আজকের কথা নয়। তা প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমার ঠাকুমা একটা গল্প বলেছিলেন। আমি মন দিয়ে গল্পটি শুনেছিলাম। ভীষণ অবাকও হয়েছিলাম। এতদিন পরে সেই গল্পটি আজ বলছি।
সুহাসপুরে হৃদয়নাথ সরকার নামে এক জমিদার ছিলেন। ভীষণ রাশভারী মানুষ। সবাই ভয় করতো জমিদারকে। প্রজারা ঠিক সময়ে খাজনা দিত বছর বছর। যদি কেউ সময়ে খাজনা দিতে না পারতো সময় দিতেন। কারো উপর কোনদিন অত্যাচার করেন নি। কেউ কেউ বলতো আমাদের জমিদার দয়ালু। কারোর দুঃখের কথা শুনলে মন খারাপ হত। যথাযথ মনে হলে সাহায্য করতেন। কি ছিল না জমিদারের। আম, জাম, লিচু, পেয়ারার বাগান। নারকোল ও সুপুরির বাগান। বড় বড় বিশখানা পুকুর। ছোট ছোট পুকুর কত ছিল তার ইয়ত্তা নেই। হাজার বিঘের বেশি জমি ছিল। মা লক্ষ্মী উজাড় করে দিয়েছে। কোন কিছুর অভাব ছিল না।
সব বাগান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। প্রতিটা বাগানে ছিল বড় গেট। দারোয়ান পাহারা দিত সর্বক্ষণ। তাদের চেহারা ছিল দশাসই। ইয়া বড় গোঁফ। অনেকেই ভয় পেত এই দারোয়ানদের দেখলে।
পাশের গাঁয়ে নদীর ধারে এক ব্রাহ্মণের বাস ছিল। সংসারে বৌ আর এক ছেলে। তিন জনকে নিয়েই সংসার। কোন রকমে ভিক্ষে করে দিন চলে। আগে ব্রাহ্মণ একলাই বেরুত। ছেলেটি বড় হতে মাঝে মাঝে বায়না ধরত সেও যাবে। ছেলেকে সঙ্গে নিত কখনও সখনও। কৃষ্ণ ওদের একমাত্র ছেলে যে।
জমিদারবাবুর বাগানের পাশ দিয়ে যেতে হত ভিক্ষে করতে। ঐ একটাই রাস্তা। কৃষ্ণ বাবার হাত ধরে পথ চলতো আর তাকিয়ে থাকতো আম, জাম, লিচু, পিয়ারা গাছের দিকে। কত বড় বড় আম ঝুলছে। থোকা থোকা লিচু। ডাঁসা পিয়ারা দেখে বাবাকে বলতো কি সুন্দর না! ব্রাহ্মণ চোখ টিপে চুপ করতে বলতো। দারোয়ান শুনতে পেলে তেড়ে আসবে। আবার ঐ রাস্তা দিয়েই ফিরে আসতো ঘরে।
একদিন ব্রাহ্মণের প্রচণ্ড জ্বর। বাবা বেরুতে পারবে না। দেখে কৃষ্ণ বললো, বাবা আজ আমি যাবো। ব্রাহ্মণ রাজী হচ্ছে না কিছুতেই। এখনও সব পথঘাট চিনে উঠতে পারেনি বলেই যত ভয়। কৃষ্ণ বললো, আমি তো তোমার সঙ্গে গিয়ে চিনে ফেলেছি। কোন অসুবিধা হবে না। মা বললো, বাবা যেতে পারবি তো! তোর বাবার তো চলার ক্ষমতা নেই। সাবধানে যাস। কিছু না আনলে আজ উপোষ করে থাকতে হবে। কৃষ্ণ বললো, কোন অসুবিধা হবে না। দেখো না পারি কিনা।
কৃষ্ণ ঝোলা নিয়ে বেরুলো। ওর মা দুগ্গা, দুগ্গা করতে করতে রাস্তা পর্যন্ত এলো। যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ছেলের দিকে। কৃষ্ণতো আনন্দে পথ চলছে। পেছনে যে মা দাঁড়িয়ে সে খেয়াল নেই। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর পথ চলছে।
সেই আম বাগানের পাশে এসে দাঁড়ালো কৃষ্ণ। থোকা থোকা আম ঝুলছে। ছোট্ট মন আনন্দে দুলে উঠলো। বাগানের গেট খোলা ছিল ঢুকলো বাগানে। দারোয়ানের কথা খেয়াল নেই। কি বিশাল বাগান রে বাবা! মনে মনে অবাক হল কৃষ্ণ। গাছের নিচে কয়েকটা আম পড়ে আছে। দারোয়ান ছুটে এলো কৃষ্ণর কাছে।—এই কি চাই। এখানে ঢুকলে কি করে। কৃষ্ণ ভয় পেলো না। বললো, বাবু গেটতো খোলা। তাই ঢুকেছি। কত আম হয়েছে দেখছি। আমি আম নিইনি। দারোয়ান ঝোলাটা হাত দিয়ে দেখলো আম আছে কিনা। নাঃ, একটাও আম নেয়নি। অন্য কেউ হলে আমগুলো কুড়িয়ে নিয়ে পালাত। দারোয়ানের মনটা যেন কেমন হলো। পড়ে থাকা আমগুলো কুড়িয়ে কৃষ্ণকে দিয়ে বললো, এগুলো নিয়ে যা। আর কখনও ঢুকবি না বাগানে।—ঠিক আছে বলে কৃষ্ণ বাগান থেকে বেরুলো খুশিমনে।
আজকে অনেকেই ভিক্ষে দিয়েছে। কেউ বলেছে আহা, এইটুকু ছেলে পথে বেরিয়েছে। কেউ বললো, ওর বাবার জ্বর, তাই বেরিয়েছে। কেউ বললো, না বেরুলে খাবে কি? কেউ দাওয়ায় বসিয়ে খাবার খেতে দিয়েছে। কৃষ্ণও বেশ খুশি। প্রথম ভিক্ষে করতে বেরিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হল। কৃষ্ণর মা জড়িয়ে ধরে বললো, কত কষ্ট আজ হয়েছে আমার ছেলের। ওর বাবাও যেন খুশি হল।
সেদিন কৃষ্ণ আবার গেট খোলা পেয়ে বাগানের ভেতরে এসে দারোয়ানকে খুঁজতে লাগলো। দেখতে না পেয়ে মনটা খারাপ হল। তাহলে গেল কোথায়। এই ভাবতে ভাবতে কখন বাগানের অনেক ভেতরে এসে গেছে খেয়াল নেই। এতবড় বাগান দেখে কৃষ্ণ ঘাবড়ে গেছে। আর বেরুতে পারলে বাঁচে। ভিক্ষে না করলে আজ উপোষ দিতে হবে। একটা গাছের তলায় এসে কাঁদতে লাগলো। তার উপর অঝোর ধারায় বৃষ্টি। গাছটা এতো ঝাঁকড়া যে কৃষ্ণর গায়ে তেমন জল লাগলো না। বৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেল। কৃষ্ণ দেখলো কে যেন আম কুড়োচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে দেখলো একটা মেয়ে আম কুড়োচ্ছে। মেয়েটি বললো, তুমি এখানে কি করে ঢুকলো।—গেট খোলা ছিল ঢুকেছি। আমি কিন্তু আম চুরি করিনি। এই দেখো আমার ঝোলা। চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো কৃষ্ণর। মেয়েটি বললো, তোমাকে আমি আগেও দেখেছি। তুমি যে আম চুরি করনি তা আমি জানি। মেয়েটি কোঁচড় থেকে অনেকগুলো আম কৃষ্ণর ঝোলায় দিল। বললো, আর এই দুটো আম পুঁতে দিও। পাঁচ বছর পর দুটো গাছেই অনেক আম হবে। অনেক অনেক আম। বিক্রী করে প্রচুর টাকা পাবে। আর প্রতিদিন এসো আমবাগানে। আমার কাছ থেকে নিয়ে যেও আম। দারোয়ান তোমায় কিছু বলবে না। তোমার যত খুশি ইচ্ছে আম নিয়ে যেও। সেদিন তেমন ভিক্ষে জোটেনি কৃষ্ণর ঝুলিতে।
মাকে সব কথা বলেছে কৃষ্ণ। বিকেল বেলায় পুঁতে দিয়েছে দুটো আমের আঁটি। কৃষ্ণর মা বললো, খোকা ও যে সে মেয়ে নয়। কোন পরীটরি হবে। তোকে দেখে ওর ভাল লেগেছে। ভেবেছে ছেলেটি খুব সৎ। তাই তোর উপর দয়া করেছে। দেখিস তোর ভাল হবে বাবা।
রাতে কৃষ্ণ স্বপ্ন দেখলো মেয়েটির। মেয়েটির পায়ে নূপুর। ঝুমঝুম করে শব্দ হচ্ছে। হাসিখুশি মুখখানি। রূপের ছটায় চারিদিক আলোয় আলো। বললো, কৃষ্ণ তুমি আমবাগানে প্রতিদিন আসবে। যত ইচ্ছে আম কুড়িয়ে নিয়ে যেও। যেদিন তোমার পোঁতা দুটি গাছে আম ফলবে সেদিন থেকে আর এ বাগানে আসবে না। সারা বছর ধরে তুমি আম পাবে ঐ গাছ দুটোতে! এত আম হবে যে তুমি অবাক হয়ে যাবে। বিক্রী করে প্রচুর টাকা পাবে। তোমাদের আর কোন অভাব থাকবে না। তোমাকে দেখে আমার মায়া হয়েছিল। তাইতো আমি থাকতে না পেরে তোমাকে দেখা দিলাম। তোমার সরল মন আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। জেনেছি দু তোমাদের অভাবের সংসার। পাঁচটা বছর ধৈর্য ধর। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ঘুমোও। ভোর হতে এখনও বাকি। আর হ্যাঁ, যদি কখনও আমায় মনে পড়ে ‘সুহাসিনি পরী’ বলে ডেকো। আজ আসি। আমার কথা যেন কাউকে বলো না। এই বলে হাসতে হাসতে অদৃশ্য হল।
দেখতে দেখতে কৃষ্ণ বড় হয়ে উঠলো। ওদিকে আমগাছ দুটোও বেড়ে উঠেছে তরতর করে। একসময় আম ধরলো গাছে। থোকা থোকা আম। ঐ আজ গাছ দুটিই কৃষ্ণদের ভাগ্য ফিরিয়ে দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন