মিমি রাধাকৃষ্ণন
দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াতেই পিয়ালি একেবারে অভিভূত হয়ে গেল—কী অসাধারণ দৃশ্য! শাল মহুয়া পলাশ শিমুল ভরা উঁচু-নিচু এবড়ো-খেবড়ো দিগন্তবিস্তৃত শুকনো এলাকার ডান দিকে, বাঁধের জলের একটা বড়ো অংশ ঝিকমিক করছে, আর তারও পরে কেবল হালকা পাহাড়ের সারি... ৷ লাল মাটি, নীল উজ্জ্বল আকাশ, সোনালি রোদ্দুর, তার সঙ্গে ফুল-পাতা, হিম-টিম মেশানো সুগন্ধি স্বচ্ছ বাতাস, আহ... ৷ তাদের ‘নিরুপমা নিবাস’ বুঝি এত সুন্দর! ছোটোবেলায় তো মনে হত না ৷
আসলে জন্মাবধি শীতকালে, এই ‘নিরুপমা নিবাস’ ছাড়া তাদের আর কোনও গতি ছিল না বলেই হয়তো তেমনভাবে চোখ ভরে কখনও চেয়েই দেখেনি! সবাই কেমন দিল্লি আগ্রা বম্বে বেড়াতে যায়, বড়োদিনে চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেনে পিকনিক, পার্ক স্ট্রিটের আলোর রোশনি দেখে, কেক খেয়ে কত আমোদ..., আর তাদের আজীবন কেবল দুমকা ৷ তবে বড়ো হয়ে এটুকু অন্তত বুঝেছে যে তাদের মতন অমন একটা ছোটোবেলাও আর কারও ছিল না, আর সে-ও কেবল এই দুমকার জন্যই ৷ তাদের শিশুকাল, কৈশোর, যৌবন—সব যেন একটা ঝলমলে সুগন্ধি, খুশির রাংতায় মুড়ে রেখেছিল দুমকার এই ‘নিরুপমা নিবাস’ ৷
পিয়ালির দিদিমার ছিল মারাত্মক হাঁপের টান ৷ শীতকালে ধোঁয়া-ধুলোয় তিনি বড়ো কষ্ট পেতেন কলকাতায় ৷ তাই দাদু নগেন্দ্রচন্দ্র পাহাড়-পর্বত, নদীর খাত, জঙ্গল আর দূরের দৃশ্য সমেত এই এলাকা কিনে, স্ত্রীর নামে চমৎকার নিবাসটি বানিয়ে সেকালের বৃহৎ পরিবারের শীতকালে পশ্চিমের হাওয়া বদলের ব্যবস্থাটি করে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন ৷ পরবর্তীকালে দিদিমা এটি উপহার দেন তাঁর বড়ো মেয়ে মাধুরীকে ৷ এতটা পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু মুশকিলটা হল যখন মাধুরী সেটি আবার দিয়ে গেলেন, তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা শ্রীমতী পিয়ালিকে ৷ চাকরি-বাকরি, সংসার, বেয়াড়া দুই মেয়ে, কর্মবীর স্বামী—সব সামলে সে আর এই ‘নিরুপমা নিবাস’ সামলাবে কী করে? তাদের মতন বাধ্য তো তার মেয়েরা নয় যে, ‘চলো’ বললেই মায়ের পিছুপিছু এসে হাজির হবে! আর স্বামী তো ‘দুমকা’ নামটা শুনেই হাই তোলে ৷ যদিও রাস্তাঘাট এখন চমৎকার হয়েছে, সবার কাছেই গাড়িও থাকে, শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের পথ ৷ তাদের আত্মীয়স্বজনরা পৌষ মাসে তো থাকেই ওখানে—ফলে উইকএন্ডে লং ড্রাইভে আসাটা কারও পক্ষেই তেমন কিছু ব্যাপার নয় ৷ কিন্তু তেমন আসাতে কি আর বাড়ির দেখাশোনা হয়! বন্ধুবান্ধব নিয়ে দু-তিন দিনের জন্য এল, হইচই করে ফিরে গেল ৷ ভাইবোনরাও তথৈবচ, কে আর সেকালের মতন মাস’ভরে ছুটি কাটাতে আসবে ৷ বৈভব চারদিকে, অভাব কেবল সময়ের ৷ তাও মা যতদিন ছিলেন, প্রতি বছর অন্তত হপ্তাখানেকের জন্য এসেছে—কখনও বছরে দু’বারও ৷ তারপর মাধুরীও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তিনি নিজেই পারতেন না আসতে! ফলে গত বছর ছয়েক একেবারেই আসা হয়নি এদিকে ৷ কেবল রামদীন আছে বলে রক্ষে, সে একেবারে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে এতকাল ৷ কিন্তু সে-ই বা আর কতদিন ৷
এই রামদীন হচ্ছে ‘নিরুপমা নিবাস’ সহ, তার গোটা চৌহদ্দিটির দেখাশোনা করবার ম্যানেজার, তবে মালিক বললেও ভুল বলা হবে না ৷ পিয়ালিরও জন্মের আগে থাকতে আছে, এ-ই তাদের এখন ভিটেমাটি ৷ এবং সত্যি বলতে, এ বাড়ির মালকিন বদল হয়েছে তিনবার, তবে মালিক একবারও নয় ৷ সেই কোন শিশুবয়সে এসে রয়েই গেল এখানে ৷ কিন্তু তখন ছোটো থাকলেও এখন তো তার বয়স হয়েছে, সে বেচারাই বা আর কত দিক সামলাবে! তার উপর, বছর দুয়েক ধরে একের পর এক অঘটনে মানুষটা যেন কেমন নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে ৷ হঠাৎ স্ত্রী মারা গেল, তারপরই একমাত্র জামাই ৷ ছোটো মেয়ে নিখেঁাজ ছিল বছরখানেক, যাও বা পাওয়া গেল, কিন্তু ততদিনে অসুখবিসুখ বাধিয়ে আধমরা ৷ এক ছেলে ভালো চাকরি পেয়েছে শান্তিনিকেতনে, পাকা বাড়ি আরও পাকা মাইনে—সেও কার পাল্লায় পড়ে চিট ফান্ডে টাকা রেখেছিল—সর্বস্ব গেছে ৷ অন্য ছেলে এখানে থেকে, বাবার সঙ্গে চাষবাস করে, তবে কী ব্যামো কে জানে—বড্ড অসুস্থ ৷ হাত-পা ফোলা, চোখ ঘোলাটে... ৷ সব কিছুর তালোগোলে, রামদীনের যাকে বলে নাজেহাল অবস্থা ৷
কাকেই বা কী বলবে, কার সঙ্গে পরামর্শ করবে! সেসব দিনকাল তো গিয়েছে—মাথার ওপর নগেন্দ্রচন্দ্র ছিলেন, তা বাদেও বাবা মামা মেসো—সর্বোপরি দিদিমা তো বটেই ৷ সুতরাং বারবার পিয়ালিকেই ফোন করে ডাকতে থাকে৷ বেরিরানি একবার যেন এসে সব বুঝেশুনে নেয়—তার দিন ঘনিয়ে এসেছে, ইত্যাদি... ৷ ফোনের পর ফোন, লোক মারফত খবর ৷ মাথায় একবার মৃত্যুভয় ঢুকলে সে কি আর সহজে নামে? আর এত সব অঘটনের ফলে যা হয় আর কী—হাজার কুসংস্কার... ৷ সারাদিন হোম-যজ্ঞ, ফকির সাধু, জলপড়া-তেলপড়া ৷ কুয়োর ধারের একটা বড়ো গাছই কেটে ফেলল—কী নাকি তাতে শয়তানের বাস, বোঝো!
সুতরাং পিয়ালি এবার এসেছে, বাড়িঘরের তত্বাবধান তো বটেই, তার সঙ্গে রামদীনেরও এই হাজার কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস, ঝাড়ফুঁকে না, সাধারণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, স্বাভাবিক বল-ভরসা জোগাতে ৷ দেখা যাক... ৷ এদিকে আজকাল সর্বত্রই স্কুল হয়েছে, ছোটো ছোটো হেলথ সেন্টারও, তবে তাতে আর কতটুকু শিক্ষা আর কতটাই বা চিকিৎসা? সুতারাং বাকিটা তাদের চিরকালের মতন এখনও ভরসা করতে হয় ওই ওঝা আর মারাংবুরুর ওপরই—নয়তো আর উপায় কোথায় বেচারাদের!
ক্লান্তিতে বারকয়েক হাই তুলে, সিঁড়ির ধাপে বসে বসে চায়ের অপেক্ষা করতে লাগল পিয়ালি ৷ শহুরে হবার এই এক ঝকমারি, ঘুম থেকে উঠে চা-টা না হলে চলে না ৷ তার উপর আবার গত রাতে একদম ঘুম হয়নি বললেই হয় ৷ কী যে হাবিজাবি স্বপ্ন দেখেছে ৷ সন্ধেরাতে স্নান করাটাও উচিত হয়নি, নতুন জায়গা, মাত্র ঠান্ডা পড়ছে, তায় কুয়োর জল—রাতে জ্বর এসেছিল, ভালোই জ্বর ৷ গলা শুকনো, হাত-পা ঠান্ডা ৷ জ্বরের ঘোরে, নাকি এসে পর্যন্ত সেই বিকেল থেকে রামদীনের ওইসব উদ্ভট কল্পকাহিনির জেরে, কে জানে—মনে হচ্ছিল, একটা বেড়াল লম্বা ল্যাজ দুলিয়ে তার মশারির চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৷ আধো ঘুমে শুনতে পাচ্ছিল কুকুর কেঁদেই চলেছে ৷ বাড়ির খুব কাছে, এই চৌহদ্দির মধ্যেই শেয়াল ডাকছে—সবটা মিলে ভালো লাগছিল না ৷ কিন্তু অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে হাত বাড়িয়ে জলের গেলাসটাও নিতে পারছে না, যেন বোবায় ধরেছে ৷ আসলে মনটাও তো খারাপ ছিলই—এ বাড়ির কত স্মৃতি, কত ঘটনা, এককালের জমজমাট বাড়ি, এখন কেমন কার্তিকের কুয়াশায় ভিজছে একা একা...৷ এই জন্যই তো আর ভালোলাগে না আসতে, কেবল এড়িয়ে যায় ৷ তবে সকালে কিন্তু সম্পূর্ণ ঝরঝরে, গত রাতের জ্বর-জ্বালার রেশমাত্রও নেই ৷ কেবল এক কাপ চা... ৷
‘‘বেবিরানি, চায়ে—’’
ঘাড় ঘোরাতেই দেখে, থালার ওপর পিতলের ঘটিতে ধোঁয়া ওঠা চা, সার্কাস বিস্কুট আর একটা কাচের গেলাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং রামদীন ৷ বাহ, এ তো মেঘ না চাইতেই জল না বলে, চাইতে না চাইতেই চা বলা যায় ৷ পিয়ালি ছেলেমানুষের মতন খুশি হয়ে উঠল আর হাত বাড়িয়ে থালাটা নিয়ে রামদীনকে এও জানিয়ে দিল, যে, আজই যেন আবার ঠিকাদার বা বংশীলাল এসে হাজির না হয়—ওসব কাল হবে’খন ৷ গতকালের একটানা জার্নিতে বড়ো ক্লান্ত লাগছে, তাই দুপুরে আজ একটু ঘুমিয়ে নেবে ৷ রামদীন ফিরেই যাচ্ছিল, পেছন থেকে পিয়ালি বলল, বংশীলাল যেন ভালো করে সব দেখেশুনে নেয়, দরজার নীচে ফাঁক-টাক আছে বোধহয়, নাকি জানলার কাচ ভাঙা, কে জানে—রাতে একটা বেড়াল ঢুকেছিল, বড্ড বিরক্ত করেছে, এটা ফেলেছে, ওটা আঁচড়াচ্ছে... ৷ বেড়াল না হোক, ইঁদুর-টিদুরও হতে পারে, মেঠো ইঁদুর বড়োসড়ো—কিছু একটা তো অবশ্যই হবে ৷ সকালে তো এটা-সেটা মেঝেতে গড়াচ্ছিল, সে নিজেই দেখেছে ৷ জ্বর আর দুঃস্বপ্নের কথাটা চেপে গেল বেমালুম ৷ ও আর আগ বাড়িয়ে বলে কী হবে শুধু শুধু ৷ কথাটা বোধহয় শেষও হয়নি, রামদীন কেমন ভয়ার্ত চোখে চেয়ে রইল তার দিকে, তারপর ধীরে ধীরে বলল ও নাকি বেড়াল না, কামোট ৷ আসলে কামোটের রূপ ধরে সাক্ষাৎ শয়তান, শনি মহারাজ ৷ হঠাৎ করে উদয় হল, আর যবে থেকে এ তল্লাটে দেখা দিল, তবে থেকেই তো শুরু হয়েছে! সর্বনাশের শেষ দেখবে এই বদমাশ দানব... ৷
ওফ, সাতসকালে আবার শুরু হল ৷ থাক বাবা, ভাঙা কাচ, ফাটা দরজা যেমন আছে থাকুক ৷ বেড়াল কুকুর হাতি গন্ডার যা ইচ্ছে ঘুরুক ঘরের মধ্যে, বংশীলালকে কিচ্ছুটি করতে হবে না ৷ তবে সেও আর ওই শনি মহারাজের পাঁচালি শুনতে রাজি নয়—সব কথার শেষেই ঘুরে আসবে কামোটে ৷ এটা কী-ই-ই? সাত জন্মে তো শোনেনি এই নাম, আর গতকাল থেকে তা-ই শুনে-শুনে কান শুধু ঝালাপালাই নয়, মাথাও খারাপ—বিরক্তির একশেষ ৷ কথা ঘোরাবার জন্য চায়ে চুমুক দিয়ে খুব হালকাভাবে পিয়ালি জিজ্ঞেস করল—‘‘কামোট কী? বেজি-টেজি টাইপ? নেউল?’’ জন্ম থেকে আসছে এখানে, কোনও দিন তো এর নামও শোনেনি!
রামদীন জানাল যে, এ হচ্ছে বনবিড়াল আর ভাম বা গন্ধগোকুলের মিশ্রণ ৷ আরও নানা জন্তুর মিশেল আছে ৷ জংলি, বিচ্ছিরি... এরা সাধারণত ঘরে ঢোকে না, জঙ্গলেই থাকে, কিন্তু এই শয়তানের ঘর চাই, তাও এই শোবার ঘর ৷ ওকে আটকানো যায় না ৷ জানলা, দরজায় তালা আটকালেও ঢুকবে, হাওয়া হয়ে ৷ ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে হাওয়া হয়ে ঢুকে, তারপর ফায়ারপ্লেসের তাকে উঠে বসে ৷ বসেই থাকে!
ওই ‘হাওয়া হয়ে’ ঢোকার কথায় পিয়ালি প্রায় বিষম খায় আর কী ৷ কত আজগুবি চিন্তা যে হাওয়া হয়ে রামদীনের মাথায় ঢুকেছে, কিন্তু পরমুহূর্তেই ওই ফায়ারপ্লেসের কথায় কেমন অদ্ভুতভাবে, আচমকা গত রাতের স্বপ্নটা দুম করে মনে পড়ে গেল ৷ কী ভয়ংকর স্বপ্ন রে বাবা! বা বলা যায় খুব ভয়ংকর না, কিন্তু সে ভয়ানক ভয় পেয়েছিল৷ হাত-পা ঠান্ডা, গলা শুকনো, বোবায় ধরার মতন গোঁ গোঁ করছিল অবশ শরীরে ৷ দেখল, তার ছোটোবেলাকার সেই খেলনা বেড়াল ‘আমির আলি’ যেন জ্যান্ত হয়ে গিয়ে লাল লাল জ্বলন্ত চোখে তার দিকে চেয়ে, জিভ চাটছে৷ কী লোভী বীভৎস চেহারা! তারপর ফায়ারপ্লেসের তাক থেকে লাফ দিয়ে নামল, আর ঘুমটাও ভেঙে গেল৷ রামদীন গতকাল থেকে ‘কামোট’ ‘কামোট’ই শুধু বলেছে, কই, বেড়ালের কথা তো বলেনি! এখনও কী যেন বলে চলেছে, পিয়ালির কানে যাচ্ছিল না কিছুই ৷ অন্যমনস্ক হয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল ঘন ঘন ৷...
বাগানে চেয়ার পেতে, সেই বিকেল থেকে রামদীনের সঙ্গে হিসেবপত্তর নিয়ে আলোচনা করতে করতে অন্ধকার হয়ে গেল ৷ দিন তিনেক থেকে বাড়ি মেরামতির কাজ শুরু হয়েছে, বাগানের একদিকে তার রসদ, চুন-সুরকি, ইটের ছোটো পাঁজা, খাপরা—এ ছাড়া জলের পাইপ, এটা-সেটা ৷ ভেবেছিল ছোটোখাটো চলনসই গোছের কাজটুকু করে, পরে দেখবে কী কী প্রয়োজন ৷ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনটাই সিংহভাগ গিলে বসে আছে, সবই অতিপ্রয়োজন ৷ কথায় বলে না, বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, কিন্তু মেরামতিতে বোধহয় ছত্রিশ ৷ আসলে মা-ও তো শেষের দিকে এইসব ঝক্কি নিতে পারতেন না, আর তারপর সে-ও আসেনি আজ প্রায় ছ’বছর ৷ রামদীনের কাছে টাকাপয়সা থাকে, ও-ই লোক ডেকে ছোটোখাটো কাজকম্ম, একটু ঠুকঠাক করে করিয়ে নেয়—কিন্তু এমন করে আর কতদিন চালাবে? এসবই ঠিক, তবে সেও তো গলা-জলে ডুবে হাবুডুবু খাচ্ছে! কলকাতায় হাজার কাজ ফেলে এসেছে, তার সঙ্গে কত যে দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, সেসব তো বন্যার জলের মতন বাড়ছে তো বাড়ছেই, এ কি আর রামদীনকে বলা যায়! বললে অবশ্য সেসবও আবার ওই কামোটের ঘাড়েই চাপাবে, নয়তো পুবের শিরীষ গাছ, অথবা দক্ষিণের ঝরনা কিংবা উত্তরের বাতাস—রাবিশ... ৷
আজকাল অন্তত সেলফোনের সিগন্যাল পাওয়া যায়, আগে তো তাও হত না ৷ এখন ঘরে বসে খরব পাচ্ছে, যদিও সে খবর সবই খারাপ খরব ৷ খারাপ এবং অতি খারাপ ৷ তবু তা আদান-প্রদান তো হয় নিয়মিত, নানান পরামর্শ, আদেশ-নির্দেশ ৷ এটুকুও না হলে ফিরেই যেতে হত সব ফেলে রেখে ৷ আর কী যে হয়েছে, এইসব চিন্তাভাবনা, রামদীনের-হুতাশ, আর সঙ্গে ছোটোবেলাকার নানান স্মৃতি নিয়ে একা একা সারাক্ষণ নাড়াচাড়া করতে করতেই কি না কে জানে—রাতে তো ঘুম হচ্ছেই না! জ্বর আসে, বেশ জ্বর, ওই প্রথম দিনের মতনই ৷ হাত-পায়ের পাতা ঠান্ডা, গলা শুকনো, হাঁসফাঁস লাগে, ভয়ংকর সব স্বপ্ন..., সব...না, বোধহয় একটাই ৷ তবে সে একাই একশো ৷ সে-ই ‘আমির আলি’—কোন ছোটোবেলার খেলনা, বুড়ো বয়সে তার ভূত চেপেছে ঘাড়ে ৷ একই স্বপ্ন, বাড়া-কমা করে রোজ রোজ দেখে, আর তারপরই ঘুমটা ভেঙে যায় ৷ ফলে বাকি রাতটা দুশ্চিন্তা নিয়ে নাড়াচাড়া করে কাটে, এবং দিনটা কাটে হাই তুলে!
তার মধ্যে আজ আবার সকালে সদরে গিয়েছিল ডিএম-র সঙ্গে দেখা করতে ৷ এই যে রামদীনের জামাই মারা গিয়েছে, তার বকেয়া টাকাপয়সা মেয়ে এখনও পেল না ৷ এমনকি চাকরি দেবে দেবে করেও ঘোরাচ্ছে কবে থেকে ৷ সরকারি পাকা চাকরি ছিল—ন্যায্য পয়সা, কেন পাবে না সময় মতন? আজ একদম কাগজপত্তর নিয়ে সামনে বসে সব ব্যবস্থা করে এসেছে ৷ ডিএম সাহেব বলেছেন তো এক মাসের মধ্যে হবেই হবে, দেখা যাক ৷ ধরা-করা ছাড়া কিছু তো হবার জো নেই ৷ ইনি আবার পিয়ালির স্বামীর ব্যাচমেট, ফলে চা-টা খাইয়ে কত খাতির! আর খাতির যখন করলই, তখন ছোটো মেয়ের জন্যও একটা ব্যবস্থা করে এসেছে ৷ রাঁচিতে ট্রেনিং স্কুলে এক বছরের কোর্স, সরকারি যোজনা ৷ থাকা-খাওয়া ফ্রি, উপরন্তু হাজার টাকা স্টাইপেন্ড—চমৎকার ব্যবস্থা ৷ ফর্ম-টর্ম সব নিয়ে, ওখানে বসেই অর্ধেক কাজ সেরে নিয়েছে, এখন এখানে সইসাবুদ করে, কাল-পরশুর মধ্যেই জমা করে দেবে—হোলির পরই ক্লাস শুরু ৷
রামদীন অবশ্য ওর অভ্যেস মতন ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছিল অনবরত ৷ ‘হামারা ভাগ্য, হামারা কপাল’, হ্যানো-ত্যানো ৷ তা, তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কোনওমতে বশে আনা গিয়েছে ৷ যতই সৎ, কর্মঠ, ভালোমানুষ হোক এবং স্নেহ ভালোবাসা বা বিশ্বাসেরও কোনও ঘাটতি নেই—সে অবশ্য দু-তরফেই, কিন্তু এদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে গেলে মাথা গরম হয়ে যায় ৷ যত রাজ্যের উদ্ভট চিন্তা, আজগুবি বিশ্বাস... ৷ কেবল জাদু- টোনা নিয়ে পড়ে থাকলে ওঝা তোমার মেয়ের বকেয়া টাকা ফেরত দেবে? নাকি হোমযজ্ঞ করে-করেই ছোটো মেয়ে নিজের পায়ে দাড়িয়ে যাবে? যত্ত সব... ৷ ছেলে অতগুলো টাকা লোভে পড়ে, বাজে জায়গায় চড়া সুদে জমা করে ঠকল, দোষ পড়ল ভূতের ঘাড়ে ৷ বউয়ের ছিল হার্টের ব্যামো, ব্লাড সুগার—সে-ও পেতনির দোষ ৷ বড়ো ছেলের রিপোর্টে তো স্পষ্ট লেখা আছে ‘হেপাটাইটিস’—তা, সেও পিশাচের কারসাজি ৷ রামদীনেরও তো গত বছর ধরা পড়েছে গল ব্লাডারে স্টোন—সে অপারেশনের কথায় এমন হাঁউমাঁউ কাঁদতে লাগল, যেন পিয়ালি মনে হল তাকে চিতায় ঝাঁপ দিতে অনুরোধ করছে ৷ এই স্বর্গীয় পরিবেশ, অপার্থিব সুগন্ধি আবহাওয়া, এমন স্থান মাহাত্ম্যে কোথায় একটু সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা করবে, তা না... ৷
এইসব ভাবনা-টাবনার মধ্যে হঠাৎই মনে হল, এই যে এদের অশিক্ষা-কুশিক্ষার কথাবার্তায় এত অসহায় বিরক্তিতে দিশেহারা লাগছে, কিন্তু পিয়ালির মায়ের তো শিক্ষা কোনওদিক থেকে কিছু কম ছিল না! নিজে সেকালের শান্তিনিকেতনে ছোটো থেকে পড়েছেন, স্বামী স্বনামধন্য বিদ্বজ্জন, শ্বশুরমশাই বিচক্ষণ পণ্ডিত মানুষ—তবু মাধুরী ঘোষালের কুসংস্কারের নিদর্শন তো পিয়ালি নিজেই দেখেছে! অল্প বয়সে তারা যেমন সবার দেখাদেখি, পয়াশাড়ি, এক শালিক, বাঁ-চোখ নাচা ইত্যাদি মানত, সেরকম ছেলেমানুষি মানা নয় ৷ তার চেয়ে অনেক বেশি—এরকমই, প্রায় রামদীনের মতনই, এবং এই ‘নিরুপমা নিবাস’-এই..., ওফ, কী ভয়ংকর সে স্মৃতি... ৷
অন্ধকার হয়ে গিয়েছে ৷ পিয়ালি কাগজপত্তর নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই রামদীন বারান্দার মিটমিটে আলোটা জ্বেলে দিল ৷ এ সময় ভোল্টেজ প্রচণ্ড কম থাকে, কোনও কোনও দিন তো জ্বলেই না—তখন হ্যারিকেনই ভরসা ৷ ভালোমতন আলো আসে রাত আটটার পর, যখন এখানে গভীর রাত ৷ পিয়ালি তখনই ওর পড়া-লেখা, কাজকম্ম নিয়ে বসে ৷
বারান্দার এক কোণে রামদীনের বড়ো বউমা দুলারি, হ্যারিকেনের কাচ পরিষ্কার করে, দেশলাই জ্বেলে আগুনটি একটু উসকে দিতেই, দেয়ালে তার কী চমৎকার একটা ছায়া পড়ল ছবির মতন ৷ চোখা নাক, মাথায় ঘোমটা, গুনগুন করে, কোনও গানও গাইছে বোধহয়, সুরটা বড়ো সুন্দর ৷ হঠাৎ ওই আধো-অন্ধকারে সব ছাপিয়ে মস্ত এক ছায়া—ল-ম্বা ল্যাজ দুলিয়ে কামোটটি বোধহয় ঘুরে বেড়াচ্ছে বারান্দায় ৷ এবার হাওয়া হয়ে ঘরে ঢুকবে, ঢুকে ম্যানটেলের ওপর বসবে, বসে লালচে জলন্ত চোখে, সবজেটে জিব বের করে, লম্বা ল্যাজটা দোলাতে থাকবে ধীরে ধীরে..., গতকাল রাতেও যেমনটা দেখেছিল স্বপ্নে ৷ আজ কিন্তু ওই হাওয়া হয়ে যাবার কথায় হাসি পেল না আর, পরিবর্তে গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল ৷ দুলারিরও গান তখন থেমে গিয়েছে ৷ সামান্য আগে ছায়ায় তৈরি হওয়া চমৎকার দৃশ্যটা ভেঙে দিয়ে, হাতের কাছের থেকে কী একটা তুলে নিয়ে ছুড়ে মারল সেইদিকে ৷ রাগে ভয়ংকর দেখাচ্ছিল দুলারিকে, বিড়বিড় করে গালি দিচ্ছে সমানে—কামোটটা কোথায় কে জানে!
পিয়ালি রামদীনের একেবারে কাছে গিয়ে ফিশফিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘রামুদা, পুটুমামা আমাকে একটা পুতুল দিয়েছিলেন, তোমার মনে আছে, সেই বিলেতের মামা—একবার এসেছিলেন না এখানে, অনেকদিন থাকলেন? একটা বেড়াল দিয়েছিলেন..., লাল লাল চোখ, রাতে জ্বলত, সবুজ জিভটাও ৷ ফায়ারপ্লেসের ওপর থাকত?’’
রামদীন ঠিক মনে করতে পারছিল না—‘‘তুমহার কত খিলোনা ছিল ৷’’
‘‘না কত না ৷ ওটাই ছিল ৷ আমার সবচেয়ে প্রিয়, ‘আমির আলি’, মা যেটা ফেলে দিলেন... ৷’’
ফেলে দেবার কথায় রামদীনের তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল, বলল যে ওটা বিল্লি না, কুছ দুসরা জানবর ৷ ‘‘হাঁ, হাঁ, মুরলী নাম থা ৷ গুসসা করে মাধুদিদি ওটা জঙ্গলে ছুড়ে ফেলে দিলেন, আর সেই দুখমে বেবিরানির খানাপিনা বনধ, সব মনে আছে ৷ মগর, উয়ো খিলোনা নহি, আজব চিজ... ৷’’
পিয়ালি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রামদীনের কথা শুনছিল, বলল—‘‘মুরলী না, আমিরালি ৷ পুটুমামাই নামটা বলেছিলেন ৷ আদতে সে নাকি বেলুচিস্তানি, ওদিক থেকেই এসেছিল, নানান হাত ঘুরে...’’ ও নিজেকেই নিজে যেন শুনিয়ে যাচ্ছিল এসব তথ্য ৷ রামদীন তাতে কানও দিচ্ছিল না ৷ সে তখন ঘ্যানঘেনিয়ে বলেই চলেছে—এখনকার কথা সব ভুলে যায়, অথচ পুরানা বাত সব মনে থাকে ৷ এ তো কবেকার কথা, চালিস? না, বিয়াল্লিস ৷ জিস সাল বড়াবাবুর দেহান্ত হল, তবে? অথচ, গতকাল বংশীলালকে টাকা দিয়ে, রিসিট নিতে ভুলে গেল... ৷ হঠাৎ কথাটা কানে যেতে, থমকে গিয়ে পিয়ালি জিজ্ঞেস করল, ‘‘কত বছর বললে?’’
তেঁতুলতলায় খাটিয়া পেতে, হাতে একটা বই নিয়ে শুয়েছিল পিয়ালি ৷ শোবার ঘরে মিস্ত্রির কাজ হচ্ছে, ইচ্ছে ছিল বাইরে গাছের ছায়ায় শুয়ে বই পড়তে পড়তে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া ৷ তা, পড়াও হচ্ছে না, ঘুমও হচ্ছে না ৷ যা হচ্ছে, তা হল গিয়ে আকাশ-পাতাল চিন্তা ৷ কতদিন ধরে এখানে বসে আছে, ওদিকে কী যে হচ্ছে! একের পর এক কেবল খারাপের পর খারাপ খবর ৷ দুঃসংবাদ, আরও দুঃসংবাদ, অতি দুঃসংবাদ—মানুষের ধৈর্যেরও তো একটা সীমা থাকে, নাকি? তার সঙ্গে হজম করারও ক্ষমতা! এসব হচ্ছেটা কী! শাশুড়ি থাকেন বেঙ্গালুরুতে, বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ, কিন্তু এখন একটু বেশিই বোধহয় ৷ সে খবর শুনে স্বামী মায়ের কাছে যেতে গিয়ে, এয়ারপোর্টেই হোঁচট খেয়ে, পায়ের বুড়ো আঙুলটা ভেঙেছে, কনুইও ফ্র্যাকচার নয়, তবে ফোলা ৷ আপাতত কলকাতায় ফিরতে পারছে না—কম করে দিন পনেরোর বিশ্রাম ৷ ছোটো বোন কাজরিকে ডাক্তাররা কিছু একটা সন্দেহ করছে বোধহয়, নয়তো একের পর এক, এত টেস্ট করাবে কেন? মেয়ে গাড়িতে ধাক্কা লাগিয়েছে এক পথচারীকে, তা-ই নিয়ে গাড়ি ভাঙচুর ৷ শুধু এই না, আরও আছে... ৷ পিয়ালির কিছু আর ভালো লাগছে না ৷ এত সুন্দর জায়গা, এমন নিরিবিলি, মনোরম, সংসারের উটকো ঝঞ্ঝাট নেই—ভেবেছিল একটু কাজকর্ম করবে নিজের মনে, তার রসদও নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে—কিন্তু লবডঙ্কা ৷ কিসসুই হল না ৷
তার নিজের শরীরটাই বা ভালো যাচ্ছে কোথায়? দিনে যাও বা একটু তন্দ্রামতন আসে, রাতে তো পুরোপুরি প্যাঁচা৷ একটুও ঘুম নেই! নাকি, একটু আসে, নয়তো ওই হাবিজাবি স্বপ্ন দেখবে কী করে? পিয়ালি ক্লান্ত চোখে গায়ের শালটা বুক পর্যন্ত টেনে পাশ ফিরে শুয়ে একটু ঘুমের আয়োজন করতে যেতেই—মনে হল কালোমতন কী যেন একটা উল্কাবেগে তেঁতুল গাছে উঠে গেল ৷ মুহূর্তের মধ্যে কী হল, বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে ওপর দিকে তাকাতেই দ্যাখে ওহ, রামদীনের ভাষায় সেই ‘শনি মহারাজ...’! পাতার আড়ালে ভালোমতন দেখা যাচ্ছে না, কেবল অতিকায় লম্বা ল্যাজটি দুলছে ধীরে ধীরে ৷
পিয়ালির আর তাকাতে ইচ্ছে করছিল না, অবসাদে চোখ বন্ধ করল ৷ ঝকঝকে নীল আকাশ, ধোঁয়া-ধুলো-কালিবিহীন কেমন পবিত্র বাতাস, তাদের সবার ছোটোবেলা সমেত, হাজার স্মৃতিতে ডোবানো প্রাণপ্রিয় এই ‘নিরুপমা নিবাস’, তার আজন্ম পরিচিত রামদীনের গোটা পরিবার, এসব ছেড়ে, হয়তো উপায় নেই, কিন্তু তবু ওর কলকাতা ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল ৷ এখানে কাজটা যদি একটু এগিয়ে নিতে পারে, বাকিটা রামদীন দেখবে ৷ তবে প্রতাপের একটা লোন স্যাংশন হবে, বড়ো মেয়ের চাকরিটা হব হব করছে, তবু জয়েনিং লেটার না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্বাস নেই ৷ ছোটো মেয়ের ফর্ম জমা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ফাইনাল চিঠি আসেনি ৷ এই সময় ও চলে গেলে ওরা আতান্তরে পড়বে ৷ আরও অন্তত দিন সাতেক তো লাগবেই ৷ পিয়ালির চোখটা জড়িয়ে আসছিল, বইটা মুড়ে মাথার পাশে রেখে আবার ওপর দিকে চাইল, চেয়ে ধীরে ধীরে ডাকল—‘‘আমির আলি-ই-ই?’’
পিয়ালি যখন বেশ ছোটো, জার্মানি থেকে এক মামা এলেন দুমকায় ৷ কলকাতায় এসেছিলেন, ফাঁকা বাড়িতে মন না টেকায়, কার সঙ্গে যেন চলে এলেন এখানে ৷ অনেক দিন ছিলেন, মানে তাদের গোটা শীতের ছুটিটা জুড়েই, এবং কী কারণে যেন কেউ তাঁকে পছন্দ করত না ৷ এমনকি মা-দিদিমাও না ৷ সারাদিন শুয়ে-বসে থেকে সবাইকে ফরমাশ করতেন, আর খুঁত ধরতেন ৷ নিজের পরিজনেরাও এড়িয়ে চলতেন ৷ স্ত্রী ছেড়ে গিয়েছিলেন, ছেলেপুলেও বোধহয় ছিল না ৷ কথাটথা বলতেন না বিশেষ, আর গল্প তো নয়ই ৷ সেই পুটুমামা ফিরে যাবার সময় পিয়ালিকে একটা উপহার দিয়েছিলেন ৷ একটা বেড়াল ৷ বেড়ালই তো জানত তখন ৷ কালচে রঙের, লম্বা ল্যাজ, রেডিয়াম দেয়া লালচে কমলা চোখ, মুখটা সামান্য ফাঁক, তার থেকে ফিকে সবুজ জিভ দেখা যায় ৷ শক্ত কোনও মেটালের তৈরি, তবে তার ওপরে সত্যিকারের লোম লাগানো... ৷ কারিগরি হিসেবে চমৎকার ৷ সবাই বলল—‘‘বাবা রে, দেখে ভয় লাগে ৷’’ মাধুরী তো খুবই বিরক্ত—‘‘ছোটো মেয়েকে এমন খেলনা কেউ দেয় ৷ থাক, ম্যানটেলের ওপর রেখে দাও ৷ ও উপহার আর সঙ্গে করে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যেয়ো না, যত্ত সব—’’’
যে যা-ই বলুক, তবু ওটা যে পিয়ালির কী প্রিয় ছিল বলার নয় ৷ সঙ্গীসাথির অভাব ছিল তো! বড়োরা নিজেদের খেয়ালে, ছোটোরা বেশি ছোটো ৷ খেলনাপাতিরও তেমন রেওয়াজ ছিল না সে সময়ে, ফলে ওই খটখটে শক্ত বেড়ালটাই হয়ে গেল ওর প্রাণ ৷ সারাদিন কাছছাড়া করত না, নিজের মনে বকবক করে যেত ওর সঙ্গে, রাতে কেবল তুলে রাখত মা-র কথামতন ম্যানটেলের ওপর, আর মশারির ভেতর থেকে দেখত লালচে দুটো চোখ, সবজেটে জিভ—রেডিয়াম তো, জ্বলত সারারাত ৷
ওকে দেবার সময় একটা গল্প বলেছিলেন ওই মামা ৷ ওর আদি নিবাস নাকি বেলুচিস্তান, অনেক হাতফেরতা হয়ে মামার কাছে এসেছে, নাম ‘আমির আলি’ ৷ চল্লিশ বছর পরপর ও জীবন্ত হয়ে ওঠে ৷ তখন ও হাঁটবে, চলবে, শিকার করে খাবে—সব ৷ —‘‘ওর মৃত্যু নেই, কিন্তু যদি অচল করতে চাও, এনি স্যাটারডে, আফটার সানসেট, অনেক উঁচু থেকে জলে ফেলে দিতে হবে, আর জলে পড়বার আগে পাথরে ধাক্কা—নয়তো হবে না ৷ বুঝেছ? এমনটা করলে তাহলে আবার চল্লিশ বছর থাকবে জলের তলায় ৷ আর যে-ই সময়টা শেষ হবে, আপনা থেকেই উঠে আসবে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে ৷ ও অমর, মরে না ৷ ঘুমোবে, আবার জেগে উঠবে ৷ আবার ঘুমোবে, আবার জেগে উঠবে... ৷ ওর নাম আমির আলি না বলে ‘অমর আলি’-ই বলা যায়, হা-হা-হা ৷’’
পিয়ালি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল—‘‘কিন্তু এত সুন্দর জিনিসটা ফেলব কেন? ও তো পুতুল?’’ জবাবে মামার কী হাসি! ছিটগ্রস্ত তো, তাই হাসিটাও অদ্ভুত, তৎসহ উত্তরও ৷ বললেন—‘‘ওকে কেউ রাখতে পারে না, ফেলবেই, এই আমি যেমন ফেললাম!’’
‘‘ফেললে কোথায়? তুমি তো আমায় গিফট দিলে?’
‘‘ওই আর কী, ঘাড় থেকে ফেললাম, হা-হা ৷ শুধু তোমায় দিলাম না, তোমার মাকে দিলাম, দিদাকে দিলাম—গোটা খানদানকে গিফট, হা-হা ৷’’
খ্যাপাটে মানুষটার আর কোনও কিছু ভালো না লাগলেও, গল্পটা কিন্তু মন্দ লাগেনি ৷ যদিও একেবারে বানানো, আজগুবি ৷ তা সে মানুষটাও তো ওরকমই ৷ একজন বাতিকগ্রস্ত, সন্দেহপ্রবণ, হিংসুটে, অসুখী এবং অবশ্যই নিঃসঙ্গ মানুষের থেকে তো আর স্বাভাবিক গল্পগাথা আশা করা যায় না!
তা, সে বছর তো শীতের শেষে যে যার মতন ফিরে গেল—পরের বছর আবার ফিরে এল ৷ এল..., কিন্তু সে সুসময় আর ফিরে এল না... ৷
বিশাল বাণিজ্য ছত্রাখান অবস্থায় রেখে দাদু হঠাৎ মারা গেলেন ৷ বড়ো মামার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিল—সবাই নাকি তাদের ঠকাবে ৷ রেলগাড়ির জানলার ধারে বসে সেজো মাসির চোখে কয়লার গুঁড়ো পড়েছিল, তার থেকে কে কবে শুনেছে যে চোখটি একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়! হল, এবং অদ্ভুত একটা ডিমের মতন পাথরের চোখ নিয়ে কেঁদে কেঁদে সবাইকে কেবল শাপশাপান্ত করতে লাগলেন ৷ মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্য চরম পর্যায়ে যাওয়াতেই বোধহয়, বাবা বছর দুয়েকের জন্য একটা আমন্ত্রণ পেয়ে হাইডেলবার্গে পড়াতে চলে গেলেন, একা ৷ ওদিকে বাংলাদেশের যুদ্ধে কলকাতা অন্ধকার, মাথার ওপর দিয়ে জঙ্গি প্লেন, ছোটো মাসি এক সুদর্শন মুক্তিযোদ্ধার প্রেমে পড়ে বিনা দ্বিধায় তার সঙ্গে ঢাকা চলে গেল... ৷
এ সমস্ত অঘটন বা ঘটনার ঘনঘটা অবশ্যই শুধু ওই একটা বছরের মধ্যেই হয়নি, ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে প্রায় বছর দু-তিনেক লেগেছিল ৷ একটা থেকে আর একটা যেমন ঘাড়ে চেপে আসে, তেমনই ৷ আসলে প্রতিটির সঙ্গেই কিন্তু যোগসূত্র আছে ৷ তবে আপাতভাবে দেখতে গেলে বলা যায় যে—সময়টা কেবলই অশান্তি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়েই গেল ৷
তা, এরকমই দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনায় ভরা শীতের এক রাতে মাধুরী বারান্দায় চাদর মুড়ি দিয়ে একা একা বসে ছিলেন অনেকক্ষণ ধরে ৷ বোধহয় কাঁদছিলেন নিঃশব্দে ৷ নিরুপমা বারবার পিয়ালিকে দিয়ে তাঁকে ডাকাচ্ছিলেন ভেতরে আসবার জন্য, তিনি আসছিলেন না ৷ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে, বাইরে একটুও আলো ছিল না ৷ না বিজলির, না চাঁদের—কৃষ্ণপক্ষ চলছিল বোধহয়, অথবা ঘোর আমবস্যা... ৷ হঠাৎ তাঁর কী যে হল, আচমকা ঘরে ঢুকে, ম্যানটেলের ওপর থেকে আমির আলিকে খামচে তুলে নিয়ে বড়ো বড়ো পা ফেলে পশ্চিমের বড়ো কুয়োর ধারে দাঁড়িয়ে সজোরে ছুড়ে ফেলে দিলেন ৷ পাথরের গায়ে ‘ঠং’ করে শব্দ হয়ে, ঝুপ করে ডুবে গেল ৷ অন্ধকারে দেখা যায় না কিছু, শুধুই শব্দ...
বাড়িসুদ্ধ সবাই ভয়ে চিৎকার দিচ্ছে, ছোটোরা অজানা আশঙ্কায় কেঁদে চলেছে, মাধুরী বিড়বিড় করে বলে চলেছেন—‘‘যত নষ্টের গোড়া, বদমাশ, শয়তান...’’ তার চোখ জ্বলছে অসহায় ক্রোধে ৷ সেই শীতের রাতটার যে কী ভয়ংকর স্মৃতি ৷ তবু রক্ষে, ওই পুতুলের ওপর দিয়েই গেল ৷ দিদিমা মনে করি ভেবেছিলেন নিজেই ঝাঁপ দিলেন ৷
এত কিছুর পরও রাত তো কাটে, সকালও হয়, দিনের পর দিনও কেটে যায় ৷ যুদ্ধ যেমন বেধেছিল, হঠাৎ তা থেমেও গেল ৷ ব্ল্যাক আউট উঠে গেল, তারাও সবাই ফিরে গেল কলকাতায় ৷ বিপর্যস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ছোটো মাসি ফিরে এল বীর হবু মেসোমশাইকে নিয়ে ৷ অতঃপর, বিয়ে সেরে দুজনেই চলে গেল অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করতে ৷ বড়ো মামাও কোনও মতে সামলে-সুমলে উঠে সংসারের হাল ধরলেন ৷ সেজো মাসি মাদ্রাজে গিয়ে ওই পাথরের চোখ ফেলে, চমৎকার এক স্ফটিকের চোখ লাগালেন, যার জন্য মজা করে পরে বলতে শুনেছে যে সেই চোখে নাকি সব কিছু স্ফটিকের মতন স্পষ্ট দেখেন, ঝকঝকে পরিষ্কার ৷ সেই গরমে তারা বাবার কাছে হাইডেলবার্গে গেল ছুটি কাটাতে... ৷ সবই ঠিকঠাক, কেবল বেঠিক হল তার আমির আলি ৷ বেচারা! বিনা দোষে এ কেমন সাজা? পুটুমামা পাগল ছিলেন, কিন্তু মাধুরী তো নয়? তাঁর কাছে কি এমন পাগলামি সাজে?
পিয়ালির ঘুম কেটে গিয়েছিল, কেবল নানান দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, আর রাশিকৃত স্মৃতি নিয়ে ক্লান্ত চোখে চেয়ে ছিল দূরের পাহাড়ের দিকে ৷ বংশীলাল আর ঠিকাদার মনোহর সিং, কিছু জিজ্ঞাসা করবার জন্য মাঠ পেরিয়ে আসছিল তার দিকে ৷ পিয়ালি তৎক্ষণাৎ ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করল ৷ কিছু আর ভালো লাগছিল না, সব অসাড় ৷
আগামীকাল রবিবারই ফিরে যাচ্ছে পিয়ালি ৷ বাড়ির কাজকর্ম যতটা এগিয়েছে, থাক ৷ বাকিটা রামদীনকেই দেখতে হবে ৷ আর ওই পেনশন, বকেয়া টাকা, ট্রেনিং প্রোগামের ফাইনাল চিঠিপত্তর, কাগজ—সব নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে করে, সেসব কলকাতা থেকেই করে নেবে, কোনও অসুবিধে নেই ৷ আজকাল তো ই-মেলের যুগ ৷ কেবল রামদীনের বড়ো ছেলে দিলীপকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার কথা ছিল ভালো করে চেকআপের জন্য—সেটি হল না ৷ জিনিসপত্তর মোটামুটি গুছিয়েই রেখেছে, গরম জামা তো তেমন দরকারই হল না—শুধু শুধু বয়ে আনল ৷ সে আর বুঝবে কী করে, অঘ্রাণের শেষে দুমকার ঠান্ডা তো কিছু কম নয়, সে শেষ দেখা তার আর সইলই না! কী করা, আর থাকবার উপায় নেই ৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বাড়ির পেছনের চাতালে ছোটো ছোটো পা ফেলে অন্যমনস্কভাবে পায়চারি করছিল পিয়ালি ৷
বেলা পড়ে এল, শীতের শেষ দুপুরটা বড়ো ছোট্ট আর বিষণ্ণ ৷ হালকা তাপ-মাখা রোদটা, সোনালি থেকে কখন যে কমলা হয়ে নিমেষে ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না ৷ কেবল মনটা হু-হু করে ওঠে... ৷
এ ক’দিনে আরও দুঃসংবাদ এসেছে ৷ কাজরির অসুখটা কনফার্মড ৷ যদিও খুবই আর্লি স্টেজ, তবু এমনই একটা রোগ, যে শুধুমাত্র নামেই, একেবারে আগাগোড়া বিপর্যস্ত করে দেয়—যেমন দিয়েছে পিয়ালিকে ৷ স্বামী পায়ের প্লাস্টার নিয়ে ব্যাঙ্গালোর থাকাকালীন প্রচণ্ড কাজের ক্ষতি হয়েছে ৷ সেসব মোটামুটি জোড়াতালি দিয়ে সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে ৷ ব্লাড সুগার বেড়ে গিয়েছে, প্রেশার হাই ৷ উগ্র মেজাজ, যাকে-তাকে যা-তা বলে দিচ্ছে রাগের মাথায় ৷ এমনটা তো ছিল না ৷ মেয়ে গাড়িতে যাকে ধাক্কা দিয়েছিল, তার লোকজন কেবল গাড়ি ভাঙচুর করেই রেহাই দেয়নি, এক লাখ টাকা নগদ ক্ষতিপূরণ নিয়ে ছেড়েছে, তৎসহ-হুমকি, ধমকি, গালিগালাজ... ৷ কেবল এখানেই শেষ না ৷ তার কলেজের একটা মেয়ে তারই নামে মামলা ঠুকে বসে আছে ৷ সেও আবার যে-সে মামলা নয়, একেবারে মানহানি ৷ পিয়ালিকে কেউ জেলেও পুরবে না, ফাঁসিও দেবে না, কিন্তু হয়রানির একশেষ তো হবে! কবে কখন কেস পড়বে, সব কাজ ফেলে হাজিরা দিতে ছোটো! শাশুড়ি ফিরেছেন বটে হাসপাতাল থেকে, তবে সে কিছু সুখের ফেরা নয় ৷ কর্তৃপক্ষ বলেছেন, কী হবে ওখানে রেখে, তার চেয়ে শেষের ক-টা দিন থাকুন নিজের ঘরে! এ সময় পিয়ালি একবার যেতে পারলে খুব ভালো হত, কিন্তু কলেজের ওই বেয়াড়া মামলাটার কোনও সুরাহা না করে কি পারবে এ মুহূর্তে কিছু করতে! কী জানি!
আসলে, ঝঞ্ঝাট যখন আসে তখন একা আসে না—সদলবলে হইহই করে, হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে একের পর এক ৷ আধিব্যাধি, বিপদ, দুর্ঘটনা—সে তো সব সময়ই অল্পবিস্তর থাকে ৷ মাথা থাকলেই মাথাব্যথা ৷ কিন্তু তা-ই বলে কেবল ব্যথাটাই থাকবে, মাথার অস্তিত্বই টের পাবে না, এ কেমন কথা? চারদিকে কেবল অশান্তি, ক্লেশ, ক্ষোভ আর উৎকণ্ঠা—এমনটা তো ছিল না ৷ কতদিন বাদে, কত সাধ করে, আশা নিয়ে এসেছিল তার ‘নিরুপমা নিবাস’-এ ৷ একা একা নিরিবিলিতে, বেশ থাকবে টানা ক-টা দিন ৷ তার আগামী বইয়ের খসড়টাও এগিয়ে রাখবে, সঙ্গে বাড়ির কাজ ৷ রামদীনের বিপত্তির সমাধান প্রচেষ্টা আর অনন্ত বিশ্রাম তো বটেই ৷ মানুষ মনে মনে ভেবে রাখে কত কী! সব উলটে গেল ৷ নজর লেগেছে, বলে না! ঠিকই বলে ৷ নয়তো কেন এমন হবে?
রাগে, দুঃখে, হাতাশায় পিয়ালির মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল ৷ শ্বাসও নিতে পারছিল না বুক ভরে ৷ বারান্দায় ফিরে যাবে ভেবেও খানিক দাঁড়িয়ে রইল ৷ এদিকটা বাড়ির পেছন দিক ৷ বড়ো চাতালের পেছনে মোটা করে পাঁচিল তোলা, তার পেছনেই খাড়া নেমে গিয়েছে নদীর খাত ৷ এ সময় জল বয়ে যায় না, তবে জমে থাকে এখানে-সেখানে, আর মাঝে মাঝেই পাথরের শক্ত চাটান ৷ দাদু একলপ্তে গোটা জঙ্গলটা কিনেছিলেন বলে, নয়তো এমন ভয়ংকর জায়গা কেউ শখ করে বসতবাড়ির মধ্যে রাখে? তাদের ছোটোবেলায় তো ওদিকটায় হায়না, নেকড়ে ঘুরত, এখন সেসব লোপাট হয়েছে বটে, তবে শেয়াল আছে বিস্তর ৷ দিনের মধ্যেও কতবার যে ডাকে, রাত্তিরে তো কথাই নেই ৷ নিরুপমা এমনিতে দারুণ সাহসী ছিলেন, নয়তো একা একা এমন জায়গায় কেউ থাকতে পারে! কিন্তু তবুও তিনি এই অঞ্চলটাকে ভয় পেতেন ৷ পাবারই কথা ৷ এতকাল পরেও ওদিকটা এখনও তেমনই ভয়ংকর আছে ৷ শ্যাওলা-পড়া খাড়া ঢাল, কাঁটা ঝোপঝাড়, ঘন জঙ্গল, দিনের বেলাতেও অন্ধকার ৷ তারা ছোটো থাকতে, পাঁচিলের দিকে আসাই নিষেধ ছিল, আর ঝোঁকা তো দূরের কথা ৷ এখন নিষেধ করবার কেউ নেই, নিষেধ মানারও না, তবে ভাঙার আছে ৷নয়তো একা একা কেউ এত কাছে আসে? পিয়ালি পায়ে পায়ে আরও খানিক এগোল বটে, তবে ঝুঁকল না—এবার ফিরে যাবে ৷ হঠাৎ চোখ পড়ল পাঁচিলের শেষ প্রান্তে, যেখানে বুনো কুল গাছটা ঝাঁকড়া হয়ে নুয়ে আছে দেয়াল ঘেঁষে, রোদ যাই যাই করছে, আর সেই শেষ বিকেলের কমলাটে রোদের তাপটুকু গায়ে মেখে আলস্যে গা এলিয়ে ঘুমুচ্ছে আমির আলি ৷
বিতৃষ্ণায় জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার তাকাল ওইদিকে, তারপর ধীর পায়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল সেদিকে ৷ গিয়েই, প্রাণপণ শক্তিতে এক ঝটকায় ঠেলে ফেলে দিল ওপাশে ৷ আর লোহার শক্ত, ভারী কিছু পাথরে পড়লে যেমন শব্দ হয়, তেমনই ঠং করে আওয়াজ এল বহু নীচ থেকে, তারপর ঝপাৎ ৷ পাথরের চাটানে ধাক্কা খেয়ে শ্যাওলা মাখা গভীর জমা জলে পড়েছে ৷ পড়ুক ৷ অন্তত চল্লিশ বছরের জন্য নিশ্চিন্ত ৷ ততদিনে পিয়ালিও থাকবে না এ দুনিয়ায়, আর রামদীনও না ৷ এমনকি এই ‘নিরুপমা নিবাস’টিও থাকবে কি না, তারই নেই ঠিক...!
রচনাকাল ২০১৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন