রাজকুমারীর রূপের তুলনা হয় না। গোলাপফুল লজ্জায় রাজকুমারীর রূপের তুলনা হয় না। গোলাপ ফুল লজ্জায়।
ঝরে যেতে চায়। পদ্মফুল জলের তলে মুখ লুকায়। চোখের পল্লব দুটি তাঁর কেয়াফুলের বুকের নরম কটি পাপড়ির মতো। নাকটি তিলফুলের মতো। গাল দুটির রঙ যেন ডালিমের দানা। আর ঠোঁট দুখানি ডালিম ফুলের মতো টুকটুকে। হাতের আঙুলগুলি যেন চাঁপাফুলের কুঁড়ি সারিবন্দী সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাহুদুটি যেন লতিয়ে ওঠা কমলের মৃণাল। গায়ের রঙের কাছে চৈত্র পূর্ণিমার চাঁদের আলো হার মেনে যায়। ঘন কালো নিবিড় চুলের রাশি দেখে আকাশে শ্রাবণের জলধর মনে ভাবে, পৃথিবীতেও কী সজল ঘন কালো মেঘ উঠেছে?
রাজকুমারীর নাম রূপলক্ষ্মী।
যেমন রূপ, গুণও তাঁর তেমনি। গান গাইতে, বীণা বাজাতে, নৃত্য করতে, নাটকাভিনয় করতে, ছবি আঁকতে, ফুলের মালা গাঁথতে, কবরী রচনা করতে, নানারকম প্রসাধন ও অঙ্গরাগ করতে, কবিতা ও শ্লোক রচনা করতে, চারু ও কারুশিল্প প্রস্তুত করতে, বিচিত্র ও বিবিধ মুখরোচক আহার্য সামগ্রী রন্ধন করতে, লোককে সেবাযত্ন করতে—এককথায়, চৌষট্টিরকম কলাবিদ্যায় সারা পৃথিবীতে তাঁর জুড়ি ছিল না। নামটি তার হয়েছিল তাই সার্থক। রূপও ছিল যেমনি, লক্ষ্মীও ছিলেন তেমনিই।
সারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে রূপলক্ষ্মীর রূপগুণের খ্যাতি। দেশ-দেশান্তর থেকে যত রাজা ও রাজপুত্তুররা আসছে রাজকুমারীর পাণিপ্রার্থী হয়ে। রূপলক্ষ্মীর কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না কাউকেই।
রূপলক্ষ্মীর পিতা রাজা শিখিধ্বজ বললেন, ‘মা! এত বড় বড় সব রাজা আর রাজকুমারদের যে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত হচ্ছে না! তুমি এদের মধ্যে থেকে বেছে নাও যাকে হোক একজনকে।
রূপলক্ষ্মী বললেন, ‘বাবা! তুমি প্রচার করে দাও, রাজকুমারী রূপলক্ষ্মীর মনোবীণা নামে একটি বীণা আছে। যিনি সেই বীণাতন্ত্রীতে বেহাগ সুরে ঝঙ্কার তুলতে পারবেন, তিনি রাজাই হোন আর রাখালই হোন—তাঁরই গলায় রাজকন্যা বরমাল্য দেবেন।’
রাজা শিখিধ্বজ রূপলক্ষ্মীর পণের কাহিনী পৃথিবীময় ঘোষণা করে দিলেন। সারা পৃথিবী থেকে লোক এসে জড়ো হতে লাগল শিখিধ্বজের রাজ্যে।
প্রথমে এলেন দেশ-দেশান্তরের বড় বড় সব ওস্তাদেরা তাঁদের প্রকাণ্ড বীণা, সেতার, সরোদ, তানপুরা প্রভৃতি নিয়ে। তাঁরা বললেন, ‘কোথায় আছে রাজকন্যার মনোবীণা নিয়ে এসো। দিচ্ছি এখনই বেহাগ রাগে মাত করে।’
আনা হল বীণা রাজকুমারীর কাছ থেকে। নরম সবুজ পদ্মপাতায় মোড়া অতি ক্ষুদ্র একটি চন্দনগন্ধী বীণা। ফুলের কোমল পাপড়ি দিয়ে গড়া। তার তন্ত্রীগুলি সোনালি রঙের। কিন্তু তা এত সূক্ষ্ম যে, মাকড়সার জালে যে সরু সূক্ষ্ম সুতো থাকে, ঠিক তারই মতো। এমনি সূক্ষ্ম ও সুকুমার যে, বাতাস লেগে থরথর করে কাঁপছে।
ওস্তাদজিরা বীণা দেখে তো অবাক! কেউ কেউ হেসে গড়াগড়ি। ঐ বীণা তো হাতে করে তুলতে গেলেই ঝরে যাবে। বীণার তন্ত্রীও বাজাবার আগেই ছুঁতে-না-ছুঁতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।
ওস্তাদরা একে একে সবাই হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন। তারপর আবার আসতে লাগলেন কত রাজপুত্তুর, মন্ত্রীপুত্তুর, কোটালপুত্তুর, সওদাগরপুত্তুর। সাত সমুদ্র তের নদীর পার থেকে কত দেশের কত রঙবেরঙের মানুষ।
কেউই রাজকুমারীর মনোবীণায় সুরঝঙ্কার তুলতে পারেন না। তাঁরা হাতে করে অতি সন্তর্পণে যেই বীণাটি ধরতে যান, স্পর্শমাত্র ফুলের পাপড়িগুলি ঝরে ঝরে এলিয়ে পড়ে। বীণার তন্ত্রীগুলি ছোঁবার আগেই নাড়া পেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে হাওয়ায় উড়তে থাকে।
দিনের পর দিন যায়। পৃথিবীশুদ্ধ লোক হার মেনে ফিরে গেল। রূপলক্ষ্মীর মনোবীণা আর বাজল না।
সেদিন ফাল্গুনমাসের দোলপূর্ণিমা তিথি। গভীর নিশুতি রাত উজ্জ্বল জোছনায় একেবারে মায়াময় হয়ে উঠেছে। আকাশের নীল চাঁদোয়ায় অসংখ্যা তারার ফুল ফুটেছে। তার মাঝখানে হাসছেন ষোলকলায় ভরে ওঠা পূর্ণচন্দ্ৰ।
ভোরবেলায় রূপলক্ষ্মী প্রতিদিনকার মতো মালঞ্চের সদ্যফোটা সেরা ফুল বেছে বেছে তারই তাজা পাপড়ি দিয়ে মনোবীণা গড়ে স্নেহময় পিতা শিখিধ্বজের কাছে রেখে এলেন।
শিখিধ্বজ রূপলক্ষ্মীকে ডেকে বললেন, ‘মা! তোমার এতরূপ, এত গুণ সবই কী বৃথা হবে? তোমাকে কোনও বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞীরূপে দেখে চোখ জুড়োব মনে আশা করেছিলাম। কিন্তু তুমি যে পাগলের মতো পণ করেছ। তোমার ওই পণ মানুষের দ্বারা পূর্ণ হবে বলে তো মনে হয় না। তুমি কি শেষকালে চিরজীবন কুমারী হয়েই থাকবে মা?’
রূপলক্ষ্মী হেসে বীণার মতোই মধুর স্বরে বললেন, ‘বাবা! আমার মনোবীণা যদি না বাজে, আমি কারুরই গলায় মালা দিতে পারব না। চিরদিন কুমারী হয়েই থাকব তোমার ঘরে।’
রাজকুমারী সখীদের নিয়ে সেদিন সমস্ত দিন বসন্ত উৎসব করেছেন। সারা রাজবাড়ি, কুসুমউদ্যান, সরোবরের শ্বেতপাথরের ঘাট তখনও আবির কুমকুমের রঙে রাঙা হয়ে আছে। রাত্রিবেলায় ক্লান্ত দেহে রাজকুমারী একলা এসেছেন বিশ্রাম করতে। তাঁর স্ফটিক সরোবরের তীরে বকুল তরুতলে বিছানো শ্বেতমর্মর শিলাসনে! উদ্যানের বাইরে সবুজ প্রান্তর ধু-ধু করছে।
রাজকুমারী আরামে এলিয়ে শুয়ে পড়ে আনমনে ভাবছেন, সত্যিই কি তবে তাঁর মনোবীণা বাজবে না? জগতে কেউ কি বাজাতে পারবে না এ বীণা? চিরদিন কি কুমারী হয়েই থাকতে হবে তাহলে? এমন সময় কানে ভেসে এল সুদূর মাঠের বহুদুর প্রান্ত থেকে অতি করুণ সুরে বাঁশির ধ্বনি।
রাজকুমারী বাঁশি শুনে চকিত হয়ে উঠলেন। ক্রমে সেই বাঁশির শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল। আহা-হা! কী সুমধুর সুর! মনে হতে লাগল যেন, সেই সুরঝঙ্কারে পূর্ণিমার জোছনা মুর্ছিত হয়ে পড়ছে! আকাশ আকুল হয়ে পৃথিবীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে! পূর্ণচন্দ্র তাঁর তারা সভা নিয়ে মুগ্ধবিস্ময়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন! নদীর স্রোত বন্ধ হয়ে গেছে! পাপিয়ার ঝঙ্কার বন্ধ হয়ে গেছে। আকাশ, বাতাস, পৃথিবী সবই আজ ফাল্গুন পূর্ণিমার নিশুতি রাতে সেই সুরের সাগরে ডুবে যাচ্ছে!
রাজকন্যা স্বপ্নাবিষ্টের মতো উঠে দাঁড়িয়ে সেই বাঁশির সুর লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন। তাঁর দুই চোখে মুক্তোধারার মতো আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
প্রাসাদের উদ্যান ছেড়ে বেরিয়ে রাজকুমারী সেই মুক্ত প্রান্তরে এসে দাঁড়ালেন। সামনেই দেখতে পেলেন এক কিশোর রাখাল বালককে। হাতে তার রেশমি ঝালর ঝোলানো বেনু। গলায় বনফুলের মালা। তার চোখদুটির মধ্যে যেন বিশ্বের স্বপ্নমায়া জড়ানো রয়েছে।
রাজকুমারী তার সামনে এসে মুখের পানে বিহ্বল হয়ে খানিক তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘কে তুমি রাখাল? জীবনে আজ প্রথম চোখে আমার জল ঝরালে? তুমি যেই হও, তোমারই গলায় আমার বরণমালা দেব।’
হঠাৎ পিছন থেকে রূপলক্ষ্মীর সখী বসন্তসেনা বলে উঠল, ‘সে কী সখী! তুমি যে পণ করেছ, তোমার মনোবীণা যে বাজাতে পারবে তাকেই তুমি মালা দেবে!’
রাজকুমারী চমকে পিছন ফিরে চেয়ে দেখলেন, বসন্তসেনা এসেছে। সঙ্গে সখীরা।
সখীরা সবাই এসে বললে, ‘রাজকুমারী, মহারাজা আদেশ করেছেন, আপনি শীঘ্র তাঁর কাছে চলুন। আপনার গড়া মনোবীণায় নাকি আপনা-আপনি মধুর সুরে বেহাগ রাগিণী বাজছে!’
রূপলক্ষ্মী এ কথা শুনে আকুল হয়ে কেঁদে লুটিয়ে পড়ে বললেন, ‘হায়! হায়! এতদিন মনোবীণা বাজল না। আর আজ বাজল? আমি কী করে এখন অন্যলোকের গলায় মালা দেব?’
বেণু হাতে কিশোর রাখাল এগিয়ে এসে বললে, ‘চলুন না রাজকুমারী, দেখাই যাক বীণা কে বাজিয়েছে? তারপর না হয় ব্যবস্থা হবে।’
রূপলক্ষ্মী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘না রাখাল, না। আর কোনও ব্যবস্থা হবার উপায় নেই। কিন্তু আমি কী করব রাখাল! মন যে চাইছে আমার এই গজমোতি হার তোমার গলায় পরিয়ে দিয়ে তোমার এই বনফুলের মালা আমার গলায় পরি।’
পিছন থেকে সখীরা বলে উঠল, ‘ছি ছি রাজকুমারী! রাখালের গলায় মালা দেবে কী? তুমি না পৃথিবীর সেরা রূপসী-রাজকন্যা রূপলক্ষ্মী? তোমার পণের কথা মনে রেখো। চলো, চলো। প্রাসাদে মহারাজা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
রাজকুমারী চোখের জলে ভাসতে ভাসতে প্রাসাদে ফিরে গেলেন।
রাজা শিখিধ্বজ মেয়েকে দেখে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘মা! এক আশ্চর্য কাণ্ড হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে তোমার মনোবীণা আপনিই বেহাগ সুরে বেজে উঠেছিল। কিন্তু এখন আবার থেমে গেছে। কে যে বাজালে তা বুঝতে পারছি না।’
এমন সময় সেই ঘরের মধ্যে এক গৌরবর্ণ প্রিয়দর্শন তরুণ এসে প্রবেশ করল। তার গায়ে সোনালি উত্তরীয়। হাতে রজতাবরণ একটি পুঁথি। রাজা তাকে দেখেই বললেন,
‘এ কী মহাকবি দেবদূত যে! আপনি এ সময়ে কোথা থেকে এলেন? বসন্তনগরের সমস্ত কল্যাণ তো?’
দেবদূত উত্তর না দিয়ে তাঁর পুঁথি খুলে কবিতা পড়তে শুরু করলেন। অমনি মনোবীণার ফুলগুলি সুগন্ধে ভুরভুর হয়ে উঠল। তার সূক্ষ্ম তন্ত্রীতে টুং টাং শব্দে ধ্বনি উঠতে লাগল।
রাজা বললেন, ‘কিন্তু কবি! একটু আগে এতে বেহাগ রাগিণী বেজেছিল। বেহাগ না বাজলে তো রাজকন্যাকে পাবেন না!”
কবি দেবদূত হেসে উত্তরীয়ের মধ্য হতে বাঁশিটি বের করে বাজাতে শুরু করলেন। সেই বাঁশির বেহাগ সুরে সুর মিলিয়ে মনোবীণাও বাজতে লাগল।
রাজকুমারী রূপলক্ষ্মী এগিয়ে এসে বেণুবাদকের কণ্ঠে বরণমালা পরিয়ে দিলেন। সখীরা উলুধ্বনি দিল। শাঁখ বাজাল।
রাজকুমারীর তখন এক চোখে অশ্রু, অন্য চোখে হাসি। তিনি রাখালকে চিনতে পেরে পুলক-গদগদ কণ্ঠে বললেন, ‘বিশ্বকবি দেবদূত, তুমিই কী সেই রাখাল?’
বিশ্বকবি দেবদূত কিছু না বলে শুধু নিজের গলার পুষ্পরঙিন বনমালা খুলে রাজকুমারীর রাজহংসীর মতো কোমল কণ্ঠে সাদরে পরিয়ে দিলেন।
বসন্ত পূর্ণিমার ফাল্গুনী রজনী রূপলক্ষ্মীর বিবাহ-উৎসব রজনীতে পরিণত হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন