জলি বোসের জবানবন্দি

মিমি রাধাকৃষ্ণন

সাত-সকালে কলিং বেলের শব্দ হতেই ভুরুটা কুঁচকে উঠল পরমার ৷ এ সময় ঘন্টি বাজা মানেই জানা কথা সেটি হচ্ছে গিয়ে সুভাষের—রাতের গার্ড ৷ কতবার পই পই করে বলা হয়েছে যে অকারণে এ সময়ে বেল না বাজাতে ৷ তা, শুনলে তো! আসলে, কারণ আর অকারণের মাঝে একটি মাত্র শব্দের ওই সামান্য পার্থক্যটা ওর কাছে এমনই সূক্ষ যে, স্থূল মস্তিষ্কে সেটি নিতান্তই মূল্যহীন ৷ ‘পাম্পে কেমনতর যেন শব্দ হচ্ছে’, নয়তো ‘খবরের কাগজ আজ এত হালকা কেন? নিশ্চয়ই পাতা মেরেছে,’... অথবা ‘ম্যাডাম, আপনার সাদা বেড়ালটা একটা পায়রা মারল...’ এসব কোনও বলবার খবর এই প্রত্যুষে? গোটা দিন জুড়ে জষ্টি মাসের নিদারুণ তাপপ্রবাহ, তার মধ্যে ভোর-সকালের নিরিবিলি এই সামান্য নির্ধারিত সময়টুকুতেই যাও বা খানিক আরাম, তা, সেটিতেও বাদ সাধা মানে দিনের শুভারম্ভটি গেল ৷ এবং যা ভেবেছিল ঠিক তাই—আধো অন্ধকার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে আছেন মূর্তিমান স্বয়ং! ‘‘গুড মন্নিং ম্যাডাম... ৷’’

হ্যাঁ..., গুডের তো এই নমুনা, মর্নিংটাও গেল! কিন্তু কী আর করবে! ফলে বিরক্তিটা কোনওক্রমে গিলে নিয়ে মাথাটা হেলালো সামান্য ৷ শেষে নীচু গলায় বলল— ‘‘কত বার বলেছি তোমায়, এ সময় বেল...’’ মুখের কথাটা ফস করে কেড়ে নিয়ে সুভাষ উত্তর দিল— ‘‘ম্যাডাম, স্যার এই সময় ঘুমোন, আপনিও..., জানি, শুদুমুদু বিরক্ত করে কেউ? কিন্তু বেপারটা খুবই আরজেন্ট... পাশের বাড়ির মাসিমা সকালে আজ গেট খোলেনি ৷’’

বাহ, বোঝো! এতদিন তা-ও এ বাড়ির ওপরই নজর ছিল, এখন সেসব একঘেয়েমির থেকে নতুনত্ব খুঁজতে একেবারে পাশের বাড়িতে গিয়ে পড়ল! পরমার এ মুহূর্তে আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না, হাত বাড়িয়ে খবরের কাগজটা নিয়ে দরজা বন্ধ করতে যেতেই ফের বলল —‘‘মাসিমা খোলেনি কিন্তু গেট...’’

পরমা এবার স্থির মাথায় খেয়াল করল কথাটা ৷ পাশের বাড়ি মানে, ওদের গায়ে লাগানো জলি বোসের বাড়ির কথাই বলছে নিশ্চয়ই ৷ কারণ অন্য পাশে তো কোনও মাসিমা নেই ৷ কিন্তু সে যাই হোক, সুভাষেরও বলিহারি! পরমা আশপাশের সবার একটু বাড়তি খোঁজ-খবর রাখে বলে কি এবার থেকে কে আলো নেভায়নি, কে গেট খোলেনি, কার জলের ট্যাঙ্ক উপচে পড়ছে—সাত-সকালে তার খবর দেওয়াও শুরু করতে হবে? অদ্ভুত!

শান্ত গলায় বলল— ‘‘গেট খোলেনি তো কী? প্রেশার-টেশার আছে, ঘুমের ওষুধ খান, উঠতে পারেন নি— হয় এমন এক-আধ দিন... ৷’’

সঙ্গে সঙ্গে মুখের ওপর বলল—‘‘না, হয় না ৷ ভোর থাকতে তালা খুলে দেয় ৷ আজ দুধঅলা ফিরে গেছে, কাগজও তোলেনি ৷’’

পরমা অত গা করল না কথাটা ৷ সকালে উঠে পাম্প-টাম্প চালাবার সময় সুভাষ পাড়া প্রতিবেশীর এ ধরনের রোজ-নামচার বৃত্তান্ত জানলে জানতেও পারে ৷ কিন্তু পরমা কখনও দেখেনি তো তাঁকে তালা খুলতে! বরং দু’ একবার বলেওছেন যে সকালে উঠে পাম্প চালাতে আলস্য লাগে—ঘুমের ওষুধ খান কিনা! কী জানি— এত সকালে অতশত কিছু ভাবতে ভালোলাগছে না ৷ পরমা এবার দরজা বন্ধ করতে করতে :বলল— ‘‘ঠিক আছে, তুমি যাও, দেখব পরে ৷ দুধটা তুমি রেখে নিলে পারতে, পরে আর পাবেন...?’’ —‘‘দেব কী করে, উঠছেই না ৷’’

—‘‘ওহ, বার বার অ্যা-ক কথা...!’’ পরমা আর সময় নষ্ট না করে বন্ধই করে দিল দরজা ৷

এরই মধ্যে রোদে ভেসে যাচ্ছে ঘর-দোর ৷ কী গরম যে চলছে টানা! লু বইছে চারিদিকে ৷ সকাল থেকেই সূর্যের তেজ কী! সব যেন শুষে-মুষে ছারখার করে দেবে ৷ জুন মাসের মাঝামাঝি—একটা দিন আকাশে মেঘের একটু ছায়াও দেখা গেল না! পরদার দড়ি টানতে টানতে পাশের বাড়ির দিকে একটু চাইল পরমা ৷ জানলা থেকে কেবল গেট আর বাগানের একটা ফালি দেখা যায় মাত্র, বাকিটা দেখতে গেলে বারান্দায় যেতে হবে, থাক—বড্ড রোদ বাইরে... ৷ পরমা টুকটাক হাতের কাজ সেরে স্নানে গেল ৷

সাধারণত এসময় খবরের কাগজ নিয়ে রমেশের সঙ্গে আর এক কাপ চা নিয়ে বসে পরমা, এবং সেটি চলেও বেশ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ৷ তারপর যায় বাগানে জল দিতে ৷ কিন্তু কিছুদিন ধরে এমন গরমের তাণ্ডব চলছে যে ঢিলে ঢালা ভাবে সকালটা কাটালে বাগানে ফুলবালারা ততক্ষণে মূর্ছাই যাবে, তৎসহ পরমা নিজেও ৷ ফলে সে সময়টাও কেটে-ছেঁটে ফেলতে হয়েছে ইদানীং ৷ তা বাদে কাজেরও তো শেষ নেই আর... ৷ রাতে কে যেন খাবে বলল রমেশ, তার জোগাড়-যন্তর করে রাখতে হবে ৷ একবার নেহেরু প্লেস যেতে হবে, সেখান থেকে হাউসখাস ৷ বুনিয়ার ক’টায় ক্লাস, কাল রাতে জিজ্ঞেস করে রাখা হয়নি ৷ উঠেই তো বেরিয়ে যাবে হুড়ুমুড়িয়ে ৷ এই সব সাত-পাঁচ ভাবনা নাড়া চাড়া করতে করতে সিঁড়ির বাঁক ঘুরতেই কাচের ফাঁক দিয়ে একেবারে মুখোমুখি হল জলি বোসের বাড়ির, আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল সকালে সুভাষ যেন বার বার কী বলছিল? মাসিমা গেট খোলেননি, না? ওহ, সে তো ভুলেই গিয়েছিল বেমালুম! রুট বদলে তৎক্ষণাৎ বাগানের দিকে না গিয়ে, তাড়াতাড়ি ড্রাইভওয়েটুকু পেরিয়ে নিচু পাঁচিল দিয়ে মুখ বাড়ালো গায়ে লাগানো একতলা বাড়িটার দক্ষিণ দিকে, আর তাকাতেই কেমন যেন ধক করে উঠল বুকটা ৷

শোবার ঘরের ঠান্ডা মেশিনের নীচে তো এ সময় একটু জল পড়ে থাকে—আজ যেন একেবারে খটখটে শুকনো! এই ভয়ংকর গরমেও উনি কাল রাতে কি এসি চালাননি! এমনটা তো হয় না!

জলি বোস খুব হিসেব করে চলেন ৷ একটু বেশি রকমই হিসেব ৷ যা নাকি কৃপণতার শেষপর্যায়ই বলা যায়—তবু রাতে কিন্তু এসি চালান-ই ৷ এমনকি বেশ খানিকক্ষণ দিনেও ৷ হাই প্রেশারের রুগি, গরম সহ্য হয় না ৷ এ কথা বলেনও বার বার যে, দিনের পর দিন পান্তা ভাত খেয়েও নাকি প্রয়োজন হলে থাকতে পারবেন, কিন্তু গরম সহ্য করতে পারবেন না একবেলাও ৷ দম বন্ধ হয়ে যায়, হাঁসফাঁস করেন..., তাহলে!

পরমা পাঁচিলের এপার থেকে ডাকল ‘‘মাসিমা!’’ আষ্টেপৃষ্টে বন্ধ দরজা জানলা ভেদ করে সে ডাক ভেতরে যাবার কথা নয়—গেলও না ৷ কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না বলে কোনও সহকারী বা সেবিকাও নেই ৷ ফলত, বাড়ির ভেতর সম্বন্ধে ধারণা না থাকলেও বাইরেটায় সদা-সর্বদাই ধুলো ভরা, পাতা-ঝরা—কাগজের টুকরো, প্লাস্টিকের ঠোঙা উড়ে বেড়ায় ৷ ছোট্ট একফালি ঘাসজমি, কেবল বর্ষার জল পেয়ে সবুজ হয়, বাকি সময় শুকনো খরখরে ৷ দেয়ালের ধার ঘেঁষে ক’টা ফুরুশ বেল চামেলির গাছ আছে, তারা বিনা জলেই সময় মতন ফুল ফোটাতে থাকে ৷ তবে এ বছর বোধহয় তারাও একেবারেই অপারগ ৷ কী অসম্ভব রোদ! সেই রোদে তেতে ওঠা, শুকনো, ফ্যাকাশে, নির্জীব, নির্জন অতি-পরিচিত বাড়িটার দিকে চেয়ে আজ হঠাৎ কেমন ভয় ভয় লাগল পরমার ৷ মস্ত তালা ঝোলানো ফটক নিয়ে এ কেমন সকাল! এমনটা তো অন্যদিন লাগে না ৷

পরমা বাড়ির চৌহদ্দির চারিদিকে ‘‘জলিমাসিমা’’, ‘‘জলিমা-সি-মা’’ উচ্চ থেকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকতে লাগল ঘুরে ঘুরে, শেষে ও পাশের বাড়ির ছাতেও উঠে গেল সিঁড়ি ভেঙে, যদি সেদিক থেকে নজর করা যায় উঠোনটা!

দেখা গেল কিছুই নজরে আসে না, কারণ ওদিকেও সব বন্ধ ৷ অতঃপর মালি, ড্রাইভারদের ডেকে সমস্বরে ডাকাডাকি এবং দুই চৌকিদার ফটক টপকে ভেতরে গিয়ে জানলায় ধুপধাপ ৷

পরমার অদ্ভুত এক আতঙ্ক হচ্ছিল—এ তো ঘুম নয়!

পরমার গলা শুকিয়ে আসছিল, চোখ জ্বালা..., জৈষ্ঠ্যের কড়া তাপ তার প্রত্যুষের নির্জন শান্তিটুকু বাষ্প করে নিংড়ে নিচ্ছিল শেষ বিন্দু পর্যন্ত, তবু, সে অবস্থাতেই ছুটল প্রতিবেশী মকুল ঘোষের কাছে ৷ ওদের সঙ্গে জলি বোসের কী একটা আত্মীয়তা আছে যেন শুনেছিল মনে হয়..., তা বাদে রমেশকেও তো ডাকতে হবে, আর একতলার সুদীপাকে ৷

বেলা বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে লোকজন জড়ো হচ্ছিল ৷ আশপাশের বাড়ির কাজের লোক, ফল-সব্জিআলা, এ পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করা নিত্য পথচারী—যারা তালা ভাঙা-টাঙার কথা শুনে কৌতূহলে নড়তে পারছিল না, অথচ কাজের তাড়ায় ঘন ঘন সময় জিজ্ঞেস করছিল জনে জনে ৷ রবিবারের সকাল, তৎসহ এই ভয়ানক দাবদাহের ফলে গৃহবন্দী প্রতিবেশীদের তো এ সময় এই এত কাণ্ডের কিছুই জানবার কথা নয় মোটে ৷ এরাই গিয়ে জানালে তবে না জানবে তারা!

টেলিফোন করা হয়েছে বেশ খানিকক্ষণ, পুলিশ এই এল বলে ৷ রমেশ, মুকুলবাবু এখন তারই অপেক্ষায় ৷ পরমা, সুদীপার সঙ্গে সামনের পার্কে, ছায়ার তলায় বেঞ্চে বসে বসে আদান-প্রদান করছিল নানান তথ্য ৷ যেমন অসম্ভব হাইপ্রেশার ছিল, তা বাদে ভার্টিগো ৷ বাতের জন্য না কী একটা নার্ভের অসুবিধেতে হাঁটতেন খুব ধীরে—পায়ে জোরই ছিল না মোটে ৷ গতকাল ক্রস আঁটা একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বাড়ির সামনে ৷ ডাক্তার সান্যাল এসেছিলেন নাকি? হয়তো শরীরটা বেশিই খারাপ লেগেছে! এই গরম..., একটা কাজের লোকও যদি রাখতেন..., এসবই আর কী... ৷

ইতিমধ্যে পুলিসের গাড়ি এসে যাওয়াতে এই এলাকার উন্নতিমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত গণ্যমান্য সদস্যরাও হাজির হলেন সেখানে ৷ সুদীপাকে ডাকা হল—যদি এলোমেলো ভাবে পড়ে থাকেন বাথরুমে, একজন মহিলা অন্তত থাকুক সঙ্গে... ৷ পরমা আর উঠল না ৷ ও যেন জেনেই গিয়েছে কী হতে পারে ওই আষ্টে-পৃষ্ঠে বন্ধ, ধুলোপড়া নির্জন বাড়িটার ভেতরে ৷ এখন কেবল একটু খাবার জল পেলে হত—শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে ৷ মনে হচ্ছে শুয়েই পড়ে এই বেঞ্চের ওপর ৷ তবু ঠায় বসেই রইল সে ভাবেই ৷

এরপর ক্রমশ ফটকের তালা ভাঙা হল এবং বারান্দারও ৷ পুলিশ-দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মুকুলবাবু আর রমেশও রইল পেছনে ৷ পরমা কতক্ষণ অলসভাবে চেয়েছিল সমুখপানে কে জানে..., সহসা সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ঘাড় ঘোড়াতেই দেখল, গোটা দলটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে তড়িঘড়ি, আর থমথমে মুখে দূর থেকেই হাত ঘোরালো রমেশ—নেই... ৷

পুলিসের দল জটলা করছে ৷ মুকুলবাবু রায়পুরের ভাগ্নের টেলিফোন নম্বর জোগাড়ের চেষ্টায় নাজেহাল হয়ে ফোন করে যাচ্ছেন এদিক-সেদিক ৷ উৎসাহী দর্শনার্থী একটু চোখের দেখা দেখবার জন্য অনুনয়-বিনয় করছে এক কৃশকায় সিপাইকে ৷ সে বেচারার ক্ষমতা যে কত সীমিত, সেটুকু বোঝাবারও ক্ষমতা নেই বলে বন্ধ সেল ফোনই কানে চেপে আকাশ দেখছে ৷ অন্যদিকে ফটকটা বেসরকারিভাবে জবরদখল করে নিয়ে মাতব্বরি করতে শুরু করেছে একজন অপরিচিত প্রতিবেশী ৷ কিন্তু জনতাই বা তা মানবে কেন? সকাল থেকে যে এই আগুন তাতে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে, কেবলমাত্র ওই ভয়ংকর দৃশ্যটুকু একটু চোখের দেখা দেখবার আশায়, তা কি এমনি হেলায় যাবে?

রমেশ এবার জোর দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলল পরমাকে—সেই সকাল থেকে রোদের তাপে বসে আছে বাইরে...৷ তাকে তো থাকতেই হবে, সই-সাবুদ, হ্যানাত্যানা—প্রত্যক্ষদর্শী তো তারা! তবে পরমা যেন আবার সকালের গোটা বৃত্তান্ত না বলে বসে, যে তারই তো প্রথমে সন্দেহ হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি! তাহলে তো হল! চলবে গোটা দিন ধরে হাজার জেরা!

পরমা বাধ্য মেয়ের মতো পা বাড়ালো বাড়ির দিকে ৷ কিন্তু তার আবার প্রথমে সন্দেহ হল কোথায়! সে তো হয়েছিল সুভাষের! পরমা পাত্তাই দেয়নি মোটে কথাটা! অতঃপর ভুলেও গিয়েছিল বেমালুম... ৷ উফ, হাত-পা ঝলসে যাচ্ছে একেবারে ৷ জলি বোসের গোটা বাড়িটাতেও কোথাও ছায়া নেই এতটুকু ৷ গতকাল দিনে কারেন্ট গিয়েছে বার বার—রাতেও কি তাই? ক্লান্ত মানুষটার ফ্রিজে জল ছিল কি ঠান্ডা? আর রাতে? খেয়েছিলেন কি কিছু ঘুমের আগে? হয়তো শরীরটা জুতসই ছিল না বলে, রান্নাই হয়নি মোটে ৷ দুপুরের রাখা ভাতটাও ভেপসে গন্ধ হয়েগিয়েছিল সে সময়ে... ৷

সবার আগোচরে ঘরে ফিরবার মুখে, পাঁচিলের ওপার থেকে মুখ বাড়াল পরমা গায়ে লাগানো পাশের বাড়িটার দিকে—বসার ঘরের দরজা খোলা, এদিকে শোবার ঘরেরও ৷ আরও লোকজন এসেছে, ভিড় ইতিমধ্যে ৷ সুদীপারও একাংশ দেখা যাচ্ছে, বসে আছে মোড়ায় ৷ গতকাল এ সময়ে কী করছিলেন জলিমাসিমা?

ক্লান্ত পায়ে কোনওক্রমে বাড়ি ফিরে এসে আগে এক কলসি ঠান্ডা জল খাবে, নাকি শীতল জমানো জলে স্নানই করে নেবে, ভাবতে-ভাবতে সোফাতেই বসে রইল ঠা-য় ৷ কী যে ক্লান্ত লাগছে, গা গুলোচ্ছে, চোখ ঝাপসা... ৷ তবু একসময় নাওয়া-খাওয়া সেরে খবরের কাগজটা নিয়ে শোবার ঘরে যাবার আগে পর্দা সরিয়ে তাকালো ওদিকপানে৷ অ্যাম্বুলেন্স এসেছে তাঁকে নিয়ে যেতে, পোস্টমর্টেম হবে কিনা! একা বাড়িতে সহসা মৃত্যু হলে এমনটাই দস্তুর! তাছাড়া ভাইপো, না ভাগ্নে কে যেন আছে রায়পুরে, সে যদি পরে সহসা প্রশ্ন তোলে?

আসলে এমন একটা জীবনের, ঠিক এমন একটা পরিণতিই তো স্বাভাবিক! অন্যথা হবার কারণ তো নেই কোনও! যেন পড়া গল্পই, আবার করে পড়া হল ৷ হল..., তবু, নাড়া তো দেয়! পরমা পর্দাটা আবার টেনে দিয়ে ভেতরে গেল—তার দায়িত্ব শেষ, এবার পুলিসের পালা! ঘরে, বাইরে তালা আঁটবে, চৌকিও বসবে হয়তো ক’টা দিন নিয়ম করে..., তারপর নির্জন বাড়িটা পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকবে অন্ধকারে ৷ হায় রে... জীবন...!

বিকেল থেকে কত যে টেলিফোন এল! বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্স, পুলিস, ভিড়-ভাড় দেখলে, মুখেমুখেই তো রটে যায় কথা—ফলে, কখন হল, কেমন করে, কে দেখল-র প্রশ্নবাণ চলতেই থাকল ক্রমাগত ৷ শেষে সন্ধের মুখে সুদীপা এলে লাউঞ্জেও ঠান্ডা মেশিনের তলায় বসে ফের সে কথারই পুনরাবৃত্তি ৷ বেচারা, ও আবার বাড়ির ভেতরে গিয়েছিল কিনা, তাই একা থাকতে পারছেই না মোটে ৷ সারাটা সময় নাকি সেই ভয়ংকর দৃশ্যই ঘুরছে চোখের সামনে ৷ ফলে এক বন্ধুকে খবর দিয়েছে, সে এসে থাকবে পাহারায় ৷ এও বলল যে গতকাল ডাক্তার আসবার কথাটা ভুল, ওটা অন্য কারুর বাড়ির গাড়ি ৷ বরং উনিই নাকি বেরিয়েছিলেন, যোশীজির চৌকিদার দেখেছে সন্ধের দিকে ৷ আর মালতি ঘোষাল তো আরও ভালো, সে আবার নাকি দেখেছে মাসিমাকে দৌড়ে দৌড়ে ফিরে আসতে, বোঝো! যাঁর পা ফেলতেই ওই অবস্থা, তিনি নাকি দৌড়েওছেন!

রমেশ সে সময়ে উপস্থিত হতে, ঘটনাটা শুনে রায় দিল যে, সে ‘দেখা’ গতকালের বদলে, আগামীকাল হলে তাও মানুষ বিশ্বাস করবে, কিন্তু তার আগে যে পুরোপুরি অবিশ্বাস্য ৷ তা শুনে সুদীপা ভয়ের চোটে চ্যাঁচাতে লাগল—তাকে একা-একা থাকতে হয়, এসব অশৈলী কথাবার্তা বলবার মানেটা কী? অ্যাঁ...?

পরমা ওর কাণ্ড দেখে হাসছিল—সুদীপাটা বড্ড ভিতু ৷ চোরের ভয়, জীব-জন্তু, ঝড়-বাদলা, রাতের অন্ধকার... ৷ অসুখ-বিসুখে ভয়, আবার ডাক্তার-বদ্যি, ওষুধ-পত্তরেও ভয় ৷ তা, তার যে ভূতের ভয় থাকবে সে আর বেশি কথা কী? রমেশটা যাচ্ছেতাই ৷

শেষমেশ সুদীপা বিদায় নেবার আগে, উঁকি দিয়ে বারান্দা থেকে বাইরেটা চেয়ে নিয়ে আঁতকে-টাঁতকে বলল যে, বাবারে, তার এক তলাটা যতই গায়ে লাগানো থাক, তবু পাঁচিলের দরুন সরাসরি এমন সর্বাংশ দেখা তো যায় না! এ যে শান বাধানো উঠোন, সিঁড়ির দরজা, ছাত, এমনকি এদিককার ঘরের বন্ধ দরজাগুলোও একেবারে প-ষ্ট...! তেমনটা হলে সে নাকি এ বাড়ি বেচে দিয়েই পালাত ৷

অতঃপর পরমাকেও দাঁড়াতে হল সিঁড়ির গোড়ায়, যতক্ষণ না দরজা খুলে ঘরে ঢুকে যায় সে ৷ ওর কাণ্ডে হাসছিলও বেশ, তবে শরীরটা এলিয়ে পড়ছিল যেন, চোখ জ্বালা, গা ব্যথা... ৷ রোদ থেকে ফিরেই স্নান করাটা ঠিক হয়নি, নাকি ঢকঢকিয়ে বরফ গলা কনকনে ঠান্ডা জল খাওয়াটা—কে জানে! তবু ওষুধ খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বার আগে দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো পরমা ৷

জলি বোসের বাড়িটা অন্যদিনের মতনই, ঠিক তেমনই আছে ৷ কেবল বাইরের ফটকে ঝুলছে শিকলে বাঁধা সাদাটে স্টিলের মস্ত নতুন একটা তালা ৷ রাস্তার আলো পড়ে, যা নাকি একটু বেশি রকম ঝকমক করছে ৷ আর শিকলের কারণে, দুটো পাল্লার মাঝে বড়ো একটা ফাঁক—তফাত বলতে এই সামান্যই ৷ তবু, তাতেই বাড়িটা কেমন অন্যরকম লাগছে ৷ নাকি অন্য কারণে? একাকী, দুর্বল একটা প্রাণমাত্র ধারণ করে রেখেই বাড়িটা বুঝি বা জীবন্ত না হলেও, কোনওক্রমে অন্তত বেঁচে ছিল ৷ আজ কেবল শেকল পরানো চকচকে, অচেনা এই সামান্য একটা তালাই যেন তার কালচিহ্ন ৷

রমেশ বাইরে এসে বলল—‘‘ওহ, তুমি এখেনে, শুনেছ?’’... বলে কী কী যেন শুনবার কথা শোনাচ্ছিল, পরমা ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করল ৷ কিছুই শোনেনি, আর কিছু চায়ও না শুনতে ৷ তার শরীরটা একদম ভালো লাগছে না, আর তারও বেশি বোধহয় মন... ৷

পরের দুটো দিন একেবারে শয্যাশায়ী হয়েই রইল পরমা ৷ জ্বরটাও বড্ড বেশি, তার সঙ্গে গলা ফোলা আর পেটের অবস্থাও যাচ্ছেতাই—লু লেগেছে ৷ গিলতে পারছে না, হজম হচ্ছে না ৷ এসি চালালে শীতে কাঁপছে, না চালালে ঘাম৷ কাজে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি হাঁটা-চলাও নামমাত্র ৷ গোটা দিন ঘুমিয়ে ঝিমিয়ে, হেঁচে কেশে, হিক্কা-তুলে যাকে বলে একেবারে অসহ্য অবস্থা ৷

অগত্যা তৃতীয় দিনে জ্বরটা নেমে যাওয়াতে স্নান করে, পরিচ্ছন্ন হয়ে, ঝোলভাত খেয়ে মনে হল—‘আহ, আ-রা-ম...৷’ হালকা ধরনের একটা বই খুঁজল—দুপুরে শুয়ে শুয়ে পড়বে, যতক্ষণ না চোখটা আপনা থেকেই আবার বন্ধ হয়ে যায় ৷ জ্বর না থাকলেও, অন্য সব উপসর্গ তো আছে ৷ আর আছে অপার ক্লান্তি ৷ কনকের বিকেলে যেন কোথায় যাবার কথা বলেছিল? যেতেই পারে, আজ সে বেশ আছে ৷ রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সে কথাই জানিয়ে দিয়ে আবার কী মনে করে বসবার ঘরের জানলার ধারে দাঁড়াল এসে ৷ ক’দিন তো পা-ও মাড়ায়নি এদিকে! পাখিদের দানা-পানি হয়েছে তো দেওয়া এই দু’দিন? তা বাদে অন্য পুষ্যিও তো প্রচুর ৷ এই গরমে...! বাবারে, বাইরে তো চাওয়াই যায় না ৷ ফেরতই চলে আসছিল, হঠাৎ চোখ যেতে মনে হল জলি বোসের বাড়ির সামনে ওটা কী? ভ্যান নাকি? আড়াআড়ি রাখা একটা অ্যাম্বুলেন্স না? আজ কেন? পরমা তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বারান্দায় গেল—পরিত্যক্ত, এলোমেলো, অপরিচ্ছন্ন বাড়িটার দোরগোড়ায়, লাল ক্রস আঁটা আরও বিবর্ণ আধভাঙা একটা ফাঁকা গাড়ি দাঁড়িয়ে... ৷ না, সম্পূর্ণ ফাঁকা নয়, ভেতরে কিছু আছে ৷ নীল রঙের প্লাস্টিকের বড়ো-সড়ো একটা কিছু ৷ তবে তার বাহক বা চালক কেউ নেই ৷ তারা পার্কের বেঞ্চে বসে গল্প-সল্প করছে, যেমন ক’দিন আগে, সে করছিল সুদীপার সঙ্গে ৷ জলিমাসিমাকে নিয়ে এল নাকি? প্লাস্টিকে মুড়ে? হায় ঈশ্বর, তাও আবার এত দিন পরে? সৎকারটুকুও হয়নি এ পর্যন্ত? সে তো জানতই না কিছু, বলেইনি কেউ! অবশ্য কে-ই বা বলবে... ৷

হাত-পা কেমন অবশ লাগছিল পরমার ৷ অসহ জীবন থাকে মানুষের, কিন্ত মৃত্যুও তাই? এত পরিচিত, অভ্যস্থ নিজস্ব বাড়ির, শেকলআঁটা ফটকের সামনে, এমনিভাবে নিঃসঙ্গ পড়ে থাকতে হয়! কারা নিয়ে এসেছে এখানে, কেন? পরমা তৎক্ষণাৎ সুদীপাকে ফোনে জানাল, চৌকিদারকে পাঠাল মুকুল ঘোষের বাড়ি—ক’টা মানুষ এসে দাঁড়াক তো অন্তত! এ নিদারুণ দৃশ্য চোখে দেখা যায় না, এবং চিন্তায় তো আরও বেদনার ৷

লোকজন অবশ্য এল খানিক বাদেই, কেউ মারুতি, কেউ অটো, কেউ বা বাইকে চেপে ৷ রায়পুরের ভাগ্নে এসেছে, এ শহরের ক’জন কোলিগকে সঙ্গে নিয়ে ৷ দু’জন মহিলা—তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়া, তা বাদে দু-চারটি প্রতিবেশি৷

ভাগ্নে মানুষটা খারাপ না ৷ একটু বোকা-সোকা, অলস ধরনের ৷ সরকারি চাকুরে ৷ খবর পেয়েই ছুটি-টুটি নিয়ে গতকাল থেকেই হোটেলে এসে বসে আছে ৷ দিল্লি ব্রাঞ্চের কোলিগরা এত সাহায্য করেছে বলে কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত৷ তা না হলে এমন ঝঞ্ঝাট তার পক্ষে সামলানো কী চাট্টিখানি কথা! মর্গ, পোস্টমর্টমের রিপোর্ট, পুলিশ, তারপর এই সৎকারের ব্যবস্থা—সে তো কিছুই জানে না... ৷ স্ত্রীর সদ্য অপারেশন হয়েছে, ছেলেরও যেন কী—তা নয়তো তারাই আসে এ সময় প্রতিবছর ইত্যাদি ৷ ভদ্রলোক, ‘মামি, মামি’ করে বেশি বাড়াবাড়ি না করাতেই স্বাভাবিক লাগল ৷ এরকম নিরীহ ছাপোষা মানুষদের আত্মীয় বিয়োগের প্রকাশটা সাধারণত, অসুখের দিন, তারিখ সমেত বিবরণে ও ঝঞ্ঝাটের তালিকা দিয়েই যেমনটা নির্ধারিত হয় আর কী ৷

ধুলোপড়া, অবিন্যস্ত ওই বসার ঘরেই ধাতুনির্মিত স্ট্রেচারে শায়িত ৷ তাঁকে ঘিরে হাতে গোনা কয়েকটি মানুষ নিয়ম রক্ষার্থে দাঁড়িয়ে আছে—সুদীপা হাত নেড়ে ডাকল পরমাকে ৷ সে তবু বসেই রইল সিঁড়ির ধাপে ৷ কাজে-অকাজে কত সময় ডেকেছেন তাকে, কিন্তু ঘরে তো যেতে বলেননি, এমনকি বারান্দার ভেতরেও নয় ৷ তাহলে আজ আর তার নিয়মভঙ্গের প্রয়োজন কী? থাক... ৷ তা বাদে এখন শেষযাত্রার প্রস্তুতিও হচ্ছে ৷ নীল প্লাস্টিকের ওপর ফটফটে সাদা লংক্লথ মেলে দিয়েছে, সঙ্গে একগোছা উগ্রগন্ধের সস্তা ধূপকাঠি ৷ রায়পুরের ভাগ্নে কানে সেলফোন লাগিয়ে হাত তুলে ডাকল ড্রাইভারদের ৷ কনকরা হাত জোড়ো করে কপালে ঠেকাল অভ্যেস বসে, একজন চাবি হাতে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিতেই অন্যজন শেকলে তালা লাগিয়ে, লাফ দিয়ে চড়ে বসল তাতে ৷ লাল ক্রস চিহ্ন দেওয়া বিবর্ণ, আধভাঙা গাড়িটা তখন বাঁক নিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে বড়ো রাস্তার দিকে ৷ পড়শিরাও যে যার মতন রওনা হতেই রাস্তা ফাঁকা ৷ শুধু অনাড়ম্বর নয়, এমন দীন অনাদৃত শেষযাত্রা বুঝি কেউ কো-থা-ও দেখেনি কখনও৷

কোনওমতে ঘরে ফিরেই শুয়ে পড়ল পরমা ৷ বিকেল হতে আর দেরি নেই মোটে ৷ মাথা ধরে আছে, জ্বরও আসছে আবার ৷ দুপুরের সেই ঝরঝরে ভাবটা উবে গিয়ে, ক্লান্তিতে ডুবে যাচ্ছিল সে ৷ এবং সেই ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গিয়ে, ঘুম ভাঙল ফের প্রায় রাতের দিকে ৷ ততক্ষণে রমেশের রাতের খাওয়া সারা, কাজ থেকে ফিরে আবার কাজ নিয়ে বসেছে ৷ ছেলে তো কলেজ এক্সকারশনে শহরের বাইরে ৷ কনক রান্নাঘরের কাজ সারছে..., বারান্দায় বসে বাইরের দিকে চাইল পরমা ৷ তেমন দেখবার মতন কিছুই নেই, ঘোলাটে লালচে আকাশ, শুকনো ঘাস, তার সঙ্গে ফ্যাকাশে রাস্তা আর ধারে ধারে লাইন দিয়ে রাখা, হরেকরঙা সার সার গাড়ি ৷ যারা গোটা দিন যা তাপ শুষেছে, তা দ্বিগুণ পরিমাণে ফেরত দিয়ে গায়ের ঝাল মেটাচ্ছে ৷ গাছে গাছে পাখিদের ছানারা, গরমে ঘুম আসছে না বলে মায়েদের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে মাথা খাচ্ছে—পরমা এবার আরাম-কেদারা থেকে উঠে রেলিঙের ধারে গিয়ে দাঁড়াল—জলি বোসের বাড়ি ৷

ড্রাইভওয়েতে খই পড়ে আছে ৷ ওই নাম মাত্র ক’টা ফুলের মধ্যে থেকে খানকতক আবার এখেনেই পড়ে শুকিয়ে খটখটে হয়েছে সারাদিন ধরে ৷ দুটো বড়ো বড়ো কোকাকোলার খালি বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে বারান্দার দিকে ৷ তার সঙ্গে ফুল, ধূপকাঠি, নতুন কাপড় ইত্যাদি—মৃতের সদগতির অতি প্রয়োজনীয় উপাচারগুলোর অতি অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক প্যাকেট উড়ে বেড়াচ্ছে অনাথ বাড়িটার শুকনো মাটিতে ৷ এত পরিষ্কার, স্বচ্ছ, নতুন প্লাস্টিকের ঠোঙা ও বাড়িতে কখনও দেখেনি পরমা ৷ ধুলোমাখা বিবর্ণতার মধ্যে এগুলো একেবারে যেন ঝলমল করছে ৷ প্রতিটি নতুন—জলি বোস নেই বলে যারা আছে... ৷ এত অসহ্য লাগছিল গোটা ব্যাপারটা, যে পরমা আর এক মুহূর্ত তিষ্ঠোতে পারছিল না সেখানে ৷ তৎক্ষণাৎ দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল হুড়মুড়িয়ে ৷

ক’দিন ধরেই অল্প-সল্প মেঘ করছে, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই ৷ আশপাশে নাকি বর্ষা নেমেছে, আকাল কেবল এ শহরেই ৷ বাগানের গাছপালা সব হলুদ হয়ে গেল, দু’ বেলা তিরতিরিয়ে যা জল আসে, তাতে প্রয়োজনের আদ্ধেকও মেটে না ৷ কাগজ খুললেই শুধু তাপপ্রবাহে মৃত্যু, কত বছরের যেন রেকর্ড ব্রেক করেছে, খরায় হ্যানো-ত্যানো—তারই মধ্যে দিনে কতবার যে বেরুতে হচ্ছে, কত কা-জ... ৷

আসলে আগামীকাল মাঝরাতে, বেশ বেশিদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে পরমা ৷ প্রায় আড়াই মাস ৷ ফলে ফিরতে ফিরতে পুজো তো কেটে যাবেই, বোধহয় লক্ষ্মীপুজোও ৷ যাবার আগে বড়ো ইচ্ছে ছিল একবার অন্তত নিজের দেশের বৃষ্টিটা দেখে যাবার—হল না! মেঘ তো করছে, থমথমে হচ্ছে আকাশও, কিন্তু ওই পর্যন্তই ৷ কে জানে, হয়তো দেখা গেল কাল রাতে ঠিক বেরুবার মুখেই তুমুল ঝড় বাদলা! মাল-পত্তর নিয়ে গাড়িতে উঠতেই নাজেহাল! থাক বাবা, তাও হোক ৷ ঘাস পাতা, পশু পাখি, মানুষ, কীট-পতঙ্গ—একটু ঠান্ডা তো হবে! পরমা শোবার ঘরের বিছানার ওপরই স্যুটকেস খুলে রেখে সকাল থেকেই তাতে জামা-কাপড়, ওষুধ, দরকারি জিনিস-পত্তর সব লিস্ট মিলিয়ে ভরে নিচ্ছিল—শেষ মুহূর্তের কত কাজ... ৷

আসলে গত একটা মাস কোনও কাজই তো হয়নি কিনা! সে-ই সে জ্বর হল, সে চলল গোটা দু’সপ্তাহ ধরে ৷ জ্বর কমল তো গায়ে র্যাশ ৷ সেটা চাপা দিলে ডায়েরিয়া, তার সাথে হাঁচি, কাশি, মাথা ধরা, গলা ব্যাথা, পা চিবোনো, চোখে অন্ধকার—এ সব তো ফাউ ৷ ফলে দুর্বল শরীরে, শুয়ে বসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই কেটেছে প্রথমটা ৷ তাছাড়া..., তাছাড়া কেন জানি, পাশের বাড়ির এই জলি বোসের মৃত্যুটাও বড্ড নাড়া দিয়েছে তাকে, বড়োই বেশি ৷ এমনই বেশি যে অদ্ভুত এক অবসাদই যেন একেবারে ঘিরে ধরেছে তাকে ৷ খুব যে কাছের মানুষ ছিলেন তা তো নয়, বেশি যোগাযোগও ছিল না ৷ এমনকি বিশেষ পছন্দের বা ভালোবাসা অথবা ভালোলাগারও নয় ৷ সে কথা আলাদা ৷ কিন্তু যখনই ভাবছে, একটা মানুষ, যে নাকি চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর একটা বাড়িতে থাকলেন, একটা পাড়ায়, একটা শহরে, চাকরি করেছিলেন সরকারি দপ্তরে ৷ দু-পক্ষের পরিবার, আত্মীয়-পরিজনও নিশ্চয়ই ছিল—স্বামীর বন্ধু, নিজের কোলিগ, ডাক্তার, দোকানদার, গ্যাসওয়ালা, চৌকিদার... ৷ তারা সবাই চিনত এই নির্বিবাদী, একাচোরা, বাতিকগ্রস্ত মানুষটাকে—বহুদিন ধরেই নিশ্চয় ৷ কিন্তু এই যে তিনি চলে গেলেন—হঠাৎই গেলেন, অথচ কারুর মনে এতটুকু সামান্যতম দাগও কাটল না তো! একটা দিন খানিক হৈ চৈ হল, ক’দিন বাদে আরও একটা দিন সামান্য—সে..., এতটুকু তো না হয়ে কোনও উপায়ই নেই ৷ কিন্তু পরমার সব চাইতে যেটা দাগ কেটেছে, তা হল—একটা জীবনের পরিসমাপ্তি বা মৃত্যুতে সামান্য একটু চোখের জল ফেলারও কেউ নেই! এ কেমন জীবন ছিল, আর কেমনই বা মৃত্যু? কেবল এই শেষ দিনটার অপেক্ষাতেই কী এতগুলো যুগ কাটিয়ে গেলেন মিসেস জলি বোস? শীতে গরম জামা চাপালেন, গরমে চালালেন ঠান্ডা মেশিন, বর্ষায় ছাতা মাথায় দিয়ে ফেরিওয়ালার থেকে দাম দর করে আলু, পটল কিনতে হল ৷ একটা বছরে ক-ত গুলো দিন, একটা দিনও কত লম্বা, আর রাতগুলোও... ৷ এমনি করেই ঋতুর পর ঋতু চলে গিয়ে বছর কাটত, বছরের পর বছরও—এ সব কথাই তাকে বড্ড ভাবাচ্ছে ৷ যত ভাবছে ততই আকুল হচ্ছে যেন ৷ এই আকুলতা কাউকে বোঝাতে পারবে না..., তবে সে নিজে বুঝতে পেরেছে! চোখে আঙুল দিয়ে যেন বুঝিয়ে ছেড়েছে তাকে... ৷ হায়রে... ৷

বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস পুঁটলি বেঁধে সরিয়ে রেখে, নিজের কাজে এবার মন দিল পরমা ৷ নিত্য প্রয়োজনীয় টুকিটাকি, সব গুছিয়ে-গাছিয়ে ৷ আগে-ভাগে ভরে না রাখলে শেষে ওদেশে গিয়ে কী বোঝাতে কী বোঝাবে... ৷ তবে, লিস্টের নামগুলো তো সে নিজেই বুঝতে পারছে না! ঘরটা কেমন অন্ধকার না? তাড়াতাড়ি ঘাড় ঘুরিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখে, এ সময় রোজকার আকাশ যেমন ঘোলাটে লাল আগুনের পিণ্ড লাগে, এ তো তা নয়! চারিদিকে যেন সন্ধে হয়ে আসছে, থমথমে বাতাস, ঝড়, এখনও আসেনি তবে এই এল বলে—পরমা সব ফেলে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে বলল—‘‘কনক, আকাশ দেখেছ? বৃষ্টি আসবে ৷’’

কনক বারান্দায় গিয়েই অবস্থা টের পেয়ে ছুট দিল শুকনো কাপড় তুলে আনতে ৷ আজ কেবল বৃষ্টি নয়, তুমুল বৃষ্টিই আসবে নিশ্চিত ৷ এবং শেষ পর্যন্ত, বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই বৃষ্টি এল প্রায় দুপুর গড়িয়ে ৷ প্রথমে তুমুল ঝড়, এতদিনের শুকনো ধুলো-বালি, কাগজ প্লাস্টিক ন্যাকড়া—স-ব নিমেষে তুলে নিয়ে তাণ্ডব করল খানিক, তারপর গাছপালা, ঝাঁকিয়ে দুলিয়ে, উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালালো প্রাণপণ ৷ পাখিরা তাদের কচি ছানাদের বাঁচাতে ভয়ে চিৎকার দিচ্ছে, পাড়ার কুকুর-বেড়াল সব ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ৷ মানুষজন তো চোখেই পড়ছে না, তারা আগে ভাগেই পালাতে পেরেছে নিশ্চয়ই ৷ অবশেষে বাচ্চাছেলে যেমন রেগে-মেগে হাতের জিনিস ছুড়ে কাঁদতে বসে—এও সেই ৷

ঝড় সামান্য থিতু হতেই বড়ো বড়ো ফোঁটা পড়ল এদিক-সেদিক ৷ পরমা কাচের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ঝড় দেখছিল বটে তবে একেবারেই নিশ্চিন্তে নয় ৷ প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি জানলাই ভেঙে পড়ে, অথবা গোটা বাড়িটাই ৷ অবশেষে ঝড়ের গতি কম হতে না হতে, বাড়িময় ধুলোয় একেবারে সাহারা মরুভূমি ৷ বাবারে বাবা, কত বালি! কনক ঝাড়ু, ঝাড়ন নিয়ে ঘর পরিষ্কারে লেগে গেল, ততক্ষণে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে—পরমা বসার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল ৷

কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! এলোপাথারি ছাঁট এসে নুইয়ে দিচ্ছে পার্কের বড়ো বড়ো গাছগুলো ৷ বালির পাহাড়ে জল প’ড়ে সোঁদা গন্ধ ৷ দেখতে দেখতে শুকনো, তপ্ত রাস্তা-ঘাট ভিজতে শুরু করল ৷ পরমা বাঁ দিক ঘুরে, জলি বোসের ধূলিজীর্ণ, পরিত্যক্ত, উত্তপ্ত, ফ্যাকাশে, একতলা বাড়িটার দিকে চাইল—ঝুম বৃষ্টিতে সে-ও আপাদমস্তক ভিজছে নিঃশব্দে ৷ আগুনের মতন প্রখর রোদ এসে যেমন চারিদিক দিয়ে ঘিরে ধরে শুষে নিত গোটা গ্রীষ্মকালটা, দেয়ালে হাত দেওয়া যেত না, ছাত থেকে হলকা বেরুত, জানলার কাচ ফাটিয়ে দিত তাপে ৷ ঠিক তেমন ভাবেই আবার চতুর্দিক দিয়ে শীতল জল ঢেলে, এবার যেন তা ধুয়ে ধুয়ে ঠান্ডা করবার চেষ্টায় মেতে গিয়েছে অদৃশ্য সেই খেলুড়ে... ৷

ছোট্ট ঘাস জমিতে জল পড়ছে, পাঁচিলের ধার-ঘেঁষা খানকতক বেল, ফুরুশ, সন্ধ্যামালতীর নির্জীব গাছগুলোর পাতা জলে ভিজে ভিজে ঝিকিমিকি ৷ ড্রাইভওয়ের ধুলোবালি, কাগজের টুকরো, প্লাস্টিকের ঠোঙা, ধূপকাঠির রং-চটা প্যাকেট, গরমে তোবড়ানো বড়ো বড়ো দুটো পেপসির নোংরা বোতল, জলের তোড়ে এসে আটকে আছে নতুন শেকলে বাঁধা ফটকের গায়ে ৷ কী চমৎকার প্রথম বর্ষার মৃদু গন্ধ ভরা ঠান্ডা বাতাস—জলিমাসিমা দেখতে পেলেন না৷ এসব কিছুই দেখতে পেলেন না তিনি... ৷

কী অসহ্য গরম ছিল তখন ৷ জলের কষ্ট, কারেন্ট থাকত না, ভয়ংকর তাপে ইলেকট্রিক আভেনের মতন জ্বলে যেত—জানলা-দরজা এঁটে বন্ধ করা গোটা একতলা বাড়িটা ৷ যে ক’দিন সামনাসামনি দেখা হয়েছে, কেবলই বৃষ্টির কথা বলতেন তিনি ৷ গরম সহ্য করতে পারতেন না কিনা—হাই প্রেশার ছিল ৷ আরও কী কী ছিল কে জানে! আর কত কিছু যে ছিলও না, সে সব কিছু তো জানতও না কেউ... ৷

এই নববর্ষার শীতল ধরাতলের স্বেচ্ছা নির্বাসিত, বিজনবাসী বৃদ্ধার সেই দুর্বিসহ দিনগুলোর কথা ভেবে, চোখে জল এসে গেল পরমার ৷ শুধু জল না, পুরোপুরি কান্না ৷ মনে হচ্ছিল, জ্বলে পুড়ে যাওয়া এক চিতায়, এতদিনে ঈশ্বর নিজেই যেন সুশীতল ধারাপাতে তা সম্পূর্ণ জুড়িয়ে দিয়ে, শেষ- কৃত্যটি সমাপন করলেন... ৷ ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো ঘনঘোর তুমুল বৃষ্টির ঘোলাটে আকাশের দিকে চেয়ে পরম ঈশ্বরের প্রতি হাত জোড় করে প্রণাম করল পরমা ৷

পাক্কা আড়াই মাস পরে বাড়ি ফিরে বড়ো আরাম হল পরমার ৷ কত দিনের পর নিজের বিছানা, পড়ার টেবিল, রান্নাঘরের গন্ধ, রোজকার মুখচেনা মানুষজন, পরিচিত শব্দ, আর প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য—এসব ফেলে দূরে চলে যাওয়া কি অতই সহজ!

সেদিন ছিল আবার রবিবার, ফলে ঢিলেঢালা দিনে তখন থেকেই চলল আড্ডা, তারপর একশো ভাগ দিশি রান্নায় মধ্যাহ্নভোজ ৷ কনকও এতদিন পরে দিদিকে পেয়ে বেজায় খুশি, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার পুষ্যিরাও ৷ অবশেষে যে যার কাজে গেলে পরমা একবার বারান্দায় এল ৷ কী চমৎকার দেখাচ্ছে পার্কটা—ঘন সবুজ মখমলের মতন ঘাস, ঝকমকে পাতাভরা বড়ো বড়ো গাছের সারি, তা বাদে আকাশও বড়ো নির্মল, ঝলমলে রোদ, আর আরামদায়ক আবহাওয়া—শরৎকাল বলে কথা ৷ আগামীকাল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, অর্থাৎ শুক্লপক্ষের শেষ—কী চমৎকার যে জ্যোৎস্না হবে আজ ৷ পরমা এবার বাঁ-দিকে জলি বোসের বাড়ির দিকে চাইল ৷

ঠিকই আছে ৷ সামনের ঘাস জমিতে প্রায় হাঁটু ডোবা আগাছা, তবু দেখতে বড়ো মনোহর ৷ তিনরঙা ফুরুশফুলে, একেবারে ঝেঁপে রয়েছে সার সার গাছগুলো ৷ বৃষ্টির দরুনই বোধহয়, বা এই সুন্দর আবহাওয়ার জন্য, বাড়িটাও বেশ দেখাচ্ছে ৷

অতঃপর সন্ধে হতেই রমেশ বলল ওকে যেন কোথায় নাকি যেতে হবে, অফিশিয়াল ডিনার ৷ ছেলেও বলল ফিল্ম দেখে, খেয়ে ফিরবে বন্ধুদের সঙ্গে ৷ সন্ধে হয়ে আসছে, এতক্ষণে পরমার একটু ক্লান্ত লাগা শুরু হচ্ছিল ৷ ঘুম ঘুম পাচ্ছে, হাই উঠছে—গতকাল গোটা দিনটাতে কম ঝঞ্ঝাট তো যায়নি! তার উপর রাতভর এয়ারপোর্টে বসা ৷ মনে হল ফাঁকা বাড়িতে একটু শুয়ে নিলে মন্দ হয় না ৷ কনককে বলল, যদি ঘুমিয়েই পড়ে তাকে যেন না ডাকে ৷ দুপুরের খাবারই হজম হয়নি! ও যেন কাজ সেরে কোয়ার্টারে চলে যায় ইত্যাদি ৷

শোবার ঘরটাতে ঢুকে প্রথমেই পরমা আরামে, আলস্যে আড়মোড়া ভাঙল, তারপর ম-স্ত একটা হাই তুলে, হাত-পা এলিয়ে চোখটা বন্ধ করল, এবং সেই যে চোখ বন্ধ করল, তা খুলল একেবারে মাঝরাত্তিরে ৷ গোটা বাড়ি, পাড়া, শহর বা চরাচর তখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন ৷ এতদিনের অনভ্যাসে পরমা প্রথমে ঠিক ঠাহর করতেই পারল না যে, সে কোথায় আছে, আর পাশে চাদর মুড়ি দেওয়া সাদা মতন ওটাই বা কী! শেষে পুরোপুরি সজাগ হতে বুঝতে পারল যে সে তার বাড়ি ফিরেছে, নিজের শোবার ঘর, এবং পাশের ওই সাদা মতন ব্যাপারটা হচ্ছে চাদর মুড়ি দেয়া মি. রমেশ ৷ আশ্বিনের শেষে এ সময়টায় হিমেল একটা ঠান্ডা থাকে বেশ ৷ খোলা জানলায় ফিকে হাওয়া এসে শীত করছিল বোধহয়, যার জন্য ঘুমটা ভেঙেছে ৷ একটা কাঁথা থাকলে হত, ভাবতে ভাবতেও শুয়েই রইল চোখ বুজে ৷

গতকাল সে-ই সন্ধে রাতে ঘুমিয়েছিল..., মা-ই গড! কী লম্বা ঘুম! যাকে বলা যায় নিদ্রা! আর এই বিরাটাকায় ঘুমের পরও মনে হচ্ছে চোখ যেন জড়িয়ে আসছে! তবু ওই আধো-ঘুমের আলস্যেও হঠাৎই খেয়াল হল—আরে! আজ তো পূর্ণিমা! যাই, একটু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই ৷ তবে বাইরের ঝুল বারান্দায় না, এই পাশেরটায় ৷ পরমা খুট করে দরজা খুলে সন্তর্পণে ছোটো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল—অপূর্ব ৷

এদিক থেকে সোজাসুজি তাকালে কিছুই বাহার নেই ৷ ক’টা একতলা বাড়ির ছাত ডিঙিয়ে একটা দোতলা, তারপর তিনতলা, শেষে চারতলা বাড়িরই মাথা ৷ কিন্তু সামান্য বাঁ-পাশ ফিরলেই দৃশ্যটা বদলে যায় সম্পূর্ণ ৷ নিম, লেবু, কারিপাতা, কলাগাছ আর অসংখ্য বাহারি টবে সাজানো ছোটো বড়ো গাছ, গুল্ম-লতায় ভরা, তারই হাতে গড়া ভারি চমৎকার, মনোরম এক বাগান ৷ আর তাদের সীমানার পাঁচিল শেষ হতেই, ও পাশে একটা ঝাঁকড়া আম গাছ সমেত সিমেন্ট বাঁধানো জলি বোসের ম-স্ত পিছদুয়ারি উঠোন—এই পূর্ণিমার রাতে যা নাকি এক অপার্থিব সৌন্দর্যে একেবারে দিশাহারা অবস্থায় পৌঁছে যায় ৷ জ্যোৎস্না রাতে সবসময় সে এই বারান্দাতেই দাঁড়ায় ৷ সামনের দিকের কড়া বিজলি আলোতে দিন রাতেরই তফাত থাকে না, তো পূর্ণিমা ৷ এদিকটা তা নয় ৷ আশপাশের বাড়ি ঘরের বাতি নিভে যায়, সার্ভিস লেনের নিয়ন আলো বছরের অর্ধেক সময় জ্বলেই না ৷ ফলে, চাঁদের আলোয়, গাছপালায় ঘেরা, জনমানবহীন এই বাগানের নির্জনে, মনে হয় যেন ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে, সবাই গেছে বনে ৷’ বাইরে হালকা ঠান্ডা ৷ হিম, কুয়াশা আর জ্যোৎস্না মাখা বাতাসে, কী যে মন মাতানো সুবাস... ৷ সাদা-কালো জাফরি কাটা গাছপালা, পাঁচিল, ফটকের উঁচু-নীচু জ্যামিতিক আলো-ছায়ায়, মনে হয় যেন গগন ঠাকুরের ছবির ফ্রেম—কী সুন্দর, কী-ই-সুন্দর! ভাগ্যিস, আজ তার ঘুমটা ভাঙল ঠিক সময় মতন! জলি বোসের বাঁধানো চাতালটাতে কেউ যেন খড়ি গুলে ঢেলে রেখেছে—কী ধবধবে, সাদা আর পরিষ্কার নিকোনো ৷ না, ঠিক খড়ি নয়, তাতে ঝকমকে একটু চিকনাই-ও আছে ৷ শান বাঁধানো শক্ত খটখটে শুকনো উঠোনও চাঁদের কিরণে কী যে নরম দেখাচ্ছে—যেন নবনী, ননী মাখা বিশ্ব চরাচর ৷ মাঝের ঝুপসি আমগাছের পাতায় আলো পড়ে মনে হচ্ছে যেন, একটা একটা পাতা হাতে ধরে রাংতায় মোড়া হয়েছে যত্ন করে ৷ ডালপালা আর সে অর্থে আলাদা করে চোখে পড়ছে না বটে, তবে কেবল ওই মোটা গুঁড়িটায় চাঁদের আলোয়... ৷

চিন্তাটা আর এর বেশি এগুলো না, হঠাৎ মনে হল, ওই গুঁড়িতে গা ঘেঁষে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে না? এত রাতে কে ওখানে? পরমা একটু ঝুঁকে পড়ে ভালো করে ঠাহর করল—হ্যাঁ ঠিকই তো! একজন কেউ... মানুষ ৷ কী করছে মাঝরাতে গাছের নীচে? ফ্যাকাশে অবয়ব, নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে, তার দিকেই যেন চেয়ে আছে! মানে চোখ-মুখ বোঝা যাচ্ছে না, তবে এদিকেই ফেরা ৷ এবার অতি পরিচিত ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পা ঘষে ঘষে একটু এগুতেই, এক লহমায় বুঝতে পারল—আরে! জলিমাসিমা! ফরসা শরীরে ন্যাতা-প্যাতা পাতলা ন্যাকড়া মতন একটা শাড়ি জড়ানো, হাতকাটা ঢিলে ঢালা শেমিজের মতন জামা, কাচের ওপর আলো পড়ে হঠাৎ ঝকমক করে উঠল চশমাটা—পরমা অস্ফুটে বলল—‘‘মা-সি-মা-মা...!’’

উনি হাতটা তুলে, অপ্রস্তুত একটা হাসি হেসে কাছে আসবার জন্য ইশারা করলেন—যেমনটা এতকাল ধরে প্রয়োজনে যেতে আসতে ডেকে এসেছেন সামনের ফটকের ভেতর থেকে ৷ এই অতি পরিচিত অভ্যেসের কারণেই বোধহয়, এমন অবাস্তব বা অতিপ্রাকৃত, অলৌকিক কর্মকাণ্ডের পরও, পরমার কিন্তু এতটুকুও বিস্ময় বোধ হল না, অথবা ভয় বা গা ছমছমে ভাব, নিদেন পক্ষে অস্বস্তিও না—অদ্ভুত! ফলে সে নিজেও হাত দেখিয়ে ‘‘আসছি’’ বলে তড়িঘড়ি একেবারে প্রায় দশ-পনেরো হাতের ব্যাবধানে মুখোমুখি গিয়ে হাজির হল জলিমাসিমার সামনে ৷

জলি বোস বেশ স্নেহের সুরেই বললেন—‘‘ভালো আছো?’’

মাথা নাড়ল পরমা, আছে ৷ ‘‘আমি ছিলাম না অনেকদিন, প্রায় আড়াই মাস, আজই ফিরেছি ৷’’

—‘‘জানি ৷ ক্লান্ত তুমি ৷ তাও ডেকে আনলাম ৷’’

পরমা বলল—‘‘কী যে বলেন ৷ আসলে, কী করে বোঝাবো..., আমার বড্ড অনুশোচনা হত, পাশে থেকেও কিছুই করতে পারলাম...’’

‘না’ শব্দটা উচ্চারণ করবার আগেই জলি বোস একেবারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন—‘‘না-না, ও কথা বোলো না ৷ আবার কী করবে, করেছ তো, যথেষ্ট করেছ ৷ এর চেয়ে বেশি আশা করা অন্যায় বুঝলে? খুব অনুচিত ৷ তোমার কাছে আমি ঋণী, আর বিশেষ করে...’’

এবার পরমার পালা ৷ বিনয়ে গ্লানিতে একাকার হয়ে প্রায় হাহাকার করে উঠল—‘‘ছি, ছি ঋণের কথা আসছে কোথা থেকে! বরং আমি তো...’’

এবারও কথাটা সম্পূর্ণ না শুনে, দুর্বল মাথাটা বেশ জোরের সঙ্গে ঝাঁকিয়ে বললেন—‘‘না, না, আমায় বলতে দাও আগে ৷ এমনি সাধারণ কৃতজ্ঞতার কথা বলছি না আমি ৷ সে তো তুমি পরোপকারী মেয়ে, নিজের শখেই না হয় করলে কিছু এই বুড়ো মানুষটার জন্য—পাড়ার বেড়াল কুকুরের হ্যাপাও তো কম সামলাওনা—সে কথা নয় ৷ এ অন্য ঋণ... ৷’’ বলে সামান্যক্ষণ থামলেন জলি বোস ৷

পরমা ঠিক ধরতে পারল না কী বোঝাতে চাইছেন ৷ তাহলে কি সেদিন সবার সঙ্গে স্ব-ইচ্ছেয় বাড়িতে যে ঢুকে পড়েনি বিনা অনুমতিতে, তার কথা?

জলি বোস একটু কষ্ট করে হাসলেন—‘‘জানো না?’’

তার বোধকরি অতক্ষণ দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছিল, ব্যালেন্স থাকছিল না ৷ একটু দুলে দুলে কসরত করে, ফের সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন—‘‘মানুষ মানুষকে অভিশাপ দেয় ‘তোর মৃত্যুতে শেয়াল কুকুরেও কাঁদবে না’—মানে, আগে মানুষ কাঁদলে না শেয়াল কুকুর! এ সব হচ্ছে শাপ-শাপান্তর কথা ৷ রাগে, দুঃখে, হিংসেয়, অন্তরের বিষ উগরে বলা, তাও ভদ্রলোকের বাড়িতে নয় ৷ তবে, এসব বলে, শেষমেশ তারাও হয়তো সব ভুলে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে৷ সে কান্না দুঃখ-বেদনার জন্য নয়—রেওয়াজ বলে... ৷ আমার বেলায় রীত-রেওয়াজ মোটামুটি মানার চেষ্টাই হল—ধূপ, ফুল, নতুন কাপড়, খৈ, নিমপাতা, লোহার টুকরো—যতটুকু না হলে নয় ৷ কেবল বাকি:রইল চোখের জল ৷ পরমা, সেদিন আমার জন্য কিন্তু কে-উ এক ফোঁটা...’’ জলি বোস কথাটা আর শেষ করলেন না ৷ শেষের দিকে গলাটা ধরে গিয়েছিল, ভাঙা-ভাঙা, ভারী... ৷

পরমা আর কী বলবে, এ তো আর তার অজানা নয় ৷

‘‘কিন্তু তুমি আমার জন্য সত্যি চোখের জল ফেলেছ পরমা ৷ তুমি আমার কথা ভেবেই কেঁদেছ ৷ আমার দুর্ভাগ্য, আমার একাকিত্বের পরিণতি, বা বলতে পারো আমার নিঃসঙ্গ, নির্বান্ধব জীবনটার কথা ভেবেই—তবে, তবে সেও তো আমারই জন্য...? সেদিনও ক্লান্ত ছিলে, ব্যস্ত ছিলে, কতদিনের জন্য বাইরে যাওয়া, সংসার ছেড়ে, একা একা, তথাপি... ৷ বাইরে তুমুল বৃষ্টি..., তোমার মনে আছে?’’ পরমা মাথা নাড়ল, মনে আছে ৷

‘‘এ-ই ঋণ, বুঝলে? মায়া, মমতা, করুণা-যাই বলো না কেন, এমনটা তো কেউ দেয়নি ৷’’ জলি বোস থামলেন, আকাশের দিকে চাইলেন সময় নিয়ে, যেন পরখ করলেন, একি চাঁদের আলোই, নাকি ভোর হচ্ছে? কী ফটফটে জ্যোৎস্না! তারপর বললেন—‘‘জানো তো, হিন্দু ধর্মে আত্মার মুক্তির জন্য নানান উপাচার থাকে, শ্রাদ্ধ-শান্তি, হ্যানো-ত্যানো—সে ক্ষেত্রে, স্থানীয় মন্দিরে মূল্য ধরে দিয়ে তারও একটা ব্যবস্থা হয়েছে আমার, আর বাকি ব্যবস্থা যেটা বলছিলাম খানিক আগে, সেটাও তুমি করেছ, অশ্রুজলে সিক্ত, মুক্ত আত্মা... ৷’’ জলি বোস নিজের রসিকতায় নিজেই একটু হাসলেন খুঁকখুঁক করে—‘‘কিন্তু তোমাকে ক’টা কথা বলে যেতে না পারলে যে আত্মা-টাত্মা জানি না, আমারই মুক্তি হবে না পরমা? ডেথ সার্টিফিকেট আর পোস্টমর্টমের রিপোর্ট দিয়ে নির্বিঘ্নে সৎকার সম্পন্ন হতে পারে, কিন্তু বাকিটা হয় না—এই আত্মার সৎকার ৷ তার জন্য সঠিক মৃত্যুর ‘কা-র-ণ টা’ জানতে হয় বুঝলে? আসল কারণ... ৷ আর সে কারণের কথা, তোমাকে বাদে কাকেই বা বলব বলো?’’

পরমা এতক্ষণ পরে একবার একটু কিছু বলবার চেষ্টা করল, কিন্তু গলা দিয়ে পরিষ্কার স্বর বেরুলো না ৷ ‘‘ও-টা কি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না!’’ এরকমই কিছু বলল বোধহয়, বা বোঝাতে চাইল ৷ জলি বোস এবারও মনের কথাটা লুফে নিয়ে বললেন—‘‘অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক, বুঝলে কিছু? বুঝলে না ৷ শোনো, বলি তাহলে—

আমার হাজব্যান্ডকে দেখোনি তুমি ৷ একটু ভালোমানুষ গোছের ছিলেন তিনি ৷ মানে, মানুষ ভালোর কথা বলছি না৷ এই আর কি—ধর্ম ভীরু, কর্মও ভীরু—সারা দিন পুজো-আচ্চা, দান-ধ্যান ৷ ধ্যান যত না, দানটাই বেশি ৷ ফলে টাকা-পয়সা জমাতে পারিনি, থাকবার মধ্যে এই বাড়িটিই... ৷ আর জানোই তো ছেলেপুলে না থাকলে আত্মীয়-স্বজন সম্পত্তির লোভে কেমন শকুনের মতন চারিধার থেকে ছেঁকে ধরে! আসা-যাওয়া, থাকা-বসা, সর্দি জ্বর হলেই দিনে তিনবার ফোন—একেবারে চোখে হারায় ৷ প্রাণান্তকর অবস্থার শেষ সীমায় জানিয়ে রাখলাম, সম্পত্তি সব আশ্রমে দান-পত্র করে দিয়েছি ৷ ব্যস, সে অবশ্য বহুকাল আগের কথা, তা সেই থেকে জনসমাগম বন্ধ হল ৷ ভালোই হল, আপদ গেল ৷

মি. বোস তখন বললেন, বলা যখন হয়েছে, তাহলে কার্যতই কোনও ধর্ম সংস্থানে দান-পত্র লিখে দেওয়া হোক ৷ উনি আবার ইহকাল, পরকাল এ সমস্ত খুব মানতেন কিনা! ধর্মের নামে মিথ্যে বললে অধর্ম হবে—এই সব হাবিজাবি আর কী ৷ আমি হতে দিইনি ৷ ইহকাল যথেষ্ট দেখলাম, পরকাল পরে দেখা যাবে ৷ সম্পত্তি হাতে পেয়ে সেই সাধুবাবারা তাদের কোনও একটা আশ্রমে ঢুকিয়ে দিয়ে বাড়ি দখল করে বসবে ৷ ওসব আমার ঢের দেখা আছে ৷ এই বাড়ির ওপর আমার বড়ো মায়া, বুঝলে..., এটিই আমার সব, প্রাণের প্রাণ ৷ জানলা দরজা খুললেও মনে হয়, হাওয়া-বাতাস এসে বাড়ি দখল করে নেবে ৷ ক্ষ্যাপামো—তা, আর কী করব! যার যাতে আরাম, যে যাতে সুখী...! কেউ হাঁচড়ে-পিচড়ে পাহাড়ের চূড়োয় উঠে খুশি হয়, কেউ হেলিকপ্টারের জানলা থেকে দেখেই খুশি ৷ যাই হোক, আমি তো জানোই একাচোরা, ঘরকুনো মানুষ, গোড়া থেকেই অবশ্য—বললাম, আমার অবর্তমানে বাড়ি পাবে ভাগ্নে, কিন্তু বর্তমানে না ৷ সে তাই দিয়ে যা ইচ্ছে করুক—আমি দেখতে আসব না ৷ তবে আমি থাকতে পা রাখতে দেব না কাউকে ৷ এটা আমার বাড়ি ৷

ওই ভাগ্নে ছেলেটা খারাপ না ৷ ওই মামার মতনই ৷ ভালোমানুষ টাইপ, লোভ-টোভও পরিমিত... ৷ ল্যাবা-গোবা বৌ আছে—মাটির মানুষ, আর এক ছেলে ৷ ও-ই একমাত্র এ বাড়িতে আসা-যাওয়া করেছে এতদিন ৷ হয়তো বা বছরে এক আধবার—তাও আসত ৷ ওর ওপরই আমার একটু বিশেষ টানও আছে ৷ ছোটোবেলায় মামাবাড়িতে থাকত, মানে আমার শ্বশুরবাড়িতে ৷ মাকে পেত না বলে সারাক্ষণ মামির কোল ঘেঁষে রইত তখন ৷ পরে শ্বশুরকুল মি. বোসের মাথায় ঢুকিয়েছিল ওকে দত্তক নেবার জন্য—আমি নিইনি ৷ যে কারণে তারা দেবার জন্য দানসত্র খুলে বসে আছে, সে কারণটি আমার জানা আছে ৷ তা বাদে অন্যের বাচ্চা নিয়ে শখ মেটাবার সখ আমার মোটেই নেই ৷ ওই কালসাপ ছেলে-পুলে যখন বাড়ি-ঘর কেড়ে কুড়ে নিয়ে, মা-বাপকে হোমে দিয়ে বেড়াল পার করে বসে থাকবে, তখন? ওসবে আমি নেই বুঝলে?’’

জলি বোস সে-ই কোন কালের ঘটনা স্মরণ করেই বেশ উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলেন ৷ সেটি কোনওক্রমে সামলে নিয়ে বললেন—‘‘এসব হল ভূমিকা—এবার আসল কথায় আসি ৷ মি. বোস থাকাকালীনই বিল্ডার, প্রমোটারের উৎপাত শুরু হয়েছিল ৷ তবে সে সহ্যের মধ্যে ৷ কিন্তু উনি চলে যেতে যা হল, তা একেবারে অসহ্য ৷ যখন-তখন ফোন, কলিং-বেল, এই অফার, সেই অফার, চিঠির পর চিঠি... ৷ উত্যক্ত করবার একেবারে শেষ পর্যায় ৷ শেষে বছর সাতেক আগে পুলিসে খবর দিলাম ৷ সত্যি বলতে কি করলও সাহায্য ৷ প্রতি হপ্তায় খোঁজ নে-য়া, কে আসছে-যাচ্ছে খেয়াল রাখা—তবে তার সঙ্গে সঙ্গে আমিও বসে থাকিনি ৷ কলিং বেলের কানেকশন কেটে আর ফটকে রাত-দিন তালা লাগিয়ে, টেলিফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখে—ব্যবস্থাটা ভালোই হল ৷ কেবল বিল্ডার কেন, তার সঙ্গে সঙ্গে স-বা-র আসা বন্ধ, সমস্ত যোগাযোগ কাট, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন... ৷

তবে কেবল বিল্ডারের দোষ দিলেও তো হবে না ৷ পাড়া-প্রতিবেশী, চেনা-অচেনা তাদের মুখেও তো একই বাক্য—‘মাসিমা, আমার কাছে বিক্রি করুন বাড়িটা ৷ একতলায় আপনি, দোতলাটা আমার, থোক টাকা পাবেন, নতুন বাড়িও হবে ৷ আমরাই সব দেখাশুনো করব আপনার, আপনি নিশ্চিন্ত ৷’ মনে মনে বলি, তোদের দেখাশুনো তোরা নিজেরাই কর ৷ আমাকে নিশ্চিন্ত করবার জন্য তোদের চিন্তায় মরবার প্রয়োজন নেই আর—মুখে বলি, ‘দেব কী করে, ও তো এখন দেবোত্তর সম্পত্তি ৷ মি. বোস তো দান করে গিয়েছেন আশ্রমকে?’

এই কথা বলে বলে চারিদিকে চাউর হওয়াতে, শেষে জেনেছে যে ঘ্যান ঘ্যান করেও কোনওই লাভ নেই ৷ তবে খুব হিতাকাঙ্ক্ষীরা তাও মাঝে মাঝে বলতে ছাড়ে না যে আমাদের এই ডিসিশনটা যে কতটা ভুল ৷ এসব দান-মান না করলে আজ রাজার হালে থাকতে পারতাম—, আরামে, আয়েশে ৷ এদের বোঝাই কীভাবে যে, এই পাঁচিলের ভেতর যে নিজেই আছে রানির হালে, তাকে রাজার হালে থাকবার জন্য পরমুখাপেক্ষী হবার যে কোনওই প্রয়োজন নেই ৷ নির্বোধ সব ৷

তবে এ সবই হচ্ছে হাবি-জাবি লোক ঠ্যাকানো মুখের কথা ৷ আমি তো জানি আদতে উইল করা আছে বহুকাল আগে ৷ আসলটা, উকিলের জিম্মায়, আর কপি আছে আমার স্বামীর অফিসের খুবই নির্ভরযোগ্য এক কোলিগ বন্ধুর কাছে ৷ ভদ্রলোক একদিকে, ওই মুকুল ঘোষদের মামা হন, অন্যদিকে আমার ভাগ্নের কাকা ৷ মানুষটি ভালো, সজ্জন ৷ আমার আবার একটু দূরে-দূরে থাকলেই সজ্জন মনে হয়, কাছে ঘেঁষতে চাইলেই দুর্জন ৷’’ —জলি বোস নিজের ওপরই ঠাট্টা করে, নিজেই হাসলেন সামান্য ৷ ‘‘গত বছর দুয়েক ভাগ্নে আসতে পারছে না নিয়মিত—বৌয়ের হ্যানো, ছেলের ত্যানো—বলে, ‘মামিমা, আপনার বয়স হয়েছে, একা একা..., এবার রায়পুরে এসেই থাকুন৷’ হয়তো ভালো ভেবেই বলে, অথবা নেহাতই কথার কথা, তবু শুনলেই বিরক্তিতে আমার প্রেশার চড়ে যায়, ভয়ে আবার ড্রপও করে, ফলে উত্তর না দিয়ে হুঁ, হাঁ করে কাটিয়ে দিই ৷’’

জলি বোস, একটানা এতক্ষণ কথা বলে বলে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন ৷ এত কথা বোধকরি উনি সারা জীবনেও বলেননি, যেমনটা আজ বলে চলেছেন চিরকালের পরিত্যক্ত শান বাঁধানো তাঁর বাসভূমির উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে, এমন অলৌকিক এক শরৎ পূর্ণিমার মধ্য বা শেষ রাতের এই সাক্ষাৎকারে ৷ সামান্যক্ষণ হাঁপিয়ে, জিরিয়ে, শেষে কেমন বিষণ্ণ গলায় বললেন—‘‘এত করেও কিন্তু শেষরক্ষা হল না... বুঝলে...! হেরেই গেলাম ৷ আসলে..., বাঘের থেকে প্রাণ বাঁচাতে না হয় তার খাঁচায় ঢুকলাম না, কিন্তু বাঘ যদি আমার খাঁচায় ঢোকে?...

গত ফেব্রুয়ারিতে—তখনও খুব শীত, সকালের দিকে ফটকের তালা খুলে দুধের প্যাকেটটা নিচ্ছি... এক ভদ্রলোক—একদম মুখোমুখি ৷ কোথাও যাচ্ছিল বোধহয়, আমাকে বাইরে দেখে রাস্তার মাঝ মধ্যিখানে গাড়ি থামিয়ে দিয়ে, নেমে, ফটকের সামনে চলে এল ৷ ইঞ্জিনও বন্ধ করেনি, দরজাটাও হাট খোলা..., ভদ্রলোকের ভ্রুক্ষেপ নেই ৷ রাস্তায় লোক চলাচল আছে, বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে, জমাদারনি ঝাড়ু দিচ্ছে—প্রকাশ্য দিবালোক...’’ জলি বোস যেন সেই মাঘ মাসের ঘটে যাওয়া ঘটনাটা আবার করে ঘটতে দেখছেন চোখের সামনে ৷ ‘‘ছাই-রঙা কোট, ভেতরে গলাবন্ধ লাল পুলওভার, জুতো থেকে ঘড়ি, চশমা, বেল্ট-প্রতিটি জিনিসে যাকে বলা যায় বহুমূল্যের ছটা ৷ কলপ লাগানো চকচকে চুল, কামানো গালে কড়া দাড়ির নীলচে আভা, উগ্র কৃত্রিম সুগন্ধে নাকে জ্বালা ধরে ৷ ভদ্রলোক হিন্দিতেই কথা বললেন, তার বাংলা তর্জমা করলে যা দাড়ায়, তা হল—‘দেবতাকে উৎসর্গ করা গৃহকে তো মন্দিরই বলা যায়, আর তার অধিষ্ঠাত্রীও সেই সূত্রে দেবীই—ফলে, সকালে দেবী দর্শন করে বড়ো পুণ্য হল, প্রণাম নিয়ে অভাগাকে কৃপা করুন... ৷’

লোকটি এমনই নাটকীয়ভাবে সহসা কথাগুলো বলল, যে জলি বোসের ঠিক মাথাতেই ঢুকল না, কী মন্দির, কে দেবী, কীসের কৃপা—উনি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন খানিক, বলে কী লোকটা! শেষে একটু বোধহয় পরিষ্কার হল ৷ কিন্তু সাত সকালে পুরোপুরি অচেনা একটা মানুষের থেকে ঠিক এই ধরনের গায়ে পড়া ঠাট্টা বা বাঙ্গ শোনা ৷ শোনা তো একেবারেই স্বাভাবিক নয়—উনি ভুরু কুঁচকোলেন ৷ সাহস কত! কথার উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে না করে ফিরে আসছিলেন, সহসা অদ্ভুত ঠান্ডা ক্রুর দৃষ্টিতে চেয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে ফের বলল—‘কিন্তু মিসেস বোস, এতকাল ধরে ভগবানের নামে মিথ্যে বলে আসাতে তিনি কী শাস্তি দেবেন জানি না, তবে মানুষকে বুদ্ধু বানিয়ে রাখবার জন্য, তারা কিন্তু ছেড়ে দেবে না—অন্তত আমি তো না-ই ৷’

বিরক্ত থেকে কখন যে ভীত হলেন, তা বুঝে উঠবার আগেই জলি বোস টের পেলেন যে তিনি আর দাঁড়াতে পারছেন না, পা দুটো থরথর করে কাঁপছে, অথচ কপালে ঘাম—অমন চাউনি, অমন ঠান্ডা-ভয়ংকর শাসানি শুনলে যে কোনও বলবান যুবকেরই বুকের রক্ত হি-ম হয়ে যায় তো জলি বোস কোন ছার ৷

ওই ভয়ানক কুটিল মুখেই একটু হাসির ভাব এনে আবার বলল—‘আপনার ভাগ্নের সঙ্গে কথা হয়েছে, দলিল-পত্তর পেতেও সময় লাগবে না—যত চালাক মনে করেন নিজেদের, তত চালাক যে নন, সেটা আশা করি এবার টের পাবেন... ৷ হরিশ খান্না যা চায়, তা পায়নি, এমনটা তো হয়নি ইতিহাসে..., সেটা খবর নিয়ে যাচাই করে দেখে নিতে পারেন ৷’ এতটা বলে, যেমন অকস্মাৎ এসেছিল, তেমনই হুশ করে চলে গেল ৷ যাবার আগে আবার স্বাভাবিক ভাবে হেসে হাতও নাড়ল—সে সব মনে হয় প্রাতঃভ্রমণকারী প্রতিবেশীদের সন্দেহ নিবারণের জন্যই—অভিনয় ৷ জলি বোস এক হাতে ছোটো একটা ঠান্ডা দুধের প্যাকেট; অন্যহাতে চাবির গোছা সমেত বরফের মতন ঠান্ডা কনকনে লোহার ফটকটা ধরে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন—এত সোজাসুজি মারণ-হুমকি!

পরমাদের রাতের চৌকিদারের ডিউটি তখন শেষ হব হব, খবরের কাগজ-টাগজ নিচ্ছে, এটা-সেটা গোছাচ্ছে, ওঁকে স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল কিছু লাগবে নাকি মাসিমার ৷ এমনি কথার কথা ৷ জলি বোসও মাথা নাড়লেন—কিছুই লাগবে না ৷ তারপর একটু ধাতস্থ হতে অস্ফুটে কেবল বললেন—‘ওই লোকটা... ৷’

সুভাষ কথা বলবার লোক পায় না মোটে—এটুকু প্রশ্নেই মহাখুশি, বলল ‘কার কথা বলেন মাসিমা, খান্না সাহেব? চেনেন না? এইতো উনিশশো-সতেরো, আঠেরোর ৷ ওই যে দুটা-প্লট জুড়ে, রাজপ্রাসাদ বলতে পারেন, ব্যাপক... ৷ বিল্ডার এ পাড়ার সব বাড়ি তারই বানানো, আর সিকি ভাগ তো নিজেরই—ভাড়া খাটে ৷ এবার পুজোয় পাঁচলাখ দিয়েছে, অষ্টমীর দিন লঙ্গোর... ৷’ আরও অনেক কিছুই বলার ছিল অমন মহান বিজনেসম্যানের, মরমিয়া কীর্তি কলাপের, তবে জলি বোসের জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট, আর দাঁড়ালেন না উনি ৷ ভয়ে হাত-পা জমে গেলেও, মানুষ তো বরফ নয়, তাই প্রচণ্ড শীত করছিল তাঁর ৷

এমনি করেই ভয়ে, ত্রাসে, চিন্তায় ঘরের মধ্যেই দিনকতক কাটালেন জলি বোস ৷ সকালে উঠে জলের পাম্প চালান না ৷ দুধের প্যাকেট থলেতে ঝুলিয়ে দিয়ে যায়—কোনওদিন বেড়াল এসে নখ ফুটিয়ে সাবাড় করে, আর ভাগ্যে থাকলে বেলার দিকে অক্ষত তুলে নেন ৷ খবরের কাগজ প’ড়ে থাকে ধুলোয়—পাশের বাড়ির দিনের চৌকিদার কমল একদিন দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল—‘মাসিমার শরীল গতিক কি খারাপ নি? সারাদিন তালা মাইরা রাখেন দেইখ্যা দিদি জিগাইতাসিল ৷’

জলি বোস মাথাটা দোলালেন মাত্র, যাতে কিছুই বোঝায় না ৷ ফলে কমলও কী বুঝল সে-ই জানে ৷ এরই হপ্তা খানেক পরে ভাগ্নের ফোন—এমনিই মাঝে মধ্যে যেমন করে তেমনই ৷ স্বাভাবিক কথাবার্তার মধ্যে সে যে এই প্রপার্টি মপার্টি, উইল-টুইলের ঘটনা কিছু জানে, এমনটা মনে হল না ৷ ফলে জলি বোসও অকারণে আর নাম-ধাম বলে ঝঞ্ঝাট বিস্তার না করে শুধু জানালেন যে বিল্ডাররা আবার ঝামেলা পাকাচ্ছে এবং এবার বেশ কোমর বেঁধে ৷

অযথা মিথ্যে বলবার ছেলে এই হাঁদা-গোদা সরল ভাগ্নেটি মোটেই নয়, আর অভিনয় করতে হলেও পুরো ফেল, অনায়াসে ধরা পড়ে যাবে ৷ বলল—‘আপনি বলেননি যে মামা সব আশ্রমে দান করেছেন?’

জলি বোস বললেন—‘বলেছি, সবাই জানেও—তবু... ৷’

—‘পুলিসে খবর দিন, ইয়ার্কি নাকি? বদমাশ সব, একা পেয়ে যা ইচ্ছে তাই... এই জন্যই বলি এবার চলে আসুন রায়পুরে, এখেনে... ৷’

উনি হু, হাঁ করে বললেন—‘ছাড়ছি... ৷’

ফোনের যোগাযোগ ছাড়লেন বটে, তবে খান্না প্রপার্টিজ কিন্তু অত সহজে ছাড়ল না জলি বোসকে ৷ বাড়ির চারিদিকে যেন জাল পেতে রেখেছে, কোনও দিকে পা বাড়াবে তারও উপায় নেই ৷ মার্চ মাসে দুটো বিয়ের নেমতন্ন ছিল পাড়াতেই, তাতেও স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে মুকুল ঘোষকে জানাতে হল পায়ে জোর পান না—যদি গাড়িতেই... ৷ কারণ তার আগে যে দেখে ফেলেছেন, দুটি লোক বাড়ির সামনে ঘুর ঘুর করছে সমানে! ঘোষবাবু অবশ্য সাগ্রহে তুলে নিলেন, আবার নামিয়েও দিলেন সময়-মতন ৷ অনুরোধ অনুযায়ী ফটক খুলে ভেতরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষাও করলেন ঠায়... ৷ নিয়োগীর বাড়ির সত্যনারায়ণ পুজোতেও কমল নিয়ে গেল হাত ধরে ৷ দু’দিন লিস্ট মিলিয়ে মাসের বাজার করে দিল পরমা, একদিন নিয়ে গেল ব্লাড টেস্ট করাতে ৷ মরমে মরে যেতেন অনবরত অনুরোধ করতে কিন্তু উপায় কী? এরা যে পালা করে নজর রাখেছে তার উপর! ছায়াটুকু দেখলেই হল!

সত্যি বলতে কী, মরতে তাঁর ভয় নেই ৷ ভয় হল কেবল বাড়িছাড়া হতে ৷ যোগসাজস করে যদি ভুয়ো দলিল দাখিল ক’রে বাড়িটাই দখল করে নেয়! এরা কেবল দিনকে রাত নয়, শীতকেও গ্রীষ্ম বানিয়ে ঘাম ছুটিয়ে ছাড়তে পারে ৷ তা বাদে নির্বিবাদী, একাচোরা অতি প্রাইভেট মানুষটার ওপর এই নজরদারিটিও তাঁর কাছে সীমাহীন বিরক্তির কারণ ৷

ইতিমধ্যে গরমও এবার হল মাত্রাহীন! জলের আকাল, দিনের সিংহভাগে বিজলি থাকে না, ঘাস পাতা শুকিয়ে খড়, দেয়ালে হাত রাখা যায় না, ছাত থেকে আগুনের হলকা—জলি বোস গরমে অর্ধমৃত ৷ শরীরটা ভালো থাকছে না, প্রেশার ওঠা-নামা করে মারাত্মক ৷ কী-বা সামান্য আহার, তা-ও হজম হয় না, রাতে ওষুধ খেয়েও ছেঁড়া-ছেঁড়া ঘুম..., আ-র সহ্য হয় না... ৷

অদ্ভুত কর্কশ কোনও পাখির ডাক শুনে পরমা চমকে ওপর দিকে তাকাল, ক্যাঁ ক্যাঁ ক্রোঁ ক্রোঁ-ও করে ডানা ঝাপটিয়ে কী যেন উড়ে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে ৷ একটি না খানকতক... ৷ জলিমাসিমা তাঁর ঋণ শোধ করতে গোটা রাতটাই মনে হয় কাটাবেন এখেনে, থাক ৷ কারণ কোনও অজানা কারণে পরমার তেমন ক্লান্ত লাগছে না কিন্তু! ক-খ-ন থেকে ঠা-য় দাঁড়ানো, তবুও... ৷

জলি বোস কষ্ট করে একটু হাসলেন যেন—তবে সেটায় নতুনত্ব নেই কোনও ৷ সব সময়ই অস্বস্তিতে সামান্য হাসির ভাবটুকুই করেন মাত্র, আজও তেমন ভাবেই বললেন—‘‘না সকাল হয়নি ৷ সেদিকে আমার খেয়াল আছে ৷ ওগুলো প্যাঁচা—কোটরে প্যাঁচা... ৷’’ বড়ো করে শ্বাস ফেলে, নাকি হাঁপিয়ে গিয়ে কষ্টে কুঁচকোলেন মুখটা—‘‘সেদিন দিনটা..., আমি যেন আর সহ্য করতে পারছিলাম না ৷ চারিদিকে মনে হয় আগুন জ্বলছে, বার বার বিজলি যাচ্ছে, ইনভার্টারে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ শুরু হল—বেচারা, আর কত টানবে ৷ এমনিতেই পুরোনো, তায় সার্ভিসিং হয়নি, এ ক’মাস তো ঢুকতেই দিইনি কাউকে...! সব তো ওদের লোক, বললাম না? পাম্পটায় জল উঠছিল না বলে সেন্টারে কল করেছিলাম, এল মিস্ত্রি ৷ বলল—‘কিছুদিন চলার মতন জোড়া তালি দিয়ে গেলাম—মাস কয় চলবে,’ বলে, অদ্ভুত এক হাসি হাসল ৷ যেন মাস কয়েকের বেশিতে আমার আর প্রয়োজন নেই ৷ আমি সেন্টারে ফোন করে বললাম—‘এ কাকে পাঠিয়েছিলে?’ বলে—‘কেন?’ আমি বললাম—‘কেমন ধারা কথাবার্তা!’ ওরা কানেই তুলল না! হয়তো তাদেরও বশ করেছে, হাত করে রেখেছে টাকা দিয়ে...! আর একবার—মিটার বক্স দেখতে এসে, লোকটা যাবার সময় বলে—‘আন্টি, এটা তো আপনারই বাড়ি, একাই থাকেন, না? মিটার বক্সটা ভেতরে লাগালে পারতেন ৷ জল প’ড়ে, বার্স্ট হতে পারে ৷ তবে, এখন আর সরিয়ে লাভ নেই ৷’ এ অবশ্য অদ্ভুত হাসি হাসেনি—তবে জানে তো যে লাভ লোকশান সবই এখন তাদের ‘বস’ এর হাতে, ক’টা দিনের মামলা... ৷ তা, এই সব কারণেই ইনভার্টার-ওয়ালাকে ডাকিনি, ব্যাটারিতে জল ঢালতে ঢালতে আবার কী সমাচার দেবে কে জানে! তবে তাও চলছিল ৷ আমি একা মানুষ, একটাই পাখা—ফলে টিকটিক করে ঘুরছিল কোনওমতে, কিন্তু বিকেলের দিকে বন্ধই হয়ে গেল—হয়তো চার্জও শেষ হয়ে গিয়েছিল!

আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না, লাগবার কথাও না ৷ ডাক্তার সরকারকে একবার ফোন করে বললাম অবস্থাটা ৷ বাইরে ছিলেন, বললেন আগামীকাল ফিরেই একবার দেখে যাবেন ৷ তবে আজই দুটো ওষুধ আনিয়ে নিন, অমুকটা বন্ধ করে তমুকটা শুরু করুন, ঘুমেরটাও বদলে দিলাম—তার সঙ্গে ওইটা, সেইটা, একদম দেরি করবেন না, আজই আনান ৷ আগে কেন বলেননি, একা থাকেন, এই বয়সে, কতদিন চেক-আপ হয়নি—ঠিক আছে, কালই আসছি... ৷’

খুব একটা ভরসার কথা না হলেও কেমন যেন নিশ্চিন্ত হলাম ৷ হল তো ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ, তাতেই অর্ধেক আরাম ৷ তা বাদে, কারেন্ট এল, আমিও এসি-টা চালিয়ে দিলাম, ঠান্ডা জলের আশায় বোতল ঢোকালাম ডিপ ফ্রিজে... ৷ তারপর সামান্য বাসি ভাত যা ছিল, জল ঢেলে খেয়ে নিয়ে, ঠান্ডা ঘরে বসে ঝিমোতে লাগলাম—শরীরটা তখন অনেক ভালো ৷ একদমই ভালো বলা যায় ৷

সন্ধে হয়ে আসছিল ৷ পার্কে বাচ্চারা চ্যাঁচামেচি করে খেলছে, মানুষজন বাজার-হাটে যাচ্ছে, কাজ কর্ম থেকে ফিরছে—আমি তৈরি হয়ে, হাতে মানি ব্যাগটায় ওষুধের নাম লেখা কাগজটা নিয়ে, বাড়ি থেকে বেরোলাম—যদি মুকুলকে পাই ওষুধগুলো আনিয়ে নেব, নয়তো তোমাকে বলব—সামনে দেখি একটা অটোরিকশা, যোশীর বাড়িতে কেউ এসেছে ৷ হঠাৎ মত বদলে অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওষুধ কিনতে হবে নিয়ে যাবে? আবার পৌঁছেও দিতে হবে কিন্ত!’ বুড়ো মানুষ আর ওষুধের কথা শুনে রাজি হয়ে গেল—তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে ৷ পুরোপুরি নয়, মানে আবছা ৷ পার্কটা পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়বার মুখেই দুটি ছেলে হাত দেখাল ৷ আমি তখনও বুঝিনি, ভাবলাম আমাকে ভেতরে দেখতে পায়নি, খালি গাড়ি ভেবে থামিয়েছে—আদতে ঠিক উলটো ৷ বলল—‘নেবে আসুন মাসিমা, আপনি কেন কষ্ট করে দোকানে যাবেন, প্রেসক্রিপশনটা আমাকে দিন, এনে দিচ্ছি ৷’ বলেই হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে আমাকে নামিয়ে এনে, এক খামচায় পার্সটা ছিনিয়ে, চেন খুলে কাগজের টুকরোটা বের করল ৷ আমি আর অটোওয়ালা হতভম্ব তাকিয়ে আছি পরস্পরের দিকে ৷ ওই টানে আমার কব্জিতে যন্ত্রণা হচ্ছিল, হাঁটু, পায়ের পাতায় ব্যথা—একজন বলল—‘মাসিমার কি হার্ট খারাপ, নাকি হাই প্রেশার? কিডনি ঠিক আছে তো?’ অন্যজন কথাটা শুনে হাসল ঠা-ন-ডা চোখে, তারপর প্রেসক্রিপশনটা কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়ে প্রজাপতির মতন উড়িয়ে দিল বাতাসে ৷ দিয়ে পার্সটা ফেরত দিল ৷ —‘নিন মাসিমা, সাবধানে রাখুন, চাবি আছে ভেতরে ৷ তালা-টালা খুলে ঢুকে পড়ুন ভেতরে ৷ দিনকাল ভালো না, একা একা বেরোবেন না আর, দরকার হলে আমাদের খবর দেবেন—আশে-পাশেই থাকি, হাত নাড়লেই চলে আসব ৷’ বলেই দু’ জন ওই অটোতে উঠে ‘চল বে’ বলে বেরিয়ে গেল ৷

আমি ওই অবস্থায় প্রায় ছুটে ছুটে কী ভাবে যে বাড়ি ফিরলাম, ফটক খুললাম, দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম, আবার সব বন্ধও করলাম—কিছু জানি না ৷ সবই মনে হয় ঘোরের মধ্যে ৷ রাত বাড়তে লাগল, তার সঙ্গে বাড়তে লাগল আমার প্রেশার আর প্যালপিটিশন ৷ ঘাম হচ্ছিল, অসহ্য গরম... এসি টা চালাতে গেলাম, চলল না, অথচ বিজলি আছে ৷ ফ্রিজে জল নেই, যে বোতলটা ডিপ ফ্রিজে রেখেছিলাম, তা বরফ হয়ে গেছে ৷ আমি আষ্টে-পৃষ্টে জানলা দরজা বন্ধ করে গরমে ঝলসাতে লাগলাম ৷ পাখাটা চলছে কিন্তু তার হাওয়া আরও অসহনীয় ৷ আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, মাথা ভার, বমি পাচ্ছিল—বুকে চাপ—আসলে..., আসলে তখন আমি মরে যাচ্ছিলাম! সেরকম অবস্থাতেই মনে হল, বাথরুমে যাই... ৷ তখন মাঝরাত ৷’’

দুধ-জ্যোৎস্নার সাদাটে ভাব মিলিয়ে গিয়ে উঠোনটাকে কেমন যেন ঘোলাটে দেখাচ্ছিল ৷ ধীরে ধীরে এবার বোধহয় আলো ফুটবে—প্যাঁচা না, দু’ একটা পাখির ছানা ঘুমটুম ভেঙে অতর্কিতে ডেকে উঠল আর মায়েরা আবার থাবড়ে-টাবড়ে বোধহয় ঘুম পাড়িয়ে দিল তৎক্ষণাৎ ৷ জলি বোস ক্লান্তিতে হাঁপাতেও পারছিলেন না, চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন কেবল ৷ তারপর ওই পাখির ডাক শুনে সম্বিৎ ফিরে পেলেন, বললেন—‘‘বুঝলে পরমা, আমার প্রাণ ভোমরা বুঝিবা ওই ঠান্ডা মেশিনটা—যত টানাটানি চলুক—যত অনটন, তবুও বিজলির বিলটা তাই তাগড়া আসে ৷ প্রেশার আছে তো, গরম আমি মোটে সহ্যই করতে পারি না—দম বেরিয়ে যায়... ৷ কিন্তু আমার এই দুর্বলতাটা ওরা কী করে জানল বলো তো? মহাভারতে এসব কলকাঠি নাড়াতেন শ্রীকৃষ্ণ ৷ এক্ষেত্রে বিল্ডার হরিশ খান্নাই একাধারে স-ব?

পরে জানতে পারলাম, ওই দিনই কোনও ফাঁকে বাইরের দিক দিয়ে আমার ঠান্ডা মেশিনের তারগুলো কেটে দিয়েছিল, দিয়ে তারপর হাজির হয়েছিল মোড়ের মাথায় ৷ ওইদিন অমন গোলেমালে সেটা আর তোমাদের কারুর নজরে আসেনি বোধহয়—আসবার কথাও না ৷ সেদিন থেকেই দেয়ালের ফুটো থেকে প্লাস্টিকের পাইপের ভেতর, কাটা-তারগুলো হাঁ হয়ে আছে—কাটা ৷ পরমা? একটা মানুষ বা অমানুষ যা-ই বলো না কেন, কেমন অনায়াসে এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুটা ঘটিয়ে ফেলতে পারল বলো তো? একেবারে একশো ভাগ স্বাভাবিক ভাবে ৷ হাজার আধি-ব্যাধি ছিলই, চেকআপ করতেন না, ডাক্তার দেখাতেন না, একা থাকতেন—মাঝরাতে হার্ট অ্যাটকে বাথরুমে পড়ে আছেন..., এটাই তো এমন মানুষদের পরিণতি! এতে দ্বিমত হবার কোনও সুযোগই নেই!

যথা সময়ে নিয়মমতন উকিল আর বোসবাবু একেবারে তাজ্জব করে দিয়ে উইল দেখালেন ভাগ্নেকে, আর সঙ্গে সঙ্গে তাকে যোগাযোগ করল খান্না সাহেবও ৷ তখন তো এই একমাত্র ওয়ারিশের নাম-ধাম চাউরই হয়ে গিয়েছে, ফলে সন্দেহের অবকাশও তো নেই ৷ এমনকি খান্নার ওই টোপ ফেলা, আর অপরপক্ষের গেলাতেও না ৷ এমনটা তো করেই থাকে বিল্ডাররা, ভেরি কমন ৷ ব্যবসাদার তো যতই হোক, গুড় থাকলে পিঁপড়ে তো আসবেই ৷ অর্থাৎ কিনা, একটু ক্যাশ, একটু ফ্ল্যাট, আর সে ফ্ল্যাটের অংশ না নিলে আরও একটু ক্যাশ—বাহ, চমৎকার... ৷ কিছুই যে আশা করেনি, তার জন্য এটুকুই যথেষ্ট! ভাগ্নে খুব খুশি ৷ ওই অর্ধেক ক্যাশ ছেলের পড়াশুনোয় খাটাবে, বাকিটা বারাসত না বসিরহাটে জলা বুজিয়ে যে সব ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হয়, তাতেই বুক করে নেবে একটা—নিশ্চিন্ত ৷ বুড়ো বয়সে ওই সুদূর রায়পুরে পড়ে থাকবে কেন শুধু-মুধু?

আজ থেকে এ বাড়ির ভেতরের তৈজসপত্তর বিক্রি শুরু হবে ৷ ডিলার ডেকেছে, সব বিদেয় করবে আগে—টিভি, পাখা, গ্যাস, এসি, হ্যানো-ত্যানো—হুলুস্থুলুর কাজ চলবে আজ ৷ তারপর হবে জানলা-দরজা, ফটক, রেলিং—শেষমেশ বাড়ি ভাঙার কাজ... ৷

ঈশ্বরের করুণার কথা মানি আর না মানি পরমা, এটুকু মানব যে আমার একটা মিনতি অন্তত রেখেছেন তিনি—জীবিত অবস্থায় বাড়ি কিন্তু আমায় ছাড়তে হয়নি, বলো? যাতে আমার ভয় ছিল, ভয়ংকর ভীতি! সারাটা দিন সিঁটিয়ে থাকতাম, রাতে ঘুম হত না..., তার থেকে তো অন্তত নিস্কৃতি দিলেন? এ বিষয়ে আমি সত্যি কৃতজ্ঞ ৷ ... আর কৃতজ্ঞ তোমার কাছে, তুমি আমাকে নানা ভাবে মুক্তি দিলে পরমা ৷ এই জবানবন্দিও না দিতে পারলে, বড়ো অশান্তিতে থাকতাম ৷ আজ শেষদিনে তোমায় বলতে পেরে, কী যে শান্তি পেলাম! বড়ো নিশ্চিন্ত ৷ কাউকে তো জানাতে হবে, বলে যেতে তো হবে কাউকে! আমার যে আর কেউ নেই! এ দুনিয়ায় কেউ তো অন্তত জানুক মৃত্যুর প্রকৃত কারণটা, বলো? যদিও তোমাকে কষ্ট দিলাম—তবু... ৷’’ কথাটা বলে জলি বোস, সাবধানে ঘষে ঘষে সামান্য নড়লেন, আর পরমা তৎক্ষণাৎ বলল—‘‘না, না, আমার কোনও..., কষ্ট তো আপনারই হচ্ছে, এতক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে..., আপনার তো পায়ে বেশ অসুবিধে আছে..., এমনভাবে...’’

জলি বোসের হাসিটা কেমন যেন বিকৃত হয়ে গেল হঠাৎ করে, বললেন—‘‘হ্যাঁ, কষ্ট তো আমার আছেই, তবে প্রয়োজনটাও আমারই! বড়ো কষ্ট পরমা, বড্ড কষ্ট! দেখো, চারিদিকে কেবল সেলাই আর সেলাই ৷ ঘাড় নাড়তে পারছি না, মুখ ফেরাতে পারছি না, এমনকি হাসতে বা কাঁদতেও না ৷ আর দাঁড়াব কী ভাবে? এমনিতেই ব্যালেন্স পাই না, তায় পা দুটোও তো বাঁধা! ...এসবের কোনও দরকার ছিল, বলো? কী যে কষ্ট, বাবারে...! জীবনে এত যন্ত্রণা, মরণে যে তারও দ্বিগুণ... ৷ এমনটা জানলে কিন্তু মরতেও ভয় পেতাম—ভাগ্যিস জানতাম না... ৷’’

কথাটা শুনে একটু অবাক হয়ে তাকালো পরমা ৷ গোড়ায় যেমন চিরাচরিত ন্যাতা প্যাতা, ফ্যাকাশে শাড়ি আর হাতকাটা একটা জামা পরা ছিলেন, এখন তো দেখা যাচ্ছে তেমনটা নয়—গায়ে ওটা কী জড়ানো? ওই যে চেন দেওয়া পোর্টেবল তাঁবু পাওয়া যায়, আপাদমস্তক কি তাই জড়িয়ে আছেন, নাকি? সস্তা, সিন্থেটিক স্লিপিং ব্যাগ!! কটকটে তুঁতে নীল রঙা, সামনে চওড়া সাদা চেন আঁটা..., যেটা উনি খুব কষ্ট করে ফাসনার টেনে খোলবারও চেষ্টা করছেন—এবার ফর ফর আওয়াজে খুলেও ফেলেছেন খানিকটা ৷ এ-কী! মুখটা অমন নিমেষের মধ্যে পালটে যাচ্ছে কেন? ফ্যাকাশে নীলচে, ছাই মাখানো... ৷ ফোলা-ফোলা আধখোলা দুটো চোখ, মুখটা সামান্য হাঁ হয়ে বেঁকে রয়েছে, আর যার ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে কালচে শুকনো জিভের অংশ... ৷ গলা, মুখ... বুক, পেট—কেবল কোনওক্রমে জোড়াতালি দিয়ে বড়ো বড়ো সেলাইয়ে ভরা ৷ আঙুলগুলো জড়ো করে বাঁধা, গজ কাপড়ের দড়ির ফাঁসটা হাওয়ায় উড়ছে হেলে দুলে... ৷ ঠিক এমনই একটা নীল-রঙা প্লাস্টিকের প্যাকেট সেদিন বারান্দা থেকে পরমা দেখেছিল ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর..., তবে কি মা... গো...!

‘‘কী হল পারু, কী বলছ...?’’ রমেশ ঝুঁকে পড়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল পরমার দিকে—‘‘হলটা কী? মা-গো, বাবা-গো বলে চ্যাঁচামেচি জুড়েছ? পরদা সরাবার ফরফর শব্দে ঘুমটা ভাঙালাম বোধহয়—তা, না হলে আজ বিকেল অব্দি ঘুমোতে—পুরো চব্বিশ ঘণ্টা—আমাকে ডাকছে, একবার নীচে যেতে হবে ৷ তোমায় চা দিতে বলি?’’

পরমার মাথায় কিছু যাচ্ছিল না ৷ চাঁদের আলো না ৷ রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে ঘর-দোর, বিছানা ৷ তার মধ্যে বসে একবার শুধু ভ্যাবলা চোখে, কোনওমতে মাথা হেলানো, ‘চা? হ্যাঁ... ৷’

লাউঞ্জের সোফায় বসে কলের পুতুলের মতন গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছিল পরমা ৷ রমেশ এসে বলল—নীচে গিয়েছিলাম, গাড়িটা সরাতে বলল—যা তাণ্ডব চলছে...! তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, জলি বোসের বাড়িটা তো বিক্রি হয়ে গেল, বুঝলে? কী যেন শুনেছিলাম না? ডিসপিউটেড, না কী যেন? আশ্রম-টাশ্রম..., তা-না ৷ ওই নেফিউকে দিয়েছিল ৷ আর সে মক্কেলও হঠাৎ প’ড়ে পাওয়া সম্পত্তি পেয়ে, পড়ি কি মরি করে বিক্রি করে দিল, ওই খান্নাকে ৷ ঘাড়ের ওপর আবার একটা দৈত্য হবে আর কী! পঞ্জাবি দৈত্য ৷ দুটো পয়সা বেশি পেলেই, সামনে যাকে পাবে তাকেই বেচবে ৷ বাঙালি পাড়া এবার দেখতে দেখতে পুরো লুধিয়ানা... ৷ খান্না পার্ক, বুঝেছ? আজ সব ঘরের জিনিস বেচতে বসেছে—বাইরে গিয়ে একবার দেখো কাবাড়িওয়ালার ভিড়..., যে, যা পাচ্ছে কিনে নিচ্ছে... ৷ তুমি আজ আর বেরুচ্ছো না তো?’’

পরমা পর পর দু’কাপ চা শেষ করল, টি-পট থেকে ঢেলে ঢেলে সময় নিয়ে, তারপর খবরের কাগজ দেখল একটু উলটে পালটে... ৷ না, আজ আর বেরুবে না সে, অন্তত সকালে তো নয়ই ৷ বিকেলে যাবে সবাই মিলে লক্ষ্মীপুজোর নেমন্তন্নে—আজ কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা কিনা ৷ গতকাল রাত থেকেই শুরু হয়েছে, মাঝরাত থেকে...৷ চায়ের ট্রে-টা রান্নাঘরে রেখে, ছোটো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল পরমা ৷ সত্যি হাটখোলা জলি বোসের বাড়ি ভিড়ে ভিড়াক্কার ৷ যে যেখান থেকে পারছে কিনে নিচ্ছে যা পাচ্ছে হাতের কাছে, বিক্রি কে করছে কে জানে—সানমাইকার খাবার টেবিল, অ্যাকোয়া গার্ড, সিলিং ফ্যান, ফ্রিজ, খবরের কাগজের ডাঁই, পুঁটলি বাঁধা কাপড়ের বোঁচকা... ৷

কনকও পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল, বলল, ‘‘খালি বাড়িতে এতকাল যে এতগুলি মালপত্তর আছিল এই না ভাইগ্য—যা-যা চুরি চামারি! মাসিমার এসি দুইটাও নাকি কয়দিন আগে মাইজরাত্রে চুরির চেষ্টা হইছিল—তার-তুর কাইট্যা রেডি কইরা রাখসে, শ্যাষে গ্যাট ডিঙাইয়া নেওনের সাহসে কুলায় নাই ৷ সুভাষ ‘ক্যারে, ক্যারে’ করসে—তো পলাইসে... ৷’’ কনক মন দিয়ে ‘নিলামওয়ালা ছে-আনা’ দেখতে লাগল ৷

কত জিনিস যে বেরুচ্ছে নিভৃত ঘরের কোণ থেকে—চাল-ডালের অর্ধ সমাপ্ত কৌটো, গায়ে-মাখা সাবানের টুকরো, অর্ধেক খালি জবাকুসুম তেলের শিশি, হাওয়াই চটি, উল কাঁটা—পরমা চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল—‘‘ক’দিন আগে না কনক, অনেক দিন আগে, জলিমাসিমা থাকতেই—ভয়ংকর গরমের সময় ৷ আর মাঝরাত্তিরে সুভাষের ডিউটির সময় নয়, ভর সন্ধেতে... পার্কে তখনও বাচ্চারা চ্যাঁচামেচি করে খেলছিল, রাস্তায় মানুষজন... কমলের তখন পাম্প চালাবার সময়... ব্যস্ত...’’ তারপর হতভম্ব কনকের দিকে চেয়ে বলল—‘‘রাতে একদম ঘুম হয়নি, এখন ক্লান্ত লাগছে বড্ড—আর এক কাপ চা দেবে আমায়?...’’

রচনাকাল ২০১৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%