ভূতুড়ে কান্না রহস্য

জয়দীপ চক্রবর্তী

গৌহাটির লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে যখন শাওনদের প্লেন মাটি ছুঁল তখন ঘড়িতে একটা পঁয়তাল্লিশ। লাগেজ নিতে আরও মিনিট দশেক লেগে গেল। দীপেনকাকু বলেছিলেন এয়ারপোর্টে নিতে আসবেন, কিন্তু পরিদাদু বারণ করে দিয়েছেন। এমনকি তাঁর গাড়ি পাঠাতেও নিষেধ করে দিয়েছেন তিনি। দীপেনকাকু ব্যস্ত মানুষ। অযথা তাঁকে ঝামেলায় ফেলে লাভ নেই। পরিদাদু ফোনেই বলে দিয়েছেন আসাম তাঁর দিব্বি চেনা জায়গা। লাচিতনগরে পৌঁছতে কোনোই অসুবিধা হবে না তাঁর। শুধুমুধু বেলা দুপুর পর্যন্ত না খেয়ে না দেয়ে তাঁদের জন্যে দীপেনকাকুর দাঁড়িয়ে থাকার মানেই হয় না কোনো।

লাগেজ নিয়ে বাইরে এসে প্রাইম ক্যাব থেকে গাড়ি নিয়ে নিলেন পরিদাদু। কলকাতায় এখন প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে সক্কলে। এখানে অত গরম নেই। কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ এখনও মুখ ভার করে আছে। তবু এ সি গাড়িই নিলেন পরিদাদু। বললেন, 'বুঝলি শানু, বয়েস বাড়ছে এবার। আগের মতন কষ্ট সয়ে নেবার মানসিকতা ক্রমশ কমে আসছে বুঝলি...' শাওন চুপ করে রইল। বাতানুকূল গাড়ির আরাম তার নিজেরও মন্দ লাগছিল না। বাবার কথা মনে হচ্ছিল এই সময়ে। অরুণাংশু বরাবর একটু মিতব্যয়ী। বাবা সঙ্গে থাকলে কিছুতেই পরিদাদুকে এ গাড়ি নিতে দিতেন না। কথাটা মনে হতে আপন মনেই হেসে ফেলল শাওন। পরিদাদু আড় চোখে তার দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে, 'কী ব্যাপার রে, নিজে নিজে বিনা কারণে হাসছিস যে বড় মিট মিট করে...'

'এই গাড়িটায় চড়েই বাবার কথা মনে পড়ে গেল', বলেই আবার হেসে ফেলল শাওন, 'বাবা থাকলে কিন্তু কিছুতেই তোমায় এ সি গাড়ি নিতে দিত না পরিদাদু, মাথা নেড়ে বলে উঠত একটুও গরম নেই এখানে, বেমক্কা এত খরচের মানেই হয় না কোনো'—

পরিদাদুও হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, 'তা বলত হয়তো। কিন্তু সত্যি বলতে কি ওকে আর খুকুকে মিস করছিও খুব'।

এবারে আসার সময়ে অরুণাংশু অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করতে পারেন নি। সুছন্দার খুব ইচ্ছে ছিল আসামে আসার। কামাক্ষা মন্দির দর্শন আর ওখানে পুজো দেবার খুব ইচ্ছে তাঁর বহুদিনের। কিন্তু অরুণাংশু না আসায় ওঁরও আসা হল না এবারে। পরিদাদু অবশ্য বার বার বলছিলেন, 'দুঃখ করিস না খুকু, আসামে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই না। দমদম থেকে ফ্লাইটে পাক্কা একঘণ্টার মামলা। এমনকি চাইলে একদিনে গিয়ে আবার ফিরে আসা যায়। অরুণ যাক না যাক তোকে আমি ঠিক একবার ঘুরিয়ে আনবখন।'

সুছন্দা চুপ করে ছিলেন। তাঁর কথায় কতটা আশ্বস্ত হলেন কে জানে। কিন্তু পরিদাদু যেই শাওনকে সঙ্গে নিয়ে আসার কথা বললেন, অমনি বেঁকে বসলেন তিনি। মাথা নেড়ে বললেন, ওরেব্বাবা, এক্কেবারে না। তুমি যাচ্ছো যাও। শানুকে তোমার সঙ্গে ছাড়ছি না।'

শাওন শুকনো মুখে বাবার দিকে চেয়ে ছিল। এই ঘোর বিপদে একমাত্র অরুণাংশুই তাকে বাঁচাতে পারে সে জানে। অরুণাংশুও আড়চোখে একবার শাওনের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে সুছন্দার দিকে ফিরে বললেন, 'ক্যানো, শাওনের যেতে অসুবিধা কোথায়? স্কুলে সামার ভেকেশন চলবে ওই সময়। তাছাড়া দীপেন আমাদের দুজনেরই চেনা পরিচিত মানুষ। পরি যদি শানুকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায় তো যাক না। ছেলেটার অন্তত দু-চার দিন বাইরে থেকে ঘুরে আসা হবে'। সুছন্দা ভয় পাওয়া মুখে বললেন, 'কামরূপ কামাক্ষা খুব ভয়ংকর জায়গা। দুষ্টু তান্ত্রিকরা ওখানে বাচ্চা ছেলেপুলেদের নাকি মন্ত্র দিয়ে ছাগল ভেড়া বানিয়ে রেখে দেয়...'

সুছন্দার কথা শেষ হবার আগেই অরুণাংশু আর পরিদাদু হো হো করে এমন হেসে উঠলেন যে সুছন্দা এ বিষয়ে আর কথা এগোতেই পারলেন না। বিরক্ত হয়ে বললেন, 'সব তাতেই তোমাদের একটা উড়িয়ে দেওয়া মানসিকতা। ঠিক নয় এটা। বিপদে পড়ার আগে সাবধানতার কথা ভেবে রাখাই উচিত।'

'বেশ বেশ। আমি খুকুর কথা মেনে নিচ্ছি। পথে ঘাটে বিপদ কোথায় যে কখন ওঁত পেতে বসে থাকে তা তো আগাম জানা যায় না। আমরা নিশ্চিত সতর্ক থাকব খুকু। তাছাড়া শানু আমাদের লক্ষ্মী ছেলে। কথার অবাধ্য হয় না কখনও। ও আমার কথা শুনে চলবে বলেই আমার বিশ্বাস। নাকি রে শানু?' বলে শাওনের দিকে চোখ টিপে মুচকি হাসেন পরিদাদু।

'আমি কক্ষনও পরিদাদুর কথা অমান্য করি না, তুমি তো জানো মা', শাওন লাফিয়ে উঠে বলে।

'করবে কেন। যত অবাধ্যতা তো তোমার খালি আমার সঙ্গে', বলে মুখ বিকৃত করেন সুছন্দা। অরুণাংশু আবার হেসে ওঠেন।

শাওন বলল, 'পরিদাদু কাজিরাঙ্গা যেতে হবে কিন্তু। হাতির পিঠে করে জঙ্গলে বেড়ানোটা দারুন থ্রিলিং হবে...'

'উঁহু, এবারে না। যেবারে খুকু অরুণাংশুকে নিয়ে আমরা আবার যাব ওই ভেঞ্চারটা সেবারের জন্যে তোলা থাক আপাতত।'

'তখন আবার যাব'। আবদেরে গলায় বলে শাওন।

'আমরা দেরি করে ফেলেছি রে শানু', পরিদাদু হাসেন, 'জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি পাওয়া যাবে না আর। জঙ্গল সাফারির জন্যে নভেম্বার মাস থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে যেতে হয়। আমরা তো যাচ্ছি মে মাসের শেষে...'

শাওনের মনটা একটু বিষণ্ণ হয়ে গেল। মা বাবা সঙ্গে থাকলে সত্যি আরও জমে যেত বেড়ানোটা। পরিদাদু সঙ্গে আছেন ঠিকই, তবু মা বাবাকে ছেড়ে এই প্রথম বাইরে বেড়াতে আসা ওর। পরিদাদু ওর পিঠে হাত রাখলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, 'কী রে মা বাবার জন্যে মন কেমন করছে নাকি?'

'ধুস', শাওন হাসল।

'সত্যি বলতে কি আমি এই টুরে খুকুকে আনতে চাইও নি জানিস তো...' পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন।

'মানে?' গাড়ির মধ্যে সোজা হয়ে বসল শাওন।

'এমন একটা কাজে এবারে আমাদের যেতে হতে পারে শানু, যেখানে খুকু থাকলে মুশকিল হতে পারত'। পরিদাদু নীচু স্বরে বলে চললেন।

'আমরা কি তবে আসামে নিছক বেড়াবার জন্যে যাচ্ছি না পরিদাদু?' অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধে নড়ে চড়ে বসল শাওন।

'বেড়াতেই যাচ্ছি, তবে সঙ্গে একটা অন্য রহস্যের সম্ভাবনাও রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।'

'কী রহস্য?' কৌতূহলী হয়ে বলে শাওন।

'সেটা দীপেনের সঙ্গে কথা হবার পরেই পুরোটা বোঝা যাবে। আপাতত তোর সামনে আমি একটা অপশন রাখতে চাই। ভেবে উত্তর দিবি কিন্তু...'

'কী অপশন পরিদাদু?'

'একটা ভূতুড়ে ব্যাপারের কারণ খুঁজতে দিন দুই হয়তো শিলং এর দিকে একটা জায়গায় থাকতে হতে পারে আমায়। এ সময়টা তুই ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে না থেকে দীপেনের বাড়িতে থেকে যেতে পারিস। ও তোকে গৌহাটির আশেপাশে যা দেখার আছে দেখিয়ে দেবে সেই সময়ে। তারপর আমি ফিরে তোকে নাহয় আবার শিলং চেরাপুঞ্জি ঘুরিয়ে দিতে পারি। অথবা দীপেন তোকে কাউকে দিয়ে আমার কাছে পৌঁছে দিতে পারে আমি যেখানে বলব। এ কথাটা আমি ইচ্ছে করেই খুকু বা অরুণকে বলিনি। তাহলে তোর আসাটা সত্যিই আটকে যেতে পারত।'

'ভূতুড়ে ব্যাপারটা কী পরিদাদু?'

'আমি এখনও জানি না ঠিকঠাক।'

'আমি তোমার সঙ্গেই যাব।'

'পাক্কা?'

'পাক্কা।'

'ভেবে বলছিস তো?'

'একদম।'

'ভয় পাবি না তো পরে?'

'তুমি সঙ্গে থাকলে আমি কিচ্ছুতে ভয় পাই না।'

'সাবাশ। খুশি হলাম তোর কথা শুনে। তুই তো জানিস ভিতু আর আলুভাতে মার্কা ছেলেপুলে এক্কেবারে না পসন্দ আমার। আমি চাই তুই বুক চিতিয়ে বড় হ।'

শাওনের পরিদাদুর কথা শুনতে ভালো লাগছিল। সেও মনে মনে পরিদাদুর মতনই সৎ আর সাহসী হতে চায় সবসময়। পরিদাদু ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন বাঁ দিকের রাস্তায় গাড়ি ঘোরাতে। একটু এগিয়ে, বাঁ দিকে একটা মন্দির আর মাঠ এবং ডান দিকে একটা মস্ত কাঠের মিল ছাড়িয়ে গাড়ি দাঁড়াল রাস্তার বাঁ দিক ঘেঁসেই। পরিদাদু বললেন, 'নেমে পড়। এসে গেছি।'

গাড়ি থেকে নেমে সামনে হাত বাড়িয়ে পরিদাদু বললেন, 'জায়গাটা দেখে রাখ। রাস্তাটা ভাঙা চোরা অপরিষ্কার হলে কী হবে, সামনেই কিন্তু মস্ত ইম্পরট্যান্ট অফিস আছে একটা...'

'কিসের?'

'এন আই এ।'

'ও।'

'এন আই এ-র ফুল ফর্ম জানিস?'

'ন্যাশানাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি।'

'গুড।'

পরিদাদু আর শাওন দীপেনকাকুর বাড়িতে ঢুকল যখন ঘড়িতে তখন তিনটে বেজে গেছে। বাইরে আকাশ মেঘলা ছিল এতক্ষণ। এখন বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে ঝম ঝম করে।

দীপেনকাকু আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসেছেন অন্য দিনের তুলনায়। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে চারটে পেরোনোর আগেই। কাকিমা বললেন অন্য দিন রাত আটটা নটার আগে নাকি বাড়ি ঢুকতেই পারেন না দীপেনকাকু। পরিদাদুকে দেখেই দু হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন একেবারে। গাঢ় গলায় বললেন, 'এলি তাহলে...'

'তুই ডেকেছিস, না এসে পারি আমি বল...' পরিদাদু হাসতে লাগলেন মিষ্টি করে। শাওনের দিকে এগিয়ে এসেও গাল টিপে দিয়ে আদর করলেন দীপেন বিশ্বাস। জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা মা ক্যামন আছেন?'

'ভালো,' লাজুক লাজুক মুখে উত্তর দিল শাওন।

'এটাও নিজের বাড়ি বলেই মনে কোরো, লজ্জা সংকোচ এসব কিচ্ছুটি পুষে রেখো না কিন্তু মনের মধ্যে। যা ইচ্ছে হবে মন খুলে চেয়ে নেবে কাকিমার কাছে...'

'হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই'। মাথা নীচু করেই বলে শাওন।

শাওনের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হেসে তার দিকে এগিয়ে এসে মাথায় বিলি কেটে দিয়ে কাকিমা বললেন, 'শাওনকে বলতেই বা হবে কেন, আমি না মা, আমি ঠিক বুঝে নেব কখন কী প্রয়োজন ওর।'

এই বাড়ির পরিবেশ ও মানুষগুলোকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল শাওনের শুরু থেকেই। মা সঙ্গে আসতে পারেননি বলে শাওনের আর কষ্ট হচ্ছিল না মনের মধ্যে। সন্ধে পেরোতেই কাকিমা এসে পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'চা দিই এবার?'

'দাও'। পরিদাদু বললেন।

'আর তোমায় কী দেব', বলে শাওনের দিকে চাইলেন তিনি, 'তোমায় বরং দুধ দিই একটু আর ক্যাডবেরি...'

দুপুরে খেতে দেরি হয়েছে বলে ক্ষিদেই পায়নি শাওনের। সে বলল, 'আমার ক্ষিদে পায়নি।'

'সে কি', চোখ গোল গোল করে তার দিকে চাইলেন কাকিমা, তা বললে হয়? সময়ে না খেলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে যে! তোমার মা তখন আমায় আস্ত রাখবে ভেবেছো?' তাঁর কথার ধরন দেখে শাওন নিজেও হেসে ফেলল।

চায়ের টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিয়েই দীপেনকাকুর দিকে চাইলেন পরিদাদু, 'বল এবার কী কারণে আমায় জরুরি তলব তোর...' দীপেনকাকুও চায়ে লম্বা একটা চুমুক দিলেন। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন ভালো করে। কাকিমার দিকে একবার চেয়ে নিয়ে পরিদাদুর দিকে চাইলেন তিনি আবার, 'তোর মনে আছে পরি, বছর তিনেক আগে তোদের বলেছিলাম শিলং-এর কাছে একটা রেসর্ট বানানোর পরিকল্পনা নিয়েছি আমি...'

'মনে আছে। সেটা তো হয়েওছিল। তুই বলেছিলি চলে আসতে। ওখানে দু-একদিন কাটিয়ে যাবার কথাও বলেছিলি।'

'এগজ্যাক্টলি', চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট মুখে দিলেন তিনি, 'আমার প্রায় সমস্ত সঞ্চয় এবং কিছু লোন একত্র করে প্রায় স্বপ্নের মতন সুন্দর করে রেসর্টটা তৈরি করিয়েছিলাম রেড পাইন উড ইউজ করে। সঙ্গে চিল্ড্রেন'স পার্ক, ফ্লাওয়ার গার্ডেন, রেস্টুরেন্ট...'

'তারপর?' পরিদাদু উৎসাহ নিয়ে বললেন।

'রেসর্ট চালু হবার মাস পাঁচেকের মধ্যেই দারুণ পপুলার হয়ে গেল ওটা। জায়গাটার ন্যাচারাল বিউটি তো আছেই। তার সাথে আমার রেসর্টের আতিথেয়তা আর রিজনেবল রেট দিব্বি টুরিস্ট টানতে শুরু করে দিল। একটা ভালো সংখ্যার পর্যটক আছেন যাঁরা শহরের ভিড় এড়িয়ে সাধারণত আউটস্কার্টে প্রকৃতির মাঝখানে থাকতেই বেশি প্রেফার করে। তাঁদের কাছে পাইনউড লেক রেসর্ট দারুন জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আর...'

'তোর রেসর্টটার এগজ্যাক্ট লোকেশনটা ঠিক কোথায়?' দীপেনকাকুর কথার মাঝখানে বলে উঠলেন পরিদাদু।

'শিলং এর চোদ্দো পনেরো কিলোমিটার আগে, বড়াপানির কাছাকাছি।'

'উমিয়ামে?'

'হ্যাঁ।'

'ওখানে উমিয়াম লেক নামেও একটা মস্ত লেক আছে না পরিদাদু?' শাওন বলে ওঠে। পরিদাদু ও দীপেনকাকু দু' জনেই হেসে ওঠেন। দীপেনকাকু শাওনের মাথায় একবার ডান হাতটা আলতো করে বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'ইউ আর রাইট শানুবাবু। তবে তোমার উমিয়াম লেক আর আমাদের বড়া পানি একই জলাশয়। আসলে ওই জায়গাটার নামই হল উমিয়াম। তাই ওই লেকটাকে উমিয়াম লেক বলে ডাকা হয়'। শাওন লজ্জা পেয়ে গেল। পরিদাদু তাড়া দিলেন দীপেনকাকুকে, 'সব তো ঠিকই ছিল। তাহলে অসুবিধেটা হল কোথায়?'

পরিদাদুর কথায় কেমন যেন উদাস হয়ে গেলেন দীপেনকাকু। একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। চায়ের কাপ শেষ করলেন নিঃশব্দে। তারপর মৃদু গলায় বলতে শুরু করলেন, 'লাস্ট ইয়ারে উমিয়াম লেকে একটা বিশ্রী মিসহ্যাপ ঘটে যায়।'

'কী রকম?'

'উমিয়াম লেকে বোটিং এর বন্দোবস্ত আছে জানিস তো?'

'জানি। আমি একটা কাজে বছর চারেক আগে একবার এসেছিলাম ওদিকে। তখন উমিয়ামে ছিলাম একদিন।'

'তাই, কোথায় ছিলি?'

'এক্কেবারে বড়া পানির গায়ে বলতে পারিস। মেঘালয় টুরিজম ডিপার্টমেন্টের একটা ভারী সুন্দর রেসর্ট আছে ওখানে। অর্কিড লেক রেসর্ট...'

'বুঝেছি', দীপেনকাকু হাসেন, 'সত্যি বলতে কি ওই রেসর্টটাকে দেখেই আমার মনে স্বপ্নটা তৈরি হয়েছিল। ওই রেসর্টটা এত সুন্দর কিন্তু ভয়ানক কস্টলি'।

'তা ঠিক।' পরিদাদু সায় দেন তাঁর কথায়।

'এদিকে বাঙালি টুরিস্টের চাপই সবচেয়ে বেশি। আর জানিসই তো বাঙালি মধ্যবিত্ত পর্যটকদের একটা কমন সাইকোলজি আছে। এরা কম খরচে ম্যাক্সিমাম কমফোর্ট এক্সপেক্ট করে।'

'হুঁ'। পরিদাদু সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।

'আমি ওখানে ঠিক সেটাই প্রভাইড করতে চেয়েছিলাম। দিয়েওছিলাম। দলে দলে বাঙালি টুরিস্ট আসতে শুরু করল আমার পাইনউডে। কিন্তু উমিয়াম লেকের অ্যাক্সিডেন্টটার পর থেকেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল আমার রেসর্টে।'

দীপেনকাকুর কথা হাঁ করে শুনছিল শাওন। উত্তেজনায় চোখ বিস্ফারিত হয়ে যাচ্ছিল তার। দীপেনকাকু একটু থামতেই সে বলে উঠল, 'উমিয়াম লেকে কী হয়েছিল কাকু?'

'একটা নৌকাডুবি।'

'কতদিন আগে?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন আশ্চর্য হয়ে।

'গত বছরে, মে মাসের মাঝামাঝি।'

'তারপর?'

'সেই দুর্ঘটনায় চারজন ইয়াং ছেলে জলের নীচে তলিয়ে যায়। সেদিন থেকে থেকেই ঝম ঝম করে বৃষ্টি হচ্ছিল। ওদের অনেকেই বারণ করেছিল জলে নামতে...' বলে একটু থেমে দু দিকে মাথা নাড়াতে থাকেন দীপেনকাকু, 'আসলে নিয়তি বুঝলি কিনা, নিয়তিই টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন তাদের। জোর করে প্যাডেল বোট নিয়ে জলে নামল, ছেলেগুলো সাঁতার পর্যন্ত জানত না...'

'ইশ', বলে মাথা নাড়তে থাকেন পরিদাদু। শাওন জানে কম বয়েসে সেনাবাহিনীতে থাকলে কী হবে পরিদাদুর মন খুব নরম। দীপেনকাকু বলতে থাকেন, 'টাটকা তাজা চারটে প্রাণ, শুধু শুধু বেঘোরে চলে গেল...'

'যাক গে,' প্রসঙ্গ পালটাতে মাঝ পথেই দীপেনকাকুকে থামিয়ে দিলেন পরিদাদু, 'এসব গল্প আর ভাল্লাগছে না দীপু, তুই বরং তোর রেসর্টের কী একটা সমস্যার কথা বলছিলি ফোনে সেটাই বল...'

'সে ঘটনার সঙ্গে এই অ্যাকসিডেন্টের ঘটনাটাই যে জড়িয়ে আছে', ম্লান হেসে বলতে থাকেন দীপেনকাকু, 'আমার রেসর্টটা দুর্দান্ত চলছিল তোকে তো বলেইছি। কিন্তু ওই অ্যাকসিডেন্টের পর ওখানে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। তারপরেই সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকে...'

'কী রকম?' কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন পরিদাদু।

'ওই ঘটনার দিন পনের কুড়ি পরে, জুন মাসে এক বাঙালি পরিবার আমার রেসর্টে ডিলাক্স রুম ভাড়া করে বেড়াতে আসে বড়াপানিতে। তাদের সাথেই প্রথম ঘটনাটা ঘটে।'

'কী ঘটনা?'

দীপেনকাকু একবার আড়চোখে শাওনের দিকে তাকিয়ে নেন। ইতস্তত করেন একটু। পরিদাদুকে বলেন, 'তোকে পরে বলব নাহয়। ব্যাপারটা ভূতুড়ে। শাওনের সামনে...'

পরিদাদু হাসেন। হাত নেড়ে বলেন, 'তুই নিশ্চিন্তে বলতে পারিস। শানু খুব সাহসী ছেলে। ও এসব ফালতু ব্যাপারে ভয় টয় পায় না।'

'বিষয়টা ফালতু বলে হালকা করে দেখবেন না পরিমলদা', কাকিমা বলে ওঠেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে, 'আমরা নিজেরা পরখ করে এসেছি ওখানে গিয়ে। আমি নিজে শুনেছি। বাপ রে, আমার তো মনে হচ্ছিল মাঝ রাতেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। সারা রাত বিছানায় বসে ঠক ঠক করে কেঁপেছি দু জনে ভয়ে।'

পরিদাদু আবার হাসেন, 'এ কথাটা তো ফোনেই শুনেছি কলকাতায় বসে। কিন্তু ঘটনাটা আমার তো বিস্তারিত জানা দরকার। এত সাধের একটা প্রজেক্ট এতখানি ক্ষতি স্বীকার করে প্রায় বিনা পয়সায় ছেড়ে দিতে চাইছ তোমরা বউঠান, আমার কাছে জানতে চাইছ রেসর্টটা বিক্রি করে দেওয়া ঠিক হবে কিনা... আমায় তো সব দিকটা ঠান্ডা মাথায় বিবেচনা করতে হবে নাকি...'

'সত্যি আমাদের কী করা উচিত বলুন দিকি পরিমলদা?' কাকিমা আবার বলে ওঠেন উদবেগের সঙ্গে। পরিদাদু তাঁর কথার জবাব না দিয়ে দীপেনকাকুর দিকে চাইলেন, 'তোর গল্পটা কন্টিনিউ কর দীপু, গপ্পটা হারিয়ে গেলে খুব মুশকিল, ওটাকে ঠিকঠাক জড়ো করতে পারব না কাজের সময়', পরিদাদু শাওনের দিকে চাইলেন, 'শানু, তোকেও কাজ দি বরং একটা...'

'কী কাজ পরিদাদু ?' উৎসাহের সঙ্গে বলে শাওন।

'গল্পটা তুইও মন দিয়ে শুনবি। কোথাও কোনো খটকা বা অসঙ্গতি ঠেকলে মনে করে রেখে দিবি। সময় মতন তোকে তোর ফাইন্ডিংস জিজ্ঞেস করে নেব আমি।'

'ঠিক আছে পরিদাদু।'

দীপেনকাকু আবার তাঁর কথা শুরু করলেন, 'জুন মাসের শুরু মানে বুঝতেই পারছিস বর্ষা এসে গেছে তখন। অবশ্য ও অঞ্চলে অন্য সময়েও যে বৃষ্টি হয় না তা নয়। তবে জুন মাস পড়ে যাওয়া মানে প্রায় প্রতিদিনই ঝম ঝম বর্ষার গান শোনা যাবেই। তবে রোদ বৃষ্টি মেঘ মিলে মিশে সেও এক অসাধারণ সুন্দরের মধ্যে বাস করা। আর জানিস তো শিলং-এ জল জমে না, কাদা হয় না। আমার পাইনউডের অ্যামবিয়েন্সটাও দুর্দান্ত। স্পেশালি রাতে বৃষ্টি পড়লে পাইনউডের কাঠের বাংলো আর তার মাথার ওপরের টিনের শেডে জল পড়ে এত রোম্যান্টিক করে তোলে চারপাশের পরিবেশ যে ওখানে না থাকলে বুঝতে পারবি না তুই...'

পরিদাদু অসহিষ্ণুভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন, 'আবার মূল গল্পটা থেকে তুই দূরে সরে যাচ্ছিস দীপু।'

'হ্যাঁ হ্যাঁ, যা বলছিলাম', বলে কাকিমার দিকে তাকালেন দীপেনকাকু, 'আমাদের আর এক কাপ করে চা দিয়ে যাও না প্লিজ', তারপর পরিদাদুর দিকে চেয়ে উদাস স্বরে বলতে আরম্ভ করলেন, 'সেদিন রাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। পাইনউডের টিনের শেডের ওপরে বৃষ্টির জল ঝম ঝম সুরে নাচছিল। হঠাৎ পাইনউডের দক্ষিণ দিকে যেদিকে উমিয়াম লেক, সেদিক থেকে এক অদ্ভুত অপার্থিব আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করে। একসঙ্গে হাজার হাজার বাঁশির শব্দ। তারপর সেই বাঁশির সুর দুম করে কান্না হয়ে বাজতে শুরু করে তীব্র স্বরে... আর একসঙ্গে একাধিক পুরুষ কণ্ঠের হাহাকার আর কান্না যেন পাক খেতে শুরু করে ঘরের মধ্যেই।'

'হোয়াট?' উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন পরিদাদু।

'এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা যে সেই অত রাতেই দড়াম করে দরজা খুলে চিৎকার করতে করতে রিশেপশনে হাজির হন তাঁরা...'

'অত রাতে রিশেপশনে কেউ ছিল?'

'ছিল। কেউ না কেউ থাকবেই তো। আমার ওখানে কর্মচারী কম নয়। রিসেপশন চব্বিশ ঘণ্টা ওপেন থাকে। শিফটিং ডিউটি।'

'কে ছিল ?'

'রাজীব, রাজীব মহান্তি। পানবাজারের ছেলে। আমার পরিচিত। বিশ্বাসী আর কর্মঠ। পাইনউড তৈরির সময় থেকে আমার সঙ্গে ছিল'।

'ওর সঙ্গে আর কেউ ছিল না?'

'সম্ভবত রাউত, সঞ্জয় রাউত...'

'বেশ। তারপর ?'

সঞ্জয় ওঁদের সঙ্গে ঘরে আসে। বৃষ্টির আওয়াজ, হাওয়ার আওয়াজ মিলে মিশে তখনও অদ্ভুত শব্দ হচ্ছিল; কিন্তু তাঁদের শোনা ভূতুড়ে সেই হাহাকারের শব্দ সঞ্জয় শুনতে পায়নি। বুঝিয়ে শুনিয়ে একটু পরে তাঁদের আবার ঘরে রেখে আসে সে, কিন্তু মাঝ রাতে আবার ভয় পেয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন তাঁরা। ওই ঘরে ঢুকতে আর তাঁদের রাজি করানো যায়নি। শেষপর্যন্ত অন্য একটা ঘরে তাঁদের শিফট করতে হয় সে রাতেই।'

'সেই ঘরে আর কোনো সমস্যা হয়নি ?'

'না, কিন্তু পরদিন সকালে উঠেই হোটেল লিভ করেন তাঁরা, যদিও আরও দু-দিনের বুকিং ছিল তাঁদের। সেই সূত্রপাত। এরপর থেকে প্রায় রোজ পাইনউডে নানা ধরনের ভূতুড়ে উপদ্রব শুরু হয়... আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতা তো জানিস। পাইনউডের ভয়ংকরতার খবর দাবানলের মতন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। টুরিস্ট আসা বন্ধ হয়ে গেল পাইনউডে। ভাবতে পারিস, গত ছ মাসে পাইনউডে রাত কাটিয়েছেন মাত্র জনা দশেক মানুষ। এখন শিলং যাবার পথে অনেকেই আসে পাইনউডে, ভূতুড়ে রেসর্ট হিসেবে ঘুরে টুরে ছবি তোলে পাইনউডের তারপর রেস্টুরেন্টে খেয়ে দেয়ে হয় প্লেজারে গিয়ে ওঠে, নাহলে সোজা শিলং।'

'প্লেজার?' অবাক হয়ে বলে শাওন।

'আর একটা হোটেল। ওটার ওনারও একজন বাঙালি, শিবলালবাবু, পুরো নাম শিবলাল বিশ্বাস। ভালো মানুষ। পাইনউড তৈরির সময় অনেক উপকার করেছেন আমাদের। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মিস্ত্রি কাজ করিয়েছেন, টাকাপয়সা দিয়ে পর্যন্ত হেল্প করেছেন সে সময়ে। খুব ভালোবাসেন আমাদের। এসেছেন এ বাড়িতে অনেকবার। এই দুঃসময়েও আমাদের পাশে থেকেছেন সব সময়।'

'কী রকম?'

'পাইনউডে ভূতুড়ে ব্যাপার যখন ঘটতে লাগল, অনেক কর্মীই কাজ ছেড়ে দিল, শিববাবু তাঁর লোক দিয়ে আমার রেসর্ট চালু রাখার চেষ্টা করেছেন, আমায় বার বার বলেছেন নিজে নিশ্চিত না হয়ে কোনো ডিসিশন না নেবার জন্যে। ইন ফ্যাক্ট সে জন্যেই আমরা ওখানে নিজেরা থাকতে গিয়েছিলাম...'

'কত দিন আগে?'

'গত মাসের পাঁচ।'

'সেদিন ঠিক কী হয়েছিল মনে করে বল আমায়, কিছু বাদ দিবি না কিন্তু' পরিদাদু সেকেন্ড রাউন্ড চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন। শাওনের মজা লাগছিল। পরিদাদু ঠিক গোয়েন্দাদের মতন করে কথা বলছেন এখন। মনে মনে ভাবছিল শাওন পরিদাদু গোয়েন্দাগিরি করলে মন্দ হত না। সেও দিব্বি তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট বনে গিয়ে বন্ধুদের কাছে ঘ্যাম নিতে পারত স্কুলে গিয়ে। কিন্তু পরিদাদুর সে ইচ্ছে আছে বলে তো মনেই হয় না।

দীপেনকাকু চুপ করে বসে রইলেন একটুক্ষণ। চোখ বুজিয়ে ঘটনাটাকে মনের মধ্যে সাজিয়ে নিলেন বোধহয়। তারপর চেয়ারে পিঠটাকে এলিয়ে দিয়ে থেমে থেমে বলতে শুরু করলেন নীচু গলায়, 'সেদিন শনিবার ছিল। গাড়ি নিয়ে আমি আর তোর্সা সকাল নটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম ব্রেকফাস্ট সেরে। রাজীবকে বলা ছিল আমরা আসছি। লাঞ্চের মেনু পর্যন্ত ঠিক করা ছিল। এতদিন বাদে আমরা আসছি শুনে খুব খুশি হয়েছিল ওরা। আমাদের জন্যে পাইনউডের সেরা সুইট সাজিয়ে রেখেছিল ওরা। আমরা পৌঁছেছিলাম এগারোটার খানিক পরে। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে চা নিই, রেসর্টের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলি তারপর হাঁটতে হাঁটতে তোর্সাকে নিয়ে গিয়ে বসি উমিয়াম লেকের কাছে। ওখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটাই আমরা'...

'রুমের চাবি কোথায় ছিল তখন?' দীপেনকাকুর কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করেন পরিদাদু।

একটু ভেবে দীপেনকাকু বললেন, 'আমি চাবি সঙ্গে নিয়ে বেরোইনি। রিসেপশনে জমা রেখেছিলাম।'

'বেশ, তারপর?'

'সেদিন ফিরে লাঞ্চ করতে খুব দেরি হয়েছিল। পাইনউডের কর্মীরা সক্কলে আমাদের জন্যে না খেয়ে বসেছিল'। কাকিমা বললেন।

'এগজ্যাক্টলি', দীপেনকাকু লাজুক গলায় বললেন, 'আর গ্র্যান্ড লাঞ্চ সার্ভ করেছিল ওরা আমাদের সেদিন। খেয়ে আইঢাই অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আমি তো ঘরে ঢুকেই বিছানায় লম্বা দিয়েছিলাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম...'

'আর বউদি?'

'আমি কিছুক্ষণ টি ভি দেখলাম। তারপর ভালো লাগছিল না বলে বাইরে তাকিয়ে বসে রইলাম চুপ করে,' কাকিমা নিজেই বলতে শুরু করলেন, 'আমাদের রেসর্টের ডিলাক্স রুমগুলোর ঘরের মধ্যে থেকেই উমিয়াম লেকের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়, আর গাছপালা, জঙ্গল...'

'জানলা দিয়ে?' শাওন খুশি খুশি গলায় জিজ্ঞেস করল।

'আসলে ওই ঘরের দক্ষিণ দিকটা পুরোটাই কাচের স্লাইডিং ডোর, 'তোর্সা কাকিমা বললেন,'পরদা সরিয়ে রাখলেই ওদিকের ভিউটা একেবারে ক্লিয়ার... এত ভালো লাগে... রাতে ওই দরজা ঠেলে ওপাশের ব্যালকনিতে দাঁড়ালেও খুব ভালো লাগে...'

'তবে ব্যাপারটা রিস্কি। আমরা বোর্ডারদের রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়াতে বারনই করি...' তোর্সা কাকিমার কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন দীপেনকাকু।

'কেন?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে।

'চিতা বাঘ হানা দিতে পারে হঠাৎ করে, ওদিকের জঙ্গল থেকে।'

'এমন হয়েছে কখনও?'

'সঞ্জয় নাকি দেখেছিল একবার একটা বাঘকে। তারপর থেকেই রাতের ব্যালকনি রেস্ট্রিক্ট করেছি আমরা।'

'সত্যি যদি বাঘ আসে সেটা তো দারুণ থ্রিলিং ব্যাপার', শাওন হাততালি দিয়ে বলে ওঠে।

দীপেনকাকু মৃদু হেসে শাওনের পিঠে হাত রাখেন, 'তোমার তো খুব সাহস শানুবাবু, কিন্তু ধর ওখানে দাঁড়িয়ে অসতর্কতার জন্যে আমার বোর্ডারদের কারও যদি ক্ষয় ক্ষতি কিছু হয়, তাহলে পাইনউড লেক রেসর্টের বদনাম না একটা...'

পরিদাদু হাত তুলে কাকুকে থামিয়ে দিলেন। তারপর আবার কাকিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি বলুন বউদি। আপনি কি তবে একাই জেগে বসে রইলেন?'

'অনেকক্ষণ ছিলাম। লেক, গাছ, মেঘ রোদ্দুরের লুকোচুরি দেখছিলাম বিছানায় আড় হয়ে। তারপর আমার চোখেও ঘুম নেমে এল।'

'ঘুমোলেন?'

'হ্যাঁ।'

'কতক্ষণ ?'

'ছটা সাড়ে ছটা নাগাদ উঠলাম না গো', বলে দীপেনকাকুর দিকে তাকালেন উনি।

'তাই হবে। ঘুম ভেঙে উঠে চোখে মুখে জল দিয়ে রিসেপশনে কফি পাঠাতে বললাম যখন ফোন করে তখন সন্ধে। ফোনেই ওরা আমায় জানালো শিবলালদা এসে নাকি আমাদের জন্যে বসে আছেন অনেকক্ষণ ধরে। আমি এত অপ্রস্তুত হলাম শুনে... বয়স্ক মানুষ, আমার জন্যে বসে আছেন... তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে রুম সার্ভিসের ছেলেটিকে আমায় আগে না ডাকার জন্যে ধমক দিলাম আমি। শিববাবু এগিয়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন আমি যেন ওদের বকাবকি না করি। ওরা আমায় খবর দেবার কথা বলেছিল, উনিই নাকি না করে দিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।'

'তারপর ?'

'তারপর আর কী', হেসে ওঠেন দীপেনকাকু, 'তুই যে একেবারে জেরায় জেরায় অস্থির করে দিচ্ছিস...'

'না না', পরিদাদুও হেসে ফেললেন, 'আমি কি গোয়েন্দা নাকি পুলিশ... আসলে আমি ব্যাপারটা ডিটেলে জানার চেষ্টা করছি।'

'শিববাবু সেদিনও আমায় ঘরে এসে অনেক বোঝালেন যাতে পাইনউড নিয়ে হুট করে কোনো ডিসিশন না নিই', দীপেনকাকু আবার বলতে শুরু করলেন, 'উনি বললেন একটা ইনসিডেন্ট এখানে হয়েছে। তার জন্যে ব্যবসাটাও মার খাচ্ছে ইদানীং ঠিকই, তবু বিষয়টা নিজে না যাচাই করে হুট করে কিছু করে বসাটা বোকামি হবে। আমিও ওঁর কথা মেনে নিলাম। বললাম ঠিকই বলেছেন। আমি নিজে ওইজন্যেই এসেছি এবার দিন দুই থাকার প্ল্যান নিয়ে। আমিও দেখতে চাই রাতে ঠিক কী ঘটে পাইনউডে।'

'উনি কতক্ষণ ছিলেন?'

'রাত প্রায় নটা পর্যন্ত।'

'এই সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি?'

'উঁহু, সারাদিনে কিচ্ছুটি বুঝতে পারিনি আমি।'

'তবে?'

'ঘটনাটা ঘটল রাতে।'

'কী রকম ?'

'রাতে খাওয়াদাওয়ার পর দিব্বি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি তোর্সা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে আমায়। ওর চোখ মুখ অন্যরকম হয়ে গেছে। ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছিল ও। আমি উঠে বসে আলতো ঠেলা দিলাম ওকে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই কাঁপা কাঁপা হাত তুলে ও ব্যালকনির দিকে দেখালো। আমি পর্দার আড়ালে স্পষ্ট একটা ছায়া মূর্তিকে সরে যেতে দেখলাম। 'কে কে ওখানে?' বলে যেই আমি ব্যালকনির দরজা খুলতে যাব অমনি শুরু হল সেই আওয়াজ। অমন বুক ফাটা আর্তনাদ আগে কক্ষনো শুনিনি আমি। একসঙ্গে দু-তিনটে গলা বাঁচাও বাঁচাও বলে কেঁদে উঠল। তারপর প্রবল জলোচ্ছ্বাসের আওয়াজে সেই কান্না ভেসে যেতে লাগল। সেই জলের আওয়াজ এত স্পষ্ট আর তীব্র যে আমার মনে হল কাচের স্লাইডিং দরজা ফুঁড়ে বড়াপানির জল বোধহয় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে এই ঘরের মধ্যে। আমি এতটাই ঘাবড়ে গেছি তখন যে কী ঘটছে দাঁড়িয়ে তা বিচার করার মানসিক শক্তিটুকুও নেই আর। আমি লাফিয়ে দরজা খুলে তোর্সাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আমরা দুজনেই তখন হাঁফাচ্ছি। রিসেপশনে নাইট ডিউটিতে থাকা ছেলেটি আর সিকিউরিটির যারা ছিল তারা দৌড়ে এল আমাদের কাছে। আমরা বললাম সবকিছু। ওরা আমাদের সঙ্গে ঘরে এল, কিন্তু কিছুই আর তখন অস্বাভাবিক নেই। সব শান্ত। সব স্বাভাবিক। তোর্সা কিছুতেই আর ঘরে ঢুকতে চাইল না। বাকি রাত বাইরেই সবাই মিলে বসে কাটিয়ে দিয়ে সক্কালবেলা ফিরে এলাম আমরা।'

'স্ট্রেঞ্জ'। পরিদাদুর কপালে ভাঁজ।

'আমি কিছুতেই পাইনউডে যেতে চাই না আর পরিমলদা। ওকে বলেছি পাইনউড বিক্রি করে দিতে।' কাকিমা ভিতু ভিতু গলায় বললেন।

'কিন্তু বিক্রি করে দেব বললেই কি বিক্রি করা যায়', পরিদাদু চিবুকের ওপরে ডান হাতটা বোলাতে বোলাতে বললেন, 'অত টাকার প্রোপার্টি দুম করে নেবে কে, তায় আবার যেখানে এমন ডিসপিউট রয়েছে।'

'সেটাই তো কথা', দীপেনকাকু মাথা নাড়াতে লাগলেন অসহায় ভঙ্গিতে, 'তোর্সা দিনরাত এখন শিববাবুকেই ফোনে রিকোয়েস্ট করছে ওটা কিনে নেবার জন্যে আর শিববাবুও না না করে যাচ্ছেন ওই কথা বলে যে ওই ভূতুড়ে সম্পত্তি কিনে কী লাভ তাঁর অত টাকা খরচ করে...'

'আমি শেষে ওঁকে বলেছি যে কোনো দামে উনি পাইনউড কিনতে রাজি হলে আমরা তাতেই দিয়ে দেব ওঁকে পাইনউড।' কাকিমা হাত নেড়ে ক্লান্ত গলায় বললেন।

কোনো দাম দিয়েছেন উনি?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।

'না, তবে বিষয়টা ভাববেন বলেছেন।'

'আমায় এখন তাহলে কী করতে বলিস তোরা ?' পরিদাদু দীপেনকাকুর দিকে তাকান।

'দ্যাখ পরি তোকে আগেই বলেছি পাইনউড আমার ড্রিম প্রোজেক্ট। একটা ফাইনাল কিছু করার আগে আমি তোর পরামর্শ চাইছি। তাছাড়া...'

'তাছাড়া...?'

'কদিন আগে এক ভদ্রলোক আমার কাছে এসেছিলেন। শিলং-এ ব্যবসা আছে তাঁর। বললেন লোকমুখে শুনেছেন আমি পাইনউড বিক্রি করে দিতে চাই। তিনি ওটা কিনতে ইন্টারেস্টেড। একটা দরও দিয়ে গেলেন আমায়।'

'বাহ। কেমন দর?'

'খুবই কম। বললেন পাইনউডের যা বদনাম তাতে হোটেলের ব্যবসা ওখানে আর সম্ভব নয়। ও জায়গাটা নিয়ে ওঁর অন্য প্ল্যান আছে।'

'তুই কী বললি?'

'আমি বিশেষ পাত্তা দিইনি।'

'ক্যানো, তোরা তো ওটা বিক্রি করতেই চাইছিস...'

'আগেই বলেছি পাইনউড আমার স্বপ্নের জিনিস। অচেনা লোককে দিলে ওখানে পরে যাওয়া টাওয়ার ব্যাপারও আর থাকবে না। শিববাবু ওটা নিলে ইচ্ছে হলেই ওখানে চলে যাবার একটা প্রভিসন থাকবে।'

'ভদ্রলোককে কেমন দেখতে?'

'নাথিং স্পেশাল। মাঝ বয়েসি। কাঁচা পাকা বাবরি চুল, মুখে দাড়ি'।

'পরে আর এসেছিলেন ভদ্রলোক?'

'না।'

'কোনো কনট্যাক্ট নম্বর নিয়েছিস?'

'না। ওইটাই ভুল হয়ে গেছে সেদিন। আসলে আমরা ওকে না দেবার ব্যাপারে এতটাই রিজিড ছিলাম... অবশ্য উনিও নিজে থেকে কোনো কনট্যাক্ট নাম্বার দেওয়ার কথা বলেননি। বরং নিজেই আবার আসবেন বলেছেন।'

পরিদাদু একটুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন। তারপর বললেন, 'আমি পাইনউডে যেতে চাই। কালই। দিন দুই এক থাকব। তারপর তোরা ঠিক করিস পাইনউড রাখবি নাকি বিক্রি করে দিবি।'

'ওই ভূতুড়ে জায়গায় সবকিছু শোনার পরেও তুই যাবি ?'

'যাব।'

'কিন্তু...'

'কোনো কিন্তু নেই আর। আমরা কাল যাচ্ছি ওখানে। সব শোনার পরেও কতকগুলো খটকা আছে আমার মনে। ওখানে না গেলে সেগুলো কাটবে বলে মনে হয় না। তুই তো জানিস, মনে খটকা লাগলে আমি তার কারণ না জেনে থেমে যেতে পারি না...'

'তোকে আমি চিনি। তোকে আটকানোর চেষ্টা তাই করব না, কেননা জানি চেষ্টা করেও লাভ হবে না কিছু। তুই তো চিরকালীন গোঁয়ার, কিন্তু শাওন এখানে থাক।'

'সেটা শাওন ঠিক করুক।' পরিদাদু মুচকি হেসে বললেন।

দীপেনকাকু কাকিমা কিছু বলার আগেই শাওন বলে উঠল, 'আমি পরিদাদুর সঙ্গে যাব, যাবই।'

'তাহলে পাইনউডে ফোন করে দিই', বলে সেলফোনের দিকে হাত বাড়ালেন দীপেনকাকু।

'একদম না', পরিদাদু খপ করে হাত ধরে ফেললেন দীপেনকাকুর, 'আমি সাধারন টুরিস্ট হিসেবেই যেতে চাই। আর সেজন্যেই শাওনের আমার সঙ্গে থাকাটা জরুরি। এতে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। আর তোর সঙ্গে আমার কানেকশনটা আমি এক্ষুনি ওখানে আনফোল্ড করতে চাইছি না।'

'তাহলে আমার গাড়িটাও তো নেওয়া যাবে না!'

'না'।

'কী ভাবে যেতে চাইছিস তাহলে?'

'কাল একটা গাড়ি আমরা নিজেরাই নিয়ে নেব। ওখানে গিয়ে ছেড়ে দেব গাড়িটাকে। পরে প্রয়োজনমতন খবর দেব তোকে। তেমন হলে তখন তোর গাড়িটা নিয়ে চলে যাস। একসঙ্গে ফিরে আসব সকলে।'

'ঠিক হ্যায়। তবে তোদের জন্যে চিন্তাটা কিন্তু থেকেই গেল।'

'অত চিন্তার সত্যিই দরকার নেই'।

'বলছিস ?'

'বলছি'।

'টেক কেয়ার, বেস্ট অফ লাক পরি...'

'থ্যাঙ্ক ইউ', বলে দরাজ হাসলেন পরিদাদু।

শাওনরা যখন পাইনউডে পৌঁছল তখন বেলা গড়াচ্ছে। রাস্তায় অহেতুক দেরি করলেন পরিদাদু কয়েক জায়গায়। তা নয়তো বারোটার আগেই পৌঁছে যাওয়া যেত। এখন প্রায় দেড়টা বেজে গেছে। বেশি লাগেজ সঙ্গে নেই। পরিদাদু বললেন, 'চল, আগে লাঞ্চ সেরে নিই'। শাওনেরও খিদে পেয়ে গিয়েছিল। কাজেই পাইনউডের রেস্টুরেন্টে ঢুকল ওরা। রেস্টুরেন্টে বেশ ভিড়। অনেক লোক লাঞ্চ করছে একসঙ্গে। পরিদাদু তাঁদের দু-চারজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগলেন লাঞ্চের অর্ডার দেবার পরে। অদ্ভুত ব্যাপার, এত মানুষ অথচ কেউই রাতে এখানে থাকবেন না বলেই জানালেন। এদের কেউ কেউ লাঞ্চ সেরে সোজা শিলং চলে যাবেন আজই, বাকিরা গিয়ে উঠবেন প্লেজারে। পরিদাদু এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করায় একজন বললেন, 'আপনি এই রেসর্টের ব্যাপারে শোনেননি কিছু?'

'কী?' বোকার মতন মুখ করে বললেন পরিদাদু।

'পাইনউড তো বেজায় ভূতুড়ে জায়গা মশাই। রাতে এখানে মারাত্মক সব ঘটনা ঘটে। পাইনউডে তাই রাত কাটায় না কেউ।'

'ইশ এত সুন্দর লোকেশন পাইনউডের', বলে দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন পরিদাদু। তারপর বেশ উঁচু গলায় সকলকে শুনিয়ে শুনিয়েই বললেন, 'ও ভূত প্রেত যাই থাক আমি বাপু পাইনউড ছেড়ে নড়ছি না। দু-তিনটে দিন এখানেই বডি ফেলে দেব, তারপর যা হয় হবে। এই যুগে ভূতের ভয়ে পালাব, হয় নাকি? সত্যি ভূতগুলো থাকেও যদি বা, মানুষ সম্পর্কে কী ধারণাটা হচ্ছে তাদের... ভাবছে মানুষগুলো এমনি ভিতুর ডিম হয়ে গেছে যে তাদের চ্যালেঞ্জটা ভরসা করে নিতেই পারছে না কেউ। আমি কিন্তু ওদের ওয়াকওভার দিতে রাজি নই। আমি এখানেই থাকব।'

'সত্যি থাকবেন?' এক অল্পবয়েসি দম্পতি লাঞ্চ করছিলেন শাওনদের পাশের টেবিলে। সেই ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদুকে।

'আলবাত'। জোর দিয়ে বললেন পরিদাদু।

'আমিও থাকব তাহলে, ইনফ্যাক্ট এ জায়গাটা এত সুন্দর আর শান্ত...'

'আমরাও আছি। চলুন একসঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার করা যাক একখানা'। আরও দুই ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন।

পরিদাদু হাসলেন, 'ভালোই হল। আমি ভাবছিলাম আমাদের দুজনকেই হয়তো কাটাতে হবে এত বড় রেসর্টে। একসঙ্গে এতজন থাকলে ভরসাও হয় জানেন তো, সত্যিই যদি কোনো বিপদ আসে একসঙ্গে সবাই মিলে মোকাবিলা করলে লড়াইটা অনেক সহজ হয়।'

পাইনউডে সাড়া পড়ে গেল। অনেকদিন পরে এতজন বোর্ডার পেয়েছে পাইনউড লেক রেসর্ট। পরিদাদু ডিলাক্স রুমই ভাড়া নিলেন। লেক ফেসিং। ঘরটা সত্যিই অসাধারণ। ঘরে ঢুকে চোখ জুড়িয়ে গেল শাওনের। পালিশ করা কাঠের মেঝে, কাঠের ছাদ। ঘরের মধ্যে ফায়ার প্লেসের বন্দোবস্ত রয়েছে। এখন যদিও ঠান্ডা নেই। শাওন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিল ফায়ার প্লেসটাকে। আগে সে কখনও এমন ব্যবস্থা দেখেনি। কাঠ জ্বালানোর জন্যে লোহার খাঁচা বানানো আছে। তার চারদিকে পাথরের দেওয়াল। ওপরের অংশে দুটো পাল্লা দেওয়া বন্ধ দরজা। দরজায় বাইরের দিক থেকে তালা লাগানো। কাবার্ডের মতন দেখতে। শাওন কাবার্ডই ভেবেছিল। পরিদাদু বললেন ওর মধ্যে দিয়ে ধোঁয়া বেরনোর পথটা ওপরে উঠেছে। ঘরের একদিকে দেওয়াল জোড়া কাচের স্লাইডিং দরজা। শৌখিন পরদা ঝোলানো। কাচের দরজার ওপাশে কাঠের রেলিং দেওয়া ব্যালকনি। ব্যালকনির ওপাশে পাহাড়ের গা গড়ানো নিবিড় জঙ্গলের পায়ের কাছে দীর্ঘ এলাকা জুড়ে শুয়ে আছে উমিয়াম লেক। পরিদাদু দরজা খুলে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। শাওনকেও ডাকলেন হাতছানি দিয়ে। বললেন, কী অসাধারণ ভিউ, বল শানু এই সুন্দর জায়গাটা যদি দীপুর হাতছাড়া হয়ে যায় সেটা কি ভালো হবে ?'

'কিন্তু সত্যি যদি এখানে ভূতুড়ে তাণ্ডব চলে, লোকজন থাকবেই বা কোন ভরসায়... হাজার হোক তারা পয়সা খরচ করছে স্বস্তিতে বেড়ানোর জন্যে...'

'ঠিকই বলেছিস', পরিদাদু মাথা নেড়ে সায় দেন শাওনের কথায়, 'কিন্তু তাঁরা যাতে উৎপাতটা বন্ধ করেন সে চেষ্টাটাও তো করতে হবে।'

'কী করবে ?'

'দেখি', খুব খুঁটিয়ে চারদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে পরিদাদু বললেন, 'প্রথমে জানার চেষ্টা করতে হবে ভূতেদের আপত্তিটা ঠিক কোথায় তারপর দরকার হলে তাদের কাছে আবেদন নিবেদন করতে হবে যাতে আমার বন্ধু দীপুর এই সুন্দর রেসর্ট থেকে তাঁদের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরে যায়'। পরিদাদু মুচকি হাসলেন। বললেন, 'চল, এখানে বেশিক্ষণ আর দাঁড়াব না। তার চেয়ে বাইরে যাই। হাঁটতে হাঁটতে আশপাশটা একটু ঘুরে আসি।'

পরিদাদুর সঙ্গে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল শাওন। পরিদাদু দরজায় তালা দিলেন। চাবি নিজের প্যান্টের পকেটে পুরে ফেললেন। শাওন জিজ্ঞেস করল, 'চাবি কি রিসেপশনে রেখে যাবে পরিদাদু ?'

'উঁহু'। ছোট্ট করে উত্তর দিলেন পরিদাদু।

রিসেপশনের সামনে খুব স্মার্ট একজন যুবক দাঁড়িয়ে ছিল। পরিদাদুকে দেখেই দু-হাত বুকের কাছে জড়ো করে নমস্কার করল হাসি মুখে। পরিদাদুও প্রতিনমস্কার জানালেন তাকে। একটু বিস্ময় মেশানো গলায় বললেন, 'আপনি ?'

'আমার নাম সঞ্জয়, সঞ্জয় রাউত। আমি পাইনউডে আছি বছর দেড়েক। সার্ভিস ম্যানেজার হিসেবে। পাইনউডের গ্ল্যামার তখন তো আকাশ ছোঁয়া। মাঝখান থেকে কী যে হয়ে গেল... আজকাল কেউ তো ভয়ে রাতে থাকেই না এখানে। আমরাও খুব ইন্সিকিওরড ফিল করছি আজকাল জানেন, রেসর্টটা ঠিকঠাক না চললে আমাদেরই কি চাকরি থাকবে আর? মালিক কতদিন আর লস করে টেনে নিয়ে যাবেন এটা। আবার শুনছি পাইনউডের মালিকানাও নাকি খুব শিগগিরই বদলাতে চলেছে।'

'তাই?' কিচ্ছু না জানার ভান করলেন পরিদাদু, 'মালিক বদল হলে আবার হয়তো ভালোভাবে চলতে পারে পাইনউড।'

'কে জানে, যা ভূতুড়ে উৎপাত হচ্ছে, নতুন মালিকই কি আর চালাতে পারবেন ঠিকমতন', বলে ঠোঁট ওলটালো সঞ্জয়, 'যাকগে বাদ দিন এসব কথা। আজ অনেকদিন বাদে পাইনউডে এতজন বোর্ডার একসাথে রাত কাটাচ্ছেন। শুনলাম আপনার জন্যেই নাকি এটা সম্ভব হল। পাইনউডের সার্ভিস ম্যানেজার হিসেবে আপনাকে আমি থ্যাঙ্কস জানাচ্ছি। সত্যি অনেকদিন পরে খুব ভালো লাগছে আজ।'

'পরিদাদু হাসলেন, 'আপনাদের এই রেসর্টের অ্যামবিয়েন্সটা কিন্তু সত্যিই চমৎকার। আমি খুব এনজয় করছি। শানুকে তাই বললাম চল ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে না থেকে বাইরের পরিবেশটা দেখে আসি খানিক।'

'বেশ করেছেন', বলে শাওনের দিকে তাকাল সঞ্জয়, 'তোমার নাম তাহলে শানু ?'

'হ্যাঁ, শাওন', শাওন হাসে, আপনি বাঙালি?'

'একদম। আমি বড় হয়েছি সোনারপুরে।'

'তাই? কোথায়?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।

'নাটাগাছি', বলে হাসল সঞ্জয়, 'চিনবেন কি আর?'

পরিদাদুও হাসলেন। উত্তর দিলেন না সঞ্জয়ের প্রশ্নের। সঞ্জয় আবার জিজ্ঞেস করল, 'এখন কোন দিকে চলবেন ভাবছেন?'

'লেকের দিকটাই ঘুরে আসি...' পরিদাদু বললেন।

'খুব ভালো। যান। ঘুরে আসুন। ভালো লাগবে'। সঞ্জয় শাওনের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়াল, 'হ্যাপি জার্নি। এনজয় শাওন।'

শাওনও হাত নাড়ল। হাসল তার দিকে চেয়ে। পরিদাদুই আবার সঞ্জয়ের একটু কাছে এগিয়ে এলেন। আড়চোখে শাওনের দিকে একবার চেয়ে নিয়ে নীচু গলায় বললেন, 'লেকের দিকটা বিকেলের দিকে এমনিতে নিরাপদ তো?'

'মানে?' সঞ্জয় চোখ কুঁচকে তাকাল তাঁর দিকে।

'না মানে শানুকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি তো, ছেলেমানুষ। ভূতে ভয় পায় খুব। শুনেছি ওই লেকেই একটা দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকেই নাকি...'

'হ্যাঁ, পরিদাদুকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল সঞ্জয়, 'জলে ডুবে গিয়েছিল কয়েকটা ছেলে। তারপর থেকেই পাইনউডে একেবারে আস্তানা বানিয়ে ফেলেছে ওরা'।

'তাই?'

'আর বলেন কেন, জেরবার হয়ে যাচ্ছি আমরা।'

'শুনেছি ওই ছেলেগুলোর মধ্যে একজনের গায়ে লাল কালো ডোরা কাটা জামা ছিল, এই রেসর্টে কেউ কেউ রাতে বাইরে পাহাড়ের ঢালে, জঙ্গলের ছায়ায় সেই ছেলেকে দেখেছে অনেকবার...'

'শুনেছি। তবে বিশ্বাস করা মুশকিল'।

'আপনি কিছু দেখেননি?'

'না। তবে শব্দ শুনেছি। ভূতুড়ে শব্দ। হাহাকারের মতন। মনে হয় কে যেন কাঁদছে, বুক চাপড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।'

'তাহলে তো খুবই মুশকিল হল', মাথা নাড়লেন পরিদাদু, 'বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে এখানে জেদ করে থেকে যাওয়াটাতো ঠিক হল না। যদি সত্যি রাতে তেমন কিছু ঘটে...'

সঞ্জয় গম্ভীর হয়ে গেল, 'সরি, আমি বোধহয় বেশি কথা বলে ফেললাম। পাইনউডের ম্যানেজার হিসেবে এমন কিছু বলা আমার সার্ভিস কোডের বাইরে যা এখানকার বোর্ডারকে পাইনউড সম্পর্কে বিরূপ করে দেয়। প্লিজ আপনারা প্যানিকড হবেন না। আর এখানে অন্য কাউকে এ বিষয়ে আমি কিছু বলেছি এটা জানাবেন না। আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে মালিক জানতে পারলে...'

'না না ঠিক আছে। আপনি আমাদের সঙ্গেই তো আছেন', পরিদাদু মিষ্টি করে হাসলেন, 'বরং আগে ভাগে সতর্ক করে আমাদের ভালোই করলেন। রাতে অসুবিধে হলে নিশ্চিত আপনার সহযোগিতা পাব।'

'রাতে রাজীব থাকবে। বিউটিফুল গাই। ভেরি হেল্পফুল। যে কোনো সমস্যায় ওকে পাশে পেয়ে যাবেন।'

'ও কে থ্যাঙ্কস।'

'থ্যাঙ্কস'। সঞ্জয় নিজের কাজে এগিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে। পরিদাদু শাওনের দিকে চাইলেন, 'চল শানু। বিকেল হয়ে গেছে। আর দেরি করলে সন্ধে নেমে যাবে। লেকের কাছ পর্যন্ত পৌঁছনই যাবে না আর।'

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শাওন জিজ্ঞেস করল, 'পরিদাদু আমায় তুমি ভূতের ভয়ে ভীতু বলে বদনাম করলে কেন?'

'এমনিই', পরিদাদু হাসলেন, 'ছোটরা ভূতে ভয় পাবে এটাই তো স্বাভাবিক'। উত্তরটা শাওনের মনমতন হল না একেবারেই। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সে আবার জিজ্ঞেস করল, 'লাল কালো ডোরাকাটা জামা পরা লোকটার কথা আবার তোমায় কে বলল?'

'খবর নিয়ে জেনেছি'। বলে চুপ করে গেলেন পরিদাদু। তারপর গম্ভীর মুখ করে বললেন, 'পথ চলতে চলতে বেশি কথা বলিস না শানু, হাঁফিয়ে যাবি'। পরিদাদু এখন কথা বলতে চাইছেন না, বেশ বুঝল শাওন। সেও তাই আর কোনো কথা না বলে পরিদাদুর পাশে পাশে চলতে লাগল চুপটি করে। আশপাশের পাহাড়ি গাছের জঙ্গল থেকে বুনো গন্ধ ভেসে আসছিল নাকে। বাতাসটাও ভেজা ভেজা স্যাঁতসেঁতে। কী একটা লেজ ঝোলা পাখি গাছের একটা ডালে বসে একটানা ডাকছিল। সেই পাখির ডাক শুনতে শুনতে শাওনের মনে হল পাখিটাও যেন কী কারণে ভয় পেয়েছে। আর সে সাবধান করতে চাইছে শাওনকেও।

ডিনারে গিয়ে জানা গেল কম বয়েসি দম্পতি যাঁরা ছিলেন তাঁরা সন্ধে নাগাদ পাইনউড ছেড়ে প্লেজারে চলে গেছেন। ভদ্রলোকের এখানে থাকার খুব ইচ্ছে থাকলেও ভদ্রমহিলা নাকি একদম রাজি হচ্ছিলেন না। অন্য দুই ভদ্রলোক অবশ্য থেকে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে ডিনারে গিয়ে দেখাও হল। দিব্বি আছেন দেখে মনে হল তাঁদের। পরিদাদুকে দেখে হাত তুললেন তাঁরা দুজনেই। পরিদাদু হাসলেন, 'ঠিক আছেন তো?'

'এখনও পর্যন্ত। মনে মনে চাইছি ভূত টুত আসুক কিছু একটা রাতে। একটা কিছু আউটস্ট্যান্ডিং এক্সপিরিয়েন্স নিয়ে ফিরতে পারি যাতে'। পরিদাদু হা হা করে হাসলেন। বললেন, 'আমিও সেই লোভেই তো থেকে গেলাম। ভয় শুধু আমার এই নাবালক নাতিটাকে নিয়ে...'

'হি ইজ টু ব্রেভ, দেখলেই বোঝা যায়', অন্য ভদ্রলোকটি বললেন। শাওনের খুব ভালো লাগল ভদ্রলোককে। সে হেসে বলল, 'আপনারা কোথা থেকে আঙ্কল?' শাওনের কথায় উত্তর দেবার আগেই পরিদাদু আক্ষেপের গলায় বলে উঠলেন, 'দেখেছেন নিজেদের পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি আমাদের এখনও।'

পরিদাদুর কথায় ওঁরা দুজনেই মিষ্টি করে হাসলেন। তারপর একজন বললেন, 'আমি মাধুর্য, আর ও বিবেক।'

'আপনারাও বাঙালি?' অবাক হয়ে বলল শাওন।

'না', বিবেক আবার হাসলেন, 'আমি অ্যাকচুয়ালি বিহারের আর ও অ্যাসামিজ, কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন বেঙ্গলে কাজ করেছি একসঙ্গে। ইন ফ্যাক্ট ওখানেই আলাপ আমাদের। একই কোম্পানিতে ছিলাম তখন। এখন নর্থ ইস্টে ট্রান্সফার হয়ে এসেছি দুজনেই। অবশ্য এখন আমরা দুজনে দুই কোম্পানিতে।'

'কিসে আছেন?' পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন।

'মার্কেটিং, মেডিকেল এন্ড রিসার্চ ইন্সট্রুমেন্ট।'

'আই সি। তা এদিকে কি কাজে ?'

'না না। আমরা ছুটিতে আছি। দু-তিন দিনের ছুটি ম্যানেজ করে রিল্যাক্স করছি দুজনে। ইয়ার এন্ডিং-এ যা চাপ গেছে'। বলে থামলেন তিনি। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, 'আপনারা ?'

'আমরা কলকাতা থেকেই। গৌহাটিতে আমার এক রিলেটিভ আছে। ওর কাছে এসেছিলাম, ভাবলাম এদিকটা একটু ঘুরে আসি। বাই দা বাই আমি পরিমল চ্যাটার্জী আর এই আমার নাতি শাওন...'

'নাতি ?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন মাধুর্য।

'ভাইঝির ছেলে'। পরিদাদু হাসেন।

'গৌহাটিতে রিলেটিভের বাড়ি বলছিলেন, কোথায়?' মাধুর্য আবার জিজ্ঞেস করেন।

'লাচিতনগর।'

'ও।'

ওয়েটার অর্ডার নিতে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। স্পষ্ট বাংলায় জিজ্ঞেস করল সে 'কী নেবেন বলুন...' পরিদাদু মেনুকার্ড দেখে অর্ডার দিয়ে দিলেন খাবারের। শাওনকে বললেন, 'কী রে শানু, আর কিছু?'

'নাহ'। মাথা নাড়াল শাওন।

ওয়েটার পাশের টেবিলে অর্ডার নিচ্ছে এখন। পরিদাদু একটু জোরে জোরেই বললেন, 'ওর কাছেই পাইনউডের কথা শুনছিলাম। ও বলছিল জায়গাটা এত সুন্দর, শুধু একটা অশরীরী কাণ্ডের জেরে টুরিস্ট হারাচ্ছে রেসর্টটা। এই রেসর্টের মালিক নাকি ওর খুব চেনা। ও শুনেছে এই রেসর্টের হস্তান্তরের কাগজ নাকি সই সাবুদ হয়ে গেছে।'

শাওন অবাক হয়ে শুনছিল। সে ভালো মতনই জানে কথাটা ডাহা মিথ্যে। পরিদাদুও জানেন। কেন যে তবু আগ বাড়িয়ে লোকগুলোকে এমন বানানো কথা বলছেন তিনি কে জানে। শাওন কথা না বলে মাথা নীচু করে খাচ্ছিল। পরিদাদু খেতে খেতে কথা বলা পছন্দ করেন না, কিন্তু আজ নিজেই দিব্বি গল্প করছেন খেতে খেতেই। বিবেক মাথা নাড়িয়ে বললেন, 'নতুন মালিকই কি আর চালাতে পারবেন যা বদনাম ইতিমধ্যেই কুড়িয়ে ফেলেছে রেসর্ট পাইনউড়..'

'দেখা যাক', সবজান্তার ঢঙে বললেন পরিদাদু, 'শুনলাম তিনিও নাকি কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকে এটা দান করে দেবেন ভাবছেন।'

'তাই?' অবাক হয়ে বলে মাধুর্য।

'কে জানে। শুনলাম তো সে রকম। কী নাকি হাসপাতাল টাসপাতাল হয়ে যাবে এই জায়গায়।'

'ও।'

ওয়েটার আবার এগিয়ে এল। পরিদাদুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর ভারী গলায় বলল, 'আর কিছু?'

'খবর?' পরিদাদু হাসলেন। লোকটা ক্যামন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে বলল, 'না না। কিসের খবর? আমি জিজ্ঞেস করছি আর কিছু কি লাগবে আপনাদের?'

'না'। শান্ত গলায় বললেন পরিদাদু, 'আমাদের যা নেবার নেওয়া হয়ে গেছে, কী বলিস শানু?'

'হুঁ'। ছোট্ট উত্তর দ্যায় শাওন। তার বার বার মনে হয় পরিদাদুর এই কথাটার মধ্যে একটা কী যেন হেঁয়ালি আছে। কিন্তু পরিদাদুকে কিছু জিজ্ঞেস করতে বাধো বাধো ঠেকল তার। নিঃশব্দে খেয়ে উঠে হাত মুখ ধুয়ে নিল সে।

পরিদাদু খাওয়া শেষ করে বললেন, 'চল শানু লনে গিয়ে দশ মিনিট হাঁটাহাঁটি করে নিই। ভালো হজম হয়ে যাবে'।

পাইনউডের সবুজ ঘাসে মোড়া লনটি ভারি সুন্দর। অনুজ্জ্বল অথচ স্নিগ্ধ আলোয় মুড়ে সেই সুন্দরকে আরও নয়নাভিরাম করা হয়েছে। লনের প্রান্তদেশে ফুট দুই উঁচু ডুরান্ডার প্রাচীর। তার ওদিকে ঢালু পাহাড় গড়িয়ে নীচে নেমে গেছে। দূরে যেখানে আবার উঁচু হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে পাহাড়টা, সেদিকটা ঘন পাইনের জঙ্গলে আরও কালো আর অন্ধকার দেখাচ্ছে। এদিকের ঢালেও কিছু পাইন আছে। আর আছে ঝাউ। খাদের উলটোদিকে যেদিকটা ছোট ছোট কটেজ, সেদিকটা অন্ধকার অন্ধকার। কোনো টুরিস্ট নেই ওখানে। একা নিঃসঙ্গ ঘরগুলোর পিছনে, লনের দিকে একটা পাহাড়ি কাঠচাঁপা গাছ রয়েছে। গাছটায় ফুল ফুটে আছে। সেই গন্ধ নাকে এসে লাগছিল। হাফহাতা টি শার্টে শাওনের শীত করছিল। আবহাওয়াটাও ভেজা ভেজা। কুয়াশার মতন মেঘ এসে ক্রমশই জড়িয়ে নিচ্ছে তাদের। উমিয়াম লেকের দিক থেকে শির শির করে জোলো হাওয়া বইতে শুরু করল এবার। পরিদাদু বললেন, 'মনে হয় বৃষ্টি নামবে'। শাওন বলল, 'চল তাহলে ঘরে ফিরে যাই।'

'আর একটু দাঁড়া', বলে পুরো এলাকাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জরিপ করতে লাগল পরিদাদু। খাদের দিকটা, শাওনদের ঘরের ব্যালকনির অবস্থান সব ভালো করে দেখতে লাগলেন তিনি। শাওন অবাক হয়ে বলল, 'কী খুঁজছ তুমি পরিদাদু?'

'অঙ্কের ফরমুলা শানুবাবু, না হলে অঙ্ক মেলানো যে কঠিন হয়ে যাবে ক্রমাগত।'

'কিছু পেলে?'

'উঁহু। তবে একটু আধটু অনুমান করছি'। পাহাড়ের দিক থেকে আর লেকের দিক থেকে আসা হাওয়াটা গতি বাড়াচ্ছে এখন। গাছের পাতায় পাতায় সর সর ঝর ঝর আওয়াজ উঠছে। পরিদাদু সেই হাওয়া অগ্রাহ্য করে খাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। মাথা নীচু করে নীচের দিকে কী যেন দেখতে লাগলেন গভীর মনোযোগ দিয়ে। আর সেই সময়েই একজন স্মার্ট হ্যান্ডসাম যুবক এসে দাঁড়ালেন সেখানে। পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলে উঠলেন ইংরেজিতে, 'কিছু মনে করবেন না, এ সময় বাইরে থাকাটা নিরাপদ নয়। আপনারা রুমে চলে যান'। পরিদাদু তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। মুখে আলগা একটা হাসি টেনে এনে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ' মিস্টার রাজীব মোহান্তি, রাইট?'

'ইয়া'। তিনিও হাত বাড়ালেন। পরিদাদু অহমিয়া ভাষায় কথা বলতে লাগলেন তাঁর সঙ্গে। অহমিয়া ভাষাটা এমনই যে পড়তে একটুও অসুবিধা হয় না বাংলা জানা থাকলে, কিন্তু শাওন দেখেছে সহজ গতিতে কথোপকথনের সময় কিছুতেই সবটা বুঝতে পারে না সে। এখনও সে সব কথা বুঝতে পারল না। কিছু পারল। পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'ওখানে থাকাটা বিপদের কেন?'

রাজীব তখন বাঘের কথা বললেন। এও বললেন যে তিনি নিজে বাঘ দেখেন নি কখনও। তবে সঞ্জয় দেখেছে। আজও যাবার আগে এ ব্যাপারে সে সাবধান করে দিয়ে গেছে। আরও কিছু কথাবার্তা হল তাঁর পরিদাদুর সঙ্গে। পরিদাদু কী জন্যে যেন তাঁকে অনেকবার থ্যাঙ্ক ইউ বললেন। তারপর শাওনের দিকে ঘুরে বললেন, 'চল ঘরে ঢুকে যাই এবার'। তখন টিপ টিপ করে বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেছে।

ঘরে ঢুকে চেঞ্জ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল শাওন। পরিদাদু তখনও বিছানায় আড় হয়ে তাঁর সেলফোন নিয়ে কী সব জানি করছেন এক মনে। শাওনের ঘুম পাচ্ছিল, তবু একটা কথা পরিদাদুকে না জিজ্ঞেস করে পারল না সে। চোখ বুজিয়ে শুয়ে শুয়েই নীচু গলায় ডাক দিল সে, 'পরিদাদু...'

'বল'। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই সাড়া দিলেন পরিদাদু।

'ডাইনিং হলে পাইনউড নিয়ে যে তথ্যগুলো দিচ্ছিলে, তুমি নিজেও তো জানো কথাগুলো ভুলভাল...'

'জানি'। খুবই নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিলেন পরিদাদু।

'তাহলে?'

'কী তাহলে?'

'জেনে শুনে মিথ্যে কথাগুলো তুমি কেন বললে? তুমি তো মিথ্যে কথা বল না।'

পরিদাদু হাসলেন, 'দেখ শানু, আমার কোনো অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা নেই। আমি মানুষের মুখ দেখে তার সম্পর্কে নির্ভুল ধারণা তৈরি করতে পারি না। মানুষের মনের কথা বুঝে নেব সে বিদ্যেও আমার জানা নেই। এমনকি ঝানু গোয়েন্দাদের মতন তীক্ষ্ন অবসারভেশন বা ইন্টারোগেশনের মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করতে গেলেও যে স্কিল লাগে আমি তা কোথায় পাব বল, আমি তো সত্যি সত্যি গোয়েন্দা নই। অন্য মানুষের সঙ্গে আমার তফাত একটাই। সাধারণ মানুষ অনেক অদ্ভুত ঘটনা চুপ করে মেনে নেয়, আমি পারি না। আমার মধ্যে বাড়তি একটা কৌতূহল কাজ করে। অদ্ভুতের কারণ খোঁজাটা আমার একটা খেয়াল। দীপু সে কারণেই হয়তো এই ব্যাপারে আমার মতামতকে একটু বাড়তি গুরুত্ব দিতে চাইছে। কিন্তু তাকে ঠিকঠাক পরামর্শ দিতে গেলে আমায় নিজেকে তো আগে জট পাকিয়ে থাকা অঙ্কগুলোকে মেলাতে হবে'... বলে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন পরিদাদু। তারপর আবার বললেন, 'আমি আসলে সম্ভাব্য সমস্ত ঘাটে চার ছড়িয়ে ছিপ ডুবিয়ে রেখে চোখ আর মনটাকে সজাগ রাখছি কোন ছিপের ফাতনা ডোবে তা দেখার জন্যে...'

চোখ খুলে তড়াক করে বিছানার ওপরে উঠে বসে শাওন। বলে, 'তুমি কি এই পাইনউডের ভূতুড়ে কাণ্ডের পিছনে ভূত ছাড়াও অন্য কিছুর সম্ভাবনার কথা ভাবছো?'

'ভাবছি।'

'তোমার কি ধারণা এর পিছনে মানুষের হাত আছে?'

'হুঁ শানুবাবু।'

'কার?'

'সেইটেই তো খুঁজে বের করতে হবে।'

'তোমার কি কাউকে সন্দেহ হচ্ছে পরিদাদু?'

'হচ্ছে।'

'কাকে?'

'সেটা এক্ষুনি বলতে পারছি না গো শানুবাবু। যা ভাবছি তা সবটা মিলছে না। মনে হচ্ছে কোথায় যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে চিন্তাভাবনাগুলো।'

'আচ্ছা পরিদাদু, শিবলাল বিশ্বাস লোকটাকে কেমন মনে হচ্ছে তোমার?'

'হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?'

'পাইনউডের ঝামেলা ঝঞ্ঝাটে উনিই কিন্তু লাভবান হচ্ছেন সব চেয়ে বেশি।'

'ঠিকই, কিন্তু পাইনউডের স্বত্বাধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রে কী অদ্ভুত সংযম দেখাচ্ছেন ভদ্রলোক। ইচ্ছে করলেই তো ড্যাম চিপ রেটে পাইনউড কিনে নিতে পারতেন উনি।'

'এটা তো ওঁর চালও হতে পারে। যাতে ওঁকে কেউ সন্দেহ না করে চট করে এজন্যে ইচ্ছে করেই হয়তো ভালো মানুষ সাজছেন ভদ্রলোক।'

'তুই কিন্তু ক্রমশই বেশ বুদ্ধিমান হয়ে উঠছিস', বলেই চোখ বুজিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন পরিদাদু।

মরিয়া হয়ে শাওন বলে উঠল, 'তুমি কিন্তু ইচ্ছে করে আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে যাচ্ছ পরিদাদু।'

'এ কথাগুলো তো আমার মনেও এসেছে শানুবাবু, কিন্তু আরও যে প্রশ্নগুলো আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তার সমাধান যে এই সূত্র ধরে করে উঠতে পারছি না আর। মনে যে নানারকম খটকা রয়ে গেল এখনও। তার কী হবে...' বলেই লম্বা হাই তুললেন পরিদাদু শব্দ করে। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমজড়ানো গলায় বললেন, 'খুব টায়ার্ড লাগছে রে শানু। এবারে ঘুমিয়ে না পড়লে আর শরীর টিঁকবে না। বয়েস বাড়ছে তো, একসঙ্গে বেশিক্ষণ মাথাটাকে আর ঘামাতে পারি না। নে ঘুমিয়ে পড়। কথা বলিস না আর'। পরিদাদু সত্যি নাক ডাকাতে শুরু করলেন একটু পরেই। চোখ বুজিয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে শাওনও ঘুমিয়ে পড়ল একসময়।

একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ন শব্দে ঘুম ভেঙে গেল শাওনের। ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার। কত রাত এখন কে জানে। ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। আর হাওয়া বইছে হু হু করে। কিন্তু সেই হাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে অন্য একটা শব্দ কানে আসছিল শাওনের। মনে হচ্ছে একসঙ্গে অনেকে যেন কাঁদছে। কখনও সেই আওয়াজ ফিকে হয়ে দূরে সরে যাচ্ছে, আবার কখনও হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আছড়ে পড়ছে ঘরের মধ্যে তীব্র স্বরে। মারাত্মক ভয় পেয়ে গিয়ে বিছানার ওপরে উঠে বসল শাওন। ঘরের আবছা আলোতেই দেখল পরিদাদুও বিছানায় উঠে বসে আছেন। হালকা গম্ভীর শব্দে মেঘ ডেকে উঠল গুর গুর করে। ঘরের মাথায় কাঠের ওপরের টিনের শেডে বৃষ্টি ঝম ঝম করে এসে লাফিয়ে পড়ছে। ঠিক এই সময়েই যেন ঘরের মধ্যেই, খুব কাছেই কোথাও এক অদ্ভুত অপার্থিব কণ্ঠে গোঙানির আওয়াজ উঠে এল। সঙ্গে তীব্র আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ এমনই চকিত আর মর্মভেদী যে শাওন ভয় পেয়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরল পরিদাদুকে। পরিদাদু শাওনকে ভরসা দেওয়ার ভঙ্গিতে আলতো করে পিঠে চাপড় মারলেন। শাওন সামান্য সামলে নিয়ে মুখ তুলল। আর মুখ তুলেই দেখতে পেল ঘটনাটা। ব্যালকনির দিকে পরদা সরে গিয়ে কাচের দরজার ওপাশটা হালকা আলোয় দেখা যাচ্ছিল। বাইরের বাগানের আলোর যেটুকু রেশ এখানে এসে পড়ে তাতে খুব স্পষ্ট দেখা সম্ভব নয়, তবুও শাওন দেখতে পেল মানুষটাকে। আবছা আলোতেও তার গায়ের জামার লাল কালো ডোরা দেখতে অসুবিধা হল না। কাচের বন্ধ দরজার ওপরে সে যেন সাহায্য চাইবার ভঙ্গিতে হাতটা একবার ওপর দিকে তুলল, তারপর ক্রমশ নুয়ে পড়তে লাগল মাটির দিকে। শাওন তাকে দেখে আঁতকে উঠে চিৎকার করে উঠল, 'পরিদাদুউউউ...' পরিদাদু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যালকনির দরজাটার দিকে তাকিয়েই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন। দ্রুত দরজার কাছে পৌঁছে ভিতর থেকে ছিটকিনি খুলে বাইরে ব্যালকনিতে বেরিয়ে পড়লেন। শাওনও বিছানা থেকে নেমে পরিদাদুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বেশ জোরে বৃষ্টি পড়ছে তখন। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। হাওয়ায় মেশা হাহাকারের মতন শব্দ। ব্যালকনিতে বৃষ্টির ছাট আসছে। গায়ে এসে লাগছে জলের কুচি। ভালোই ঠান্ডা লাগছে। পরিদাদুর যেন কোনো হুঁশ নেই। ব্যালকনির রেলিঙের ওপর দিয়ে ঝুঁকে নীচের দিকটা একদৃষ্টে দেখতে লাগলেন তিনি। শাওনের ভয় করছিল। এক্ষুনি যদি একটা চিতা বাঘ লাফিয়ে আসে এখানে। তাছাড়া বাতাসের সঙ্গে মিশে সেই কান্নাটাও উড়ে আসছে এখনও। সে কাঁপা গলায় বলল, 'পরিদাদু ঘরে চল'। পরিদাদু যেন কথাটা শুনতেই পাননি এমনভাবে বললেন, 'লোকটাকে আর একটু স্পষ্ট দেখা গেলে ভালো হত রে শানু।'

'আমি তো স্পষ্টই দেখেছি। সেই লোক পরিদাদু, কোনো ভুল নেই, সেই যে উমিয়াম লেকে ডুবে মরেছিল। লাল কালো ডোরা জামা...'

পরিদাদু মৃদু হাসলেন, 'ইশ, আর একটু আগে লোকটাকে যদি দেখতে পেতাম রে শানু। আমাদের বাইরে বেরোতে বড্ড দেরি হয়ে গেল রে। তা না হলে...' পরিদাদুর কথা শেষ হল না। ওদের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে উত্তেজিত গলায় মিস্টার চ্যাটার্জী, মিস্টার চ্যাটার্জী বলে হাঁক পাড়তে লাগল বিবেক আর মাধুর্য। পরিদাদু তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে ব্যালকনির দিকের দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরের দরজা খুলে দিলেন। হুড়মুড় করে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল মাধুর্য আর বিবেক। আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল, 'আমরা ঘরে থাকতেই পারছি না, ভীষণ ইন্সিকিওরড ফিল করছি জানেন... আর বেশিক্ষণ থাকলে হার্ট কোল্যাপ্স করে যাবে দাদা।'

পরিদাদু বিবেকের কাঁধে হাত রাখলেন, 'কিচ্ছু হয়নি। শান্ত হন।'

'কী করে শান্ত হব, বাইরে একটানা কান্নার শব্দ শুনছেন?'

'শুনছি তো।'

'এর পরেও শান্ত থাকা যায়, বলুন?'

পরিদাদু হাসলেন, 'এ শব্দটা কোনো অলৌকিক বা ভৌতিক শব্দ নয়।'

'মানে?' কাঁপা গলায় বললেন বিবেক, 'আমার তো ভয়ে হাত দুটো পেটের মধ্যে ঢুকে গেছে মশাই।'

'এটা একটা খুব ন্যাচারাল সাউন্ড। পাইন গাছের ফল দেখেছেন তো?'

'হ্যাঁ।'

'ওই ফলগুলোর অজস্র ফাঁক ফোকর দিয়ে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে হাওয়া পাস করে এমন অদ্ভুত শব্দ হয়। অনেকেই এই শব্দে ঘাবড়ে যান। যাওয়াটা অস্বাভাবিকও নয়। না জানলে আমি নিজেও ঘাবড়ে যেতাম হয়তো। কিন্তু আগে কয়েকবার বিভিন্ন জায়গায় এ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। তাই এই অশরীরী শব্দ রহস্য আমার জানা।'

'কিন্তু ঘরের মধ্যেও একটা অন্য ধরনের আওয়াজ আমরা পেয়েছি মিস্টার চ্যাটার্জী'।

পরিদাদু এবারে গম্ভীর হলেন, 'আমরাও।'

'এ শব্দটা তো প্রাকৃতিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।'

'হুঁ'। পরিদাদু এবারেও গম্ভীর, 'আপনারা কেমন আওয়াজ পেয়েছেন বলুন তো?'

'কল কল করে জলের আওয়াজ। তার মধ্যেই কারা যেন সেভ মি সেভ মি বলে চিৎকার করছে। সেই চিৎকার ক্রমশ অসহায় গোঙানিতে পালটে যেতে লাগল...'

'আমাদেরও অলমোস্ট সেম, কিন্তু জলের শব্দটা তো ছিল না'। বলে ভুরু কুঁচকে তাঁদের দিকে তাকালেন পরিদাদু।

'যাই বলুন, আমরা কাল এখান থেকে চলে যাচ্ছি'। মাধুর্য বললেন ভয় পাওয়া গলায়।

'চলে যাবেন', পরিদাদু অদ্ভুত মুখ করে হাসলেন, 'কিন্তু তাহলে একটা ধাঁধার উত্তর যে না জানাই থেকে যাবে আপনাদের। আপনারা পাইনউডের আসল ভূতকে না দেখেই চলে যেতে চান সত্যি সত্যি?'

'মানে?' অবাক হয়ে বলেন বিবেক।

'আমায় আর একটা দিন সময় দিলে আমি আপনাদের একটা দারুণ ম্যাজিক দেখাব কথা দিচ্ছি। মাঝরাতে মিথ্যে ভূতের চিৎকার শোনার চেয়ে সেটা কিন্তু কম রোমাঞ্চকর হবে না দেখবেন।'

'মিথ্যে ভূত?'

'হ্যাঁ।'

'শিওর?'

'আলবাত।'

'কিন্তু এ ভাবে কে আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে বলুন তো, আর তার আমাদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যটাই বা কী?'

'এই প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় এখনও আসেনি', পরিদাদু মাথা নাড়লেন, 'আমি নিজেই এখনও কতকগুলো প্রশ্নের জবাব হাতড়ে বেড়াচ্ছি প্রাণপণে। আমার আশা দু-একদিনের মধ্যে সেই প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে যাব। শুধু আপনারা আমায় একটু হেল্প করে যান। দুম করে পাইনউড ছেড়ে যাবেন না প্লিজ।'

'ঠিক আছে আমরা থেকেই যাব', বলেই পরিদাদুর চোখে চোখ রাখলেন মাধুর্য, 'আপনি কি গোয়েন্দা নাকি?'

'ধুস'। পরিদাদু জোরে হেসে উঠলেন।

'তাহলে?'

'আমিও আপনাদের মতন বেড়াতেই এসেছি, কিন্তু চোখ কান খোলা রাখবার চেষ্টা করছি আমি।'

'আপাতত ভয় নেই বলছেন?'

'বলছি, কিন্তু আপাতত ভয় পাওয়া ভাবটা জিইয়ে রাখুন। আর ওদের বলুন ওই ঘরে না থেকে আমাদের ঠিক নীচের ঘরটা আপনাদের অ্যালট করে দিতে। অন্য কিচ্ছু না ভেবে এ কথাটা বলবেন কিন্তু। আপনাদের ওই ঘরে ঢোকাটা খুব জরুরি। রাত শেষ হতে ঘণ্টা তিনেক বাকি আছে আর। না ঘুমিয়ে ভয় ভয় ভাব নিয়ে রিসেপশনে বসে থাকতে আপনাদের খুব কষ্ট হবে কি?'

'না না ঠিক আছে। আপনিও কি আমাদের সঙ্গেই বসে থাকবেন এখন?'

'নিশ্চয়ই'। বলে শাওনের হাত ধরে টান দিলেন পরিদাদু, 'চল ভয় পেয়ে দৌড় লাগা রিসেপশনের দিকে।

শাওন দ্রুত পা ফেলল সেদিকেই। পরিদাদু বিবেক আর মাধুর্যর দিকে চেয়ে চোখ টিপলেন, 'আপনারা দু-তিন মিনিট পরে আসুন।'

'ওকে'। বলে নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন ওঁরা।

হাওয়ার শব্দের সঙ্গে তখনও একটানা কান্নার মতন শব্দটা এসে আছড়ে পড়ছিল, কিন্তু শাওনের আর ভয় করছিল না এতটুকু।

রিসেপশনে পৌঁছতেই রাজীব এগিয়ে এলেন, 'কী ব্যাপার এনি প্রবলেম?'

'একটা ভীষণ অস্বস্তিকর শব্দ, ঘরে এবং ঘরের বাইরে', পরিদাদু যেন উত্তেজনায় হাঁফাতে লাগলেন, 'মনে হচ্ছে যেন কারা সব...' পরিদাদুর কথা শেষ হবার আগেই পড়ি কি মরি করে দৌড়ে এলেন বিবেক আর মাধুর্য। ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠলেন, 'আমরা আমাদের রুম চেঞ্জ করতে চাই।'

'হোয়াই?' শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করতে চেষ্টা করেন রাজীব, কিন্তু তাঁর গলাটাও কেঁপে যায়। বুঝতে অসুবিধা হয় না কী ঘটতে পারে সে সম্পর্কে দিব্বি অনুমান করতে পারছেন তিনি।

'আমরা পরিমলবাবুর নীচের রুমটায় থাকতে চাই, দো উই নো ইটস কস্টলি...'

'ওকে, আইল অ্যারেঞ্জ', বিনয়ের সঙ্গে বললেন রাজীব, 'কাল আমি ওই ঘরটা রেডি করে দেব। আজ আপনারা নিজের ঘরে ফিরে যান।'

'ওহ নো মিস্টার মোহান্তি, ও ঘরে গেলে আমরা বাঁচব না। ও ঘরটা খুব গোলমেলে'। বিবেক প্রায় কঁকিয়ে ওঠেন। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে এতক্ষণে। হাওয়ার দাপটও নেই তেমন। সেই অদ্ভুত কান্নার মতন আওয়াজটাও থেমে গেছে। পরিদাদু বাইরে বেরোলেন। রাজীব বলে উঠল, 'এ সময় বাইরে বেশি দূরে যাবেন না, ব্যাপারটা রিস্কি', কিন্তু পরিদাদু ততক্ষণে বেরিয়ে গেছেন। রাজীব একজনকে চোখের ইশারায় কাছে ডেকে বিবেকদের ঘরটা রেডি করতে বললেন। লোকটা চলে গেল। রাজীব শাওনের দিকে চাইলেন। একটু ভাঙা ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'খুব ভয় পেয়ে গেছ না?'

শাওন মাথা নীচু করে ফেলল। রাজীব নিজেই বলতে লাগলেন, 'কী অভিশাপ যে লাগল পাইনউডে কে জানে। ক্যানো এমন হচ্ছে বার বার...' বেশ কিছুক্ষণ পরে সেই লোকটা ফিরে এসে রাজীবকে বললেন বিবেকদের ঘর রেডি। তাঁরা ঘরে যেতে পারেন। শাওনকে একা রেখে যেতে ইতস্তত করছিলেন তাঁরা। শাওনের নিজেরও খারাপ লাগছিল। দরজার কাছে গিয়ে কাচের বড় পাল্লাটা সরিয়ে বাইরে মুখ বাড়াল সে। মেঘ উড়ছে সাদা হয়ে। সেই মেঘের ওপাশে কিছুই চোখে পড়ল না তার। পরিদাদু ফিরলেন যখন তখন প্রায় আলো ফুটে গেছে বাইরে। শাওন রিসেপশনের সোফায় বসে ঢুলছিল। পরিদাদু ওর পিঠে আলতো টোকা দিলেন। পরিদাদুকে দেখে চমকে উঠল শাওন। গায়ের জামা ভেজা। কাদা মাটি লেগে আছে সারা গায়ে। পরিদাদু শাওনকে বললেন, 'চল আর ভয় নেই। রাত কেটে গেছে। এবার আমরা ঘরে চলে যেতে পারি। বিবেকরাও উঠে পড়লেন। রাজীব বললেন, 'আশা করি পাইনউডে আর অসুবিধে হবে না আপনাদের। হ্যাভ আ নাইস ট্রিপ।'

ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছিল শাওন। ঘুম ভেঙে দেখল পরিদাদু বিছানায় নেই। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল সে। ব্রাশ করল। জল খেল। তারপর রিসেপশনে এসে দাঁড়াল। রাজীব দাঁড়িয়ে ছিলেন। সঞ্জয়ও রয়েছে এখন। শাওনকে দেখে একগাল হাসলেন রাজীব, 'গুড মর্নিং শাওন। মিস্টার চ্যাটার্জী একটা জরুরি কাজে বেরিয়েছেন। লাঞ্চের আগেই এসে পড়বেন। তোমাকে ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে বলেছেন উনি। যা খুশি খেয়ে নাও তুমি, রুম নং বললে বিল অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে। উনি ভুল করে ফোনটা বোধহয় ঘরেই ছেড়ে এসেছেন। রুম লক হয়ে গেছে বলে ওটা আর নিতে পারেন নি। আমার থেকে সেলফোন চেয়ে নিয়ে তিনি ওই ফোনে রিং করার চেষ্টা করেছিলেন। তুমি ডিপ স্লিপে ছিলে বলে রিং শুনতে পাওনি সম্ভবত। ফোনটা উনি তোমার কাছেই রাখতে বলেছেন।'

শাওন চুপ করে শুনল কথাগুলো। তার অবাক লাগছিল। সে তো ঘরে পরিদাদুর ফোনটা দেখেনি কোথাও। পরিদাদুর ফোন কি তাহলে কাল ডামাডোলের মধ্যে হারিয়ে গেল কোথাও, অথবা চুরি টুরি হয়ে গেল! অথবা এমনও তো হতে পারে পরিদাদু হয়তো ইচ্ছে করেই এমন বলছেন। কিছু একটা মতলব আছে নিশ্চয়ই তাঁর। তা নাহলে এই সাত সকালে কী এমন জরুরি কাজ পড়ে গেল পরিদাদুর যে কিছু না জানিয়েই চলে যেতে হল শাওনকে একা এখানে রেখে দিয়ে। আপন মনে চিন্তা করতে করতে ডাইনিং হলে এসে ঢুকল শাওন।

পরিদাদু যখন ফিরলেন তখন বেলা দুপুর হয়ে গেছে। খুব গম্ভীর লাগছিল তাঁকে। শাওন ঘরের মধ্যেই বসে ছিল চুপ করে। পরিদাদুর জন্যে চিন্তা হচ্ছিল খুব। এমন তো তিনি করেন না। তিনি জানেন শাওন এখানে একা আছে। পরিদাদু ঘরে ঢুকে আবার দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। বললেন, 'টিফিন করেছিলি?'

'হ্যাঁ'। ছোট্ট উত্তর দিল শাওন।

'ঘরে চাবি দিয়ে গিয়েছিলি?'

'হুঁ।'

'চাবি নিজের কাছেই ছিল তো?'

'হ্যাঁ।'

পরিদাদু মাথা নাড়লেন। 'ঠিক আছে। স্নান করে নে শিগগির।'

'আমার স্নান হয়ে গেছে।'

'তাহলে দাঁড়া আমি স্নান টান সেরে নি।'

'তুমি কোথায় গিয়েছিলে পরিদাদু?'

'প্লেজারে।'

'প্লেজার?' অবাক হয়ে বলে শাওন, 'শিবলালবাবুর সঙ্গে কথা বললে কিছু?'

'বললাম। আলাপ করলাম তাঁর সঙ্গে। দীপুর রেফারেন্স দিলাম। খুব খাতির করলেন। বিকেলে আসবেন বললেন। তাঁর কাছে কয়েকটা তথ্য জানার ছিল।'

'এই জন্যে আমায় কিছু না বলেই বেরিয়ে যেতে হল তোমায়?'

'তাছাড়া আরও কিছু খোঁজ তল্লাশি করার ছিল। কিছু ইনফরমেশন খুব দরকার ছিল রে শানু।'

'পেয়েছ?'

'প্রয়োজনের বেশিই পেয়েছি শানুবাবু, এমন তথ্য পেয়েছি যে জানলে তোর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে।'

'কী পরিদাদু?'

'বলবখন', বলে বাথরুমের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেলেন পরিদাদু।

শিবলালবাবু যখন এলেন তখন বিকেল প্রায় তিনটে। পরিদাদু আর শাওন ব্যালকনিতে বসে ছিল। আজ আকাশে মেঘ নেই। এখান থেকেই উমিয়াম লেকটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। শিবলালবাবু গাড়ি পার্ক করে লনে আসতেই চোখচোখি হয়ে গেল তাঁর সঙ্গে। শাওন শিবলালবাবুকে চিনত না। পরিদাদুই চিনিয়ে দিলেন। পরিদাদু হাতছানি দিয়ে ডাকলেন তাঁকে, 'আমার রুমে আসুন একবার, দেখে যান কেমন আছি'। শিববাবু হেসে হাত নাড়লেন।

শিবলালবাবু মিনিট পনেরো পরে ঘরে এলেন। চেয়ারে বসলেন হেলান দিয়ে। পকেট থেকে পানের ডিব্বা বের করলেন। স্বগতোক্তি করলেন, 'যাঃ একটাই তো মোটে আছে দেখছি', বলে মুখে পানটা পুরে দিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ বলুন।'

পরিদাদু একটু ভেবে সময় নিয়ে বললেন, 'আপনার কাছ থেকে কয়েকটা কথা শুনতে চাই। যদি আমায় সাহায্য করেন...'

'নিশ্চয়ই।'

'আসলে প্রশ্নগুলো নিতান্তই আপনার ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার কেন্দ্রিক...'

'ঠিক আছে, বলুন। আপনি দীপেনবাবুর বন্ধু, তাছাড়া আমি নিজেও চাই জানেন তো যে পাইনউড অভিশাপ মুক্ত হোক...'

'দেখুন সেই জন্যেই তো...' বলে খুব বিনীত ভঙ্গিতে পরিদাদু শিববাবুর সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন, 'আপনি এদের বলেননি তো আমার পরিচয় আর উদ্দেশ্য?'

'না, আপনিই তো বারন করেছেন।'

'ওয়েল। এবার আমায় দুটো প্রশ্নের জবাব দিন।'

'বলুন।'

'আপনি আমায় বলেছেন যে আপনি সম্পূর্ণ একা। বিয়ে থা করেননি এবং সাত কূলে আপনার কেউই নেই।'

'হ্যাঁ, বলেছি।'

'কিন্তু আপনার এ কথাটা তো ঠিক নয় শিববাবু...'

'মানে?' উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে ওঠেন শিবলালবাবু।

'আমি যে খবর নিয়ে জেনেছি আপনারা দুই ভাই...'

'এ বিষয়ে প্লিজ আমায় প্রশ্ন করবেন না', উত্তেজিত গলায় বলে ওঠেন শিবলালবাবু।

'কিন্তু আমার যে এটা জানা খুব দরকার', আন্তরিক গলায় বললেন পরিদাদু।

শিববাবু একটু দম নিলেন। তারপর হতাশ গলায় বললেন, 'আমার বাবা যখন মারা যান আমার বয়েস তখন সাত আর হীরার বয়েস তিন। আর মা মারা গেল যখন তখন আমি পনেরো। বলতে গেলে আমিই বুকে করে মানুষ করেছি ওকে। কিন্তু ভাইটা আমার মানুষ হল না। বদ সঙ্গে পড়ে বাজে খরচে পয়সা ওড়াতে লাগল আর আমার কাছে চাপ দিতে লাগল টাকার জন্যে। আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। লাভ হয়নি। একদিন সম্পত্তির লোভে আমাকে খুন পর্যন্ত করতে গিয়েছিল ও। আমি শেষে বিরক্ত হয়ে আমাদের সম্পত্তি দু-ভাগ করে আমার অংশ বেচে দিয়ে চলে এলাম এ দিকে। ভাই আমার খোঁজ করার চেষ্টা করেনি। আমিও অভিমানে আর খবর নিইনি ওর। আমার কাছে ওর কোনো অস্তিত্বই নেই আর'। শিববাবু বড় করে শ্বাস নিলেন।

'তখন আপনার ক্যামন বয়েস?'

'কত আর, ছাব্বিশ সাতাশ হবে।'

'বেশ। আর একটা কথা।'

'বলুন।'

'আপনি শেষ কলকাতা গেছেন কত বছর আগে?'

'তা ধরুন বছর দশেক।'

'কী কারণে?'

'আমার এক বাল্য বন্ধুর ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে। হোটেলে উঠেছিলাম। পরদিনই ব্যাক করি।'

'হুঁ', পরিদাদু মাথা নাড়লেন, 'যে ছবিকটা আপনার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলাম সকালে সেগুলো আপনি এখন নিয়ে নিতে পারেন। আমার কাজ হয়ে গেছে।'

'ধন্যবাদ'। শিববাবু উঠে পড়লেন, 'চলি, ওদের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।'

'আসুন', পরিদাদুও উঠে দাঁড়ালেন, 'কাল আর একবার আপনাকে হয়তো পাইনউডে আসতে হতে পারে। আমি আপনাকে সময় মতন ফোনে জানিয়ে দেবখন।'

'ওকে।'

শাওন মনে মনে নিশিন্ত হল। পরিদাদুর ফোন তার মানে পরিদাদুর কাছেই আছে।

সন্ধেবেলা চা আর স্ন্যাক্স খেতে খেতে পরিদাদু বললেন, 'ঘরে গিয়ে এখনই ঘণ্টা দুই তিন ঘুমিয়ে নিই বরং চল। রাতে মনে হচ্ছে তো ঘুম টুম হবে না আর।'

'আজও ওইসব উপদ্রব হবে বলছ?'

'তা তো একটু হবেই। তবে একটা ভরসা তোকে দিতে পারি। সম্ভবত লাল কালো ডোরাকাটা জামা পরা লোকটা জল থেকে উঠে এসে মাঝরাতে তোকে আর ভয় দেখাতে আসবে না।'

'কী করে জানলে?'

'কাল বলব।'

'তার মানে পাইনউডের রহস্য তোমার জানা হয়ে গেছে।'

পরিদাদু আর কোনো কথা বললেন না।

রাতে লাল কালো ডোরা কাটা জামা পরে সত্যিই কেউ আর ভয় দেখাতে আসেনি। রাত গভীর হতেই হালকা বৃষ্টির সঙ্গে জোরালো হাওয়া বইতে শুরু করতেই পাইনের জঙ্গল থেকে সেই সমবেত কান্নার মতন তীক্ষ্ন আওয়াজটা পাইনউড রেসর্টের শরীর জড়িয়ে পাক খেতে লাগল। আর তখনি আবার খুব কাছেই, যেন গায়ের পাশ থেকেই আর্তনাদ আর গোঙানির শব্দ ভাসতে আরম্ভ করল। একটানা নয়, থেমে থেমে, দু-চার মিনিটের ব্যবধানে। সেই আওয়াজে হাড়ে হিম ধরার কথা। কিন্তু পরিদাদুকে আজ খুবই নিরুদ্বেগ দেখাল। শাওন ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু সে নিজেই বুঝল যে ভয়টা কালকের মতন অত তীব্র নয়। পরিদাদু বললেন, 'শুধু আজকের রাতটাই রে শানু। কাল থেকে পাইনউড আবার শান্ত নিরুপদ্রব হয়ে যাবে। কাজেই এসবে আমল না দিয়ে বরং চল ব্যালকনিতে গিয়ে চেয়ার পেতে বসি দুজনে। কে জানে আমাদের ঘরে আসতে না পেরে যদি বিবেকদের ঘাড়ে গিয়ে চাপতে চায় ভূতটা'। পরিদাদু কাচের দরজা খুলে বাইরে চেয়ার নিয়ে বসলেন গায়ে চাদর জড়িয়ে। শাওনও চাদর মুড়ি দিয়ে এসে বসল তাঁর পাশে। বাইরে আলো খুব তীব্র নয়, কিন্তু সেই ঝাপসা আলোতেই মনে হল কে যেন পাহাড়ের ঢালু গা বেয়ে ওপরের দিকে উঠে আসতে চাইছে বুকে হেঁটে। শাওন পরিদাদুর হাত চেপে ধরল বাঁ হাতে। ডান হাতে সেদিকে দেখিয়ে চাপা গলায় ডেকে উঠল, 'পরিদাদু'—

'দেখেছি। চুপ করে থাক'। ফিসফিস করে বললেন পরিদাদু। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেন মিসড কল দিলেন। ঠিক তখনি নীচের ব্যালকনিতে বেরিয়ে এল মাধুর্য আর বিবেক। পরিদাদু রেলিং এ ঝুঁকে মাথা নীচের দিকে করে বললেন, 'ভূতটা বোধহয় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে আসার চেষ্টা করছে। অন্ধকারে কাজটা কি সুবিধের হবে... আমাদের একটু আলো দেখানো উচিত কী বলেন...'

পরিদাদুর কথা শেষ হতে না হতেই বিবেক টর্চ জ্বালল ঝোপের দিকে। লোকটা হঠাৎ আলোয় স্থির হয়ে রইল একটু। তারপর ঝোপ ঠেলে সড়াৎ করে গড়িয়ে গেল নীচে। টর্চের আলোয় লালচে জামার একদিকটা শুধু দেখা গেল এক ঝলক। তারপরেই বেশ কিছুটা নীচে ধপাস শব্দ আর একটা চাপা আর্তনাদ। ব্যাস। সে রাতে আর তেমন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটল না কিছুই।

সকালবেলাতেই বিচ্ছিরি খবরটা পাওয়া গেল। কাল এখান থেকে ফেরার সময় শিবলালবাবুর অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেছে। দুর্ঘটনাটা মারাত্মকই হবার কথা ছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন শিবলালবাবু। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়তে পড়তেও একটা গাছের গায়ে ধাক্কা খেয়ে আটকে যায়। পিছনের গাড়ির দুজন ড্রাইভার তাড়াতাড়ি করে এসে রেসকিউ করে তাঁকে। শিবুবাবুর বেশি চোট হয়নি। কপাল ফেটে গেছে। পাঁজরে আঘাত পেয়েছেন স্টিয়ারিঙের চাপে। কিন্তু সম্ভবত শকে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অচৈতন্য অবস্থাতেই শিলং সিভিল হাসপাতালে অ্যাডমিট করা হয়েছে তাঁকে। খবর পেয়েই সঞ্জয়বাবু ছুটলেন। পরিদাদুও সঙ্গী হলেন তাঁর। ওঁরা ফিরলেন এগারোটা নাগাদ। পরিদাদু বললেন, 'দেখা করতে দেয়নি। আই সি ইউ তে আছেন। সেন্স আসেনি এখনও। তবে ডাক্তাররা বলছেন কেসটা ফ্যাটাল নয়'। পরিদাদু খুব আফশোস করছিলেন, 'ইশ আজ বিকেলে অ্যামন একটা জমাটি নাটকের আয়োজন করলাম আর শিববাবুই থাকতে পারবেন না...' তখনই পরিদাদুর মুখে শুনল শাওন আজ দুপুরেই দীপেনকাকু, তোর্সা কাকিমা আসছেন পাইনউডে। পরিদাদুর কথা মতন তাঁরা ফোন করে জানিয়েছেন পাইনউডের সমস্ত কর্মী যেন বিকেলে উপস্থিত থাকেন ডাইনিং হলে। উত্তেজনায় বুকের মধ্যে গুড় গুড় করে উঠল শাওনের। আজই তাহলে পরিদাদু বোমাটা ফাটাবেন সকলের সামনে। পাইনউডের ভূতুড়ে কান্ডে যে মানুষের হাত আছে তা নিয়ে এখন শাওনের মনেও আর সংশয় নেই, কিন্তু পালের গোদাটি যে কে সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনি সে এখনও। আজ পুরো ঘটনাটা তার নিজের কাছেও পরিষ্কার হবে।

বিকেল ঠিক পাঁচটায় পাইনউডের ডাইনিং হলে উপস্থিত হল সক্কলে। আজ চেয়ারগুলোকে বেশ একটু অন্যরকমভাবে সাজানো হয়েছে যাতে সবাই মিলে গোল হয়ে বসা যায়। দীপেনকাকু আর তোর্সা কাকিমা একটা সোফায় বসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গেই বসেছিল শাওন। ঠিক তাদের পাশেই চেয়ারে বসেছিলেন পরিদাদু। ডাইনিং হল থেকে রিসেপশনের দিকে যাওয়ার দরজার কাছে বসেছেন বিবেক আর মাধুর্য। পরিদাদু তাঁদেরকেও থাকতে বলেছেন আজ। আর অন্য চেয়ারগুলোয় বসেছেন সঞ্জয়, রাজীব এবং পাইনউডের অন্য কর্মচারীরা। সকলেই চুপ। পাইনউডের সিকিওরিটির লোকজনও আছেন। এঁদের কেউ কেউ এখন অবশ্য রাতে প্লেজারে ডিউটি করেন। পাইনউডে বোর্ডার আজকাল প্রায় থাকেই না। কাজেই এখানে দু-একজনের বেশি গার্ড থাকে না। রাজীব এবং সঞ্জয় জিজ্ঞেস করেছিলেন এঁদের সকলকে ডাকার দরকার আছে কিনা। পরিদাদু তাঁদেরও থাকতে বলে দিয়েছেন। ওয়েটারদের মধ্যে কয়েকজন সকলকে কফি সার্ভ করে গেল। সঙ্গে স্ন্যাক্স। আজ পাইনউড এটা স্পনসর করছে বলে জানালেন দীপেনকাকু। শাওনের জন্যে এল স্পেশাল ফ্রুট জুস। কফি মাগে চুমুক দিয়ে পরিদাদু একবার কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে দীপেনকাকুর দিকে চেয়ে বললেন, 'আর দেরি না করে আমি বরং আমার কথা শুরু করি।'

'শিওর'। দীপেনকাকু বলে উঠলেন।

তোর্সা কাকিমাও বললেন, 'আপনার কথা শোনার জন্যে উদগ্রীব হয়ে আছি পরিমলদা। বলুন আসল ব্যাপারটা কী। পাইনউড কি সত্যিই অভিশপ্ত এবং ভূতুড়ে?'

পরিদাদু হাসলেন, 'একেবারেই না। পাইনউড অত্যন্ত মনোরম। নির্জনতা পছন্দ করেন যে সমস্ত ভ্রমণার্থী, তাঁদের কাছে পাইনউড অত্যন্ত লোভনীয় একটি জায়গা।'

'তাইতো ছিল', দীপেনকাকু মাথা নাড়িয়ে বললেন, 'কিন্তু ভূতুড়ে উৎপাতে...'

'নো ভূতুড়ে উৎপাত', পরিদাদু মাঝপথে বাধা দিয়ে থামিয়ে দিলেন তাঁকে, 'উৎপাতটা মানুষের তৈরি করা এবং সেটা করা যথেষ্ট প্ল্যান করে এবং মাথা খাটিয়ে।'

'হোয়াট?' উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন দীপেনকাকু, 'কিন্তু আমি এবং তোর্সা দুজনেই তো সরেজমিনে দেখে গেছি পরিস্থিতি সত্যিই কতটা ভয়াবহ।'

'তোরা দেখিসনি দীপু, তোদের দেখানো হয়েছে, আরও স্পষ্ট করে বললে শোনানো হয়েছে'।

'ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না পরি', অসহায়ের মতন বললেন দীপেনকাকু।

পরিদাদু বলতে শুরু করলেন, 'রাতের দিকে প্রায় প্রতিদিন এখানে বড়াপানির দিক থেকে একটা জোরালো হাওয়া বইতে থাকে। পাইনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসার সময় পাইনফলের ফাঁকফোকরের মধ্যে ঢুকে অদ্ভুত অপার্থিব শব্দ সৃষ্টি করে সেই হাওয়া। বাঁশির মতন। এখানে উমিয়ামের দুর্ঘটনার জের টেনে আজকাল সবাই ভাবে ওটা সমবেত কান্নার শব্দ।'

'কিন্তু'—

'আমি বলে নিই আগে', দীপেনকাকুকে আবারও থামান পরিদাদু, 'এই শব্দের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাইনউডের বোর্ডাররা শুনতে পান আরও কিছু ভূতুড়ে শব্দ। আর্তনাদ, গোঙানি, অথবা বাঁচার জন্যে হাহাকার।'

'রাইট, এই আওয়াজই আমরা শুনেছি'। দীপেনকাকু এবারেও বলে উঠলেন কথার মাঝখানে উত্তেজিত ভঙ্গিতে।

'আমরাও শুনেছি', এতক্ষণ চুপ করে বসে পরিদাদুর কথা শুনছিলেন মাধুর্য এবং বিবেক। এবারে কথা বলে উঠলেন তাঁরা।

'আমিও শুনেছি এবং শানুও', পরিদাদুর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি, 'কিন্তু আমি বিহ্বল না হয়ে গিয়ে এই আওয়াজের উৎস খোঁজার চেষ্টা করি।'

'উৎস পেয়েছিস?' দীপেনকাকুর আবার কৌতূহল।

'পেয়েছি।'

'কী সেটা?'

'রিং টোন। মোবাইলের রিং টোন। এই মোবাইল ফোনগুলো ফায়ার প্লেসের ওপরের তাকে তালা বন্ধ অবস্থায় রেখে দেওয়া থাকে। ঘর রেডি করার সময়েই কায়দা করে ঢুকিয়ে দেওয়া হত এটা।'

'স্ট্রেঞ্জ। পাইনউডে কে এমন কাজ করবে?' রাজীব মোহান্তি বলে উঠলেন বিস্মিত গলায়।

'বলব', পরিদাদু হাসলেন, 'কিন্তু তার আগে তোমায় যে একটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে আমার', বলে রুম ক্লিনিং এর দায়িত্বে থাকা মহিলার দিকে চাইলেন পরিদাদু, 'তোমার দু-হাতের আঙুলে অমন কালি লাগল কী করে বল তো? তুমি কি পড়াশুনো কর খুব?'

মহিলা অপ্রস্তুত হয়ে নিজের হাতের দিকে আর পরিদাদুর মুখের দিকে তাকাতে লাগল ফ্যাল ফ্যাল করে। পরিদাদু বললেন, 'কলমটা অচল হয়ে গেল, কিন্তু এ ছাড়া উপায় ছিল না আর। রিফিলটা কেটে তালায় কালি লেপে দিয়েছিলাম। হাতের কাছে আর তো কিছু ছিল না...'

মহিলা মাথা নীচু করল। পরিদাদু এরপরেই আর একজন কর্মচারীর দিকে চাইলেন, 'কী নাম হে তোমার?'

'আজ্ঞে দেবাশিস...'

'পায়ে চোট পেলে কেমন করে, তাছাড়া কনুইএর কাছটাও অনেকখানি চেঁছে গেছে। কাল রাতে ভূত সেজে কী বিপদেই না পড়ে গেলে বল। পরশু কাজটা উতরে গিয়েছিল ঠিকঠাকই, কাল গোল পাকল বাঘের ভয়কে পাত্তা না দিয়ে আমরা সবাই বাইরে থাকায়...'

'বাঘ আছে কিন্তু। আমি দেখেছি একবার। ঝোপের আড়ালে ঢাকা ছিল, তবু পিঠের হলুদ চামড়ায় কালচে ছোপ...' সঞ্জয় বলে উঠলেন।

'কী হে দেবাশিস, তুমি কী বল', পরিদাদু লঘু গলায় বললেন, 'সত্যি বাঘ আছে?'

দেবাশিস চুপ করে রইল।

পরিদাদু বললেন, 'পাহাড়ের ঢালে যে ফাটলটা সাধারণ মানুষ ওটাকে দেখতে পাবে না ঠিকই, পাহাড় বেয়ে সরীসৃপের মতন তো কেউ ওঠা নামা করে না... আমি নেহাত সৃষ্টিছাড়া তায় মিলিটারিতে কাজ করা লোক তাই ও পথে নামতে সাহস দেখালাম। ভাগ্যিস নাহলে তোমার যন্ত্রপাতিগুলো আমিও দেখতে পেতাম না হয়তো...'

'যন্ত্রপাতি মানে?' তোর্সা কাকিমা জিজ্ঞেস করলেন।

'দড়ির মই, ভেলভেটের তৈরি বাঘছাল মার্কা টাওয়েল, লাল কালো স্ট্রাইপ দেওয়া শার্ট... শার্টটা তো মনে হল এক্কেবারে নতুন। পরশুই কেনা বুঝি... ভাগ্যিস প্রথম দিনেই ওটা পরে ভয় দেখাতে এসেছিলে, আমার কাজটা সহজ করে দিয়েছিলে ভাই। আমার লাল কালো ডোরাকাটা জামার টোপ এত সহজে গিলে ফেলবে তোমরা, আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারিনি হে। যাই বল, তোমরা বাপু বড্ড অপেশাদার।'

শাওন পরিদাদুর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে পরিদাদু বললেন, 'সত্যি কি আর অমন জামা পরে কেউ মরেছিল বলে শুনেছিলাম নাকি, বলে দেখলাম কী হয়। যাক গে এরা কাঁচা লোক, ওতেই কাজ হয়ে গেছে। না হলে আমার মতন এলেবেলে একটা মানুষ, পুলিশ নই, গোয়েন্দা নই, এই কেস দু দিনে বুঝে ফেলতে পারি!'

'কিন্তু এরা তো নিশ্চয়ই মূল ষড়যন্ত্রী নয় পরি। কেউ এদের দিয়ে কাজটা করিয়েছে পয়সা টয়সার লোভ দেখিয়ে'। দীপেনকাকু অসহিষ্ণুকণ্ঠে বলে উঠলেন।

'সে তো বটেই।'

'কে সে আর কী তার উদ্দেশ্য?'

'এইটাই তো আসল প্রশ্ন', পরিদাদু ঠোঁট ওলটালেন, 'এ প্রশ্নের উত্তরটা পেতেই বার বার বিভ্রান্ত হয়েছি আমি। নিজের বুদ্ধি বিবেচনার ওপরেই অনাস্থা এসে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার ওপরে পাইনউডের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ভার দিয়ে ভুল করেছে দীপু।'

'শিববাবুই কি শেষমেশ...' তোর্সা কাকিমা বলার চেষ্টা করলেন।

পরিদাদু মাথা নেড়ে তাঁকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন, 'আমিও তাই ভেবেছিলাম প্রথম থেকে। দ্যাখো ভূতুড়ে ব্যাপারের পিছনে মানুষের হাত নিশ্চিত আছে এ নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল না। যুক্তি প্রথমেই বলে পাইনউডের পসার বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে লাভ শিববাবুরই। প্লেজার ক্রমশ ফুলে ফেঁপে উঠছে। ব্যবসায়ী হিসেবে শিববাবুর এটা একটা চাল হতেই পারে। পাইনউডের অনেকেরই অন্নসংস্থানের ভার এখন তাঁর হাতে, কাজেই তাঁর কথা শুনে পাইনউডে কিছু কর্মী যদি ভূতুড়ে কাজকম্মগুলো চালায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গোল বাঁধল পাইনউডে এসে আমি হাজির হবার পর'—

'কী রকম?' বিবেক উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

'ওই ডোরা কাটা জামা। আমি তো আউট অফ নাথিং ওই জামার গল্পটা বলেছিলাম সঞ্জয়বাবুকে। কাজেই সন্দেহের তালিকায় সঞ্জয়বাবুও ঢুকে গেলেন। রাজীববাবুকেও ব্যাপারটা বলেছিলাম সম্ভবত। কেউ প্রতিবাদ করেননি, আবার জোর দিয়ে বলেনওনি যে অমন ঘটনা তাঁরা জানেন যে সেই দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া অন্তত একজন সত্যিই লাল কালো ডোরাকাটা জামা পরেছিল। কিন্তু রাতে আমাদের ভয় দেখাতে ওই ডোরাকাটা জামার আবির্ভাব হতেই খটকাটা মনে গেঁথে গেল। তারপর ঘরের মধ্যে মোবাইলে শোনানো আর্তনাদ। সাধারণে ভয়ের সময় আগুপিছু ভাবে না, কিন্তু আমি যে আবার সেনাবাহিনীতে ছিলাম বেশ কিছু দিন। কাজেই আর্তনাদ টার্তনাদ দিয়ে আমায় টলানো মুশকিল। তাছাড়া বরাবরই ভয় ডর আমার কম। সুতরাং বিহ্বল হয়ে না পড়ে আমি মাথা খাটালাম। মোবাইলের ব্যাপারটা অনুমানে ছিল। বাইরে বেরিয়ে কায়দা করে সঞ্জয় এবং রাজীব দুজনেরই মোবাইল চেয়ে নিয়ে রিসেন্ট কল লিস্ট ঘেঁটেছি আমি। রাজীব সম্ভবত এত দ্রুত কল লিস্ট থেকে নাম্বারগুলো মোছার সময় পায়নি। আমি সময় ক্যালকুলেট করে খান চারেক নাম্বার মুখস্ত করে রেখেছিলাম। শাওন যখন ঘুমোচ্ছিল টেস্ট করে মিলে গেল। একটা নাম্বার ডায়াল করতেই বিবেকের ফোন, দাদা সাত সকালেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই থেমে গেল'। দ্বিতীয় নাম্বারে আমার ঘরেই বেজে উঠল আগের রাতের বিভীষিকাময় আওয়াজ... আমি অতএব ফাঁদ পাতলাম। ডট পেনের রিফিল ফাটিয়ে কালি ঢেলে রাখলাম তালা আর দরজার পাল্লায়'... পরিদাদু থামলেন। বললেন, আর এক কাপ কফি হলে মন্দ হত না হে'। রাজীব মোহান্তির মুখটা অদ্ভুতভাবে পালটে গেছে এখন। লাল মুখ থমথম করছে তার। চেয়ারের হাতলটা মাঝে মাঝেই শক্ত করে চেপে ধরছেন তিনি। সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন সঞ্জয়, 'রাজীব এমন করছে এতদিন ধরে ভাবতেই পারছি না। মানে আপনি তাহলে বলতে চাইছেন দেবাশিস, কবিতাদি এরাও রাজীবেরই রিক্রুট?'

'হ্যাঁ'। তাঁর দিকে চেয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন পরিদাদু।

'ও যে এ কাজ করতে পারে আমি সত্যি ভাবতে পারছি না পরি। আমি ওকে এত বিশ্বাস করেছিলাম...' দীপেনকাকু বলে উঠলেন।

'শুধু এটুকুই তো নয় দীপু, আরও জঘন্য কাণ্ড ঘটাতে চেয়েছিলেন রাজীব। কপাল জোরে সে ঘটনাটি ঘটেনি শেষ পর্যন্ত'।

'কী কাণ্ড?' সঞ্জয় উত্তেজিত গলায় বলে।

'খুন।'

'খুন, মাই গড। কাকে?'

'শিবলালবাবুকে। কাল শিবলালবাবুর পান ফুরিয়ে গিয়েছিল। রাজীব ফেরার সময় তাঁকে পান খাওয়ায়...'

'তাতে কী? পান খাওয়ানোটা কি অপরাধ?' চিৎকার করে ওঠে রাজীব।

'না', শান্ত কণ্ঠে বললেন পরিদাদু, 'কিন্তু কেউ যদি যে মানুষটাকে পাহাড়ি রাস্তায় নিজে ড্রাইভ করে ফিরতে হবে তার পানের মধ্যে না জানিয়ে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখে সেটাও কি অপরাধের মধ্যে পড়বে না রাজীববাবু... আপনি পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন, কিন্তু একটা প্রাচীন কথা আছে জানেন তো, রাখে হরি মারে কে...'

'কিন্তু কেন ও এমন কাণ্ড করল? ওর কী স্বার্থ আছে এতে?'

'আছে', হাসলেন পরিদাদু, 'এ প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতেই আরও দেড়দিন লেগে গেল আমার। আজ শিববাবুর এখানে থাকাটা জরুরি ছিল... কী করা যাবে আর, আমার দুর্ভাগ্য', বলে কফির কাপে লম্বা চুমুক দিলেন পরিদাদু। চুপ করে রইলেন একটুক্ষণ। তারপর বললেন, 'সেদিন রাতে লনে রাজীববাবুর সঙ্গে অনেক কথা হয়েছিল আমার। খুব অন্তরঙ্গ কথা। কথা প্রসঙ্গে জেনেছিলাম তিনি কটন কলেজে ইকনমিক্স নিয়ে পড়তেন। দু-হাজার সালের পাস আউট। কটন কলেজে আমার পরিচিত একজন আছেন। ক্লার্ক। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করায় তিনি খাতা পত্র দেখে কনফার্ম করেন ও নামে ওই ইয়ারে কেউ কটন কলেজে ছিলই না। আমি তখন হোয়াটস অ্যাপে রাজীবের ছবি পাঠাই। ছবি দেখে তিনি আমায় জানান এ ছবি রাজীব মহান্তির নয়, রাজীব বিশ্বাসের, পিতার নাম, হীরালাল বিশ্বাস...'

'সেটি আবার কে পরিদা?' অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন তোর্সা কাকিমা। এবার কথা বলে উঠলেন।

'শিবলালবাবুর একমাত্র ভাই, তাঁর কথা পরে একদিন আপনাদের শোনাবখন বউদি। তাঁকে আমি চিনি না। শিবলালবাবুর কাছ থেকে সংগ্রহ করা বহু পুরোনো একটা ফোটোয় তাঁর ছবি দেখেছি শুধু। সদ্য কিশোর তিনি তখন। মুখটা কেমন চেনা লেগেছিল ছবি দেখে। কিন্তু কোথায় দেখেছি বুঝতে পারছিলাম না। আসলে রাজীবের সঙ্গে... সে কথা আপাতত থাক। কিন্তু মাথায় রাখুন অকৃতদার শিববাবুর আইনত একমাত্র ওয়ারিশন রাজীববাবুই। তিনি জানতেন শিববাবু তাঁর আসল পরিচয় পেলে তাঁর ভাগ্যে কানাকড়িও জুটবে না। সুতরাং কৌশল করলেন তিনি। প্রথমে প্লেজারের শ্রী বৃদ্ধিই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। কিন্তু যেই আমার মুখে শুনলেন যে পাইনউড বিক্রি হয়ে গেছে তিনি আর দেরি করতে চাইলেন না। শিববাবু মারা গেলে পাইনউড এবং প্লেজার দুইই তাঁর কবলে চলে আসবে এই আশায় শিববাবুকে খুন করার ফন্দি এঁটে ফেললেন তিনি...'

'কিন্তু শিববাবুই যে পাইনউড কিনেছেন এ কথাটা তো তুমি সেদিন বল নি পরিদাদু?' শাওন জিজ্ঞেস করল চোখ বড় বড় করে।

পরিদাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'রাজীব তো সরেজমিনে তদন্তই করে এসেছে যে তোর দীপেনকাকু শিববাবু ছাড়া আর কাউকেই পাইনউড বেচতে আগ্রহী নন।'

'কখন?'

'সেই যে লোকটা, কাঁচা পাকা চুল, মুখে দাড়ি... পাইনউড কিনতে গিয়েছিল,' পরিদাদু রাজীবের দিকে মুখ ঘোরালেন, 'কী রাজীববাবু, ভুল বললাম নাকি, আপনিই তো গিয়েছিলেন সেদিন ছদ্মবেশে...'

রাজীব উত্তর দিল না। মাথা নীচু করে বসে রইল। দেবাশিস আর কবিতাসহ তাকে সঞ্জয়ের নেতৃত্বে পাইনউডের কর্মীরা এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে সে পালানোর চেষ্টাটুকুও করার ফুরসত পেল না। পাইনউড থেকে মেঘালয় পুলিশের কাছেও খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তারাও নাকি এসে পড়ল বলে।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরেই রেডি হয়ে নিলেন পরিদাদু। শাওনও ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি। পরিদাদু দীপেনকাকুকে বললেন, 'শানুটার একটুও ভালো করে বেড়ানো হল না এখনও। কাজেই আর দেরি নয়, শিলং ছুঁয়ে ডাউকি হয়ে চেরাপুঞ্জি চলে যাব আমরা আজকেই'। দীপেনকাকু তোর্সাকাকিমার দিকে চেয়ে বললেন, 'অনেকদিন আমাদেরও বেরনো হয় না কোথাও। চল ওদের সঙ্গে আমরাও ঘুরে আসি। আমাদের গাড়িতেই হয়ে যাবে চারজনের। পরি বরং ওর ভাড়ার গাড়ি ছেড়ে দিক এবার'। তোর্সা কাকিমাও একগাল হেসে বললেন, 'সত্যি দারুণ হবে তাহলে। বাব্বা যা গেল কদিন, মন খুলে দুটো দিন ঘুরেই আসি...'

গাড়িতে ওঠার সময় পাইনউডের সমস্ত কর্মী বাইরে এসে দাঁড়াল। বিবেক আর মাধুর্য হাত বাড়িয়ে দিলেন পরিদাদুর দিকে। পাইনউডের কর্মীরা পরিদাদুর দিকে চেয়ে আনন্দে হাত নাড়াতে লাগল। তাদের চোখের দৃষ্টি কৃতজ্ঞতায় ভরা। সে দিকে চেয়ে পরিদাদুও হাসি মুখে হাত নাড়লেন। আর গাড়িতে ওঠার সময় তাদেরকে আন্তরিক আশ্বাস দিলেন, 'আকৌ আহিম, আকৌ লগপাম... আবার আসব, আবার দেখা হবে...'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%