রানি কঙ্কাবতী – ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

রানি কঙ্কাবতী – ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

নৌকার সহিত কঙ্কাবতী ডুবিয়া গেলেন। কঙ্কাবতী জলের ভিতর ক্রমেই ডুবিতে লাগিলেন। ক্রমেই নীচে যাইতে লাগিলেন। যাইতে যাইতে অনেক দূর চলিয়া গেলেন। তখন নদীর যত মাছ সব একত্র হইল। নদীর ভিতর মহাকোলাহল পড়িয়া গেল যে, “কঙ্কাবতী আসিতেছেন।” রুই বলে, “কঙ্কাবতী আসিতেছেন।” পুঁটি বলে, “কঙ্কাবতী আসিতেছেন।” সবাই বলে “কঙ্কাবতী আসিতেছেন।” পথপানে এক দৃষ্টে চাহিয়া জলচর জীব-জন্তু সব যেখানে দাঁড়াইয়া ছিল, ক্রমে কঙ্কাবতী আসিয়া সেইখানে উপস্থিত হইলেন। সকলেই কঙ্কাবতীকে আদর করিল। সকলেই বলিল,—“এসো এসো, কঙ্কাবতী এসো।”

মাছেদের ছেলেমেয়েরা বলিল,—“আমরা কঙ্কাবতীর সঙ্গে খেলা করিব।”

বৃদ্ধা কাতলা মাছ তাহাদিগকে ধমক দিয়া বলিলেন,—“কঙ্কাবতীর এ খেলা করিবার সময় নয়। বাছার বড় গায়ের জ্বালা দেখিয়া আমি কঙ্কাবতীকে ঘাট হইতে ডাকিয়া আনিলাম। আহা কত পথ আসিতে হইয়াছে। বাছার আমার মুখ শুকাইয়া গিয়াছে! এসো মা, তুমি আমার কাছে এসো। একটু বিশ্রাম করো; তার পর তোমার একটা বিলি করা চাইবে।”

কঙ্কাবতী আস্তে আস্তে কাতলা মাছের নিকট গিয়া বসিলেন।

এদিকে কঙ্কাবতী বিশ্রাম করিতে লাগিলেন, ওদিকে চলচর জীব-জন্তুগণ মহাসমারোহে একটি সভা করিলেন। তপস্বী মাছের দাড়ি আছে দেখিয়া, সকলে তাঁহাকে সভাপতিরূপে বরণ করিলেন। “কঙ্কাবতীকে লইয়া কী করা যায়,” সভায় এই কথা লইয়া বাদানুবাদ হইতে লাগিল।

অনেক বক্তৃতার পর, চতুর বাটা মাছ প্রস্তাব করিলেন, “এসো ভাই! কঙ্কাবতীকে আমরা আমাদের রানি করি।”

এই কথাটি সকলের মনোনীত হইল। চারিদিকে জয়ধ্বনি উঠিল। জলের ভিতর পথে ঘাটে ট্যাটরা পড়িল যে, “কঙ্কাবতী মাছেদের রানি হইবেন।”

মাছেদের আর আনন্দের পরিসীমা নাই। সকলেই বলাবলি করিতে লাগিল যে, “ভাই! কঙ্কাবতী আমাদের রানি হইলে আর আমাদের কোনও ভাবনা থাকিবে না।  বড়শি দিয়া আমাদিগকে কেহ গাঁথিলে, হাত দিয়া কঙ্কাবতী সুতাটি ছিঁড়িয়া দিবেন। জেলেরা জাল ফেলিলে, ছুরি দিয়া কঙ্কাবতী জালটি কাটিয়া দিবেন। কঙ্কাবতী রানি হইলে আর আমাদের কোনও ভয় থাকিবে না। এসো, এখন সকলে কঙ্কাবতীর কাছে যাই, আর কঙ্কাবতীকে গিয়া বলি যে, ‘কঙ্কাবতী, তোমাকে আমাদের রানি হইতে হইবে’।”

এইরূপ পরামর্শ করিয়া মাছেরা কঙ্কাবতীর কাছে যাইল, আর সকলে বলিল,—“কঙ্কাবতী! তোমাকে আমাদের রানি হইতে হইবে।”

কঙ্কাবতী বলিলেন, “এখন আমি তোমাদের রানি হইতে পারিব না। আমার শরীরে সুখ নাই, আমার মনেও বড় অসুখ। তাই এখন আমি তোমাদের রানি হইতে পারিব না।”

এই কথা শুনিয়া বৃদ্ধা কাতলানী মৎস্যদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা সভা তো করিলে, বক্তৃতা তো অনেক করিলে, বিধিমত কঙ্কাবতীকে “ভোট দিয়াছ?”

মাছেরা উত্তর করিল, “না, কৈ কঙ্কাবতীকে বিধিমতো ভোট দেওয়া হয় নাই। আমরা ভুলিয়া গিয়াছি।”

কাতলানি বলিলেন, “তবে? ভোট না পাইলে কঙ্কাবতী রানি হইবে কেন?”

তখন মাছেরা সব বলিল,—“ওহো! বুঝেছি বুঝেছি! ভোট না পাইলে কঙ্কাবতী রানি হইবে না। এসো আমরা সকলে কঙ্কাবতীকে ভোট দিই।”

এই বলিয়া যত মাছ কঙ্কাবতীকে ভোট দিতে আরম্ভ করিল। অবশেষে তাহারা ভোটের হাঁড়িটা কঙ্কাবতীর সম্মুখে লইয়া গেল। হাঁড়ির মুখে যে ন্যাকড়াখানি বাঁধা ছিল, তাহা খুলিয়া বলিল,—“দেখ দেখ, কঙ্কাবতী! কত ভোট পাইয়াছ! এখন আর বলিতে পারিবে না যে তোমাদের রানি হব না!”

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন, “না গো না! ভোটের জন্য নয়। আমি এখন তোমাদের রানি হইতে পারিব না। আমার যা হইয়াছে, তা আমিই জানি।”

“তোমরা তখন কাতলানি পুনরায় বলিলেন, রাজপোশাক প্রস্তুত করিয়াছ? রাজপোশাক না পাইলে কঙ্কাবতী তোমাদের রানি হইবে কেন?”

এই কথা শুনিয়া মাছেরা সব বলিল,—“ও হো! বুঝেছি! রাজপোশাক না পাইলে রানি হইবে না। রাঙা কাপড় চাই, মেমের মতো পোশাক চাই, তবে কঙ্কাবতী রানি হইবে।”

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন, “না গো না! রাঙা কাপড়ের জন্য নয়। সাজিবার গুজিবার সাধ আর আমার নাই। একেলা বসিয়া কেবল কাঁদি, এখন আমার এই সাধ।”

তখন কাতলানি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা রাজার ঠিক করিয়াছ? রাজা না পাইলে কঙ্কাবতী রানি কী করিয়া হয়। তাই একেলা বসিয়া কঙ্কাবতীর কাঁদিতে সাধ হইয়াছে।”

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–”তা নয় গো, তা নয়! আমার রাজায় কাজ নাই। আমি দুঃখিনী কঙ্কাবতী। প্রাণের জ্বালা জুড়াইতে তোমাদের এই জলের ভিতর আসিয়াছি।”

কাতলানি তখন ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “রাজা চাই না বটে? আর যদি খেতুকে রাজা করি?”

চমকিত হইয়া কঙ্কাবতী কাতলানির মুখপানে চাহিলেন তিনি ভাবিলেন,–”এই নদীর মাঝখানে, এত গভীর জলের ভিতরেও এ সংবাদ আসিয়াছে!”

কাতলানি তাঁহার মনের ভাব বুঝিতে পারিলেন, আর বলিলেন,—“ তোমরা মনে কর, মাছেরা কিছু জানে না, মাছেদের কেবল ধরিয়া খাইতে হয়। শুধু তা নয়,

কঙ্কাবতী! শুধু তা নয়। আমরাও কিছু কিছু সংবাদ রাখিয়া থাকি। ঘাটে যখন চরিতে যাই, যখন তোমাদের মেয়েতে মেয়েতে কথা হয়, তখন আমরাও এক আধটা কথা কান পাতিয়া শুনি। যাও মা! এখন উঠ, গিয়া পোশাক পর, রানি হও, কাঁদিও না।”

বৃদ্ধা কাতলা মাছের প্রবোধ বাক্য শুনিয়া কঙ্কাবতীর মন অনেকটা সুস্থ হইল।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ভালো! না হয় আমি তোমাদের রানি হইলাম। এখন আমাকে করিতে হইবে কী?”

মাছেরা উত্তর করিল,–”করিতে হইবে কী? কেন? দরজির বাড়ি যাইতে হইবে, গায়ের মাপ দিতে হইবে, পোশাক পরিতে হইবে।”

সকলে তখন কাঁকড়াকে বলিলেন,—“কাঁকড়া মহাশয়! আপনি জলেও চলিতে পারেন, স্থলেও চলিতে পারেন। আপনি বুদ্ধিমান লোক। চক্ষু দুটি যখন আপনি পিট্ পিট্‌ করেন, বুদ্ধির আভা তখন তাহার ভিতর চিক্ টিক্ করিতে থাকে। কঙ্কাবতীকে সঙ্গে লইয়া আপনি দরজির বাড়ি গমন করুন। ঠিক করিয়া কঙ্কাবতীর গায়ের মাপটি দিবেন, দামি কাপড়ের জামা করিতে বলিলেন। কচ্ছপের পিঠে বোঝাই দিয়া টাকা মোহর লইয়া যান। যত টাকা লাগে, তত টাকা দিয়া, কঙ্কাবতীর ভাল কাপড় করিয়া দিবেন।”

কাঁকড়া মহাশয় উত্তর করিলেন, “অবশ্যই আমি যাইব। কঙ্কাবতীর ভাল কাপড় হয়, ইহাতে কার না আহ্লাদ? আমাদের রানিকে ভাল করিয়া না সাজাইলে গুজাইলে, আমাদেরই অখ্যাতি। তোমরা কচ্ছপের পিঠে টাকা মোহর বোঝাই দাও, আমি ততক্ষণ ঘর হইতে পোশাকি কাপড় পরিয়া আসি, আর মাথার মাঝে সিঁথি কাটিয়া আমার চুলগুলি বেশ ভাল করিয়া ফিরাইয়া আসি।”

কচ্ছপের পিঠে টাকা মোহর বোঝাই দেওয়া হইল। ততক্ষণ কাঁকড়া মহাশয় ভাল কাপড় পরিয়া মাথা আঁচড়াইয়া, ফিট্‌-ফাট হইয়া আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

.

কঙ্কাবতী করেন কী? সকলের অনুরোধে তাঁহাদের সঙ্গে চলিলেন। কাঁকড়া মহাশয় আগে, কঙ্কাবতী মাঝখানে, কচ্ছপ পশ্চাতে, এইরূপে তিন জনে যাইতে লাগিলেন।

প্রথমে অনেক দূর জলপথে যাইলেন, তাহার পর অনেক দূর স্থলপথে যাইলেন। পাহাড়, পর্বত, বন, জঙ্গল, অতিক্রম করিয়া অবশেষে বুড়ো দরজির বাড়িতে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

বুড়ো জি চশমা নাকে দিয়া কাঁচি হাতে করিয়া কাপড় সেলাই করিতেছিলেন। দূর পাহাড় পানে চাহিয়া দেখিলেন যে, তিন জন কাহারা আসিতেছে। মনে মনে ভাবিলেন, “ও কারা আসে?” নিকটে আসিলে চিনিতে পারিলেন।

তখন বুড়ো দরজি বলিলেন,—“কে ও কাঁকড়া ভায়া?”

কাঁকড়া মহাশায় উত্তর করিলেন,—“হ্যাঁ দাদা! কেমন, ভাল আছ তো?”

দরজি বলিলেন, “আর ভাই! আমাদের আর ভাল থাকা না থাকা! এখন গেলেই হয়। তোমরা সৌখীন পুরুষ, তোমাদের কথা স্বতন্ত্র। এখন কী মনে করিয়া আসিয়াছ, বল দেখি?”

কাঁকড়া উত্তর করিলেন, “এই কঙ্কাবতীকে আমরা আমাদের রানি করিয়াছি। কঙ্কাবতীর জন্য ভাল জামা চাই, তাই তোমার নিকট আসিয়াছি।”

দরজি বলিলেন,—“বটে! তা আমার নিকট উত্তম জামা আছে। ভাল পাটনাই খেরোর জামা আছে। টক্-টকে লাল খেরো, রঙ উঠিতে জানে না, ছিঁড়িতে জানে না, আগাগোড়া আমি বখেয়া দিয়া সেলাই করিয়াছি। তোমাদের রানি কঙ্কাবতী যদি শিমুল তুলা হয়, তো পরাও, অতি উত্তম দেখাইবে। দামের জন্য আটকাইবে না। এখন টিপিয়া দেখ দেখি? কঙ্কাবতী শিমুল তুলা কী না?”

দাড়া দিয়া কাঁকড়া মহাশয় কঙ্কাবতীর গা টিপিয়া দেখিলেন। তাহার পর দরজির পানে চাহিয়া বলিলেন,—“কই না! সেরূপ নরম তো নয়!”

দরজি বলিলেন,—“তাই তো! আচ্ছা ফুঁ দিয়া দেখ দেখি?”

কাঁকড়া মহাশয় কঙ্কাবতীর গায়ে ফুঁ দিয়া দেখিলেন। তাহার পর দরজির পানে চাহিয়া পুনরায় বলিলেন,—“কই না! উড়িয়া তো গেল না?”

দরজি বলিলেন, “তাই তো! আচ্ছা! দেখ দেখি, যদি ছোবড়া হয়? ছোবড়া হইলেও কাজ চলিবে।”

কঙ্কাবতী বলিলেন,–“খেরোর খোল পরাইয়া তোমরা আমাকে বালিশ করিবে না কি? এই, সকলে মিলিয়া আমাকে রানি করলে, তবে আবার বালিশ করিবার পরামর্শ করিতেছ কেন?”

দরজি উত্তর করিলেন,—“ঈশ্! মেয়ের যে আম্বা ভারি! বালিশ হ’বে না তো কী তাকিয়া হইতে চাও না কি?”

দরজির এইরূপ নিষ্ঠুর বচনে কঙ্কাবতীর মনে বড় দুঃখ হইল, কঙ্কাবতী কাঁদিতে লাগিলেন।

কাঁকড়া মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,–”তুমি ছেলেমানুষ! আমাদের কথায় কথা কও কেন বল দেখি? যা তোমার পক্ষে ভাল তাই আমরা করিতেছি, চুপ করিয়া দেখ। চুপ কর; কাঁদিতে নাই।”

এইরূপ সান্ত্বনা-বাক্য বলিয়া কাঁকড়া মহাশয় আপনার বড় দাড়া দিয়া কঙ্কাবতীর মুখ মুছাইয়া দিলেন। তাহাতে কঙ্কাবতীর মুখ ছড়িয়া গেল।

কঙ্কাবতীর কান্না থামিলে, পুনরায় কাঁকড়া মহাশয় ভাল করিয়া কঙ্কাবতীর গা টিপিয়া টিপিয়া দেখিলেন ও দেখিয়া দরজিকে বলিলেন,—“না! এ ছোবড়াও নয়।”

বুড়ো দরজি বলিলেন,—“তাই তো! তবে এর গায়ের জামা আমার কাছে নাই। এর জামা আমি কাটিতেও জানি না, সেলাই করিতেও জানি না। যদি তুমি শিমুল তুলা হইতে, অভাবপক্ষে ছোবড়াও হইতে তাহা হইলে কেমন জামা পরাইয়া দিতাম। তা তোমার কপালে নাই, আমি কি করিব?”

কাঁকড়া মহাশয় বলিলেন,—“তবে এখন উপায়? ভাল জামা কোথায় পাই?”

বুড়ো দরজি বলিলেন,—তুমি এক কাজ কর, তুমি খলিফা সাহেবের কাছে যাও। খলিফা সাহেব ভাল কারিগর। খলিফা সাহেবের মতো কারিগর এ পৃথিবীতে নাই, তাহার কাছে নানাবিধ কাপড় আছে, সে কাপড় পরিলে খাঁদারও নাক হয়।”

এই কথায় কাঁকড়া মহাশয়ের রাগ হইল। তিনি বলিলেন,—“তুমি কী আমাকে ঠাট্টা করিতেছ না কি? তোমার না হয় নাকটি একটু বড়, আমার না হয় নাকটি ছোট, তাতে আবার অত ঠাট্টা কীসের?”

বুড়ো দরজি উত্তর করিলেন,—“না না! তা কি কখনও হয়? তোমাকে আমি কি ঠাট্টা করিতে পারি? কেন? তোমার নাকটি মন্দ কী? কেবল দেখিতে পাওয়া যায় না, এই দুঃখের বিষয়।”

বুড়ো দরজির এইরূপ প্রিয় বচনে কাঁকড়া মহাশয়ের রাগ পড়িল। সন্তোষ লাভ করিয়া তিনি উত্তর করিলেন, “তা বটে! তা বটে! আমার নাকটি ভাল, তবে দোষের মধ্যে এই যে, দেখিতে পাওয়া যায় না। কোথায় আছে, আমি নিজেই খুঁজিয়া পাই না! যদি দেখিতে পাওয়া যাইত, তাহা হইলে আমার নাক দেখিয়া সকলেই প্রশংসা করিত, সকলেই বলিত, ‘আহা! কাঁকড়ার কী নাক! যেন বাঁশির মতো?’ আর যারা ছড়া বাঁধে, তারা লিখিত,—’তিল ফুল জিনি নাসা!’ ‘কিম্বা শুকচঞ্চু মতো নাসা!’ যা বলো, যা কও, আমার অতি সুন্দর নাক।”

কঙ্কাবতী ভাবিলেন, “ব্যাপারখানা কী? আমি দেখিতেছি সব পাগলের হাতে পড়িয়াছি। এ কাঁকড়াটা তো বদ্ধ পাগল। এরে পাগলা গারদে রাখা উচিত।” মুখ ফুটিয়া কিন্তু কঙ্কাবতী কিছু বলিলেন না।

সকলে পুনরায় সেখান হইতে চলিলেন। আগে কাঁকড়া মহাশয়, তাহার পর কঙ্কাবতী, শেষে কচ্ছপ। এইরূপে তিনজনে যাইতে লাগিলেন। যাইতে যাইতে অনেক দূর গিয়া অবশেষে খলিফা সাহেবের ঘরে উপস্থিত হইলেন। খলিফা তখন অন্দরমহলে ছিলেন।

কাঁকড়া মহাশয় বাহির হইতে ডাকিলেন, “খলিফা সাহেব! খলিফা সাহেব!”

ভিতর হইতে খলিফা উত্তর দিলেন,—”কে হে! কে ডাকাডাকি করে?”

কাঁকড়া মহাশয় উত্তর করিলেন,—“আমি কাঁকড়াচন্দ্র! একবার বাহিরে আসুন, বিশেষ কাজ আছে।”

খলিফা বাহিরে আসিলেন। কাঁকড়াচন্দ্রকে দেখিয়া অতি সমাদরে তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিলেন।

খলিফা বলিলেন,– “আসুন, আসুন, কাঁকড়াবাবু আসুন! আর এই যে কচ্ছপবাবুকেও দেখিতেছি! কচ্ছপবাবু! আপনি ঐ টুলটিতে বসুন, আর কাঁকড়াবাবু! আপনি ঐ চেয়ারখানি নিন্। এ মেয়েটিকে বসিতে দিই কোথায়? দিব্য মেয়েটি! কাঁকড়া বাবু! এ কন্যাটি কি আপনার?”

কাঁকড়াচন্দ্র উত্তর করিলেন, “না, এ কন্যাটি আমার নয়, আমি বিবাহ করি নাই। ওঁর জন্যই এখানে আসিয়াছি। ওঁরে আমরা আমাদের রানি করিয়াছি। এক্ষণে রাজপরিচ্ছদের প্রয়োজন। তাই আপনার নিকট আসিয়াছি। এঁর জন্য অতি উত্তম রাজপরিচ্ছদ প্রস্তুত করিয়া দিতে হইবে।”

খলিফা উত্তর করিলেন, “রাজ পরিচ্ছদ প্রস্তুত করিতে পারি। আমার কাছে রেশম আছে, পশম আছে, সার্টিন আছে, মায় বারাণসী কিংখাব পর্যন্ত আছে। কিন্তু রাজপোশাক তো আর অমনি হয় না? তাতে হীরা বসাইতে হ ইবে, মতি বসাইতে হইবে, জরি লেস্ প্রভৃতি ভাল ভাল দ্রব্য লাগাইতে হইবে। অনেক টাকা খরচ হইবে। টাকা দিতে পারিবেন তো?”

কাঁকড়াচন্দ্র হাসিয়া বলিলেন,—“আমাদের টাকার অভাব কী? যত নৌকা ডুবি হয়, তাহাতে যে টাকা থাকে, সে সব কোথায় যায়? সে সকল আমাদের প্রাপ্য। এক্ষণে আপার কত টাকা চাই, তা বলুন?”

খলিফা উত্তর করিলেন, “যদি দুই তোড়া টাকা দিতে পারেন, তাহা হইলে উত্তম রাজপোশাক প্রস্তুত করিয়া দিতে পারি।”

কাঁকড়া তৎক্ষণাৎ কচ্ছপের পিঠ হইতে লইয়া দুই তোড়া মোহর খলিফার সম্মুখে ফেলিয়া দিলেন। খলিফা অনেক রাজার পোশাক, অনেক বাবুর পোশাক, অনেক বরের পোশাক প্রস্তুত করিয়াছিলেন। কিন্তু একবারে দুই তোড়া মোহর কেহ কখনও তাঁহাকে দেয় নাই।

মোহর দেখিয়া কঙ্কাবতী ব্যাকুল হইয়া বলিলেন, “ও গো! তোমরা ও টাকাগুলি আমাকে দাও না? আমি বাড়ি লইয়া যাই। আমার বাবা বড় টাকা ভালবাসেন, এত টাকা পাইলে বাবা কত আহ্লাদ করিবেন। এই ময়লা কাপড় পরিয়াই আমি না হয় তোমাদের রানি হইব, ভাল কাপড়ে আমার কাজ নাই। তোমাদের পায়ে পড়ি, এই টাকাগুলি আমাকে দাও, আমি বাবাকে গিয়া দিই।”

কাঁকড়া কঙ্কাবতীকে বকিয়া উঠিলেন। কাঁকড়া বলিলেন,—“তুমি তো বড় অবাধ্য মেয়ে দেখিতেছি! একবার তোমাকে মানা করিয়াছি যে, তুমি ছেলেমানুষ আমাদের কথায় কথা কহিও না। চুপ করিয় দেখ, আমরা কী করি।”

কী করিবেন? কঙ্কাবতী চুপ করিয়া রহিলেন। মোহর পাইয়া খলিফার আর আনন্দের পরিসীমা রহিল না। তিনি বলিলেন,—“টাকাগুলি বাড়ির ভিতর রাখিয়া আসি, আর ভাল ভাল কাপড় বাহির করিয়া আনি। এইক্ষণেই তোমাদের রানির রাজবস্তু করিয়া দিব।”

বাটীর ভতির খলিফা দুই তোড়া মোহর লইয়া যাইলেন। আহ্লাদে পুলকিত হইয়া দত্তপার্টি বাহির করিয়া এক গাল হাসির সহিত সেই মোহর স্ত্রীকে দেখাইতে লাগিলেন।

স্ত্রী অবাক্! কী আশ্চর্য! “আজ সকাল বেলা আমরা কার মুখ দেখিয়া উঠিয়াছিলাম?” খলিফানি এইরূপ ভাবিতে লাগিলেন। অবশেষে প্রকাশ্যে খলিফানি বলিলেন, “এবার কিন্তু আমাকে ডায়মনকাটা তাবীজ গড়াইয়া দিতে হইবে।”

তাহার পর খলিফা কঙ্কাবতীকে বাটীর ভিতর লইয়া গেলেন। স্ত্রীকে বলিলেন, “ইনি রানি। এঁর নাম কঙ্কাবতী। এঁর জন্য রাজপরিচ্ছদ প্রস্তুত করিতে হইবে। অতি সাবধানে তুমি ইঁহার গায়ের মাপ লও।”

খলিফানি কঙ্কাবতীর গায়ের মাপ লইলেন। অনেক লোক নিযুক্ত করিয়া অতি সত্ত্বর খলিফা রাজবস্ত্র প্রস্তুত করিয়া ফেলিলেন। খলিফা-রমণী যত্নে সেই পোশাক কঙ্কাবতীকে পরাইয়া দিলেন। রাজপরিচ্ছদ পরিধান করিয়া কঙ্কাবতীর রূপ ফাটিয়া পড়িতে লাগিল।

খলিফা-রমণী বলিলেন, “আহা! মরি কী রূপ!”

খলিফা বলিলেন,—“মরি, কী রূপ!”

সকলেই বলিলেন,—“মরি, কী রূপ!”

রাজপরিচ্ছদ পরা হইলে কাঁকড়া ও কচ্ছপ, কঙ্কাবতীকে লইয়া পুনরায় গৃহাভিমুখে চলিলেন। অনেক স্থল অনেক জল অতিক্রম করিয়া তিন জনে পুনরায় নদীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। সেখানে উপস্থিত হইলে কঙ্কাবতীর মনোহর রূপ, মনোহর পরিচ্ছদ দেখিয়া, সকলেই চমৎকৃত হইল। সকলেই ‘ধন্য ধন্য’ করিতে লাগিল। সকলেই বলিল,—“আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, আমরা কঙ্কাবতী হেন রানি পাইলাম।”

এক্ষণে একটি মহা ভাবনার বিষয় উপস্থিত হইল। জলচর জীবগণের এখন এই ভাবনা হইল যে, রানি থাকেন কোথায়?… যে সে রানি নয়, কঙ্কাবতী রানি! যেরূপ জগৎসুশোভিনী মনোমোহিনী কঙ্কাবতী রানি সেইরূপ সুসজ্জিত, অলঙ্কৃত, মনোমোহিত অট্টালিকা চাই। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অবশেষে সকলে স্থির করিলেন যে, রানি কঙ্কাবতীর নিমিত্ত মোতিমহলই উপযুক্ত স্থান। যাহাতে মোতি বলে, তাহাকেই মুক্তা বলে। মুক্তার যথায় উৎপত্তি, মুক্তার যথায় স্থিতি, সেই স্থানকে ‘মোতিমহল’ বলে।

রুই প্রভৃতি মৎস্যগণ জোড়হাত করিয়া কঙ্কাবতীকে বলিলেন,—“মহারানি! মোতিমহল আপনার বাসের উপযুক্ত স্থান, আপনি ঐ মোতিমহলে গিয়া বাস করুন।”

এইরূপে সসম্ভ্রমে সম্ভাষণ করিয়া মাছেরা কঙ্কাবতীকে একটি ঝিনুক দেখাইয়া দিল। ঝিনুকের ভিতর মুক্তা হয় বলিয়া, ঝিনুকের নাম মোতিমহল। কঙ্কাবতী সেই ঝিনুকের ভিতর প্রবেশ করিলেন। ঝিনুকের ভিতর বাস করিয়া কঙ্কাবতী মাছেদের রানিগিরি করিতে লাগিলেন।

সকল অধ্যায়
১.
নিখুঁত মানুষ – লালবিহারী দে
২.
রানি কঙ্কাবতী – ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
৩.
বানর রাজপুত্র – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
ছোট চোর ও বড় – যোগীন্দ্রনাথ সরকার
৫.
ভুতো আর ঘোঁতো – সুখলতা রাও
৬.
চুনির জন্ম – ত্রিভঙ্গ রায়
৭.
ভোঁদড় বাহাদুর – গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৮.
সন্দেশের দেশে – মণীন্দ্রলাল বসু
৯.
মনোবীণা – নরেন্দ্র দেব
১০.
দুধ পাহাড় দধিসায়র – প্রেমেন্দ্র মিত্র
১১.
অস্তপাহাড়ে মানুষের মেয়ে – নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
১২.
মায়া আয়না – প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
১৩.
সেলাইবুড়ি ও আশ্চর্য ছুঁচ – শৈল চক্রবর্তী
১৪.
বন্দিনী রাজকন্যার গল্প – রাধারানী দেবী
১৫.
রামধনুকের রাজপুত্তুর – স্বপনবুড়ো
১৬.
রাজশ্রী – ইন্দিরা দেবী
১৭.
কাঠকন্যা – মৌমাছি
১৮.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড – শৈলেন ঘোষ
১৯.
নতুন দিনের আলো – মনোজকান্তি ঘোষ
২০.
আশ্চর্য আমগাছ – প্রণবকুমার পাল
২১.
কী ভালো মেঘ – উত্থানপদ বিজলী
২২.
যাদুশ্রেষ্ঠ বীরমাণিক্য – অমিতাভ রায়
২৩.
সোনার চাঁপা ফুল – পুণ্ডরীক চক্রবর্তী
২৪.
রাজকুমার বৃষস্কন্ধ আর শ্রীময়ী – নবনীতা দেবসেন
২৫.
একটা আইসকীরিম একটা কাঠবেড়ালীর গল্প – কার্তিক ঘোষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%