মিমি রাধাকৃষ্ণন
বাগানে বসে বিকেলের বারোয়ারি চা পর্বটি সেরে, সবেমাত্র ভাবছিল এবার নিরিবিলিতে ঘরে গিয়ে একটু বসা যাক—তৎক্ষণাৎ দুদ্দাড় করে বিভিন্ন বয়সের, ভিন্ন ভিন্ন আকার-প্রকারের আধ ঝুড়ি বালক-বালিকা একেবারে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে ঘিরে ধরে বলল—‘‘চলো টাবলিমাসি, এবার গল্প বলবে ৷’’
টাবলিমাসি, অর্থাৎ স্বনামধন্য সাহিত্যিক তরুলতা হাজরা পড়ল আকাশ থেকে ৷
‘‘সে কী...? আবার গল্প কী রে? এতক্ষণ তবে কী হচ্ছিল? গল্পই তো?’’ এ কথার জবাবগুলো অবশ্য এল তাদের মামা-পিসি-জ্যাঠাদের থেকে ৷ তারা রায় দিল যে সেসব নাকি কোনওমতেই গল্প নয়, কেবল গল্পগাছা ৷ এবার তাকে বলতে হবে সত্যি করে একদম আসল গল্প ৷
এমন বিপরীতার্থক শব্দে তরুলতা হেসেই ফেলল—‘‘গল্প আবার সত্যি হয় নাকি? গল্পে আসল বলে কিছু নেই, সবই নকল ৷ সত্যি হয় ঘটনা... ৷’’ অন্যরা উঠি-উঠি করলেও রাঙাদা একেবারে এগিয়েই এসেছিলেন, বললেন—‘‘ওসব ভাষণ তুই তোর টেলিভিশনের ইন্টারভিউ-এর জন্য তুলে রাখ টাবলি, আমাদের বলে লাভ হবে না ৷ কাল থেকে বাড়ি ফাঁকা হতে শুরু করবে, আর বাগানে এখন হিম পড়ছে, তায় মশা ৷ ফলে এই হচ্ছে সুবর্ণ-সুযোগ ৷ হাত-পা কোলে করে জমিয়ে তোর নকল গল্প শোনবার আসল সময় ৷ বেশি দাম বাড়াসনি বলে দিলুম ৷ এই বেলা সস্তায় ছেড়ে না দিলে, পরে বস্তাপচা গল্প নিয়ে মাছি তাড়াতে হবে কিন্তু...!’’
টুনুবউদি বলল—‘‘ঠিকই বলেছে খোকন ৷ কবে থেকে বলছি ‘একটা গল্প বল, গল্প বল’, তা-না ৷ লিখে লিখে বই ছাপাবে, আর এখানে মুখে কুলুপ এঁটে বসে বসে অন্যের বৃত্তান্ত শুনবে ৷ ওটি হচ্ছে না এবার— ৷’’ কথার শেষেই বিরাট দলটি হেলেদুলে সেজোকাকার দক্ষিণের ঘরের দিকে রওনা দিতেই তরুলতা পড়ল মহা ফাঁপড়ে ৷ একা ঘরে টেবিলের সামনে বসে কাগজের ওপর কলমটা ধরলেই, সরেস, নিরেস কিছু না কিছু ফুটে ওঠেই, কিন্তু এমন ঘর ভরতি জনতার সামনে মুখে মুখে তৎক্ষণাৎ গল্প বানানো, এ কি চাট্টিখানি কথা! ইশ, কী কুক্ষণে, কখন যে প্রাণের দায়ে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল—‘‘আরে, ফেরার তো এখনও ঢের দেরি, বলব’খন!... সব মিটে-টিটে যাক... ৷’’ তা, সেক্ষেত্রে সব মিটেছে তো বটেই ৷
জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষে, কার্তিক মাসের এই ক’টা দিনের জন্য হাজরা পরিবারের সবাই এসে প্রতি বছর জড়ো হয় জামুরিয়া কোলিয়ারির এই ‘নিরুপমা নিবাস’—অর্থাৎ তাদের দাদুর বাড়িতে ৷ সবাই বলতে অবশ্য এখন মাত্র টাবলিদের প্রজন্মই ৷ দাদু-ঠাকুমা তো বহুকালই গত, এমনকি তার পরের বাবা-জ্যাঠারাও ৷ একজোড়া কাকা-পিসি এখনও আছেন বটে, তবে তাঁরা আর এ বয়সে এই জনসমাগমে আসতে সাহস পান না ৷ ফলে আসে সেই নাতিপুতি সমেত তাদেরও ছেলেপুলেরাই, এই যেমন এবারও এসেছে ৷
জগদ্ধাত্রী পুজো মানে হল একটা বাহানা, উদ্দেশ্য আসলে একত্র হওয়া ৷ দাদুর আমলে আসা হত বড়োদিনে, তারপর পুজোর ছুটিতে ৷ শেষে দেখা গেল, সবাই ওইসব ছুটিতে ছোটো ছোটো পরিবার নিয়ে অন্যত্র বেড়াতে যাবার প্ল্যান কষছে, আর তা ভেস্তে যাওয়াতে ব্যাজার মুখে হাজিরা দিচ্ছে হাজরা বাড়িতে ৷ ফলে গত পঁচিশ-তিরিশ বছর থেকে শুরু হয়েছে এই ব্যবস্থা ৷ শরৎও না, শীতও না—মাঝামাঝি, হেমন্তকাল ৷ সময়টা মনোরম, আর স্থানটি তো মনোহর বটেই ৷
রানিগঞ্জ-ঝরিয়ার মাঝামাঝি এই খনি অঞ্চলগুলি শরতের শেষ থেকেই ভারী চমৎকার সুন্দর হয়ে ওঠে ৷ সকাল সন্ধে শীতের সামান্য আমেজ ৷ আকাশ পরিষ্কার থাকবার দরুন দূরের উঁচুনিচু পাহাড়ি উপত্যকাও দৃশ্যমান ৷ তৎসহ স্বচ্ছ বাতাস, খেতের সতেজ সবজি, বাগানের ফল, গোয়ালের দুধ, পুকুরের মাছ... ৷ এমটি না হলে আর পারিবারিক উৎসব! এ ক্ষেত্রে অবশ্য কেবল উৎসব না বলে, ছুটির উৎসব বলাই ভালো ৷ কারণ, ওই যে বলা হল, পুজোটা এ ক্ষেত্রে নিমিত্তমাত্র! আর সেটিও কেটে গিয়েছে দিন চারেক আগে ৷ এবার একে একে সবার ফিরে যাবার পালা ৷ টাবলিদের ছোটো কাকা যাকে বলেন ‘ফল’ ৷ মানে পাতা ঝরবার সময় ৷ যদিও এ বছর গাছে পাতার সংখ্যাও ছিল অন্যান্যবারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম ৷ অর্থাৎ কিশলয় থেকে জীর্ণপত্র সব ধরে, সাকুল্যে আটাশ জন মাত্র ৷
অন্য সব পরিবারের মতন এই হাজরা পরিবারেও নানান ধরনের, নানান পেশার, নানান গুণের মানুষজন আছেন ৷ কেউ চাকুরিয়া, কারও নিজস্ব ব্যাবসা ৷ কেউ উচ্চাশায় ভোগে, তো কেউ হতাশায়, তবে সবা-ই এক-আধটা বই পড়ে ফেললেও, লেখে কিন্তু মাত্র একজন—এই তরুলতা হাজরা ৷ যার ফলে সবাই আজ তাকে অবশেষে ধরে বসেছে গল্প শোনাবার জন্য ৷ এবং শুধু ধরে বসাই নয়! জনা দশ-বারোর গোটা দলটা, বিছানা, চেয়ার, টুল, জলচৌকি যেখানে যা ছিল সব দখল করে বসেও পড়েছে গ্যাঁট হয়ে ৷ আর ছোটোরা তো পা গুটিয়ে গালে হাত দিয়ে মুখপানে চেয়েও আছে হাঁ করে ৷ এ-ই তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল বলে ৷
তরুলতা বিপন্ন মুখে একবার ঘড়ি দেখল, তারপর ছাদ, অতঃপর জানলা দিয়ে দৃষ্টি মেলে দিয়ে শেষে চিরকালের সব চাইতে তার প্রিয় আশ্রয় আবলুশ কাঠের বিশাল রাইটিং টেবিলটার দিকেই ফিরে তাকাল... ৷
‘‘ঠিক আছে, আজ তোমাদের তাহলে একটা সত্যি ঘটনাই বলি... ৷’’ এহেন প্রস্তাবে শ্রোতারা অবশ্য খুব একটা খুশি হল বলে মনে হল না! কারণ সত্যি ঘটনাই তো আবার কখনও গল্প হয় নাকি? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চারদিকে সত্যি ঘটনাই ঘটছে প্রতিদিন ৷ সে সবই ফের দু’বার করে শোনবার কী? তবু নেইমামার চেয়ে ব্যাজার মুখে কানামামাকেই কোনওমতে গিলে নেবার আগে, টুটুর মেয়ে বলল—‘‘ঠিক আছে, সত্যি হলেও, একটু ভূতুড়ে সত্যি তো বলো? ভৌতিক ভৌতিক?’’ সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের প্রস্তাব শুনে টুটুও সায় দিল, ‘‘ঠিক বলেছে ৷ একটু গা-ছমছমে না হলে আসর জমে নাকি? নিদেনপক্ষে চোর, ডাকাত, কাপালিক ৷ গায়ে গায়ে লেগে এতজন আছি, কেউ ভয় পাবার আর জো-টি নেই ৷ নো চান্স ৷ অথচ বেশ ভয় ভয় আর কী... বুঝলি?’’
এ কথা শুনে টাবলি বলল—‘‘বুঝলাম, গল্পে ঠিক চোর নয় তবে বহুমূল্য চোরাই একটা জিনিস আছে—একটা আসবাব ৷ আর তার যক্ষী মালকিন বুড়ি মেম ৷ ফলে গা-ছমছমে ব্যাপার তো থাকবেই ৷ তবে..., তবে, ডরনা মানা হ্যায়, ঠিক আছে? বেশ, বলছি তাহলে ৷’’ বলে গলা খাঁকরিয়ে, নড়েচড়ে বসে তরুলতা হাজরা ওরফে টাবলি শুরু করল তার যক্ষী বুড়ি মেমের গা-ছমছমে সত্যি ঘটনার আজীব দাস্তান... ৷
‘‘আমাদের দাদু এই জামুরিয়া থেকেই যে তাঁর বিশাল কোলিয়ারি আর অভ্রখনির বাণিজ্য শুরু করেছিলেন, সে নিশ্চয়ই সবার জানা ৷ কিন্তু তার আগে-পরের অত্যন্ত জরুরি খানিকটা অংশ অনেকের কাছেই একেবারে অজানা থেকে গিয়েছে... ৷ আমারও থাকত, যদি না সেবার অতগুলো অলস ছুটির দিন বটুমার সঙ্গে এখানে কাটাতাম ৷ কী কারণে যেন সে বছর আমাদের মেজোপিসি অর্থাৎ বটুমা, মান-অভিমান করে এ সময়কার জনসমাগমে না আসাতে, পরে প্রচুর সাধ্যসাধনা করে আমায় সঙ্গে জোর করে নিয়ে এসে দিন সাতেক একসঙ্গে থাকল এখানে ৷ এই নিরুপমা নিবাসে দারুণ কেটেছিল ছুটিটা ৷ গোটা দিন বটুপিসি বাগানে রোদ পোহান, আমি লেখালিখির কাজ করি ৷ আর সুয্যি ডুবতেই ঘরে ঢুকে মুড়িশুড়ি দিয়ে বসে হাজরা অ্যান্ড কোম্পানির আনাচকানাচের গল্প শুনি ৷ যার সামান্যমাত্র নিয়েই বারো খণ্ডের ইতিবৃত্ত লেখা যায় অনায়াসে ৷ তা, সে যা-ই হোক— ৷
দাদু তখন খাস কলকাতার বাসিন্দা এবং ব্যাবসাপত্তরও সব ওই শহরকেই কেন্দ্র করে ৷ বাবা-জ্যাঠারা সবাই-ই নেহাতই ছেলেমানুষ, তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ দুগ্ধপোষ্যও বটে ৷ সে সময়, কোন সূত্রে যেন হঠাৎ এক সাহেবের সঙ্গে আলাপ হয় দাদুর, যিনি তখন তাঁর দু’টি চালু কোলিয়ারিই কোনওমতে বিক্রি করে দিয়ে, কোন বিশেষ জরুরি কারণে দেশে ফিরে যেতে চান ৷ শ্রীল শ্রীযুক্ত নগেন্দ্র হাজরা মশাই তৎক্ষণাৎ শুধু সে সম্পত্তি কেন, গোটা অঞ্চলটাই একবার চোখের দেখাও না দেখে, এক কথায় দুম করে কিনে বসলেন ৷ সঙ্গে লেজুড়, চার একরের বাগান সমেত ম-স্ত ‘ক্রিসেন্ট ভিলা’ও ৷ এবং বলাই বাহুল্য, শুধু জল নয়, একেবারে পানাপুকুরের পচা জলের দরেই ৷ সে কাল তো আর আজকালকার মতো কম্পিউটরের যুগ নয়, যে ডিজিটল ক্যামেরায় ছবি তুলে, চারদিকের আকার-প্রকার, বাহার-বাহুল্য দেখিয়ে-টেখিয়ে পার্টিকে কবজা করবে ৷ ওই মুখেই বলেছিলেন বোধহয় সাহেব ৷ হরেক গাছপালা সমেত দেয়াল-ঘেরা বাগান আর আসবাবপত্র সমেত ঘর সাজানো বাংলোর বৃত্তান্ত, তাতেই শত মাইল দূরের শহরে বসে উকিল ডেকে লেখাপড়া করে বিক্রিবাটা হয়ে গেল ৷ আর খনি, বসতবাড়ির সর্বস্ব বেচে... সামান্য ক’টা টাকা ট্যাঁকে গুঁজে সাহেবও পড়িমরি করে জাহাজে চেপে পাড়ি দিলেন বিলেতে ৷
সাধারণত দুঁদে ব্যবসায়ীরা এমনটা করে না ৷ অথবা কী জানি, বোধহয় ঠিক তার উলটোই ৷ জাহাজের ব্যাপারীকেও ‘নিলামওয়ালা ছে’ আনা’র দরে আদার আড়ত কিনে রাখতে হয় ৷ যুদ্ধের মরশুম, দাদুর হাতে ক্যাশও প্রচুর—ওই আর কী..., কিনেই রাখলেন!
কিনলেন, কিন্তু নজর দিলেন না ৷ সে... তখন অল্প বয়স, কলকাতায় জমজমাট ব্যাবসা, পরিচিত মানুষজন—এসব ছেড়ে নড়াচড়া করবার কথা মাথাতে আসে তখন? তা বাদে খাস কোলিয়ারি অঞ্চলে মোহিত হবার মতো কিছু নেইও ৷ কালো মাটি, বাতাসে কয়লার গুঁড়ো উড়ছে, গাছপালাহীন রুক্ষ শুষ্ক পাথুরে অঞ্চল ৷ গরমে আকাশ থেকে আগুন ঝরে, পায়ের তলায় লাভা... ৷ তেমন অপারগ না হলে এমন জায়গায় মানুষ আগ বাড়িয়ে সাধ করে ঘর বাঁধে না ৷ আর নগেন হাজরার তো সে ক্ষেত্রে রীত-রেওয়াজ মেনে ওখানে তে-রাত্তির কাটাবারও কোনও সাধ জাগেনি, ও-ই পুরোনো কর্মচারীরাই পুরোনো মতে প্রাক্তন মালিকের আমলে যেমন কাজ চালাত, তেমনই চালাতে থাকল ৷ বার্ষিক টাকাপয়সার লেনদেন হত হয়তো, অথবা হতও না কে জানে ৷
এর বেশ কিছু বছর পর, কী একটা—এর যেন গুরুতর গণ্ডগোল হয়েছিল সেখানে ৷ শ্রমিক অসন্তোষ বা কোনও বড়োসড়ো দুর্ঘটনা—অতঃপর ম্যানেজারমশাই অপারগ হয়েই সেবার হাজরা সাহেবকে আসতে অনুরোধ করেছিলেন তৎক্ষণাৎ ৷ দাদু বোধ করি বহু দিনের ধামাচাপায় ওদিককার অস্তিত্ব ভুলেই গিয়েছিলেন বেমালুম, হঠাৎ টের পাওয়ায় নড়েচড়ে বসলেন ৷ কেবলমাত্র সম্পত্তিই তো নয়, অত বড়ো একটা চালু ব্যাবসা ৷ তায় ততদিনে বাণিজ্যের ব্যাপারে বোধ করি মাথাটাও পাকাপোক্ত হয়েছিল যথেষ্ট ৷ ফলে কিছু লোকবল, দলিল- দস্তাবেজ এবং উকিল আমলা নিয়ে তো তিনি পৌঁছে গেলেন যথাসময়ে ৷ ইচ্ছে ছিল কাছাকাছি ফুলটিকি ডাকবাংলোতে থেকে, মোটর চেপে সব দেখে ঘুরে, দাবড়ানি, ধমকানি, প্রয়োজনে বাবা-বাছা করে পিঠ চাপড়ানি দিয়ে ফিরে এসে, পরের দিন সেই ব্যবস্থাতেই যাবেন পাঁচ মাইল দূরের খাদার ৷ অতঃপর সব সেরে-টেরে নিশ্চিন্তে যথাস্থানে কলকাতায়—যেমনটা এ ক্ষেত্রে হয় আর কী...! কিন্তু হল সম্পূর্ণ বিপরীত ৷
দু’দিনের মামলা মিটে গেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৷ গরিবগুরবো অশিক্ষিত আদিবাসী শ্রমিকরা, দাবি মানলে তবে না মেটানো! তবু এসে যখন পড়েইছেন তখন দুই খনির ম্যানেজারের সঙ্গে সাড়ম্বরে মিটিং হল, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি, শ্রমিক উন্নয়নের প্রস্তাব... ৷ এই ফাঁকে কয়লাকুঠির কর্মীবৃন্দ মালিকপক্ষের কাছে সামান্য একটু অনুদানের আরজি পেশ করল ‘ক্রিসেন্ট ভিলা’র রক্ষার্থে ৷ আম জাম লিচু আতা তেঁতুল বকুল—সেসব তো আপনি ফোটে, আপনি ঝরে ৷ পাখি, বাদুড়, বাঁদর, হনুমানে খায়—খেলো, কিন্তু ওই বাংলো... ৷ মেমসাহেব যতদিন ছিলেন, হাজার দুঃখকষ্টের মধ্যেও নিজে হাতে ধুয়ে-মুছে পরিপাটি করে রেখেছেন ৷ গত পাঁচ বছর তিনি নেই, ফলে বাড়ির হাল শোচনীয় ৷ সাপখোপের বাসা, শেয়ালের আস্তানা—আ-হা-রে..., অমন একটা বাংলো! অন্য কিছু না হোক, অন্তত তাঁর আত্মার শান্তির কথা ভেবে, তৎসহ এ এলাকার মানুষজনেরও..., ম্যাডাম টেরিজার অত সাধের বুকের ধন... ৷
কোলিয়ারির লাভ-লোকসান, টাকাপয়সার লেনদেন, জমা-খরচের হিসেব-নিকেশ বাবদ আলোচনা-কথাবার্তা কলকাতার কাছারিতে বসে যখন হত, বছরে দু’-চারবার জামুরিয়া, খাদারের নাম উল্লেখটা অন্তত তাঁর কানে গিয়েছে—তিনি জানতেন ৷ ফলে তা থেকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হতে পারেননি ৷ হয়েছিলেন যেটা, সে হল ওই ‘ক্রিসেন্ট ভিলা’ ৷ কোলিয়ারি বিক্রির সময় সাহেব বলেছিলেন বটে তাঁর বসতবাড়ির কথা ৷ বড়ো বড়ো গাছপালা সমেত বাগান ঘেরা বাহারে বাংলো..., সে তো বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলেন! তা, সে একবার দেখে এলেই হয়? দেখাই যাক না, যদি সাফসুতরো করে ফের বাসযোগ্য করা যায়! ফুলটিকির দূরত্ব কিছু কম নয়, তায় রাস্তা অকথ্য খারাপ ৷ একদিনের জার্নিতেই হাত-পায়ের জোড় খুলে যাবার জোগাড় ৷ তা বাদে সে যুগে পশ্চিমে একটা সাহেব বাংলো থাকা মানে, আভিজাত্যে এক লাফে তিন ধাপ ডিঙোনো ৷
জামুরিয়া কয়লাকুঠি থেকে মাইল তিনেকের দূরত্ব ৷ উঁচুনিচু শক্ত পাথুরে ডাঙা ৷ কালচে নিষ্ফলা মাঠের মাঝে এঁকেবেঁকে গাড়ি চলার রাস্তা গিয়েছে, তবে অবশ্যই কাঁচা ৷ খানিক এগিয়ে বাঁক ঘুরতেই দেখেন মরূদ্যানের মতন এক টুকরো যেন জঙ্গল! উনি তো থ! এই রুক্ষ, শুষ্ক কয়লাকুঠি এলাকায় শিমুল পলাশ শাল মহুয়া তাও চোখে পড়ে, কিন্তু এমন ঘন সবুজ, সতেজ, অমলিন, ফলন্ত বৃক্ষরাজি! রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে যেখানে—অটুট বড়ো ফটকের দু’ধারে মোটা থাম, তাতে পাথরে খোদাই করা ফলকে লেখা—
ক্রিসেন্ট ভিলা
টেরিজা ব্রিক
জামুরিয়া—১৯২০
লোহার ফটকে তালা ছিল না—হুড়কো দিয়ে টানা ৷ সে ডিঙিয়ে সুরকি ঢালা ভেতরের চওড়া রাস্তায় গাড়ির চাকার নিশান আছে বটে তবে আর বাদবাকি সবই আগাছায় ছাওয়া ৷ একদিকে শৌখিন বাগান ছিল নিশ্চয়ই, সেদিকে বড়ো গাছ কম ৷ ফাঁকা জমিতে ইটের কেয়ারি করা, তাতে কোথাও কোথাও খাপছাড়াভাবে ফুলও ফুটেছে—অন্য দিকটি বৃক্ষে ঢাকা থাকবার দরুন ভরদুপুরেও ছায়া-ঘেরা আধো অন্ধকার ৷ সে সব মহীরুহ পেরিয়েই ফুলবাগানের দিকে মুখ করা, কাঠের খাম্বা, টালির ছাদে প্রশস্ত বারান্দা সহ অর্ধচন্দ্রাকার এককালের রূপসি বাংলো—লতাগুল্ম, শ্যাওলা-ট্যাওলা মেখে এখন লজ্জায় মুখ ঢেকে আছে ৷ নগেন্দ্রচন্দ্র অবাক হয়ে দেখলেন উই টুই লেগেছে বটে, বাদুড়-চামচিকেও বাসা বেঁধেছে যত্রতত্র, তৎসহ সাপখোপ, হায়না, শেয়াল—হয়তো বা নেকড়েও... ৷ সে তো হবেই, মালকিন না থাকলে জবরদখলের মালিকানা তো আটকানো যাবে না! তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এতদিনের হাট-খোলা ফটকেও, বারান্দায় এখনও কিন্তু বাহারে সেজবাতির ঝাড় ঝুলছে; আরামচেয়ার, টেবিল, সোফা—সব একেবারে জীর্ণ মলিন হলেও, যেখানকারটা সেখানেই! চোর-ডাকাতের লুটপাট না হলেও, আশপাশের গাঁয়ের মানুষ কিছুটি ছুঁয়েও দেখেনি! কত বছর বেওয়ারিশ পড়ে রইল, এ তো একেবারে দৃষ্টান্ত...!!
কোলিয়ারির জনকয়েক কর্মচারী ছিলেন সঙ্গে, তাঁরাই ঘুরিয়ে-টুরিয়ে দেখালেন ঘরদোর—বড়োসড়ো হল, মস্ত শোবার ঘরের সঙ্গে বিশাল নাইবার জায়গা ৷ সাহেবের থাকবার আলাদা ব্যবস্থা, মেমের স্টাডি... ৷ কী চমৎকার সব আসবাব, আবলুশ কাঠের মস্ত পড়বার টেবিলটার থেকে তো চোখই ফেরানো যায় না! পাশে দাঁড় করানো ইজেল ৷ টেরিজা মেমের নাকি আঁকার হাত ছিল চমৎকার, ছবি আঁকতেন—পেন্টিং ৷ পড়াশুনো করতেন, অসাধারণ সেলাই, ক্রুশ বুনতেন অপূর্ব ৷ তার নিদর্শনও আছে এখানে-সেখানে ছেঁড়া পর্দা আর মলিন টেবিল ক্লথের ওপর ৷ নগেন্দ্রনাথের খারাপ লাগছিল—ইশ, এমন শখের সংসার, কীসের এমন তলব পড়ল যে ছুটে চলে যেতে হল সব ছেড়ে ছুড়ে?
তবে এই চিন্তার যা উত্তর পেলেন তা কিন্তু তিনি কল্পনায়ও আনতে পারেননি ৷ কী যেন সব জরুরি কাজের বাহানা দিয়ে তড়িঘড়ি করে, চালু দুটো কোলিয়ারি কোনওমতে বেচে দিয়েই তো পড়িমরি করে দেশে ছুটেছিল সাহেব, সে-তো মনে আছে ৷ এবং পরে ভুলে গেলেও, তার সঙ্গে বাংলোও যে ছিল, সে কথাও তখন বলেছিল বটে ৷ কিন্তু সে বাংলোতে যে তার মেমকে ফেলে গিয়েছিল, সে কথা তো উল্লেখও করেনি, আশ্চর্য! তার বাবার দেওয়া যৌতুকের দু’টি কোলিয়ারিই ছিল টেরিজা মেমেরই নামে, তৎসহ ‘ক্রিসেন্ট ভিলা’ও ৷ বুঝে দেখো একবার অবস্থাটা!
জ্ঞানীগুণী গিন্নি, তায় সম্পত্তির মালিক ৷ নির্জীব, নিরীহের মতন ল্যাজ গুটিয়ে ম্যানেজারি করে আর রেস খেলে, তাস পিটিয়ে গোটা জীবনটা কাটিয়ে শেষে এমন একটা ছোবল দেবার মতলবেই দিন গুনছিল বোধহয় ৷ নয়তো অমন আঁটিসাঁটি বেঁধে, সইসাবুদ করে বেচাকেনা করতে পারে? বিক্রি-বাটার কোনও ফাঁক তো ছিল না, তা হলে গোড়াতেই ধরা পড়ত ৷ ফাঁক ছিল তার ধর্মে ৷ কেবল তা-ই নয়, এদের কথা থেকে বুঝলেন, টেরিজা মেমের মানসিকতার সঙ্গে নাকি সাহেবের কোনওই মিল ছিল না, রুচি বা মতাদর্শেও নয়—তা সে সম্পর্ক তাদের যেমনই থাকুক না কেন, তা বলে এমন অনাচার? কী ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা ভেবে দেখো—কেমন ভয়ানক পাপ...? হায় রে হায়, ঘুণাক্ষরেও আগে টের পেলে সাধ করে কি আর তিনি এই পাপের ভাগী হতেন?
এর পর যে ক’বছর বেঁচে ছিলেন ম্যাডাম টেরিজা, ফটকের বাইরে পাও রাখেননি, আর ভেতরে কাউকে আসতেও দেখেনি কেউ ৷ টাকাপয়সা কী ছিল কে জানে, তা ছাড়া থাকলেও খরচাটাই বা করবেন কীভাবে? দশ- বিশ মাইলের মধ্যে দেহাতি দোকানপাট হয়তো ছিল দু’-একটা, কিন্তু হাতে কানাকড়িটিও ছিল কি না সন্দেহ ৷ আনাচকানাচ কাচিয়ে নিয়ে পালিয়েছিল সাহেব ৷ বাবুর্চি, খানসামা, ড্রাইভার, কোচোয়ান তো দূরের কথা, অত বড়ো বাংলোয় একটা মালি, চৌকিদার বা ঝি-চাকরও ছিল না তখন ৷ কী-ই খেতেন তিনি, অসুখবিসুখ হলেই বা কে দেখত! পরের দিকে রাতে আলোও জ্বলত না ঘরে ৷ দুঃখে, অপমানে মাথাটাও গোলমেলে হয়ে গিয়েছিল একেবারে—কাউকে ঢুকতে দিতেন না ভেতরে, ঢিল মারতেন ছুড়ে ৷ বাগানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন বিড়বিড় করে, আর জানলার ধারের ওই টেবিলে ঝুঁকে বসে কী যেন লিখতেন সারাদিন—আত্মজীবনীই হবে হয়তো ৷ শেষে..., যা হয় আর কী এমন ক্ষেত্রে তেমনটা... ৷ ক’দিন পরে টের পেয়ে গ্রামবাসী এল, দরিঝরিয়ার পাদরি সাহেব এসে গোর দিলেন ওই বাগানের ধারেই, আর কোলিয়ারির সবাই মিলে চাঁদা তুলে বেদি বানাল সেখেনে... ৷
নগেন্দ্র হাজরাও দেখলেন সেই বেদি ৷ মামুলি ইটের গাঁথনি দিয়ে চৌকোনা কবর ৷ চারপাশে গাছ-টাছও পুঁতেছিল বোধহয় কেউ, সেসব তখন শুকিয়ে খড়—ভারাক্রান্ত মনে কলকাতায় ফিরে এলেন তিনি, তবে এসেও হাত- পা গুটিয়ে ফেললেন না ৷ মালি, চৌকিদার, জমাদার বহাল হল ৷ টালি বদলে, ভাঙা কাচ পালটে সাফসুতরো করে হালও ফিরিয়ে আনা হল নিমেষে ৷ কিছু আসবাব গেল কলকাতায়, সেখান থেকেও এল খানকতক ৷ বছরকতক বাদে আবার নতুন করে গড়লেন খানিক, কিছুটা ভাঙলেন অ-দরকারে ৷ তারপর সপরিবার আসা-যাওয়া শুরু করলেন নিয়মিত ৷ শীতের ছুটি, পুজোর ছুটি, তা বাদে অন্য কোনও পালপার্বণেও—শেষে রেওয়াজ করলেন এই সময়টা, জগদ্ধাত্রী পুজোয় ৷ বাবা-জ্যাঠারা তখন বেশ বড়ো—সাবালক একেবারে ৷ ততদিনে এ বাড়ির ছিরিছাঁদ বদলে গিয়েছিল বেশ খানিকটা ৷ পুরোনো মানুষ যাঁরা ‘ক্রিসেন্ট ভিলা’ দেখেছেন, তাঁরা আর দেখলে চিনতে পারবেন না ৷
এর বেশ কিছু বছর পর দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা খুব ভেঙে পড়েছিলেন ৷ সে সময়, সব কিছু থেকে দূরে, নিরিবিলি ফাঁকায় একা থাকতে চাইতেন ৷ ছিলেনও তখন এখানে প্রায় টানা সাত-আট মাস ৷ অবশ্য সে সময় থাকাকালীন কতগুলো ঘটনা ঘটে ছিল যাকে অঘটনই বলা উচিত—সে অন্য গল্প ৷ আর-একদিন সবিস্তার বলা যাবে’খন ৷ অতঃপর তিনি মারাও যান এখেনেই ৷ সে কারণেই বাবা জ্যাঠার আমলে এ বাংলো যখন আপাদমস্তক বদলে গেল, তখন তার নামও বদলে দিয়ে রাখা হল ‘নিরুপমা নিবাস’ ৷ ফুলবাগানের দিকে সে যুগের হাল ফ্যাশনের দোতলা বাড়ি হল—টালির বারান্দা ভেঙে দালান ৷ রান্নাঘর, প্যানট্রির সাজ বদলিয়ে মেজো জ্যাঠা, বড়ো পিসির ঘর ৷ সাহেবের খাস কামরা বদল করে বাবার শোবার ব্যবস্থা, আর হলঘরে পাঁচিল তুলে দুটো আলাদা কামরা ৷ অর্থাৎ দু’-একটা সাবেক ঘর মাঝে পড়ে হাঁসফাঁস করল কেবল, বাদ বাকি সব পুরো নতুন, নয়তো আধা৷ ওই সাবেক ঘরের একটি হচ্ছে টেরিজা মেমের স্টাডি ৷ চমৎকার মরোক্কোন টাইলসের মেঝে, স্টেন গ্লাস করা জানলা—থ্যাংক গড, বাবা যে এ ঘর বদলাননি ৷ বটুমা, নতুনমায়ের পাশে এ ঘরে কেউ থাকত না আর ৷ মানে প্রয়োজনও হত না ৷ ওই সাজানো-গোছানো স্টাডি হিসেবেই পড়ে থাকত মোটামুটি ৷ সে ঘরের পিয়ানো, অর্গান কোন কালে কলকাতায় বদলি হয়ে গেলেও, অন্য ঘরে বটুমা-রা নাকি রাতে টুংটাং শব্দ শুনতেন, পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসত, চেয়ার টানার আওয়াজ... ৷ পরে বিদেশ থেকে সেজোকাকা এলে, এ ঘরে একটানা বেশ কিছুদিন থাকবার দরুন, পরবর্তীকালে এটি সেজোকাকার ঘর নামেই পরিচিত হল.. ৷
তা, সেবার আমি বটুমার সঙ্গে যখন এলাম, তখন অন্যান্যবারের মতন নতুন বাড়িতে আর না থেকে, এখেনে, তাঁর পাশের সেজোকাকার ঘরেই আস্তানা নিলাম ৷ কারণ বটুমা তো চিরদিন প্রথামতন নিজের ঘরে থাকবেনই, তার অন্যথা হবার জো-টি নেই, তাহলে ওই ফাঁকা বাড়িতে এত দূরে একা তাঁকে রেখে আমি অন্যদিকে থাকি কীভাবে? ফলে প্রথমদিকে একটু দোনামোনা হয়ে বাধ্য হয়েই থাকলাম পাশে পাশে ৷ কিন্তু থাকতে থাকতেই ক্রমশ দারুণ ভালো লাগতে লাগল ৷ পুরোনো ঘর, নতুন পরিবেশ, পাশাপাশি পিসি-ভাইঝি..., বটুমা গল্প তো বলেন চমৎকার! তবে, অবশ্য রংও চড়ান খুব ৷ ওঁর মনের কথাটা অন্যের ভাষায় চালিয়ে দিয়ে, অমন অসাধারণ এক রসালো উপাখ্যান তৈরি করবার সত্যি আর জুড়ি মেলা ভার... ৷’’
এতক্ষণ একটানা বলে একটু থামতেই রাঙাদা বললেন—‘ফ্যামিলি প্রি-হিস্ট্রি, হিস্ট্রি, পলিটিক্যাল সায়েন্স, জিয়োগ্র্যাফি—সেসবই তো শোনালি, শুনলুম, বেশ লাগলও বটে ৷ তবে তোর ভূতের গল্প কি ওই পিয়ানোর টুংটাং আর সেন্টের গন্ধের মধ্যেই শেষ?’’
টুনিদি বললেন—‘‘তাই তো মনে হচ্ছে ৷ এবার ওই সাহেবকে কাপালিকই ধরে নে ৷ এ-ও তো বাপু এক ধরনের নরবলিই বলা যায়! কী বদমাশ রে! চোর-ডাকাত-খুনে সব একসঙ্গে!!!’’
তরুলতা সামান্য হেসে বলল—‘‘হ্যাঁ তা-ই ৷ ঠিকই বলেছ, তবে আমার গল্প শেষ হয়নি, অথবা বলা যায় শুরুও হয়নি ৷ এবার বলছি ৷ এতক্ষণ যা ছিল তা হল গৌরচন্দ্রিকা বা ভণিতা ৷ তোমরা অধৈর্য হয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ো না... ৷ এ তো লেখা গল্প নয় যে এডিট করা হবে ৷ এ হল গিয়ে মুখে মুখে বলা কাহিনি—লতায়-পাতায় এই আগাছা বাড়তেই থাকে ৷ ছাঁটাছাঁটির পরোয়া করলে চলে না—তা..., সেবার তখন ছিল ঘোর শীতকাল—বড়োদিনের সময় ৷ সকাল হয় দেরিতে, সন্ধে একেবারে চোখের নিমেষে ৷ গোটা দিন রোদ সেঁকে আর অন্ধকার হতে না হতেই ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে হাজরা রোডের অলিগলি, তস্য গলিরও গল্পগাছা করতে করতে, সাড়ে আটটা বাজল কি না বাজল, বটুমা তো ঢুলতে থাকেন ৷ ফলে তখনই রাতের খাবার খেয়ে উনি ‘গুডনাইট’ বলে ও ঘরে শুতে চলে যান—আমি তখন এ ঘরে লিখতে বসি মাঝের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে, যাতে আলোতে ওঁর অসুবিধে না হয় ৷
আগেই বলেছি, সে বছরই প্রথম আমার সেজোকাকার এ ঘরে থাকা ৷ তার প্রধান কারণটাও বলা হয়ে গেছে ৷ আর দ্বিতীয় কারণ হল, বহু দিনের শখ ছিল আমার এ ঘরে থাকবার, বিশেষ করে এই বাহারে টেবিলটার জন্য কী যে লোভ ছিল শিশু বয়স থেকে...! আলিশান এই টেবিল ঘিরে কত যে গল্প...! একে নাকি কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল—আবার ফেরত এসেছে ৷ তার মাঝে হাতবদল হয়েছে বারকয়েক ৷ নিলামে গিয়েছিল—অকশন হাউজ থেকে উধাও ৷ শেষে চোরাই মাল উদ্ধার হল চালানি ট্রাক থেকে ৷ সে ট্রাকও নেহাত অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল, তাই রক্ষে—ইত্যাদি... ৷ বটুমা সে বিষয়েও লম্বা গল্প বলেছিলেন বটে, এবং অবশ্যই তাতে প্রচুর পরিমাণে বাদশাহি মশলাপাতি ঢেলে ৷ সে বিরিয়ানিও আর-একদিন পরিবেশন করা যাবে না হয়—মজার... ৷
তা সে যা-ই হোক—প্রথম দিনটা বেশ কাটল ৷ দ্বিতীয়টা বোধহয় আরও ভালো ৷ সব গুছিয়ে-গাছিয়ে বসেছি, ছোটো ছোটো খসড়া করছি, চ্যাপ্টার ভাগ করে রাখছি এক-এক করে ৷ তবে ওই দিনে দিনে ৷ বেশি রাত জাগতে পারি না—বড্ড শীতে ধরে ৷ একে এই শুকনো খনি অঞ্চল তায় পৌষ মাস ৷ ফলে ধীর স্থীর হয়ে আপদমস্তক মুড়িসুড়ি দিয়ে টেবিলের সামনে বসে ঘষাঘষ হাত চালাই বটে, তবে খুব খুশি হলে মেরেকেটে ঘণ্টা দু-তিন, ব্যাস৷ তারপর ওই কলমধরা হাত আর চেয়ারে ঝোলানো পা কনকনে ঠান্ডা হতে শুরু করলেই হট ওয়াটার বটল নিয়ে সটান ঢুকে যাই লেপের তলায়, আর তৎক্ষণাৎ গভীর ঘুম ৷ এ ঘরটা একে পুরোনো, তায় মাঝখানে পড়াতে রোদ ঢোকে না মোটে ৷ এমনই এক রাতে, তৃতীয় বা চতুর্থ দিন হবে..., মোটামুটি রাত হয়েছে সে দিন—প্রায় এগারোটা বা ওরকম ৷ এমন নির্বান্ধব কয়লাকুঠি এলাকায় সে প্রায় নিশুত রাত ৷ আমার টেবিলে কেবল ল্যাম্পটা জ্বলছে, আর কোণের দিকে আর- একটা ঝোলা বাতি—খুবই হালকা আলো তার ৷ কারণ তার আগের দিনই বটুমা অনুযোগ করেছেন, আমি নাকি সারারাত চেয়ার টেনে শব্দ করি—বারান্দায় আলো জ্বেলে পায়চারি করতে করতে গল্পের প্লট ফাঁদি, গলা ছেড়ে গান গাই—তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত হয় খুব ৷ কথাগুলো সবই প্রায় ঠিক, তবে মাঝরাতের বদলে রাত ন’টা, এবং গলা ছাড়ার ক্ষেত্রে গুনগুনিয়ে, আর ওই বারান্দায় পায়চারির ব্যাপারটা রাতে তো কদাচ নয়—দিনের বেলায় ৷ গল্প ফাঁদার অভ্যেস আদতে বটুমার-ই ৷ তা যা-ই হোক, এই কালো বড়ো টেবিলটার এক ধারে জোরালো বাতিটা, অন্য ধারে ফুলস্ক্যাপ কাগজের দিস্তা—মাঝে কলম-টলম এটা-সেটা আর আমার লেখা পাতা... ৷ কখনও লিখছি, কখনও থামছি, পেন চিবুচ্ছি, গুনগুনাচ্ছি, লেখা এগুচ্ছে—বেশ খুশি ৷ হঠাৎই মনে হল, কাগজের ওপরে যে লেখা ফুটে উঠছে, সে যেন আমার নয়, অন্য কারও ৷ কারণ হস্তাক্ষর আমার অতিশয় কদর্যই বলা যায়, বিশেষ করে তা আবার যদি খসড়া হয়, তাহলে তো কথাই নেই ৷ নিজের লেখা নিজেরই দুর্বোধ্য ঠেকে ৷ সে ক্ষেত্রে এ যেন অতি স্পষ্ট, টানা-টানা, কাটাকুটির নামগন্ধও নেই, হালকা ত্যারচাভাবে শোওয়া শোওয়া—ইংরেজিতে যাকে বলে কারসিভ রাইটিং—তা-ই ৷ আমার অবাক হওয়াটা কিন্তু খুশি দিয়েই প্রকাশ পেল ৷ মনে হল, এখানে এসে আমি অবশ্যই খুব সাবধানে, নজর করে করে লিখছি—স্থানমাহাত্ম্য যাকে বলে আর কী ৷ এমন ঘর, এমন টেবিল, এমন পরিবেশ... ৷ যদিও হাতি-মার্কা দিস্তা কাগজ আর কালি-কলমটা কলকাতা থেকে আমারই বয়ে আনা ৷ আমি মনের আনন্দে আবার অনায়াসে তেমনই বাঁকা বাঁকা অক্ষরে মন দিয়ে ফের টা-না লিখে যেতে লাগলাম ৷
খানিক বাদে নজরে এল, লেখা তো বটেই কিন্তু আমার কালির রংটাও যেন অন্যরকম ঠেকছে ৷ আর এ তো বল পয়েন্টের লেখা নয়...! আমি লিখছিলাম রেনল্ড-এর লসারটিপ পেন-এর কালো কালিতে..., এ তো দেখছি নীল! আর নীলও ঠিক রয়্যাল ব্লু নয়, কেমন ফিকে..., একটু নীলের সঙ্গে যেন ফিরোজি মেশানো—বেশ... মানে..., হালকার ওপর উজ্জ্বল... ৷ আমি এবার কলমটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরখ করে দেখলাম খানিক ৷ নাহ, এ তো আমারই মনে হচ্ছে..., কে জানে! আমি আবার মন দিলাম লেখায় ৷
আসলে মানুষের নিজের ওপর যদি বিশ্বাস থাকে, আর থাকে চারদিকের নিশ্চিন্ত পরিতৃপ্তির এক পরিমণ্ডল, তাহলে সহজে সে কোনও কিছুকেই বোধহয় আর সন্দেহ করতে পারে না—অন্তত আমার সেই ধারণা ৷ ফলে আমি আবার লিখতে লিখতে সাধারণত নিজস্ব জায়গায় যেমন সচরাচর করে থাকি অর্থাৎ—অন্যমনস্কভাবে পেনটাকে টেবিলে হয়তো ঠুকি ঠকঠক করে, নয়তো চেয়ারে দোল খাই ঘটর-ঘটর শব্দে, সে সবের ধারে কাছেও না গিয়ে তার বদলে কোমর-পিঠ সোজা করে আড়মোড়া ভাঙলাম ৷ তারপরও আর কিছু না পেয়ে আঙুল মটকাতে লাগলাম ৷ কারণ লেখায় পুরোপুরি মজে থাকলেও, এটুকু পুরোপুরি খেয়াল ছিল যে পাশের ঘরে বটুমা আছেন, এসব শব্দে ঘুমটা ভাঙলেই হয়েছে আর কী ৷ কিন্তু ওই মনোযোগ সহকারে আঙুল মটকাতে গিয়ে, আরও মনোযোগ দিয়ে দেখলাম, আমার গায়ের রং সবাই যে কালো বলে, আর মা বলতেন শ্যামলা—তা কিন্তু মোটেই নয় ৷ ছোটোবেলায় রোদে রোদে ঘুরতাম বলে হয়তো, আজকাল একে তো ঘরবন্দি, তায় কত শত রূপটানের উপকরণ... ৷ মুখমণ্ডল না হলেও, হ্যান্ড ক্রিম মেখে- টেখে হাতটা কিন্তু বেশ... ৷ আমি আলোর সামনে হাতটা নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আঙুলগুলো দেখছিলাম—নখ, হাতের তালু..., অভয়মুদ্রায় ল্যাম্পের সামনে তা মেলে ধরতেই, আঙুলের ফাঁক দিয়ে আলো এসে হাতের পাতাটা মনে হল স্বচ্ছ লালচে পোর্সোলিনের তৈরি—বাহ ৷ দেখছিলাম, তবে এসবই কিন্তু অন্যমনস্কতারই লক্ষণ..., খুশি মনে সময় কাটাবারই একটা প্রকার আর কী—মনটা তো পড়ে রয়েছে লেখায়... ৷ লিখছি..., কিন্তু এবার আর নজর এড়াতে পারছি না ৷ বারবার চোখ যাচ্ছে, হাতের ওপর ৷ আর বারবার লক্ষ করছি, সে হাত বদল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে—ঠিক যেন চন্দননগরের আলোর কারসাজি ৷ সেখানে যেমন আলো জ্বালিয়ে-নিবিয়ে গতি-টতি বোঝায়, বা বলা যায় ভেলকিবাজি দেখায়—ফুল হয়ে গেল হাতি অথবা মানুষ, এই স্যালুট করছে, পরমুহূর্তেই স্বাগত জানাচ্ছে নমস্কার করে, এও সেই ৷ তবে আরও অনেক রয়ে-সয়ে সময় নিয়ে ৷ সেই রওয়া-সওয়া সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, আমার হস্তদ্বয় কেবল ফরসা নয়, সম্পূর্ণ শ্বেতশুভ্র হতে চলেছে... ৷ এবার কিন্তু আর আমার অন্যমনস্কতার লেশমাত্রও রইল না, তার বদলে সত্যি সত্যি এক অস্বস্তি জড়িয়ে ধরল—এতটা দৃষ্টিভ্রম, এও কি সম্ভব...? কারণ ততক্ষণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আমার সেই ফ্যাকাশে সাদা বাহুতে সোনালি ছোটো ছোটো রোম, সেগুলো টেবিল ল্যাম্পের জোরালো আলোতে আবার চিকমিকও করছে ৷ আমি কেমন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে, এক হাত দিয়ে অন্য হাতের অপরিচিত সেই রোমগুলো ঘষতে লাগলাম—যেন ঘষে ঘষে সেসব তুলে ফেলতে পারলেই আমি আবার আমার আজন্মকালের পরিচিত সেই হাত দু’খানা ফিরে পেয়ে যাব ৷ কিন্তু কীভাবে আর তা সম্ভব! আমার আঙুল, নখ, সবই যে এখন অচেনা! একটু হাড়ালো, লম্বা লম্বা পরিষ্কার আঙুলের আরও পরিষ্কার যত্ন করে কাটা চ্যাপটা চ্যাপটা চৌকোনো, ধবধবে সাদা নখ ৷ এমন ধরনের নখ আমাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কারও মধ্যে দেখিনি ৷ মনে হয় যেন এগুলোকে আঙুলের মাথায় প্রথমে গড়ে নিয়ে শেষে ওপর থেকে একটু চাপ দিয়ে দেবে দিয়েছে ৷ কেন যে এমনটা দেখছি, কেনই বা এমনটা হচ্ছে—বিহ্বল হয়ে এসব ভাবতে ভাবতে আমি চিন্তা করবার চেষ্টা করছি যে, এই হাত আমি কবে কোথায় দেখেছি, যে আজ এই গভীর নিশুত রাতে সে সেটি আমার কবজিতে জোড়া লাগিয়ে দিয়ে, আড়াল থেকে তামাশা দেখছে?
কবজি এ জন্য বললাম, কারণ সোয়েটার থাকবার দরুন তার ওপরটুকু দেখবার আর উপায় ছিল না... ৷ তবে..., তবে... বহুরূপীর রং বদলাবার মতন এও তো বদলাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে ৷ যেমন এইমাত্র বাঁ হাতের অনামিকায় ফুটে উঠল সোনার একটা রিং—পাতলা, সরু ম্যাটমেটে পেতল-রঙা... ৷ ভয়ে, ত্রাসে এবার আমি চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালাম ৷ আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, শীত করছিল আরও চতুর্গুণ, মনে হচ্ছিল আমি মরেই যাচ্ছি, অথবা বদ্ধ উন্মাদ... ৷ তার মধ্যেও ঘাড় ঘুরিয়ে আমি ঘরের চারদিকে তাকালাম—নাহ ৷ যেখানে যেমনটি থাকবার কথা, ঠিক তেমনটিই তো আছে, কোনওই বদল নেই! তবে কেবল আমারই এ কী হল? মনে মনে বটুমাকেও দুষছিলাম প্রাণপণে ৷ মনে হচ্ছিল, সন্ধে থেকে সাহেব-মেমের ওইসব আজগুবি অবান্তর কূটকচালির গল্প শোনাবার জন্যই আজ এখন আমার এই দশা... ৷ মাথার মধ্যে সেসবই ঘুরে ঘুরে এবার চোখের সামনে পর্দা ফেলে দেখাচ্ছে তার কেরদানি—যেন বলছে, ‘দেখো এবার স্বচক্ষে তুমি...’ ৷ শীতে আমার হাত-পা জমে যাচ্ছিল, অথচ গা-গলা দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে, চোখ ঘোলাটে, অস্পষ্ট দৃষ্টি, গলা শুকিয়ে কাঠ, শুকনো গলায়...’’
এই পর্যন্ত বলে তরুলতা হঠাৎই গল্প থামিয়ে খুকখুক করে একবার কেশে উঠল ৷ তারপর সামান্য থেমে, আবার ৷ প্রথম দিকে টেবিলের কোনাটা ধরে, ঝুঁকে পড়ে সেটা সামাল দিতে চেষ্টা করছিল কিন্তু পেরে উঠছিল না ৷ তারই মধ্যে আবার একটা এমনই দমক উঠল যে মনে হচ্ছিল বুঝি বিষম খেয়ে দমটাই না আটকে যায়! বাজে কাশি ৷ ঘরের শ্রোতা বা দর্শকমণ্ডলী একাগ্রভাবে গল্প শোনবার দরুন প্রথমটায় ঠিক ধরতে পারেনি—এ কি সত্যি, নাকি গল্পেরই একটা অভিনয় অংশ? ছোটোদের মধ্যে একদম অবুঝ কেউ অধৈর্য হয়ে বলল—‘‘আহ, তাপ্পর কী হল? তুমি ভূত হয়েই রইলে, না সেরে গেলে...?’’ এ কথায় কেউ হাসল, কেউ তাকে থামাল, কেউ উদবিগ্ন হয়ে তরুলতার মাথায়, পিঠে চাপড়-টাপড় মারতে লাগল—কতক্ষণ ধরে টানা কথা বলে যাচ্ছে, আসবে না কাশি! টুনিবউদি বেবিকে এক ধমকে জল নিয়ে আসতে বলে, ঘরের এদিক-সেদিক নজর দিতে লাগল, যদি জলের বোতল-টোতল থেকে গিয়ে থাকে কোথাও ৷ তরুলতার ততক্ষণে ওই বাড়াবাড়িরকম কাশির দমকটা কমে গিয়েছিল অবশ্য, তবু পুরোপুরি থামেনি ৷ হাসতে হাসতে কী যেন বলতে গেল, কিন্তু তখনও স্বর বেরুচ্ছিল না গলা দিয়ে ৷ চোখে জল, মুখে হাসি, তারই মধ্যে লজ্জা পেয়ে ইশারায় বলল—এক মিনিট, সে নিজে গিয়েই জল খেয়ে আসছে ৷ ছোড়দা অসহিষ্ণু মুখে বলল যে, তার আর দরকার কী, বেবি গেলই তো আনতে ৷ ওর কথা শুনে মনে হচ্ছিল যেন তরুলতা ঘর ছেড়ে গেলে, এই গল্পের শেষ ভাগটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে ৷ ছোড়দার এমন স্বার্থপর ভাবনায় বাসবী ভুরু কুঁচকে ইশারা করল তাকে ৷ —ওর হয়তো বাথরুমে যাবারই আছে, আসুক না ঘুরে...৷ ছোটোখাটো এই ব্যাপারগুলো যদি বুঝতে পারত পুরুষেরা! তরুলতা অবশ্য ওদের ওই অকারণ বাগ-বিতণ্ডার জন্য অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়েই গেল, আর ও যেতেই ঘরের গোটা দলটা আর কোনও কাজ না পেয়ে নিজেদের মধ্যেই হাসি-মশকরায় একেবারে মেতেও গেল পুরোপুরি ৷ কী করবে বেচারারা? এমন জমাটি সময়ে এমনতর অঘটন... ৷ তারা বেশ নড়েচড়ে এর-তার দিকে ঘেঁষে ঘেঁষে বসছিল—যেন বেশ ভয় পেয়েছে এবং হলফ করে বলতে পারে, এবার শেষ পর্যায়ে আরও পাবে, দাঁতকপাটি যদি না লাগে তো... ৷ মজা করেই অবশ্য—ওই সময় কাটানো আর কী ৷ নয়তো এই সন্ধেরাতে, একসঙ্গে এতগুলো মানুষের হঠাৎ করে ভয়ে কাঁপবার তো কোনও কারণ নেই ৷ কিন্তু এমন পরিবেশে, এমনতর ভান করতেও তো বেশ লাগে.. ৷ তারা পরস্পরের সঙ্গে অন্য বিষয়েও দু’-চারটে কথা বলছিল, কেউ হয়তো ঘড়ি দেখল—আর কতক্ষণ...? আর এই ভাবনাচিন্তা, কথাবার্তার মধ্যেই তরুলতাও জল টল খেয়ে, গলা পরিষ্কার করে, ফের ঘরে ঢুকে নিজের জায়গাটিতে ফিরে গিয়ে হাসিমুখে বলল—‘‘স্যরি, একদম ক্লাইম্যাক্সের তীরে এসে তরি ডোবালাম তো? ভেরি ভেরি স্যরি... ৷’’ কোণের দিকের চেয়ার থেকে তাংড়ু বলল—‘‘ডোবালি আর কোথায়? ডুবছিলি তো তুই নিজেই! যা খাবি খাচ্ছিলি, মনে হল পেলি আজ অক্কা—নে বল—তারপর...?’’
টুকুতরুলতার দিকে চেয়ে বলল—‘‘গল্প শেষ না করে অক্কা পেলেই হল? হাঁ করে ইল্লি আর কী! নাও, বলো, বলো... ৷’’ ছোড়দাও তাড়া লাগাল—‘‘হ্যাঁ ঠিক আছে, ঠিক আছে, ওকে বলতে দে না ৷ তারপর...?’’ কথা শেষ হতে না হতেই বড়দার ছেলে গোরা বলল—‘‘তারপর আর কী? তেমন কিচ্ছুই না ৷ আমিই বলে দিচ্ছি ৷’’ বলেই তরুলতার গলার স্বর নকল করে বলতে শুরু করল—‘‘তারপর, চেয়ার ঠেলা-টেলার আওয়াজে বটুমা ও ঘর থেকে টা-ব-লি-ই, এই বুড়ো মানুষটাকে রাতে কি তুই চোখটা একটু লাগাতেও দিবি না? এ তুই কোন জাতের বিদ্যেধরী রে অ্যাঁ...? এইসব বলে গালিগালাজ করতে লাগলেন আর সেই চ্যাঁচামেচি, গালিবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তোমার হাতের টেম্পোরারি ওই সাদা আইভরি কালারও আবার কালচে হতে হতে শ্যামবর্ণা হয়ে গেল—চ্যাপটা চৌকো পরিচ্ছন্ন নখের জায়গায় গোল গোল, ফোলা ফোলা নোংরা নখ ৷ বাহুতে কালো কালো খোঁচা খোঁচা লোম ৷ পেতল-পানা ফংফং-এ রিঙের বদলে, ফটিক স্যাকরার গড়া ওপেল পাথরের ভারী আংটি, স্বর্ণাক্ষরও পালটে গিয়ে পরিচিত সেই কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং... ৷’’ গোরার বর্ণনার সঙ্গে সবাই তাল দিয়ে তাকে জোগান দিতে লাগল পুনরুত্থিত নানান বর্ণনার নমুনা ৷ আসলে একবার ওই সুরটা কেটে গেছে তো, তাই গল্পের বদলে সবাইকে তখন ফাজলামিতে ধরেছে ৷ কোনওমতে তাদের থামিয়ে-টামিয়ে রেশমি বলল—‘‘তবু তোমার ভাগ্য ভালো টাবলিদি, কেবল হাতের ওপর দিয়েই ফাঁড়াটা কাটল ৷ ভাবো তো, ওই নিশুত রাতে, একা ঘরে..., মা গো...! আমি হলে তো ক-খ-ন হার্টফেল...’’
সবার এত শত হাজার কথাবার্তার মধ্যে টেবিলের ধারে বসা তরুলতা এতক্ষণ কিচ্ছুটি বলেনি—মানে বলবার সুযোগও পায়নি অবশ্য ৷ সামান্য হাসিমাখা মুখে অন্যমনস্কভাবে বসেই ছিল চুপটি করে ৷ মনে হচ্ছিল যেন গল্পের খেইটাই ধরবার চেষ্টা করছিল মগ্ন হয়ে ৷ এই বালখিল্য পরিবেশের মধ্যে বসেও লেখক মানুষদের আলাদা একটা জগৎ থাকে কিনা... ৷ কিন্তু রেশমির ওই সরল উক্তিতে এতক্ষণে ঘরের সবার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকিয়ে কেমন অদ্ভুত রহস্যময়ভাবে হাসল একবার ৷ তারপর সেই দুর্বোধ্য হাসির রেশটুকু ঠোঁটের কোনায় রেখেই স্থিরদৃষ্টিতে রেশমির দিকে চেয়ে খুব নিচু গলায় বলল—‘‘তা-ই? একেবারে হার্টফেল? সত্যি...? আর নিশুতি রাতে একা ঘরে না হয়ে যদি সন্ধেরাতে, এক ঘর লোকের মাঝে হয়, তাহলে? তাহলে আর ফেল হবে না তো? এক চান্সেই পাস? ঠিক আছে... বলছি তাহলে এবার... শোনো... ৷’’ বলেই তরুলতা আবার গা হাত-পা ঝেড়ে, গলা খাঁকরিয়ে শুরু করবার তোড়জোড় করতেই দরজা দিয়ে তরুলতা ঢুকে বলল—‘‘স্যরি, একদম ক্লাইম্যাক্সের তীরে এসে তরী ডোবালাম তো? ভেরি ভেরি স্যরি... ৷’’ বলে জামার হাতায় মুখটা মুছে এক ঘর হতভম্ব পরিজনদের মাঝে এসে দাঁড়াতেই, টেবিলের ধার ঘেঁষে চেয়ারে বসা প্রথম তরুলতাটি উজ্বল আলোয় ভরা সন্ধেরাতের জমজমাটি আড্ডার এই এতগুলো ভয়বিহ্বল, আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ, কান্না, চিৎকার, গোঙানি ইত্যাদি নানারকম শব্দের মাঝে সহসা শ্যামবর্ণা থেকে ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে ফরসা হতে হতে শেষে এক লহমায়, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক অবয়বের আকার নিয়েই হঠাৎ চোখের নিমেষে মিলিয়ে গেল... ৷
রচনাকাল ২০১৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন