এক দেশে এক রাজপুত্তুর দেশ ভ্রমণে বেরুলেন।
দেশ-ভ্রমণে বেরিয়ে কত রাজ্য—কত শহর-গ্রাম—কত পাহাড়-পর্বত অরণ্য ঘুরে ঘুরে শেষকালে নীল সমুদ্দুরের ধারে এক দেশে গিয়ে পৌঁছুলেন। সেখানে সঙ্গের লোক-লস্কর সব্বাইকে বিদায় দিয়ে একা চলতে শুরু করলেন পায়ে হেঁটে।
রাজপুত্তুর ভ্রমণে বেরিয়েছেন সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে। মাথায় নেই সোনার রাজছত্তর, সোনার পাগড়ি। গায়ে নেই ইস্পাতের ওপর সোনার ফুল তোলা ঝকঝকে উজ্জ্বল বর্ম! হাতে নেই রুপোর মতন চক্চকে ইস্পাতের বল্লম! হীরেমানিক বসানো কোষে নেই ধারালো তরোয়াল। রাজপুত্তুর চলেছেন সাদাসিধে পোশাকে, কোমরে আর হাতে লাঠি নিয়ে।
নীল সমুদ্দুরের ধারে একটি দেশ দেখে রাজপুত্তুরের খু-উ-ব পছন্দ হল। কী সুন্দর নতুন রকমের গাছপালা আর নতুন ধরনের সুন্দর সুন্দর গড়নের ঘর-বাড়ি। রাজপুত্তুর খুশি হয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে একটি নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, এমন সময় কানে এলো মানুষের কান্না!
কে কাঁদে? কান্না শুনে রাজপুত্তুর ব্যস্ত হয়ে সেইদিকে এগিয়ে চললেন। কিছুক্ষণ পরে দেখতে পেলেন একটি বুড়ি এক প্রকাণ্ড বটগাছের নিচে বসে হাপুস নয়নে কাঁদছে।
রাজপুত্তুরকে দেখতে পেয়েই বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বললে—বাবা, সর্বনাশ হয়েছে! রাজকন্যে ময়না পাখির খোঁজে বেরিয়েছিল, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী হবে?
রাজপুত্তুর আশ্চর্য হয়ে বললেন—ময়না পাখির খোঁজে রাজকন্যা এসেছে এখানে?
বুড়ি বললে—হ্যাঁ। শোনো বাবা, রাক্ষসেরা আমাদের রাজ্যে এসে ভীষণ উৎপাত করছিল। রাজা মশাই গেছেন রাজ্যের সমস্ত পুরুষ মানুষ নিয়ে যুদ্ধ করতে রাক্ষসদের সঙ্গে।
রাজপুত্তুর ব্যস্ত হয়ে বললেন—তারপর?
—তারপর আর কি! আমাদের মা-মরা রাজকন্যে। তাকে আমিই আঁতুড়-ঘর থেকে মানুষ করেছি বাবা! তার আদরের পোষা ময়না পাখিটা উড়ে এই বটগাছটার উপরে গিয়ে বসেছিল। রাজকন্যে পাখির পিছু-পিছু ছুটে বেরিয়ে এলো, আমিও তার পিছু-পিছু ছুটলুম। কিন্তু রাজকন্যের আর দেখা পেলাম না। এই দ্যাখো না, এই গাছের তলা পর্যন্ত তার পদ্মপায়ের ছাপ পড়েছে। তারপর আর তার পায়ের ছাপ পাচ্ছিনেকি হবে বাবা? তুমি জোয়ান ছেলে! তুমি এই বটগাছের কোটরে একবার উঁকি দিয়ে দেখো না… পাখি ধরতে গিয়ে রাজকন্যে ঐ কোটরের মধ্যে পড়ে গেছে কিনা!
রাজপুত্তুর, মালকোঁচা বেঁধে তরতর করে বটগাছে উঠে পড়লেন। উপরে উঠে কোটরের কাছে পৌঁছে উঁকি দিয়ে দেখলেন,—কোটরে মধ্যে এক বিরাট গহ্বর! অবাক কাণ্ড! সেই গহ্বরের ভিতরে দিব্যি থাক্ থাক্ সিঁড়ি কাটা রয়েছে গাছের গায়ে।
বুড়ি নিচে থেকে ব্যাকুল হয়ে বললে—আমার কলাবতী কি ওর ভেতরে আছে?
রাজপুত্তুর কোটরের ভিতর দিকে ঝুঁকে দেখতে দেখতে বললেন—কই, না তো?
বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বললে—কিন্তু তার পায়ের ছাপ যে এইখানে এসেই শেষ হয়েছে, বাবা! ওমা, এখন কী করি আমি! মহারাজ ফিরে এলে তাঁকে কী বলবো গো?
বুড়িকে ডেকে রাজপুত্তুর বললেন—কিছু ভয় নেই বুড়িমা! গাছের ভেতরে নামবার চমৎকার সিঁড়ি আছে। এর মধ্যে নেমে আমি রাজকন্যের খোঁজ নিয়ে আসি। যতক্ষণ আমি না ফিরি, তুমি ঐখানে বসে থেকো!
রাজপুত্তুর তরতর করে নেমে গেলেন গাছের কোটরের দেওয়ালে খাঁজ-কাটা ধাপ বেয়ে। নামতে নামতে—– শেষকালে যেখানে সিঁড়ির খাঁজ শেষ হয়ে অনেক সবুজ পাতা ছড়ানো রয়েছে, রাজপুত্তুর লাফ দিয়ে সেই জমির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যেই না পড়া—সঙ্গে সঙ্গে সবুজ জমিটা নড়ে গিয়ে হু-হু করে নীচের পানে তলিয়ে গেল। যেখানে এসে সেই জমি থামলো, রাজপুত্তুর বুঝতে পারলেন যে, একটা বহু যুগের পুরনো পাথরের কেল্লার মধ্যে এসে পড়েছেন তিনি।
যে-জায়গাটিতে তিনি পড়েছিলেন, তার একদিকে একটা ছোট দরজা দেখতে পেলেন। দরজাটায় হাত দেবা মাত্তর সেটি খুলে গেল। রাজপুত্তুর দেখলেন, খু-উ-ব সরু একটা পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে। উঁচু-সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগলেন রাজপুত্তুর। অনেক সিঁড়ি উঠবার পর দেখতে পেলেন, উপরের সুন্দর জমিতে একটি বাগান।
সেই বাগানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে, বাগানের দক্ষিণ দিক আন্দাজ করে এগুতে-এগুতে কিছু দূরে নীল সমুদ্দুর দেখতে পেলেন। সমুদ্দুর দেখে রাজপুত্তুরের আনন্দ আর ধরে না! যাক আর ভয় নেই। সমুদ্দুর যখন দেখতে পাওয়া গেছে তখন যেমন করেই হোক এখান থেকে পালাতে পারবেন। কিন্তু, আকাশে সূয্যি নেই কেন? তবে কি পাতালপুরীতে এসে পড়েছেন নাকি? রাজপুত্তুর ভাবছেন, এমন সময়ে একটি সুন্দর ময়না পাখি উড়ে এসে তাঁর কাঁধের ওপর বসে, মিষ্টিস্বরে বলে উঠল—তুমি কে গো?
রাজপুত্তুর বললেন—আমি রাজপুত্তুর। তুমিই কি সেই ময়না-পাখি, যার খোঁজে রাজকুমারী কলাবতী হারিয়ে গেছেন?
ময়না বললেন, হ্যাঁ। আমি কলাবতীর পোষা ময়না। কলাবতীর বাবা যে রাক্ষসরাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছেন, সেই রাক্ষসরাজা যুদ্ধে হেরে গিয়ে তার এই পাতালপুরীতে বাড়িতে এসে লুকিয়ে আছে। যুদ্ধে হেরে পালিয়ে আসার সময় সে ফাঁদ পেতে ভুলিয়ে কলাবতীকেও এখানে ধরে এনেছে। কলাবতীর খোঁজেই আমি আছি এখানে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাইনি। তবে রাক্ষসরাজের সঙ্গে আমি ভাব জমিয়ে নিয়েছি। কলাবতীকে খুঁজে ঠিক বের করবো।
এমন সময় একটা ভীষণ শব্দ শোনা গেল। ময়না বললে—তুমি শীগগির ঐ পাথরের ঢিবিগুলোর আড়ালে লুকোও, রাক্ষসরাজ এই দিকেই আসছে। এরপর আমি এক-সময়ে এসে তোমার সঙ্গে ভাব করবো।
রাজপুত্তুর তাড়াতাড়ি আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন।
একটু বাদেই এক বিরাটকায় রাক্ষস এসে পড়ল। তার গায়ের চামড়া উঁচু-কাঁটা-ওঠা কাঁঠালের মতন, কান দুটি হাতির কানের মতন। চেহারা তার মানুষের মতন, আর চোখ দুটো বাঘের মতন। ময়না তাড়াতাড়ি সামনে এগিয়ে গিয়ে ঘাড় দুলিয়ে নমস্কার করে বললে—কাল থেকে আপনাকে দেখতে পাইনি। শরীর বেশ ভাল আছে তো, মহারাজ।
রাক্ষসরাজ মোটা কর্কশ গলায় বললে—মোটেই না। পাতালপুরীতে এসে অবধি ভাল খাবার পাচ্ছিনে! পরশু হাঙ্গরের চচ্চড়ি আর তিমির তরকারি খেয়ে কাল সারাদিন পেটের ব্যথায় উঠতে পারিনি। মনিষ্যির কচি-মাংসের ঝোল না খেলে বোধ করি সুস্থ হবো না।
ময়না বললে—তা মনিষ্যির ছানা কি পাওয়া যাচ্ছে না নাকি?
রাক্ষস রেগে উঠে বললে পাওয়া যাবে না কে? ঐ যে মনিষ্যির রাজাটার রাজ্যি ধ্বংস করতে গেলুম, সেখান থেকে হেরে পালিয়ে আসবার সময় তার মেয়েটাকে ভুলিয়ে ফাঁদে ফেলে ধরে এনেছি। সেটাকে তো কেটে ঝোল বানাতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার মন্ত্রী বারণ করলে।
ময়না বললে—কেন, কেন মহারাজ? আপনার শরীর খারাপ হয়েছে…পথ্যি খেতে হবে…মন্ত্রীমশায় তাতে মানা করলেন কেন?
রাক্ষস বললে-মন্ত্রী বললে, ঐ মেয়েটার বাবার কাছে একটা খবর পাঠিয়ে দেবে যে, প্রত্যেক দিন সমুদ্দুরের ধারে আমার জন্যে একটি করে জ্যান্ত মনিষ্যি রেখে দেয়, তবেই তার মেয়েকে আমরা ছেড়ে দেবো। নইলে দেবো না।
ময়না বললে—এটা মন্দ পরামর্শ নয় মহারাজ।
রাক্ষস বললে—হ্যাঁ, মন্ত্রীও বললে তাই। একদিনের জন্যে একটা বাচ্চা খেয়ে আর কি হবে? বরং প্রতিদিন যাতে একাট করে তাজা মনিষ্যি পাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা ভাল।
রাক্ষসরাজ পেটের ব্যথায় ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে প্রাসাদের মধ্যে চলে গেল।
ময়না-পাখি ফিরে গিয়ে রাজপুত্তুরকে বললে-কলাবতী এইখানেই আছে। তাকে খুঁজে বের করতে হবে। তুমি এখন এইধারেই লুকিয়ে থাকো। আমি চারিদিকে দেখে-শুনে বুঝে আসি।
এদিকে হয়েছে কি রাক্ষসরাজের সেই পেটের যন্ত্রণা বিষম বেড়ে গেছে! তার চেঁচামেচিতে চারিদিকে রাক্ষস-খোক্কসরা ছোটাছুটি করছে। ময়না পাখি তাড়াতাড়ি গিয়ে তাদের বললে-আমাকে মহারাজের কাছে নিয়ে চলো। আমি পেটের যন্ত্রণা কমিয়ে দিতে পারি।
রাক্ষস-খোক্কসরা তাদের রাজার কাছে নিয়ে গেল ময়না পাখিকে।
ময়না-পাখি রাক্ষসরাজকে ঘাড় দুলিয়ে নমস্কার করে বললে—মহারাজ! আমি পেটের ব্যথা সারিয়ে দিতে জানি। তবে এ রকম দারুণ পেটের যন্ত্রণার ওষুধ তো পাতালে কেউ জানে না। এর খুব ভাল ওষুধ জানে পৃথিবীর মনিষ্যিরা। যারা এই পেটের ব্যথা সারাতে পারে তাদের বলে—গো-বদ্যি। মহারাজ যদি হুকুম দেন, আমি পৃথিবী থেকে গো-বদ্যি ধরে আনতে পারি। এখানে এসে সে আপনার পেটের ব্যথা সারিয়ে দেবে।
রাজা তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছে। বললে —তা যদি পারো তো তুমি যা বলবে, শুনবো। যে করে হোক, শীগগির সারিয়ে দাও আমার পেট কামড়ানি!
ময়না পাখি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে উড়ে রাজপুত্তুরের কাছে গিয়ে বললে-রাজপুত্তুর শীগগির তৈরী হয়ে নাও! তোমাকে গো-বদ্যি সেজে রাক্ষসরাজের পেট কামড়ানি সারিয়ে দিতে হবে এখুনি।
রাজপুত্তুর তো আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন—সে কি কথা? আমি আবার চিকিৎসার কি জানি?
ময়না বললে—সে তোমায় ভাবতে হবে না। আমি যা-যা বলি, ঠিক তেমনি তেমনি করো দিকি! ময়না উড়ে গিয়ে রাজপুত্তুরের কাঁধের উপর বসে তাঁর কানে কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে যা করতে হবে শিখিয়ে দিলে ঘাড় নেড়ে নেড়ে। শুনে রাজপুত্তুরের মহা আনন্দ।
রাক্ষসরাজ ময়দানের মত তার প্রকাণ্ড ঘরের মেঝেতে পড়ে এমুড়ো থেকে ও-মুড়ো গড়াগড়ি দিচ্ছে। কাতরানিতে মনে হচ্ছে, আকাশ-ফাটা মেঘ ডাকছে বুঝি বা! মাঝে-মাঝে আবার একসঙ্গে দশ-বিশটা বাজ পড়ার মতন উৎকট চিৎকার করে উঠছে। রাজপুত্তুরকে সঙ্গে নিয়ে ময়না এগিয়ে গিয়ে বললো,—মহারাজ। পৃথিবী থেকে গো-বদ্যি ধরে এনেছি।
রাজা ককাতে ককাতে বললে—এখখুনি আমার রোগের ব্যবস্থা করে দে। নইলে তোকেই আমি কাঁচা গিলে খেয়ে ফেলবো।
রাজপুত্তুর গম্ভীর মুখে এগিয়ে গিয়ে একদৃষ্টিতে রাক্ষসের পেটের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বললেন—মহারাজ! আপনার খাবারে কোনো সমুদ্রের জন্তু রান্না হয়েছিল কি?
সেখানে উপস্থিত মন্ত্রী-পাত্র-মিত্র-রাক্ষস-খোক্কসরা সকলে মিলে চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো—হ্যাঁ-হ্যাঁ—হয়েছিল। মহারাজ খেয়েছিলেন হাঙ্গর আর তিমির ঝোল!
রাজপুত্তুর খুব গম্ভীরভাবে নিজের নাকটি টিপে ধরে, চোখ দুটি বুজে একমুহূর্ত চুপ করে কি চিন্তা করলেন। তারপর বললেন—হয়েছে। সেই হাঙ্গরগুলোই পেটের মধ্যে জ্যান্ত হয়ে উঠে তাদের দাঁত দিয়ে মহারাজের নাড়ীভুঁড়ি চিবুচ্ছে! শুধু তাই নয়, তিমিটাও দেখছি বিশ্বাসঘাতক! সেও আস্তে আস্তে পেটের মধ্যে বেঁচে ওঠার মতলবে রয়েছে।
সমস্ত রাক্ষস-খোক্কসরা ব্যাকুল হয়ে হাঁউ-মাউ-খাঁউ করে বলতে লাগলো—হায় হায় কী হল! গো-বদ্যি মশাই? এখন উপায়?
রাজপুত্তুর রাশভারী গলায় বললেন—হ্যাঁ, খুব শীগগিরই এর উপায় করতে না পারলে বিপদ হতে পারে। হাঙ্গরগুলো বেঁচে উঠে পেটের মধ্যে যতই উৎপাত করুক না, তাতে শুধু যন্ত্রণাই হবে। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক তিমি ব্যাটা বেঁচে উঠে পেটের মধ্যে তার ল্যাজ আছড়িয়ে, নাকের ফোয়ারার জল ছড়াতে শুরু করলে—
রাজা ককাতে ককাতে বললে—এখুনি ব্যবস্থা করো। নইলে–
রাজপুত্তুর বললেন—ভাববেন না রাজামশাই, আমি ঠিক ভাল করে দেবো আপনার পেট কামড়ানি! তবে একটা জিনিস চাই। আমার ওষুধের সঙ্গে সেটা মিশিয়ে খাইয়ে দিলেই এখুনি সেরে যাবে। সেটা হচ্ছে, তিত্তিরে গাছের শেকড়, আর মানুষের মেয়ের দশ ফোঁটা চোখের জল। সে তো আর এ রাজ্যিতে পাওয়া যাবে না; সে পাওয়া যায় মানুষের রাজ্যিতে। আমি গিয়ে দুদিনের মধ্যে সব যোগাড় করে নিয়ে আসবো।
ময়না তাকে বাধা দিয়ে বললে—ওগো বদ্যি! তুমি মনিষ্যি জীব। তুমি এখান থেকে একলা ওষুধ খুঁজতে গেলে, মহারাজের রাজ্যির প্রজারা তোমাকে দেখতে পেয়ে পাকা আমটির মতন টুপ করে পেটে পুরে ফেলবে! তখন মহারাজের রোগ সারবে কী করে?
রাক্ষসরাজ বিরক্ত হয়ে কাতরাতে কাতরাতে বললে-কিছু ভয় নেই। তুমি আমার রাজ্যে যেখানে খুশি ঘুরে বেড়িয়ে যত শিগগির পারো ওষুধের গাছ খুঁজে নিয়ে এসো। তোমায় আমার ‘যাদু-টুপি’ একটা দিচ্ছি, এই টুপিটা পরলেই তুমি রাক্ষস হয়ে যাবে। তখন আর আমার রাজ্যির কোনো রাক্ষস-খোক্কস তোমার চুলটি পর্যন্ত ছোঁবে না। শীগগির যাও।
রাজপুত্তর রাক্ষসরাজের কাছ থেকে তামার ঝকঝকে ‘যাদু-টুপি’ নিয়ে মাথায় পরলেন।
ওমা! দেখতে দেখতে রাজপুত্তুর একটা বিরাট রাক্ষস হয়ে গেলেন।
ময়না দারুণ ভয়ে আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল। রাক্ষস এত যন্ত্রণার মধ্যে ফিক ফিক হেসে ফেলে বললে—গো-বদ্যি, টুপিটা খুলে নামিয়ে রাখো।
রাজপুত্তুর তাড়াতাড়ি টুপিটা মাটিতে নামালেন। অমনি আবার তাঁর পরম সুন্দর চমৎকার চেহারা ফিরে এলো। যাইহোক, রাজপুত্তুর রাক্ষসরাজকে লম্বা দণ্ডবৎ করে ময়নাকে নিয়ে তো ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে এসে ময়নার সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন চুপি চুপি।
পরামর্শ ঠিক হবার পর ময়না একলা রাজার কাছে গিয়ে রাজাকে জানালে—রাজামশাই! গো-বদ্যি ধ্যানে বসে জানলে যে আর চারপ্রহরের মধ্যে ওষুধ না খাওয়ালে আপনাকে বাঁচানো শক্ত হবে। অথচ মানুষের মেয়ের চোখের জল দশ ফোঁটা এই সময়ের মধ্যে কেমন করে আনবে, সেই হয়েছে বিষম ভাবনা। আপনার রাজ্যির ধারে পাশে কোথাও কি মনিষ্যির বাস নেই? আপনার পেরমাই থাকতে থাকতে শিগগির ভেবে বলুন!
পরমায়ু কমে আসছে শুনেই ভয়ে ভয়ে রাজা বললেন—হ্যাঁ, হ্যাঁ, উপায় আছে, মনে পড়েছে। মন্ত্রীর কাছে যাও, গিয়ে সব কথা বলে জানাও যে, রাজার হুকুম, শিগগির ব্যবস্থা করো। গম্বুজের মাথায় বন্দিনীর চোখের জল—বুঝলে?
ময়না বললে—বুঝলুম, আর চললাম মন্ত্রীমশাইয়ের কাছে।
ময়না এসে রাজপুত্তুরকে বলতেই রাজপুত্তুর টুপি খুলে মানুষের বেশে রাক্ষসরাজের মন্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন—আমি শুক্তি ঝিনুক এনেছি। এই শুক্তি ঝিনুকে দশ ফোঁটা মনিষ্যির মেয়ের চোখের জল চাই। মহারাজের পেট f কামড়ানির ওষুধ তৈরি করবো। মহারাজ বলেছেন, আপনার কাছে এলেই চোখের জলের ব্যবস্থা হবে। গম্বুজের মাথায় আছে চোখের জল!
মন্ত্রী বললে—হ্যাঁ, আমার কাছেও সে খবর এসছে। চলো আমার সঙ্গে।
রাজপুত্তুর চললেন মন্ত্রীর সঙ্গে। চলে—চলে—চলে—চাল, দেখলেন, কেল্লার শেষে সমুদ্রের ধারে একটা প্রকাণ্ড উঁচু গম্বুজ। সেই গম্বুজের উপরে উঠে দেখলেন, সেখানে একটা ছোট ঘরে রাজকন্যা কলাবতী বসে বসে কাঁদছেন।
রাক্ষস-মন্ত্রী গিয়ে রাজকন্যাকে এমন বিশ্রীভাবে ধমক দিলে যে তার চোখ দিয়ে আরও বেগে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। তখন মন্ত্রী ইশারা করে রাজপুত্তুরকে বললেন—নাও, নাও, এইবেলা চোখের জলটা শুক্তির ঝিনুকে ভরে নাও।
রাজপুত্তুর তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে কলাবতীর চোখের কোলে শুক্তির ঝিনুকটি ধরলেন আর খু-উ-ব আস্তে আস্তে বললেন—ভয় নেই রাজকুমারী, আমি তোমায় উদ্ধার করতেই এসেছি।
অনেকদিন বাদে কলাবতী মানুষ দেখে স্বাভাবিক আনন্দে চিৎকার করতে যাবেন, এমন সময় রাজপুত্তুরের ইশারায় চুপ করে গেলেন।
রাজপুত্তুর কলাবতীকে চোখ টিপে ইশারা করে—আবার অন্য সময়ে আসবেন জানিয়ে, তাঁর দশ ফোঁট চোখের জল নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এমন সময় রাজপুত্তুরের পিছনে তাঁর নিজের পোষা ময়নাকে দেখতে পেয়ে রাজকন্যা তাকে ধরে আদর করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়ে যদি রাজপুত্তুর কলাবতীর পায়ের আঙুল, নিজের পা দিয়ে টিপে ধরে ইশারা না করতেন, তাহলে মুশকিল হতো। রাজকন্যা ইশারা বুঝলেন। বলে উঠলেন, ও মা! ওই পাখিটা আবার কোথা থেকে এলো? কী চমৎকার পাখি! আমি একলা থাকি, আমি ওটাকে পুষবো।
মন্ত্রীমশাই ভাবলে, ভালই হলো, ওই ময়না-পাখিটা আসার পর থেকেই রাজামশাইয়ের নিত্যি অসুখ লেগেই আছে। এ আপদটাকে রাজার কাছ থেকে তফাতে রাখাই উচিত। এই মনে করে মন্ত্রীমশাই বললে —আচ্ছা, পাখিটাকে তুমি তোমার সঙ্গী করে পোষো। ওকে এখানে রেখে যাচ্ছি। তারপর ময়নার দিকে ফিরে বললে—থাক ব্যাটা পাজি। তুইও এইখানে বন্দী থাক। দিন রাত্তির মহারাজের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ঘোচাচ্ছি।
এই বলে একটা মস্ত লোহার খাঁচা আনিয়ে তার মধ্যে ময়নাটাকে বন্দী করে রেখে, খাঁচার দরজা বন্ধ করে রাজপুত্তুরকে নিয়ে চলে এলো।
পথ চলতে চলতে গো-বদ্যি বললে মন্ত্রীমশাইকে—দেখুন মন্ত্রীমশাই, আমি যাচ্ছি, কিন্তু আপনি ফটকের পাশে বসে থাকুন।
মন্ত্রীমশাই বললে—কেন?
গো-বদ্যি বললে—কেন আবার কী? রাজার পেরমাই মোটে একপ্রহর। এর মধ্যে আমায় সাত-সাতবার আসতে হবে চোখের জল নিতে। প্রতিবারেই গরম-গরম চোখের জল চাই—বুঝলেন? তবে রাজা বাঁচবেন। বারে বারে আমায় গম্বুজের চাবি খুলে দেবে কে?
মন্ত্রীমশাই বললে—আমাদের রাজামশাই ঠিক বাঁচবেন তো?
গো-বদ্যি বললে-বাঁচবেন না কেন? নিশ্চয় বাঁচবেন! তবে আপনাকে একটা মন্তর শিখিয়ে দিচ্ছি, তাড়াতাড়ি গিয়ে রাজামশায়ের কানের কাছে বিড়বিড় করে তিন লাখ ছাপান্ন বার আওড়াতে থাকুন তাঁকে ছুঁয়ে! সাবধান! কেউ যেন না শুনতে পায় এই মন্তর। বড় বিশ্বাসী মন্তর এটা। আর আপনিও খুব বিশ্বাসী মন্ত্রী রাজামশায়ের। শীগগির আপনি চলে যান…আমিও খুব শীগগির গরম-গরম জল নিয়ে সাত-সাতবার যাবো আসবো…আসবো আর যাবো…
মন্ত্রীমশাই বললে—তবে গম্বুজ-ঘরের চাবিটা তুমিই রাখো…আমি যাই। গো-বদ্যি বললে—সেই ভাল।
মন্ত্রীমশাই রাজপুত্তুরের হাতে চাবি দিয়ে চলে যেতেই, রাজপুত্তুর করলে কি তাড়াতাড়ি কলাবতীর ঘরের সামনে গিয়ে বললেন—ময়না, তুমি শীগগির জানালা দিয়ে বেরিয়ে এসো।
ময়না তখন কলাবতীর সঙ্গে মন খুলে গল্প করছিল। কলাবতী পিঞ্জর খুলে তাকে কোলে বসিয়ে বলছিলেনঃ
‘ময়না, ময়না, দুঃখ যে আর সয় না।’
ময়না জবাব দিচ্ছে :
‘রাজকন্যে ভাই, চিন্তা কিছু নাই।
কেমন করে উদ্ধার করি, দেখো তখন ভাই।’
এমন সময় রাজপুত্তুরে ঐ কথা শুনে কলাবতী জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে ময়নাকে বের করে দিলেন। ময়না বেরিয়ে এসে বললেন—এখুনি আমাদের পালাতে হবে। এত দেরী দেখে মহারাজের লোকজন তোমার খোঁজ করতে এলো বলে।
রাজপুত্তুর বললেন—সে তো জানি। কিন্তু পালাবো কেমন করে?
তখন ময়না বললে—সেই যাদু-টুপিটা তুমি শীগগির আমার মাথায় পরিয়ে দাও। তারপর তোমরা দুজনে আমার দু’খানা ডানার গা ঘেঁষে পিঠে চড়ে বোসো।
রাজপুত্তুর তাড়াতাড়ি ‘যাদু-টুপিটা’ ময়নাকে পরিয়ে দিতেই সে ঈগল পাখির চেয়েও মস্ত বড় রাক্ষুসে পাখি হয়ে গেল। কলাবতী আর রাজপুত্তুর তার পিঠে চড়ে বসতেই সে হু-হু করে উপর দিকে উঠতে লাগল। উঠতে—উঠতে—উঠতে—হাজির হল এসে পৃথিবীতে। হাজির হতেই রাজপুত্তুর দেখেন, বুড়ি বসে বসে অঝোর ঝরে কাঁদছে। যেমন করে মানুষ-করা মেয়েকে রাক্ষসের হাতে সঁপে দিয়ে আজও কাঁদে তার অভাগিনী মা। এ কান্না শেষ হবে যদি কোনদিন কোন দয়ালু রাজপুত্তুর এসে তার মানুষ করা মেয়ের সারা জীবনের ভার নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে পারে।
রাজপুত্তুর পাতালপুরীর বাইরে এসে কলাবতীকে আর তার ধাইমাকে ময়নার পিঠে চড়িয়ে তাঁর বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে গেলেন।
আমার কথাটি ফুরুলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন