এক রাজার রাজপুরী। দেখতে যেন ছবি খানি।
রাজ মহলের সাত মহলে—সাত রানি।
রাজবাড়ির হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। ভাণ্ডারে মণি মানিক, সিন্দুক জোড়া। মোতে মোহর ঘড়া ঘড়া। বারবাড়ি, ভিতরবাড়ি, সদর দেউড়ি—পটে-ঘটে সাজানো চিত্রপুরী!
সেপাই-মন্ত্রী, সৈন্য-সামন্ত লাখো হাজার। পুব-দক্ষিণে উত্তর-পশ্চিমে, দিক-দিগন্ত জুড়ে—বিরাট রাজত্ব এই রাজার।
কিন্তু হলে কি হয়? এতো থেকেও কিছু নেই। না আছে রাজপুত্র, না রাজকন্যা।
রাজার সদাই বুক খালি। সাত রানির মুখ কালি। পাত্ৰ মিত্র, মন্ত্রী, সেপাই, লোকজন সক্কলেরই উদাস মন।
রাজবাড়িতে আলো জ্বলতে না জ্বলতে নিভে যায়। শাঁখ বাজতে না বাজতে ফুঁ ফুরোয়—থেমে যায়।
রাজসভায় রোজই মন্ত্রী কোটাল হাজিরা দেন–সিংহাসন খালি দেখে, মুখ ভার করে ফিরে যান।
দিন যায়, মাস যায়। বছর যায়, যুগ যায়। কত মানত, যাগযজ্ঞ পূজাআর্চা, জড়িবুটি তাবিজ কবচ। সোনা মোহর অঢেল খরচ।
সব বৃথা।
একদিন হঠাৎ ছোটরানী স্বপ্ন দেখেন—মাঝ রাতে মাথায় শিয়রে—সন্ন্যাসী ঠাকুর! ত্রিশূল হাতে!
স্বপ্নে রানি শুনতে পান-সন্ন্যাসী ঠাকুর বলে যান —নীল সাগরে নাইবে রানি, যতক্ষণ না দৈববাণী—ধর্ণা দিয়ে দণ্ডি খাবে। আকাশের চাঁদ কোলে পাবে।
সেই রাতের শেষ প্রহরে—ছোট রানি পড়ি কি মরি ছুটে যান—ছয় সতীনকে ডেকে জাগান। ‘ওঠ লো ওঠ।’ চাপা ঠোঁটে বলেন—রাতের সেই স্বপ্নের কথা।
বড়, মেজ, সেজ, ন’, নতুন, রাঙা–বাকি ছয় রানি, ওঁরাও বলেন, ‘আমরাও যাবো। নীল সাগরে ডুবে নাবো—ধর্ণা দিয়ে দণ্ডি খাবো—বুকের মানিক বুকে পাবো।’
তখনই সাত রানির মন ঠিক, মতলব পাকা। সাত রানি শুক-সারীর কানে কানে ফিফিসিয়ে সেকথা বলেন। চললেন সাত জনেই। শুকসারির মুখেই রাজামশাই খবর পাবেন। খোশ-খবরে খুশি হবেন।
ভোর রাতের আলো-আঁধারে—হাওয়ায় ওড়া পাল্কি চড়ে সাত রানি পৌঁছে গেলেন, নীল সাগরের তীরে—নন্দন তীর্থে।
রানির বেশ খুলে থুয়ে, নূপুর মুকুট নামিয়ে ছুঁয়ে-নীল সাগরে নেয়ে ধুয়ে—রানীরা দণ্ডি খাটেন। নীল সাগরের তীরে—মানুষ নেই, জন নেই, ফল নেই! —গরম বালি তাতা-পোড়া, নীল সমুদ্র আকাশ জোড়া।
সাগরের ঢেউ ওঠে, পড়ে। শোঁ শোঁ আওয়াজ, হাওয়ায় ঝড়ে। সেই শব্দ ছাড়া, রানিরা শোনেন না কোনও রা কোনও সাড়া।
তিন দিন তিন রাতেই সাত রানি আধমরা। রোদের তাপে রানিদের অঙ্গ পোড়ে। বালির আঁচড়ে গা ছড়ে। তবু রানিরা না নড়েন—না ছাড়েন মনের সংকল্প।
দিনে সূয্যিঠাকুর কটমটিয়ে চায়; রাতে তারারা মিটমিটিয়ে তাকায়; চাঁদও দেখে আড়চোখে।—ওরা কেউ কিন্তু একটিও কথা কয় না। একদিন~শেষরাতে চাঁদ ভাবে রানিদের এতো কি কষ্ট সয়! তাই শেষমেষ সেই মুখ খোলে, কথা কয়। জোছনার সুরের আলোর হাসি ছড়িয়ে চাঁদ বলে-
মনের আঁধারে আঁধার মন
নীল আকাশে আলোর ক্ষণ
পূর্ণিমাতে আমায় দেখো
আলোর পরাগ গায়ে মেখো
আলোয় ঘর আলো হবে
রাজকন্যা বুকে পাবে।
আকাশে শোনা দৈববাণী! খুশি রাজার সাত রানি। আর ভাবনা কিসের। তাই সাত রানি পরের দিন ভোরে-পুণ্যিব্রত সেরে ফিরে আসেন রাজপুরীতে।
কয়েকদিন পরেই, পূর্ণিমা তিথি। ষোলোকলা চাঁদ ফোলে—জোছনা মাখা রুপোলী রাত। আলোয় আলো রাজপুরীর ছাদ।
সাত রানি রাজপুরীর ছাদে উঠে; গা খুলে জোছনা মাখে। ফুলের বিছানায় গড়াগড়ি যায়—ঝিকমিক্ জোছনায়।
বারো মাসে বারো পূর্ণিমা পার হয়। জোছনা মেখে, চাঁদ দেখে এক বছর যায়, দু’বছর যায়, কতো বছর যায়।
কিচ্ছু না।
সাত রানির এক রানিও টের পান না, রাজকন্যার আসার খবর। সাত মহলে সাত রানির চোখের জলে নুন সাগর।
আশায় আশায় যায় দিন—যায় রাত। এক রাতে শাঁখের আওয়াজে চমকে ওঠেন রাজা। দাসী এসে খবর দেন—
‘ছোট রানিমা আঁতুড় ঘরে।’
রাজপুরীতে, চারিধারে আলো জ্বলে ওঠে সারে সারে। সুখ সানাই সুর ধরে। কাড়া-নাকাড়ায় দুম্দাম্ সাড়া! ঢাল তরোয়াল ঝন্ ঝন্—সিপাই সান্ত্রী সবাই সাজে।
রাজদরবারে ঘণ্টা বাজে—ঢং ঢং ঢং। শাঁখে কাঁখে শত ফুঁ—পুঁ—পুঁ—পুঁ—পুঁ—উঁ—অঁ!
শাঁখ শুনে রাজামশাইও পা বাড়ান। অন্দর মহলে—খবর কি? মেয়ে? না ছেলে?
হঠাৎ আঁতুড় ঘরে সাত রানি কেঁদে উঠলেন। কি হলো? কি হলো!
না চাঁদ, না মানিক! এক কাঠের পুতুল। শাঁখ ঘণ্টা, বাজনা-বাদ্যি সব হোঁচট খেলো। গেল থেমে। রাজামশাই ঠোঁট কামড়ে ফিরে যান। গণৎকার জ্যোতিষ ডেকে পাঠান, জিজ্ঞেস করেন—’রহস্য কি?’
খড়ি পেতে গুণে গেঁথে জ্যোতিষীরা বললেন, মহারাজ নন্দন-তীর্থের দৈববাণী মিথ্যে হয় না। কাঠের পুতুল কাঠকন্যা, উনিই হবেন রাজকন্যা। একদিন না একদিন জিয়োবেন, প্রাণ পাবেন—রানিমা ধন্য হবেন।
ছোট রানিমা আঁতুড়েই থাকুন—ষেটেরা ষষ্ঠীর বেদী সাজিয়ে কাঠকন্যা সেথায় রাখুন। ধূপ দীপ চাই নিত্য জ্বালা, দোলাতে হবে সারা ঘরে লক্ষ ফুলে একশো মালা।
রাজা কি আর করেন। জ্যোতিষীরা যেমনটি বলে যান—রানিদের মহলে তেমনটি জানান।
ছোট রানির মহলে—রোজই রাশি রাশি ফুলের মালা, ধূপ দীপ পাঠান।
সবই হয়। কিন্তু সকলের মনে ভয়। তাও কি হয়, তাও কি হয়। কাঠের পুতুল আবার জীয়ন্ত হয়! প্রাণ পেলে কি মানুষ হয়।
কাজেই রাজপুরী আবার আগের সেই নিঝুম পুরী। বাজনা-বাদ্যি হাসি-গান বন্ধ। শোনা যায় না শাঁখ শঙ্খ, ভেরী-তুরী-
ছয় রানি ছোট রানির আঁতুড় ঘর থেকে সেই যে মুখ ঢেকে বেরিয়ে এলেন; আর সে ধারে কেউ গেলেনও না।
ছোট রানি আর কী করেন! রোজই যেঠেরা ষষ্ঠীর বেদী সাজান—বট পাতা ঘটে দিয়ে! ফুল ছড়িয়ে চার প্রহর ধূপ দীপ জ্বালান। ছড়ান চারিদিকে রঙিন ফুল, দোলান ফুলের মালা। এই তাঁর কাজ। এই তাঁর খেলা।
আর রাজা? দূরের-কাছের-আশেপাশের সাত রাজ্যে দূত পাঠালেন। ট্যাটরা দিলেন—যে জিয়োবে কাঠকন্যা—সেই-ই পাবে রাজার রাজত্ব আর রাজকন্যা!’
এ দেশে যায় দূত। সে দেশে যায়। বিদেশে যায়, সব দেশে যায়।
হেঁটে যায়, ছুটে যায়, ঘোড়ায় যায়—নৌকায় যায়।
রাজত্বের খবরে—অনেকেই আগ বাড়ায়, কাঠকন্যা শুনেই সবাই কাঠ হয়। কেউ আর পা বাড়ায় না। কেউ আসে না।
দূতরা হাঁক পেড়ে পেড়ে—পাড়ি মেরে মেরে একেবারে নাজেহাল, হয়রান!
একদিন—হদি নদীর জলে—লাল নীল পাল তুলে-সপ্তডিঙা ভাসিয়ে এক সওদাগর পুত্র যায়। দূতের হাঁক শুনে নদীর ঘাটে ডিঙি লাগায়।
সওদাগরের সাত সাগরে বাণিজ্য। ধন-ঐশ্বর্যের সীমা নেই—তার ওপরে আরও অনেক বিদ্যে জানা। তুক্-তাক্ তন্ত্র-মন্ত্র।
সওদাগর সব শুনেটুনে বললে—’বেশ আমি রাজি।’
সপ্তডিঙা ভরা তার ওষুধ-বিষুধ, জড়ি-বুটি, যন্ত্ৰ মন্ত্ৰ কত কি!
সওদাগর পুত্র—দূতকে ডিঙ্গায় তুলে নিয়ে রাজপুরীর ঘাটে ডিঙি লাগালেন। রাজা-মন্ত্রী, পাত্র-মিত্র হস্তদন্ত ছুটে এলেন। সবাই ব্যস্ত।
রাজপুরীতে পৌঁছেই সওদাগর পুত্র কাজে লাগলেন।
শিকড় বাটা, জড়ির তেল, সাপের ঘিলু, বাঘের চর্বি মেখে কাঠের পুতুল আড়ে আড়ে, লম্বায় বাড়ে—কিন্তু নড়ে না, চড়ে না। অং বং মন্ত্রের শব্দে কাক চিল, পখ-পাখালি পালাই পালাই। যাগ-যজ্ঞির ধোঁয়া আগুনে বেড়ে গেলো। রাজ্যিসুদ্ধ লোকের হাঁচি, কাশি, চোখ জ্বালা।
তিন বছর, তেরো মাস, তেষট্টি দিন কাটলো এমনি করেই। কাঠের পুতুল যেমনকার তেমনই রয়ে গেল!
হার মেনে সওদাগর পুত্র—রাজবাড়ির ঘেসেড়া হয়ে রইল।
রাজা আবার দূত পাঠান।
এবার নদীর ধারে নয়, বনে, পাহাড়ে। খাড়া পাহাড়ে ঘোড়ায় চড়ে, এক কোটাল পুত্র যান। দূতের সাড়া পেয়ে ঘোড়া থামান।
কান পেতে সব শুনে বলেন, ‘বেশ, রাজি।’
কোটালপুত্র ভেরীতে ফুঁ লাগাল। ভেরী বাজতেই সামনের পাহাড় ফেটে চার-চৌচির। সামনে হাজির-এক বিরাট দৈত্য।—
কোটাল-পুত্র দৈত্যকে বলে—কাঠকন্যা বাঁচবে কিসে বলে দাও?’
দৈত্য বললে, ‘আম গাছের কোটরে, জাম রঙের ঘাম-নাগিনী সাপ? সেই সাপের রক্ত—তিন ফোঁটা কাঠকন্যার ঠোঁটে দিলে কাঠকন্যা পরাণ পাবে কথা কবে গান গাবে।’
দূত গেল রাজাকে খরবটা দিতে।
কোটালপুত্র বেরুলো দলবল নিয়ে। পাহাড়ে-পর্বতে আম গাছের কোটরে জাম রঙের সাপ খুঁজতে।
মাটি, পাথর গুঁড়ো-গুঁড়ো, ভাঙলো কতো পাহাড় চুড়ো!
যতো রাজ্যের আমবাগান তছনছ। আমগাছ থাকে তো কোটর নেই। কোটর থাকে তো সাপ নেই। ঢোঁড়া ঢেমনা, বোড়ো জোড়া-বেজোড়া সাপ। জাম রঙের সাপ ঘামনাগিনী কোথাও মেলে না।
হাজার দিন হাজার রাত—দেখতে দেখতে কাবার। কোটাল পুত্র হেঁটে ছুটে জেরবার। শেষটায় নিজেই তিনি বিরক্ত। এক ঢেঁাড়া সাপ কেটে নিলেন তারই রক্ত। তাই নিয়ে কোটাল পুত্র কাঠকন্যার দেশে হাজির। সাত বছর, সতেরো দিন, সতেরো রাত পরে—
আশা আনন্দে রাজা অধীর। সবাই ভাবে কোটাল পুত্ৰ মস্ত বীর। তলোয়ারের তার যেমনি ধার, বুদ্ধিও তেমনি ধারালো!
ভাবলে কি হয়?
সাপের রক্ত শান তলোয়ারের ডগায় করে—গুণে গুণে তিন ফোঁটা! কাঠকন্যার ঠোঁটে দিতেই—নীল ঠোঁট টুকটুকে লাল।
ঠোঁটের রঙ বদলালো। কাঠ বদলালো না। কাঠের পুতুল যে কাঠ সেই কাঠ। কোটাল পুত্র দেখে—উপায় নেই আর।
বেচারা ভয়ে কাঠ-রাজা বুঝি শুলে দেয়।
রাজা তাকে শূলে দিলেন না। হাত-পা বেঁধে তুলে দিলেন—লাউ মাচায়।
তারপর রাজাই নিলেন দূতের কাজ। গায়ে চড়ালেন দূতের সাজ। দূতের বেশে রাজা এ দেশে যান। সে দেশে যান। বন ডিঙোন, পাহাড় পার হন। শেষে এক ফুলের বন।
ফুলের বনে পাখির গান। ফুলে গড়া রাজবাড়ি! ফুলে গড়া ফটক সিঁড়ি! চারিধারে ফুলের দোলনা, ফুলের খেলনা! রাজা এগোন, অবাক হয়ে—খুশি হয়ে।
দেখেন ফুলের মুকুট পরে—ফুলের ধনুকে—ফুলের তীর জুড়ে—এক কুমার খেলা করে।
দূত-রাজা এগিয়ে যান, মাথা নোয়ান। কুমারকে জানান—মনের কথা।
ফুল রাজ্যের রাজপুত্রের চোখের কোলে চোখের জলে দুই মুক্তো চিক্ চিক্। বলে ওঠে, ‘আহা। কাঠকন্যার রাজ্য কাঠ হয়ে থাকবে?”
রাজপুত্র ফুলের ধনুক নামিয়ে রাখে। ডাকে, ‘বন্ধুরা এসো, বন্ধুরা এসো।’
কুমারের ডাক শুনে কুঁড়িরা ফোটে, পাখিরা জোটে। প্রজাপতিরা আসে, ‘কি। কি। অসময়ে ডাকো কেন কুমার?”
‘কাঠকন্যা জিয়োয় কিসে বলে দাও।’
পাখিরা বলে, ‘যতো ফুল যতো ফল বিলিয়া দাও।’ ফুলেরা বলে, ‘যতো রঙ, যতো রত্ন, মণি মানিক মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দাও।’
বলে রাজপুত্র, ‘প্রাণ দিলে যদি প্রাণ মেলে, তাও দি!’ ফুল, প্রজাপতি সব বন্ধুরাই বলে ওঠে, ‘তবে আর ভাবনা কি? রথ আনি?’
দূত-রাজার ভিজে চোখে পলক পড়তে না পড়তেই রথ হাজির। চার স্তম্ভ ফুলের রথ। চাকার বদলে চারখানা পাখির ডানা। মস্ত মস্ত প্রজাপতি ঘোড়ার লাগামে জোড়া।
ফুলেরা বললে, ‘কুমার রাজবেশ পরো—রাজমুকুট ধরো।’ রাজবেশ, রাজমুকুট, রাজত্ব ও-সব থাক। আগে কাঠকন্যা জীবন পাক-এখন পরাও রাখাল বেশ!
কপালে চন্দন, নাকে তিলক, চোখে কাজল। পরালে ফুল, প্রজাপতি, পাখিরাই।
কুমার সাজলো রাখাল বেশ। হাতে বাঁশি। মুখে মিষ্টি হাসি। দূত-রাজাকে বললে কুমার, ‘রথে উঠুন—চলুন।’
দূতরাজা অমন রথ জন্মে দেখেন নি। উঠতে ভয় পান। রাজাকে হাত ধরে কুমারই রথে ওঠান। কাঠকন্যার দেশে রথ ছোটান। শোঁ-শোঁ—শোঁ। ফুলের গন্ধে আকাশ-বাতাশ ম-ম-ম। হাওয়ায় দুলে রথ চলে মেঘ ডিঙিয়ে-বন পেরিয়ে। শেষে এসে পৌঁছায়—কাঠকন্যার দেশে।
রাজপুরীর বাইরে চম্পক বন। কনক চাঁপা কাঁঠালী চাঁপা আঠালী চাঁপা। সবচেয়ে বড় শ্বেত চাঁপা গাছটার মাথায় রথ থামলো। রাখালের বেশে ফুলকুমার, আর দূতের বেশে বুড়ো রাজা—গাছ বেয়ে মাটিতে নামলো।
দূতের সঙ্গে রাখাল ছেলে বাঁশি হাতে হেঁটে যায়। রাজ্যের লোক দেখে বলে, ‘বুড়ো দুতের গর্দান যাবে। শেষে এক রাখালকে নিয়ে এলো—সাত দেশ ছুঁড়ে!’ ওরা কেউ তো জানে না—কে রাজা। কে দূত? রাজা রাজপুরীতে ফিরে, পোশাক বদলে গেলেন,—অন্দর মহলে। রানিদের কাছে খুলে বললেন সব কথা। বললেন, ‘রাখাল নায়—রাজপুত্র।’
রানিরা বলাবলি করেন, ‘বুড়ো রাজার ভীমরতি কোথাকার এক রাখাল—মুকুট নেই! মালা নেই।—খাপে নেই তলোয়ার। হাতে শুধু এক বাঁশি! তাকে বলেন রাজপুত্র।’ অত দুঃখেও রানীদের হাসি পায়।
হাসবার কি উপায় আছে? স্বয়ং রাজা এনেছেন এই কুমারকে। ভালোবাসেন কুমারকে, শুধু রাজা। ভালোবাসার ভান করে আর সবাই।
সারাদিন কুমারের দেখা কেউ পায় না। ভোর না হতে সে চাঁপার বনে চলে যায়। সেখানে বনে বসে বসে বাঁশি বাজায়। না কারুর কাছে ঘেঁষে, না কারুর সঙ্গে মেশে। বনের ফল, ঝরনার জল খায়। বনে বনেই দিন কাটায়।
সাঁজ-সন্ধ্যের বাতি দিয়ে—ষাট-ষেষ্ঠেরার বেদী সাজিয়ে লাখো ফুলের একশো মালা দুলিয়ে ছোট রানি কাঠকন্যার ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে যখন শুতে যান, তখন—রাতের আলো ছায়ায় কাঠকন্যার ঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, একলা কুমার। আশে পাশে কেউ কোথাও থাকে না তখন!
থাকবার মধ্যে, ঘরের চারধারে চার সারি দীপ। ঘরের বেদীর ফুলশয্যায় কাঠের পুতুল কাঠকন্যা। আর হাওয়ায়-দোলা—একশো ফুলের মালা। দরজার সামনে হরিণের চামড়ার আসন-পাশে পঞ্চদীপ।
পাহারা দিতে এসে পাছে ঘুম পায়—তাই প্রথম প্রহরে কুমার চম্পক বন থেকে তুলে আনা সাত রকম চাঁপার সাতটা মালা গাঁথে।
একশোর পাশে আরও সাত মালা হাসে। একশো সাত। পরের প্রহরে দুপুর রাতে কুমার গান করে। তিন প্রহর রাতে বাঁশিতে সুর ধরে। ভোরের প্রহর যখন শুরু হয়—দুরু দুরু বুকে কাঠকন্যার ঘরে যায়। কাঠের পুতুলের পায়ে কাঠের বাঁশিটি রেখে বলে, ‘রইলো বাজিয়ো।’ বাঁশি রেখে এসে ধ্যানে বসে—সামনে জ্বলে ঘিয়ের পঞ্চপ্রদীপ!
এমনি করে দিনের পর দিন যায়। এক বছর যায়, দু’বছর যায়। তিন–চার–তাও পার।
.
পাঁচ বছর পাঁচ দিনের পর। রাতের তখন প্রথম প্রহর। কুমার রোজ দিনের মতো মালা গাঁথতে বসে—কিন্তু কেবলই ফুলের বোটা খসে, পাপড়ি ঝরে—সুতো ছেঁড়ে! চাঁপার কলি আঙুলে ছুঁচ বিঁধে, রক্ত ঝরে!
সারাটা প্রহরে, সাত মালার বদলে সেদিন এক মালা গাঁথা হয়। রাগ করে কুমার মালাটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পড়ে গিয়ে কাঠকন্যার গলায়। কুমার সেটা টের পায় না
দ্বিতীয় প্রহরে গান ধরে। আর ধরতে না ধরতেই বাতাস বয় সর সর করে। এক সারি বাতি নিভে যায় কাঠকন্যার ঘরে। গান থেমে যায়, ছুটে গিয়ে একটি একটি করে সেই সারি দীপগুলি জ্বালায়। আবার এক সারি দীপ নিভে যায়—তাও জ্বালায়। আরও এক সারি দীপ নেভে। এমনি করে চার সার দীপ বার বার নিভে যায়। কুমার বার বার জ্বালায়।
এমনি করেই সে রাতের আরও দু’প্রহর কাটে। গানও হলো না, বাঁশিও বাজলো না। ঝড়ের, হাওয়ায় ঘরের সব মালার ফুল ঝরে ঝরে এমন করে বাঁশিটাকে ফুলে ঢেকে দিলে লুকিয়ে রাখলে। বাতি জ্বালিয়ে ফিরে এসে, কুমার আর বাঁশি খুঁজে পেলো না।
শেষ রাতে হাওয়া কমলো। দরজায় আসন পেতে কুমার বসলো ধ্যানে। পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে।
বার বার দীপ জ্বেলে কুমারের দেহমন গেছে এলে। ধ্যানে বসতে না বসতেই—আসনেই সে ঘুমে ঢলে, ধ্যানও হলো না।
হঠাৎ বাঁশির সুর। ঘুমের মাঝখানে—চমক আনে। কান পাতে, চোখ খোলে। গা তোলে না—স্বপ্নজাগা নিঝুম। বাঁশিও থেমে যায়। রাজপুত্র একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। চোখ রাখে দরজার ফাঁকে। খানিক পরে পঞ্চপ্রদীপের এক পিদিম নিভলো!
নেভায় কে?
চার প্রদীপের সঙ্গে কুমারের দুই চোখের দুই দীপ জ্বলে ওঠে। দেখে, চাঁপার কলি পাঁচটি আঙুল–টুক্টুকে একখানি হাত। দরজার ফাঁক গলে আসছে—সাপের ফণার মতো। পঞ্চ দীপের আরও এক দীপ নেভাতে।
‘রাজকন্যা!’ বলেই—খপ্ করে, কুমার সেই হাত ধরে।
ধরতেই বন্ধ দরজা খুলে গেল। অন্ধকার সরে গেল। চম্পক বনের পাখিরা গেয়ে উঠলো কনক-চাঁপার ডালে ডালে। কুমার দেখে, রাগ করে ছুঁড়ে ফেলে-দেওয়া মালাটা রাজকন্যার গলায় দোলে। দেখেই কুমার রাজকন্যার হাত ছেড়ে দিলে—ডঙ্কায় ঘা দিলে।
অসময়ে ডঙ্কা বাজে! রাজা উঠে আসেন, রানিরা ছুটে আসেন, রাজপুরী ভেঙে লোকজন জড়ো হয়। সবাই এসে, দেখে, রাজার পাশে শিশির ধোয়া ফুলের মতো রাজপুত্র আর ছোট রানির পাশে জোছনা গলা চাঁদ-পানা রাজকন্যা।
ছয় রানি বাজায় ছয় শাঁক। তোরণে তোরণে বাজে বাঁশি, বাজে ঢাক। সোরগোল, হাঁকডাক।
সোনার রোদে আকাশ ভরে। এতদিন পরে—জমাট বাঁধা দুঃখের রাত পোহায় রাজার ঘরে।
রাজার বাগানে সব ফুল ফুটে উঠলো। পাখায় পাখায় ঢেউ তুলে রঙ বেরঙের প্রজাপতি জুটলো। রাজবাড়ির গাছে গাছে পাখিরা গান ধরলো।
ফুলের দেশের
ফুলের রাজা—
ভুবনে অতুল।
কঠোর ত্যাগে কাঠকন্যার
ফোটায়
পরাণ ফুল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন