মিমি রাধাকৃষ্ণন
হেমন্তের সকালে বাগানের মরশুমি ফুলগাছের গোড়ার ঝুরো মাটিতে সারের মিশ্রণ দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গুনগুন করে গান গাইছিলেন তনিমা বড়াল ৷ বড়ো গামলায় চা-পাতা, নিমফল, ডিমের খোলা, সবজির খোসা ইত্যাদির সংমিশ্রণে নিজস্ব পদ্ধতিতে কফি পাউডারের মতন ঘন গাঢ় রঙের উৎকৃষ্ট সার; তার সঙ্গে খুরপি, জলের ঝারি, ছোটো ছোটো ডালপালা কাটবার বাঁকানো কাঁচি, হাবিজাবি জড়ো করবার ঝুড়ি—এসব ব্যবস্থা তো ঠিকই আছে, তবে যা নেই তা হল গিয়ে রোদ ৷ নিম লেবু আর আমলকী গাছে ঘেরা বাড়ির পেছনদিকের ছোট্ট তিনকোনা এই জমিটুকুতে রোদ্দুর বড়ো বাড়ন্ত ৷ গাছপালা, জমি মাটি সব যদি একেবারে ঠান্ডায় কনকন করে, তাহলে শীতের ফুল ফুটবেটা কী করে?
বেঞ্চের ওপর বুড়ো কুকুর ঘেঁঘোরাম, কুঁকড়ে-মুকড়ে শুয়ে শুয়ে পাখিদের লাফাঝাঁপা দেখছে, আর মাঝে মাঝে অনিচ্ছাসত্বেও বাধ্য হয়ে খাঁউ খাঁউ করে কামড়ে কামড়ে পিঠ চুলকোচ্ছে ৷ বেচারা, বড্ড বুড়ো হয়ে গিয়েছে, কে এখন আর পাউডার মাখাবে, ইঞ্জেকশন ফোটাবে ৷ তিনি নিজেই কি আর কম বুড়ো! বসা থেকে উঠতে প্রাণটা বেরোয়, হাঁটাচলা করেন হেলেদুলে ৷ এইসব পাড়ার কুকুর ‘ঘেঁঘোরাম’, ‘গন্ধরাজ’, ‘নটবর সিং’রা যখন ছেলেমানুষ, তাদের টেনে টেনে ডাক্তারের কাছে কত ছুটেছেন ৷ এখন তারাও সবই প্রায় গত হয়েছে আর নিজেরও এই অবস্থা, কে কাকে দেখে ৷ তবু যে ক-জন আছে, নিজেরাই এসে এক-আধবার দিনে হাজিরা দেয়, দুটো সুখদুঃখের কথা শোনে, খেয়েদেয়ে ঝিমোয় খানিক, তারপর পাড়া বেড়াতে যায় ৷
প্রবল পশুপ্রেমী, প্রকৃতিরক্ষক, উদারমনা, শুভাকাঙ্ক্ষী, সদালাপী, পরোপকারী, তনিমা বড়াল ভারতবিখ্যাত না হলেও, পাড়া-বেপাড়া, চেনা- অর্ধচেনা, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধবদের এক কিংবদন্তি অজাতশ্রক্র, ভালোবাসার মানুষ ৷ যে একবার তাঁর কাছে এসেছে, সে আর তাঁকে ভুলতে পারেনি ৷ বহুদিনের পুরোনো ড্রাইভার, ততোধিক পরিচিত চৌকিদার, আর সেবিকা মারিয়ামকে নিয়ে একতলায় একাই থাকেন ৷ স্বামী নেই, একমাত্র ছেলে বহুকাল বাইরে, তবু তিনি পরিজন পরিবৃত ৷ তা ছাড়া দোতলায় ছাতের লাগোয়া ঘরটাতে, এই গত বছর পাঁচেক ধরে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ভাগনে থাকে—অনিকেত, ডাকনাম অনি ৷ এমনিতে ডিফেন্স অ্যানালিস্ট—সে তো একেবারেই পড়াশুনোর কাজ, কিন্তু তবু কী জানি কী কারণে, কর্মসূত্রে নাকি সঙ্গে পিস্তল-টিস্তলও রাখতে হয় ৷ সে পিস্তলই না বন্দুক, তা ঠিক জানেন না, তবে আছে একটা ফায়ার আর্ম ৷ আত্মীয়স্বজনরা এই বয়সে একা একা থাকবার জন্য নানান ভয়-টয় দেখালে, তিনি হেসে উত্তর দেন যে বাইরে চৌকিদার লাঠি নিয়ে পাহারা দেয়, ওপরে বন্দুকধারী অনি, তার আর চিন্তা কী? অনি বলে, ‘গাদা বন্দুক না বলে কামান বলো না, তাহলে তারা আরও একটু নিশ্চিন্ত হয়!’
হাসিখুশি, কর্তব্যপরায়ণ চমৎকার ছেলেটি, তবে একটানা থাকে আর ক-দিন! মাসের মধ্যে অন্তত পনেরো দিনই ট্যুর ৷ আজ হায়দরাবাদ, তো পরের হপ্তায় ইস্তানবুল, ফিরেই জয়পুর, তারপরই প্যারিস ৷ সদ্য চাকরি নিয়ে এ শহরে প্রথম এসে, এমনিই একদিন মামিমার বন্ধু তনিমা বড়ালের সঙ্গে দেখা করতে এসে এমনই মায়ায় জড়িয়ে গেল, যে তখন থেকেই তারা পরম আত্মীয়, একে অপরের সহায় ৷ ওপরটা তো খালিই থাকে, নিরিবিলি, একটেরে ঘরটায় থাকুক না অনি নিজের মনে ৷ কতরকম বাজনা বাজে, জানলা দিয়ে আলো দেখা যায়—অল্পবয়সি ছেলেপুলেরা থাকলে বাড়িঘরে যেন হাওয়া-বাতাস খেলে, নয়তো সবই স্যাঁতসেঁতে ৷ যদিও তাঁর কাছে মানুষজন আসবার বিরাম নেই, তবু... ৷ কখনও একসঙ্গে রাতের খাবার খান, কখনও সকালের চা ৷ তা না হলে অনি তনুমাসিকে নিযে জ্যাজ শুনতে চলল, অথবা তনুমাসি অনিকে নিয়ে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ৷ আজ যেমন সকালে তাদের লুচি খাবার প্রোগ্রাম—রবিবার কিনা! তনিমার আর সে অর্থে রবি-সোমে কী আসে যায়, কিন্তু অন্যদের তো আর তা নয় ৷ ছুটির দিনে আজাদ আসে না, তাই গাড়ি চলে না ৷ মিরিয়াম গির্জায় যায়, তাই তিনি ফুলো ফুলো লুচি ভাজেন—তনিমা বড়াল হাতের কাজকর্ম সেরে ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে দোতলার দিকে চাইলেন ৷ বেলা হল বেশ, এখুনি হয়তো জানলা দিয়ে অনি হাঁক দেবে—‘‘ত-নু-মা-সি...’’
—‘‘ম্যাঁ-ও ৷’’
এ আবার কী? তনিমা অবাক হয়ে ডাকের উৎসস্থলে দোতলার জানলার বদলে নিমগাছের নীচে ডাঁই করা মাটির টব-সারের বস্তার দিকে চাইলেন ৷ কালো-হলুদ, ছাই সব রঙের মিশেল দেয়া, পেটমোটা, করুণ মুখের একটা বেড়াল, চেয়ে আছে তার দিকে, বাচ্চা হবে ৷ আহা, বেচারা ছোট্ট শরীরে মস্ত পেট নিয়ে নড়তে-চড়তেও পারছে না ৷ করুণায় বিগলিত হয়ে উঠতে না উঠতেই, তৎক্ষণাৎ মনে হল—সব্বনাশ, এরা তো এই সময়ই নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে, তাহলে? সত্যি বলতে কী, তার যেমন মায়ার শরীর, এরা বিপদে পড়লে, তাদের রক্ষা না করে তিনি মোটেই পারেন না ৷ আবার অন্যদিকে বিপন্ন বোধ করেন ৷ এখন তাকে কে দেখে তারই নেই ঠিক! তিনি এসব দায়িত্ব সামলাবেন কেমন করে? তবু অভ্যেসবশে সকালে পাখিদের দানা দেন, সামনের পার্কে হাঁটতে যাবার সময় গাছের নীচে নীচে পাউরুটির টুকরো ছড়িয়ে রাখেন কাঠবিড়ালিদের জন্য—সেখানে বড়ো গামলায় টলটলে জলেরও ব্যবস্থা আছে সবার ৷ পাড়ার বেড়াল, কুকুরদের দু’বেলা নিয়ম করে খাদ্য সরবরাহ করেন—কিন্তু ঘরে আর পোষেন না—সে অনেক ঝঞ্ঝাট ৷ একসময় তো কুকুর বেড়াল পাখি কচ্ছপ— কী না ছিল! তখন তো বাড়িতে মানুষজনও ছিল বিস্তর ৷ তা বাদে একা মানুষ এখন অনেকটা সময় এদিক-ওদিক চলেও যান চারদিকে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ছড়িয়ে আছে ৷ নিজের শখ শেষে মিরিয়ামের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া কি ঠিক! কিন্তু এ যে তার দিকেই চেয়ে গুটিশুটি দিয়ে বসে আছে! যেন সামান্য ভরসা পেলেই পায়ের দিকে এগিয়ে আসে—কী ঝঞ্ঝাট এই সাতসকালে ৷ খাবার দেয়া তো কোনও ব্যাপার নয়, সে তিনি গামলা ভরেও দিতে পারেন ৷ কিন্তু ও যা চায়, তাতে যে তনিমা অপারগ!
ওদিকে চাইব না, চাইব না করে বিমর্ষ-চিত্তে তনিমা ঘরের দিকে ফিরে চললেন—মায়া বড়ো বিষম বস্তু, কিন্তু নির্মম হওয়া আরও যে কত বিষম! দুপুরের দিকে বাগানে কি একটু খাবার রেখে দেবেন চুপিচুপি? থাকলে খেল, না থাকলে না! ওফ, কী ফ্যাসাদে যে পড়লেন তিনি...!
সেদিন সেই রবিবারের সকালে পেটমোটা বেড়ালটিকে যখন প্রথম দেখেছিলেন তার বাগানের আনাচে-কানাচে ঘুরঘুর করতে, তখনই প্রমাদ গুনেছিলেন, তা, হলও তাই! তার ঠিক ক-দিনের মধ্যেই, সব সার্ভে-টার্ভে সেরে নিয়ে, নিশ্চিন্ত হয়ে, নিম গাছের একপাশে ডাঁই করা টব-মবের আড়ালে তিনি তো খান চারেক বাচ্চা দিয়ে বসলেন! মারিয়াম্মা পরে অবশ্য জানিয়েছে, যে এরকম কাণ্ড আগেও নাকি ঘটেছে ৷ কিন্তু তখন তনিমা হয়তো এখানে ছিলেন না, তাই জানতে পারেননি ৷ বিকেলে গাছে জল দিতে গেলে, মিহিন গলায় মিঁউ মিঁউ শুনেছে, আবার ক-দিন পরে শোনেওনি ৷ অর্থাৎ বেড়ালের যা ধর্ম, মুখে করে এদিক-ওদিক নিয়ে গিয়েছে ৷ ইনি হলেন গিয়ে বহুপ্রসবিনী, এ পাড়ার সকল মার্জারকুলের আদি মাতাজি, ইত্যাদি... ৷ কিন্তু এবার যে তিনি স্বয়ং দিল্লিতেই, এবং শুধু তাই নয়, একেবারে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বাগানে বসে চা-ও খাচ্ছিলেন! চোখের সামনে দেখেন দলা পাকানো খানকতক হরেকরঙা বাচ্চা নিয়ে ভয়ে যন্ত্রণায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে তার দিকে ৷ ফলে তার দেখাদেখি তনিমাও হতভম্ব হয়ে সেরকমই চেয়ে রইলেন সেদিকে ৷ বেলা গড়াতে লাগল, চা রইল চায়ের নামে, তিনি ভাবতে লাগলেন আকাশ-পাতাল ৷
এ বাড়ি থেকে খানিক এগুলে ডাকসাইটে মাছের বাজার, আর আ-দিগন্ত বাঙালি পাড়া ৷ সে পাড়ায় বেড়াল থাকবে না, তাই কখনও হয়? সর্বোপরি হুলো বেড়াল ৷ তারা গোদা শরীর নিয়ে পাঁচিলে পাঁচিলে ঘুরে বেড়ায় আর মিনি বেড়ালের বুকের ধন কচি কচি দুগ্ধপোষ্য ছানাগুলোকে টপাটপ খেয়ে, ঢেকুর তুলে ফের ঝগড়া লড়াই করতে যায়৷ তনিমা কী যে করবেন ভেবে ভেবে কুলকিনারা পেলেন না ৷ একবার খবরের কাগজ এনে মোটা করে বিছিয়ে দিলেন গাছের গোড়ায়, একবার বড়ো জামবাটিতে গরম দুধে কমপ্ল্যান গুলে..., অতঃপর ডিম সেদ্ধ, মাংস-ভাত...সবই তো হল, কিন্তু তারপর? গাছে গাছে কাকের দল ‘কা, কা’ করছে, নীল আকাশে চিল উড়ে বেড়াচ্ছে ঘুরপাক খেয়ে, হুলোরা বোধ করি খবর পায়নি এখনও, তবে এই পেল বলে ৷
এরকম চিন্তাভাবনার মধ্যেই শেষে যখন সন্ধে নামলে বাগানে আলো জ্বালা হল, তখন তিনি তাঁর হাজার দোনামোনা, চিন্তাভাবনা—সব পুঁটলি বেঁধে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেস্টরুমের স্নানঘরে, প্লাস্টিকের একটা গোল গামলায় পুরোনো কাপড় পেতে, বাগান থেকে বাচ্চা সমেত তুলে আনলেন মাতৃদেবীকে ৷ চৌকিদার কমল এসে এঁটে বন্ধ করে দিল জানলা, যাতে আততায়ী প্রবেশের পথ না পায় ৷ মারিয়াম বলল রুমহিটার জ্বেলে খানিক তাপ দেয়া উচিত, বন্ধ বাথরুম তো রোদ না পেয়ে হিমঘর হয়ে আছে ৷ তনিমা জলের পাত্র রাখলেন, অন্য বাসনে মাছ-ভাতের মণ্ড—থাকো বাপু ক’টা দিন নিশ্চন্তে ৷ এই শরীরে আর ছুটোছুটি করে খাবারের খোঁজে বেরুতে হবে না ৷ চোখ-টোক ফুটুক তো আগে, তখন দেখা যাবে ৷—অনি সে সময়ে মাদ্রাজে, না ব্যাঙ্গালোরে, ঠিক মনে পড়ছে না ৷ যা হোক, মোট কথা ছিল না বাড়িতে ৷ থাকলে সে-ও কোমর বেঁধে লেগে যেত ৷ তা সে যাই হোক, সেই থেকে বাথরুমটি হল মেটারনিটি রুম—তবে অবশ্যই অস্থায়ী ৷ আঁতুড়ঘর কি আর স্থায়ী হয়!
সে না হয় হল না, কিন্তু তনিমা বড়ালের রোজনামচাটি সহসা বদলে গেল একবারে একশো আশি ডিগ্রি ৷ ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ, মাকে পেট পুরে খাইয়ে বাইরে বের করা, তারপর বাচ্চাদের কাঁথা কাপড় বদলানো, হিটার জ্বেলে বাথরুম গরম করা, নিজে হাতে স্যাভলন দিয়ে সব সাফসুতরো করা—যা নোংরা গন্ধ হয় ৷ অবশ্য এত সব করেও খুব একটা যে সুরাহা হয়, তা নয় ৷ বাথরুম ডিঙিয়ে গোটা ঘরখানাতেই কেমন যেন চিড়িয়াখানার বাঘের খাঁচার গন্ধ ৷ তা হোক, সে আর কী করা! বন্ধ ঘরের জীবজন্তুর তো আর পদ্মগন্ধ থাকবে না!
সুতরাং এর ফলে নিজের হাতে চা বানিয়ে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে গেয়ে বাগান পরিদর্শন করা, তৎসহ পাখির কিচিরমিচির, সদ্য ফোটা সুগন্ধি ফুলের স্বর্গীয় সুবাস, বুড়ো ঘেঁঘোরামদের সঙ্গে প্রাণ খুলে সুখদুঃখের গল্পগাথা, মহার্ঘ সোনালি রোদ্দুরের তাপে বসে, কাপড়ে সুতোর ফুল তোলা, এমনকি পরিজনদের আসা-যাওয়া, আড্ডা গল্প, বেড়ানো, সর্বোপরি সময়মতন বিশ্রাম, খাওয়া অথবা ঘুমও এখন অতীত কথা ৷ তবে এ কিন্তু কোনও খেদের কথা নয় ৷ কিংবা অনুযোগ বা আপশোশেরও নয়, কারণ ঈশ্বর বুঝি তাঁর একটা দরজা বন্ধ করলে আরেকটা খুলে দেন হাট করে ৷
তনিমা যে এই অবস্থান্তরেও কী আনন্দে বিভোর হয়ে আছেন, বলবার নয় ৷ ঈশ্বর বড়ো করুণাময়, তাঁর অসীম ভাণ্ডার থেকে কতরকম ধন যে তিনি কতভাবে বিলোন এই দীন হীন, কাঙালদের মধ্যে...! আর সেই অমূল্য ধন পেয়ে, এমন প্রায় অথর্ব অশক্ত, একাকী মানুষেরাও কেমন অপার আনন্দসাগরে হাবুডুবু খান...!
রুমহিটারের একেবারে সামনে, সোফায় বসে, কম্বলে হাত-পা গুঁজে দারুণ গা-ছমছমে একটা গল্প পড়ছিলেন তনিমা ৷ ঠিক ভূতের নয়, তবে ভূতুড়ে তো বটেই ৷ একজন অতি ভালোবাসর কাছের মানুষ যদি হঠাৎ করে বদলাতে শুরু করে, আর..., ফট করে বড়ো আলোটা জ্বেলে, সামনে হট চকোলেটের গেলাসটা রাখল মারিয়াম্মা ৷ ও বাবা, সন্ধে হয়ে এল যে! আসলে রুম হিটারের তাপে গা লাগিয়ে, সোনালি আলোর মধ্যে বাছারা গভীর ঘুমে অচেতন, আর তার দেখাদেখি নড়াচড়া বন্ধ করে তনিমাও মগ্ন ওই বই নিয়ে ৷ খেয়ালই করেননি দুপুর গড়িয়ে কখন যে বিকেলও শেষ হতে চলেছে ৷ সংবিৎ ফিরিয়ে বই বন্ধ করতেই দেখেন লাল-কালোয় ডোরাকাটা বাহারি স্পঞ্জের গামলায় চারটে সদ্য চোখ ফোটা বেড়ালছানা ঘুম ভেঙে লাল টুকটুকে মুখ খুলে মস্ত বড়ো বড়ো হাই তুলে আড়ামোড়া ভাঙছে, ওদের চোখে আচমকা আলো পড়েছিল কিনা! এইবার তাদের কসরত শুরু হবে ৷ তনিমা নড়েচড়ে বসলেন আরাম করে ৷ এই আমোদের কাছে কোথায় লাগে রাশিয়ান সার্কাস, অথবা পৌষমেলার সাঁওতালদের খেলাধুলো, কিংবা হলিউডের অস্কার পাওয়া বায়োস্কোপ! আহা...!
বয়স ওদের পাঁচ সপ্তাহ হয়ে গেল, বা হিসেবমতন বলতে গেলে আটতিরিশ দিন ৷ বেচারিদের এমন ঘনঘোর ঠান্ডায় জন্মদিনটি হবার ফলে ঠিকমতন হাত-পা খেলিয়ে বাড়তে পারছে না ৷ ওই হিটারের সামনেই যা নাচানাচি, বা পাড়াবেড়ানি মা ফিরলে তার ঘাড়ে পিঠে লাফালাফি—ব্যাস ৷ কার্পেটের বাইরে পা-ই ফেলে না ঠান্ডা মেঝেতে! কিনারা ঘেঁষে টলোমলো পায়ে ঘুরে বেড়ায় ৷ কখনও আবার কচি হাতখানা বাড়িয়ে একবার পরখ করে দেখে শীতলতার পরিমাপ ৷ কী বুদ্ধি, কী বুদ্ধি! তনিমা অবাক হয়ে ভাবেন, অতটুকু একটা প্রাণীর একরত্তি মাথার মধ্যেও কত আক্কেল যে তিনি দিয়েছেন! তারপর ডেকে ডেকে তিনি মারিয়ামকে দেখান, ঘরে থাকলে অনিকেতেরও তলব পড়ে ৷ শেষে তিনজনে মিলে, তাদের রঙ্গতামাশা দেখতে দেখতে হেসে গড়িয়ে পড়ে ৷ রাতের খাবার খেতে দেরি হয়ে যায় ৷ অনিকেতের পাহাড়প্রমাণ কাজ শেষ করতে রাত গড়ায়, তবু লাউঞ্জ ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না—নেশা একেবারে ৷ তনিমা বলেন—‘‘এই যে মাতা মেরি আমাদের খড়ের গাদায় যিশুদের জন্ম দিলেন, কী ভাগ্যি বল দিকিনি অনি! এবারের অন্ধকার, হাড়-কাঁপানো, বিটকেল শীতকালটা যেন মোটে টেরই পেলুম না, বল? বুদ্ধি করে তুলে আনলুম বলে না ৷ ভাব তো, সেদিনটা যদি বাগানে না থাকতুম, অথবা এই শহরেই? বাছারা কার পেটে যে যেত...!’’
চারটে বাচ্চা চার রঙের, এমনকি সাইজেও তারা অসমান, তবে অসুস্থ নয় ৷ ওদের মাতৃদেবীটি তো শতপুত্রের জননী—গান্ধারী ৷ এ পাড়ার সব বয়সের, সব রঙের, সব স্বভাবের, স-ব ক’টা বেড়ালেরই জননী মনে হয়, স্বয়ং ইনি ৷ তবু একটাও যে অপুষ্ট, আধমরা নয়, এই রক্ষে ৷
অপুষ্ট নয়...তবে, তবে এদের মধ্যে একটি যেন একটু কেমন কেমন অদ্ভুত ৷ বেশি শক্ত, কাঠ-কাঠ এবং যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন বেশি প্রকট হচ্ছে তার অস্বাভাবিকতা ৷ হাইও তোলে, স্বভাবমতন গড়াগড়িও দেয়, কিন্তু মনে হয় বুঝি বা দম-দেওয়া খেলনা ৷ এই কারণেই নাকি কে জানে, ওদের মা, মানে মিসেস গান্ধারী এটাকে যেন একটু এড়িয়ে চলে ৷ চাটে কম, কাছে এলে ঠেলে সরিয়ে দেয়, মাঝেমধ্যে ফ্যাঁসফেঁাস করতেও দেখেছেন ৷ আহা রে, চেহারা বা স্বভাবচরিত্র তো এতটুক দুধের শিশুর হাতে নেই! ফলে, তনিমাকেই আরও একটু স্পেশাল নজর দিতে হয় এটিকে ৷ এনার আবার খিদেটাও বেশি, ফলে মায়ের দুধে পেটও ভরে না ৷ গাঢ় ধূসর রং, প্রায় কালো, কিন্তু কালো নয়—অনেক রঙের মিশেল ৷ শেয়াল বা নেকড়ের যেমন থাকে, অনেকটা যেন তেমন ৷ বেশি লম্বাটে, মাথাটা ছোটো, কান দুটো বেমানান রকমের বড়ো আর চোখা ৷ বিড়ালাক্ষীর কথা আছে, কিন্তু এ কেমন অক্ষি রে বাবা! অতটুকু প্রাণীর এমন লালচে-কমলাই চোখ! তার থেকে আবার রোশনি বেরোয় ৷ আর সর্বোপরি এ সময় তুলতুলে উলের বলের মতন যেমন নরম ভাবটা হবার কথা, তার বদলে, যেন কাঠের..., না, কাঠও না, যেন কোনও ধাতুর তৈরি—হাত থেকে পড়ে গেলে শব্দ হবে ‘ঠং’ করে ৷
হট চকোলেটের গেলাসটা হাতে ধরে অন্যমনস্ক হয়ে চেয়ে ছিলেন সেদিকে—ক-দিন থেকে একটা চিন্তা মাথায় আসছে, একেবারেই ছোটোবেলাকার কথা ৷ তাঁর একটা খেলনা ছিল, বিলিতি ৷ রেডিয়াম দেওয়া লালচে চোখ, আর সবজেটে জিভের বেড়াল ৷ বেড়ালই তো, নাকি ওই জাতীয় কোনও জন্তু, ঠিক জানেন না ৷ তাদের দুমকার মামাবাড়ির ফায়ারপ্লেসের ম্যানটেলে রাখা থাকত ৷ রাতের বেলায় চোখটা জ্বলত, মুখের ভেতরটাও ৷ মা একবার রেগেমেগে ছুড়ে ফেলে দিলেন অলক্ষুনে জন্তু বলে ৷ তনিমার এক খ্যাপাটে মামা তাকে জন্মদিনে উপহার দিয়ে বলেছিলেন—‘‘দেখো বাপু, এ কিন্তু ভয়ানক রিভেঞ্জফুল! হেলাফেলা কোরো না!’’ সে নাকি বেলুচিস্তানের, নাম তার ‘আমির আলি’ ৷
এ যেন সেই আমির আলিই জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে এত বছর পরে ৷ কিন্তু এ কথা তিনি কাকে বলবেন? সে সময়কার কেউ কি আর আছে আশপাশে? মনে তো পড়ছে না ৷ আর পড়লেও তারা কি আর মনে করে রেখেছে—কী জানি... ৷ যাকগে, যাক ৷ ওসব হচ্ছে গিয়ে লৌকিক জং বাহাদুরের অলৌকিক অপবাদ ৷ তনিমা ওসব উদ্ভট চিন্তাভাবনা সরিয়ে দিয়ে গামলার দিকে নজর দিলেন ৷ হাই-টাই তোলা শেষ করে এখন তারা চারদিক দিয়ে বেয়ে-ছেয়ে উঠে লাফ দিয়ে নামবার চেষ্টা চালাচ্ছে, তার সঙ্গে অনবরত মিহিন গলায় ‘‘মিঁউ মিঁউ’’ ৷ খিদে পেয়েছে বাছাদের ৷ উড়নচণ্ডী মা এ সময় এলে হয়! আসলে এদের তো চোখ ফোটা পর্যন্তই সম্পর্ক ৷ একবার চোখ মেলে হাঁটাচলা শুরু করল তো, ব্যাস—জানলা গলে পালাল মা ৷ এনার ক্ষেত্রে অবশ্য এ বাড়িতে চর্ব্যচোষ্য খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাটা আছে বলে, আর বাইরে নেহাত অমন হাড়-কাপানো ঠান্ডা বলে, নিজের তাগিদেই বাধ্য হয়ে দু’বেলা ফিরে আসতেই হয় ৷ কর্তব্যের খাতিরে নয় ৷
সাদা বাচ্চাটা খিদে ভুলে কার্পেটে নেমে, নিজের মনে ল্যাজ নিয়ে খেলা করছে উলটেপালটে, আর তার দেখাদেখি বাকি দু’জনও ৷ কেবল শেষেরটিরই ভ্রূক্ষেপ নেই আর কিছুতে ৷ অনবরত কেঁদেই চলেছে, তৎসহ শুঁকছে কেবল এদিক-সেদিক ৷ খাবার খুঁজছে, নাকি মা’কে? তনিমা দুটো বিস্কিটের সঙ্গে চকোলেট চটকে মোয়া বানিয়ে দিলেন, নিমেষে শেষ ৷ অতঃপর হাত নেড়ে সামান্য খেলাবার চেষ্টা করে ভোলাতে যেতেই, অতি উৎসাহে তৎক্ষণাৎ কান্না থামিয়ে কুচিকুচি দাঁত দিয়ে হঠাৎ তাঁর কড়ে আঙুলটা কামড়ে ধরল খপ করে ৷ তনিমা আর্তনাদ করে উঠলেন যন্ত্রণায়, এই একফোঁটা ছানা, তার দাঁতে এত ধার! বড়শির মতন দুটো দাঁত ফুটে গিয়ে বোধ করি হাড় পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছে, আর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে টলটলে লাল দুটো বিন্দু ৷ তনিমা অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন সেই বিন্দু দুটির দিকে, এবং দেখতে দেখতে তা গড়িয়ে এল হাত বেয়ে, এ যে রক্তধারা! আর সেই মুহূর্তেই তাঁকে আরও বিস্ময়ে হতবাক করে ছানাটা তার ছোট্ট একটা জিব দিয়ে ব্যগ্র হয়ে সমস্তটা চেটে নিল চট করে ৷ এখন আর কাঁদছে না, খুঁজছেও না মাকে ৷ পরিতৃপ্ত হয়ে জিব চাটছে আর লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আঙুলটার দিকে, যেখানে আবার দুটো বিন্দু ফুটে উঠেছে স্পষ্ট হয়ে... ৷ তনিমা কেমন ভয় পেয়ে, তাড়াতাড়ি হাতটা গুটিয়ে, ঢুকিয়ে ফেললেন শালের ভেতরে ৷
পুরোপুরি স্বাবলম্বী করে দিয়ে, কাঁধের বোঝা নামিয়ে, মাতৃদেবী তো জানলা টপকেই বিদেয় নিলেন—আর সেদিকে ভ্রূক্ষেপও না করে, মহানন্দে ক্ষীরে-ননিতে মাখামাখি হয়ে গৃহপালিত বালগোপালরা বেড়ে উঠতে লাগলেন মা যশোদার আদরে-যত্নে ৷
শীত কেটে বসন্ত এল ৷ পার্কে ভরা ফুল ৷ অনির ছাতের টবে যেন আবির ছড়ানো ৷ পেছনের বাগানে তেমন ফুল নেই বটে, তবে গাছে গাছে টুনটুনি বুলবুলি শালিক ছাতারে টিয়ার শোরগোল ৷ ঝাঁকবাঁধা প্রজাপতি মৌমাছি—বেড়াল বাচ্চারা দামি দামি বিলিতি পাতাবাহারের গাছে চেপে, ডাল ভাঙছে, ফুল চিবোচ্ছে, পাতা ছিঁড়ছে, মাটি উপড়িয়ে ডিগবাজি খেয়ে, কতভাবে যে আনন্দ করবে দিশা পাচ্ছে না—সে বড়ো সুখের দিন ৷
ধবধবে সাদা তুলতুলে নরম, ঘুমকাতুরে বিশালকায় গোরাচাঁদ হেলেদুলে থপথপিয়ে দৌড়োয় ৷ খাওয়ায় মন নেই, নেহাত জাতটুকু বজায় রাখার জন্য নামমাত্র মাছমাংসে মুখ দিয়েই, দুধের জন্য বায়না ধরে ৷ আর পছন্দ পেঁপে কলা আলুসেদ্ধ ৷ অনি ওকে বলে, ভাটপাড়ার ভটচাযদাদু ৷ তা বাদে অবশ্য গোপাল ভাঁড়ও বলা যায়, যা মজার কাণ্ড করে, হাসতে হাসতে দম ফেটে যায় ৷
অন্যটি লিলিয়াম ৷ ছোট্ট একটা ফুলপরি ৷ কোলে না নিলে, ডাক ছেড়ে কাঁদতে থাকে ৷ বিস্কুটের টুকরো কোণে লুকিয়ে রাখে পরে খাবে বলে, খেলনাপাতিও তাই ৷ বালিশের ফাঁকে পছন্দের পুতুল মুখে করে নিয়ে গুঁজে দিয়ে পাহারায় বসে, কাউকে দেবে না ৷ হিংসুটির একশেষ, ন্যাকার চূড়ান্ত ৷ তনিমা ওকে কোলে বসিয়ে, মিলে-ঝুলে চলবার জন্য নানান জ্ঞানগর্ভ উপদেশ শোনান, মনটা উদার করবার নানান পদ্ধতি... ৷ তা দেখেশুনে অনি বলে—‘‘ভস্মে ঘি ঢালছ তনুমাসি, জ্ঞানের কথায় ওর কিচ্ছু হবে না, ওকে বরং বম্বে পাঠাও, হেসেকেঁদে বলিউড কাঁপিয়ে দেবে..., মিস লিলিয়াম ৷’’ কী আহ্লাদী, কী যে আদুরে, ফুরফুরে একটা কাঠবিড়ালী যেন ৷
আহ্লাদী অবশ্য জং বাহাদুরও, তবে সে আদুরেপনা কেবলমাত্র তনিমার সঙ্গে ৷ পেশিবহুল, শক্তপোক্ত চমৎকার চেহারা, লম্বা ল্যাজ দুলিয়ে হেঁটে চলে বেড়ালে সবাই হাঁ করে চেয়ে থাকবে ৷ ছাঁটা লোমে আলো পড়ে যেন চমকে ওঠে ৷ লম্বা গলা, সরু কোমর, লালচে চোখে চাউনি কী! যারাই দেখে, অবাক হয়ে যায়, মায় ওদের ডাক্তারও ৷ প্রথম যেদিন ছুঁচ ফোটাতে এলেন, একে দেখে তো কেবল বিড়বিড়ই করতে থাকলেন আধ ঘণ্টার উপর ৷ বলেন—‘‘একে কোথায় পেলেন? এমন জাত বইয়ে পড়তে হয়েছিল বটে, তবে চাক্ষুষ বোধ হয় কেউই দেখেনি ৷ আসলে এদের জন্মস্থান তো... ৷’’ ভদ্রলোক আর শেষ করতে পারলেন না—কোন কালে পড়েছেন, প্র্যাকটিস না থাকলে কি আর সব মনে থাকে! তনিমাও আর ভাঙলেন না ওর জন্মরহস্য ৷ এই ভেতো বাঙালি পাড়ায়, কোথা থেকে উদয় হয়েছিলেন এর পিতৃদেব কে জানে ৷ কত রহস্যই যে থাকে দুনিয়ায়! মারিয়াম্মা যদিও বলেছিল একবার, যে তাদের দুমকা অঞ্চলের জঙ্গলে এ ধরনের একটা জন্তু ছিল—কামোট ৷ অনেক কিছুর মিশ্রণে বোধহয়, এখন আর নেই ৷ মরে-ধরে গিয়েছে ৷ সে নিজেও দেখেনি, শুনেছে লোকমুখে ৷
শিশুকালে যেমন লোহায় গড়া, দম দেওয়া খেলনা মনে হত, এখন কিন্তু আর সেরকম নয় ৷ মনে হবে পাথরে গড়া অপূর্ব এক মূর্তি ৷ তেমনই ভারী, ততটাই কঠিন, এমনকি শীতলও ৷ তবে কোনওমতেই এদেশি নয়, সম্পূর্ণ ভিনদেশি ৷ তনিমার কোমরের ফাঁকে হাঁটুর খাঁজে মুখ গুঁজে আদর করে, লজ্জা পেয়ে মুখ লুকোয়, খানিক বাদে বাদে ছুটে এসে গাল চেটে দিয়ে যায় ৷ স্নানে গেলে, দরজার বাইরে বসে থাকে ৷ অনি খেপায়, বলে— ‘‘তনুমাসি, তুমি দেখছি হান্টারওয়ালিকেও ছাড়িয়ে গেলে, এই ব্যাটা প্যান্থার, তাকেও বশ করে নিলে ৷ ধন্যি তোমার ক্ষমতা মাসি!’’
বশ আর করবেন কী, কোলেই তুলতে পারেন না, এমন ভারী ৷ আর খাইয়েও কূল পান না, এমন খিদে ৷ একটু দেরি হলে বাঘের মতন ছটফট করতে থাকে ৷ ঘুরপাক খায়, চোখ-মুখ পালটে যায়—খিদে সহ্য করা ওর পক্ষে অসম্ভব ৷ প্যাকেট ভরা ভিটামিন, মিনারেল সমৃদ্ধ ক্যাট ফুডে ওর পেট ভরে না, তেনার জন্য অন্য ব্যবস্থা ৷ গামলা ভরা মাংস-ভাত, সবজি দেওয়া চিকেন স্টু—ব্যাটা সত্যি নবাবজাদা ৷ গাছে চড়ে খেলা করে, ডিগবাজি খেয়ে মজাও করে, কিন্তু ওই... ৷ যেন বেড়াল নয়, অন্য কিছু ৷ অন্যদের মতন পাশে গা ঘেঁষে শুলে একদম স্বস্তি পান না, একটু ভয় ভয় করে ৷ জং বাহাদুরের বাহাদুরি আছে বটে, তনিমাকেও ভয় পাওয়ায় ৷ তায় আবার বেড়াল হয়ে!
এরপর চতুর্থটির বিষয়ে বিশদ আর কিছু না বলাই শ্রেয় ৷ নামকরণ হয়েছিল নাথুরাম, সম্প্রতি সে হারিয়ে গিয়েছে ৷ প্রকৃতি এখন কত মনোরম, এত কিছু সুন্দরের মধ্যে ছোট্ট চাঁদের কণাটিকে কে যে তুলে নিল! নিরিবিলি পাড়া হলেও গাড়িঘোড়ার অভাব নেই, আরও আছে বড়োলোকের বড়ো বড়ো বিলিতি কুকুরের সান্ধ্য-ভ্রমণ ৷ পেছনের ম্যানহোলটাও একটু ভাঙা—একটা দুপুর তিনি বাইরে ছিলেন, বিকেলে ফিরে আর দেখলেন না ৷ হায় রে কপাল! অসুখ হয়ে মারা গেলে, একটা অন্তত সান্ত্বনা থাকত ৷ কিন্তু এ কেমন শাস্তি! সারাটা দিন জনে জনে জিজ্ঞাসাবাদ, রাতে আধো ঘুমের মধ্যেও জেগে ওঠেন যেন ডাক শুনে... ৷ সহোদরদের কিন্তু ভ্রূক্ষেপও নেই, বাদে জং বাহাদুর ৷ সে কেবল গোটা একদিন মনমরা হয়ে খাওয়াদাওয়া করল না, শুয়ে রইল এক কোণে—বোঝা যায় না, কার যে কোথায় মায়া মমতা!
সূয্যি উঠতে না উঠতেই তার কী তেজ রে বাবা, চারদিক যেন খাঁ খাঁ করছে ৷ আকাশ ঘোলাটে, গাছপালা ঝিমুচ্ছে৷ পাখিদের গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না, কেবল ডালে ডালে হাঁ করে বসে আছে, একটু জল পেলে গলাটা ভিজিয়ে নিত ৷ কিন্তু সে আর পাচ্ছে কোথায়; গামলা ভরা টলটলে জলের সামনে ওঁত পেতে যে বসে আছে বড়াল দিদিমার বেড়াল-পুষ্যিরা, নামলেই কপাৎ ৷ ফলে থাকো বসে হাঁ করে, কখন তেনাদের বাইরের গরম অসহ্য হলে, ঠান্ডা মেশিনের হাওয়া খেতে ঘরে ঢোকা হবে!
চারদিকে এই আগুন-পোড়া গরম হলেও পাঁচিল তোলা, গাছে ঢাকা তনিমার ছোট্ট বাগানখানা কিন্তু রীতিমতন ঠান্ডা৷ বোশেখ-জষ্টি মাসের শুকনো বাতাস বইলে, ছায়ায় বসে বেশ আরাম ৷ অনিও আজকাল এখানে বসেই চা-জলখাবার খায়, খবরের কাগজ পড়ে, ল্যাপটপে জরুরি কাজকর্ম সেরে নেয় ৷ রাতদিন ওই ঠান্ডা বদ্ধ ঘরে থেকে থেকে এই একটা সময়, যখন তাজা আলো-বাতাস নেওয়া যায় ৷ তনুমাসিও পুষ্যিদের কোলেকাঁখে গুঁজে, তাঁর ছেলেবেলাকার গল্প বলেন, স্কুল-কলেজের, হস্টেলের ঘটনা, বাবা-মায়ের কথা, ভাইবোনের কাণ্ডকারখানা... ৷ এসব আসলে নিজের মনে সরব স্মৃতিচারণ, এবং তারাও খানিক আরাম করে নিয়ে শেষে উশখুশ করে ৷ গোরাচাঁদ ভেজা মাটিতে লম্বা হয়ে নাক ডাকে, লিলিয়াম জলের ধারে বসে নিজের ছায়া দেখতে দেখতে ঢুলে পড়ে, আর জং বাহাদুর ঘুমোয় গাছের ডালে হাত-পা ঝুলিয়ে ৷ ও কিনা প্যান্থার, নাকি পুমা, অথবা চিতাও হতে পারে ৷ আর মারিয়ামের কথায় কামোট না কী যেন ৷ পশু-ডাক্তার রানা যার জন্মস্থানটা এখনও স্মরণে আনতে পারেননি, আর তনিমা বড়াল তার জন্মরহস্যটা ৷ তা, সে গাছে ঘুমোবে না তো কি দোলনায় ঘুমোবে? অন্ততপক্ষে রাতে যে বিছানায় গা ঘেঁষে, মুখ গুঁজে ঘুমোয়, এই না ঢের! কী যে ভালোবাসে তাকে, সে আর বলবার নয় ৷ জ্বরজ্বারি বা শরীরটা বেজুত হলে, ঠায় বসে থাকবে বিছানার পাশে ৷ ক্ষণে ক্ষণে চেটে দেবে—ওর জন্য নিজের মনে চোখ বুজে একটু শুয়ে থাকাও দায় ৷
সে দায় অবশ্য সবেতেই ৷ কেবল দায় না, একেবারে দায়বদ্ধ ৷ এ বয়সে এ যে কী মায়ায় জড়িয়ে গেলেন! কোথায় ভেবেছিলেন সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে প্রাণীকুলের সেবা করেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন, বিধি হলেন বাম ৷ এই তিনজনকে আতুপুতু করে সামলাতেই দিন যায় ৷ পাখিদের দানা, কি কাঠবিড়ালীদের ফল দিতেও এখন তিনি নামজপ করেন, এই বুঝি পেছন থেকে ধরল এসে ক্যাঁক করে ৷ তিনিই তো শেষে পাপের ভাগী হবেন! আর এরাও কী সব ব্যাধের বংশধর নাকি? ...সে না হয় গেল, কিন্তু...
আদতে, গৃহপালিত হলেও এরা তো শিকারির জাত ৷ কুকুর, বেড়াল তাড়া করে, বেড়াল, ইঁদুর, ছুঁচো; পাখি উচ্চিংড়ে-বোলতা—এ তো জানাই কথা ৷ তবে বাড়ির কুকুর কেবল তাড়াই করে, শিকার নয় ৷ আর বেড়ালের ঘর-বারের বালাই নেই, সামনে পেলেই ধরল খপ করে ৷ গাছেরও খাবে, তলারটাও কুড়োবে ৷ ক-দিন আগে তো এই ফুটফুটে লিলিয়ামও টিয়ার ছানা ধরে এনেছিল তনিমাকে দেখাতে ৷ তিনি আর কী করবেন, দুঃখে প্রাণটা ফেটে যায়, হায় হায় করেন, তবুও জীবের ধর্ম ৷ কিন্তু জং বাহাদুর তো জঙ্গি, তাই ওর শিকারের ধুমটাও বেশি ৷ এই পায়রা ধরছে, ওই ঘুঘু ৷ ইঁদুর-টিঁদুর তো মনে হয় গোটা পাড়াটাই সাবাড় করেছে ৷ অনি তো বলেই, ওকে ফুড কর্পোরেশনের গুদোমে পাঠাতে—ও এক মাসের মধ্যে নাকি বেড়াল থেকে বাঘ হয়ে যাবে ৷ তবে দুষ্টু বাচ্চাদের যেমন সবার দোষ তাদের ঘাড়ে পড়ে, জং বাহাদুরেরও তাই ৷ গত মাসে কে একজন কমলকে বাড়ি বয়ে নালিশ করে গিয়েছে যে তাদের বাড়ির সদ্য-ফোটা সব ক-টা বেড়ালছানাকে নাকি ইনি খেয়ে গিয়েছেন ৷ কমল আর কী বলবে! ‘‘কে বলেছে এ বাড়িরই বেড়াল’’, ‘‘হুলোরা অমন করেই থাকে’’, ‘ছোটো ছানাদের তো ঘরে রাখা উচিত’’ ইত্যাদি হাজাররকম ব্যাখ্যা দিয়েছে বটে ৷ কিন্তু সেও শাসিয়ে গিয়েছে, যে—‘‘দেখো একবার, আমিও কী উচিত কাজ করি ৷’’ সে যে কী করবে, তা তনিমা কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন ৷ তবে তিনি যে কী করবেন—ঈশ্বরই জানেন ৷
এ তো গেল শোনা কথা, আন্দাজি বা অনুমানের ব্যাপার ৷ কিন্তু দিন দুয়েক আগে হয়েছে কী, মারিয়াম গিয়েছে দোকানে ৷ কী কারণে একটু দেরি হওয়াতে বুঝি খাবার সময় পেরিয়ে গিয়েছে সামান্য ৷ সে—এমন ছটফট করতে থাকল! ঘুরপাক খাচ্ছে, অদ্ভুত চাউনি ৷ শেষে ব্যালকনি টপকে বেরিয়ে গেল লাফ দিয়ে, আর তার খানিক বাদেই পার্কে মহা শোরগোল—কার বাড়ির আদরের কুকুরকে তিনি তাড়া করেছেন ৷ আর কেবল তাড়াই নয়, তীর বেগে ধাওয়া করে পায়ের উপর দিকে কামড়েই ধরেছে ৷ যাঁর কুকুর, তিনি তাঁর বেঁটে লাঠি দিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন, লাফাচ্ছেন চারধার ঘুরে ৷ লোকজন জড়ো হয়েছে, বাচ্চাদের সরানো হচ্ছে নিরাপদ জায়গায়, একদল তাস খেলুড়ে, তারা পটাপট মোবাইলে ছবি তুলে নিচ্ছে—এমন দুর্লভ দৃশ্য কি সবার ভাগ্যে জোটে! তনিমার দুর্ভাগ্য যে, তিনিও বারান্দায় দাঁড়িয়ে, অতি সুলভেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দেখলেন সেটি ৷ শেষে অবশ্য মারিয়ামই কী কৌশলে যে ছাড়িয়ে আনল তাকে... ৷ তনিমার এখনও ভাবলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় ৷ এ কেমন রাগ রে বাবা, কী ভয়ংকর তেজ, নাকি পাগুলে খিদে, অথবা নেহাতই পাগলামি? কী জানি ৷ পশুদের শারীরিক রোগের চিকিৎসা আছে, মানসিকেরও কি হয়?
গত পরশু থেকে লিলিয়ামকে পাওয়া যাচ্ছে না ৷ খোঁজ চলছে, ছাতের আনাচকানাচ, জলের ট্যাঙ্ক—কিছুই বাদ যায়নি ৷ অনি নেই, তাও তালা খুলে দেখা হল, যদি ঢুকে বসে থাকে ৷ কাল গোটা দিন, আজও দিন ফুরিয়ে রাত—কোথায় গেল! এমনটা তো কখনও হয়নি! এই দুটো দিন, তনিমা দফায় দফায় কেবল খুঁজে বেড়িয়েছেন, সঙ্গে মারিয়াম নয়তো কমল—কিন্তু এখন আর শরীরটাই বইতে পারছেন না ৷ অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে কেবল কেঁদেই চলেছেন অনবরত ৷ অনিকেত ছিল না শহরে, আজই ফিরে এই খবর ৷ বেচারা আর কী করে, মাসির শিয়রে বসেই আছে ঠায় ৷ গোটা বাড়ি শোকে নিঝুম ৷ ঘরে আলো জ্বলছে না, রান্নাঘরে আজ আর হাঁড়িও চড়েনি—তনুমাসি অন্নজল ত্যাগ করেছেন, সঙ্গে জং বাহাদুরও ৷
গত দু-দিন ধরে, সকাল-বিকেল কেবল প্রাত্যহিক কর্মটি সেরেই, বাকি সময়টা নাকি ঘাড় গুঁজে শুয়েই থাকে তনুমাসির কাছে ৷ অনি ওর মাথাতেও হাত বোলাল খানিক ৷ আহা রে, এমন শক্তপোক্ত লৌহকপাট মার্কা চেহারা বলে বোঝা যায় না, মনটা কিন্তু বড্ড নরম ৷ কিছু একটা বোঝে নিশ্চয়ই, সে সহোদরার জন্যই হোক বা তনুমাসির কারণেই... ৷ যে খিদেই সহ্য করতে পারে না, সেও কেমন উপোস করে শোক পালন করছে! বিচিত্র এই জীবজগৎ, সত্যি ৷
অনিকেত তনুমাসির জন্য রান্নাঘর থেকে একটু হট কোকো আর বিস্কিট নেবার সময় মারিয়ামকে বলল, জং বাহাদুরকেও একটু কমপ্ল্যান মিশিয়ে বাটি ভরে দুধ দিতে—খাওয়া বন্ধ করেছে, কিন্তু শরীরে জলীয় পদার্থ তো দরকার ৷ উত্তরে মারিয়াম বলল, সে, জল নাকি ও প্রচুর খাচ্ছে, বারবার, ঘুরে ঘুরে ৷ পেটটা তো তাইতেই ফুলে জয়ঢাক, মাগর, খানা খাবে না মাতাজি না খেলে—দেখো, কাল যদি বা খায়... ৷
অনিকেত লাউঞ্জের বাতিটা জ্বেলে শোবার ঘরের দিকে চলে গেল ৷ শীতের সময় এই জায়গাটাই ছিল যাকে বলে আনন্দনিকেতন ৷ চারটে বাচ্চা, তারা সবাই, ঝলমলে আলো জ্বলছে, রুম হিটারের তাপ, মজা, হাসি-ঠাট্টা ৷ প্রথমে নাথুরামটা গেল, এবার এটি... ধুর ৷ এ বাড়ির প্রাত্যহিক ছন্দটাই কেটে গেল ৷ গোরাবাবাও নাকি খেলে না, মারিয়ামের কোলেই বসে থাকে সারাদিন—তবে সে অন্তত খায় ৷ আর জঙ্গিবাবা মাসির কাছেই পড়ে আছে সারাদিন ৷ কিন্তু হারালটা কীভাবে! এই পচা গরমে ওরা এসির দিকে চেয়ে চেয়ে নাকি হাই তোলে, যতক্ষণ না চালাবে, ততক্ষণ ঘুমোবে না ৷ এসব অবশ্য তনুমাসির কথা, তাই নিয়ে কত হাসাহাসি... ৷
