওর শুদ্ধ মনে আচার বিচার মেনে চললে ওসব অপদেবতার কোনও ভয় নেই, বরং তারাই ভয় পায় এঁদের ৷ তবে ভয়ের গল্প তারা যেমন সব করছিল, অল্পবিস্তর বাংলা জ্ঞান থাকবার ফলে, পুরোপুরি না হলেও, মোটামুটি বলা যায় পঞ্চাশ ভাগই হয়তো বুঝতে পারছিল সে, বাকিটা ধরে নিচ্ছিল আড়ে ঠাড়ে ৷ তা, এ ধরনের, সে রকম ঘটনাও তো মনে পড়ছে না তার ৷ আর ছোটোখাটো ভয় টয়—সে ছোটবেলায় গ্রাম দেশে থাকতে গেলে কে, না পায়, ওতে অতবড়ো গল্প হয় না ৷ কিন্ত... অন্য যে ভয়ের কথা—সে বললেও, তারা ঠিক বুঝতে পারবে কি? মানে নিজস্ব ভয়ের কথা? কারণ দু’ পক্ষের পরিবেশ, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ রকম ভিন্ন কিনা! তারা যেমন ছায়া দেখে, আলো দেখে, শব্দ পেয়ে ভয় পেয়েছে, তার নিজের সেসবে ভয় পাবার শৌখিনতা ছিল না ৷ সে ভয় পেয়েছে অন্যখানে, দারুণ ভয় ৷ বাপ, ঠাকুরদাকে ভূতের চেয়ে একশো গুণ বেশি ভয় পেত ৷ মা ঠাকুমা কাকা পিসি, এমনকি পাড়া প্রতিবেশীকেও ৷ এ যে কেমন ভয়ংকর ভয়, সে তারা বুঝবে না ৷ ভূত হয়তো ভয় দেখাবে, আর কিছু না ৷ কিন্তু এরা খতরনাক! শুধু ভয় না, তোমায় ভূত বানিয়ে ছাড়বে ৷ গার্গী বলল—তা ঠিকই ৷ শহরে-গঞ্জেও আসমান-জমিন ফারাক ৷—সে কি স্কুলে পড়ে? কোন ক্লাস...?
প্রশ্ন শুনে ঠোঁট চেপে ভারি মিষ্টি হাসি হাসল মেয়েটি ৷ শেষে বলল—সে নাকি অত কিছু ছেলেমানুষ নয় ৷ স্কুল শেষ হয়ে গিয়েছে ৷ এখন সে কলেজে ৷ প্রি-ইউনিভার্সিটি আর দু’ মাস পরেই ফাইনাল ৷
মঞ্জরি বলল—‘‘বাহ, তাহলে তো লেডি, বিগ গার্ল ৷ আর কদিন পরে গ্র্যাজুয়েশনও হয়ে যাবে ৷ নাম কী...?’’ মেয়েটি সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, যে, সে একটা গল্প বলতে পারে ৷ পুরো গল্প না, ওই উনি যেটা বললেন, সেটাকে একটু ঘুরিয়ে ৷ বলে কেতকীকে দেখাল ৷ অনেকক্ষণ ধরে শুনছিল কিনা, তাই তারও ইচ্ছে হচ্ছে ৷
কেতকী বলল—‘‘বলো না, বলো? আমরা মন দিয়ে শুনব ৷’’ শেষে আস্তে করে বলল—‘‘আর ফাইনও দিতে হবে না, তার আগেই আমরা গভীর নিদ্রায়... ৷’’
সবার খুকখুকে হাসির মধ্যে মোতিলালজির মেয়ে তার গল্প শুরু করে প্রথমেই বলল যে, মেয়েটিকে ঘরে বন্দি করে রেখে, চারিদিকে নিঃশব্দে সম্বন্ধ করে বেড়ানো হচ্ছিল, সে কথা একদম ঠিক ৷ কোথাও বেরোতে দিত না, উঠোনে না, ছাদে না, কুয়োতলায় না—কোথাও না ৷ পাশের চক্রবর্তী চাচারা বদলি হয়ে, তখন কেরালার ম্যাথু আংকলরা এসেছেন, তারা আবার খ্রিস্টান ৷ ফলে ওদিকের যাতায়াতেও প্রায় আগল তোলা ৷ এরকম সময়, এমনই এক মাঘমাসের শীতের সাতসকালে ঘটকমশাই এসে চুপি চুপি জানাল—বিয়ে পাকা ৷ পালটি ঘর, আঠাশ বছর বয়স ছেলের, পোস্টাপিসে চাকরি, ঝাঁসিতে বাড়ি, জমি-জিরেত, গোরু মোষও আছে ৷ চার ভাই, তিন বোন, সৎ পরিবার ৷ মেয়ে দেখে সময় নষ্ট করবে না, শুভস্য শীঘ্রম ৷ বিয়ে আর দশ দিনের মাথায়, ২রা ফাল্গুন... ৷
মেয়েটি শুনল সব কথা তার ছোটোবোনের থেকে, তবে কোনও উচ্চবাচ্য করল না ৷ পরদিন অতিকষ্টে একটা চিরকুটে তার প্রেমিকের নাম আর হস্টেলের বারোয়ারি ফোন নাম্বার লিখে, খবরটা স্রেফ জানিয়ে দিতে বলল কানপুরে ৷ কথাটা বলতে অবশ্য সামান্য সময় গেল, তবে কাজটা করতে কত যে হয়রানি! হাতের আংটি, কানের দুলও গেল তার সঙ্গে সঙ্গে—তবু গেল তো! তারপর তো খবর পাঠিয়ে অপেক্ষা আর অপেক্ষা ৷ কারণ সাত হাত ঘুরে কে যে ট্রাংকল করবে, তাকে তো জানেই না ৷ তার উপর আছে লাইন পাওয়া, এবং সর্বোপরি তাকে লাইনে পাওয়া ৷ তা সে যাই হোক, অন্য উপায়ও তো নেই ৷ সারাদিন কেবল বন্ধ ঘরে বসে বসে, আকাশ-পাতাল ভাবনা আর সাইকেলের ওই মিহিন শব্দের অপেক্ষা ৷ তারপর তো দিনের পর দিন যেমন যেমন কাটতে লাগল, মেয়েটির চঞ্চলতাও তেমন তেমন স্তিমিত হতে হতে প্রায় স্থির পর্যায়ে চলে গেল ৷ আর যেন সে পারছিল না এই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে ৷ তাই পঞ্চম দিনে, যার পরদিন কাকভোরে ওরা হলদোয়ানি রওনা দেবে, তার আগের সন্ধেতে, ওই কোণের ঘরে নিজের দোপাট্টাটা গলায় জড়িয়ে, সব অপেক্ষা, সব অপমান, সব হেনস্থার নাগালের বাইরে চলে গেল ৷’
সবাই বেশ স্মিত মুখেই শুনছিল গল্পটা, ভালোই তো ৷ কেবল কেতকী বলল,—‘‘ওহ, তুমি পালটে দিলে ব্যাপারটা, রমেশের বদলে, ওকেই মেরে দিলে একেবারে? তাও আবার বিয়ের আগেই...?’’ ও যেন ছেলেমানুষের বানানো গল্প শুনছে, তেমনই হালকা মেজাজে করল প্রশ্ন ৷
মেয়েটি চোখে বিদ্যুৎ হেনে, ঘাড় ঘুরিয়ে চমৎকার একটা ভঙ্গি করে বলল—‘‘রমেশ? কওন? ওহ, জওয়াহার?’’ বলেই একেবারে ফুলে ফুলে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকল শব্দ করে ৷ ‘‘উয়ো কিঁউ মরেগা? বড়া ইঞ্জিনিয়ার সাহাব ৷ আউর, খবর ভি তো মিলা নেহি থা! ক্যায়া করে বেচারা... ৷ বিচমেসে উয়ো লড়কীকি, আংগুঠী আওর কানকা বালি ভি গয়ি, সাথমে খবর ভি গয়া দরিয়ামে... ৷ নসিব...! আপ শাদীসে পহলী কি বাৎ বোল রহে হ্যায়? তো, উয়ো লড়কীকে লিয়ে শাদীকে বাদ আর পহলে কা ক্যায়া ফারাক? শাদী-বিয়া উনকে লিয়ে ক্যায়া, মওথ নহী থা? ঠিক হ্যায়, শাদী সে পহলেই কর লিয়া খুদখুশী ৷ অ্যায়সে, আপনা সফেদ দুপাট্টা লেকর, গলামে... ৷’’ মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে তীব্র রাগে, বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে, নিজের সাদা দোপাট্টাটা গলায় জড়ালো খানিক ৷ এমন উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল যে, ঠিকমতো জড়াতে পারছিল না গলাতে, কেবল দুর্বল, কাঁপা হাতে ঘোরাচ্ছিল চারিদিকে ৷ শেষে ক্লান্ত স্বরে বলল—‘‘ঠিক হ্যায়..., বাঁচত গয়ি আপনা জান লেকর... ৷’’ এত কথা বলে হঠাৎ ভুঁরু কুঁচকে কান পেতে যেন দূরে সাইকেলের মৃদু ধ্বনি শুনল সামান্য ক্ষণ—তারপর নিশ্চিৎ হয়ে, লাজুক হেসে বলল—‘‘লো, আ গায়া নওয়াব সাব... ৷’’ বলে তড়িৎ পায়ে এগোচ্ছিল, হঠাৎই আবার পেছন ফিরে তাকাল চকিতে—কারও পায়ের শব্দ? মোতিলালজি বোধহয় খাবার দিয়ে ডাকতে আসছে তাদের ৷ পাগলাটে, ক্ষ্যাপা সুন্দরীটিকে একটু উসকে দেবার জন্যই কেতকী আবার বলল—‘‘তা, জহর না রমেশ, সে তো বলছ মরেনি, তাহলে তার সাইকেলের ঘণ্টা কেন চারিদিক থেকে বাজে রাত দিন? সে কেন আসে, সে তো এখনও বেঁচে, জীবিত?’’
—‘‘হাঁ জিন্দা তো হ্যাঁয়, মগর ঘণ্টি শুননেকে লিয়ে মরনা জরুরি নহী হ্যায় ৷ কিঁউকি উয়ো লড়কি তো পড়ে হ্যায় উসকী আপনি খোয়ি হুয়ি দুনিয়ামে, যাঁহা উয়ো ক্রিং ক্রিং আওয়াজ হুয়া করতা থা, উয়ো মওসম, উয়ো খশবু, উয়ো প্যায়ার, উয়ো নফরৎ... ৷’’
প্রথমদিকে মজা করলেও, এখন সবারই কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল মেয়েটির হাবভাব ৷ গতকাল থেকে ঘরে ঢোকেনি তো ঢোকেইনি ৷ এদিক সেদিক থেকে কেবল দেখেছে আড়ালে আবডালে ৷ আর আজ একেবারে কেতকীর গল্প শুনে আত্মহারা! প্রগলভার মতন কথা বলে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই! নীলাঞ্জনা হাত দেখিয়ে অন্যদের থামতে বলে, একটু শক্ত গলায় বলল—‘‘ঠিক আছে, খুব ভালো হয়েছে ৷ বাবাকে বলো খানা লাগাতে, কাল সকাল সকাল উঠতে হবে তো?’’
গার্গী আবার একটু বেশি ভদ্র, বেশি নরম ৷ ফলে এই কঠিন কথাটা তাড়াতাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে, কোমল গলায় বলল—‘‘কাঁহা রহতে হো তুম? আভিতক তো তুমহারা নাম হী নহী বোলি, ক্যায়া নাম তুমহারা?’’ মেয়েটি কেমন অভিমানে ব্যথাতুর চোখে চাইল চারিদিকে, শেষে হাত তুলে পাশের বাড়ির দেয়ালটা দেখিয়ে বোঝলো তার বাসস্থান, তারপর সেদিকেই এগিয়ে গেল কয়েক পা ৷ যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে বলল—‘‘নাম? মেরা? নাম—মেরা কুমারী কুসুমলতা দ্বিবেদী... ৷’’ বলেই দুটো জোড়া খাটিয়া আর বেজোর খাটিয়ার মাঝে যে সামান্য ফাঁক, সেদিকে কোনও রকম ধাক্কা-টাক্কা না খেয়ে, অনায়াসে একেবারে হওয়ার মতন ভেসে গিয়ে, ওপাশের মোটা দেওয়ালের গায়ে যেন অদৃশ্য একটা ভেজানো দরজা আছে—তেমন ভাবে সেই দেওয়াল ভেদ করে, এতগুলো হতভম্ব মেয়ের সামনে সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেল ৷
রচনাকাল ২০১৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন