মায়া আয়না – প্রভাবতী দেবী সরস্বতী

মায়া আয়না – প্রভাবতী দেবী সরস্বতী

লখিমপুরের রাজকন্যা উত্তরা। লোকের মুখে মুখে, বাতাসের আগে আগে তার রূপের খ্যাতি ছোটে।

সবাই বলে, এমন রূপ নাকি দুনিয়ায় নেই। সবাই বলে, এ রাজকন্যার যোগ্য বর দুনিয়ায় মিলবে না।

প্রশংসা শুনে শুনে রাজকন্যাও গর্বে ফুলে উঠেছে, সমস্ত দুনিয়াকে সে পায়ের তলায় রাখতে চায়।

রাজার বড় আদরের মেয়ে, সে যখন যা চায়, রাজা তখনই তা যেমন করে হোক এনে দেন। রাজকন্যার খেয়াল মেটাতে কত লোককে মরতে হয়েছে, কত লোককে হাত পা খোঁড়া হয়ে চির-অকর্মণ্যভাবে বসে থাকতে য়েছে, তার ইয়ত্তা নাই।

এমন নিষ্ঠুর মন। রাজাও কন্যাস্নেহে অন্ধ।

কেবল ভাবেন, তাঁরই কেবল চোখের জল পড়ে। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে তিনি শিউরে ওঠেন।

রাজাকে বলেন, “মেয়ে পাগল বলে তুমিও কি পাগল হলে, রাজা?”

রাজা বলেন, “কিন্তু উত্তরা কাঁদবে, রানি।”

মেয়ের চোখে জল পড়বে, এ কল্পনাও রাজার কাছে অসহ্য লাগে।

রানি হতাশ হয়ে দেবতার কাছে প্রার্থনা করেন ও মেয়ে বরং মরে যাক—সেও ভালো। দেশের লোক বাঁচবে। তিনিও বাঁচবেন।

.

দুই

পথ দিয়ে একজন লোক হেঁকে যাচ্ছিল, “আশ্চর্য আয়না নেবে গো—আশ্চর্য আয়না—”

রাজকন্যা উত্তরা ছুটে জানালার কাছে এল।

একটা লোক, হাতে তার একটা আয়না।

রাজকন্যা জিজ্ঞাসা করলে, “এ আয়নায় কী হয় গো?”

লোকটি উত্তর দিলে, “এ আয়নায় মুখ দেখলে সবচেয়ে বেশি সুন্দর হওয়া যায়, মুখে যদি এতটুকু খুঁত থাকে, সে খুঁতও সেরে যায়।”

রাজকন্যার গালে ছিল একট মস্ত বড় কালো তিল। অমন সুন্দর মুখখানায় মস্ত বড় চিহ্ন, যেন চাঁদে কলঙ্ক।

রাজকন্যা উৎসুক হয়ে বললে, “কই, দেখি তোমার আয়না।”

লোকটি মাথা নেড়ে বললে, “না, দাম দিয়ে কিনতে হয়, তারপর মুখ দেখতে হয়।”

রাজকন্যা জিজ্ঞাসা করলে, “তারপর দাম নিয়ে তুমি যদি পালাও?”

লোকটি হেসে বললে, “না গো, আমি পালাব না, এইখানে দাঁড়িয়ে থাকব।”

রাজকন্যা তখনই দাম দিয়ে আয়না নিলে।

লোকটি বললে, “এখনই যেন মুখ দেখ না। আগে স্নান করো, ভাল কাপড়-জামা গহনাপত্র পর, তারপর একলা একটা ঘরে এই আয়নাতে মুখ দেখ। ভয় নেই, আমি পালাব না, এইখানে তোমার সিপাইদের কাছে বসে থাকছি। আয়নায় মুখ দেখে এসে আমায় দেখতে পাবে।”

রাজকন্যা তাড়াতাড়ি আয়নাখানা বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে স্নান করতে গেল।

সেদিন কী তাড়াতাড়ি!

মা ভাবেন, দাসীরা, সহচরীরা ভাবে, আজ ব্যাপার কী? যাকে স্নান করিয়ে দিতে হয়, সে আজ কারও সাহায্য না নিয়ে নিজে চলেছে স্নান করতে, এর মানে?

রাজকন্যা স্নান করে এসে সবচেয়ে দামি শাড়ি-জামা পরলে, বেছে বেছে ভাল ভাল গহনা গায়ে দিলে, তারপর বাক্স খুলে আয়না বার করলে।

তার বুক তখন কাঁপছে!

কী জানি, আয়না কী বলে! রাজকন্যা চমকে ওঠে!

প্রবল উৎসাহ ও আনন্দ নিয়ে আয়নায় সে মুখ দেখলে।

এ কী! ওমা, একী?

ছিল একটা তিল, এযে সারামুখে অসংখ্য কালো তিল বার হয়ে পড়েছে।

দেখতে দেখতে একী পরিবর্তন!

রাজকন্যার মাথার চুলগুলো হয়ে উঠলো কটা, একেবারে ছোট, কাঁধের উপর লুটোপুটি খায়। নাকটা যেন কেমন চেপ্টা হয়ে গেছে, দাঁতগুলো বড় হয়ে গেছে। অমন যে কাঁচা সোনার মতো রং দেখতে দেখতে হয়ে উঠল কালো। আর সেই কালো তিলগুলো আঁচিলের মতো ঝুলতে লাগল।

হাত থেকে আয়না খসে পড়ল।

দৃষ্টি পড়ল হাতে-পায়ের দিকে।

সব কালো। অমন যে গোল গোল হাত-পা, হয়ে গেছে শীর্ণ শির-ওঠা।

তবু বিশ্বাস হয় না।

রুদ্ধ নিঃশ্বাসে রাজকন্যা দেয়ালে নিজের বড় আয়নার পানে চাইল।

কী কদর্য আকৃতি!

এই কী সেই রাজকন্যা?

রাজকন্যা আছড়ে পড়ল।

এ তার কী হল? কী করে কোন যাদুমন্ত্রে তার চেহারা এমন বদলে গেল? এখন সে কী করবে, কাকে বলবে কে বিশ্বাস করবে, সে সেই রাজকন্যা। দর্পে যে ধরাকে সরা জ্ঞান করত?

সর্বনাশ, তার মা-বাপ পর্যন্ত বিশ্বাস করবেন না। ভাে চিনতে পারবেন না। এখন উপায়?

রাজকন্যা চিৎকার করে কাঁদতে গেল! হায় হায়, গলায় সে সুর কই! এ যে বিশ্রী গোঁ গোঁ শব্দই বার হয়!

রাজকন্যা সারাদিন না খেয়ে সেই ঘরে বন্ধ হয়ে রইল।

.

তিন

রানি এসে দরজায় ঘা দেন। সহচরী দাসীরা ডাকে, “ও রাজকন্যা, ওঠো, ওঠো।”

সাড়া নেই।

রাজবাড়ির মিস্ত্রি আসে, দরজা ভেঙে ফেলা হল।

কী সর্বনাশ, এ ডাইনি বুড়ি কে?

আঁৎকে উঠে রানি ছুটে পালান, দাসি সহচরীরা ছুটে পালায়।

রাজবাড়িময় হুলুস্থুল কাণ্ড, রাজকন্যা ঘরে নাই, এক ডাইনি বুড়ি রাজকন্যার ঘরে বসে।

রাজার আদেশে প্রহরীরা বুড়িকে তখনই বেঁধে ফেলল।

বুড়ির চোখ দিয়ে ঝরে অজস্র জলধারা। মুখে শুধু হাঁউ মাউ শব্দ।

রাজারানি কেঁদে লুটিয়ে পড়েন, এই রাক্ষসী বুড়ি তাঁদের একমাত্র মেয়েকে খেয়ে ফেলেছে।

রানি তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন।

“তোমার পায়ে পড়ি, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও, তুমি যা চাও তোমায় তাই দেব।”

বুড়ি সঙ্গে সঙ্গে হাঁউমাউ করে কাঁদে।

রাজা হুকুম দিলেন, “ডাইনি বুড়িকে শূলে দেওয়া হোক।”

রাজ্যের লোক দলে দলে ডাইনি বুড়িকে দেখতে আসতে লাগল।

যতদিন না শূলে দেওয়া হয়, ততদিনের জন্য ডাইনি বুড়িকে একটা খাঁচার মধ্যে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। ডাইনি। বুড়ি সেই খাঁচার মধ্যে গোঁ গোঁ করে বেড়াত। নিজের কথা বলবার জন্য ছট্‌ফট্ করত।

যারা দলে দলে আসত, তারা বলাবলি করত।

“বেশ করেছে বুড়ি, সুন্দরী রাজকন্যাকে খেয়ে ফেলেছে। রাজকন্যা সুন্দরী হলে কী হবে, অমন রাক্ষসী আর দুনিয়ায় ছিল না। গর্বে কাউকে তোয়াক্কা করত না। তার খেয়াল মেটাতে বহু লোক মরেছে। কত লোকের হাত-পা খোঁড়া করে, চোখ তুলে দিয়ে মজা দেখেছে। ভগবান তাদের চোখের জলে দয়া করে বুড়িকে পাঠিয়েছেন।”

বুড়ি-বেশিনী রাজকন্যা সব বুঝতে পারে। অনুতাপে সে জর্জর হয়ে ওঠে। ভাবে, সে যদি আবার নিজের চেহারা ফিরে পায়, প্রতিজ্ঞা করবে আর কখনও অমন সব পৈশাচিক কাজ করবে না। এবার সে লক্ষ্মী শান্ত হবে।

এত লোক আসে, সেই আয়না-বিক্রেতা লোকটাকে দেখা যায় না।

তাকে দেখতে পেলে অনুনয়-বিনয় করেও যদি চেহারা ফেরানো যেত!

শূলে যাওয়ার দিন এদিকে কাছে এল।

.

চার

মস্ত বড় ময়দান।

লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। ডাইনি বুড়ির শূল হবে। রাজা নিজেও উপস্থিত। ডাইনি বুড়ির চোখ দিয়ে জল পড়ছে, সেই দুই হাত জোড় করে কী যেন বলতে চায়, শুধু গোঁ গোঁ শব্দ হয়।

শূলে তাকে উঠানো হবে।

জনতার মধ্যে থেকে কে যেন চিৎকার করে বলল, “থাম থাম, আমার একটা কথা আছে।”

ডাইনি বুড়ি চমকে উঠল।

এই না সেই, যে বলেছিল আয়না নেবে?

সেই লোকটিই এসে দাঁড়াল।

রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “কী চাও?”

সে লোকটি বললে, “আমি আপনার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারি, বলুন আমায় কী দেবেন?”

“আমার মেয়েকে ―?”

রাজা যেন আকাশ থেকে পড়লেন।

“তুমি যা চাইবে, আমি তাই দেব। অজস্র অর্থ, সোনা, রূপা, গহনা, এমনকী আমার অর্ধেক রাজত্ব।”

লোকটি মাথা নাড়লে, “আমি ওসব কিছুই চাইনে রাজা, আমি চাই আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে। বলুন, আপনি বিয়ে দেবেন কী না। যদি দেন, তাহলে আপনার মেয়েকে আমি ফিরিয়ে দেব।”

মন্ত্রী বললেন, “কিন্তু তুমি দীন-দরিদ্র, তোমার হাতে মেয়ে দেওয়া—“

বাধা দিয়ে লোকটি বললে, “বেশ, আমি চলে যাচ্ছি।” রাজা বাধা দিলেন, বললেন, “আমি তোমার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেব, তুমি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও।”

লোকটি বললে, “আপনি সকলের সামনে এ কথাটা বলুন।”

মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় রাজা সকলের সামনে চিৎকার করে বললেন “যদি এই লোকটির দয়ায় আমার মেয়েকে ফিরে পাই, তাহলে এই লোকটির সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব।”

লোকটি আস্তে আস্তে ডাইনি বুড়ির খাঁচার পাশে পঁড়িয়ে একখানা ছোট আয়না খাঁচার ফাঁক দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বললে, “নাও রাজকন্যা, মরে আবার জন্ম পেলে, মনে করে আমার গলায় মালা দিয়ো।”

রাজা ও আর সকলের দিকে ফিরে সে বললে, “আপনারা সকলে চোখ বন্ধ করুন।”

সকলে চোখ বন্ধ করলেন।

প্রথমেই চোখ খুললেন রাজা—এ কী, খাঁচার মধ্যে কোথায় গেল ডাইনী বুড়ি? রাজকন্যা খাঁচার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রণাম করছেন।

“উত্তরা—মা—”

সেই লোকটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল—“প্রতিজ্ঞা মনে রাখবেন মহারাজ!”

.

পাঁচ

রাজ্যময় সমারোহ। রাজকন্যার বিবাহ।

রাজকন্যার মুখ মলিন। দরিদ্র ভিক্ষুকের সঙ্গে বিবাহ, কিন্তু উপায় নেই। পিতাকে প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গ পাপে তিনি ডুবতে দিতে পারেন না।

বিবাহ হয়ে গেল, রাজকন্যা রাগ করে স্বামীর পানে চাননি।

“রাজকন্যা—একবার চাও আমার দিকে।

রাজকন্যা চোখ তুলে চাইলেন। “রাজপুত্র—তুমি—”

কত রাজপুত্রই বিবাহ করতে এসে গর্বিতা রাজকুমারীর গর্বিত কথায় আহত হয়ে ফিরে গেছেন। রাজপুত্র তাদেরই একজন।

রাজপুত্র উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আমিই। তোমার অহঙ্কার আমায় ভারী কষ্ট দিয়েছিল! তোমার এখান থেকে ফিরে আমি আর রাজ্যে যাইনি। এক কাপালিকের শিষ্য হয়েছিলুম। তাঁকে সেবায় তুষ্ট করে তাঁর কাছ থেকে দুখানা আয়না পেয়েছিলুম। এক আয়নায় চেহারা রাক্ষসীর মতো হবে, আর এক আয়নার মুখ দেখলে স্বাভাবিক চেহারা ফিরে আসবে। তোমায় বিকৃত অবস্থায় ফেলে অনেক কষ্ট দিয়েছি রাজকন্যা, আমায় মাপ করো।’

রাজকন্যা বললেন, “আমিও তোমায় আগে কটুকথা বলেছি, আমায় মাপ করো।”

রাজা, রানি পরদিন যখন শুনতে পেলেন তাঁদের জামাই ভিখারি নয়—রাজপুত্র, তখন তাঁদের আনন্দের সীমা রইল না।

সকল অধ্যায়
১.
নিখুঁত মানুষ – লালবিহারী দে
২.
রানি কঙ্কাবতী – ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
৩.
বানর রাজপুত্র – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
ছোট চোর ও বড় – যোগীন্দ্রনাথ সরকার
৫.
ভুতো আর ঘোঁতো – সুখলতা রাও
৬.
চুনির জন্ম – ত্রিভঙ্গ রায়
৭.
ভোঁদড় বাহাদুর – গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৮.
সন্দেশের দেশে – মণীন্দ্রলাল বসু
৯.
মনোবীণা – নরেন্দ্র দেব
১০.
দুধ পাহাড় দধিসায়র – প্রেমেন্দ্র মিত্র
১১.
অস্তপাহাড়ে মানুষের মেয়ে – নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
১২.
মায়া আয়না – প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
১৩.
সেলাইবুড়ি ও আশ্চর্য ছুঁচ – শৈল চক্রবর্তী
১৪.
বন্দিনী রাজকন্যার গল্প – রাধারানী দেবী
১৫.
রামধনুকের রাজপুত্তুর – স্বপনবুড়ো
১৬.
রাজশ্রী – ইন্দিরা দেবী
১৭.
কাঠকন্যা – মৌমাছি
১৮.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড – শৈলেন ঘোষ
১৯.
নতুন দিনের আলো – মনোজকান্তি ঘোষ
২০.
আশ্চর্য আমগাছ – প্রণবকুমার পাল
২১.
কী ভালো মেঘ – উত্থানপদ বিজলী
২২.
যাদুশ্রেষ্ঠ বীরমাণিক্য – অমিতাভ রায়
২৩.
সোনার চাঁপা ফুল – পুণ্ডরীক চক্রবর্তী
২৪.
রাজকুমার বৃষস্কন্ধ আর শ্রীময়ী – নবনীতা দেবসেন
২৫.
একটা আইসকীরিম একটা কাঠবেড়ালীর গল্প – কার্তিক ঘোষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%