রামধনুকের রাজপুত্তুর – স্বপনবুড়ো

রামধনুকের রাজপুত্তুর – স্বপনবুড়ো

রূপকুমারীর রূপের কথা নিয়ে দেশ-বিদেশে কানা-কানি চলে! রূপের গরবে রাজকন্যার মাটিতে পা পড়ে না—

রূপ নয় তো যেন আগুনের ফুলকি!

তার ওপর হিরে, মণি, মুক্তো, পান্না, চুনি দিয়ে সারাটা দেহ যেন দীপান্বিতার দেয়ালী উৎসব।

রাজা ভাবেন –এ রূপ যাবে কার ঘরে!

রানি কাঁদেন—কোন্ তেপান্তরের রাজপুত্রের হাতে এ রূপের ডালি তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হবেন।

সখীরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে—সখীর মনের মানুষ মিলল কী?

দলে দলে রাজপুত্র ছুটে আসে রূপের কথা শুনে, যেমন নাকি পতঙ্গের দল ছুটে আসে দীপের আলোর আভাস পেয়ে।

মালঞ্চ দেশের রাজপুত্র, গজমোতির দেশের রাজকুমার, জ্যোৎস্নার দেশের যুবরাজ —হাসলে চুনি, কাঁদলে পান্নার দেশের রাজকুমার—কারও আসতে বাকি রইল না।

কিন্তু রাজকুমারীর রূপের আভায় চোখ তাদের ঝলসে গেল, রুমালে চোখ ঢেকে, তারা ঘরে ফিরলে। সে মুখ আর কাক-পক্ষী কেউ দেখতে পেলে না! রাজার রাজকার্য বন্ধ হল।

মন্ত্রীর পাকা দাড়িতে এর কোনও মন্ত্রণা জুটল না। রানি বৃথাই সকাল সন্ধে শিবের মন্দিরে মাথা খুঁড়তে লাগলেন।

সখীরা বললে—

সাতটা রঙের পাখনা ওড়া রামধনুকের রাজকুমার
গজমোতির মাল্য যাহার—হবে কী গো বর তোমার?

রুপকুমারী বললে—

পায়ে যার রামধনু
ভালে যার সূর্য
সেই নেবে মালা মোর
বাজাইয়া তুর্য!

কথাটা রাজা শুনলেন, রানি শুনলেন, রাজ্যের মন্ত্রী শুনলেন, আর শুনলেন সেনাপতি। রাজা শুধোলেন, ‘সেনাপতি, রামধনুর দেশ কোথায়?’ সেনাপতি মাথা নুইয়ে বললেন, ‘গজমোতির দেশের পাশ দিয়ে, মালঞ্চ দেশের দক্ষিণ দিয়ে, জ্যোৎস্নাপুরী পেরিয়ে শ্বেত দ্বীপের চামেলি দেশের কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে রামধনুর দেশের আকাশ-ছোঁয়া পুরী। আদেশ করুন এক্ষুনি সে দেশ জয় করে রাজকুমারকে সসম্মানে চতুর্দোলায় নিয়ে আসি।’

বুড়ো মন্ত্রী দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘এ বল প্রকাশের কথা নয় সেনাপতি। তুমি দূত পাঠিয়ে দাও রামধনুপুরের রাজকুমারের কাছে। আমাদের রাজকন্যার রূপের কথা তাকে জানিয়ে আসুক।’

রাজা বললেন, ‘তাই ভাল সেনাপতি! কিন্তু দূত নয়, আমার সভাকবি মধুশেখর তার কবিতায় সুললিত ছন্দে কুমারীর রূপের কথা কয়ে আসুক রামধনুপুরের যুবরাজকে। এ কাজের ভার আর কারও হাতে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারছিনে!’

রাজাকে নমস্কার জানিয়ে সভাকবি মধুশেখর রামধনুপুরের পথে পা চালিয়ে দিলে, পথের সাথী রইল শুধু তার—একতারাটি।

কবি তার একতারাটি বাজিয়ে রাজকুমারীর রূপের গান গায়। এক মনে পথ চলে। দিন যায় রাত আসে। আবার রাতের শেষে সকালের সোনালি রোদ কবিকে অচিন দেশের পথের ঠিকানা বলে দেয়।

একুশ দিন একুশ রাত্তির পর কবি যখন গিয়ে রামধনুপুরের সাতরঙা আকাশছোঁয়া পুরীর ফটকের সামনে দাঁড়াল, পূর্ণিমার চাঁদ তখন সবে দেব-মন্দিরের পেছন থেকে উঁকি মেরে রামধনুপুরের সরোবরের সাতরঙা জলে

জ্যোৎস্নার জাল ফেলেছিল।

কবি তার একতারাটি দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে গান ধরলে-

সাত সাগরের নীলিমা নিঙাড়ি গড়িয়াছে আঁখি বিধি ঠোঁট দুটি বাঁকা গড়িয়াছে আহা কোন অপরূপ নিধি

কুন্তলে তার সর্পের খেলা,
দন্তে শুধুই মুকুতার মেলা—

অপরূপ সাজে সাজাইতে তার যুগল চরণে কী দি!

গানের সুরে সুরে দীঘির সাতরঙা জল ফুলে ফেঁপে চাঁদের জ্যোৎস্নার সঙ্গে মিতালি পাতালে।

হঠাৎ আকাশ-ছোঁয়া রামধনুপুরীর সাতমহলের সেরা জানালাটা খুলে কে শুধোলে, ‘ওগো সুরের যাদুকর। ওগো দরদী কবি। তোমার গানে আমার সাত বছরের ঘুম ভেঙেছে। বলো, তোমার কী চাই?’

কবি বললে, ‘চাইনি আমি কিছুই, এ গান যার জন্যে রচা তার কানে পৌঁছুলেই আমি ধন্য হব।’

জানালা থেকে জবাব এল’কবি, তোমার গানে আমি রূপকুমারীর রূপের আভাস পেয়ে ধন্য হলুম। কিন্তু এই পুরী থেকে বেরুবার উপায় তো আমার নেই। একটি পাখির ভিতর আমার প্রাণ লুকানো, সেই পাখি আজ সাত বছর নিরুদ্দেশ। সেই পাখির অভাবে আমি সাত বছর মরার মতো নির্জীব হয় পড়েছিলুম। তুমি এসে তোমার সুরের যাদুতে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে, কিন্তু সেই সোনালি চোখওয়ালা সাতরঙা পাখি ফিরে না এলে তো আমি আমার দেহে সেই হারানো শক্তি ফিরে পাব না।’

কবি বললে, ‘ওগো রামধনুকের রাজপুত্তুর, তোমায় দেখে, তোমার কথা শুনে আমি ধন্য হয়েছি। আমি ফিরে চললুম, সেই রূপকুমারীর দেশে, তোমার হারানো সাতরঙা পাখির সন্ধান খুঁজে বের করতে।’

রাজপুত্তুর বললে, ‘ওগো বন্ধু, ওগো কবি, এইখান থেকেই তোমায় আমার অন্তরের প্রীতি জানাচ্ছি। যদি কোনওদিন সেই সাতরঙা পাখির সন্ধান মেলে তো আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে। নইলে, এই শেষ।

কবি তার ভগ্ন একতারাখানা নিয়ে রূপকুমারীর দেশে ফিরে সব কথা রাজাকে জানালে।

রাজা শুনলেন।

রানি শুনলেন।

সখীদের কানে গেল।

রূপকুমারী রাজাকে বললে, ‘বাবা, পাখি আমার চাই-ই।’ লোক ছুটল দেশ-বিদেশে পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও প্ৰান্ত অবধি।

আবার ফিরে এল। উঁচু মাথা নিচু করে বললে, ‘মহারাজ পাখি পেলুম না!’

রাজকুমারী বললে, ‘দলে দলে পাখি ধর, আমার মনে হচ্ছে পাখি রূপ বদলায়।”

রূপকুমারীর আদেশে লোকে পাখি ধরে ধরে রাজপুরী ভর্তি করে ফেললে।

রূপকুমারীর সখী ললিতা চোখের জল ফেলে বললে, ‘কুমারী, এ রকম করে আর কতদিন পাখি ধরা চলবে? মুক্ত আকাশ-তলে উন্মুক্ত পাখা ছড়িয়ে যারা মনের আনন্দে গান গায়, তাদের এমনি করে শেকলের বাঁধনে বেঁধে কী তুমি প্রাণের মানুষকে খুঁজে পাবে? ‘

রূপকুমারীর চোখ ঝলসানো রূপে কে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। চোখ রাঙা করে বললে, ‘কে আছিস, তোরা ললিতাকে এক্ষুনি পাখিদের ঘরে আটক করে রাখ।’

ললিতা বললে, ‘সখী, আমায় বন্দী করো ক্ষতি নেই, কিন্তু এই নির্মম আজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে তোমার প্রাণের দেবতাকেও বন্দী করে রাখলে।’

প্রহরীর হুমকিতে ললিতার শেষ কথা রূপকুমারীর কানে পৌঁছুল না।

আঁধার কারাগারে ললিতার দিন কাটে, বাইরের আলো তার কানে যেতে পথ খুঁজে পায় না।

দিন যায়, রাত আসে। কিন্তু তার কাছে সবই রাতের অন্ধকারের মতো মিশমিশে কালো দিয়ে ঘেরা।

একদিন ঘুমের ঘোরে ললিতা শুনতে পেলে, কে যেন তাকে মিষ্টি কথায় ডাকছে।

সে চোখ রগড়ে উঠে বসে দেখলে রামধনুকের সাত রঙে রাঙা চমৎকার একরত্তি এক পাখি, পিট্‌পিটে ছোট্ট দুটো সোনালি চোখ—সোনার শিকলে বাঁধা।

পাখি বললে—’ওগো ভাল মেয়ে, আমার বাঁধনটা খুলে দাও, নইলে আর আমি বাঁচব না। কী নিষ্ঠুর তোমরা বলো তো এমন করে বেঁধে রেখে কী লাভ তোমাদের!’

ললিতা বললে, ‘আহাহা সত্যিই তো! কে তোমায় এমন করে বাঁধলে, কি মিষ্টি তোমার গলা।’

পাখি বললে, ‘ছেড়ে দাও আমায়, এক্ষুনি চলে যাব আমি অমৃতের ঝরনার পাশে, মিঠে মিঠে ফল খাব।’

ললিতা তাড়াতাড়ি উঠে পাখির পায়ের সোনার শিকল খুলে দিলে।

ঠিক এমনি সময় খবর পেয়ে রূপকুমারী ঘরে ঢুকে বললে, ‘কই সেই রামধনুদেশের সাতরঙা পাখি? ‘

রূপকুমারীর গলার সাড়া পেয়ে পাখি জানালা দিয়ে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল।

রূপকুমারী ডাকলে, ‘ললিতা!’

ললিতা ভয়ে চোখ বুজে রূপকুমারীর পায়ের তলায় বসে পড়ল।

রূপকুমারী বললে, ‘যেখান থেকে পার আমার পাখি ধরে এনে দাও, তোমার প্রাণ তার জামিন রইল।’

ললিতা বললে, ‘পাখি বলেছিল, সে যাবে ফল খেতে অমৃতের ঝরনার পাশে।’

রূপকুমারীর আদেশে রথ তৈরি হ’ল।

সেনাপতি আর ললিতাকে নিয়ে তিনি রথে উঠলেন!

একমাস একদিন পর ঝরনার সন্ধান মিলল। কিন্তু সাতটা দিনের ক্রমাগত চেষ্টাতেও পাখির দেখা মিলল না।

রূপকুমারী আদেশ দিলেন, আজকে পাখি না পাওয়া গেলে পাহাড়ের চুড়ো থেকে ললিতাকে ঝরনার জলে ছুঁড়ে ফেলা হ’বে। সমস্ত দিন কাটল, পাখি মিলল না।

সাঁঝের মুখে সেনাপতির আদেশে একজন সৈন্য গিয়ে ললিতাকে ঝরনার বুকে ফেলে দিলে। কিন্তু অবাক কাণ্ড—কোত্থেকে রামধনু রঙা পাখিটা এসে এক্কেবারে মানুষের মূর্তি ধরে মাঝপথে ললিতাকে লুফে নিলে।

বললে, ‘ললিতা, তোমার দয়ায় আমি খুব খুশি হয়েছি। রামধনু পাখি আমার ছল, তোমাদের রূপকুমারীকে পরীক্ষা করবার জন্যই ওটা গড়েছিলাম। পরীক্ষায় তার হার হয়েছে তাই ওই ভুয়ো জিনিসটা ওরই ভাগ্যে পড়ল। কিন্তু তোমার ভাগ্যে পড়েছে এইটি’,—বলে রামধনুদেশের রাজপুত্তুর তার গলার গজমোতি মালা খুলে ললিতার গলায় পরিয়ে দিলে।

সকল অধ্যায়
১.
নিখুঁত মানুষ – লালবিহারী দে
২.
রানি কঙ্কাবতী – ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
৩.
বানর রাজপুত্র – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
ছোট চোর ও বড় – যোগীন্দ্রনাথ সরকার
৫.
ভুতো আর ঘোঁতো – সুখলতা রাও
৬.
চুনির জন্ম – ত্রিভঙ্গ রায়
৭.
ভোঁদড় বাহাদুর – গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৮.
সন্দেশের দেশে – মণীন্দ্রলাল বসু
৯.
মনোবীণা – নরেন্দ্র দেব
১০.
দুধ পাহাড় দধিসায়র – প্রেমেন্দ্র মিত্র
১১.
অস্তপাহাড়ে মানুষের মেয়ে – নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
১২.
মায়া আয়না – প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
১৩.
সেলাইবুড়ি ও আশ্চর্য ছুঁচ – শৈল চক্রবর্তী
১৪.
বন্দিনী রাজকন্যার গল্প – রাধারানী দেবী
১৫.
রামধনুকের রাজপুত্তুর – স্বপনবুড়ো
১৬.
রাজশ্রী – ইন্দিরা দেবী
১৭.
কাঠকন্যা – মৌমাছি
১৮.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড – শৈলেন ঘোষ
১৯.
নতুন দিনের আলো – মনোজকান্তি ঘোষ
২০.
আশ্চর্য আমগাছ – প্রণবকুমার পাল
২১.
কী ভালো মেঘ – উত্থানপদ বিজলী
২২.
যাদুশ্রেষ্ঠ বীরমাণিক্য – অমিতাভ রায়
২৩.
সোনার চাঁপা ফুল – পুণ্ডরীক চক্রবর্তী
২৪.
রাজকুমার বৃষস্কন্ধ আর শ্রীময়ী – নবনীতা দেবসেন
২৫.
একটা আইসকীরিম একটা কাঠবেড়ালীর গল্প – কার্তিক ঘোষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%