তীর্থের সাধু

জয়দীপ চক্রবর্তী

'ইলেকট্রিক নাগোরদোলায় চড়া আছে তোর শানু'? পরিদাদু শাওনকে জিজ্ঞেস করলেন।

'গত বছর রাসের মেলায় চড়েছিলাম।' উত্তর দেয় শাওন।

'ভয় পেয়েছিলি?'

'উঁহু—'

তাহলে তো কোনো চিন্তাই নেই। অসুবিধা হবার কথাই নয়। তবু সিট বেল্টটা বেঁধে নিস। ফর সেফটি—' বলে হাত বাড়িয়ে পরিদাদু নিজেই শাওনের সিট বেল্টটা কট করে আটকে দিলেন কোমরের কাছে। আর তারপরেই প্লেনটা ছুটতে শুরু করল। সামনের সিট থেকে অরুণাংশু বলে উঠলেন, 'লক্ষ রাখ শানু। এরপর এক সেকেন্ড থেমেই কেমন তীব্র গতি নেয় প্লেনটা ওড়ার জন্য।'

শানুর ভয় করছিল না একটুও। কিন্তু রোমাঞ্চ হচ্ছিল খুব। আর মনে মনে থ্যাংকস জানাছিল সে পরিদাদুকে। বাবা কিছুতেই প্লেনের টিকিট কাটতে রাজি ছিলেন না। তাঁর এক কথা, ইনদোর যাবার জন্য প্লেনের টিকিট কাটার মানেই হয় না। শুধু শুধু একগাদা পয়সা নষ্ট। শিপ্রা বিউটিফুল ট্রেন। বেশি লেটফেট না করলে এমন কিছু অসুবিধা নেই। এসি টিকিট করে নেব। দিব্বি আরামে পৌঁছে যাব গল্প করতে করতে—'

পরিদাদু জোর করল ভাগ্যিস। তাছাড়া শাওনের মা সুছন্দাও পরিদাদুকেই সমর্থন করে বললেন, 'অত কিপ্টেমির দরকার কী বাপু— অফিস থেকে তো তুমি এল টি সি পাবে। যাই বলো না কেন দু—দুটো রাত ট্রেনে কাটানো খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার। তার চেয়ে একটু পয়সা খরচা করে দু—ঘণ্টায় যদি পৌঁছে যাওয়া যায়—'

পরিদাদু হাসলেন, 'দু' ঘণ্টায় হবে না। প্রায় তার ডবল সময় লাগবে পৌঁছতে—'

'এত সময় লাগবে? অবাক হয়ে বললেন সুছন্দা।

'হুঁ', পরিদাদু বললেন, 'রায়পুরে একবার নামবে প্লেনটা—'

মা পরিদাদু একদিকে হয়ে যাওয়ায় সুবিধেই হয়ে গেল শাওনের। বাবা আর আপত্তি করতে পারলেন না।

সুছন্দা ঘাড় ঘুরিয়ে পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'রাজুকে ফোন করে দিয়েছিলেন তো সকালে?'

পরিদাদু মাথা নাড়লেন, 'হ্যাঁ ও গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে থাকবে বলে দিয়েছে।'

প্লেন থেকে নেমে লাগেজ নিয়ে বাইরে বেরোতেই শাওন দেখতে পেল রাজদীপমামা দাঁড়িয়ে আছে। শাওনকে দেখতে পেয়েই হাত নাড়ল রাজদীপ। শাওন হাত নাড়তে নাড়তে ছুট লাগাল তার দিকে। রাজদীপ পরিমলের দাদার ছেলে। জুট এন্ড ফাইবার টেকনোলজিতে বি.টেক করে ইন্দোরে চাকরিতে যোগ দিয়েছে বছর আড়াই হল। সুছন্দার এই জ্যাঠতুতো ভাইটি বরাবরই সুছন্দাকে ভালোবাসে ভীষণ। কাজেই চাকরি পাবার পর থেকেই ক্রমাগত ফোন করে যাচ্ছে তাঁকে অরুণাংশু আর শানুকে সঙ্গে নিয়ে ওর ওখানে যাওয়ার জন্য। রাজদীপ অফিস থেকে যে কোয়ার্টারটা পেয়েছে তাতে থাকার জায়গার অভাব নেই। ওর নিজের গাড়িও রয়েছে। কাজে কাজেই উজ্জ্বয়িনী ওঁকারেশ্বর বেড়িয়ে আসতেও অসুবিধা নেই একটুও। তবুও গত দু—বছর ঠিকঠাক সময় বের করা যাচ্ছিল না কিছুতেই। এবারও হত কিনা বলা যায় না যদি না পরিদাদু নিজে ওখানে যাওয়ার ব্যাপারে এতখানি উদ্যোগ নিতেন।

রাজদীপ এগিয়ে এসে অরুণাংশুর হাত ধরল, 'যাক সত্যি সত্যিই শেষমেশ এলেন তাহলে। কী ভালো যে লাগছে আমার'— অরুণাংশু হাসলেন, কৃতিত্বের সিংহভাগটা কিন্তু তোমার কাকার— রাজদীপ এগিয়ে এসে পরিমলকে প্রণাম করল নিচু হয়ে। তারপর হেসে বলল, 'থ্যাংকস ছোটকা, ভাগ্যিস তুমি ইনিসিয়েটিভটা নিয়েছিলে। সুছন্দা ঘুঁসি পাকিয়ে এগিয়ে এলেন রাজদীপের দিকে, সব থ্যাংকস শুধু পরিকাকু আর অরুণদার জন্যে— আমি বুঝি তবে বানের জলে ভেসে এলাম?

রাজদীপ দু—হাত দিয়ে তাঁর হাত ধরল। জিভ কেটে বলল, 'সরি খুকুদি, আয় আয়,—গাড়িতে উঠে পড় সবাই।'

শাওনরা রাজদীপের গাড়িতে উঠছে যখন, লাগেজ বোঝাই ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে পাশে এসে দাঁড়ালেন বিশ্বাস কাকু। শাওনের কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'সি ইউ এগেইন শাওন, খুব ভালো করে বেড়াও কদিন।' তারপর অরুণাংশু ও পরিদাদুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'ওকে, চলি তাহলে। কলকাতায় ফিরে যোগাযোগ করবেন প্লিজ। আমার কার্ড তো রইলই।

অনীশ বিশ্বাসের সঙ্গে শাওনদের আলাপ দমদম এয়ারপোর্টে। হাইল্যান্ড পার্কের কাছাকাছি থাকেন। পারিবারিক ব্যবসা আছে বিভিন্ন রকমের কেমিক্যালসের। ভারি সজ্জন মানুষ এবং ভীষণ রকম ঈশ্বরবিশ্বাসী। একটু বেশি কথা বলেন, কিন্তু কথার মধ্যে এমন সহজ একটা আন্তরিকতার ছোঁয়া আছে যে ওঁর কথা শুনতে একটুও বিরক্তি লাগে না। ব্যবসার কাজে ওঁকে মাঝে মাঝেই ইন্দোর আসতে হয়। কথায় কথায় বাবাকে বারংবার বলছিলেন, ইন্দোরে আসছেন যখন ওঁকারেশ্বরে তো নিশ্চিত বেড়াতে যাবেন। চেষ্টা করবেন অন্তত তিনটি রাত ওখানে কাটাতে। ওঁকারেশ্বর বড় পবিত্র জায়গা। আর এত বড় তীর্থস্থান ভারতবর্ষে বড় একটা পাবেন না।'

সুছন্দার তো দারুণ ভালো লেগে গেছে অনীশবাবুকে। প্লেনে ওঠার সময় থেকেই বলতে গেলে ভক্ত হয়ে পড়েছেন তাঁর। এখন গাড়িতে উঠতে উঠতেও একগাল হেসে বললেন, 'কলকাতায় ফিরে কিন্তু যোগাযোগ করব আপনার সঙ্গে। ওঁকারেশ্বরে তো অনেকবার গেছেন আপনি। অনেক সাধুসঙ্গও করেছেন ওখানে। একদিন জমিয়ে তাঁদের গল্প শুনব আপনার মুখ থেকে।'

'একশোবার—' একগাল হেসে বললেন অনীশ বিশ্বাস, 'তবে আমার মনে হচ্ছে ওঁকারেশ্বরেও আপনাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যেতে পারে।'

'সত্যি, কবে যাচ্ছেন ওখানে?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'আপনারা পৌঁছচ্ছেন কবে নাগাদ?'

'দেখা যাক। ইচ্ছে আছে দু—একদিনের মধ্যেই রওনা দেব।' পরিদাদু বললেন।

'আমি হয়তো আর এক আধদিন পরে। আজকালের মধ্যে বোধহয় এখানকার কাজ শেষ করতে পারব না। বাই দা বাই, ওখানে গেলে উঠবেন কোথায়?

'দেখি, এক্ষুনি ঠিক নেই কিছুই।'

'ওকে, আমি ফোন করে নেবখন', অনীশবাবু পা পাড়ালেন, 'চলি—'

পরিদাদু বলছিলেন, 'ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন ও পবিত্র নদীগুলির একটি এই নর্মদা। মধ্যপ্রদেশের অমরকণ্টকে উৎপত্তি। আরাবল্লী ও সাতপুরা পর্বতশ্রেণির মধ্যে দিয়ে দীর্ঘপথ প্রবাহিত হয়ে গুজরাট হয়ে আরবসাগরে গিয়ে মিশেছে নদীটি। শাওনের ভূগোল পড়তে একটুও ভালো লাগে না, কিন্তু পরিদাদুর মুখে নর্মদার উৎপত্তি ও প্রবাহপথের বর্ণনা শুনতে তার এখন একটুও খারাপ লাগছিল না। এখন বিকেল গড়াচ্ছে। রোদ্দুরের চড়া ভাবটা আর নেই। গরমও কম লাগছে এখন। এবড়োখেবড়ো পাথরের ওপর দিয়ে ঝর ঝর করে বয়ে চলা নর্মদার তীরের বাঁধানো ঘাটে বসে চুপ করে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। নদীর অপরপাড়ে প্রাচীন ঋষি মার্কণ্ডেয়র তপোস্থলি। ভারী মিষ্টি সুরে বেদমন্ত্র ভেসে আসছিল সেই আশ্রম থেকে। তাদের ডানদিকে সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে অনেকটা উঠে গেলে ওঁকার আশ্রম। ওখানেই থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে তাদের। আশ্রমের পরিবেশ খুবই মনোরম। ঘরগুলোও বড় বড় আর একদম নর্মদা নদীর ঠিক ওপরেই। ঘরের বারান্দায় বসে নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দিব্যি সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। আশ্রমের মহন্ত স্বরূপানন্দজির বয়েস খুব বেশি নয়। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মানুষ। স্বরূপানন্দজি বাঙালি নন, কিন্তু খুব ভালো বাংলা বলতে পারেন। রাজদীপমামা কয়েকবার এখানে এসে থাকার জন্য স্বামীজির সঙ্গে ভালোই অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়ে গেছে এখন। কাজেই ফোন করে আশ্রমে ঘর পেতে অসুবিধা হয়নি কোনো। শাওনরা আশ্রমে পৌঁছল যখন, স্বামীজি নিজে আপ্যায়ন করেছেন তাদের। শাওনকে আদর করেছেন খুব আর হাসিমুখে দুঃখ করেছেন, 'শাওনবাবু খাওয়াদাওয়ার একটু কষ্ট হবে তোমার। আশ্রমে তো নিরামিষ ছাড়া আর কিছু খাওয়াতে পারব না তোমায়—'

শাওন খুব লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল ওঁর কথা শুনে। মা অবশ্য অবস্থার সামাল দিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই। শাওনকে বুকে টেনে নিয়ে বলে উঠেছিলেন আন্তরিকভাবে, 'শানু আমাদের খুব লক্ষ্মীছেলে মহারাজ। খাওয়াদাওয়া নিয়ে কোনো বায়না নেই ওর—'

পরিদাদু বলছিলেন, 'নর্মদা নদী এত পবিত্র যে গঙ্গা দেবী পর্যন্ত পাপে পূর্ণ হয়ে গেলে নর্মদাস্নান করে পবিত্র হয়ে যান—' সুছন্দা চোখ গোল গোল করে বললেন, 'সত্যি পরিকাকু?'

'সত্যি মিথ্যের কথা তো বলা মুশকিল', পরিদাদু হাসলেন, 'তবে এমন কথাই শোনা যায়।'

অরুণাংশু যোগ করলেন 'শুধু কী তাই! শঙ্করাচার্যকে দীক্ষা দেবার জন্য ঋষি গোবিন্দপাদ এখানে একটি গুহার মধ্যে হাজার বছর অপেক্ষা করেছিলেন।'

'হাজার বছর কি মানুষ বাঁচে নাকি?' শাওন প্রশ্ন করল অবাক হয়ে।

'ঋষি মুনিরা তপস্যার প্রভাবে সবই পারতেন। 'সুছন্দা আশ্বস্ত করেন তাকে।

'হাঁটতে হাঁটতে দেখে আসবে নাকি গুহাটা?' পরিদাদু বললেন।

'গুহাটা এখনও আছে?' জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'নিশ্চয়ই। জায়গাটা অপূর্ব। নদীর অপর পারে রানি অহল্যাবাই প্রতিষ্ঠিত, মমলেশ্বর আর এ পারে রাজা মান্ধাতা প্রতিষ্ঠিত জ্যোতির্লিঙ্গ ওঁকারেশ্বর। মাঝে নদীর ওপর মমলেশ্বর সেতু।'

'আর গুহাটা?' প্রশ্ন করে শাওন!

'ওঁকারেশ্বর মন্দিরের ঠিক নীচে।' পরিদাদু বললেন।

অরুণাংশু বললেন, এ শিবমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কোন মান্ধাতা, সেই কিংবদন্তির মান্ধাতা নাকি— সেই যে খুব প্রাচীন বলতে আমরা যে মান্ধাতার আমল বলি—'

'ইনিই সেই মান্ধাতা। ইক্ষ্বাকু বংশের কুড়িতম রাজা—'

'ইক্ষ্বাকু বংশ, মানে শ্রীরামচন্দ্র—' সুছন্দা ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন,

'ইয়েস ম্যাম—' পরিদাদু হাসতে হাসতে বললেন, 'এই ইক্ষ্বাকু বংশেরই ষাট নম্বর রাজা রঘু, বাষট্টি নম্বরে দশরথ আর তেষট্টি নম্বর বংশধর রাজা শ্রীরামচন্দ্র—'

'উরিব্বাস—' বিস্ময়ে বলে উঠল শাওন।

ওঁকারেশ্বর মন্দিরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পরিদাদু বললেন, 'মান্ধাতার সেই রাজপ্রাসাদ এখন যে অবলুপ্ত তা তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাঁর সেই অবলুপ্ত রাজত্বের চারটি প্রবেশদ্বার আর ওঁকারেশ্বর পাহাড়কে ঘিরে তাঁর রাজত্বের সীমারেখা নির্ণায়ক পাথরপ্রাচীর পরিক্রমা পথে এখনও দেখতে পাওয়া যায়—'

'পরিক্রমা পথ মানে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'অনেক পুণ্যার্থী নর্মদা নদীর উভয় তট পায়ে হেঁটে পরিক্রমা করেন পুণ্যলাভের আশায়—'

'সে তো অনেক পথ' পরিদাদুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন সুছন্দা। 'অনেক পথই শুধু নয়, অত্যন্ত দুর্গম সেই পথ। তবু মানুষ কষ্ট করে এই ব্রত গ্রহণ করে। পরিক্রমা পথে মারাও পড়েছেন অনেকে। কাজেই এই কঠিন ব্রতের বিকল্প হিসেবে অনেকে শুধুমাত্র এই ওঁকারেশ্বর পাহাড়টিকেই পরিক্রমা করেন পায়ে হেঁটে—

'কতক্ষণ সময় লাগে?' জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'চার পাঁচ ঘণ্টা লাগবে বোধহয়', পরিদাদু বললেন, 'আমরাও এটা করতে পারি! যাবে নাকি কাল?

'গেলেই হয়', অরুণাংশু বললেন, 'কিন্তু পাহাড়ি পথে শানু কি আর অতক্ষণ হাঁটতে পারবে?'

'আমি ঠিক পারব। একটুও কষ্ট হবে না আমার।' অন্য কাউকে কিছু বলার সময় না দিয়েই বলে উঠল শাওন।

পরিদাদুর কাছে ওঁকারেশ্বর পাহাড় পরিক্রমার ইচ্ছার কথা শুনে স্বরূপানন্দজি খুব খুশি হলেন। বললেন, 'আমিও আপনাদের সঙ্গী হিসেবে জুটে যেতাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য কাল আশ্রমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আমাকে থাকতেই হবে।'

সুছন্দা বললেন, 'আপনি সঙ্গে গেলে ভীষণ ভালো লাগত আমাদের, সুবিধাও হত।'

স্বরূপানন্দজি হাসলেন, 'আমি না গেলেও কোনো অসুবিধা হবে না আপনাদের। পুরো পরিক্রমাপথই সুন্দর করে বাঁধানো হয়েছে এখন। ওই নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে গেলেই হল। বহু সাধুসন্তের পবিত্র তপোস্থলি দেখতে পাবেন পথের ধারে ধারে। অসংখ্য শিব মন্দিরও হয়েছে এখানে ওখানে। তবে পরিক্রমা পথে সব মন্দিরে না ঢুকলেও প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলি একটু ঘুরে নেবেন—'

'যেমন?' অরুণাংশু জিজ্ঞাসা করলেন কৌতূহলী স্বরে।

'কত বলব আর', স্বরূপানন্দজি হাসলেন, 'কাবেরিসঙ্গম এরন্ডি সঙ্গমে যেতে ভুলবেন না আর মন্মথেশ, 'ঋণমুক্তেশ্বর, গৌরীসোমনাথ আর আদি সিদ্ধিনাথ মহাদেবকে দর্শন করবেন অবশ্যই—'

'এই ওঁকারেশ্বর তীর্থে তো বহু সাধু মহাত্ম এখন তপস্যা করে চলেছেন শুনেছি', সুছন্দা বললেন, 'পরিক্রমা পথে কি তাঁদের কারও কারও সঙ্গেও দর্শন হয়ে যেতে পারে?'

সুছন্দার কথা শুনে স্বরূপানন্দজি হাসলেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন 'সত্যিকারের মহাত্মাদের চেনা তো অতো সহজ কথা নয় মা। তাঁরা চেনা না দিলে তাঁদের চিনবেন এমন সাধ্য কোথায়— তখন নকল সাধুকেই আসল ভেবে ঠকে যেতে হবে এক্কেবারে—'

অরুণাংশু হাসলেন, 'এমন পবিত্র জায়গায় তাহলে কোনো নকলও আছে বলছেন—'

অরুণাংশু হালকাভাবে কথাটা বললেও স্বরূপানন্দজি কিন্তু তাঁর কথায় হাসলেন না। বরং গম্ভীর গলায় বললেন, 'প্রদীপের নীচেই যে অন্ধকার বেশি গাঢ় হয় বাবা। এই ওঁকারেশ্বর তীর্থে অন্য সব তীর্থস্থানের মতনই কত ভণ্ড তপস্বী ঘুরে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে। সাধনার পথ তো সহজ নয়। সে পথে ধৈর্য চাই, নিষ্ঠা চাই, ত্যাগ চাই— আজকাল তেমন ত্যাগ—নিষ্ঠা কতজনের আছে? অধিকাংশই ভেক ধরে লোক ঠকিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে তাই বলে সত্যিকারের সাধু মাহাত্ম্যও কী নেই—অনেক আছে; কিন্তু তাঁরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন বেশি। দৈবাৎ লোক কল্যাণের জন্যে বাইরে আসেন তাঁরা। তাঁরা আছেন বলেই না এখানকার মানুষগুলো এখনও বেঁচে বর্তে আছে। নইলে কবেই শেষ হয়ে যেত সব— ' একটানা অনেকটা কথা বলে স্বরূপানন্দজি থামলেন।

অরুণাংশু আবার বললেন, 'এখানকার মানুষ কিন্তু এখন এই যুগেও ভক্তি বিশ্বাসে অটল—'

'কথাটা মিথ্যে নয় হয়তো', স্বরূপানন্দজি বললেন, 'তবে এরাও পালটাচ্ছে। সহজ—সরল ভাবটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। লোভ বাড়ছে। আর সবচেয়ে যেটা মারাত্মক, এই অঞ্চল জুড়ে মাদকাশক্তি বেড়ে চলেছে দ্রুত হারে—'

'ড্রাগসও' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন অবাক গলায়।

'হ্যাঁ তাও।' হতাশ কণ্ঠে উত্তর দিলেন স্বরূপানন্দজি।

'কিন্তু পাচ্ছে কোথায়?'

'মুম্বাই এবং ইন্দোর দুই শহরেই মোটামুটি সুষ্ঠু যোগাযোগ সম্ভব এখান থেকে। জানেন তো মুম্বাই এসবের আখড়া। আজকাল ইন্দোরেও— এই অঞ্চলটা তাই ক্রমশই ড্রাগমাফিয়া আর চোরাচালানকারীদের ট্রানজিট জোন হয়ে উঠছে ইনানীং—'

'প্রশাসনিক কোনো উদ্যোগ নেই এসব বন্ধে? হাজার হোক এত বড় তীর্থস্থান, এত লোক এখানে আসেন সারা দেশ থেকে।'

'উদ্যোগ নেই বলব না। মাস কয়েক আগেও ইন্দোর থেকে ধরা পড়েছে দুজন। তবে পুলিশের অনুমান এই দলটার যে পাণ্ডা সে এদিকেই গা ঢাকা দিয়ে আছে কোথাও। পুলিশের এক বড় কর্তা মাঝে মাঝে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আসেন আমাদের আশ্রমে। দুজনেই ঠাকুরের ভক্ত খুব। কথায় কথায় ভদ্রলোক বলছিলেন যে, 'কেন্দ্রীয় স্তরেও ব্যাপারটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। খোঁজ খবরও নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন স্তর থেকে—'

'লোকটা ধরা পড়ে যেতে পারে বলছেন?'

'আমি আর কী বলব বলুন। তবে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানাই মা নর্মদা যেন এ ধরনের বদ লোকগুলোর হাত থেকে এখানকার সহজ—সরল লোকগুলোকে রক্ষা করেন এবং তীর্থের মর্যাদা বজায় রাখেন—' স্বরূপানন্দজি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখখানা একটু বিষণ্ণ লাগছিল। তার মধ্যেই মুখে স্নিগ্ধ হাসি টেনে এনে বললেন 'রাত হচ্ছে, এবার একটু বিশ্রাম করে নিন আপনারা। আমি আসি। রাতে প্রসাদের কী বন্দোবস্ত হল তদারক করে আসি একটু।' সুছন্দা, অরুণাংশু হাতজোড় করে প্রণাম জানালেন তাঁকে। পরিদাদুও। স্বরূপানন্দজি আশীর্বাদের ভঙ্গীতে হাত তুললেন। বললেন, 'সকালে দেখা হবে আবার। চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব ভোর ভোর বেরিয়ে পড়বার। রোদ চড়া হয়ে গেলে পাথর গরম হয়ে যায় ভীষণ। পাহাড়ি পথে হাঁটতে খুব কষ্ট হবে তখন। স্বরূপানন্দজি পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন। আর তখনই বিশ্বাসকাকুর ফোনটা এল পরিদাদুর মোবাইলে। পরিদাদু মোবাইলের স্পিকার অন করলেন। বিশ্বাসকাকু বলছেন, 'কাল পৌঁচচ্ছি সকাল সকাল। কোথায় দেখা পাব, কোথায় উঠলেন আপনারা?

'ওঁকার আশ্রম—' পরিদাদু ছোট্ট জবাব দিলেন।

'স্বরূপবাবার আশ্রমে?'

'হুঁ। ওঁকে চেনেন নাকি?'

'চিনব না, কী বলছেন— এতবার যাচ্ছি ওঁকারেশ্বরে— বাই দা বাই কাল কী প্রোগ্রাম আপনাদের?'

'পরিক্রমায় বেরোচ্ছি—'

'কালই?'

'হুঁ।'

'মেক ইট পরশু প্লিজ—'

'পরশু?'

'হুঁ, তাহলে আমিও সঙ্গী হতে পারব। কাল বরং চলুন সবাই মিলে ওঁকারেশ্বর মন্দিরে পুজো দিই। তারপর মা নর্মদার জল গায়ে মাথায় ঠেকিয়ে পরশু রওনা দিই পরিক্রমা মার্গের দিকে—'

'ঠিক আছে। তাই হবে। তাহলে কাল দেখা হচ্ছে।'

'একদম।' বলেই ফোনটা কেটে দিলেন বিশ্বাসকাকু।

বিশ্বাসকাকু পৌঁছলেন বেলা দশটা নাগাদ। আশ্রমের একতলায় শিবমন্দিরের সামনে যে নাটমন্দির, সকালের খাওয়াদাওয়া সেরে শাওনরা সবে এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। একটু আগে পর্যন্ত নাটমন্দিরে সংকীর্তন চলছিল। অনেক লোকের ভিড়ে গমগম করছিল জায়গাটা। একটু আগে সেটা থেমেছে। নাটমন্দিরের ভিড়ও কমে গেছে এখন। দু—একজন লোক আপন মনে মন্দিরের কাজকর্ম করছে। নাটমন্দিরের মাঝখানের বাঁধানো তুলসিমঞ্চের সামনে বসে একজন বয়স্ক আশ্রমিক চোখ বুজিয়ে মালা জপ করছেন। সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে নাটমন্দিরে উঠে এসে শাওনদের পাশে দাঁড়ালেন অনীশ বিশ্বাস। শিবমন্দিরের শিবলিঙ্গের দিকে তাকিয়ে দু—হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন ভক্তিভরে। তারপর চাপা গলায় স্বগোতোক্তি করলেন,

'অপূর্ব—'

'কী—' অবাক গলায় বললেন সুছন্দা।

'এসব জায়গার পরিবেশটাই এমন যে মনটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়—'

'যা বলেছেন', সায় দেন সুছন্দা, 'মনে হয় যেন এখানেই থেকে যাই সারাজীবন—'

অরুণাংশুও হাসলেন, 'ব্যাস ব্যাস। অতখানি ভেবে ফেলো না এক্ষুনি। শানুটা বড্ড ছোট এখন—'

'তুমি তো আছো—'

'মাফ করো বাপু—'

সুছন্দা উত্তরে আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন। স্বরূপানন্দজিকে এদিকে হেঁটে আসতে দেখে চুপ করে গেলেন। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে শাওনদের সামনে থামলেন তিনি। ওদের সঙ্গে অনীশ বিশ্বাসকে দেখে একটু অবাক গলায় বললেন, 'আপনি?'

'ইনি মি. বিশ্বাস, দমদম এয়ারপোর্টে আলাপ', অরুণাংশু বললেন,

'আমরা এখানে আছি শুনে দেখা করতে এসেছেন—'

'বেশ বেশ—' বলে স্বরূপানন্দজি হাত তুলে নমস্কার জানালেন তাঁকে। বিশ্বাসকাকুও প্রতি নমস্কার করলেন। পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার লাগেজ?'

'লাগেজের বেশিরভাগটাই ইন্দোরে ফাঁকা করে ফেলেছি। কিছু অর্ডার সাপ্লাই—এর ব্যাপার ছিল। বাকিটা হোটেলে—'

বিশ্বাসকাকু হাসলেন।

'হোটেলে কখন গেলেন আবার?' সুছন্দা বললেন।

'কাকভোরে বেরিয়েছি ইন্দোর থেকে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোকের গাড়িতে। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে আসছি আপনাদের কাছে একসঙ্গে ওঁকারেশ্বর মহাদেব দর্শন করবো বলে।'

'আমরা তো রেডি।' পরিদাদু বললেন।

'চলুন তাহলে বেরিয়ে পড়া যাক'— অনীশকাকু বললেন, 'আর হ্যাঁ, তার আগে একটা ছোট্টো অনুরোধ আপনাদের কাছে—'

'বলুন না কী করতে পারি আপনার জন্যে—' সুছন্দা বললেন আন্তরিকভাবে।'

'তার আগে বলুন তো আর কদ্দিন আছেন এখানে?'

'দিন দুই তো বটেই—'

'বিউটিফুল। আমারও হয়তো দু—তিনদিনই লাগবে কাজকর্ম শেষ করতে—'

'ওব্বাবা এখানেও কাজ? বললেন সুছন্দা।

'কী করব বলুন, ব্যবসায়ী মানুষ আমরা। মুনাফার সম্ভাবনা দেখলে ছাড়ি কী করে—' অনীশ বিশ্বাস হাসলেন। অ্যাকচুয়ালি আমার মুম্বাই—এর এক পার্টি আসছে ওঁকারেশ্বর দর্শনে। আগামী বিশ তারিখ—'

'মানে পরশুর পরদিন—'

'এগজ্যাকটলি। তাই ভাবলাম মুম্বাই যাওয়ার কষ্টটুকু বাঁচাতে এখানেই ওঁকে ভিজিট করে নিই। তারপর সোজা ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন—' শেষ কথাটা শাওনের দিকে তাকিয়ে বলে হাসলেন বিশ্বাসকাকু।

'কিন্তু আপনার কী একটা উপকার করার কথা বলছিলেন যে—' সুছন্দা মনে করিয়ে দেন তাঁকে।

'আমার একটা জিনিস দিন দুই আপনাদের কাছে গচ্ছিত রাখতে হবে দয়া করে।'

'কী জিনিস?' আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন সুছন্দা।

'এইটা' বলে নিজের কাঁধের ছোট ব্যাগটা থেকে কাঠের একটা বাক্স বের করলেন বিশ্বাসকাকু। বাক্সটা উচ্চতায় ফুটখানেক আর প্রস্থে তার হাফ।

'কী আছে বাক্সে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'শিবলিঙ্গ'—বলে বাক্সের ডালাটা খুলে ফেললেন বিশ্বাসকাকু। 'আমার দূর সম্পর্কের এক দিদির জন্যে। আসলে যখনই এদিকে আসি খুব করে বলে আমায়—'

'কিন্তু এটা আমাদের কাছে রাখতে চাইছেন কেন?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন এবার।

'আমি তো হোটেলে উঠেছি। বুঝতেই পারছেন খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে কোনো আচার বিচারই তো মানা সম্ভব নয় ওখানে। আর আমার দিদি আবার এসব মানে—টানে খুব— সত্যি বলতে কী আমিও মানি। হাজার হোক ঠাকুর টাকুরের ব্যাপার— তাই ভাবলাম আপনারা যখন আশ্রমেই উঠেছেন তখন এই দুই দিন—'

'ঠিক আছে দিন না—' বলে হাত বাড়িয়ে বাক্সটা নিজের কোলে তুলে নিলেন সুছন্দা, 'তবে মনে করে আমরা যাবার আগে চেয়ে নেবেন কিন্তু—'

'ও বিষয়ে ভাববেন না বউদি', অনীশ বিশ্বাস হাসলেন,' ওটা আপনাদের দান করে চলে যাব এমন বড় মনের মানুষ আমি নই—'

সকলেই হেসে উঠলেন ওঁর কথা শুনে। স্বরূপানন্দজি কিন্তু হাসলেন না। বরং গম্ভীর হয়ে বললেন, 'নর্মদা লিঙ্গ কিন্তু এখান থেকে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।'

'কেন?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করেন।

'শুনেছি নর্মদা তীর থেকে শিবলিঙ্গ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়ে গৃহস্থের বাড়িতে রাখলে তাদের অকল্যাণ হয়। আসলে শিবলিঙ্গের নানা চিহ্ন থাকে। গৃহস্থের জন্য সব শিবলিঙ্গ মঙ্গলজনক নয়।'

'আমিও শুনেছি, কিন্তু দিদিকে বোঝাতে পারিনি—' বিশ্বাসকাকু বললেন।

'দেখুন, যা ভালো বোঝেন—' বলে স্বরূপানন্দজি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। বিশ্বাসকাকু তাড়া দিলেন, 'বউদি জিনিসটা ঘরে রেখে চলুন বেরিয়ে পড়ি। বেলা বাড়ছে। এরপর বেরোলে দেরি হয়ে যাবে। তাছাড়া আপনাদেরও তো ... প্রসাদের আগে আশ্রমে ফিরতে হবে—'

সুছন্দা কাঠের বাক্সটা দু—হাতে ধরে ভক্তিভরে কপালে ছোঁয়ালেন। তারাপর অরুণাংশুর কাছ থেকে ঘরের চাবিটা চেয়ে নিয়ে দ্রুত পা চালালেন ঘরের দিকে।

ওঁকারেশ্বর শিব বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের একটি হওয়া সত্ত্বেও বৈশাখ মাস বা শিবরাত্রির সময়টুকু বাদ দিলে মারাত্মক ভিড় ভাড়াক্কা এখানে হয় না। জায়গাটা এত পবিত্র এবং এত সুন্দর তবুও সাধারণ পর্যটকের আনাগোনা এখানে খুব বেশি নয়। কাজেই মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাটেই মন্দির ঘোরা হয়ে গেল শাওনদের। এখানকার শিবলিঙ্গটি অদ্ভুত। কুচকুচে কালো নয় এবং পাথরটি কেমন যেন এবড়ো খেবড়ো— অমসৃণ। এই শিবলিঙ্গ নাকি রাজা মান্ধাতা নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরের গর্ভগৃহের ঠিক বাইরে একটি কাচের শোকেসে রাজা মান্ধাতার সিংহাসন এবং তাঁর ব্যবহৃত পোশাক ও অন্যান্য টুকিটাকি দু—একটা জিনিস রাখা হয়েছে। পরিদাদু অবশ্য বলেছিলেন যে এগুলো সত্যি সত্যিই মান্ধাতার ব্যবহৃত বস্তু হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। মন্দির থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে নদীর কাছে এসে একটু হেঁটে নর্মদার বাঁধানো ঘাটে এসে দাঁড়ালেন পরিদাদু। সুছন্দাদের দিকে চেয়ে বললেন, 'খুকু, এই হচ্ছে কোটি তীর্থের ঘাট। এখানে দাঁড়িয়ে মা নর্মদাকে স্পর্শ করলে বা দর্শন করলেও এক কোটি তীর্থ ভ্রমণের ফল হয় বলে মানুষের বিশ্বাস—'

তাঁর কথা শুনে সুছন্দা তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে জলের দিকে নেমে গেলেন। নর্মদার জলে হাত ডুবিয়ে সেই জল মাথায় দিলেন। তারপর আঁজলা ভরে জল এনে ছিটিয়ে দিলেন শাওন পরিদাদু ও অরুণাংশুর মাথায়। অনীশকাকু ঘাটের ওপরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছিলেন কার সঙ্গে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে। নীচে নামলেন না। তাঁর দিকে তাকাতে একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। লাল টকটকে কাপড় পরা এক সন্ন্যাসী, মাথায় জটা মুখে লম্বা দাড়ি গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন অনীশকাকুর দিকে। তাঁর একটা হাতে কমণ্ডুলু। অন্য হাতটা কাঁধে ঝোলানো ঝোলার মধ্যে ঢোকানো। শাওনদের সঙ্গে চোখাচুখি হতেই কমণ্ডুলু ধরা ডান হাতটা বুকের কাছ পর্যন্ত তুলে এনে ভরাট গলায় তিনি বলে উঠলেন, 'নর্মদে হর—'

শাওনরাও সকলে বলে উঠল 'নর্মদে হর—'

সেই শব্দে বিশ্বাসকাকু একটু চমকেই ঘুরে তাকালেন। তাঁর ঠিক পাশেই সাধুবাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেমন যেন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তড়িঘড়ি ফোনটা রেখে দিলেন তিনি। সন্ন্যাসী তাঁর দিকে ফিরেও তাকালেন না। পিছু ফিরে দ্রুত পায়ে হেঁটে তিনি মিলিয়ে গেলেন মমলেশ্বর সেতুর দিকে। শাওনরাও হাঁটতে শুরু করল। মমলেশ্বর সেতুর কাছে এসে অনীশ বিশ্বাস থামলেন। একটু হেসে বললেন, 'আমি এখান থেকেই বিদায় নিচ্ছি। আজ আর দেখা হবে না। বিকেল থেকে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে। তবে কাল একদম সক্কাল সক্কাল পৌঁছে যাচ্ছি আপনাদের ওখানে। তৈরি থাকবেন কিন্তু—'

'সক্কাল সক্কাল মানে কটায়? 'হেসে জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'ধরুন ছটা নাগাদ—'

'ঠিক আছে, রেডি হয়ে যাব আমরা—'

'চলি শানুবাবু—' বলে শাওনের গালটা টিপে দিয়ে মমলেশ্বর সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে নদীর ওপারে চলে গেলেন বিশ্বাসকাকু। শাওনরা সোজা হাঁটতে লাগল আশ্রমের দিকে। দু—চার পা হেঁটে এসে সেই সন্ন্যাসীর সঙ্গে আরও একবার দেখা হয়ে গেল তাদের। মমলেশ্বর সেতু পেরিয়ে এসে পাহাড়ের গায়ে যে টেলিফোন বুথটা সন্ন্যাসী তার মধ্যে ঢুকে কথা বলছেন দোকানের লোকটির সঙ্গে। লোকটি মাথা নীচু করে বাধ্য ছাত্রের মতন সন্ন্যাসীর কথা শুনছিল চুপ করে। কথা শেষ করে ঝোলা থেকে একটা ছোট্ট কাগজের মোড়ক বের করে সন্ন্যাসী লোকটার হাতে দিলেন। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে লোকটার কানের কাছে মুখ এনে কী বললেন। বলেই বেরিয়ে পড়লেন দোকান থেকে। দোকান থেকে বেরিয়ে আমাদের মুখোমুখি হয়েও কোনো কথা না বলে সন্ন্যাসী হন হন করে হেঁটে চলে গেলেন সামনের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে পরিদাদু আপনমনে বলে উঠলেন, 'অদ্ভুত—' অরুণাংশুও বললেন, লোকটার গতিবিধি কিন্তু বেশ সন্দেহজনক।

'হুঁ বললেন পরিদাদু।'

'যাই বলো তোমরা, আমার কিন্তু বাবাজিটিকে বেশ লেগেছে। সেই কোটিতীর্থের ঘাটেই দেখেছি, তীক্ষ্ন চাউনি। যেন মনের ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলছিলেন। দেখলেই মনে সম্ভ্রম জাগে।'

সুছন্দার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে পরিদাদু এগিয়ে গেলেন পাবলিক বুথটার দিকে। অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় চললে আবার?'

'আসছি। সাধুবাবা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর করে আসি।'

শাওন তাঁর সঙ্গ নিচ্ছিল। পরিদাদু বললেন, 'দাঁড়া। আমি এক্ষুনি আসছি—'

অরুণাংশু বিরক্তির সঙ্গে বললেন, 'পরিটার সবটাতেই বাড়াবাড়ি। সাধু সাধুর মতন আছেন থাকুন না— আমাদের তাঁকে নিয়ে এত মাথা ব্যথার তো কোনো কারণ নেই—'

সুছন্দাও সমর্থন করলেন তাঁকে 'হুঁ যা বলেছ। পরিকাকুটা চিরকালই এমন। কোনো একটা বিষয় মাথায় ঢুকলে হয়। ব্যাস তখনি পড়ে গেল তার পিছনে।'

শাওন চুপ করে ছিল। মা বাবার কথার মধ্যে কোনো কথা বলল না সে, কিন্তু মনে মনে খুশিই হল। বেশ একটা রহস্য রহস্য ভাব তৈরি হচ্ছে এখন। ওঁকারেশ্বরে বেড়াতে এসে সত্যিই যদি একটা বলবার মতন কাণ্ড ঘটে যায় তাহলে ফিরে গিয়ে স্কুলে সে হিরো হয়ে যেতে পারবে। এমন কী ওদের ক্লাসের ফাস্টবয় গোমরামুখো দীপাঞ্জনটা পর্যন্ত গল্প শোনার লোভে ছুটে আসবে তার কাছে।

মিনিট পাঁচ সাত পরেই ফিরে এলেন পরিদাদু। অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, 'খবর কিছু পাওয়া গেল?'

'গেল।' পরিদাদুর সংক্ষিপ্ত উত্তর।

'কীরকম?'

'সাধুবাবাটি বেশ ইন্টারেস্টিং—'

'কেন?'

'তপস্যাবলে এলাকার গরিবগুর্বো মানুষজনের ছোটখাটো অসুখবিসুখ বেমালুম সারিয়ে দিচ্ছেন উনি—'

'তাই নাকি?'

'টেলিফোন বুথের লোকটি তো তাই বলল। দুদিন ধরে জ্বর বলে সাধুবাবা নাকি ওষুধ দিয়ে গেলেন তাকে।'

'ওষুধ?'

'হুঁ। ওষুধ মানে কখনও মন্ত্রপূত নর্মদার জল, কখনও মাটি, কখনও বা আবার সাদা সাদা গুঁড়ো—'

'কীসের গুঁড়ো?'

'তা কে জানে?'

'তাতে সারে অসুখ?'

'লোকটি তাই তো বলল।'

'সাধু থাকেন কোথায়?'

'এঁদের তো থাকবার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থাকে না। রমতা সাধু। আজ এখানে তো কাল অন্য জায়গায়। কিছুদিন হল কুবের ভাণ্ডারী তীর্থে কুঠিয়া বানিয়ে রয়েছেন। তবে খুব বেশিদিন বোধহয় উনি আর ওখানে থাকবেন না—'

'কী করে জানলে?'

'লোকটা বলছিল।'

'ওই বা জানল কী করে?'

'অনুমান।'

'আহা অনুমানেরও তো একটা ভিত্তি থাকে—'

অলৌকিক ক্ষমতায় সাধুবাবার কাছে রোগ সারাতে মানুষের ভিড় বাড়ছে। সাধারণত প্রকৃত মহাত্মারা খ্যাতি প্রচার ও লোকমান্যতার বাইরে থাকতেই ভালোবাসেন—'

'আহা মানুষ কত উপকার পাচ্ছেন ওঁর কাছ থেকে আর উনি চলে যাবেন?' বিষণ্ণ গলায় বলেন সুছন্দা।

'কিছু তো করার নেই,' অরুণাংশু বললেন, 'এঁরা তো এক জায়গায় থাকেন না বেশি দিন—'

'চলো না পরিকাকু আমরাও সাধুবাবার সঙ্গে একবার দেখা করে আসি', সুছন্দা বললেন আবেদের গলায়, 'শানুটার যাতে পড়াশুনায় মতিগতি হয় সে জন্যে আমি একটু প্রার্থনা করব। তাছাড়া কোমরটাতেও কদিন ধরে একটা খচখচে ব্যথা বোধ করছি। যদি দৈব ওষুধে ওটা সেরে যায়—'

'আমরাও খুব ইচ্ছে করছে রে খুকু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার বাবাজির সঙ্গে দেখা করতে।'

'সত্যি বলছ? তাহলে কখন যাবে বলো। আমি তোমার সঙ্গে যাব—'

'খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ।

কী আপত্তি আছে?' শেষ প্রশ্নটা করলেন পরিদাদু অরুণাংশুর দিকে তাকিয়ে।

'না। ঠিক আছে চলো।' ভাবলেশহীন গলায় উত্তর দিলেন অরুণাংশু।

ওঁকারমঠের একেবারে পাশ দিয়েই পরিক্রমার পথটি পাহাড়ের গা বেয়ে ক্রমশ উঠে গেছে ওপর দিকে। পরিদাদু বললেন, 'ধীরে সুস্থে রিল্যাক্স করে হাঁটো। তাড়াহুড়োর কোনো প্রয়োজন নেই, তাতে হাঁফিয়ে পড়বে একটু পরে। শাওনরা ধীরে ধীরেই হাঁটছিল গল্প করতে করতে। পথের পাশে পাশে বিভিন্ন সাধু মহাত্মাদের আশ্রম। কোথাও কোথাও পাহাড়ের গায়ের ছোট্ট গুহাতে আশ্রয় নিয়ে বসে আছেন কোনো সর্বত্যাগী সন্ত। এছাড়াও দু—একটা বসত বাড়িও চোখে পড়ছিল মাঝে মাঝে। রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে কখনও কোনো মানুষজনের সামনে পড়লেই তারা হাত তুলে 'হর নর্মদে হর' বলে চিৎকার করে উঠছিল। রাস্তার পাশে পাহাড়ের গুহায় বা কোনো কুঠিয়ায় সাধু সন্ত দেখলেই পরিদাদু 'নম নারায়ণায়' বলে দু—হাত জোড় করে প্রণাম জানাচ্ছিলেন। তাঁর দেখাদেখি সুছন্দা এবং অরুণাংশুও। সবকিছুই ভারি ভালো লাগছিল শাওনের। রামকৃষ্ণ মিশনের সফেদ কুঠি পার হয়ে যাওয়ার পর জনবসতি চোখে পড়ল না তেমন। রাস্তাটা যেন ঝুপ করে একেবারে ফাঁকা এবং নিঃঝুম হয়ে গেল। শুধু কিছু বানর এ গাছ থেকে ও গাছ লাফালাফি করছিল হুপ হাপ শব্দ করতে করতে। পরিদাদু বলছিলেন, 'কুবের ভাণ্ডারী তীর্থ হল কুবেরের তপস্যাস্থল। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যাবার পর রাবণ কুবেরের রত্নভাণ্ডার লুঠ করে নেন। হৃতসর্বস্ব কুবের নর্মদা ও কাবেরি নদীর এই সঙ্গম স্থলে এসে তপস্যায় বসেন তাঁর হারানো সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্যে।'

'শেষমেশ তাঁর সম্পত্তি কি পেয়েছিলেন তিনি পরিদাদু?'

শাওন জিজ্ঞেস করল কৌতূহলী হয়ে।

'পেয়েছিলেন', বললেন পরিদাদু, 'ব্রহ্মার বরে আবার তিনি সব ফিরে পান এবং যক্ষপতি হিসাবে অভিষিক্ত হন। এই কারণেই এই কাবেরি সঙ্গমকে বলা হয় কুবের ভাণ্ডারী তীর্থ। ওখানে একটা প্রাচীন মন্দির আছে। ওই মন্দিরে ব্রহ্মার মূর্তি আছে।' কথা বলতে বলতেই গন্তব্যে পৌঁছে গেল শাওনরা। কলকল শব্দে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলেছে নদীর জল। পরিদাদু বললেন 'খুকু জায়গাটা শুনেছি খুব পবিত্র। মন চাইলে মা নর্মদাকে স্পর্শ করে মনে কী প্রার্থনা টার্থনা আছে সব করে ফেল।' তাঁর কথা শুনে অরুণাংশু হেসে উঠলেন। সুছন্দা কিন্তু সত্যি সত্যিই জল স্পর্শ করে প্রণাম করলেন হাতজোড় করে তারপর সেই জল ছিটিয়ে দিলেন অন্যদের গায়ে মাথাতেও।

সাধুবাবাটি তাঁর ছোট্ট কুঠিয়ার মধ্যেই ছিলেন। কুঠিয়াটি পাথর, কাঠ আর পাতানাতা দিয়ে বানানো। শাওনদের সেদিকে এগিয়ে যেতে দেখে তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। খালি পা। হাঁটুর নীচ পর্যন্ত কৌপিন আর পায়ে রাবারের স্ট্র্যাপ লাগানো কাঠের খড়ম। হাত জোড় করে 'নম নারায়ণায়' জানাতেই হাতের ইশারায় তিনি শাওনদের কুঠিয়ার বাইরের পাথুরে মাটিতে বসতে বললেন। শাওনরা বসে পড়ল তাঁকে ঘিরে। একটুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর সন্ন্যাসী ধীর গম্ভীর গলায় হিন্দিতে বললেন, 'বলুন কী করতে পারি আপনাদের জন্য—'

সুছন্দা হাতজোড় করে বললেন, 'বাবা আশীর্বাদ করুন আমার ছেলেটা যেন পড়াশুনায় মনোযোগী হয়। ও যেন মানুষ হয়—'

সন্ন্যাসী হাসলেন। বড় মিষ্টি সেই হাসি। তারপর শাওনের মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন কী নাম তোমার?'

শাওন নাম বলল নিজের। সন্ন্যাসী বললেন, 'যতই কষ্ট আসুক জীবনে সত্যের পথ থেকে সরে যেও না'।

সন্ন্যাসী হিন্দিতে কথা বললেও শাওন তাঁর কথা বুঝতে পারছিল। সে মাথা নাড়ল তাঁর কথায়। সন্ন্যাসী আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?'

'ক্লাস সেভেন।'

'তুমি মা বাবার কথা শোনো তো?'

'হুঁউ—' বলে মাথা নীচু করে ফেলল শাওন।

সন্ন্যাসী আবার বললেন, 'সকালে আরও একজন যিনি তোমার সঙ্গে ছিলেন তিনি তোমার কে হন?'

শাওন হিন্দি বুঝতে পারলেও হিন্দিতে কথা বলার অভ্যাস তো তার নেই।' কাজেই ইতস্তত করতে লাগল সে। অরুণাংশু শাওনের হয়ে উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। সন্ন্যাসী থামিয়ে দিলেন তাঁকে। তারপর সকলকে অবাক করে দিয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলে উঠলেন, 'তুমি বাংলাতেই বলো শাওন, আমি বাংলাভাষা একটু আধটু বুঝি।'

'ওঁকে আমরা আগে চিনতাম না। এখানে আসার সময় দমদম এয়ারপোর্টে আলাপ। বিশ্বাসকাকু খুব ভালোমানুষ।'

সন্ন্যাসী মুচকি হাসতে লাগলেন, 'কী করে জানলে যে উনি খুব ভালোমানুষ? তোমাকে কি উনি ক্যাডবেরি খাইয়েছিলেন?'

'না না তা নয়' ভীষণ লজ্জা পেয়ে গিয়ে বলে উঠল শাওন। 'একবারের দেখায় কি সিদ্ধান্ত সবসময় ঠিকঠাক হয় শাওনবাবু? 'বলে সকলের মুখের ওপর দিয়েই তাঁর তীক্ষ্ন চোখদুটি বুলিয়ে নিলেন সন্ন্যাসী। তারপর আবার শাওনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, 'একটা জলপূর্ণ পাত্রে যদি তুমি একখানা বাঁকা লাঠিকে ঠিকঠাক অ্যাঙ্গেলে চুবিয়ে দাও তাহলে রিফ্র্যাকশনের জন্যে তাকে কিন্তু সোজাই দেখাবে। তাই বলে লাঠিটা কি সত্যিই সোজা—'

শাওন থতমত খেয়ে গেল। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সে বলল, 'ওঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যেন উনি কত দিনের চেনা—'

সন্ন্যাসী হা হা করে হাসতে লাগলেন। তারপর একটু থেমে মজা করার ভঙ্গিতে বললেন, 'কী আশ্চর্য বলো তো শাওনবাবু। কত অচেনা লোককে আমাদের চেনা মনে হয় আবার কখনও চেনা লোককেও আমরা চিনে উঠতে পারি না।'

এ কথার কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে না পেরে চুপ করে রইল শাওন। সন্ন্যাসী তার থুতনি ধরে খুব আদর করলেন খানিক। তারপর কুঠিয়া থেকে তাঁর লাল কাপড়ের ঝোলাটা নিয়ে এসে তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা লজেন্স বের করে এনে বাড়িয়ে দিলেন শাওনের দিকে। শাওন ইতস্তত করছিল। সুছন্দা চোখের ইশারায় ওটা নিয়ে নিতে বললেন। শাওন হাত বাড়িয়ে লজেন্সটা নিয়ে নিতেই সন্ন্যাসী আবার তার থুতনি ধরে চুমু খেলেন। মৃদু হেসে বললেন, 'তুমি কিন্তু সত্যিই খুব ভালো। তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।'

'আপনাকেও'। লাজুক লাজুক গলায় বলে শাওন।

সন্ন্যাসী আবারও হাসতে থাকেন হা হা করে। তার কথা শুনে। হাসতে হাসতেই বলেন, 'থ্যাঙ্কস—'

পরিদাদু চুপ করে বসে ছিলেন এতক্ষণ। সন্ন্যাসী এবং শাওনের কথার মধ্যে একটাও কথা বলেননি। এতক্ষণে সন্ন্যাসীর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি, 'আপনি কী অনীশ বিশ্বাসকে চেনেন?'

সন্ন্যাসীর মুখে একটা রহস্যের হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। গম্ভীর গলায় তিনি বললেন, 'মানুষকে চেনা কি বড় সহজ কথা?'

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে পরিদাদু আবার জিজ্ঞেস করলেন,

আপনি সন্ন্যাস নিয়ে ঘর ছেড়েছেন কত বছর আগে?'

'তার কী আর হিসেব আছে—'

'আগে কোথায় থাকতেন?'

'সন্ন্যাসীকে পূর্বাশ্রম জিজ্ঞেস করতে নেই।'

'আপনি নাকি এখানকার অনেক মানুষের রোগের চিকিৎসা করেন?'

'শুধু গরিব গুর্বো আর্থিক অসচ্ছল মানুষদের।'

'আপনি কী ওষুধ দেন তাদের?'

'মাটি, বালি, নর্মদার জল—'

'তাতে রোগ সারে?'

'ওরা তো তাই বলে।'

'কী সব গুঁড়ো পাউডারও নাকি খাওয়ান। কী ওগুলো?'

'আপনি তো আমার সম্পর্কে এর মধ্যে ভালোই খোঁজ—খবর করেছেন দেখছি। কবে এসেছেন ওঁকারেশ্বরে?'

'কাল'।

'আপনাকে ক্রেডিট দিতেই হবে।' বলে আবার মুচকি হাসতে লাগলেন সন্ন্যাসী। কথাটা নিঃশব্দে হজম করলেন পরিদাদু। প্রত্যুত্তর করলেন না।

সুছন্দা সন্ন্যাসীর সামনে এসে বসলেন হাতজোড় করে। প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, 'কদিন হল কোমরের একটা ব্যথা খুব ভোগাচ্ছে বাবা। আপনার ওষুধ আমায় একটু দিন না—'

সন্ন্যাসী বললেন, 'বললাম যে আমার চিকিৎসা শুধুমাত্র আর্থিকভাবে যারা দুর্বল, যারা পাশ করা ডাক্তার দেখাতে অক্ষম তাদের জন্য—'

'তবু আমায় দিন—' অনুনয়ের সুরে বললেন সুছন্দা।

'ঠিক আছে', বলে ঝোলা থেকে একটা কাগজের মোড়ক বের করলেন তিনি। সুছন্দার হাতে দিয়ে বললেন, 'ওঁকারেশ্বর তীর্থের মাটি। নর্মদার জলে গুলে ব্যথার জায়গায় লাগিয়ে দেবেন। মা নর্মদার কৃপায় আশা করি আরাম পাবেন।'

অরুণাংশু ঠাট্টা করলেন, 'আপনার ঝুলিটি তো ভারী ইন্টারেস্টিং—'

'কেন?'

'একবার হাত ঢোকালেন লজেন্স উঠে এল। এবারে উঠে এল ওষুধ—'

'এতেই আশ্চর্য হচ্ছেন', হাসলেন সন্ন্যাসী, ঝোলার মাহাত্ম তো কিচ্ছুই দেখেননি এখনও। এ হচ্ছে ক্ষ্যাপার ঝুলি। কতকিছু যে আছে এর মধ্যে—'

'যেমন?'

'আমার বিশ্বাস তার কিছু কিছু আপনারা এখান থেকে ফেরার আগেই হয়ত দেখে যেতে পারবেন—' বলে উঠে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী। পরিদাদুদের দিকে চেয়ে নির্দেশ দেবার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, 'আলো কমে আসছে। ফিরে যান আপনারা। সন্ধ্যার পর এ জায়গাগুলো আজকাল আর খুব ভালো নেই। তাছাড়া সাপ খোপেরও ভয় আছে।'

পরিদাদুও সমর্থন করলেন তাঁর কথায়। সন্ন্যাসীকে আবারও হাত জোড় করে 'নম নারায়ণায়' জানিয়ে ফেরার পথ ধরল শাওনরা।

ফেরার সময় একটু দ্রুতই পথ হাঁটছিল তারা। তবু কুবের ভাণ্ডারি তীর্থ ফেলে সিকি মাইলটাক পথ আসার পরেই সূর্যের আলো বেশ কমে এল। আর আলো কমে যেতেই সেই পাহাড়ি জঙ্গলের পথটা আরও নির্জন, আরও থমথমে হয়ে গেল।

শাওন মা বাবার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিল, পরিদাদু একটু আগে আগে হাঁটছিলেন। হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন পরিদাদু। হাতের ইশারায় থামতে বললেন শাওনদেরও। শাওনরা দাঁড়িয়ে পড়ল। পাহাড় ও জঙ্গলের গা গড়িয়ে তখন অন্ধকার নামছে ধীরে ধীরে। সেই আবছা আলোতেও স্পষ্ট দেখা গেল তিনটি রুক্ষ চেহারার লম্বা লম্বা চুলওলা অ্যাংলো ছেলেকে। তাদের সামনে দাঁড়ানো চব্বিশ—পঁচিশ বছরের প্যান্ট আর টি শার্ট পরা আর একটা ছেলে। অ্যাংলো ছেলেগুলো পকেট থেকে এক গোছা টাকা ছেলেটির হাতে দিতেই প্যান্টের হিপ পকেট থেকে একগোছা কাগজের মোড়ক বের করল সে। কাগজের মোড়কটা খুলে তার মধ্যে থেকে ছোট ছোট কিছু পাউচ বের করে সে ছেলেগুলোর হাতে দিল। ঠিক এই সময়ে একটা মশা পিঁহহ করে উড়তে উড়তে ঢুকে পড়ল শাওনের নাকের মধ্যে আর সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচ্ছো করে হেঁচে ফেলল সে। চারজনেই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল সেইদিকে। প্রায় অন্ধকার হয়ে আসা পথের ওপর শাওনদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমটা হকচকিয়ে গেল তারা। পরক্ষণেই পিছন ফিরে দৌড়ে রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের পথে হারিয়ে গেল ছেলেগুলো। যে ছেলেটি পাউচগুলো বিক্রি করল পরিদাদু তার পিছনে ধাওয়া করলেন, কিন্তু অন্ধকার বনপথে ছেলেটি যে কোথায় মিলিয়ে গেল তার সন্ধান পাওয়া গেল না। হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে এলেন পরিদাদু। তারপর রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছেলেটার দলা পাকিয়ে ফেলে দেওয়া কাগজের মোড়কটা খুঁজে বের করে সেটা তুলে নিলেন ঝুঁকে পড়ে। শাওনরা কাছে আসতে হাত দিয়ে কাগজটাকে সমান করতে দেখা গেল কাগজটার ওপর মোটা হরফে ইংরেজি ODD শব্দটি ছাপা রয়েছে। কাগজের পিছনে কলম দিয়ে হিন্দিতে একটা কিছু লেখা কিন্তু আলো কমে আসায় লেখাটা পড়া গেল না আর। কাগজটাকে ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে পরিদাদু বললেন, 'দ্রুত পা চালাও।'

ওঁকার আশ্রমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে অরুণাংশু গজগজ করতে লাগলেন, 'পরি তোমার কিন্তু এটা বাড়াবাড়ি। অযথা ছেলেগুলোর পিছনে ছোটার কী দরকার ছিল তোমার? এ তো বিপদকে ডেকে আনা। ছোঁড়াগুলোর কাছে যদি অস্ত্র থাকত— তাছাড়া বেড়াতে এসেছো বেড়াও— কোথায় কী হচ্ছে তাতে তোমার মাথা গলানোর দরকারটা কী— তুমি পুলিশ না গোয়েন্দা— ডিফেন্সে চাকরি করতে বলে তুমি কি এখনও নিজেকে আইনের রক্ষক ভাবো নাকি সবসময়?'

পরিদাদু নিঃশব্দে হাঁটতেই থাকলেন। অরুণাংশুর কথার কোনো জবাব দিলেন না।

আশ্রমে ফেরার পরেও পরিদাদু অস্বাভাবিক রকম চুপ হয়ে রইলেন। রাতের প্রসাদও নিলেন প্রায় কোনো কথা না বলেই। খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে এসে দাঁড়ালো যখন শাওনরা সকলে; পরিদাদু তখনও নীরব। শাওনের পরিদাদুকে এইভাবে দেখতে একটুও ভালো লাগছিল না। সবসময় সবাইকে নিয়ে কত হই চই করেন মানুষটা। পরিদাদুর সঙ্গে বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে শাওন তো প্রায় সেঁটেই থাকে পরিদাদুর সঙ্গে। কেননা পরিদাদু মানেই হাজার গল্প আর দেদার মজা। সেই মানুষটাই যদি এমন ভ্রূ কুঁচকে গোমরা থেরিয়াম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মুখে কুলুপ এঁটে কার না খারাপ লাগে। খারাপ লাগছিল অরুণাংশু সুছন্দারও। সুছন্দা একবার গিয়ে সামনে দাঁড়ালেন তাঁর। জিজ্ঞেস করলেন, 'কী গো পরিকাকু কী হল তোমার? অরুণের কথায় কি রাগ করেছো তুমি?'

পরিদাদু উত্তর না দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে পায়চারি করতে আরম্ভ করলেন ছাদের একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত। শাওনও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগল চুপটি করে। এই ছাদের একপ্রান্তে গেলে নীচে পাথরের ওপর দিয়ে ঝরঝর ঝরঝর শব্দ করে বয়ে চলা নর্মদাকে দেখতে পাওয়া যায় অপর প্রান্ত থেকে দেখা যায় পাহাড়ের গা ঘেঁষে এগিয়ে চলা পরিক্রমা মার্গটি। এখন নদীর আওয়াজ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। সেই নৈঃশব্দ ভেঙে অরুণাংশু বলে উঠলেন অসহিষ্ণু গলায়, 'দেখো পরি, সত্যিই আর ভালো লাগছে না। তোমার হঠাৎ এমন মৌনব্রত গ্রহণ করার কারণটা দয়া করে বলো—'

পরিদাদু পায়চারি থামালেন। তারপর অরুণাংশুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, 'খটকা, অনেকগুলো খটকা আর প্রশ্ন—'

'কীসের খটকা?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন অরুণাংশু।

একটুক্ষণ চুপ করে থাকলেন পরিদাদু। তারপর বললেন 'আচ্ছা অরুণ, সত্যি করে বলো তো, সাধুবাবাটির সঙ্গে কথা বলার সময় তোমাদের কোনো অসঙ্গতির কথা মনে হয়নি কখনও?

'কী ধরনের অসঙ্গতির কথা বলছ?'

'এমন মনে হয়নি যে লোকটা সাধুর ভেক ধরে আছে। ও সত্যি সত্যি সাধু নয়—'

'যাঃ, কী যে যা তা কল্পনা করো না তুমি—'

সুছন্দাও সমর্থন করেন অরুণাংশুকে, এ তোমার ভারি অন্যায় পরিকাকু, মনগড়া রহস্য তৈরি করে যাকে তাকে সন্দেহ করা শুরু করেছো তুমি। যাই বলো বাপু তুমি, সাধুবাবাকে কিন্তু আমার বেশ লেগেছে। কী ইম্প্রেসিভ চেহারা। কথা বার্তাও কী সুন্দর আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ। বোঝা যায় যথেষ্ট পড়াশোনা আছে ওঁর। কে জানে হয়তো কোনো বড় ঘরের ব্রাইট ছেলে ছিলেন সন্ন্যাস নেবার আগে। তাছাড়া—'

'তাছাড়া কী?'

'ওঁর দেওয়া মাটি লাগিয়ে সত্যি সত্যিই আমার কোমরের ব্যথাটা যেন কম লাগছে—'

'একবার লাগিয়েই?'

'হ্যাঁ গো— বিশ্বাস করো—'

'পরিদাদু হাসলেন, ওটা তোর মনের বিশ্বাস—'

'যাঃ—'

'যাঃ বলিস আর যাই বলিস, এটা পুরোপুরি সাইকোলজিক্যাল—'

'আচ্ছা সন্ন্যাসীকে যে তোমার সন্দেহ হচ্ছে, তার কি নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'আছে।'

'কীরকম।'

নাম্বার ওয়ান, যে লোকটা দীর্ঘদিন ঘরছাড়া এবং যে মাঠে ঘাটে পর্বতের গুহায় থাকে তার হাত পায়ের নোখ থেকে সারা শরীরে এমন শহুরে পালিশ আসে কীভাবে?'

'আর?'

'নাম্বার টু, যে লোকটা দীর্ঘদিন খড়ম ব্যবহার করছে তার পায়ে কোথাও কোনোরকম স্ট্র্যাপের সাদা ছাপ পড়েনি তো— সাধারণত যারা পুরো পা মোড়া জুতো ব্যবহার করে না তাদের পায়ে রোদে পোড়া কালো অংশের মধ্যে জুতোর ঢাকা অংশের সাদা ছোপ পড়ে যায়। তাছাড়া বাবাজির খড়মটির বয়েসও বেশি বলে মনে হল না এবং খড়ম পরে বাবাজির পায়ে পড়া ফোসকার দাগও স্পষ্ট দেখতে পেলাম—'

'কোনো ভক্ত তো সম্প্রতি তাঁকে পাদুকাটা কিনেও দিতে পারে?'

সুছন্দা যুক্তি দেখালেন সাধুর হয়ে।

'পারে', পরিদাদু বললেন, 'কিন্তু সাধুর পরণের কাপড় এমন কী কমণ্ডলুটাও যে ব্র্যান্ড নিউ—'

'কী করে বুঝলে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন সুছন্দা।

'পরণের কৌপিনটা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে নতুন, এখনও কাপড়ের মাড় ভাঙেনি।

'আর কমণ্ডলু?'

নতুন বাসনটাসন কিনলে দেখবি তার গায়ে কোম্পানির স্টিকার আটকানো থাকে আঠা দিয়ে। স্টিকারটা তুলে দেবার পরেও আঠার কালো দাগটা থেকে যায়। মাজা—ঘষা করতে করতে উঠে যায় ওটা। সাধুর কমণ্ডলুর ওপর স্টিকারের আঠার গোল দাগটা স্পষ্ট হয়ে লেগে রয়েছে। সম্ভবত কেনার পর থেকে একবারও মাজা হয়নি ওটা—'

'স্ট্রেঞ্জ—' বললেন অরুণাংশু।

'তোমার কি ধারণা সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ পরে ওই লোকটাই মাদক আর চোরাচালানের পাণ্ডা হিসেবে কাজ করছে এখানে বসে, যাকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে হন্যে হয়ে?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদুকে।

'অসম্ভব কিচ্ছু নয়। বিশেষত কাগজের মোড়কের মধ্যে রোগ সারানোর বালি মাটির নামে ঠিকঠাক লোকের হাতে মাদক পৌঁছে দেবার যথেষ্ট সুবিধা আছে লোকটার। কিন্তু তাও একটা খটকা থাকছে—'

'আবার খটকা কীসের?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'ওই যে লিফলেটের মতন কাগজটা—'

'যেটায় ড্রাগস—এর প্যাকেটগুলো মোড়া ছিল?'

'হুঁ।'

'কাগজটা কী সমস্যা করল আবার?'

'কাগজটা সমস্যা করেনি, কিন্তু ওর ওপরে ছাপানো ODD শব্দটা— ওটার কী মানে? ওটা কি কোনো বিশেষ কোড— অথবা কোনো দোকান বা কোম্পানি— আর কাগজের পিছনে লেখা বুডঢা বাবা সাতবিশ কথাগুলোরই বা মানে কী? আর যদি জানা যেত কাগজের পিছনের হাতের লেখাটা কার—' বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে ছাদের একপ্রান্তের রেলিং ধরে নীচের দিকে ঝুঁকে কী যেন দেখতে লাগলেন পরিদাদু।

শাওন এগিয়ে এসে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কী দেখছ পরিদাদু?'

'একটা লোক—'

'কে লোক—' বলতে বলতে এগিয়ে এলেন অরুণাংশু। লোকটা পরিক্রমা মার্গ ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে ওপর দিকে। ডানহাতে ঝোলানো একটা পুঁটলি, বাঁ হাতে ছোটো লণ্ঠন। লোকটার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শাওনই বলে উঠল হঠাৎ, 'পরিদাদু পি.সি.ও. এস.টি.ডি বুথের সেই লোকটা—'

চকিতে শাওনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন পরিদাদু। জিজ্ঞেস করলেন, 'কী বললি?'

'পি.সি.ও এস.টি.ডি বুথের সেই লোকটা।' আবার বলল শাওন।

পিসিও এস. টি. ডি আই এস.ডি— পি.সি.ও এস.টি.ডি আই.এস.ডি—' বলতে বলতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল পরিদাদুর। 'থ্যাঙ্ক ইউ শাওন' সত্যি তুই জিনিয়াস। ইশ এই কথাটা আমার মাথায় এল না—' বলতে বলতে শাওনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন পরিদাদু।

'কী হেঁয়ালি শুরু করলে বলো দেখি—' অসহিষ্ণু গলায় বললেন অরুণাংশু।'

'বুঝলে না PCO, STD, ISD—এর লিফলেট থেকে ছিঁড়ে নেওয়া কাগজের টুকরো। অর্থাৎ ওই ছেলেটাই—' বলতে বলতে ছাদের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নীচে নেমে গেলেন পরিদাদু। শাওনরা ছাদ থেকেই দেখতে পেল রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে টেলিফোন বুথের সেই ছেলেটার পিছু নিলেন পরিদাদু।

অনীশকাকু যখন আশ্রমে এলেন তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ছটা। কাল রাতে সেই যে বেরোলেন পরিদাদু, ফিরলেন একেবারে প্রায় শেষ রাতে। শাওন জানতেই পারেনি কখন তিনি ঢুকলেন আর কখনই বা ঘুমোলেন। ভোরবেলা শাওন ঘুম থেকে উঠে যখন তৈরি হচ্ছে বেরোবার জন্যে, অরুণাংশু সুছন্দাকে বলছিলেন, পরিটা বোধহয় আজ আর যেতে পারবে না আমাদের সঙ্গে। এত রাতে ফিরে আর কি শরীর বয় মানুষের?'

সুছন্দা বললেন, 'এত রাত হলো কেন বলো তো—?

'কী করে বলি বলো তো। জানোই তো ও বরাবরই একটু খেয়ালি আর জেদি। মাথায় একটা কিছু ঢুকলে তো তার শেষ না দেখে ছাড়বে না—'

'তাতে তো অনেক সময় ঝুঁকিও থাকে, বলো—'

'তা তো থাকেই। কিন্তু কে ওকে বোঝাবে সে কথা। তাছাড়া সাহস বস্তুটা তো ওর চিরকালই বেশি—'

'ওইটাই তো চিন্তার। সবসময় সবকিছুতে তো সাহস দেখানো ভালো নয়। কখন কী বিপদ আসে কোন দিক থেকে কেউ কি বলতে পারে আগে থেকে?'

'কথাটা তো ঠিকই। এই যেমন ধরো কাল। হুট করে রাত্তির—বেলা অমন করে বেরিয়ে যাওয়ার কী দরকার ছিল ওর। সবচেয়ে বড় কথা তুই যখন বুঝতে পারছিস ওই ছোঁড়াটা আর ওই সাধু মাদক পাচার আর চোরাচালানের গ্রুপটার সঙ্গে জড়িত—'

'পরিকাকুর একা একা কাল অমন করে চলে যাওয়াটা একদম উচিত হয়নি। কী যে চিন্তা হচ্ছিল না আমার, রাত্তিরবেলা তো ঘুমোতেই পারিনি একদম।' সুছন্দা বললেন।

অরুণাংশু ও সুছন্দার কথা শুনতে শুনতে উত্তেজনায় ফুটছিল শাওন। কৌতূহল চেপে রাখাতে না পেরে সে এবার জিজ্ঞেস করে ফেলল,

'পরিদাদু কি কালকেই লোকগুলোকে ধরে ফেলেছে মা?'

'মনে তো হয় না—'

'ইশ দুষ্টু লোকগুলোকে চিনে ফেলার পরেও পরিদাদু এমনি এমনিই ছেড়ে দিলেন?'

'তোমার পরিদাদুর কীই বা করার ছিল বলো, সুছন্দা বললেন, উনি যে একা।'

'তাছাড়া দুষ্টু লোকগুলোকে ধরার কাজ তো পুলিশের—' অরুণাংশু বোঝানোর চেষ্টা করলেন শাওনকে। শাওন খুব খুশি হল না। লোকগুলো ধরা না পড়ায় পরিদাদুর কৃতিত্ব কোথায় যেন একটু খাটো হয়ে গেল বলে মনে হল তার। একটু মন খারাপের সুরেই সে বলল, 'পরিদাদু পুলিশকে জানালেন না কেন। তাহলে পুলিশের সাহায্য নিয়েই তা লোকগুলোকে ধরে ফেলতে পারতেন উনি?'

শাওনের কথাটা হালকাভাবে নিলেন না অরুণাংশু। সুছন্দাকে বললেন তিনি, 'আমরাও কিন্তু মনে হচ্ছে ব্যাপারটা এবার পুলিশকে জানানো উচিত। অনীশবাবু এলে ওঁর সঙ্গে আলোচনা করে লোকাল পুলিশকে ব্যাপারটা ইনফরম করুক পরি। অনীশবাবু সঙ্গে থাকলে সুবিধাই হবে ওর। হাজার হোক এই এলাকায় ওঁর যাতায়াত আছে। চেনাজানাও আছে অনেকের সঙ্গে।

'উঁহু, উঁহু— একদম নয়, একদম নয়—' বলতে বলতে বাইরে বেরোনোর জন্যে পুরোদস্তুর তৈরি হয়ে ঘরে ঢুকলেন পরিদাদু।

'একি তুমি একদম রেডি—' অবাক হয়ে বললেন সুছন্দা, কাল অত রাতে ফিরলে, আমরা তো ভাবলাম আজ আর তুমি বেরোতেই পারবে না—'

পরিদাদু হাসলেন, 'ভুলে যাচ্ছিস কেন খুকু আমি মিলিটারিতে ছিলাম পনেরো বছর। মাত্র একটা রাত্তিরের ধকলে ক্লান্ত হয়ে পড়ব আমি—' অরুণাংশু বললেন একটু গলাখাকারি দিয়ে, 'পরি আমরা আলোচনা করছিলাম অনীশবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে—'

'বললাম তো না—' তাঁকে থামিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন পরিদাদু, আমি চাই না অনীশবাবুকে এক্ষুনি ব্যাপারটার মধ্যে জড়ানো হোক—'

'কিন্তু কেন?'

'অযথা ওঁকে টেনশানের মধ্যে ফেলে কী লাভ। তাছাড়া—'

'তাছাড়া কী?'

অনীশবাবুকে বিষয়টা জানিয়ে পুলিশের সাহায্য চাইবার আগে কতকগুলো বিষয়ে আরও একটু শিওর হওয়া দরকার আমার—'

'এখনও'?

'হুঁ' এখনও। বলে ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গেলেন পরিদাদু।

যে পথে কাল কুবের ভাণ্ডারী তীর্থে গিয়েছিল শাওনরা, সেই পথেই হাঁটা শুরু হল আজও। সেই একই রকম নির্জন পথ। মাঝে মাঝে আশেপাশে এক আধজন সাধু সন্ন্যাসীর ছোট্ট আনাড়ম্বর আস্তানা। সাধারণ মানুষজনের বসতি চোখেই পড়ে না রাস্তার আশেপাশে। গাছপালার ডালে ডালে বানরেরা লাফালাফি করছে আগের দিনের মতোই। তাদের দু'চারটে আবার শাওনদের দেখে তরতর করে গাছ থেকে নেমে এসে সামনে দাঁড়িয়ে হাত পেতে খাবার চাইতে লাগল মুখের দিকে জুল জুল করে তাকাতে তাকাতে। সুছন্দা বললেন, 'ইশ বড্ড মায়া লাগছে গো। ব্যাগে করে এদের জন্যে খাবার দাবার কিছু আনলে ভালো হত।'

অনীশ বিশ্বাস বললেন, 'ঠিকই আছে। খাবার আনলে রীতিমতন বিপদে পড়ে যেতেন বউদি। দু—একটাকে দিলেই পাল পাল নেমে আসত আপনার কাছে। তখন সামাল দেওয়াই কষ্টকর হত। দেখতেন কাঁধের ব্যাগ—ট্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে দিত দস্যিগুলো—'

পরিদাদু আজ একেবারেই গম্ভীর। কথাবার্তা বলছেনই না প্রায়। মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে কোনো একটা বিষয়ে গভীর চিন্তার মধ্যে রয়েছেন। শাওনের ভালো লাগছিল না। পরিদাদুর পাশে পাশেই হাঁটছিল সে অথচ তেমন একটা গল্প টল্প শোনা যাচ্ছে না ওঁর মুখ থেকে। এমনকি কাল ওই বদ লোকটাকে ধাওয়া করার পর কী হল সে বিষয়েও জানা যাচ্ছে না কিছু। কুবের ভাণ্ডারী তীর্থের কাছে পৌঁছেই সাধুবাবার কথা মনে পড়ল। কী করছে এখন লোকটা কে জানে। আদৌ এখনও ওখানে আছে কিনা তারই বা ঠিক কী। পরিদাদু যে তার ভেক ধরে ফেলেছেন তা কি লোকটা জানে? শাওনের মনে হল লোকটা একথা জানলে পরিদাদুর ওপর তার একটা আক্রোশও তো তৈরি হতে পারে। শাওনের বুকের ভিতরটা গুড়গুড় করে উঠল হঠাৎ। ভয় ভয় করতে শুরু করল খুব। কে জানে এই ঝোপ জঙ্গলের আড়ালেই হয়তো অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। পরিদাদুকে এ বিষয়ে সাবধান করে দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল শাওন। পরিদাদু পই পই করে বলে দিয়েছেন যে তাদের গত কালকের অভিজ্ঞতার কথা কোনোভাবেই আজকে প্রকাশ করা যাবে না। শাওন আশপাশের জংলি গাছপালা আর পাহাড়ের দিকে তাকাতে তাকাতে নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল।

সুছন্দা বললেন, 'অনীশবাবু ভূতের মতন শুধু তো হেঁটেই চলেছি আমরা। কিছু বলুন—'

'কী শুনতে চাইছেন?'

'এই জায়গাটা সম্পর্কেই বলুন কিছু—'

'কাছেই একটা সঙ্গম আছে। কাবেরি আর নর্মদার। আমি তো আগে গেছি কয়েকবার। আপনারা ইচ্ছে করলে দেখে আসতে পারেন একবার।'

'দরকার নেই', নিরাসক্ত গলায় বললেন পরিদাদু, 'ওখানে গেলে দেরি হয়ে যাবে অনেক। একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আমার না একটা খুব জরুরি কাজ ছিল। আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। তাছাড়া একটা ওষুধ খাওয়ার আছে বেলা একটা নাগাদ। ওষুধটা সঙ্গে নেওয়া হয়নি।'

পরিদাদুর দিকে একঝলক তাকিয়ে নিলেন অনীশ বিশ্বাস। তারপর বললেন, 'আপনার কী ব্যাপার বলুন তো?'

'কেন?' পরিদাদু কষ্ট করে হাসি টেনে আনলেন মুখে।

'আপনাকে আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।'

'কীরকম?'

'যাই বলুন, আজ আপনার মুড অফ।'

'আরে না না', সহজ হবার চেষ্টা করলেন পরিদাদু, 'আসলে একটা খুব জরুরি ফোন আসার কথা আছে আমার কলকাতা থেকে। ফোনটা না আসা পর্যন্ত একটু টেন্সড আছি—' পরিদাদু হালকা হাসলেন।

'কার ফোন গো পরিকাকু?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন বিস্মিত কণ্ঠে।

'ত্রিতপ রায়—'

'সে আবার কে?'

'তুই চিনবি না। আমার বন্ধু। নিউ আলিপুরে থাকে।'

'ও।' বলে চুপ করে গেলেন সুছন্দা।

বুক পকেট থেকে বের করে টেলিফোনটা হাতে নিলেন পরিদাদু। তারপর অনীশবাবুর সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটতে লাগলেন। এবার অবশ্য আর অতখানি চুপচাপ রইলেন না তিনি। হাঁটতে হাঁটতেই বলতে লাগলেন, 'এই ওঁকারেশ্বর পাহাড়টা নর্মদার ওপরে একটা দ্বীপের মতন। অর্থাৎ পাহাড়ের দুদিক দিয়েই প্রবাহিত হয়ে পাহারটাকে বেড় দিয়ে এগিয়ে গেছে নদী। এই পাহাড়ই প্রাচীনকালের বৈদুর্যপর্বত—' কথা বলতে বলতেই ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল পরিদাদুর হাতের মধ্যে। পরিদাদু ফোনটা চোখের সামনে তুলে নাম্বারটা দেখলেন। চোখের ইশারায় অনীশবাবুকে বোঝালেন যে প্রত্যাশিত ফোনটাই এল এতক্ষণে। ফোন রিসিভ করলেন পরিদাদু, হ্যাঁ, বলো ত্রিতপ—'

হ্যাঁ তোমার ফোনের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।'

হুঁ, টেনশন হচ্ছিল।

ঠিক আছে। তুমি বললে যখন ব্যাস নিশ্চিন্ত হলাম।

আমাকেও যেতে হবে? ফিরে গেলে হবে তো?

আচ্ছা। হ্যাঁ।

হ্যাঁ বলো।

এক মিনিট দাঁড়াও—' বলে পকেট থেকে তাঁর ছোট্ট নোটবুক আর কলমটা বের করে অনীশ বিশ্বাসের হাতে দিয়ে ইশারায় লিখতে বললেন তাঁকে পরিদাদু।

'বলো এবারে—' বলে অনীশবাবুর দিকে একটু ঝুঁকে বলতে লাগলেন পরিদাদু, 'বুদ্ধদেব বাপুলী... সাতাশ বাই ছয় ঢাকুরিয়া স্টেশন রোড—'

পরিদাদু ফোনটা ছেড়ে হাত বাড়িয়ে নোটবুক আর কলমটা নিলেন অনীশবাবুর থেকে। লেখাটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন একবার তারপর হেসে বললেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ। অনেক উপকার করলেন আপনি আমার—'

অনীশবাবুও হাসলেন। লাজুক হাসি। তারপর বললেন, 'উপকার আর কী। আমার তো বরং লজ্জা লাগছে। কী ভাববেন আপনি। বাঙালি হয়ে বাংলা লিখতে পারি না, হিন্দিতে লিখতে হল শেষ পর্যন্ত। অ্যাকচুয়ালি কলকাতায় পড়াশুনা করলেও আমার ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল ইংলিশ আর সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দি—'

'মিথ্যে লজ্জা পাচ্ছেন আপনি,' পরিদাদু আশ্বস্ত করলেন তাঁকে, 'কলকাতার অনেক বাঙালিই বাংলা লিখতে পড়তে পারে না আজকাল—'

পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে পরিদাদু অরুণাংশুকে জিজ্ঞেস করলেন,

তোমার ক্যামেরাটা সঙ্গে এনেছো তো?'

'হ্যাঁ কেন?'

'একটাও তো ছবি তুলতে দেখলাম না এখনও—'

'পথের ছবি তুলে কী হবে? মেইন স্পটগুলোয় পৌঁছাই আগে।'

'তুমি এক্কেবারে বেরসিক। কই দাও, ক্যামেরাটা আমাকে দাও। আমিই আজ ফোটোগ্রাফার। ভয় নেই, ছবি আমি মন্দ তুলি না—'

'ছন্দাকে বলো। ওর ব্যাগে আছে ক্যামেরাটা।'

পরিদাদু সুছন্দার কাছ থেকে ক্যামেরাটা চেয়ে নিয়ে গলায় ঝোলালেন। শাওনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কেমন মানিয়েছে আমায় বল শানু—'

'দারুণ' বলে হাততালি দিয়ে উঠল শাওন।

অন্যরাও হেসে উঠলেন পরিদাদুর কথায়। শাওনের খুব ভালো লাগছে এখন। অনেকক্ষণ পরে যেন আসল পরিদাদুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে এইবার। উৎসাহের সঙ্গে সে বলল, 'পরিদাদু আমাদের একটা গ্রুপ ফোটো তুলে দাও তাহলে— পরিদাদু খুশি হলেন, 'গুড আইডিয়া— সকলে দাঁড়িয়ে পড়ো তাহলে—'

শাওনরা দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার পাশে একটা গাছের নীচে, পরিদাদু মাথা নাড়লেন, 'এখানে নয় এখানে নয়—'

'তাহলে?' চোখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'একটু ওপরে উঠে ওই যে ভাঙা ভাঙা পাথরের তোরণটা রয়েছে ওইখানে—'

সুছন্দা বললেন, 'বাপরে পাথরগুলো হেলে রয়েছে যে। হুড়মুড় করে গায়ের ওপর ভেঙে পড়বে না তো—'

'সম্ভাবনা কম। ও ভাবেই শত শত বছর দাঁড়িয়ে রয়েছে ওটা—' পরিদাদু আশ্বস্ত করলেন তাঁকে।

'ওটাই কী মান্ধাতার আমলের প্রবেশ দ্বার নাকি?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে।'

'ইয়েস স্যার,' পরিদাদু হাসলেন 'ওটার মতন আরও কয়েকটা আছে।' পরিক্রমা পথে চোখে পড়ে যাবে।'

'সত্যিই মান্ধাতার আমল থেকে এগুলো এইভাবে টিকে আছে?' অবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন সুছন্দা।

মানুষের তাই তো বিশ্বাস। কেউ কেউ অবশ্য বলেন মান্ধাতা নন, এই বিশাল প্রাসাদ—তোরণ ইত্যাদি তৈরি করিয়েছিলেন তাঁর পুত্র মুচকুন্দ—'

'তাই বা কম কী—' চোখ গোল গোল করে বলেন সুছন্দা।

পরিদাদু প্রসঙ্গ পালটালেন, 'তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ো সকলে— অনীশবাবু আপনিও চলে আসুন—'

অনীশবাবু ইতস্তত করলেন, 'আবার আমি কেন, থাক বরং আপনি দাঁড়ান। আমি ছবি তুলে দিচ্ছি—'

'খবর্দার', ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বললেন পরিদাদু, 'বলেছি না আমিই আজ ছবি তোলার দায়িত্বে—'

অনীশবাবু কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন শাওনদের দিকে।

পরিদাদু আবার থামলেন তাঁকে। অনীশ বিশ্বাস অবাক হলেন,

'কী হল আবার?'

'আপনার ব্যাগটা—'

'ব্যাগ—কেন ব্যাগে কী সমস্যা—'

'ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ভালো লাগছে না। ওটা আমায় দিয়ে দিন, আমি ধরছি—'

'যাঃ কী যে বলেন আপনি। অসুবিধে নেই, থাকই না ব্যাগটা।

'ব্যাগে কি খুব মূল্যবান কিছু আছে? আমি কিছুক্ষণ ব্যাগটা আমার কাছে রাখলে কি চোট যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিছু—' হালকা গলায় কথাগুলো বলতে বলতে অনীশবাবুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ব্যাগটা নিজে কাঁধে নিয়ে নিলেন পরিদাদু। তারপর তাড়া দিলেন সকলকে, 'দাঁড়িয়ে পড়ো সক্কলে। রেডি—'

পরিক্রমা পথটার প্রায় সমস্তটাই ভীষণ ভালো লাগছিল শাওনের। রোদ্দুর উঠে যাওয়ার পর হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছিল অবশ্য। তবে পথের গম্ভীর পবিত্র সৌন্দর্য আর প্রাচীন ইতিহাসকে সামনে দাঁড়িয়ে স্পর্শ করার আনন্দ সেই কষ্টটুকুকে ঢেকে দিচ্ছিল। গৌরী সোমনাথ মন্দিরে পৌঁছে অবাক হয়ে গেল শাওন। অরুণাংশু সুছন্দার মুখ হাঁ। এত বিশাল শিবলিঙ্গ যে হতে পারে ধারণাই ছিল না ওদের। কুচকুচে কালো আর চকচকে পাথরের লিঙ্গ থেকে যেন আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। যেমন উঁচু লিঙ্গ তেমনই তার ব্যাপ্তি। একজন মানুষ দু—হাত ছড়িয়েও জড়াতে পরাবে না শিবলিঙ্গটি। পরিদাদু বললেন একসময় শিবলিঙ্গটি নাকি ছিল স্বচ্ছ স্ফটিকের তৈরি। তখন এই লিঙ্গের সামনে কোনো মানুষ এসে দাঁড়ালে পরজন্মে সে কী হবে তা নাকি ফুটে উঠত স্ফটিক লিঙ্গের মধ্যে—'

'উরিব্বাস—' শাওন বলে উঠল।

'এখন দেখা যায় না?' মন্দিরের শিবঠাকুরের দিকে চেয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করতে করতেই জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'না।' বলেই হো হো করে হাসতে লাগলেন পরিদাদু, 'ভাগ্যিস দেখা যায় না। দেখা গেলে আমাদের মতন মানুষদের কী হাল হত, বলুন অনীশবাবু—' পরিদাদু অনীশ বিশ্বাসের দিকে তাকালেন। অনীশ বিশ্বাস হাসলেন না। গম্ভীর হয়ে রইলেন। তারপর পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি জন্মান্তর মানেন?'

'কেন আপনি মানেন না?' ঘুরিয়ে তাঁকেই প্রশ্ন করলেন পরিদাদু।

'না' স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন অনীশ বিশ্বাস। তারপর শাওনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'শাওন চলো, আমরা আদি ওঁকারেশ্বর মন্দিরের দিকে রওনা হই।'

'আদি ওঁকারেশ্বর আদি—' বলতে বলতে মুচকি হাসলেন পরিদাদু।

'হুঁ। ওনাকে সিদ্ধিনাথও বলা হয়—' অনীশবাবু বললেন।

'জানি', পরিদাদু বললেন, 'কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর জ্ঞাতিহত্যার পাপ মোচনের জন্যে ওইখানে তপস্যা করেছিলেন পঞ্চপাণ্ডবেরা—'

'আপনি কি ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন?' অনীশবাবু পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন।

'না না। আসলে এদিকে আসার আগে দু—একটা বইপত্তর আর নেট ঘাঁটাঘাঁটি করে এসব তথ্য জানলাম।' বলে চুপ করে গেলেন পরিদাদু। তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, 'অনীশবাবু আপনি কবে যেন ফিরে যাচ্ছেন এখান থেকে?'

'কাল।'

'কাল কখন—' সকালে?

'না রাতে—' বলে খুব তীক্ষ্ন চোখে পরিদাদুর দিকে তাকালেন অনীশবাবু, 'কেন বলুন তো?'

'আমরাও তো পরশু রওনা হচ্ছি এখান থেকে। ভাবছিলাম কদিন বেশ কাটল আপনার সঙ্গে। কাজেই কাল বাদ পরশু একসঙ্গে ফিরলেই হত—'

'আমার একটু কাজ আছে। কাল বিকেলে আমার এক পার্টি আসছে মুম্বাই থেকে, আপনাদের তো বলেছিলাম। ওঁকে মিট করেই বেরিয়ে পড়তে হবে আমায় এখান থেকে—'

'ওই সময় ফিরবেন কীভাবে?'

'আমার গাড়ি থাকবে।'

'আচ্ছা আচ্ছা তাহলে তো অসুবিধাই নেই কোনো—'

'আপনার দিদির ঠাকুরটা যে আমাদের কাছে রয়েছে। ওটা কি তাহলে আজই নিয়ে নেবেন ফেরার পথে?'

সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন এবার।

'না আজ থাক। কাল বেলার দিকে একবার গিয়ে ঠিক নিয়ে নেবখন আমি সময় মতন। কাল এমনিতে আপনারা আশ্রমেই থাকছেন তো?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ—'

'আসলে আমার হোটেলটাও না ঠিক সেফ নয়—'

'কেন?'

'কেন কে জানে আমার মনে হচ্ছে হোটেলে আমার রুমে কেউ বোধহয় ঢুকেছিল—'

'সেকি, কবে?'

'কাল সন্ধের দিকে—'

'আপনি তখন কোথায় ছিলেন?'

'একটু কাজে বেরিয়েছিলাম—'

'রুমের চাবি কি সঙ্গে ছিল?'

'ছিল।'

'তবে?'

'জানি না।'

'কিছু চুরি—টুরি গেছে?'

'না—'

'জিনিসপত্র হাঁটকানো ছিল?'

'তাও না—'

'তবে?'

'আমি বলতে পারব না কেন এমন মনে হচ্ছে। তবু আমার বিশ্বাস কেউ আমার ঘরে ঢুকেছিল।'

'হোটেলে জাননি?'

'জানিয়েছি।'

'ওরা কী বলছে?'

'জোর দিয়ে বলছে কেউ ঢোকেনি।'

'অনেক সময় রুম ক্লিনিং এর জন্যে—'

'না হোটেল বলছে বোর্ডার না থাকলে ওঁরা সুইপারকে ঘরে ঢুকতে দেন না—'

'অদ্ভুত ব্যাপার তো। অবশ্য এটা আপনার মনের ভুলও হতে পারে।'

'মে বি অর মে নট বি—' বলে অনীশ বিশ্বাস চুপ করে গেলেন। সুছন্দাও কথা বললেন না। হাঁটতে হাঁটতে আদি ওঁকারেশ্বর তীর্থে পৌঁছে গেলেন তাঁরা। আশ্রমে ফেরার পর বেশ ক্লান্তি লাগছিল শাওনের। দুপুরের প্রসাদ নেবার পর ঘুমও পাচ্ছিল খুব। অরুণাংশু সুছন্দাও বলছিলেন যে হাঁটার অভ্যাসটা একেবারে চলে গেছে বলে একটানা এতখানি পাহাড়ি পথ হেঁটে একদম কাহিল হয়ে পড়েছে শরীরটা। কাজেই আজ পুরোপুরি বিশ্রাম দরকার। একমাত্র পরিদাদুকে দেখেই মনে হল যে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই। সুছন্দা বলছিলেন তাঁকে, 'কাল রাত থেকে তো ঘুমোওনি। তার ওপর এতটা পথ হাঁটাহাঁটি হল। সোজা বিছানায় পড়ে লম্বা ঘুম দাও একখানা। পরিদাদু হাসলেন, 'তোরা রেস্ট নে। আমার দুপুরে ঘুমোলে শরীর আইঢাই করে। আমি বরং বিকেলের দিকে একা একাই একটু ঘুরে ফিরে আসি। আর হ্যাঁ, অরুণ, তোমার ক্যামেরাটা বরং আজ আমার সঙ্গেই থাক—'

'কোথায় যাবে?'

'কাজ আছে একটু—'

'বেড়াতে এসে কী এত কাজ তোমার?'

'টেলিফোন বুথের ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে হবে। তাছাড়া কুবের ভাণ্ডারী তীর্থের সাধুবাবার সঙ্গেও একবার মোলাকাত হওয়া দরকার—'

'আবার ওই বদলোকগুলোর সঙ্গে দেখা করার কী দরকার পড়ল তোমার? একটা বিপদ না বাঁধিয়ে মনে হচ্ছে থামবে না তুমি।' অরুণাংশু বিরক্তির সঙ্গে বললেন।

'জলপূর্ণ পাত্রে বাঁকা লাঠিকে প্রপার অ্যাঙ্গেলে ডোবালে রিফ্রেকশানের জন্যে তাকে যেমন সোজা দেখায় তেমনি সেজা লাঠিকেও তো অনেক সময় বাঁকা লাগে—' বলে মিটি মিটি হাসতে লাগলেন পরিদাদু।

'তুমিও যে দেখি কুবের ভাণ্ডারী তীর্থের সাধুবাবার মতন কথা বলতে শুরু করে দিলে—'

পরিদাদু আবার হাসলেন। তারপর নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন, মানুষ চেনা কী এত সহজ বাপু। কত অচেনা লোককে মনে হয় কতকালের চেনা আবার সত্যিকারের চেনা লোককেও কখনও কখনও চিনতে পারা যায় না বুদ্ধির ভুলে—'

অরুণাংশু রহস্যের গন্ধ পাচ্ছিলেন। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনাও বোধ করছিলেন এইবার। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি পরিদাদুকে, 'ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বলো দেখি—'

দু—দিকে মাথা নাড়লেন পরিদাদু। তারপর রহস্যের হাসি হেসেই বললেন, 'আর একটা মাত্র দিন অপেক্ষা করো কষ্ট করে। আশা করি কালই তোমার সব জিজ্ঞাসার সমাধান হয়ে যাবে।'

'কাল?'

হ্যাঁ কাল। বলে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন পরিদাদু। রাতে শুতে যাওয়ার আগে পরিদাদু সুছন্দাকে বললেন, 'খুকু, অনীশবাবুর শিবলিঙ্গটা তোর কাছেই আছে তো?'

'হ্যাঁ কেন?' জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা।

'আজকের রাতের জন্যে ওটা আমার কাছে রাখতে দিবি?'

'কী ব্যাপার বলো তো?'

কালই তো অনীশবাবু নিয়ে যাবেন, ভাবলাম একটা রাত অন্তত আমি একটু পুজোআর্চা করে নিই—'

'পুজো করবে, তুমি?' সুছন্দার মুখ হাঁ।

'নর্মদা লিঙ্গ খুব জাগ্রত বলে শুনেছি। ভক্তিভরে ওঁর কাছে যা চাওয়া যায় উনি নাকি হাত উজাড় করে তাই দেন—'

'তুমি কী চাইবে?'

'আমি—' বলে চোখ বুজিয়ে একটু ভাবলেন পরিদাদু। তারপর হেসে বললেন, 'বলব বাবা, কাল বিকেলে নাটকের শেষ অঙ্কে তুমি আমাদের সঙ্গে থেকো—'

শাওন চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করল, 'পরিদাদু, তোমার মনের মধ্যে কীসব খটকা ছিল বলেছিলে, সে সব রহস্যের কি সমাধান করে ফেলেছো তুমি?'

'হুঁ।' ছোট্ট জবাব দিলেন পরিদাদু।

'তোমার নাটকের শেষ অঙ্কের অভিনয়টা কোথায় হবে?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন হালকা গলায়।

'আদি ওঁকারেশ্বর।'

'কখন?'

'কাল সন্ধে সাতটা নাগাদ—'

'হঠাৎ ওই সময়?'

'বুডঢা বাবা সাতশো বিশ— বলে থামলেন পরিদাদু।

'এ তো সেই লিফলেটের পিছনে লেখা কথাগুলো', সুছন্দা বললেন,

'কিন্তু এর মানে কী?'

'বুডঢা বাবাই আদি ওঁকারেশ্বর শিব যাঁকে সিদ্ধিনাথ বলা হয়।'

'আর সাতশো বিশ?'

'আমার ইনটিউশন বলছে ওটা কাল কুড়ি তারিখ সন্ধ্যা সাতটার কথা বলা হয়েছে।'

'সকাল সাতটা নয় কেন?' অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন।

'সকাল সাতটায় স্থানীয় মানুষের অল্প আনাগোনা থাকতে পারে মন্দিরে, কিন্তু সন্ধেবেলায় জায়গাটা একেবারে ফাঁকা শুনশান—' পরিদাদু উত্তর দিলেন।

'ওই বদসাধু আর তার চেলাটা তাহলে কালই ধরা পড়বে?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'মাদকপাচার আর চোরাচালানের দলের এক বড় পাণ্ডা কাল জালে ধরা পড়ছে এটুকু প্রায় নিশ্চিত।' বলে এক্কেবারে চুপ করে গেলেন পরিদাদু।

শাওন যখন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠল, পরিদাদুর তখন স্নান—টান করা হয়ে গেছে। শাওনকে দেখেই পরিদাদু একগাল হেসে বললেন, 'গুড মর্নিং'।

শাওনও গুড মর্নিং জানাল তাঁকে। পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'খুকু কী করছে শাওন?'

শাওন উত্তর দেবার আগেই সুছন্দা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, 'কী ব্যাপার, সক্কাল, সক্কাল স্নান—টান সেরে রেডি যে একেবারে।' কোথাও চললে নাকি?'

'হুঁ।' বলে হাসলেন পরিদাদু।

'কোথায়?'

'উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি। আসলে চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকতে ভীষণ বোরিং লাগে আমার জানিস তো—'

'তাহলে অরুণকে ডাকি। শানুও তৈরি হয়ে নিক। সকলে মিলেই ঘুরে আসি চলো—'

'গেলেই হত, কিন্তু আমরা সকলে মিলে বেরিয়ে যাওয়ার পর যদি অনীশবাবু আসেন—'

'ঠিকই।' বলেই পরিদাদুর দিকে চাইলেন সুছন্দা। একগাল হেসে বললেন, 'কাল রাতে তোমার শিবপুজো কেমন হল?'

'খুব ভালো।'

'শিবজি কি তোমার ওপর প্রসন্ন হয়েছেন?'

'বিলকুল'। বলে ভারি পরিতৃপ্তির হাসি হাসলেন পরিদাদু। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে শিবলিঙ্গের বাক্সটি এনে সুছন্দার হাতে দিয়ে বললেন, 'যত্ন করে রাখো। ভারি জাগ্রত ঠাকুর ইনি। এক রাতের মধ্যেই খুব জটিল একটা ধাঁধার উত্তর মিলিয়ে দিয়েছেন ইনি আমার—'

'কী ধাঁধা পরিদাদু?' কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল শাওন।

'সেটা তো এখন বলা যাবে না শানুবাবু। এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যে যে আর একটু ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে তোমায়।'

'মাঝে মাঝে বড্ড হেঁয়ালি করো তুমি পরিকাকু, অরুণ ঠিকই বলে—' অনুযোগের সুরে বললেন সুছন্দা।

পরিদাদু তাঁর কথায় প্রতিবাদ করলেন না। আশ্রমের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে নামতে বললেন মজা করে, 'উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠাটা আগে পড়ে নিলে কি গল্প আর জমে খুকু?'

দুপুরের প্রসাদ নেবার একটু পরেই অনীশকাকু আশ্রমে এসে হাজির হলেন। সকলের দিকে চেয়ে একগাল হেসে বললেন, 'দুটো দিন আপনাদের সঙ্গে খুব ভালো কাটালাম।'

'আমরাও' বলে শিবঠাকুরের বাক্স কপালে ঠেকিয়ে অনীশ বিশ্বাসের হাতে তুলে দিলেন সুছন্দা।

'খুব উপকার করলেন আপনারা আমার—' বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন অনীশবাবু। তারপর নিজেও কপালে ঠেকালেন বাক্সটা।

'কী আর এমন করলাম আমরা—' লাজুক মুখে বললেন সুচ্ছন্দা।

অরুণাংশু বললেন, 'কলকাতায় ফিরে যোগাযোগ করবেন কিন্তু। সত্যি সত্যিই দেখবেন দল বেঁধে একদিন আপনার বাড়ি পৌঁছে গেছি আমরা।'

'উলটোটাও তো হতে পারে—' অনীশবাবু হাসলেন,' আমিও চলে যেতে পারি কোনো দিন—'

'ও শিওর—'

'ঠিক আছে। আসি তাহলে।' অনীশবাবু হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন। শাওনের মাতায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'আবার দেখা হবে।'

'নিশ্চয়ই আবার দেখা হবে আপনার সঙ্গে। বলে পরিদাদু হাসলেন অনীশবাবুর দিকে চেয়ে। উনিও হাসলেন। তারপর হাত নেড়ে বেরিয়ে পড়লেন আশ্রম থেকে।

ঘড়িতে তিনটে বাজতে না বাজতেই তাড়া দিলেন পরিদাদু, 'হারি আপ। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে, না হলে দেরি হয়ে যাবে। সময়মতন আদি ওঁকারেশ্বরে পৌঁছতে না পারলে পুরো ব্যাপারটাই কেঁচে যাবে কিন্তু।'

অরুণাংশু ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন, 'ওসব ঝুটঝামেলার মধ্যে ছন্দা শানু না গেলেই তো পারত। কখন কী বিপদ—আপদ ঘটে—'

'তেমন হলে ওদের নিয়ে যাওয়ার কথা আমি বলতাম না।' গম্ভীর গলায় বললেন পরিদাদু। অরুণাংশু কথা বাড়ালেন না।

বাবার কথায় মনে মনে একটু দমে গিয়েছিল শাওন পরিদাদুর কথায় আশ্বস্ত হল সে। দশ বারো মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়ল ওরা।

আদি ওঁকারেশ্বর মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছল যখন শাওনরা তখন বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে ক্রমশ। সেই ম্লান আলোয় ভাঙা ভাঙা কারুকার্য করা সিদ্ধিনাথ মন্দিরের প্রাচীন নাটমন্দিরটি অপূর্ব লাগছিল। কবে কে এই মন্দির বানিয়েছিলেন এত সুন্দর করে কে জানে। এখন নাটমন্দিরের ছাদ আর নেই। কারুকার্য করা পাথুরে পিলারগুলো খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ের মতন। নাটমন্দির পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে লোহার রেলিং দেওয়া দরজা। দরজার ওপারে একা একা বসে আছেন একহাত সমান উঁচু ঈষৎ তামাটে রঙের শিবলিঙ্গ আদি ওঁকারেশ্বর মহাদেব, পরিদাদুর কথায় ছেঁড়া কাগজটিতে উল্লেখিত বুডঢা বাবা—

পুরো এলাকাটাই এক্কেবারে শব্দহীন। মন্দিরের পাশে ও পিছনে বড়ো বড়ো গাছপালার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অস্পষ্ট ঝাড়িপথ ক্রমশ নেমে গেছে কুলকুল শব্দে বয়ে চলা নর্মদার দিকে। হঠাৎই এই থমথমে ভাবটা ভেঙে দিয়ে সাত আটজন মানুষের একটা দল 'নর্মদে হর, নর্মদে হর' শব্দ করতে করতে এসে হাজির হল সেই মন্দিরের কাছে। তারপর নাটমন্দিরে উঠে তাদের ঝোলা গাঁঠরি নামিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল ক্লান্ত ভঙ্গিতে। তাদের মুখে দাড়ি, রুক্ষ চুল, পরনে কৌপিন আর হাতে কমণ্ডুলু। শাওন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল অরুণাংশুকে, 'এরা কারা বাবা?'

'সম্ভবত এরা পরিক্রমাকারীদের একটা দল। অমরকণ্টকে নর্মদার যেখানে উৎস সেখান থেকে সংকল্প করে পায়ে হেঁটে নর্মদা পরিক্রমা করতে বেরিয়েছে এরা। সারাদিন কত হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাতটুকু এরা আজ হয়তো এখানেই কাটাবে মনস্থির করল—'

শাওন অরুণাংশুকে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে পরিক্রমাকারীদের মধ্যে দু—একজন ওদের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল 'হর নর্মদে—'

অরুণাংশুও বললেন 'হর নর্মদে—'

পরিদাদু অরুণাংশুর হাত ধরে টান দিলেন। শাওনকেও তাড়া লাগালেন চাপা স্বরে, 'এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো নিরাপদ নয়। চলো আমরা গাছপালার আড়ালে চলে যাই। ওখান থেকে চুপচাপ লক্ষ রাখতে হবে এলাকাটার ওপর। আর হ্যাঁ। কোনো অবস্থাতেই কেউ কারো সঙ্গে কোনো কথা বলবে না এখানে বসে। আওয়াজও করা যাবে না কোনো। ঠিক আছে?'

'ঠিক আছে।' বললেন অরুণাংশু ও সুছন্দা।

শাওনরা সক্কলে মিলে মন্দির থেকে কিছুটা তফাতে পাহাড়ের খাঁজে ঝোপ জঙ্গল গাছপালার আড়ালে বসে রইল চুপটি করে। একটু একটু করে সময় গড়াতে লাগল। সূর্যের আলোও নিভে এল প্রায়। হঠাৎ মন্দিরের দিকে তাকিয়ে চোখ গোল গোল করে ফেলল শাওন। কুবের ভাণ্ডারী তীর্থের সেই সাধু এসে দাঁড়িয়েছেন নাটমন্দিরের সামনে। উত্তেজনায় স্থির থাকতে পারল না আর শাওন। চাপা গলায় সে ডাক দিল, 'পরিদাদু—'

'হু। মৃদুস্বরে সাড়া দিলেন পরিদাদু।

'সেই সাধুবাবাটি—'

'দেখেছি।'

'এবার কি ওঁকে ধরবে তুমি?'

'না।'

'কখন ধরবে।'

'দেরি আছে।'

'যদি তার মধ্যে লোকটা চলে যায়?'

'চুপ করে থাক। কথা বলিস না আর—' পরিদাদু ধমকের সুরে বললেন। শাওন চুপ করে গেল। ধীরে ধীরে সূর্যের আলো নিভে গিয়ে অন্ধকার নামল চারপাশে। গাছপালার ফাঁক থেকে নানান ধরনের পোকারা গান শুরু করল একসঙ্গে। শাওনের অস্বস্তি হতে শুরু করল খুব। মনে হল সময় যেন কাটতেই চাইছে না আর। একটু পরে অস্বস্তিটা অবশ্য কেটে গেল। আকাশ আলো করে পাহাড় ও গাছপালার মাথায় গোল চাঁদ উঠল। সেই জ্যোৎস্না ধোয়া সন্ধ্যায় আদি ওঁকারেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠল। আর তখনই একহাতে একটা ছোট সুটকেশ নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে শাওনদের একটু তফাতে ঘাসে ঢাকা ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে পড়ল মধ্যবয়েসি একজন মানুষ। লোকটার মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, চোখে চশমা। জিন্সের সঙ্গে হাফশার্ট, পায়ে ভারী জুতো। লোকটা হাতঘড়িতে সময় দেখল তারপর এদিক ওদিক তাকাতে লাগল চঞ্চল ভঙ্গিতে। এই সময় আর একটা লোক ধীর পায়ে এগিয়ে এল সেদিকে। শাওন অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল লোকটার দিকে। হঠাৎ সামনের দিকে তাকাতেই বিস্ময়ে একেবারে বিমূঢ় হয়ে গেল শাওন। অনীশকাকু না! পরিদাদুর দিকে তাকাতেই পরিদাদু ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে কথা না বলতে ইশারা করলেন। শাওন কথা বলল না। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল অনীশকাকুর দিকে।

অনীশ বিশ্বাস পরিক্রমাকারীদের দলটার সামনে দিয়ে এসে দাঁড়ালেন লোকটার সামনে। লোকটা অনীশ বিশ্বাসকে দেখে হাসল। হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, 'সব দিক আছে?'

'ঠিক আছে।' মাথা নাড়লেন অনীশ বিশ্বাস।

লোকটা তার হাতের সুটকেশটা বাড়িয়ে দিল অনীশ বিশ্বাসের দিকে। অনীশ বিশ্বাস তাঁর কাঁধের ব্যাগ থেকে শিবলিঙ্গ রাখা সেই কাঠের বাক্সটা বের করে এনে বাড়িয়ে দিলেন সেই লোকটার দিকে। ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। সিদ্ধিনাথ মন্দিরের নাটমন্দিরের ওপর অলসভঙ্গিতে শুয়ে বসে থাকা লোকগুলো অবিশ্বাস্য ক্ষীপ্রতায় নাটমন্দির থেকে লাফিয়ে নেমে এসে একেবারে ঘিরে ফেলল ওদের দুজনকে।

ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি তড়িঘড়ি পকেটে হাত ঢোকাতে যেতেই মন্দিরের পাশ থেকে হেঁটে বেরিয়ে এসে সোজা লোকটার সামনে দাঁড়ালেন কুবের ভাণ্ডারী তীর্থের সাধু। তাঁর কাঁধের ঝোলা থেকে একটা চকচকে রিভলবার বের করে লোকটার নাকের সামনে দু—বার নাচিয়ে নিয়ে বললেন, 'কোনো চালাকি নয়, বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে দিন—'

পরিদাদু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন 'চলো, বনে বাদাড়ে বসে থাকার আর দরকার নেই। এবার সামনে যাওয়া যাক।'

পরিদাদুর কথা শুনে সুছন্দা আঁতকে উঠলেন, 'কী করছ কী পরিকাকু, বেয়াড়া সাধুটার হাতে যে অস্ত্র রয়েছে। তাছাড়া পরিক্রমাকারী বলে ভুল করেছিলাম যাদের সেই লুটেরাগুলোও যে সাধুর সঙ্গে যোগ দিয়েছে—'

পরিদাদু হাসলেন, 'সাধুর অস্ত্র আমাদের জন্যে নয় খুকু, ও অস্ত্রগুলো অবিনাশ ভার্মাদের মতন বদ মানুষদের শায়েস্তা করার জন্য—'

'অবিনাশ ভার্মাটা আবার কে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু।

কুখ্যাত চোরাচালানকারী ও মাদকপাচার চক্রের পাণ্ডা, যিনি আমাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন অনীশ বিশ্বাস বলে।

'অনীশবাবুই শেষ পর্যন্ত,... আমি তো ভাবতেই পারছি না— সুছন্দা বিস্ময় চেপে রাখতে পারলেন না।

'দীর্ঘদিন ধরে হন্যে হয়ে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছিল লোকটাকে। কিন্তু ক্রমাগত নিজের রূপ পালটে আর নাম ভাঁড়িয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে নোংরা ব্যবসাগুলো চালিয়ে যাচ্ছিল লোকটা—' বলতে বলতে ঝোপ—জঙ্গলের আড়াল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন পরিদাদু। পিছন পিছন শাওনরাও। সাধুর সঙ্গী লোকগুলো ততক্ষণে অনীশ বিশ্বাস মানে আসলে যিনি অবিনাশ ভার্মা এবং তাঁর সঙ্গীকে একেবারে পাকড়াও করে ফেলেছে। পরিদাদুকে দেখেই কুবের ভাণ্ডারী তীর্থের সেই সাধুবাবাটি হাসিমুখে এগিয়ে এসে পরিদাদুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, 'ওয়েল ডান মি. চ্যাটার্জি, আপনি না থাকলে এবারেও হয়তো লোকটা হাত ফসকে ঠিক বেরিয়ে যেত প্রমাণের অভাবে।'

পরিদাদু লাজুক লাজুক মুখ করে মিটি মিটি হাসতে লাগলেন। সাধুবাবা দু—হাত দিয়ে নিজের জটা ও গোঁফ—দাড়ি খুলে ফেললেন। পরিদাদু অরুণাংশুদের দিকে চেয়ে বললেন, 'এসো পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি গোয়েন্দা অফিসার মি. রাকেশ চতুর্বেদী আর এই আমার ভাইঝি সুছন্দা, ওর হাজব্যান্ড অরুণাংশু আর আমার নাতি—'

'শাওন, ইত্তর অ্যাসিট্যান্ট' পরিদাদুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে নিজেই বলে উঠলেন মি. চতুর্বেদী।

পরিদাদুর অ্যাসিস্ট্যান্ট কথাটা শুনে খুব লজ্জা পেয়ে গেল শাওন, মনে মনে একটু আনন্দও যে হল না তা নয়। অরুণাংশু বললেন, 'কিন্তু কিছুই যে বুঝতে পারলাম না এখনও— ওই শিবলিঙ্গের বাক্সটা এই লোকটাকে দিতে চাইছিল কেন ভার্মা? কী আছে ওর মধ্যে?'

চতুর্বেদী পরিক্রমাকারীর বেশে থাকা একটা লোকের দিকে চেয়ে হাঁক দিলেন, শর্মা—'

অরুণাংশুকে লোকগুলোর দিকে অমন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে চতুর্বেদী হাসলেন, 'বুঝতে পারছি এদেরকে দেখে খুবই আশ্চর্য হয়েছেন আপনি—'

'সত্যিই আশ্চর্য হয়েছি— এরা কারা?'

'এরা সকলেই পুলিশের লোক।'

শর্মা নামের ভদ্রলোক এতক্ষণে শিবলিঙ্গের বাক্সটা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন চতুর্বেদীর সামনে। চতুর্বেদী বাক্সটা নিয়ে পরিদাদুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, 'অ্যাজ ইট ইজ ডিসকভারড বাই ইউ, আপনিই এটা খুলুন।'

পরিদাদু বাক্স থেকে শিবলিঙ্গটা বের করলেন। বাঁ হাতে শিবলিঙ্গটা ধরে ডানহাত দিয়ে তার নীচের দিকের অংশটা ঘোরাতে শুরু করলেন। শিবলিঙ্গের বাড়ানো যে অংশটাকে গোরীপীঠ বলে, তার নীচের গোল স্ফীত অংশটা ধীরে ধীরে খুলে চলে এল পরিদাদুর ডানহাতে। আর তার মধ্যের ফাঁপা অংশের মধ্যে থেকে বেরিয়ে পড়ল একটি দুটি করে মোট চারটি প্যাকেট।

'হেরোইন অ্যান্ড ব্রাউন সুগার, একেবারে খাঁটি— বাজারে এর দাম কয়েক লক্ষ টাকা—' বলে উঠলেন রাকেশ চতুর্বেদী।

'সত্যি?' অবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে উঠলেন সুছন্দা।

'সত্যি।' পরিদাদু বললেন।

শাওন এতক্ষণ চুপ করে একধারে দাঁড়িয়ে ছিল লক্ষ্মীছেলে হয়ে। কোনো কথা বলেনি কারো সঙ্গে। এবার গুটি গুটি পায়ে সে রাকেশ চতুর্বেদীর কাছে এগিয়ে এল। তারপর তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, 'সেই কুবের ভাণ্ডারী তীর্থেই আমি বলেছিলাম না যে আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। বিশ্বাস করুন সত্যিই আমার ভালো লেগেছে আপনাকে। আপনি সত্যি সত্যিই খুব ভালো—'

'অথচ দেখো জান—পহেচান হওয়া সত্ত্বেও চ্যাটার্জি কিনা আমাকেই সন্দেহ করে বসল প্রথম থেকে—' হা হা করে হাসতে লাগলেন রাকেশজি।

পরিদাদু লজ্জা পেয়ে গেলেন, 'কেন যে আপনাকে চিনতে পারলাম না প্রথম দিন। আপনাকে চিনতে পারাটা সত্যিই উচিত ছিল। অন্তত গলাটা শোনার পর—'

'উনি কি তোমার পরিচিত নাকি পরিকাকু?' সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন।

'যখন এয়ারফোর্সে ছিলাম তখন আলাপ হয়েছিল ওঁর সঙ্গে, দিল্লিতে। ওঁর কোয়ার্টারেও গেছি দু—তিনবার—'

'সত্যিই তাহলে তোমার রাকেশজিকে চেনা উচিত ছিল।'

'ছিল।'

শাওন জিজ্ঞেস করল, 'কখন তুমি ওঁকে চিনতে পারলে?'

'টেলিফোন বুথের লোকটাকে ধাওয়া করে যখন কুবের ভাণ্ডারী তীর্থে গিয়ে পৌঁছলাম রাত্রিবেলা—'

রাকেশ চতুর্বেদী তাড়া দিলেন, 'চলুন এবার যাওয়া যাক। রাত বাড়ছে। তাছাড়া আর তর সইছে না। এতদিন সাধু সেজে বনে বাদাড়ে না খেয়ে না ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তো। এবার একটু সাফ সুতরো হতে হবে। এদের একটা ব্যবস্থা বন্দেজ করে দিয়ে ভালো করে ঘুমোতে হবে আজ রাত—' বলে ইচ্ছে করেই একটা লম্বা হাই তুললেন তিনি। তাঁর হাই তোলা দেখে সকলেই হেসে উঠল মজা পেয়ে।

১০

গাড়ি করে ইন্দোরের পথে ছুটতে ছুটতে পরিদাদু বলছিলেন, 'এতদূর এলামই যখন দু—একদিনের মধ্যে উজ্জ্বয়িনীটাও ঘুরে আসি, কী বল খুকু?'

অরুণাংশু বললেন 'উজ্জ্বয়িনী বললেই কিংবদন্তির রাজা বিক্রমাদিত্যর কথা মনে পড়ে যায়—'

শাওন বলল, 'বেতাল যাঁকে গল্প শোনাতো?'

'হুঁ।' অরুণাংশু বললেন।

সুছন্দা বললেন, 'আর কোথাও যাও না যাও মহাকালেশ্বর আর হরসিদ্ধি মায়ের মন্দিরে কিন্তু যেতেই হবে পরিকাকু।'

পরিদাদু বললেন, 'সবই হবে। কিন্তু দুঃখ একটাই, ওখানে কোনো স্বরূপবাবাকে পাওয়া যাবে না—'

পরিদাদুর কথায় সকলেই সায় দিলেন। এমন সজ্জন ও অতিথিবৎসল মানুষ খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। আজ দুপুরে আশ্রম ছেড়ে আসার সময়েও আন্তরিকভাবে বলছিলেন, 'আর কটা দিন থেকে গেলে হত না—'

থাকতে পারলে ভালোই লাগত হয়তো, কিন্তু উপায় নেই। ফেরার টিকিট কাটা রয়েছে যে।

চলে আসার সময়ে পরিদাদুর হাত দু—খানা ধরে বার বার বলছিলেন স্বরূপানন্দজি, 'এখানকার মানুষের খুবই উপকার করলেন আপনি। নর্মদা মায়ি এবং ওঁকারেশ্বর মহাদেব নিশ্চিত মঙ্গল করবেন আপনার। শাওনের যে কী ভালো লাগছিল তখন। পরিদাদুর জন্যে গর্বে বুকটা ভরে উঠছিল। এসব কথা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনীশ বিশ্বাস পরিচয় দেওয়া লোকটার কথাও মনে পড়ল তার। আর তখনই প্রশ্নটা মাথায় এল। পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে শাওন জানতে চাইল, 'অনীশকাকুই যে আসলে অপরাধী তা তুমি কী করে বুঝলে বলো তো পরিদাদু?'

শাওনের প্রশ্নে অরুণাংশু নড়েচড়ে বসলেন, 'সত্যি কথা বলো দেখি পরি ওই অবিনাশ ভার্মা লোকটাকে প্রথম সন্দেহ হল তোমার কবে?'

'যেদিন লোকটা প্রথম ওঁকার আশ্রমে দেখা করতে এল সেদিন।'

'কীভাবে?'

'লোকটা যখন বলল যে সেদিনই গাড়ি করে ওঁকারেশ্বরে পৌঁছেছে, শুনেই আমার মনে হল ও মিথ্যে কথা বলছে।'

'কেন?'

'দিব্বি দেখলাম বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে চোখ মুখ ফুলিয়ে এসেছেন ভদ্রলোক।'

'আসবার পথে গাড়িতেও তো ঘুমোতে পারে?' অরুণাংশু বললেন।

'পারে।' বললেন পরিদাদু, কিন্তু দ্বিতীয় সন্দেহটা লোকটা সম্পর্কে আমাকে আরও কৌতূহলী করে দিল।'

'কীরকম?'

নর্মদা তীরের প্রতিটি নুড়ি পাথর যখন শিবলিঙ্গ জ্ঞানে পুজো করা যায় তখন লোকটা সেই ন্যাচরাল শিবলিঙ্গ না নিয়ে মানুষের তৈরি স্পষ্ট ছাঁচে ফেলে তৈরি করা ওই বেঢপ শিবলিঙ্গটা কিনতে গেল কেন?'

'ঠিক। এ প্রশ্নটা আমাদের মাথাতেও আসা উচিত ছিল।'

'আর একটা বিষয়ও তোমাদের মাথায় আসা উচিত ছিল।'

'কী বিষয়?'

'যে লোকটা এত ধর্মপ্রাণ, নর্মদার তীর্থমাহাত্ম সম্পর্কে এত সচেতন, সে কোটিতীর্থের ঘাটে নর্মদা স্পর্শ করতে না নেমে ফোন কলে ব্যস্ত থাকে কী করে! কিন্তু—'

'আবার কিন্তু কেন?'

'মাঝখানে সাধু এসে গিয়ে আমার চিন্তাভাবনাগুলো সব কেমন যেন ওলোট পালোট হয়ে গেল। আমার সমস্ত সন্দেহ গিয়ে পড়ল ওই সাধু আর টেলিফোন বুথের লোকটার ওপর। না হলে অনীশ বিশ্বাসের জারিজুরি অনেক আগেই ধরে ফেলতাম আমি—'

'যাক গে। শেষমেশ তো ধরলে তাকে—'

'আমি আর ধরলাম কই,' উদাস ভঙ্গিতে বললেন পরিদাদু,' আমি শুধু শেষকালে তথ্য প্রমাণ যোগাড় করে দিয়ে সাহায্য করলাম মাত্র—'

'কীরকম?' উৎসাহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু।

লোকটা মাদক দ্রব্যগুলো কোথায় যে রেখেছে বোঝা যাচ্ছিল না কিছুতেই। চতুর্বেদী কোটিতীর্থের ঘাটে তার ঝোলায় রাখা লুকোনো টেপরেকর্ডারে ওর টেলিফোনের কথা টেপ করেছিল, সূত্র পায়নি কিছু। পুলিশ দিয়ে গোপনে ওর ঘর সার্চ করিয়েছে হোটেলে। সেখানেও কিছু হদিশ করা যায়নি। তাহলে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কী করে ধরে ওরা লোকটাকে। অথচ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওরা বুঝতে পারছিল যে এই লোকটাই—

'কী মুশকিল বলো দেখি—' এতক্ষণ পর কথা বলে উঠলেন সুছন্দা।

'কাল পরিক্রমা করার সময় আমিও ওর ব্যাগটা নিয়ে—'

'তুমি তাহলে ইচ্ছে করে ওঁর ব্যাগটা নিজের কাছে নিয়েছিলে ব্যাগে কিছু আছে কিনা পরীক্ষা করবে বলে?' পরিদাদুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে ওঠে শাওন।

'হু।'

'কিছু পেলে?'

'উহুঁ। অথচ আমি তখন জানি যে এ লোকটাই মাদক পাচারের পাণ্ডা এবং এর হাত দিয়েই বিশ তারিখ কিছু একটা পাচার হতে চলেছে।'

'কীভাবে জানলে?'

'ত্রিতপ রায়ের ফোনের গল্প বলে ওকে দিয়ে যে কথাগুলো কাগজে লিখিয়ে নিলাম তার প্রায় প্রতিটি অক্ষরই আছে ছেঁড়া লিফলেটের পিছনে লেখা কথাটায়—'

'সেই বুডঢাবাবা সাতশো বিশ?'

'হ্যাঁ। আর লোকটার আমার নোটবইতে লেখা ঠিকানাটা দেখেই বুঝলাম হাতের লেখাটা এক।'

'তার মানে সত্যি সত্যি তোমার ফোন আসেনি?

'না। ফেক কল অ্যাকটিভেট করে দিয়েছিলাম আমি।'

'উরিব্বাস।' বলে উঠল শাওন।

'তবে সবচেয়ে কাজে লাগল অরুণের ক্যামেরাটা।' পরিদাদু বলে চললেন। ছবিটা ক্যাজুয়ালি তুলেছিলাম লোকটার ব্যাগটা কিছুক্ষণ নিজের কাছে রাখব বলে। কিন্তু ছবি তোলার পর একটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ল।

'কী পরিদাদু?'

লোকটা হাত উঁচু করে তোরণে ঠেকিয়ে রাখার জন্য জামার হাতাটা নীচে নেমে গিয়েছিল অনেকটা। ছবিতে স্পষ্ট দেখলাম তার হাতের ভিতর দিকে উল্কি করে হিন্দিতে লেখা রয়েছে অবিনাশ—'

'তারপর?'

'তারপর আর কী? একটাই চিন্তা তখন যে ওর পাচার করার জিনিসটা তাহলে কোথায়। চিন্তা করতে করতে সিদ্ধিনাথ মন্দিরের শিবলিঙ্গর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবনাটা মাথায় এল হঠাৎ। ওই শিবলিঙ্গটার মধ্যেই কিছু লুকোনো নেই তো—

'কেন মনে হল?'

ভাবলাম জিনিসটা কাছে রাখা যে বিপদজনক তা তো ও নিজেও জানত। কাজেই সেটা যদি সন্দেহের ঊর্ধ্বে আছে এমন কারো কাছে রাখা যায় তাহলে নিশ্চিন্ত। আর আমরা যেহেতু ছিলাম আশ্রমে সুতরাং ওখানে জিনিসটাকে গচ্ছিত রাখা আরও নিরাপদ। পুলিশ ভুলেও সন্দেহ করতে পারবে না আর—'

'পরিদাদু তুমি যে সত্যি সত্যিই পাকা গোয়েন্দার মতন কাজ করে ফেললে গো—' হাততালি দিয়ে বলে উঠল শাওন।

'যা বলেছিস।' শাওনকে সমর্থন করে বললেন অরুণাংশু।

'যাঃ' লজ্জা পেয়ে বললেন পরিদাদু, 'গোয়েন্দা হওয়া অত সহজ নয়। কত শ্রম নিষ্ঠা আর কষ্ট সহিষ্ণুতা লাগে ভালো গোয়েন্দা হতে গেলে তা তো নিজের চোখেই দেখে এলি কুবের ভাণ্ডারী তীর্থে গিয়ে—

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%