আসলে ওই ভয়ংকর গরমের পর বৃষ্টি হলে, সে আরও ভয়ানক হয় ৷ তেতে ওঠা জমি বাড়ি রাস্তা থেকে কেবল যেন বাষ্প বেরুতে থাকে ৷ ঘন, ভারী বাতাস, অথচ হাওয়া বয় না ৷ গাছপালা খানিক সবুজ হয় বটে, কিন্তু তার সঙ্গে হাজার পোকামাকড়, মশা মাছি ৷ বাগানে বসা যায় না, বারান্দায়ও না, গুমোট গরম, হাঁসফাঁস অবস্থা ৷ এ বছর বৃষ্টিই নেই ৷ আকাশ থমথমে হয়ে থাকল সারাটা দিন ৷ শেষে দু-চার ফোঁটা হল কি হল না ৷ মেঘ কাটল না, হাওয়াও শীতল হল না—অথচ পরশুর আগের দিন কী যে হল, হঠাৎ কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! আকাশ উপুড় করা ঝুম বৃষ্টি যাকে বলে ৷ আর যাবি তো যা, তনিমা সেদিনই গেলেন খান মার্কেটে ৷ ক্যাট ফুডও শেষের দিকে, নিজেও অনেকদিন ঘর বন্ধ..., অতঃপর ফিরলেন ওই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তখন ৷ আলো চলে গিয়েছে, ভিজে সপসপে, রাস্তায় জল, জনমনিষ্যি নেই ৷ উনি ফিরেই ভেজা জামা বদল করেছেন, আদা দিয়ে চা..., নজরই দেননি পুষ্যিদের ওপর, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত? গোরাচাঁদ ঘুমচ্ছিল সোফার ওপর, সেটি মনে আছে, বাকিরাও ধরেই নিয়েছেন আছে তাদের মতন ৷ নাকি সেটুকুও ধরেননি নিজের স্বার্থেই, মগ্ন তখন ৷ ‘ঠান্ডা লেগে গেল নাকি’, ‘কারেন্ট কখন আসবে’, এটা, ওটা ৷ আহা রে, তখনই যদি খুঁজতে যেতেন... ৷ তনিমা জামার হাতায় চোখের জল মুছে নিলেন ৷ সকাল হয়ে গিয়েছে, অনি এসে আবার জোরজার করবে খাবার জন্য, মারিয়াম্মা হাজার কথা বলবে আর কীসের খাওয়া, কীসেরই বা কথা..., দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে বসলেন তনিমা ৷
ড্রাইভওয়েতে অনিদের গলা শুনছেন, মারিয়াম্মাও কিছু বলল, কমল খিড়কিদোরটা খুলছে শব্দ করে—এল নাকি? তনিমা বারান্দায় গেলেন উৎসুক হয়ে ৷
পেছনের গলিতে একটা বেওয়ারিশ গন্ধরাজ গাছে ঝেঁপে ফুল হয়, রোজ মারিয়াম তুলে এনে রেকাবিতে সাজিয়ে রাখে ৷ এ ক-দিন তো সে বালাই-ই ছিল না ৷ কিন্তু আজ তো ওদিকে যাওয়াই যাচ্ছে না—কী পচা গন্ধ! অনি শুনেই, তৎক্ষণাৎ কমলকে নিয়ে রওনা হয়েছে, তনিমাও ক্লান্ত শরীরে এগিয়ে গেলেন ৷
ফুলে ভরা বড়ো গাছটার নীচে ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়, বেশি কাছে যেতে হল না—অনিকেত ‘‘লিলিয়া—ম’’ বলে ডুকরে উঠে তনুমাসিকে আঁকড়ে ধরল ৷ অবশিষ্ট আর বেশি কিছু নেই, সামান্য কিছু অংশমাত্র!
এ পাড়ার বড়ো বড়ো বাড়ির, বড়ো বড়ো কুকুর ভারি নিরীহ, কিন্তু বেপাড়ার ছাড়া কুকুরেরা রাতে আসে দল বেঁধে৷ ওই বর্ষার সন্ধ্যায় তনিমাকে না পেয়ে বেরিয়েছিল বোধহয় গেটের বাইরে ৷ বেচারি বেশি নরম, বেশি আদুরে৷ জং বাহাদুর থাকলে টুঁটি চিপে ধরত ঘাতকদের ৷ ও তো দু দিন থেকে ওদিকে যাচ্ছে, আসছেও ৷ বোধহয় দেখাতে চেয়েছিল ওই বধ্যভূমি, তারা বোঝেনি ৷ তনিমা বড়াল কাঁদতে কাঁদতে বিছানা নিলেন ৷
দিন তো কেটে যায়ই তার নিয়ম মতন ৷ সকাল যায়, সন্ধে আসে, মাসের পর মাস ৷ আর এবারের শরতে তনিমার কাছে একটানা অতিথিও ৷ কেউ মহালয়ার পরই দিল্লি হয়ে রাজস্থান যাচ্ছে, নয়তো কেউ দশমীর আগেই দিল্লি দর্শন করে কুলু-মানালি ৷ এ যদি নিউ ইয়র্কের জন্য প্লেন বদল করে, তো ও সিঙ্গাপুর যাবার পথে দু’ দিন থেকে যায় ৷ তা বাদে, এই বাঙালি পাড়ায় পুজোর হুজ্জোতও তো কিছু কম নয়! তার উপর কমল দেশে গিয়েছে, এক ক্যাবলাকে বদলি দিয়ে ৷ সে কেবল লাঠি ঠকঠক করে আর ঝিমোয় ৷ কানেও শোনে না, চোখেও দেখে না ৷ অনি দিনকতকের জন্য বাইরে যাবার আগে বলেই গিয়েছে যে, এই নিধিরাম শর্মাকে বদল করবেই, ততদিন মাসি আমাদের হেপাতজেই থাকুন ৷ তনিমা বললেন যে তাকে অত চিন্তা করতে হবে না, ও নিশ্চিন্তে ঘুরে আসুক ৷ কমলের ফেরবার সময় তো হয়েও এসেছে ৷ ‘কানামামা’ যেমন আছে, থাক না ক-টা দিন, বেচারা ৷ এবার তার দুই ‘ইয়াং বন্ধু’ আসছে, তারাই চৌকি দেবে ৷
অনিকেত চলে গেল, ‘ইয়াং বন্ধুরা’ও এল ৷ তবে আসা ওই নামেই ৷ একদিন থাকে তো তিন দিন ঘোরে ৷ মারিয়ামের দেশ থেকে বোন এসেছে, তার ভাইয়ের বাড়ি ৷ দিন দুয়েক ছুটি নিয়ে নিজের ভাষায় গল্প করতে গেল—আহা, যাক ৷ ক্রমাগত এই যে পর্যটকের ঢল—সেসব তো ওকেই সামলাতে হয় ৷ যাবার আগে মাতাজির জন্য ফ্রিজে সব মজুত ৷ দু’বেলা ফোনে কথাও তো হবে, দরকার হলেই যেন ডাকেন ৷ বেশি দূর তো নয়, চট করে চলে আসবে ৷ তা ছাড়া কাল ভোরে তো অনিদাদাও এসে যাবে... ইত্যাদি ৷ তনিমা মনে মনে বললেন, যাও বাবা, যাও ৷ আমি দুটো দিন একটু নিরিবিলিতে থাকি—বয়স হয়েছে বোঝা যায় ৷ বেশি কথা, লোকজন, যেন হাঁসফাঁস লাগে ৷ দুপুরে ফাঁকা বাড়িতে খিচুড়ি বেগুনভাজা খেয়ে, চমৎকার বাজনা চালিয়ে, দারুণ একটা গল্পের বই নিয়ে আরাম করে বসলেন তিনি ৷
পুরোপুরি সন্ধে তখনও হয়নি, পার্কে বাচ্চাদের কোলাহল, মানুষজন কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরছে—এ সময়টা বেশ শোরগোল চলে ৷ গাড়ির হর্ন, পথচারীদের আলাপ, কাজের লোকেদের দলবদ্ধ হয়ে উচ্চৈঃস্বরে গালগল্প—তারই মধ্যে একটা কানফাটা ভয়ংকর চিৎকার শোনা গেল, কিছু যেন উলটে পড়ল, আরও কিছু, অনেক কিছু, তার সঙ্গে আবারও একবার আর্তস্বর কি? রাস্তা দিয়ে কেউ যাচ্ছিল, থমকে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকালো ৷ পেছনের বড়ো বাড়ির ছাত থেকেও উৎসুক হয়ে মুখ বাড়াল দু’জন কাজের লোক গোছের ৷ টিভি সিরিয়াল নিশ্চয়ই, এ সময় কোনটা যেন হয়, খুব হল্লা-গুল্লার? আর ভলিউমও দিয়েছে বাবা! এত জোরে চালায়!
অনিকেত যখন ফিরল, নামেই তখন সকাল হয়েছে বটে, তবে পুরোপুরি অন্ধকার ৷ যথারীতি নতুন চৌকিদ্দার মুড়িসুরি দিয়ে গভীর ঘুমে—তবে তনুমাসির প্রায় সব ঘরেই আলো জ্বলছে ৷ সব বলতে ওদিকটা দেখা যায় না, তবে লাউঞ্জ, শোবার ঘর, বসার ঘরেও বোধহয়... ৷ কেউ এসেছে নাকি? ভোর সকালে বোধহয় শতাব্দী ধরবে! আসে তো এরকম প্রায়ই—ওই ‘ইয়াং বন্ধুরা’ নাকি? অনিকেত জিনিসপত্তর নিয়ে ওপরে চলে গেল ৷ সকাল হোক, তখন দেখা করবে ৷ ততক্ষণে শতাব্দীও দিল্লি ছেড়ে যাবে নিশ্চয়ই ৷
কার্তিকের ভোর তো, এ সময়টা একটু ঠান্ডা ভাব থাকে ৷ ফলে গিজারটা চালিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে কাজকর্ম সারতে লাগল অনিকেত ৷ জিনিসপত্তর আনপ্যাক করে, দরকারি কাগজ-টাগজ আগেভাগেই গুছিয়ে নিল ৷ তারপর কুসুম গরম জলে ভালো করে স্নান করে, এক কাপ চা-ও খেয়ে নিল ৷ আজ অফিস নেই, তবে একবার যেতে হবে ওদিকে ৷ জানলা দিয়ে নীচের বাগানে তাকালো ৷ কেবল আলো ফোটা নয়, হেমন্তের সকালে মরশুমি ফুলগাছের ওপর একফালি সোনালি রোদ্দুরও পড়েছে—তনুমাসি আসেননি এখনও ৷ আজ রোববার, লুচির তোড়জোড় চলছে নাকি! অনিকেত সুগন্ধির শিশিটা আর চকোলেট নিয়ে নীচে চলল ৷
ঘরের আলোগুলো তখনও নেবানো হয়নি, অনিকেত চৌকিদারকে তিনবারের চেষ্টায় বোঝাতে পারল—মাতাজির কাছে কেউ এসেছে কি না ৷ এবং সে আরও অনেক কষ্টে বোঝাতে পারল যে, এসেছিল কি না তা সে জানে না ৷ তবে কেউ যে যায়নি, সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত ৷ বেকার আর বাড়তি প্রশ্ন না করে অনিকেত বেল বাজালো—খুলল না ৷ দুবার, তিনবার, চারবারেও না ৷ বাগান দিয়ে ঘুরে ঘুরে সব ক’টা জানলা পরখ করল ৷ কোনওটায় জালি আটকানো, কোনওটায় কাচও, তবে কোথাও আওয়াজ তো নেই! মারিয়াম্মার ঘরেও বাইরে থেকে তালা—এসব কী?
অনিকেতের ভালো লাগচ্ছিল না, কেমন অস্থির লাগছিল ৷ ওর কাছে নীচের চাবি নেই—দরকারই তো হয়নি কখনও, তবে মারিয়াম্মার সেল ফোন নাম্বার তো আছে! দৌড়ে ওপরে গেল ফোন করতে, পেলও ৷ বলল, ‘‘তুমি কোথায়?’’ নিশ্চিন্ত খুশির গলায় সে কাল ফিরবে শুনে, ভাঙা-ভাঙা, কাঁপা গলায় অনিকেত বলল, সে যেন এখনই চলে আসে, তার মোটেই ভালো ঠেকছে না ৷
রবিবারের সকাল ৷ ধীরে ধীরে লোকজন জড়ো হচ্ছিল চারিদিক থেকে ৷ ঠিকানা আর গাড়ি দিয়ে একজনকে পাঠানো হল মারিয়াম্মাকে নিয়ে আসতে ৷ ওর কাছেই চাবি, নয়তো যে দরজা ভাঙতে হয় ৷
খোলা হল দরজা ৷ অনিকেতের আশেপাশে যেন আর কিচ্ছুটি নেই, কেউ না ৷ ধীর পায়ে শূন্য লাউঞ্জে দাঁড়ালো ৷ ভাঙা টি-পট, ছিটকানো ট্রে, দোমড়ানো গল্পের বই পেরিয়ে শেষে শোবার ঘরে ৷ প্রথমেই আলমারির মাথা থেকে ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে এল গোরাচাঁদ ৷ বাকি ঘর লন্ডভন্ড, এটা-ওটা উলটে আছে, তারই মধ্যে পড়ে আছেন রক্তাক্ত তনুমাসি, আর কোলের কাছে গুটিগুটি মুখ গুঁজে ঘুমোচ্ছে তাঁর চির অনুগত জং বাহাদুর... ৷
বোধহয় শরীর খারাপ লেগেছে, টলোমলো পায়ে বাথরুমে যাবার পথে এটা-সেটা ধরতে গিয়েছেন ৷ চেয়ার উলটোনো, টেলিভিশন পড়ে গিয়েছে, ফোনের চেষ্টা করেছেন—সেটি ঝুলছে ৷ ...ধারালো কিছুতে লেগেছে বোঝহয় গলার কাছে, কাচ-টাচ... ৷ আর, যাকে বলে বাজু, নরম তুলতুলে, ঝুলে পড়া মোটা হাতের বেশ অনেকটা অংশ নেই... ৷
এবার ডাক্তার আসবে, পুলিশ, গোয়েন্দা, আরও কে-কে, কে জানে—কত কাজ ৷ তারই মধ্যে বিষাদ ছাড়িয়ে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান অনিকেত সবিনয়ে পড়শিদের উদ্দেশে বলল যে, অভুক্ত বেড়ালদের খাবার দিতে হবে ৷ বেচারা, তারা তো জানে না কী সর্বনাশ ঘটে গেল!
গোরাচাঁদ এ সময়ে দুধ ছাড়া খায় না, বাগানে বুড়ো গন্ধরাজ অপেক্ষা করে বসে আছে, পার্কে পাখিদের দানা, কাঠবিড়ালীদের ফল... ৷ রান্নাঘরে বাসন ভেজানো, কাল দুপুরের পর ধোয়া হয়নি ৷ বিকেলে চা খেয়েছেন, তার বাকি ফুটন্ত জলটুকুও তখনও বাসনে ঢাকা দেওয়া ৷ জুতসই গল্পের বই পেলে তনুমাসির সময়জ্ঞান থাকত না ৷ জানতেন, জং বাহাদুর খিদে সহ্য করতে পারে না, তবুও... ৷
অনিকেত গ্যাসে দুধ গরম করল, নানান নির্দিষ্ট বাসনে বাকিদের খাবারও ৷ বেচারা গোরাচাঁদ খিদেতে ঝিমোচ্ছে—কেমন ঘুম-ঘুম ভাব—তবে জং বাহাদুরের খিদে নেই, ওর পেট ভরা ৷
অনিকেত সবার এই সংস্থানটুকু সেরে দোতলায় নিজের ঘরে ফিরে এল ৷ তারপর আলমারির চাবি আঁটা ড্রয়ার খুলে রিভলভারটা বের করে পরখ করল একবার, হাতে বেশি সময় নেই ৷ ভিড় বাড়বার আগেই, তাড়াতাড়ি... ৷ আবার কতক্ষণের মধ্যে ফের ওর খিদে পেয়ে যাবে, সে কথা তনুমাসি জানতেন না, কিন্তু সে এখন আরও ভালোভাবে জানে, জং বাহাদুর কত কম খিদে সহ্য করতে পারে ৷
রচনাকাল ২০১৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন