এক যে ছিল রাজা—নাম তাঁর বীরবাহু।
এক মম ছিল রাজা আর হয় না। যেমন রূপ, তেমনি গুণ। আবার এদিকে নামেও যেমন বীরবাহু কাজেও তেমনি মস্ত বীর। সারা পৃথিবী জুড়ে রাজার বীরত্বের খুব খ্যাতি। বহু দূর দেশের আর এক রাজা তাঁর কাছে দূত পাঠালেন।
চিঠিতে লিখলেন, “বন্ধু! তোমার সাহায্য চাই। এক রাক্ষস এসে আমার রাজ্যটা ছারখার করে ফেললে। কিছুতেই তাকে এঁটে উঠতে পারিনে। তুমি এসে পাষণ্ড রাক্ষসের হাত থেকে আমায় রক্ষা কর।”
সাহায্য চাইলে সাহায্য করতেই হয়। রাজার ধর্মই তাই। কাজেই এ-রাজা তখুনি ছুটলেন রাক্ষস মারবার জন্য সেই সুদূর দেশে। সৈন্য-সেনাপতি কিছুই নিলেন না। নিজের বাহুবলই সম্বল। বুকে সাহস, আর হাতে তরোয়াল—এমন কে শত্রু আছে যে বীরবাহুর বশ না মানবে?
সেই দূর দেশে সে কী ভয়ানক যুদ্ধ! রাজা মারেন ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ, রাক্ষস ছোঁড়ে গাছ আর পাথর! সাত দিন সাত রাত লড়াই চলল। চন্দ্র-সূর্য ঢাকা পড়ে গেল বাণে বাণে আর গাছে গাছে। অবশেষে হার মেনে পালাল দুষ্ট রাক্ষস।
ওদেশের রাজা একেবারে থ। বীরবাহুর মতো বীর তিনি কখনও দেখেননি। আদরে আপ্যায়নে নিজের রাজ্যে তাঁকে ধরে রাখলেন অনেক দিন। শেষ কালে নিজের মেয়েটিকে সঁপে দিলেন বীরবাহুর হাতে।
বৌ নিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে এলেন বীরবাহু। খুব ধুমধাম হল। সারা দেশে আনন্দের তুফান বয়ে গেল যেন! কোনও বাড়িতে আর রান্না চড়ে না এক মাসের মধ্যে। ছেলে বুড়ো মেয়ে পুরুষ সবাইয়ের ঢালাও নেমন্তন্ন রাজবাড়িতে। মণ্ডা মিঠাইয়ের পাহাড় খাড়া আছে, যে যত চাও, আপন হাতে তুলে নিয়ে খাও। বড় বড় পুকুর কেটে তাই ভরে রাখা হয়েছে ক্ষীর দই আর পায়েস দিয়ে, গামছা পরে নেমে যাও, সেই পুকুরে, আর আঁজলা ভরে খাও! উৎসবের চরম করে ছাড়লেন বীরবাহু।
দিন যায়। রানির ছেলে হবে।
রাজা রানির তো কথাই নেই, দেশের লোকও আনন্দে আটখানা। “যেমন আমাদের রাজা, তেমনি আমাদের একটি রাজপুত্তুর হোক!”—লোকের মুখে মুখে শুধু ঐ একই কথা।
অবশেষে—ধাই একদিন রাজাকে বললে–“মহারাজ, আজ রাত্তিরেই রানি মায়ের ছেলে হবে। আপনি গুরু, পুরুত, বদ্যি, গনৎকার, সবাইকে ডেকে এনে তৈরি রাখুন।”
তা তো আনতেই হবে! গুরু বসবেন মন্তরে-মন্তরে রক্ষা-বাঁধন বাঁধবার জন্যে, যাতে ভূত, পেত্নী, রাক্ষস, খোক্কসে শিশুর কোনও ক্ষতি করতে না পারে। পুরুত বসবেন মা-ষষ্ঠীর পুজোয়, বদ্যি থাকবেন ওষুধপত্তর বেটে তৈরি হয়ে। আর গনৎকার?—সবচেয়ে বড় কাজ তো তাঁরই। জন্মক্ষণটির চুলচেরা হিসাব করে রাখতে হবে, তাই দিয়ে পরে তৈরি হবে রাজপুত্তুরের ঠিকুজি।
সবই তো হল! কিন্তু কী মুশকিল দেখ—সন্ধ্যে হতে না হতেই আকাশ আঁধার হয়ে এল অকালের কালো মেঘে। এ কেমন হ’ল? তিন মাসের মধ্যে মেঘ-বৃষ্টির দেখা নেই, আর আজই তাদের যত গড় গড় গুড় গুড় করে ঘটা না দেখালে চলত না? রাজা থেকে শুরু করে চাকর দাসী সবাইয়েরই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
সবাই যখন বিরক্ত হয়ে গজ গজ করছে, গুরুঠাকুর তখন ব্যক্ত হয়ে রাজাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, “ব্যাপারটা সাধারণ নয় বাপু! এ মেঘ-বৃষ্টি স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে না আমার। মন্তর-তন্তরে রক্ষা-বাঁধন আমি বাঁধতে পারছি না। খুব দারুণ রকমের মায়াবী কেউ আড়ালে থেকে কাটান-মন্তর ঝাড়ছে। তারই জোরে এই সব উৎপাত ঘটছে রাজপুরীতে। শিশুর অনিষ্ট করবার চেষ্টা করছে কোনও দৈত্য বা রাক্ষস।”
রাজা তো ভেবে পান না—দৈত্য রাক্ষসেরা কেন তাঁর সন্তানের অনিষ্ট করতে চাইবে। চিন্তিত হয়ে তিনি বললেন, “তাহলে এখন উপায় কী গুরুদেব?”
“সাবধানে থাকো! আর কী করবে?” গুরু হতাশভাবে বললেন, “আমি তন্তর-মন্তর যতটুকু জানি, তাতে এ মায়াবীর মায়াকে রুখতে পারব বলে ভরসা নেই। সময় থাকলে হিমালয় থেকে, আমারও যিনি গুরু, তাঁকে আনিয়ে নিতাম। রাক্ষস হোক, পিশাচ হোক, তাঁর কাছে ট্যাঁ ফোঁ করবার শক্তি কারও নেই। কিন্তু সে সময় তো এখন নেই! অস্ত্র হাতে করে বসে থাকো সুতিকাগারের দরজায়। আমি এদিকে যথাশক্তি মন্তর পড়ি! তারপর যা থাকে ভাগ্যে!”
রাত যত গভীর হয়, ঝড়বৃষ্টি তত বেড়ে চলে। পৃথিবীটা যেন রসাতলে যেতে বসেছে আজ। রাজা ধনুকে বাণ জুড়ে বসে আছেন সুতিকাঘরের দরজায়, মায়াবীর সাড়া পাওয়ামাত্র এফোঁড় ওফোঁড় করে বিধে ফেলবেন তাকে।
কিন্তু তা আর তিনি পেরে উঠলেন না। ঠিক মধ্যরাতে দারুণ একটা ঘুমের আবেশ এসে জুড়ে বসল তাঁর দুচক্ষুতে। অস্ত্র হাতে করেই তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। সেই মুহূর্তে রাক্ষুসে নিদালিতে রাজপুরীর ঘরে-বাইরে মেয়ে-পুরুষ সবাই ঘুমে অজ্ঞান হয়ে গেল। ঘরের ভিতর রানি ঘুমোন, তাঁর আশে-পাশে ঘুমোয় ধাইয়েরা। ঘরের দরজায় ঘুমোন রাজা, চণ্ডীমণ্ডপে ঘুমোন পুরুত ঠাকুর। সভাঘরে ঘুমোন বদ্যি, গনৎকার। দাসদাসী, পশুপাখি জন্তুজানোয়ার, এমনকী পুজোঘরে গুরুদেব পর্যন্ত ঘুমে অচেতন। গুরুদেবের মন্তর-তন্তর হার মেনেছে।
প্রলয়বেগে ঝড় বইছে। মুষলধারে ঝরছে বৃষ্টি। মেঘ ডাকছে যেন একসাথে গর্জাচ্ছে একশোটা বজ্র। তারই মাঝে কখন ঘুমন্ত রানি এক সন্তান প্রসব করলেন, রানি নিজেও জানলেন না। আর সেই মুহূর্তে কোথা থেকে আচমকা এক যোজনজোড়া নিকষকালো ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে এসে হানা দিল রাজপুরীতে। নিঃশব্দ তার গতি, নিঃশব্দ হাসি তার মুখে, জয়ের আনন্দ নিঃশব্দে জ্বলজ্বল করছে তার ভাঁটার মতো গোল গোল দুটি চক্ষুতে।
এ হচ্ছে সেই রাক্ষস —রানির বাপের বাড়ির দেশে বীরবাহু যাকে সাত দিন সাত রাত্তির যুদ্ধের পর পরাস্ত করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাহুবলে বীরবাহুর সঙ্গে সে আঁটতে পারেনি; তাই মনের ঝাল ঝাড়বার জন্য সে এতদিন মায়ামন্তরের সাধনা করেছে। সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়েছে এতদিনে। তাই সাহসে ভর করে সে বীরবাহুর অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছে শত্রুতা সাধন করবার জন্য।
কেউ কিছু জানলা না। রানির কোল থেকে নবজাত শিশুটিকে তুলে নিয়ে রাক্ষস, হাওয়ার রাজ্যে উঠে গেল। ঘরের ভিতর রানি হঠাৎ জেগে উঠে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলেন, তাই শুনে তাঁর চারপাশে কেঁদে উঠল ধাই-ধরুনীর দল। ঘরের বাইরে ধড়মড় করে জেগে উঠলেন বীরবাহু। পুজোঘরে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে গুরুঠাকুর মন্তর আওড়ালেন, “ওঁ আপদ-বারণায় স্বাহা!”
আর মন্তর! আপদ যা ঘটবার তা ঘটে গিয়েছে। রানির কোল থেকে সন্তান চুরি গিয়েছে। বীরবাহুর বীরত্ব ব্যর্থ! ব্যর্থ গুরুদেবের মন্তরের শক্তি! সারা রাত হা-হুতাশ কান্নাকাটি চলল রাজপুরীতে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখবার কথা মনেও হল না কারও। আকাশের মেঘ কখন কেটে গিয়েছে, নির্মল নীলের বুকে ঝকমক করছে হিরের টুকরোর মতো তারার মালা।
রাক্ষস ততক্ষণে শিশুকে নিয়ে একেবারে সাত-সমুদ্দুর-পারে চলে গেছে।
অস্তপাহাড়ের মাথার উপর এক পাষাণপুরী, তাইতে বাস করে এই মায়াবী রাক্ষস। পাহাড়ের কোলে এক কালো জলের সরোবর, বড় বড় শ্বেতপদ্ম ফুটে আছে সেই কালো জলে। রাক্ষস হাতের কাছে বড় পদ্মটার উপরে শিশুটিকে শুইয়ে রেখে নিজে জলে নামল হাত মুখ ধোবার জন্য।
রাক্ষসের কোলে বাচ্চাটা বেশ ছিল গরমে গরমে। হঠাৎ পদ্মের পাপড়ির ঠাণ্ডা পরশ পেয়ে সে ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল।
মুখ হাত ধুতে ধুতে রাক্ষস এতক্ষণ ভাবছিল—ওটাকে কীভাবে শেষ করে দেওয়া যায়। পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া? না, ঐ পদ্মের উপর যেভাবে শোয়ানো আছে ভাবেই শুইয়ে রেখে যাওয়া? বাজ পাখিতে ছোঁ মেরেও নিয়ে যেতে পারে, না-হয় তো আপনা থেকে গড়িয়ে জলে পড়ে যেতে পারে!
কোনটা করা যায়, সেই চিন্তাই তোলপাড় করছে মনে মনে—হঠাৎ বাচ্চার কান্না শুনে সে হকচকিয়ে গেল। কিছু ভেবে ঠিক করার আগেই সে তাড়াতাড়ি জল থেকে উঠে পড়ল, আর পদ্মের উপর থেকে বাচ্চাটাকে তুলে নিল হাতে। এতক্ষণে তার খেয়াল হল যে চোরাই বাচ্চাটা ছেলে নয় মেয়ে। নিজের মনেই সে জিভ কামড়ে পড়ল। আরে ছিঃ মেয়েকে কখনও মারতে আছে? থাকুক এটা বেঁচে! রাক্ষসের নিঃসঙ্গ জীবনে তবু সঙ্গী আসুক একটা!
তাই হল শেষ পর্যন্ত। রাজার মেয়েটি সেই থেকে রাক্ষসের কাছে থাকতে লাগল।
কয়েক বছর যায়, মায়াবলে রাক্ষস জানল —বীরবাহুর রানির আবারও ছেলে হবে। সেবারের মতো এবারও সে মেঘ-বৃষ্টি সাজিয়ে, নিদালি নামিয়ে রাজপুরীকে অচেতন করে ফেলবার চেষ্টা করল। কিন্তু কী আশ্চর্য! এবার আর রাজবাড়ির ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারল না রাক্ষস। বীরবাহুর গুরু এবারে সতর্ক হয়েছেন। নিজের গুরুকে হিমালয় থেকে আনিয়ে বসিয়ে রেখেছেন পুরীর ভিতরে। তিনি মহাতপস্বী সিদ্ধপুরুষ। রাক্ষসের মায়া তাঁর ত্রিসীমায় ঢুকতে পারে না। রাক্ষসকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হল এবার। নির্বিঘ্নে পুত্র হল রানির।
বীরবাহুর পুত্রের নাম হল বজ্ৰবাহু।
দিনে দিনে বেড়ে ওঠে বজ্রবাহু। বীরত্বে সে-বুঝি তার পিতাকেও ছাড়িয়ে যায়। তার উপর—বীরবাহুর গুরুর গুরু সেই যে সিদ্ধপুরুষ—তিনি এক রক্ষাকবচ বেঁধে দিয়ে গেছেন তার গায়ে, যার প্রভাবে রাক্ষস খোক্কস দৈত্য দানো কোনও দিন কোনও অনিষ্ট করতে পারবে না তাঁর।
ছেলেবেলা থেকেই বজ্রবাহু শুনেছে—তার আগে এক ভাই বা বোন হয়েছিল তার। রাক্ষসে তাকে নিয়ে গিয়েছিল চুরি করে। বজ্রবাহুর রক্ত টগবগ করে ফোটে সেকথা মনে হলে। পৃথিবী থেকে রাক্ষসবংশ নির্মূল করে দেবে বজ্রবাহু। তার ভাইকে চুরি করা? ভাই না বোন? বজ্রবাহুর যেন মনে হয়—হারিয়ে যাওয়া সেই শিশুটি ভাই না হয়ে বোন হলেই ভাল। বোনেরা যেমন আদর করতে জানে, ভাইয়েরা তা জানে না।
মা তার কথা শুনে চোখের জল ফেলেন। বলেন, “ভাই হোক, বোন হোক, সে তো আর বেঁচে নেই। কবে তাকে মেরে ফেলেছে রাক্ষসে!”
বজ্রবাহু দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “মেরে যদি ফেলেই থাকে, আমি রাক্ষসদের দেখে নেব! সমুদ্দুরে ডুবিয়ে মারব! জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব আগুনে! পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে মাটির ঢ্যালার মতো তাদের ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারব আকাশের বুকে। লাটুর মতো তারা বনবন করে ঘুরতে থাকবে হাওয়ার রাজ্যে!” বড় বড় রাক্ষসের লাটুর মতো অসহায় অবস্থা কল্পনা করে, অত রাগের মাথায় হাসি সামলাতে পারে না বজ্ৰবাহু।
সবে বারো তেরো বছরের ছেলেটি তখন বজ্রবাহু। একদিন সে শিকারে গেল একা একাই। গভীর বনের মাঝখানে একখানি খোলা মাঠ, তাইতে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে এক বাচ্চা ঘোড়া। বজ্রবাহু তাকে তাক্ করে ধনুকে তীর জুড়তে যাচ্ছে এমন সময় ঘোড়ার বাচ্চাটা চিঁহি চিঁহি করে ডেকে উঠল। আর কী আশ্চর্য! বজ্রবাহু তার ভাষা পরিষ্কার বুঝতে পারল। ঘোড়াটা যেন বলছে, “আরে কর কী রাজপুত্তর! আমি যে তোমার জন্যেই এসে অপেক্ষা করছি এই বনে! আমি পক্ষিরাজ ঘোড়া, আমার সাহায্য না পেলে তো তুমি রাক্ষসের দেশে পৌঁছুতেই পারবে না।!”
বজ্রবাহু চমকে উঠল। তারপর তূণের তীর তূণে রেখে দুই বাহু মেলে ছুটে গেল সেই পক্ষিরাজের দিকে। বললে, “তুমি এ-পৃথিবীতে আমার সব চেয়ে সেরা বন্ধু! চল, বন্ধু, আমার বাড়ি চল।”
দুজনে মহানন্দে চলল রাজবাড়ির দিকে। দুজনেই দুজনকে পেয়ে খুব খুশি।
তারপর কিছুদিন কেটে গেল, রাজপুত্তুর এখন বড় হয়েছেন। এবার আর একদিন।
সেদিনও শিকারে গেছেন রাজপুত্তুর। পক্ষিরাজের পিঠে চেপেই গেছেন। হঠাৎ তেপান্তরের মাঠে দেখলেন—মাথার উপরে চক্কোর দিচ্ছে এক বাজের বাচ্চা। বজ্রবাহু ধনুকে তীর জুড়তে যাচ্ছেন, এমন সময় হল কী—সেই বাজ ‘কুরর-ক্যু’ শব্দে কান-ফাটান ডাক ডেকে বলছে, “আরে কর কী কর কী রাজপুত্তুর! আমি যে তোমায় সাহায্য করতেই এসেছি! আমি হচ্ছি গরুড় মহারাজের নাতির নাতি। দেবাংশে আমার জন্ম। আমার সাহায্য না পেলে সাধ্য কী রাক্ষস-যুদ্ধে তুমি জিতবে!”
বজ্রবাহু বাজকেও বন্ধু বলে ডেকে নিলেন। তারপর সেই তেপান্তর মাঠ থেকেই পক্ষিরাজকে ছুটিয়ে দিলেন আকাশপথে। আর দেরি নয়! আর দেরি নয়! আজই! এক্ষুণি! সাত সুমুদ্দুর পারে রাক্ষসের পুরীতে হানা দিতে হবে। উদ্ধার ক’রে আনতে হবে হারানো ভাইকে! ভাই, না বোন? বজ্রবাহু আবারও মনে মনে বলেন, “বোন হলেই ভাল! আমার একটি দিদির বড় শখ! দিদির মতো আদর দাদারা করতে পারে না।”
আকাশে উড়ে চলে পক্ষিরাজ, বজ্রবাহুকে পিঠে নিয়ে। আকাশে উড়ে চলে বাজপাখি, বজ্রবাহুকে পথ দেখিয়ে। দিনের পর দিন! মেঘলোক পেরিয়ে কত, কত উঁচু দিয়ে তাদের গতি! অবশেষ একদিন পায়ের নীচে শোনা যায় জলের কল্লোল। ঐ যে! সমুদ্দুর এসে গিয়েছে! এইটে পেরুলেই ব্যস—
দিনের পর দিন! উড়তেই থাকে পক্ষিরাজ! উড়তেই থাকে দেবাংশী বাজপাখি! শেষে একদিন অস্তপাহাড়ের চুড়োয় এসে নামল বজ্রবাহুর পক্ষিরাজ।
বজ্রবাহুর ধনুকে উঠল পৃথিবী-কাঁপানো টংকার। পক্ষিরাজ চিঁ হিঁ শব্দে এমন চেঁচিয়ে উঠল যে, আকাশের মেঘগুলো খান খান হয়ে ছিঁড়ে গুঁড়িয়ে গেল বাতাসের ঝাপ্টায়। বাজপাখির গলা থেকে বেরুল এমন ‘কুরর-ক্যু’ আওয়াজ যে চরা থেকে আলু থালু হয়ে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল রাক্ষসরাজা। যত দূরেই সে থাক্, এক কান সে আজকাল অস্তপাহাড়ের দিকে খাড়া করেই রাখে—সেখানে তার মেয়ে রয়েছে যে। কখন মেয়েটার কী বিপদ ঘটে, ঠিক কী!
ঝড়ের বেগে এসে পড়ল রাক্ষস। অবাক হল বজ্রবাহুকে দেখে। মানুষের বাচ্চাটা কী করে সাত সমুদ্দুর পারের এই অস্তপাহাড়ে এসে হাজির হল? এ-পাহাড়ের চারদিকে যে রাক্ষুসে গণ্ডী টানা রয়েছে! কোনও শত্রুর তো সাধ্যি নেই এখানে হানা দেওয়ার! বোকা রাক্ষস তো জানে না যে বীরবাহুর গুরুর গুরু রক্ষাকবচ বেঁধে দিয়েছেন কুমারের হাতে! সেই রক্ষাকবচের বলেই আজ বজ্রবাহু পেরিয়ে এসেছেন রাক্ষুসে গণ্ডী।
যুদ্ধ বেধে গেল। পাহাড়ের চুড়োর আধখানা ভেঙে নিয়ে বজ্রবাহুকে তাড়া করে এল মহারাক্ষস। কিন্তু বজ্রবাহুর গদা বজ্রের বেগে এসে তার উপর পড়তেই পাহাড়চুড়োটা ভেঙে শতখান হয়ে পড়ল রাক্ষসের হাত থেকে। আর সেই মুহূর্তে দেবাংশী বাজপাখি এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাক্ষসের মাথার উপরে। দুই পায়ের ধারালো নখ দিয়ে উপড়ে নিল তার দুটি চোখ।
দারুণ যাতনায় চিৎকার করে রাক্ষস মাটিতে বসে পড়ল। দুই হাতে চোখ দুটি চেপে ধরে। পক্ষিরাজ উড়ে এসে পড়ল তার সমুখে। আর বজ্রবাহু তরোয়াল তুললেন-রাক্ষসের মাথা কেটে ফেলবার জন্য।
কিন্তু তরোয়াল নামাবার শক্তি আর বজ্রবাহুর হল না। তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে পরমাসুন্দরী এক মানুষের মেয়ে বিদ্যুতের বেগে ছুটে এসে আগলে দাঁড়াল রাক্ষসকে!
“দিদি? আমার দিদি?”—চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা
হয়ে এল বজ্রবাহুর।
“আমি তোমার দিদি?”-বীণার ধ্বনির মতো মধুরস্বরে মেয়েটি বলল, “আমি যদি তোমার দিদি হই, তবে আমার মিনতি রাখো। এ-রাক্ষসকে তুমি মের না! ইনি আমার বাবার মতো!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন